রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২০

অনলাইন শিক্ষা




আমরা সেই ক্ষণজন্মা প্রজন্ম যারা যুগ সন্ধিক্ষণে জন্মেছি। শেয়াল ডাকা বাঁশবনের ধারে গা ছমছমে সন্ধ্যায় হ্যারিকেনের বাতি জেলে পড়া শুরু করে এখন কিন্ডেলে সদ্যপ্রকাশিত উপন্যাস দেখি। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহের টং এর ঘর থেকে ফেলা আলোয় রুপোলি পর্দা বদলে গিয়ে এখন OTT প্ল্যাটফর্মে হাতেগরম সরবরাহ, মাঝখানে এই আমরাই দেখেছি টিভির দাপাদাপি। এই আমরাই সাইকেল চলার অনুপযুক্ত মোরামের রাস্তাকে বদলে যেতে দেখলাম এসফল্টের পরত দেওয়া খেলনা গাড়ির দৌড় প্রতিযোগিতার ট্র্যাকে। পাড়ার সাপ্তাহিক হাট-বাজারও আজ একটা ক্লিকের অপেক্ষায় দুয়ারে এসে দাঁড় করিয়ে দেবে ‘ডেলিভারি বয়’ নামক রানারদের। হাতের মুঠোয় সবকিছুই প্রায় হাজির। জীবনটা এতটা দ্রুত বদলে গেল যে, কবে ক্যাসেট ফুরিয়ে সিডি এল, ডিভিডি এল, আর কবেই বা মাইক্রো চিপস এল- তার গ্রাফটাই এঁকে উঠতে পারলাম না।
এরই মাঝে আরেক ক্রান্তিকাল, গরিব ও মধ্যবিত্তের চরম বিভীষিকাময় অধ্যায়- করোনাকাল। করোনাকাল জীবনের বহু গতানুগতিক রীতিনীতিই বদলে দিয়েছে, শিক্ষাও যার ব্যতিক্রম নয়। স্বভাবতই গত এক শিক্ষা বছরে গতানুগতিক শিক্ষা আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিকেরা নানান তথ্য-তত্ত্ব দিয়ে গোটা বিষয়টার পিছনে কোনো অসাধু উদ্দেশ্যকে চিহ্নিত করতেই পারেন, কিন্তু তাতে আম মানুষের রোজনামচাতে কোনও পরিবর্তন ঘটবে না। যা পরিবর্তন ঘটার ছিল সেটা ঘটে গেছে, এখান ভাল হোক বা মন্দ- সেটাকে সাথে করে নিয়েই আগামীর পথ চলতে হবে। আমরা একটি নতুন যুগে প্রবেশ করছি- অনলাইন শিক্ষা যুগে। সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং মেন্টেনের যুগে ক্লাসরুমে শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকে শিক্ষালাভই একমাত্র উপায় নয়- পঞ্চম প্রজন্মের গতিময় ইন্টারনেট এবং তার সাথে সঙ্গত রেখে নিত্য প্রযুক্তির বিকাশ ও উত্থানের এই সমাজব্যবস্থায় অভ্যস্ত হতে হবে বিকল্পতে। প্রয়োজন শুধু নিজস্ব ইচ্ছা সাথে কিছুটা অর্থনৈতিক সামর্থ্য, আর পরিকাঠামোর সহযোগিতা- এই ত্রিবেণী সঙ্গমে আপনি যখন যেখানে চান, একটি মানসম্মত শিক্ষার প্রবেশদ্বার পেয়ে যাবেন।
ইন্টারনেট মাধ্যমে শিক্ষাকে ঘিরে সংশয় নিয়ে আমার এই প্রবন্ধ নয়, সব কিছুরই ভাল ও মন্দ দুটো দিক থাকে। বর্তমানে অনলাইন শিক্ষার নামে যা শুরু হয়েছে তা একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে। এর ব্যাপ্তিও বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল, আর হাতেগোনা একআধটা সরকারি স্কুল ছাড়া সেভাবে উপলব্ধ নেই। সেটাও কতটা কার্যকরী তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে, কারণ অনলাইনে মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী আদপে কতটা শিখছে সেটার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। এর মূল কারণ দুটো- প্রথমত, আমাদের গতানুগতিক মানসিকতা, দুই- অনলাইন শিক্ষার পরিকাঠামো। এই পরিকাঠামো তৈরি হলেই- বাচ্চা আদৌ শিখছে কিনা তার পর্যবেক্ষণের নিয়ম এসে যাবে।
শত সহস্র বছর ধরে প্রচলিত ক্লাসরুম ভাবনাকে এক লহমায় কয়েক মাসের মধ্যে ভুলে যাওয়া যাবে- এই ধারণাটি ভাবনাতে আনাও অপরাধ। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী কঠিন হলেও অসাধ্য নয়, কারণ ইন্টারনেটের মাধ্যমে ধরতে পারা পৃথিবীর ব্যাপ্তিটা ক্লাসরুমের চেয়ে ঠিক কতটা বিশাল- সেটা আমরা কল্পনাতেও আনতে পারি না। আজ করোনা পরিস্থিতি আমাদের ইন্টারনেটের মুখোমুখি দাঁড় না করালেও মুখাপেক্ষি করে তুলেছে।
বিকল্পকে সকল সময় স্বাগত জানাতে হয়, বিকল্প শক্তির পরিচায়কও বটে। এদেশের শিক্ষার্থীরা ডিসট্যান্স এডুকেশন বিষয়টার সাথে পরিচিত থাকলেও, সেটার অনলাইন মাধ্যমের সাথে পরিচিতই নই। ওদিকে পশ্চিমা দেশগুলোতে শিক্ষার্থীরা বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে হাতেকলমে শিখছে, আর একাডেমিক শিক্ষা শিখছে অনলাইনে ডিসট্যান্স কোর্সে। বিকল্পের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, তারা পরিকাঠামোগত বাধা সরিয়ে ভাল দিকটা গ্রহণ করেছে, তাই তারা এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি প্রাপ্তবয়স্ক হলে অনলাইন শিক্ষা সবসময় একটি বুদ্ধিদ্বীপ্ত বিকল্প। একটি কঠিন বিষয়ে দক্ষতাকে তীক্ষ্ণ করার জন্য অথবা নতুন দক্ষতা রপ্ত করার জন্য একজন ছাত্রের কাছে অনলাইন শিক্ষা অতি কার্যকরী বিকল্প। কিন্তু শিশু ও কিশোরদের জন্য বিষয়টি এখনও পরীক্ষিত নয়, এটাই এই মাধ্যমের মূল সমস্যা।
অনলাইন শিক্ষা সহজবশ্য। শিক্ষক এবং ছাত্রকে তাদের নিজস্ব সময়সূচি নির্ধারণের অতিরিক্ত নমনীয়তা রয়েছে যা প্রত্যেকের কর্মসূচির সাথে খাপ খায়। চলতি কিছু না ছেড়েই অনলাইন শিক্ষার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পেশা ও পড়াশোনার একটি ভাল ভারসাম্য তৈরি করা যায়। অনলাইন অধ্যয়ন সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা শেখায়, যা জীবনে ভারসাম্য আনতে সাহায্য করে। এই মাধ্যমের যৌথ কর্মসূচি উভয় পক্ষকেই নতুন দায়িত্ব গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে।
ইন্টারনেটের মতো বিস্তৃত স্থানে শেখানোর এবং শেখার জন্য অসীম দক্ষতা এবং বিস্তৃত বৈষয়িক পরিসর রয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে সমসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা স্কুল সেভাবে তৈরি হয়নি আমাদের দেশে। অনলাইন সংস্করণ শিক্ষায় সংগীত শিক্ষা থেকে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান, সব ধরনের শিক্ষার্থীর জন্য একাধিক বিকল্প রয়েছে। ক্যাম্পাসে পা না রেখেও অফিসিয়াল সার্টিফিকেট, ডিপ্লোমা বা ডিগ্রি পাওয়ার জন্য অনলাইন শিক্ষা দুর্দান্ত বিকল্প। বস্তুত বলতে গেলে আমরা গৃহিণীরা আজকাল ইউটিউব দেখে রান্না করি, এটাও তো এক ধরনের অনলাইন শিক্ষাই। আসলে শিক্ষাকে যদি এন্টারটেনমেন্টের পর্যায়ে উন্নীত করা যায়, তাহলেই শিক্ষা সহজ হয়ে যায়।
এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত না করেই অনলাইন মাধ্যম বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে শিক্ষা দিতে সক্ষম করে। এতে কেবল সময়ই বাঁচে তাই নয়, অর্থ সঞ্চয়ও হয়, যা অন্যান্য অগ্রাধিকারগুলিতে ব্যয় করা যেতে পারে। ভ্রমণে থাকাকালীনও ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের সুবিধা নেওয়া যায়। ব্যক্তিগত শিক্ষা পদ্ধতির বিপরীতে, অনলাইন শিক্ষা সাশ্রয়ী হতে পারে। আপনি যাতায়াত এবং শ্রেণীর উপকরণ থেকেও ভালো অর্থ সাশ্রয় করতে পারেন। শিক্ষককেও আর্থিক বিনিয়োগ কম করতে হয়।
অনলাইন শিক্ষার নমনীয়তা অধ্যয়নের গতি নির্ধারণ করতে সাহায্য করতে পারে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বতন্ত্র প্রয়োজনীয়তা এবং যোগ্যতার স্তরের জন্যও এই মাধ্যম যথেষ্ট নমনীয়। প্রথাগত ক্লাসরুম শিক্ষার চেয়ে অনলাইন ক্লাসগুলি আকারে-আয়তনে চেয়ে ছোট হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্ত্রীর মধ্যে অধিক মিথস্ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ এনে দেয়। ভিডিও, ফোটো এবং ইবুকের মতো খুব বৈচিত্র্যময় সামগ্রী অনলাইনে অতিসহজেই অ্যাক্সেস করা যায়, যা আগেকার দিনের ছাত্রবন্ধু কিংবা পাঠাগারের বিকল্প। পাঠ উন্নত করতে ফোরাম বা আলোচনার মতো বিবিধ ফর্ম্যাটগুলিকে অনলাইন শিক্ষা সংহত করতে পারে সহজেই। এই অতিরিক্ত বিকল্প বাস্তবে কোনো একটি মুহূর্তে একটি স্থানে পাওয়া অসম্ভব, ফলে শিক্ষাব্যবস্থাকে ভীষণ গতিশীল করে তোলে।
আমাদের প্রত্যেককে অবশ্যই অনন্য পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে হয় এবং সময়ের চাহিদা ও লক্ষ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রথাগত শিক্ষার পরিবর্তে এই বিকল্প আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে সবার জন্য নয়, এই বাস্তব পরিস্থিতিতে যাকে উপেক্ষা করতে পারি না আমরা। অবশ্যই এটি একটি সুবিধাজনক বিকল্প যা বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক ছাত্রদের জন্য অনুকল্প- কিন্তু সেই আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত হওয়ার জন্য যে মৌলিক শর্তগুলো পূরণ করতে হয় আমাদের পরিকাঠামো তার শুরুটাই করে উঠতে পারেনি, অথচ অনলাইনে পঠনপাঠন শুরু করে দিয়েছে।
স্বভাবতই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিশু ও কিশোর ছাত্রছাত্রীরা এই লকডাউনে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে গেছে বিনা দোষে, সমাজের মাঝে শিক্ষায় স্পষ্টত দুটো বিভেদ তৈরি হয়েছে অভিভাবকের অর্থ আর ডেমোগ্রাফিক লোকেশনের উপরে ভিত্তি করে। গুটিকতক ছাত্রছাত্রী যেখানে ২ বছর এগিয়ে গেলো সেখানে অবশিষ্ট গোটা ছাত্রসমাজ স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই ২০২০ সালের মার্চ মাসেই, কে জানে কতজন পড়াশোনার অভ্যাসটাই ভুলে গেছে। কিম্বা পেটের জ্বালা মেটাতে কতজন কতজন সস্তার শ্রমিক হয়ে গেছে, কত বালিকা বাল্য বিবাহের অভিশাপে পাতিত হয়েছে। এদের চিহ্নিত করে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে অনলাইন শিক্ষার বিকল্পকেই গ্রহণ করতে হবে। যাতে শ্রমিক তথা বালিকাবধুটি যেন শিক্ষাটা পায় তার বর্তমান অবস্থাতেও।
অনলাইন কোর্সের কিছু অসুবিধা~
  • অনলাইন ক্লাস পরিচালনার জন্য যে পরিকাঠামোর দরকার হয় আমাদের দেশের তার ন্যূনতম অবকাঠামো নেই। দেশের ৪২% মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যার মধ্যে ৮৪ শতাংশ আর্বান নাগরিক। তাছাড়া ১৩৯ কোটি জনসংখ্যার ১০৫ কোটি মানুষ জানেইনা স্মার্টফোনটা খায় না গায়ে মাখে। যে দেশে প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বা আশেপাশে বসবাস করে সেখানে অনলাইন শিক্ষা সোনার পাথরবাটির বাইরে কিছু নয়।
  • অনলাইন ক্লাস ক্যাম্পাস ক্লাসের চেয়ে বেশি সময় নেয়। প্রথাগত শিক্ষার সময়সীমার মতো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। উদাহরণস্বরূপ কোনো এক ইংলিশ মিডিয়ামের ছোট বাচ্চাকে সন্ধ্যে সাতটাতেও অনলাইন ক্লাস করতে হচ্ছে।
  • অনলাইন শিক্ষাতে যেহেতু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে শারীরিক দূরত্ব থাকে, তাই প্রথাগত শিক্ষার মতো তাদের মাঝে আত্মিক যোগাযোগ গড়ে উঠে না। প্রত্যক্ষ সংযোগের অভাব পঠনপাঠনে একটা সময়ের পর অমনোযোগিতা দেখা দেয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে টেকনোলজির অপব্যবহারে শুধুমাত্র উপস্থিতি জানান দিয়ে ক্লাসে মানসিক ভাবে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা বাড়তে থাকে। বাচ্চারা ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে, সারাক্ষণ ইউটিউব সহ নানান মাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকছে, বস্তু জগতের সাথে একপ্রকার কোনও সম্পর্কই থাকছেনা।
  • প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের নিজেদের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে৷ একসাথে পাশাপাশি বসে ছোট থেকে তারা বড় হয়। তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা আত্মিক সম্পর্ক শিশুর বিকাশে সাহায্য করে। শিক্ষার্থীরা মানবিক গুণাবলী রপ্ত করে প্রাকৃতিক ভাবেই। এসব যান্ত্রিক অনলাইন শিক্ষায় সম্ভব হয় না।
  • শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার বয়সে খেলাধুলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য। অনলাইন ক্লাসের বিপুল চাপে খেলার অবসর হারিয়ে যাচ্ছে। মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।
  • অনলাইন ক্লাস বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি করে, কারণ এখানে পেশাদারিত্বই শিক্ষকের কাছে শেষ কথা।
  • অনলাইন ক্লাস মাত্রাছাড়া বেয়াড়া স্বাধীনতা দেয়, অধিকাংশ সময়েই যা ছাত্রের চরিত্র গঠনের পরিপন্থী।
  • অনলাইন ক্লাসে জন্য আপনাকে একজন সক্রিয় শিক্ষার্থী হতেই হবে। কিছু এড়িয়ে গেলে তা ছাত্রেরই যাবে, রিপিটের তেমন সুযোগ নেই। এটা কিছুটা কলেজের প্রফেসরদের লেকচারের মত।
  • অনলাইন কোর্সে কোন প্রশিক্ষক থাকে না যিনি নির্দিষ্ট ছাত্রের জন্যই লেগে থাকে।
  • অনলাইন ক্লাস একটি ছাত্রকে অনেক বেশি চাপ প্রদান করে যতটা সে সামলাতে পারেন তার চেয়ে অনেক বেশি!

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা :
করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ অচলাবস্থা চলতেই থাকছে। তার দরুন বেশ কয়েক মাস আমার কর্মক্ষত্রের সহকর্মীরা মিলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনলাইন ক্লাস শুরু করেছি, যা এখনো চলছে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটা বড় অংশ আর্থিক দিক থেকে নিম্নমানের। তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে এই কর্মসূচিতে। অনলাইন শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার মাধ্যম, যার দ্বারা শিক্ষা বাড়ি বসে পৌঁছানো হয়। আর্থ-সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শয়ে শয়ে পরিবারের মধ্যে হাতেগোনা কিছু পরিবারের কাছে এই মাধ্যম, অর্থাৎ ন্যূনতম একটা স্মার্ট ফোন ও ইন্টারনেট পরিষেবা উপলব্ধ। ফলত এই উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে বা হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়।
শিক্ষক হিসেবে প্রাথমিক ভাবে ব্যক্তিগত স্তরে নতুন ব্যবস্থার জড়তা আমাদের মধ্যেও ছিল। তা কাটিয়ে উঠে অপর দিকের শিক্ষার্থীদের দিকে হাত বাড়ালেই যে তারা খুব সহজে তা ধরে নেবে তা কিন্তু নয়। কারণ প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার মূল অনেক গভীরে। হঠাৎ করে তা উপড়ে একশ শতাংশ পরিকাঠামো থাকলেও অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার মূল অত গভীরে যাবে না সহজে। যার উপলব্ধি প্রত্যক্ষভাবে লাভ করেছি।
পরিশেষে আশা করি, এই করোনাকালকে হারিয়ে ফিরে আসুক প্রথাগত শিক্ষার পুরাতন ব্যবস্থা নতুন আঙ্গিকে। অনলাইন শিক্ষাও বিস্তার লাভ করুক সময় নিয়ে। একটি চারাগাছকে মহীরুহ হতে পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি সবদিক থেকে শৃঙ্খলাপরায়ন হতে হয়, যা প্রথাগত শিক্ষার অন্যতম সুফল।


বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২০

মুসলমানঃ দেশের বিচারব্যবস্থা



যদিও আমি নিজে মহরমের শোকের নামে "তাজিয়া" অসভ্যতামির তীব্র বিরুদ্ধে, কারন শোকের সময় কে অমন নেচে গেয়ে লোক জড়ো করে জুলুস করে ভাই? ইসলামে ধর্ম পালন আল্লাহর জন্য, যেখানে লোক দেখানো উপাসনার নামে ভন্ডামির কোনো স্থান নেই।

কিন্তু প্রশ্নটা অন্য- নাগপুরের বিচারপতির অধীনে থাকা সুপ্রিম কোর্টের বিচার ব্যবস্থাকে ধন্যবাদ- বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যে এ দেশে মুসলমানেরা দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক। আজকের বিচারপতিদের যে 'মহরম কি ও কেন' এ বিষয়ে জ্ঞান থাকবেনা সেটাই স্বাভাবিক, তারা এ জন্যই বিচারপতি হয়েছে কারন তারা কিছু জানেনা।
রথযাত্রা, গণেশ উৎসব, জৈন উৎসবের মত বহু উৎসব যেখানে বিপুল জনসমাগম হয়েছিল, সেখানে ছাড় দেওয়া হয় বিশেষ অর্ডার বের করে- করোনা ছড়াবে কেবল মাত্র মহরমে। তাই বাকি সবে সুপ্রিম কোর্ট অনুমতি দিলেও মহরম নিষিদ্ধ করে দেয়।
সাব্বাস, মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য- ভারতবর্ষের সূচনা মুসলমানেদের হাত ধরেই হয়েছিল, তার আগে ছোট ছোট দেশীয় হিন্দু রাজাদের রাজত্ব ছিল। এভাবে চললে আবার এ দেশের বুকে বেশ কয়েকটা ৪৭ যে নেমে আসবে সেটা বলাই বাহুল্য, তাদের আমার কথায় দেশদ্রোহীতার গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন, তারা নেপাল চলে যেতে পারেন, কিম্বা যোগীর উত্তরপ্রদেশে।
মোদীয় গণতন্ত্রে সুপ্রিম কোর্টও যে সাম্প্রদায়িক বিভেদের জন্ম দেবে এতে আর আশ্চর্য কি, কিন্ত এতে করে যদি বিজেপি ভেবে থাকে দেশের মানচিত্র অক্ষত থাকবে তাহলে সেটাই ভেবে কিছুদিন সুখ পাক- কারন নির্বংশের নাতি মরে আগে।

সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২০

গুরুদেব ও অকপট

 

কথা কও, কথা কও।
অনাদি অতীত, অনন্ত রাতে
কেন বসে চেয়ে রও?
কথা কও, কথা কও”

বাঙালি মানুষ, কবিগুরুকে পাশ কাটিয়ে কোনো কিছুর উদযাপন করবে এমন ভয়াবহ ও অসম্ভবতম দুঃস্বপ্ন কোনো শিক্ষিত বাঙালিই দেখতে পারে না। অকপট, দিনের শেষে শত তর্ক-বিতর্ক, রাজনীতি-সমাজনীতি, আড্ডা-মন্তাজ, দেশীয়-আন্তর্জাতিক, খেলা-তামাশা ইত্যাদির মাঝে সাহিত্যকে ভালোবেসে এর চর্চা করে যাওয়াটাকেই মূল পরিচয় হিসাবে আঁকড়ে ধরে বেড়ে উঠেছে জন্মলগ্নকাল থেকে।

সুতরাং কবিগুরুর চরণস্পর্শ না করে এই পথের পথিক হওয়া গেলেও টিকে থাকা যায় না। তো সে যাই হোক- এরপর সময়ের চাকা দ্রুত ঘুরেছে, আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হরেক দোলাচলের মাঝে, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টিয়ে স্মৃতিগুলো অবগুণ্ঠনের জট পাকিয়ে বুকের অতল গভীরে সেঁধিয়ে গেছে, কিন্তু তারা এতোটা দূরেও যায় নি যে- আত্মিক নাড়া দিলে তা ভোরের শিউলির মতো ঝরে পড়বে না। তাইতো কবিগুরুর লাইন ধার করে মনে করিয়ে দিই-

তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর,
যবে আমার জনম হবে ভোর
চলে যাব নবজীবন-লোকে,
নূতন দেখা জাগবে আমার চোখে,
নবীন হয়ে নূতন সে আলোকে
পরব তব নবমিলন-ডোর
তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর”

স্মৃতিগুলোকে ফিরে পাওয়া, ফিরে দেখা, সাম্প্রতিক সমসাময়িকালের সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশায় বিতর্কের আয়োজনে বসা মিলন মেলার মানচিত্রে 'অকপট' আসলে একটা ঐতিহ্যবাহী মেলবন্ধন- নবীন ও প্রবীণ কিছু মানুষের মাঝে, যে মেলবন্ধন আয়োজন করে মাত্র ৪২টা রেলের কনফার্ম টিকিটে ৫২জনের একটা দলের প্রফুল্লতামাখা যাত্রাপথ, যার কোথাও কোনও অভিযোগ নেই; অকপট মানে সেই ফেলে আসা দিন, ফেলে আসা শৈশবের সরলতা মাখা বন্ধুত্ব- যাকে চাওয়া ও পাওয়ার মাপকাঠিতে পরিমাপ করা যায় না। গুরুদেবের ভাষায় অকপট মানে-

নাই, নাই, কিছু নাই, শুধু অম্বেষণ--
নীলিমা লইতে চাই আকাশ ছাঁকিয়া
কাছে গেলে রূপ কোথা করে পলায়ন,
দেহ শুধু হাতে আসে-- শ্রান্ত করে হিয়া”

অকপট শিক্ষা দেয় নতুন করে পুরাতনকে জানার, নিত্য অন্বেষণের। ক্ষুদ্রজীবনে বিরামহীন যে খোঁজ- তার মাঝেই তো আমার আমিকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আর অকপট অন্বেষণের মোক্ষ তো তখনই, যখন কেউ নিজেকে উপলব্ধি করতে পারে এককভাবে এই বিশ্বচরাচরে

জন্মজয়ন্তীর উৎসব পালনে দৃষ্টিগোচর বাঁধ ভাঙা উল্লাসের পুনরাবৃত্তি এবারে হয়তো হয় নি আনুষ্ঠানিকতার বাগড়ম্বরা সহ, কিন্তু অকপটের যে মূল চালিকা শক্তি তা হলো- সম্পর্কের বন্ধন; পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস। অকপটের যে প্রত্যয় তা আসলে সম্পর্কের সংস্কৃতিতে উচ্চমর্যাদা দিয়ে সেই কৃষ্টিকে পারিবারিকভাবে হৃদয়ে লালন করার মাধ্যমে, এর জন্য কে কোথায় ভৌগলিকভাবে অবস্থান করছে তার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দেয়- আমার হৃ্দয়ে তাকে বা তাদের আসন দিতে পেরেছি কিনা। এভাবেই রাত্রি দেড়টার সময় হিমালয়ের পাদদেশে, ৩ ডিগ্রি শীতল আবহাওয়াতে বিনা নুনের বিরিয়ানিও অমৃতের স্বাদে ধরা দেয় অকপটুদের কাছে, আসলে এটা কোনো একক প্রচেষ্টার সফলতা নয়, দলগতভাবে আমিত্বের বিসর্জন দিয়ে আমরা হয়ে উঠার নামই 'অকপট'তাই তো কবিগুরু লিখেছেন-

মুক্ত করো হে মুক্ত করো আমারে,
তোমার নিবিড় নীরব উদার
অনন্ত আঁধারে
নীরব রাত্রে হারাইয়া বাক্
বাহির আমার বাহিরে মিশাক,
দেখা দিক মম অন্তরতম
অখণ্ড আকারে”

'অকপট' মানে তো নস্টালজিয়া, যেখানে হারিয়ে যায় উত্তর ও দক্ষিণের ভেদাভেদ, মুছে যায় পূর্ব-পশ্চিমের সীমানা। অবসরপ্রাপ্ত সম্মানীয় সদস্যেরাও অনায়াসে পাল্লা দেয় সদ্য যুবকের সাথে, আসলে বয়স এখানে কেবলই একটা ধ্রুবক মাত্র, অকপট আসলে একটা নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়, যেখানে আমরাই আমাদের শিক্ষক, আবার সকলেই মনোযোগী শিক্ষার্থী।

যে যেভাবে পারে খুঁজে ফেরে জীবনের একান্ত স্বাদটুকু, অকপট ‘ডেকার্স লেনের’ ব্যস্ত ফুটপাতের একটা ছোট্ট কাউন্টার স্বরূপ। এখানে খাবারের নামে আদর পরিবেশনা করা হয়, বিনিময়ে ঘৃণা দিলে অগ্নিবর্ষণ করতে পিছুপা হয় না কেউ- এটাই 'অকপট'যারা মানিয়ে নিতে পারেনা, তারা হয় সাথে পথচলা থামিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়, কেউ বা কক্ষ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। ইতিউতি আলাপচারিতায় ভেসে বেড়ায় অকপটের সমাপ্তিকাব্য। যখনই এমন কিছু শ্রুতিগোচর হয়, মনে পড়ে যায় কবিগুরুর অমোঘ সৃষ্টি-

শেষের মধ্যে অশেষ আছে,
এই কথাটি মনে
আজকে আমার গানের শেষে`
জাগছে ক্ষণে ক্ষণে
সুর গিয়েছে থেমে তবু
থামতে যেন চায় না কভু,
নীরবতায় বাজছে বীণা
বিনা প্রয়োজনে”

আসলে শেষের যে শেষ নেই এটাই তো অকপটের ধমনীর মূল, ব্যস্ত জীবনের মাঝে ঝরে পড়া শিউলির গন্ধ নিয়ে মাতোয়ারা হতে অকপটের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ঠিকানা আর কিই বা হতে পারে, এখানে জীবন আছে, তাই তো বিচ্ছেদ আছে, অভিমান আছে, বিষাদ আছে, প্রেম আছে, পরিণয় আছে, আছে কত শত অপত্য, রয়েছে মিলনান্তক-বিয়োগান্তক কতই না অধ্যায়, আসলে ব্যক্তিপরিসর যেখানে দলে এসে মিশে যায় তখন তাকে ‘অকপট’ ডাকনামে ডাকা হয়।

চলার পথে দিন যাপনের নানা ধরণের গ্লানির পলি জমে জমে অকপটের ভিত মজবুত না হলে, জনসেবার নামে লক্ষ লক্ষ টাকার সংস্থান করা সম্ভব হতো না, কৈশোরের অকপট সেই স্মৃতির ভারে তলিয়ে না গিয়ে তাকে ভর করেই নতুন উচ্চতায় উঠে এসেছে, মাথা তুলেছে নতুন ভোরের স্বপ্নে। অতিক্রান্ত ঋতুপর্যায়ে শীতের শেষে নব বসন্তের দখিনা হওয়ার সাথে অকপট প্রতিদিন চোখ মেলে পৃথিবীর পানে নতুন প্রত্যাশাতে। মনে পড়ে যায় কবিগুরুর লেখনী-

মনে করি এইখানে শেষ
কোথা বা হয় শেষ
আবার তোমার সভা থেকে
আসে যে আদেশ
নূতন গানে নূতন রাগে
নূতন করে হৃদয় জাগে,
সুরের পথে কোথা যে যাই
না পাই সে উদ্দেশ”

'অকপট' মানে তো নতুনকে গড়ে তোলার স্বপ্নকে লালন করা, পথ ভিন্ন হতেই পারে, মতের অমিল হতেই পারে কিন্তু অকপট শেখায় গন্তব্য যখন একটিই তখন সকল বৈরিতাকে একটি খোলসের মাঝে আবৃত রেখে যদি আমরা সাথে সাথে পথ চলি তাহলেই তো প্রাণে সমৃদ্ধি আসে জীবনীশক্তিতে- আর এই প্রাণশক্তিটার নামই তো আসলে অকপটতা। অকপট ভীরুতা, কাপুরুষতাকে প্রশ্রয় দেয় না, কিন্তু অশ্লীলতাকে কঠোর ভাবে দমন করার প্রেরণা দেয়, ক্ষমতার চোখে চোখ রাখতে শেখায়। দাসত্ব, অন্ধত্বের গরল থেকে স্বতন্ত্রতার গরিমার পথের প্রতিটি যাত্রীই আসলে একজন অকপটু

ওজোনের চাদর যেমন ঢেকে রাখে প্রকৃতির শুদ্ধতাকে, অকপটের শ্রেষ্ঠ সদস্যেরা পরিচালক রূপে অকপটের সেবা করে চলেছে প্রতিনিয়ত। বিদ্বেষ, হীনতা, স্বার্থপরতা, মিথ্যাচারের উত্তুরে হাওয়া যখন মুহূর্তে কাঁপন ছড়িয়ে দেয় শিরা-উপশিরায়, শক্ত হাতে তাঁরা পাল সামলে অকপট নামের ডিঙিকে ভাসিয়ে রাখে এই মহাসমুদ্রে। আজকে ‘সাথে সাত’ অকপটজয়ন্তী উৎসবের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন, বিশ্বব্যাপী মারণ রোগের সাথে ছড়িয়ে পড়া দেউলিয়া রাজনীতির নগ্নতা, অপরিকল্পিত রাষ্ট্রব্যবস্থা, সাম্রাজ্যবাদীদের যুদ্ধের দামামার সাথে সর্বগ্রাসী কর্পোরেটের ক্ষিদের সাথে যুঝতে গিয়ে আমরা সকলেই রণক্লান্ত, আমাদের হৃদয়ের উষ্ণতা হারিয়ে গেছে সামান্য খিদের চাহিদা মেটাতে। মিথ্যা প্রচারের অনন্ত শীতলতায় ঢেকে যাওয়া সমাজের বুকে একটুকরো রোদ হয়ে বুকের ভিটেতে একটুখানি ওম পৌঁছে দেওয়ার নামই অকপটতা। এ উষ্ণতায় কোনো ভেদাভেদ নেই, আছে মিলন পিয়াসী শুধু সুখ, আর ভাগ করে নেওয়া সুখানুভূতি।

সামাজিক বৈষম্য, জাত, ধর্ম, বর্ণ কিছুই অকপটের বাধা হতে পারে না, আর যেখানে এই বন্ধন আছে তা কখনও অকপট হতে পারে না। তাইতো কবিগুরু বলে গেছেন-

ললাটে দিয়েছে চিহ্ন ‘তুমি আমাদের চেনা' বলে
খসে পড়ে গিয়েছিল কখন পরের ছদ্মবেশ;
দেখা দিয়েছিল তাই অন্তরের নিত্য যে মানুষ;
অভাবিত পরিচয়ে
আনন্দের বাঁধ দিল খুলে
ধরিনু চিনের নাম, পরিনু চিনের বেশবাস
এ কথা বুঝিনু মনে,
যেখানেই বন্ধু পাই সেখানেই নবজন্ম ঘটে
আনে সে প্রাণের অপূর্বতা”

আর এই প্রাণের অপূর্বতা আছেই বলেই কখনও একঘেঁয়েমি গ্রাস করে না অকপটকে, অকপট কঠোর কিন্তু স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, ব্যক্তিত্ববোধের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের সহায়ক, মোহনীয় মানবিক গুণের পৃষ্ঠপোষক। অকপট বর্তমানে বাঁচে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে এঁকে, কিন্তু নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে বর্তমানের অকপটুদের সাথে ভাগ করে নিয়ে স্মৃতিময় করে তোলে বর্তমানকে, আগামীর জন্য।

অকপট মানে তো সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের উজ্জ্বল্যের গান, স্মৃতিচারণা কেবলই একটা পথ নির্দেশনা মাত্র- সমাজের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত অকপটুদের সাথে নিশ্চিন্তে বেড়ে উঠে নব প্রজন্ম, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে প্রেরণা নিয়ে বস্তু জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারার নামই অকপট অনুশীলন। স্মৃতিধন্য বর্তমান প্রজন্মই পারে আগামীর স্বপ্ন পূরণে আন্তরিকতার অভিব্যক্তিময় পরম্পরা চালিয়ে যেতে। অকপট জানে কবিগুরুর এই কবিতাখানি-

সমুখে শান্তিপারাবার,
ভাসাও তরণী হে কর্ণধার
তুমি হবে চিরসাথি,
লও লও হে ক্রোড় পাতি,
অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি ধ্রুবতারকার”

অকপট সদা সর্বদা একটি অকৃত্রিম সংস্করণ, এখানে থাকা মানেই মনের স্ফূর্তি। সংসার-জীবনের কৃত্রিমতার বাধা পেরিয়ে সবাই নিজেকে হালকা করতে অকপট হওয়া, যেখানে কোনো অভিনয় থাকে না। নিজেকে খোলস থেকে বের করে আনার একটা প্রক্রিয়ার নাম 'অকপট'অকপট আসলে অনেক নাম, হরেক চেহারা, ভিন্ন ভিন্ন চঞ্চলতা, অপ্রতুল হর্ষ, অনিঃশেষ পরিতৃপ্তি ঘিরে ভিড় করে থাকা মানুষের দল। তাদের সামঞ্জস্যই হলো তাদের তারতম্যতায়, যেখানে রঙ, রূপ, বর্ণ, গন্ধ সবেতেতেই আছে দৃষ্টান্তমূলক ভিন্নতা; তা সত্ত্বেও প্রত্যেকের উজ্জ্বলতা ও আত্মার পরিশুদ্ধতা একইরকম দীপ্তিময়। একে বিচ্ছিন্ন করে এমন সাধ্যি কার!

কথিত আছে- ‘বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’; কিন্তু অকপট একটা ভার্চুয়াল মাধ্যম হয়েও এর মানে হলো- বিগলিত আবেগের বারিধারা। জীবিকার তাগিদে যতোই যান্ত্রিকতায়- বস্তুজীবনের মানবিকতা পথ হারিয়ে ফেলুক, অন্তরের আবেগ কখনও ফুরিয়ে যায় না, আর এই আবেগকেই পুঁজি করে যারা বাসা বেঁধেছে, তাদের সেই বাসার নামই যে 'অকপট'নিরন্তর সংগ্রামে লিপ্ত সকলেই এক সমান্তরালে এসে পূর্ণ করে তুলেছে শ্রদ্ধা ও স্নেহের অপূর্ব এক মেলবন্ধনে। এমনই কোনো জন্মদিনের অবসরে কবিগুরু বলে গেছেন-

আজি এই জন্মদিনে
দূরের পথিক সেই তাহারি শুনিনু পদক্ষেপ
নির্জন সমুদ্রতীর হতে”

চোখ আমাদের সামনের দিকে হলেও আমরা দেখতে পায় কেবলমাত্র পিছনের অতীতকে, সেই নির্লোভ, নির্ভেজাল, নিষ্কলুষ শৈশবের কাছে বাঁধা আছে আমাদের প্রাণভোমরা। যাকে আক্ষরিকভাবে ছোঁয়া যায় না ঠিকই, তাই তো অকপট নামের এমন মঞ্চের প্রবর্তনা। অসীম আকুলতা মহাকালের পথ দিয়ে আমরা জীবনের সেই চরম সত্যের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে যায়- ‘সময় কখনও ফিরবার নয়’। তবুও মনের জানালা খুলে দিলে অকপট সমাজ আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় মূর্তিমান হয়ে। তাই তো কবিগুরু প্রশ্ন করেছেন- তোমার গেছে যে দিন সে কি একেবারেই গেছে? কিছুই কি নেই বাকি? বিড়বিড় করতে করতে মন বলে উঠে- ‘রাতের সব তারা-ই আছে দিনের আলোর গভীরে’

কবি শঙ্খ ঘোষের একটি লাইন দিকে আমি নিজেকে অকপটের সাথে সম্পর্ক সম্পৃক্ত করতে পারি আজকের ন্যাংটা সমাজে, যেখানে আমার যা কিছু আছে সবটাই আসলে অকপটের জন্য- তাই তো এই কবিতাটা ‘আমি ও অকপটের’ মাঝে যোগসূত্র স্বরূপ

আমার জন্য একটুখানি কবর খোঁড়ো সর্বসহা
লজ্জা লুকোই কাঁচা মাটির তলে --
গোপন রক্ত যা-কিছুটুক আছে আমার শরীরে, তার
সবটুকুতে শস্য যেন ফলে”

শুভ জন্মবার্ষিকী 'অকপট', পায়ে পায়ে এই পথ চলা শতাব্দীর প্রাচীরকে ভেদ করে কালের গর্ভে যাত্রা করুক এটাই তো অকপট কামনা

শেষে বলি, কবিগুরু যেন অকপটের জন্যই এমন একটা কবিতা এঁকেছিলেন বোধহয়- একে ছাড়া যেন এই আত্মচর্চাটাই অসম্পুর্ণ-

সীমার মাঝে, অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর
কত বর্ণে কত গন্ধে, কত গানে কত ছন্দে,
অরূপ তোমার রূপের লীলায় জাগে হৃদয়পুর
আমার মধ্যে তোমার শোভা এমন সুমধুর
তোমায় আমায় মিলন হলে সকলি যায় খুলে--
বিশ্বসাগর ঢেউ খেলায়ে উঠে তখন দুলে
তোমার আলোয় নাই তো ছায়া, আমার মাঝে পায় সে কায়া,
হয় সে আমার অশ্রুজলে সুন্দরবিধুর
আমার মধ্যে তোমার শোভা এমন সুমধুর”

-চরৈবেতি

শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২০

টেলিগ্রাম মেসিজিং এ্যাপস



হোয়াটস অ্যাপ নিঃসন্দেহে এই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ। হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ পাঠানো সম্পূর্ণ নিরাপদ, এত কাল এমনটাই ভেবে এসেছেন আপনি; কিন্তু এটা যে মোদী জামানা, সুতরাং এখানে এনস্ক্রিপ্সন ধাপ্পার উপরে নির্ভর করে আঁখি দাসেরা RSS-বিজেপির কাছে সম্পূর্ণ রূপে বিক্রি হয়ে বসে রয়েছে। আর বিক্রি হয়েছে বলে তবে না নাগপুর হোয়াটস অ্যাপকে ইউনিভার্সিটি বানিয়ে তুলেছে ভক্তদের জন্য, যে মাধ্যমে মিথ্যা ও ঘৃণা শব্দের চেয়েও দ্রুতগতিতে দৌড়ায়। অথচ আপনার সামান্য একটা নিরীহ লেখা বা ছবি যেখানে মোদীজীর সমালোচনার কথা রয়েছে তা যেকোনো সময় ব্লক হয়ে যেতেই পারে, এমনকি হোয়াটস অ্যাপও। এখন তো সরকারি ভাবেই জিও-হোয়াটস অ্যাপ-নাগপুর-জুকারবার্গ-রবিরঞ্জন-আঁখি দাস-উন্নয়ন-আচ্ছেদিন সবই একটা ছাতার তলায়, শিল্পের ভাষায় সিংগেল উইণ্ডো। যারা ভেবেছেন আমরা বোধহয় হোয়াটস অ্যাপে সুরক্ষিত, ভুল ভেবেছেন এত দিন। হোয়াটস অ্যাপে আপনার গোপনীয়তা আদৌ সুরক্ষিত নয়, বরং আপনার প্রতিটি মেসেজই রাষ্ট্রে বিক্রির দালাল তথা স্বঘোষিত দেশপ্রেমিকদের দ্বারা নজরবন্দী।

তাহলে উপায়? End to end এনক্রিপ্টেড মেসেজিং সার্ভিসের দিন কি তাহলে শেষ?

দেখুন শেষ কিনা জানি না, কিন্তু বেশি ভালো ভালো নয়- সেই সূত্র মেনে পাশাপাশি অন্য আর কিছু বিকল্প কি ট্রাই করা যেতে পারে না, বিশেষ করে তাদের জন্য যারা ফেসবুক গোষ্ঠীর দ্বারা RSS এর রক্তচক্ষুর শিকার হয়েছেন বা হয়ে চলেছেন। অনেকেই একে অক্সিমরোন বলবেন, কিন্তু দেখুন সোনার পাথরবাটি না হলেও সোনার বাটি কিন্তু হয়। অতএব কেন পড়ে আছেন হোয়াটস অ্যাপে, অন্য বিকল্প ট্রায় করে বুঝিয়ে দিন যে- কাল এই জিনিস ফেসবুকের সাথে হওয়াটাও অসম্ভব কিছু নয়। সাম্প্রতিক অতীতেই অর্কুট নামের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল নেট দুনিয়াতে, যেমন ছিল নোকিয়া ফোন বা ফুজি ফিল্ম বা hmt ঘড়ি। কালের নিয়মে এরা সকলেই হারিয়েছে, সুতরাং ফেসবুকই একমাত্র বিকল্প এমনটা নাও থাকতেই পারে নিকট আগামীতে। তাই খুব স্বল্প ক্ষমতা দিয়ে আপনার আমার মতো প্রান্তিক গ্রাহকেরা জাস্ট একটা টোকা দিয়েই দেখি না, লক্ষ লক্ষ টোকা ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো কাঁপুনি ধরিয়ে দেবে ক্যালিফোর্নিয়ার মেনলো পার্কের অফিস বাড়িতে।

কথা বলছি টেলিগ্রাম মেসেজিং অ্যাপ নিয়ে, তবে এটা কোনো পেইড বিজ্ঞাপন নয়। আমার টেলিগ্রামের প্রতি ভালোলাগা থেকে এই লেখা। টেলিগ্রাম হলো সিকিউরিটি ও প্রাইভেসির জন্য অন্যতম পরিচিত একটি অ্যাপ, যা দীর্ঘ ৭ বছর ধরে পরিষেবা দিয়ে আসছে। এটি কখনোই থার্ড পার্টির কাওকে আপনার কোন তথ্য দেয় না, বা দিয়েছে বলে এমন কোনো অপশ্রুতি বাজারে নেই। তথ্য না দেওয়ার কারণে অধিকাংশ দেশের সরকারের রক্ত-চক্ষুর মুখে পড়েছে টেলিগ্রাম, কিন্তু তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে অবিচল। এখানে আপনি নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত এক্টিভ না থাকলে অটোমেটিক ভাবে আপনার একাউন্টটি সিস্টেম থেকে ডিলিট হয়ে যাবে, যা “Self Destructing” নামে পরিচিত, আর এই পিরিয়ডটা আপনি নিজেই সেট করতে পারবেন যে, ঠিক ‘কতদিন আমি ব্যবহার না করলে এটা অটো ডিলিট হয়ে যাবে’। তাই এমন একটা প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারী মানেই খরিদ্দার এমনটা মনে হয় না, অন্তত আজকের তারিখ পর্যন্ত।

টেলিগ্রাম ব্যবহার না করার জন্য আপনার বহু কারণ থাকতে পারে, আবার হোয়াটস অ্যাপ না ছাড়ার জন্যও লক্ষ কারণ থাকতেই পারে- আমার উদ্দেশ্য আপনাকে কনফিউজড করা নয়- উদ্দেশ্য আপনার কাছে বিকল্পটা সম্বন্ধে একটা স্বচ্ছ ও পরিষ্কার ধারণা দেওয়া। তবে সে যাই হোক না কেন এটি একটি পোক্ত মেসেজিং অ্যাপ এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। হোয়াটস অ্যাপ ব্যবহারকারিদের কাছে এর চেয়ে দুর্দান্ত বিকল্প এই মুহূর্তে আর নেই। যদিও মাইক্রোসফটের কাইজালা বা সিগন্যাল নামের দুটো অ্যাপও রয়েছে কিন্তু টেলিগ্রাম কিছু বিষয়ে একেবারেই অনন্য। এখানে গর্ভমেন্ট অফ ইন্ডিয়ার MyGov নামে চ্যানেল আছে, চেক করে দেখতে পারেন, যেখানে ২৫ লক্ষেরও বেশি সদস্য রয়েছে।

দুই রাশিয়ান ভাই- পাভেল জুরভ এবং নিকোলাই জুরভ এই সফটওয়্যারের জনক। এতে হোয়াটস অ্যাপের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়া তো যায়ই, বরং আরও বেশি কিছু আছে এতে। তাছাড়া, ব্যবহারের দিক থেকে হোয়াটস অ্যাপের চেয়ে টেলিগ্রাম আরও বেশি ‘নিরাপদ’ ও ‘কার্যকর’ নির্মাতাদের দাবি অনুযায়ী, অ্যাপটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতই জোরদার করা রয়েছে যে, কেউ এটি ভাঙতে পারলে তাকে দুই লাখ ডলার পুরস্কার প্রদানের ঘোষণাও রয়েছে। টেলিগ্রামের সাত বছর পূর্ন করল মাত্র কয়েক দিন আগে, এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৩। এদের একমাত্র মোটো হচ্ছে সুরক্ষিত বার্তাপ্রেরণের উপর ফোকাস। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৫০ কোটিরও বেশি টেলিগ্রাম ব্যবহারকারী রয়েছে, সর্বাধিক ডাউনলোড হওয়া ১০ টি অ্যাপের মধ্যে টেলিগ্রাম অন্যতম।

এছাড়া টেলিগ্রাম একটি নন-প্রফিট কোম্পানি আর এর ক্লায়েন্টস হলো ওপেন সোর্স। নির্মাতা পাভেল জুরভ এবং নিকোলাই জুরভ জানিয়েছে, টেলিগ্রাম অ্যাপটিতে কোনো ধরনের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হবে না বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে এটি বিক্রিও করা হবে না ভবিষ্যতে, না করা হবে কোনো প্রকারের কর্পোরেট লগ্নি। অ্যাপটির পরিচালনার জন্য যদি কখনও অর্থের প্রয়োজন হয়, তবে ব্যবহারকারীদের কাছেই অনুদান চাওয়া হবে- যেভাবে উইকিপিডিয়া ক্রাউড ফান্ডিং করছে।

যে কারণে টেলিগ্রাম ব্যবহার করবেনঃ

একটা সময় পর্যন্ত টেলিগ্রামে ভিডিও কল করা যেত না, কিন্তু ১৫ই আগষ্ট ২০২০ সালে তাদের নতুন আপডেট ভার্সন তথা আলফা ভার্সনে ভিডিও কলের সুবিধা একে দুর্দান্ত বানিয়ে তুলেছে।

১) প্রাইভেসি: টেলিগ্রামের প্রতিটি মেসেজগুলো কঠোরভাবে এনক্রিপড করা। আপনার মেসেজগুলি হ্যাকারদের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখে, তেমনই রাষ্ট্রের নামে থাকা বেনামি দালালদের বদ মতলবের নজর থেকেও আপনার ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ হয় না।

২) ক্লাউড-বেসড সার্ভিসঃ যার জন্য আপনি অনেকগুলো ডিভাইসের মাধ্যমে একটাই টেলিগ্রাম ব্যবহার করতে পারবেন অনায়াসে। এর মধ্যে এন্ড্রয়েড, আইওএস, উইন্ডোজ, লিনাক্স, ম্যাক উল্লেখযোগ্য। এমনকি Web এও ব্যবহার করতে পারবেন। যেটা আগে ছিল না, এখন বাংলা ফন্টও সাপোর্ট করে।

৩) ফাস্টঃ টেলিগ্রাম অন্যান্য সকল এই জাতীয় অ্যাপ্লিকেশনের থেকে দ্রুত মেসেজ আদান-প্রদান করতে সক্ষম। প্রতিটি মেসেজের রিপ্লাই দেওয়া যায় বা মেসেজটিকে ফরোয়ার্ড করার সুবিধা রয়েছে।

৪) ডিস্ট্রিবিউটেডঃ নিরাপত্তা ও গতির জন্য টেলিগ্রামের সার্ভার বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত।

৫) ওপেন: টেলিগ্রামের উন্মুক্ত API ও Protocol যা সবার জন্য ফ্রি।

৬) ফ্রিঃ টেলিগ্রাম চিরদিনের জন্য ফ্রি। এতে কোনো ধরণের বিজ্ঞাপন বা সাবস্ক্রিপশন ফি নেই।

৭) অ্যানিমেটেড ইমোজিঃ আপনাকে আনন্দ দান করার জন্য টেলিগ্রামে থাকা হরেক অ্যানিমেটেড ইমোজিগুলো শুধু অনবদ্য বললে কিছুই বলা হয় না, এটার মজা শুধু সেই জানে যে ব্যবহার করেছে এই ইমোজি।

৮) পাওয়ারফুলঃ টেলিগ্রামে আপনি যেকোনো সাইজের মিডিয়া এবং ডকুমেন্ট (যে কোনো ধরনের) পাঠাতে পারবেন এটাচমেন্টে। সেখানে আপনি ভিডিওর কোয়ালিটি নিজেই কন্ট্রোল করতে পারবেন।

৯) সিক্রেট চ্যাটঃ অনেকের কাছে খুবই কাজের একটা জিনিস। সিক্রেট চ্যাটে যে বার্তা আদান প্রদান করা হয়ে থাকে তা প্রেরক ও প্রাপক ছাড়া কেউ দেখতে পারবে না, এমনকি যারা এটি বানিয়েছে তারাও দেখতে পারবে না।

১০) একাধিক ফোন নম্বর ব্যবহারঃ আপনার যদি কখনও নিজের ফোন নম্বর পরিবর্তন করার দরকার পরে, সেক্ষেত্রে অনায়াসে আপনার সমস্ত কনট্যাক্ট লিষ্ট এবং অন্যান্য তথ্যপঞ্জী নতুন নম্বরে স্থানান্তর করতে পারেন। আপনার চ্যাট বা কনট্যাক্ট গুলির কোনো ক্ষতি না করেই আপনি সহজে আপনার অ্যাকাউন্টের সাথে সংযুক্ত ফোন নম্বরটি পরিবর্তন করে নিতে পারবেন। যে নম্বরটি ব্যবহার করছেন তা পরিবর্তন করতে, বাম দিকের মেনুটি স্লাইড করুন, সেটিংস খুলুন এবং অ্যাকাউন্টে থাকা আপনার ফোন নম্বরটিতে আলতো চাপুন। তারপরে পরিবর্তিত নম্বরটি লিখে দিয়ে নির্দেশাবলী অনুসরণ করুন। কেল্লা ফতে-

১১) একই সাথে দুটো একাউন্টঃ আপনি যদি নম্বর পরিবর্তনের পরিবর্তে দ্বিতীয় আরেকটা নম্বর যুক্ত করতে চান, যেমন ফেসবুকে একাধিক একাউন্ট করা যায় তেমন- তাহলে টেলিগ্রামের বিকল্প আর কিছু নেই। বাম পাশের মেনুতে অ্যাকাউন্টের স্যুইচারটি প্রসারিত করে আপনার পরিচিতির তথ্যটিতে আলতো চাপুন এবং অ্যাকাউন্ট যুক্ত করুন যতগুলো খুশি। একাধিক মেসেঞ্জার অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার না করেই আপনার ব্যক্তিগত এবং পেশাদার জীবনকে আলাদা রাখতে এর জুড়ি নেই।

১২) একাধিক প্রোফাইল ফটোঃ বহুগুণের কথা বললে- নিজের একাধিক পছন্দের ছবি ডিপিতে কে না রাখতে চায়, আর এর জন্য টেলিগ্রাম হলো সবচেয়ে সেরা স্থান, এই সিস্টেম আপনাকে অতিরিক্ত প্রোফাইল ফটো আপলোড করতে অনুমোদন দেয়। সর্বশেষতম ছবিটি আপনার পরিচিতিগুলির প্রোফাইল ছবি হিসাবে দেখা গেলেও যে কেউ আপনার বাকী ছবিগুলি দেখতে চাইলে শুধু তাকে সোয়াইপ করার কষ্টটুকু করতে করতে হবে।

১৩) আপনি যেকোনো সময় যেকোনো মেসেজ ডিলিট করে ফেলতে পারেন, এই মাধ্যমে তার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।

১৪) কাস্টমাইজ থিমঃ টেলিগ্রামে আপনি ডিফল্ট বর্ণের রঙ এবং পটভূমির সামঞ্জস্য যেকোনো সময় বদল করে ফেলতে পারেন আপনার মনের রঙ দ্বারা। আপনি টেলিগ্রামটিকে ঠিক যেভাবে দেখতে চান তেমনই রঙে রাঙানোর স্বাধীনতা পেয়ে যাবেন স্বয়ংক্রিয় নাইটমোডের সুবিধা সহ। চাইলে ব্যাকগ্রাউন্ডের ছবিটিও আপনি আপনার ফোনের গ্যালারি থেকে বেছে নিতে পারবেন।

১৫) প্রক্সি সার্ভারে ব্যবহারের স্বাধীনতাঃ আপনি যদি টেলিগ্রামটিকে এমন এক অঞ্চলে ব্যবহার করতে চান যেখানে এটির ব্যবহারকে অবরুদ্ধ করা হয়েছে, সেক্ষেত্রেও বিন্দাস থাকুন। টেলিগ্রাম ফাংশনটির সকল সময় আপনাকে প্রক্সি সার্ভারের মাধ্যমে সংযোগ করার অনুমতি দেয়। বেশিরভাগ সময়, আপনার ফোনে একটি ভিপিএন ব্যবহার করেই করা যেতে পারে।

প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করতে, সেটিংস> ডেটা এবং স্টোরেজ> প্রক্সি সেটিংস।এবারে উইজ প্রক্সি এনাবেল করুন এবং প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য পূরণ করে দিন, ব্যাস। প্রয়োজনে সার্ভার সম্বন্ধীয় তথ্য অনলাইনে খুঁজে পেয়ে যাবেন।

১৬) হ্যাশট্যাগঃ টেলিগ্রামে হ্যাশট্যাগ সুবিধা উপলব্ধ, আপনি যদি হ্যাশট্যাগটি ট্যাপ করেন তবে সেই নামে করা আপনার সমস্ত পূর্ব লিখিত বার্তা গুলো সহজে খুঁজে পেয়ে যাবেন, যা অনুসন্ধান করা বা নিজের জন্য তথ্য শ্রেণীবদ্ধ করা অত্যন্ত সহজ করে তোলে।

১৭) গ্রুপের সদস্য সংখ্যাঃ হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে যেখানে সর্বোচ্চ ২৫৬ জন মাত্র মেম্বারকে যোগ করা যায়, সেখানে টেলিগ্রাম আপনাকে একটি গ্রুপে সর্বোচ্চ দুই লক্ষ সদস্যকে যোগ করার স্বাধীনতা দেয়।

১৮) এখানে আপনি নিজের নামে চ্যানেল খুলতে পারেন।

১৯) পিন পোস্টঃ গ্রুপ বা নিজস্ব চ্যানেলের জন্য জরুরী বার্তাগুলোকে পিন পোস্ট আকারে গ্রুপের শুরুতেই সেঁটে রাখতে পারবেন ফেসবুকের মতো। একটি মেসেজ আলতো চাপুন এবং এটিকে চ্যাটের শীর্ষে রাখতে পিনটি চয়ন করুন, যেখানে প্রত্যেকে সহজেই এটি উল্লেখ করতে পারে। আপনি যদি এডমিন হন, সেক্ষেত্রে যেকোনো মেসেজকে আপনি এডিট করতে পারবেন।

২০) এখানে ছবি বা ভিডিও খুললেই তা অটোমেটিক গ্যালারিতে জমা হয় না, যেটা আপনি গ্যালারিতে সেভ করতে চান অপসনে গিয়ে তা সেভ করলে তবেই তা সেভ হবে, নচেৎ নয়।

২১) গোপনীয়তা এবং সুরক্ষা নিয়ন্ত্রণঃ গ্রুপের মধ্যে আপনি নিজের অ্যাকাউন্টটি আরও ব্যক্তিগত করতে চাইতে তা অনায়াসেই করতে পারেন। গোপনীয়তার বিকল্পগুলি পরিবর্তন করতে, সেটিংস> প্রাইভেসি এন্ড সিকিউরিটি তে গিয়ে- কে আপনার ফোন নম্বর, এক্টিভ স্ট্যাটাস এবং আরও অনেক কিছু দেখতে পাবে আর কার থেকে লুকাবেন তা অনায়াসেই ঠিক করতে পারবেন।

২২) এছাড়া আপনি ফিঙ্গারপ্রিন্ট লক বা পাশওয়ার্ড লক করে আপনার অ্যাপটিকে সুরক্ষিত করতে পারবেন।

২৩) টেলিগ্রামের যেকোনো মিডিয়াকে সরাসরি যেকোনো অন্য মাধ্যম যেমন হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুক, ইমেল বা অন্য কিছু ক্ষেত্রে শেয়ার করার সুবিধা আছে সেটিকে ডিভাইসে ডাউনলোড না করেই।

২৪) লাইভ লোকেশন পাঠাতে পারবেন।

২৫) সর্বোপরি, অতিরিক্ত মেসেজের দ্বারা কোনো ব্যক্তি বা গ্রুপের দ্বারা বিরক্ত হলে আপনি অনায়াসে সেই চ্যাটবক্সটি থেকে লিভ না করে মিউট করে রেখে দিতে পারেন।

এছাড়াও আর অনেক অনেক আকর্ষনীয় ফিচার্স রয়েছে যেগুলোর খবর হয়ত আমি নিজেই জানি না, আপনি ব্যবহার করতে করতে আবিষ্কার করবেন।

উপরে বর্ণিত প্রতিবেদনটি পড়ে আশা করি এবার বুঝতে পেরেছেন কেনো টেলিগ্রাম ব্যবহার করবেন।

তথ্যঃ মেক ইউস অফ,
বাংলা নিউজ এইট্টিন

সম্পাদনাঃ তন্ময় মিস্ত্রী

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...