সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২০

করোনোত্তর পৃথিবীঃ যুদ্ধাশঙ্কা

 


আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, দক্ষিন কোরিয়া, চীন, ইংল্যান্ড, ইজরায়েল ও ইতালি।

কী, করোনার তালিকার কথা ভাবছে! ঠিক তাই, কিন্তু এই তালিকার বাইরেও আরেকটা তালিকা রয়েছে, যেখানে এই পর্যয়ক্রমেই এই দেশ কটিই বিরাজমান।

কথায় আছে ভাগ্যের বোঝা ভগবানে বয়। আপনি আব্রাহামীয় বা প্যাগান তথা সনাতনী যে ধর্মেরই হোন- আপনার নির্দিষ্ট ভগবান আছে; নাস্তিকদেরও ভগবান আছে- আস্তিকেরা। কারণ নাস্তিকেরা আস্তিকদেরই জপেন দিবানিশি। সে যাই হোক, প্রশ্নটা ভগবান নিয়ে, আস্তিক বা নাস্তিক নিয়ে নয়। ঘটনা হলো ভগবান দেশ শাসন করেনা, করে মানুষ। কেউ ভগবানদের দোহায় দিয়ে তো কেউ গণতন্ত্রের দোহায় দিয়ে, বাকি মুষ্টিমেয় লেজেন্ডরা 'এলিট-বুড়ো' দিয়ে।

ভগবান থাকার একটা মস্ত সুবিধা আছে, বোঝা’র সব দায় সব তার; অপরদিকে এলিট-বুড়োরা ভুল করেন না, তাই বোঝাও নেই, সুতরাং দায়ের প্রশ্নও দেই সেসব দেশে। বাকি রইল গণতন্ত্রী দেশগুলো! এখানে জনগণই ভগবান, সুতরাং স্বরলিপির তৃতীয় ও পঞ্চম সুরের মিলন ঘটিয়ে- সব দায় আমাদের; আমরা জনগণ। আইনানুসারে সব বোঝা আমাদের, দায়ও। বাকিরা ভক্ত ও প্রশাসন, এবং আইন আইনের পথেই চলে।

কিছুদিন আগে আমি একটা পোস্ট করেছিলাম, যুদ্ধবাজ অস্ত্র বিক্রেতা ও শীর্ষ করোনা আক্রান্ত দেশগুলি। বেশ গুছিয়ে গালিমন্দ খেয়েছিলাম। হ্যাঁ, হতেই পারে গোটা বিষয়টাই কাকতালীয়, ইরানের মতো এক আধজন বাদ দিলে ‘এক থেকে দশ’ নম্বরের দিকে চেয়ে দেখুন- দেখবেন করোনা তালিকায় উজ্জ্বল প্রতিটা দেশই অস্ত্র রপ্তানিতেও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়। একবার স্মরণ করিয়ে দিই, আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, দক্ষিন কোরিয়া, চীন, ইংল্যান্ড, ইজরায়েল ও ইতালি।

2018 সালের এক sipri এর প্রতিবেদনে(1) অনুযায়ী- বর্তমানে অস্ত্রের বাজার হচ্ছে ৪২০ বিলিয়ন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় অঙ্কতে- বত্রিশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকারও বেশি। শূণ্য গুণে শেষ করা যাচ্ছিল না, যা অঙ্ক। এটা টাকা আমাদের এই ১৩৮ কোটি জনসংখ্যার দেশের ২০২০ সালের মোট বাৎসরিক বাজেটের(2) সমান। আল’জাজিরার(3) একটা প্রতিবেদনের হিসাবে এই বাজার বিগত ১০ বছরে বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই বিপুল টাকা কাদের পকেটে যায় ভেবে দেখেছেন কখনও? এতটুকুও আশ্চর্য না করে বলি- অস্ত্র রপ্তানি কারক প্রথম ৪টি কোম্পানিই আমেরিকার যথাক্রমে, ‘লকহেড মার্টিন’, ‘বোয়িং’, ‘রেদিওন’, ‘নরথর্প গ্রুম্ম্যান’। একটি ব্রিটিশ কোম্পানি, ‘BAE Systems’, ষষ্ঠটি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ‘এয়ারবাস’; একচেটিয়া বাজার তাতে সন্দেহ নেই। এদের ভাগযোগটাও দেখে নিন এই ঠিকানাতে(4) ঘুরে এসে, দেখুন এই লুটের বখরা কে কত পায়। মোদ্দা এই দেশগুলর রাষ্ট্রীয় সংসারের একটা বড় আয়ের উৎসই হচ্ছে এই অস্ত্র বিক্রি। প্রতিটি দেশকে চমকে ধমকে অস্ত্র কিনতে বাধ্য করে হয় মিত্র পক্ষ সেজে, না হলেই ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়া করে ছেড়ে দেবে।

এটা তো গেল শুকনো তথ্যের ক্লিশে খটখটানি। বলবেন, নতুন কী এর আছে এতে! আছে দাদা আছে, সেটাই তো আমাদের বিষয়।

এখানে বলে রাখি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ‘যুদ্ধের বাজার’ এশিয়াতে স্থানান্তরিত হয়েছে, অল্প কিছুটা আফ্রিকা ও বাকি সামান্য লাতিন আমেরিকাতে।

বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি মোটামুটি গোটা বিশ্বকেই গৃহবন্দী করে দিয়েছে। বাইরে যাওয়াই শুধু বন্ধ নেই, বরং সব্জি-মুদি-ওষুধ ছাড়া প্রায় সকল রোজগারই বন্ধ; সকলেই আমরা ঘরে বসে খাচ্ছি। কেউ সঞ্চিত অর্থ ভেঙে, কেউ ঋণ করে, আবার কেউবা সরকারের দয়াদাক্ষিণ্যে। আপনি বলবেন চাকুরিজীবি! উনারা মোট জনসংখ্যার দেড়জন মাত্র, বাকি সাড়ে ৯৮ জনের কথা বলছি, তেমনভাবে দেখলে সরকারী কর্মচারিরাও সরকার পোষিত।

ঠিক কতদিন লকডাউন থাকবে আমরা কেউ জানি না, খুব দ্রুত বিশ্ববাসী মুক্তি পাবে করোনার ত্রাস থেকে সে আশাও নেই। তারপর? মানুষ খাবে কী! রাতারাতি তো সকলে কাজ ফিরে পাবে না, সঞ্চিত পুঁজি ফুরাবে, ঋণের দরজা বন্ধ হবে। সরকারও কোনো কল্পতরু নয় যে অনন্তকাল বসে খাওয়াবে জনগণকে, সে সমর্থ কোনো দেশের সরকারেরই নেই। অতএব, কৃচ্ছসাধন অনিবার্য, মাংসে বদলে ফুলুরি দিয়েই ভাত খেতে হবে।

প্রতিটা দেশেই যে বিপুল অর্থনৈতিক দুরবস্থা এসেছে এটা একটা বাচ্চা ছেলেও জানে। আমাদের দেশও যেমন তার বাইরে নয় তেমনই উন্নত দেশগুলোও, সকলেরই হাঁড়ির হাল অবস্থা। ‘যুদ্ধের বাজার’ ও ‘অস্ত্রের উৎপাদক’ সকলেই মোটামুটি অর্থনৈতিক ভাবে ধুঁকছে, দিনে দিনে পরিস্থিতি রোজই খারাপ হচ্ছে। আমেরিকার টেক্সাস, ওকলাহোমা, জর্জিয়া, সাউথ ক্যারোলাইনা, কোলারডো, টেনিসি, মন্টানা প্রদেশ তাদের দেশের ওই ভয়াবহ মহামারীর উপেক্ষা করে সব খুলে দিয়েছে, বা দিতে বাধ্য হয়েছে। মদের বার, সেলুন, ট্যাটু পার্লার, রেস্টুরেন্ট ইস্কুল সহ সব খুলে গেছে; পেটের জ্বালা বড় জ্বালা যে। বর্তমান আমেরিকার অর্থনীতির বিষয়ে একটা ছোট্ট আঁচ বা অনুমান পেতে এই লিঙ্কে(5)। ঘুরে আসতেই পারেন লিঙ্ক থেকে, জ্ঞান বাড়বে বই কমবে না। বাকি উন্নত বিশ্বের অর্থনৈতিক হালহকিকৎও নেটে একটু ঘাঁটলেই পেয়ে যাবেন।

আমাদের দেশেও লকডাউন খুললো বলে, নিরুপায়; তাতে করোনার ভাক্সিন বাজারে আসুক বা না আসুক। আশার কথা হচ্ছে আমাদের দেশজ অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। উন্নত দেশগুলোর সে সুবিধা নেই, তারা প্রযুক্তি, ভোগ্যপণ্য ও অস্ত্র বিক্রি করা অর্থের বলে বলিয়ান। স্বভাবতই, আমরা সরু চালের বদলে মোটা চাল একবেলা খেয়ে জীবন ধারণ করে নেবো কিন্তু উন্নত দেশগুলো কী খাবে! তাদের ঠাটবাট কী দিয়ে চলবে!

এখন এই পরিস্থিতিতে এই “যুদ্ধ বাজারের দেশের” সরকার চাল কিনবে না অস্ত্র কিনবে? চাল না দিলে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে, সাথে লুঠতরাজ-অরাজকতা। এক্ষেত্রে উত্তরটা খুব স্বাভাবিক, অস্ত্র কিনবে না। সাধারণ মানুষও ভোগ্যপণ্য খুবই কম কিনবে, প্রযুক্তি খরিদও তথৈবচ। এদিকে বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্য বিক্রি বিপুল হ্রাস, মানে উন্নত দেশগুলোর উৎপাদন ঝাড় খাবে। প্রযুক্তিও বেঁধে খাওয়াবার বস্তু নয়, সে ব্যবসাও ঝাড় খাবে উন্নত বিশ্বের। মানুষের হাতে আবার ক্রয়ক্ষমতা না ফিরলে এই ক্ষেত্রগুলোতে বিপুল আর্থিক মন্দা দেখা দেবে, যা রাতারাতি শুধরাবার নয়। তাহলে তাদের বাঁচার উপায় কী?

সিম্পলি একটাই, যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা।

সেটা করতে পারলেই, খেয়ে না খেয়ে অস্ত্র কিনতে বাধ্য প্রতিটা দেশ। এদের সাথে আছে পাকিস্তানের মতো পরজীবি রাষ্ট্রগুলো, যাদের জন্মই হয়েছে যুদ্ধবাজেদের পোষা নেড়ির মতো ঘেউ ঘেউ করে মাতিয়ে ব্যস্ত রাখা পড়শীকে।

একটা বৃহৎ যুদ্ধই পারে লকডাউনে শুয়ে পড়া ইউরোপ-আমেরিকার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে। কোটি কোটি মানুষের কাছে গিয়ে যেচে যেচে ভোগ্যপণ্য বা প্রযুক্তি ফেরি করার চেয়ে শ'খানেক রাষ্ট্রপ্রধানকে কব্জা করা সহজ। প্রতিটি দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি রয়েছে তাদের নিজেদের মধ্যে বা রাষ্ট্রের সাথে লেলিয়ে দেওয়া আরো সহজ। যেকোনো ছুতোয় অস্ত্রগুলো কিনতে বাধ্য করতে পারলেই তাদের রোজগার, এটাই তাদের জরুরীকালীন ঘুরে দাঁড়ানো একমাত্র পন্থা। প্রসঙ্গত এই এপ্রিলেই ভারত সরকার আমেরিকার থেকে কয়েক হাজার কোটির অস্ত্র কিনেছে, বা কিনতে বাধ্য হয়েছে।

সুতরাং করোনার ছোঁয়াছুঁয়ি শেষ হয়ে গেল মানেই দুর্যোগ শেষ হবে, আমার অন্তত তা মনে হয়না। কারণ উন্মত্ত যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রপ্রধানগুলোর উপর যেমন পূর্ণ ভরসা আছে ঠিক তেমনি পুঁজিবাদের উপরেও আমার ভরসা অটুট। তারা একে অপরের পরিপূরক, নিজের স্বার্থের বাইরে কিচ্ছুটি বোঝে না। যুদ্ধের ফলে যদি দু'একশ কোটি ভোগে যায় যাবে, আমরা তো তৃতীয় বিশ্বের সংখ্যা মাত্র। তাতে তাদের কী ক্ষতি! দুর্বল মাত্রেই ক্ষমতার বলিপ্রদত্ত, নতুবা ছাগলের বদলে সিংহ বলি দিত আস্তিকেরা।

যুদ্ধ তো হয় বা হবে এশিয়া আফ্রিকা অঞ্চলে। যুদ্ধোন্মাদ ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে, চীনও সমুদ্রে নতুন দখলদারিত্বের খেলায় মত্ত, মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তি সামান্যও কমেনি করোনার প্রভাবে। ভয়ঙ্কর কথাটা হলো এশিয়া মহাদেশের বেশ কয়েকটি দেশ পরমাণু শক্তিধর। এই করোনা আবহে চীন পারমানবিক অস্ত্র পরীক্ষা করেছে এই এপ্রিলেই। আগামীর যুদ্ধ হলে সেখানে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহৃত হবে না, এ ভাবনা বালখিল্যতার পরিচয়।

চীন এই তথাকথিত ‘ইউরোপ-আমেরিকা’ নাম্নী উন্নত বিশ্বের কাছে বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাদের সস্তার শ্রমিক, উন্নত প্রযুক্তি, সস্তা দাম ও উন্নত বিপণন নিয়ে গোটা বিশ্বে জাঁকিয়ে বসেছে। কিন্তু তাদের দেশজ যে বাজার, যা গোটা আফ্রিকা ও আমেরিকার জনসংখ্যার সমান- তা বাকি বিশ্বে জন প্রায় বন্ধ। বাকি ভোগ্যপণ্য ছেড়ে দিন, মার্কিন ট্যেকনোলজি জায়েন্ট গুগুল, ফেসবুকেরও সেখানে ব্যবসার অধিকার নেই; উল্টে এ্যপলের মত বহু মার্কিন সংস্থার প্রোডাকশন ইউনিট চীনে।

সুতরাং, ‘উন্নত বিশ্বগুলো’ তাদের আর্থিক সঙ্কটে তাদের ‘সকলের প্রতিদ্বন্ধী’ চীনকে যে শায়েস্তা করার চেষ্টা করবে তা বলাই বাহুল্য। আমাদের দেশ সহ চীন, আফ্রিকা ইত্যাদি হলো অত্যন্ত ঘন বসতির দেশ। সুতরাং আগামীতে এই মানব সম্পদ লোভের জন্য আমাদের দেশকে যে টার্গেট বানাবে না, সে কথাও জোর দিয়ে বলতে পারা যাবেনা।

তাই ঠিক সঠিকভাবে এখনই নির্দিষ্ট করে সময় অনুমান না করা গেলেও যুদ্ধ যে অতি সন্নিকটে তা বলাই বাহুল্য। বলা ভালো আমরা যুদ্ধের ছায়াতেই শ্বাস নিচ্ছি। এই যুদ্ধে কে জিতবে কে হারবে জানি না, জ্ঞান ও বিজ্ঞান হেরে যাবে লোভ আর লালসার কাছে, তা নিশ্চিত।

মানবতা শব্দ শুধুই গরিবের জন্য, সম্মান-অহংকার-হার-ঔদ্ধত্য পুরোটাই ধনীর অলঙ্কার। সুতরাং আগামী আরও দুঃসহ ও ভয়ঙ্কর। পয়সা নয়, সম্পদ জমিয়ে রাখুন বেহিসাবি খরচা না করে। গুলি বোমাতে কত মানুষ মরবে জানি না, কিন্তু যুদ্ধের সাইডএফেক্ট হিসাবে বহু মানুষের অনাহারে মৃত্যু হবেই। তাদের মধ্যে আমি আপনি যে থাকবো না সে কথা বলা দুষ্কর।

আমাদের আছে সেই নেতারা, যাদের না আছে জ্ঞান, না আছে প্রজ্ঞা, না আছে সাহস, না আছে আছে লড়াই করার ক্ষমতা। সুতরাং এমতাবস্থায় আমরা কেউই এই করোনা পরবর্তী এফেক্ট থেকে ছোঁয়াচ বাঁচাতে পারব না, তাতে ঘরে যুদ্ধ লাগুক বা পড়শীর ঘরে।

আমাদের জনসাধারণের লড়াই এখনই শেষ হচ্ছে না বরং এটাকে শুরুর শুরু ভাবাটাই বিচক্ষণতার কাজ। এই বিচক্ষণতা আপনাকে আমাকে বাঁচিয়ে দেবে কিনা নিশ্চিত ভাবে না জানলেও আমাদের জীবনকে কিছুটা হলেও দীর্ঘায়িত করবে পুঁজির বিরুদ্ধে লড়াই দেবার জন্য।

যদি এই আশঙ্কা অমূলক হয়, এর চেয়ে বাজে ভাবনা আর দ্বিতীয়টি হয় না। কিন্তু সত্য হলে?

ভয় পেয়ে লাভ নেই, আমরা সব দিক থেকে মার খেয়েই রয়েছি। মরা আর দ্বিতীয় বার মরেনা, এই চরিত্রই আমাদের বাঁচিয়ে দেবে না সেটার গ্যারান্টি কে নিয়েছে!

ভালো থাকবেন।

1) https://www.sipri.org/.../global-arms-industry-rankings...

2) https://www.india.gov.in/spotlight/union-budget-2020-2021

3) https://www.aljazeera.com/.../huge-arms-trade-fair-draws...

4) https://www.weforum.org/.../5-charts-that-reveal-the.../

5) https://www.cbo.gov/about/privacy 

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২০

কিটের ভিতরে ঘুণঃ নেপথ্যকথন

 


র‍্যাপিড ‘করোনা টেষ্ট’ বন্ধ রাখার ঘোষণা করল iCMR, এটা খবর। যেগুলো খবর নয় সেটাই এ পোষ্টের বিষয়।

মোহাল সারাভাই এর কথা মনে আছে? মাসখানেক আগে মার্চের শেষ সপ্তাহের শুরুতে আমি একটা পোষ্ট লিখেছিলাম, ভক্তদের অসীম ভালবাসার দাপটে সেই প্রোফাইলটি দেহ রেখেছে যেখান থেকে পোষ্ট করেছিলাম। সে যাই হোক, অনেকেই মোহাল ভাইয়ের ভুলে গেছেন হয়ত, এটাও ভুলে গেছেন যে তার পিতা কার্তিকেয় সারাভাই ট্রাম্পকে উত্তরীয় প্রদান করেছিলেন মোতেরার ‘নমস্তে ট্রাম্প’ উৎসবে। এসব ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, কারন রোজই কতশত ঘটনা ঘটে চলেছে সেখানে এদের নাম আর কেইবা মনে রাখে আলাদা করে; কিন্তু সেই বিষয়টাই ভীষণভাবে আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ফিরে এসেছে।

বিগত এক মাসে পৃথিবীতে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, আমাদের দেশও তার বাতিক্রম নয়। ভারত ও বাকি দেশের বিজ্ঞানীরাও লেগে পরে আছে কিভাবে সংক্রমণ থেকে বিশ্ববাসীকে রক্ষা করা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে- ১৭ই মার্চ ২০২০ এর আগে কেন্দ্রীয় সরকার করোনা বিষয়টিকে সিরিয়াসলিই নেয়নি, তাই করোনা পরীক্ষার কিট বা ডাক্তার/স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা পোশাকেরও বরাতও দেয়নি। ১৭ তারিখের পর কেন্দ্র একটা অর্ডার জারি করে- ওই মোহাল ভাই এর ‘কোসেরা ডায়াগনেস্টিক’কে কিট যোগানের বরাত দেয়, এমনকি রাষ্ট্রীয় সংস্থা https://www.niv.co.in/ ও সে বরাত পায়নি।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেশ সহ বিশ্বের করোনা পরিস্থিতি- ভয়াবহ রূপ ধারণ করার দরুন, কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আর কোনো উপায় ছিলনা। অগত্যা কিছু বিদেশী কোম্পানীকে কিট সাপ্লাই এর অনুমোদন দেয়। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ (iCMR) এর কাছে ৩০টি কোম্পানি দরপত্র দিলেও ১৬টি কোম্পানি গুনগত মান অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল। ১৪টি কোম্পানীর মধ্যে সর্বপ্রথম- ‘Seegene’ এবং ‘SD Biosensor’ নামের দুটো দক্ষিণ কোরিয়ান সংস্থা ‘RT-PCR’ ভিত্তিক করোনা ভাইরাস রোগনির্নায়ক কিট সাপ্লাই করছিল, এগুলো ছিল সময় সাপেক্ষ পরীক্ষা। পরবর্তীতে ১২টি কোম্পানির সবাই ‘এন্টিবডির ভিত্তিক’ করোনা ভাইরাস পরীক্ষার কিট সাপ্লাই করেছিল, যেগুলো মাত্র ৩০ মিনিটে ভাইরাসের উপস্থিতি সনাক্ত করতে পারছিল।

কেন্দ্রীয় সরকার যে বিদেশী কোম্পানী গুলো থেকে অ্যান্টিবডি ভিত্তিক ‘র্যা পিড টেস্টিং কিট’ আমদানি করছিল তারা হল- বায়োমেডনমিক্স (আমেরিকা), সি.টি.কে বায়োটেক (আমেরিকা), বায়োম্যাক্সিমা (পোল্যান্ড), জিটেইন বায়োটেক (চীন), সেন্সিং সেল্ফ লিমিটেড (সিঙ্গাপুর), হ্যাংজো বায়োস্টেস্ট বায়োটেক (চীন), আমোনমেড বায়োটেকনোলজি (চীন), বেইজিং তিগসুন ডায়াগনস্টিকস (চীন), হুনান লিটুও বায়োটেকনোলজি (চীন), ভিভাচেক ল্যাব (চীন) এবং ওয়ান্ডফো (চীন)।

মানে ভারত শুধু মাত্র চীন থেকেই কিট আমদানি করেনি, মোট সাপ্লায়ারদের অর্ধেক চীনা সংস্থা অর্ধেক অন্যান্য দেশ। চীনা সংস্থাগুলোকেও iCMR ই অনুমোদন দিয়েছিল, আরো ১৬টি কোম্পানির মত বাতিল করে দেয়নি। এছাড়া সম্প্রতি কেন্দ্র সরকার দুটি বেসরকারি সংস্থা, মাইল্যাব (ভারত) এবং অ্যাল্টোনা ডায়াগনস্টিকসকে (জার্মান) বেসরকারি ল্যাবগুলিকে কিট সরবরাহের অনুমতি দিয়েছে।

এত কিছু করেও বিগত এক মাস থেকে গতকাল পর্যন্ত সাকুল্যে সাড়ে চার লক্ষ মানুষের টেস্ট করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছাড়া কেউই উপরোক্ত ১৪টি কোম্পানীর কিট নিয়ে কোনো অভিযোগ করেনি। কয়েকদিন আগে কয়েকটি হাসপাতাল কিটগুলি সঠিক ফলাফল না দেওয়ার অভিযোগ করলে, iCMR ই বলেছিল অদক্ষ ট্যেকনিসিয়ানদের কারনেই এমনটা হচ্ছে, কিটে কোনো গন্ডগোল নেই। এখানে জানিয়ে রাখা ভাল যে, উপরোক্ত কোম্পানি গুলো প্রায় সারা পৃথিবীতেই কিট সরবরাহ করছে। আর ইউরপে এ কিট গুলো খারাপ বেরিয়েছে সেই ‘সেনঝেন বায়োইজি’ কোম্পানি ভারতে কোনো মাল সাপ্লাই করেনি। এর মাঝে আবার আমার কোনো চীন প্রীতি খুঁজবেননা দয়া করে।

এ পর্যন্ত সমস্ত কিছু ঠিকঠাকই ছিল কিন্তু দুদিন আগে iCMR একটা নির্দেশে জারি করেছে যে, সারাদেশব্যপী ২ দিন ‘র্যা পিড টেস্টিং’ বন্ধ রাখতে, কারণ হিসেবে বলেছে চাইনিস কিট গুলির ব্যর্থতা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- চাইনিস কোম্পানি তো ৭টা, বাকি সাতটা সংস্থার সাপ্লাই করা কিট গুলো কি দোষ করেছে? এখানেই আসলে রহস্য লুকিয়ে আছে হয়ত। প্রসঙ্গত, বিগত ১ মাসে অনেক ভারতীয় বিজ্ঞানী, গবেষক, সংস্থা কিট আবিষ্কার করেছে ও প্রসংশিতও হয়েছে। কিন্তু সেগুলো ওই পর্যন্তই এসে দাঁড়িয়ে গেছে, পরবর্তী অগ্রগতি বিষয়ে আমরা কেউই সম্ভবত জানিনা, সম্ভবত সেগুলোর কোনো ব্যবহারিক প্রয়োগ হয়েছে বলেও জানা যায়নি।

রোজই যেখানে লাফিয়ে লাফিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে কিট দ্বারা পরীক্ষা করলেই, সেখানে হঠাৎ এভাবে সম্পূর্ণ বন্ধের পিছনে যুক্তি কি! এখানেই মনে হচ্ছে আসল ঘটনাটা লুকিয়ে আছে। ১৬টি ব্যার্থ কোম্পানীর মধ্যে ‘কোসারা ডায়াগনেস্টিক’ও ছিল। তারা মোট ৮ বার তাদের তৈরি করা কিট দাখিল করেছিল iCMR এর কাছে এবং প্রতেকবারই সেগুলো ব্যার্থ হয়েছে যোগ্যতা পরীক্ষাতে। মজার বিষয় হল এই মোহাল ভাইএর কসোরা তার নতুন কিট আমেরিকার US FDA ও ইউরোপের EUA/CE-IVD এজেন্সি থেকে তাদের কিট এপ্রুভ করিয়ে নিয়ে চলে এসেছে এই মধ্য এপ্রিলে।

বাজার হিসাবে ভারতের জনসংখ্যা- গোটা আমেরিকা মহাদেশ, ও গোটা ইউরোপ মহাদেশের যোগফলের চেয়েও বেশি। সুতরাং এই বিপুল বাজার ধরতে আমেরিকা, চীন, ইউরোপ সবাই ঝাঁপিয়ে পরবে স্বাভাবিক। ইউরোপ ও আমেরিকা নিজেরাই এই মুহুর্তে অসুস্থ, চীন বিষয়ে কেউ জানেনা তারা কেমন আছে। এদিকে ভারতীয় ব্যাবসাদারেদের চীনের মার্কেটে অন্যের ঢোকা প্রায় অসম্ভব, আমেরিকার বাজারেও তাই। বাকি রইল ভারত সহ মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকা। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিনশো কোটি মানুষ, এটাই এখন সকলের টার্গেট।

আচ্ছা, ভারত সরকার সরাসরি নিজে তো আর ওই ১৪টা কোম্পানি থেকে কিট আমদানি করছিলনা, তাহলে কে করছিল! মূলধারায় তথ্য গোপন রাখার প্রচেষ্টা কম করেনি। http://asence.com/ কোম্পানীর সাইটে চলে যান, দেখবে এটা নিউইয়র্কে রেজেস্ট্রিকৃত একটা মার্কিন ফার্মা ডিস্ট্রিবিউটেশন কোম্পানি। খালি চোখে কোনো সমস্যাই নেই, কিন্তু এদের ডাইরেক্টর তালিকা দেখলেই চুলকিয়ে টাকের চুল সব উঠে যাবে, সেই অকৃত্রিম মোহাল সারাভাই। এখন আরেক গুজরাতি কোম্পানি যাদেরকে সিংহভাগ কিট ইমপোর্টের দায়িত্ব দিয়েছে কেন্দ্র, নাম ‘জাইদাস ক্যাদিলা’, ডাইরেক্টরের নাম পঙ্কজ প্যাটেল; বাকিটার দায়িত্বে কিরণ মজুমদার শ এর কোম্পানী ‘বায়োকন ফার্মা’। এর মাঝখানে মেহুল ভাই এর ভারতীয় কোম্পানি কোসারা ডায়গনস্টিক তার দুটো কিট বাজারজাত করে ফেলেছে, The Logix Smart™ ও CoPrimer™ qPCR নামে, বিক্রির জন্য ছাড়পত্রও পেয়ে গেছে কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে। http://codiagnostics.com/ ওয়েবসাইটে তথ্য পেয়ে যাবেন।

দেশপ্রেমিকের দল ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ট্যাগ দিয়ে হয়ত কোসারার ওই কিটগুলোকেই প্রোমোট করবে বাজারে। বেনিয়া দালালদের ভেস্টেড ইন্টারেস্ট রয়েছে এই বিশ্বজোড়া মহামারীতে, 'বাজারের' হিসাব উপরের দিয়েছি। মানুষের সর্বনাস হলেও কারো তো পৌষমাস হয়ই হয়। অন্য দেশ থেকে আমদানি করা কিট গুলো থেকে সেভাবে হয়তো কাটমানি রাখতে পারছিলনা ‘দেশপ্রেমিকের’ মাদুলি বেচা রাজনৈতিক দলটি।

হয়ত আগামীতে ওই রাজনৈতিক দল পরিচালিত সরকার- মোহাল ভাইয়ের কোম্পানী থেকে, সরকারী অর্থে কিট কিনে রাজ্য গুলোকে পাঠাবে। রাজ্যগুলোরও হাত বাঁধা- তারা কেন্দ্রের থেকেই নিতে বাধ্য, আসাম ছাড়া একটিও রাজ্যকে ক্ষমতা দেওয়া হয়নি কোন প্রকারের কিট আমদানি করার। সুতরাং করোনা মোকাবিলার নামে অতিরিক্ত দামে সরকারী কোষাগার থেকে একটা বিশাল অর্থ এই দালাল ফার্মা কোম্পানীগুলোর একাউন্টে চলে যাবে, কারন আগের ১৪টা কোম্পানিকে বাতিল করে দিলে বাজারে প্রতিযোগিতাই থাকলনা, মোনোপলি দাম মোনোপলি বাজার। টাকার বাচ্চা দিতে কতক্ষণ, আর এই তাকারই বৃহত্তর অংশটা কর্পোরেট ফান্ডিং, ইলেক্টোরাল বণ্ডের পোশাক সেজে আবার ফিরে চলে আসবে বিশেষ রাজনৈতিক দলটির কাছে, যারা গত বছরে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা এভাবেই রোজগার করেছিল- মানে ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে বা সাধারণ চাঁদা হিসাবে যা অপ্রকাশিতি রয়ে যায়।

কখনও ভেবেছেন, গুজরাতি কোম্পানী গুলোই কেন অর্ডার পাচ্ছে! সরকারের কোন দায় আছে যে এদেরই অর্ডার দিতে তারা বাধ্য! এরা তো আর ভারতের প্রথম ফার্মা কোম্পানি ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল’ নয় যে, ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার দায় আছে, তাহলে স্বার্থটা কি? ও কার স্বার্থ?

আপনি কিন্তু প্রশ্ন করতে পারবেননা, কারন দেশপ্রেম আপনাকে বাঁধা দেবে। এদিকে একজন ফার্মা কোম্পানির মালিক ঐ মোহাল ভাই মোট ১১টা কোম্পানির ডাইরেক্টর, যার মধ্যে ৯টি ফার্মা কোম্পানি বাকি দুটি ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি। জানিনা ইনভেস্টমেন্ট-ফাইনান্সিং সেক্টরে একজন ওষুধওয়ালার কী কাজ থাকতে পারে টাকা সাইফন ছাড়া। এদিকে কোসারা ডায়াগনেষ্টিকের নামে কোনো লোন নেই- কর্পোরেট বিষয়ম মন্ত্রকের হিসাবে। দরকারই বা কেন, সরকার কী আর টোকেন এমাউন্ট দেয়নি তাদের!

লোন যেটাতে আছে সেটা ওই ‘আসেন্স’ কোম্পানিতে, যার লগ্নি আমেরিকাতে। আপনি দেশপ্রেমের তাড়ি খেয়ে থাকলে এসব খটখটে তথ্য মূল্যহীন। এই আসেন্স কোম্পানির দুজন অন্য ডাইরেক্টর হলেন- উমেশ সাহ ও অশোককুমার শাহ্। এনাদের সম্বন্ধে আমি বেশি কোনো তথ্য পায়নি, আপনি কিন্তু পদবী দেখেই আলাদা কিছু সন্দেহ করছেন- শাহ্ পদবী কি গুজরাতে কম? আবার আপনার সন্দেহ সত্যি হতেই পারে। আসলে ফার্মা ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আড়ালে কী দারুণ ভাবে ভারতীয় জনগণের সম্পদ লুঠ হয়ে যাচ্ছে ‘নাদির শাহ্’ এর উত্তরসূরিদের দ্বারা। আপনি হিন্দু মুসলিম নিয়েই ব্যাস্ত থাকু, বাকিরা তো ভক্ত- ওদের কি যায় আসে যায় এ সবে।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন মানুষ বাঁচল কী মরল সেটা গৌণ বিষয় রাষ্ট্রের মহান পরিচালকদের কাছে, ঘরের লোককে মুনাফা পাইয়ে দেওয়াটাই মূল লক্ষ্য। বেনিয়াদের তো এসব নিয়েও মাথাব্যাথা নেই নিজেদের স্বার্থ ছাড়া। এদের অদ্বিতীয় একটাই লক্ষ্য- তা হল রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুঠ; কখনও সরাসরি, কখনও দুর্বৃত্ত রাজনেতাদের দালালির মাধ্যমে।

এই হল সেই অধরা বিকাশ, যা মুকেশভাই, গৌতম ভাই এর পর বর্তমান উত্তরাধিকার মোহাল ভাই এর। তাতে দুদিন কেন, ২০০ দিন টেষ্ট বন্ধ হলে হোক, আমি তো ভক্ত- আমার ওসব ভেবে লাভ কী! মোদিজীকে থোরিই জনগণ – অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষা ইত্যাদির জন্য ভোট দিয়েছেন! পাকিস্তান, হিন্দুমুসলিম, পিটিয়ে মারা, রামমন্দির, NRC, নোটবন্দি, কাশ্মীরের স্পেশাল ধারা লোপ এসবের জন্য ভোট দিয়েছিলেন। আজ তার কাছে স্বাস্থ্য চাওয়া অন্যায় ও অপরাধ

বেচারা iCMR এর অধিকর্তারা, জবাবদিহি করতে করতে তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। সে যাই হোক, করোনা নিয়ন্ত্রণে মোদিজী বিশ্ব সেরার শিরোপা পেয়েছে- এই খবর কি জানতেন? যেটা জানেননা সেটা হল- এই মোহাল সারাভাই- ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার প্রানপুরুষ, সম্মানীয় ‘বিক্রম সারাভাই’ এর নাতি। দাদু হস্তি সেজে বল দেখিয়েছিলেন গোটা বিশ্বকে, নাতি মর্কট সেজে নাচ দেখাচ্ছেন। দেখুন তো উপরের ঐ 'নামটা' শোনার পর আর কোনো ত্রুটি খুঁজে পাচ্ছেন কিনা! সাবধান এনাদের নামে কিছু বলা মানেই কিন্তু দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আসতে পারে, ভক্তরা সাহেবের ইশারা ছাড়া কিছুই বোঝেনা।

তাই সাধু সাবধান।

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২০

আশার খবরঃ ভ্যাকসিন গবেষণা

 


নভেল করোনা ভাইরাস SARC-CoV2 তথা COVID-19 এর মারন দাপটে গোটা বিশ্বজুড়ে ত্রাহিত্রাহি রব উঠছে। ভয়ানক ছোঁয়াচে এই রোগ বিশ্বে প্রায় প্রতিটি দেশকে ধরাশায়ী করে দিয়েছে, প্রায় পাঁচমাস যাবৎ এই মারন রোগ বিশ্বকে গ্রাস করে রেখেছে, রোগী পরীক্ষার পর দেখা গেছে প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত ও পৌনে দু’লাখ মানুষ এর বলি হয়েছে, কমবেশি আমাদের সকলের কাছেই এ তথ্য রয়েছে। কিট দ্বারা পরীক্ষার বাইরে পৃথিবীর এই বিপুল জনসংখ্যার কাকে কোথায় যে এই ভাইরাস তার অভিক্রমনে বন্দী করেছে তা কেউই জানেনা। সারা পৃথিবী জুড়েই চলছে মারণ যজ্ঞ, মৃত্যু ভয় থেকে সভ্যতাকে বাঁচাতে আজ সারা পৃথিবী সকল বিভেদ ভুলে একজোট হয়ে লড়াই করছে। কিন্তু আজ ২১শে এপ্রিল ২০২০, তারিখ পর্যন্ত না সঠিকভাবে এই অদৃশ্য জীবাণুকে সনাক্তের সহজতর প্রণালী আবিষ্কৃত হয়েছে, না আবিষ্কার হয়েছে এই জীবানু কীভাবে সংক্রমণ শানাচ্ছে।

সারা বিশ্বের নিরিখে তথ্য বলছে, প্রতি ১০০ জন করোনা আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ৭৯ জনই সুস্থ হয়ে গেছেন। জিব্রালটার, ফকল্যান্ড আইল্যান্ড, ফায়িরো আইল্যান্ড, সানমারিও, বাহারিন ইত্যাদির মত খুব অল্প জনসংখ্যার দেশগুলো ব্যাতিরেকে করোনা আক্রান্ত হয়েছে কি হয়নি এই পরীক্ষার নিরিখে আইসল্যান্ড সবচেয়ে আগে রয়েছে, তারপরে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তৃতীয় স্থানে ইজরায়েল। আমেরিকা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে পরীক্ষা করেছে, সংখ্যাটা চল্লিশ লক্ষের কিছু বেশি; যদিও সেটা শতাংশের হিসাবে সেটা ১ জনের একটু বেশি। আমেরিকার পর পরীক্ষার বিষয়ে এগিয়ে আছে রাশিয়া, জার্মানি ও ইতালি। চীন কি করেছে সেটা তারা ছাড়া কেউ জানেনা, তাই সঠিক তথ্য কারো কাছেই নেই। সবচেয়ে মৃত্যুহার বেশি ইংল্যান্ডে, সেখানে সুস্থ হয়ে ওঠার হারও অত্যন্ত কম। অসমর্থিত সূত্রমতে ভারতে মোট করোনা টেষ্ট হয়েছে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার লক্ষের সামান্য বেশি মানুষের, মানে প্রতি সাড়ে তিন হাজার মানুষের মধ্যে একজনের। বাকি ৩৪৯৯ জনের মধ্যে কে আক্রান্ত কেউ জানেনা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত, মরলেও করোনা হয়ে কিনা জানার আগেই হয়ত দেহ লীন হয়ে যাচ্ছে। এত বড় দেশের একটা বিধানসভার সমান জনসংখ্যাকে (ভোটার নয়) কোনো রকমে স্পর্শ করতে পেরেছে, এখনও ৪১২০টা বিধানসভা বাকি। নাগরিকদের তরফ থেকে সরকারের কাছে দাবী করা উচিৎ- প্রতিদিন কতজনের টেষ্ট হচ্ছে এটা যেন নিয়মিত ঘোষণা করে ICMR বা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক।

এর মুহুর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন এই ভাইরাসের মোকাবিলার জন্য অস্ত্র তথা ভ্যকসিন বা টিকার আবিষ্কার করা। যদিও কেউ নিশ্চিত করে বলতে সক্ষম হচ্ছেননা যে ঠিক কবে নাগাদ এই রোগের প্রতিষেধক বাজারজাত করা সম্ভব। সমগ্র সভ্যতা আজ প্রায় গৃহবন্দী জীবন যাপন করলেও একটা শ্রেনীর মানুষ কিন্তু তাদের নিরলস মেধা ও শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন সভ্যতাকে রক্ষা করতে। তারা বিজ্ঞানী, গবেষক, বিশ্লেষক, অধাপকদের দল; যাদের পিছনে লগ্নি করে চলেছে বিভিন্ন রাষ্ট্র, ওষুধ কোম্পানী, সংগঠন, ও হরেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইতিপূর্বে কখনও গোটা বিশ্বজুড়ে থাকা বিজ্ঞানীরা এইরকম আপদকালীন সময়ে জরুরী ভিত্তিতে একই বিষয়ে, এই মাত্রার গবেষণা করেননি; সেদিক থেকে এটা নিজেই একটা ইতিহাস। চলুন আজকে তেমনই কিছু গবেষক, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের বিষয়ে একটু জেনে নিই এই অবসরে।

ফরিদাবাদের ‘ট্রান্সলেশানাল হেলথ সাইন্স এন্ড ট্যেকনোলজি ইন্সটিটিউট’ এর এক কর্মকর্তা গগনদীপ কাং এর বিবৃতি অনুয়ায়ী এই মুহুর্তে ভারতে ৬টি কোম্পানী সরাসরি করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন ‘ডেভলপিং’ এর কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে গুজরাটের ‘জাইডাস কাডিলা’ দুটো ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা করছে, বাকি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান একটি করে ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা করছে। সেগুলো হল- পুনের ‘সিরাম ইন্সটিটিউট’, হায়দ্রাবাদের ‘বায়োলজিকাল ই’, ‘ভারত বায়োটেক’, ইন্ডিয়ান ইমিউনোলজিক্যাল’, এবং ব্যাঙ্গালুরুর ‘মিনভ্যাক্স’ কোম্পানী গুলি। কেরালার রাজীবগান্ধী বায়োট্যেকনোলজির মুখ্য বিজ্ঞানী শ্রীকুমারবাবু জানিয়েছেন- “এই ভ্যাকসিক ডেভলপ হওয়া একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, প্রথমেই এগুলো মানুষের উপরে ব্যবহার করা হয়না; ক্লিনিক্যালি হরেক পর্যায়ের পরে, পরীক্ষাগারে বিভিন্ন ধরনের জীবজন্তুর উপরে ধাপে ধাপে পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়ে তারপর মানুষের উপরে প্রয়োগ হয়, যা কমপক্ষে এক থেকে দেড় বছরের সময়রেখাকে নির্দেশ করে”।

সুতরাং বোঝায় যাচ্ছে পৃথিবীর সকল ধরনের মানুষের জন্য সহজলভ্য ভ্যাকসিন বানানোটা সকলসময়ই একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। বিল গেটস এর ফাউন্ডেশনের অর্থে পুষ্ট- নরওয়ের অসলো শহরে অবস্থিত ‘কোপিশন ফর এপিডেমিক প্রিপারেডনেস ইনোভেশনস’ (CPIC) করোনা গবেষণা বিষয়ে তথ্য বিশ্লেষণ, বিজ্ঞানীদের মাঝে আন্তঃ সংযোগস্থাপন, ইত্যাদি- হরেক ভাবে বিজ্ঞানকে পুষ্ট করে চলেছে। তাদের তথ্য মতে, এই মুহুর্তে বিশ্বে ১১৫টি সংস্থা করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে, যাদের মধ্যে ৭৮জন এখনও চালিয়ে যাচ্ছে, বাকি ৩৭ টি কোম্পানী পরবর্তীতে আর কোনো উচ্চবাচ্য করেনি শুরুর পর। এর মধ্যে ভারত থেকে মাত্র দুটো কোম্পানীর গবেষণাকে বিশ্বসংস্থা গুলি স্বীকৃতি দিয়েছে, যথাক্রমে জাইডাস কাডিলা ও সিরাম ইন্সিটিটিউট।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর তথ্য মোতাবেক ২০শে এপ্রিল পর্যন্ত তিনটে সংস্থা মানবদেহে এই ভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেছে, যদিও তা এক্কেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। এছাড়া আরো প্রায় ৭০টি মত সংস্থা এমন আছে যারা ল্যাবরেটরি পর্যায়ে রয়েছে বা জন্তু জানোয়ারের উপরে প্রয়োগ পর্যন্ত অগ্রসর হতে সক্ষম হয়েছে। ‘হু’ এর অধিকর্তা প্রতিটি রাষ্ট্রনেতাদের কাছেই আহ্বান করেছেন যে, যখনই এই ভ্যাকসিন বাজারে আসুক তা যেন শুধু মাত্র অর্থনৈতিক সমর্থ মানুষদের জন্য বা নির্দিষ্ট কোনো ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলের জন্য না হয়; প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহায়হীন মানুষটিও যেন এই আবিষ্কারের লাভ নিতে পারে।

বিশ্বের অন্যত্র নজর রাখলে দেখা যাবে, অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন G-20 দেশগুলির কাছে যৌথ তহবিল গঠন করার আবেদন জানিয়েছে, যাতে করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক ও এন্টি-ভাইরাল ওষুধ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য দ্রুত আর্থিক ও পরিকাঠামোগত বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা যায়। কয়েকদিন পূর্বেই তাদের জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা জানিয়েছে- অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের বানানো একধরনের ভ্যাকসিন তারাও কিছু আক্রান্ত নাগরিকদের উপরে প্রয়োগ করেছে।

ডাউনিং স্ট্রীটের সূত্রানুসারে, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায়- গবেষনাসংক্রান্ত খাতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ লগ্নি করেছে গ্রেট ব্রিটেন, পরিমাণটা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। G-20 দেশ গুলির নেতা হিসাবে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিশ জনসন ঘোষণা করেছেন যে- ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হলেই তারা সর্ব নিন্মমূল্যে সেটিকে বাজারজাত করবে, যাতে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ বিজ্ঞানের লাভ পায়। এদিকে মার্কিন সরকার তাদের দেশজ কোম্পানী গুলোকে উৎসাহিত করতে বিপুল অঙ্কের পুরষ্কারের ঘোষণা করেছে, যারা করোনার ভ্যাকসিন সর্বপ্রথম আবিষ্কার করতে পারবে। যদিও ‘মেক ইন আমেরিকা’ শ্লোগানের উন্নাসিকতা রয়েছে তাদের অনেক কর্মেই, তবুও দিনের শেষে একটা সমাধান আসাটাই বড় কথা। শুধু সরকারই নয়, তাদের দেশের বিখ্যাত কোম্পানী ‘জনসন এন্ড জনসন’ বিপুল আর্থিক পুরষ্কারের কথা ঘোষণা করেছে।

CNBC সংবাদ সংস্থার উদ্ধৃতি অনুযায়ী, ‘হু’ জানিয়েছে- ‘জিন সিকোয়ান্সিং’ নিয়ে কাজ শুরু করার মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে মানবশরীরে প্রয়োগের পর্যায়ে পৌঁছানটাই একটা বিশাল সাফল্য গোটা বিশ্বের কাছে। ‘হু’ এর জরুরী কার্যক্রম বিভাগের পরিচালক ডাঃ মাইক রায়ানের মতে- ভাইরাস মানুষের জন্য যতটা ক্ষতিকর, একটা ভুল ভ্যাকসিন তারচেয়ে আরো বেশি ভয়ানক। কারন বহু আক্রান্ত মানুষ নিজ শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার গুনেই সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষমা রাখেন, যেখানে ভুল ভ্যাকসিন দেওয়া মানেই মৃত্যু অবধারিত। এদিকে এই ভ্যাকসিন সারা বিশ্বের মানুষের জন্যই অতিপ্রয়োজনীয় আজকের পরিস্থিতিত, তাই এখানে তাড়াহুড়োর কোনো জাইগা নেই।

আমেরিকার সিয়াটেলস্থিত ‘মডারনা থেরাপিউটিকস’ নামের এক বায়োটেক সংস্থা করোনা ভাইরাসের ‘জিনগত বিন্যাসক্রম’ সংক্রান্ত গবেষণা শুরু করেছে, যেখান থেকে আগামীতে এই ভাইরাসের আণবিক গঠন থেকে সংক্রমণের পদ্ধতি ও পরিবেশের সাথে দ্রুত পরিব্যাপ্তির বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। আমেরিকার জাতীয় স্বাস্থমন্ত্রকের তথ্য অনুয়ায়ী উপরোক্ত সংস্থার তৈরি ভ্যাকসিন mRNA, ১৮-৫৫ বছর বয়সী ৪৫ জন- ‘পুরুষ ও গর্ভবতী নয় এমন মহিলাদের’ শরীরে প্রয়োগ করে ভ্যাকসিন ডেভলপের প্রাথমিক দশা সাফল্যের সাথে অতিক্রম করেছে। ঠিক একই ধরনের পরীক্ষা চালিয়েছে ফিলাডেলফিয়ার ‘ইনোভো ফার্মা’ সংস্থা, INO-4800 নামের ভ্যাকসিন ৪০ জন রোগীর দেহে পরীক্ষামূলক ভাবে প্রয়োগ করেছে। আমেরিকারই ‘জন হপকিন্স’ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক নিরন্তর তথ্য বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন, এই ভাইরাসের সংক্রমণের গানিতিক গতিপ্রকৃতি নিরুপনের জন্য।

চীনের উহান প্রদেশে এই করোনা ভাইরাসের প্রকোপ সর্বপ্রথম লক্ষ্য করা গেছিল। তাদের গবেষণা সম্বন্ধে খুব বেশি জানতে পারেনা বাকি বিশ্ব, তবে তাদের কমিউনিস্ট সরকার একটা ‘ডেটাবেস’ প্রকাশ করেছে বিজ্ঞানীদের জন্য, যাতে করে বিশ্বজুড়ে ছিটিয়ে থাকা গবেষকেরা উপকৃত হন। চীনের সরকারী সংবাদপত্র সিনহুয়া’র দাবী অনুযায়ী তাদের সেনাবাহিনীর ‘ইন্সটিটিউট অফ মিলিটারি মেডিসিন’, মানব শরীরে তাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের নিরীক্ষা শুরু করে দিয়েছে গত ১২ই এপ্রিল। এছাড়া ‘কানসিনো বায়ো’ নামের এক ওষুধ কোম্পানী Ad5-nCoV নামের ভ্যাকসিন মানব দেহে প্রয়োগ করেছে, সেনঝেন প্রদেশের ‘জেনো-ইমিউন মেডিকেল ইনস্টিটিউট’ আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত গবেষণা চালাচ্ছে LV-SMENP-DC নামের করোনা ভ্যাকসিনের উপরে।

Adenovirus 26 (Ad26) নামের গবেষণাগারটি এইডস ভাইরাস, সিন্সিটিয়াল ভাইরাস, ইবোলা ভাইরাস, জিকা ভাইরাস, ইত্যাদির ভ্যাকসিনের সফল গবেষণা করেছিল; এটি জনসন এন্ড জনসন কোম্পানীর অধীনস্ত ‘জেন্সসেন ফার্মা’র নিয়ন্ত্রাধীন। এরাও কোভিড ভাইরাসের জিনগত প্রোটিনের উপরে গবেষণা করে প্রাথমিক সাফল্য লাভ করেছে। তাদের বিজ্ঞানী দলের মুখ্য কর্মকর্তা ‘পল স্টোফেলস’ এর বিবৃতি অনুযায়ী- “পৃথিবী কবে করোনার ভ্যাকসিন পাবে তা একমাত্র সময়ই বলতে পারবে, কারন গবেষণার সমস্ত শর্তগুলো বিজ্ঞানীদের নিয়ন্ত্রাধীন নয়। এবং এই ভাইরাসটি সম্বন্ধে কারো কাছেই কোনো তথ্য ছিলনা, তাই সকল বিজ্ঞানীদের শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে। তবে আমরা আশাবাদী, খুব দ্রুতই বিশ্বকে আমরা সুসংবাদ দিতে পারব’। প্রসঙ্গত জনসন এন্ড জনসন কোম্পানীটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ওষুধ কোম্পানী। পর্যায়ক্রমে বিশ্বের ১ থেকে ১০ নং ওষুধ কোম্পানী গুলি মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তাদের করোনা গবেষণাকে একটা সম্পূরক রূপ দিতে, যথাক্রমে- ফাইজার, রোচে, নোভার্তিস, মার্ক, গ্ল্যাক্সো-স্মিথ-ক্লিন, জনসন এন্ড জনসন, আবভাই, সানোফি ও ব্রিস্টল-মেয়ার্স-স্কুইবি। এর বাইরেও বহু গবেষক আড়ালেই কাজ করে চলেছেন, যার তথ্য নেই।

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল, চীনের জিজিং হাসপাতাল, এবং উত্তর ইতালির একজোড়া হাসপাতালে একত্রে- ‘হার্ভার্ড’ এর একদল গবেষকেরা করোনভাইরাস রোগীদের উপর ‘ইনহেলড নাইট্রিক অক্সাইডে’র কার্যকারিতা বিষয়ক পরীক্ষা চালাচ্ছে। medRxiv ও bioRxiv নামের দুটি অনলাইন সার্ভারের অর্কাইভে, করোনা রোগীদের সম্পর্কিত প্রচুর সঞ্চিত তথ্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন চীনা গবেষক ও বিজ্ঞানীরা। অথচ এগুলো কোনো যে গবেষকের ক্ষেত্রে বিশাল সম্মান ও অর্থ রোজগারের কারন হতে পারত, কিন্তু বিশ্বের জনগণের স্বার্থে চীনা বিজ্ঞানীরাও নিঃস্বার্থ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

সারা বিশ্বজুড়ে অক্সফোর্ডের ‘জেনার ইন্সটিটিউট’, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকুলার বায়োলজি গবেষণা কেন্দ্র, আমেরিকার ‘কাইজার পার্মানেট’ সহ অনেকেই এই কর্মে ব্রতী। ইতালির করোনাভাইরাস ক্লিনিকাল ট্রায়ালের নেতৃত্ব দানকারী ডঃ ফ্রান্সেস্কো পেরোন বলেছেন- “গবেষকরা কয়েক’শ করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স সনাক্ত করে সেগুলো বিভিন্ন ভাগে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন। দ্রুতই আমরা সফল হব”। রাশিয়ার পিটসবার্গের ‘ডাঃ ডুপ্রেক্স ল্যাব’, প্যারিসের ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউট’, ফরাসি জনস্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্র ‘ইনসার্ম’, ইতালির ‘ইমিউনোসপ্রেসিভ ড্রাগ টোকিলিজুমাব’, অস্ট্রিয়ান ড্রাগ সংস্থা ‘থেমিস বায়োসায়েন্স’, কানাডার ‘ন্যাশানাল ল্যাব’, মন্টানার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথের ‘রকি মাউন্টেন ল্যাবরেটরি’, ইরানের উর্মিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, প্রমুখ প্রতিষ্ঠানেও নিরবিচ্ছিন্নভাবে করোনা মহামারির প্রতিষেধকের খোঁজে সাধনা চালাচ্ছে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ উন্নতি ঘটিয়েছে ইজরায়েল। তাদের দেশের বহুল প্রচলিত নিউজ পোর্টাল ‘Ynet’ জানিয়েছে যে- ইজরায়েল সেনাবাহিনী চীন, জাপান, ইতালি, ব্রাজিল, আমেরিকা, ভারত সহ অন্তত ১০০ টি দেশ থেকে করোনাক্রান্ত মৃত মানুষের নমুনা যোগার করেছে। যেগুলো তাদের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সহযোগিতায়, দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের নিজস্ব কুরিয়ারে, মাইনাস ৮০ ডিগ্রী তাপমাত্রার বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত প্যাকেটে করে দেশের মুল গবেষণা কেন্দ্রে এসে পৌঁছেছে মৃতের নমুনা গুলি। সে দেশের জনপ্রিয় সংবাদ পত্র ‘হারিৎজ’ এর বয়ানে অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তত্ত্ববধানে থাকা ‘ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিকাল রিসার্চ’-এর প্রায় ৩০০ বিজ্ঞানীদের দল, নেস জিজিয়ানা শহরের ল্যাবোটারিতে ভাইরাসটির জৈবিক প্রক্রিয়া এবং চারিত্রিক গুণাবলী বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে বাকিদের তুলনাতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছ। এর মধ্যে রয়েছে আরো ভাল করে শারীরিক লক্ষণ দেখে রোগনির্নয় ক্ষমতা, সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব কমানো, মানবদেহের মাঝে উপস্থিত করোনা প্রতিরোধে সক্ষম এন্টিবডিগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে তাকে কীভাবে আরো শক্তি প্রদান করা যায়, সেই সংক্রান্ত গবেষনাও রয়েছে যেগুলো অস্থিমজ্জা ও জিনগত মডিউল বিশ্লেষণ করে পাওয়া। বিতর্কিত এক এক মাধ্যমের মতে, গ্যালিলি অঞ্চলের একটি ল্যাবে বেশ কিছু ফিলিস্তিনি ও সিরিয়ান উদ্বাস্তুদের দেহে তৃতীয় পর্যায়ের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেছে ইজরায়েল সরকার। চীনের মত না হলেও সে দেশের গোপনীয়তা সবচেয়ে নিশ্চিদ্র। সময়ই বলবে কোন গবেষকের দল সভ্যতার হয়ে বাজি জিতল।

এই হল মোটামুটি বিগত ১ মাস যাবৎ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা পড়ার ফলাফল, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য কোথাও কোনো বিজ্ঞানীকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনিনকে করোনার ওষুধ বলে ব্যবহারের নিদান দিয়ে বলে পড়লামনা। তাহলে এগুলো হচ্ছেটা কি আর এ নিয়ে আমাদের দেশ জুড়ে আলোড়নই বা উঠল কেন! এ প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে থাকলে দয়া করে বলবেন।

তথ্যসুত্রঃ-
ইকোনোমিক টাইমস ওয়েব পোর্টাল
নিউ ইয়র্ক টাইমস পোর্টাল
দ্য গার্ডিয়ান ওয়েব পোর্টাল
সি এন বি সি পোর্টাল
সায়েন্স ম্যাগাজিন পোর্টাল

রিসেসনঃ সংবাদ মাধ্যম



গোটা বিশ্বের সংবাদ সংস্থাগুলোর হাঁড়ির হাল। বিজ্ঞাপন আসছেনা কর্পোরেট দুনিয়া থেকে। সকলের অনুপ্রেরণা নেই ABP আনন্দের মত, তাই বাকিরা সাহায্য চাইছে লিঙ্ক খুললেই। সেটা ইংল্যান্ডের দ্যা টেলিগ্রাফ হোক বা মার্কিনিদের নিউইয়র্ক টাইমস। কিছু বিদেশী পোর্টাল তো পয়সা না দিলে ঢুকতেই দিচ্ছেনা তাদের ওয়েবসাইটে।
ছাপা কাগজের সংবাদ পত্র বিক্রিও বিপুল হারে কমে গেছে। ভোগ্যপণ্য সহ প্রতিটি সংস্থা যারা বিজ্ঞাপন দেয় তাদের ভাঁড়ারে টান পড়তেই সবার আগে বিজ্ঞাপন খাতে বাজেট কমিয়েছে। তাই সংবাদ সংস্থাগুলোর ভাঁড়ে মা ভবানি, আরো দুটো মাস যদি এভাবে লকডাউন চলে সেক্ষেত্রে সাংবাদিক ও নিউজ এঙ্ক্যরগুলোকেও যে সব্জি বেচতে হবেনা কে জানে!
বিজ্ঞাপন বলতে কিছু অসভ্য প্রশাসক যুক্ত রাজ্যের কর্মকর্তারা তাদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্য গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। অনেকে তো আবার পাকায় ১০০ টাকা দিচ্ছে সরকারি কোষাগার থেকে, ৭০% পার্টি ফান্ডে ফেরৎ নিয়ে আসছে বেনামিতে বা কর্পোরেট ফান্ড রূপে। সংবাদ সংস্থা গুলো দেখছে নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো- অগত্যা পায়ে পরে রয়েছে। ধন্যি গণতন্ত্র।
সংবাদের নামে সারা বিশ্বে মিথ্যার দাপটে বর্তমান যুগটার নাম দাঁড়িয়েছিল "post truth era", তুলাদন্ডের সাম্যাবস্থার জন্য প্রকৃতি নিজেই যখন চেপে ধরে- বিধি, অদৃষ্ট বা ঈশ্বরের বাহানাতে, তখন তাদের এমনই হাল হয়। মাভৈ
শেষ পাঁচ বছরে যে কিছুই পারতনা- সে একটা পোর্টাল বানিয়ে কন্টেন্ট রাইটার দিয়ে খবর লেখাতো, রোজগারের জন্য। দেশের অধিকাংস সাংবাদিকিই লাথখোর পেটোয়া, পেশার যে নীতি সেটাই ভুলে গেছিল। সাংবাদিকতার মা মাসি এক করে দিয়েছিল। সুতরাং মানুষ এদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। সুতরাং, এই রিশেসন তাদের জন্য আবার " চপশিল্পে" নতুন নতুন মানবসম্পদ লগ্নি করবে সেটা বলাই বাহুল্য।
চরৈবেতি।
যা হয়, ভালর জন্যই হয়।

সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২০

গণতন্ত্র মিথ ও আগামীর পৃথিবীঃ ২



দ্বিতীয় পর্ব

গণতন্ত্র কতপ্রকারের হতে পারে! গণতন্ত্রের মূলত দুটো মৌলিক প্রভেদ পরিলক্ষিত করেছেন পণ্ডিতেরা। সরকারের গঠনতন্ত্রে প্রতিনিধিত্বমুলক বিষয়ের উপরে নির্ভর করে; প্রথমটি হল ‘প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র’ ও দ্বিতীয়টি হল ‘প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র’। এই নীতির উপরে ভিত্তি করেই রাষ্ট্রের সংবিধান তথা ‘সরকার ও নাগরিকের’ নিয়মতন্ত্রের গঠনপ্রণালী পঞ্জিকরন নির্দিষ্ট হয়।

‘প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র’

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক বাক্তিকে সরকারের অংশীদার রূপে বিবেচনা করা হয়। রাজনৈতিক মতাদর্শের উপরে ভিত্তিকরে জনগণেরা গোষ্ঠীবদ্ধ হয় ও তারা প্রত্যেকে নির্বাচকের ভূমিকা পালন করে। এই পর্যায়ে বাক্তি ও সরকারের মাঝে কোনো সমন্বয়কারী থাকেনা। প্রাদেশিকতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, লিঙ্গভেদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত বিভিন্নতা ইত্যাদিকে অগ্রাহ্য করে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারন পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে সকলের সমঅধিকার রক্ষিত হয়। তত্ত্বগতভাবে দেখলে মনে হওয়া স্বাভাবিক সে এটাই বোধহয় গণতন্ত্রের আদর্শ রূপ, কিন্তু বাস্তবটা ততটাও নিষ্কলঙ্ক নয়। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক বিরোধী বলে একটা সম্প্রদায় থাকে যারা সরকারের পরিচালকদের বিভিন্ন ত্রুটিগুলিকে তুলে ধরে ও জনগনকে সেই বিষয়ে জ্ঞাত করে। যদিও বর্তমানে ‘রাজনৈতিক বিরোধী’ বাক্যটা থেকে রাজনৈতিক শব্দটাকে বেমালুম উহ্য করে রেখে শুধুই ‘বিরোধী’ শব্দটা জনপ্রিয় হয়েছে। ফলস্বরুপ বিরোধটা সমাজের সর্বত্র পৌঁছে গেছে, একদম ভাতের হাঁড়ি পর্যন্ত।

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের জন্য সাওয়াল করতে থাকে মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোই। ঐতিহাসিকভাবে কিছু পরম্পরার ক্ষেত্রে দেখা গেছে- ছোট ছোট প্রাদেশিক রাজনৈতিক দলগুলো প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করে যতক্ষননা তারা ক্ষমতায় পৌঁছে বৃহত্তর গোষ্ঠীতে রুপান্তরিত করছে। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের কিছু জনপ্রিয় পন্থা রয়েছে জনগণের কাছে পৌঁছানোর, প্রথমটি হল- যেকোনো জনমোহিনী উদ্যোগের সূচনা ও দ্বিতিয়টি হচ্ছে গণভোট। দুটি পন্থায় হরেক আঙ্গিকে রাষ্ট্রের জনগণের সামনে উপস্থাপিত হয়, ভিন্ন ভিন্ন অভিলাষ ও অভিসন্ধি নিয়ে। এই পদ্ধতি মেনে সংসদ বা এসেম্বলির প্রতিটি অধিবেশনেই সংবিধানের ধারা পর্যন্ত সংশোধিত, পরিবর্তিত, পরিমার্জনা বা অপোনদন করে দেওয়া হয়; যে পরিবর্তন সকল সময় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বা নাগরিক সুরক্ষার হিতে থাকেনা। এমন পদ্ধতিতেই ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দলগুলি প্রায় প্রতিটিই, জনগণের সার্বজনীন চাহিদার জোট ভাঙতে উপরোক্ত দুই ধরনের পন্থা কৌশলে ব্যবহার করে জনগণের মাঝে বিভাজন ঘটিয়ে দিয়ে থাকে, গোটা বিশ্বে যার উদাহরন ভুঁড়িভুঁড়ি। তা সত্বেও এই প্রত্যক্ষ গনতন্ত্রেই বিক্ষুব্ধ জনগণকে তাদের অপ্রাপ্তির ক্ষোভ মেটাবার সুযোগ দেয় ভোটের বাক্স, পরবর্তী মেয়াদের জন্য সেই সকল রাজনৈতিক দল বা তাদের জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করতে পারে জনগণই।

এই প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র জনগণকে আর শুধু জনগণ না রেখে প্রত্যেককে ‘রাজনৈতিক কর্তৃত্বে’র সর্বক্ষুদ্র একক বানিয়ে তোলে, প্রত্যেককে রাজনৈতিক জ্ঞানের সুযোগ দিয়ে সন্তুষ্ট করার পাশাপাশি রাজনৈতিক ভাবে সচেতন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসীম ভূমিকা রাখে। নাগরিকদের ইচ্ছা প্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্বসহ ও নিরপেক্ষ ভাবে মান্যতা দেওয়ার সাথে, ধর্মীয় কিম্বা রাজনৈতিক মতাদর্শগতভাবে সংখালঘুদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকায় বিষয়টা- প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত; পুঁথিগতভাবে এটা দেখতে নিখুঁত হলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা ভীষণ উদ্বেগের, তাই এই ধরনের গনতন্ত্রকে অন্য কোনো পদ্ধতিরই পরিপূরক বলা যায়না।

গণতান্ত্রিক কার্যবিধি গুলো নিরুপন করার দরুন সঠিক কর্মধারা যুক্ত দিশা অধিগ্রহণ করে, নির্বাচিত সরকার জনমুখী আইনের প্রণয়ন করে ও সেগুলোকে বৈধতা দান স্বরূপ গণমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রচেষ্টা করে। এই জনমুখী পন্থা গুলো কার্যকর করার কয়েকটি অলিখিত নীতিমালা অনুসরণ করে চলতে হয় ‘প্রত্যক্ষ গনতান্ত্রীক’ রাষ্ট্রগুলিকে। যথা-

i) যেকোনো প্রবর্তনা মূলক উদ্যোগে গণভোটের প্রস্তাবনা আসলে তা কখনই সংসদ বা সরকার নিজে থেকে নিতে গ্রহণ করতে পারবেনা, নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে তাদের প্রতেকের মতামত নিতে। কিন্তু এর সমস্যা হল, কতদিন অন্তর কতবার জনসাধারনের কাছে রাষ্ট্র এই ভোটের প্রস্তাবনা দেবে সেটা বড় জটিলতা যুক্ত বিষয়, রাজনৈতিক দলগুলি কখনই জনগণের কাছে নিজেদের উন্মুক্ত না করে একটা অপরিচ্ছন্ন ধোঁয়াশা রেখে দেয়। স্বভাবতই জনগন সরকারকে নিয়ন্ত্রণের বদলে সরকার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করে- তারা কি করবে, কি খাবে, কি বলবে। এই অসামঞ্জস্যতা প্রশ্ন তুলে দেয়, আসলে তাহলে কে সার্বভৌম- নাগরিক না তাদের দ্বারা নির্বাচিত সরকার!

ii) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব আসলে ভোটারের সংখ্যার উপরে ন্যাস্ত থাকে, সুতরাং সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধমত পোষণ করার পুর্ণ স্বাধীনতা থাকবে কিম্বা সেই সিদ্ধান্তকে আরো কীভাবে উন্নততর করা যার সে বিষয়ে মতামত জাহির করতেই পারে যে কোনো নাগরিক। বিশিষ্ট জার্মান দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী জুরগেন হাবের্মাস এর মতে- ‘রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত ভোট প্রক্রিয়াই গণতন্ত্রের অন্তিম নির্নায়ক পদ্ধতি নয়, বরং নিয়মিত আলাপ আলোচনার মাঝে জনগণকে প্রত্যক্ষ ভাবে সংযুক্তিকরনের মাঝেই সর্বোৎকৃষ্ট ফলাফল পাওয়া সম্ভব’। এক্ষেত্রে ভোটারকে যতক্ষণনা তার ভোটগত সিদ্ধান্তের পক্ষে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত বিরতিতে, ততক্ষণ পর্যন্ত মতদানের গুরুত্বকে খাটো করে দেওয়া হয়। সকলসময়েই রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা সাধারন জনগণের কাছে বিভ্রান্তিকর বিষয়, তা স্বত্বেও বর্তমান ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে রাজনীতির সাথে প্রায় সমার্থক করে দেওয়া হয়েছে। রাজনীতি হল ক্ষমতায়নের যন্ত্র- ক্ষমতা বন্টনের নয়; রাজতন্ত্রেও রাজনীতি থাকে সুতরাং রাজনীতি মানেই গণতন্ত্র নয়। কিন্তু গণতন্ত্র মানে অধিকার বুঝে নেওয়া, রাজনীতিতে এ কেউ অংশগ্রহণ করতে পারে, ক্ষমতার সমবন্টন হয় যোগ্যোতা অনুয়ায়ী।

iii) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র এমন একটি হাতিয়ার যার দ্বারা প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রের উন্নতির সুষম বন্টন ও ভোগ করতে সক্ষম। সেটার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংগঠিত সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সমিতি গঠন করে প্রত্যক্ষ ভাবে জনগণকে পরিচালন পর্ষদে অন্তর্ভুক্তি করতে হয়। এতে করে তৃনমূল স্তরের জনগণ যেমন রাজনীতির উপকরণ গুলির সাথে পরিচিত হয়, তেমন অনুশীলিত হওয়ারও সুযোগ মেলে; যেমন পঞ্চায়েত বা পৌরসভা। যেকোনো নীতির পরীক্ষাগার হিসাবে এই সকল পরিসর গুলির ভূমিকা অসীম, এখানে নাগরিকের প্রতক্ষ্য ভূমিকা থাকে গণতন্ত্রিক সরকারের প্রশাসন যন্ত্রকে সম্পাদনা করার; যা কেন্দ্রীয় ভাবে রাষ্ট্রকে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে প্রত্যয় দান করে।

...ক্রমশ

পালঘর সাধু হত্যা

 

মুসলমানেরা সাধু হত্যা করেনি

 

সারফারোজ নামের একটা সিনেমা দেখেছিলাম, যেখানে একদল ডাকাত একটা বাস আক্রমন করে তাদের থেকে সকলকিছু লুঠ করে প্রত্যেককে হত্যা করেছিল। হ্যাঁ, সেটা সিনেমাই ছিল

কিন্তু গত ১৫ই এপ্রিল মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার গড়ছিঞ্চোল গ্রামে যেটা ঘটেছে সেটাও কিছুটা তেমনই

শতাধিক মত্ত জনতা একটি প্রাইভেট গাড়িকে রাস্তায় থামিয়ে সেই গাড়ির ড্রাইভার সহ তিনজনকে হত্যা করে। বাদবাকিরাও বেধরক মারের শিকার। সেইমুহুর্তে পুলিশের একটা গাড়িও এসে উপস্থিত হয়- কিন্তু সেই কনস্টেবলও শুধু প্রহৃতই হন তা নয় বরং পুলিশের গাড়িটিও ভেঙে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলেই মারা যায় তিনজন, যা ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক। একজন গাড়ির ড্রাইভার নীলেশ তালগাড়ে(৩৫), অন্য দুজন- চিকনা মহারাজ(৭০) ও কালপুরুষ গিরি মহারাজ(৩৫)।

জুনা আখাড়ার কয়েকজন সাধু মুম্বই থেকে গুজরাতের সুরাতে যাচ্ছিল কোনো একটা শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যোগ দিতে। আদিবাসী অধ্যুষিত পালঘরের ঐ অঞ্চলে কোনো ভাবে রটেছিল ওই গাড়িতে ছেলেধরা বা 'বাচ্চাচোর' এর দল যাচ্ছে যারা শিশুদের শরীর থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খুলে নিয়ে ব্যবসা করে। যদিও পুলিশ প্রায় ১০১ জনকে গ্রেফতার করার পর বলেছে- এরা স্বসস্ত্র ডাকাতদলও হতে পারে। এই হল ঘটনা

রটনা হল, RSS ও তার প্রোপাগান্ডা মেসিনারি গত ২৪ ঘন্টা ধরে এই বিষয় নিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধাবার প্রচেষ্টার খামতি রাখেনি। কিন্তু লাঠিসোঁটা সহ দলটি আদিবাসী প্রমানিত হতেই ব্যাকফুটে চলে গেছে

সারা ভারত জুড়ে মব লিঞ্চিং বা পিটিয়ে মারার ঘটনার সুত্রপাত RSS নামক সন্ত্রাসবাদী দল ও তার শাখা সংগঠন গুলোর হাত ধরেই। কোনো রাজ্যের প্রশাসনই এ বিষয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আজ তাদের দেখানো পথেই আজ "সাধু সন্ন্যাসীর" দল আক্রান্ত। এটা হওয়ারই ছিলনা কি? নগর পুড়লে দেবালয় কীভাবে রক্ষা পায়?

১৩৭ কোটি ভারতীয়কে শাসন করছে সেই বিজেপি, যাদের ১১৩ কোটি ভারতীয়ই অপছন্দ বা ঘৃণা করে। তাদেরই নেতারা এই মব লিঞ্চিংকে সমর্থন করেছে যখন আহত বা নিহতের নাম মুসলমান ছিল। এমনকি লোকসভাবে মবলিঞ্চিনহ বিরোধী আইন এর প্রস্তাবটুকুকেও বিজেপি সেদিন নস্যাৎ করেছিল, আজ সেই বিজেপিই মব লঞ্চিং নিয়ে লফাও করে সোস্যালমিডিয়ার মড়াকান্না কাঁদছে।

এই ট্রেন্ড ভয়ানক ইঙ্গিত করছে, "এভাবেও পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়" ধারনা বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে গেলে তার ফল মারাত্বক ও সুদূরপ্রসারী। কারন পূর্বের কোনো ক্ষেত্রেই আইনকে সেভাবে কঠোর হতে দেখা যায়নি। সাপুরেরা সাপের ছোবলেই মারা যায়- আজ আইন চোখের পটি খুলে হয়ত দেখতে চেষ্টা করবে- কিন্তু তবরেজ আনসারীদের আত্মারা মিছিল করে অবরোধ করে রাখবে।

সুতরাং এটা একটা ভয়াবহ মৎসন্যায়ের সূচনা মাত্র, যার রুপকার একমাত্র সন্ত্রাসী RSS

সাধু সন্ন্যাসীদের উপর হামলার তীব্র প্রতিবাদ হওয়া উচিৎ দেশ জুড়ে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে বিগত কোনো মব লিঞ্চিং এর সময় মাননীয় সন্তদের তরফে কোনো প্রতিবাদ আসেনি। তারও পরেও বলব, আপনারা এর প্রতিবাদ করুন। এ এক ভয়ানক ইঙ্গিত

 

রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২০

গণতন্ত্র মিথ ও আগামীর পৃথিবীঃ ১

 

প্রথম পর্ব

মাঝে মাঝেই আমরা শুনি গণতন্ত্র বিপন্ন, কিম্বা বড্ড অগণতান্ত্রিক ইত্যাদি বাক্যগুলি। শিরোনামে থাকে- কোথাও না কোথাও গণতন্ত্র লঙ্ঘিতও হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনিই। কখনও মনে হয়নি এই গণতন্ত্র বিষয়টা কি? তার সংজ্ঞা কি? চলুননা গণতন্ত্র নিয়ে আমরা একটু পড়াশোনা করি।

অভিধান বলছে- ‘জনগণ দ্বারা নির্বাচিত, সবচেয়ে যোগ্য জনপ্রতিনিধি দ্বারা প্রশাসন যন্ত্রকে জনহিতে পরিচালনা করার প্রণালী বা সরকারকে এক কথায় গণতন্ত্র বলে’। সুতরাং, জনগণ, যোগ্য, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, জনহিত ও পরিচালনা এই সবগুলি থাকলে তবেই গণতন্ত্র, এপর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এগুলো একটা বা একাধিক না থাকে তাহলে কি! এখানেই হল আসল মজাটা, সে প্রশ্নে পরে আসব। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে যে কেউ জানবে যে- জনগণকে পরিসেবা দেওয়া যন্ত্র ছিল গণতন্ত্র, সেখান থেকে শাসকে তার রূপান্তর ঘটেছে। সে সব বিষয়ে অবশ্যই আসব, তারও আগে চলুন অতি সংক্ষিপ্ত ভাবে গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটু চোখ বুলিয়ে নিই।

গণতন্ত্র নামক শব্দটার উৎপত্তি সেই খ্রীষ্টপুর্ব ৫০০ সনে, গ্রীসের আথেন্স নগরীতে। তৎকালীন ‘এ্যালকমেওনিড’ নামের অভিজাত বংশীয় এক আইনজীবি, ‘ক্লিয়েস্থিনিস’কে গণতন্ত্রের জনক হিসাবে অবিহিত করা হয়। পরবর্তীতে প্রখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল গণতন্ত্র বিষয়ে বহুবিধ জ্ঞান ও তত্ত্ব রচনা করেন। “government will be rule by the best over the rest. an aristocracy based on merit rather than blood” এই ছিল তার প্রবচনের অন্যতম মূলমন্ত্র।

পরবর্তী প্রায় ২০০০ বছর এর তেমন কোনো খোঁজখবর ছিলনা। খ্রিষ্ট পরবর্তী সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ শুরু হয় সংসদপন্থী ‘রাউন্ডহেড’ ও রাজা চার্লস-১ এর অনুগামী ‘কাভালিয়ার’ দের মাঝে। এরই দীর্ঘমেয়াদি ফলশ্রুতি হিসাবে ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের দুটো রাজত্ব একসাথে মিশে গিয়ে গিয়ে আধুনিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্টা হয়, যা ক্রমশই শক্তিশালী হতে থাকে। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপের অন্য অনেক দেশেই তখন গণতন্ত্র বিস্তার শুরু করে দিয়েছে, ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া প্রমুখ তাদের অন্যতম।

বিশ্বের অন্যপ্রান্তে ইউরোপিয়ান লুঠেরা জাতিগুলো লাতিন আমেরিকাকে গ্রাস করলেও, আমেরিকার মূল ভুখন্ডে মধ্য অষ্টাদশ শতকে গৃহযুদ্ধ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্টা পায়। সে তুলনায় আমাদের ভারত তথা উপমহাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাস মাত্র ৭০ বছরের সামান্য বেশি সময়ের। একটা লুণ্ঠিত অশিক্ষিত গরীব জাতিকে দাঁড় করাতে, শিক্ষিত করাতে, মাথার উপরে আস্তানা, দুমুঠো ভাতের যোগান নিশ্চিত করতেই এই সময়টা কোথা দিয়ে চলে গেছে। এর সাথে ছিল নিয়মিত ঘর ও বর্হিশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ। বিশ্বায়নের সাথে পাল্লা দিয়ে এই সময়ের মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা জনগণের হাতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করিয়েছে। এই বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে, যতটা হওয়ার কথা ছিল ততটা হয়েছে কী হয়নি, সে প্রশ্ন থাকাটা গণতন্ত্রেরই অঙ্গ।

শুরুর গণতন্ত্রে মহিলা বা দাসেদের কোনো ভোটাধিকার ছিলনা। তথ্যের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সেদিনের শুরুর গণতন্ত্রের সাথে আজকের গণতন্ত্রের বিপুল ফারাক রয়েছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেমন অনেক কিছুকেই গণতান্ত্রিক বলতে নারাজ তৎকালীন এ্যসেম্বলির নিয়মকে, ঠিক তেমনি সেদিনের প্রেক্ষাপটে ভাবলে আজকের অনেককিছু যাকে আমরা গণতন্ত্র বলি, সেগুলোকে হাস্যকর পাগলামো মনে হতে বাধ্য। মোদ্দাকথাটা হল গণতন্ত্র হল সেই ব্যবস্থাপনা যা সময়ের সাথে ক্রমশই পরিবর্তনশীল, জনগণ শুধু ধ্রুবক রয়ে গেছে। কিন্তু, বর্তমান যুগে ইজরায়েল-ফিলিস্তিনের নাগরিক সমস্যা হোক বা মায়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা, কিম্বা আমাদের দেশেই NRC এর নামে না-নাগরিকত্ব আইন; এই সবের ফাঁসে জনগণ আড়াআড়ি দুটো ভাগে বিভক্ত- একটা নাগরিক অন্যটা উদ্বাস্তু; বলাই বাহুল্য দ্বিতীয় শ্রেনীটার কাছে গণতন্ত্র সোনার পাথরবাটি। সুতরাং জনগণ মানেই সে গণতন্ত্রের অংশীদার নয়- সে কথা আজকে প্রমাণিত।

অতীতের অনেক দার্শনিকই গণতন্ত্র থেকে আইনব্যাবস্থাকে পৃথিকীকরণের কথা বলেছিলেন, কারন গণতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপরে। সেখানে রাষ্ট্র, যুক্তি, আইনের গুরুত্ব কখনই ওই সংখ্যাগরিষ্ঠতার উর্ধ্বে যায়না; তেমন বিতর্কিত ক্ষেত্রে ‘রাষ্ট্র’, ‘যুক্তি’ বা ‘আইনের’ সংজ্ঞাই বদলে দেয় সেই সংখ্যাগরিষ্ঠের দল। গণতন্ত্র বিষয়ক নানা বিষয়ে খোদ এ্যারিস্টটলও বিরুদ্ধ মত পোষণ করলেও, তাঁর মতে গনতন্ত্রই সরকারের শ্রেষ্ঠ রূপ নয়, বরং মনার্কি বা আভিজাত্যবাদ দ্বারা প্রাপ্ত ক্ষমতাও যদি আইনের পক্ষে শাসন করে যা প্রান্তিক মানুষটিকেও সরকারের সুফল পৌঁছে দেয়, সেটাও গণতন্ত্রের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

তিনি বিশ্বাস করতেন আভিজাত্যই ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাবার একমাত্র দাবীদার; যে আভিজাত্য বংশানুক্রমে প্রাপ্ত নয়, যেটা সুশিক্ষা ও প্রকৃত জ্ঞানের পরম্পরা বহন করে। এ সব দর্শন তত্ত্বের পরেও গণতন্ত্রকেই তিনি প্রকৃত স্বাধীনতা হিসাবে মানতেন। বহুদলীয় রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষমতালিপ্সা, অলীক প্রতিশ্রুতি আর দুর্বৃত্তায়ন, পুঁজিবাদের দাসত্ব মনোভাব- গণতন্ত্রকে কোণঠাসা করে দিয়েছে আজকের দিনে। ‘ধনতন্ত্রের প্রত্যক্ষ প্রভাবে গণতন্ত্রকে ঢাল বানিয়ে কিছু জনপ্রতিনিধি একনায়ক শাসকে পরিণত হবে আগামীতে’, এ্যারিস্টটল নিজেই এই বিষয়ে সাবধান করে দিয়েছিলেন সভ্যতাকে।

বিপুল ক্ষমতা ও অর্থের নিয়ন্ত্রক রূপে কোনো গণতান্ত্রিক শাসক যখন পদে আরোহণ করেন, কুক্ষিগত করার রিপুগত তাড়না তাকে লোভী করে তোলে। স্বভাবতই সদাপরিবর্তনশীল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিই হল অবক্ষয়গামী। সুতরাং কতগুলি প্রতিষ্ঠান বা সূচকের মানের উপরে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নির্ধারিত হয় বা গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকে বলা যায়, যেগুলোকে গণতন্ত্রের স্তম্ভ হিসাবে গন্য করা হয়। উন্নততর গণতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রের প্রকাশ- এই স্তম্ভগুলোর স্বাস্থ্যের উপরেই নিরুপন হয়। এই পথ বেয়েই প্রতিটি পরিবর্তন পরিবর্তিত হতে থাকে দশকের পর দশকে। গণতন্ত্রের স্তম্ভের বিষয়ে পরবর্তী অধ্যয়ে বিশদে আলোচনা করব, তার আগে বর্তমান পৃথিবীতে কতধরনের গণতন্ত্র আছে সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাতের চেষ্টা করি।

....ক্রমশ

শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২০

আবাপতে মান্নীয়ার মুখ কেন?

 


কেউ কী আমাকে বুঝিয়ে দেবে-
'আবাপ'তে এই ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে করোনার বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই হচ্ছে? অনলাইন পেজ খুললেই এই বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে।

১) এই বিজ্ঞাপন সাধারন মানুষকে কীভাবে উপকৃত করছে?

২) বিজ্ঞাপনে খরচা কত হয়েছে নাকি আবাপ বিনামূল্যে ছেপেছে? টাকা নিলে কত নিয়েছে? এই মহামারির অর্থকষ্টের সময় আবাপ'র পকেট ভরলে কোন নাগরিকের লাভ?

৩) তথাকথিত এই বিশ্বসেরারা কোন দেশে থেকে করোনার বিরুদ্ধে সফল লড়াই এর নজির রেখেছেন?

৪) ভাইরাস নিজে কি এই বিজ্ঞাপন দেখতে পাচ্ছে? মানুষ বুঝতে পারলেও হতেই পারে যে ভাইরাসকে ধমকানো চমকানোর জন্য এই বিজ্ঞাপন।

৫) এনারা ঠিক কি কি বিষয়ে গবেষণা করছেন, মানে ছবিতে যারা রয়েছেন। তারা তাদের মহামুল্যবান গবেষনা আর কাউকে না দিয়ে শুধুমাত্র বাংলাকে রক্ষা করতেই বা এলেন কেন?

৬) একজন মেডিসিনের ডাক্তার, একজন HIV বিশেষজ্ঞ, একজন হু' এর প্রাক্তন আঞ্চলিক অধিকর্তা, দুজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ, একজন আমেরিকার কি একটা বিশেষজ্ঞ, একজন আমলা, একজন প্রাক্তন জনস্বাস্থ্য আধিকারিক। সাকুল্যে মোট আট জন।

৭) এটা কীভাবে 'জনস্বার্থ' সুরক্ষা করছে? কোন নাগরিকের স্বার্থ এতে উপকৃত আবাপ ছাড়া? এই বোর্ড কোন পরামর্শ দিয়েছে যেটার সফল প্রয়োগ করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার?

৮) এনারা ঠিক কে কীভাবে গবেষনা ও অনুপ্রেরণাকে অনুপ্রানিত করছেন? বিশেষ করে আমেরিকার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ করোনাতে- তা ওই আমেরিকান ভদ্রলোককে নিজের দেশের সরকারই পাত্তা না দিলেও ওনার অনুপ্রেরণা ওনালে খুঁজে এনে ফেলেছেন।

৯) বাকিরা ঠিক কি বিষয়ে রাজ্যবাসীর সহযোগিতা করছেন যেটা কেন্দ্র সরকার বা WHO এর গাইডলাইন দিতে পারছেনা?

১০)বিশেষজ্ঞদের জন্য কত আর্থিক বরাদ্দ হয়েছে? সেই টাকায় কিট, PPE, ভাইরাস গবেষণা বা জনগনের পিছনে খরচা না করে এদের পকেট ভরা কেন?

মোটা মাথা তো, তাই কটা প্রশ্ন করেই ফেল্লাম।
আসলে এমন অনুপ্রেরণা তো সেভাবে বিশ্বে আর কোনো নজির নেই, তাই তাদের থেকেও জানা যায়নি। সেজন্যই শুধানো। যাদের এমন বিশ্ব এডভাইসারি বোর্ড নেই তারা কতটা লোকসানে আছে আর আমাদের রাজ্য ঠিক কতটা এগিয়ে আছে?

দিনের শেষে করোনার নামে কেন্দ্রের বরাদ্দ, লোকজনের থেকে চাওয়া অর্থ তথা পাব্লিক মানি দিয়ে এ কার প্রচার হচ্ছে সেটা জানাটা নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...