শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২০

দেশের গাদ্দার বিজেপি




সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মোদী সরকারের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। পাকিস্তানি এজেন্ট দাভিন্দর সিং কোর্ট থেকে জামিন পেয়ে গেল দিল্লি পুলিশের চার্জসিট ফাইল না করতে পারার ব্যর্থতায়।

দাবিন্দর - সিং না হয়ে সেখ হলে আদালতও যে জামিনের বিষয়ে চোখের কালো ফিতে খুলতনা- তাতে চার্যসিট জমা পরুক বা না পরুক- সে বিষয়ে কারো মনে সন্দেহ থাকা অপরাধ।

এদিকে উমর খালিদ- কানাইয়া কুমারকে জেলে ভরতে দিল্লি পুলিশ ভীষণ তৎপর , সাফুরা জারগার জেলে। আমাদের আদরনীয় গৃহ মন্ত্রী চোখে লঙ্কা গুড়ো লাগাচ্ছেন হয়ত, চীনকে লাল আঁখ দেখাতে হবে বলে।

বাহ মোদিজী বাহ। আত্মনির্ভরতার শ্রেষ্ঠ উদাহরন।

হুজুকে জনগন আর দেশপ্রেমের গিমিকে সন্ত্রাসীদের আচ্ছে দিন, তো ভক্ত.... নাচো.....

মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়

মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২০

প্রসঙ্গঃ নেপালি কোম্পানি বয়কট


প্রাক কথন

চাইনিস কোম্পানি বর্জনের গল্প তো অনেক হল, নেপালি কোম্পানি ‘বয়কট’ হোক এবারে।
গান্ধী পরবর্তী ভারতে আবার স্বদেশি যুগের ‘বিকাশ’ ঘটেছে, অন্তত ভক্তদের হিসাবে। চীনা অগ্রাসনের জবাবে, তাদের ভূমিতে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের বদলে চীনাপণ্য বয়কট করাকেই ধর্মযুদ্ধ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে নাগপুর; ভক্তরা চীনাদ্রব্য বর্জনের পণ করেছে টুনি লাইট ও টিকটক আনইন্সল করে।
যদিও আমাদের দেশকে ২০০ বছর ধরে লুটে নিয়ে যাওয়া ব্রিটিশ কংগ্লোমেরেট কোম্পানি ‘ইউনিলিভার’কে বর্জনের বিষয়টা সেভাবে উঠে আসেনি কখনও, কারন ভক্ত আইকন স্বঘোষিত ‘বীর’ সাভারকরকে এই ব্রিটিশ প্রভুরাই মাসিক মাসহারা দিয়ে তাদের হয়ে লালনপালন করেছিল, সেটারই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ব্রিটিশ বাপের প্রতি আজকের ভক্ত সন্তানদের আহুতি জ্ঞাপন হয়ত।
নেপাল বর্তমানে ভারত রাষ্ট্রের মাথাব্যাথার কারন, যদিও আমাদের প্রতিরক্ষা ‘কড়িনিন্দা’ মন্ত্রী- নেপাল কনফ্লিক্ট বিষয়ে দৈবযোগের উপরে ভরষা রাখতে বলেছেন ১৫ই জুন ২০২০ তারিখে এক সাক্ষাৎকারে। এক্ষেত্রেও সেনাকে দিয়ে জবাব দেওয়ানোর মত বুকের পাটা তৈরি হয়নি ৫৬ ইঞ্চির মিত্রো’র, যেটা উহ্যই রেখে গেছেন। আজকাল আর নেপালিরা দারোয়ান থাকেনা সেভাবে, তাহলে নেপালকে শায়েস্তা করতে নেপালি পণ্য বর্জন হোক।
আকাশ থেকে পরলেন নাকি? ভারতে আবার নেপালি কোম্পানি কোথায়, যাকে বর্জন করা যায়? আজকের গল্পটাই তো সেটা, হোক নেপালি পন্য বয়কট

ভূমিকাঃ
বিদেশী মাল্টিন্যাশানাল FMCG ও Conglomerate বিকল্প ভারতীয় পণ্যের কথা ভাবলেই আপনার মনে কোন নামটা ভেসে উঠে বা আপনার মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, মোদী সরকারের কর্তাকর্তা ও নাগপুরের খাটালপতিদের- বিগত ৬ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে!
কেন পতঞ্জলী, এ তো খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন। শুদ্ধ দিশি ভারতীয় কোম্পানি।
গেরুয়া বস্ত্র গায়ে একজন সনাতন সাধু সন্ত, হাজার হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য তৈরি করেছে বলে- জিহাদি মুসলমানের বাচ্চা আর চীনের দালাল কমিউনিষ্টগুলোর বক্ষশূল শুরু হয়ে গেছে, চলতি ভাষায় পিছন ফাটছে ব্যার্থ ঈর্শাতে; অনেক সেলিব্রিটি ভক্ত তো প্রকাশ্যেই বলছে- “দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি”, তা ভাই দেশদ্রোহীরা লুচির মত ফুলতে থাকুক, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- পতঞ্জলী কি অদৌ ভারতীয় কোম্পানি?

প্রশ্নঃ
পতঞ্জলী কি অদৌ ভারতীয় কোম্পানি? প্রশ্ন দু’দুবার না করলে তা জোশ পায়না, আমাদের সমাজে।

অন্বেষণঃ
‘মিনিষ্ট্রি অফ কর্পরেট এ্যাফেয়ার্স’ এর তথ্যমতে ‘পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ লিমিটেড’ নিশ্চই ভারতীয় কোম্পানি, ভারত সরকারের কোম্পানি বিষয়ক মন্ত্রকের থেকে লাইসেন্স প্রাপ্ত কোম্পানি ভারতীয় হবেনা? তাহলে তো কাকা প্রতিটি বিদেশী কোম্পানিই ভারতে এসে লিমিটেড বা প্রাইভেট লিমিটেডের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসা করে, অতএব কেউই বিদেশী হতে পারেনা এই ফান্ডাতে। যাই হোক ছেঁদো কথাতে ভক্তেরা ভুলে থাকুক, কারনে ধর্মের তাড়ির নেশা সহজে নামেনা, বাকিদের জন্য কিছু তথ্য নিয়ে এলাম, যেটা জনৈক ‘রঞ্জিত টমাস’ টুইটারে বিষয়টি সর্বপ্রথম সর্বসমক্ষে নিয়ে আসেন দিন দুয়েক আগে, সেখান থেকে প্রাপ্ত এন্থু নিয়ে তথ্য অনুসন্ধান করে আনলাম।
পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ এই মুহুর্তে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটির সম্পদশালী FMCG তথা Conglomerate কোম্পানি, যার CIN- U24237DL2006PLC144789। MCA তে দাখিল করা তথ্যমতে কোম্পানির ৭ জন ডিরেক্টর, যথাক্রমে-
1. রাম ভারত
2. আচার্য বালকৃষ্ণ
3. স্বামী মুক্তানন্দ
4. অজয় কুমার আর্য
5. রাকেশ মিত্তল
6. সুমেধা
7. ইয়াজ দেব আর্য
এনাদের মধ্যে রাম ভারত হলেন স্বামী রামদেবের আপন ভাই, স্বামী মুক্তানন্দ রামদেবের সহচর, বাকিরা আত্মীয় ও বেতনভুক কর্মচারী।
পতঞ্জলী আয়ুর্বেদের শেয়ার হোল্ডিং প্যাটার্নটা আরও ইন্টারেস্টিং,
1. গঙ্গোত্রী আয়ুর্বেদ- ০.৫৮%
2. কাংখাল আয়ুর্বেদ- ০.২০%
3. চৈতন্য আয়ুর্বেদ- ০.১০%
4. ডায়ানামিক বিল্ডকন- ০.৪৪%
5. পতঞ্জলী করুপ্যাক- ০.০৮%
6. আরোগ্য হার্বস- ০.০৫%
সব মিলিয়ে ১.৪৫% শেয়ারের মালিক বাইরের(!) কেউ; আর বাকি ৯৮.৫৫% শেয়ারের মালিক আচার্য বালাকৃষ্ণ নিজে। কিন্তু এখানেই সব শেষ নয়- কাঙ্খাল, চৈতন্য, ডায়ানামিক, আরোগ্য হার্বস, গঙ্গোত্রী ও পতঞ্জলী করুপ্যাক কোম্পানি গুলোরও প্রতিটির ৯০% এর বেশি শেয়ারের মালিক আচার্য বালকৃষ্ণ। অর্থাৎ আক্ষরিক এবং খাতায় কলম উভয় ক্ষেত্র মিলিয়ে আচার্য বালকৃষ্ণই পতঞ্জলী সাম্রাজ্যের ৯৯.৯২% এর মালিক; বাকিরা বেতনভুক কর্মচারী।
তথ্য বলছে গত ২০১৯ অর্থবর্ষে পতঞ্জলির ‘নেট ইনকাম’ ছিল ৮৩৩০ কোটি টাকা, সুতরাং পতঞ্জলী আয়ুর্বেদের সম্পত্তি সাড়ে চার হাজার কোটির গিঁটে আঁটকে থাকলেও এর মালিক আচার্য বালাকৃষ্ণ’র সম্পদ ২০১৮ সালে দাখিলকৃত তথ্যানুযায়ী- ৪৩৯৩২ কোটি টাকা, এই ২০২০তে সেটা যে আর বেড়েছে সেটা বলাই বাহুল্য, যেটা তাকে ভারতের(!) পঁচিশতম ধনী ব্যাক্তির শিরোপা দিয়েছে।
কে এই আচার্য বালাকৃষ্ণ?
যদি উইকিপিডিয়া আর হোয়াটসএ্যাপ ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞদের রায়কে অভ্রান্ত বলে ধরে নেন, সেক্ষেত্রে উনি খাঁটি ভারতীয় নাগরিক; নেপালি উদবাস্তু পিতা- জয়বল্লভ সুবেধী’র ঔরসে ও মাতা সুমিত্রাদেবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭২ সালে, ভারতের হরিদ্বারে।
এটাই যদি সত্য হবে তাহলে ২০১১ সালের ২৩শে জুলাই CBI ভুয়ো ডকুমেন্টস সাবমিট করে ‘জালি’ ভারতীয় পাসপোর্ট বানানোর দায়ে বালাকৃষ্ণর নামে ফরজারি ও চিটিং এর মামলা করেছিল কেন, ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট এক্ট ১২ লঙ্ঘনের অপরাধে? যেখানে আদালত এরেষ্ট ওয়ারেন্ট বের করলে তাকে হেফাজতেও নেওয়া হয়, ও পরে জামিনে মুক্ত হলেও মামলা চলতে থাকে।
পাশাপাশি ED ও SFI তদন্ত শুরু করে তথ্যপ্রমাণ পায় যে, বিপুল পরিমাণে আর্থিক তছরুপ, নেপালে টাকা পাচার, হাওলার মাধ্যমে স্কটল্যান্ডে টাকা পাচার, করফাঁকি সহ হরেক মানি লন্ডারিং কেস এমনকি চিটফান্ডের নামে জনগনের টাকা আত্মসাৎ এর মত গুনেরও অধিকারী এই আচার্য বালকৃষ্ণ। পতঞ্জলীর প্রথম লগ্নিই ছিল স্কটল্যান্ড প্রবাসী নেপালি ধনকুবের ‘সারোয়ান পোদ্দার ও তার স্ত্রী সুনিতার’ করা লগ্নি দিয়ে। যাই হোক CBI, EB, SFI একত্রে মামলাও শুরু করে বালকৃষ্ণর নামে ২০১২ সালে, CBI চার্যসিটও দাখিল করে দেয় যথাসময়ে। সেসময় বালকৃষ্ণ কর্টে হলফনামা দাখিল করে স্বীকার করে নিয়েছিল যে তার জন্ম হয় নেপালের গন্দকী প্রদেশের সঞ্জিয়া নামক এক স্থানে।
এই সময়েই আন্না হাজারের নেতৃত্বে, বাবা রামদেব সহ কেজরিওয়াল, কিরণ বেদীদের মত ‘দেশপ্রেমিক’ ব্যাক্তিরা দেশপ্রেমিকদের সরকার আনতে তীব্র লড়াই শুরু করেছিল রামলীলা ময়দানে, উদ্দেশ্য মনমোহন সরকার ফেলে দিয়ে আচ্ছেদিনের সরকার আনা। রামদেবের- ৩৫টাকা লিটার পেট্রোলের ধাপ্পাবাজিও এই সময়েরই।
এরপর ২০১৪ সালে দেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হয় আচ্ছেদিনের সরকার, শুরুতেই যাদের যাদের আচ্ছেদিন এসেছিল তাদের মধ্যে এই আচার্য বালকৃষ্ণ পায়োনিয়ার ব্যাক্তি। মোদী সরকার ক্ষমতায় আসতেই যাবতীয় মামলা ও অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, ও ২০১৭ সালে তাকে ক্লিনচিট ও ঘোষণা করা হয়। যদিও বালকৃষ্ণকে আজ পর্যন্ত অফিশিয়ালি ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়নি মোদী সরকার, যেমনটা আদনান স্বামীকে দিয়েছিল। এরপর আর কী, ‘বিপ্লব’ শেষ হয় বালকৃষ্ণর টাকায় চলা ‘দম দেওয়া কলের পুতুলদের’। আন্না হাজারে শীতঘুমে ফিরৎ চলে যায়, কেজরিওয়াল দিল্লির ক্ষমতায়, কিরন বেদী বিজেপি জয়েন করে রাজ্যপাল হয়ে যায়, আর বাবা রামদেব? গেরুয়া ধারী সন্ন্যাসীর ভেকে, হাজার কোটির ‘ব্যবসায়িক’ সাম্রাজ্যের বেতাজ বাদশা।
আর আপনি ৮০ টাকা পেট্রোল কিনছেন-

আত্মনির্ভরতাঃ
এরপর থেকে পতঞ্জলীর সম্পদ আর ততটা বাড়তে দেননি বালকৃষ্ণ, যতটা নিজের সম্পদ ও শেয়ার বাড়িয়েছেন ‘বিকাশ’ পুরুষের পরবর্তী ৬ বছরের রাজত্বে। দেশজ মিডিয়ার প্রোপাগান্ডার কল্যাণে, নেপালি নাগরিকত্বকে সুন্দরভাবে ধামাচাপা দিয়ে ভারতীয়দের দেশপ্রেমের নতুন আইকন হয়ে উঠে এসেছে নেপালি নাগরিক ‘আচার্য বালকৃষ্ণর’ পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ। নেপালি মানেই বাহাদুর নয়, চোর ও জালিয়াৎ ও হয় এটাও জানা গেল।
বালাকৃষ্ণর গুণ এখানেই শেষ নয়, বারানসীর ‘সম্পূর্ণনন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়’ নামের যে প্রতিষ্ঠান থেকে ওনার শিক্ষাগত যোগ্যতা বলে দাবী সমস্ত অফিসিয়াল নথিতে- সেখানে এই সেদিন, মানে মধ্য নব্বইয়ের দশকের কোনো নথিতেও বালকৃষ্ণর নামগন্ধও নেই। বিকাশপুরুষের মতই তিনিও জালি ডিগ্রীধারি, এই না হলে যুগলমিলন!
বালকৃষ্ণর নামে মামলার আগে পর্যন্ত যে পোদ্দার সাহেব বাবা রামদেবের ছায়াসঙ্গী ছিলেন, মামলা শুরু হতেই স্বভাবতই ‘স্কটিট নেপালি’ পোদ্দার ‘বামাল’ ছেড়ে ‘জান’ বাঁচাতে গিয়ে আর ফেরেনি এ দেশে; প্রসঙ্গত এই সারোয়ান ওরফে ‘শ্যাম’ বাবুর স্ত্রী- বাবা রামদেবকে একটি আস্ত দ্বীপ কিনে উপহার দিয়েছিলেন, যার মূল ব্যবসার প্রায় সবটা চীনে ছিল বা আছে। পতঞ্জলিতে থাকা সারোয়ান পোদ্দারের অধিকাংশ সম্পত্তি মোদী সরকারের বাদান্যতায় অফিশিয়ালি বাজেয়াপ্ত করে এই বালকৃষ্ণ, বাকিটা দান হিসাবে দেখিয়ে দেয়।
এরপর নতুন করে পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ নেপালে লগ্নি শুরু করে দেয় ২০১৬ সাল থেকে। তৎকালীন নেপালি রাষ্ট্রপতি ভন্দ্রাই, প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কামাল দহল, নেপাল কংগ্রেস সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা, মন্ত্রী, সান্ত্রী, নেতারা এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একটা বিরাট সদস্য দল নিয়ে বীরগঞ্জে একটা প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় সাড়ে এগারো হাজার কোটি টাকা নেপালের বিভিন্ন ক্ষেত্রে লগ্নি করেন প্রবাসী নেপালি ‘আচার্য বালকৃষ্ণ’। ২০২০ সালে সেটা ঠিক কতটা বেড়েছে সেই তথ্য না থাকলেও সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কোঅপারেশন (MCC)’ নামের ভেঞ্চার গুলোকে ফিরিয়ে দিয়েছে নেপাল সরকার, যেখানে চীনের সংস্থার সাথে জুটি বেঁধে কাজ করছে আচার্য বালকৃষ্ণর সংস্থা।
তাহলে? একজন নেপালি নাগরিককে জালি ভারতীয় বানিয়ে দেশপ্রেমের রজঃস্রাবে স্নান করার মাঝে সুখ ঠিক কতটা ভক্তজন?
ভারতীয় আইনব্যবস্থার দীর্ঘসুত্রতার সুযোগ নিয়ে বালকৃষ্ণরা ক্লিনচিট পেয়ে যায় বেনিয়া সরকারদের কাছ থেকে, মামলা যদি চলত, তাহলে কে বলতে পারে যে ‘বালকৃষ্ণ নিজেও চীনা পুঁজির দ্বারা সম্পৃক্ত, ভায়া নেপাল’ এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেড়িয়ে আসতনা। নিশ্চই তেমন কিছু সম্ভাবনা তো ছিলই, ঝুলি থেকে বেড়ার বেড়িয়ে যাবার; নতুবা ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার ১১ দিনের মাথায় কীভাবে সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করে নিতে পারে জনগণ দ্বারা নির্বাচিত কোনো সরকার?
উত্তর খুঁজুন আপনি নিজেই। আমি শুধু তথ্য গুলো দিয়ে দিলাম।
নেপালের লাল চোখকে জবাব দিতে হলে, নেপালি পণ্য বর্জন হোক। ভারতে এসে ব্যবসা করে, সেই লভ্যাংশ নেপালে লগ্নিকরা নেপালিদের বর্জন করা হোক। লোগোতে তেরঙ্গা লাগিয়ে আর সাধুসন্তদের নিয়ে ভারতীয়দের আবেগ ও ভক্তিকে ব্যবহার করে এমন মুরগি বানাবার ইতিহাস বেশ বিরলই।
#বয়কট_নেপালি_পণ্য
#বয়কট_পতঞ্জলী

আরও পড়ুন-
এর পাশাপাশি ‘বিদেশী পণ্য বর্জন’ করার উথলে পরা দেশপ্রেমের ফেনার ভিড়ে চাপা পরে যাওয়া কিছু নেপথ্য গল্প, কেউই যেগুলো নিয়ে বলছেনা সেটা হল, ২৫শে মে ২০২০ তারিখে- রিলায়েন্স ইন্ড্রাস্ট্রিজের ‘জিও মার্ট’ ভারতের ২০০টি শহরে নিজস্ব বিপনী সহ অনলাইনের মাধ্যমে- গোটা দেশে মুদি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবসার ‘পাইলট প্রজেক্ট’ লঞ্চ করেছে। যার পার্টনার আর ১১টি ‘ইউরোপীয়, আমেরিকা ও ইজরায়েলি’ পুঁজির লগ্নি কোম্পানির সাথে জুকারবার্গের ‘ফেসবুক’ তথা হোয়াটসএ্যাপ নিজেই- স্বাভাবিকভাবেই ভক্তকুলের মাঝে দেশপ্রেমের জোয়ার এসেছে, তাতে দিনের শেষে লাভের অংশ মুম্বই এর ‘আন্তেলিয়াতে’ না গিয়ে যে ‘পালো অল্টো’র প্রিসিলা চ্যানের লকারে জমা হবে সেটা বললেই আপনি দেশদ্রোহী।
ঘটনাক্রমে প্রিসিলা চ্যানও খাঁটি ‘মেড ইন চায়না’, মার্কিন নাগরিকত্বের ইহুদী স্বামীর বৌদ্ধ স্ত্রী, বিচিত্র কম্বিনেশন।
সে যাই হোক, আমাদের দেশে বর্তমানে আম্বানীর জিও, নাগপুরের গোয়াল আর জুকারবার্গের ‘ফেসবুক- হোয়াটসএ্যাপ-ইন্সটাগ্রাম’ এর ত্রিবেণী সঙ্গম চলছে, তারা আক্ষরিক অর্থেই ‘Brother in same boat’, প্রত্যেকের মধ্যেই ঘোষিত আন্তঃব্যবসায়িক সংযোগ রয়েছে। সম্পূর্ণভাবে ব্যবসায়িক স্বার্থে দোকান খুলেছে আলাদা আলাদা ধাঁচে, কেন্দ্রের সরকারও যে এদেরই হাতের পুতুল হবে সেটা বলাই বাহুল্য। তবে এটা ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছে, মধ্যযুগে পোপ যেমন ক্রুসেডারদের দিয়ে বিশ্বজয়ের অবাস্তব স্বপ্ন দেখেছিল, নাগপুরও সেই পুরাতন মদ নতুন বোতলে পরিবেশনা করছে ‘দেশপ্রেম’ লেবেল সেঁটে।
সুতরাং দেশপ্রেমের তাড়ি খাইয়ে কীভাবে ভক্তপিতারা তাদের গোবৎস গুলোকে বায়বীয় জাবর কাটাচ্ছে সেটা ইতিহাসে স্থান পাবার যোগ্য। অন্ধত্ব যখন সর্বাঙ্গকে গ্রাস করে, ধূর্ত শেয়াল ওরফে বেনিয়ারা সে সুযোগ কাজে লাগাতে ভোলেনা।
আম্বানির মাধ্যমে বিদেশী পুঁজি, সঙ্ঘের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ দিয়ে তৈরি দেশপ্রেমের গ্যাঁজলা, সাথে জুকারবার্গের ফেসবুক ও হোয়াটসএ্যাপের মত প্রতিষ্ঠিত প্রোপাগান্ডা মেকানিজম- এমন 3D তথা ত্রিমাত্রিক লুঠেরা সিস্টেম কিন্তু ইংরেজরা আমদানি করেছিল অষ্ঠাদশ শতকে, যারা বণিকের বেশে এসে শাসকের রাজদণ্ড হরণ করেছিল। এখানে শাসক অবশ্য আগে থেকেই এদের পদতলে; এখন এটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ না অতলের আহ্বান সেটা পাঠকের ভাবনার উপরেই ছাড়া থাকুক।
তাহলে, আপনার মাঝে দেশপ্রেম কতটা জাগল?

মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২০

ভারতীয় যুদ্ধের সহিংস ইতিহাস ও মুসলমান

 


আজকের ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘দেশপ্রেমিক’ ধারনাটা হলঃ আরবজাত মুসলমানেরা আফগান, পামির অঞ্চল, কখনও মোগল রূপে বা কখনও পারস্য থেকে এসে ভারত আক্রমণ করেছিল, অতএব এই জাতিটাই একমাত্র বর্বর, রক্তপিপাসু, ক্ষমতালোভী, নিকৃষ্ট তথা জিহাদি জাতি। মুসলমানেরা ভারত আক্রমণ করার পুর্বে এই উপমহাদেশে পবিত্র ‘রামায়ণ ও মহাভারতের মত’ ধর্মযুদ্ধ থাকলেও, অধর্মজাত যুদ্ধ বিষয়টা মোটেই ছিলনা, সেটা সম্রাট অশোক করলেও নয়। সকলে নমস্কার, প্রণাম, আলিঙ্গন, চুম্মাচাটি করত আর রেগে গেলে বড়জোর শাপশাপন্ত করে ছেড়ে দিত, বাকিটা ঈশ্বরের কাজ ছিল- ভাবখানা এমনই বর্তমান ভারতীয় ইতিহাসে। এটা যে শুধু বিজেপির দান তা নয়, রাজীব গান্ধী ও তৎপরবর্তী কংগ্রেস সরকার থেকে আজকের নরেন্দ্র মোদী সরকার- সকলেই সমান অবদান রেখেছে। কংগ্রেস নরম হিন্দুত্ব তাস খেলত, বিজেপি সেটাই ন্যাংটা উদোম করে দিয়েছে, এটাই যা ফারাক।

মূলত বাবরি মসজিদ ভাঙা ও মুম্বই দাঙ্গার পরবর্তী পর্যায়ে- RSS ও তার রাজ্যওয়ারি প্রকাশ্য বা গুপ্ত রাজনৈতিক সহযোগী, অসাম্প্রদায়িকতার ভেকধারী কিছু আঞ্চলিক স্বার্থবাদী দল গুলো মিলে এই RSS এর ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষকে সমাজের মাঝে ‘মহীরুহে পরিণত করে দিয়েছে’ নিরবিচ্ছিন্নভাবে সার ও জল সিঞ্চন করে। এদেশে খারাপ কিছু মানেই সেটা মুসলমান জনগোষ্ঠী দ্বারা সম্পৃক্ত, অথবা কমিউনিস্ট; বাকিরা ভাল- কিন্তু ‘সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদ’- এমন একটা ইউটোপিও ধারণা রেডিও, টিভি সিরিয়াল, সিনেমা, ২৪ ঘন্টার খবরের চ্যানেল, বিভিন্ন টক-শো, সংবাদপত্র, সমসাময়িক সাহিত্য ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমের দ্বারা সমাজের মাঝে সুস্পষ্ট ও পরিকল্পিতভাবে বুনে দেওয়া হয়েছে। এখান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়া অন্তত তিনটে প্রজন্ম ঠিক সেটাই শিখেছে যেমনটা ‘RSS’ এর এ্যাজেন্ডা ছিল, কে ভাল তা নিয়ে গবেষণা থাকুক বা না থাকুক- কিন্তু ‘হিংস্র ও খারাপ’ কিছু মানেই তা মুসলমান- এটা প্রতিষ্ঠিত আজকে এই ২০২০ সালে।

যদিও আজকে পর্যন্ত পাকিস্তান তথা ISI এর চর হিসাবে ধরা পরা প্রায় প্রতিটি ব্যাক্তিই- প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিজেপি বা RSS মতাদর্শের সাথে যুক্ত, এবং তারা কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়।

প্রাচীন ভারতের ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে রচিত প্রচুর বই রয়েছে বাজারে, সে তুলনায় তৎকালীন রাজনীতি ও যুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গবেষণা মূলক বই খুব কমই প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো হয়েছিল সেগুলোও আশ্চর্যজনকভাবে বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে অজানা কারনে। এমনই একটা বই এর নাম ‘From Hydaspes to Kargil: A History of Warfare in India from 326 BC to AD 1999’, লেখক কৌশিক বসু। এখানে সেই খ্রীষ্টপুর্ব ৩২৬ অব্দ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি যুদ্ধের ঘটনার তিনি যথোপোযুক্ত বর্ণনা করেছেন নথি সহযোগে। এমনই আরেকটা বই ‘Ancient Indian Warfare: With Special Reference to the Vedic Period’ এটার লেখক- সর্ব দমন সিং। এছাড়া বিখ্যাত তামিল ঐতিহাসিক ‘ভিষ্মাপেত রামচন্দ্রনের’ লেখা ‘War in Ancient India’ বইটি, যা একটি দুর্মুল্য নথি- এগুলো কখনও কোনো স্কুলের পাঠ্যসূচিতে আসবেনা, যদিও তিন লেখকের কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়, তবুও। বই তিনটিতে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় যুদ্ধের মতাদর্শগত বিষয়গুলো, নানান ধর্মীয় ও গোষ্ঠীজাত পক্ষগুলোর পরিচয় জ্ঞাপনা, হরেক দিশি বিদেশী ঐতিহাসিকের দলিল সহ বর্ণনামূলক ‘সহিংসতার’ ঐতিহ্যগুলো বিষয়ে অত্যন্ত বিস্তৃত ধারণার জন্ম দেয় পাঠকের মননে, যা দুর্দান্তভাবে মৌলিক বিষয়।

বিদেশী লেখকদের মধ্যে, Laurie L. Patton এর লেখা ‘Telling Stories about Harm: An Overview of Early Indian Narratives’ ও ‘John R. Hinnells and Richard King’ লেখকদ্বয় সম্পাদিত ‘Religion and Violence in South Asia: Theory and Practice’ এই বই দুটির মাঝে শুধু ভারতের ইতিহাসই নয়, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাসকে নতুন ভাবে জানা ও বোঝার সুযোগ পাবেন। প্রসঙ্গত, এই দুটো বই গুগুলে PDF হিসাবে উপলব্ধ।

এর পাশাপাশি গোবিন্দ নিহালানীর ‘তমশ’ জাতীয় সিনেমা বলিউডের সংস্কৃতি থেকে উধাও হয়ে গেছে, সেখানে সানি দেওলের টিউবওয়েলের পাইপ তোলা ‘গদরঃ এর প্রেম কথা’ কিম্বা ইজ্রায়েলের জাতীয় সংগীত ‘Hatikvah’ এর সুর চুরি করা (মেরা মুল্ক মেরা দেশ মেরা ইয়ে বতন) ‘দিলজ্বলের’ মত সিনেমাগুলো বিকশিত হয়েছে, শরীর সর্বস্ব সিনেমা গুলোর সাথে সাথে। ওম পুরী, অমরিশ পুরী, কুলভুষণ খারবান্দা, স্মিতা পাতিল, সাবানা আজমি, দীপ্তি নাভাল, সদাশিব অমরাপুরকার, নাশিরুদ্দিন শাহ্ প্রমুখদের মত বলিষ্ঠ অভিনেতাদের দ্বারা চিত্রায়িত সমান্তরাল সিনেমা সংস্কৃতি- যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করত, সেগুলো সম্পূর্ন ভাবে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। বলিউডের এই বিবর্তন নিয়ে আগামীতে একটা প্রবন্ধ নিয়ে আসা যেতেই পারে।

না পড়লে জানা যায়না, না জানলে ভ্রম বা মিথ্যার প্রাচীরকে অতিক্রম করবেন কীভাবে? আজকের ভারতে RSS এর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, যেমন- বিজেপি, শিবসেনা সহ বিজেপির একদা সহযোগী পশ্চিমবঙ্গের তৃনমূল কংগ্রেস, গোর্খা মুক্তি মোর্চা, বিহারের নীতিশ কুমার, রামবিলাশ পাসোয়ান, মহারাষ্ট্র গোমন্তক পার্টি, তেলেঙ্গনার চন্দ্রশেখর রাও, মেঘালয়ের সাংমা, অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু, কর্ণাটকের দেবেগৌড়ার দল, কাশ্মীরের মেহবুবা মুফতি, উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী, আসাম গণ পরিষদ, ঝাড়খণ্ডে শিবু সোরেন, ওড়িশার নবীন পটনায়ক, তামিলনাড়ুর করুণানিধির DMK, জয়ললিতার AIADMK, পাঞ্জাবের ধর্মী রাজনৈতিক দল ‘আকালি দল’, হরিয়ানা ওমপ্রকাশ চৌথালার দল, এছাড়া উত্তরপুর্বাঞ্চলের প্রতিটি বিচ্ছিন্নতাবাদী দল এর মত সহযোগী বহুরূপী দলগুলির মূল শত্রুই হল- কমিউনিস্ট আর মুসলমানেরা; কেউ বিষ খাইয়ে মারছে তো কেউ মধু খাইয়ে। উদ্দেশ্য একটাই- নিকেশ, সেটা যেভাবেই হোক। বাকিদের কিনে ফেলা যায় অতি সহজে।

স্বঘোষিত বিশুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতির ‘ধারক ও বাহকের’ দলেরা আপনার মাঝে ‘হিটলার, মুসলিনি, গোয়েরিং’ এর মতাদর্শকে ‘গোয়েবলসের’ ফর্মুলা অনুযায়ী আপনার মাঝে কবেই ঢুকিয়ে দিয়েছে তা আপনি টেরই পাননি। ভাবছেন বুঝি আপনি প্রকৃত দেশভক্ত, ওদিকে দেশের সবকিছু বিকিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।

তাই প্রতিটি শুভচিন্তক ভারতীয় নাগরিক- যাদের মনেপ্রাণে ও বিশ্বাসে ঢুকে গেছে যে, ‘শুধুমাত্র মুসলমানেরাই বর্বর, আর কমিউনিস্টরা বিদেশী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ’ পাশাপাশি বাকিরা মুনিঋষি পর্যায়ের; তাদের জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ ঘটবে এই বই গুলো পড়লে। এগুলো পড়ার পর বিচার করুন, তার পরেও ঘৃণা বিদ্বেষ থাকলে আরো পোক্তভাবে সেগুলোর বহিঃপ্রকাশ করুন। বাকিরাও পড়ুন, কারন আমাদের কীভাবে ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে রেখে ভুলভাল, অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা বিষয়কে পরিবেশনা করা হচ্ছে ইতিহাসের নামে, সেটাও জানতে পারবেন।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ও বাপ ঠাকুর্দা চোদ্দপুরুষকে খুঁজুন গবেষণালব্ধ নথি দ্বারা; হিটলারি বিজ্ঞাপনের দেশপ্রেম দিয়ে কখনই যা আপনি জানতে পারবেননা, বা আপনাকে জানতে দেওয়া হবেনা।

ভারতীয় যুদ্ধের সহিংস ইতিহাস ও মুসলমান- শুরুর কথা



আজকের ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘দেশপ্রেমিক’ ধারনাটা হলঃ আরবজাত মুসলমানেরা আফগান, পামির অঞ্চল, কখনও মোগল রূপে বা কখনও পারস্য থেকে এসে ভারত আক্রমণ করেছিল, অতএব এই জাতিটাই একমাত্র বর্বর, রক্তপিপাসু, ক্ষমতালোভী, নিকৃষ্ট তথা জিহাদি জাতি। মুসলমানেরা ভারত আক্রমণ করার পুর্বে এই উপমহাদেশে পবিত্র ‘রামায়ণ ও মহাভারতের মত’ ধর্মযুদ্ধ থাকলেও, অধর্মজাত যুদ্ধ বিষয়টা মোটেই ছিলনা, সেটা সম্রাট অশোক করলেও নয়। সকলে নমস্কার, প্রণাম, আলিঙ্গন, চুম্মাচাটি করত আর রেগে গেলে বড়জোর শাপশাপন্ত করে ছেড়ে দিত, বাকিটা ঈশ্বরের কাজ ছিল- ভাবখানা এমনই বর্তমান ভারতীয় ইতিহাসে। এটা যে শুধু বিজেপির দান তা নয়, রাজীব গান্ধী ও তৎপরবর্তী কংগ্রেস সরকার থেকে আজকের নরেন্দ্র মোদী সরকার- সকলেই সমান অবদান রেখেছে। কংগ্রেস নরম হিন্দুত্ব তাস খেলত, বিজেপি সেটাই ন্যাংটা উদোম করে দিয়েছে, এটাই যা ফারাক।
মূলত বাবরি মসজিদ ভাঙা ও মুম্বই দাঙ্গার পরবর্তী পর্যায়ে- RSS ও তার রাজ্যওয়ারি প্রকাশ্য বা গুপ্ত রাজনৈতিক সহযোগী, অসাম্প্রদায়িকতার ভেকধারী কিছু আঞ্চলিক স্বার্থবাদী দল গুলো মিলে এই RSS এর ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষকে সমাজের মাঝে ‘মহীরুহে পরিণত করে দিয়েছে’ নিরবিচ্ছিন্নভাবে সার ও জল সিঞ্চন করে। এদেশে খারাপ কিছু মানেই সেটা মুসলমান জনগোষ্ঠী দ্বারা সম্পৃক্ত, অথবা কমিউনিস্ট; বাকিরা ভাল- কিন্তু ‘সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদ’- এমন একটা ইউটোপিও ধারণা রেডিও, টিভি সিরিয়াল, সিনেমা, ২৪ ঘন্টার খবরের চ্যানেল, বিভিন্ন টক-শো, সংবাদপত্র, সমসাময়িক সাহিত্য ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমের দ্বারা সমাজের মাঝে সুস্পষ্ট ও পরিকল্পিতভাবে বুনে দেওয়া হয়েছে। এখান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়া অন্তত তিনটে প্রজন্ম ঠিক সেটাই শিখেছে যেমনটা ‘RSS’ এর এ্যাজেন্ডা ছিল, কে ভাল তা নিয়ে গবেষণা থাকুক বা না থাকুক- কিন্তু ‘হিংস্র ও খারাপ’ কিছু মানেই তা মুসলমান- এটা প্রতিষ্ঠিত আজকে এই ২০২০ সালে।
যদিও আজকে পর্যন্ত পাকিস্তান তথা ISI এর চর হিসাবে ধরা পরা প্রায় প্রতিটি ব্যাক্তিই- প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিজেপি বা RSS মতাদর্শের সাথে যুক্ত, এবং তারা কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়।
প্রাচীন ভারতের ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে রচিত প্রচুর বই রয়েছে বাজারে, সে তুলনায় তৎকালীন রাজনীতি ও যুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গবেষণা মূলক বই খুব কমই প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো হয়েছিল সেগুলোও আশ্চর্যজনকভাবে বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে অজানা কারনে। এমনই একটা বই এর নাম ‘From Hydaspes to Kargil: A History of Warfare in India from 326 BC to AD 1999’, লেখক কৌশিক বসু। এখানে সেই খ্রীষ্টপুর্ব ৩২৬ অব্দ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি যুদ্ধের ঘটনার তিনি যথোপোযুক্ত বর্ণনা করেছেন নথি সহযোগে। এমনই আরেকটা বই ‘Ancient Indian Warfare: With Special Reference to the Vedic Period’ এটার লেখক- সর্ব দমন সিং। এছাড়া বিখ্যাত তামিল ঐতিহাসিক ‘ভিষ্মাপেত রামচন্দ্রনের’ লেখা ‘War in Ancient India’ বইটি, যা একটি দুর্মুল্য নথি- এগুলো কখনও কোনো স্কুলের পাঠ্যসূচিতে আসবেনা, যদিও তিন লেখকের কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়, তবুও। বই তিনটিতে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় যুদ্ধের মতাদর্শগত বিষয়গুলো, নানান ধর্মীয় ও গোষ্ঠীজাত পক্ষগুলোর পরিচয় জ্ঞাপনা, হরেক দিশি বিদেশী ঐতিহাসিকের দলিল সহ বর্ণনামূলক ‘সহিংসতার’ ঐতিহ্যগুলো বিষয়ে অত্যন্ত বিস্তৃত ধারণার জন্ম দেয় পাঠকের মননে, যা দুর্দান্তভাবে মৌলিক বিষয়।
বিদেশী লেখকদের মধ্যে, Laurie L. Patton এর লেখা ‘Telling Stories about Harm: An Overview of Early Indian Narratives’ ও ‘John R. Hinnells and Richard King’ লেখকদ্বয় সম্পাদিত ‘Religion and Violence in South Asia: Theory and Practice’ এই বই দুটির মাঝে শুধু ভারতের ইতিহাসই নয়, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাসকে নতুন ভাবে জানা ও বোঝার সুযোগ পাবেন। প্রসঙ্গত, এই দুটো বই গুগুলে PDF হিসাবে উপলব্ধ।
এর পাশাপাশি গোবিন্দ নিহালানীর ‘তমশ’ জাতীয় সিনেমা বলিউডের সংস্কৃতি থেকে উধাও হয়ে গেছে, সেখানে সানি দেওলের টিউবওয়েলের পাইপ তোলা ‘গদরঃ এর প্রেম কথা’ কিম্বা ইজ্রায়েলের জাতীয় সংগীত ‘Hatikvah’ এর সুর চুরি করা (মেরা মুল্ক মেরা দেশ মেরা ইয়ে বতন) ‘দিলজ্বলের’ মত সিনেমাগুলো বিকশিত হয়েছে, শরীর সর্বস্ব সিনেমা গুলোর সাথে সাথে। ওম পুরী, অমরিশ পুরী, কুলভুষণ খারবান্দা, স্মিতা পাতিল, সাবানা আজমি, দীপ্তি নাভাল, সদাশিব অমরাপুরকার, নাশিরুদ্দিন শাহ্ প্রমুখদের মত বলিষ্ঠ অভিনেতাদের দ্বারা চিত্রায়িত সমান্তরাল সিনেমা সংস্কৃতি- যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করত, সেগুলো সম্পূর্ন ভাবে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। বলিউডের এই বিবর্তন নিয়ে আগামীতে একটা প্রবন্ধ নিয়ে আসা যেতেই পারে।
না পড়লে জানা যায়না, না জানলে ভ্রম বা মিথ্যার প্রাচীরকে অতিক্রম করবেন কীভাবে? আজকের ভারতে RSS এর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, যেমন- বিজেপি, শিবসেনা সহ বিজেপির একদা সহযোগী পশ্চিমবঙ্গের তৃনমূল কংগ্রেস, গোর্খা মুক্তি মোর্চা, বিহারের নীতিশ কুমার, রামবিলাশ পাসোয়ান, মহারাষ্ট্র গোমন্তক পার্টি, তেলেঙ্গনার চন্দ্রশেখর রাও, মেঘালয়ের সাংমা, অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু, কর্ণাটকের দেবেগৌড়ার দল, কাশ্মীরের মেহবুবা মুফতি, উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী, আসাম গণ পরিষদ, ঝাড়খণ্ডে শিবু সোরেন, ওড়িশার নবীন পটনায়ক, তামিলনাড়ুর করুণানিধির DMK, জয়ললিতার AIADMK, পাঞ্জাবের ধর্মী রাজনৈতিক দল ‘আকালি দল’, হরিয়ানা ওমপ্রকাশ চৌথালার দল, এছাড়া উত্তরপুর্বাঞ্চলের প্রতিটি বিচ্ছিন্নতাবাদী দল এর মত সহযোগী বহুরূপী দলগুলির মূল শত্রুই হল- কমিউনিস্ট আর মুসলমানেরা; কেউ বিষ খাইয়ে মারছে তো কেউ মধু খাইয়ে। উদ্দেশ্য একটাই- নিকেশ, সেটা যেভাবেই হোক। বাকিদের কিনে ফেলা যায় অতি সহজে।
স্বঘোষিত বিশুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতির ‘ধারক ও বাহকের’ দলেরা আপনার মাঝে ‘হিটলার, মুসলিনি, গোয়েরিং’ এর মতাদর্শকে ‘গোয়েবলসের’ ফর্মুলা অনুযায়ী আপনার মাঝে কবেই ঢুকিয়ে দিয়েছে তা আপনি টেরই পাননি। ভাবছেন বুঝি আপনি প্রকৃত দেশভক্ত, ওদিকে দেশের সবকিছু বিকিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।
তাই প্রতিটি শুভচিন্তক ভারতীয় নাগরিক- যাদের মনেপ্রাণে ও বিশ্বাসে ঢুকে গেছে যে, ‘শুধুমাত্র মুসলমানেরাই বর্বর, আর কমিউনিস্টরা বিদেশী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ’ পাশাপাশি বাকিরা মুনিঋষি পর্যায়ের; তাদের জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ ঘটবে এই বই গুলো পড়লে। এগুলো পড়ার পর বিচার করুন, তার পরেও ঘৃণা বিদ্বেষ থাকলে আরো পোক্তভাবে সেগুলোর বহিঃপ্রকাশ করুন। বাকিরাও পড়ুন, কারন আমাদের কীভাবে ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে রেখে ভুলভাল, অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা বিষয়কে পরিবেশনা করা হচ্ছে ইতিহাসের নামে, সেটাও জানতে পারবেন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ও বাপ ঠাকুর্দা চোদ্দপুরুষকে খুঁজুন গবেষণালব্ধ নথি দ্বারা; হিটলারি বিজ্ঞাপনের দেশপ্রেম দিয়ে কখনই যা আপনি জানতে পারবেননা, বা আপনাকে জানতে দেওয়া হবেনা।

বুধবার, ৩ জুন, ২০২০

মোদীর ভারতে আত্মনির্ভর চীন



চীন নিয়ে চীনচিনানিটা ইদানিং বড্ড বেড়েছে, চীনা সেনা তাদের এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে আমাদের ভূমি দখল করছে। অসমর্থিত সুত্র মতে লাদাখের প্যাংগং লেকের কাছে আমাদের জোয়ানদের সাথে চীনা সেনার হাতাহাতিও হয়েছে, যার একটা ভিডিও ভাইরাল হলে আমাদের সেনা মুখপাত্র সেটাকে পত্রপাঠ নাকচ করে দেন। এর পর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও NDTV এর খবর মতে সীমানে দুই দেশের সেনাই ভারী অস্ত্রসস্ত্র মজুত করছে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জন্য। চীনের এমন ব্যবহার অবশ্য নতুন কিছু নয়, লাদাখ ও অরুণাচলের অনেকটা অংশকে চীন গায়ের জোরে তাদের দেশের অংশ বলে দাবী করে।
IPL এর মাঠে চার ছয় হোক বা আউট, চিয়ারলিডারের দলের নাচুনি কখনই বন্ধ হয়না, একটা না একটা নাচিয়ে দল গানের তালে ঠিক নাচবেই, অধিকাংশ দেশজ মিডিয়া চিয়ার লিডারের মতই নেচে চলেছে সরকারের পক্ষে। এদেরকে সামলে রাখা যাদের কাজ, সেই এডিটর গিল্ডও সরকারের রক্ষিতার কাজ করছে, স্বভাবতই চীন ভারতের ৮০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা দখল করে নিলেও তাদের তরফ থেকে সরকারকে কোনও প্রশ্ন করা হয়নি। লাগাতার তিন বছরে অর্থনীতি নিম্নমুখী- মিডিয়া ‘পাকিস্তান’ দেখিয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবর্ষে GDP ৫% ধসে গেছে, চূড়ান্ত বেকারত্ব, কর্মহীন মানুষের ভিড় বাড়ছে রোজ, পাল্লা দিয়ে ‘ক্ষুধা সূচকে’ অবনমন- মিডিয়ার কিন্তু যত প্রশ্ন সবটাই রাহুল গান্ধী আর কংগ্রেসের জন্য, সরকারের জন্য কেবলই স্তুতিকাব্য, যেমনটা গনিকারা তাদের বাবুদের জন্য করে থাকে।
নেহেরু ও নেহেরুর রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের ৬০ বছরে কি কি হয়েছে দেশে? আধুনিক ভারতের প্রতিটি নবরত্ন প্রতিষ্ঠানই তাদের আমলে তৈরি, যা দেশের গর্ব। যথা-
1. IIT
2. AIIMS
3. BSP
4. SAIL
5. BARC
6. ONGC
7. DRDO
8. IIM
9. NID
10. ISRO
11. BHEL
12. HAL ইত্যাদি
প্রসঙ্গত স্বাধীনতার যে আন্দোলন তা কংগ্রেসের নেতৃত্বেই ছিল, অতঃপর স্বাধীন ভারতে গণতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, কৃষিতে আত্মনির্ভর হয়েছিল, শক্তি তথা বিদ্যুতে আত্মনির্ভর হয়েছিল, যানবাহনের দেশীয় কারখানা তৈরি ও সেই যানের জন্য রাস্তা তৈরি হয়েছিল। ছোট, মাঝারী ও বড় উত্পাদন শিল্পে জোয়ার এসেছিল। আইটি ইন্ড্রাষ্ট্রিতে ভারত মেধার অন্যতম বড় যোগান হিসাবে উঠে এসেছিল। দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বিশ্বে সম্ভ্রম আদায় করতে পেরেছিল। মোদীর দল RSS স্বাধীনতার লড়াইতে ব্রিটিশদের পক্ষে চরবৃত্তি করত, যাতে ব্রিটিশেরা আত্মনির্ভর থাকে; স্বাভাবিকভাবেই তারা ও তাদের ভক্তদের হিসাবে ভারত আত্মনির্ভর ছিলনা কংগ্রেসী আমলে। তাদের কাছে আত্মনির্ভরতা মানে গোলামী বা দাসত্বের প্রতিশব্দ।
মোদীর আমলে ৬ বছরে আত্মনির্ভরতার কি কি হয়েছে?
গণতান্ত্রিক প্রতিটি সূচককে সবচেয়ে তলানিতে নামিয়ে এনেছে, অর্থনীতিকে শরশয্যায় পাঠিয়েছে, পায়ে হেঁটে ভ্রমণের যুগকে আবার ফেরত এনে আত্মনির্ভরতার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে দিয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকদের। সরকার হাত তুলে চৈতন্য হয়ে গেছে, পারলে নিজে নিজে বেঁচে দেখা! মানুষ বুঝতে পারছে, আত্মনির্ভরতার ভক্তিমূলক ‘মন কি বাত’ হল দাসত্ব।
নোটবন্দী, জিএসটি মানুষের রোজগার ছিনিয়ে নিয়েছে। কাশ্মীর, তিনতালাক, রামমন্দির নিয়েরোজকার ফালতু বিতর্ক দিয়ে মাতিয়ে রেখেছে জনগনকে, যাতে প্রশ্ন না করে। ক্রমাগত মবলিঞ্চিং, মুসলমান- দলিত বিদ্বেষ, ও ছোটখাটো দাঙ্গাতে গোটা দেশে হিংসা আর ঘৃণার চাষ করা হয়েছে সযত্নে। মেরুকরণ চূড়ান্ত-
মোদী জামানার এই ৬ বছরের সময়কালে অন্য কিছু দেশগুলোতে কি অগ্রগতি হয়েছে-
 বাংলাদেশ তার গার্মেন্টস কারখানাগুলি চীন থেকে সরিয়ে নিজেদের দেশে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে যা দেশজ শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছে।
 থাইল্যান্ড জাপানের ইলেকট্রনিক্স ও রাসায়নিক কারখানাগুলি চীন থেকে সরিয়ে নিজেদের দেশে নিয়ে এসেছে।
 ভিয়েতনাম, যাদের উৎপাদন শিল্পের বৃহত্তম অংশটাই একসময় চীনে ছিল, তারা ২০২২ সালের মধ্যে ১০০% উত্পাদন নিজেদের দেশে সরিয়ে আনার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করেছে। মোবাইল টেকনোলজির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তারা গোটা বিশ্বে রপ্তানি করছে সাফল্যের সাথে।
 ইথিওপিয়া তাদের জুতা কারখানাগুলি চীন থেকে সরিয়ে এসেছে।
এরা ভক্তদের ভাষায় ‘আত্মনির্ভর’ হয়নি।
‘দেশপ্রেমিক’ এর ভেকধারী মোদীর ভারত কি করেছে? মেক ইন ইন্ডিয়ার লোগো বানিয়েছে বিদেশ থেকে, তার বিজ্ঞাপনের দায়িত্বও পেয়েছে মার্কিন কোম্পানি। মোদীভক্তেরা দীপাবলীর সময় চীনা ‘টুনি লাইট’ বয়কট করুন ডাক দিয়ে সোশ্যালমিডিয়াতে মিম ছেরেছে, তাতে লাইক শেয়ার করেছে, আর এখন টিক-টক আনইন্সটল করছে। মোদী ও তার দল RSS জানে, যে তাদের শাসনামলে ভারত পরাধীন হয়েছে বিদেশী শক্তি ও অর্থের কাছে, তাই আত্মনির্ভরতার গল্প আনতে হচ্ছে পিঠ বাঁচাতে।
ভারতে চীনের কি ‘বিকাশ’ হয়েছে মোদীর ৬ বছরে?
ভারতের মোবাইল ফোনের বাজারের প্রায় ৭০% দখল করেছে শাওমি, ওপ্পো, ভিভো ইত্যাদি নামের চীনা কোম্পানি গুলো। লিনভো খাঁটি চীনা কোম্পানি, যা ভারতীয় ল্যাপটপের বাজারে ২৪% স্থান দখল করে আছে। ডেল মার্কিন কোম্পানি হলেও তাদের অধিকাংশ প্রডাকশন লাইন চীনে অবস্থিত, যাদের ল্যাপটপ ভারতীয় বাজার ২০% দখল করে আছে। এছাড়া আসুস ও এসার তাইওয়ানের কোম্পানি হলেও বকলমে তা চীনজাত দ্রব্যই; এদের সম্মিলিত ল্যাপটপ কম্পিউটারের বাজার ১১ %। মোদীর শাসনে ‘আচ্ছে দিন’ তো এসেছে, কিন্তু সেটা চীনের।
Directorate General of Foreign Trade | Ministry of Commerce এর তথ্য মোতাবেক ভারতে চীনা পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৬১%, যেখানে ভারতের পণ্য রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ৯%, এটা মোদী সরকারের একার কৃতিত্ব। আত্মনির্ভরতার বুলি কপচানোর উপযুক্ত সময় এসেছে বটে, কারন বিকিয়ে না গেলে কীভাবে নিজেকে মুক্ত করবে? তাই প্রথম পাঁচ বছরে বিকিয়ে দিয়েছে দেশজ অর্থনীতিকে, সাইফনিক করে রাজনৈতিক তহবিলে সেই বিকানোর দালালি স্বরূপ অর্থও এসে গেছে ‘ইলেক্টোরাল বন্ড’ নামি পোশাকের আড়ালে; এখন ‘আত্মনির্ভর’ হওয়ার গল্প বলে দায় ঝেরে ফেলার ধান্দা।
মোদীর ‘আত্মনির্ভর’ ভারতে চীনা বিনিয়োগের একটা ক্ষুদ্র তালিকাঃ-
• বিগ বাস্কেট- আলিবাবা গ্রুপ, TR ক্যাপিটাল
• বাইজু’স- Téngxùn হোল্ডিং,
• ড্রিম ইলেভেন- ফোসুন
• ডেলিভারি কুরিয়র- Téngxùn হোল্ডিং, Steadview Capital
• Xpress কুরিয়র- Téngxùn হোল্ডিং, Steadview Capital
• E Cart কুরিয়র- Téngxùn হোল্ডিং, Steadview Capital
• হাইক- CTRIP
• ফ্লিপকার্ট- Téngxùn হোল্ডিং, Steadview Capital
• FirstCry - SoftBank Vision Fund
• HomeShop18- Softbank Asia Infrastructure Fund
• মেক মাই ট্রিপ- Téngxùn হোল্ডিং
• গো আইবিবো- Téngxùn হোল্ডিং
• রেড বাস- Téngxùn হোল্ডিং
• উড়ান- Téngxùn হল্ডিং
• ওলা- সিলিং ক্যাপিটাল, Steadview Capital, ইয়েল্ড ইন্টারন্যাশানাল, ECF, চাইনা ইউরেশিয়া ক্যাপিট্যাল
• র‍্যাপিডো- ইন্ট্রিগ্রেডেড ক্যাপিটাল
• ওয়ো- দিদি চুক্সিং, চায়না লোডিং
• পেটিএম- আলিবাবা গ্রুপ, Softbank Asia Infrastructure Fund
• পেটিএম মল- আলিবাবা গ্রুপ
• পলিশি বাজার- Steadview Capital
• কুইকার- Steadview Capital
• রিভিগো- Softbank Asia Infrastructure Fund
• স্ন্যাপডিল- আলিবাবা গ্রুপ, FIM মোবাইল
• জবং- Téngxùn হোল্ডিং,
• মিন্ত্রা- Téngxùn হোল্ডিং,
• ক্লাব ফ্যাক্টারি- Jiayun Data Technology Co. Ltd
• সুইগি- মেচুয়ান দেংপিং, হিলিহাউস ক্যাপিটাল, Téngxùn হোল্ডিং, সাইফ পার্টনারস
• জোমাটো- আলিবাবা গ্রুপ, সুনেউই গ্রুও
• নাইকা- Steadview Capital
• ফার্মইজি- Softbank Asia Infrastructure Fund (একটা অংশ আছে)
• মাই ড্রমেসি- সাইবার কেরিয়ার
• জুম কার- সাইবার কেরিয়ার
• Practo- Téngxùn হোল্ডিং
• Gaana- Téngxùn হোল্ডিং
• MX Player- Téngxùn হোল্ডিং
• Khata Book- Téngxùn হোল্ডিং
মোটামুটি ভারতীয় e-commerce বা গোদাবাংলাতে অনলাইন মার্কেটের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানগুলিই চীনা পুঁজির দাসত্ব করছে। দিনের শেষে লাভের অংশটা চীনেই পৌছাচ্ছে; আর এসবের অধিকাংশের বিজ্ঞাপনী মুখ আমাদের প্রধান সেবক, চৌকিদার ‘নরেন্দ্র মোদী’ নিজে।
এছাড়া ছোটখাটো অগুন্তি চীনা লগ্নি রয়েছে। ‘স্ট্যাচু অফ ইউনিটি’র বরাতও পেয়েছিল "জিয়াংসি টোকাইন মেটাল ক্র্যাফট কর্পোরেশন" নামের চীনা কোম্পানী, তারা চীন থেকে কারিগরও এনেছিল। সস্তার মাইক্রো চিপ তৈরিতে চীনের বাজার শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বেই একচেটিয়া। আগামীর যে 5G প্রযুক্তি, সেখানে খোদ মার্কিনী ও ইউরোপোয়ীদের কাছেও এর কোনো বিকল্প নেই- ভারত তো সেখানে হিসাবেও আসেনা।
একজন ভক্ত যে শাওমি/ওপ্পো/ভিভো ফোন ব্যবহার করে ফ্লিপকার্ট থেকে শপিং করে, পেটিএমের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে, তারা সবাইকে চাইনিজ পণ্য বর্জন করতে বলছে। যার ডিপিতে ‘স্ট্যাটু অফ ইউনিটির’ ছবি সাঁটা। এই না হলে আচ্ছে দিন! মানুষ আর ভক্তের তো এখানেই ফারাক।
সোনাম ওয়াংচুকের মত দু’একটা ছুপা ভক্ত চীনা পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় পদপ্রাপ্তির নেশা জন্মেছে মনে, আরেকটু আত্মনির্ভর হতে যেটা ভীষণ জরুরী। চীনা পণ্য বর্জন তো করব, কিন্তু আমরা তো আর চীনে গিয়ে কেনাকাটা করিনা। ওয়াংচুক সাহেব সবাইকে নিজের মত ছাগল ভেবে নিয়েছেন, যে- ‘যা বলব তাই লোকে খাবে’, সকলে যে ভক্ত নয় সেটা ওনারা ভুলে গেছেন। উনার যদি সত্যি সদিচ্ছা থাকত, তাহলে কেন্দ্রের সরকারকে বলুক চীনা পণ্যের আমদানি বন্ধ করতে, ব্যাস হয়ে গেল। ময়ুরপুচ্ছধারী কাকেরা ততক্ষণ পর্যন্ত সুন্দর, যতক্ষননা ডেকে উঠছে, ওয়াংচুক সাহেব সেই তালিকাতে নব্য সংযোজন মাত্র।
ভারতের জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট, যে দলের মূল স্পনসর ওপ্পো। ভক্তরা নিশ্চই ভারতীয় ক্রিকেট দলকে ব্যান করবে আগামী ৪ বছর-
‘মোদী হ্যাঁয় তো মুমকিন হ্যাঁয়’
তথ্য সহায়তায়ঃ
ইনভেষ্ট ইন্ডিয়ার সরকারী ওয়েবসাইট

মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০

নেপাল সীমান্ত সমস্যা


পাক অধিকৃত কাশ্মীর নিয়ে মিডিয়ার যতটা আগ্রহ, চীন অধিকৃত কাশ্মীর তথা ‘আকসাই চীন’ নিয়ে এরা ততটাই নীরব। জানিনা কোন কারনে কোন মন্ত্রবলে। তবুও এটা আশ্চর্য করেনা, কারন বিগত ছ’বছরে ভারতীয় মিডিয়া নির্লজ্জতার সর্বোচ্চ সীমা পার করে গেছে; কিন্তু যেটা আশ্চর্য করছে সেটা হচ্ছে নেপালের বর্তমান রূপ, রীতিমত আগবাড়িয়ে তারা ভারতের মত দেশকে হুমকি দিচ্ছে। যারা আমাদের ভারতের চেয়ে আকারে আয়তনে ২১৩৩ গুণ ছোট, অর্থনীতি বা সেনাবাহিনী শক্তি তুলনাতেও আসেনা- তা সে তথ্য দেওয়া বৃথা।

সঙ্ঘ পরিবার, মোদী সরকারের ব্যার্থতা ঢাকতে লাল চীনের সাথে বর্তমান নেপালের বাম সরকারকে এক করে ফেলে, অতি সরলীকরণ এর মাধ্যমে নিজেদের লুকাতে চাইছে। সমস্যার যে বিষয়, তার সময়রেখা আজকে নয়; বরং আজ থেকে ২০০ বছর পিছনে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাদের সাথে তৎকালীন ‘কিংডম অফ গোর্খা’র সেনাদের লড়াই হয়, যাকে ‘এংলো-নেপালী যুদ্ধ ১৮১৪’ বলা হয় এবং এই যুদ্ধের শেষে ১৮১৫ সালে শেষ নাগাদ ‘সুগৌলির চুক্তি’ সম্পাদিত হয়, যার দ্বারা আজকের নেপাল রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারিত হয়েছে, যা পশ্চিমে ‘মহাকালী নদী’ বরাবর ও পূর্বে ‘মেচি নদী’ বরাবর। প্রসঙ্গত এই চুক্তি অনুযায়ী নেপালিরা দার্জিলিং ও সিকিম ব্রিটিশদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
সমস্যার সুত্রপাত হয়, পশ্চিম সীমার নির্নায়ক মহাকালী নদী বর্তমান উত্তরাখন্ডের একটা স্থানে এসে দুটো শাখানদীতে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে, যে অঞ্চলটার নাম লিপুলেখ ও কালাপানি। এই মহাকালী নদীর উৎপত্তি লিম্পিয়াধুরা নামে একটা স্থানে। ব্রিটিশ সার্ভেয়ারেরা ১৮২৭ সালে যে ম্যাপ প্রকাশিত করেছিল নেপালের সীমানার, সেখানে দেখা যাচ্ছে নদীর মোটা যে অংশ সেটাকে তারা ‘অফিশিয়ালি’ মান্যতা দিয়েছিল সীমানা হিসাবে। কিন্তু পরবর্তীতে এই অঞ্চলটি চীনের সাথে ব্যবসার জন্য একটা গুরুত্বপুর্ন অঞ্চল হিসাবে দেখা দেয়, ফলস্বরূপ ব্রিটিশরা নেপালিদের সাথে আলোচনা না করেই তাদের ম্যাপে সরু নদী ‘পানিখাদ’কে সীমানা করে নতুন ম্যাপ প্রকাশিত করে দেয় ১৮৬০ সালে প্রকাশিত একটা সার্ভে অনুযায়ী।
তৎকালীন দিনে এই অঞ্চলে কেউ বসবাস করতনা, তাই এই অঞ্চলটার কোনো গুরুত্বই ছিলনা নেপালের রাজার কাছে। একে তো দুর্গম এলাকা, দ্বিতীয়ত কেবল ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের- কৈলাসের মানস সরবোরে যাওয়ার এটা একটা সহজ রাস্তা ছিল, নতুবা সিকিম ঘুরে তাদের মানস সরবোরে যেতে হত, তাই ১৮৬০ এর সমসাময়িকালে নেপালি রাজা বিষয়টিকে একপ্রকার উপেক্ষাই করেছিল বলা যেতে পারে, কারন ১৮৫৭ সালের একটি আভ্যন্তরীণ ঘরোয়া বিদ্রোহে তৎকালীন নেপালি রাজা জঙ্গ-বাহাদুর রানা- ব্রিটিশদের সেনা সাহায্যে বিদ্রোহীদের দমন করেছিল, এর পর থেকেই নেপাল কখনও এই অংশকে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক ম্যাপে নেপালের অংশ বলে উল্লেখ করেনি। কিন্তু চীনের কুং রাজবংশের প্রকাশিত তৎকালীন ম্যাপে অংশটিকে নেপালের বলেই উল্লেখিত রয়েছে, যেমনটা ১৮২৭ সালে ব্রিটিশদের ম্যাপে ছিল।
এই ধারাবাহিকতা সেই থেকে চলে আসছে, ব্রিটিশরা এর পর প্রায় ১০০ বছর রাজ ক্ষমতায় ছিল, কোন সমস্যা হয়নি; স্বাধীন ভারতেও ১৯৯০ সালে একবারই সামান্য উচ্চবাচ্য শোনা গিয়েছিল, যখন নেপালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছিল। এছাড়া দীর্ঘ কংগ্রেসি শাসনে নেপাল একপ্রকার ভারতের স্বাধীন করদ রাজ্য হিসাবেই ছিল বলা যেতে পারে। স্বাধীন ভারতে উক্ত ‘লিপুলেখ-কালাপানি-লিম্পিয়াধুরা’ অঞ্চলটি উত্তরাখণ্ডের পিথরগড় জেলার অধীনে রয়েছে, বর্তমানে অঞ্চলটি ভারতের দিক থেকে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।
এদিকে নেপালিরা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যেমন চাকরি করে রোজগার করে তেমনই লক্ষ লক্ষ নেপালি ভারতে এসে বিনা পাসপোর্ট বিনা ভিসাতে ব্যবসা, বাণিজ্য, চাকরি সবই করছে একজন আম ভারতীয়ের মতই। তারা আমাদেরই খেয়ে আমাদেরই লাল চোখ দেখাচ্ছে।
বর্তমান ভারতের অকর্মন্য ও চূড়ান্ত ব্যার্থ রাষ্ট্রনেতাদের কল্যাণে নেপালের মত দেশও ভারতের সাথে সংঘাতের যেতে রাজি হয়ে যাচ্ছে, যা এক চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা। ভুটান ছাড়া এই মুহুর্তে প্রায় প্রতিটি প্রতিবেশী দেশের সাথেই ভারতের সম্পর্ক তলানিতে।
মোদী সরকার এক্ষেত্রেও স্বভাবগত ভাবেই নেহেরুর উপরে দোষ চাপিয়ে পালাবার বাঙ্কার খুঁড়তে ব্যস্ত হয়ে গেছে।

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...