মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১

দুর্গাপুজো


দুর্গাপুজো বাঙালি আবেগ, বর্ণিল উৎসব। উৎসবের ভঙ্গিতে দেবী আগমণ করেন নতুন স্বপ্ন নিয়ে, বাচ্চাদের নতুন পোশাক নিয়ে, প্রবাসীদের আত্মীয়স্বজনের সাথে একাত্ম করতে, বয়স্কদের পুনর্মিলনীর স্বাদ হয়ে, পরিবারে খুশির পুঁটুলি হয়ে, সুস্বাদু খাবারের জাদু হয়ে, মন্ডপের দর্শনার্থী হয়ে, আলোর জাদুতে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে। ডাকের সাজ, ঢাকের বোল আর আরতির ধোঁয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে, ভক্তের প্রাণে মধুর স্মৃতি হতে মর্ত্যে নেমে আসেন দেবীসময়ের পায়ে পায়ে দুর্গা পুজোর ইতিহাসও নানান ভাবে আবর্তিত হয়েছে কালের কক্ষপথে। চলুন আজকে সেই সংক্রান্ত একটা অগোছালো এলোমেলো আলাপ করি।

অতুলনীয় উৎসাহ ও ভক্তির সাথে, বিশ্বজুড়ে সনাতনী মানুষ দেবীকে সম্মান জানাতে একত্রিত হয়, তাঁর বিজয় এবং ঐশ্বরিক শক্তি উদযাপন করে মহা সমারোহে। মহিষাসুরের উপর দেবী বিজয়, মন্দের উপর ভালোর জয়ের প্রতীক। দেবী ঐশ্বরিক নারীশক্তির মূর্ত প্রতীক, যিনি একধারে যেমন উগ্র তেমনই মাতৃরূপী করুণাময়ী। এই কারনেই দুর্গাপুজো একটি প্রাথমিক ধর্মীয় আচার থেকে, ক্রমে বিশাল সামাজিক-সাংস্কৃতিক জমকালো অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে

দেবীর শক্তি, স্থিতিস্থাপকতা এবং প্রতিরক্ষামূলক প্রকৃতির পুজা করা হয়। একই সাথে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য আশীর্বাদও আহ্বান করা হয়তাঁর ধারণ করা প্রতিটি অস্ত্র শক্তির প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব করে ভয়, অজ্ঞতা, অহংকার এবং অন্যায়ের মতো অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক মন্দকে পরাজিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়। রূপকভাবে, মহিষাসুরের সাথে দেবীর যুদ্ধ, সমাজের মধ্যে ভাল এবং মন্দের মধ্যে চলমান সংগ্রামের প্রতিফলন।

দেবী দুর্গা নারী ক্ষমতায়নের বার্তা প্রদান করেন, অপ্রতিরোধ্য প্রতিকূলতার মুখে, অনৈতিকতার উপর ন্যায় এর বিজয়দেবী নিজে সুরক্ষার মূর্ত প্রতীক, হিংস্রতা এবং লালনের মধ্যে ভারসাম্যের প্রতিরূপ। কর্ম এবং ধৈর্য, ​​ধ্বংস এবং সৃষ্টি, শক্তি এবং সহানুভূতির মধ্যে ভারসাম্যে প্রতীক হলে দেবী দুর্গা। ভারত জুড়ে দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপ রয়েছে, বিশেষ করে নবদুর্গা, নবরাত্রির সময় তাঁর নয়টি অবতারের পূজা করা হয়পশ্চিম ও মধ্য ভারতের কিছু অংশে দুর্গা নানা ভাবে, নানা রূপে পূজিত হন।

নন্দীর উপরে শৈলপুত্রী, সিংহের উপরে কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা এবং কাত্যায়নী, বাঘের উপরে চন্দ্রঘণ্টা, গাধার উপরে কালরাত্রি, ষাঁড়ের উপরে মহাগৌরী, ঘোড়ার উপরে ব্রহ্মচারিণী, সিদ্ধিধাত্রী, ইত্যাদি দেবীর নানার রূপ। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রূপগুলির মধ্যে রয়েছে দশটি জ্ঞান দেবীর সমষ্টি, দশটি মহাবিদ্যা, যেমন কালী এবং তারা, এবং আঞ্চলিক প্রকাশ যেমন পূর্ব ভারতে চণ্ডিকা এবং দক্ষিণ ভারতে মারিয়াম্মান, যা তাঁর সর্বোচ্চ নারীশক্তির বিভিন্ন দিককে মূর্ত করে।

বাংলায় দেবীকে মহিষাসুর মর্দিনী রূপে পূজিত করা হয়। দেবী তাঁর স্বর্গীয় আবাস কৈলাস পর্বত থেকে পিত্রালয়ে বেড়াতে আসেন কন্যা বেশে। ভক্তরা দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করে পুষ্পাঞ্জলি এবং আরতি এর মতো বিস্তৃত আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। উৎসবের প্রধান দিন অষ্টমীসন্ধি পুজো, যা অষ্টমী থেকে নবমীতে রূপান্তরের প্রতীক

মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে, কিংবদন্তি রাজা সুরথ সভাসদদের ষড়যন্ত্রে রাজ্যহারা হলে, তা পুনরুদ্ধারে ঋষি মেধাসের পরামর্শে তিনি দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। প্রার্থনায় সন্তুষ্ট দেবী রাজ্য ফিরিয়ে দিলে, রাজা প্রতি বছর বসন্তকালে এই পুজোর প্রচলন করেন, যেটি বাসন্তী পুজো নামেও পরিচিত।

বর্তমান বাংলায় প্রচলিত দুর্গাপুজো রাজা সুরথের পুজো নয়। আজ যে উৎসব দেখা যায় তা রাজসিক পুরাণের ছায়ায় কৃত্তিবাস রচিত, ১৫ শতকের বাংলা রামায়ণ অনুযায়ী। এখানে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আগে শ্রীরাম কর্তৃক দুর্গার উপাসনার ঘটনা রয়েছে, যেটা আশ্বিন মাসে ঘটেছিল। কথ্য ইতিহাস অনুযায়ী নদীয়া জেলার তাহেরপুরের জমিদার কংস নারায়ণই বাংলায় প্রথম শারদীয় দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছিলেন, বসন্তকালে প্রচলিত দুর্গাপুজোর পরিবর্তে।

লিখিত ইতিহাসে আমাদের বঙ্গদেশে দেবীর আরাধনার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ৫৫০ খ্রিস্টাব্দে বীরভূমের মাটিতে। পরবর্তীতে ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনগরের ভবানন্দ মজুমদার দ্বারা পুজোর উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায়, যিনি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পূর্বপুরুষ ছিলেন। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে সম্ভবত কলকাতায় প্রথম দুর্গোৎসবের আয়োজন হয়েছিলো জমিদার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারে

সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকেও, দুর্গাপুজো জনসাধারণের উৎসব ছিল না। দুর্গাপুজো মূলত ধনী ও ক্ষমতাবানদের একটি উদযাপন ছিল, তাই এটা রাজা-জমিদারদের বাড়িতেই সীমাবদ্ধ ছিল, খুব সীমিতভাবে নির্বাচিত কিছু সাধারণ মানুষ আমন্ত্রণের মাধ্যমে পুজোয় প্রবেশাধিকার পেতো শুধু দর্শনার্থী হিসেবেএর মূল কারণ- দুর্গা পুজো একটি ব্যয়বহুল বিষয়। চার দিন ধরে চলা বিবিধ আচার-অনুষ্ঠান, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে আর্থিকভাবে বহন করা একপ্রকার অসম্ভব ছিল। শতশত বছর ধরে পুজো পর্যায়ক্রমে রূপান্তরিত হয়েছে। হুগলিগুপ্তিপাড়া পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয় ১৭৯০ সালে, ‘বারোয়ারী দুর্গোৎসব’ ভাবনাটাই এই প্রিয় উৎসবের দুয়ার খুলে দেয় আম মানুষের জন্য। সত্যিকার অর্থে জনসাধারণের উৎসবে পরিণত হয়

আজও গ্রাম বাংলার পুজো কলকাতার পুজোর থেকে সূক্ষ্মভাবে আলাদা। গ্রাম্য জীবনে পুজো চার দিনের নয়, গুণে গুণে দশ দিনের উৎসব। মফঃস্বলের পুজো, শহুরে বিলাসী বৈভবের বাইরে গিয়ে একটা মেঠো সোঁদা গন্ধ বহন করে। শ্রেণী এবং মর্যাদার এক অদম্য আধিপত্য গ্রামীণ মানুষকে বেঁধে রাখে, যা নগর জগতে শিথিল হয়ে যায়। এখানে জীবন কিছুটা ধীর, তাড়াহুড়ো হীন প্রশান্ত। মেঠো থ আর ভেজা কাদা যেমন মাখামাখি করে থাকে, তেমনই আবেগের সাথে ঐতিহ্য ধরা দেয় গ্রামজীবনে- এই অনন্য আনন্দ জীবনের কঠিনতাকেও রাঙিয়ে দেয় অদ্ভুত প্রসন্নতায়। 

বেগ প্রকাশে অক্ষমতা থাকলেও, অনুভবে তাকে রোখা যায়না। স্মৃতির রোমন্থনসুখ অভূতপূর্ব সুখানুভূতি, যেন দূষণমুক্ত বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার মতই ফুরফুরে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া মূল ফটকের ভেতরে একটা উঁচু মঞ্চের উপরে শামিয়ানা, তার নিচে সপরিবারে মা দুর্গা। ম্যারাপের অদূরে একটা বাতাবি লেবুর গাছ, পূর্ণ প্রস্ফুটিত শিউলি গাছটার পাশে ফলন্ত আতা গাছ। ইতিহাসের সাথে মাখামাখি করে থাকা ভগ্নপ্রায় পুরাতন প্রাসাদসম দালান থেকে ঝোলা আইভি লতা, শ্যাওলা ধরা ভাঙা ক্ষয়াটে দেওয়াল, তার মাঝে ইতিউতি কিছু জড়াজীর্ণ মুখের সারি।

একটা বদ্ধ ঘর, পুরানো মরচে পড়া বইয়ের সারি, তার গন্ধ যেগুলি স্পর্শ ধরা যায়না, সেই বাতাসে যাপন করলে তবে মেলেপ্রবীনদের মুখে শোনা পারিবারিক ইতিহাস, এখানেই উৎসবের সার্থকতা। অপ্রত্যাশিত আপেক্ষিকতার সমাবেশ ঘটে গ্রামের এই জাতীয় পুজোতে বার্ষিক প্রত্যাবর্তন উদযাপন করতে মিলিত হওয়া শহুরে প্রাণ, গ্রাম্য প্রতিবেশীদের সাথে প্রাঙ্গণ জুড়ে আলাপি বৈঠকে মেতে উঠে, প্রসাদ বন্টনের অছিলায় আনন্দের বন্টনও হয় বৈকি

পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের নগরায়ন হয়েছে বৈকি, অনেক থিমের পুজো আজকাল প্রাচীন এবং আধুনিকের নিখুঁত মিশ্রণ হয়ে উঠছে। প্যান্ডেলের থিম, প্রতিমা উদ্ভাবন ও আলোক সজ্জার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে গেছে। স্বাধীনতা-উত্তর যুগে, কলকাতার দুর্গাপুজো ক্রমশ শৈল্পিক স্বত্তা প্রকাশের একটি জীবন্ত ক্যানভাসে রূপান্তরিত হয়েছে। সৃজনশীল ধারণা নিয়ে আয়োজকদের ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, উৎসবটিকে শিল্প ও সংস্কৃতির বার্ষিক প্রদর্শনীতে পরিণত করেছে

আজকের মন্ডপ গুলো জলবায়ু পরিবর্তনের গল্প বলে, লিঙ্গ সমতাকে সামাজিক সমস্যা হিসাবে তুলে ধরে। প্রতিটি প্যান্ডেল যেন একেকটা ছোট গল্প, যার রেশ শেষ হয়েও শেষ হয়না। ধর্মীয় গন্ডির বাইরে গিয়ে আজকের দুর্গাপুজো একটি অর্থনৈতিক উদপানের উৎসব। বিপুল সংখ্যার শ্রমজীবী মানুষের কাছে এটা রুটিরুজি আমদানির কারনে উচ্ছ্বাসের। পোশাক শিল্পের উত্থান ঘটে, ছুটির দিনগুলো পর্যটন শিল্পে বিকাশ ঘটায়, পরিবহণ শিল্পে নতুন রক্ত সঞ্চালন করে। কলকাতায় বিপুল জনসমাগম শহরের অর্থনীতিতে জ্বালানি যোগান দেয়ফলত রাষ্ট্রের জন্যও এটা অর্থনৈতিক শক্তিদায়ক

পুজো যতক্ষণ ধর্মীয়ভাবে সীমাবদ্ধ ছিল, ততক্ষণ এটি শুধুই ভক্তের উৎসব ছিল। আজকে যখন পরিধি বাড়িয়ে বাংলার দুর্গাপুজো বিস্তৃতি লাভ করেছে গণ উৎসবে, থিমের প্যান্ডেল, বহুজাতিক খাদ্যোৎসবে, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, হর্ষে, আনন্দ-উল্লাসে পরিপূর্ণ সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিতে, তখন বৈশ্বিক স্বীকৃতি এসেছে UNESCO থেকে। কোলকাতার ঐতিহ্য হিসেবে ‘দুর্গাপুজো’ নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

অনেকে কলকাতায় গিয়ে দূর্গাপুজো দেখার স্বপ্ন দেখেনকোলকাতার বিখ্যাত কিছু দুর্গাপুজোর জনপ্রিয় স্থান- শোভাবাজার রাজবাড়ী, মোঃ আলী পার্ক, কলেজ স্কোয়ার, বাগবাজর সর্বজনীন, কুমোরটুলি সর্বজনীন, আহিরীটোলা সর্বজনীন, কাশী বোস লেন, তেলেঙ্গাবাগান, চালতাবাগান, ম্যাডক্স স্কোয়ার, আদি বালিগঞ্জে সর্বজনীন, একডালিয়া এভারগ্রিন, সিংঘি পার্ক, হিন্দুস্তান পার্ক, দেশপ্রিয় পার্ক, সুরুচি সংঘ, মুদিয়ালি, শিব মন্দির, বাদামতলা আষাঢ় সংঘ, চেতলা অগ্রণী ক্লাব, লাটুবাবু ছাতুবাবুর বাড়ির পুজো, দাঁ ভবন, জানবাজার রাজবাড়ী, ঠনঠনিয়া দত্ত বাড়ি, মল্লিক বাড়ির পুজো উল্লেখযোগ্য।

আজকের দিনে দুর্গাপুজো বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করে, সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করে, জাতি হিসাবে সূক্ষ্মভাবে নিজেদের সংগঠিত হওয়ার মঞ্চ দেয়। আধুনিকতা আর সাবেকের মিশেলে আসলে আমরা আগামীর ঐতিহ্যকে লালল করে চলেছি। কুমোরদের ঐতিহ্যবাহী কারিগরি দক্ষতা, ডাকের সাজ, ঢাকের বাদ্যি, মন্ডপ সজ্জার সৃজনশীলতা, দেবীর আরাধনার জন্য তৈরি করা বিস্তৃত আচার-অনুষ্ঠানই আসলে আদর্শ বনেদিয়ানার প্রতীক। আগামী যাকে উদযাপন করবে অহংকার আর গর্ব হিসাবে।

 

-       - বিলাতের ‘মনিহার’ পত্রিকার পুজোবার্ষিকীতে প্রকাশিত

 

সোমবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

করোনা ভ্যাক্সিনের সাইড এফেক্ট


 

কিছুনা, আসলেই কিছুনা

করোনা পিরিয়ডে, মানে ভ্যাকসিন নেওয়ার আগে রোড এক্সিডেন্টে মরলেও সরকারি নথিতে করোনাতেই মরেছে লেখা হয়েছে- এর জন্য আবার লিঙ্ক চাইবেনা যেন

অবশ্য মিডিয়ার দেখানো ভয় বাজি, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর টাকা সাইফনিং আর সরকারি বিজ্ঞাপনের দৌলতে একবার ভ্যাকসিন নেবার পর মরলে - আপনি হার্ট ফেল, কিডনি সহ মাল্টি অর্গান ফেলিওর হয়ে মরুন- করোনা আপনার কখনই হবেনা। মানে যারা এইভাবে মরেছে তাদের কারোরই করোনা হয়নি। কিন্তু সেই ডেটা আছেটা কার কাছে? কতজন সত্যকারের ভ্যাক্সিন নিয়েছে, সেই ডেটা প্রতিটি ভ্যাক্সিন কোম্পানির কাছেই আছে, কারন প্রতিটি ভ্যাক্সিনের নির্দিষ্ট নাম্বার ছিলো

প্রতিটি ভ্যাক্সিন কোম্পানি জানে তাদের "ট্রায়ালে" মর্টালিটি রেট কত। কিন্তু সেটা জনগণকে জানাবেনা। সরকার বা আদালত যারা চালায় তাদের মাঝেই তো "বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করে গরু অক্সিজেন দেয়" শীর্ষক রায় দেন। সুতরাং কোভিড সংক্রান্ত আসল তথ্য এ পোড়ার দেশের জনগন কখনই জানবেনা

হ্যাঁ, এখনও ট্রায়ালই চলছে- আজও সেল্ফ ডিক্লিয়ারেশন দিতেই হয়। মানে আপনার পটল তোলার দায় একান্তই আপনার নিজের- সরকার বা ভ্যাক্সিন কোম্পানির কোনো দায় নেই। বুঝতেই পারছেন, কেন আমাদের দেশের কোনো ভ্যাক্সিনই পরিপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। তার মাঝে একটিকে তো কেউই মান্যতা দেয়নি

অনেকেই বলবেন, কোটি কোটি মানুষ ভ্যাক্সিন নিয়েছে, কতজন আর মরেছে! জ্বী, নুন-জলে কী আর মানুষ মরে! শুরুতেই বলেছি ট্রায়াল চলছে, তবেই না একটা এ্যাম্পুল থেকে ৫-৭ জনের মাঝে কাউন্টার বিলি করা যায়। যারা একটু কেউকেটা, তারা বাঁচার তাগিদে 'আসল' ভ্যাক্সিন নিয়েছিল- ফলাফল দেখুন- রেল লেগে গেছে সেলিব্রিটি মৃত্যুর। সেই তুলনাতে আপনার পাশের বস্তি বা গ্রামাঞ্চলে করোনা আছে?

জানি আপনি তর্ক করবেন, কারন ভ্যাক্সিন নিয়েছেন, তাই স্বপক্ষে আপনি বলতে দায়বদ্ধ- লেজকাটা শেয়ালের মত।

প্রশ্নই আগেও ছিল- করোনা অদৌ কোনো প্যাথোলজিক্যাল রোগ নাকি এটা একটা ক্যাপিটালিজম রোগ। ভ্যাক্সিনে করোনা না সারলেও যারা ভ্যাক্সিন কোম্পানি খুলেছিলো তাদের পৌষমাস- আঙুল ফুলে বাওবাব গাছ

ভেবে লাভ নেই, আপনি সেই নির্বোধের মতই নেচে দ্বিতীয় ডোজের ভ্যাক্সিন নেবেন, আর সপক্ষে এঁড়ে তর্ক করবেন যুক্তি ছাড়া

 


সোমবার, ২ আগস্ট, ২০২১

পোর্শিয়া



“গঙ্গাগর্ভোস্থিত দ্বীপ দ্বীপপূঞ্জৈবর্হিধৃত। প্রতিচ্যাং যস্য দেশস্য গঙ্গাভাতি নিরন্তরম”।

আমাদের এই সুপ্রাচীন অঞ্চল নিজগুণেই প্রসিদ্ধ। মধ্যযুগের হেন কোনো কবি নেই যিনি সেন রাজাদের রাজধানী- গাঙ্গেয় এই ছোট্ট শহর নবদ্বীপকে নিয়ে সূক্ত বা পদাবলী বাঁধেননি। কবি কর্ণপুর, নুলো পঞ্চানন কিম্বা এডু মিশ্রের বর্ণনায় নদীয়া ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে তার সমৃদ্ধির নিশান রেখে দিয়েছে। কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকে নরহরি চক্রবর্তীর বৈষ্ণব সাহিত্য, সর্বত্র নবদ্বীপের উল্লেখ রয়েছে। গোটা মধ্যযুগে বিদ্যালাভ ও সংস্কৃতিচর্চার পীঠস্থান ছিল আমাদের এই অঞ্চল; এখান থেকেই স্মার্ত রঘুনন্দন, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, বুনো রামনাথের মতো মণীষীরা সমাজকে দিশা দেখিয়েছেন। এই সব কিছুর উপরে প্রেমসাগর মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের জন্ম ও লীলাভূমি হওয়ার দরুন এতদ অঞ্চলে কখনও সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ছিল না, বরং এক আশ্চর্য মিথোজীবীয় সৌভাতৃত্বময় সহাবস্থান দেখা যেত আদিবাসী, দেশীয় হিন্দু ও মুসলমানেদের মাঝে। নতুন শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে এই অঞ্চলে পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তুর ভিড় বাড়তে বাড়তে দেশীয় হিন্দু, আদিবাসী ও মুসলমানেরা জনসংখ্যার ২০ শতাংশে এসে দাঁড়াবার দরুন অঞ্চলের চরিত্র বদলে গেল, পুরাতন ঐতিহ্য আজ তলিয়ে গেছে বর্ণময় অতীতের গর্ভে। এই স্বীকারোক্তির গল্পটা খুবই ছোট্ট, তাই একটা ভণিতা দিয়ে শুরু করি- এটা সেই আশির দশকের গ্রামবাংলার সমাজব্যবস্থার একটা ক্ষুদ্র চিত্রকল্পও বটে।
আমার তখন বছর আষ্টেক বয়স, সারাদিন দম ফেলার ফুরসত থাকে না, এত খেলার ব্যস্ততা। এক সংসারের বিশাল হেঁসেলের জোয়াল বইতে বইতে মায়ের সুযোগই ছিল না দস্যি ছেলেকে দু’দণ্ড নজরে রাখে। জমিদারী প্রথা বহু আগেই গত হয়েছিল, অপারেশন বর্গার পর জমির পরিমাণও কমে গিয়েছিল, কিন্তু জমিদারী মেজাজের ঘাটতি ছিল না। দাদুদের চার ভাইয়ের মধ্যে একজন শহরে চাকরি করলেও তিনজন এখানেই থাকতেন এক পেল্লাই ইমারতের মাঝে যৌথ সংসারে। আমরা ভাইবোনেরা অবশ্য সেই বাড়িতে আংশিক বড় হয়েছি, বাবা-কাকার বিয়ের পরেই পুরাতন বালাখানার পশ্চিমে পিচরাস্তার ধারে নতুন বাড়িতে উঠে আসে, মা সেখানেই নতুন বউ হয়ে এসেছিলেন। তবে নতুন বাড়িতে কেবলমাত্র রাত্রিবাস, খাওয়া-দাওয়া সহ বাকি সকল কিছু পুরানো বাড়ির খানকাতেই হতো, দুপুরের বিশ্রাম বলতে খানিক খানকার রোয়াকের সামনে পুকুর ও বাড়ির উত্তর দেহলির মাঝখানে কয়েক একরের বাচরা মতো স্থানটিতে বসে গল্পগাছা। বড়ি দেওয়া, আচার শুকানো, পিঠেপুলির জন্য প্রাকপ্রস্তুতি, চুলে চিরুনি দেওয়া, কাঁথায় ফুলেল নক্সা আঁকা কিম্বা সোয়েটার বোনা- সবই দ্বিপ্রাহরিক বাচরাতেই অনুষ্ঠিত হতো।
গোটা বাড়িটার চর্তুবেড়ে বাঁশবাগান, তারই মাঝে মাঝে ধানের মড়াই, ভূষিমালের গোলা। বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিমে বাঁশ ঝাড়ের নিচেই হাঁস-মুরগির খুলডো, গরুর গোয়াল, সারগর্ত আর ছাগলের মাচা। বাড়ির রান্নাঘরও ওই বাঁশবাগানের মধ্যে, তার চালে লাউ, কুমড়ো, শশার লতা। বাচরার শেষে প্রশস্ত হামাম মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ঘাট, চারকোণা পুকুরের উত্তরপাড়ে পারিবারিক গোরস্থান। পূর্বপাড়ে বিস্তীর্ণ খেলার মাঠের শুরুতেই বেশ কয়েক কুঠুরি দালান বাড়ি ছিল, তার মধ্যে একটা বৈঠকখানা, হাকিমের দাওয়াখানা, একটা নহবতখানা, একসার টানা মুসাফিরখানা। এর ঠিক পিছনে একটা ক্যাম্পবাড়ি। ক্যাম্পবাড়িতে দেশ স্বাধীনের পূর্বে নাকি পুলিসের ফাঁড়ি ছিল, নব্বই এর দশকের মাঝামাঝি সময় অবধি ২-৩ জন কনস্টেবল থাকতেন। বাড়ির দক্ষিণে কয়েকশো মিটার দূরে ছিল অভিলাষের বাগান, বড় বড় ফল গাছের পারিবারিক বাগান। এই বাগানের শুরুতে দরগাতলা, তারপর একটা সাহেবকুঠি, এরপর পাঁচিলে ঘেরা বিস্তীর্ণ নীলকুঠির মাঠ ও তার দরদালান। ইস্কুলবাড়ির মতো এই সাহেবকুঠির নির্মাণ ব্রিটিশেরাই করেছিল, রেললাইন পাতার সময়। একপাশে তাদের ইঞ্জিনিয়ারেরা থাকত, অন্যদিকে কুলিবস্তি। তারা চলে গেলে দাদুর বাবা সেগুলো সস্তায় কিনে নেয়। এই বাড়িটাই কালক্রমে হয়ে উঠে মিস্ত্রীবাড়ির জাইরামঞ্জিল। এই ছিল তৎকালীন সময়ের আমাদের বাড়ির সুদীর্ঘ ভিটের বর্ণনা।
এই সমস্ত বাড়ি তৈরি ছিল ইয়া মোটা মোটা দেওয়ালের, পাটকেল রঙের বেলে পাথরের সাথে চুনসুরকির পেটাই করা মেঝে, লম্বা থাম, ছোট ক্যাসেজ, কড়িবরগা, জাফরি আর খিলানের মাথায় অর্ধবৃত্তাকার জানালা দরজা দিয়ে ইরানি-ফরাসি স্থাপত্যের এক মিশ্র নক্সার স্থাপত্য। কিছু কিছু ইমারতে ফিনিয়াল আর গম্বুজও ছিল। আমাদের পরিবারের ঊর্ধ্বতন কোনো পুরুষ পামির অঞ্চলের কোনো এক স্থান দেশ থেকে বাংলার ভূমে এসেছিল ‘মিস্ত্রী’ হয়ে, আমার ঊর্ধ্বতন তৃতীয় পুরুষ পর্যন্ত সেই পদবীই ছিল- যদিও মূল পদবী ছিল সেখ। আগেই বলেছি এটা নবদ্বীপ অঞ্চল, তবে ঠিক নবদ্বীপ নয় যা আজকের পুরসভা শহর।
“দ্বীপ নাম শ্রাবণে সকল দুঃখ ক্ষয়। গঙ্গা পূর্ব-পশ্চিম তিরেতে দ্বীপ নয়।
পুরবে অন্তদ্বীপ, শ্রীসীমন্তদ্বীপ হয়। গোদ্রুমদ্বীপ, শ্রীমধ্যদ্বীপ চতুষ্টয়।
কোলদ্বীপ, ঋতু, জহ্নু, মোদদ্রুম আর।
রুদ্রদ্বীপ এই পঞ্চ পশ্চিমে প্রচার”।
এই ন’টা দ্বীপের মধ্যে আমাদের বসবাস মোদদ্রুম দ্বীপে, যা কালক্রমে গড়ে পরিণত হয়েছিল শ্রীচৈতন্য দেবের কল্যাণে। নবদ্বীপের এই মিশ্র সংস্কৃতির কল্যাণে বাড়িতে সেই অর্থে কোনো হার্ডকোর ইসলামিক নিয়মের বন্ধন ছিল না, তবে বাড়ির বৌ-শ্রেণীর মহিলারা সাধারণত সেভাবে বাইরে পরপুরুষের সামনে যেত না। বোরখার চল না থাকলেও সাত হাত ঘোমটা টানাটা বাধ্যতামূলক ছিল। পুরুষেরা জুম্মার নামাজে অধিকাংশই হাজিরা দিত, ব্যাস; এখানেই নামাজ পালনের ইতি। রমজান মাসে মহিলারা হায়েজের দিনগুলো বাদে সব রোজা রাখলেও, শেষ সাতদিন তথা শেষ তিনদিনে হৈহৈ রৈরৈ ব্যাপার হতো, কারণ বাড়ির অভিভাবক স্থানীয় পুরুষেরা এই কটাদিনই রোজা রাখত। বাড়ির বাচ্চারাও উৎসাহে জোহর পর্যন্ত রোজা রাখত। স্বাভাবিক ভাবেই ইফতারির দস্তরখানে খানাপিনার জুলুশ বসাতে খানদানি বাবুর্চিরা আসতেন। পঞ্চাশের দশকের আগে নাকি লক্ষ্ণৌ থেকে বাবুর্চিরা আসতেন, এখন মুর্শিদাবাদের লালবাগ কিম্বা কোলকাতার মেটিয়াবুরুজ থেকে আসে। অগুন্তি মেহমান, দরবেশ, পীর, ফকির, মাওলানা, মুয়াজ্জিন কতই না মুরুব্বিরা দরগাতলায় মেহফিলের রুহানিতে দোয়া, দরুদ পাঠ করতেন, সালাম-আসগর দিতেন- যাতে আল্লাহর রহমত নাজিল হয়।
ঈদ, মহরম, ঊরুষ, মিলাদের জশনের পাশাপাশি রথযাত্রা, দোলযাত্রা, রাসযাত্রা, অম্বুবাচীর হরেক আচার পালন হতো সমোৎসাহে। তবে মহাশিবরাত্রি পালনে হতো সবচেয়ে বেশি ধুমধামের সাথে। বিশ-পঁচিশ ক্রোশ দূরের গাঁ শান্তিপুর, ধুবুলিয়া, কাটোয়া থেকে, এদিকে রাঢ় ও দখিনা ভেল অঞ্চল থেকে লোক আসত উৎসব পালন করতে, বাড়তি হিসাবে পাওনা ছিল নবদ্বীপে গঙ্গাস্নান, এই সময় দরগাতলায় ম্যারাপ বেঁধে অন্নকূট উৎসব পালিত হতো। যদিও শ্রীকৃষ্ণের অন্নকূট উৎসবের সাথে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না, আগত পুণ্যার্থীদের খাওয়া-দাওয়া করানোর নামটাই ছিল অন্নকূট। এনাদের মহিলারা অধিকাংশেই গাদাগাদি করে উপরোক্ত জাইরামঞ্জিল, বৈঠকখানা, ক্যাম্পঘর, হামাম, নহবত, মুসাফিরখানা, নতুনবাড়ির বারান্দাতে থাকতেন। পুরুষেরা খানকা ও বাচরাতে মাথায় শামিয়ানা টাঙিয়ে, চটের পাতলা শতরঞ্জির নিচে খড় বিছিয়ে শুতেন।
মোট কথা উৎসব ছাড়াও সারা বছর বাড়িতে মেলা বসে থাকত আত্মীয় কুটুম্বে- কারণ মেহমানখানা ও জাইরামঞ্জিল নামের দুই সরাইখানার নিঃশুল্ক অন্ন ব্যঞ্জন; শুধু একটু কসরত করে বিপুল সাইজের এই ভিটের কোনো একটা ইমারতের কোনো একটা কোণে মাথা গোঁজার স্থানটা করে নিতে পারলেই নিশ্চিন্তি। মুসাফিরখানা একটু উচ্চাঙ্গের খাবার-দাবার থাকত, মানে রোজ দুপুরে মাছের পদ আর একটা অম্বল। কুলকুচি ও হাত ধোয়ার জন্য থাকত চিলিঞ্চি। জাইরামঞ্জিলের খাতকদের জন্য সপ্তাহে একদিন মাছ, নিজে যোগাড় করতে পারলে ডিম, বাকি ডাল সব্জি আর ভাজা- এই ছিল বারমাস্যা বরাদ্দ। রাত্রে এই দুই স্থানের জন্যই আটার রুটি আর কিছু একটা ভাজি বা ডাল, কোনোদিন একটু গুড় দেওয়া জাউ এর পায়েস- ব্যাস। পালে-পরবে মাংস হতো।
    ঠাকুমাদের ভাইয়ের শালা থেকে দাদুর বোনপোদের ফুফুশাশুড়ির ননদাই এর মতো নিকটাত্মীদের ভিড়ের সাথে বাবা-কাকাদের বন্ধুর বন্ধু, তস্য বন্ধুতে গোটা অঞ্চল গমগম করত। দাদুদের মূল ব্যবসা ছিল ফসল মজুদ করে বজরায় করে কোলকাতায় চালান দেওয়া, তাই পাইকের, মহাজন, ফড়েদের সাথে মুন্সী, খাজাঞ্চি, সরকার, চৌধুরী, ধোপা, নাপিত, জেলে, রোজমুনিষ, রাখালবাখাল, চাকরবাকর মিলিয়ে দৈনন্দিন ভিড় মেলার চেয়ে নেহাত কম ছিল না। অনেকেই বছরের পর বছর এখানেই থাকত, তাদের মেয়েরা হেঁসেলে আর খামারে স্বেচ্ছাকর্মী হিসাবে কাজ করতেন, পুরুষেরা ব্যবসায়িক ও চাষাবাদী দেখভাল করত ফাইফরমাইসে। এই ভাবেই মাসের পর মাস দিব্ব্যি গড়িয়ে যেত, কেউ কাউকে মানা করত না। কেউ কাউকে সেভাবে নিমন্ত্রণও করত না, কেউ চলে যেতেও বলত না। প্রথমত জমিদারী মেজাজ বজায় রাখা, চাকরবাকর ছাড়াও কয়েকশো লোক কত্তাবাবু বলে কারণে-অকারণে মাথা ঝুঁকিয়ে থাকাটা বেশ উপভোগ করতেন দাদু ও তদুর্ধ্ব ঊর্ধ্বতন পুরুষেরা। দ্বিতীয়ত, লেঠেল না পুষেও এক হাঁকে একশত লাঠি সড়কি বেরিয়ে আসার জোরের জন্য এই বিপুল আয়োজন চালিয়ে যেত ধুরন্ধর পূর্বপুরুষেরা- বিনা বেতনে, শুধুমাত্র পেটেভাতের বিনিময়ে। সুতরাং, এই বাড়ির বড় বৌমা হিসাবে মায়ের শ্বশুরবাড়ির শুরুর দিনগুলোর অবস্থা কল্পনা করতে খুব একটা কষ্ট হয় না।
    আমি তখন আইডিয়াল ইস্কুলে স্ট্যান্ডার্ড টু’তে পড়ি, এক শীতকালে কোনো এক আত্মীয়ের কিছু একটা লতাপাতা সূত্রে খান দুয়েক পরিবার এসে মিস্ত্রীবাড়ির আশ্রিত হলেন। এনাদের সূত্রেই কিছুদিন পর নিগারও এলো। নিগার মাসোনি আর তার ছোট বোন মেহের গুল তাদের বাবাব সাথে দাদুর কিসমাতে এসে আতুরাশ্রম প্রার্থনা করলেন। কোনো একটা স্থানে দাঙ্গাতে নাকি তাদের মা ও ভাই মারা গেছে, সহায়সম্বলহীন হয়ে চেনা এক বাঙালি পড়শি ব্রজ মোদকের সাথে এখানে এসে জুটেছেন। এখন বুঝি সেটা ছিল ৯২ এর বোম্বে দাঙ্গা। সময়ের পলি তাদের ভুলিয়েই দিয়েছিল প্রায়, স্বীকারোক্তি লিখতে বসে আবার স্মৃতির সাগরে ডুবুরি নামাতে ভেসে উঠল নিগার, নিগার মাসোনি।
    নিগারকে কখনও বুবু-আপা-দিদি বা ফুফু-খালা কোনো নামে সম্বোধন করিনি, কেন করিনি তা অজানা। আমি যখন আট, তখন সে ষোল। বাবা কয়লা আমদানি ও পাটের চালানের দায়িত্বে ছিলেন, স্বভাবতই মাসের অধিকাংশ দিন তিনি বিদেশ বিভূঁইতে রাত কাটাতেন। আমি আর আমার ছোট বোন মায়ের সাথে নতুন বাড়িতে থাকতাম। নিগার মায়ের সাথে সেই রাত্রিগুলোতে আমাদের ঘরে থাকত মাকে সঙ্গ দিতে, তার ভাই মায়ের জন্য বিলাপ করত। আমার দুই খুড়তুতো বোন আছে, আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট, তারা দেখতে পুরো পুতুলের মতো ছিল।
    এদের সাথে আমার বোন- সারাদিন বিদঘুটে কাজকর্ম করে বেড়ানো বেয়াড়া বাচ্চা- স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির দুজন ঝি এই কন্যা সন্তানদেরই আগলাত, আর আমি একটু বড় হয়ে যাওয়াতে সেভাবে আমার কেউ খোঁজ রাখত না, আগানে-বাগানে ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম স্কুল থেকে এসে। মাস খানেকের মধ্যেই নিগার মায়ের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল, কারণ এনাদের দুজনের মাঝে একটা কমন মিল ছিল, কেউ কারও ভাষা বুঝত না। মা আদ্যোপান্ত শহুরে মেয়ে, গ্রাম্য বিদ্যুৎহীন পরিবেশে শুরুতে কষ্ট হতো। সে সম্বন্ধে কিছু বললেই আমার ফুফু-দাদিরা মাকে উন্নাসিক বলত, এ নিয়ে একটা আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও ছিল তাদের মাঝে- খুব সম্ভবত এই কারণেই মা ও নিগার একটা শহুরে আত্মীয়তার বন্ধনে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য নিগারের ভাষা এ বাড়ির হাতে গোনা এক আধাজন সদস্যের বাইরে কেউই বুঝত না।
    নিগারের আব্বার নাম ডোংরিওয়ালা, অবশ্য পুরো নাম তৌফিক আগা, বোম্বে শহরের অদূরে ডোংরি নামে একটা স্থানে থাকত বলে নামের শেষে ডোংরিওয়ালা জুড়ে গিয়েছিল। দাদু রেগে গেলে বরাবর হিন্দি বলতেন, আগাসাহেবকে পেতেই উর্দু শিক্ষার ক্লাসও শুরু করে দিলেন সন্ধ্যার দিকে, সে এক কমিক অধ্যায় ছিল- কারণ এরপর হরকথায় দাদুর ভুলভাল উর্দু লফজ-লতিফার চোটে সকলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। অল্প দিনেই দাদুর ভীষণ আস্থাভাজন হয়ে উঠলেন আগা সাহেব। বোম্বের কোনো একস্থানে বা একাধিক স্থানে তাদের গালিচা, মখমল, মলমল পর্দা, বিছানার চাদরের ব্যবসা ছিল, এনার অন্য এক ভাইয়ের কাঁচের থালাবাসনের ব্যবসা ছিল। দাঙ্গার সময় সব কিছুতে লুঠপাঠ ভাঙচুর চলে, বহু আত্মীয়স্বজন খুন হয়ে যায়। এনাদের কথ্য ভাষা ফার্সি, প্রত্যেকেই উর্দু জানতেন অল্পবিস্তর। সময়ের তাড়নাতে হোক বা বিশেষ কোনো এলেম, নিগার অতিদ্রুত বাংলা ভাষা করায়ত্ত করে নিল, বছর দেড়েকের মধ্যে সে কলেজেও ভর্তি হয়েছিল ক্লাস ইলেভেনে, অনর্গল বাংলা বলতে শিখে গিয়েছিল। নিগারের বাবাও দাদুর দেওয়া পুঁজিতে মেটিয়াবুরুজ থেকে কাপড় এনে হাটে-ঘাটে বিক্রি করে সম্মানের রুজি রোজগার করতেন, যদিও থাকা-খাওয়া করতেন জাইরামঞ্জিলে।
    মা বড় বাড়ির হেঁসেলে সাংসারিক কাজের তদারকি করতেন। নিগার তার ভাবির ছেলে অর্থাৎ আমাকে নিয়েই সারাদিন খেলা করত, মা নিজেও নিগারের কাছে আমাকে ছেড়ে বড় নিশ্চিন্তে থাকত। সোনালি কোঁকড়ানো চুল, কটা সাদা চামড়া, ছিপছিপে দীর্ঘাঙ্গী, টিকালো নাক, প্রশস্ত কপাল আর নীল চোখের এই পার্সিয়ান জিনের মেয়েটির মুখশ্রী মারাকাটারি সুন্দরী না হলেও উপরোক্ত বৈশিষ্টের কারণে আমাদের দক্ষিণ গাঙ্গেয় অঞ্চলের শ্যামবর্ণ তামাটে মানুষের ভিড়ে আলাদা করে চেনা যেত। এদের সম্ভাষণ রীতিতে হাত ও কপাল চুম্বনের প্রথা ছিল, যেটাকে আমাদের সমাজে সবাই শুরুতে খুব হাসাহাসি করত। নিগারের কাছে আমরা ভাইবোনেরা কতশত ইরানি গল্প শুনতাম, ডাকাতের গল্প, বোম্বে শহরের গল্প, আরব সাগরের গল্প। আরব্য রজনীর গল্প, বাগদাদ, তেহরান, জ্বিন, পরী, শাহেনশা, বাদশাদের দেশের ওস্তান, মার্কাজ, বাখ্‌শে পাড়ি জমাতাম নিগারের গল্পের উড়ন্ত গালিচাতে চড়ে। প্রথমদিকে নিগার জাইরামঞ্জিলের একটা ঘরে আরো অনেক মহিলাদের সাথে ঠাসাঠাসি করে থাকলেও পরবর্তীতে মায়ের উদ্যোগে গুমঘরের এককোণে পাটকাঠির বেড়া দিয়ে একটা স্থান নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল বাড়ির অন্দরে। প্রথমদিকে ফুফুদের পুরাতন সালোয়ারগুলো পরলেও পরের দিকে তাদের দেশীয় স্টাইলের খাটো কুর্তি, আজারি চুড়িদার আর জরিদার কুর্দি ওড়নায় বড় মোহময়ী লাগত তাকে। আমাকেও কয়েক পিস গিলান জোব্বা ও পিরান গড়িয়ে দিয়েছিল আগা সাগেব।
    সমস্যাটা শুরু হলো কিছুদিন পর থেকে, ফুফুদের বিয়ে-শাদির জন্য ঘটকে যখন ভাল ভাল সম্বন্ধ আনে, সকলেই নিগারকে পছন্দ করে। কারণ, বাঁধা বাঁদির মতো নিগারই শরবত, বরফি, মিষ্টি, শোনপাপড়ি সাজিয়ে যেত বারকোশে সাজিয়ে। সিউড়ির বড় খানেদের বাড়ি থেকে ন’ফুফুর জন্য একটা সম্বন্ধ এলে তারা নিগারের বোন মেহের গুলকে নিকাহ পড়িয়ে নিয়ে চলে যেতে তখন বিষয়টা অসহ্যের পর্যায়ে পৌঁছাল। সেই থেকেই দাদির চোখের বালি হয়ে গেল নিগার, যথারীতি তার ঠাঁই হলো জাইরামঞ্জিলের গাদাগাদিতে। কয়েকদিন পর মা- দাদির বিরোধিতা করে আমাদের নতুন বাড়ির সিঁড়ির নিচেটা খানিকটা মেরামত করে সেখানেই নিগারের পাকা আস্তানা করে দিলেন। সেই থেকে নিগার আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে উঠল। আব্বা শুরুতে কিছুটা আপত্তি করলেও নতুন বাড়িতে দুটো বাচ্চা নিয়ে মায়ের অসুবিধার কথা ভেবে রাজি হয়ে গেলেন। ফলত দাদির সাথে মায়ের বিরোধ তুঙ্গে উঠল ছুতোনাতাতে, এই সময়েই গত কয়েক শতাব্দীর যৌথ সংসার থেকে হাঁড়ি আলাদার বীজ বপন হয়ে গেল। দাদি-পিসিরা শলা করে নিগারের নামে হরেক রকমের চারিত্রিক অপবাদ কুৎসা দিতে শুরু করল।

    আমাদের ঘরে থাকার জন্য নিগারের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলাম, ক্রমশ সে যেন মিস্ত্রী বাড়িরই মেয়ে হয়ে গেল। একটা কেমন যেন অযাচারী অধিকারবোধ জন্মে গিয়েছিল ওর প্রতি। সে নিয়মিত তাদের দেশে বা অন্য কোথাও কাউকে চিঠি লিখত, পাল্টা চিঠি আসতও। হয়ত কোনো প্রেমিক বা পত্রমিতালী- ভাষা ফার্সি হওয়ার দরুন তা আমার অবোধ্য ছিল। নিগার আমাকে আদর করে বুল্লা নামে ডাকত, কারণে-অকারণে আল্লাকে শুকরানা দিয়ে আমাকে স্নেহ, আদর, চুমুতে ভরিয়ে তুলত সর্বক্ষণ। একা একাই বলত, হসলা জিততা হ্যাঁয়, হাতিয়ার নেহি। আমার হসলা আছে, আমরা আবার ডোংরি ফিরে যাব। বুঝতাম তার রুহতে শুকুন নেই স্বদেশ ছেড়ে এসে, শরীরটা এখানে থাকলেও আত্মা সেই ডোংরিতেই পড়ে থাকে।
    নিগার দারুণ দারুণ সব রান্না করত, আমার নানি, মামারা এলে মাকে সাহায্য করত। ডালিমের রস দিয়ে মাংসের এক চমৎকার সুরুয়া বানাত- ফেসেঞ্জান বা ঐ ধরনের কিছু একটা নাম ছিল। মাংসের কিমা দিয়ে নানা ধরনের সবজি সিদ্ধ বানাত- এর নাম ছিল বাদেমজান। এছাড়া কাসেমি পুলাও, খাসবু মাহি, কোরমাহ, খোশ কারাফ এমন নানা ধরনের খাবারে খুশবুতে বাড়ি ম ম করত যখন সানকি বা খঞ্চাতে করে দস্তরখান সাজত। জন্মদিনে আমাকে একটা অনুবাদিত বাংলা বই দিয়েছিল নিগার- ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’। পাওলো কয়েলহো নামের এক লাতিন লেখকের রাখাল নায়কের গুপ্তধন প্রাপ্তির কাহিনী, নায়িকার নাম ফাতিমা। আমি নিজেকে সান্তিয়াগো মনে করতাম, আর নিগারকে ফাতিমা। সর্বক্ষণ বলত, মাওলাকে বলেছি- তুই আমার মুরসিদ, আমি তোর মুরিদ হবো- ভাল করে লেখাপড়া কর বুল্লা। তুই বড় হলে আমি তো তোকেই শাদি করতাম, তুই আমার মির্জা আর আমি তোর বেগম; আ মেরে আউলিয়া। বলেও নিপুণভাবে গালে, কপালে, ঠোঁটে চুমু এঁকে দিত। সুন্দর সুন্দর ফার্সি গজল, আলাপ, কাওল, রুবাইয়াৎ ভীষণভাবে মন ছুঁয়ে যেত। বোল না বুঝলেও সুফি ঘরানার সুরগুলো কিশোর মনে পুলক জাগাতো, খিলখিলিয়ে বিষয়গুলো উপভোগ করতাম।
    আমাদের ঘরে থাকাকালীন তার ইবাদতে পাবন্দেগী এল, চেহেরাতেও নূর এল- কিন্তু বিরহাপনা বেড়ে যেতে লাগল, কারণ ফুফুরা তার সাথে কেউ কথা বলত না- মাতৃ ও ভাতৃ বিয়োগের যন্ত্রণা তো ছিলোই, বোনটাও চলে গিয়েছিল শ্বশুরবাড়ি । একদিন মা সত্যিই আর সকালে ও’বাড়ি গেল না, ভেঙে গেল সংসার। মালার একটা পুঁতি খুলে গেলে বাকিগুলো চোখের পলকে ঝরে যায়, এক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হলো না। চার দাদু সহ তাদের অধিকাংশ বিবাহিত ছেলেপুলেরাই আলাদা হয়ে গেল বছর ঘুরতেই। এর ফলে যারা লাভবান হয়েছিল তারা নিজেদের ক্রেডিট দিল, আর যাদের লোকসান হলো তারা গালিগালাজের জন্য নিগারকে বেছে নিল। ভূসম্পত্তি বা ব্যবসা ভাগ না হলেও হাঁড়ি আলাদা হয়ে যেতেই বারোয়ারি খানার চাষ উঠে গেল, কারণ তখন সকলের জন্য নির্দিষ্ট মাসিক মাসোহারার বন্দোবস্ত হলো, কে আর নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ভূতভোজন করাবে! ভেলকিবাজির মতো লতায় পাতায় জড়িয়ে থাকা আত্মীয়েরা পাততাড়ি গুটাল মিস্ত্রীবাড়ি থেকে।
    কিন্তু যাদের হাতে কাজ ছিল না, এ বাড়িতে খেয়েদেয়ে ব্যোম ব্যোম করে ঘুরে বেড়াত তেমন কিছু আত্মীয়ের মাথায় বাজ পড়ল, খুব মনে আছে ক্লাস সিক্সের হাফইয়ার্লির রেজাল্ট এনে নাচতে নাচতে বাড়িতে ঢুকে দেখি লোকজন গিজগিজ করছে। সবটা না বুঝলেও যেটা বুঝলাম, সেটা হলো- নিগার নাকি পতিতাবৃত্তি করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে। ফজল নামের একজনের সাথে ভরদুপুরে ছাদের চিলেকোঠায় নাকি মন্দ কাজ করেছে, আর সেটা দেখেছে বাড়ির এক ঝি আশিরন আর দাদির ভাইপো নাতি শাবাব। বিচার হলো, যেহেতু হাতেনাতে ধরা পরেছে তাই পঞ্চাশ ঘা কাড়ার হুকুম দিলো দাদু, নিগার কিছুই বলার সুযোগ পেল না আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য। সেদিন সারারাতই প্রায় কাঁদল সে, মায়ের কাছে কোরান পাক হাতে নিয়ে বারে বলতে থাকল- এই কালামে পাকের কসম ভাবি, আমি মন্দ কিছু করিনি। আগা খান তখন কোলকাতায়, তিনি ফিরে এসে কান্নাকাটি করে মেয়ের হয়ে মাফ চেয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার আর্জি করলেন।
    নারী-পুরুষের সম্পর্ক, যৌনতার বিষয়ে সবটা না বুঝলেও ভাসা ভাসা একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল সেই সময়, কেমন যেন ঘৃণা তৈরি হয়ে গেল নিগারের উপরে। যদিও মা বিশ্বাস করল না নিগার অন্যায় কিছু করেছে বলে, কিন্তু চারিপাশের সকলের মুখের কথা শুনে আমার কেমন একটা হতে লাগল। যদিও অনেক পরে দাদি বিলাপ করে সত্য উগরেছিল, স্বীকার করেছিল যে নিগারের সাথে অন্যায় করা হয়েছিল- যখন আমার ছোট ফুফা ২৩ বছরের ফুফুকে বিধবা করে জান্নাতে চলে যান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। যাইহোক, ক্রমশই আমি কেমন যেন হিংস্র হয়ে উঠতে লাগলাম নিগারের উপরে। সারাক্ষণ তাকে তাড়াবার চেষ্টায় মত্ত হয়ে উঠলাম, সে শুধু বলত- এখানে আমার কেউ নেই বুল্লা, বাপটাও দেশে চলে গেল। এমনই একদিন কাছে ডেকে হাসতে হাসতেই বলল- শর কলম কিয়া যায়ে, হুজুর! উর্দু আমিও কিছুটা বুঝি, বিরক্তির সাথে উপেক্ষা করে টিভি খুলে বসে গেলাম। সেদিনের কথাগুলো আজও কানে বাজে- “এটা জাজমেন্টাল সোসাইটি বুল্লা, তুইও ভুল বুঝলি! শোন আমার কথা- যে শোনে, সেই কেবল বুঝতে পারে, যে বুঝতে পারে তার পক্ষেই ভাল কিছু করা সম্ভব”। আমার এই আচরণ তাকে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা দিয়েছিল, যা সে মেনে নিতে পারেনি। হয়ত, আমার প্রতি তার ছিল এক অকৃত্রিম সন্তান বাৎসল্য- কিম্বা, কে জানে কী ছিল!
    এরপর একদিন সকালে উঠে দেখি নিগার নেই, বিকাল পর্যন্তও ফিরে এল না, মা খোঁজ শুরু করল, আমাকে শুধাল। আমি মিথ্যা বললাম, বিল পাড়ার পরীক্ষিতের সাথে তাকে যেতে দেখেছি বলে মাকে মিথ্যা বললাম। সন্ধ্যার পর কাকিমার সাথে সে বাড়ি ফিরতে কিছু না শুনেই মা ভীষণভাবে তাকে অপমান করল, তারপর সে নিজেও কিছু তর্কে জড়িয়ে যায়- আমি সেসব আর খেয়াল করিনি। পরদিন ভোরে আর কেউ তাকে দেখেনি এ তল্লাটে। সেদিন গেল, আজও গেল। ২০১৫ সালে মুম্বই গিয়েছিলাম, ডোংরিতে গিয়ে দেখি তৌফিক আগা সাহেবের ধান্দা আবার জমে উঠেছে, খাতিরের কোনো ত্রুটি হলো না। নিগারের কথা শুধাতে তিনি মৌন হয়ে গেলেন, চোখ মুছে বললেন- ইতনা বড়া দেশমে শোয়া’শ কড়োর লোগ- উসে কাহা ঢুঁন্ডু বেটা।
    একটা জলজ্যান্ত অনূঢ়া মেয়ে জাস্ট হারিয়ে গেল আমাদের পরিচিত সমাজ থেকে, শুধুমাত্র অবহেলা আর কুৎসার কারণে। হারিয়ে গেল নিগার মাসোনি।
“ভালবাসা হলো এমন একটি পর্যায়, যা দুঃখের মধ্যেও মানুষকে সুখী রেখে দেয়”
    পাওলো কোয়েলহোর অমর উক্তির মাঝে আজও নিগারকে খুঁজে পাই, আমার ছেলেবেলার ক্রাশ ছিল হয়ত বা- যার জন্য আজও নিগার নামটা শুনলে সবার আগে একটা অনাবিল খুশির উদ্রেগ হয়, তারপরেই একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা ঘিরে ধরে- ভরসার মর্যাদা রাখতে না পারার যন্ত্রণা। সে যেখানে আছে নিশ্চিত সুখেই আছে।
সেকেন্দ্রাবাদী শায়র সন্তোষ আনন্দের একটা শায়েরী দিয়ে তাকে অক্ষম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ছাড়া আজ কিছুই করার নেই-
“কুছ পা কর খোনা হ্যাঁয়
কুছ খো কর পানা হ্যাঁ
জীবন কা মতলব তো
আনা অউর জানা হ্যাঁয়
জিন্দেগী অউর, কুছ ভি নেহি
তেরি মেরি কাহানি হ্যাঁয়”।

মঙ্গলবার, ৬ জুলাই, ২০২১

আসন্ন উপনির্বাচনঃ শ্রেণীকে আর অগ্রাহ্য করা যাবে না



পরিযায়ী শ্রমিক ও রেড ভলেন্টিয়ার প্রার্থী চাই।
রাজ্যে লকডাউন উঠে গিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরলেই আবার ৫টি কেন্দ্রে বিধানসভা উপনির্বাচনের দামামা বেজে যাবে। সামসেরগঞ্জ ও জঙ্গীপুর কেন্দ্রে ভোটের আগেই প্রার্থী মারা যায়, সেখানে নির্বাচনই হয়নি। খড়দহে ফলপ্রকাশের আগেই জয়ী প্রার্থীর মৃত্যু ঘটে। দিনহাটা ও শান্তিপুর কেন্দ্রে জয়ী প্রার্থীরা পদত্যাগ করেছে।
২০১৯ লোকসভায় এই কেন্দ্র গুলোতে গত দলের ভোট কত ছিল, দেখে নেওয়া যাক।
- দিনহাটা, ফঃবঃ- প্রাপ্ত ভোট ৬০৩৭, ২.৬২%,
- জঙ্গীপুর, সিপিএমঃ- প্রাপ্ত ভোট ৯৯২৭, ৫.০৯%
- সামসেরগঞ্জে কংগ্রেস প্রার্থী ছিল, NO Data
- শান্তিপুর, সিপিএমঃ- প্রাপ্ত ভোট ১১৬২৮, ৫.৫০%
- খড়দহ, সিপিএমঃ- প্রাপ্ত ভোট ২০০৬৯, ১১.৪০%
২০২১ নির্বাচনে ৫টা আসনে সংযুক্ত মোর্চার তরফে ৩টে আলাদা আলাদা দলের কোনো প্রার্থীর জামানত বাঁচেনি।
- দিনহাটা, ফঃবঃ- প্রাপ্ত ভোট ৫৯১৬ ভোট, ২.৪৯%
- শান্তিপুর, কংগ্রেসঃ- প্রাপ্ত ভোট ৯৭২৫, ৪.৪৮%
- খড়দহ, সিপিএমঃ প্রাপ্ত ভোট ২৬৭৩০, ১৪.৭০%
- সামসেরগঞ্জে ভোট হয়নি
- জঙ্গীপুরে ভোট হয়নি
এই হচ্ছে পরিসংখ্যান।
২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে আমাদের দলীয় ইস্তেহারে উল্লেখ ছিল পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য আলাদা দপ্তর খোলা হবে। ভোটে আমরা না জিতলে কী হবে, আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে অটল আছি, সেই বার্তা পরিষ্কারভাবে দেওয়া দরকার। পাশাপাশি ‘পরিযায়ী শ্রমিক সংগঠন’ নামের গণসংগঠন তৈরি করা হোক কেন্দ্রীয় ভাবে, যারা ব্লকে ব্লকে ইউনিট বানিয়ে পরিযায়ী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের পাশে থাকবে নানা দাবী-দাওয়া বিষয়ে।
রাজ্যের সবচেয়ে বেশি পরিযায়ী শ্রমিক কোচবিহার জেলার, তার পরেই মুর্শিদাবাদ জেলা। সুতরাং, এই দুই জেলার ৩টে আসনের প্রতিটিতে মানুষের মতিগতি বুঝে নেওয়ার স্বার্থে- পরিযায়ী শ্রমিক কিম্বা তাদের পরিবার থেকে প্রার্থী দিতে হবে। এরাই তো আমাদের শ্রেণী, এরাই তো পার্টির পাঁজর, এদের জন্যই তো সংগ্রাম।
‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ শেষ কয়েক দশকের ভিতরে, বাম প্রচার দলের আশ্চর্য আবিষ্কার। তাদেরই দাবী অনুসারে- ২০২১ ভোটের ফল বের হওয়ার দিনে যেখানে মাত্র ২০০০ সদস্য ছিল, ১৭ই মে তারিখ পর্যন্ত তা নাকি লক্ষের সীমা ছাড়িয়েছে। এত দ্রুত ভলেন্টিয়ারের সদস্য বৃদ্ধি, গোটা বিশ্বে এক ঐতিহাসিক নজির সৃষ্টি করেছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করে- ব্রিটেনের সংবাদপত্রেও ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল।
গোটা বিষয়টা পার্টিকর্মী ও অজস্র দলীয় সমর্থকদের মাঝে চরম উন্মাদনা সৃষ্টি করেছ। সাধারণ মানুষ সহ বিরোধী পক্ষও ভীষণ ভাবে স্বাগত জানিয়েছে এবং চরম উৎসাহ দিচ্ছে। তথাকথিত মেইনস্ট্রিম মিডিয়া যারা কার্যত বামেদের অচ্ছুত করে রেখেছিল- তারাও দেখাতে বাধ্য হচ্ছে। মাত্র ১৫ দিন আগে ভোটের ফলাফলে ‘শূন্য’ পাওয়া একটা দলের জন্য এ এক আশ্চর্য চাঁদমারি।
এমতাবস্থায় গোটা রাজ্য তথা দেশের কাছে ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স'কে স্বীকৃতি দিতে, সমর্থক ও কর্মীদের উৎসাহ শতগুণ বাড়িয়ে তুলতে- পুরসভা বিশিষ্ট শান্তিপুর বিধানসভা কেন্দ্র, এবং কোলকাতা সন্নিহিত খড়দহ কেন্দ্রে- পরিচিত রাজনৈতিক কর্মীদের বদলে, আক্ষরিক অর্থে রাস্তায় থাকা পরিশ্রমী ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ এর মধ্য থেকে ক্যান্ডিডেট বেছে নেওয়া হোক।
এখন যদি পার্টি নতুন ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে তো কবে করবে! এদের ভোটের ময়দানে নামিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক লাভ যদি না নেয় তো কবে নেবে? সুতরাং এখন থেকেই পরিকল্পনা করে প্রার্থী বাছাই করে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া হোক, যাতে বিধানসভায় একটিও বাম মুখ দেখতে পাওয়া যায়, শূন্যের লজ্জা কাটিয়ে।

মঙ্গলবার, ১৫ জুন, ২০২১

সালভাদর আলেন্দে



মাত্র ৩ বছরের শাসনাকালে গোটা পৃথিবীকে সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পথ দেখিয়েছিলেন, যা যারা পৃথিবীর জন্য অনুকরনীয় ও দৃষ্টান্তমূলক। আমাদের রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকারের পদক্ষেপের অধিকাংশই আলেন্দের কল্যাণমুখী প্রকল্পগুলোকে পরিমার্জন করে অনুসরণ করা।
• চিলি’র প্রেসিডেন্ট হবার পরপরই তিনি ঘোষনা করেন- The Chilean Path To Socialism. চিলি’র নিজস্ব পন্থায় সমাজতন্ত্র’ বা সমাজতান্ত্রিক দেশ গঠনের আন্দোলনের ঘোষনা তিনি দিলেন। তিনি শুধু ডাক দিয়েই ক্ষান্ত থাকলেন না, তিনি উৎসাহের সাথে কাজে নেমে পড়লেন।
• বৃহৎ আকারের শিল্প জাতীয়করণ বা রাষ্ট্রীয়করণ করেন। তিনি কপার খনি ও ব্যাংক খাতসহ বিভিন্ন বড় বড় শিল্প ও শিল্প কারখানা জাতীয় করণের ঘোষনা দেন। তিনি স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষাখাতের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটানোর চেষ্টা করেন।
• শিক্ষার হার বাড়ানোর পাশাপাশি, আগামী প্রজন্মকে পুষ্টি দিতে বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সের শিশুদের জন্য তিনি বিনা খরচে দুধ বিতরণের কাজে হাত দেন। স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করেন। যা আমাদের দেশে মিডডে মিল নামে চালু হয় গত দশকে।
• বিনামূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর অবধি শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিন বছরের মধ্যে ভর্তির হার বেড়ে যায় ৮৯ শতাংশ।
• শহরাঞ্চলে গৃহহীনদের জন্য ঘর করে দেবার উদ্যোগ নেন।
• শ্রমিকদের নুন্যতম ন্যায্য বেতনের পরিমাণ নির্ধারন করেন।
• আগে থেকেই জমি অধিগ্রহণ ও জমি পুনঃবন্টনের যে কাজ চলছিল তিনি তা আরো দ্রুততার সাথে করার উদ্যোগ নেন।
• ১৮ মাসের মধ্যে লাথিফুন্দা বা বৃহদাকারের কৃষি জমিদারী দেশ থেকে লুপ্ত করেন।
• বিদ্যুতের দাম তিনি কমিয়ে দেন।
• জনগণের বিভিন্ন খাতের ট্যাক্স কমিয়ে দেন।
• তিনি পপুলার সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
• নারীদের মাতৃত্ব ছুটি ৬ সপ্তাহ থেকে বাড়িয়ে ১২ সপ্তাহ করেন।
• প্রজেক্ট সাইবারসিন(Cybersen) একটি উন্নত নেটওয়ার্কৃ ব্যবস্থা তিনি সৃষ্টি করেন। যার মাধ্যমে কলকারখানা থেকে টেলেক্স মেশিন ও কম্পিউটারের সাহায্যে সরকারের সরাসরি যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করা হয়।
চিলি দেশের মধ্যে এই সকল সংস্কারমূলক কাজ মুখের কথা কথা ছিলো না। বাস্তবেই সাধারণ জনগণ এই সংস্কারের সুফল ভোগ করতে সক্ষম হচ্ছিলো। একইসাথে পূঁজিপতিরা এই সংস্কার কাজে জর্জরিত হয়েছিলো। এরইমধ্যে আমেরিকান সরকার চিলি’র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনের কাজকে নানাভাবে ভন্ডুল করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে চিলি ঘোষনা দিলো আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা ও বিদেশী কোনো দেশের দেনা চিলি শোধ করবে না।
স্বভাবতই চিলি’র সমাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার চক্রান্ত সমানতালে চলতে থাকলো।
আলেন্দে যেদিন থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়িছিলেন সেদিন থেকে তার বিরুদ্ধে আমেরিকা নানা চক্রান্ত ষড়যন্ত্রের জাল বিছাতে থাকে। আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি আরকাইভস-র ডকুমেন্ট থেকে জানা যায়, ১৯৭০ সালেই CIA বলেছিল যে, আলেন্দে সামরিক অভ্যুত্থানে মারা যাবে এমনটা নির্ধারিতই ছিল।
সেখানে বলা হয়, ’এটা নিশ্চিত এবং অবধারিত বিধান যে, আলেন্দেকে ক্যু’র মাধ্যমে সরিয়ে দেয়া হবে.. …’
In 1970, the CIA’s deputy director of plans wrote in a secret memo: “It is firm and continuing policy that Allende be overthrown by a coup. … It is imperative that these actions be implemented clandestinely and securely so that the USG [the U.S. government] and American hand be well hidden.”
একই বছরে আমেরিকান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সিআইএকে নির্দেশ দিলেন, ‘”make the economy scream”। চিলি’র অর্থনীতিতে হাহাকার এনে দাও! শাসনতান্ত্রিক সংকট শুরু করা হলো নানা ওজর উছিলা সৃষ্টি করে।
সাল ১৯৭৩, ১১ সেপ্টেম্বর। আলেন্দে রেডিওতে সরাসরি বক্তব্য দিচ্ছেন। এদিকে দূর থেকে শোনা যাচ্ছে গোলাগুলির আওয়াজ। এরই মধ্যে তিনি বললেন-
“আমার দেশের প্রিয় শ্রমিক জনতা! চিলি’র জনগণ ও তাদের আকাংখার উপর আমার বিশ্বাস আছে। বিশ্বাসঘাতকতা’র ভেতর থেকেও নিশ্চয়ই আগামীর যারা আসবে তারা এই অন্ধকার-অসহ্য সময়কে পরাজিত করতে পারবে। মনে রাখবেন, দিনক্ষণ সমাগত, বিরাট সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে, যার মাধ্যমে মুক্ত জনতা নতুন একটি ভালো সমাজ গঠনের কাজে এগিয়ে আসবে।
চির জাগরূক থাকুক চিলি!
চির দেদিপ্যমান থাকুকি জনতা!
চিরজীবন বেঁচে থাকুক শ্রমিকসমাজ”!
তিনি এই বক্তব্য শেষ করার কিছুক্ষণের মধ্যে ক্ষমতা দখলকারীরা ঘোষনা দিলো, আলেন্দে আত্মহত্যা করেছেন।
১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সালভাদর আলেন্দে’র মৃত্যু হলো।
চিলি’র সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের সংস্কারমূলক প্রচেষ্টা আপাতত থেকে গেলেও, রয়ে যায় চিলিকে আমূল পরিবর্তনের শ্রমসাধ্য চেষ্টার বিরাট এক দক্ষযজ্ঞ। অসমাপ্ত অধ্যায়ের অশেষ কর্তব্য কর্ম আজও সমগ্র বিশ্ব অনুসরণ করছে।
__________________
পরিমার্জিত ও সংযোজিত
সুত্রঃ বিডি নিউস

বৃহস্পতিবার, ১০ জুন, ২০২১

বিজেপি রুখতে CPIM বিনা গতি নেইঃ ইতিহাস

 



পশ্চিমবঙ্গের ভোটের রাজনীতিতে নাকি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কখনও জায়গা পায়নি, এটা অনেকেই গর্ব করে বলেন। ইতিহাস ও তথ্য কি তাই বলছে?
স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচন- ১৯৫২ সালের বিধানসভা ভোট; জাতীয় কংগ্রেস, কিষাণ মজদুর প্রজা পার্টি, CPI সহ মোট ৭টি বামদল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল- যারা সেকুলার ছিল।
সাম্প্রদায়িক দলগুলোর মধ্যে ২৩৮টি বিধানসভা ক্ষেত্রের ৮৫টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল ভারতীয় জনসঙ্ঘ, হিন্দু মহাসভা ৩৩টি আসনে ও রামরাজ্য পার্টি ১৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। যার মধ্যে জনসঙ্ঘ ৫.২৯% ভোট পেয়ে ৯টি আসনে জয়লাভ করে আর হিন্দু মহাসভা পায় ৪টি আসন, মোট ভোটের ২.৩৭%। লক্ষ্যণীয়ভাবে পশ্চিম মেদিনীপুরের নারায়ণগড় আসনটি জনসঙ্ঘ জিতেছিল। মুসলিম লিগ ৩৬টা আসলে নির্দল হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল।
১৯৫৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জনসঙ্ঘ কোনো আসন না পেলেও, হিন্দু মহাসভা মাত্র ২.১৫% ভোট পেয়ে ২৫টি আসনে জয়লাভ করেছিল। ১৯৬২ সালের নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদীরা শূন্য হয়ে যায় বিধানসভাতে, কারণ বামেরা আলাদা আলাদা লড়েও ২৫২টি আসনের মধ্যে ৭৭টা আসন পেয়েছিল যা মোট ভোটের ৩৭.৫৭% ছিল।
১৯৬৭ সালের নির্বাচনে হিন্দু মহাসভা প্রার্থীই দিতে পারেনি, কিন্তু জনসঙ্ঘ ৫৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র ১.৩৩% ভোট পায় ও ১টি মাত্র আসন জিততে সক্ষম হয়। বলাই বাহুল্য, এই সময়ের মধ্যেই ১৯৬৪ সালে CPIM দলের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, এবং সর্বাপেক্ষা বেশি CPIM উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসে জ্যোতি বসু বিরোধী দলনেতা হয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠা লগ্নেই CPIM আজকের বিজেপির পূর্বপুরুষদের বাংলার মাটিতে প্রায় নির্বংশ করে যাত্রা শুরু করেছিল।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, কেন সেই সময় CPI ভেঙে গেছিল! কারণ মানুষ মনে করেছিল CPI ক্রমশ ভাববাদী দলে পরিণত হয়ে গিয়েছে- যারা কংগ্রেসকে হারাতে পারবে না। স্বভাবতই সদ্য জন্মানো CPIMকে মানুষ ঢেলে আশীর্বাদ করেছিল। একই ঘটনা ১৯৯৯ সালেও দেখা যায়, সরকার বিরোধী মানুষ মনে করেছিল CPIM কে হারানো কংগ্রেসের কম্ম নয়, তাই সদ্য জন্মানো তৃণমূল কংগ্রেস বেশ চোখে ধরা সাফল্য পায়।
এই একই ধারাতে ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে মানুষ মনে করেছে CPIM ক্রমশ কোলকাতা কেন্দ্রিক মধ্যবিত্তের ‘ভাববাদী জড়’ দলে পরিণত হয়েছে, তাই ভোটের বাক্সে CPIMকে বিবেচনাই করেনি। এই জায়গা থেকেই সুপ্ত জনসঙ্ঘের DNA ‘জিন’ আবার কোমা থেকে বেরিয়ে ‘আলাদীনের জিন’ হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে জেগে উঠেছে।
১৯৭১ এর নির্বাচনেও জনসঙ্ঘ ১টি আসন পেয়েছিল। আরেক সাম্প্রদায়িক দল মুসলিম লিগ এই বছর নিজেদের সিম্বলে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। এই সময় CPIM একাই ১১৩টা আসন পেয়ে বিধানসভায় বৃহত্তর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, এবং লক্ষ্যণীয়ভাবে CPI ক্রমশ পিছোতে থাকে। ১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কোনো ভোট হয়নি, গণতন্ত্রকে লুঠ করেছিল কংগ্রেস। সিদ্ধার্থ রাজের প্রথম ৩ বছরে নির্বিচারে খুনোখুনির পর ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি হয়। পরবর্তীতে কংগ্রেস বিরোধীরা দুটো গোষ্ঠীতে সংঘবদ্ধ হয়, CPI ছাড়া অন্যান্য বামপন্থীরা ‘বামফ্রন্ট’ গঠন করে, বাকিরা জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ‘জনতা দল’ গঠন করে, যার মধ্যে জনসঙ্ঘও ছিল। ১৯৭২ সালে বরানগর আসনে জ্যোতি বসু CPI এর প্রার্থীর কাছে হেরেছিল, CPI কংগ্রেসের সাথে জোট বেঁধে ভোটে লড়েছিল।
১৯৭৭ সাল থেকে ২০১১ সাল অবধি বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে জনতা দল ২৯টা আসন পেয়েছিল, যার মধ্যে সিংহভাগ আসন ছিল অবিভক্ত মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলায়। এই বছরও ‘CPI-কংগ্রেস’ জোট ছিল। ১৯৮০ সালে জনতা পার্টি ভেঙে ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ (BJP) নাম নিয়ে জনসঙ্ঘ আত্মপ্রকাশ করে, যা ছিল RSS এর মুখ্য রাজনৈতিক শাখা। ১৯৮২ সালের নির্বাচনে জনতা পার্টি বা বিজেপি কেউ কোনো আসন পায়নি। CPIM এর গণসংগঠনের দাপটে এদের সংগঠন শিকেই উঠে গিয়েছিল তা প্রাপ্ত ভোট শতাংশ দেখেই সহজে অনুমেয়, যথাক্রমে- ০.৮৩% ও ০.৫৮%।
১৯৮৭ সালের নির্বাচনেও জনতা দল, বিজেপি বা মুসলিম লিগের কেউই বিধানসভায় খাতা খুলতে পারেনি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজেপি সর্বপ্রথম ২৯১টা আসনে প্রার্থী দিয়ে ১১.৩৪% ভোট পেয়েছিল, আদবানীর রথযাত্রাকে পুঁজি করে। এই বছর আরেক জনসঙ্ঘ, হিন্দু মহাসভা ও শিবসেনা আলাদা ভাবে প্রার্থী দিয়েছিল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজেপি কোনো আসন পায়নি, অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দলের মধ্যে শিবসেনা, জনসঙ্ঘ ও হিন্দু মহাসভার পাশাপাশি মুসলিম লিগ প্রার্থী দিয়েছিল।
২০০১ সালের নির্বাচনেও বিজেপি সহ অন্যান্য সাম্প্রদায়িক দলগুলো বিধানসভাতে শূন্য ছিল। ২০০৬ সালে বিজেপি তৃণমূলের সাথে জোট করে, সেখানে তৃণমূলরূপী বিজেপিরা ৩০টা আসন জিতলেও স্বনামে বিজেপির হাত খালিই রয়ে যায়।
২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারের পতন হলেও বামেরা প্রায় ৪০% ভোট পেয়েছিল। এই বছরও বিজেপি ঠনঠন গোপালই ছিল। দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৯১ ছাড়া বিজেপির প্রাপ্ত ভোট সর্বদাই ৫% এর আশেপাশে ছিল, গোটা আশির দশকে RSSকে কার্যত ‘হাফ পার্সেন্টেজে’ নামিয়ে দিয়েছিল CPIM। কিন্তু ২০১৬ সালে এসে তৃণমূল সরকারের অভিভাবকত্বে বিজেপির অভিষেক ঘটে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভাতে, ৩টে আসন নিয়ে।
এর পর ২০২১ তো টাটকা ইতিহাস।
মরাল অফ-দ্যা স্টোরি কী?
১) পশ্চিমবঙ্গীয় রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে সাম্প্রদায়িকতার ভাইরাস ছিলই, CPIM নামের ভ্যাক্সিন ‘ধর্মীয় রাজনীতিকে’ কোমায় পাঠিয়ে রেখেছিল।
২) বামেরা নয়, CPIM এসেছিল বলে জনসঙ্ঘ বা হিন্দু মহাসভা শূন্য হয়ে হারিয়ে গেছিল। এক দশক ধরে ভোট শেয়ারিং ‘হাফ পার্সেন্টেজে’ নামিয়ে দিয়েছিল।
৩) CPIM এর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট ছিল বলে বিজেপি এই রাজ্যে খাতা খুলতে পারেনি বিধানসভাতে।
৪) সুতরাং, বিজেপিকে তাড়াতে CPIM ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
এতে অবশ্য আনন্দিত হয়ে লেঙুড় তুলে নাচার কিছু নেই, অতীতটা অতীতই হয়। লড়াইটা আজকের বাস্তবতাতে লড়তে হবে, তাহলেই আবার বিজেপিকে নিষ্ক্রিয় করে কোমায় পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব। ভাববাদী মধ্যবিত্তের দল হতে গিয়ে কংগ্রেসের মতো বুর্জোয়া দলের সাথে জোট করা, CPI এর উবে যাওয়ার উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। পিছনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন মধ্য মেধার নেতাদের দ্রুত মুক্তি দিয়ে তরুণ লড়াকু মানসিকতার ‘শ্রেণী ও সংখ্যালঘু’ নেতাদের জায়গা দিলে তবেই সেটা CPIM হবে, না হলে আগামী ঠিক তার বিকল্প খুঁজে নেবে, দল রয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায় আর সাইনবোর্ডে।

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...