বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২০

অখণ্ড শক্তিশালী ভারতই চীনের সমস্যা কারণ


 
অখণ্ড শক্তিশালী ভারতই চীনের সমস্যা কারণ

এই মুহুর্তে ভারতের প্রয়োজন যেকোনো মুল্যে দেশের অখণ্ডতা বজার রাখার জন্য সবধরনের শক্তি নিয়ে ঝাঁপানো, দলমত নির্বিশেষে। সাম্রাজ্যবাদী চীনের লক্ষ্য ব্যবসা, তার জন্য নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ বা শ্রীলংকার মত ছোট ছোট দেশ সৎ হবে তাদের জন্য তা ততই সহজ হবে নিয়ন্ত্রণ। ভারতের মত বৃহৎ জনশক্তি ও সেই মানানে অর্থ ও সমরশক্তি বিশিষ্ট দেশ যে সব সময় অন্য সকল ‘আমরা পৃথীবি শাসন করব’ ভাবনার দেশ গুলোর জন্য যে অন্তরায় সেটা বলাই বাহুল্য। আর এই জন্যই আমেরিকা, ইজরায়েল সহ রাষ্ট্রপুঞ্জ কেউ সামান্যতম নিন্দা টুকু করেনি চীনের এই অবৈধ অগ্রাসনে, মোদী সরকারের ব্যর্থ বিদেশনীতি আজ উলঙ্গ হয়ে গেছে। তাই কাদা ছড়াছুড়ি না করে দেশের অখন্ডতার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে শত্রু মোকাবিলা করা হোক, কূটনৈতিক স্তর সহ অস্ত্রের ঝনঝনানিতেও।
গালওয়ানের পর সাম্রাজ্যবাদী চীন এবারে আবার ডোকালাম অঞ্চলে অশান্তি বাঁধাবার তাল করেছে, চীন বুঝে গেছে স্বাধীনতার পর এই প্রথম ভারতে ফাঁপা ডায়লগবাজি সর্বস্ব ‘দুর্বল সরকার' গঠিত হয়েছে, যাদেরকে আক্রমণ করাই যায়। তার উপরে সারেন্ডার মোদীর চীনের কাছে প্রায় আত্মসমর্পন একপ্রকারে ভারতীয় সার্বভৌমত্ব ও সেনার গরিমাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। আমেরিকার চামচাগিরি করতে গিয়ে পড়শি সব কটি দেশের সাথে সম্পর্ক তলানিতে, ভুটানও চীনা সেনাদের মদতে তলে তলে ছোবলের প্রতীক্ষায় করছে, নেপাল তাদের সীমান্ত অঞ্চলে ভারী নির্মানে হাত লাগিয়েছে, পাকিস্তান শ্রীলঙ্কা তো অফিশিয়ালি চীনের উপনিবেশ- বাকি বাংলাদেশ; তাহলেই ষোলকলা পূর্ণ হয়।
ভারতের রাষ্ট্রনেতারা বিদেশ কূটনীতি ভুলে, দেশের মানুষকে পড়ুন (মুসলমানকে) রাষ্ট্রহীন করতে NRC এর নীলনক্সা আঁকতে ব্যাস্ত ছিল, ব্যাস্ত ছিল দেশের মাটিতে জাতিদাঙ্গা সংগঠিত করিয়ে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ দ্বারা রাজনৈতিক ক্ষমতা সুনিশ্চিত করা। তার জন্য জঙ্গি যোগসাজশে RSS নামের দেশদ্রোহী সংগঠন পাঠানকটের মত পরিকল্পিত হামলা সংগঠিত করেছিল, যাতে দেশের মানুষের কাছে সেনামৃত্যুর আবেগ দেখিয়ে ভোটে জেতা যায়, ভোটে তো জিতে এসেছে- কিন্তু এভাবে নিজের সেনা যারা নিজেরা খুন করে সেটা কি বিদেশী শক্তি লক্ষ্য করবেনা? যখন প্রতিপক্ষের নাম চীন, যারা কমিউনিজমের ভেকধারী নব্য পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ- তারা সুযোগ কাজে লাগিয়েছে পূর্ণ ভাবে।
অধিক মার্কিন ঘনিষ্টতা পুরাতন বন্ধু রাশিয়াকে রিঙের বাইরে করে দিয়েছিল, নতুন কোনো বন্ধু তো জটাতে সক্ষম হয়নি উপরন্তু শত্রু বাড়িয়েছে। মোদী সরকারের বিদেশনীতি আসলে স্বপার্ষদ মোদীর ব্যাক্তিগত ভ্রমণের ইচ্ছাপূরণ ছাড়া কোনও কাজে আসেনি।
ফেসবুক বা টুইটার তো আর পরীক্ষার হলের প্রশ্নপত্র নয় যে উত্তর অজানা থাকবে, তাই সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রতিটি ভক্ত সব প্রশ্নের জবাব নিয়ে হাজির, সেটা বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত হোক বা না হোক। উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে রাখা ‘পবিত্র বিশ্বাসী’ভক্ত প্রজন্ম তৈরি করার কৃতিত্ব নিশ্চয়ই দাবী করতে পারে ‘সঙ্ঘ পরিবার’, কিন্তু এর মাশুল চরম মূল্যে দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে।
কিন্তু সঙ্ঘ-পরিবারের কী যায় আসে! তারা তো ঐতিহ্যগতভাবেই উপনিবেশের পক্ষে, আগে ব্রিটিশ ছিল এখন না হয় চীন হবে!

সোমবার, ২২ জুন, ২০২০

আ'মোদী'ত অ'চীন' কথা


চীনে কি আমাদের মতো ‘সাধারণ মানুষ’ বাস করে না! এই ধরুন যাদের আমাদের ভাষায় বলি অকম্মা বা নিষ্কর্মা! নূন্যতম যোগ্যতাহীন আম-পাবলিকেরা যারা ‘গুড ফর নাথিং’ তারাও গতরে খাটা ‘নাট, বল্টু, বাইকের যন্ত্রাংশ, মায় টুনি বাল্ব’ পর্যন্ত বানায়। তাদের দেশের সরকারি অথবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেগুলোর জন্য অগ্রিম লোন দেয়, ও ফিনিস গুডস কিনে নিয়ে বিদেশের বাজারে তা বিক্রি করে দেশের চূড়ান্ত অকম্মাগুলোকেও আত্মনির্ভর বানিয়ে দিয়েছে। এদিকে চীনা সরকার বৈদেশিক মুদ্রার বিপুল সঞ্চয় গায়ে তুলছে, যে সম্পদ দিয়ে নতুন করে তাদের সাম্রাজ্যবাদী কার্যকলাপ রোজ বাড়িয়ে যাচ্ছে।

আমার দেশের দিকে তাকিয়ে দেখুন, মাতাল বেওড়া ধরনের লোকজন এখানে চা দোকানে আড্ডা দেয়, রাজনৈতিক দলের হয়ে ঝান্ডা নিয়ে মারামারি করে- আর কাজ বলতে, পঞ্চায়েতের লুঠের বখরার জন্য খেয়োখেয়ি, চালচুরি, গাছচুরি, ত্রিপল চুরি।
সব শেষে আসে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রকল্প, ১০০ দিনের কাজ। কী যে ছাতার মাথা দেশের উন্নতি হয় এখানে কেউ জানে না, কংগ্রেসের পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি আমদানি করে দিয়েছে। পুকুর পাড়, নয়ানজুলির আগাছা পরিষ্কার, নদী তীরের কাশবন সাফ করা, সহ যত ধরনের অকাজ যার কোনও বস্তুগত গুরুত্ব নেই সেই ধরনের কাজ করানো হয়। কাজ হওয়া তো বাহানা, যে কাজ একজন স্বাভাবিক রোজের শ্রমিক ১ জনে ১ দিনে করবে, সেটাই ১০০ দিনের সরকারি প্রকল্পে ৫০ জন শ্রমিক মিলে ৪ দিনেও শেষ করতে পারবে না- প্রকাশ্য প্রহসন। গরীবেরা ধাপ্পা দিয়ে টাকা পেয়ে খুশি, সরকার এভাবে বিলিয়ে ভোটের রাজনীতি করতে পেয়েই খুশি। আমরা মধ্যবিত্তেরা এসব দেখে নাটক দেখে খুশি।
আমরা ভাবছিও না, যে টাকাটা খরচা হচ্ছে এই ১০০ দিনের প্রকল্পের মজুরিতে সেটার জন্য আমাদেরই ৮০ টাকা লিটার পেট্রোল কিনতে হচ্ছে, কিম্বা রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাকে পুঁজিপতিদের কাছে বেচে দিয়ে হচ্ছে , অথবা চীন, আমেরিকা বা আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডারের থেকে ঋণ করে এনে সেটা দিচ্ছে।
এতে ডান, বাম, মধ্য, টিকি, দাড়ি, নেড়া সবাই সমান দোষী; কারণ এ বিষয়ে সকলেরই মুখে কুলুপ। দেশের জনগণকে মূর্খ ‘মুফত খোর’ অশিক্ষিত বানিয়ে রেখে নিকৃষ্ট অশিক্ষিত নেতাদের দিয়ে বিশ্বের সেরা হব এমন ভাবনা পাগল ছাড়া কেউ ভাবে না। তাই তিন পা এগোনোর আগেই তাসের ঘরের মতো হুড়মুড়িয়ে পরে যায় প্রতিবার; শ্রমের উপযুক্ত প্রয়োগের জন্য দরকার শিক্ষিত রাষ্ট্রনায়ক যে বা যারা দিশা দেখাবে জাতিকে। এই নিয়ে আমরা ‘জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’ ভাবনা ভাবা গাঁজায় দম দিয়ে চাঁদে যাওয়ারই সামিল।
আমরা ব্যস্ত মমতা না দিলীপ ঘোষ কে আজ বেশি ভুল বকল! মাননীয় পদ্মপাল জগদীশ ‘অপমানখোর’ এর সাথে রাজ্যের সংবাদে দ্রুত শিরোনাম দখল করতে চেয়ে স্বঘোষিত ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্রা পালের ‘গণশক্তি’ অভিযানের ফ্লপ-শো এর চেয়েও বেশি হাস্যকর ছিল জয় ব্যানার্জী নামের লম্পটের ভাষণ। এগুলোই আমাদের আলোচ্যসূচী। একটা ফেকু বেওড়া মাল, না সে সিনেমা জগতে কোনো কিছু ঠিক করে করতে পেরেছিল, না বিজেপিতে জয়েন করে আহামরি কিছু করতে পেরেছে; অকাল কুষ্মান্ড হয়ে যা হয় আর কি। ঘরের বৌকে যে সামলাতে পারে না, সে আবার হুমকি দেয় মানুষজনকে মেরে জ্বালিয়ে দেওয়ার, অবশ্য এতে করে তার পেটে থাকা কুচো কৃমিগুলোও যে হেসে অস্থির সেটা পাঁচুইখোর জয়ের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তবুও প্রাত্যহিক জীবনের হরেক লড়াইতে ‘জয়’ দের মতো ক্লাউনের ‘সার্কাস’ দেখতে মন্দ লাগে না। আর এখানেই আমাদের বর্তমান নেতাদের সাফল্য, তারাও আমাদের সামনে এমন রামদাস আটাউলে, অনুব্রত, জয় ব্যানার্জির মতো গাম্বাটগুলোকে সাপ্লাই দিয়ে যাচ্ছে নিরবচ্ছিন্নভাবে।
এটাই আমাদের রাজনীতি সর্বস্ব গণতন্ত্রের বন্ধ্যা প্রসব। যেখানে পরিকল্পনাই নেই মেয়াদী জনস্বার্থে। কেউ বলার নেই, কেউ ভাবার নেই।

রবিবার, ২১ জুন, ২০২০

গালওয়াল কি ও কেন?



লাদাখের যে অঞ্চলে বর্তমানে ভারত চীন দ্বন্দ্ব চলছে সেই অঞ্চলটির নাম আমরা সকলেই জেনে গেছি, ‘গালওয়ান উপত্যকা’; কিন্তু এটা কি জানি- কেন এই অঞ্চলের নাম গালওয়ান?
এটি বিরল উদাহরণগুলির মধ্যে একটি, যেখানে একটি বিশিষ্ট ভৌগলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পন্ন অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছিল তথাকথিত ‘নেটিভ’ এক্সপ্লোরারের নামে।
সমুদ্র পৃষ্ঠের ৫০০০ থেকে ৭০০০ মিটার উচ্চতার হিমালয়ে, যেখানে স্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ৩০ ডিগ্রী, এমন সব অগম্য দুর্গম স্থানে, পাহাড়ি চিতার মতো অনায়াস পথ খুঁজে সভ্যতার সামনে নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করে গেছেন সারাজীবন ধরে যে মানুষটি, তার নাম- গোলাম রসূল গালওয়ান।
‘লেহ’ থেকে লাদাখের পথ অন্বেষণকারী প্রথম ব্যক্তির নাম ‘গোলাম রসূল গালওয়ান’। আয়ারল্যাণ্ডের অভিজাত কাউন্টি ডানমোরের সপ্তম আর্ল ‘ডুনমোর মুর’ সাহেব এলেন হিমালয় অভিযানে, সেটা তখন ১৮৯২ সাল; এই আইরিস-ব্রিটিশ অভিযাত্রী দলটি ‘চ্যাং চেনমো’ উপত্যকার উত্তর দিকের অঞ্চল অন্বেষণ করছিল। একদিকে রাশিয়ান অভিযাত্রীদের সাথে তিব্বত দখলের লড়াই- অন্যদিকে ব্রিটিশদের আগের প্রতিবারের ব্যর্থ অভিযানের ইতিহাস বেয়ে, একসময়ে মুর সাহেবরাও ভ্রমবশত পূর্ব দিকে এক অজানা নদী উপত্যকায় এসে পড়েছিল, যেখান থেকে সামনে দুর্ভেদ্য খাড়াই হিমালয়ের প্রাচীর ছাড়া আর কিছুই ছিলনা।
দুর্গম অঞ্চলে পথ হারিয়ে যখন প্রায় মৃত্যুমুখে অবতীর্ণ হতে বসেছে অভিযাত্রী দলটি, ঠিক তখনই একটি ১৪ বছরের বালক কুলি, গোটা দলটাকে একটা এমন পথে দিয়ে বের করে নিয়ে আসে, যা ওই অভিযানের সবচেয়ে সহজলভ্য পথ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করে দেয়।
কোনও ধরনের পুর্ব অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া, আশ্চর্য অনুমান ক্ষমতা, সাহস, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা, আর কঠিন পরিস্থিতিতে স্নায়ুর উপরে পূর্ন নিয়ন্ত্রণ রেখে, সাথে হিমালয়কে অনুসন্ধানের এক অবিশ্বাস্য নেশার দৌলতে সে যাত্রায় গোটা অভিযাত্রি দলটা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়। আজও ওই অঞ্চলে যাতায়াতের জন্য এই পথের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সহজ কোনো উত্তরণের পথ পাওয়া যায়নি।
জীবন বাঁচানোর কৃতিত্বে মুগ্ধ হয়ে যান আর্ল ‘ডুনমোর মারে’, কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সেই বালকের কাছে জানতে চান- ‘তোমার কী পুরস্কার চাই বলো’! তখন বালক গোলাম রসূল বলেন- ‘যে পাহাড়ী নদীটি আছে এটি আমার উপজাতির নামে রাখা হোক ‘গালওয়ান নাল্লা’। নূন্যতম কালক্ষেপ না করে অভিযাত্রী দলটি তৎকালীন ব্রিটিশ বাহাদুরকে যে নথি পাঠায় সেখানে প্রায়োরিটি হিসাবে নদীর নাম ‘গোলাম রসূল গালওয়ান’ এই পুরো নামটাই উল্লেখ করে পাঠান।
সেইমতো পরবর্তী ব্রিটিশ মানচিত্র প্রকাশিত হলে দেখা যায়, ওই অঞ্চলের ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ যে নদী, সরকারি ভাবে তার নাম রাখা হয়েছে ‘গালওয়ান নদী’; যা লাদাখের পূর্ব অংশে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পাড় বরাবর যে পথ, সেই নতুন পথেরও নাম রাখা হয়েছিল গালওয়ান পাস। শুধু তাইই নয়, অঞ্চলটির নামও গালওয়ান উপত্যকা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল মানচিত্রে। গালওয়ান নদীটি বর্তমান ‘আকসাই চিন’ অঞ্চলের একটি ছোট অনাম্নী হ্রদ থেকে উদ্ভূত হয়ে চীনের সীমান্ত বরাবর পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ভারতের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে ‘শায়ক’ নদীর সাথে মিলিত হয়েছে, এই শায়ক নদী সিন্ধু নদীর একটি গুরুত্বপুর্ণ শাখা।
‘ফোরসাকিং প্যারাডাইজঃ স্টোরিস অফ লাদাখ, বই অনুসারে যে তথ্য পাওয়া যায়-
বইতির লেখক, ব্রিটিশ ‘রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির’ ১৯১৯ সালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ‘লেফটেন্যান্ট কর্ণেল স্যার ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’; যিনি তার সেনা কর্মজীবনে তিব্বত অঞ্চলের কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৮৯০ সালের শীতে তিনি কাশগরে শীত কাল কাটিয়ে সেখান থেকে হিমালয়ের পাদদেশ বরাবর অভিযান শুরু করেন, সহজে ‘চাইনিস তুর্কিস্তানে’ যাবার রাস্তা খোঁজার মিশনে পাঠানো হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার বাহাদুরের তরফে। বলাই বাহুল্য সেই মিশন সাফল্যের মুখ দেখেনি। এই একই রাস্তা খুঁজছিল বেশ কয়েকটি রাশিয়ান, ফরাসি, মার্কিন ও অস্ট্রেলীয় অভিযাত্রী দল; প্রসঙ্গত কেউই সফলতার মুখ দেখেনি চূড়ান্ত পর্যায়ের দুর্গম আবহাওয়ার জন্য।
ডুনমোর আর্লের পাঠানো নথিতে বিস্ময় বালকের সন্ধান পেতেই ব্রিটিশ বাহাদুর পুনরায় ‘ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’কে তিব্বত অভিযানে পাঠায় পথের সন্ধান করতে; তবে এবারে অর্ডার ছিল ‘গোলাম রসূল গালওয়ান’ কে গাইড হিসাবে নেওয়ার। ব্যাস, ১৮৯৯ সালে শুরু হওয়া অভিযান অচিরেই সফলতা অর্জন করে ও পরবর্তীতে ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’ তিব্বতের কমিশনার পদে নিযুক্ত হন।
আরও পরবর্তীতে ‘ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’ মাউন্ট এভারেস্ট কমিটির চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন, যার দরুন ১৯২১ সালের ‘ব্রিটিশ রিকনোসায়েন্স এক্সপিডিশন টু মাউন্টে এভারেস্ট’ মিশনে মুখ্য কোঅর্ডিনেটর নিযুক্ত হন; আবার সেই গোলাম রসূল গালোয়ানের দ্বারস্থ হয় গোটা অভিযাত্রি দলটি। এমন হরেক বীরত্বে ঠাসা তথ্য সযত্নে লিখিত রয়েছে রয়েছে ‘ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’ রচিত ২৬টি পুস্তকে, যা ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত রাখা আছে। তাছাড়া আরো অন্তত ৫০ জন আলাদা আলাদা অভিযাত্রীর লেখা বইতে ‘গোলাম রসূল গালওয়ানের’ গৌরবান্বিত উপস্থিতি রয়েছে।
গোলাম রসূল গালওয়ান সারা জীবন ধরেই বহু দুর্গম অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্থানীয় গাইড হিসাবে। তিনি ব্রিটিশ, ইতালিয়ান এবং আমেরিকান এক্সপ্লোরারদের নেতৃত্বে হরেক অভিযানগুলিতে শুধুই গাইড হিসাবে সহায়তা করেননি, বরং একজন নিখুঁত পরিকল্পনাকারী ও তার সফল রূপায়নকার হিসাবে নির্দিষ্ট করে নিজের কর্মের ছাপ রাখতেন। তিব্বত, জিনজিয়াংয়ের ইয়ারকান্দ যা বর্তমানে চীনের উইঘুর প্রদেশের কাছে অবস্থিত, কারাকোরাম শৈলসীমা, পামির মালভূমি অঞ্চল সহ অন্যান্য মধ্য এশিয়ার দুর্গম থেকে দুর্গমতম অঞ্চল গুলোতে কেউ অভিযানের কথা ভাবলে সকলের আগে তারা গালওয়ানকে ভাবতেন।
১৮৭৮ সালে লেহ’তে জন্মগ্রহন করা গোলাম রসূল গালওয়ান মাত্র ১২ বছর বয়সের আর্থিক দুরবস্থার কারণে, ঝুঁকিপূর্ণ, পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘ-দূরত্বে অভিযান চালানো বিভিন্ন দলের সাথে গাইডের কাজে নিযুক্ত হয়ে যান। কাজের সন্ধানে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাড়ি ত্যাগ করেন, নতুন জায়গা সন্ধানের প্রতি তাঁর অসীম আগ্রহ ও আবেগ তাকে ব্রিটিশদের প্রিয় গাইড হিসাবে গড়ে তুলেছিল।
গোলাম রসূল গালওয়ান প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু ভীষণ পণ্ডিত মানুষ ছিলেন। একজন আগ্রহী শিক্ষানবিশ কিশোরের সামান্য মুটে থেকে অপ্রতিরোধ্য গাইড হিসাবে বেড়ে উঠার কথা, ফ্রান্সিস ইয়াংহাজবেন্ডের প্রতিটি লেখায় ফুটে উঠেছে। চোস্ত ইংরাজির সাথে সাথে, চীনা, রাশিয়ান, তুর্কি, তিব্বতি, ইতালীয় ও স্প্যানিশ ভাষায় তার দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। এর সাথে সাথে নেটিভ ভারতীয়দের ভাষা, যেমন লাদাখি, উর্দু, হিন্দি, কাশ্মীরি, পুস্তু, আফগানী, গাড়োয়ালী, কিন্নরী ইত্যাদি সহ প্রায় ১৮টি ভারতীয় ভাষায় অনর্গন কথা বলতে পারতেন। একজন সামান্য কুলি এবং টাট্টু ঘোড়ার সহিস হিসাবে জীবন শুরু করে, ১৯১৭ সালে লেহ’এর ব্রিটিশ যুগ্ম কমিশনারের প্রধান সহকারী পদে উত্তীর্ন হয়েছিলেন।
গোলাম রসূল গালওয়ানেরা কাশ্মীরি ‘গালওয়ান’ উপজাতির অন্তর্ভুক্ত, যার অর্থ কাশ্মীরি ভাষায় ‘ঘোড়ার রক্ষক’; আমরা বাংলায় যাকে উচ্চারণ করি ‘গাড়োয়ান’। কথিত আছে যে, গোলাম রসূল গালওয়ানের মাতামহ ‘কারা গালওয়ান’ নামের কুখ্যাত ছিল, কাশ্মীরি ভাষায় যার অর্থ ‘কালো দস্যু’। ‘কারা’ সে সময় তার উপজাতির গোষ্ঠী প্রধান ছিল, এবং তারা শুধুমাত্র ধনী জমিদারদের সম্পদ লুঠ করত, যা তার জ্ঞাতিভাইদের মাঝে বিতরণ করত। এক সময় কাশ্মীরের ডোগরা রাজার ঘরে দস্যু বৃত্তি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় ‘কারা’, ফলস্বরূপ গোটা উপজাতি দলটির উপরে নেমে আসে সাহার খাঁড়া। গালওয়ান উপজাতিকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে দিয়ে একটাকে লেহ আর অন্যটিকে বালোচিস্তানের ঊষর অঞ্চলে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। লেহ এর দুর্গম আবহাওয়া সহ্য না করতে পেরে বহু ‘গালওয়ানিস’ মারা যাওয়া শুরু হলে, তখন তারা হিমালয় টপকে উইঘুর প্রদেশের ইয়ারকান্দে বসতি স্থাপন করেছিল, যদিও গোলাম রসুলের পরিবার লেহ তেই রয়ে যায় কয়েকঘর স্বজাতির সাথে। তার পারিবারিক জীবনের ইতিহাস তিনি নিজেই তার লিখিত বইতে উল্লেখ করে যান, যা তিনি তার মা ও স্বজাতিদের কাছে শুনেছিলেন।
১৯৪৫ সালে এক দুর্গম অভিযানে গিয়ে আর ফেরা হয়নি গালওয়ানের, হিমালয়ের কোনো এক দুর্গম অঞ্চলে বরফের মাঝেই তার নশ্বর দেহ চিরতরে হারিয়ে যায় মাত্র ৪৭ বছর বয়সে। এভাবেই একটা বর্ণময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। বর্তমান দিনে, ওল্ড লেহ’এর চামসপা ইয়ার্টং সার্কুলার রোডে গোলাম রসূলের চতুর্থ প্রজন্মের সদস্য বসবাস করেন। সেখানের সরকারি গেস্টহাউজ ‘গালওয়ান গেস্ট হাউস’টি ওনারই সম্মানার্থে নামকরণ করা হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার দ্বারা, যা আজও রয়েছে।
কিন্তু এত সবের পর আর গালওয়ানের নাম থাকবেনা কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। ইতিমধ্যেই এলাকাটিকে চীন তাদের দেশের অংশ বলে অন্যায় দাবী করে নতুন নাম দিয়েছে; আর চীনকে সমুচিত জবাব দিয়ে যদি আমাদের সেনা ওই এলাকা পুনরুদ্ধার করে আনে, যোগী আদিত্যনাথ কি আর হাত গুটিয়ে বসে থাকবে! হাজার হোক নামটা গোলাম রসূল, গৌড় বা রাসেল নয়, তাই অতি শীঘ্রই এমন একটা ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে তা বলাই বাহুল্য।
তথ্য সুত্রঃ
indian defence research wing এর ওয়েবসাইট

শনিবার, ২০ জুন, ২০২০

দেশদ্রোহী BJP সরকার



প্রধানমন্ত্রী অফিসিয়ালি ঘোষনা দিয়েছিলেন, যে গালওয়ান উপত্যকা অঞ্চলে ২০ জন ভারতীয় সেনা শহীদ হয়েছিল সেটা ভারতীয় সীমা নয়, মানে ভারতীয় সীমায় চীনা অনুপ্রবেশ করেনি। যেটা উহ্য ছিল সেটক হল- আমাদের সেনা চীনা ভুখন্ডে ঢুকে আত্মহত্যা করতে গেছিল।


ব্যাস, মোদীজির কথাকে মান্যতা দিয়ে এবং ওনার ইঙ্গিতের ভিত্তিতে, চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে পুরো পৃথিবীর কাছে গোটা গলওয়ান উপত্যকার দাবির পুনরাবৃত্তি করেছে।

মোদীজি ভেবেছিলেন ভক্তদের মন কি বাত শোনাচ্ছেন, যা বলবে তাতেই ভক্তরা হৈ মেরে উঠবে। চীনও যে মোদীর মত বড় বক্ত আজকে প্রমান পাওয়া গেল। অক্ষরে অক্ষরে মোদীর কথা কেমন সুরসুর করে মেনে নিল!

চীনে মোদীজির জনপ্রিয়তা হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে গাধার কানের খবর, তারা নাকি বলছে "ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রধানমন্ত্রী"।

বাহ মোদিজী বাহ
মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়।


শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২০

ট্রাম্প ও মোদীর নোংরা সম্পর্ক

 


আমেরিকায় ভোট, ট্রাম্পের নির্দেশে তার বন্ধু শিনপিং এর ভারতে পরিকল্পিত হামলা, সহযোগী মোদী।
মেকি দেশপ্রেমিক ভক্তদের বাপ মোদীর মিত্রোঁ "ডোলান"- আরো কিছু হাজার ডলারের অস্ত্র বিক্রি করাতে চায়। আমাদের সৈনিক খুন করিয়ে মসনদে আসতে চায়, যেমন পুলওয়ামাতে সেনা খুন করিয়ে- মিত্রোঁ আচ্ছে দিন এনেছিল দ্বিতীয় দফাতে। যার কোনো তদন্ত হয়নি।
সাম্রাজ্যবাদী চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে শয়তান ট্রাম্প এর ঘনিষ্ঠতা ফাঁস করে দিয়েছে ট্রাম্প জামানারই প্রাক্তন জাতীয় নিরপত্তা উপদেষ্টা জন বুল্টন।
গত বছর জুনে চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে আলাপ হয়েছিল ট্রাম্পের, অক্টোবরে সিংপিং এদেশে এনেছিল মোদীর সাথে চুক্তি করতে। সেই মতই শীত কমতেই দেশের সার্বভৌমত্ব ও সেনাদের প্রাণ বলিদান দিয়ে দালাল মোদীর দুই অবৈধ পিতাদের কার্যকারিতা। এক বাপ ভয় দেখাবে, অন্যবাপ অস্ত্র বেচবে, ফুল প্যাকেজ।
সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন-চীনা জোট, সাথে দালাল মোদী ও RSS, আমাদের সেনাদের জীবন ও ভারত ভূমি প্রতিবেশীদের কাছে বিকিয়ে দিয়ে নিজেদের কুর্সি সুরক্ষিত করেছে।
আজকের চীনা হামলা নিয়ে মোদী সরকার আগে থেকেই ওয়াকিবহাল। জেনেবুঝেই সেখানে বিহারের ও বাংলার সেনাদের রেজিমেন্ট পাঠানো হয়েছে, যাতে আসন দুই রাজ্যের ভোটে দেশপ্রেমের সেন্টিমেন্ট তুলতে পারে।
চাড্ডী বাছুর গুলো এদেশীয় মুসলমান ও কমিউনিষ্টদের পিছনে লেগেছে, আসলে তো দেশদ্রোহী এরা নিজেরা। আগে ব্রিটিশদের গোলামি করত, মাঝে আমেরিকার এখন নতুন 'বাবু' ঘরেছে RSS নামের গনিকারা, নাম "চীন",
এদের বিচার চাই।

দেশের গাদ্দার বিজেপি




সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মোদী সরকারের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। পাকিস্তানি এজেন্ট দাভিন্দর সিং কোর্ট থেকে জামিন পেয়ে গেল দিল্লি পুলিশের চার্জসিট ফাইল না করতে পারার ব্যর্থতায়।

দাবিন্দর - সিং না হয়ে সেখ হলে আদালতও যে জামিনের বিষয়ে চোখের কালো ফিতে খুলতনা- তাতে চার্যসিট জমা পরুক বা না পরুক- সে বিষয়ে কারো মনে সন্দেহ থাকা অপরাধ।

এদিকে উমর খালিদ- কানাইয়া কুমারকে জেলে ভরতে দিল্লি পুলিশ ভীষণ তৎপর , সাফুরা জারগার জেলে। আমাদের আদরনীয় গৃহ মন্ত্রী চোখে লঙ্কা গুড়ো লাগাচ্ছেন হয়ত, চীনকে লাল আঁখ দেখাতে হবে বলে।

বাহ মোদিজী বাহ। আত্মনির্ভরতার শ্রেষ্ঠ উদাহরন।

হুজুকে জনগন আর দেশপ্রেমের গিমিকে সন্ত্রাসীদের আচ্ছে দিন, তো ভক্ত.... নাচো.....

মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়

মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২০

প্রসঙ্গঃ নেপালি কোম্পানি বয়কট


প্রাক কথন

চাইনিস কোম্পানি বর্জনের গল্প তো অনেক হল, নেপালি কোম্পানি ‘বয়কট’ হোক এবারে।
গান্ধী পরবর্তী ভারতে আবার স্বদেশি যুগের ‘বিকাশ’ ঘটেছে, অন্তত ভক্তদের হিসাবে। চীনা অগ্রাসনের জবাবে, তাদের ভূমিতে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের বদলে চীনাপণ্য বয়কট করাকেই ধর্মযুদ্ধ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে নাগপুর; ভক্তরা চীনাদ্রব্য বর্জনের পণ করেছে টুনি লাইট ও টিকটক আনইন্সল করে।
যদিও আমাদের দেশকে ২০০ বছর ধরে লুটে নিয়ে যাওয়া ব্রিটিশ কংগ্লোমেরেট কোম্পানি ‘ইউনিলিভার’কে বর্জনের বিষয়টা সেভাবে উঠে আসেনি কখনও, কারন ভক্ত আইকন স্বঘোষিত ‘বীর’ সাভারকরকে এই ব্রিটিশ প্রভুরাই মাসিক মাসহারা দিয়ে তাদের হয়ে লালনপালন করেছিল, সেটারই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ব্রিটিশ বাপের প্রতি আজকের ভক্ত সন্তানদের আহুতি জ্ঞাপন হয়ত।
নেপাল বর্তমানে ভারত রাষ্ট্রের মাথাব্যাথার কারন, যদিও আমাদের প্রতিরক্ষা ‘কড়িনিন্দা’ মন্ত্রী- নেপাল কনফ্লিক্ট বিষয়ে দৈবযোগের উপরে ভরষা রাখতে বলেছেন ১৫ই জুন ২০২০ তারিখে এক সাক্ষাৎকারে। এক্ষেত্রেও সেনাকে দিয়ে জবাব দেওয়ানোর মত বুকের পাটা তৈরি হয়নি ৫৬ ইঞ্চির মিত্রো’র, যেটা উহ্যই রেখে গেছেন। আজকাল আর নেপালিরা দারোয়ান থাকেনা সেভাবে, তাহলে নেপালকে শায়েস্তা করতে নেপালি পণ্য বর্জন হোক।
আকাশ থেকে পরলেন নাকি? ভারতে আবার নেপালি কোম্পানি কোথায়, যাকে বর্জন করা যায়? আজকের গল্পটাই তো সেটা, হোক নেপালি পন্য বয়কট

ভূমিকাঃ
বিদেশী মাল্টিন্যাশানাল FMCG ও Conglomerate বিকল্প ভারতীয় পণ্যের কথা ভাবলেই আপনার মনে কোন নামটা ভেসে উঠে বা আপনার মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, মোদী সরকারের কর্তাকর্তা ও নাগপুরের খাটালপতিদের- বিগত ৬ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে!
কেন পতঞ্জলী, এ তো খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন। শুদ্ধ দিশি ভারতীয় কোম্পানি।
গেরুয়া বস্ত্র গায়ে একজন সনাতন সাধু সন্ত, হাজার হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য তৈরি করেছে বলে- জিহাদি মুসলমানের বাচ্চা আর চীনের দালাল কমিউনিষ্টগুলোর বক্ষশূল শুরু হয়ে গেছে, চলতি ভাষায় পিছন ফাটছে ব্যার্থ ঈর্শাতে; অনেক সেলিব্রিটি ভক্ত তো প্রকাশ্যেই বলছে- “দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি”, তা ভাই দেশদ্রোহীরা লুচির মত ফুলতে থাকুক, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- পতঞ্জলী কি অদৌ ভারতীয় কোম্পানি?

প্রশ্নঃ
পতঞ্জলী কি অদৌ ভারতীয় কোম্পানি? প্রশ্ন দু’দুবার না করলে তা জোশ পায়না, আমাদের সমাজে।

অন্বেষণঃ
‘মিনিষ্ট্রি অফ কর্পরেট এ্যাফেয়ার্স’ এর তথ্যমতে ‘পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ লিমিটেড’ নিশ্চই ভারতীয় কোম্পানি, ভারত সরকারের কোম্পানি বিষয়ক মন্ত্রকের থেকে লাইসেন্স প্রাপ্ত কোম্পানি ভারতীয় হবেনা? তাহলে তো কাকা প্রতিটি বিদেশী কোম্পানিই ভারতে এসে লিমিটেড বা প্রাইভেট লিমিটেডের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসা করে, অতএব কেউই বিদেশী হতে পারেনা এই ফান্ডাতে। যাই হোক ছেঁদো কথাতে ভক্তেরা ভুলে থাকুক, কারনে ধর্মের তাড়ির নেশা সহজে নামেনা, বাকিদের জন্য কিছু তথ্য নিয়ে এলাম, যেটা জনৈক ‘রঞ্জিত টমাস’ টুইটারে বিষয়টি সর্বপ্রথম সর্বসমক্ষে নিয়ে আসেন দিন দুয়েক আগে, সেখান থেকে প্রাপ্ত এন্থু নিয়ে তথ্য অনুসন্ধান করে আনলাম।
পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ এই মুহুর্তে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটির সম্পদশালী FMCG তথা Conglomerate কোম্পানি, যার CIN- U24237DL2006PLC144789। MCA তে দাখিল করা তথ্যমতে কোম্পানির ৭ জন ডিরেক্টর, যথাক্রমে-
1. রাম ভারত
2. আচার্য বালকৃষ্ণ
3. স্বামী মুক্তানন্দ
4. অজয় কুমার আর্য
5. রাকেশ মিত্তল
6. সুমেধা
7. ইয়াজ দেব আর্য
এনাদের মধ্যে রাম ভারত হলেন স্বামী রামদেবের আপন ভাই, স্বামী মুক্তানন্দ রামদেবের সহচর, বাকিরা আত্মীয় ও বেতনভুক কর্মচারী।
পতঞ্জলী আয়ুর্বেদের শেয়ার হোল্ডিং প্যাটার্নটা আরও ইন্টারেস্টিং,
1. গঙ্গোত্রী আয়ুর্বেদ- ০.৫৮%
2. কাংখাল আয়ুর্বেদ- ০.২০%
3. চৈতন্য আয়ুর্বেদ- ০.১০%
4. ডায়ানামিক বিল্ডকন- ০.৪৪%
5. পতঞ্জলী করুপ্যাক- ০.০৮%
6. আরোগ্য হার্বস- ০.০৫%
সব মিলিয়ে ১.৪৫% শেয়ারের মালিক বাইরের(!) কেউ; আর বাকি ৯৮.৫৫% শেয়ারের মালিক আচার্য বালাকৃষ্ণ নিজে। কিন্তু এখানেই সব শেষ নয়- কাঙ্খাল, চৈতন্য, ডায়ানামিক, আরোগ্য হার্বস, গঙ্গোত্রী ও পতঞ্জলী করুপ্যাক কোম্পানি গুলোরও প্রতিটির ৯০% এর বেশি শেয়ারের মালিক আচার্য বালকৃষ্ণ। অর্থাৎ আক্ষরিক এবং খাতায় কলম উভয় ক্ষেত্র মিলিয়ে আচার্য বালকৃষ্ণই পতঞ্জলী সাম্রাজ্যের ৯৯.৯২% এর মালিক; বাকিরা বেতনভুক কর্মচারী।
তথ্য বলছে গত ২০১৯ অর্থবর্ষে পতঞ্জলির ‘নেট ইনকাম’ ছিল ৮৩৩০ কোটি টাকা, সুতরাং পতঞ্জলী আয়ুর্বেদের সম্পত্তি সাড়ে চার হাজার কোটির গিঁটে আঁটকে থাকলেও এর মালিক আচার্য বালাকৃষ্ণ’র সম্পদ ২০১৮ সালে দাখিলকৃত তথ্যানুযায়ী- ৪৩৯৩২ কোটি টাকা, এই ২০২০তে সেটা যে আর বেড়েছে সেটা বলাই বাহুল্য, যেটা তাকে ভারতের(!) পঁচিশতম ধনী ব্যাক্তির শিরোপা দিয়েছে।
কে এই আচার্য বালাকৃষ্ণ?
যদি উইকিপিডিয়া আর হোয়াটসএ্যাপ ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞদের রায়কে অভ্রান্ত বলে ধরে নেন, সেক্ষেত্রে উনি খাঁটি ভারতীয় নাগরিক; নেপালি উদবাস্তু পিতা- জয়বল্লভ সুবেধী’র ঔরসে ও মাতা সুমিত্রাদেবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭২ সালে, ভারতের হরিদ্বারে।
এটাই যদি সত্য হবে তাহলে ২০১১ সালের ২৩শে জুলাই CBI ভুয়ো ডকুমেন্টস সাবমিট করে ‘জালি’ ভারতীয় পাসপোর্ট বানানোর দায়ে বালাকৃষ্ণর নামে ফরজারি ও চিটিং এর মামলা করেছিল কেন, ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট এক্ট ১২ লঙ্ঘনের অপরাধে? যেখানে আদালত এরেষ্ট ওয়ারেন্ট বের করলে তাকে হেফাজতেও নেওয়া হয়, ও পরে জামিনে মুক্ত হলেও মামলা চলতে থাকে।
পাশাপাশি ED ও SFI তদন্ত শুরু করে তথ্যপ্রমাণ পায় যে, বিপুল পরিমাণে আর্থিক তছরুপ, নেপালে টাকা পাচার, হাওলার মাধ্যমে স্কটল্যান্ডে টাকা পাচার, করফাঁকি সহ হরেক মানি লন্ডারিং কেস এমনকি চিটফান্ডের নামে জনগনের টাকা আত্মসাৎ এর মত গুনেরও অধিকারী এই আচার্য বালকৃষ্ণ। পতঞ্জলীর প্রথম লগ্নিই ছিল স্কটল্যান্ড প্রবাসী নেপালি ধনকুবের ‘সারোয়ান পোদ্দার ও তার স্ত্রী সুনিতার’ করা লগ্নি দিয়ে। যাই হোক CBI, EB, SFI একত্রে মামলাও শুরু করে বালকৃষ্ণর নামে ২০১২ সালে, CBI চার্যসিটও দাখিল করে দেয় যথাসময়ে। সেসময় বালকৃষ্ণ কর্টে হলফনামা দাখিল করে স্বীকার করে নিয়েছিল যে তার জন্ম হয় নেপালের গন্দকী প্রদেশের সঞ্জিয়া নামক এক স্থানে।
এই সময়েই আন্না হাজারের নেতৃত্বে, বাবা রামদেব সহ কেজরিওয়াল, কিরণ বেদীদের মত ‘দেশপ্রেমিক’ ব্যাক্তিরা দেশপ্রেমিকদের সরকার আনতে তীব্র লড়াই শুরু করেছিল রামলীলা ময়দানে, উদ্দেশ্য মনমোহন সরকার ফেলে দিয়ে আচ্ছেদিনের সরকার আনা। রামদেবের- ৩৫টাকা লিটার পেট্রোলের ধাপ্পাবাজিও এই সময়েরই।
এরপর ২০১৪ সালে দেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হয় আচ্ছেদিনের সরকার, শুরুতেই যাদের যাদের আচ্ছেদিন এসেছিল তাদের মধ্যে এই আচার্য বালকৃষ্ণ পায়োনিয়ার ব্যাক্তি। মোদী সরকার ক্ষমতায় আসতেই যাবতীয় মামলা ও অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, ও ২০১৭ সালে তাকে ক্লিনচিট ও ঘোষণা করা হয়। যদিও বালকৃষ্ণকে আজ পর্যন্ত অফিশিয়ালি ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়নি মোদী সরকার, যেমনটা আদনান স্বামীকে দিয়েছিল। এরপর আর কী, ‘বিপ্লব’ শেষ হয় বালকৃষ্ণর টাকায় চলা ‘দম দেওয়া কলের পুতুলদের’। আন্না হাজারে শীতঘুমে ফিরৎ চলে যায়, কেজরিওয়াল দিল্লির ক্ষমতায়, কিরন বেদী বিজেপি জয়েন করে রাজ্যপাল হয়ে যায়, আর বাবা রামদেব? গেরুয়া ধারী সন্ন্যাসীর ভেকে, হাজার কোটির ‘ব্যবসায়িক’ সাম্রাজ্যের বেতাজ বাদশা।
আর আপনি ৮০ টাকা পেট্রোল কিনছেন-

আত্মনির্ভরতাঃ
এরপর থেকে পতঞ্জলীর সম্পদ আর ততটা বাড়তে দেননি বালকৃষ্ণ, যতটা নিজের সম্পদ ও শেয়ার বাড়িয়েছেন ‘বিকাশ’ পুরুষের পরবর্তী ৬ বছরের রাজত্বে। দেশজ মিডিয়ার প্রোপাগান্ডার কল্যাণে, নেপালি নাগরিকত্বকে সুন্দরভাবে ধামাচাপা দিয়ে ভারতীয়দের দেশপ্রেমের নতুন আইকন হয়ে উঠে এসেছে নেপালি নাগরিক ‘আচার্য বালকৃষ্ণর’ পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ। নেপালি মানেই বাহাদুর নয়, চোর ও জালিয়াৎ ও হয় এটাও জানা গেল।
বালাকৃষ্ণর গুণ এখানেই শেষ নয়, বারানসীর ‘সম্পূর্ণনন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়’ নামের যে প্রতিষ্ঠান থেকে ওনার শিক্ষাগত যোগ্যতা বলে দাবী সমস্ত অফিসিয়াল নথিতে- সেখানে এই সেদিন, মানে মধ্য নব্বইয়ের দশকের কোনো নথিতেও বালকৃষ্ণর নামগন্ধও নেই। বিকাশপুরুষের মতই তিনিও জালি ডিগ্রীধারি, এই না হলে যুগলমিলন!
বালকৃষ্ণর নামে মামলার আগে পর্যন্ত যে পোদ্দার সাহেব বাবা রামদেবের ছায়াসঙ্গী ছিলেন, মামলা শুরু হতেই স্বভাবতই ‘স্কটিট নেপালি’ পোদ্দার ‘বামাল’ ছেড়ে ‘জান’ বাঁচাতে গিয়ে আর ফেরেনি এ দেশে; প্রসঙ্গত এই সারোয়ান ওরফে ‘শ্যাম’ বাবুর স্ত্রী- বাবা রামদেবকে একটি আস্ত দ্বীপ কিনে উপহার দিয়েছিলেন, যার মূল ব্যবসার প্রায় সবটা চীনে ছিল বা আছে। পতঞ্জলিতে থাকা সারোয়ান পোদ্দারের অধিকাংশ সম্পত্তি মোদী সরকারের বাদান্যতায় অফিশিয়ালি বাজেয়াপ্ত করে এই বালকৃষ্ণ, বাকিটা দান হিসাবে দেখিয়ে দেয়।
এরপর নতুন করে পতঞ্জলী আয়ুর্বেদ নেপালে লগ্নি শুরু করে দেয় ২০১৬ সাল থেকে। তৎকালীন নেপালি রাষ্ট্রপতি ভন্দ্রাই, প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কামাল দহল, নেপাল কংগ্রেস সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা, মন্ত্রী, সান্ত্রী, নেতারা এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একটা বিরাট সদস্য দল নিয়ে বীরগঞ্জে একটা প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় সাড়ে এগারো হাজার কোটি টাকা নেপালের বিভিন্ন ক্ষেত্রে লগ্নি করেন প্রবাসী নেপালি ‘আচার্য বালকৃষ্ণ’। ২০২০ সালে সেটা ঠিক কতটা বেড়েছে সেই তথ্য না থাকলেও সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কোঅপারেশন (MCC)’ নামের ভেঞ্চার গুলোকে ফিরিয়ে দিয়েছে নেপাল সরকার, যেখানে চীনের সংস্থার সাথে জুটি বেঁধে কাজ করছে আচার্য বালকৃষ্ণর সংস্থা।
তাহলে? একজন নেপালি নাগরিককে জালি ভারতীয় বানিয়ে দেশপ্রেমের রজঃস্রাবে স্নান করার মাঝে সুখ ঠিক কতটা ভক্তজন?
ভারতীয় আইনব্যবস্থার দীর্ঘসুত্রতার সুযোগ নিয়ে বালকৃষ্ণরা ক্লিনচিট পেয়ে যায় বেনিয়া সরকারদের কাছ থেকে, মামলা যদি চলত, তাহলে কে বলতে পারে যে ‘বালকৃষ্ণ নিজেও চীনা পুঁজির দ্বারা সম্পৃক্ত, ভায়া নেপাল’ এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেড়িয়ে আসতনা। নিশ্চই তেমন কিছু সম্ভাবনা তো ছিলই, ঝুলি থেকে বেড়ার বেড়িয়ে যাবার; নতুবা ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার ১১ দিনের মাথায় কীভাবে সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করে নিতে পারে জনগণ দ্বারা নির্বাচিত কোনো সরকার?
উত্তর খুঁজুন আপনি নিজেই। আমি শুধু তথ্য গুলো দিয়ে দিলাম।
নেপালের লাল চোখকে জবাব দিতে হলে, নেপালি পণ্য বর্জন হোক। ভারতে এসে ব্যবসা করে, সেই লভ্যাংশ নেপালে লগ্নিকরা নেপালিদের বর্জন করা হোক। লোগোতে তেরঙ্গা লাগিয়ে আর সাধুসন্তদের নিয়ে ভারতীয়দের আবেগ ও ভক্তিকে ব্যবহার করে এমন মুরগি বানাবার ইতিহাস বেশ বিরলই।
#বয়কট_নেপালি_পণ্য
#বয়কট_পতঞ্জলী

আরও পড়ুন-
এর পাশাপাশি ‘বিদেশী পণ্য বর্জন’ করার উথলে পরা দেশপ্রেমের ফেনার ভিড়ে চাপা পরে যাওয়া কিছু নেপথ্য গল্প, কেউই যেগুলো নিয়ে বলছেনা সেটা হল, ২৫শে মে ২০২০ তারিখে- রিলায়েন্স ইন্ড্রাস্ট্রিজের ‘জিও মার্ট’ ভারতের ২০০টি শহরে নিজস্ব বিপনী সহ অনলাইনের মাধ্যমে- গোটা দেশে মুদি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবসার ‘পাইলট প্রজেক্ট’ লঞ্চ করেছে। যার পার্টনার আর ১১টি ‘ইউরোপীয়, আমেরিকা ও ইজরায়েলি’ পুঁজির লগ্নি কোম্পানির সাথে জুকারবার্গের ‘ফেসবুক’ তথা হোয়াটসএ্যাপ নিজেই- স্বাভাবিকভাবেই ভক্তকুলের মাঝে দেশপ্রেমের জোয়ার এসেছে, তাতে দিনের শেষে লাভের অংশ মুম্বই এর ‘আন্তেলিয়াতে’ না গিয়ে যে ‘পালো অল্টো’র প্রিসিলা চ্যানের লকারে জমা হবে সেটা বললেই আপনি দেশদ্রোহী।
ঘটনাক্রমে প্রিসিলা চ্যানও খাঁটি ‘মেড ইন চায়না’, মার্কিন নাগরিকত্বের ইহুদী স্বামীর বৌদ্ধ স্ত্রী, বিচিত্র কম্বিনেশন।
সে যাই হোক, আমাদের দেশে বর্তমানে আম্বানীর জিও, নাগপুরের গোয়াল আর জুকারবার্গের ‘ফেসবুক- হোয়াটসএ্যাপ-ইন্সটাগ্রাম’ এর ত্রিবেণী সঙ্গম চলছে, তারা আক্ষরিক অর্থেই ‘Brother in same boat’, প্রত্যেকের মধ্যেই ঘোষিত আন্তঃব্যবসায়িক সংযোগ রয়েছে। সম্পূর্ণভাবে ব্যবসায়িক স্বার্থে দোকান খুলেছে আলাদা আলাদা ধাঁচে, কেন্দ্রের সরকারও যে এদেরই হাতের পুতুল হবে সেটা বলাই বাহুল্য। তবে এটা ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছে, মধ্যযুগে পোপ যেমন ক্রুসেডারদের দিয়ে বিশ্বজয়ের অবাস্তব স্বপ্ন দেখেছিল, নাগপুরও সেই পুরাতন মদ নতুন বোতলে পরিবেশনা করছে ‘দেশপ্রেম’ লেবেল সেঁটে।
সুতরাং দেশপ্রেমের তাড়ি খাইয়ে কীভাবে ভক্তপিতারা তাদের গোবৎস গুলোকে বায়বীয় জাবর কাটাচ্ছে সেটা ইতিহাসে স্থান পাবার যোগ্য। অন্ধত্ব যখন সর্বাঙ্গকে গ্রাস করে, ধূর্ত শেয়াল ওরফে বেনিয়ারা সে সুযোগ কাজে লাগাতে ভোলেনা।
আম্বানির মাধ্যমে বিদেশী পুঁজি, সঙ্ঘের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ দিয়ে তৈরি দেশপ্রেমের গ্যাঁজলা, সাথে জুকারবার্গের ফেসবুক ও হোয়াটসএ্যাপের মত প্রতিষ্ঠিত প্রোপাগান্ডা মেকানিজম- এমন 3D তথা ত্রিমাত্রিক লুঠেরা সিস্টেম কিন্তু ইংরেজরা আমদানি করেছিল অষ্ঠাদশ শতকে, যারা বণিকের বেশে এসে শাসকের রাজদণ্ড হরণ করেছিল। এখানে শাসক অবশ্য আগে থেকেই এদের পদতলে; এখন এটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ না অতলের আহ্বান সেটা পাঠকের ভাবনার উপরেই ছাড়া থাকুক।
তাহলে, আপনার মাঝে দেশপ্রেম কতটা জাগল?

মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২০

ভারতীয় যুদ্ধের সহিংস ইতিহাস ও মুসলমান

 


আজকের ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘দেশপ্রেমিক’ ধারনাটা হলঃ আরবজাত মুসলমানেরা আফগান, পামির অঞ্চল, কখনও মোগল রূপে বা কখনও পারস্য থেকে এসে ভারত আক্রমণ করেছিল, অতএব এই জাতিটাই একমাত্র বর্বর, রক্তপিপাসু, ক্ষমতালোভী, নিকৃষ্ট তথা জিহাদি জাতি। মুসলমানেরা ভারত আক্রমণ করার পুর্বে এই উপমহাদেশে পবিত্র ‘রামায়ণ ও মহাভারতের মত’ ধর্মযুদ্ধ থাকলেও, অধর্মজাত যুদ্ধ বিষয়টা মোটেই ছিলনা, সেটা সম্রাট অশোক করলেও নয়। সকলে নমস্কার, প্রণাম, আলিঙ্গন, চুম্মাচাটি করত আর রেগে গেলে বড়জোর শাপশাপন্ত করে ছেড়ে দিত, বাকিটা ঈশ্বরের কাজ ছিল- ভাবখানা এমনই বর্তমান ভারতীয় ইতিহাসে। এটা যে শুধু বিজেপির দান তা নয়, রাজীব গান্ধী ও তৎপরবর্তী কংগ্রেস সরকার থেকে আজকের নরেন্দ্র মোদী সরকার- সকলেই সমান অবদান রেখেছে। কংগ্রেস নরম হিন্দুত্ব তাস খেলত, বিজেপি সেটাই ন্যাংটা উদোম করে দিয়েছে, এটাই যা ফারাক।

মূলত বাবরি মসজিদ ভাঙা ও মুম্বই দাঙ্গার পরবর্তী পর্যায়ে- RSS ও তার রাজ্যওয়ারি প্রকাশ্য বা গুপ্ত রাজনৈতিক সহযোগী, অসাম্প্রদায়িকতার ভেকধারী কিছু আঞ্চলিক স্বার্থবাদী দল গুলো মিলে এই RSS এর ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষকে সমাজের মাঝে ‘মহীরুহে পরিণত করে দিয়েছে’ নিরবিচ্ছিন্নভাবে সার ও জল সিঞ্চন করে। এদেশে খারাপ কিছু মানেই সেটা মুসলমান জনগোষ্ঠী দ্বারা সম্পৃক্ত, অথবা কমিউনিস্ট; বাকিরা ভাল- কিন্তু ‘সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদ’- এমন একটা ইউটোপিও ধারণা রেডিও, টিভি সিরিয়াল, সিনেমা, ২৪ ঘন্টার খবরের চ্যানেল, বিভিন্ন টক-শো, সংবাদপত্র, সমসাময়িক সাহিত্য ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমের দ্বারা সমাজের মাঝে সুস্পষ্ট ও পরিকল্পিতভাবে বুনে দেওয়া হয়েছে। এখান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়া অন্তত তিনটে প্রজন্ম ঠিক সেটাই শিখেছে যেমনটা ‘RSS’ এর এ্যাজেন্ডা ছিল, কে ভাল তা নিয়ে গবেষণা থাকুক বা না থাকুক- কিন্তু ‘হিংস্র ও খারাপ’ কিছু মানেই তা মুসলমান- এটা প্রতিষ্ঠিত আজকে এই ২০২০ সালে।

যদিও আজকে পর্যন্ত পাকিস্তান তথা ISI এর চর হিসাবে ধরা পরা প্রায় প্রতিটি ব্যাক্তিই- প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিজেপি বা RSS মতাদর্শের সাথে যুক্ত, এবং তারা কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়।

প্রাচীন ভারতের ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে রচিত প্রচুর বই রয়েছে বাজারে, সে তুলনায় তৎকালীন রাজনীতি ও যুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গবেষণা মূলক বই খুব কমই প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো হয়েছিল সেগুলোও আশ্চর্যজনকভাবে বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে অজানা কারনে। এমনই একটা বই এর নাম ‘From Hydaspes to Kargil: A History of Warfare in India from 326 BC to AD 1999’, লেখক কৌশিক বসু। এখানে সেই খ্রীষ্টপুর্ব ৩২৬ অব্দ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি যুদ্ধের ঘটনার তিনি যথোপোযুক্ত বর্ণনা করেছেন নথি সহযোগে। এমনই আরেকটা বই ‘Ancient Indian Warfare: With Special Reference to the Vedic Period’ এটার লেখক- সর্ব দমন সিং। এছাড়া বিখ্যাত তামিল ঐতিহাসিক ‘ভিষ্মাপেত রামচন্দ্রনের’ লেখা ‘War in Ancient India’ বইটি, যা একটি দুর্মুল্য নথি- এগুলো কখনও কোনো স্কুলের পাঠ্যসূচিতে আসবেনা, যদিও তিন লেখকের কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়, তবুও। বই তিনটিতে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় যুদ্ধের মতাদর্শগত বিষয়গুলো, নানান ধর্মীয় ও গোষ্ঠীজাত পক্ষগুলোর পরিচয় জ্ঞাপনা, হরেক দিশি বিদেশী ঐতিহাসিকের দলিল সহ বর্ণনামূলক ‘সহিংসতার’ ঐতিহ্যগুলো বিষয়ে অত্যন্ত বিস্তৃত ধারণার জন্ম দেয় পাঠকের মননে, যা দুর্দান্তভাবে মৌলিক বিষয়।

বিদেশী লেখকদের মধ্যে, Laurie L. Patton এর লেখা ‘Telling Stories about Harm: An Overview of Early Indian Narratives’ ও ‘John R. Hinnells and Richard King’ লেখকদ্বয় সম্পাদিত ‘Religion and Violence in South Asia: Theory and Practice’ এই বই দুটির মাঝে শুধু ভারতের ইতিহাসই নয়, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাসকে নতুন ভাবে জানা ও বোঝার সুযোগ পাবেন। প্রসঙ্গত, এই দুটো বই গুগুলে PDF হিসাবে উপলব্ধ।

এর পাশাপাশি গোবিন্দ নিহালানীর ‘তমশ’ জাতীয় সিনেমা বলিউডের সংস্কৃতি থেকে উধাও হয়ে গেছে, সেখানে সানি দেওলের টিউবওয়েলের পাইপ তোলা ‘গদরঃ এর প্রেম কথা’ কিম্বা ইজ্রায়েলের জাতীয় সংগীত ‘Hatikvah’ এর সুর চুরি করা (মেরা মুল্ক মেরা দেশ মেরা ইয়ে বতন) ‘দিলজ্বলের’ মত সিনেমাগুলো বিকশিত হয়েছে, শরীর সর্বস্ব সিনেমা গুলোর সাথে সাথে। ওম পুরী, অমরিশ পুরী, কুলভুষণ খারবান্দা, স্মিতা পাতিল, সাবানা আজমি, দীপ্তি নাভাল, সদাশিব অমরাপুরকার, নাশিরুদ্দিন শাহ্ প্রমুখদের মত বলিষ্ঠ অভিনেতাদের দ্বারা চিত্রায়িত সমান্তরাল সিনেমা সংস্কৃতি- যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করত, সেগুলো সম্পূর্ন ভাবে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। বলিউডের এই বিবর্তন নিয়ে আগামীতে একটা প্রবন্ধ নিয়ে আসা যেতেই পারে।

না পড়লে জানা যায়না, না জানলে ভ্রম বা মিথ্যার প্রাচীরকে অতিক্রম করবেন কীভাবে? আজকের ভারতে RSS এর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, যেমন- বিজেপি, শিবসেনা সহ বিজেপির একদা সহযোগী পশ্চিমবঙ্গের তৃনমূল কংগ্রেস, গোর্খা মুক্তি মোর্চা, বিহারের নীতিশ কুমার, রামবিলাশ পাসোয়ান, মহারাষ্ট্র গোমন্তক পার্টি, তেলেঙ্গনার চন্দ্রশেখর রাও, মেঘালয়ের সাংমা, অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু, কর্ণাটকের দেবেগৌড়ার দল, কাশ্মীরের মেহবুবা মুফতি, উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী, আসাম গণ পরিষদ, ঝাড়খণ্ডে শিবু সোরেন, ওড়িশার নবীন পটনায়ক, তামিলনাড়ুর করুণানিধির DMK, জয়ললিতার AIADMK, পাঞ্জাবের ধর্মী রাজনৈতিক দল ‘আকালি দল’, হরিয়ানা ওমপ্রকাশ চৌথালার দল, এছাড়া উত্তরপুর্বাঞ্চলের প্রতিটি বিচ্ছিন্নতাবাদী দল এর মত সহযোগী বহুরূপী দলগুলির মূল শত্রুই হল- কমিউনিস্ট আর মুসলমানেরা; কেউ বিষ খাইয়ে মারছে তো কেউ মধু খাইয়ে। উদ্দেশ্য একটাই- নিকেশ, সেটা যেভাবেই হোক। বাকিদের কিনে ফেলা যায় অতি সহজে।

স্বঘোষিত বিশুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতির ‘ধারক ও বাহকের’ দলেরা আপনার মাঝে ‘হিটলার, মুসলিনি, গোয়েরিং’ এর মতাদর্শকে ‘গোয়েবলসের’ ফর্মুলা অনুযায়ী আপনার মাঝে কবেই ঢুকিয়ে দিয়েছে তা আপনি টেরই পাননি। ভাবছেন বুঝি আপনি প্রকৃত দেশভক্ত, ওদিকে দেশের সবকিছু বিকিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।

তাই প্রতিটি শুভচিন্তক ভারতীয় নাগরিক- যাদের মনেপ্রাণে ও বিশ্বাসে ঢুকে গেছে যে, ‘শুধুমাত্র মুসলমানেরাই বর্বর, আর কমিউনিস্টরা বিদেশী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ’ পাশাপাশি বাকিরা মুনিঋষি পর্যায়ের; তাদের জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ ঘটবে এই বই গুলো পড়লে। এগুলো পড়ার পর বিচার করুন, তার পরেও ঘৃণা বিদ্বেষ থাকলে আরো পোক্তভাবে সেগুলোর বহিঃপ্রকাশ করুন। বাকিরাও পড়ুন, কারন আমাদের কীভাবে ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে রেখে ভুলভাল, অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা বিষয়কে পরিবেশনা করা হচ্ছে ইতিহাসের নামে, সেটাও জানতে পারবেন।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ও বাপ ঠাকুর্দা চোদ্দপুরুষকে খুঁজুন গবেষণালব্ধ নথি দ্বারা; হিটলারি বিজ্ঞাপনের দেশপ্রেম দিয়ে কখনই যা আপনি জানতে পারবেননা, বা আপনাকে জানতে দেওয়া হবেনা।

ভারতীয় যুদ্ধের সহিংস ইতিহাস ও মুসলমান- শুরুর কথা



আজকের ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘দেশপ্রেমিক’ ধারনাটা হলঃ আরবজাত মুসলমানেরা আফগান, পামির অঞ্চল, কখনও মোগল রূপে বা কখনও পারস্য থেকে এসে ভারত আক্রমণ করেছিল, অতএব এই জাতিটাই একমাত্র বর্বর, রক্তপিপাসু, ক্ষমতালোভী, নিকৃষ্ট তথা জিহাদি জাতি। মুসলমানেরা ভারত আক্রমণ করার পুর্বে এই উপমহাদেশে পবিত্র ‘রামায়ণ ও মহাভারতের মত’ ধর্মযুদ্ধ থাকলেও, অধর্মজাত যুদ্ধ বিষয়টা মোটেই ছিলনা, সেটা সম্রাট অশোক করলেও নয়। সকলে নমস্কার, প্রণাম, আলিঙ্গন, চুম্মাচাটি করত আর রেগে গেলে বড়জোর শাপশাপন্ত করে ছেড়ে দিত, বাকিটা ঈশ্বরের কাজ ছিল- ভাবখানা এমনই বর্তমান ভারতীয় ইতিহাসে। এটা যে শুধু বিজেপির দান তা নয়, রাজীব গান্ধী ও তৎপরবর্তী কংগ্রেস সরকার থেকে আজকের নরেন্দ্র মোদী সরকার- সকলেই সমান অবদান রেখেছে। কংগ্রেস নরম হিন্দুত্ব তাস খেলত, বিজেপি সেটাই ন্যাংটা উদোম করে দিয়েছে, এটাই যা ফারাক।
মূলত বাবরি মসজিদ ভাঙা ও মুম্বই দাঙ্গার পরবর্তী পর্যায়ে- RSS ও তার রাজ্যওয়ারি প্রকাশ্য বা গুপ্ত রাজনৈতিক সহযোগী, অসাম্প্রদায়িকতার ভেকধারী কিছু আঞ্চলিক স্বার্থবাদী দল গুলো মিলে এই RSS এর ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষকে সমাজের মাঝে ‘মহীরুহে পরিণত করে দিয়েছে’ নিরবিচ্ছিন্নভাবে সার ও জল সিঞ্চন করে। এদেশে খারাপ কিছু মানেই সেটা মুসলমান জনগোষ্ঠী দ্বারা সম্পৃক্ত, অথবা কমিউনিস্ট; বাকিরা ভাল- কিন্তু ‘সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদ’- এমন একটা ইউটোপিও ধারণা রেডিও, টিভি সিরিয়াল, সিনেমা, ২৪ ঘন্টার খবরের চ্যানেল, বিভিন্ন টক-শো, সংবাদপত্র, সমসাময়িক সাহিত্য ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমের দ্বারা সমাজের মাঝে সুস্পষ্ট ও পরিকল্পিতভাবে বুনে দেওয়া হয়েছে। এখান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়া অন্তত তিনটে প্রজন্ম ঠিক সেটাই শিখেছে যেমনটা ‘RSS’ এর এ্যাজেন্ডা ছিল, কে ভাল তা নিয়ে গবেষণা থাকুক বা না থাকুক- কিন্তু ‘হিংস্র ও খারাপ’ কিছু মানেই তা মুসলমান- এটা প্রতিষ্ঠিত আজকে এই ২০২০ সালে।
যদিও আজকে পর্যন্ত পাকিস্তান তথা ISI এর চর হিসাবে ধরা পরা প্রায় প্রতিটি ব্যাক্তিই- প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিজেপি বা RSS মতাদর্শের সাথে যুক্ত, এবং তারা কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়।
প্রাচীন ভারতের ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে রচিত প্রচুর বই রয়েছে বাজারে, সে তুলনায় তৎকালীন রাজনীতি ও যুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গবেষণা মূলক বই খুব কমই প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো হয়েছিল সেগুলোও আশ্চর্যজনকভাবে বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে অজানা কারনে। এমনই একটা বই এর নাম ‘From Hydaspes to Kargil: A History of Warfare in India from 326 BC to AD 1999’, লেখক কৌশিক বসু। এখানে সেই খ্রীষ্টপুর্ব ৩২৬ অব্দ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি যুদ্ধের ঘটনার তিনি যথোপোযুক্ত বর্ণনা করেছেন নথি সহযোগে। এমনই আরেকটা বই ‘Ancient Indian Warfare: With Special Reference to the Vedic Period’ এটার লেখক- সর্ব দমন সিং। এছাড়া বিখ্যাত তামিল ঐতিহাসিক ‘ভিষ্মাপেত রামচন্দ্রনের’ লেখা ‘War in Ancient India’ বইটি, যা একটি দুর্মুল্য নথি- এগুলো কখনও কোনো স্কুলের পাঠ্যসূচিতে আসবেনা, যদিও তিন লেখকের কেউই মুসলমান বা কমিউনিস্ট নয়, তবুও। বই তিনটিতে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় যুদ্ধের মতাদর্শগত বিষয়গুলো, নানান ধর্মীয় ও গোষ্ঠীজাত পক্ষগুলোর পরিচয় জ্ঞাপনা, হরেক দিশি বিদেশী ঐতিহাসিকের দলিল সহ বর্ণনামূলক ‘সহিংসতার’ ঐতিহ্যগুলো বিষয়ে অত্যন্ত বিস্তৃত ধারণার জন্ম দেয় পাঠকের মননে, যা দুর্দান্তভাবে মৌলিক বিষয়।
বিদেশী লেখকদের মধ্যে, Laurie L. Patton এর লেখা ‘Telling Stories about Harm: An Overview of Early Indian Narratives’ ও ‘John R. Hinnells and Richard King’ লেখকদ্বয় সম্পাদিত ‘Religion and Violence in South Asia: Theory and Practice’ এই বই দুটির মাঝে শুধু ভারতের ইতিহাসই নয়, বরং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাসকে নতুন ভাবে জানা ও বোঝার সুযোগ পাবেন। প্রসঙ্গত, এই দুটো বই গুগুলে PDF হিসাবে উপলব্ধ।
এর পাশাপাশি গোবিন্দ নিহালানীর ‘তমশ’ জাতীয় সিনেমা বলিউডের সংস্কৃতি থেকে উধাও হয়ে গেছে, সেখানে সানি দেওলের টিউবওয়েলের পাইপ তোলা ‘গদরঃ এর প্রেম কথা’ কিম্বা ইজ্রায়েলের জাতীয় সংগীত ‘Hatikvah’ এর সুর চুরি করা (মেরা মুল্ক মেরা দেশ মেরা ইয়ে বতন) ‘দিলজ্বলের’ মত সিনেমাগুলো বিকশিত হয়েছে, শরীর সর্বস্ব সিনেমা গুলোর সাথে সাথে। ওম পুরী, অমরিশ পুরী, কুলভুষণ খারবান্দা, স্মিতা পাতিল, সাবানা আজমি, দীপ্তি নাভাল, সদাশিব অমরাপুরকার, নাশিরুদ্দিন শাহ্ প্রমুখদের মত বলিষ্ঠ অভিনেতাদের দ্বারা চিত্রায়িত সমান্তরাল সিনেমা সংস্কৃতি- যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করত, সেগুলো সম্পূর্ন ভাবে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। বলিউডের এই বিবর্তন নিয়ে আগামীতে একটা প্রবন্ধ নিয়ে আসা যেতেই পারে।
না পড়লে জানা যায়না, না জানলে ভ্রম বা মিথ্যার প্রাচীরকে অতিক্রম করবেন কীভাবে? আজকের ভারতে RSS এর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, যেমন- বিজেপি, শিবসেনা সহ বিজেপির একদা সহযোগী পশ্চিমবঙ্গের তৃনমূল কংগ্রেস, গোর্খা মুক্তি মোর্চা, বিহারের নীতিশ কুমার, রামবিলাশ পাসোয়ান, মহারাষ্ট্র গোমন্তক পার্টি, তেলেঙ্গনার চন্দ্রশেখর রাও, মেঘালয়ের সাংমা, অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু, কর্ণাটকের দেবেগৌড়ার দল, কাশ্মীরের মেহবুবা মুফতি, উত্তরপ্রদেশের মায়াবতী, আসাম গণ পরিষদ, ঝাড়খণ্ডে শিবু সোরেন, ওড়িশার নবীন পটনায়ক, তামিলনাড়ুর করুণানিধির DMK, জয়ললিতার AIADMK, পাঞ্জাবের ধর্মী রাজনৈতিক দল ‘আকালি দল’, হরিয়ানা ওমপ্রকাশ চৌথালার দল, এছাড়া উত্তরপুর্বাঞ্চলের প্রতিটি বিচ্ছিন্নতাবাদী দল এর মত সহযোগী বহুরূপী দলগুলির মূল শত্রুই হল- কমিউনিস্ট আর মুসলমানেরা; কেউ বিষ খাইয়ে মারছে তো কেউ মধু খাইয়ে। উদ্দেশ্য একটাই- নিকেশ, সেটা যেভাবেই হোক। বাকিদের কিনে ফেলা যায় অতি সহজে।
স্বঘোষিত বিশুদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতির ‘ধারক ও বাহকের’ দলেরা আপনার মাঝে ‘হিটলার, মুসলিনি, গোয়েরিং’ এর মতাদর্শকে ‘গোয়েবলসের’ ফর্মুলা অনুযায়ী আপনার মাঝে কবেই ঢুকিয়ে দিয়েছে তা আপনি টেরই পাননি। ভাবছেন বুঝি আপনি প্রকৃত দেশভক্ত, ওদিকে দেশের সবকিছু বিকিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।
তাই প্রতিটি শুভচিন্তক ভারতীয় নাগরিক- যাদের মনেপ্রাণে ও বিশ্বাসে ঢুকে গেছে যে, ‘শুধুমাত্র মুসলমানেরাই বর্বর, আর কমিউনিস্টরা বিদেশী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ’ পাশাপাশি বাকিরা মুনিঋষি পর্যায়ের; তাদের জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ ঘটবে এই বই গুলো পড়লে। এগুলো পড়ার পর বিচার করুন, তার পরেও ঘৃণা বিদ্বেষ থাকলে আরো পোক্তভাবে সেগুলোর বহিঃপ্রকাশ করুন। বাকিরাও পড়ুন, কারন আমাদের কীভাবে ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে রেখে ভুলভাল, অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা বিষয়কে পরিবেশনা করা হচ্ছে ইতিহাসের নামে, সেটাও জানতে পারবেন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ও বাপ ঠাকুর্দা চোদ্দপুরুষকে খুঁজুন গবেষণালব্ধ নথি দ্বারা; হিটলারি বিজ্ঞাপনের দেশপ্রেম দিয়ে কখনই যা আপনি জানতে পারবেননা, বা আপনাকে জানতে দেওয়া হবেনা।

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...