বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২০

তোমার মাঝে বসত করে কয়জনাঃ করোনা ভাইরাস (৪)

 


চতুর্থ পর্ব

তিন ঘন্টায় টিকা আবিষ্কারঃ টাকার লোভ

মনে করুন, মাঝরাত্রে আপনার পেটে ভীষণ ব্যাথা, যন্ত্রণায় আছার-কাছার করছেন; আশেপাশে ডাক্তারও নেই। এমন সময় বাড়ির সামনের গ্যারেজ মালিক ত্রাতা হিসাবে উপস্থিত হলেন, না তিনি তার গাড়ি নিয়ে আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য আসেননি- তার গ্যারেজ ব্যবসার বুদ্ধিতে আবিষ্কৃত ওষুধ সে আপনাকে খাওয়াবে বলে এসেছে।

কি, গাঁজাখুরি বলে মনে হল তাইনা? হওয়ারই কথা, আমি গরীব ভেতো বাঙালী, তাই অজ পাড়াগাঁয়ে বাস- আমার বা আমাদের মতন লোকেদের কথা ফেলে দেওয়াটাই দস্তুর। কিন্তু ওই গ্যারেজওয়ালাটা যদি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষটি হন, আর আপনার আমার স্থানে একটা দেশ বা গোটা মহাদেশ বা ধরুন গোটা পৃথিবী রোগাক্রান্ত হয়?

আপনি আবার প্রমান ছাড়া মানবেননা, তথ্য-যুক্তি সবকিছু আচ্ছন্ন করে ফেললেও- পবিত্র যে বিশ্বাস সেখানে পৌছানো খুবই শক্ত, তাই তো আমাদের মাঝেই ভক্ত জন্মায়। ভ্যানতারা না বলে সোজা কাজের কথায় আসি-

ঘটনা পরম্পরাঃ করোনা ভাইরাস উৎপত্তি হল চীনে, মানুষ মরছে বেশি আমেরিকা ইউরোপে, বিজ্ঞানীরা দিশাহারা, ওষুধ কোম্পানি গুলো মাথার চুল ছিঁড়ছে- এমতাবস্থায় সর্বপ্রথম “করোনা-ভাইরাসের ভ্যাকসিন বা টিকা রয়েছ আমাদের কাছে” বলে দাবী কে করেছিল সেটা কি জানেন? আসলে সমবেত কন্ঠস্বরও পুঁজির কাছে অসহায়, সত্যকে ‘বিশ্বাসের’ বুদ্বুদে ঢেকে- প্রহেলিকাময় করে দিয়েছে।

কথা হচ্ছে বিশ্বের ধনীতম ব্যাক্তি, বিল গেটস এর বিষয়ে। তিনি বিশ্বখ্যাত কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার তথা বিজ্ঞানী, চূড়ান্ত সফল ব্যবসাদার, সমাজসেবী ইত্যাদি। মুশকিল হল এই ‘ইত্যাদি’তেই, তিনি ডাক্তার নন, তার হাসপাতালের ব্যবসা নেই, তিনি জীববিদ্যার ছাত্রও ছিলেননা, তার ওষুধ কোম্পানীও নেই। তিনি কম্পিউটার তৈরি করেন, তার হরেক যন্ত্রাংশ বেচেন। এহেন তিনি সবকিছু ছেড়ে তিনি বেশ কয়েকবছর ভ্যাক্সিনের পিছনে আঠার রয়ে রয়েছেন। তাদের কি আছে? তাদের আছে টাকা, বিপুল পুঁজি- যা আমি আপনার কল্পনার অতীত; আর এই পুঁজি নিয়ে তারা ‘স্বামী-স্ত্রী’ সমবেতভাবে একটা দাতব্যসংস্থার মাধ্যমে ‘সমাজসেবা(!)’ করে চলেছেন।

করোনা ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের পিছনেও তারা আড়াই হাজার কোটি টাকার উপর লগ্নি তথা দান করেছে, এটা প্রকাশিত- অপ্রকাশিত কত রয়েছে তা কে জানে! আপনি বলবেন, টুইটারের কর্নধার জ্যাক ডরসি, উইপ্রোর আজিম প্রেমজি, সোরের ফান্ডের জর্জ সোরেস, ফোর্টেক্সি মেটালসের এন্ড্রু ফরেস্ট, স্কল ফাউন্ডেশনের জেফ স্কল, আমাজনের জেফ বোজেস, ডেলের মাইকেল ডেল সহ পৃথিবী প্রথমশ্রেনীর সকল ব্যবসাদারই তো করোনা গবেষণা খাতে টাকা দান করেছে, বিল গেটসের ক্ষেত্রে প্রশ্ন কেন? কারন বাকিরা কেউ ভ্যাকসিন বিলোয়না।

ভ্যাকসিন নিয়ে বিল গেটসের মোহ এক বিচিত্র পর্যায়ের, বহু ভ্যাক্সিনের প্যাটেন্ট নিয়ে বসে আছেন চিকিৎসা বিদ্যার মানুষ না হয়েও। না, তবে সরাসরি নিজেদের নামে কোনো পেটেন্ট এদের নেই, কিন্তু এমন পেটেন্ট যাদের রয়েছে সবই গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থে পুষ্ট। যেমন, ইংল্যান্ডের The Pirbright Institute নামের একটা বায়োলজিক্যাল রিসার্চ সেন্টার; এদের কাছে বেশ কিছু করোনা ভাইরাসের পেটেন্ট রয়েছে, যদিও The Pirbright Institute দাবী করেছে তাদের কাছে নোভেল করোনা ভাইরাসের স্টেইনের পেটেন্ট নেই। প্রসঙ্গত, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি যে করোনা প্রতিষেধক ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা করছে ও বানিজ্যিক ভাবে টিকা উৎপাদনের জন্য প্রায় প্রস্তুত- তাদের সবচেয়ে মুখ্য সদস্য এই The Pirbright Institute।

এই দাবী আমার নয়, “Humans Are Free” নামের একটি মানবাধিকার সংগঠন, ২৯শে জানুয়ারি, ২০২০ তারিখে- বিশাল এক আর্টিকেলে, তথ্য ও তত্ত্ব দিয়ে এই বিষয়টা লিখেছে যে- নোভেল করোনা ভাইরাস বিল গেটসের আর্থিক সহায়তায় এই The Pirbright Institute রয়াসনাগারে তৈরি করেছে। সন্দেহের কারন হল, The Pirbright Institute সামান্য একটা প্রেসবিজ্ঞপ্তি করে Humans Are Free এর এই দাবীকে শুধুই নাৎস করে দিয়েই সমাপ্তি দিয়েছে। কোনো মামলা মোকদ্দমা কিছুই করেনি বিগত ৩ মাস কালে, না The Pirbright Institute এর তরফে, না Bill and Melinda Gates Foundation এর তরফে।

বর্তমানে, আমেরিকা তো বটেই, দক্ষিণ কোরিয়া সব বিশ্বের বহু দেশে দুরদুরিয়ে ‘Human Trial’ চলছে যে DNA ভ্যাকসিনটি- তার নাম INO-4800, এটা ডেভলপ করেছে যে মার্কিন কোম্পানী তার নাম Inovio Pharmaceuticals, প্রসঙ্গত এরাই সর্বপ্রথম ফার্মা কোম্পানি, যারা মার্কিন FDA দ্বারা ছাড়পত্র পেয়েছিল মানবশরীরে প্রয়োগের ক্ষেত্রে- সেই মার্চের শেষ সপ্তাহে। অথচ পশুর শরীরে সাফল্যের সাথে উৎরে গিয়েছে এমন অনেক ফার্মা কোম্পানিই এই ছাড়পত্রের জন্য হত্যে দিয়ে পরে রয়েছে, শিকে ছেড়েনি। দৃশ্যত ইনোভিও অতি ক্ষুদ্র একটা ফার্মা কোম্পানি। এখানেই মূল পালা গানটা লুকিয়ে রয়েছে, এই ইনোভিওর ইনভেস্টর(১) হচ্ছে ‘Bill and Melinda Gates Foundation’।

FDA এর যুক্তি ছিল ‘Bill and Melinda Gates Foundation’ এর সাহায্য প্রাপ্ত সংস্থাগুলো ২০০৩ সাল থেকে শ্বাস সম্বন্ধীয় SARS বা MARS জাতীয় রোগের বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা করছে, তাই তাদের করোনা ভাইরাসের হিউম্যান ট্রায়ালের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাকিদের কোন গ্রাউন্ডে ঝুলিয়ে রখেছে সে বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে।

এপ্রিলের ৩০ তারিখে তো এই ইনোভিও কোম্পানি- জার্মানির Richter-Helm BioLogics কোম্পানির সাথে মিলে বিপুল আকারে ভ্যাকসিনের বানিজ্যিক উৎপাদনের ঘোষণা করে দিয়েছে। অবশ্যই আনন্দে ফেটে পরার মতই ঘটানা, তাইনা!

তাহলে এই লিঙ্কে গিয়ে ইনোভিওর দাবিটা(২) দেখে আসুন। ১০ই জানুয়ারি, ২০২০ তারিখে চীন প্রথম প্রকাশ করে SARS-CoV2/Covid-19 ভাইরাসের কথা, ইনোভিও বলছে তারা নাকি মাত্র ৩ ঘন্টার মধ্যে ঐ দিনই করোনার ভ্যাক্সিন ডিজাইন করে ফেলেছিল, যেটা অজানা এই নোভেল করোনার DNA এর সাথে হুববু মিলে গেছে কাকতালীয়ভাবে। পিসি সরকারের ম্যাজিক এই আবিষ্কারের কাছে দুগ্ধপোষ্য শিশু। শুধু তাই নয়, এই ইনোভিও কোম্পানি মার্কিন কংগ্রেস থেকে ৭০ কোটির অনুদানও লাভ করে রাতারাতি।

ইনোভিও ৩ ঘন্টায় ‘ভ্যাক্সিন’ রেডি দাবী করলে- ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ভীষণ ভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে সেই প্রচারনা মূলধারার সংবাদ পত্র থেকে কর্পুরের মত উবে যায়। কয়েকজন ত্যাদোর নাছোড়বান্দা ওই “৩ ঘন্টার মিরাকেল” দ্রুত ব্যবহার করার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তারা জানায়– সেটা আগষ্টের আগে সম্ভব নয়। প্রশ্ন উঠা কি সঙ্গত নয় যে, বিনা টেস্টিং, বিনা জিন কোডিং, বহু কিছু ছাড়াই কিকরে মাত্র ৩ ঘন্টায় ভ্যাক্সিন তৈরি করতে পারে? মার্কিন সরকারই বা কেন শুধুই এদেরই অনুমতি দেয়? উত্তর দেবার কেউ নেই, তাই প্রশ্নেরা বোবা হয়েই রয়ে যায়।

গোটা পৃথিবীর অর্থব্যবস্থা না ধসা পর্যন্ত, যতক্ষননা গোটা পৃথিবীতে কোনায় কোনায় না ছড়িয়ে পড়ছে রোগটি, কয়েক কোটি গরীব ও বুড়ো হাবড়া না মরছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটা বাজারে ছাড়া যাবেনা- এটাই তো মোদ্দা কথা দাঁড়ায়। সম্ভবত পুঁজিবাদের ল্যাবটারিতে তৈরি একটা পুঁজের নাম নোভেল করোনা ভাইরাস- এমনটা হওয়া কি খুব আশ্চর্যের?

প্রাকৃতিকভাবেই করোনা ছড়িয়েছে- এই পবিত্র বিশ্বাসে যারা স্থির রয়েছেন তাদের জন্য একবালতি করুনা রইল। সারা পৃথিবী রিসার্চ করে যা করতে পারছেনা, কেউ মাত্র ৩ ঘন্টাতেই সেটা করে দিয়েও নিশ্চুপ এই ‘মে,২০২০’ এর দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। খদ্দের বাড়ার অপেক্ষা করছে নাকি আরো অনেক বড় কোনো ষড়যন্ত্র রচিত রয়েছে এর পিছনে- কে জানে কি এর জবাব। ইনোভিওর ওয়েবসাইটে দেখে আসুন- ‘৩ ঘন্টার মিরাকেল’ জ্বলজ্বল করছে। ৩ ঘন্টায় অদৌ কীভাবে ভ্যাক্সিন তৈরি হতে পারে সেটা নিশ্চই যা জীববিদ্যার ছাত্র তারা বিশ্লেষণ করবে।

নাহ, এই দাবিও আমি করছিনা- প্রশ্ন তুলেছেন একজন মার্কিনি এটর্নি, নাম- রবার্ট ফ্রান্সিস কেনেডি জুনিয়র। ইনি কোনো এলি তেলি কেউ নন, সাবেন ফেডারাল এটর্নি জেনারেলের পুত্র ও সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির ভাইপো। তার ভাষ্য মতে(৩), বিল গেটস গোটা পৃথিবীর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, গোটা পৃথিবীতে ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষেত্রে তার ঘৃন্য ভূমিকা রয়েছে। দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশে গেটস ফাউন্ডেশনের ভ্যাকসিনের প্রভাবে পোলিও, মার্স, ইয়োলো ফিভারের মত রোগ ছড়িয়ে পরেছে, যেগুলো একসময় নির্মুল হয়ে গেছিল। এছাড়া নিত্যনতুন ভাইরাসের প্রকোপ লেগেই আছে, যার কৃতিত্ব এই Bill and Melinda Gates Foundation এর; আর এই পরিকল্পনা এরা WHO কে সাথে করেই করছে, কারন হু এর অনুদানের অনেকটা অংশ গেটস ফাউন্ডেশন থেকে আসে।

আপনি গেটস ফাউন্ডেশনের(৪) সাইটে চলে যান, সেখানেই পাবেন MICROCHIPS BIOTECH(৫) এর উল্লেখ। এরা ভ্যাকসিনেশনের সময় লক্ষ লক্ষ রোগীর হাতের শিরায় একটা অতি ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক চিপস ঢুকিয়ে দেয়, যার দ্বারা সেই মানুষগুলিকে এরা যন্ত্রের মত ২৪x৩৬৫ ঘন্টা পর্যবেক্ষনে রাখে চিকিৎসার নামে। Crypto mining system based sensors(৮) নামক প্রযুক্তির দ্বারা মানুষের শারীরবৃত্তীয় গতিবিধির সাথে সাথে সাইকোলজিক্যাল বা মানসিক গতিবিধির উপরেও নজরদারি চালাচ্ছে। লিঙ্কের প্রবন্ধটা পড়ুন, বাকিটা নিজেই বুঝে যাবেন।

আসলে ব্যাক্তির ব্যাক্তিগত পরিসরের সকল কিছু গতিবিধিই এর দ্বারা মনিটর করা হচ্ছে। এদের একমাত্র লক্ষ্য মানব শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি সিস্টেমের উপরে জাহিরি করা। অস্কার বিজয়ী চিত্রপরিচালক নিকিতা মিখালকভ, Crypto mining system based sensors এর উপরে একটি পূর্ণদৈঘ্যের তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছেন, যেখানে গেটস ফাউন্ডেশনের ‘কুকর্ম’ কার্যকলাপ বিষয়ে খুলমখুল্লা যুক্তি ও তথ্য সামনে এনেছেন। প্রাক্তন বিখ্যাত টেনিস খেলোয়ার মারাট সাফিনের মত বহু বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্ব নিকিতাকে সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু মূলধারার মিডিয়া চলে পুঁজিতে, আর এই পুঁজির তালিকায় বিলগেটসের উপরে আর কে আছে এই বিশ্বে? তাই সকলেই চুপ রয়েছে। এই MICROCHIPS BIOTECH এর লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত কয়েকশো কোটি মানুষের শরীরে এই চিপ ইমপ্ল্যান্ট করে দেওয়া।

গোটা বিশ্বজুড়েই এই গেটস ফাউন্ডেশনের জাল বিছিয়েছে ২০১৪ সাল থেকে সমাজসেবার মোড়কে। ২০১৫ সালের শেষের দিকে, আমেরিকার সিয়াটেলে এক প্রযুক্তি সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে বিল গেটস নিজেই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, “আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে আসন্ন মহামারী সম্পর্কে সতর্ক করেছি সকলকে, এটি আমাদের সভ্যতাটিকে দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেবে”। ইউটিউবে এটা আজও উপলব্ধ। বাকিটা নিজেই অনুমান করে নিন।

নিকিতা দেখিয়েছেন, গেটস তার কম্পিটারের ট্রোজান ভাইরাসের হ্যাক করার ক্ষমতা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানবদেহের ভাইরাসে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল ২০০৪ সালে, একটি বক্তিতায় সেটাও বিল গেটস নিজেই সেটা জানিয়েছিল, যে ভিডিওটা পৃথিবীর সকল মাধ্যম থেকেই মুছে দেওয়া হয়েছে এর পর। নিকিতার মতে, আসন্ন করোনা ভাইরাসে টিকা আসলে বিশ্বদাসত্ব ব্যবস্থার, ইলেকট্রনিক্স বা তারচেয়েও কোনো উন্নত কোডিং সংস্করণ।

এ এক বেসরকারী বৃহত্তম ডেটাবেস যা দিয়ে বহুকিছুই করা সম্ভব- ভাল খারাপ উভয়ই। এদের কি উদ্দেশ্য, তা এরাই একমাত্র জানে। চিপ ইমপ্ল্যান্টের ভয়াবহতা বিষয়ে এই প্রতিবেদনটা পড়ে দেখতে পারেন, লিঙ্ক- (৬)। গেটস, এই ভ্যাকসিন সেক্টরে তার আগামীর ব্যবসা সম্প্রসারনের জন্য সম্ভবত এখন লগ্নি করে যাচ্ছে, ভবিষ্যতে যা সুদে আসলে তুলে নেবে। এই করোনা প্যন্ডেমিকিই সেই ভবিষ্যৎ কিনা সময় জবাব দেবে।

ক্রিপ্টো কথাটার সাথেই চলে আসে ক্রিপ্টোকারেন্সির কথা। মানে ওই বিটকয়েন বা ঐ জাতীয় সাঙ্কেতিক মুদ্রা ব্যবস্থা। করোনা কি তাহলে আগামীর অর্থব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা? যেখানে ব্যাঙ্ক নেই, ক্রেডিট কার্ড নেই, একাউন্ট নাম্বার নেই, সবটাই একটাই পরিচয়- ওই Crypto mining system based sensors, সেখানেই ব্যাক্তির যাবতীয় তথ্য রয়েছে। এটা আমার ব্যাক্তিগত কল্পনা, সত্যটা আগামীর গর্ভে।

আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে সম্প্রতি এই গেটস ফাউন্ডেশন আমার ভারত সরকারের স্বাস্থ মন্ত্রকের অধীনে থাকা Public Health Foundation of India (PHFI) সংস্থার সাথে গাটছড়া বেঁধেছে। তার আগে অবশ্য তোষামোদ স্বরূপ, Bill and Melinda Gates Foundation আমাদের প্রধান সেবককে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন(৭)। এই গাঁটছড়া Immunisation Technical Support Unit (ITSU) নামের একটা কর্মসূচী চালাচ্ছে সেই ২০১৭ সাল থেকে।

গোটা বিশ্বজুড়ে করোনা আজ মহামারী, তাহলে কি এদের ‘করোনা প্যান্ডেমিক’ কাহিনী প্রিপ্ল্যানড! আলাদা আলাদা দেশের অর্থব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে একটা ছাতা ‘New World Order’ এর আওতায় সকলকে আনার জন্য কি এই নিখুঁত পরিকল্পনা? পুঁজিবাদ আর গুপ্ত সংগঠনগুলোর রমণ নতুন কিছু নয়, জায়োনিজমের অন্যতম লক্ষ পৃথিবীর জনসংখ্যা অর্ধেক করে দেওয়া। জায়োনিজম হল তারা- যারা ঘোষিত শয়তানের পূজারী। কে না জানে The number of beast বা শয়তানের নাম্বার হল- ৬৬৬; এটা নিউ টেস্টামেন্টে রয়েছে। আর ইনোভিওর ৩ ঘন্টায় তৈরি ভ্যাক্সিনের পেটেন্টের নামার কত? নিজেই নেটে সার্চ করে দেখে নিন। পাঠকের ভাবনা ও বিচারের উপরে বিশ্বাস রেখে, আগামীর জন্যই ‘সবটা’ মুলতুবি থাকুক নাহয়।

1. https://www.businessinsider.in/.../articleshow/75013340.cms

2. http://ir.inovio.com/.../Inovio-Accelerates.../default.aspx

3. https://www.irishcentral.com/.../robert-kennedy-jr-bill...

4. https://www.gatesfoundation.org/.../2014/01/opp1068198

5. https://darebioscience.com/microchips-biotech/

6. https://www.govtech.com/.../chip-implants-the-next-big...

7. https://economictimes.indiatimes.com/.../71164934.cms...

8. https://www.independent.co.uk/.../microsoft...

সোমবার, ১১ মে, ২০২০

লকডাউন ও লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক


প্রতিদিন আমরা দেখতে পারছি লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক শ'য়ে শ'য়ে কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বা সাইকেল চালিয়ে নিজের দেশে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে শহরগুলো থেকে। অনেকে শেষ অবধি পৌঁছতে পারছে না, রাস্তাতেই হার স্বীকার করে নিচ্ছে। মৃত শ্রমিকের সংখ্যা করোনায় মৃতের সংখ্যার মত গোনা হচ্ছে না, কোনো ওয়েবসাইট মৃত শ্রমিকের সংখ্যার "ইউনিফর্ম" বা "লগারিদমিক" - কোনো স্কেলেই "কার্ভ" তৈরি করে দেখাচ্ছে না। হাতে গোনা কিছু খবর আসছে যেমন ট্রাকের ধাক্কায় গুজরাটে ৫ জনের মৃত্যু বা অরঙ্গাবাদে ট্রেনের তলায় ১৫ জন অথবা আম বোঝাই ট্রাক উল্টে ৫ জন। এর বাইরেও যে অনেক বড় সংখ্যক শ্রমিক মাঝরাস্তায় হারিয়ে যাচ্ছে সেই নিয়ে সন্দেহ নেই।

তবে করোনায় মৃত্যুর সঙ্গে শ্রমিকের মৃত্যুর একটা তফাৎ রয়েছে। করোনায় মৃত্যু ভাইরাসে, আর শ্রমিকের মৃত্যু রাষ্ট্রের জন্য। করোনায় মৃত্যুগুলো রোখা সম্ভব ছিল না, শ্রমিকদের মৃত্যুগুলো রোখা যেত। রাষ্ট্র যদি এদের থাকার-খাওয়ার ব্যবস্থা করতো, অথবা প্রত্যেকের হাতে এক মাসের রোজগার পৌঁছে দিত তাহলে এই পরিণতি হতো না। কিছু কিছু বিজ্ঞ দেখছি বলছে যে সরকারের কী দোষ, সরকার কী করবে ইত্যাদি। তাদেরকে শুধু একটাই কথা বলব যে অপেক্ষা করুন, যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে চলেছে দেশ এবং বিশ্ব তাতে সরকারি চাকুরেদেরও মাইনে এবং চাকরিতে কাট ছাঁট হতে চলেছে, বেসরকারি চাকরি... হেঁ হেঁ। আপনি আইটিতে কাজ করেন? ভাবছেন আইটিতে ওয়ার্ক ফ্রম হোম হয়, চাকরিতে টান পড়বে না? কে নেবে আপনার সার্ভিস? কে হবে আপনার ক্লায়েন্ট? আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান - যে দেশগুলোয় ভারতের সবচেয়ে বেশি আইটি রফতানি সেখানকার সব থেকে বড় বড় কোম্পানিগুলোও চরম অর্থনৈতিক সংকটে। ২০০৮-এর মত এখনো লেম্যান ব্রাদার্স বা এআইজি দেখতে পাননি তার কারণ এদের ব্যালেন্স শিট এবং ব্যাংকগুলোর কাছে প্রকৃত বকেয়া ঋণের হিসেব এখনো করে ওঠা হয়নি। লকডাউন ওঠার পরেই আসল চিত্র দেখতে পাবেন। আমেরিকায় বেকারত্ব ১৫%-এ পৌঁছেছে যা ঐতিহাসিক। সেখানকার সরকারও আউটসোর্সিংয়ের ওপর বিধিনিষেধ চাপাবে। মার্কিনী বিশেষজ্ঞরা সকলেই এক মত যে এই ক্রাইসিস ২০০৮-এর গ্রেট রিসেশনের থেকেও অনেক গ্রেটার। তাই আইটি ভাই বোনেরা একটু ধৈর্য ধরুন, আমি নিশ্চিত যারা এখনো পরিযায়ী শ্রমিকদের সাথে সমব্যথী হতে পারছেন না তারা কয়েক মাস পরেই হতে পারবেন।
তবে শুধু কয়েক কোটি পরিযায়ী শ্রমিকই এতে বিপর্যস্ত এটা খুব ভুল ধারণা। তাদের কষ্টটা হয়ত সর্বাধিক এবং তারা শ'য়ে শ'য়ে কিলোমিটার হাঁটছে বলে সেটা সামনে আসছে, কিন্তু অর্থনৈতিক বিপর্যয় চিত্রটা যে অনেক বিপুল বুঝতে পারবেন যখন আপনি নিজের পাড়ায় খোঁজ নেবেন। ছোট কারখানা, রেস্তোরাঁ, দোকান, ট্যাক্সি বা অটোচালক, রিকশাচালক, হকার - এই বিপুল সংখ্যক মানুষ, যারা ছোট ব্যবসা বা অস্থায়ী চাকরি করে পেট চালান তাদের রেশনের চাল আর আটা ছাড়া বাকি কোনো কিছু কেনার আর পয়সা নেই। শুধু এরাই নন, টিউশন করে পেট চালানো, অথবা স্কুল বা কলেজের অস্থায়ী শিক্ষক/শিক্ষিকা, যারা আপাত মধ্যবিত্ব তাদেরও অনেকের অবস্থা এরকম, আত্মীয় স্বজনের থেকে ধার চাইতে হচ্ছে বিদ্যুতের বা টেলিফোনের বিল দিতে। যাঁরা ত্রাণ দিচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়, অথবা কমিউনিটি কিচেন চালাচ্ছেন তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, কত মধ্যবিত্ব বাড়ির লোকজনকেও খাবার দিতে হচ্ছে কারণ তাদের বাড়িতে গ্যাস কেনার টাকা নেই।
অথচ এই অর্থনৈতিক সংকট আটকানো না গেলেও কিছুটা সুরাহা মানুষকে হয়ত দেওয়া যেত। আমেরিকা ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশের সরকার নিঃশর্তে প্রত্যেকটা মানুষের একাউন্টে বেশ কিছু টাকা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উচ্চবিত্ত বাদ দিয়ে বাকি প্রতিটা মানুষের একাউন্টে ১,২০০ ডলার দিয়েছে, ৯০,০০০ টাকা। জার্মান সরকার প্রত্যেকের একাউন্টে দিয়েছে ৮০০ ইউরো, তা ছাড়া ছোট ব্যবসায়ীদের দিয়েছে ৫০০০ ইউরো করে যাতে তারা কর্মচারীদের মাইনে দিতে পারে। উন্নত দেশ বাদ দিন, অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশও ভারত সরকারের চেয়ে বেশি ত্রাণ দিয়েছে। নীচে একটি গ্রাফ রয়েছে (চিত্র-১)। ইউরোপের সেন্টার ফর ইকোনোমিক পলিসি রিসার্চ বিশ্বের অর্থনৈতিক গবেষণার একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তারা প্রতি সপ্তাহে কোভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে কিছু গবেষণাপত্র প্রকাশ করছে। এই গ্রাফটি সেখানকারই একটি গবেষণাপত্র থেকে নেওয়া যার লিংক শেষে পাবেন (লিংক-১)। এই গ্রাফে এক একটা নীল বিন্দু হলো এক একটি দেশ। এই গ্রাফে এক একটি দেশের অর্থাৎ বিন্দুর অবস্থান নির্ভর করছে দুটো সংখ্যার ওপর - এক, সে দেশের সরকার কতটা কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে এবং দুই, সে দেশের সরকার কতটা ইকোনোমিক রিলিফ দিয়েছে জাতীয় আয়ের শতাংশের হিসেবে। যে দেশের সরকার যত বেশি কঠোর লকডাউন ঘোষণা করবে তত বেশি সেই দেশের মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং তাই মানবতার খাতিরে ধরে নেওয়া যায় যে সেই দেশের সরকার তত বেশি অর্থনৈতিক ত্রাণ দেবে। ওই চিত্রটিতে দেখা যাচ্ছে যে অধিকাংশ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই সেটা সত্যি - যত কঠিন লকডাউন তত বেশি ত্রাণ, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনো দেশের নাগরিকদের আধ পেটা খেয়ে থাকতে বাধ্য করতে পারে না। কিন্তু দেখুন, একমাত্র ব্যতিক্রম কে? ভারতবর্ষ! এই দেশ লকডাউনের দিক দিয়ে প্রায় কঠোরতম অথচ অর্থনৈতিক ত্রাণের দিক দিয়ে প্রায় কৃপণতম। ভুল বুঝবেন না, এখানে কিন্তু ত্রাণের হিসেবটা জাতীয় আয়ের শতাংশে করা হচ্ছে তাই আমাদের দেশ গরিব সেই যুক্তি খাটবে না। ও হ্যাঁ, এই গ্রাফ তৈরির জন্য সমস্ত তথ্যই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কোভিড ডেটাবেস থেকে জোগাড় করা। এই ডেটাবেসের হিসেবেই ভারতের লকডাউনকে বিশ্বের মধ্যে কঠিনতম বলা হয়েছিল, যা দেখিয়ে ভারতের সরকারপন্থী মিডিয়া মোদির গুনগান গেয়েছিল। তখন বোধয় তারা জানতো না যে সেই ডেটাবেসে অর্থনৈতিক ত্রাণেরও হিসেবও দেওয়া থাকে।
অর্থাৎ ভারতের রাষ্ট্র বিশ্বের সমস্ত দেশের তুলনায় সব থেকে শ্রমিক বিরোধী অবস্থান নিয়েছে করোনাযুদ্ধে। কিন্তু প্রশ্ন হলো - কেন? এই কোটি কোটি মানুষের তো ভোটাধিকার আছে, ভারত এখনো গণতন্ত্র, এখনো ভোট হয়, তাহলে কী এমন দায় পড়লো সরকারের যে তারা এই কোটি কোটি মানুষের চরম বিপর্যয়ে একটু সাহায্যের হাতও বাড়াতে চাইছে না? কার স্বার্থ কোটি কোটি শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের চেয়েও বেশি? এর উত্তর আছে দ্বিতীয় চিত্রে। দ্বিতীয় চিত্রে ফের এক একটি বিন্দু হলো এক একটি দেশ এবং এই গ্রাফে এক একটি দেশের অবস্থার নির্ধারিত হয়েছে ফের দুটি সংখ্যামানের দ্বারা যার একটি আগের মতোই অর্থনৈতিক ত্রাণ কিন্তু অপরটি হলো "সভরেন ক্রেডিট রেটিং"। সভরেন ক্রেডিট রেটিং কী? এটি হলো একটা মাপকাঠি যা নির্ধারণ করে কোন দেশের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে কতটা আকর্ষণীয় হওয়া উচিত। সভরেন ক্রেডিট রেটিং যদি খারাপ হয়ে যায় কোনো দেশের তাহলে সে দেশের শেয়ার বাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পয়সা তুলে নেবে, সে দেশের কোম্পানিগুলোর বিদেশ থেকে ঋণ পাওয়া মুশকিল হবে বা সুদের হার বেশি দিতে হবে, সে দেশের সরকারকেও বিদেশ থেকে ধার করলে সুদের হার বেশি দিতে হবে। এই গ্রাফটিতে দেখতে পাচ্ছেন যে যেসব দেশগুলির ক্রেডিট রেটিং খারাপ সেই দেশগুলো করোনার জন্য অর্থনৈতিক ত্রাণও কম দিয়েছে এবং ভারতও সেই দেশগুলির মধ্যে একটা। এর কারণ হলো সরকারি খরচ বাড়ালে ক্রেডিট রেটিং কমার সম্ভাবনা থাকে, তাই যাদের ক্রেডিট রেটিং আগের থেকেই খারাপ তারা ত্রাণও কম দেবে এই ভয়ে যে রেটিং তাতে আরো খারাপ হয়ে যেতে পারে।
তাহলে এটা বোঝা গেল যে ভারত সরকার শ্রমিক বিরোধী অবস্থান নিচ্ছে, ত্রাণ দিচ্ছে না তার কারণ ক্রেডিট রেটিংয়ের ভয়। কিন্তু ক্রেডিট রেটিং খারাপ হলেই বা কী? অসুবিধে কোথায়? আগেই বলেছি যে তাতে শেয়ার বাজার ধাক্কা খাবে কারণ বিদেশি বিনিয়োগ বেরিয়ে যাবে। শেয়ার বাজারে এই বিদেশি বিনিয়োগটা মূলত ফাটকা পুঁজি। কিন্তু তা বেরিয়ে গেলেই বা কী? অনেকেরই ভুল ধারণা থাকে যে শেয়ার বাজারের ওপর অর্থনীতির স্বাস্থ্য নির্ভর করে, কিন্তু আসলে বিষয়টা উল্টো - অর্থনীতির স্বাস্থ্যর ওপর শেয়ার বাজার নির্ভর করে (যদিও সেটাও সবসময় হয় না)। তাই শেয়ার বাজার পড়লে অর্থনীতির আলাদা করে বড় ক্ষতি হবে না, বিশেষ করে যেখানে আমাদের দেশে খুব কম সংখ্যক মানুষ শেয়ার বাজারে অনেক টাকা বিনিয়োগ করে। তাহলে? শেয়ার বাজারে বড় বিনিয়োগকারীদের অনেকের সাথে বিজেপি আরএসএস-এর দহরম মহরম কোনো গোপন তথ্য নয়, তাদের স্বার্থ রক্ষা করাটা হয়ত একটা উদ্দেশ্য হতে পারে। অপর একটা যুক্তি হতে পারে যে বিদেশি ফাটকা পুঁজি বেরিয়ে চলে গেলে টাকার দাম পড়বে। সেটার একটা সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এ কথাও সত্যি যে ভারতের বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার বিশ্বের মধ্যে অন্য বৃহত্তম, তা ছাড়া তেলের ও সোনার দাম তলানিতে। এই দুটো দ্রব্য ভারতের সবচেয়ে বড় আমদানি, তাই এদের দাম কমলে/বাড়লে টাকার দামও বাড়ে/কমে। সেই দিক দিয়ে তাই এক্ষুনি টাকার ওপর চাপ আসার তেমন কারণ নেই। সম্প্রতি, আইএমএফ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রার দাম করোনা সংকটের জন্য যাতে হঠাৎ করে পড়ে না যায়, আর তাদের বিদেশি মুদ্রার কোষাগার যাতে ফাঁকা না হয়ে যায়, তার জন্য সব উন্নয়নশীল দেশকে ব্যাপক বিদেশি মুদ্রা ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় (স্পেশ্যাল ড্রয়িং রাইটসের লিমিট বাড়িয়ে), কিন্তু ভারত একমাত্র উন্নয়নশীল দেশ যে এটার বিরোধিতা করেছে। তাই ধরে নেওয়া যায় যে ভারত সরকার টাকার মূল্য পড়া নিয়ে ভাবিত নয়।
তাহলে ক্রেডিট রেটিং খারাপ হলে আর কী কী ক্ষতি হতে পারে যার জন্য সরকার এত ভাবিত? ভারত সরকার বিদেশ থেকে ঋণ নিতে চাইলে সুদ বেশি দিতে হতে পারে। কিন্তু ভারত সরকারের বিদেশ থেকে ঋণ খুবই সামান্য, আর যেটুকু সেগুলোও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মত সংস্থা থেকে স্পেশ্যাল ডেভেলপমেন্টাল লোন যাতে সুদ নামমাত্র। তাহলে? দেখুন আরো একটা কারণ ওপরে লেখা রয়েছে। দেখছেন? - ভারতীয় "কোম্পানিগুলোর বিদেশ থেকে ঋণ পাওয়া মুশকিল হবে বা সুদের হার বেশি দিতে হবে"। এই, এইটেই হলো সেই গোপন কথাটি যেটা সরকার কোনোদিন উচ্চারণ করবে না। ব্যাংক অফ ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট জানাচ্ছে যে ভারতের কর্পোরেট সেক্টরের মোট বিদেশী ব্যাংকগুলো থেকে বিদেশী মুদ্রার ঋণ হলো ৫৯০০ কোটি ডলার, ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি টাকা (লিংক-২)। এটা শুধুই কিন্তু বিদেশী ব্যাংক থেকে। অন্য জায়গা থেকে বিদেশী মুদ্রার ঋণ ধরলে সংখ্যাটা আরো বেশি। শুধু ২০-টা বৃহত্তম কর্পোরেট সংস্থার বিদেশী ঋণই ১৮০০ কোটি ডলার, ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে রিলায়েন্স, টাটা, বিড়লা - সবই আছে (কোম্পানিগুলির ব্যালেন্স শিট থেকে এই তথ্য পেয়ে যাবেন।) সভরেন রেটিং খারাপ হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে এদের ওপরেই। এই ঋণের ওপর সুদ বেড়ে যাবে, নতুন ঋণ পেতে অসুবিধে হবে, লাভ কমবে।
তাহলে বোঝা গেল যে ভারতের কোটি কোটি শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী, দিন আনি দিন খাই মানুষের প্রতি সরকারের অমানবিক আচরণ এবং পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ত্রাণ দেওয়ায় অনীহার পেছনে কারণ হলো যে এই সরকার বৃহৎ পুঁজিপতি ও শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে বেশি ব্যস্ত। শ্রমিকদের ট্রেনের টিকিটের টাকা না দেওয়ার অমানবিক সিদ্ধান্তের পেছনেও রয়েছে টাটা আম্বানি - যারা বিজেপির ইলেক্টরাল বন্ডে হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েছে - সেই তাদের স্বার্থ রক্ষার তাগিদ। ভারতের শ্রেণী সংঘাত বোধয় এতটা সরাসরি এবং এতটা ক্ষিপ্র আকার ইদানিংকালে নেয়নি। কিন্তু অধিকংশ মানুষ জানবে না যে লক্ষ লক্ষ মানুষ হাজার হাজার কিলোমিটার হাঁটছে আসলে শ্রেণী সংঘাতের কারণে, তারা জানবে না যে তাদের ওপর শ্রেনিযুদ্ধর ঘোষণা হয়েছে। ভাববার সময় হয়েছে যে এই বৃহৎ পুঁজিপতিরা কতটুকু সম্পদ ও চাকরি তৈরি করে দেশের জন্য যার জন্য এরকম কোটি কোটি মানুষ আধপেটা খাবে? যারা এখনও পুঁজিপতিদের পক্ষ নেবে তাদের সাথে এখনই কোনো তর্ক করবো না, তিন মাস পর করবো কারণ আমি নিশ্চিত যে তিন মাসের মধ্যে এর আঁচ কর্পোরেট চাকরি করা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গায়ও লাগবে। তখন না হয় তাদের মতামত শুনতে চাইবো।

পুরন্দর

রবিবার, ১০ মে, ২০২০

তোমার মাঝে বসত করে কয়জনাঃ করোনা ভাইরাস (৩)



তোমার ঘরে বসত করে কয়জনাঃ করোনা


তৃতীয় পর্বঃ বাণিজ্য যুদ্ধের আড়ালে কি করোনার জন্ম

পৃথিবীতে তিন ধরনের তত্ত্ব রয়েছে, একটা মীমাংসিত, অন্যটা অমীমাংসিত। এই দুই তত্ত্বের মাঝে যে তত্ত্বের বাস তাঁর নাম ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বা ইংরাজিতে ‘দ্য কন্সপিরেসি থিয়োরি’- এটাই তৃতীয় প্রকারটি। রাষ্ট্র বা ক্ষমতা- সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রচারমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের মগজধোলাই করে যেটা বলে দেয়, প্রায় প্রত্যেকেই সেটাকেই ধ্রুবসত্য হিসাবে মেনে নেয়। কিন্তু কিছু মানুষ রয়েছেন, যারা যুক্তি ও তর্কের মাঝে তথ্য বিশ্লেষণ করে, যেকোনো তত্ত্বের একটা বিপ্রতীপ কিন্তু সমীচীন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে। রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীনেরা একেই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে। বহুক্ষেত্রেই দেখা গেছে, কোনো ঘটনার বহু বছর- এমনকি কয়েক দশক বা শতাব্দী পরও এই ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকদের ব্যাখ্যা হুবহু মিলে গেছে।

করোনা নিয়েও এমন বহু কন্সপিরেসি থিয়োরি বাজারে চালু হয়েছে, তারমধ্যে বিভিন্ন তথ্য ঘ্যেটে যেগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হল তেমনই তিনটে ঘটনার বর্ণনা করব। দুটো বর্তমান চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধের নেপথ্য কথন, তৃতীয়টা দু’দশক আগের গল্প।

প্রথম দুটো তত্ত্বে বহু তথ্য রয়েছে, যেগুলো ছাড়া আলোচনা অর্থহীন তাই খুব সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম।

প্রথম ঘটনা
°°°°°°°°°°°°

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সহ মিডিয়া ব্যবসার ‘বিশ্ব বানিজ্যের’ অধিকাংশই মার্কিন ব্যবসাদারেদের দখলে ছিল। আগামীতে ব্যাঙ্কিং, যোগাযোগ, চিকিৎসা, শিক্ষা ক্ষেত্রে 5G প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে আমরা সকলেই কমবেশি ওয়াকিবহাল। এমতাবস্থায় চীন এই প্রযুক্তি বাজারে দ্রুত ঢুকে এসে জাঁকিয়ে বসেছে, বিশেষ করে Huawei ও ZTE গোটা বিশ্বব্যাপী দ্রুতগতির 5G ইন্টারনেট সরঞ্জাম বিক্রিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। ‘হুয়াওয়ে’ কোম্পানী- কানাডা, ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, বেলজিয়াম, ভারত, পাকিস্তান, সুইডেন, আয়ারল্যান্ড, রাশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর সহ মোট ১৭০টি দেশে একচ্ছত্র ভাবে নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। শিপিং নেভিগশনে তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির খরিদ্দার বিশ্বের ৯৫% শিপিং এজেন্সি। মজার কথা হল- ওই ১৭০টি দেশের তালিকাতে খোদ আমেরিকাও রয়েছে।

সমস্যা বাঁধে, ‘হুয়াওয়ে’ যখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পরোয়া না করে ইরানকেও 5G প্রুক্তি বিক্রিতে চুক্তি সম্পাদনা করে। প্রতিহিংসা বসত, প্রথমে হুয়াওয়ের কর্মকর্তার মেয়েকে কানাডায় গ্রেফতার করা হয় CIA এর মদতে, ২০১৮ এর ডিসেম্বরে। পাল্টা হিসাবে চীনও কয়েকজন কানাডিয়ান দূতকে পাল্টা জাতীয় নিরপত্তা বিঘ্নতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। এমনই বিভিন্ন নাটকীয় পরিস্থিতির পর উভয় দেশই সকলকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়, যাতে ভীষণ চটে যায় আমেরিকা।

হবেনা টাই বা কেন, হুয়াওয়ে এর নিজস্ব ওয়াবসাইটেই দেওয়া আছে- ২০১৮ সালের তাদের মোট পণ্য বিক্রয় ছিল ৭২১.২০ বিলিয়ন ইউয়ান, যা আমাদের ভারতীয় মুদ্রাতে সাত লক্ষ বাহাত্তর হাজার কোটি টাকা। যা আমাদের ‘গর্ভমেন্ট অফ ইন্ডিয়ার’ ২০১৮-১৯ সালের মোট বাজেটের একচতুর্থাংশেরও বেশি(১)। ২০১৮ সালে হুয়াওয়ের রাজস্ব বৃদ্ধির হার ছিল ১৮ %, লভ্যাংশ বেড়েছিল ২৫%। ২০১৯ সালে এই বৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ১৮% ও ১৪%। এই বাজারকে নষ্ট করার বা দখল করার চেষ্টা আমেরিকার মত দেশ যে করবে তা বলাই বাহুল্য।

যথারীতি তীব্র ক্রোধে এই হুয়াওয়েকে গোটা বিশ্বে নিষিদ্ধ করতে এক প্রকার হুইপ জারি করে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু সস্তার যন্ত্রাংশ ও উন্নত পরিষেবার কারনে, ব্রাজিলের মত এক আধটা দেশ ছাড়া কেউই তাতে পাত্তা না দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে। এমনকি খোদ মার্কিনিদের কাছেও হুয়াওয়ের কোনো বিকল্প ছিলনা, এই এপ্রিল ২০২০ তেও নেই(২)। ইউরোপিয়ান কোম্পানী নোকিয়া ও এরিকশন এই 5G প্রযুক্তির সরঞ্জাম বেচলেও তা হুয়াওয়ে তো দূরস্থান, চীনের আরেক প্রযুক্তি দানব- ZTE এর সমমানেরও নয়।

এদিকে ট্রামের নিষেধাজ্ঞা শুধু অন্য দেশগুলোই যে মানেনি তা নয়, আমেরিকার ৫০টা প্রদেশের ৩৮টা প্রদেশই সেই নিষেধাজ্ঞা না মেনে- হুয়াওয়ের সাথে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। মরিয়া মার্কিন প্রশাসন তখন- হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে তথ্য চুরির অভিযোগ এনে আমেরিকাতে হুয়াওকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেয়। ইন্টারনেট প্রোটোকল থেকে নকল পণ্য সরবরাহের দোহায় দিয়ে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে মামলা করে কোর্ট থেকে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে সেই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করে।

২০১৫ সালেও আমেরিকা একবার এই চুরির অভিযোগ তুলেছিল চীনা কোম্পানী গুলোর বিরুদ্ধে, এবং আশ্চর্যজনক ভাবে চীনা রাষ্ট্রপ্রধান- সিনপিং এর তরফে বিবৃতি ছিল “আগামীতে আর চুরি করবেনা”, পক্ষান্তরে চুরি স্বীকারই করে নিয়েছিল। এরপর চীন খুলমখুল্লা আইন করে তাদের দেশজ প্রযুক্তি কোম্পানীগুলোকে নির্দেশ দেয় যে, তাদের ব্যবসা, খরিদ্দার সহ সকল ধরনের যাবতীয় তথ্য চীনের সরকারের কাছে তারা দিতে বাধ্য।

প্রসঙ্গত, হুয়াওয়ে যদিও চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, তবুও তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রতিটি কোম্পানিকে তারা সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিয়ে থাকে। বিগত দশকে এই হুয়াওকে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক, সাড়ে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকা দিয়েছে ঋণ ও অনুদান বাবদ দিয়েছিল; পাশাপাশি ২০১৮ সালের আগে হুয়াওয়ে এর গোটা ব্যবসাটাই ছিল করমুক্ত। স্বাভাবিকভাবেই হুয়াওয়ে- শুধু ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষেই কয়েকলক্ষ কোটি টাকা গবেষণা খাতে লগ্নি করতে পেরেছে।

যাই হোক, আমেরিকার নিষিদ্ধকরনের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ চীনও তাদের দেশে গুগুল, এ্যপল ও ফেসবুককে ব্যান করে দেয় রাতারাতি, এমনকি তাদের মোবাইল হ্যান্ডসেটে এন্ড্রেয়েড অপারেটিং সিস্টেম লাগানোও বন্ধ করে দেয়, সাথে সাথেই হুবহু এন্ড্রোয়েডের কার্বন কপি বাজারে নিয়ে চলে আসে। গুগুল থেকে শুরু করে মার্কিন কোম্পানিগুলি এর ফলে বিপুল পরিমাণে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এছাড়া ভিসন ২০৩০- আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ইন্টারনেট অফ থিংস এর ক্ষেত্রেও একই কাহিনীতে আমেরিকা সম্পূর্ন ভাবে পর্যদুস্ত হয়ে পরে চীনের কাছে। হাস্যকর বিষয় হল- মার্কিনিদের পরম মিত্র ব্রিটেনও আমেরিকার নিষেধাজ্ঞাকে উড়িয়ে দিয়ে চীনের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক দৃঢ় করে চলেছে দিনদিন।

দ্বিতীয় ঘটনা
°°°°°°°°°°°°°
উচ্চাশার কোনো সীমা হয়না, ক্ষমতার লোভেরও সীমা নেই। উল্টো দিক থেকে ভাবলে স্বপ্ন না দেখলে কীভাবে এগোবে আগামীতে? তাদের মুল লক্ষ্য হল ব্যবসা, আর তাতে উন্নত পরিষেবা দিতে গেলে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা জরুরী, আর এই প্রকল্পেই কাজ শুরু করেছে চীন।

BRI প্রকল্পের নাম শুনেছেন কি! যার পুরো নাম হচ্ছে “বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ”। এ এক মহাপ্রকল্প যাকে এই একবিংশ শতাব্দীর ‘রেশম পথ’ নামে অবিহিত করা হচ্ছে। আফ্রিকা, পূর্ব থেকে পশ্চিম এশিয়া, ইউরোপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, ভারত মহাসাগর, পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সামুদ্রিক অঞ্চলকে সংযুক্ত করবে ৪০০০ কিমি ব্যাপী এই দানবীয়-যোগাযোগ প্রকল্প। এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ২০১৪ সালে যা তাদের প্রেসিডেন্ট সিনপিং এর মস্তিষ্কপ্রসুত, ৭০টি দেশকে এক সড়কে মেলানোর প্রচেষ্টা- যার দ্বারা পৃথিবীর ৬০% জনসংখ্যাকে ছুঁয়ে যাওয়া যাবে। এটা পৃথিবীর ৪৫% ‘গ্লোবাল গ্রোথ’ এলাকা জুড়ে করিডোর প্রতিষ্ঠা করে পরিকাঠামো নির্মাণের দরুন সমগ্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে রেল, সড়ক ও নৌপথে।

নক্সা মোতাবেক, পশ্চিম চীন থেকে কাজাখস্তান হয়ে পশ্চিম রাশিয়ার দিকে একটা পথে চলে যাবে। যাতে চীনের জিনজিয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, কাজাখস্তান, রাশিয়া, বেলারুশ, পোল্যান্ড এবং জার্মানি হয়ে নেদারল্যাণ্ড যুক্ত হয়ে যাবে। দ্বিতীয় পথটি, চীন – মঙ্গোলিয়া – রাশিয়া করিডোর, যা উত্তর চীন থেকে রাশিয়ান পূর্বদিকের শহর গুলোকে ছুঁয়ে যাবে। তৃতীয়টি, চীন – আফগানিস্থান – ইরাণ- তুরস্ক- বুলগেরিয়া- সার্বিয়া- স্লোভেনিয়া- সুইজারল্যাণ্ড- ইতালি- ফ্রান্স হয়ে স্পেনে ঢুকে যাবে। এই তিনটে মূল করিডরের মাঝ অসংখ্য কানেক্টিং রোডেরও প্রস্তাবনা আছে বিভিন্ন দেশ দিয়ে। ইরান থেকে চতুর্থ পথটি সোজা ওমান- ইয়েমেন হয়ে আফ্রিকার মূল ভূখন্ডে যুক্ত হবে। এছাড়া বাংলাদেশ- থাইল্যান্ড, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া- ফিলিপিন্স সহ পূর্ব এশিয়ার সমকটি দেশই এই প্রকল্পের অধীনে যুক্ত হয়েছে।

ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পে চীন প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার লগ্নি করে ফেলেছে, মোট বাজেট ১০ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার। ইতিমধ্যেই চীনের এই বিপুল পুঁজির কাছে ১৩৮টি দেশ ও ৩০ টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থা মাজা নুইয়ে দিয়েছে; তারা একজোট করে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে চীনা ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানী গুলো একচেটিয়া এই কাজ শুরু করে দিয়েছে।

পরিকাঠামো প্রকল্পগুলির মধ্যে বন্দর, রেলপথ, মহাসড়ক, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিমান ও টেলিযোগাযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর এইখানেই হচ্ছে আমেরিকার কাছে চ্যালেঞ্জ, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে পশ্চিমা সাম্প্রাজ্যবাদ- চীনের বাণিজ্যিক কূটনীতির কাছে এক্কেবারে ধরাশায়ী হবার আশঙ্কা রয়েছে। আমেরিকা প্রাসঙ্গিকতা হারাবে অনেকটাই, কারন ইতিমধ্যেই মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্থান সহ বিশ্বের অন্তত ৪৭ টা দেশের বিভিন্ন বন্দর ৯৯ বছরের লিজে অধিগ্রহণ শুরু করেছে চীন সরকার, যা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে বিশাল হুমকি। রাশিয়া ও চীন মিলে যৌথ তহবিল বানিয়েছে, এছাড়া লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা ও জামাইকাও এই প্রকল্পে সামিল হয়েছে। খোদ ব্রিটেন পর্যন্ত এই প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়ে ইংল্যান্ডের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে চীনা ছাত্রদের জন্য বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করেছে বরিস জনসন।

আমেরিকার রাশ হালকা হওয়া শুরু হয়েছে G7 গোষ্ঠীর দেশ হিসাবে সর্ব প্রথম ইতালির অন্তর্ভুক্তিকরন, গোটা ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন সহ CIA প্রকাশ্যে চীন-ইতালি বাণিজ্য চিক্তির বিরোধীতা করেছে, বিষয়টা এখানেই থেমে নেই- বর্তমানে সৌদি আরব সহ ইজরায়েলও এই প্রকল্পের অংশীদার হয়ে গেছে।

কোণঠাসা আমেরিকা এই প্রকল্প শুরুর পাঁচ বছর পর এসে প্রচার শুরু করছে, এটি মোটেও উন্নয়নের রোডম্যাপ নয়- এটা চীনা ঋণের ফাঁদ, যাতে ফেলে সংশ্লিষ্ট এলাকার আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে চীন। আরো প্রচার করছে যে এতে বায়োডাইভারসিটি নষ্ট হবার সম্ভাবনা বিপুল, ইত্যাদি। এখানেই না থেমে থেকে, আমেরিকা এদের পাল্টা প্রকল্প শুরু করেছে- "Free and Open Indo-Pacific strategy" (FOIP) নামে, যেখানে আমেরিকা ছাড়া- জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও আমাদের দেশ ভারতও রয়েছে। ভারতের জন্য চীনা মহা-প্রকল্পের সবচেয়ে বড় হুমকি হল পাকিস্তান-চীন করিডর, আর এটির জন্যই ভারত পরিষ্কার করে জবাব না দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে বেজিংকে।

সুতরাং, বিকল্পহীন প্রযুক্তি আর পরিকাঠামোর সুবিধা সহ বিপুল পুঁজি নিয়ে চীনের এই উত্থান আমেরিকার দাদাগিরিতে ইতি টেনে দিতে পারে। তাই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কোনো মজবুত প্রমান না থাকলেও, ঘটনাপ্রবাহের গতিপ্রকৃতি “করোনা-ভাইরাস- একটি মার্কিন-জায়োনিষ্ট ষড়যন্ত্র” তত্ত্বকে নাৎস ও করতে পারছেনা বিশেষজ্ঞরা। কারন এর আগে আমেরিকার প্রমাণিত সত্য দুনিয়ার সামনে আজ উন্মুক্ত।

তেতো সত্য তথা তৃতীয় ঘটনা
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
আমরা সকলেই জানি, আমেরিকার টুইন টাওয়ার হামলার (9/11) দায়ে জর্জ বুশ ইরাক আক্রমণ করে ও কয়েক হাজার মার্কিন সেনা সহ লাখ ছয়েক ইরাকীকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়ে দেশটিকে তছনছ করে দেওয়া হয়েছিল। আশ্চর্যজনক ভাবে সেই সময় মার্কিন পেট্রোলিয়াম কোম্পানি ‘Halliburton’ এর শেয়ারের দাম বেড়ে গেছিল প্রায় ৫০০ শতাংশ, ও তাদের মুনাফা বেড়েছিল ৬৮০ শতাংশ লিঙ্ক (৩) রইল। ‘হালিবার্টন’ এর সাবসিডিয়ারি কোম্পানিই আবার ইরাক পূনর্গঠনের বরাতও পেয়েছিল। বুঝতেই পারছেন, মধ্যপ্রাচ্যের খনিজ তেলের একটা বৃহৎ অংশকে সরাসরি নিজেদের কুক্ষিগত করা হয়েছিল এই যুদ্ধের অজুহাতে।

এই ‘হালিবার্টন’ কোম্পানির সর্বেশ্বর কর্তার নাম জানেন? তিনি হলে ‘ডিক চেনী’। এনার অন্যতম বড় পরিচয় হচ্ছে- ইনি জর্জ বুশের আমলে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আজকের দিনে এসে আর কষ্ট করে অনুমান করতে হয়না ইরাক যুদ্ধের নেপথ্য কারন। এবং গোটা বিষয়টি পরিচালিত হয়েছিল- বিশ্বের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধর্মীয় মৌলবাদী জাতি ‘ইহুদিদের’ দ্বারা। বুশের প্রশাসনে, বুশের বক্তিগত মুখ্য সহায়ক, হোয়াইট হাউসের চিপ অফ স্টাফ, ডিক চেনীর চিপ অফ স্টাপ, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের ডাইরেক্টর, ডিফেন্সের আন্ডার সেক্রেটারি ও তার ডেপুটি, হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি, স্পিচ রাইটার, হোয়াইট হাউসের পলিটিক্যাল ডাইরেক্টর, সহ এক ঝাঁক ইহুদি। লিঙ্ক রইল(৪)। আমারিকান জনসংখ্যার শতকরা দেড় জন মাত্র একজন ইহুদী, কিন্তু মুল ক্ষমতার অলিন্দে? সিংহভাগ মূল ক্ষমতাতে তারা।

প্রসঙ্গত- ইহুদিদের ইরাকীদের প্রতি ঘৃণার কারন, ৫০০০ বছর পূর্বে কোনো এক ইরাকি শাসক তাদের ঐশ্বরিক ক্ষমতা সম্পন্ন সিন্দুক ‘Ark of the Covenant’ লুন্ঠন করে নিয়ে গিয়েছিল, তার পর থেকে ইহুদিদের নাকি দুর্ভোগের শুরু, তাদের ধর্ম বিশ্বাস মোতাবেক। ওই ‘Ark of the Covenant’ কে খোঁজার জন্য ইরাকে তারা আমেরিকার ঘোমটার আড়ালে যুদ্ধ বাঁধিয়েছিল। ওই Ark of the Covenant খুঁজে পেলেই গোটা পৃথিবী ইহুদিদের শাসনে চলে আসবে এটাই তাদের ধর্ম বিশ্বাস। আপনি ভাবেনঃ হিন্দু-মুসমানেরাই সাম্প্রদায়িক জাতি।

সুতরাং, কে বলতে পারে, করোনা রহস্যের নেপথ্যে এমনই কোনো গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে কিনা। কারন খুব পরিষ্কার, প্রথমত সেই দেশকে সমূলে ধ্বংস করে দাও যাদের সাথে ব্যবসা যুদ্ধে পারা যাচ্ছেনা, আর সেই দেশগুলোকেও চরমতম সাজা দাও- যারা মার্কিন প্রভুদের আদেশ অমান্য করে হুয়াওয়ের সাথে বা চীনের BRI প্রজোক্টে যুক্ত হয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এটা যে আমেরিকা করতেও পারে সেটা হোলিবার্টনের উদাহরনেই পরিষ্কার। খালি চোখে কারো সর্বনাশের আড়ালে ঘটে চলে পুঁজিবাদ, ব্যবসায়িক প্রতিপত্তি ও ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তারের নিকৃষ্ট খেলা।

আর সবচেয়ে হিংস্র ও নৃশংস তথ্যটা হল- ‘বায়ো-উইপন’ বা জৈব-অস্ত্র নিরোধ কনভেনশনে ১৮৩ টি দেশ পক্ষে স্বাক্ষর করেছিল, যে তারা এই সংক্রান্ত গবেষণা করবেনা। চাদ, জিবুতি, কমোরস, নামিবিয়া, ইরিত্রিয়া, কিরিবাতির মত অজানা কয়েকটি ‘শক্তিহীন’ দেশের সাথে আরো একটা দেশ এই বিরতি প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেনি(6)।

যে দেশটা প্রতিটি বিশ্বযুদ্ধে নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে নিজেদের ধর্মীয় জাতির জন্য পৃথক দেশের প্রতিশ্রুতি হাসিল করেছিল; আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেই প্রস্তাবিত দেশটির মালিকানা পেয়েছিল ‘ইহুদিরা’। এখন এরা চায় পৃথিবীর ‘বাপ হতে’, যার জন্য প্রয়োজন আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ। চীন ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিলনা কখনই, আগামীতেও থাকার সম্ভাবনা শূন্য, কারন ইহুদি মানেই ৫ হাজার বছর আগের ধর্ম বিশ্বাসকে বাস্তবায়ন, আর চীন ধর্ম ছাড়া বাকি সবেতেই থাকে। তাই ইহুদিরা, পরাক্রমী চীনের সাথে সরাসরি যুদ্ধংদেহী মনোভাব না দেখিয়ে ‘মোসাদ’কে দিয়ে গোপনে কোনো ঘৃন্য চাল চালতেই পারে; তাই করোনা-প্যান্ডেমিক মোটেই কোনো প্রাকৃতিক বিষয় নয়। এটা একটা সুপরিকল্পিত নৃসংসতা, বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকা তৈরি জন্য এই লকডাউনে ভেঙেপড়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এক্কেবারেই আদর্শ।

দেশটির নাম ইজরায়েল। এরাই জৈব-অস্ত্র বিরোধী কনভেনসনে বিপক্ষে ছিল। আমেরিকা আর চীন নামের দুই বেড়ালের ঝগড়ার মাঝে, ইজরায়েল নামক নেপোয় দই মেরে দিচ্ছে হয়ত। এই ইহুদিরাই মানে রথচাইল্ড ফ্যামিলি(৫)- ওয়াটারলু যুদ্ধে নেপোলিয়ন ও ইংল্যান্ড দুপক্ষকেই ঋণ দিয়েছিল অস্ত্র খরিদের জন্য, যেই জিতুক লাভ শুধুই ইহুদিদের, যারা আজ ইজরায়েল নামক দেশ গঠন করে বিশ্বপিতা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। নেটে ঘ্যেটে তথ্য দেখে ফ্যাক্ট চেক করার দায় আপনার, আমি শুধু সত্যানুসন্ধান করে সম্ভাবনার কথা উস্কে দিলাম।

আরো দু দশক পর হয়ত এই আশঙ্কার সত্যতা প্রকাশ পাবে, ততদিন আমরা মরে বেঁচে থাকি।

1. https://www.huawei.com/.../2019/3/huawei-2018-annual-report
2. https://thehill.com/.../486014-lawmakers-look-for-5g...
3. https://www.irishtimes.com/.../iraq-war-turns-handsome...
4. https://www.jewishvirtuallibrary.org/jews-in-the-george-w...
5. https://www.businessinsider.com/the-rothschild-gang...
6. https://en.wikipedia.org/.../List_of_parties_to_the...

বুধবার, ৬ মে, ২০২০

গণতন্ত্র মিথ ও আগামীর পৃথিবীঃ ৪

 

চতুর্থ পর্ব

উপরোক্ত দুই ধরনের গণতন্ত্রেই মূলত দুটো অধিবিভাগ দেখা যায়, যথা- সংসদীয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রপতি পরিচালিত গণতন্ত্র।

সংসদীয় ব্যবস্থাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তথা সংসদেরা মিলে তাদের নেতা নির্বাচন করে। এই নির্বাচিত নেতাই সরকারের সর্বাসের্বা তথা প্রধানমন্ত্রীর হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন, মন্ত্রীসভার বাকিদেরকে মূলত তিনিই মনোনীত করেন। এই ধরনের গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রধান ‘রাষ্ট্রপতি’ হলেও তা নেহাতই একটা আলঙ্কারিক পদ বহুলাংশে, তবুও রাষ্ট্রের সকল কিছু রাষ্ট্রপতির নামেই সম্পাদিত হয় প্রোটোকল অনুয়ায়ী। এই ব্যবস্থায় যেকোনো সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদেরা তাদের নেতা তথা তথা প্রধানমন্ত্রীকে যেকোনো সময় বদলে ফেলতে পারে। এই গণতন্ত্রের অনুশীলনে দ্বিতীয় বৃহত্তম সংখ্যাগরিষ্ট সংসদীয় দলটি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে, যাদের কাজ হয়- গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি আনুগত্য রেখে, সরকারের গঠনমূলক বিরোধিতা বা সমালোচনা। মন্ত্রীগোষ্ঠীর সাথে- সরকারপক্ষ ও বিরোধীপক্ষ মিলে গঠিত বিভিন্ন সংসদীয় যৌথ কমিটি গঠনের মাধম্যে সরকার পরিচালিত হয়ে থাকে।

রাষ্ট্রপতি পরিচালিত গণতন্ত্রে, রাষ্ট্রপতি একাই- রাষ্ট্র ও সরকার উভয়ের প্রধান পরিচালক হয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি হিসাবেই সরাসরি মানুষের ভোটে জিতে আসে, সমগ্র মন্ত্রীসভা রাষ্ট্রপতির আয়ত্তাধীন থাকে। এক্ষেত্রে আইনসভার সদস্যরা রাষ্ট্রপতিকে ইমপিচ বা অভিযুক্ত করার ক্ষমতা রাখলেও বহিষ্কার করার ক্ষমতা রাখেনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, কারন রাষ্ট্রপতি ও আইনসভা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ বিশিষ্ট, এক বা একাধিক, নির্বাচিত বা মনোনীত ব্যক্তিদের ঐক্যমত্যে আনা অতীব দুঢ়হ কর্ম।

পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই কখনও না কখনও ইউরোপিয়ানদের উপনিবেশ ছিল, যে ইউরোপ গণতন্ত্রের ধাত্রী ভূমি। অথচ তারাই গোটা বিশ্বকে দাস বানিয়ে রেখেছিল বেশ কয়েক শতাব্দী, গণতন্ত্রের আজকের ধ্বজাধারীরাই সমগ্রবিশ্বের অধিকাংশ দেশগুলোকে পরাধীনস্ত করে রেখেছিল সম্পদ লুঠের জন্য। বহু রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর, উনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত দেশগুলো সার্বভৌমত্ব তথা স্বাধীনতা লাভ করে। তাই লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সর্বত্রই অষ্টাদশ শতকের ইউরোপিয়ান আইনের উপরে ভিত্তিকরে স্বাধীন দেশগুলির সংবিধান রচিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা সময়ের চাহিদায় নিজ নিজ দেশের মত করে সংযোজন, সংশোধন, ও পরিমার্জন করে ‘প্রতিটি’ স্বতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। পৃথিবীতে বেশ কিছু দেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব তথা ক্ষমতা বন্টনের মাধ্যমে এক ধরনের শঙ্কর জাতীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, কিছু দেশে আবার প্রত্যক্ষ ও প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মিশেলে একটা মিশ্র গণতন্ত্র বিন্যাসিত হয়েছে।

একটা সময় গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রে মাঝে বেশ কতকগুলি বিরোধ ছিল; কোনটা বেশি জনহিতকর নাকি দুটোই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত- এ নিয়েও তর্কের শেষ নেই আজও। কারন ব্রিটেন, স্পেনের মত বেশ কিছু দেশে এখনও প্রতীকি রাজক্ষমতার আধারে ‘সাংবিধানিক রাজতন্ত্র’ বর্তমান, সেখানে প্রজাতন্ত্র শব্দটা ব্যবহার করা যায়না। আবার ভারতের মত দেশে না রাষ্ট্রপতি না প্রধানমন্ত্রী না কোনো রাজতন্ত্র সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক, আমাদের দেশের সিস্টেমটা আক্ষরিক অর্থে ‘প্রজাতন্ত্র’, যেখানে জনগণই রাষ্ট্র ও সরকারের নিয়ন্ত্রক। মেয়াদ ফুরালে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী যে ই হোক তাকে ক্ষমতায় থাকতে গেলে মানুষের ভোটে জিতে আসতেই হবে।

প্রজাতন্ত্র হলেই যে সোনার কাঠি হবে তেমনটাও হয়; আমাদের দেশে কি প্রতিটি জনগণ তার প্রাপ্য সুবিধা ভোগ করে? আমাদের দেশে কি রাজনৈতিক অনুশীলন সম্পূর্ণ ‘কপি-বুক’ গণতান্ত্রিক নিয়ম মানা হয়? ‘ভারতীয় গণতন্ত্র ও তার প্রয়োগ’ নিজেই একটা বিপুল চ্যাপ্টার, তার পরবর্তী কোনো ফুরসতে এ বিষয়ে আলাপ করা যাবে। কোনো কোনো দেশে ধর্মীয় আনুশাসনিক গণতন্ত্র বর্তমান, যেমন পাকিস্থান বা আগের নেপাল ইত্যাদি। এগুলো সবই ওই শঙ্কর প্রজাতীয় গণতন্ত্র, যারা কোনো আদর্শলিপি পাওয়া যায়না। মার্ক্সীয় তত্ত্বকে ভিত্তি করে বহুদেশে সমাজতন্ত্রিক গণতন্ত্র প্রচলিত রয়েছে, এখানে একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী রাষ্ট্র পরিচালনা করে যারা সমাজের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র থেকে প্রতিনিধিত্ব করে, এখানে গণভোটের কোনো বালাই নেই। বহুলাংশেই দেখা গেছে সামাজিক গণতন্ত্রের মোড়কে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই ‘সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র’ ব্যবস্থায়, কারন ক্ষমতার বৈভব ও ক্রমবর্ধমান লালসা- বহুলাংশেই মার্ক্সীয় নীতি থেকে সরে গিয়ে সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আইন লাগু হয়েছে।

কিছু দেশে নির্বাচন বিনাই ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে জুড়ি কমিটি জনগণের মধ্যে থেকে যাকে বেশি যোগ্য মনে করবে তাকেই রাতারাতি ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে- একে ‘সর্টিসন’ গণতন্ত্র বলা হয়। কিছু দেশে সংখাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠীগুলো ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে একটা গণতান্ত্রিক সমন্বয় গঠন করত, যাকে ‘একচেটিয়া’ গণতন্ত্র বলা হয়। এখানে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো থাকে। এগুলো ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রদেশে- Inclusive democracy, Participatory politics Democracy, Cosmopolitan Democracy, Creative democracy, Guided democracy ইত্যাদি নামের ভিন্নভিন্ন উপধারার গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার উল্লেখ পাওয়া যায় ইতিহাসে। এর বাইরেও যৌক্তিকতন্ত্র, সমষ্টিতন্ত্র, বিচক্ষণতন্ত্র, মৌলিকতন্ত্র নামের কয়েকটি গণতান্ত্রিক মতবাদের উদ্ভব হয়েছিল, যা কখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

বিশ শতকের গোঁড়ার দিকে ইউরোপের ‘চূড়ান্ত ব্যাক্তি স্বাধীনতাকামী’ একটা শ্রেনীর জনগণের কাছে গণতান্ত্র বা রাজতন্ত্র ও তাদের সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত সরকার ব্যবস্থারই প্রয়োজন নেই বলে বিশ্বাস করত। রাজতন্ত্রকে যেমন ‘মনার্কি’ বলা হয় ইংরাজিতে, তেমনই সরকারের প্রয়োজনীয়তাকেই মান্যতা না দেওয়াটাকে ‘এনার্কি’ বলা হয়। শুদ্ধবাংলাতে একে ‘নৈরাজ্যবাদ’ বলা হয়, অনেকে ক্ষেত্রেই এদের দ্বারা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হত বলে- একে মাৎস্যন্যায়ও বলা হয়। যারা এনার্কিতে বিশ্বাস রাখে তাদের এনার্কিষ্ট ও তাদের মতবাদকে এনার্কিজম নামে ডাকা হয়। এনার্কিজম কোনো প্রকারের কর্তৃত্তকারীকেই স্বীকৃতি দেয়না, এই মতবাদে শাসক মানেই প্রহসন। তারা বিশ্বাস করে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেখানে কর্তৃপক্ষ ছাড়াই সমাজ থাকবে, প্রতিটি ব্যাক্তি নিজেই স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান- এবং এভাবেই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব।

কিছু বেসরকারি ক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক ভোটদান প্রক্রিয়ায় তাদের কর্মকর্তা নির্বাচিত হয়ে থাকে, যেমন কো-অপারেটিভ, ট্রেড ইউনিয়ন প্রমুখ।

এই হল গণতন্ত্র বিষয়ে, মোটের উপরে একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা।

…ক্রমশ

তথ্যঋণঃ উইকিপিডিয়া

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...