সোমবার, ৫ এপ্রিল, ২০২১

নিজের কর্মসূত্রে কিছু নীলচে ধুসর অভিজ্ঞতা



ওরে.... ভবিষ্যতের নেতা......
এতো মিটিং করে করবি কি তা বল।
নির্বাচন প্রক্রিয়া চলছে, প্রার্থী কোথায় মানুষের বাড়ি বাড়ি যাবে তা নয়, তার বদলে শুধু মিটিং। নিজেদের মধ্যেই সাত রকম কমিটি বানিয়ে নিয়ে মিটিং। ছোট-বড় কমিটি তৈরি করে মিটিং। সকালে মিটিং, দুপুরে মিটিং, বিকালে মিটিং। মিটিংময় প্রচার প্রক্রিয়া।
মিটিংটা তাও যদি জনগণের উদ্দেশ্যে হতো তাহলেও একটা কথা থাকত। একই ব্যক্তি, একই কথা, একই বক্তব্য- সাত রকম কমিটিতে উপস্থিত থেকে বলে যাচ্ছে নাগাড়ে। একদল লোক বোকার মতো তা শুনে যাচ্ছে বিকারহীন ভাবে। শুনছে শুনছে, চিরকালই শুনবে। আদান-প্রদান বলে শব্দটাই এদের অভিধানের পাতা থেকে উঠে গেছে। সেই বোকার মতো ভ্যাবলা চোখে অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়ে থাকা লোকটা, যে লোকটার কিছু বক্তব্য থাকতে পারে তা কেউ কোনোদিন ভাবনায়-চিন্তায় আনেনি।
কেউ ভাবছে না, যে লোকটা ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছে কিন্তু কোথাও বলার সুযোগ বা অধিকার পাচ্ছে না, আদপে লোকটার মধ্যে যে কিছু তো ট্যালেন্ট আছে সেটাই বিকশিত হওয়ার জায়গাই পাচ্ছে না।
নতুন ধারণা আমাদের মাঝে আসবে কী করে!
১০০টা ছেলে সাথে ঘুরছে, কেন ঘুরছে ছেলেগুলোও জানে না, প্রার্থীও জানে না, ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বও জানে না, কিন্তু ঘুরছে। মিডিয়া নেই নেই করেও আছে, তথাকথিত ডানপন্থী আন্দোলন ও উত্থানের গল্প আছে। নিজেদের মতো করে তৈরি করে নেওয়া ময়দান আছে, তাই নজর আছে। পয়সা আছে, ফ্লেক্স আছে, পোস্টার আছে, সংগঠন আছে, আত্মবিশ্বাস আছে, রোজ রোজ বড় বড় নেতা সেলিব্রিটির আমদানি আছে- যা যা থাকার দরকার সব আছে।
নেই শুধু পরিকল্পনা।
যেটা থাকতেই পারত সেটাও নেই- সোশ্যাল মিডিয়া। ৫০০ কোটির PK আর ৫০০০ কোটির আঁটি সেলের বিরুদ্ধে সেল্ফি তোলা টিভি সেলেব কিম্বা চার আনার ঘটিগরম। ফল যা হবার তাই হয়েছে- যে প্রচারটা পেতেই পারত, সেটাও পায়নি।
জল নেই, খাবার নেই, দিশা নেই, কিচ্ছু নেই, আছে শুধু আবেগ আর উচ্ছ্বাস। অথচ যেখানে কিছুই ছিল না প্রায়, সেখানে এগুলো সব ছিল, কারণ পরিকল্পনা ছিল। আবেগ-উচ্ছ্বাস দিয়ে একটা দূর পর্যন্ত যাওয়া যায়, তারপর কিন্তু বিনোদ কাম্বলি। ট্যালেন্ট আর সফলতা- দুয়ের মাঝের ফারাকটা হলো পরিকল্পনা।
বরই যখন বরকর্তা হয়, তার অনুষ্ঠান বাড়ি ঘেঁটে না যাওয়াটাই অস্বাভাবিক।
কী হবে এত মিটিং দিয়ে? মানুষের দোরে দোরে না পৌঁছলে হাতে রইবে শুধুই পেন্সিল।
প্রতিষ্ঠিত নেতা দেখেছি, স্ট্রাগলার নেতা দেখেছি, সোনার চামচ মুখে নেওয়া নেতা দেখেছি, ভাবুক আঁতেল দেখেছি, গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল দেখেছি, দরকারের সময় পালিয়ে যাওয়া নেতা দেখেছি, মার খাবার ভয়ে না এসে ফোনের সুইচ অফ করে দেওয়া নেতা দেখেছি, হুকুম জারি করা নেতা দেখেছি- সে কেন নেতা এইটা না জানা নেতা দেখেছি, সহজাত নেতৃত্বের গুণ কম মানুষেরই থাকে, তেমন বিরল নেতাও দেখেছি।
পাশাপাশি- পিতার স্নেহে লাটাই এর সুতো ছেড়ে দেওয়া নেতা দেখেছি, সন্তানকে আগলে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া নেতা দেখেছি- নেতার জন্ম হতে দেখেছি। কিন্তু গাছে ওঠার আগেই এক কাঁদি পেড়ে ফেলা নেতা দেখার বাকি ছিল। সেটাও দেখলাম। দেখলাম বেশ কয়েক স্থানে।
কেউ কেউ ইন্টারভিউ দিচ্ছে- তিনি আবার প্রার্থী
-প্রেম করেন?.
-কেন করব না...
এটা জবাব ছিল।
এতে মানুষের কোন সমস্যা মিটবে? প্রার্থী নাচতে জানলে বা গাইতে জানলে তাতে ভোটারদের কোন সমস্যার সমাধান হবে?
একটা রেসে অনেকে দৌড়ায়, জেতে একজনই। কিন্তু হারের অনুসন্ধান করতে যাওয়ার জন্য যারা যায় তারা মাটিতেই নামেন না, তাই মিটিং চলতেই থাকে। আর সামনের লোকটা বোবা দৃষ্টিতে বাইরের জানালা দিয়ে গ্রীষ্মের লু এর সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে সময় কাটায় একই ক্লিশে ডায়লোগ শুনে।
হাল ফেরাতে
লাল ফেরাও
একদম ঠিক, কিন্তু তারও আগে শোনা অভ্যাস করতে হবে, অভিজ্ঞ পার্টি কমরেড মেন্টরের অধীনে ওয়ার্কশপ করতে হবে, এসবের বিকল্প নেই। আবেগে ভোট হয় না, ভোট করাতে হয়, মেসিনারি লাগে, আর লাগে পরিকল্পনা। শক্তি কম হোক বা বেশি, পরিকল্পনার ঘাটতি হলে লড়াই থেকে প্রথমেই পিছিয়ে পড়তে হয়। আর এটা উপলব্ধির বয়স কাঁচা চুলের সকলের থাকবে না এটাই স্বাভাবিক।
ফেসবুকের কিছু ক্লোজড গ্রুপ আছে, যেখানে রোজ পলিটব্যুরো বসে, সেখানে এসে প্রত্যেকে বা অনেকেই ভয়ানক ভাবগম্ভীর মতামত রাখে এমন ভাবে যেন - এটার এগনস্টে কাল পার্টি কংগ্রেস বসবে, গঠনতন্ত্র বদলে যাবে। কেউ কেউ ভবিষ্যৎবাণী করেন কারো কারো সম্বন্ধে, যিনি তার এলাকাতে ২২দিন থাকার পরেও প্রার্থীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেননি বা করার যোগ্যতা হয়ে উঠেননি। অথচ খাপ বসিয়ে দিশা ঠিক করে দেওয়ার জন্য সে কী প্রাণপাত লড়াই... তাই হাসি লাগে না, করুণা হয়। মনে হয় ওই মিটিং নেতারা এদেরই যোগ্য উত্তরসূরী নেতা।
বুঝলে ভাল, না হলে আসছে বছর আবার হবে।
ততক্ষণে সামনের বোবা লোকগুলো উসখুস করতে করতে ঘুমিয়ে যাক না হয়,
যে দেখে শেখে না, সে ঠেকে শেখে।
সবই ঠিক থাকে, শুধু সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটে।

রবিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২১

আব্বাস সিদ্দিকী


নির্বাচন চলাকালীন প্রতিপক্ষকে এভাবে পড়ে ফেলা- এলেম লাগে। মুসলমানেদের যে গুলি খাওয়াবার প্ল্যান করছে মমতা- সেটা আব্বাস পড়ে ফেলেছিল। সদ্য ৩০ পার করা নেতার মাঝে এটা অলীক গুণ বৈকি।

এই বয়সে যে প্রাজ্ঞতা দেখাতে পেরেছে আব্বাস- সেটা বহু লব্ধ প্রতিষ্ঠিত নেতার নেই। আব্বাস নিজের নির্বাচনী প্রচারের প্রতিটা জনসভায় একটা টিম নিয়ে যায়, আমরা হয়ত অনেকেই তাদেরকে চিনি না- কিন্তু তারা আমাদেরই মধ্যে মিশে আছে। আব্বাস নিজের বডিল্যাঙ্গুয়েজ তৈরি করতে পেরেছে, মঞ্চ বুঝে বুঝে বক্তব্যের ধারা বদলাচ্ছে, নিয়মিত নিত্যনতুন তথ্য দিচ্ছে, সর্বোপরি ভাষণে বৈচিত্র্য আনছে। আব্বাস তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য কোনোভাবেই পরিত্যাগ না করেই ভাষণ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রচন্ড উচ্চস্বরে ভাষণ চলাকালীন বক্তব্য রাখা কিংবা নিজের মোবাইল থেকে তথ্য জনগণের সামনে চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবার ভাষণ দেওয়া। এই যে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে থাকার প্রচেষ্টা, এটাই আব্বাসকে জনগণের মধ্যে ধরে রেখেছে।
আব্বাসকে কাদের সাথে লড়তে হচ্ছে? বিরোধী দলে তার মানের কোনো নেতা নেই, তাই ওদের কথা নাই বা আনলাম। কিন্তু সংযুক্ত মোর্চার মধ্যেই তার শরিক দলের একঝাঁক উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী যারা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাবড়-তাবড় ডিগ্রিধারী, এমনকি পার্টির মধ্যেও ছাত্র ও যুবফ্রন্টে ইতিমধ্যে পরীক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত- তাদের সাথে সমানে পাল্লা দিয়ে যেতে হচ্ছে।
তবে উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের অনেকেই অদ্ভুত রোগের শিকার- কেন আমি মোবাইল দেখে বলব, কেন কেউ জেনে যাবে অমুক আমাকে তথ্য সাপ্লাই দেয় ইত্যাদি ট্যাবু। আব্বাস সেই ট্যাবু থেকে মুক্ত- সে প্রকাশ্য মঞ্চে হোয়াটস অ্যাপে দেখে বক্তৃতা দিচ্ছে অনায়াসে। মানুষ তার থেকে নতুন কিছু পেতে চাইছে, সেটা সে মোবাইল থেকে দেখে বলল, না মুখস্ত বলল সেটা গৌণ। আব্বাস এখানে বাকি অনেকের চেয়ে এগিয়ে গেছে।
সত্যজিৎ রায় প্রয়াত হওয়ার পর তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ওনার ওপর একটা বিশেষ সংখ্যা বের করেছিল। সেখানে একটা স্মৃতিচারণায় উৎপল দত্ত একটা শিক্ষনীয় গল্প শুনিয়েছিলেন। যখন 'হীরক রাজার দেশে' শুটিং হচ্ছে, উৎপল দত্তর ডায়ালগ থ্রো সত্যজিৎ বাবুর পছন্দ হয়নি। উনি উৎপলবাবুকে পরামর্শ দেন-
"উচ্চারণে একটু গ্রাম্যতা আর অশিক্ষার ছাপ আনো। ‘করেছিল’ না বলে বলো ‘কইরেছিল’।
আসলে এই জোতদার ধরনের লোক বেশ ক্রুড আর অশিক্ষিত হয়। না হলে অন্য লোকেদের oppress করবার চিন্তা এদের মাথায় আসত না। তাই এই ধরণের লোককে deem করে দাও। যাতে ভয় পাবার বদলে লোকে তোমায় দেখে হাসাহাসি করে"।
এর পর উৎপল দত্ত লিখছিলেনঃ
"আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। মনে পড়ছিল চেয়ারম্যান মাও-এর কাগুজে বাঘের তত্ত্ব। শত্রুকে সবসময় হাস্যকর করে খড়ের সৈনিকের স্ট্যান্ডার্ডে নামিয়ে আনতে হবে। এই তত্ত্বের এরকম প্রয়োগ যে হতে পারে আমি ভাবতে পারিনি এর আগে।"
আব্বাস কি নতুন কিছু করছেন?
আব্বাস সেই অর্থে বিজেপির বিরুদ্ধে বলছে না, ও মমতাকে ধরেছে ভীষণ তাচ্ছিল্যের সাথে- কারণ মমতাই যে বিজেপিকে স্থান দিয়েছে বাংলার মাটিতে সেটাকেই পাখির চোখ করেছে। আব্বাসকে যারা ধর্মীয় নেতা হিসেবে দিতে শুরুর দিকে সক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন, তাদের প্রায় সমস্ত অস্ত্র সুনিপুণভাবে দক্ষতার সাথে আব্বাস নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। এই নির্বাচনে বামেদের উত্থানের পিছনে আব্বাস নামক x-factor কে অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
খেলা হবে আর জয় শ্রীরামের বাইনারির মাঝে- "চিল্লায়া কন, ঠিক কি বেঠিক" আলাদা স্থান করে নিয়েছে।
আব্বাসের নিজস্ব রিসার্চ টিম রয়েছে, নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে- বঙ্গদর্শন, মিল্লি ইত্যাদি হরেক নামে। ফেসবুকেও এদের অবাধ বিচরণ। সাউন্ড কোয়ালিটি এদের দারুণ, ক্যামেরার এঙ্গেল দারুণ। মঞ্চের দখল যদি আব্বাস নিয়ে নেয় মুহূর্তে, মঞ্চের সামনেটার দখল কিন্তু তার টিমের অধীনে চলে যায়। প্রচার মানে কী? আমার বা আমাদের বার্তাটা বেশি বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো, টিম আব্বাস সেটাই সুনিপুণ করতে পেরেছে। দুরন্ত পোস্টার, দুরন্ত ক্যাপশন সাথে আনএডিটেড ভিডিও- চুম্বকে এটাই সাফল্য। সব মিলিয়ে প্রচার যন্ত্র তার নিজস্ব কাজটা করতে পারছে প্রতিনিয়ত, ফলত সারাদিনে ২টো সভা করলেও ২ কোটি মানুষের কাছে পরিষ্কার ভাবে পৌঁছে যাচ্ছে প্রচলিত মিডিয়া হাউজদের সাহায্য ছাড়াই।
সামনে অনেক ফাঁকা মঞ্চ, রাজনৈতিক ময়দানে অচিরেই নতুন প্রজন্মের মুখেরা দাপিয়ে বেড়াবে। সেখানে আমিত্বকে দূরে রেখে শোনার অভ্যাস বজায় রেখে, কাজের লোক আর তোষামোদের লোক চিহ্নিত করে, কারা আমার তথা আমাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্রে লাভজনক সেই বোধটা আনতে পারবে- সে বা তারাই সফলকাম হবে। আব্বাস সম্ভবত সেই সফলকামদের অগ্রগণ্য প্রতিনিধি। যত উপরে উঠবে- প্রতিদ্বন্দ্বিতা তত কঠিন- এবং সেটা কাছের বন্ধু বা কলিগদের থেকেই আসবে।
প্রতিভা বহু ওঠে, কিন্তু সঠিক পদ্ধতিতে লালন-পালনের অভাবে সেগুলো অধিকাংশটাই অকালে ঝরে যায়। এই নির্বাচনেও সম্ভাবনাময় হয়ে অনেকেই দেখা দিয়েছে নানান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, কিন্তু আব্বাস ছাড়া সেভাবে পরিকল্পিত টিম ওয়ার্ক আর কারোর মাঝে নজরে আসল না।
কি বুঝা আসছে?
চিল্লায়া কন, ঠিক কি বেঠিক?

বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ, ২০২১

বামদলে পাত্র-মিত্র ও গুরুদেব


গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে একজন বিশিষ্ট দার্শনিক ছিলেন তা তার বহু লেখায় ছাপ রেখে গেছেন। তেমনই একটা দূরদর্শী রূপকধর্মী গল্প তোতা কাহিনী। মূর্খ রাজা, আর তার চারপাশে ঘিরে থাকা নিম্নমেধার স্তাবক কুল তথা চামচারা। এই চামচা বা স্তাবকেরা সমাজে পরিচিত- পাত্র, মিত্র, অমাত্য, পারিষদ, উমেদার, চাটুকার, ভাঁড় ও অন্বয় পুরুষের দলেরা। এখানে পণ্ডিতেরা স্থান পায় না, কারণ ভাঁড়েরা পণ্ডিতের পোশাকে কৌতুক দেখায় কুমন্ত্রণা চক্রের প্রত্যক্ষ মদতে।

এখন সেই রাজন্যদের কাল গত হয়েছে, গণতন্ত্রের পতাকা পতপত করে উড়ছে উন্নত বিশ্বসহ তৃতীয় বিশ্বের আমাদের দেশেও। গভীর জনঘনত্বের বহু ভাষাভাষী বহু ধর্মের আপাতদৃষ্টিতে সচেতন আর বুদ্ধিমান সেজে থাকা ক্রমশ পিছনের সারিতে ছুটে চলা একটি রাজ্য এই পশ্চিমবাংলা। যেহেতু রবিঠাকুরও এই মাটিরই মানুষ, তাই আমাদের ক্রোমোজোমকে তিনি এক শতাব্দী আগেই নিখুঁতভাবে ম্যাপিং করে ফেলেছিলেন।
আজও দেখুন, কেউ কেউ তারাশঙ্করের লেখা তথা সত্যজিতের চিত্রায়িত- জলসাঘরের ‘ছবি বিশ্বাস’ সেজে পুরাতন অট্টালিকার পলেস্তারা খসা বর্তমানে বিরাজমান, মোটা মোটা থামের পাশে আসক্ত শরীরে আকাশপানে ঝুলে ঢাকা ঝাড়বাতির পানে চেয়ে ‘আত্মসমীক্ষা’ করেন- যা যৌবনের বৈভবের প্রতীক। দেওয়ালে টাঙানো ক্রমশ বেরঙা হতে থাকা পূর্বসুরীদের তৈলচিত্র, মেঝেতে ফরাশ পাতা, তার উপরে ‘ক্ষমতার’ চেয়ার, তাকিয়া-বালিশ। জমিদারী চলে গেলেও, বয়সের ভারে ন্যূজ জমিদার ক্ষীয়মান পরিস্থিতিতে জমিদারসুলভ অশোভনীয় অন্তঃসারশূন্য বুর্জোয়া আস্ফালন ধরে রেখেছেন ষোলআনা।
অতঃপর ধুলোমাখা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঝুলফাঁদ সরিয়ে নিজেকে দেখার পালা জমিদারের। পিছনে সামান্য দূরে সেই প্রলেতারিয়েৎ লোকটি একটা কালি লাগা কাঁচের লন্ঠন নিয়ে দাঁড়িয়ে, জমিদারির খাদের কিনারে পৌঁছে অতীতের স্বপ্নে মশগুল, যার কথা কখনও শোনেননি রাজামশাই। পাত্র-মিত্রেরা কবেই পালিয়ে গেছে নিজের আখের গুছিয়ে। সময়ে শিক্ষা নেওয়ার ভান করা জমিদার- শুধুই নিস্তব্ধ হাহাকারের প্রতিমূর্তি। এখন সম্পদ আর আভিজাত্য ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্কে এসে দাঁড়িয়েছে। শুধু পরে আছে ব্যর্থতা, ঔদ্ধ্যত্ব, দম্ভ আর একরাশ একাকীত্বে ঠাসা শূন্যতা।
জলসা ঘর হোক বা তোতাকাহিনী, আসলে এ সবই রূপক। শূন্যে পৌঁছাবার জন্য আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হলে, যোগ্য পাত্র-মিত্র ঠিক জুটে যায়। এর পর শুধুই রয়ে যায় আত্মসমীক্ষা আর চণ্ডীমণ্ডপে (আধুনা ফেসবুক) জমিদারের এককালের চামচা তথা স্তাবক কুল। জমিদার তার জমিদারিত্ব হারিয়ে অট্টালিকাতে একা মৃত্যুর প্রতীক্ষাতে আয়না দেখে। একজন পারিষদ ছিলেন, যিনি বিবেকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন- সৎ পথ দেখাবার চেষ্টাই করতেন। দীর্ঘদিন নিম্নমেধার স্তাবক, পাত্র-মিত্র-উমেদার-চাটুকারের মাঝে থাকার দরুন, ততদিনে জমিদারে মেধা, বিবেক, বোধ, চেতনা সবকিছুই অবলুপ্ত হয়ে গেছে।
গুরুদেবের তোতারা আজও শিকড়হীন শৃঙ্খলার শিকলে আঁটকা পরে, এখন খালি শেখানো পুঁথিগত বুলি আওড়ায়। যে বুলি আমজনতার বোধের বাইরে। একটা জরাজীর্ণ খাঁচাকে ‘উপযুক্ত স্থান’ নাম দিয়ে সেখানেই অবোধ্য ভাষায় আলাপচারিতা করতে করতে, মুক্তভাবে গাইতে ভুলে গেছে, মুক্তভাবে উড়তে ভুলে গেছে, মুক্তভাবে কথা বলতে ভুলে গেছে, মুক্তভাবে ভাবতেও ভুলে গেছে- তোতার মতো।
ক্রমাগত শিক্ষাহীন আত্মসমীক্ষারত নামে ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে কী হয় সেটা গুরুদেবই লিখে গেছেন- “পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হু করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্ গজ্‌গজ্ করিতে লাগিল”। সবই থাকবে, শিকল, খাঁচা, পাত্র, মিত্র, অমাত্য সব- শুধু পাখিটাই থাকবে না।
চলুন, আরেকবার তোতা কাহিনীর পাতা উল্টে নিই, জলসাঘরটাও ঘুরে আসি- বইয়ের পাতা বেয়ে।

করোনা ও প্রোটোকল




করোনার নতুন ঢেউ নাকি আছড়ে পড়েছে দেশে, যদিও পুরনো ঢেউ কখন কীভাবে চলে গেছিল সে বিষয়ে কেউ কোনো ধারণা দিতে পারেনি। কেন গেছিল, কোথায় গেছিল তাও কেউ জানে না। নতুন ঢেউ কোথা থেকে এলো সে বিষয়েও কেউ খুব একটা বেশি জ্ঞান রেখেছে বলে এ পর্যায় পর্যন্ত মনে হয়নি। আসলে করোনা নিয়ে কে বলছে না, ডাক্তার বলছে, সরকার বলছে, নেতা-নেত্রী বলছে, WHO বলছে, আমার মতো ফেসবুকের জ্ঞানগর্ধবেরা বলছে, মাই চায়ের দোকানের বীর বিপ্লবী বিশ্লেষকরাও যেমন ভাবে পারছে বলছেন এবং নিজ নিজ মতবাদ রাখছেন বলিষ্ঠভাবে।
কিন্তু যাদের বলার দরকার সেই বায়োটেকনোলজিস্টরা কী বলছেন কেউ সে বিষয়ে জানতে ন্যূনতম আগ্রহী নই। তারাও যে কিছু বলতে চায়, বা বলতে দেওয়া উচিত কিংবা যেটা তারা বলেছেন সেটাকে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত- এ বিষয়টা আমাদের কারোর ধর্তব্যের মধ্যেই নেই। না সরকার তাদেরকে বলতে দিচ্ছে, না কোনো বেসরকারি সংগঠন - সুতরাং সেই না বলা সমাধানের আঁধারে যা ক্ষতি হওয়ার তাই হচ্ছে।
করোনা কতটা মানুষের রোগ তথা প্যান্ডেমিক আর কতটা দেউলিয়া পুঁজিবাদী অর্থনীতির মারণ রোগের জড়িবুটি এ বিষয়ে তর্ক চলতেই থাকবে, কারণ করোনাকালের লকডাউনে আমার আপনার হাত থেকে কাজটি চলে গিয়ে অভাবের বাটি ধরিয়ে দিয়েছিল সরকার। কিন্তু আদানি-আম্বানি সহ গোটা বিশ্ব জুড়ে ধনীরা আরও আরও বেশি ধনী হয়েছে লকডাউনকে কেন্দ্র করে।
সুতরাং আপনার পবিত্র বিশ্বাসে আপনি করোনাকে দেব জ্ঞানে থুরি প্যান্ডেমিক জ্ঞানে পূজা করতেই পারেন, আমি করবো না। কারণ আমি পরিষ্কার উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম গত লকডাউনের কিছুদিনের মধ্যেই- যে করোনা একটা ষড়যন্ত্রের নাম, যে ষড়যন্ত্রে গরিব আরও গরিব হয়েছে, ধনী আরও ধনী হয়েছে মনোপলি লুঠ চালিয়ে।
করোনা যদি ছোঁয়াচেই হতো তাহলে ভোটকে কেন্দ্র করে এত এত মিটিং-মিছিলের পরে গোটা বাংলা জুড়ে কিংবা যে সমস্ত রাজ্যের ভোট হচ্ছে সেই সমস্ত রাজ্য জুড়ে মড়ক লাগত। যদিও সে সব কিছুই হয়নি, কিন্তু স্কুল বন্ধ আছে আজ ১ বছর। অনলাইনে পড়াশোনার নামে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী লুটেপুটে খাচ্ছে। একটা প্রজন্মের বাচ্চাদের পড়ার অভ্যাস, স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস সমস্ত কিছুকে নিপুণভাবে নষ্ট করে দিয়েছে।
তাহলে এবার লক্ষ্য কী? লক্ষ্য অবশ্যই ভ্যাক্সিন বেচা, কারণ যে পরিমাণ টাকা রোজগার করার সামর্থ্য ষড়যন্ত্রীদের ছিল, তারা যে স্বপ্ন দেখেছিল- ২০২০ এর পরিকল্পিত করোনা সন্ত্রাস সেই লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারেনি ভ্যাক্সিনের ব্যবসায়ীদের। তারা কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে মরিয়া, তাদের লগ্নি তুলতে হবে সুদসহ, তাই নতুন এক পদ্ধতিতে আগামী তিন থেকে চার মাসের জন্য এই করোনা-করোনা নতুন জিগিরটা বাজারে এনেছে। নতুন স্ট্রেন, নতুন আতঙ্ক। এরা এটাকে চালাবে, মিডিয়া এদের সাথ দেবে পয়সা খেয়ে- যাতে জনমানসে একটা তীব্র ভীতি সঞ্চার হয়। যতটা পারা যায় পাবলিকের টাকা লুটে নেওয়ার একটা ব্যর্থ প্রয়াস।
পুঁজিবাদী হাঙরেরা ভ্যাক্সিন বিক্রির জন্য ষড়যন্ত্র করবে সেটাতো খুব স্বাভাবিক কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের অপোগণ্ড রাষ্ট্রযন্ত্র তথা সরকার সহ আমলাদের একটা অংশ তারা এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ; আর এই যোগসাজশের প্রাতিষ্ঠানিক নাম হচ্ছে প্রোটোকল।
কেমন এই প্রোটোকল সিস্টেম!
১) একটা বছর কুড়ির তরুণী প্রথম বার মা হওয়ার জন্য একটা জেলা হাসপাতালে গেছে, তারপর সেখানে তার কিছু টেস্ট করা হলো, কেউ জানে না কেন সেই টেস্টটা করানো হলো, ব্যাস- তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো কোভিড রোগীদের জন্য স্পেশ্যাল হাসপাতালে। যেখানে প্রেগন্যান্সি বিষয়ক ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নেই, করোনাতে মরবে কিনা জানা না থাকলেও- লেবার পেইন উঠলে তাকে যে বাঁচানো দায় সেটা বলাই বাহুল্য।
২) একজন ছাত্র ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি ডায়ালাইসিস করার জন্য গেছেন একটি হাসপাতালে, সেখানে তার অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হলো এবং সাথে সাথে পাঠিয়ে দেওয়া হলো কোভিড স্পেশ্যাল হাসপাতাল- যেখানে ডায়ালিসিসের ড নেই। ২ দিন পর এ লোক এমনিতেই মরে যাবে।
৩) একজন অ্যাক্সিডেন্টে পায়ের হাড় ভাঙা নিয়ে গেছে হাসপাতালে হাড় ভাঙার চিকিৎসা করাতে। তাকে রেফার করে পাঠিয়ে দেয়া হলো কোভিড স্পেশ্যাল হসপিটালে। এরকম অসংখ্য ডায়রিয়া পেশেন্ট, কলেরার পেশেন্ট সহ নানা ধরনের স্বাভাবিক রোগীদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে কোভিড হাসপাতালে। মাত্র ৭ দিনে সমস্ত কোভিড স্পেশ্যাল হাসপাতালগুলোকে এভাবে ভরে ফেলা হয়েছে, কার নির্দেশে এগুলো হচ্ছে কেউ জানে না।
এরা যে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছিল সেই চিকিৎসাই হচ্ছে না দিনের পর দিন, আর কোভিডের নাম করে তাদের আঁটকে রেখেছে। ছাড়া না পেলে এমনিতেই এরা মরে যাবে যে রোগে এসেছিল সেই রোগে- তখন সরকারের খাতায় নাম উঠবে নতুন করে করোনাতে আক্রান্ত হয়ে এত জনের মৃত্যু অমুক কোভিড হাসপাতালে। ভাবুন তো আমার আপনার ঘরের কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেছে আর তাকে কোভিড হাসপাতালে রেফার করে দিল!!
এ ও কি এক ধরনের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প নয়? কার স্বার্থে রোগীর সাথে আলাপচারিতা না করে, সঠিক টেস্ট না করে অনুমানের ভিত্তিতে গরু ছাগলকে খোঁয়ারে পাঠাবার মতো করে সাধারণ রোগগ্রস্থ রোগীকে কোভিড হাসপাতালে ঠেলে দিচ্ছে! আমরা সচেতন হবো না? ডাক্তারেরা পর্যন্ত গণহারে পদত্যাগ করেছিল কোলকাতা সন্নিহিত এক শহরতলীর কোভিড হাসপাতালে, ভোটের প্রচারের ঢক্কানিনাদে সে খবর চার দেওয়ালের মধ্যেই হারিয়ে গেছে।
অতএব, ১ দিনে ১ লাখ সংক্রমণ কীভাবে হলো বুঝে নিন, বুঝে নিন - মৃত্যুর হিসাব কিভাবে হবে। যেটা বুঝতে পারবেননা সেটা হচ্ছে- ভ্যাক্সিন উৎসব করে কার লাভ? রাত্রে লকডাউন করে কোন পাহাড় ডিঙানো হবে। কখনও বুঝবেননা- মাস্ক পড়লে ২ গজের দুরত্ব কেন, দুগজের দুরত্ব সঠিক হলে ভ্যাক্সিন কেন, ভ্যাক্সিন সঠিক হলে আবার মাস্ক ও ২ গজের দুরত্ব কেন!! প্রশ্ন অনেক- উত্তর দেওয়ার কেউ নেই।
সতর্ক হোন, প্রতিবাদ করুন। সরকারের অসভ্যতামির বিরুদ্ধে যেমন ভাবে পারেন প্রতিবাদ করুন- কিন্তু করুন। যে করোনা রোগী তাকে নিয়ে যাক কোভিড স্পেশ্যাল হাসপাতালে- কিন্তু অন্যেরা কেন?
মানুষের মধ্যে যত আতঙ্ক ছড়াবে তত ভ্যাক্সিন বিক্রি হবে। কোন ভ্যাক্সিন? যে ভ্যাক্সিনের রিপোর্ট আজ পর্যন্ত কেউ দেখেনি সেই ভ্যাক্সিন। কেন আপনি নেবেন! কারণ সরকার আপনাকে নিতে বাধ্য করছে। আপনি বলবেন- পয়সা তো আর দিচ্ছি না, সরকার দিচ্ছে। আপনাকে শুধাই- সরকারের কি বাপের টাকশাল আছে? সরকার তো আমার আপনার ট্যাক্সের টাকাই ঘুরপথে ভ্যাক্সিন হাঙরদের গিফট করছে। বিনিময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর তহবিলে কাটমানি জমা হচ্ছে।
গোটা তৃতীয় বিশ্ব জুড়ে এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের খেলা চলছে। যারা ভ্যাক্সিন নিয়েছে তারাও সুরক্ষিত নয়, মাস্ক ও সামাজিক দুরত্ব তাদের জন্যও ম্যাণ্ডেটারি। তার মধ্যে এই নতুন স্ট্রেনের খেলা এসে উপস্থিত। আমরা তো মেতে রয়েছি ভোট নিয়ে, এরপর আইপিএল, তারপর আবার নতুন কিছু এসে যাবে- কবে আমাদের বোধ হবে কে জানে!
কিন্তু তত দিনে কত প্রসূতি মা, কত ডায়ালাইসিসের রোগী, কত আমাশা আন্ত্রিকের রোগী বিনা চিকিৎসায় মরে গিয়ে করোনায় মৃত্যুর লিস্টে উঠে বসে থাকবে তার হিসেব হবে না। হিসাব হবেনা কোভিড স্পেশাল হাসপাতালে কতজন সত্যিকারের কোভিডাক্রান্ত, আর কতজন প্রোটোকলের শিকার। লিস্ট যত লম্বা হবে, তত ভয় বাড়বে, যত ভয় বাড়বে তত ভ্যাক্সিন বিক্রি।
আসলে রাষ্ট্রযন্ত্র যখন দুর্বৃত্তদের সাথে হাত মিলিয়ে ফেলে জনগণ তখন খেলার পুতুল হয়ে যায়।

সোমবার, ২২ মার্চ, ২০২১

অকপট সম্পর্ক

 


একটি পরিবার কিম্বা সমাজ কতটা সুস্থ তা নির্ধারণ করা যায় সেই পরিবার তথা সমাজের আভ্যন্তরীণ পারস্পারিক সম্পর্কগুলোকে বিচার করে। এই সম্পর্কের সূচকগুলো যতটা গভীর, সেখানে সুখের পারদ ততটা উঁচুতে বিচরণ করে। তাই প্রতিটি সম্পর্কের প্রতি আমাদের মূল্যবোধ এবং দায়বদ্ধতা রয়ে যায়, যেখানে এগুলোর অনুশীলন সর্বোচ্চ - সেখানে সুসম্পর্ক বিরাজ করে। ক্রমে ক্রমে এই মূল্যবোধ বা দায়বদ্ধতা- শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, অধিকারে পর্যবসিত হয়। এই পর্যায়ে প্রতিটি ক্ষুদ্র শিষ্টাচার, বাহ্য লৌকিকতা, শাস্ত্রীয় ক্রিয়াদি বা সম্মানজ্ঞাপক প্রবর্তনা একটা পরম আঙ্গিকে প্রকাশ পায়, তা যদি প্রেম হয় তখন তার রূপ চরমাকার ধারণ করে।
সম্পর্ক মানে কী?
শুধুই কী লেনদেন, দেনা পাওনা- যা বস্তুগত মাধ্যমের মাঝে সীমাবদ্ধ! সম্পর্ক আসলে তা নয়, কিছু জিনিস যা চোখে দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়, উপলব্ধি করতে হয়, আত্মস্থ করতে হয়- সেটাই হলো সম্পর্ক।
সম্পর্কের কোনো প্রথাগত সংজ্ঞা হয় না, রক্তের আত্মীয়তার সীমানা ছাড়িয়ে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান মানবিক বোধ। সম্পর্ক হলো একটা অভ্যাস, যাকে লালন করতে হয় যত্নে; যেখানে নিয়মিত মানবিক আবেগের লেনদেন হয়, কখনও তা আলাপে, কখনও বিলাপে, কখনও জ্ঞানের বিনিময়ে, কখনও শিক্ষার্থী হয়ে, কখনও দাদা, ভাই, বোন সম্পর্কের নাম নিয়ে তো কখনও নামহীন হয়ে। সম্পর্ক মানে শুধুই প্রেম নয়, ভালোবাসা নয়, ঘৃণা বা নিত্য যোগাযোগ নয় বরং এ সবকিছুর ঊর্ধ্বে একটা পরিস্থিতির নাম সম্পর্ক- যেটা দুটো বস্তুকে বেঁধে রাখে।
অতীতকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা মানুষ একাকীত্বের শামিয়ানাতে ঢাকা পড়ে যায়। অবিরাম আশেপাশে ঘটতে থাকা ঘটনাক্রমগুলোকে ভাগ করে নেওয়ার জন্য কিছু জীবন্ত প্রাণের প্রয়োজন হয়, যারা অনুভূতিতে প্রতিক্রিয়াশীল হয়। এমতাবস্থায় অধিকাংশ মানুষ - অন্য একটি বা একাধিক মানুষকে বেছে নেয়, অবলম্বন করে, দুঃখ-সুখের সাথী হয়- ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি সহ রিপুগত বিভিন্ন কার্যকলাপের ভাগীদার করতে। একেই বলে সম্পর্ক। সততা, ক্ষমা, বোঝাপড়া, বিশ্বাস, বন্ধুত্ব, ধৈর্য, ভালোবাসা, অধিকারবোধ, ঈর্ষা, ঘৃণা ইত্যাদি সবটা নিয়েই সম্পর্কের বুনন।
আমরা তো সজীব, আমাদের মাঝে ইন্দ্রিয় আছে, তাই সম্পর্ককে আমরা অনুভব করতে পারি, যারা একটু বেশি প্রতিক্রিয়াশীল তারা প্রতিপালন করি এই সম্পর্কগুলোকে। প্রতিটি বন্ধন- বিশ্বাস, সম্মান ও যত্নের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। কিছু মনোমালিন্য, খুচরো দ্বন্দ্ব-বিবাদ, মান-অভিমান সম্পর্কের শিকড়কে দৃঢ়তা প্রদান করে।
আমরা প্রতিনিয়ত হরেক ধরনের সম্পর্কের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে চলেছি, কখনও বুঝে কখনও না বুঝে, কখনও প্রয়োজনে কখনও নিরর্থক। সম্পর্কের সৃষ্টি হয়ে চলেছে অবিরাম ও নিরবচ্ছিন্ন ধারাতে। অনেক সম্পর্ক প্রাথমিকভাবে সুন্দর কিন্তু নষ্ট হয়ে যায়, কিছু সম্পর্ক আপাত রুক্ষ যদিও তার শিকড় অনেক গভীরে। কিছু সম্পর্ককে শিকল দিয়েও ধরে রাখা যায় না, কিছু সম্পর্ক ছিন্ন করা দুষ্কর। সম্পর্কের ভুলভুলাইয়াতে কে যে কখন কাছে আসে আর কে যে কখন দূরে যায় তার নির্দিষ্ট কোনও নিয়ম নেই, কিন্তু এই সকল কিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে কিছু মানুষ রয়ে যায় ছায়ার মতো- সম্পর্ক তখন আর শুধুই সম্পর্ক নয় বরং সেখানে স্পেশাল কিছু উপাদান থাকে যা বাকি অন্যদের চেয়ে স্বতন্ত্র।
আমাদের অনেকেরই জীবন এখন ভার্চুয়াল আর বস্তু জগতের একটা ককটেল। এখানে সম্পর্কগুলো কি-প্যাডে তৈরি হয়, বিচ্ছেদও। টেলি যোগাযোগ, অন্তর্জাল ও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে ঘরে বসেই অনেক সভার সভ্য হয়ে ওঠা যায়, সম্পর্ক তৈরি হয়। তেমনই আমার ‘অকপট’ পরিবার, আমার টাইমলাইনের একটা ক্ষুদ্র অংশের সাথে নিত্য ভাবের লেনদেন। তাদের সাথে অনুদিন মানসিক বেসাতি। সেই পরিসর থেকে যখন প্রামাণিক এজহারের শংসাপত্রের প্রাপ্তি ঘটে, যা শব্দের অভিঘাতে পুষ্ট, মননে প্রশান্তির কারক- তখন সার্থক হয় এই সৌহার্দময় সন্নিধান।
আমার সকল ভাই, দাদা, বন্ধু, গুরুজন, অভিভাবক সহ সকল আপনজনকে জানাই অকপট শুভকামনা।
একটি সামান্য দিন তোমাদের/আপনাদের শুভেচ্ছা, শুভকামনা, আর্শীবাদ, আদরে- অসামান্য একটা দিনে পর্যবাসিত হয়েছে। এ পরম সৌভাগ্যের, যা স্নেহ সোহাগের রঙে রাঙা হয়ে উঠেছে আন্তরিকতার লালচে ছোঁয়াতে।

সকলকে আমার তরফ থেকে আবার অনেক শুভেচ্ছা।

রবিবার, ১৪ মার্চ, ২০২১

সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়



২০২০ সালের নভেম্বর মাসের ছবি, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিক সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমুলে যোগ দিলেন। সে দিতেই পারেন, কিন্তু কে এই সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়? তার জন্য ১৪ বছর পিছিয়ে যেতে হবে।


নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহন হবেনা ঘোষণা করেছিল বাম সরকার। প্রমাদ গোনে বিরোধী তৃণমুল, যাদের পেছনে পুর্ণ সহযোগিতা করছিল সঙ্ঘ পরিবার। সরকারের ঘোষনায় বিক্ষোভ রদ হয়ে গেলে বামকে হটানোর পুরো পরিকল্পনাই তো জলে যাবে। তাই লাশ চাই , লাশ। তাপসী মালিক , রিজওয়ানুরের মতই লাশ প্রয়োজন হয়েছিল। অতঃপর গুলি চললো ১৪ই মার্চ , গুলি চালনায় অভিযুক্ত হন এই সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। 

মৃত্যু হলো ১৪ জনের, যদিও তৃণমুল শহীদ বেদিতে ১৩ জনের নাম লেখে, এক হতভাগ্যের পরিচয় গোপন করে। সেই লাশের উপর ভিত্তি করে ২০১১ য় ক্ষমতায় আসেন RSS র দুর্গা। অতঃপর অবসর গ্রহনের পর সেই ১৪ ই মার্চের পুরস্কার স্বরূপ তৃণমুলে ঠাঁই পেলেন সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। আর শহিদদের পরিবারগুলির কি হলো ? কেমন আছেন তারা? নন্দীগ্রামে ভোট প্রচারে একই মঞ্চে সেই শহীদ পরিবারের সদস্যদের ও সত্যজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে "খেলা হবে" স্লোগান তুলতে পারবে কি তৃণমুল কংগ্রেস ?

শুক্রবার, ১২ মার্চ, ২০২১

শিক্ষকদের স্বার্থে সরকার ও নাগরিক সমাজ

 


মেধার অপচয় চলবেনাঃ পর্ব- ১

গোটা দেশের পাশাপাশি এই পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে করোনা নামের মহামারী গ্রাস করে রেখেছে। প্রায় অধিকাংশ মানুষই জীবন-জীবিকার জন্য সংগ্রাম করছে। কিছু মানুষ আছেন যারা আরো নিরুপায়, তেনারা পেশাগতভাবে সরকারী কর্মচারী। তারা কেউ স্কুল শিক্ষক, কেউ রেল কর্মচারী, কেউ বা অন্য দপ্তরের যারা সরকারের ৫০% হাজিরার ফরমানে ঘরে বসে আছেন, মরমে মরে।
শিক্ষকেরা কার্যত ঘরে বসে রয়েছে দীর্ঘ এক বছর প্রায়, হায়ারসেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষককুল মাঝের এক দু’মাস কর্মস্থলে ফেরার সুযোগ পেলেও অন্য শিক্ষকেরা সেই সুযোগটুকুও পাননি। মাসে ২-৩ দিন মিড-ডে মিলের বিলিবন্টন- তারপরে এক বিরাট শূন্যতা তাদের স্বাভাবিক জীবনকে তছনছ করে দিয়েছে পাহাড় থেকে সাগর। রেলও বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন, পরে খুললেও তা অর্ধেক মাত্রার ছিল, নতুন করে আবার তা বন্ধ হয়েছে। অন্যান্য সরকারি অফিস, আদালত বহু ক্ষেত্রেই কর্মচারীদের জোর করে ছুটিতে রাখা হয়েছে। অথচ এনাদের অধিকাংশ জনই মনে প্রাণে কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছেন, কিন্তু যেহেতু স্কুল বন্ধ বাচ্চাদের স্বাস্থ্যের প্রশ্নে, অফিস বন্ধ করোনার বিস্তার রোধ রুখতে- তাই তারা গুমরে কাঁদছেন, কর্মস্থলে আসতে না পেরে।
‘শিক্ষক সহ ঘরে বসে থাকা সরকারী কর্মচারীদের মাস মাহিনা বন্ধ করে দেওয়া হোক অথবা মাহিনা অর্ধেক করে দেওয়া হোক’ জাতীয় যে অযৌক্তিক দাবিগুলো উঠছে, আমরা তার তীব্র বিরোধিতা করছি এই পর্যায়ে। তাদেরও প্রত্যেকের সংসার রয়েছে, তাদেরও বিকল্প কোনো রোজগার নেই, তারাও অধিকাংশ জন যোগ্যতার নিরিখে চাকরিতে বহাল হয়েছেন। সুতরাং, অশালীন কিছু ভাবনা ভাবার পরিবর্তে আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি ‘বিকল্প’ ভাবনার প্রেক্ষিতে। সমাজের শিক্ষিত শ্রেণী, যাদের মধ্যে মেধা, বিদ্যা, বুদ্ধি ও কর্মদক্ষতা রয়েছে তারা সরকারি কর্মচারী। এনাদের মধ্যে শিক্ষক সম্প্রদায় ফলিত জ্ঞানের আধার, তাই এই সকল সরকারি কর্মীদের গুণ কুশলতাকে বিভিন্ন বিকল্প ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে সমাজকে আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে কিছু অনন্য পরিকল্পনা করা উচিৎ। ভারতবর্ষ এতো বড় দেশ, থোরিই প্রতিটি দপ্তরে পর্যাপ্ত পরিমাণে কর্মী রয়েছে?
প্রতিজন ঘরে বসে থাকা কর্মীকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী টেম্পোরারি অন্যদপ্তরে নিয়োগ করা হোক, সংশ্লিষ্ট সেই দপ্তরের কোন সিনিয়র অফিসারদের অধীনে। শিক্ষকেরা স্পেশাল, তাদের কোনো স্পর্শকাতর কাজে নিয়োগ করা যাবেনা। বেশিরভাগ শিক্ষক যারা কমপক্ষে স্নাতক, তারা যেহেতু পেন ধরে অথবা কম্পিউটারের কাজ করতে অভ্যস্ত তাই তাদের ঐ জাতের কাজে আগে নিয়োগ করা হোক। প্রত্যেকটি কাজের সাথে তারিখসহ স্বাক্ষর বাঞ্ছনীয়, নতুবা দুর্নীতির সৃষ্টি হবে।
প্রত্যেককে কোভিড প্রোটোকল মেনে পর্যাপ্ত সুরক্ষা গ্যাজেট ও ওষুধপথ্যের পাশাপাশি একটা বিমা করিয়ে তবে নতুন টেম্পোরারি কর্মস্থলে পাঠানো হোক। ঠিক যেভাবে স্বাস্থ্যকর্মী ও ডাক্তারেরা আমাদের সেবা দিয়ে চলেছেন। শিক্ষকেরাও কী কোনো অংশে দেশ তথা জাতির সেবার জন্য ডাক্তার- স্বাস্থ্যকর্মীদের চেয়ে কম যান! সুযোগ পেলে তারা ছাপিয়ে যাবার ক্ষমতা রাখেন।
তেমনই কিছু বিকল্প পরিকল্পনা রইল- আপনাদের ভাবনাতেও কোনো চমৎকার ভাবনা থাকলে শেয়ার করতে পারেন।
খাদ্য এবং গণবণ্টন ব্যবস্থায় নিয়োগ
~~~~~~~~~~~~~~~~~
এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর হলেও কেন্দ্র বা রাজ্যের তরফে এই দপ্তরে বিপুল কর্মী ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবছর টেন্ডার ডেকে বহু নষ্ট হয়ে যাওয়া খাদ্যশস্য ফেলে দিতে হয়। প্রোক্রিয়োর কিম্বা গণবন্টন ব্যাবস্থা দুটতেই অনেক অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, এই সকল শিক্ষিত মানুষদের বহাল করে এই অতিমারী কালে দপ্তরের খোলনাচল বদলে দেওয়া যেতে পারে। এখানে দারোয়ান থেকে রসায়নবিদ হয়ে অর্থনীতিবিদ সকলের জন্য স্বল্প সময়ের জন্য কাজের স্কোপ রয়েছে। সিনিয়র পুরুষ শিক্ষকদের এখানে নিয়োগ করার বন্দোবস্ত করা হোক।
স্বাস্থ্য বিভাগ
~~~~~~~~~~
স্বাস্থ্যবিভাগের ব্যাকআপ অফিসে, যেমন মেডিসিন এন্ট্রি, মেডিসিন পারচেজ এন্ড সেলস, হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে রোগী ভর্তি সহ অসংখ্য মানুষের প্রয়োজন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সব কাজে ঘরে বসে যেমন কাজ হয়- এমন বহু শূন্যস্থান আছে- সেগুলি মহিলা শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষিত কর্মচারি দিয়ে দিয়ে পূরণ করা যেতে পারে।
নারী ও শিশু কল্যাণ বিভাগের জন্য গ্রামীণ অঞ্চলে অল্প কিছু আশা এবং স্বাস্থ্য কর্মী রয়েছে। জনসংখ্যা পিছু পর্যাপ্ত কর্মীর ভীষণ অভাব রয়েছে। এই অতিমারিকালে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন, এর সাথে প্রসূতি ও শিশুদের বিশেষ পরিচর্যা প্রয়োজন। আপার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষাকর্মীদের ওই স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে জুড়ে দেয়া হোক।
এই মুহুর্তে সমাজের বুকে এক ধরনের আতঙ্ক ত্রাস করছে, মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছেনা। দেশের অধিকাংশ মানুষের পড়াশোনার সাথে প্রতক্ষ্য যোগাযোগ নেই- তাদের মাঝে নানান কুসংস্কার ছড়াচ্ছে। সরকারের কাছে বিভিন্ন জরুরী পরিষেবা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত কর্মী নেই। প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকদের তার স্কুল সংলগ্ন স্থানে অঞ্চলে সোশ্যাল ভলেন্টিয়ার এর কাজ দেয়া হোক। যারা গরীব, অসহায়, অক্ষম ব্যক্তিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নানা ধরনের পরিষেবা দিতে সরকারের পক্ষ থেকে। সুবিধা অসুবিধাতে তাদের ফোন করবে, যাতে তারা বিপদে আপদে মানুষে পাশে থাকতে পারে সরকারের পক্ষ থেকে।
পথে ঘাটে গণসচেতনতা
~~~~~~~~~~~~~~~~~
সাধারনভাবে মানুষ মাস্ক পরছে না হাটেবাজারে, গণসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তাদের থেকে ফাইন সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু সেটা খুবই মুষ্টিমেয় কিছু স্থানে। এই কাজে যুবক পুরুষ শিক্ষকদের নিয়োগ করা যেতে পারে, উনারা স্কুলে ছড়ি হাতে নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত৷ দেশের স্বার্থে তারা রাস্তায় দাঁড়াতে মোটেই কুন্ঠাবোধ করবেননা। তাদের সাথে অবশ্যই পুলিশ থাকবে যারা শিক্ষকদের সুরক্ষা দেবে। মানুষকে মাস্কের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো ও ফাইনের রসিদ শিক্ষকেরা কাটবে, এতে পুলিসের নামে দুর্নীতির দাগও মুছবে- কারন শিক্ষকেরা সৎ।
আইন ও আদালত
~~~~~~~~~~~~~
বিভিন্ন মহকুমা দেওয়ানি আদালত এবং ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তরে- শুধুমাত্র অফিশিয়াল কাজকর্ম করার লোকের অভাবে বহু মামলা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, সাধারণ মানুষ বিচার পাচ্ছেনা দিনের পর দিন। সেখানে কিছু শিক্ষকদের পাঠানো হোক, তারা কোর্ট অফিসারদের সহযোগিতা করে দেশের বিচারব্যবস্থাকে কিছুটা গতি দিতেই পারেন।
ভূমি ও রাজস্ব দপ্তর
~~~~~~~~~~~
এই দপ্তরের দীর্ঘ সুত্রিতার লাল ফাঁসের গেরোর শিকার আমরা সকলেই। ভূগোল ও অর্থনীতির শিক্ষকদের স্পেশালি এই দপ্তরে নিয়োগ করা হোক।
পর্যটন
~~~~~
রাজ্যের পর্যটনশিল্প একেবারে তলানিতে পৌঁছেছে। ভ্রমনপিপাসু কিছু শিক্ষকদের ছোট ছোট দল গঠন করিয়ে বিভিন্ন পর্যটন সম্ভাবনাময় জায়গা গুলোতে পাঠানো হোক। সেখানকার ইনফ্রাস্ট্রাকচার খতিয়ে দেখুন এবং গোটা বিষয়টার উপরে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিক, পরামর্শ দিক- টুরিষ্টের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করে, কীভাবে সরকারের আয় বাড়তে পারে এই খাত থেকে।
লাইব্রেরী
~~~~~~
রাজ্যের প্রায় সকল লাইব্রেরীতে কর্মীর অভাব রয়েছে, নিয়মিত সংস্কারের অভাবে বই এর তাকে ধুলো জমছে। এখানে কিছু শিক্ষককে দায়িত্ব নিয়ে টেম্পোরারি নিয়োগ দেওয়া হোক। তারা গ্রামে গ্রামে লাইব্রেরীর গুরুত্ব বোঝাক, এই লকডাউনে বাড়িতে বসে বই পড়ার অভ্যাস বাড়াতে প্রচার করুক, পাশাপাশি লাইব্রেরীগুলোকে সাফাই করে আবার তার শ্রী ফিরিয়ে আনুক- প্রয়োজনে রোজের শ্রমিক করে সাফাই করে লাইব্রেরীগুলোকে আবার আবাদ করে তুলুক।
পরিযায়ী শ্রমিক এ্যাসিষ্ট
~~~~~~~~~~~~~~~~
বিভিন্ন রাজ্যে বা ভিন জেলাতে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকরা ঘরে ফিরছে, অধিকাংশ শহরে ঘোষিত বা অঘোষিত লকডাউন চলছে। নানা ধরনের সমস্যা ও কষ্টের সম্মুখীন হচ্ছে সেই শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে। শ্রম দপ্তরের অধীনে থেকে এই হতভাগ্য শ্রমিকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে সুস্থ ভাবে তাদের ঘরে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের পরিবহণ ও অন্যান্য জরুরী দপ্তরের সাথে লিয়াজো মেন্টেন করার কাজে শিক্ষিত সরকারি কর্মচারী তথা শিক্ষকদের নিয়োগ করা হোক রাজ্যের প্রতিটি প্রশাসনিক ব্লক ধরে।
বনদপ্তর
~~~~~~
বহু শিক্ষক ও সরকারী কর্মী শখের বাগান করতে খুব ভালবাসেন, তাদের বনদপ্তরের বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করা হোক। সবুজায়ন ও বনসৃজন প্রকল্পে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হোক। এতে বনদপ্তরও কিছুটা অক্সিজেন পাবে, ঘরে বসে থাকা শিক্ষকেরাও কটাদিন হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন মুক্ত পরিবেশে।
তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর
~~~~~~~~~~~~~
এই দপ্তরেও কর্মী অপ্রতুল। রাজ্যের বিভিন্ন বিষয়ে সংগৃহীত তথ্য পঞ্জীকরনের এই এক অব্যর্থ সুযোগ, শিক্ষকের এই কাজে নিয়োগ করা হোক।
ভার্চুয়াল প্রচার
~~~~~~~~~
সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রায় প্রতিজন শিক্ষকই ভীষণভাবে অ্যাক্টিভ, তাদের নিয়ম করে সরকারি সচেতনতা প্রচার করানো হোক একটা নির্দিষ্ট দল দিয়ে। এটা স্কুল পরিদর্শকেরা মনিটর করুক।
বিবিধ সরকারি দপ্তর
~~~~~~~~~~~~~
পুরসভা, পঞ্চায়েত, জেলা পরিষদ, কর্পোরেশন, সেচ দপ্তর, দমকল দপ্তর, উদ্বাস্তু ত্রান ও পুনঃর্বাসন দপ্তর, মৎস দপ্তর, প্রাণী সম্পদ উন্নন দপ্তর, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তর, বস্ত্র দপ্তর, প্ল্যানিং, স্ট্যাটিসটিক্স ও প্রোগ্র্যাম মনিটরিং দপ্তর সহ বহু ইমারজেন্সি দপ্তরে পর্যাপ্ত কর্মীর অভাব রয়েছে- সেখানেও শিক্ষকদের দায়িত্ব দেয়া হোক, কারন মাস্টারেরা দায়িত্ববান ও সৎ- তারাই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলে। শিক্ষকদের হাতে এই দপ্তরের কিছু দায়িত্ব গেলে আমার বিশ্বাস এনারা একটা মসৃণ প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবেন।
আপনি সহমত পোষণ করলে পোষ্টটিকে শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন।

মঙ্গলবার, ৯ মার্চ, ২০২১

হিন্দু গোত্র

 


গোত্রমানব জীবনের একটি অপরিহার্য উপাদান কারণ এটি মানবের সনাতনী পরিচয় সনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। মরা সবাই প্রপিতামহ ব্রহ্মা থেকে এসেছি, যদিও আমাদের আদি পিতা-মাতা যথাক্রমে মনু ও শতরূপা। গোত্র, যা গরুর পালকে বোঝায়, ঋগ্বেদে উল্লেখ অনুযায়ী যা একটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত পূর্বপুরুষকে নির্দেশ করেএকটি নির্দিষ্ট গোত্রের সদস্যদের বৈশিষ্ট্যগুলি ভাগ করে নেওয়া হয়, তা সে কাজের মাধ্যমে অর্জিত হোক বা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য

হিন্দু ঐতিহ্য অনুসারে, গোত্র হল একটি আত্মীয় গোষ্ঠীর পরিচয় যা বংশ বা বংশানুক্রমের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়। গোত্র এবং উপাধি তার পরিবারের সদস্যদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বিস্তৃত অর্থে, এটি একক পিতৃতান্ত্রিক বা সাধারণ পুরুষ পূর্বপুরুষের বংশধরদের বোঝায়। হিন্দু ঐতিহ্যে, গোত্র বিবাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং একই গোত্রের কাউকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ।

আমাদের প্রদত্ত নামগুলি গোত্রের পরিবর্তে ঐতিহ্যবাহী পেশা, বসবাসের স্থান বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত করে। গোত্র শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বৈশ্যদেরই থাকে। অন্তজ্য বর্ণের গোত্র থাকেনা কারণ ঐতিহাসিকভাবে তাদের শিক্ষা অর্জনের অনুমতি ছিল না। আজ, সমস্ত বর্ণ তাদের গোত্রের স্ব-ঘোষিত নাম ব্যবহার করেগোত্র পদ্ধতি মূলত আপনার পরিবারে পৈতৃক জিন সনাক্ত করার জন্য একটি হাতিয়ার এক কথায় Y ক্রোমোজোম সনাক্তকরণতাই রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় না হলেও তাদের ভাইবোন হিসেবে গণ্য করা হ

বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে, একটি বংশের রক্ত প্রবাহিত হয় পুরুষ পরম্পরায়। সুতরাং বংশের রক্তের ধারক ও বাহক হলো পুরুষ। সনাতন ধর্মের বংশ রক্ষার ধারায় ছিলেন প্রথম সত্য যুগের শুরুতে ব্রহ্মার মানস সন্তানদের মধ্যে অন্যতম ঋষিগণ। পরবর্তীকালে অন্যান্য ঋষির বংশ পরম্পরাও পরিলক্ষত হয়। ব্রহ্মার মানস পুত্রগণের থেকে আগত প্রতিটি বংশ এক একটি গোত্র বা রক্তের ধারায় প্রবাহিত।

বৈদিক তত্ত্ব অনুসারে, ব্রাহ্মণরা হলেন সাত ঋষির নিকটাত্মীয়, যারা ব্রহ্মার সন্তান বলে স্বীকৃত এবং যোগশক্তির মাধ্যমে গর্ভধারণ করেছিলেনমহর্ষি গৌতম, শাণ্ডিল্য, ভরদ্বাজ, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, বশিষ্ট, কশ্যপ এবং অত্রিএই আটজন ঋষি থেকেই যাবতীয় ১০৮ গোত্র বিবর্তিত হয়েছে, বিশেষ করে ব্রাহ্মণদেররবার্ট ভেন রাসেলের মতে, অসংখ্য হিন্দু গোত্রের নামকরণ করা হয়েছিল উদ্ভিদ, প্রাণী এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বস্তুর নামে এবং তাদের উৎপত্তি ছিল উপজাতীয়উদাহরণস্বরূপ, ভরদ্বাজ একটি লার্ক অর্থাৎ একটি ছোট গান গাওয়া পাখি থেকে আগত, কৌশিক কুশ থেকে, অগস্ত্য অগস্তি ফুল থেকে, কশ্যপ কচ্ছপ থেকে এবং তৈত্তিরী তিতিরকে নির্দেশ করেন।

একই গোত্রের লোকদের আত্মীয় হিসাবে গণ্য করা হয়। ফলে হিন্দু ঐতিহ্যের চর্চা অনুযায়ী  তাদের মধ্যে বিবাহ হয়না, কিছু অনুযায়ী এই ধরনের বিবাহের ফলে সন্তান বংশগত অসুস্থতা লাভ করে একই গোত্রের হওয়ায়, পিতৃতুল্য তুতো ভাইবোনদের বিবাহ করা নিষিদ্ধসংস্কৃত শব্দ সাহা উদরা, যার অর্থ সহ-জরায়ু বা একই গর্ভে জন্মগ্রহণ করা, তৎসম শব্দের উৎস হল সহোদর (ভাই) এবং সহোদারি (বোন)

 

হিন্দুদের প্রধান গোত্র তালিকাঃ

কৌশিকা, কাউন্দিন্য, মারিচি, মীন, ভৃগু, সিওয়াল, বৃহদবালা, চন্দ্রত্রে, প্রতিরোধ, কদম, অত্রি, অগস্ত্য, আলম্যান/আলম্ব্যয়ন, আত্রেয়, কাশ্যপ, মৌদ্গল্য, ভরদ্বাজ, বশিষ্ট, বৃহস্পতি, বিশ্বামিত্র, জামদগ্ন্য, শিব, ভার্গব, শান্ডিল্য, ব্যাসঋষি, ধন্বন্তরি, পরাশর, সাবর্ণ, কাত্যায়নী, গৌতম, ঘৃতকৌশিক, নাগঋষি, চান্দ্রায়ণ, বাঘ্রঋষি, হোবি ঋষি, বাতস্য, বৃদ্ধি, কৌন্ডল্য, শুনক, কৃষ্ণাত্রেয়, জাতুকর্ণ, কাণ্ব, কুশিক, আঙ্গিরস, গর্গ, বিষ্ণু, শক্তি

 

অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুর মুদিরাজাদের ২৬০০টি গোত্র আছেজা এবং রাজপুতদের ৩০০০টি গোত্র আছেবেশিরভাগ হিন্দুদের কাছে, গোত্র সর্বদা পিতা থেকে সন্তানের কাছে চলে আসে। অন্যদিকে, মালয়ালি এবং তুলু সম্প্রদায়ের লোকেরা এটি মা থেকে সন্তানের কাছে চলে আসে

একই গোত্রে চারটি বর্ণে থাকতে দেখা যায়। কারণ, একই ঋষির সন্তানরা একেক সময়ে একেক কাজে মনোযোগী হয়ে থাকে। যে শাস্ত্র অধ্যয়ণ বা বুদ্ধিভিত্তিক জীবিকা অবলম্বন করে সে ব্রাহ্মণ হিসেবে, রাজধর্ম পালনকারী ক্ষত্রিয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগী হলে সে বৈশ্য এসব পেশাগত লোকদের সেবা করেই সন্তুষ্ট অর্জনে আগ্রহীরা শূদ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে থাকে। এ গুণাবলীসমূহ কেউ জন্মে প্রাপ্ত হয় না, অর্জন করতে হয়। তাই বর্নাশ্রম সঠিক সটঠিক হলেও বর্ণপ্রথা ভুল ও মিথ্যা


সোমবার, ৮ মার্চ, ২০২১

যারা আজকের তৃনমূল তারা প্রত্যেকেই আগামীর বিজেপি।

 

আজকে মালদহে কার্যত গোটা তৃনমূল দলটাই বিজেপিতে রুপান্তরিত হয়ে গেল। আজ আরো একবার প্রমাণিত হয়ে গেল- যারা আজকের তৃনমূল তারা প্রত্যেকেই আগামীর বিজেপি।
তৃনমূল দলের জন্মলগ্ন থেকেই মমতা ব্যানার্জী বহু যত্ন করে কংগ্রেস ত্যাগী মমতাপন্থীদের বিজেপির ঝাণ্ডা ধরতে শিখিয়েছিলেন অনেক সময় নিয়ে। অগ্নিকন্যা, সততার প্রতীক, অনুপ্রেরণা, মা-মাটি-মানুষ, দিদিকে বলো ও শেষমেশ ‘বাংলার নিজের মেয়ে’- বিক্রিত মিডিয়ার প্রত্যক্ষ মদতে নিজেকে নানা ব্র্যান্ডে বিকোতে মমতার জুড়ি মেলা ভার; আর এতে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছিল RSS, যার জন্য তৃনমূলের ২০২১ প্রার্থী তালিকাতে ১৪ জন সঙ্ঘের নেতাকে রাখতে বাধ্য হয়েছে। এই সঙ্ঘ ঘনিষ্টতা আগেও ছিল, কিন্তু ‘দিদি’ আবেগের বিস্ফোরণে এগুলোকে কেউ দেখতেই চাইনি।
হুগলীর চাঁপদানি বিধানসভা থেকে ২০১১ সালে মুজাফফর খানকে MLA করে এনেছিল মমতা ব্যানার্জী। তারও আগে ২০০১ সালে বেহালা পুর্ব কেন্দ্র থেকে পরশ দত্তকে বিধানসভাতে স্থান দিয়েছিল মমতা ব্যানার্জী, ২০১১ ও ২০১৬ সালে এই পরশ দত্তই তৃনমূলের টিকিটে জিতেছিল জগদ্দল বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। এই দুজনের পরিচয় জানেন? এরা দুজনেই ঘোষিত RSS কর্মী। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যে করসেবকের দল বাবরি মসজিদ ভাঙ্গতে গিয়েছিল, সেই দলে এই দুজনেই ছিল ঘোষিত ভাবে। সুতরাং মমতা ব্যানার্জি অত্যন্ত সুক্ষ ভাবে দলের মাঝে গেরুয়া চাষ করেছিলেন। আজ রাতারাতি কেউ বিজেপিতে যাচ্ছেনা, এদের মাঝে গেরুয়ার বীজ বহু আগে থেকেই রোপন করেছিলেন ‘হিজাবধারী’ মমতা। খোদ শুভেন্দু বা দীনেশ ত্রিবেদীর আজকের স্বীকারোক্তি এ বিষয়ে প্রামাণ্য দৃষ্টান্ত স্বরূপ।
এভাবেই ক্রমে ক্রমে যারা তৃণমূলের নিচুস্থরের নেতা কর্মী ছিল তারা গেরুয়াতে নিজেকে আর অচ্ছুৎ মনে করেনি, এভাবেই গোটা তৃনমূলটাকে RSS আদর্শে দীক্ষিত করার কর্মসূচী চালিয়ে এসেছে বিগত দুটো দশক ধরে। আজকে যারা দেখছেন সকালে তৃনমূল আর বিকালে বিজেপি- আসলেই এরা RSS এর প্রোডাক্ট, মানুক বা না মানুক- সত্য বদলাবেনা। একারনেই বিজেপিতে যেতে তৃণমূল নেতাদের সামান্যতম চক্ষুলজ্জার প্রয়োজন হচ্ছেনা, নীতি আদর্শের মতো জটিল বিষয়ে নাইবা গেলেন। এই একটা বিষয়ে অতিবড় বাম সমর্থক বা বাম নেতাও মানবেন যে, এটা কেবলই তাঁর একান্ত অনুপ্রারণার ফসল। লাগাতার পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটু একটু করে RSS এর চাষ করেছে, কোথাও শাখা খুলতে দিয়ে তো কথাও সরস্বতী বিদ্যামন্দিরের নামে। মজা হল, গোটা তৃণমূল দলটাই আসলে আজকের বিজেপি আঁতুড়ঘর সেটা আজ প্রমাণিত। বিজেপিকে আজকে আর আলাদা করতে পারবেননা, প্রাক্তন তৃণমূলী বাদ দিলে বাংলাতে বিজেপি বলে কেউ নেই করেক পিস জোকার ছাড়া।
আজকের দিনে দাড়িয়েও যে সকল চটিচাঁটা গাম্বাট ‘আদর্শ-নীতি’ ইত্যাদির বুলি কপচায়, তাদের মুখে অনুপ্রেরণার চটি ছুঁড়ে মারুন, আর প্রশ্ন করুন- গান্ধীবাদী দলের ভেকধারী তৃণমূল নেতা মন্ত্রী সান্ত্রীরা কোন আদর্শে দীক্ষিত হয়ে- টিকিট পেয়ে অথবা না পেয়ে এই ভোটের মুখে গান্ধীর খুনী গডসের দলে নাম লেখায়?
আপনার ভোটটি নিশ্চিত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি বিজেপি সমর্থক হতেই পারেন, ভারতীয় সংবিধানে আপনি রাষ্ট্র স্বীকৃত দল বুক ফুলিয়ে করুন। কিন্তু যারা নাকি বিজেপির বিরুদ্ধে, কিন্তু বিশ্বাস করেন ‘বিজেপিকে’ রুখতে তৃণমূলকেই ভোট দেবেন- জেনে নিন, আপনি নিজেও একজন বিশুদ্ধ প্রো বিজেপি। কারন আপনার ভোট পাওয়া তৃণমূল জনপ্রতিনিধিটা কালকেই যখন বিজেপিতে চলে যাবে- তখন আপনার সন্তানকে ১০০০ টাকা সিলিন্ডার রান্নার গ্যাস আর ১০০ টাকা লিটার পেট্রলের দামের জবাবদিহি করতে হবে। লক্ষবার জয় শ্রী রাম বললেও- এসবের দাম কমবেনা বা আপনার আয় বাড়বেনা। আপনাকেই জবাবদিহি করতে হবে- কোন কারনে নোটবন্দি করে দেশকে খাদের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল? কেন প্রতিদিন দেশের সম্পত্তি বেনিয়াদের কাছে বেচে দেওয়া হচ্ছে, কেন পরিযায়ীরা হেঁটে ফিরেছিল? পাকিস্তান জুজু, মুসলমান জুজু আর রামনামে আপনার কি লাভ হয়েছে?
আপনাকেই জবাব দিতে হবে, কেন মেলা খেলার নামে রাজ্যের দেনা আজ এই পরিমাণে, কেন আজ চতুর্দিকে চালচর আর কাটমানি খোরেদের মেলা? কেন আজ রাজ্যে শিল্প নেই, কেন আজ রাজ্যে পুলিস দলদাস, কেন রাজ্যে চাকরি নেই, কেন রাজ্যের শ্রমিকেরা পরিযায়ী হয়ে অন্য রাজ্যে যায়?
পারবেন আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জবাব দিতে? পারলে তৃণমূল কেন- সরাসরি বিজেপিকেই ভোট দিন, ঘোমটার আড়ালে খ্যামটা না নেচে হিম্মৎ জুটিয়ে বিজেপির ঝাণ্ডা ধরুন। ডবল ইঞ্জিন সরকার ত্রিপুরাতেও এসেছিল- ফলাফল নেট ঘেঁটে দেখে নিন। আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পে হিন্দুরাই বেশি সংখ্যাতে ছিল, দেশের বিজেপি শাসিত রাজ্য গুলোতে সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার গরীব হিন্দুরাই। আপনি দেশপ্রেমের কাজল পরে স্বপ্নে রয়েছেন, কাল স্বপ্নদোষ হবেই- আর তখন নিজের পরিবারেই মুখ দেখাতে পারবেননা, লিখে নিন।
আর আপনি যদি মুসলমান হন তাহলে তো সোনায় সোহাগা। NRC ক্যাম্পে বসে ভাবার অনেক সুযোগ পাবেন। প্রসঙ্গত, মান্নীয়াই সংসদে বাংলাতে সর্বপ্রথম NRC এর দাবী উত্থাপন করেছিলেন। এখানেও RSS এর এজ্যেন্ডার সফল প্রয়োগ হয়েছিল, আপনি মুসলমানের ত্রাতা ভেবেছিলেন মমতাকে, আজ আপনি ভুগবেননা তো কে ভুগবে? হাজার হোক আপনার একটা গালভরা পরিচয় যে আছে- ‘দুধেল গাই’। আর কিছু না হোক, বিজেপির ষাঁড় আপনাকে পাল দিয়ে যাবে গোয়ালে নিয়ে গিয়ে। এটাই আপনার প্রাপ্তি।
তাই আজকেই ভাবুন, এখনি, এই মুহুর্তে- আপনি সত্যিই কি বিজেপি বিরোধী?
যদি তাই ই হয়, তাহলে আপনি ও আপনার পরিবার এবার জোটে ভোট দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প নিন। জোটই অন্ন-বস্ত্র-কর্মসংস্থান ও সুপ্রশাসনের জন্য আপনার হয়ে লড়াই এর জন্য দায়বদ্ধ।

প্রতিবারের ভুলের ক্ষমা হয়না, এবারে কাঠ খেলে আপনাকেই ফার্নিচার হাগতে হবে- এটা মাথায় রাখবেন, ব্যাস।

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...