মঙ্গলবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৮

 


অষ্টম পর্ব


শ্রমজীবী ক্যান্টিন বা সুলভ মূল্যের সবজি বাজারের মতো মহতি কাজ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার একটা অংশে কিছু প্রচারণা করে নিজেদেরকে আশ্বস্ত করা যায় যে- ‘হ্যাঁ আমরা আছি বাজারে’; কিন্তু ক্ষমতায়নের জন্য ভোটের রাজনীতিতে তা যথেষ্ট নয়। মিছিলের ভিড় জেতার জন্য যথেষ্ট নয়, তাহলে বিহারে তেজস্বী জিতত আর নীতিশ কুমার হারত। শুধুমাত্র সৎ বলে, বৃদ্ধ নেতাদের চেয়ারে রেখে বিপ্লবও হয় না। তাঁরা নমস্য, ওঁনাদের নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করতে ভাল লাগে, লড়াই এর সেনাপতি হিসাবে তাঁরা যে অচল এটা না বুঝলে ভোটের বাক্সে কোনো সুফল অন্তত পাবে না এই নভেম্বর, ২০২০ এর পরিস্থিতিতে।

লেনিন, স্ত্যালিন, মাও, চে, ফিদেল, হো-চি-মিন প্রমুখ এনারা কেউ বৃদ্ধতন্ত্রের প্রতীক ছিলেন না। এবারে দেশের দিকে একটু নজর দিন- ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ ৪৮ বছর বয়সে দেশের প্রথম বামপন্থী মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। জ্যোতি বসু ৫৩ বছর বয়সে রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ৩৩ বছর বয়সে রাজ্যের পুর্ণ মন্ত্রী হয়েছিলেন। সূর্যকান্ত মিশ্র ২৮ বছর বয়সে অবিভক্ত মেদনীপুর জেলার সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছিলেন। অনিল বিশ্বাস ২১ বছর বয়সে পার্টি মেম্বার হয়েছিল, ৫৪ বছর বয়সে রাজ্য সম্পাদক। বিমান বসু ৩১ বছর বয়সে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হয়েছিলেন। হরেকৃষ্ণ কোনার ২৩ বছর বয়েসে পার্টি মেম্বার হয়েছিলেন, ৫৪ বছর বয়েসে রাজ্যের মন্ত্রী। মহঃ সেলিম ৩৩ বছর বয়সে রাজ্যসভার মেম্বার হয়েছিলেন, সৈফুদ্দিন চৌধুরী ৩২ বছর বয়সে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়েছিলেন। ভি এস অচ্যুতানন্দ ১৭ বছর বয়সে পার্টি মেম্বার হয়েছিলেন। আর কত উদাহরণ চাই!

এই তাজা রক্ত ছিল বলে বামেরা দেশে একটা শক্তি হিসাবে উঠে এসে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল, এখনকার পার্টি নেতৃত্বে আছে এমন তাজা রক্ত? ভক্ত কমরেডরা বলবেন- সায়নদীপ, ময়ূখ, মীনাক্ষী, সৃজন বা প্রতিকুর কি নেই রাজ্য কমিটিতে! সত্য হলো এরা কেউ রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নয় যাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। নতুনদের সুযোগ না দিলে তাদের থেকে কীভাবে আরেকটা অনিল বিশ্বাস, জ্যোতি বসু, সৈফুদ্দিন চৌধুরিরা জন্মাবে! হাস্যকর হলো এই তালিকাতে ফুয়াদ হালিমই নেই, অথচ দেশে বামপন্থী মুসলমান মুখের মধ্যে তিনি সুপরিচিত। তাই আগে ঘরে বিপ্লব করে নের্তৃত্বে বিপুল তাজা রক্ত আনতে হবে বঙ্গ বামেদের, তার পরে না হয় সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিস্টদের সাথে লড়াই করবে।

কারা বিজেপিতে বা অন্য দলে যাচ্ছে ও কেন যাচ্ছে, সেই খবরের আগাম সন্ধান লাগিয়ে যাবার আগেই বহিষ্কার করার সংগঠনটুকু নেই বামেদের। কোথাও একটা পার্টি অফিস দখল করার সংবাদে আনন্দ থাকুক, প্রত্যয় থাকুক, আত্মবিশ্বাস বাড়ুক, কিন্তু সেটাকে পাবার যোগ্যতা কতটা নিজেদের শক্তিবলে আর কতটা চালচোরেদের গোষ্ঠী কোন্দলের ফলে ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা’ সেটুকু বোঝার ক্ষমতা ফিরলে তবে সেই আনন্দের সার্থকতা।

তৃণমূল কংগ্রেস পরিস্থিতি আবার ভিন্ন ধরনের, মমতা ব্যানার্জী নিজেও জানেন না কে আমার দলে আর কে বিজেপিতে গেছে। ভোটের দিন ঘোষণার পর যদি বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থীর নাম মমতা ব্যানার্জী হয় তাতেও কিছু আশ্চর্যের নয়। গোটা তৃণমূল দলটাই ১০ বছর ধরে লাগামহীন দুর্নীতিতে ডুবে ছিল। তাদের কুচো, মেজো, বড় সব নেতাগুলো CBI, ED, IT দপ্তরের হাতে বন্দী হওয়ার ভয়ে বিজেপির ঘরে রোজ হাজিরা দিয়ে আসে। কিছুজন আবার লেজেন্ড, যেমন শুভেন্দু, রাজীব ব্যানার্জীরা; ‘ঠিকঠাক দর পেলেই যাইব’ মোডে আছে। অবশিষ্টগুলো আম্বানি আদানির থেকে কামানো বিজেপির টাকার থলির দিকে চেয়ে দিন গুণছে- “মেরা নাম্বার কাব আয়েগা!”

প্রশান্ত কিশোর- চোরেদের মাঝে ‘কম্বলের লোম বাছার’ কাজ ছিল তার। সে ভাবছে আমার ৫০০ কোটির শেষ কিস্তি পাই না পাই, তার আগেরটা পেয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরতে পারলেই জান বাঁচে, মান হারালেও সেটা অন্যত্র ম্যানেজ করে নেবে আগামীতে। তবে তারাও মিডিয়া সেল তৈরি করেছে, বিজেপিকে টক্কর দেবে। এ দিক থেকেও বামেরা ১০ বছর পিছিয়ে, ভারতবর্ষের অন্যতম ধনী রাজনৈতিক ক্যাডারভিত্তিক দল হয়েও পেশাদার IT Cell নেই। অতি উৎসাহী কিছু বাম সমর্থক নিজেরা ঘরের খেয়ে সমানে বিজেপি আর তৃণমূলের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ে যায়। ফেসবুক-টুইটারের মতো প্রো-বিজেপি সংস্থার বিরুদ্ধেই এদের লড়তে বাম-কংগ্রেসী সমর্থকদের, নিত্যদিন ব্লক ও ‘প্রোফাইল উড়িয়ে দেওয়া’র মতো এক অসম লড়াই। তবু তারা লড়ছে বলেই সোশ্যাল মিডিয়াতে বামেদের অস্তিত্ব টুকু আছে।

বাম বা কংগ্রেসের IT সেলের নামে যারা আছে এক আধাজন, তারা প্যারালাল ঘোঁট পাকাতে ব্যস্ত। দুদিন কয়েকটা বড় নেতার সাথে ছবি তোলা হলেই নিজেদের কক্সিসে এক্সট্রা লেজের উপস্থিতি টের পেয়ে যায়। ব্যাস, তখন তাদের জ্ঞানের নমুনা, ঔদ্ধত্য ও আঁতলামো দেখলে মনে হবে তারাই প্রশান্ত কিশোর বা অমিত মালব্যের শিক্ষাগুরু। আগেই বলেছি, বামেদের দ্বাপরযুগের নের্তৃত্ব আজও পুষ্পকরথে বিশ্বাসী, সুপারসনিক জেট প্লেনে তাদের কি যায় আসে! চেয়ারে বসে থাকার জন্য কি আর রথ লাগে না জেট প্লেন লাগে! প্রয়াত সোমেন মিত্র বা প্রদীপ ভট্টাচার্যরা অদৌ জানেন যে IT cell খায় না মাথায় মাখে!

বিজেপি অমিত মালব্য সহ বাকি প্রোপ্যাগান্ডা টিমকে কোলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছে। আশার কথা হলো প্রশান্ত কিশোর ফেল মেরেছে বাংলাতে, তার কোনও প্রজেক্টই চলেনি। মালব্যদের গুরুর এই হাল হলে মালব্য-আঁখিদাস কতটা সফল হবে তা যথেষ্ট সন্দেহের।

.....ক্রমশ

সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৭



সপ্তম পর্ব


দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসী বা বামেদের পক্ষে থাকা জনগণ যারা ২০১৯ সালে তৃণমূলের বিপক্ষে পদ্ম চিহ্নে ভোট দিয়েছিল, তারা কেউ বিজেপির আদর্শে অন্ধ ভক্ত হয়ে যায়নি। এরা শ্রেনীগতভাবে বিজেপির ভোটারই ছিলনা, তৃণমূলের অত্যাচারের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে ‘সিপিএম-কংগ্রেস’ সম্পূর্ন ব্যর্থ হওয়াতে এরা পদ্মে ছাপ পেরেছিল, বাঁচতে। সুতরাং এরা বিজেপি ছাড়া অন্যকে কখনও ভোট দেবে না এটা ভাবা মুর্খামি। যদিও বিজেপির পয়সা খেয়ে সংবাদের চ্যানেলগুলো বিজেপির পক্ষে আপনাকে এই হিসাবই কিন্তু দেখাচ্ছে ও দেখাবে।

কখনও ভেবেছেন- মুসলমান অধ্যুষিত রায়গঞ্জ, মেদনীপুর, মালদা ও বর্ধমান-দুর্গাপুর উত্তর কেন্দ্রে বিজেপি জিতেছিল কীভাবে? এছাড়া বর্ধমান পুর্ব, কুচবিহার, মালদা দক্ষিণ, জঙ্গিপুর, বসিরহাট, উলুবেড়িয়া, আরামবাগ, যাদবপুর, জয়নগর, তমলুক, ঘাটাল, বোলপুর, বীরভূম কেন্দ্র গুলোতেও বিপুল পরিমাণে মুসলমান ভোটার রয়েছে, এখানে বিজেপির দ্বিতীয় স্থানে থাকাটা আসলে বিজেপির জয় নয়- তৃণমূলের বিরুদ্ধে অনাস্থা। এই সব অঞ্চলের অন্তত ২০% মুসলমান বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল, নতুবা ভোটটা বিজেপিকে দিয়েছিলো কে?

তৃণমূলও বিজেপির ওই চূড়ান্ত হিন্দুত্ববাদী হাওয়াতে ৪৩-৪৪% ভোট ধরে রেখে দিয়েছে মূলত মুসলমান ও সেকুলার ভোটের উপরে ভর করেই, যারা এক সময় বামেদের খাস ছিল। বামেদের আর হারাবার কিছু নেই, এখন সামনে সবটাই প্রাপ্তিযোগ- যদি সদিচ্ছা থাকে। গ্রহণযোগ্য নতুন মুখকে সুযোগ দিলে বামেরা যে জমি ফেরাতে পারবে না এমনটা মোটেও নয়। ওদিকে অধীর চৌধুরীর নের্তৃত্বে কংগ্রেস কিছুটা হলেও সোমেন মিত্র বা প্রদীপ ভট্টাচার্যের আমলের চেয়ে যে চাঙ্গা হবে সেটাও সহজে অনুমেয়, আর যাই হোক অধীর অন্তত বিকিয়ে যাবেনা এই বিশ্বাস মানুষের আছে।

রাজ্যের CPIM তথা রাজ্য বাম নের্তৃত্ব এখনও ২০১১ এর হারের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সিপিএমই মূল দল, বাকিদের অবস্থা ততোধিক খারাপ।
সিপিএমের বুদ্ধদেববাবু আনুষ্ঠানিক ভাবে অবসর ঘোষণা করেছিলেন, বাকিরা ‘না তাড়াইলে যাব না’ মোডে রয়ে গেছেন পদ আঁকড়ে। দলে কিছু যুবকেরা যারা উঠে এসেছে স্বচেষ্টায়, তাদের চেষ্টার খামতি নেই স্বল্প পরিসরে, কিন্তু পার্টির প্রতিটি উচ্চপদে সেই মুখগুলোই রয়ে গেছে যাদের নের্তৃত্বে বামেরা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল।

শেষ ১০ বছর যাবৎ এই বৃদ্ধতন্ত্রেরই কঠোর অনুশীলনে ক্রমক্ষয়ে প্রান্তিক শক্তিতে এসে দাঁড়িয়েছে রাজ্য বামশক্তি। এই মুখগুলো যতদিন থাকবে ততদিন বামেদের ভাল হওয়ার জো নেই, এই বোধটা আসতেই হবে বাম সমর্থকদের মাঝে; তাতে যে যা খুশি যুক্তি দিক। খোদ মমতা ব্যানার্জীও চায় এই অথর্বেরাই থাকুক, তাতে তার পক্ষে সুবিধাজনক ক্ষমতায় টিকে থাকা। তথ্য বলছে, বামেদের নের্তৃত্বের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপনের জন্যই ১০% শক্তির বিজেপিকে রাতারাতি ৪০% তে পৌঁছে দিয়েছিল বামেদের পক্ষে থাকা ১৯% জনগণ, এদের অনুসরণ করেছিল কংগ্রেসের ৮% ভোটার।

বঙ্গ বামেরা আজও নভেম্বর বিপ্লব নিয়েই নভেম্বরের প্রথম দুটো সপ্তাহ ব্যস্ত ছিল। পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে USSR বললে যে শব্দের মানে ৯৯% মানুষ বুঝতেই পারবে ‘কিসের’ কথা বলছে। সেই ‘নেই রাষ্ট্রের’ প্রয়াত রাষ্ট্রপ্রধান যিনি পার্টি ক্লাসে নব্য কমরেডদের জন্য মূল্য রাখলেও, উনি আজকের সাম্প্রদায়িক শক্তির শাসানিযুক্ত বাংলা তথা ভারতের জনসমাজে কতটা যুক্তিযুক্ত- সেটা উপলব্ধি করতে শেখেনি। তাই আজও আসমানি পোলাও রেঁধে চলে কমরেডদের অধিকাংশ জন, অতএব লেনিন নামের ঘি ঢালতে কার্পণ্যের প্রশ্নই থাকে না। যোগ্য নের্তৃত্বের অভাবে ভোগা একটা দলে এমন পথভ্রষ্টতা অত্যন্ত সাধারণ বিষয়, আর লাগাতার এমন ‘কৃষ্টির চর্চা’ করার ফলস্বরূপ দিনে দিনে নিজেদের ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে তথাকথিত খেটেখাওয়া মানুষের কাছে।

আজকের বদলে যাওয়া ডিজিটাল পৃথিবীর একটা ক্ষুদ্র গন্ডীর মাঝেই নিজেদের বেঁধে নিয়েছে কমরেডদের ‘অধিকাংশ’ বাহিনী। এই গন্ডীতে নিজেরাই একে অন্যের পিঠ চুলকায়, গা শোঁকাশুঁকি করে, পিঠ চাপড়ে দেয়, যে পৃথিবীতে তারা ভিন্ন আর অন্য কেউ নেই।

এমনিতেই মেইনস্ট্রিম ভারতীয় মিডিয়া বামেদের পক্ষে কোনো গঠনমূলক সমালোচনা করেনা, যেখানে বামেদের নেতা-কর্মীরা আয়নায় নিজেদের মুখ দেখতে পাবে।
বামমনস্ক কেউ বামেদের সমালোচনা করলেই বামাতি আঁতেল গোষ্ঠী (পড়ুন ভক্ত) তাকে সর্বপ্রথমেই ‘স্বল্পজ্ঞানী’, ‘নির্বোধ’, ‘নিরক্ষর’ ও বামাদর্শ থেকে বিচ্যুত মনে করে ও করায়। সমালোচক যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশ্বাস রাখে, তাকে এরা সরাসরি বিরোধী শত্রু ভাবে। অতিবাম হলে তাকে শ্রেনিশত্রু বলে দায়িয়ে দেয়। আসলে সেই পিঠ চুলকানোর গল্প; সবাই বলতে চায়, কেউ শুনতে চায়না।

বস্তুত নিজেদের আয়নায় দেখতে এরা ভয় পায়, আসলে ময়দানে লড়াই না করেই তো নেতা হয়ে গেছে ‘কোটা’ সিস্টেমে, আতরের গন্ধ যাবে কীভাবে! কেউ মানুক বা না মানুক তাতে সত্য বা বাস্তব পরিস্থিতি বদলাবে না। বহু বাম সমর্থকের এই প্যারাগ্রাফ পড়ে আমাকে গালি দিতে পারেন, আসলে ভক্ত তো তারাই যারা বাস্তব ও তথ্য না বুঝে শেখানো কাগুজে বুলি আওড়ে যায় অন্ধবিশ্বাসে, আর বামেদের মাঝে কিছু শতাংশ ভক্ত নেই এমনটা দাবী পলিটব্যুরোও করে না।

...ক্রমশ

রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০

হায়দ্রাবাদ, মিম ও বাস্তবতা



হায়দ্রাবাদ পুরসভার ফলাফল বলছে সেখানে মিম কনটেষ্ট করা ৫১টার মধ্যে ৪৪টা জিতেছে, কিন্তু বিজেপি ৪৮টা আসনে জিতেছে চন্দ্রশেখর রাও এর TRS কে ধরাশায়ী করে। মিম ও কংগ্রেস যে যেখানে ছিল সেখানেই আছে TRS এর ৪৪টা এবার বিজেপির ঝুলতে চলে গেছে।

অঙ্কটা সোজা, এই চন্দ্রশেখর রাও, চন্দ্রবাবু নাইডু, প্রফুল্ল মোহান্ত, সুখবীর সিং বাদল, মেহবুবা মুফতি, নবীন পট্টনায়ক, জয়ললিতা, নীতিশ কুমার, মমতা ব্যানার্জী, এরা সবকটা সংখ্যালঘু মুসলমান প্রেমীর ভেকধরা RSS এর দালাল, যারা বিজেপির ভূমি তৈরি করেছিল নিজ নিজ রাজ্যে সঙ্ঘের সংগঠন ব্যবহার করে।

কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে থাকতে ভুলেই গেছিল যে RSS এর নিজস্ব রাজনৈতিক দলের নাম BJP, সুতরাং জো ধরা জমিতে দালালদের কাজ কি, তাই হায়দ্রাবাদ পুরসভায় দালাল TRS কে খেয়ে নিয়েছে সঙ্ঘ, ফুটেছে পদ্ম। কাল তৃণমূলেরও এই দশাই হবে এটাকে আগাম অনুধাবন করে মমতা ব্যানার্জী কিছু তৃণমূলপন্থী মুসলমান ভক্তকে বাজারে ছেড়ে রেখে ‘BJP খারাপ তৃনমূল ভালো’র সাথে ‘মিম সাম্প্রদায়িক’ বলে উদোম চেঁচাচ্ছে।

মিম নিশ্চিত সাম্প্রদায়িক এতে কারো সন্দেহ নেই, কিন্তু তৃণমূল যে ২১ বছর ধরে বিজেপিকে লালন করে গেল কখনও মন্ত্রীসভায় থেকে কখনও RSS এর দালাল হিসাবে, সে কি তাহলে? আসলে পাব্লিক জেনে গেছে ‘বিজেমূল’ জুটি আসলে RSS এর গোয়ালে এক গোঁজেই বাঁধা। মিম অন্তত RSS এর দালাল গুলোর মতো মেকি সেকুলার পোশাক পরে নেই; স্বভাবতই, মিম এরাজ্যে জন্মাবার আগেই তৃণমুলীদের রাত্রের ঘুম হারাম করে রেখেছে TRS এর দশা হবার ভয়

শনিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২০

কবে খুলবে ইস্কুল?



আসলে সরকারি অবরোধ আজকাল অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে। কয়েকজন মুর্খ মিলে শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে প্রায় লাটে তোলার যোগাড় করে দিয়েছে, যাদের আমরাই ক্ষমতায় বসিয়েছি। চোরাবালির ফাঁদে আঁটকা পড়ে গেছি আমরা, প্রতিটা মুহূর্তে একটু একটু করে ডুবে যাওয়াই নিয়তি।


এ অবস্থায় একে অন্যের হাত ধরাধরি করে না চললে আমাদের আগামী বলে আদৌ কিছু থাকবে না। সুতরাং সত্যজিতের কথা ধার করে বলাই যায়-

“না না না না
আর বিলম্ব নয়
আর বিলম্ব নয়
আর বিলম্ব না না
আর বিলম্ব নয়
এখনো মোদের শরীরে রক্ত
রয়েছে গরম, মেটেনি শখ তো
আছে যতো হাড় সবই তো শক্ত
এখনো ধকল সয়
এখনো আছে সময়
এখনো আছে সময়
আর বিলম্ব নয়
আর বিলম্ব না না
আর বিলম্ব নয়”

বাস্তব বলছে- ট্রাম্প হেরে যেতেই করোনা গায়েব, শুধু ভ্যাক্সিনের কারবারিরা জিইয়ে রেখেছে করোনা ভীতি। দেশের সমস্ত কিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বাজার-হাট, শপিং মল, যানবাহন, সিনেমা হল, ধর্মস্থান, কীর্তন-জলসা, মদের ঠেক, রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল, পিকনিক, ভ্রমণ, ক্রিকেট-ফুটবল সব হচ্ছে; সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীরা অফিস যাচ্ছে ভিড় ঠেলে, ব্যবসায়ী সফর করছে, কৃষকেরা আন্দোলন করছে, সরকার দমন করছে, আম্বানি-আদানি দেশ কিনছে, তারা রোজ গুণিতক হারে ধনী হচ্ছে, আলু-পেঁয়াজ-সরষের তেল সহ নিত্য পণ্যের দাম আকাশ ছুঁচ্ছে, দেশ বিদেশে আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে, সর্বত্র চুটিয়ে বিকিকিনি আনাজ হোক বা MLA, চাষীরা কাজ করছে শস্য হোক বা ঘৃণা, অটোওয়ালা ৬ জন প্যাসেঞ্জার তুলছে, পুলিস ঘুষ খাচ্ছে, থিকথিকে ভিড় বাসের খালাসি গেটের মুখ থেকে ঝুলে ঝুলে চেঁচিয়ে যাচ্ছে ‘ভিতরে ফাঁকা সেখানে যান’, সেনারা যুদ্ধ করছে সীমান্তে, উকিল দিন গুণছে, ডাক্তার ছুরিতে শান দিচ্ছে; সবই হচ্ছে গতানুগতিক ধারায় সাবলীলভাবে- শুধু ইস্কুল খোলা যাবে না।

- “ওরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে” এবং “জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই”

পাঠশালা কখনই শাসকের পক্ষে সুখকর নয়, তা কল্পিত হীরক রাজ্য হোক বা বাস্তবের ভারতভূম- এ সত্য আবার প্রমাণিত। বিশ্বে অধিকাংশ দেশে স্কুলিং চালু হয়ে গেছে আর ৪-৫ মাস হতে চলল। আমাদের পড়শি দেশ সহ অনেক দেশ আছে যাদের ইস্কুল-কলেজ বন্ধই ছিল না, তারাও আমাদের মতো এমন জনবহুল রাষ্ট্র, সেখানে শিশু মড়ক লেগে গেছে? প্রতিটি উন্নত দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে, খোদ আমেরিকাতেও চালু।

তবে কোনো কোনো শিক্ষিত রাষ্ট্রপ্রধান আছে, যারা বলতে পারে-
“We cannot and will not allow our children and young people’s futures to be another victim of this disease,”
- Irish prime minister ‘Micheál Martin’

তাই এভাবে আমাদের বাচ্চাদের ইস্কুল বন্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন নাগরিক সমাজ। আজকের সরকার কাল চলে যাবে, ক্ষমতাবানেরা তাদের সময় চুটিয়ে উপভোগ করে নিয়ে তারাও হারিয়ে যাবে, মাঝখান থেকে আমার আপনার ঘরের বাচ্চাটি পড়াশোনার অভ্যাসটাই ভুলে যাবে বা গেছে। নতুন করতে আবার অভ্যাস করতে অনেকের গোটা বছর লেগে যেতে পারে, আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান গবেষকের দলের দাবী এটা। কত বাচ্চা যে ইস্কুলে ফিরবে না তার কোনো হিসেব-নিকেশ আছে আমাদের সরকারের কাছে? অর্থনৈতিক মন্দায় তারা বাধ্য হয়ে শিশুশ্রমিক হয়ে পেটের ধান্দায় লেগে পড়েছে। সুতরাং সকল খারাপ ফলাফল বাচ্চাটিকেই ভুগতে হচ্ছে ও হবে।

আমাদের সরকার ও বিরোধী দলগুলো ধর্ম, হিন্দু-মুসলমান, ভোট আর ক্ষমতা দখলের বাইরে কোনো অ্যাজেন্ডা রাখেনি তা কেন্দ্র হোক বা রাজ্যগুলো। মিডিয়াও হিন্দু-মুসলমান, পাকিস্তান, ক্রিকেট, আর সেলিব্রিটিদের কেচ্ছা-কাহিনীর বাইরে বেরোবে না বলে ঘোষিত পণ করে রয়েছে। এ অবস্থায় আমি আপনি ছাড়া কেউ বলবে না, কারণ আমার আপনার সন্তান মূর্খ থাকলে মিডিয়া বা নেতাদের কিচ্ছু যায় আসে না। নেতার কাছে শিক্ষিতর ভোটের মূল্য অশিক্ষিতের সমানই। মিডিয়া বোঝে বাজারে ‘কী খাবে’, এর সাথে শিক্ষার সংযোগ নেই।

অতএব, নিজের জন্য আওয়াজ তুলুন, এখনই।

করোনার ভয় আর সেভাবে পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। ভ্যাক্সিনের কারবারিদের ভয়ের আবহ জিইয়ে রেখে ভ্যাক্সিন বেচে মুনাফা কামাবার স্বপ্নে জল পড়ে গেছে আপাতত। ‘অক্সফোর্ড-সিরাম-গেটস’ গোষ্ঠী এখন সরাসরি মূর্খ সরকারকে টার্গেট করেছে বিনিয়োগ তুলতে। ১০০ কোটি মানুষকে টার্গেট করে ভ্যাক্সিন বিক্রির চেয়ে ডাইরেক্ট সরকারকে বেচলে একলপ্তে মুনাফা কামানো অনেক সহজ। এতে নেতাদেরও ইন্টারেস্ট আছে, তাদের পার্টি তহবিল ফুলে ওঠার পাশাপাশি অনেকের বালবাচ্চা-ভাইপো-ভাগ্নেরা কয়েক প্রজন্ম বসে খাবে কাটমানির দয়ায়। তাই ভ্যাক্সিন বাজারে এলে আপনাকে সরকারই দিয়ে দেবে, তার স্বার্থ আছে সেখানে।

এরপর লোকাল ট্রেনে দাদ-হাজার মলমের সাথে করোনা ভ্যাক্সিন ফেরি করতে দেখলেও দেখতে পারেন। খুচরো না থাকলে আজকাল শপিং মলে লজেন্স টফি দেয়- কাল হয়ত এক ড্রপ করোনার ভ্যাক্সিন দেবে খুচরোর পরিবর্তে।

আপনার বাঁচামরা আপনার দায়, আপনার শিশুর ভবিষ্যৎ আপনার দায়। করোনা আপাতত গেলেও ভ্যাক্সিনের পিছনে টাকা লাগানো পুঁজিবাদী হাঙরেরা যাবে না, তাদের অতৃপ্ত আত্মা আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখে মহামারীর গুজব ছড়াবে। তারা আবার ২০২১ এর শীতে করোনা জুজু ফিরিয়ে আনবে। কদ্দিন সন্তানকে ঘরে বসিয়ে রাখবেন?

দুটো সমান উচ্চতার লাঠিকে কীভাবে অন্যটির চেয়ে একটিকে বড় করবেন? সোজা হিসাব- একটিকে ভেঙে ছোট করে। আপনার সন্তান শিক্ষায় পিছিয়ে গেলে কিম্বা শিক্ষা ছুট হয়ে গেলে প্রতিযোগী দেশগুলোর লাভ। আমাদের অশিক্ষিত, গাম্বাট, মূর্খ ও মিথ্যুক রাজেনেতাগুলোর এটা বোঝার ক্ষমতা নেই, তারা ক্ষমতা দখলের রাজনীতি করতেই ব্যস্ত। সুতরাং, মহামারী আসার হলে সে আপনাকে ঠিক খুঁজে নেবে, বাঙ্কারের নিচেও। এক্ষেত্রে ভাইরাস আমাদের বাচ্চাদের ক্ষতি করুক বা না করুক- অশিক্ষা মহামারী হবে এভাবে চললে, তার থেকে কোন ভ্যাক্সিন বাঁচাবে?

কল্পনার হীরক রাজ্যে তবু একটা উদয়ন পন্ডিত ছিল, এই বধিরের রাজ্যে কেউ কি পন্ডিত বেঁচে নেই যিনি চেঁচিয়ে সত্য বলতে ভয় পান না? নাকি উদয়ন পন্ডিতেরই মগজধোলাই হয়ে গেছে? জানি উত্তর দেওয়ার কেউ নেই, গুন্তিতে অগুন্তি ‘Teacher’ থাকলেও তারা সিংহভাগই মেরুদন্ডহীন। কিছুজনের মুখে বুলি আছে, অবশ্য তারা ভোটের ডিউটিতে যাব না আর প্রাপ্য DA চাই আন্দোলনে ভীষণ ব্যস্ত। ইস্কুল খোলার বিষয়ে কেউ নেই, অথচ ফেসবুকে শয়ে শয়ে ‘টিচার গ্রুপ’, DA, মিউচুয়াল ট্রান্সফার, মজলিশি আড্ডা, গেট্টু প্রোগ্রাম আর শখের কাব্যচর্চার বাইরে সময় কোথায় বাকি কিছু নিয়ে ভাবার?

স্যার/ম্যাডাম আপনাকে বলি, আপনারা তো শিক্ষক, পথপ্রদর্শক। দেশের আগামী প্রজন্মকে আপনারাই তো শেখাবেন- আসুন না, আরেকবার এগিয়ে আসুন। বলুন না চেঁচিয়ে সকলকে, কোনটা সত্য কোনটা মিথ্য। দেশ-বিদেশের তত্ত্ব, তথ্য, প্রবন্ধ, প্রতিবেদন, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, চিকিৎসা বিজ্ঞান, WHO ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্বন্ধে তো পড়ছেন, শুনছেন, জানছেন- কতকগুলো উন্মাদের কান্ডকারখানার বাইরে অন্য কিছু মনে হয়েছে তাদের দেখে?

দুর্ভাগ্যক্রমে যদি না পড়ার সৌভাগ্য হয়ে থাকে তাহলে নিচে ইউনিসেফ সহ বেশ কিছু লিঙ্ক দিলাম, দয়া করে পড়ে নিন। খোদ ইউনিসেফ বলছে বাচ্চাদের ইস্কুলে পাঠান স্বাস্থ্যবিধি মেনে, পড়ুন সেটা। কত মেয়েবাচ্চা আর ইস্কুলে ফিরবে না সেই প্রতিবেদন পড়ুন, কেমব্রিজের গবেষকের থিসিস পড়ুন। জানুন- ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, কানাডা, পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়া কোথাও আর ইস্কুল বন্ধ নেই। অনলাইনে শিক্ষা ব্যবস্থা হবে না আমাদের মতো গরিবের দেশে। প্লিজ বলবেন না আবার- “ইংরাজিটা আমার ঠিক আসে না…”। ছেড়ে দিন, এক আধটা বাংলাও দিলাম ‘ট্যাঁকের জোরে’ যারা চাকরি পেয়েছেন তাদের জন্য।

পড়ার পরে বলুন- কেন এখনও আপনারা চুপ রয়েছেন?

আপনাদের যদি ভাল আর মন্দের বোধ না জন্মায় কীসের শিক্ষক আপনারা? ছাত্রদের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকুক বা না থাকুক আপনার নিজের কর্মের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখিয়ে এখনই প্রতিবাদের সাহস না পেলে আপনাদের সাথে পুরসভার সাফাই কর্মচারি ভাই-দিদিটির পার্থক্য কী? দুজনেই পেটের দায়ে চাকরি করেন, এটাই মিল। পৃথিবীতে কোন সরকারি-বেসরকারি কর্মচারি গোষ্ঠী আজকের দিনে ঘরে বসে আছে বা নাম কা ওয়াস্তে এক আধাদিন ‘ঘরেই তো বসে আছি, যাই একটু ঘুরে আসি’ মনোভাবে হাওয়া বদল করে আসেন একঘেঁয়েমি কাটাতে।

সামাজিক স্খলন, সরকারি কর্মকর্তা সহ রাজনেতাদের দুর্নীতি বিষয়ে আপনাদের সমাজের মুখে কুলুপ কয়েক দশকের ঐতিহ্য, তাই ওই বিষয়ে আপনাদের থেকে কেউ কিছু আশা করে না। কিন্তু DA নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি ইস্কুল খোলা নিয়েও দু'চার কথা বলুন, ওটাই তো আপনার কর্মস্থল স্যার/ম্যাডাম।

সরকার বদলালে DA পাবেন, হয়ত বা এই সরকারই দেবে তা আদালতের রায়ে- কিন্তু দীর্ঘদিন কিন্তু বসে মাইনের সুখ থাকবে না স্যার-ম্যাডাম। যারা DA দেয় না, দীর্ঘদিন চাকরি দেয় না- তারা যে চাকরি খেয়ে নেবে না তার গ্যারান্টি কে দিয়েছে আপনাকে? সেদিন আপনিও প্রতিবাদ করতে চাইবেন, চিৎকার করবেন যন্ত্রণায়- কেউ শুনবে না সেদিন।

তাই সময় থাকতে শুভবুদ্ধি জাগ্রত করুন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলুন- আমি শিক্ষক। আমিই তো শেখাব ভাল ও মন্দের ফারাক। দেখবেন অনেক ফুরফুরে লাগছে। আর বসে মাইনে পাওয়ার সুখে ‘ঝামেলা এড়িয়ে’ যদি শীতে পিকনিকের প্ল্যান করেন কাজ নেই বলে- জানবেন ইতিহাসের থাপ্পড় কিন্তু নির্মম।

আমরা আজও স্বপ্ন দেখি, কোনো এক উদয়ন পন্ডিত এখনই বলে উঠবে – “দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খানখান”। রাজা খানখান না হোক, তার পাঠশালা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত খানখান হয়ে আবার শ্রেণীকক্ষগুলো ভরে উঠুক কচিকাঁচা ফুলে, শিক্ষার মধু আহরণে। শিক্ষকেরা আবার গড়ে তুলুক জাতিকে, যে জাতির মাঝে মেরুদন্ড থাকবে, শতসহস্র উদয়ন পন্ডিতে ছেয়ে যাক সমাজ।

পুনশ্চঃ- আমার কথা তেতো লাগলে আমাকে মার্জনা করার দরকার নেই, আমি অসভ্যই রইলাম। ‘আমি ও আপনি’ আমরা কেউ কারো প্রত্যাশী নই- তাই আমাকে নিয়ে নাই বা ভাবলেন। বরং, আপনারা আপনাদের কর্মস্থল বা আপনার শিশুর শিক্ষাস্থল খুলিয়ে পঠন-পাঠন চালুর জন্য আন্দোলনটা করুন। হওয়া না হওয়া সরকারের হাতে, কিন্তু নিজেরা নিজেদের কাছে সৎ থাকুন, যেমন আমি আমার কাছে রইলাম এই লেখাটা লিখে।

ধন্যবাদ।

১) https://www.nytimes.com/.../europes-locked-down-but...
২) https://indianexpress.com/.../coronavirus-lockdown-back.../
৩) https://www.firstpost.com/.../schools-reopen-after...
৪) https://www.newindianexpress.com/.../no-plan-to-close...
৫) https://www.washingtonpost.com/.../9047be8c-a645-11ea...
৬) https://www.timesofisrael.com/school-is-back-in-session.../
৭) https://www.unicef.org/.../supporting-your-children...
৮) https://www.devex.com/.../many-girls-won-t-go-back-to...
৯) https://www.cambridge.org/.../back-to-school-specific.../
১০) https://bengali.indianexpress.com/.../coronavirus.../
১১) https://www.prothomalo.com/.../%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6... 

 #standwithstudents

#Reopen_school_college
#হককথন

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৬


 

ষষ্ঠ পর্ব


উপরোক্ত সকল তথ্যমতে কোন উদগাণ্ডু বিশ্লেষক মিমকে বিজেপির দালাল বলে দাবী করতে পারে অন্তত এই বিহার পর্যায়ে? আসলে কংগ্রেস জাতীয় ক্ষেত্রে মিমের উপরে দায় চাপিয়ে নিজেদের সংগঠন না থাকার ব্যর্থতা ও হারের দায় চাপিয়ে খালাস হয়েছে। বিজেপিও মিমকে ‘ভোট কাটুয়া’ হিসাবে প্রচার করে প্রমাণ করতে চাইছে যে মুসলমানেরা সর্বত্র একজোট হয়েছে, অতএব ‘হিন্দু খতরেমে হ্যাঁয়’। এতে করে অন্য যেসকল রাজ্যে আসন্ন ভোট আছে, সেই সকল রাজ্যের মুসলমানেরা বিভ্রান্তিতে পড়ে যাচ্ছে যে, “সত্যিই যদি গোটা ভারত মিমের পক্ষে যায়, আমরা কি দলছুট হয়ে যাচ্ছি”! এ এক চরম মানসিক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার মাঝে ফেলে দিয়েছে মুসলমানেদের। আর এই কাজে কিছু নামধারী মুসলমানই বিজেপির কাজকে সোজা করে দিচ্ছে মিম বিরোধী প্রচার করে।

জাতপাতের নিরিখে হওয়া ভোটের প্রসঙ্গে বিহারের জাতপাতের তথ্যে নজর রাখলে দেখা যাবে-

যাদব OBC- ১২%,
কুর্মি OBC - ৪%,
কুশাওহা, কৈরি, কাছি, মুরাও OBC - ৮%
তেলি OBC - ৩%
৭১টি ক্ষুদ্র EBC/ OBC জাতি- ২৫%
মহাদলিত দুষাদ- ৫%
মহাদলিত চামার- ৫%
মহাদলিত মুশাহার- ৩%
অন্যান্য মহাদলিত- ২%
ব্রাহ্মণ (উচ্চবর্ণ)- ৪%
ভূমিহার (উচ্চবর্ণ)- ৬%
ক্ষত্রিয় (উচ্চবর্ণ)- ১%
রাজপুত (উচ্চবর্ণ)- ৩%
কায়স্ত (উচ্চবর্ণ)- ১%
আদিবাসী- ১.৩%
খ্রিস্টান, জৈন, বৌদ্ধ অন্যান্য সংখ্যালঘু- ০.৪%

মুসলমান হচ্ছে ১৭%

সুতরাং বহুভাগে বিভক্ত মনুবাদী হিন্দু সমাজের মাঝে সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু মুসলমানেরাই। ৪% ব্রাহ্মণ ও বাকি ১১% উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করা RSS যদি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি করতে পারে, অবশ্যই ওয়াইসি-আজমলদের মুসলমানবাদী রাজনীতি করার অধিকার আছে। RSS নিজের সুবিধার্থে AIMIM বা AIUDF দের বাজারে নামিয়ে লেজ কাটা শেয়ালের মতো জাতপাতভিত্তিক রাজনীতির চর্চাকে গতি দিয়েছে।

মোদীজির সৌজন্যে আজকের অখন্ড মানচিত্র যদি না বদলে যায়, তাহলে আগামী দিনে লেবাননের মতো ধর্মকেন্দ্রিক প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

RSS নিজে যুক্তিহীন উগ্র ধর্মান্ধ রাজনীতি করে ভোটের মেরুকরণ করে, এদের মুখ্য রাজনৈতিক দল বিজেপি। কিন্তু প্রতিটি রাজ্যে এদের একটা করে ‘নরম হিন্দুত্ববাদী’ দল আছে। যে সকল জনগণের প্রকাশ্যে উগ্র ধর্মীয় রাজনীতি করতে চক্ষুলজ্জা লাগে RSS এর এই B-Team গুলো তাদের জন্য উগ্র হিন্দুত্ববাদীতার প্রাথমিক ইস্কুল। তৃণমূল কংগ্রেস এদেরই একজন, নতুবা সদ্য দল গঠন করা তৃণমূল ১৯৯৯ সালের লোকসভা ভোটে যাওয়ার সাহস ও অর্থের উৎস কী ছিল! বিজেপিতে যাওয়ার দুটোই রাস্তা, সরাসরি RSS থেকে অথবা ভায়া তৃণমূল। দু’একটা বাম বা কংগ্রেসী যে বিজেপিতে যাচ্ছে না এ রাজ্যে তা নয়, কিন্তু তা নিতান্তই ব্যতিক্রম। বিজেপির নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবাদর্শ আছে তা আপনি পছন্দ করুন বা বিপক্ষে থাকুন, বামেদেরও তা আছে, কিন্তু তৃণমূলের এ সকল বালাই নেই। তাদের জন্মটাই কংগ্রেস থেকে সুবিধাবাদী হিসাবে, এই জন্যই এদের বিজেপিতে যাওয়াটা কোনো সমস্যা হয় না।

তৃনমূলের ২১ বছর অতিক্রান্ত তার মধ্যে ১০ বছর ক্ষমতায়। তৃণমুল কংগ্রেসের হাত ধরে বাংলার বুকে ছাপ ফেলা বিজেপির আর দরকার নেই তাকে, সে নিজেই ক্ষমতায় ফিরতে চায় একা। বস্তুত গোটা ভারত জুড়েই এই মধ্যস্বত্তাভোগী দালাল B-Team দলগুলোকে আর দরকার নেই RSS এর, টিভি মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে নব্য ভোটারদের নিয়ন্ত্রণ করা এখন অনেক সোজা। এর বাইরে অঙ্ক কষে কীভাবে ভোটের ভাগাভাগি করে জিততে হয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বিহার নির্বাচন, উন্নয়নের দিক থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরেও তারা জিতেছে। তাই RSS এবারে অলআউটে খেলতে নেমেছে। উত্তরপ্রদেশের পর বিহারেও মুসলমান বিহীন মন্ত্রিসভা গঠন করে বাংলা ও আসামের সুর বেঁধে দিয়েছে।

এই মতো রাজনৈতিক চিত্রনাট্যে ২০২১ এর ভোট যে কারোর জন্যই ‘সুবিধার’ হবে না তা বলাই বাহুল্য। এই সকল হরেক ফ্যাক্টরের মাঝে মিম এসে জুটলে পরিস্থিতি কী হতে পারে! তার আগে দেখে নেওয়া যাক সাম্প্রতিক অতীতের পরিসংখ্যান- ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল পেয়েছিল ৪৩.৬৯%, বিজেপি ৪০.৬৪%, বামফ্রন্ট- ৬.৩৪% ও কংগ্রেস ৫.৬৭%। কিন্তু ২০১৬ সালের শেষ বিধানসভা নির্বাচনে এই অঙ্কটা ছিল- তৃণমূল ৪৪.৯১%, বামফ্রন্ট- ২৫.৬৯%, কংগ্রেস ১২.২৫%, বিজেপি ১০.১৬%। পঞ্চায়েত, পুরসভা বা উপনির্বাচনের ভোট করতেই দেয়নি তৃণমূলের উন্নয়ন বাহিনী, তাই এই সকল ভোটের হিসাবের কোনো দাম নেই।

‘চাণক্য’ নামের একটি সমীক্ষা সংস্থা দেখিয়েছিল যে পশ্চিমবাংলার প্রতিটি ভোটের ‘টার্ণ আউটের’ (প্রদত্ত ভোট) হিসাবে মুসলমান ভোট অন্তত ৩৯.৭৭%, যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা ২৭.২%। হিসাব পরিষ্কার, হিন্দু সম্প্রদায়ের চেয়ে মুসলমানেদের মাঝে ভোট দানের প্রবণতা অনেকটাই বেশি। এদের সাথে প্রতি বছর বিপুল হারে নতুন যুবসমাজ যুক্ত হচ্ছে ভোটার তালিকাতে, এরা কোন পক্ষ কেউ জানে না। মাত্র ১% ভোটের সুইং ফলাফল উল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

সুতরাং তৃণমূলকে ভোট না দিলেই বিজেপি এসে যাবে এটা একটা নিখাদ মিথ্যা অপপ্রচার।

শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২০

বাবু রন্তিদেব ,আইটি অপপ্রচার ও একটি নিরীহ ভ‍্যাকসিন

 


এবছর যখন দেশীয় কোভিন-১৯ প্রতিষেধক কোভ‍্যাক্সিনের ট্রায়াল শুরু করেছিল আইসিএম‌আর ,তখন পূর্ব ভারতে প্রাথমিকভাবে পটনায় টীকাটির ট্রায়াল ডোজ গ্রহণের সুবিধা ছিল।পশ্চিমবঙ্গের আবেদনকারী হিসেবে  দুর্গাপুরের একটি প্রাথমিক বিদ‍্যালয়ের শিক্ষক চিরঞ্জিত ধীবর এ রাজ‍্য থেকে তখন টীকাটির ডোজ নেওয়ার সুযোগ পান আবেদনকারীদের মধ‍্য থেকে।যদিও পরবর্তীতে ভুবনেশ্বরে গিয়ে তাঁকে টীকাটির ডোজগুলি নিতে হয়েছিল।স্বাভাবিকভাবেই এই মানবিক উদ‍্যোগটি  যথাযথ প্রচার পেয়েছিল,এমনকী ভারত সরকারের নিজস্ব প্রচারযন্ত্র পিআইবি(প্রেস ইনফরমেশন ব‍্যুরো)ও ফলাও করে ওই সংবাদটি প্রকাশ করেছিল।

অতি সম্প্রতি কোভ‍্যাক্সিনের ট্রায়াল এ রাজ‍্যেও শুরু হয়েছে।আর তার প্রথম ডোজটি নিয়েছেন রাজ‍্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম,যিনি কলকাতা পুরনিগমের বর্তমান প্রশাসক‌ও বটে।

স্বভাবতই মিডিয়িকুল‌ও এই ঘটনা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই প্রচার করছে।

কিন্তু এই নিয়ে বিজেপির সেই বিখ‍্যাত আইটি সেলের ঢঙে অশ্বত্থামা হত ইতি কুঞ্জর স্টাইলে খেলা শুরু করলেন বর্তমান পত্রিকার একদা প্রখ‍্যাত সাংবাদিক ,বিজেপির টিকিটে লোকসভা ভোটে প্রার্থী হিসেবে পরাজিত তথা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের নিজস্ব মুখপত্র 'স্বস্তিক'(বাংলা সংস্করণ)এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক রন্তিদেব সেনগুপ্ত।

তিনি বলছেন--- এরাজ‍্য থেকে কোভ‍্যাক্সিনের প্রথম ডোজ নিয়েও  চিরঞ্জিৎ ধীবর কোনও প্রচারে আসতে চাননি,কিন্তু ফিরহাদ হাকিমের টীকার ডোজ নেওয়া নিয়ে সুকৌশলে  প্রচার চলছে। ব‍্যস এই পোস্ট হুড়মুড়িয়ে বিজেপি সমর্থক রা শেয়ার করছেন।

প্রকৃত ঘটনা: 

দেশীয় টীকা কোভ‍্যাক্সিনের প্রথম ট্রায়াল(তখন এরাজ‍্যে ট্রায়াল চালায়নি আইসিএম‌আর) ‌এরাজ‍্য থেকে প্রথম নিয়েছিলেন চিরঞ্জিৎ ধীবর‌ই।চিরঞ্জিত বাবুকে নিয়ে ও প্রচুর প্রচার হয়েছিল।উল্লেখ‍্য চিরঞ্জিত বাবু আর‌এস‌এসের সক্রিয় সদস‍্য ও কিছুদিন আগে দুর্গাপুর অঞ্চলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে বিজেপির টিকিটেই লড়েছিলেন।

আর এরাজ‍্যে যখন আইসিএম‌আর ও ভারত বায়োটেক রাজ‍্য সরকারের সম্মতিতে কোভ‍্যাক্সিন টীকার‌ই এই রাজ‍্যের জন‍্য ট্রায়াল চালু করল,তখন এরাজ‍্যের ট্রায়ালে ফিরহাদ হাকিম প্রথম ডোজ নিলেন।

এই ঘটনাকে নিয়েই রন্তিদেববাবু আইটি প্রচারটি যে উদ্দেশ‍্যে চালাচ্ছেন,তার অভিমুখ কোন দিকে তা বিজ্ঞ পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন!

এরকম আইটি অপপ্রচার রোধে আপনিও সদর্থক ভূমিকা রাখবেন,রাজনৈতিক রঙ নির্বিশেষে--এই আশা রাখি।


লেখাঃ তন্ময়

বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৪



চতুর্থ পর্ব


হায়দ্রাবাদে মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণ, মহারাষ্ট্রের মালেগাঁওতে বিস্ফোরণের সাথে মোদী মিডিয়ার লাগাতার মিথ্যা ঘৃণা সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন, মব লিঞ্চিং, বিজেপি-RSS নেতাদের বিষাক্ত ভাষণ সহ নানা কারণের ফলে মুসলমান সমাজ ক্রমেই একঘরে হয়ে গেছিল। আন্তর্জাতিক ভাবে সারাক্ষণ ইসলামোফোভিয়ার চাষে প্রতিটি ভারতীয় মুসলমান নিজ ভূমেই যখন অবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল – মিডিয়া জুড়ে ভিক্টিম হয়ে উঠেছিল, স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাছে একটা ত্রাতার প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল।

এমনিতে ইসলামে কাস্ট সিস্টেম না থাকলেও, সিয়া সুন্নি, ওয়াহাবি, সহ বেশ কিছু বিভেদ তো আছেই, একে কীভাবে কেউ অস্বীকার করবে! এছাড়া হরেক পীরপন্থীদের আলাদা আলাদা মাজহাব বা উপদল, সেখানে ‘নরেন্দ্র মোদীর’ মতো হিন্দু হৃদয় সম্রাট হয়ে কোনো মুসলমানের মুসলমান হৃদয় সম্রাট হয়ে উঠে আসা অসম্ভব ছিল।

কংগ্রেসের বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, সেখানেই RSS সুকৌশলে মিমকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ‘কংগ্রেস মুক্ত’ ভারতের লক্ষ্যে, আসামেও এটাই করেছিল বদরুদ্দিন আজমলকে দিয়ে। আগামীতে বাংলাতে ফুরফুরার পীরবেশী দালালগুলোকে দিয়েও এই খেলা খেললে আশ্চর্যের কিছু নেই, কারণ তারা অনেকেই মুকুল রায় ঘনিষ্ঠ।

২০১৪ পরবর্তী সময়টা একটা লাইনে বললে দাঁড়ায়- দেশজ রাজনীতিতে বিজেপির নেতা মন্ত্রীদের ক্রমাগত মুসলমান বিদ্বেষী মন্তব্য, মব লিঞ্চিং, গোমাংস অজুহাতে হত্যা। পাশাপাশি একটা রাষ্ট্রযন্ত্রে ‘মেজোরিটি র্যাডিক্যাল পলিটিক্যাল পার্টি’ থাকলে বিজ্ঞানের নিয়মেই ‘মাইনরিটি র্যাডিক্যাল পলিটিক্যাল অর্গানাইজেশনের’ উৎপত্তি ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে ভারতীয় রাজনীতিতে যেখানে বহু ভাষাভাষী বহুদলীয় রাজনীতি মূলত জাতপাতের উপরে নির্ভর করেই কেন্দ্রীভূত হয়, সেহেতু এখানে সংখ্যালঘুদের পক্ষে দানা বাঁধাটা অত্যন্ত দুরুহ একটা কাজ ছিল।

বাঙালী মুসলমানের সাথে হিন্দিভাষী মুসলমান বা কেরালার মুসলমানের ততটাই ফারাক, যতটা উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের। এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে RSS নিজেই অতি উৎসাহী হয়ে ‘রাতারাতি এখনই আমার সকল ক্ষমতা চাই’ এর মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে মিমকে লাগিয়ে দিত মুসলমান ভোটকে পোলারাইজড করে উল্টো দিকের হিন্দু ভোটকে একটা বাক্সে জমা করার প্রয়াসে। আগামীতে মিম থাকবে কি যাবে তা জানিনা, কিন্তু উগ্র ইসলামিক রাজনৈতিক দল গুলোই যে এই সম্প্রদায়কে নিয়ন্ত্রণ করবে তা বলাই যায়।

সুতরাং- RSS দু'ক্ষেত্রেই সফল। ক্রমাগত মুসলমানফোবিয়া আর পাকিস্তান ভিতি দিয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে একটা অশিক্ষিত সোস্যাল মিডিয়া প্রজন্মের জিনের মাঝে সেঁধিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি, এটাই তাদের সাফল্য।

RSS দীর্ঘদিন মাটির সাথে লেগে থেকে সংগঠন বাড়ানোর সুফল আজকের নরেন্দ্র মোদী বা যোগি আদিত্যনাথ। ১৯% সংখ্যালঘু মুসলমানেদের মাঝে সারাক্ষণ- ‘এই বোধহয় আমাকেও জঙ্গি বলে দাগিয়ে দেবে’ বা ‘দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দিল’ ভয়ে থাকা সম্প্রদায়ের মাঝে নেতার জন্ম হতে পারে না তাৎক্ষণিকভাবে, জন্ম হয়ও নি।
RSS ই মিমকে প্রমোট করেছিল প্রকাশ্যে, নতুবা মসলমান অধ্যুষিত নাগপুর সেন্ট্রাল সিটে কংগ্রেসের ‘বান্টি বাবা সেলকে’কে ৪০০০ ভোটে হারাতে পারত না বিজেপির বিকাশ কুম্ভারে। প্রসঙ্গত এখানে মিম প্রার্থী ভোট পেয়েছিল সাড়ে আট হাজারের একটু বেশি। এ যাবৎ যাবতীয় ইতিহাসে, মিম যত না বিজেপির পক্ষে ছিল তার চেয়েও কংগ্রেসী ভোটকে ভাগ করতে RSS এর একটা সফল রাজনৈতিক চাল ছিল।

এই পথ বেয়েই RSS ঘনিষ্ঠ প্রণব মুখার্জী ‘ওয়েইসি’কে ২০১৪ সালে সংসদ রত্নের পুরষ্কারে ভূষিত করে তার পেডিগ্রী বাড়িয়ে দিয়েছিল জাতীয় রাজনীতির স্তরে। এ যাবৎ জাতীয় স্তরে মিমের রাজনীতি নির্ভর পরিচিতি যে অতি ক্ষুদ্র প্রান্তিক উপস্থিতির বাইরে কোনো অস্তিত্ব ছিল না তা উপরে জেনেছেন।

মোদীর এই নতুন সাম্প্রদায়িক ঘৃণার যে চাষ, তার পিতামাতা RSS-BJP হলে- শিক্ষক হিসাবে যার নাম না নিলে ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান ডেমোক্রেটিক সার্কাস’ অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে, সেই রিংমাস্টারের নাম হলো ‘প্রশান্ত কিশোর’। মোদী-২০১৪, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তেলেঙ্গনা, অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহারের পর আধুনা তৃণমূলের হয়ে খেপ খাটতে এসেছেন বাংলাতে। বিজেপির এখন আর কোনো হাইপ্রোফাইল প্রশান্ত কিশোরকে দরকার নেই, তারা এর অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গেছে মিথ্যার চাষে।

সরাসরি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপকেই নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আম্বানিকে লেলিয়ে দিয়ে সেটিং করে নিয়েছে। খাতায় কলমে প্রশান্ত কিশোরের স্থলাভিষিক্ত করেছে অমিত মালব্য, যার কাজই হলো লাগাতার মিথ্যা সম্প্রচার করে মগজে দাঙ্গার চাষ করা। আগামীতে বাংলা নির্বাচনে বিজেপির এই মিথ্যাচারের সাথে মূল লড়াই তৃণমূলের মিথ্যাচারের, এই ডুয়েলে বামেরা কতটা লড়াই দিতে পারবে বা আদৌ দিতে পারবে কিনা সেটাই কোটি টাকার প্রশ্ন।

মোদীফায়েড মিডিয়ার দ্বারা ক্রমাগত সমাজের মাঝে প্রতিটি বিষয়ে মুসলমানেদের দোষী সাব্যস্ত করে দাগিয়ে দেওয়া, কথায় কথায় পাকিস্তান পাঠাবার ধমকি, NRC এর নামে মুসলমানেদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া বা D-voter করে দেওয়ার ঢক্কানিনাদের মাঝে চলে আসে লকডাউনের মার ও তৎপরবর্তী বিহার নির্বাচন।

...ক্রমশ

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...