বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

মোদির জন্মদিন ও Adandia




ক্ষমতায় থাকাকালীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কোনো সর্বোচ্চ নেতা, জনগনণের করের টাকায় নির্লজ্জভাবে নিজের জন্মদিবসকে রাষ্ট্রীয় উৎসবে পরিনত করেছে। গত ১১ বছরে বহু কিছু সয়েছি আমরা, এবারের জন্মদিন পালনও নাহয় সয়ে নিলাম। সমস্যা জন্মদিন পালনে নয়, আমার ব্যক্তিগত তরফ থেকেও মোদিজীর সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।


কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থাকা দেশের প্রতিটি সংস্থায় প্রজাতন্ত্র দিবসের চেয়েও বেশী ধুমধাম করে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের জৌলুশ প্রদর্শিত হচ্ছে অবশ্যই জনগণের টাকায়, আর এই মোচ্ছবে হরির লুঠ করে চলেছে বিজেপির এলি-তেলি নেতা নেত্রীর দল। ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর অর্থাৎ গান্ধী জয়ন্তী অবধি টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলবে এই ধাষ্টামো, প্রতিটি CBSE ইস্কুলে মোদীজির জীবনী নিয়ে সিনেমা দেখানো হবে, যার পোষাকী নাম দেওয়া হয়েছে ‘সেবা পাক্ষিক’। দেশের প্রতিটি সংবাদ পত্র জুড়ে পাতার পর পাতা মোদীজির জন্মদিন পালনের বিজ্ঞাপন। দেশের তাবড় সেলেব্রিটিরা হুলিয়ে ভিডিও বার্তায় জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে-

এই ধরণের জনদিন পালন ইতিহাসে দুর্লভ হলেও নজিরবিহীন নয়। বিজেপি RSS কাদের অনুশরন করছে সেটা অতীতের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যায়। চলুন দেখি ওই ধরনের কিছু উদাহরণ-


আডলফ হিটলার। ২০ এপ্রিল “Hitler’s Birthday” ছিল নাৎসি ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে বড় উৎসবগুলোর একটি। জার্মানির সব স্কুল, অফিস, দোকানপাটে ছুটি থাকত। বার্লিনে বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ, শিল্পকলা প্রদর্শনী, সংগীতানুষ্ঠান হতো। হিটলারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে যুব সংগঠন (Hitler Youth) বিশেষ মিছিল করত। ১৯৪৪ সালে হিটলারের শেষ জন্মদিনেও গোটা জার্মান রেডিওতে তাকে উদ্দেশ্য করে শুভেচ্ছা প্রচারিত হয়েছিল

বেনিতো মুসোলিনি। ২৯ জুলাই “Duce Day” নামে পরিচিত ছিল। ফ্যাসিস্ট দলের নেতারা ও নাগরিক সংগঠনগুলো বিশাল জনসমাবেশ করত। স্কুল ও সরকারি দপ্তরে বক্তৃতা, কবিতা আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদি আয়োজন হতো। মুসোলিনিকে “রোমের পুনর্জন্মকারী” হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। শিশু ও কিশোর সংগঠন (Opera Nazionale Balilla) বিশেষ কুচকাওয়াজ করত

 

উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসক কিম ইল-সুং ও কিম জং-ইল, জাপানের তোজো, এদের জন্মদিনেও বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ, আতশবাজি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গণনৃত্য অনুষ্ঠিত হতো। রাষ্ট্রীয় ছুটি, সারা দেশে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ


ক্রমশ যত দিন যাচ্ছে, মোদীজি মরিয়া হয়ে উঠছে আদানির হাতে দেশের সবটা তুলে দেওয়ার জন্য। মোদীজী পারলে গোটা দেশটাই আদানির নামে লিখে দেয় সংবিধান সংশোধন করে। মোদীজির প্রতিটি বিদেশ সফর ছিলো মূলত আদানির দালাল বা ভদ্র ভাষায় ‘ডিল ম্যানেজার’ হিসাবে। মোদীজীর বিদেশ সফর থেকে ফেরার পর সেই সব দেশের সর্বত্রই ব্যাবসার নামে খুঁটি গেঁড়েছিল আদানি গোষ্ঠী, অভ্যাসমত চুরিচামারি করতে গিয়ে- সবকটা দেশ থেকে লাথ খেয়ে, ব্ল্যাকলিস্ট হয়ে, মামলার সম্মুখীন হয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে পালিয়ে এসেছে। প্রতিটা ক্ষেত্রে বিপুল লোকসানের বোঝা, মোদীজি সেই লোকসানের দায় মেটাতে ভারতের জনগণের সম্পদ তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মিটিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দেশের সম্পদের হরির লুঠের জন্যই, দেশজুড়ে প্রভু আদানি কর্তৃক এই জন্মদিনের লীলা সঙ্কীর্তন আয়োজন চলছে স্বমস্বরে, পারফেক্ট PR Stunt.

ওদিকে বিহারের ভাগলপুরের পীরপৈন্তিতে, মাত্র ১ টাকায় ১০৫০ একর জমি লিখিয়ে নিয়েছে ৩৩ বছরের জন্য। যে জমির বাজারমূল্য বর্তমানে কয়েক হাজার কোটি টাকা, বিহারের ডাবল ইঞ্জিন সরকার জনগণের করের ৮০০ কোটি টাকা খরচা করে সেই জমি স্থানীয়দের থেকে নানান অসদুপায় অবলম্বন করে অধিগ্রহন করেছে। সেখানে প্রায় ১০ লাখ আম লিচু জাতীয় ফলের গাছ রয়েছে, সেই জমিকে সরকারীভাবে অনুর্বর দেখিয়ে আদানির ‘পাওয়ার প্ল্যান্ট’ গড়ার জন্য মনোনীত করেছে।
“এক পের মা কে নাম”, এর আগেও অপারেশন সিঁদুরের সময়েও ফটোগ্রাফার দিয়ে শ্যুটিং করিয়ে গাছ লাগাবার সে কী বিশাল বিজ্ঞাপন। ওদিকে ১০ লাখ ‘পের’ আদানির নামে কেটে উড়িয়ে দিচ্ছে। গোটা দেশ জুড়ে কয়লা খনি, বিভিন্ন আকরিকের খনি দখল করেছে আদানি, সেই সমস্ত স্থানে- গারে পেলমা, গিধমুরি পাটুরিয়া, কেনতে এক্সটেনশন, পারসা পূর্ব ও কান্তবসন, সুলিয়ারি ব্লক, ওয়াশারী, বাইলাডিলা, কুর্মিটার অঞ্চল, সর্বত্র নির্বিচারে হেক্টরের পর হেক্টর জঙ্গল কেটে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আদানির লুটের এখানেই শেষ নয়, বার্ষিক ১ টাকা ভাড়ার জমিতে সরকারি টাকায় গড়ে উঠবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বিহার সরকার এর জন্য ইতিমধ্যেই ২১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। বিহারের কয়লাতে পাওয়ার প্ল্যান্ট চলবে, আর আদানি সেই প্ল্যান্টের বিদ্যুৎ বিহারের জনগণকে বিক্রি করবে ৬ টাকা ইউনিট দড়ে, শুধুমাত্র কেন্দ্রটির পরিচালনা করার বিনিময়ে। এই মুহুর্তে রাষ্ট্রীয় কয়লা প্রায় বিনামূল্যে উত্তোলন ও পরিবহণ করে দেশজুড়ে ৮টি পাওয়ার প্ল্যান্ট চালাচ্ছে আদানি গোষ্ঠী, সেগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ৬টার বেশী প্রতি ইউনিট হিসাবে বিক্রি করছে আদানি। আচ্ছা, দেশটার নাম ইন্ডিয়া বদলে দিয়ে আদানিন্ডিয়া রাখলে কী খুব বিশ্রী শোনাবে?

আগামীতে দেশে সরকার উল্টালে আদানির ১ টাকাও লোকসান নেই, আদানি বিদেশে পালাবে, সিম্পল সুত্র। কারন আদানি জনগণের সম্পত্তি দখল করে সরকারের থেকে লিজ বা দীর্ঘমেয়াদি ভাড়ায় নিয়ে। হয় সেই ভাড়া বিনামূল্যে অথবা বার্ষিক ১ টাকা বা ওই জাতীয় নাম মাত্র মুল্যে। আদানি দেশের প্রতিরক্ষা, পরিবহণ ও খনি অঞ্চলকে টার্গেট করেছে। রেলের ফ্রেট করিডর, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর গুলো ক্রমশ গ্রাস করেছে। আদানি যে লুণ্ঠনটা করছে, সেটা কলোনিয়াল যুগের ইংল্যান্ডের ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও করতে পারেনি। দেশের মাটিতে আদানি নিজের ১ পয়সাও স্থাবর সম্পত্তিতে ইনভেষ্ট করেনি, সেই সব ইনভেষ্ট বিদেশে। মোদী সরকার উল্টালে আদানির কোন সম্পত্তিই পাবলিক দখল করতে পারবেনা, যেগুলোতে আদানি জোঁকের মত রক্ত চুষছে, সেগুলো মোদীজির কৃতিত্বে পাওয়া, ১০০% জনগণের সম্পত্তি।

জনার্দন চৌধুরী, নামটা অপরিচিত, তিনি বর্তমানে Advisor – PSP & Hydro at Adani Green Energy, এটাই তার বিগত ৯ বছরের পেশা। এই ব্যাক্তিকে মোদী সরকার ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের তরফে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার জন্য- পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র দেবার কমিটিতে বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়। বাকি ৬ সদস্যের মধ্যে ইনিই ৪ জনের নাম সুপারিশ করেন, যথারীতি সেই সুপারিশ গৃহীত হয়। পরবর্তীতে এই কমিটি প্রায় ১৯টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ১৮টিই ‘আদানি গ্রীন এনার্জি’র হাতে তুলে দেয়।

যেমন, ৮৫০ মেগাওয়াট রাইওয়াদা প্রকল্প, ১৮০০ মেগাওয়াট পেডাকোটা, 2100 মেগাওয়াট পাটগাঁও, 2,450 মেগাওয়াট কয়না-নিভাকানে, 1500 মেগাওয়াট মালশেজ ঘাট ভোরান্দে এবং 1500 মেগাওয়াট তারালি। কি অসাধারণ দুর্নীতিমুক্ত সিস্টেম, প্রথমে আদানির বেতনভুক কর্মচারীকে সরাসরি সরকারি কমিটির মাথায় বসিয়ে দাও- যে কমিটি প্রকল্পের অনুমোদন দেবে। বাকি পদগুলোতেও পারলে নিজের লোক বসাও, নাহলে যারা আছে তাদের কিনে, একান্তই সে সব না হলে ভয় দেখিয়ে বাধ্য করো। ব্যাস, সরকারীভাবে সমস্ত টেন্ডার ‘মালিকের’ নামে লিখিয়ে নিতে আর কি চায়- বিশ্বের আর কোথাও এভাবে দিনে ডাকাতি করে সরকারি সম্পদ লুন্ঠনের ইতিহাস রয়েছে?

আদানি খাবে আর আম্বানি আঙুল চুষবে? দেশে windfall tax নামে এক ধারনের কর ব্যবস্থা চালু ছিল। উইন্ডফল ট্যাক্স হল লাভের উপর ‘উচ্চ করের হার’ যা একটি কোম্পানির আকস্মিক লাভের উপরে ধার্য হয়। রাশিয়ার সস্তা তেল কিনে আম্বানির রিলায়েন্সের এই ধরণের ‘আকস্মিক’ এলোমেলো পরিমানে লাভের অঙ্ক ফুলেফেঁপে উঠে। ব্যাস আর কি, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মোদীজি সেই ‘উইন্ডফল ট্যাক্স’ আইন বাতিল করে দেয়, শুধু তাই নয়- আকস্মিক লাভকে সম্পূর্ণ ‘করমুক্ত’ ঘোষণাও করে দেয়। পাশাপাশি মোটাভাইকে ভবিষ্যতের সুরক্ষা দিতে, নতুন আরেক আইন প্রণয়ন করা হয়। যেখানে বলা হয়েছে- এই কোম্পানির পূর্ববর্তী ‘আকস্মিক লাভের’ উপরে আগামীতে কখনও অন্য কোনো সরকার কর দাবী করতে পারবেনা।

শরদ কুমার জৈন, IIT রুরকি থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার। কেন্দ্রীয় রিভার ভ্যালি প্রোজেক্টের মুখ্য কর্তা ছিলেন ২০১৭ সালে। এনার অধীনেই ‘কেন-বেতোয়া’ প্রকল্প ছারপত্র পায়। কেন-বেতোয়া সংযোগ প্রকল্প (KBLP) হল একটি নদী-আন্তঃসংযোগ প্রকল্প, যেটা মধ্যপ্রদেশের ‘কেন নদী’র উদ্বৃত্ত জল যমুনার উপনদী ‘বেতোয়া নদীতে’ স্থানান্তর করার জন্য তৈরি করা হয়েছিলো। ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা কর্তৃক অনুমোদিত এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল খরাপ্রবণ বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা করা। প্রকল্পের অধীনস্ত দৌধন বাঁধ, সংযোগ খাল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আনুমানিক ব্যয় ৪৪,৬০৫ কোটি টাকা।

এই প্রোজেক্ট সরকারিভাবে ন্যাশানাল ওয়াটার ডেভলপমেন্ট এজেন্সি কনডাক্ট করছে। বর্তমানে এই প্রোজেক্টের অধিকর্তা সেই শরদ কুমার, যিনি ছাড়পত্র দিয়েছিলেন। তার সাথে কোন প্রভু জড়িত, গুগুল করলেই পেয়ে যাবেন। একই ভাবে ‘সরিস্কা টাইগার রিজার্ভ’ এর বাউন্ডারি দেওয়ার কাজ- যিনি সরকারের হয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে অনুমতি দিয়েছিলেন, তিনিই পরবর্তীতে টেন্ডার নিয়ে কাজের সেই বরাত পান। আরো পরে সেই তিনিই আবার সরকারী ভাবে সেই টেন্ডারের অডিটের বরাত পান। মোদী সরকারের এমন ‘টেন্ডার’ চুরির উদাহরণ দিতে বসলে শেষ হবেনা। গোয়া, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, বিহার, আসাম- দেশের সর্বত্র।

সর্বত্র যখন ঘটছে, গুজরাটই বাদ যায় কেন। বরোদার কাছে দাহোদ শহর, এটি গুজরাটের সবচেয়ে দরিদ্র শহর হিসাবে পরিচিত। যেখানকার মানুষ দুবেলা রুটিরুজির জন্য উদভ্রান্ত, গুজরাত সরকার সেখানে বিমানবন্দর তৈরি করতে নোটিফিকেশন জারি করে জমি অধিগ্রহন করে। এরপর আনন্দী বেন প্যাটেলের ডাবল ইঞ্জিন সরকার উন্নয়নের নামে সেই জমি- ১ টাকা টোকেন মূল্যে আদানি এবং আম্বানিকে উপহার দিয়ে দেয়।

একই ভাবে ‘স্ট্যাচু অফ ইউনিটি’ বানানোর জন্য গুজরাত সরকার তফসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের জমি নামমাত্র মূল্যে জবরদখল করে। সেই জমির বর্তমান সিংহভাগ অংশের দখল আদানি ও আম্বানিদের হাতে, ১ টাকা টোকেনেই সেই জমি ৫১ বছরের লিজে দিয়েছে বিজেপি সরকার, বর্তমানে ব্যক্তিগত রিসর্ট আর বাংলো তৈরি করেছে কর্পোরেট আর RSS বিজেপির নেতা মন্ত্রীরা। সমগ্র গুজরাত জুড়ে এমন অনেক উর্বর জমিকে অনুর্বর ঘোষণা করে সেগুলো পুঁজিপতি হাঙরদের মুখে তুলে দিয়েছে সরকার। সেখানকার স্থানীয় মানুষদের স্বানান্তরিত করেছে কচ্ছের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে চাষবাসের কিছুই নেই।

গোদি মিডিয়ার প্রায় সবটাই আদানি আম্বানিদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন, অবশিষ্ট টুকু পমেরিয়ান অর্নব গোস্বামী বা বিজেপির সাংসদ সুভাষচন্দ্রের মত পরজীবীদের। তারপরেও এই সব দুর্নীতির খবর বাইরে প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে- ফ্রিল্যান্সার সাংবাদিক ও সোস্যালমিডিয়ায় আমার আপনার দৌলতে। তাই আদালতের কিছু ‘কিংবদন্তি’ বিচারকদের বদান্যতায় মোদী সরকার আইন করে খবর প্রকাশ দাবিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় কোনো খামতি রাখছেনা।

উত্তর-পশ্চিম দিল্লি জেলা আদালতের সিনিয়র সিভিল জজ অনুজ কুমার সিং, গত ৬ সেপ্টেম্বর আদানি এন্টারপ্রাইজেসের দায়ের করা মানহানির মামলায় ‘একতরফা’ আদেশে জারি করেছে। এই ক্ষেত্রে জড়িত কোনো সাংবাদিক বা কোনো ব্যাক্তির থেকে আদালত কিচ্ছুটি শোনেনি, আদানির পক্ষে একতরফা আদেশ জারি করে দিয়েছেন মাননীয় বিচারক। বিচারব্যবস্থা আর গণতন্ত্রের কী শোচনীয় গর্ভপাত।

আর সেই রায়ের উপরে ভিত্তি করে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেল আর সোস্যালমিডিয়া একাউন্ট হোল্ডারকে রাষ্ট্রীয় ফরমান পাঠিয়ে আদেশ করেছে, আদানি গ্রুপের নাম উল্লেখ করা ১৩৮টি ভিডিও এবং ৮৩টি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট সরিয়ে ফেলতে হবে বিনা প্রশ্নে। দ্য ওয়্যার, নিউজলন্ড্রি, রবীশ কুমার, অজিত আঞ্জুম, ধ্রুব রাঠি, আকাশ ব্যানার্জি ওরফে দেশভক্ত, পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা, রবি নায়ার, আবীর দাসগুপ্ত, অয়স্কান্ত দাস এবং আয়ুশ যোশী সহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের নামে কমপক্ষে ৭ টি করে মামলা দায়ের হয়েছে।

তারপরেও আমরা আদালতের উপরেই ভরষা করব, গণতন্ত্রেই আস্থা রাখব। স্বর্গীয় বিচারক লোয়া প্রাণ দিয়ে বিচারব্যবস্থার সত্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। বিনা বিচারে জেলবন্দী IPS সঞ্জীব ভাট মেরুদন্ডী আমলার সত্যতার অত্যতম প্রতীক। আদানির রায় দেওয়া বিচারক অনুজ কুমার সিং যেমন সত্য, সেই একই ‘নর্থ-ইষ্ট ডিস্ট্রিক্ট দিল্লি’ কোর্টের আরেক বিচারক মাননীয় ‘প্রবীণ সিং’ও সত্য।

২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা মামলাতে সর্বশক্তিমান অমিত শাহ ও মিনি বিশ্বপ্রভু যোগীর পুলিশের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছেন বিচারপতি প্রবীণ সিং। দাঙ্গা সম্পর্কিত পুলিসের দায়ের করা পৃথক পৃথক ১১৬ মামলার রায় ঘোষণা করতে গিয়ে ৯৭টি মামলার অভিযুক্তদের (পড়ুন মুসলমানদের) বেকসুর খালাস করে দিয়েছেন। রায়ের কপিতে লেখা রয়েছে- পুলিশ কমপক্ষে ১২টি মিথ্যা সাক্ষী যোগার করেছিলো, এবং ৯৭টা মামলাই মিথ্যা বানোয়াট নথির ভিত্তিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ‘মুসলমানদের’ ফাঁসিয়েছিল যোগী-শাহ এর প্রশাসন।

“There has been an egregious padding of evidence by the IO and this has resulted in serious trampling of the rights of the accused who have been probably charge sheeted only in order to show that this case is worked out… Such instances lead to serious erosion of the faith of the people in the investigating process and the rule of law.”

সুতরাং, মোদী আদানি মিথোজীবিতা যেমন সত্য, তেমন সংবিধানকে রক্ষাকারী আদালতও সত্য, অল্প কিন্তু বেঁচে আছে। এই ঘোলাটে রকমের পরিস্থিতিতে মোদীজির জন্মদিন পালনের মত ইভেন্ট আয়োজন না করলে কীভাবে চাপা দেবে এগুলো? আগামীতে আমি বা আমার মত নগণ্য পাতি কলমচিরাও আদালতের সমন পাওয়ার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, জাইরে বলসেনেরো আর নরেন্দ্র মোদি অর্থাৎ বর্তমান পৃথিবীর একনায়ক চতুর্ভুজের ফ্যাভ ফোরের একজন ৪৭ বছর জেলের মাধ্যমে অস্তাচলে। দ্বিতীয় জন ইরানের মার খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। বাকিরা ট্যাক্সের কর্মবৃদ্ধির খেলাতে নেমে দেশের মানুষকে তুর্কি নাচন নাচিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব ও টিকিয়ে রাখতে চাইছে

পুনশ্চঃ- এই সব দুর্নীতি নিয়ে মমতা ব্যানার্জী নিজে বা দিল্লিতে থাকা তার ৪০ জন সাংসদের কেউ কোনো ‘রা’ কেটেছে বলে বদনাম দিতে পারবেনা। এরা চোরে চোরে মাসতুতো ভাই নয়, এরা RSS তুতো আপন ভাই। আপনার কি, আপনি তো দুধেল গাই কিম্বা আগে রাম পরে বাম তত্ত্বের ‘সনাতনী’ সৈনিক।


#হককথন

মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

এলোমেলো ঘুড়ি


সুতো ছিঁড়ে যাবার পর ঘুড়িটা ভাবলো সে স্বাধীন, আজ নিজের খুশিতে উড়ছে। যতক্ষণ উড়লো, আনন্দের আতিসায্যে যে সে ভুলে গেল- এটা ছিল বহমান বাতাসের দয়া। 

দয়া খুবই সাময়িক, সামনের জনের উপরে নির্ভরশীল। ফলত ঘুড়িটা আর কোনোদিন আকাশ দেখলো না। গোঁত্তা খেয়ে মুখের বলে মাটিয়ে পরে ছিন্নভিন্ন হয়ে পরে রয়েছে কোথাও। অথচ সুতো ছিঁড়ে না গেলে বা দিলে সে  আবার পরদিন আকাশে পৌঁছে যেতো। আসলে লাটাই, যে সুরক্ষা দিতো- তাকেই বন্ধন বা শৃঙ্খলা মনে হয়েছিলো ঘুড়ির। পরিমিত ও বন্ধনের বাঁধনে থাকাটাকে পরাধীনতা মনে হয়েছিলো ঘুড়ির। সুতো কেটে দেবার মাঝে জীবনের স্বার্থকতা মনে করেছিলো।

আসলে দিনের শেষে সকলেই একটা সুতোর বাঁধন দিয়ে লাটাই নামের সংসারে বেঁধে থাকতে চায়। যেখানে শাসন থাকবে, মানা থাকবে, আদেশ, নিষেধ থাকবে। তবে সেখানে ভালবাসা শব্দটা মর্যাদা পাবে। সুতো কেটে গেলে কেউ কারো খোঁজ নেবেনা আর- কখনও। 

আমরা আকাশে উঠলে আগে লাটাইকে ভুলে যায়, আর সুতো কেটে স্বাধীন হতে গিয়ে- অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলি। ন্যংটা লোভ একাকিত্ব আর সামাজিক পঙ্গুত্ব দেয়। জুড়ে থাকার মাঝে যে আসল সুখ- তা আমরা হারিয়ে বুঝি।

রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

IND v PAK Asia Cup 2025

 





আপনি খেলা আর রাজনীতিকে এক পাত্রে রেখে গুলিয়ে দেবার মত ভুল করেননা। স্বাধীন দেশে আপনার সেই অধিকার আছে

স্বাধীন দেশে মোদী সরকার আজ পেহেলগাঁও এর রক্তক্ষয়ী হামলা ভুলে গিয়ে, কর্পোরেট অর্থের স্বার্থর কাছে নরসংহারের শোক ভুলিয়ে দিতে চাইছে। অথচ ১৯৮৬ সালের এশিয়া কাপ ভারত বয়কট করেছিলো। এই বছরই পাকিস্তান হকি দল আনুষ্ঠানিকভাবে পুরুষদের হকি এশিয়া কাপ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে, ভারতের বিরুদ্ধে তারা খেলেনি। সিদ্ধান্ত খেলোয়ারেরা নেয়না, সিদ্ধান্ত ক্রিকেট বোর্ড নেয়না, সিদ্ধান্ত সরকার নেয়। সরকারে মোদী-শাহ আছে। সিদ্ধান্ত ICC নেয়, সেখানেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেকুপুষু সন্টুমনাই বসে আছে

সম্পূর্ণভাবে বিজেপির ইচ্ছাতে এই খেলা হচ্ছে, জাতির আবেগের সাথে প্রতারণা করে।

এদিকে RSS এর MP রাকেশ সিনহা টিভিতে বলছে- মোদিজী বলেছিলেন, রক্ত আর নদীর পানি একসাথে বইবেনা, ক্রিকেট খেলবেনা এমনটা বলেননি। ফলে BCCI ভারত বনাম পাকিস্তান ম্যাচ খেলতে বাধ্য। বীরেন্দ্র সেহবাগের মত প্রি-চাড্ডি ক্রিকেটারকে দিয়ে 'রগ রগ মে ভারত' বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে টিভিতে। আজকাল কোন হামলাতে জঙ্গির পরিচয় জানা যায়না, তারা শুধু পাকিস্তানি হয়, পাকিস্তানের পরিচয়পত্র পকেটে রেখে হামলা করে, যাতে সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলতে পারে। পাকিস্তান না হলে বিজেপির রাজনীতি হালে পানি পায়না

দেশপ্রেমের দায় আমার আপনার, আদালতের মতে দেশপ্রেমের দায় সিপিএমের, দেশপ্রেমের দায় উমর খালিদের, তাই বিনা বিচারে ৫ বছর ধরে জেলে সে পচবে। বিজেপি বা RSS এর সে সবের দায় নেই। তাদের পকেটে লাভের টাকা এলেই হবে, ততক্ষণ জাতীয়তাবাদী ভাবনা আপনি আপনার পায়ুপথে চালান করে দিন। বিজেপি ও RSS সেটাই করেছে, পুরুষেরা পায়ুপথে, মহিলারা সম্ভবত যোনীপথে। এগুলো আবার ওরা সেদিন বের করে আনবে, যেদিন ওদের প্রয়োজন হবে। আপাতত DP World আর Wonder Cement কে পয়সা কামাবার বন্দোবস্ত করে দেওয়াটাই আদর্শ স্বদেশপ্রীতি ও আনুগত্যের চেতনা। এটাই মোদীর ভারত

বিনোদন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আমাদের বিবেক বা মনুষ্যত্ব তো স্থায়ী একটা বিষয়। শহীদ নিরপরাধ সহ নাগরিক, শহীদ সৈন্যদের সম্মানের চেয়ে বড় কোনও ম্যাচ আছে? আগামীতে শত শত ম্যাচ আসবে যাবে, সময় হলে সেসব অবশ্যই দেখব, কিন্তু আজকে নয়

আজকে প্রতিটা বল, প্রতিটা শট, প্রতিটা বাউন্ডারি, প্রতিটা বিজ্ঞাপন- যখন আপনি আমি টিভিতে বা মোবাইলের স্ট্রিমিং এ লাইভ দেখব, বিজ্ঞাপন থেকে আয় হবে, ফুলে ফেঁপে উঠবে কোষাগার। সেই আয় এর একটা অংশ পাকিস্তান যাবে। সেই অর্থ বুলেট হয়ে আগামীতে গেঁথে যাবে সীমান্তের তীরবর্তী ভারতীয় নিরপরাধ নাগরিকদের গায়ে, প্রাহারারত সেনাদের কপালে

পেহেলহগামের জঙ্গিরা বলেছিলো- মোদীকে গিয়ে বলে দিবি। মোদী শুনেছে, তাই তো এশিয়া কাপে পাকিস্তান ম্যাচের আয়োজনে সম্মতি দিয়েছে। রক্তের বদলা রক্তে নেওয়া যায়নি, অপারেশন সিঁদুর ট্রাম্পের ধমকিতে হেগে ফেলে সেনাকে থামিয়ে দিয়েছিলো। এখন ক্রিকেটের মাঠে 'লৌড়েন ভোজ্যম' প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছে।

আপনি খেলা আর রাজনীতিকে এক পাত্রে রেখে গুলিয়ে দেবার মত ভুল করেননা। আমি করি। তাই এশিয়া কাপ বয়কট করাটা আমার নিজের কাছে দেশপ্রেমের নমুনা। বাকীটা আপনার সদবুদ্ধি।

জয় হিন্দ


#হককথন

#bycottindvspak
#IndvsPak

শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

মুজরা সম্রাটের মনিপুর ভ্রমণ

 



রাষ্ট্রপতি শাসন জারিকৃত মনিপুরে, ১০ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে রেখে, ১৬টা জেলার ১৩টাতে অঘোষিত কার্ফিউ ঘোষণা করে, ৫৪ টারও বেশী মহকুমার যানবাহন সহ রাস্তাঘাট বন্ধ রাখে, ইস্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় দোকানপাট জবরদস্তি বন্ধ করিয়ে, স্থানীয় জনজীবন সমস্তটা স্তব্ধ করে- বুলেটপ্রুফ বিদেশী গাড়ি বহর নিয়ে, কাঁচ বন্ধ রেখে, AC কোচ থেকে রোড শো করে- ভাঁড় মহাশয়, মণিপুরের মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে এসেছেন আজ।

২০২৩ থেকে মণিপুরের সমস্যা কী নিয়ে ছিলো জানেন?

যেকোনো মূল্যে উপজাতিদের উচ্ছেদ করে তাদের জমি কেড়ে নিয়ে সেখানকার খনিজ সম্পদ আদানির হাতে তুলে দেওয়া। হ্যাঁ, এটুকুই, একমাত্র এটাই।
জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তথ্য মতে, মণিপুরের কুকি অধ্যুষিত জেলা গুলোতে প্রচুর পরিমাণে পেট্রোলিয়াম এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদ মজুদ রয়েছে। কুকি সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ যে- উপত্যকাবাসী ও বিজেপির মদতে থাকা 'মেইতেই' সরকার তাদের সবকিছু কেড়ে নিতে চায়।
সাহেব আজকাল যেখানেই যান, তার আগে ফেউ এর মত Adler Industrial Services এর ডিরেক্টর অশ্বিনী বৈষ্ণব পৌঁছে যায় রেলের নতুন প্রোজেক্ট নিয়ে। যারা হাওড়া সাউথ লাইনে যাতায়াত করেন, তারা জানেন রেলের হাল আসলে কতটা যন্ত্রণাময়। যেগুলো আছে সেই রেল গুলোই সামলাতে গিয়ে হেগে ফেলছে 'শিক্ষিত রেলমন্ত্রী', ওদিকে ‘বৈরাবি-সাইরাং’ নামে নতুন প্রকল্প ঘোষণা করে ভক্তদের গান্ডু বানানোতে কোনও খামতি নেই। রেলের ফ্রেট করিডরের অধিকাংশই ইতিমধ্যে DP World ও আদানিকে বেচে দিয়েছে, যারা আগামীকাল অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে পাকিস্তান ম্যাচ ঘটানোর মূল হোতা।

গত দুই বছর ধরে ৩০০ এর বেশী মানুষ প্রকাশ্যে খুন হয়েছে, ২০০০ এর বেশী মানুষের অঙ্গহানি ঘটেছে, কেউ খোঁড়া, কেউ অন্ধ, কারো হাত নেই, কারো চোয়াল নেই, তো কারো শরীরে গুলি বিঁধে রয়েছে। ৫০০০ এর বেশী মানুষ আহত, ১৫০০ এর বেশী নিখোঁজ মানুষ ও ৯০,০০০ এরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ গৃহহীনের দলে নাম লিখিয়ে- ত্রান শিবিরের আশ্রয়ে কোনো মতে বেঁচে আছে।

এটা কোনো আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বগত সমস্যা ছিলোনা, না ছিলো হিন্দু-খ্রিষ্ট্রান এর জাতি লড়াই, না ছিলো মায়ানমার থেকে আসা অবৈধ অভিবাসন সমস্যা, না এটা কোনো মাদক সংক্রান্ত সমস্যা ছিলো, এই ধ্বংসাত্মক সংঘাত ছিলো আদানির স্বার্থে তৈরি করা- বিজেপি সৃষ্ট নারকীয় সন্ত্রাস। আর মূল উদ্দেশ্য ঢাকতে নানান মিথ্যা ন্যারেটিভ সেট করা হয়েছিলো বিজেপির প্রোপ্যাগান্ডা মেশিনারি দিয়ে।।
মণিপুর হিংসা ইচ্ছাকৃতভাবে উস্কে দেওয়া একটা পরিকল্পিত দাঙ্গা। যেটা পরিচালনা করেছিলো ‘মেইতেই’ ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। মেইতেই-রা মূলত হিন্দু, এবং তারা অধিকাংশই ইম্ফল লাগোয়া সমতল ও উপত্যকা অঞ্চলে বসবাস করে। মণিপুরের মাটির তলায় আবিষ্কৃত বিপুল প্ল্যাটিনাম মজুদ রয়েছে। সেই খনি যেকোন মূল্যে আদানির হাতে তুলে দিতেই এই নরসংহার যজ্ঞ ছিলো।
যে অংশে প্ল্যাটিনামের মজুদ রয়েছে, সেটা পাহাড়ের আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাসের জমিতেই সীমাবদ্ধ। কুকি জনগোষ্ঠীর গাংতে, হমার, পাইতে, সিমতে, সুক্তে, থাদৌ, ভাইফেই, জো এবং কিছু ছোট উপজাতির বাস সেখানে। এছাড়া নাগা উপজাতির আঙ্গামি, কাবুই, কাঁচা নাগা, মাও, মারাম, পৌমাই, সেমা, তাংখুল নামের উপজাতিদেরও বাস ওই অঞ্চলে।
একটা গোটা প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে, উপজাতি পরিবারগুলি গৃহহীন, সেই অঞ্চলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শ্মশানে। অনিশ্চিত ভবিষ্যত আর অপরিমাপযোগ্য ক্ষতির সাথে লড়াই করা মানুষগুলোর জীবনে আজও শান্তি অধরা। সাহেব সেই মানুষগুলোর কাছে যায়নি, তাদের ব্যাথার উপসম হয়ে যন্ত্রণার কথা শোনেননি, উনি কিছু ভাড়াটে লোক দাঁড় করিয়ে আত্মরতি নিয়েছেন কেবল, যাতে গোদি মিডিয়া এই ‘আত্মরিতির’ এডিটেড অংশ সারাদিন টিভিজীবীদের গেলাতে পারে, ভক্তদের অর্গাজম দিতে পারে। স্থানীয় উপজাতিরা তার সামনে নাচতে রাজি না হওয়ার, মুজরা সম্রাটের উপজাতি নৃত্য দেখা হলোনা এ যাত্রায়।
আজকে মাননীয় 'লৌড়েন ভোজ্যম' আসলে ‘জো’ হয়েছে কিনা দেখতে এসেছিলেন- কতদিনে প্রভু আদানির হাতে জমিগুলো তুলে দিতে পারবেন, তার রেইকি করে গেলেন নিজে, সরেজমিনে।

শুক্রবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

দেবত্ব



দেবত্ব কাকে বলে জানেন!

যখন বিনা স্পর্শে কোনো কিছু আপনার আত্মাকে ছুঁয়ে যায়, যখন মোহিনীশক্তি আপনার ব্যক্তিত্ব, হৃদয়ের অনুভূতি বা চারিত্রিক গুণাবলীকে তন্ময় করে দেয়, তখন দেবত্বের জন্ম হয়।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঈশ্বর হলো ভক্তি ও আত্মিক যোগের মিলন, আর ভালবাসা সেই চিরন্তন সত্তা থেকে জন্মানো শর্তহীন ও অপরিবর্তনীয় অভ্যাস, যা ত্রুটি বা দূরত্বের কারণেও স্থির থাকে। যার পরিবৃত্তি আছে কিন্তু বিনাশ নেই।
ঈশ্বরের প্রকাশ তাঁর সৃষ্টিতে, মুগ্ধতাপুর্ণ ভালবাসা তাই শ্রেষ্ঠ শিল্প। সেই শিল্পকর্মই আসল সৌন্দর্য, যা সত্যতে প্রতিফলিত আমাদের অন্তরে, এটাই ঈশ্বরের গুণাবলী। সৃজনশীলতা যখন আরাধনা হয়ে উঠে, শিল্প তখন উপাসনায় পর্যবাসিত হয়ে দেবত্বে উন্নীত হয়।
প্রেম বেঁচে থাকে মুগ্ধতায়, যা ফুরালে শব্দেরা চুপপাখি হয়ে যায় নিঃশব্দে হারিয়ে খোঁজে অনুরাগের অতিবাহন। প্রেম হলো আবেগ, ঈশ্বর হলো অনুভূতি, দুই এর মিশেল হলো দেবত্ব।

বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

ছাত্র রাজনীতি ও প্রাসঙ্গিকতা


রাজনীতি, আমাদের জীবন ও মৃত্যুর মাঝে যা কিছু আছে সেই সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটা শেখার জন্য কোনো নির্দিষ্ট পাঠশালা না থাকলেও, কলেজ জীবনের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলই আগামী প্রজন্মের মনে সুপ্ত রাজনীতির অঙ্কুরকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। পরবর্তীতে যখন এই প্রজন্ম প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আসে, দলমত নির্বিশেষে গোটা সমাজ একটা শিক্ষিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব পায়।

গুরুকুল ভারতীয় উপমহাদেশের আদি শিক্ষাব্যবস্থা। পুরাকালে বেদবিদ্যার সাথে জড়িত ব্রাহ্মণরা- বৈদিক শিক্ষা বিতরণের জন্য গুরুকুল পরিচালনা করতেন। এই ঐতিহ্য তৎকালীন বেশিরভাগ শাসকই অব্যাহত রেখেছিলেন এবং প্রাচীন ভারতের প্রায় সর্বত্র এমন গুরুকুল পরিচালিত হওয়ার বহু শিলালিপি পাওয়া যায় প্রামান্য হিসাবে। এই ধরনের গুরুকুলের উন্নত রূপগুলি ছিল তক্ষশীলা, নালন্দা, বিক্রমশীলা এবং ভাল্বী বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। ধর্মীয়, সামাজিকতা, জ্ঞান, বিজ্ঞানের সাথে সাথে রাজনৈতিক শিক্ষা প্রদানের জন্য গুরুকুলই ছিলো বৈদিক যুগের একমাত্র ঐতিহ্য, যার মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করা হত রাজপুত্রকেও। ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ এবং মহাভারতে উল্লিখিত কিছু বিখ্যাত ঋষি বা গুরুও গুরুকুল পরিচালনা করতেন। রাম এবং কৃষ্ণ যথাক্রমে বশিষ্ঠ এবং সন্দীপনীর কাছে গুরুকুলে শিক্ষালাভ করেছিলেন। এখানেই তারা রাজনীতির পাঠও শিখেছিলেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী যুগের একদম শুরুতে- ব্রিটিশ ও মার্কিন রাজনৈতিক আদলে গড়ার প্রচেষ্টা ছিলো আমাদের খিচুড়ি রাজনৈতিক সমাজকে। কিন্তু যে দেশে প্রতি ৫০ কিমিতে ভাষা বদলে যায়, খাদ্য সংস্কৃতি বদলে যায়, জাতপাতের অঙ্কে সমস্যার মূল ইশ্যু বদলে যায়, সেখানে আঞ্চলিক বাধ্যবাধকতা এসেই যায়। তখন আর একে নির্দিষ্ট কোনো কপিবুক স্টাইলে ব্যাখ্যা করা যায়না, নিজশ্ব পরিভাষা তৈরি হয়ে যায়। এই আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বুঝতে গেলে সেখানকার মানুষের সাথে একাত্ম হতে হয়।

সবচেয়ে ভালো হয় স্থানীয় হাতে রাজনীতির ভারটা সমর্পিত হলে, বাইরে থেকে কাউকে এনে রাতারাতি নেতা বানিয়ে দেওয়া যায়না। পুঁথিগত ভাবে তথাকতথিত অশিক্ষিত মানুষও রাজনীতি করতেই পারেন, কিন্তু একটা সীমানা অবধিই তার দৌড় সীমাবদ্ধ। আর এখানেই রাজনীতিতে শিক্ষার দাবী জোড়ালো ভাবে প্রকট হয়ে উঠে। শিক্ষিত আর অশিক্ষিত মূর্খের মাঝে একটা মোটা দাগের জ্ঞানগত বিবেচনা, দুরদৃষ্টিতা আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থানেষী গোষ্ঠীকে উপেক্ষা করার মত কাঠিন্য দেখানোর ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েই যায়। মোদীজির চেয়ে বড় অশিক্ষিতের জ্যান্ত উদাহরন আর কী হতে হতে পারে শিক্ষিত ভারতীয়দের সামনে!

চলে আসুন ২০২৫ সালের পশ্চিমবঙ্গে। ছাত্র রাজনীতি প্রায় নেই হয়ে গেছে বা নেই করে দিতে সক্ষম হয়েছে মমতা ব্যানার্জী। কারন তার যে দল, তাকে চালাবার জন্য প্রথম শর্তই হচ্ছে অশিক্ষা, মুর্খামি আর অসৎ মানসিকতা। তৃনমূল দলের মূল বিপদ হচ্ছে শিক্ষা আর বিবেক। সুতরাং, খুব স্বাভাবিক কারনেই তিনি ছাত্র রাজনীতির শিকড়ে আঘাত করেছিলেন। শুরুতে নিজের দলের ছেলেপুলেদের দিয়ে ক্লিনিক্যালি ছাত্র রাজনীতিকে আতঙ্কে রুপান্তরিত করেছিল, যা অত্যন্ত দুরদর্শী ও কার্যকরী সিদ্ধান্ত ছিল। সংবাদপত্র খুললেই ছাত্র সংগঠনের দাদাগিরির রগরগে কেচ্ছা, ছাত্রনেতা নাম শুনলেই কেমন যেন হিংস্র শ্বাপদের মত শোনাতো। অভিভাবকেরা শঙ্কিত হয়ে উঠলো, সাথে সাথে ছেলেপুলেরাও। যৌনতা বা গরু-শুয়োর এর ট্যাঁবুর চেয়েও ‘ছাত্র রাজনীতি’ শব্দটাকে প্রবল নিষিদ্ধ ও পাপগ্রস্থ বানিয়ে তুলতে সফল হলো।

রাজনীতি আসলে ‘ইজম’ ভিত্তিম একটা নান্দনিক শিল্প, যেখানে যুক্তি তর্কের ধারালো ফলা এফোঁড়ওফোঁড় করে দেয় যাবতীয় ভণ্ডামি। রাজনীতি হলো দর্শন, শিল্পকলা, রুজি কেন্দ্রিক সামাজিক আন্দোলন। যা নমনীয়তার সাথে সমালোচনা করতে শেখায়, কূটনৈতিক বর্ম ব্যবহার করে সমালোচনা সইতে শেখায়। অশিক্ষা না এলে সেই সমাজে চুরিকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যাবেনা বৈধতার সাথে। আদর্শ ভিত্তিক ইজমের শিক্ষা থাকলে রন্ধ্রে রন্ধ্রে বর্বরতা, ভন্ডামি, গুন্ডামি আর আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা যাবেনা, যেখানে সরকারের সমালোচনা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ, প্রশ্ন করা মানেই প্রকাশ্য গণশত্রুতে রুপান্তরিত হওয়া। এদের উদ্দেশ্য গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করে চরম বিশৃঙ্খলাপূর্ণ নৈরাজ্য তৈরি করা, যেখানে শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যই তৃণমূলীয় যোগ্যোতার একমাত্র মাপকাঠি। অতএব, শিক্ষিত রাজীনীতির সূতিকা গৃহই বন্ধ করে দাও। কলেজ বা ইউনিভার্সিটি থেকে কেবল নেকুপুষু ছেলেমেয়েই বের হবে, যারা আজীবন দয়াভিক্ষার উপরে স্থানীয় মস্তান রাজনৈতিক নেতাদের পা ধরে করুণার পাত্র হিসাবে বেঁচে থাকবে

অত্যন্ত মোটাভাবে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হলো রাজনীতি মানেই অস্পৃশ্য, অবৈধ, এটা কোনো সভ্য ভদ্র লোকেদের ছেলেমেয়েদের কাজ নয়। সংবাদ মাধ্যম ছিলো এই অপরাধের প্রত্যক্ষ দোসর, বিজ্ঞাপনে আরাবুল, অনুব্রতরা তখন সংবাদ পত্রের কোহিনূর। রাজনীতির ময়দানকে হিংস্র পশুর চারণভূমির সাথে তুলনা শুরু হয়ে গিয়েছিলো, অতএব ছাত্র রাজনীতির আঁতুড় ঘরকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো মানে হয়! ক্রমশ ‘ভালো ছেলে’ রাজনীতি করেনা, শিক্ষিতেরা ইউনিয়নবাজি করেনা জাতীয় গায়েত্রী মন্ত্রের জপ করানো হলো সমস্বরে, কর্পোরেট হাঙরদের সুবিধে করে দিতে। ফলে ক্রমশ মূল ধারার রাজনীতির কারবারিরা, যারা দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের দায়ে অভিযুক্ত- তারাই ছাত্র রাজনীতির নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল, ইস্কুল কলেজের সরকারি ফান্ড আত্মসাৎ করতে। ছাত্র রাজনীতির ধাত্রী ভূমি হওয়ার বদলে কলেজগুলো চোখের সামনে দুর্নীতিবাজদের আখড়া হয়ে উঠলো

এটাও সত্য যে, কংগ্রেসী ঘরানার ছাত্র রাজনীতি মানেই পার্টির ক্ষমতা মজবুত করা, বাম আমলেও তার ব্যতিক্রমী ছিলো না২০০৬ পরবর্তী বাংলাতে মমতা ব্যানার্জী এটার ন্যাংটা রূপ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলো। ছাত্র রাজনীতি মানেই পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। ছাত্র রাজনীতি মানেই চরদখলের মতো হলদখলের মহড়া। ছাত্র রাজনীতি মানেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের লেজুরবৃত্তি, একে অন্যের পা চাঁটা। ছাত্র রাজনীতি মানেই ছাত্রীদের নিয়ে দখলদারি, কে কাকে ভোগ করবে তার প্রতিযোগিতা। ছাত্র রাজনীতি মানেই অপমান করে ন্যায্য প্রতিবাদের ভাষা রোধ করে দেয়া। বোমাবাজি, লুটপাট, চাঁদাবাজি, দলবদ্ধ হয়ে গাড়ি ভাংচুর। সাধারন মেধাবী ছাত্ররা কেন রাজনীতিতে জড়াবে বলুন তো!

আর এই ফাঁকেই জন্ম নিলো- ‘অরাজনৈতিক’ কাঁঠালের আমসত্বের। যা রামধনু যৌনতার মত বিকৃত কামের মজা দেয়, আবার প্রাণঘাতী যৌন রোগও তৈরি করে- নতুন কিছু জন্ম না দিয়েই। এই নপুংসক প্রজাতিটাকে তৈরি করা হয়েছিলো অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে, মমতা ব্যানার্জী যখনই নিজে কোনো মুশকিল ফাঁদে জড়িয়ে গেছে বা যাচ্ছে, এই খোদার খাসির দল সামনে চলে গিয়ে একটা মিথ্যা প্রতিবাদের পর্দা টাঙিয়ে দেয়। যারা Shock absorber হয়ে গণবিদ্রোহের আগুনের লেলিহান শিখাটাকে স্তিমিত ও সহনীয় করে দেয়, এবং বেশ কিছুটা সময় পাইয়ে দেয় মমতা ব্যানার্জীকে। যেখানে রাজনৈতিক আদর্শ নেই, সে আন্দোলন শুধুই ক্ষমতা দখলের খেলা।

এই অরাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী সমাজটাই প্রচার করলো- ছাত্রদের কাজ শুধুই পড়াশোনা করা। তোতাকাহিনীর জনৈকের মত মমতা ব্যানার্জীও নিশ্চই অলক্ষ্যে বলেছিল- “শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।” পড়তে গিয়ে দলবাজি করা অপরাধ অন্যায়, যা সভ্যতার পরিপন্থীশাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্প করে রাবীন্দ্রিক অনুষঙ্গে, রোজ সন্ধ্যার টিভি খেউড়ে অভিভাবকদের টার্গেট করে খাপ পঞ্চায়েত বসালো আনন্দ টিভি ও বিজন দেবনারায়ণের মত ‘অরাজনৈতিক’ মাষ্টারেরা। প্রশ্ন তুলে দিলো আমাদের দেশে ছাত্ররাজনীতি জিইয়ে রাখা কি খুবই জরুরী! স্বাধীন সার্বভৌম গনতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থার দেশে ছাত্রদের কেনো পড়াশোনার পরিবর্তে রাজনীতি করতে হবে। এভাবেই ক্রমশ ছাত্রদের রাজনীতি থেকে সরাতে সরাতে, রাজনীতি থেকেই শিক্ষিত সমাজকে সাবাড় করে দিলো।

অথচ সোনালী প্রজন্মের বরেণ্য নেতাদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহেরু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, বাবা সাহেব ভীমরাও আম্বেদকর এমনকি জ্যোতি বসু পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির কোষ্ঠীপাথরে নিজেদের ঘসামাজা করে নিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলো সোসালিস্ট পার্টির জয়প্রকাশ নারায়ন সেই আন্দোলনের সর্বাগ্রভাগে ছিল লালু প্রসাদ যাদব, সুশীল মোদী, নীতিশ কুমার, রামবিলাস পাশওয়ান এর মত ছাত্র নেতারাই। সোসালিস্ট এবং দক্ষিণপন্থী রাজনীতির অন্যতম বীজতলা বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি, যার সেরা ফসল দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর

ভারতের ছাত্র রাজনীতি এবং ক্লাসিক্যাল ভারতীয় রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সর্বাজ্ঞে চলে আসবে বামপন্থীরা. বর্তমানে দেশের যে কটা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি চালু আছে, তার মধ্যে JNU অন্যতম। আজকের কেন্দ্রীয় রাজনীতির মঞ্চে যে কয়েকজন ছেলেমেয়ে সন্ধ্যার টিভির খেউর বা সোস্যাল মিডিয়াতে বিরোধী স্বর হিসাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তারা প্রায় প্রত্যেকেই phd ডিগ্রীধারি শিক্ষিত ও অধিকাংশই JNU থেকে এসেছে। এই JNU থেকে অমিতাভ নন্দী, ডি রাজা, শেহেলা রশিদ, ওমর খালিদেরা বেরিয়ে এসেছে।

অর্থাৎ রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী একটা পরিমণ্ডলে এরা প্রত্যেকে জন্মেছে ও লালিত হয়েছে, পুঁথিগত শিক্ষাসাথে সাথে রাজনৈতিক শিক্ষাতেও শিক্ষিত হতে পেরেছে বলেই, আজ তারা ক্ষমতার চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করতে শিখেছে নিয়মিত অনুশীলনে। আজ গোদি মিডিয়ার মত একনায়কতান্ত্রিক একটা পুঁজিবাদী সমষ্টির বিরুদ্ধে গিয়ে- নিজের ইজমের কথা রাখতে পারছে, যুক্তি ও তথ্য দিয়ে মাত করে দিতে পারছে RSS এর মিথ্যার বেসাতিকে, ধর্ম আর জাতপাতের ভুয়ো ন্যারেটিভকে ছিঁড়ে খানখান করে দিতে পারছে আত্মবিশ্বাসের সাথে।

তত্ত্বগত ভাবে শ্রমিক কৃষকের মিলিত শক্তির উত্থানে প্রোলেতারিয়েত পরিবার থেকে উঠে আসবে বামপন্থীদের নেতা। সেই নেতারা ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাবে, গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেও বৈপ্লবিক যুগান্তকারী কোন সিদ্ধান্ত নেবে- এমনই প্রত্যাশা থাকে বামপন্থী সমর্থকদের । কিন্তু বাস্তবটা হচ্ছে মূল কাঠামোর সর্বোচ্চ শিখর অর্থাৎ প্যালিটব্যুরো নিয়ে যদি আলোচনা করা যায়, দেখা যাবে আজ অবধি সিংহভাগ নেতাই এসেছে ছাত্র রাজনীতির অন্দরমহল থেকে। দিল্লির JNU যদি ছাত্র রাজনীতিতে বামপন্থীদের আঁতুড় ঘর হয়, তবে দিল্লী ইউনিভার্সিটি অবশ্যই দক্ষিণপন্থীদের ধাত্রীভূমি। অরুন জেটলি, বিজয় কুমার মালহোত্রা, বিজয় গোয়েল, অনুরাগ ঠাকুর, অজয় মাকেন, অলোক শর্মা, অরবিন্দ সিং লাভলী প্রমুখ, নাম শেষ হবেনা বলতে থাকলে।

আজকের বিজেপির পিতা জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিরাজনৈতিক জন্মও, কোলকাতা বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্র রাজনীতির হাত ধরেই। সঙ্ঘচালক মোহন ভগবত, কে সুদর্শন, বিজেপির মুরলী মনোহর জোশি, সুব্রহ্মণ্যম স্বামী, অশ্বিনী কুমার চৌবে, গিরি রাজ সিং এর মত বিষাক্ত মালেরাও ছাত্র রাজনীতির গলি থেকে এসেছিলো। আজকের উপরাষ্ট্রপতি রাধাকৃষ্ণণ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, জেপি নাড্ডা, রাজনাথ সিং, নিতিন গডকড়ি, প্রকাশ জাভড়েকর, ধর্মেন্দ্র প্রধান, রাধা মোহন সিং এনারা তো আছেই। প্রাক্তনদের মধ্যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী, রাম জেঠমালানি, প্রমোদ মহাজন, ভেঙ্কাইয়া নাইডু, কমলাপতি ত্রিপাটি, হেমবতী নন্দন বহুগুনা তথা RSS এর মূল পাইপলাইন- ছাত্র রাজনীতির মন্থন থেকেই উঠে এসেছে।

বামপন্থী রাজনীতির নেতৃত্ব স্থানীয় ক্ষেত্রে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা প্রশ্নহীন। প্রকাশ করাত, সীতারাম ইয়েচুরি, বৃন্দা কারাত, বিমান বসু, শ্যামল চক্রবর্তী, সুভাষ চক্রবর্তী, অনিল বিশ্বাস, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মোহাম্মদ সেলিম, সুজন চক্রবর্তী, গণশক্তি সম্পাদক শমিক লাহিড়ী, মইনুল হাসান বা সেদিনের বামনেতা তথা আজকের বিজেপির দিল্লি অফিস সামাল দেওয়া ব্রতীন সেনগুপ্ত হয়ে আজকের মীনাক্ষী, শতরূপ, দীপ্সীতা, ঐশী কিম্বা তোলামূলের ঋতব্রত, দশটা বছর শুধু বসে বসে কাটিয়ে দেওয়া ব্যার্থ ছাত্র নেতৃত্বের প্রতীক- সৃজন প্রতীকুও এসেছে এই ছাত্র রাজনীতির সাপ্লাই লাইন থেকে। দেশজুড়ে হাজার হাজার এমন নাম রয়েছে।

দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে প্রিয়রঞ্জন, সুব্রত, তাপস রায় থেকে অরূপ বিশ্বাস, এমনকি সোনালী গুহ পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির ফসলকেন্দ্রীয় ভাবে পুরো অতিবাম ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা আজকের দীপঙ্কর ভট্টাচার্য নিজেও ছাত্র রাজনীতির ফসল। দেশ উত্তাল করে দেওয়া বাম ছাত্র সংগঠনের হয়ে ‘আজাদি’ স্লোগান দেওয়া, সদ্য কংগ্রেসী কানাইয়া কুমারকে আমরা কে ভুলতে পারি! বাঙালি খেদা আন্দোলনের নামে গুয়াহাটি ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকেই প্রফুল্ল মহন্ত, ভূগু ফুকানেরা আবিষ্কৃত হয়েচছিল। সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্যের মত নাম, যারা আসাম রাজ্যের ভীত নড়িয়ে দিয়েছিল, তারাও ছাত্র রাজনীতি জাত সন্তান। শাহবানু মামলা খ্যাত আরিফ মোহাম্মদ খান, রাজস্থানের অশোক গেহলত, এমন কত নাম বলব!

শুধু উত্তর ভারত নয়, দক্ষিণ ভারতীয় রাজনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করতেন একসময়, তাদের বড় অংশের উত্থান ছাত্রনেতা হিসেবেই কারুনানিধি, চন্দ্রবাবু নাইডু, চন্দ্রশেখর রাও, দেবগৌড়া, সিদ্দেমাইয়া, অনন্ত কুমার হেগড়ে প্রমুখ। সুপ্রিম কোর্টের বিখ্যাত আইনজীবীদের তালিকায় যদি চোখ বুলানো যায়, দেখা যাবে কপিল সিবাল, অভিষেক মনু সিংভি, পি চিদাম্বরম, কিরণ রিজিজু, প্রশান্ত ভূষণ, ইন্দিরা জয়সিং, রবিশঙ্কর প্রসাদ এমনকি দেশের চিফ জাস্টিস রামান্না, জাস্টিস অরবিন্দ কুমার এর মত মানুষেরাও স্বমহিমাতে ছাত্র রাজনীতি করেও নিজ নিজ পেশাতে সফল। অভিনয় জগতে সাই পল্লবী বা সুশান্ত সিং রাজপুতের নাম অনেকেই জানে সফল ছাত্রনেতা/নেত্রী হিসাবে, এটাও জেনে রাখুন- শাহরুখ খানও নিজ কলেজ জীবনে চুটিয়ে ক্যাম্পাস পলিটিক্স করেছেন।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গনতান্ত্রিক দেশের একটি অঙ্গরাজ্যে ছাত্র রাজনীতি বলে আজ কিছুই সেভাবে অবশিষ্ট নেই। এক কথায় বলা যেতে পারে পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রনীতির ধারাটি আক্ষরিক অর্থে ‘খুন’ করে, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বন্ধ্যা, মূর্খ, মেরুদণ্ডহীন, দুর্নীতিগ্রস্ত, চলশক্তিহীন নেতৃত্বের পথ সুগম করে দিয়েছে মমতা ব্যানার্জি। অথচ স্বাধীনতা আন্দোলনে এই বাংলার কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোই সবচেয়ে বেশী স্বাধীনতা সংগ্রামী দিয়েছিলো দেশমাতৃকাকে। বর্তমান উচ্চ শিক্ষাঙ্গন গুলো ক্রমশ শাসক লের ছত্রছায়ায় পালিত, ছাত্র নামধারী কিছু সন্ত্রাসীর অভয়ারন্যে পরিনত হয়েছেচুরি এদের মূল ভিত্তি হলেও খুন, ধর্ষন থেকে শুরু করে এমন কোন অপরাধ নেই, যা এই সন্ত্রাসীরা করে না।

শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত করতে গিয়ে আজ ছাত্ররাই সমাজচ্যুত একঘরে হয়ে গিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করা এই বীর পুঙ্গবেরা যখন চাকরি বা কর্মংস্থানের দিকে তাকাচ্ছে, সেখানে ধু ধু মরুভূমি। তাদের ন্যায্য চাকরি লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রি হচ্ছে দলদাস অযোগ্যদের কাছে, কর্মফল কাউকে ক্ষমা করেনাএই প্রজন্মের সকল শিক্ষিত ‘অরাজনৈতিক’ আবেদন-নিবেদন, আহাজারি নিষ্ফল হয়ে যাচ্ছে শাসকের পোশাকধারী রাষ্ট্রশক্তির নৃশংসতা, আক্রমণকারীদের বর্বরতার মুখে। শাসক তার সর্বশক্তি দিয়ে রাজনৈতিকভাবে অশিক্ষিতদের ওপর ঝাঁপিয়ে পরলে, তারা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে অনভিজ্ঞতার কারনেকর্পোরেট হাঙরেরা আজ শ্রমকোড লঙ্ঘন করে ১২ ঘন্টার গাধার খাটুনি খাটিয়ে নিচ্ছে দাসত্বের টাই বেঁধে দিয়ে। অরাজনৈতিক বাপ-মা আক্ষেপ করে বলছে “রাজনীতি বড়ই নোংরা, সৎ মানুষেরা দূরে সরে গেছে, আর দুর্নীতিবাজরা জায়গা করে নিয়েছে।” তাদের বলি- আপনার ছেলেটিকে রাজনৈতিক শিক্ষা দিয়েছিলেন তার শিক্ষানবীশ কালে!

রাজনৈতিক বোধহীন এই যুবসমাজ রাজ্যের দুর্নীতিবাজ আইনরক্ষক, চোরের সরকার ও তার পুলিশ প্রশাসনেসামনে কীভাবে দাঁড়াবে! কোন ভাষাতে রাষ্ট্রের কাছে জবাব চাইবে, সেটাই তো জানেনা। ছাত্রদের হাতে শুধুই বই আর কলম রয়ে গেছে, সেগুলোকে কিভাবে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে হয় তা তারা কখনও শেখেনিযুক্তি আর তর্ক যে আগ্নেয়াস্ত্রর চেয়েও শক্তিশালী, সেই প্রকৌশল কীভাবে আর কোথায় শিখবে? ঞ্চাশ বা ষাটের দশকে কেউ ছাত্র রাজনীতি করেছে শুনলে মনে ভেসে উঠে একজন মেধাবীর মুখ। বিজ্ঞান, গনিত, ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজবিদ্যা, আইন বিষয়ে জ্ঞানবান, সচেতন, নিষ্ঠাবান কটা তরুণ বা তরুণী ছবি আজকে বাংলার যুব রাজনীতিতে রয়েছে বলতে পারেন? আজকে যুব দলের কেউ মানেই- সে নির্ঘাত গরু, শুয়োর, মন্দির মসজিদ এর পক্ষে বা বিপক্ষে বলে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। যার গোটা অবয়ব জুড়ে মেধাহীনতা, পাঠশূন্যতা, তোলাবাজের সাথে আপস করার চেহারা।

নিজের মতো করে জীবিকা খুঁজে নিতে গেলেও রাজনৈতিক বোধ প্রয়োজন। যেহেতু ছাত্রাবস্থায় নৈতিকতা শিখছেনা, তাই আয় বাড়াতে, সংসার বাঁচাতে, সস্তার চুরি বিদ্যা শিখে নিচ্ছে দ্রুত। সুস্থতার স্বপ্নকে হত্যা করেছে জটিল, কুটিল ও নিষ্ঠুর শাসক দলের বর্তমান অনাদর্শের পাঁকে- চোর হলে তোমার সব কিছু মাফ। ছাত্ররাজনীতির বদলে এই দিশাহীন আদর্শহীনতা, সমাজকে ফোকলা বানিয়ে দিয়েছে ভিতর থেকে, প্রতিবাদের ভাষাকেই নেই করে দিয়েছে।

বর্তমান বিরোধী দলগুলোও কম দায়ী নয়, তাদের যারা শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন তাদের প্রায় সকলেই ছাত্র রাজনীতির ফসল। অথচ এই স্লো পয়জনিংটাকে সেভাবে ধরতেই পারেনি, তাই গুরুত্বও দেয়নি। এটা চরম ব্যার্থতা, যার ফলে বিরোধী রাজনীতির পরিসর একটা বন্ধ্যা সমাজে পরিনত হয়েছে। যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান, গনিত, অর্থনীতি, আইনজ্ঞ সহ বিবিধ ধারায় শিক্ষিত নব প্রজন্মের স্রোত নেই। শাসক ক্ষমতার গদিতে টিকে থাকতে সকল ধরণের অপচেষ্টা করবেই, বিশেষ করে ডানপন্থী ভাবধারার সেই রাজনৈতিক দল- যারা ধর্মীয় বিভেদের মাঝে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করে। তাই, অভিভাবকদের পাশাপাশি বিরোধীরাও সমানভাবে দোষী আজকের পরিস্থিতির জন্য।

এই শাসক দলেরও একদিন পতন হবে। সেদিন এদের হয়ে পতাকা ধরার কেউ থাকবেনা, কারন পরবর্তী শিক্ষিত রাজনৈতিক প্রজন্মের যে আতুঁড়ঘর, যেখানে মমতা ব্যানার্জী নিজে জন্মেছিল- সেই কলেজ রাজনীতিকে নিজে হাতে শেষ করে দিয়েছে একদা ছাত্র রাজনীতির পরিপুষ্ট ফসল।

যতদিননা আবার নতুন করে রাজনীতির ধাত্রীভূমিকে সংস্কার করে আবার একটা সুস্থ পরিমণ্ডল ফিরিয়ে দেওয়া যাবে, ততদিন অশিক্ষিত চোরেদের অধীনেই শাসিত হতে হবে। ততদিন হবু শিক্ষকেরা রাস্তায় শুয়ে থাকবে, ততদিন বর্তমান চাকুরিজীবীরা অমেরুদন্ডীদের মত চার হাতপায়ে হেঁটে DA এর জন্য মিনমিন করে ভিক্ষা চাইবে, আর পুলিশের হাতে মার খাবে। ততদিন একটা হিংসার ঘটনা চাপা দিতে নতুন হিংসার জন্ম দেবেআরো একটা বড় ঘৃণা দিয়ে পুরাতন ঘৃণার পাপকে ধামাচাপা দেবে। দুর্নীতি আর অশিক্ষার পাঁকে জন্মানো রাজনীতি প্রজন্ম- ঘৃণার চাষ ছাড়া আর করবেই বা কী! কু-যুক্তিই অবোধের হাতিয়ার।

আন্দোলন একটা ধারাবাহিক অভ্যাস, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবী তারই অঙ্গ। কলেজ রাজনীতিই প্রথম মিছিলে হাঁটতে শেখায়, স্লোগান দিতে শেখায়। বর্তমান প্রজন্মের প্রায় কেউই তাই রাস্তায় নামাতে জানেনা। লক্ষ লক্ষ জ্বলন্ত ইস্যু থাকা সত্বেও বিরোধীরা পঞ্জিকা দেখে তিথি নক্ষত্র মিলিয়ে রাস্তায় নামে। শাসক দলের নেত্রী ‘আমরা সবাই চোর’ প্ল্যাকার্ড লাগালে যুব অনুগামীরা সেটাই অন্ধের মত প্রশ্নহীন অনুসরন করে, বিজেপির ছাত্ররা ‘চেঁচায় মাতা’ স্লোগান তোলে, IT সেলের লিখে দেওয়া দু লাইনে- সবাই বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র হয়ে যায়। এটাই তো দৈন্যতা, শিক্ষাহীন রাজনীতির দুরবস্থা। বেঁচে থাকার নাম গণতন্ত্র নয়, মানবাধিকার রক্ষার পদ্ধতিটা অবিচ্ছিন্ন একটা অভ্যাস

দিশাহীন GenZ আর ছাত্র রাজনীতির মন্থনে জন্মানো কোনো ব্যাক্তি এক নয়। চেয়ার, হাঁস, ব্রা কিম্বা বন্দুক হাতে সংসদে ঢুকে যাওয়াটা গণতন্ত্রের ছবি নয়, এটাই আজকের তথাকতথিত GenZ আর ছাত্রনেতাদের মাঝের ফারাক। মুজরা আর শাস্ত্রীয় নৃত্যর মাঝে দৃশ্যত ফারাক থাকবেই।

যেদিন রাজ্যে ছাত্র রাজনীতি স্বমহিমাতে ফিরবে, সেদিন রাজপথে অবরোধ আন্দোলন নতুন পরিচয় পাবে। গত এক দশক ধরে লাখ লাখ অরাজনৈতিক শিক্ষিত ছাত্র বেরিয়েছে কলেজ ইউনিভার্সিটি থেকে, তাতে জাতির কোন লাভটা হয়েছে? কেউ পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিনরাজ্যে পরে আছে, বাকিরা কেউ ডেলিভারি বয়, কেউ টিউশুনি খুঁজছে, আর কেউ ঘরে বসে বেকারত্ব উপভোগ করছে সোস্যালমিডিয়াতে। ইতিহাস সাক্ষী, শান্তি মিছিল কখনও শান্তি ফেরায়নি। ছাত্রদের জঙ্গি আন্দোলন শাসকের ঘুম হারাম করে দেয়। তাই সে ছাত্র রাজনীতিকে সে ঘৃণা করে, উচ্ছেদ করতে চায়। ছাত্রকে সত্যিই জাতির মেরুদন্ড হতে গেলে কলেজে কলেজে রাজনীতির পাঠ ফেরাতেই হবে। রাজনীতিকে শিক্ষিত করতে হবে, নতুবা ধুর্ত শাসকের দয়ার পাত্র হয়ে আজীবন ভিক্ষাই করতে হবে।




সোমবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

আপনিই তো এটা চেয়েছিলেন



➤আপনার ছেলেটা চাকরি পাচ্ছে না?

➤ব্যবসা বানিজ্য করার মত পুঁজি ও সুযোগ নেই?
রাতবিরেতে বউ মেয়েকে বাইরে বের হতে দিতে ভয় লাগে?
➤ বাজারে যেতে ভয় লাগে আগুন দামের কারণে?
➤ জরুরী ওষুধের দাম আকাশ ছোঁয়া?
➤ ছেলেটা চোরের ধরে নাম লিখিয়েছে?
➤ ধার দেনা করে ব্যবসা শুরু করলেও তোলা দিতে হচ্ছে স্থানীয় সরকারী দলের নেতা ও পুলিশকে?
➤ রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ?
➤ চতুর্দিকে কৃত্রিম দাঙ্গা পরিস্থিতি?
বড় কষ্ট আপনার, বড় কষ্ট। কিন্তু ভেবে দেখুন তো, প্রতিবার যখন ভোট হয় আপনি কাকে ভোট দেন? উপরের কোন কথাগুলো মাথায় রেখে ভোট দিতে যান? আপনি তো ভোট দেন ৫০০ টাকার লক্ষীর ভান্ডারে বিকিয়ে গিয়ে। আপনি ভোট দেন প্রার্থীর ধর্ম দেখে। আপনি ভোট দেন অন্য ধর্মের লোকগুলোকে শায়েস্তা করতে। আপনি ভোট দেন BJP চলে আসবে সেই ভয়ে!
আপনিই তো শুধু মন্দির চেয়েছিলেন, আপনিই তো চান কাটুয়াদের পাকিস্তান পাঠাতে। আপনিই তো বলেছিলেন শরিয়া শাসন চাই যেকোনো মূল্যে, আপনিই তো মনেপ্রাণে গাজোয়াতুল হিন্দের প্রতীক্ষাতে তসবি গুনছেন। এক কাজ করুন, একবার নিজ পায়ুতে মধ্যমা আঙুল ভরে সেটা শুঁকুন- গুয়ের গন্ধই পাবেন! আর আপনার মস্তিষ্ক ঠিক ওইখানেই রয়েছে, আপনার পোঁদে। খাঁটি বেইন স্টোকস।
বিজেপি চলে এলে কে আসবে? সেই শুভেন্দুই তো, যে মমতার ডানহাত ছিলো। দুটোই তো RSS, গুয়ের এপিঠ ওপিঠ। দুই ফুল মিলে আপনাকে চুতিয়া বানাচ্ছেনা, আপনি আসলেই চুতিয়া, প্যান্ট খুলে উবু হয়ে বসে আছেন পেছন খুলে দিগম্বরী পোজে।
যেদিন রুটি রুজির কথা ভেবে ভোট দিতে পারবেন, যেদিন সন্তানের কথা ভেবে ভোট দেবেন, যেদিন অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের কথা ভেবে শিক্ষিত মানুষকে বেছে নিতে পারবেন, যেদিন সরকারের দিকে আঙুল তুলতে পারবেন, সেদিন উপরের কষ্টগুলো নেই হয়ে যাবে।
আর যতদিন তা না পারছেন অভ্যাস করে নিন, কারণ আগামী আরো দুর্দশা নিয়ে আসছে আপনার জন্য। তৃণমূল আর বিজেপি দুটোই আপনাকে ভয় দেখিয়ে ভোট নেয়, আপনিও তাই দেন জেনেবুঝে। দিনের শেষে আপনি RSS এর মনুবাদী এ্যাজেন্ডারই একটা বোরে মাত্র।
আপনি ভক্ত না দুধেল গাই সেটা আপনি বুঝুন, আমরা শুধু বুঝি আপনাদের মত উদগান্ডুরা আছে বলে ওরা ক্ষমতায় আছে। আর ওরা ক্ষমতায় আছে বলে সাধারণ মানুষের দুর্দশার শেষ নেই।
আপনি থাকছেন স্যার-

বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

Punjab Flood

 


পাঞ্জাবের বন্যা পরিস্থিতির রীতিমতো উদ্বেগ ধরিয়ে দিয়েছে।
এই বছর কাশ্মীর উপত্যকা থেকে শুরু করে সমগ্র হিমালয়ান রিজিওনে মেঘ ভাঙা বৃষ্টি, প্রবল বৃষ্টিপাত, ভূমিধস এর দরুন পাহাড়ি নদীগুলো সমতলে যখন পৌঁছাচ্ছে তখনই তারা জলে টইটম্বুর হয়ে থাকছে। এদিকে সমতল অঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণ অত্যন্ত বেশি ফলে বন্যা পরিস্থিতিই ভবিতব্য।
ঝিলম, বিতস্তা, শতদ্রু, ইরাবতী, বিপাসা, ঘাগর, সহ এদের প্রতিটি উপনদীর জল- বিপদ সীমার উপর দিয়ে বইছে। ২৩ টি জেলার প্রায় সম্পূর্ণ অংশের কৃষি জমি সম্পূর্ণভাবে জলের তলায় চলে গেছে।
পাঞ্জাবের পরিস্থিতি গোটা ভারতবর্ষের আম নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের। ফসল না হলে খাদ্যশস্যের দাম বাড়বে, গম, চাল, ভুট্টা, সরষে, সূর্যমুখী, জোয়ার, বাজরা সহ পশুজাত দৈনন্দিন নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যদি অবৈধ মজুতকরণ ও কালোবাজারি শুরু হয়।
রাজ্যের APP সরকার দৃশ্যত বেসামাল হয়ে পড়েছে, আর মাননীয় সার্কাস মন্ত্রী 'বেবুনজী' চিন থেকে ফিরে মার্দারদোর্ড নিয়ে রুঁদালি গাইতে বসে গেছে।
জনগণের অশেষ দুঃখ রয়েছে আগামী দিনে।

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...