বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২০

কিটের ভিতরে ঘুণঃ নেপথ্যকথন

 


র‍্যাপিড ‘করোনা টেষ্ট’ বন্ধ রাখার ঘোষণা করল iCMR, এটা খবর। যেগুলো খবর নয় সেটাই এ পোষ্টের বিষয়।

মোহাল সারাভাই এর কথা মনে আছে? মাসখানেক আগে মার্চের শেষ সপ্তাহের শুরুতে আমি একটা পোষ্ট লিখেছিলাম, ভক্তদের অসীম ভালবাসার দাপটে সেই প্রোফাইলটি দেহ রেখেছে যেখান থেকে পোষ্ট করেছিলাম। সে যাই হোক, অনেকেই মোহাল ভাইয়ের ভুলে গেছেন হয়ত, এটাও ভুলে গেছেন যে তার পিতা কার্তিকেয় সারাভাই ট্রাম্পকে উত্তরীয় প্রদান করেছিলেন মোতেরার ‘নমস্তে ট্রাম্প’ উৎসবে। এসব ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, কারন রোজই কতশত ঘটনা ঘটে চলেছে সেখানে এদের নাম আর কেইবা মনে রাখে আলাদা করে; কিন্তু সেই বিষয়টাই ভীষণভাবে আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ফিরে এসেছে।

বিগত এক মাসে পৃথিবীতে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, আমাদের দেশও তার বাতিক্রম নয়। ভারত ও বাকি দেশের বিজ্ঞানীরাও লেগে পরে আছে কিভাবে সংক্রমণ থেকে বিশ্ববাসীকে রক্ষা করা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে- ১৭ই মার্চ ২০২০ এর আগে কেন্দ্রীয় সরকার করোনা বিষয়টিকে সিরিয়াসলিই নেয়নি, তাই করোনা পরীক্ষার কিট বা ডাক্তার/স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা পোশাকেরও বরাতও দেয়নি। ১৭ তারিখের পর কেন্দ্র একটা অর্ডার জারি করে- ওই মোহাল ভাই এর ‘কোসেরা ডায়াগনেস্টিক’কে কিট যোগানের বরাত দেয়, এমনকি রাষ্ট্রীয় সংস্থা https://www.niv.co.in/ ও সে বরাত পায়নি।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দেশ সহ বিশ্বের করোনা পরিস্থিতি- ভয়াবহ রূপ ধারণ করার দরুন, কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আর কোনো উপায় ছিলনা। অগত্যা কিছু বিদেশী কোম্পানীকে কিট সাপ্লাই এর অনুমোদন দেয়। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ (iCMR) এর কাছে ৩০টি কোম্পানি দরপত্র দিলেও ১৬টি কোম্পানি গুনগত মান অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল। ১৪টি কোম্পানীর মধ্যে সর্বপ্রথম- ‘Seegene’ এবং ‘SD Biosensor’ নামের দুটো দক্ষিণ কোরিয়ান সংস্থা ‘RT-PCR’ ভিত্তিক করোনা ভাইরাস রোগনির্নায়ক কিট সাপ্লাই করছিল, এগুলো ছিল সময় সাপেক্ষ পরীক্ষা। পরবর্তীতে ১২টি কোম্পানির সবাই ‘এন্টিবডির ভিত্তিক’ করোনা ভাইরাস পরীক্ষার কিট সাপ্লাই করেছিল, যেগুলো মাত্র ৩০ মিনিটে ভাইরাসের উপস্থিতি সনাক্ত করতে পারছিল।

কেন্দ্রীয় সরকার যে বিদেশী কোম্পানী গুলো থেকে অ্যান্টিবডি ভিত্তিক ‘র্যা পিড টেস্টিং কিট’ আমদানি করছিল তারা হল- বায়োমেডনমিক্স (আমেরিকা), সি.টি.কে বায়োটেক (আমেরিকা), বায়োম্যাক্সিমা (পোল্যান্ড), জিটেইন বায়োটেক (চীন), সেন্সিং সেল্ফ লিমিটেড (সিঙ্গাপুর), হ্যাংজো বায়োস্টেস্ট বায়োটেক (চীন), আমোনমেড বায়োটেকনোলজি (চীন), বেইজিং তিগসুন ডায়াগনস্টিকস (চীন), হুনান লিটুও বায়োটেকনোলজি (চীন), ভিভাচেক ল্যাব (চীন) এবং ওয়ান্ডফো (চীন)।

মানে ভারত শুধু মাত্র চীন থেকেই কিট আমদানি করেনি, মোট সাপ্লায়ারদের অর্ধেক চীনা সংস্থা অর্ধেক অন্যান্য দেশ। চীনা সংস্থাগুলোকেও iCMR ই অনুমোদন দিয়েছিল, আরো ১৬টি কোম্পানির মত বাতিল করে দেয়নি। এছাড়া সম্প্রতি কেন্দ্র সরকার দুটি বেসরকারি সংস্থা, মাইল্যাব (ভারত) এবং অ্যাল্টোনা ডায়াগনস্টিকসকে (জার্মান) বেসরকারি ল্যাবগুলিকে কিট সরবরাহের অনুমতি দিয়েছে।

এত কিছু করেও বিগত এক মাস থেকে গতকাল পর্যন্ত সাকুল্যে সাড়ে চার লক্ষ মানুষের টেস্ট করতে সক্ষম হয়েছে সরকার। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছাড়া কেউই উপরোক্ত ১৪টি কোম্পানীর কিট নিয়ে কোনো অভিযোগ করেনি। কয়েকদিন আগে কয়েকটি হাসপাতাল কিটগুলি সঠিক ফলাফল না দেওয়ার অভিযোগ করলে, iCMR ই বলেছিল অদক্ষ ট্যেকনিসিয়ানদের কারনেই এমনটা হচ্ছে, কিটে কোনো গন্ডগোল নেই। এখানে জানিয়ে রাখা ভাল যে, উপরোক্ত কোম্পানি গুলো প্রায় সারা পৃথিবীতেই কিট সরবরাহ করছে। আর ইউরপে এ কিট গুলো খারাপ বেরিয়েছে সেই ‘সেনঝেন বায়োইজি’ কোম্পানি ভারতে কোনো মাল সাপ্লাই করেনি। এর মাঝে আবার আমার কোনো চীন প্রীতি খুঁজবেননা দয়া করে।

এ পর্যন্ত সমস্ত কিছু ঠিকঠাকই ছিল কিন্তু দুদিন আগে iCMR একটা নির্দেশে জারি করেছে যে, সারাদেশব্যপী ২ দিন ‘র্যা পিড টেস্টিং’ বন্ধ রাখতে, কারণ হিসেবে বলেছে চাইনিস কিট গুলির ব্যর্থতা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- চাইনিস কোম্পানি তো ৭টা, বাকি সাতটা সংস্থার সাপ্লাই করা কিট গুলো কি দোষ করেছে? এখানেই আসলে রহস্য লুকিয়ে আছে হয়ত। প্রসঙ্গত, বিগত ১ মাসে অনেক ভারতীয় বিজ্ঞানী, গবেষক, সংস্থা কিট আবিষ্কার করেছে ও প্রসংশিতও হয়েছে। কিন্তু সেগুলো ওই পর্যন্তই এসে দাঁড়িয়ে গেছে, পরবর্তী অগ্রগতি বিষয়ে আমরা কেউই সম্ভবত জানিনা, সম্ভবত সেগুলোর কোনো ব্যবহারিক প্রয়োগ হয়েছে বলেও জানা যায়নি।

রোজই যেখানে লাফিয়ে লাফিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে কিট দ্বারা পরীক্ষা করলেই, সেখানে হঠাৎ এভাবে সম্পূর্ণ বন্ধের পিছনে যুক্তি কি! এখানেই মনে হচ্ছে আসল ঘটনাটা লুকিয়ে আছে। ১৬টি ব্যার্থ কোম্পানীর মধ্যে ‘কোসারা ডায়াগনেস্টিক’ও ছিল। তারা মোট ৮ বার তাদের তৈরি করা কিট দাখিল করেছিল iCMR এর কাছে এবং প্রতেকবারই সেগুলো ব্যার্থ হয়েছে যোগ্যতা পরীক্ষাতে। মজার বিষয় হল এই মোহাল ভাইএর কসোরা তার নতুন কিট আমেরিকার US FDA ও ইউরোপের EUA/CE-IVD এজেন্সি থেকে তাদের কিট এপ্রুভ করিয়ে নিয়ে চলে এসেছে এই মধ্য এপ্রিলে।

বাজার হিসাবে ভারতের জনসংখ্যা- গোটা আমেরিকা মহাদেশ, ও গোটা ইউরোপ মহাদেশের যোগফলের চেয়েও বেশি। সুতরাং এই বিপুল বাজার ধরতে আমেরিকা, চীন, ইউরোপ সবাই ঝাঁপিয়ে পরবে স্বাভাবিক। ইউরোপ ও আমেরিকা নিজেরাই এই মুহুর্তে অসুস্থ, চীন বিষয়ে কেউ জানেনা তারা কেমন আছে। এদিকে ভারতীয় ব্যাবসাদারেদের চীনের মার্কেটে অন্যের ঢোকা প্রায় অসম্ভব, আমেরিকার বাজারেও তাই। বাকি রইল ভারত সহ মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকা। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিনশো কোটি মানুষ, এটাই এখন সকলের টার্গেট।

আচ্ছা, ভারত সরকার সরাসরি নিজে তো আর ওই ১৪টা কোম্পানি থেকে কিট আমদানি করছিলনা, তাহলে কে করছিল! মূলধারায় তথ্য গোপন রাখার প্রচেষ্টা কম করেনি। http://asence.com/ কোম্পানীর সাইটে চলে যান, দেখবে এটা নিউইয়র্কে রেজেস্ট্রিকৃত একটা মার্কিন ফার্মা ডিস্ট্রিবিউটেশন কোম্পানি। খালি চোখে কোনো সমস্যাই নেই, কিন্তু এদের ডাইরেক্টর তালিকা দেখলেই চুলকিয়ে টাকের চুল সব উঠে যাবে, সেই অকৃত্রিম মোহাল সারাভাই। এখন আরেক গুজরাতি কোম্পানি যাদেরকে সিংহভাগ কিট ইমপোর্টের দায়িত্ব দিয়েছে কেন্দ্র, নাম ‘জাইদাস ক্যাদিলা’, ডাইরেক্টরের নাম পঙ্কজ প্যাটেল; বাকিটার দায়িত্বে কিরণ মজুমদার শ এর কোম্পানী ‘বায়োকন ফার্মা’। এর মাঝখানে মেহুল ভাই এর ভারতীয় কোম্পানি কোসারা ডায়গনস্টিক তার দুটো কিট বাজারজাত করে ফেলেছে, The Logix Smart™ ও CoPrimer™ qPCR নামে, বিক্রির জন্য ছাড়পত্রও পেয়ে গেছে কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে। http://codiagnostics.com/ ওয়েবসাইটে তথ্য পেয়ে যাবেন।

দেশপ্রেমিকের দল ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ট্যাগ দিয়ে হয়ত কোসারার ওই কিটগুলোকেই প্রোমোট করবে বাজারে। বেনিয়া দালালদের ভেস্টেড ইন্টারেস্ট রয়েছে এই বিশ্বজোড়া মহামারীতে, 'বাজারের' হিসাব উপরের দিয়েছি। মানুষের সর্বনাস হলেও কারো তো পৌষমাস হয়ই হয়। অন্য দেশ থেকে আমদানি করা কিট গুলো থেকে সেভাবে হয়তো কাটমানি রাখতে পারছিলনা ‘দেশপ্রেমিকের’ মাদুলি বেচা রাজনৈতিক দলটি।

হয়ত আগামীতে ওই রাজনৈতিক দল পরিচালিত সরকার- মোহাল ভাইয়ের কোম্পানী থেকে, সরকারী অর্থে কিট কিনে রাজ্য গুলোকে পাঠাবে। রাজ্যগুলোরও হাত বাঁধা- তারা কেন্দ্রের থেকেই নিতে বাধ্য, আসাম ছাড়া একটিও রাজ্যকে ক্ষমতা দেওয়া হয়নি কোন প্রকারের কিট আমদানি করার। সুতরাং করোনা মোকাবিলার নামে অতিরিক্ত দামে সরকারী কোষাগার থেকে একটা বিশাল অর্থ এই দালাল ফার্মা কোম্পানীগুলোর একাউন্টে চলে যাবে, কারন আগের ১৪টা কোম্পানিকে বাতিল করে দিলে বাজারে প্রতিযোগিতাই থাকলনা, মোনোপলি দাম মোনোপলি বাজার। টাকার বাচ্চা দিতে কতক্ষণ, আর এই তাকারই বৃহত্তর অংশটা কর্পোরেট ফান্ডিং, ইলেক্টোরাল বণ্ডের পোশাক সেজে আবার ফিরে চলে আসবে বিশেষ রাজনৈতিক দলটির কাছে, যারা গত বছরে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা এভাবেই রোজগার করেছিল- মানে ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে বা সাধারণ চাঁদা হিসাবে যা অপ্রকাশিতি রয়ে যায়।

কখনও ভেবেছেন, গুজরাতি কোম্পানী গুলোই কেন অর্ডার পাচ্ছে! সরকারের কোন দায় আছে যে এদেরই অর্ডার দিতে তারা বাধ্য! এরা তো আর ভারতের প্রথম ফার্মা কোম্পানি ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল’ নয় যে, ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার দায় আছে, তাহলে স্বার্থটা কি? ও কার স্বার্থ?

আপনি কিন্তু প্রশ্ন করতে পারবেননা, কারন দেশপ্রেম আপনাকে বাঁধা দেবে। এদিকে একজন ফার্মা কোম্পানির মালিক ঐ মোহাল ভাই মোট ১১টা কোম্পানির ডাইরেক্টর, যার মধ্যে ৯টি ফার্মা কোম্পানি বাকি দুটি ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি। জানিনা ইনভেস্টমেন্ট-ফাইনান্সিং সেক্টরে একজন ওষুধওয়ালার কী কাজ থাকতে পারে টাকা সাইফন ছাড়া। এদিকে কোসারা ডায়াগনেষ্টিকের নামে কোনো লোন নেই- কর্পোরেট বিষয়ম মন্ত্রকের হিসাবে। দরকারই বা কেন, সরকার কী আর টোকেন এমাউন্ট দেয়নি তাদের!

লোন যেটাতে আছে সেটা ওই ‘আসেন্স’ কোম্পানিতে, যার লগ্নি আমেরিকাতে। আপনি দেশপ্রেমের তাড়ি খেয়ে থাকলে এসব খটখটে তথ্য মূল্যহীন। এই আসেন্স কোম্পানির দুজন অন্য ডাইরেক্টর হলেন- উমেশ সাহ ও অশোককুমার শাহ্। এনাদের সম্বন্ধে আমি বেশি কোনো তথ্য পায়নি, আপনি কিন্তু পদবী দেখেই আলাদা কিছু সন্দেহ করছেন- শাহ্ পদবী কি গুজরাতে কম? আবার আপনার সন্দেহ সত্যি হতেই পারে। আসলে ফার্মা ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আড়ালে কী দারুণ ভাবে ভারতীয় জনগণের সম্পদ লুঠ হয়ে যাচ্ছে ‘নাদির শাহ্’ এর উত্তরসূরিদের দ্বারা। আপনি হিন্দু মুসলিম নিয়েই ব্যাস্ত থাকু, বাকিরা তো ভক্ত- ওদের কি যায় আসে যায় এ সবে।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন মানুষ বাঁচল কী মরল সেটা গৌণ বিষয় রাষ্ট্রের মহান পরিচালকদের কাছে, ঘরের লোককে মুনাফা পাইয়ে দেওয়াটাই মূল লক্ষ্য। বেনিয়াদের তো এসব নিয়েও মাথাব্যাথা নেই নিজেদের স্বার্থ ছাড়া। এদের অদ্বিতীয় একটাই লক্ষ্য- তা হল রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুঠ; কখনও সরাসরি, কখনও দুর্বৃত্ত রাজনেতাদের দালালির মাধ্যমে।

এই হল সেই অধরা বিকাশ, যা মুকেশভাই, গৌতম ভাই এর পর বর্তমান উত্তরাধিকার মোহাল ভাই এর। তাতে দুদিন কেন, ২০০ দিন টেষ্ট বন্ধ হলে হোক, আমি তো ভক্ত- আমার ওসব ভেবে লাভ কী! মোদিজীকে থোরিই জনগণ – অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষা ইত্যাদির জন্য ভোট দিয়েছেন! পাকিস্তান, হিন্দুমুসলিম, পিটিয়ে মারা, রামমন্দির, NRC, নোটবন্দি, কাশ্মীরের স্পেশাল ধারা লোপ এসবের জন্য ভোট দিয়েছিলেন। আজ তার কাছে স্বাস্থ্য চাওয়া অন্যায় ও অপরাধ

বেচারা iCMR এর অধিকর্তারা, জবাবদিহি করতে করতে তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। সে যাই হোক, করোনা নিয়ন্ত্রণে মোদিজী বিশ্ব সেরার শিরোপা পেয়েছে- এই খবর কি জানতেন? যেটা জানেননা সেটা হল- এই মোহাল সারাভাই- ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার প্রানপুরুষ, সম্মানীয় ‘বিক্রম সারাভাই’ এর নাতি। দাদু হস্তি সেজে বল দেখিয়েছিলেন গোটা বিশ্বকে, নাতি মর্কট সেজে নাচ দেখাচ্ছেন। দেখুন তো উপরের ঐ 'নামটা' শোনার পর আর কোনো ত্রুটি খুঁজে পাচ্ছেন কিনা! সাবধান এনাদের নামে কিছু বলা মানেই কিন্তু দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আসতে পারে, ভক্তরা সাহেবের ইশারা ছাড়া কিছুই বোঝেনা।

তাই সাধু সাবধান।

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২০

আশার খবরঃ ভ্যাকসিন গবেষণা

 


নভেল করোনা ভাইরাস SARC-CoV2 তথা COVID-19 এর মারন দাপটে গোটা বিশ্বজুড়ে ত্রাহিত্রাহি রব উঠছে। ভয়ানক ছোঁয়াচে এই রোগ বিশ্বে প্রায় প্রতিটি দেশকে ধরাশায়ী করে দিয়েছে, প্রায় পাঁচমাস যাবৎ এই মারন রোগ বিশ্বকে গ্রাস করে রেখেছে, রোগী পরীক্ষার পর দেখা গেছে প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত ও পৌনে দু’লাখ মানুষ এর বলি হয়েছে, কমবেশি আমাদের সকলের কাছেই এ তথ্য রয়েছে। কিট দ্বারা পরীক্ষার বাইরে পৃথিবীর এই বিপুল জনসংখ্যার কাকে কোথায় যে এই ভাইরাস তার অভিক্রমনে বন্দী করেছে তা কেউই জানেনা। সারা পৃথিবী জুড়েই চলছে মারণ যজ্ঞ, মৃত্যু ভয় থেকে সভ্যতাকে বাঁচাতে আজ সারা পৃথিবী সকল বিভেদ ভুলে একজোট হয়ে লড়াই করছে। কিন্তু আজ ২১শে এপ্রিল ২০২০, তারিখ পর্যন্ত না সঠিকভাবে এই অদৃশ্য জীবাণুকে সনাক্তের সহজতর প্রণালী আবিষ্কৃত হয়েছে, না আবিষ্কার হয়েছে এই জীবানু কীভাবে সংক্রমণ শানাচ্ছে।

সারা বিশ্বের নিরিখে তথ্য বলছে, প্রতি ১০০ জন করোনা আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ৭৯ জনই সুস্থ হয়ে গেছেন। জিব্রালটার, ফকল্যান্ড আইল্যান্ড, ফায়িরো আইল্যান্ড, সানমারিও, বাহারিন ইত্যাদির মত খুব অল্প জনসংখ্যার দেশগুলো ব্যাতিরেকে করোনা আক্রান্ত হয়েছে কি হয়নি এই পরীক্ষার নিরিখে আইসল্যান্ড সবচেয়ে আগে রয়েছে, তারপরে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তৃতীয় স্থানে ইজরায়েল। আমেরিকা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে পরীক্ষা করেছে, সংখ্যাটা চল্লিশ লক্ষের কিছু বেশি; যদিও সেটা শতাংশের হিসাবে সেটা ১ জনের একটু বেশি। আমেরিকার পর পরীক্ষার বিষয়ে এগিয়ে আছে রাশিয়া, জার্মানি ও ইতালি। চীন কি করেছে সেটা তারা ছাড়া কেউ জানেনা, তাই সঠিক তথ্য কারো কাছেই নেই। সবচেয়ে মৃত্যুহার বেশি ইংল্যান্ডে, সেখানে সুস্থ হয়ে ওঠার হারও অত্যন্ত কম। অসমর্থিত সূত্রমতে ভারতে মোট করোনা টেষ্ট হয়েছে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার লক্ষের সামান্য বেশি মানুষের, মানে প্রতি সাড়ে তিন হাজার মানুষের মধ্যে একজনের। বাকি ৩৪৯৯ জনের মধ্যে কে আক্রান্ত কেউ জানেনা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত, মরলেও করোনা হয়ে কিনা জানার আগেই হয়ত দেহ লীন হয়ে যাচ্ছে। এত বড় দেশের একটা বিধানসভার সমান জনসংখ্যাকে (ভোটার নয়) কোনো রকমে স্পর্শ করতে পেরেছে, এখনও ৪১২০টা বিধানসভা বাকি। নাগরিকদের তরফ থেকে সরকারের কাছে দাবী করা উচিৎ- প্রতিদিন কতজনের টেষ্ট হচ্ছে এটা যেন নিয়মিত ঘোষণা করে ICMR বা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক।

এর মুহুর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন এই ভাইরাসের মোকাবিলার জন্য অস্ত্র তথা ভ্যকসিন বা টিকার আবিষ্কার করা। যদিও কেউ নিশ্চিত করে বলতে সক্ষম হচ্ছেননা যে ঠিক কবে নাগাদ এই রোগের প্রতিষেধক বাজারজাত করা সম্ভব। সমগ্র সভ্যতা আজ প্রায় গৃহবন্দী জীবন যাপন করলেও একটা শ্রেনীর মানুষ কিন্তু তাদের নিরলস মেধা ও শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন সভ্যতাকে রক্ষা করতে। তারা বিজ্ঞানী, গবেষক, বিশ্লেষক, অধাপকদের দল; যাদের পিছনে লগ্নি করে চলেছে বিভিন্ন রাষ্ট্র, ওষুধ কোম্পানী, সংগঠন, ও হরেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইতিপূর্বে কখনও গোটা বিশ্বজুড়ে থাকা বিজ্ঞানীরা এইরকম আপদকালীন সময়ে জরুরী ভিত্তিতে একই বিষয়ে, এই মাত্রার গবেষণা করেননি; সেদিক থেকে এটা নিজেই একটা ইতিহাস। চলুন আজকে তেমনই কিছু গবেষক, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের বিষয়ে একটু জেনে নিই এই অবসরে।

ফরিদাবাদের ‘ট্রান্সলেশানাল হেলথ সাইন্স এন্ড ট্যেকনোলজি ইন্সটিটিউট’ এর এক কর্মকর্তা গগনদীপ কাং এর বিবৃতি অনুয়ায়ী এই মুহুর্তে ভারতে ৬টি কোম্পানী সরাসরি করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন ‘ডেভলপিং’ এর কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে গুজরাটের ‘জাইডাস কাডিলা’ দুটো ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা করছে, বাকি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান একটি করে ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা করছে। সেগুলো হল- পুনের ‘সিরাম ইন্সটিটিউট’, হায়দ্রাবাদের ‘বায়োলজিকাল ই’, ‘ভারত বায়োটেক’, ইন্ডিয়ান ইমিউনোলজিক্যাল’, এবং ব্যাঙ্গালুরুর ‘মিনভ্যাক্স’ কোম্পানী গুলি। কেরালার রাজীবগান্ধী বায়োট্যেকনোলজির মুখ্য বিজ্ঞানী শ্রীকুমারবাবু জানিয়েছেন- “এই ভ্যাকসিক ডেভলপ হওয়া একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, প্রথমেই এগুলো মানুষের উপরে ব্যবহার করা হয়না; ক্লিনিক্যালি হরেক পর্যায়ের পরে, পরীক্ষাগারে বিভিন্ন ধরনের জীবজন্তুর উপরে ধাপে ধাপে পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়ে তারপর মানুষের উপরে প্রয়োগ হয়, যা কমপক্ষে এক থেকে দেড় বছরের সময়রেখাকে নির্দেশ করে”।

সুতরাং বোঝায় যাচ্ছে পৃথিবীর সকল ধরনের মানুষের জন্য সহজলভ্য ভ্যাকসিন বানানোটা সকলসময়ই একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। বিল গেটস এর ফাউন্ডেশনের অর্থে পুষ্ট- নরওয়ের অসলো শহরে অবস্থিত ‘কোপিশন ফর এপিডেমিক প্রিপারেডনেস ইনোভেশনস’ (CPIC) করোনা গবেষণা বিষয়ে তথ্য বিশ্লেষণ, বিজ্ঞানীদের মাঝে আন্তঃ সংযোগস্থাপন, ইত্যাদি- হরেক ভাবে বিজ্ঞানকে পুষ্ট করে চলেছে। তাদের তথ্য মতে, এই মুহুর্তে বিশ্বে ১১৫টি সংস্থা করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে, যাদের মধ্যে ৭৮জন এখনও চালিয়ে যাচ্ছে, বাকি ৩৭ টি কোম্পানী পরবর্তীতে আর কোনো উচ্চবাচ্য করেনি শুরুর পর। এর মধ্যে ভারত থেকে মাত্র দুটো কোম্পানীর গবেষণাকে বিশ্বসংস্থা গুলি স্বীকৃতি দিয়েছে, যথাক্রমে জাইডাস কাডিলা ও সিরাম ইন্সিটিটিউট।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর তথ্য মোতাবেক ২০শে এপ্রিল পর্যন্ত তিনটে সংস্থা মানবদেহে এই ভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেছে, যদিও তা এক্কেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে। এছাড়া আরো প্রায় ৭০টি মত সংস্থা এমন আছে যারা ল্যাবরেটরি পর্যায়ে রয়েছে বা জন্তু জানোয়ারের উপরে প্রয়োগ পর্যন্ত অগ্রসর হতে সক্ষম হয়েছে। ‘হু’ এর অধিকর্তা প্রতিটি রাষ্ট্রনেতাদের কাছেই আহ্বান করেছেন যে, যখনই এই ভ্যাকসিন বাজারে আসুক তা যেন শুধু মাত্র অর্থনৈতিক সমর্থ মানুষদের জন্য বা নির্দিষ্ট কোনো ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলের জন্য না হয়; প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহায়হীন মানুষটিও যেন এই আবিষ্কারের লাভ নিতে পারে।

বিশ্বের অন্যত্র নজর রাখলে দেখা যাবে, অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন G-20 দেশগুলির কাছে যৌথ তহবিল গঠন করার আবেদন জানিয়েছে, যাতে করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক ও এন্টি-ভাইরাল ওষুধ সংক্রান্ত গবেষণার জন্য দ্রুত আর্থিক ও পরিকাঠামোগত বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা যায়। কয়েকদিন পূর্বেই তাদের জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা জানিয়েছে- অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের বানানো একধরনের ভ্যাকসিন তারাও কিছু আক্রান্ত নাগরিকদের উপরে প্রয়োগ করেছে।

ডাউনিং স্ট্রীটের সূত্রানুসারে, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায়- গবেষনাসংক্রান্ত খাতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ লগ্নি করেছে গ্রেট ব্রিটেন, পরিমাণটা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। G-20 দেশ গুলির নেতা হিসাবে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিশ জনসন ঘোষণা করেছেন যে- ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হলেই তারা সর্ব নিন্মমূল্যে সেটিকে বাজারজাত করবে, যাতে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ বিজ্ঞানের লাভ পায়। এদিকে মার্কিন সরকার তাদের দেশজ কোম্পানী গুলোকে উৎসাহিত করতে বিপুল অঙ্কের পুরষ্কারের ঘোষণা করেছে, যারা করোনার ভ্যাকসিন সর্বপ্রথম আবিষ্কার করতে পারবে। যদিও ‘মেক ইন আমেরিকা’ শ্লোগানের উন্নাসিকতা রয়েছে তাদের অনেক কর্মেই, তবুও দিনের শেষে একটা সমাধান আসাটাই বড় কথা। শুধু সরকারই নয়, তাদের দেশের বিখ্যাত কোম্পানী ‘জনসন এন্ড জনসন’ বিপুল আর্থিক পুরষ্কারের কথা ঘোষণা করেছে।

CNBC সংবাদ সংস্থার উদ্ধৃতি অনুযায়ী, ‘হু’ জানিয়েছে- ‘জিন সিকোয়ান্সিং’ নিয়ে কাজ শুরু করার মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে মানবশরীরে প্রয়োগের পর্যায়ে পৌঁছানটাই একটা বিশাল সাফল্য গোটা বিশ্বের কাছে। ‘হু’ এর জরুরী কার্যক্রম বিভাগের পরিচালক ডাঃ মাইক রায়ানের মতে- ভাইরাস মানুষের জন্য যতটা ক্ষতিকর, একটা ভুল ভ্যাকসিন তারচেয়ে আরো বেশি ভয়ানক। কারন বহু আক্রান্ত মানুষ নিজ শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার গুনেই সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষমা রাখেন, যেখানে ভুল ভ্যাকসিন দেওয়া মানেই মৃত্যু অবধারিত। এদিকে এই ভ্যাকসিন সারা বিশ্বের মানুষের জন্যই অতিপ্রয়োজনীয় আজকের পরিস্থিতিত, তাই এখানে তাড়াহুড়োর কোনো জাইগা নেই।

আমেরিকার সিয়াটেলস্থিত ‘মডারনা থেরাপিউটিকস’ নামের এক বায়োটেক সংস্থা করোনা ভাইরাসের ‘জিনগত বিন্যাসক্রম’ সংক্রান্ত গবেষণা শুরু করেছে, যেখান থেকে আগামীতে এই ভাইরাসের আণবিক গঠন থেকে সংক্রমণের পদ্ধতি ও পরিবেশের সাথে দ্রুত পরিব্যাপ্তির বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। আমেরিকার জাতীয় স্বাস্থমন্ত্রকের তথ্য অনুয়ায়ী উপরোক্ত সংস্থার তৈরি ভ্যাকসিন mRNA, ১৮-৫৫ বছর বয়সী ৪৫ জন- ‘পুরুষ ও গর্ভবতী নয় এমন মহিলাদের’ শরীরে প্রয়োগ করে ভ্যাকসিন ডেভলপের প্রাথমিক দশা সাফল্যের সাথে অতিক্রম করেছে। ঠিক একই ধরনের পরীক্ষা চালিয়েছে ফিলাডেলফিয়ার ‘ইনোভো ফার্মা’ সংস্থা, INO-4800 নামের ভ্যাকসিন ৪০ জন রোগীর দেহে পরীক্ষামূলক ভাবে প্রয়োগ করেছে। আমেরিকারই ‘জন হপকিন্স’ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক নিরন্তর তথ্য বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন, এই ভাইরাসের সংক্রমণের গানিতিক গতিপ্রকৃতি নিরুপনের জন্য।

চীনের উহান প্রদেশে এই করোনা ভাইরাসের প্রকোপ সর্বপ্রথম লক্ষ্য করা গেছিল। তাদের গবেষণা সম্বন্ধে খুব বেশি জানতে পারেনা বাকি বিশ্ব, তবে তাদের কমিউনিস্ট সরকার একটা ‘ডেটাবেস’ প্রকাশ করেছে বিজ্ঞানীদের জন্য, যাতে করে বিশ্বজুড়ে ছিটিয়ে থাকা গবেষকেরা উপকৃত হন। চীনের সরকারী সংবাদপত্র সিনহুয়া’র দাবী অনুযায়ী তাদের সেনাবাহিনীর ‘ইন্সটিটিউট অফ মিলিটারি মেডিসিন’, মানব শরীরে তাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের নিরীক্ষা শুরু করে দিয়েছে গত ১২ই এপ্রিল। এছাড়া ‘কানসিনো বায়ো’ নামের এক ওষুধ কোম্পানী Ad5-nCoV নামের ভ্যাকসিন মানব দেহে প্রয়োগ করেছে, সেনঝেন প্রদেশের ‘জেনো-ইমিউন মেডিকেল ইনস্টিটিউট’ আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত গবেষণা চালাচ্ছে LV-SMENP-DC নামের করোনা ভ্যাকসিনের উপরে।

Adenovirus 26 (Ad26) নামের গবেষণাগারটি এইডস ভাইরাস, সিন্সিটিয়াল ভাইরাস, ইবোলা ভাইরাস, জিকা ভাইরাস, ইত্যাদির ভ্যাকসিনের সফল গবেষণা করেছিল; এটি জনসন এন্ড জনসন কোম্পানীর অধীনস্ত ‘জেন্সসেন ফার্মা’র নিয়ন্ত্রাধীন। এরাও কোভিড ভাইরাসের জিনগত প্রোটিনের উপরে গবেষণা করে প্রাথমিক সাফল্য লাভ করেছে। তাদের বিজ্ঞানী দলের মুখ্য কর্মকর্তা ‘পল স্টোফেলস’ এর বিবৃতি অনুযায়ী- “পৃথিবী কবে করোনার ভ্যাকসিন পাবে তা একমাত্র সময়ই বলতে পারবে, কারন গবেষণার সমস্ত শর্তগুলো বিজ্ঞানীদের নিয়ন্ত্রাধীন নয়। এবং এই ভাইরাসটি সম্বন্ধে কারো কাছেই কোনো তথ্য ছিলনা, তাই সকল বিজ্ঞানীদের শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে। তবে আমরা আশাবাদী, খুব দ্রুতই বিশ্বকে আমরা সুসংবাদ দিতে পারব’। প্রসঙ্গত জনসন এন্ড জনসন কোম্পানীটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ওষুধ কোম্পানী। পর্যায়ক্রমে বিশ্বের ১ থেকে ১০ নং ওষুধ কোম্পানী গুলি মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তাদের করোনা গবেষণাকে একটা সম্পূরক রূপ দিতে, যথাক্রমে- ফাইজার, রোচে, নোভার্তিস, মার্ক, গ্ল্যাক্সো-স্মিথ-ক্লিন, জনসন এন্ড জনসন, আবভাই, সানোফি ও ব্রিস্টল-মেয়ার্স-স্কুইবি। এর বাইরেও বহু গবেষক আড়ালেই কাজ করে চলেছেন, যার তথ্য নেই।

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল, চীনের জিজিং হাসপাতাল, এবং উত্তর ইতালির একজোড়া হাসপাতালে একত্রে- ‘হার্ভার্ড’ এর একদল গবেষকেরা করোনভাইরাস রোগীদের উপর ‘ইনহেলড নাইট্রিক অক্সাইডে’র কার্যকারিতা বিষয়ক পরীক্ষা চালাচ্ছে। medRxiv ও bioRxiv নামের দুটি অনলাইন সার্ভারের অর্কাইভে, করোনা রোগীদের সম্পর্কিত প্রচুর সঞ্চিত তথ্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন চীনা গবেষক ও বিজ্ঞানীরা। অথচ এগুলো কোনো যে গবেষকের ক্ষেত্রে বিশাল সম্মান ও অর্থ রোজগারের কারন হতে পারত, কিন্তু বিশ্বের জনগণের স্বার্থে চীনা বিজ্ঞানীরাও নিঃস্বার্থ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

সারা বিশ্বজুড়ে অক্সফোর্ডের ‘জেনার ইন্সটিটিউট’, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকুলার বায়োলজি গবেষণা কেন্দ্র, আমেরিকার ‘কাইজার পার্মানেট’ সহ অনেকেই এই কর্মে ব্রতী। ইতালির করোনাভাইরাস ক্লিনিকাল ট্রায়ালের নেতৃত্ব দানকারী ডঃ ফ্রান্সেস্কো পেরোন বলেছেন- “গবেষকরা কয়েক’শ করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স সনাক্ত করে সেগুলো বিভিন্ন ভাগে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন। দ্রুতই আমরা সফল হব”। রাশিয়ার পিটসবার্গের ‘ডাঃ ডুপ্রেক্স ল্যাব’, প্যারিসের ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউট’, ফরাসি জনস্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্র ‘ইনসার্ম’, ইতালির ‘ইমিউনোসপ্রেসিভ ড্রাগ টোকিলিজুমাব’, অস্ট্রিয়ান ড্রাগ সংস্থা ‘থেমিস বায়োসায়েন্স’, কানাডার ‘ন্যাশানাল ল্যাব’, মন্টানার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথের ‘রকি মাউন্টেন ল্যাবরেটরি’, ইরানের উর্মিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, প্রমুখ প্রতিষ্ঠানেও নিরবিচ্ছিন্নভাবে করোনা মহামারির প্রতিষেধকের খোঁজে সাধনা চালাচ্ছে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ উন্নতি ঘটিয়েছে ইজরায়েল। তাদের দেশের বহুল প্রচলিত নিউজ পোর্টাল ‘Ynet’ জানিয়েছে যে- ইজরায়েল সেনাবাহিনী চীন, জাপান, ইতালি, ব্রাজিল, আমেরিকা, ভারত সহ অন্তত ১০০ টি দেশ থেকে করোনাক্রান্ত মৃত মানুষের নমুনা যোগার করেছে। যেগুলো তাদের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সহযোগিতায়, দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের নিজস্ব কুরিয়ারে, মাইনাস ৮০ ডিগ্রী তাপমাত্রার বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত প্যাকেটে করে দেশের মুল গবেষণা কেন্দ্রে এসে পৌঁছেছে মৃতের নমুনা গুলি। সে দেশের জনপ্রিয় সংবাদ পত্র ‘হারিৎজ’ এর বয়ানে অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তত্ত্ববধানে থাকা ‘ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিকাল রিসার্চ’-এর প্রায় ৩০০ বিজ্ঞানীদের দল, নেস জিজিয়ানা শহরের ল্যাবোটারিতে ভাইরাসটির জৈবিক প্রক্রিয়া এবং চারিত্রিক গুণাবলী বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে বাকিদের তুলনাতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছ। এর মধ্যে রয়েছে আরো ভাল করে শারীরিক লক্ষণ দেখে রোগনির্নয় ক্ষমতা, সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব কমানো, মানবদেহের মাঝে উপস্থিত করোনা প্রতিরোধে সক্ষম এন্টিবডিগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে তাকে কীভাবে আরো শক্তি প্রদান করা যায়, সেই সংক্রান্ত গবেষনাও রয়েছে যেগুলো অস্থিমজ্জা ও জিনগত মডিউল বিশ্লেষণ করে পাওয়া। বিতর্কিত এক এক মাধ্যমের মতে, গ্যালিলি অঞ্চলের একটি ল্যাবে বেশ কিছু ফিলিস্তিনি ও সিরিয়ান উদ্বাস্তুদের দেহে তৃতীয় পর্যায়ের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেছে ইজরায়েল সরকার। চীনের মত না হলেও সে দেশের গোপনীয়তা সবচেয়ে নিশ্চিদ্র। সময়ই বলবে কোন গবেষকের দল সভ্যতার হয়ে বাজি জিতল।

এই হল মোটামুটি বিগত ১ মাস যাবৎ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা পড়ার ফলাফল, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য কোথাও কোনো বিজ্ঞানীকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনিনকে করোনার ওষুধ বলে ব্যবহারের নিদান দিয়ে বলে পড়লামনা। তাহলে এগুলো হচ্ছেটা কি আর এ নিয়ে আমাদের দেশ জুড়ে আলোড়নই বা উঠল কেন! এ প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে থাকলে দয়া করে বলবেন।

তথ্যসুত্রঃ-
ইকোনোমিক টাইমস ওয়েব পোর্টাল
নিউ ইয়র্ক টাইমস পোর্টাল
দ্য গার্ডিয়ান ওয়েব পোর্টাল
সি এন বি সি পোর্টাল
সায়েন্স ম্যাগাজিন পোর্টাল

রিসেসনঃ সংবাদ মাধ্যম



গোটা বিশ্বের সংবাদ সংস্থাগুলোর হাঁড়ির হাল। বিজ্ঞাপন আসছেনা কর্পোরেট দুনিয়া থেকে। সকলের অনুপ্রেরণা নেই ABP আনন্দের মত, তাই বাকিরা সাহায্য চাইছে লিঙ্ক খুললেই। সেটা ইংল্যান্ডের দ্যা টেলিগ্রাফ হোক বা মার্কিনিদের নিউইয়র্ক টাইমস। কিছু বিদেশী পোর্টাল তো পয়সা না দিলে ঢুকতেই দিচ্ছেনা তাদের ওয়েবসাইটে।
ছাপা কাগজের সংবাদ পত্র বিক্রিও বিপুল হারে কমে গেছে। ভোগ্যপণ্য সহ প্রতিটি সংস্থা যারা বিজ্ঞাপন দেয় তাদের ভাঁড়ারে টান পড়তেই সবার আগে বিজ্ঞাপন খাতে বাজেট কমিয়েছে। তাই সংবাদ সংস্থাগুলোর ভাঁড়ে মা ভবানি, আরো দুটো মাস যদি এভাবে লকডাউন চলে সেক্ষেত্রে সাংবাদিক ও নিউজ এঙ্ক্যরগুলোকেও যে সব্জি বেচতে হবেনা কে জানে!
বিজ্ঞাপন বলতে কিছু অসভ্য প্রশাসক যুক্ত রাজ্যের কর্মকর্তারা তাদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্য গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। অনেকে তো আবার পাকায় ১০০ টাকা দিচ্ছে সরকারি কোষাগার থেকে, ৭০% পার্টি ফান্ডে ফেরৎ নিয়ে আসছে বেনামিতে বা কর্পোরেট ফান্ড রূপে। সংবাদ সংস্থা গুলো দেখছে নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো- অগত্যা পায়ে পরে রয়েছে। ধন্যি গণতন্ত্র।
সংবাদের নামে সারা বিশ্বে মিথ্যার দাপটে বর্তমান যুগটার নাম দাঁড়িয়েছিল "post truth era", তুলাদন্ডের সাম্যাবস্থার জন্য প্রকৃতি নিজেই যখন চেপে ধরে- বিধি, অদৃষ্ট বা ঈশ্বরের বাহানাতে, তখন তাদের এমনই হাল হয়। মাভৈ
শেষ পাঁচ বছরে যে কিছুই পারতনা- সে একটা পোর্টাল বানিয়ে কন্টেন্ট রাইটার দিয়ে খবর লেখাতো, রোজগারের জন্য। দেশের অধিকাংস সাংবাদিকিই লাথখোর পেটোয়া, পেশার যে নীতি সেটাই ভুলে গেছিল। সাংবাদিকতার মা মাসি এক করে দিয়েছিল। সুতরাং মানুষ এদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। সুতরাং, এই রিশেসন তাদের জন্য আবার " চপশিল্পে" নতুন নতুন মানবসম্পদ লগ্নি করবে সেটা বলাই বাহুল্য।
চরৈবেতি।
যা হয়, ভালর জন্যই হয়।

সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২০

গণতন্ত্র মিথ ও আগামীর পৃথিবীঃ ২



দ্বিতীয় পর্ব

গণতন্ত্র কতপ্রকারের হতে পারে! গণতন্ত্রের মূলত দুটো মৌলিক প্রভেদ পরিলক্ষিত করেছেন পণ্ডিতেরা। সরকারের গঠনতন্ত্রে প্রতিনিধিত্বমুলক বিষয়ের উপরে নির্ভর করে; প্রথমটি হল ‘প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র’ ও দ্বিতীয়টি হল ‘প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র’। এই নীতির উপরে ভিত্তি করেই রাষ্ট্রের সংবিধান তথা ‘সরকার ও নাগরিকের’ নিয়মতন্ত্রের গঠনপ্রণালী পঞ্জিকরন নির্দিষ্ট হয়।

‘প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র’

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক বাক্তিকে সরকারের অংশীদার রূপে বিবেচনা করা হয়। রাজনৈতিক মতাদর্শের উপরে ভিত্তিকরে জনগণেরা গোষ্ঠীবদ্ধ হয় ও তারা প্রত্যেকে নির্বাচকের ভূমিকা পালন করে। এই পর্যায়ে বাক্তি ও সরকারের মাঝে কোনো সমন্বয়কারী থাকেনা। প্রাদেশিকতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, লিঙ্গভেদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত বিভিন্নতা ইত্যাদিকে অগ্রাহ্য করে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারন পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে সকলের সমঅধিকার রক্ষিত হয়। তত্ত্বগতভাবে দেখলে মনে হওয়া স্বাভাবিক সে এটাই বোধহয় গণতন্ত্রের আদর্শ রূপ, কিন্তু বাস্তবটা ততটাও নিষ্কলঙ্ক নয়। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক বিরোধী বলে একটা সম্প্রদায় থাকে যারা সরকারের পরিচালকদের বিভিন্ন ত্রুটিগুলিকে তুলে ধরে ও জনগনকে সেই বিষয়ে জ্ঞাত করে। যদিও বর্তমানে ‘রাজনৈতিক বিরোধী’ বাক্যটা থেকে রাজনৈতিক শব্দটাকে বেমালুম উহ্য করে রেখে শুধুই ‘বিরোধী’ শব্দটা জনপ্রিয় হয়েছে। ফলস্বরুপ বিরোধটা সমাজের সর্বত্র পৌঁছে গেছে, একদম ভাতের হাঁড়ি পর্যন্ত।

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের জন্য সাওয়াল করতে থাকে মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোই। ঐতিহাসিকভাবে কিছু পরম্পরার ক্ষেত্রে দেখা গেছে- ছোট ছোট প্রাদেশিক রাজনৈতিক দলগুলো প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করে যতক্ষননা তারা ক্ষমতায় পৌঁছে বৃহত্তর গোষ্ঠীতে রুপান্তরিত করছে। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের কিছু জনপ্রিয় পন্থা রয়েছে জনগণের কাছে পৌঁছানোর, প্রথমটি হল- যেকোনো জনমোহিনী উদ্যোগের সূচনা ও দ্বিতিয়টি হচ্ছে গণভোট। দুটি পন্থায় হরেক আঙ্গিকে রাষ্ট্রের জনগণের সামনে উপস্থাপিত হয়, ভিন্ন ভিন্ন অভিলাষ ও অভিসন্ধি নিয়ে। এই পদ্ধতি মেনে সংসদ বা এসেম্বলির প্রতিটি অধিবেশনেই সংবিধানের ধারা পর্যন্ত সংশোধিত, পরিবর্তিত, পরিমার্জনা বা অপোনদন করে দেওয়া হয়; যে পরিবর্তন সকল সময় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বা নাগরিক সুরক্ষার হিতে থাকেনা। এমন পদ্ধতিতেই ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দলগুলি প্রায় প্রতিটিই, জনগণের সার্বজনীন চাহিদার জোট ভাঙতে উপরোক্ত দুই ধরনের পন্থা কৌশলে ব্যবহার করে জনগণের মাঝে বিভাজন ঘটিয়ে দিয়ে থাকে, গোটা বিশ্বে যার উদাহরন ভুঁড়িভুঁড়ি। তা সত্বেও এই প্রত্যক্ষ গনতন্ত্রেই বিক্ষুব্ধ জনগণকে তাদের অপ্রাপ্তির ক্ষোভ মেটাবার সুযোগ দেয় ভোটের বাক্স, পরবর্তী মেয়াদের জন্য সেই সকল রাজনৈতিক দল বা তাদের জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করতে পারে জনগণই।

এই প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র জনগণকে আর শুধু জনগণ না রেখে প্রত্যেককে ‘রাজনৈতিক কর্তৃত্বে’র সর্বক্ষুদ্র একক বানিয়ে তোলে, প্রত্যেককে রাজনৈতিক জ্ঞানের সুযোগ দিয়ে সন্তুষ্ট করার পাশাপাশি রাজনৈতিক ভাবে সচেতন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসীম ভূমিকা রাখে। নাগরিকদের ইচ্ছা প্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্বসহ ও নিরপেক্ষ ভাবে মান্যতা দেওয়ার সাথে, ধর্মীয় কিম্বা রাজনৈতিক মতাদর্শগতভাবে সংখালঘুদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকায় বিষয়টা- প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত; পুঁথিগতভাবে এটা দেখতে নিখুঁত হলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা ভীষণ উদ্বেগের, তাই এই ধরনের গনতন্ত্রকে অন্য কোনো পদ্ধতিরই পরিপূরক বলা যায়না।

গণতান্ত্রিক কার্যবিধি গুলো নিরুপন করার দরুন সঠিক কর্মধারা যুক্ত দিশা অধিগ্রহণ করে, নির্বাচিত সরকার জনমুখী আইনের প্রণয়ন করে ও সেগুলোকে বৈধতা দান স্বরূপ গণমাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রচেষ্টা করে। এই জনমুখী পন্থা গুলো কার্যকর করার কয়েকটি অলিখিত নীতিমালা অনুসরণ করে চলতে হয় ‘প্রত্যক্ষ গনতান্ত্রীক’ রাষ্ট্রগুলিকে। যথা-

i) যেকোনো প্রবর্তনা মূলক উদ্যোগে গণভোটের প্রস্তাবনা আসলে তা কখনই সংসদ বা সরকার নিজে থেকে নিতে গ্রহণ করতে পারবেনা, নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরে যেতে হবে তাদের প্রতেকের মতামত নিতে। কিন্তু এর সমস্যা হল, কতদিন অন্তর কতবার জনসাধারনের কাছে রাষ্ট্র এই ভোটের প্রস্তাবনা দেবে সেটা বড় জটিলতা যুক্ত বিষয়, রাজনৈতিক দলগুলি কখনই জনগণের কাছে নিজেদের উন্মুক্ত না করে একটা অপরিচ্ছন্ন ধোঁয়াশা রেখে দেয়। স্বভাবতই জনগন সরকারকে নিয়ন্ত্রণের বদলে সরকার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করে- তারা কি করবে, কি খাবে, কি বলবে। এই অসামঞ্জস্যতা প্রশ্ন তুলে দেয়, আসলে তাহলে কে সার্বভৌম- নাগরিক না তাদের দ্বারা নির্বাচিত সরকার!

ii) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব আসলে ভোটারের সংখ্যার উপরে ন্যাস্ত থাকে, সুতরাং সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধমত পোষণ করার পুর্ণ স্বাধীনতা থাকবে কিম্বা সেই সিদ্ধান্তকে আরো কীভাবে উন্নততর করা যার সে বিষয়ে মতামত জাহির করতেই পারে যে কোনো নাগরিক। বিশিষ্ট জার্মান দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী জুরগেন হাবের্মাস এর মতে- ‘রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত ভোট প্রক্রিয়াই গণতন্ত্রের অন্তিম নির্নায়ক পদ্ধতি নয়, বরং নিয়মিত আলাপ আলোচনার মাঝে জনগণকে প্রত্যক্ষ ভাবে সংযুক্তিকরনের মাঝেই সর্বোৎকৃষ্ট ফলাফল পাওয়া সম্ভব’। এক্ষেত্রে ভোটারকে যতক্ষণনা তার ভোটগত সিদ্ধান্তের পক্ষে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত বিরতিতে, ততক্ষণ পর্যন্ত মতদানের গুরুত্বকে খাটো করে দেওয়া হয়। সকলসময়েই রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা সাধারন জনগণের কাছে বিভ্রান্তিকর বিষয়, তা স্বত্বেও বর্তমান ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে রাজনীতির সাথে প্রায় সমার্থক করে দেওয়া হয়েছে। রাজনীতি হল ক্ষমতায়নের যন্ত্র- ক্ষমতা বন্টনের নয়; রাজতন্ত্রেও রাজনীতি থাকে সুতরাং রাজনীতি মানেই গণতন্ত্র নয়। কিন্তু গণতন্ত্র মানে অধিকার বুঝে নেওয়া, রাজনীতিতে এ কেউ অংশগ্রহণ করতে পারে, ক্ষমতার সমবন্টন হয় যোগ্যোতা অনুয়ায়ী।

iii) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র এমন একটি হাতিয়ার যার দ্বারা প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রের উন্নতির সুষম বন্টন ও ভোগ করতে সক্ষম। সেটার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংগঠিত সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সমিতি গঠন করে প্রত্যক্ষ ভাবে জনগণকে পরিচালন পর্ষদে অন্তর্ভুক্তি করতে হয়। এতে করে তৃনমূল স্তরের জনগণ যেমন রাজনীতির উপকরণ গুলির সাথে পরিচিত হয়, তেমন অনুশীলিত হওয়ারও সুযোগ মেলে; যেমন পঞ্চায়েত বা পৌরসভা। যেকোনো নীতির পরীক্ষাগার হিসাবে এই সকল পরিসর গুলির ভূমিকা অসীম, এখানে নাগরিকের প্রতক্ষ্য ভূমিকা থাকে গণতন্ত্রিক সরকারের প্রশাসন যন্ত্রকে সম্পাদনা করার; যা কেন্দ্রীয় ভাবে রাষ্ট্রকে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে প্রত্যয় দান করে।

...ক্রমশ

পালঘর সাধু হত্যা

 

মুসলমানেরা সাধু হত্যা করেনি

 

সারফারোজ নামের একটা সিনেমা দেখেছিলাম, যেখানে একদল ডাকাত একটা বাস আক্রমন করে তাদের থেকে সকলকিছু লুঠ করে প্রত্যেককে হত্যা করেছিল। হ্যাঁ, সেটা সিনেমাই ছিল

কিন্তু গত ১৫ই এপ্রিল মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার গড়ছিঞ্চোল গ্রামে যেটা ঘটেছে সেটাও কিছুটা তেমনই

শতাধিক মত্ত জনতা একটি প্রাইভেট গাড়িকে রাস্তায় থামিয়ে সেই গাড়ির ড্রাইভার সহ তিনজনকে হত্যা করে। বাদবাকিরাও বেধরক মারের শিকার। সেইমুহুর্তে পুলিশের একটা গাড়িও এসে উপস্থিত হয়- কিন্তু সেই কনস্টেবলও শুধু প্রহৃতই হন তা নয় বরং পুলিশের গাড়িটিও ভেঙে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলেই মারা যায় তিনজন, যা ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক। একজন গাড়ির ড্রাইভার নীলেশ তালগাড়ে(৩৫), অন্য দুজন- চিকনা মহারাজ(৭০) ও কালপুরুষ গিরি মহারাজ(৩৫)।

জুনা আখাড়ার কয়েকজন সাধু মুম্বই থেকে গুজরাতের সুরাতে যাচ্ছিল কোনো একটা শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যোগ দিতে। আদিবাসী অধ্যুষিত পালঘরের ঐ অঞ্চলে কোনো ভাবে রটেছিল ওই গাড়িতে ছেলেধরা বা 'বাচ্চাচোর' এর দল যাচ্ছে যারা শিশুদের শরীর থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খুলে নিয়ে ব্যবসা করে। যদিও পুলিশ প্রায় ১০১ জনকে গ্রেফতার করার পর বলেছে- এরা স্বসস্ত্র ডাকাতদলও হতে পারে। এই হল ঘটনা

রটনা হল, RSS ও তার প্রোপাগান্ডা মেসিনারি গত ২৪ ঘন্টা ধরে এই বিষয় নিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধাবার প্রচেষ্টার খামতি রাখেনি। কিন্তু লাঠিসোঁটা সহ দলটি আদিবাসী প্রমানিত হতেই ব্যাকফুটে চলে গেছে

সারা ভারত জুড়ে মব লিঞ্চিং বা পিটিয়ে মারার ঘটনার সুত্রপাত RSS নামক সন্ত্রাসবাদী দল ও তার শাখা সংগঠন গুলোর হাত ধরেই। কোনো রাজ্যের প্রশাসনই এ বিষয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আজ তাদের দেখানো পথেই আজ "সাধু সন্ন্যাসীর" দল আক্রান্ত। এটা হওয়ারই ছিলনা কি? নগর পুড়লে দেবালয় কীভাবে রক্ষা পায়?

১৩৭ কোটি ভারতীয়কে শাসন করছে সেই বিজেপি, যাদের ১১৩ কোটি ভারতীয়ই অপছন্দ বা ঘৃণা করে। তাদেরই নেতারা এই মব লিঞ্চিংকে সমর্থন করেছে যখন আহত বা নিহতের নাম মুসলমান ছিল। এমনকি লোকসভাবে মবলিঞ্চিনহ বিরোধী আইন এর প্রস্তাবটুকুকেও বিজেপি সেদিন নস্যাৎ করেছিল, আজ সেই বিজেপিই মব লঞ্চিং নিয়ে লফাও করে সোস্যালমিডিয়ার মড়াকান্না কাঁদছে।

এই ট্রেন্ড ভয়ানক ইঙ্গিত করছে, "এভাবেও পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়" ধারনা বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে গেলে তার ফল মারাত্বক ও সুদূরপ্রসারী। কারন পূর্বের কোনো ক্ষেত্রেই আইনকে সেভাবে কঠোর হতে দেখা যায়নি। সাপুরেরা সাপের ছোবলেই মারা যায়- আজ আইন চোখের পটি খুলে হয়ত দেখতে চেষ্টা করবে- কিন্তু তবরেজ আনসারীদের আত্মারা মিছিল করে অবরোধ করে রাখবে।

সুতরাং এটা একটা ভয়াবহ মৎসন্যায়ের সূচনা মাত্র, যার রুপকার একমাত্র সন্ত্রাসী RSS

সাধু সন্ন্যাসীদের উপর হামলার তীব্র প্রতিবাদ হওয়া উচিৎ দেশ জুড়ে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে বিগত কোনো মব লিঞ্চিং এর সময় মাননীয় সন্তদের তরফে কোনো প্রতিবাদ আসেনি। তারও পরেও বলব, আপনারা এর প্রতিবাদ করুন। এ এক ভয়ানক ইঙ্গিত

 

রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২০

গণতন্ত্র মিথ ও আগামীর পৃথিবীঃ ১

 

প্রথম পর্ব

মাঝে মাঝেই আমরা শুনি গণতন্ত্র বিপন্ন, কিম্বা বড্ড অগণতান্ত্রিক ইত্যাদি বাক্যগুলি। শিরোনামে থাকে- কোথাও না কোথাও গণতন্ত্র লঙ্ঘিতও হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনিই। কখনও মনে হয়নি এই গণতন্ত্র বিষয়টা কি? তার সংজ্ঞা কি? চলুননা গণতন্ত্র নিয়ে আমরা একটু পড়াশোনা করি।

অভিধান বলছে- ‘জনগণ দ্বারা নির্বাচিত, সবচেয়ে যোগ্য জনপ্রতিনিধি দ্বারা প্রশাসন যন্ত্রকে জনহিতে পরিচালনা করার প্রণালী বা সরকারকে এক কথায় গণতন্ত্র বলে’। সুতরাং, জনগণ, যোগ্য, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, জনহিত ও পরিচালনা এই সবগুলি থাকলে তবেই গণতন্ত্র, এপর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এগুলো একটা বা একাধিক না থাকে তাহলে কি! এখানেই হল আসল মজাটা, সে প্রশ্নে পরে আসব। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে যে কেউ জানবে যে- জনগণকে পরিসেবা দেওয়া যন্ত্র ছিল গণতন্ত্র, সেখান থেকে শাসকে তার রূপান্তর ঘটেছে। সে সব বিষয়ে অবশ্যই আসব, তারও আগে চলুন অতি সংক্ষিপ্ত ভাবে গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটু চোখ বুলিয়ে নিই।

গণতন্ত্র নামক শব্দটার উৎপত্তি সেই খ্রীষ্টপুর্ব ৫০০ সনে, গ্রীসের আথেন্স নগরীতে। তৎকালীন ‘এ্যালকমেওনিড’ নামের অভিজাত বংশীয় এক আইনজীবি, ‘ক্লিয়েস্থিনিস’কে গণতন্ত্রের জনক হিসাবে অবিহিত করা হয়। পরবর্তীতে প্রখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল গণতন্ত্র বিষয়ে বহুবিধ জ্ঞান ও তত্ত্ব রচনা করেন। “government will be rule by the best over the rest. an aristocracy based on merit rather than blood” এই ছিল তার প্রবচনের অন্যতম মূলমন্ত্র।

পরবর্তী প্রায় ২০০০ বছর এর তেমন কোনো খোঁজখবর ছিলনা। খ্রিষ্ট পরবর্তী সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ শুরু হয় সংসদপন্থী ‘রাউন্ডহেড’ ও রাজা চার্লস-১ এর অনুগামী ‘কাভালিয়ার’ দের মাঝে। এরই দীর্ঘমেয়াদি ফলশ্রুতি হিসাবে ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের দুটো রাজত্ব একসাথে মিশে গিয়ে গিয়ে আধুনিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্টা হয়, যা ক্রমশই শক্তিশালী হতে থাকে। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপের অন্য অনেক দেশেই তখন গণতন্ত্র বিস্তার শুরু করে দিয়েছে, ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া প্রমুখ তাদের অন্যতম।

বিশ্বের অন্যপ্রান্তে ইউরোপিয়ান লুঠেরা জাতিগুলো লাতিন আমেরিকাকে গ্রাস করলেও, আমেরিকার মূল ভুখন্ডে মধ্য অষ্টাদশ শতকে গৃহযুদ্ধ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্টা পায়। সে তুলনায় আমাদের ভারত তথা উপমহাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাস মাত্র ৭০ বছরের সামান্য বেশি সময়ের। একটা লুণ্ঠিত অশিক্ষিত গরীব জাতিকে দাঁড় করাতে, শিক্ষিত করাতে, মাথার উপরে আস্তানা, দুমুঠো ভাতের যোগান নিশ্চিত করতেই এই সময়টা কোথা দিয়ে চলে গেছে। এর সাথে ছিল নিয়মিত ঘর ও বর্হিশত্রুর আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ। বিশ্বায়নের সাথে পাল্লা দিয়ে এই সময়ের মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা জনগণের হাতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করিয়েছে। এই বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে, যতটা হওয়ার কথা ছিল ততটা হয়েছে কী হয়নি, সে প্রশ্ন থাকাটা গণতন্ত্রেরই অঙ্গ।

শুরুর গণতন্ত্রে মহিলা বা দাসেদের কোনো ভোটাধিকার ছিলনা। তথ্যের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সেদিনের শুরুর গণতন্ত্রের সাথে আজকের গণতন্ত্রের বিপুল ফারাক রয়েছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেমন অনেক কিছুকেই গণতান্ত্রিক বলতে নারাজ তৎকালীন এ্যসেম্বলির নিয়মকে, ঠিক তেমনি সেদিনের প্রেক্ষাপটে ভাবলে আজকের অনেককিছু যাকে আমরা গণতন্ত্র বলি, সেগুলোকে হাস্যকর পাগলামো মনে হতে বাধ্য। মোদ্দাকথাটা হল গণতন্ত্র হল সেই ব্যবস্থাপনা যা সময়ের সাথে ক্রমশই পরিবর্তনশীল, জনগণ শুধু ধ্রুবক রয়ে গেছে। কিন্তু, বর্তমান যুগে ইজরায়েল-ফিলিস্তিনের নাগরিক সমস্যা হোক বা মায়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা, কিম্বা আমাদের দেশেই NRC এর নামে না-নাগরিকত্ব আইন; এই সবের ফাঁসে জনগণ আড়াআড়ি দুটো ভাগে বিভক্ত- একটা নাগরিক অন্যটা উদ্বাস্তু; বলাই বাহুল্য দ্বিতীয় শ্রেনীটার কাছে গণতন্ত্র সোনার পাথরবাটি। সুতরাং জনগণ মানেই সে গণতন্ত্রের অংশীদার নয়- সে কথা আজকে প্রমাণিত।

অতীতের অনেক দার্শনিকই গণতন্ত্র থেকে আইনব্যাবস্থাকে পৃথিকীকরণের কথা বলেছিলেন, কারন গণতন্ত্রের সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপরে। সেখানে রাষ্ট্র, যুক্তি, আইনের গুরুত্ব কখনই ওই সংখ্যাগরিষ্ঠতার উর্ধ্বে যায়না; তেমন বিতর্কিত ক্ষেত্রে ‘রাষ্ট্র’, ‘যুক্তি’ বা ‘আইনের’ সংজ্ঞাই বদলে দেয় সেই সংখ্যাগরিষ্ঠের দল। গণতন্ত্র বিষয়ক নানা বিষয়ে খোদ এ্যারিস্টটলও বিরুদ্ধ মত পোষণ করলেও, তাঁর মতে গনতন্ত্রই সরকারের শ্রেষ্ঠ রূপ নয়, বরং মনার্কি বা আভিজাত্যবাদ দ্বারা প্রাপ্ত ক্ষমতাও যদি আইনের পক্ষে শাসন করে যা প্রান্তিক মানুষটিকেও সরকারের সুফল পৌঁছে দেয়, সেটাও গণতন্ত্রের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

তিনি বিশ্বাস করতেন আভিজাত্যই ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাবার একমাত্র দাবীদার; যে আভিজাত্য বংশানুক্রমে প্রাপ্ত নয়, যেটা সুশিক্ষা ও প্রকৃত জ্ঞানের পরম্পরা বহন করে। এ সব দর্শন তত্ত্বের পরেও গণতন্ত্রকেই তিনি প্রকৃত স্বাধীনতা হিসাবে মানতেন। বহুদলীয় রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষমতালিপ্সা, অলীক প্রতিশ্রুতি আর দুর্বৃত্তায়ন, পুঁজিবাদের দাসত্ব মনোভাব- গণতন্ত্রকে কোণঠাসা করে দিয়েছে আজকের দিনে। ‘ধনতন্ত্রের প্রত্যক্ষ প্রভাবে গণতন্ত্রকে ঢাল বানিয়ে কিছু জনপ্রতিনিধি একনায়ক শাসকে পরিণত হবে আগামীতে’, এ্যারিস্টটল নিজেই এই বিষয়ে সাবধান করে দিয়েছিলেন সভ্যতাকে।

বিপুল ক্ষমতা ও অর্থের নিয়ন্ত্রক রূপে কোনো গণতান্ত্রিক শাসক যখন পদে আরোহণ করেন, কুক্ষিগত করার রিপুগত তাড়না তাকে লোভী করে তোলে। স্বভাবতই সদাপরিবর্তনশীল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিই হল অবক্ষয়গামী। সুতরাং কতগুলি প্রতিষ্ঠান বা সূচকের মানের উপরে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নির্ধারিত হয় বা গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকে বলা যায়, যেগুলোকে গণতন্ত্রের স্তম্ভ হিসাবে গন্য করা হয়। উন্নততর গণতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রের প্রকাশ- এই স্তম্ভগুলোর স্বাস্থ্যের উপরেই নিরুপন হয়। এই পথ বেয়েই প্রতিটি পরিবর্তন পরিবর্তিত হতে থাকে দশকের পর দশকে। গণতন্ত্রের স্তম্ভের বিষয়ে পরবর্তী অধ্যয়ে বিশদে আলোচনা করব, তার আগে বর্তমান পৃথিবীতে কতধরনের গণতন্ত্র আছে সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাতের চেষ্টা করি।

....ক্রমশ

শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২০

আবাপতে মান্নীয়ার মুখ কেন?

 


কেউ কী আমাকে বুঝিয়ে দেবে-
'আবাপ'তে এই ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে করোনার বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই হচ্ছে? অনলাইন পেজ খুললেই এই বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে।

১) এই বিজ্ঞাপন সাধারন মানুষকে কীভাবে উপকৃত করছে?

২) বিজ্ঞাপনে খরচা কত হয়েছে নাকি আবাপ বিনামূল্যে ছেপেছে? টাকা নিলে কত নিয়েছে? এই মহামারির অর্থকষ্টের সময় আবাপ'র পকেট ভরলে কোন নাগরিকের লাভ?

৩) তথাকথিত এই বিশ্বসেরারা কোন দেশে থেকে করোনার বিরুদ্ধে সফল লড়াই এর নজির রেখেছেন?

৪) ভাইরাস নিজে কি এই বিজ্ঞাপন দেখতে পাচ্ছে? মানুষ বুঝতে পারলেও হতেই পারে যে ভাইরাসকে ধমকানো চমকানোর জন্য এই বিজ্ঞাপন।

৫) এনারা ঠিক কি কি বিষয়ে গবেষণা করছেন, মানে ছবিতে যারা রয়েছেন। তারা তাদের মহামুল্যবান গবেষনা আর কাউকে না দিয়ে শুধুমাত্র বাংলাকে রক্ষা করতেই বা এলেন কেন?

৬) একজন মেডিসিনের ডাক্তার, একজন HIV বিশেষজ্ঞ, একজন হু' এর প্রাক্তন আঞ্চলিক অধিকর্তা, দুজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ, একজন আমেরিকার কি একটা বিশেষজ্ঞ, একজন আমলা, একজন প্রাক্তন জনস্বাস্থ্য আধিকারিক। সাকুল্যে মোট আট জন।

৭) এটা কীভাবে 'জনস্বার্থ' সুরক্ষা করছে? কোন নাগরিকের স্বার্থ এতে উপকৃত আবাপ ছাড়া? এই বোর্ড কোন পরামর্শ দিয়েছে যেটার সফল প্রয়োগ করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার?

৮) এনারা ঠিক কে কীভাবে গবেষনা ও অনুপ্রেরণাকে অনুপ্রানিত করছেন? বিশেষ করে আমেরিকার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ করোনাতে- তা ওই আমেরিকান ভদ্রলোককে নিজের দেশের সরকারই পাত্তা না দিলেও ওনার অনুপ্রেরণা ওনালে খুঁজে এনে ফেলেছেন।

৯) বাকিরা ঠিক কি বিষয়ে রাজ্যবাসীর সহযোগিতা করছেন যেটা কেন্দ্র সরকার বা WHO এর গাইডলাইন দিতে পারছেনা?

১০)বিশেষজ্ঞদের জন্য কত আর্থিক বরাদ্দ হয়েছে? সেই টাকায় কিট, PPE, ভাইরাস গবেষণা বা জনগনের পিছনে খরচা না করে এদের পকেট ভরা কেন?

মোটা মাথা তো, তাই কটা প্রশ্ন করেই ফেল্লাম।
আসলে এমন অনুপ্রেরণা তো সেভাবে বিশ্বে আর কোনো নজির নেই, তাই তাদের থেকেও জানা যায়নি। সেজন্যই শুধানো। যাদের এমন বিশ্ব এডভাইসারি বোর্ড নেই তারা কতটা লোকসানে আছে আর আমাদের রাজ্য ঠিক কতটা এগিয়ে আছে?

দিনের শেষে করোনার নামে কেন্দ্রের বরাদ্দ, লোকজনের থেকে চাওয়া অর্থ তথা পাব্লিক মানি দিয়ে এ কার প্রচার হচ্ছে সেটা জানাটা নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২০

কুলুপাধীন কালের পরকীয়া

 


(১)

লকডাউন তথা কুলুপাধীন নাম্নী এক ব্যাতিক্রমী প্রতিকুল যুগের অবতারনা হইয়াছে মানবসভ্যতায়, সেই সন্ধিক্ষণের সাক্ষী রূপে নিজেকে আবিষ্কার করিলেও তাহার সম্যক রূপ উপলব্ধি করিতে পারি নাই। বিশ্বচরাচরের সমুদায় মনুষ্য প্রজাতি অদৃশ্য বীজাণুর আক্রমণ হইতে সভ্যতাকে সংরক্ষণ করিবার তরে সংগ্রাম করিতেছে; আমি তুচ্ছ নাগরিক, অগত্যা গৃহবন্দী হইয়াই সংরক্ষিত হইতেছি। পূনঃ পূণঃ এই একঘেয়ে মুখমণ্ডল ও তদনিসৃত ফরমাইস পুঞ্জ দ্বারা অতিষ্ঠ হইয়া; গৃহকর্ত্রীর সমাঙ্গিত অসূয়া পরিবেষ্টিত আমি ক্রমশই নিঃসঙ্গ পার্ষদহীন রূপে দ্বিতলের একটি কক্ষে ঠাই লইয়াছি, দোসর সেই একমেবাদ্বিতীয় দূরসঞ্চালক বার্তালাপ তথা অন্তর্জালীয় অভিগমন যন্ত্র ও অঙ্কশীর্ষক পরিগণক যন্ত্র। এই দুই এর বিদ্যুৎবাহী যবনিকা প্রান্তরে যাবতীয় জৈবিক চলন গমন সীমাবদ্ধ হইয়াছে দর্শন কর্তৃক।

 অবিরতভাবে সপ্তম দিবসকাল হইল গৃহবন্দী সমগ্র দেশবাসী, বিগত কয়েকদিন যাবৎ রাত্রির অন্তিম প্রহরে অদ্ভুত এক অতিপ্রাকৃত বিষয়ে প্রতীত হইলাম। আমাদের বাসভবনের পূর্বপ্রান্তে নব্য আমদানি পট্টাদারের নিবাস হইতে এক তরুনীর বসন্তদূতাকন্ঠী কাব্য-নির্ঝর কর্ণকূহরে পুলকের সঞ্চার ঘটাইলো। লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হইল, অনুদিন একই কাব্যের আবৃত্তি সাধনা অনুশীলিত হইত। কখনও কখনও সান্ধ্যলগ্নে সাধিত হইলেও, রাত্রি চতুর্থ প্রহরের সূচনা লগ্নে কাব্যবিলাস নির্দিষ্ট ছিল। অতঃপর বিরামহীন নিরবতা, গৃহসম্মুখে শিলাজতু নির্মিত মূলসরণি হইতে যন্ত্রশকটের মৃদু তূর্যধ্বনী বিনা কোনো কিছুই আর শ্রবণগ্রাহ্য রহিতনা।

 আমি নিশিপালক প্রজাতির মরমানব, করোনা বীজাণু ভীতির দরুন বর্তমানে রাষ্ট্র কর্তৃক আদেশকৃত 'সঙ্গরোধ' যাপন করিতেছি, দপ্তর যাইবার তাড়া বিহীন জীবনধারায়- বেলা ১২ ঘটিকায় প্রাতঃকালের উদ্ভাস হয়, স্বভাবতই রাত্রি জাগরণে নুন্যতম অসুবিধা হয়না। আমাদিগকের এই আবাসনটি দ্বিতল বিশিষ্ট, উত্তর আধুনিক গঠনপ্রাণালীর না হইলেও নিতান্ত অনাড়ম্বরও নহে। পিতামহের জামানায় এই ভবনগুলি নির্মিত হইয়াছিল, যথেষ্ট মুক্ত পরিসর চতুর্ভিতে অবশিষ্ট রাখিয়া। একই ভিটাতে অন্যান্য পিতৃব্য শ্রেণীর গুরুজন ও তুতো ভ্রাতা-ভগীনিদের নিবাস। কনিষ্ঠ খুড়ো মহাশয়ের বাটিকার অতিরিক্ত কক্ষে নয়া পট্টাদার পরিবারটি ঘাঁটি গাড়িয়াছে, তাহাদিগকে অদ্যাবধি চাক্ষুষ করিবার ফুরসৎ মেলে নাই।

 স্বভাবিক অবসরে আমার মা জননীই স্থানীয় বিশ্বের যাবতীয় তথ্যাদি আহরণ করিয়া সকলের নিকটে তাহা রসমিশ্রিত করিয়া পরিবেশন করিয়া থাকেন। বর্তমান সময়ই অসুস্থ, ইচ্ছাকৃত পল্লীভ্রমণে রোগাক্রান্ত হইবার শঙ্কা শিয়রে দণ্ডায়মান; তদুপরি পিতৃদেব বিকল্প আবাসে স্বপার্ষদ পলায়ন করিয়াছেন আমার মাতৃদেবীর স্বৈরাচারী নিপীড়নের শিকার হইয়া, সেই পাপখন্ডনে তিনি নিজেকে আজকাল অধিকাংশ সময়ই ধর্মকর্মেই ব্যাপৃত রাখিয়াছেন। নিতান্ত প্রয়োজন ব্যাতিরেকে বাহিরে গমন করেননা।

 কাব্য বিষয়ে আমার অধিক শিরঃপীড়া নাই, বিষয়টি যথেষ্ট দুর্বোধ্যও বটে। তদহেতুও ব্যাতিক্রমী ক্ষেত্রে কদচিৎ আগ্রহ প্রসব করে চিত্তপটে। তত্রাচ, দৈনন্দিন মধ্যনিশীথের অপরিবর্তনীয় ও সুনিয়ন্ত্রিত কাব্যগাথা শ্রবণ করিয়া কেমন অদ্ভুতুড়ে প্রকারের অনুভব উদগীরন হইতেছিল। অতীব দরদ মিশ্রিত সেই মায়াবী কন্ঠের উক্ত কাব্যের শব্দমালা আমার নিকটে স্পষ্ট ছিলনা, তথাপি ললনাটি যে এই বিশেষ কাব্যটির উপর সিদ্ধপ্রাপ্ত হইয়াছে তাহা লইয়া সন্দেহের কোনো অবকাশ ছিলনা। গ্রীষ্মকালের নিমিত্ত কক্ষের বাতায়ন উন্মুক্তই থাকে, আমি সেই বাতায়নের একটির প্রকোষ্ঠে উপবিষ্ট হইয়া অদৃশ্য সুরেলা কন্ঠের প্রতি মনোনিবেশ করিতে লাগিলাম প্রত্যহ।

 কুলুপাধিনস্তের প্রতিটি দিবস অতিবাহিত হইতেছিল নির্বিঘ্নেই, অপর দিকে অতিন্দ্রিয়ার বিরামহীন কাব্যবিলাসে কোন ছেদ পড়ে নাই। অন্তরের ব্যাকুলতা দিনদিন বৃদ্ধি পাইবার দরুন, অষ্টম দিবসে মাতাশ্রীকে গূঢ়সংবাদবাহক রূপে তথায় প্রেরণ করিলাম কৌশলে। নব্য পড়শীর কুশলাদি সহ কুলুপাধিন কালে কোনো প্রকারের সহযোগিতার প্রয়োজন রহিয়াছে কিনা তাহার সন্ধান লওয়া সুনাগরিকের ধর্ম।

 নৈশভোজনকালে মাতৃদেবী হইতে প্রাথমিক রেইকির যাবতীয় বিষয়ে অবগত হইলাম। পরিবারটির সদস্য সংখ্যা দুই জন, পার্শ্ববর্তী জিলায় তাহাদের নিবাস। বদলির চাকুরীর সুত্রে এই মহল্লাতে আগমন, বর্তমানে অবশ্য একটিই প্রাণীর বাস হেথা, স্ত্রী'টি। তাহাদের সন্তানহীন পরিণয়ের বয়স দশটি বসন্ত পার করিয়াছে, স্বামী কোটাল বিভাগে চাকুরিরত। বদলি আদেশ হইলেও কুলুপাধীনের আকস্মিকতায় তাহার রুপায়ন স্থগিত হইবার দরুন, পুরাতন কোতোয়ালিতেই কর্তব্যরত রহিয়া গিয়াছেন, অথচ স্ত্রী ও গৃহাদি আসবাবপত্র সকলই এই নূতন আস্তানায় পৌঁছাইয়াছে।

 উপচিত হইলাম, এক নিরুপায় রমণীর সোহাগবিচ্ছেদের আর্তকাব্য শ্রবন করিতেছি রোজ, চিত্তাভ্যন্তরে পরকীয়া নাম্নী পাপবোধ জাগ্রত হইতেই তাহা স্বত্তাকে দংশন করিতে লাগিল। আমার কনিষ্ঠ খুড়ো রাষ্ট্রীয় সৈন্যদলের করণিক, ভিনরাজ্যে তাহার নিবাস। সেই হেতু তাহাদের প্রয়োজনাতিরিক্ত কক্ষগুলিতে নিয়মিত পাট্টাদার তথা ভাড়াটিয়াদের আনাগোণা দেখিয়াছি, সুতরাং নূতন মানুষ আমার সন্নিকটে নতুন কোনো বিষয় যেমন ছিলনা, তেমনই তাহাদিগক সম্বন্ধীয় কখনও কোনো প্রকারের কৌতুহলও সঞ্চার করেনি ভাবনাপটে। নিশিজাগরণ করিয়া আমার সাহিত্যচর্চার স্বভাব বহু পুরাতন, স্ত্রী-কন্যাত্রয় মিলিতভাবে জাগরণ পীড়া ও আমার ন্যায় 'সংক্রামক নমুনা' হইতে পরিত্রাণ পাইতে অগত্যা অন্য কক্ষে শয়নের ঘটনা- নিজ ক্ষেত্রেই ইতিহাস। এমতাবস্থায় একাকী ব্যাক্তির মধ্যরাত্রে পুনরায় কাব্যবিষাদনামা কর্ণকূহরে প্রবেশ করিতেই চিত্ত ব্যাগ্র হইয়া উঠিল, পরকীয়ার পাপবোধ মুহুর্তেই নিশীথের তিমিরে বিলীন হইয়া হৃদয়ে অনুরাগের মুকুল অঙ্কুরিত হইয়া গেল। অনুভব করিলাম, তাহার একাকীত্ব আমার প্রানে চঞ্চলতা সৃষ্টি করিয়াছে, যাহা ক্রমশই বর্ষার ছত্রাকের ন্যায় সংক্রমণ ছড়াইয়া দিতে লাগিল সমগ্র মননে।

 নবম দিবসে শরমের মাথা খাইয়া স্ত্রীকে প্রশ্ন করিয়াই বসিলাম, "পড়শী পিতৃব্য গৃহের নূতন ভাড়াটিয়া কী উন্মাদ"?

ভার্যা আমার দিকে সন্ধিগ্ধ দৃষ্টিপাত করিয়া শুধাইল- "কেন, কি হইয়াছে? সহসা এই উদ্বেগের হেতু”?

কহিলাম, "না তেমন গুরতর কিছু নয়, তথাপি একটি ঘটনা প্রাণে ক্লেশের সঞ্চার ঘটাইয়াছে। তুমি শ্রবণ করিয়াছো কিনা জানিনা- স্ত্রীলোকটি মধ্যরাত্রে নিত্যদিন একই কবিতামালা বারংবার আবৃত্তি করেন, এবং নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে। বিষয়টা কী অস্বাভাবিক নহে"?

 স্ত্রী ঈষৎ বক্র হাস্যের সহিত কহিল, "উঁ, মিনশে যেন রাধাভাব ধারন করিয়া শ্রীনন্দনন্দনের মোহনবংশী শুনিয়া অবস হইয়া গিয়াছে। রাত্রিকালীন আবৃত্তি বিষয়ে জানিনে, তবে রাসমণ্ডলের রসিকেশ্বরীটি অতিশয় সুন্দরী এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু..."।

 সেই মুহুর্তে মধ্যম কন্যার তীব্র চিৎকারে আলাপচারিতাতে বিরতি আসিল, কারন স্ত্রী দ্রুতপদে সেই অভিমুখে ধাবিত হইল, নিশ্চই ভগিনীগণের মাঝে ক্রীড়াচ্ছলে কলহজনিত বিবাদ ঘটিয়াছে। পরন্তু, মনজগতের উৎকণ্ঠা আরো বিপুল পরিমাণ বাড়িয়া গেল স্ত্রীলোকটি সৌন্দর্য জনিত সংবাদ শ্রবণ করিবা ইস্তক। অবচেতনে কতশত ভাবনারা জট পাকাইয়া গেল, স্বামীর বিরহে বিরহিণী বেচারি রমণীর সন্তানও নেই যাহাতে তাহার একাকীত্ব দুরীভূত হইতে পারে। সুতরাং, আপন চরিত্রের সমাজসেবক বৈশিষ্টটি চরমরূপে জাগ্রত হইবার বাসনা প্রকাশ করিল। 

 

(২)

 যেহেতু দ্বিতীয়তলে অন্য পিতৃব্যের বসবাস, সেইহেতু গগনচন্দ্রাতপ-প্রদেশে পট্টাদারদিগের আসাযাওয়ার উপরে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ এর বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত ছিলাম। এই কুলুপাধীন কালের অখন্ড অবকাশের অপরাহ্ণে গগনচন্দ্রাতপ-প্রদেশে গমন করিয়া যে মধ্যরাত্রির মোহিনীকে চাক্ষুষ করিব সেই উপায় ছিলনা, তবুও বিবাগী ইন্দ্রিয়ের বশবর্তী হইয়া গত দুইদিন যাবৎ সেইস্থান হইতেই একাকী উদয়ারম্ভ চলিতে লাগিল। বর্তমান জীবনে আমার কোনোরূপ অস্বচ্ছন্দ্যতার লেসমাত্র ছিলনা, তথাপিও নিজেকে কষ্টবিলাসী ভাবিতেই বেশ প্রসন্নতা ভাবের উদ্রেগ ঘটিল চিত্তে। ভাবিতেছিলাম বেচারির বৈবাহিক জীবনে বসন্তেরা নিয়মিত উপনীত হইলেও দাম্পত্যে হয়ত শুধুই কাষ্ঠল গ্রীষ্মের দাবদাহ, সেই শুষ্ক জমিনে সামান্য বর্ষার বারিধারা নাজানি কতই নবপ্রানের সঞ্চার ঘটাইবে।

 নিজেকে সাক্ষাৎ কৃষ্ণাকায় জলগর্ভ জীমূতের প্রতিরূপ কল্পনা করিতেই কিছু গম্ভীর ধ্বনী কর্নকূহরে পশিল, তীব্র বজ্রপাত করিয়া বিরহীর উপরে ঝরিয়া পড়িব ওমনি লক্ষ্যভ্রষ্ট কামানের ন্যায় আপন বপুতেই বজ্রপাতের ন্যায় ঝঙ্কারধ্বনি পতিত হইল। ভীষণ রকমের চমকিত হইয়া দেখি, আপন স্ত্রীরত্নটি কুঞ্চিত ললাটে, তীর্যক দৃষ্টি হানিয়া বিস্বাদ কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়িয়া দিল, "কয়েকদিন হইতেই খেয়াল করিতেছি, নিয়মিত একাকী এই গগচ্ছাদনে কিসের তরে আগমন"? আমি দ্বিধাগ্রস্থের ন্যায় কিছু কহিতে যাইব, কুপিত স্ত্রী কহিল, "গৃহে অতিথি নারায়ণের আগমন ঘটিয়াছে, মিষ্টান্নভাণ্ডার হইতে কিছু মিঠাই আনিলে ধন্য হই। পড়শী নবীন পট্টাদার রমণীটি আসিয়াছেন, অতিশয় সজ্জন। দ্রুত কর্ম সম্পাদন করিয়া ধন্য করিলে বাধিত হই"।

 অস্ফুটেই আপন মুখ দিয়া বাহির হইয়া আসিল "...আসিয়াছে"! দুরদর্শের ধারাবাহিকের নেপথ্য সঙ্গীতের ন্যায় আমার মস্তিষ্কের প্রায় প্রতিটি কোষিকাতে তন্ত্রীনির্মিত বাদ্যযন্ত্রের সুরঝঙ্কার উঠিল। আবেগের বশবর্তী হইয়া স্ত্রীকেই আলিঙ্গনাবদ্ধ করিয়া তীব্র আশ্লেষে ভরাইয়া দিলাম। স্ত্রী কি অনুধাবন করিল তাহা বোঝা দুষ্কর, আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে বলিল- "আচ্ছা ঠিক আছে, একটু অধিক কটুস্বরে শাসন হইয়া গিয়াছে, আজি হইতে কিছুদিন তোমাকে অব্যাহতি দিলাম"। কিছুদিন! ত্রাসের প্রকোপে আপনা হইতেই আলিঙ্গনের মুষ্ঠি শিথিল হইয়া আসিল।

 নববধূর মত লজ্জিত হইয়া স্ত্রীধনটি প্রায় দৌড়াইয়া সোপান বাহিয়া দ্বিতলে অবতরণ করিয়া অদৃশ্য হইল, অপরাহ্ণের স্তিমিত সুর্যালোকে বহুকাল পর তাহার প্রতি নেত্রপাত করিলাম, শুভদৃষ্টির মতনই সে আজও রূপসী। কিন্তু স্ত্রীরূপে তাহার উত্তরোত্তর শাসকবৃত্তির প্রকোপে আমার অন্তরাত্মা প্রহারেন সারমেয়র লেঙ্গুড়ের ন্যায় নতমস্তক যাপনে অভ্যস্ত হইয়া  গিয়াছিল।

 সে যাহাই হউক আমি ভাবিতে লাগিলাম ঠিক এই মুহুর্তে অকুস্থলে আমার উপস্থিতি কতটা বাঞ্ছনীয়! এক অত্যাশ্চর্য উদ্দিপনাকে দমন করিয়া আমি নিন্মতলে যাওয়া হইতে বিরতই রহিলাম।

 সেই দিবসগত রাত্রেও বাতায়নের লৌহশলাকাকে মুষ্ঠিবদ্ধ করিয়া কানপাতিয়া কাব্য শ্রবণ করিলাম, যথারীতি শব্দমালা পূর্বের ন্যায়ই অস্পষ্ট রহিয়া গেল। এক অদ্ভুত প্রগলভ রহস্যজাল ক্রমশই আমাকে গ্রেপ্তার করিয়া নিল।

 দশম দিবসের প্রাতঃরাশে কনিষ্ঠা কন্যা কহিল, "গতকাল যে মাসীমণি আসিয়াছিলেন তিনি সকালে 'ডিমের হালুয়া' পাঠাইয়াছেন, তুমি খাইবে"? এরই মধ্যে এতটা ঘনিষ্টতা, তবুও চোখেমুখে এক নির্লিপ্ততা রাখিয়া শুধাইলাম, "কোন মাসিমনি রে"? কনিষ্ঠা পঞ্চমবর্ষীয়া, সে নিরুত্তর রহিলে জ্যেষ্ঠা কন্যা বিষদে বুঝাইবার কসুর করিলনা, কিন্তু আমার ন্যায় জ্ঞানপাপীকে বুঝাইবে সে সাধ্যি তাহার কোথায়! মুশকিল আসান করিল মধ্যম কন্যা, সহসা সে তাহার মায়ের দূরভাষ যন্ত্রের চিত্র সংগ্রহশালা উন্মুক্ত করিতেই- গতকাল অপরাহ্ণে ভগিনীত্রয়ের সহিত সেই মোহনীয় অতিথির প্রতিকৃতি আঁখিপাতে ফুটিয়া উঠিল। কীভাবে নিজের উত্তেজনা গোপন করিব সেই ভাবনাতে প্রাতঃরাশ মুলতুবি রাখিয়া যন্ত্রটি কুক্ষিগত করিয়া আপন কক্ষে শয়ন গ্রহণ করিলাম।

 স্ত্রী পাকশালায় রন্ধনকর্মে ব্যাস্ত ছিল, আমার এহেন কর্মটি প্রাথমিকভাবে তাহার চুক্ষু এড়াইয়া যাইলেও, ভুক্তাবশেষ দেখিয়া চড়াও হইলেন ক্ষনকাল বাদেই। আমি সম্পূর্ণরূপে তাহার ভর্ৎসনা উপেক্ষা করিয়া তাহার রৌদ্ররসে পরিপুর্ণ লাবন্য উপভোগ করিতে লাগিলাম নির্লিপ্ত মুখাবয়বে, পত্নীমহাশয়াও যে পরমা সুন্দরী তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই, তথাপি আমার রাত্রিকালের ওই নিশিঅঙ্গনার রূপলাবণ্য যেন কিঞ্চিৎ পরিমান হইলেও অধিক বলে বোধ হইল। অগত্যা পট্টিকা পরিষ্কার করিয়া অবশিষ্ট ভুক্তাবশেষ হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিলাম, স্ত্রীর রোষ হইতেও। ততক্ষণে সেই পরস্ত্রীর দূরভাষ সংযোগ রাশি হাসিল করিয়া লইয়াছি স্বীয়’স্ত্রীর দূরভাষ যন্ত্র হইতে। অতএব ভাবসাগরে সমাধি লইয়া পরবর্তী কার্যক্রমের গতিপ্রকৃতি নিরুপন দরুন, আদিম রিপুকে তুষ্ট না করিলে প্রাণের সন্তোষ বিলুপ্ত হইবে। কোনো এক আসব উৎপাদক সমিতির প্রজ্ঞাপন বানী শুনিয়াছিলাম বিলাতী ভাষ্যে- man will be man, আমি খামোখা তাহার বিরুদ্ধাচারন করিব কেমনে! 

 

(৩)

 হিনা'র সহিত অন্তর্জালীয় বার্তাপ্রেরন মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপনা আজ পঞ্চম দিবসে গড়াইয়াছে। সম্পর্কটি শুরু বন্ধুত্বের মতই কিন্তু প্রতিদিনিই তাহার চেয়েও অধিক গাঢ় হইতে লাগিল। নকল পরিচয়বহ আননকিতাবের নকল পরিলেখাবৃত পরিচিতির গভীরে আমার উপস্থিতি অত্যন্ত সচেতন ও নিগূঢ়তাচ্ছন্ন; অতএব ব্যাক্তি আমিকে ঠাহর করা অতি দুঃসাধ্য, ধুরন্ধর ব্যাতিরেকে। যদিও আমি আমার অভীষ্ট লক্ষ্যে অবিচল থাকিয়া সফলতা অর্জন করিয়াছি প্রত্যাশা মতই, কারন অন্তর্জালীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মুসাবিদায় আমার অতীব কুশলতার বিষয়ে, তদশ্রেনীয় পরম মিত্রদিগের হইতে প্রভূত শংসা হাসিল করিয়াছি। নিন্দুকে বলিয়া থাকে, তথায় আমার বাকপটুতা যেন বরষার ছত্রাকের ন্যায় ক্রমশ বিস্তার লাভ করিয়া সন্মুখস্থ ব্যাক্তিকে সমাচ্ছন্ন করিয়া তোলে। হিনা প্রত্যহ সর্বদিনব্যাপি সাংসারিক কর্মসম্পাদনের অনুমুখিতা রক্ষা করিয়াও নিরবিচ্ছিন্নভাবে আমার সহিত আপচারিতাতে মগ্ন থাকে রাত্রি দ্বিপ্রহরের কিয়ৎকাল পুর্ব পর্যন্ত, অতঃপর উহা পরবর্তী দিবসের তরে মুলতুবি হইয়া যায়।

 মাত্র সপ্তমদিবসীয় আলাপচারিতাতেই তাহার শৈশব হইতে বর্তমান দিন পর্যন্ত প্রায় সকল কিছুরই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস উন্মোচিত হইলেও, মধ্যরাত্রের কাব্যসাধনার প্রহেলিকা হইতে অবগুণ্ঠন উন্মুক্ত করিতে পারিনাই। স্পষ্টুরভাবে শুধাইব এমন সাহস নেই, সেক্ষেত্রে পরিচয় উদ্ঘাটন হইয়া যাইবার সমূহ সম্ভাবনা, তিনি কৌতূহল বসত শুধাইতেই পারেন, "আপনি কেমনে জানিলেন আমার মধ্যরাত্রির কাব্যবিলাসের প্রসঙ্গ"। বিগত সাতদিনে তাহার তরফে একটি শব্দও ব্যায় হয়নি কাব্য সংক্রান্ত বিষয়ে, অথচ আমার প্রচেষ্টা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের। অগত্যা এই সপ্তম রাত্রিব্যাপীও কাব্যমুর্চ্ছনায় নিবৃত্তি আসিলনা।

 ক্রমশই সম্পর্ক ঘনীভূত হইতেছিল, আদিম প্রবৃত্তি তাহার বিষাদগ্রস্থ অতৃপ্ত আত্মায় কামচেতনা জাগরিত করিয়া তুলিল অচিরেই। তাহার পক্ষ হইতেই সর্বপ্রথম চাক্ষুষ সাক্ষাতের নিবেদন- পরিস্থিতি অতিষ্ঠ করিয়া তুলিল। কুলুপাধিনের অজুহাতে সেই আব্দার হইতে কোনোপ্রকারে পরিত্রাণ পাইতেই, 'কি-নিবেশ' বাহনের দুরেক্ষণ আহ্বান বাণী- প্রতিষিদ্ধ অম্লমধুর কহনের গগনে, কজ্জ্বলের ন্যায় ধুম্রজালে আচ্ছাদিত করিয়া ফেলিল, যাহা উপেক্ষার সর্বপ্রকার বাহানা প্রতিবার অকৃতকার্য হইতেছিল।

 পূর্বরঙ্গের অতীব যাতনায় হিনা নান্মী রমণীটি, প্রণয়ের প্রস্তাবনা করিয়া বসিল আপন বৈবাহিক পরিচয় গোপন রাখিয়াই। আমি পত্রপাঠ তাহা নাকচ না করিলেও বাচনভঙ্গি দ্বারা আমার ঔদাসীন্য অভিলষিত করিলাম। ইহাতে সে দৃশ্যত কুপিত হইয়া দিবসভাগের প্রায় অষ্টঘন্টাধিক কাল আলাপচারিতা রুদ্ধ রাখিল। নৈশভোজনের পর ধ্বান্তচিত্তে ধুম্রপানের নিমিত্তে দেউরিতে পদচারনা করিতেছি, অমনি টুং শব্দযোগে হিনার মুখমণ্ডলের গোলাকৃতি বিম্ব দূরভাষ যন্ত্রের স্ফটিক যবনিকাপাতে প্রস্ফুটিত হইল।  অতঃপর সটান বার্তাবহ চালনতন্ত্র ক্রিং ক্রিং স্বনে নিনাদিত হইতে লাগিল, হরিৎ বর্ণের বোতাম উর্ধ্বে উন্মুলিত করিয়া 'হ্যালো' কহিবার পূর্বেই অপরপ্রান্ত হইতে রোদনধ্বনি সহযোগে তর্জন গর্জন আসিতে লাগিল। আহা কী সুমধুর সুরধ্বনি যেন প্রতিটি বাক্য হইতে পুষ্পরস নিঃসৃত হইতেছে, আমি নিশ্চুপই রহিলাম। ভাবিলাম ইতিপুর্বে তো তাহার সহিত কোন প্রকারেরই বাক্যালাপের অবকাশ হয়নাই, সুতরাং যদি দুএকটি প্রশস্তিসুচক কিম্বা সান্ত্বনাদায়ক ভাষণ প্রদানও করি ধরা খাইবার সম্ভাবনা শূন্য। কহিলাম,

-      আহা এতো উতলা হইবার কী ঘটিয়াছে?

-      হইবনা উতলা! একজন নারীর বেদনা তোমরা পুরুষজাতি কেমনে বিদিত হইবে! নির্মম, পাষাণহৃদয়, বর্বরোচিত...

-      কটূভাষ্যে পীড়া নাই, কিন্তু পুরুষের প্রতি এই ক্ষোভের কারণ কী আমি একাই! নাকি আমি এই গণনার একটি সংখ্যা মাত্র

-      তোমাদের সকলেই নিষ্ঠুর, নির্বিবেক। কেউ কেউ তো পাশবিক স্বত্তাধারী মাংসাশী প্রজাতির...

-      আমি কী আপনার সহিত কোন প্রকারের অশালীন আচরণ করিয়াছি এই ক্ষণকালের আলাপে?

-      তা হয়ত করোনি ঠিকিই, কিন্তু প্রেম নিবেদন করিতেই কুঞ্চিত কেন্নোর ন্যায় সঙ্কুচিত হইয়া আপনার চর্তুপার্শ্বে আবর্তিত হইয়া গিয়াছিলে

-      আহা তা কেন, আসলে এখনও তো আমাদিগের মধ্যে সাক্ষাৎই হয়নাই। না দেখিয়াই...

-      থাক থাক, আর বচনবাজি করিয়া লাভ নাই। কেবলমাত্র সোহাগ অভিষঙ্গে আহ্বান করিলে তো শ্ব'যূথ নাড়াইতে নাড়াইতে আবির্ভুত হইতে

 ইহার পর আর কথোপকথন চালাইয়া যাওয়া মুর্খের কর্ম, স্বভাবতই দূরভাষের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিলাম। পরদিন প্রভাতে হিনার তরফে উপন্যাসের ন্যায় লম্বা বার্তা আসিল, "আমি ক্ষমাপ্রার্থী, তোমার সনে ওইরূপ রূঢ় আচরণ অনভিপ্রেত ছিল। আসলে পুরুষ জাতির উপরে আমার বিরাগভাজনের ইতিহাস বেশ পুরাতন। ঈশ্বর প্রাপ্ত সৌন্দর্যের অপরাধে কিশোরীবেলা কাটিতে না কাটিতেই, পিতৃদেব আমার পরিণয় করাইয়া দিলেন বয়সে দ্বিগুণেরও অধিক এক সরকারী চাকুরের সহিত, যিনি তাহার পিতার একমাত্র পুত্র। অতঃপর আমার বয়সজনিত চপলতাতে, স্বভাবগম্ভীর স্বামী রাজনের ক্রোধাগ্নিতে কুপিত হইলাম। শারীরিক মিলন ছিল আমার জন্য অভিশাপ স্বরূপ, তাহা সত্বেও সন্তানাদির লোভে কয়েক বৎসর সেই নির্যাতন সইয়া লয়েছিলাম। অতঃপর আমাকে বাঁজা মহিলা প্রতিপন্ন করিয়া দাগাইয়া দিলে, আমি চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্মরণাপন্ন হই, এবং প্রমাণিত হয় স্বামী ঠাকুর নিজেই নির্বিজ পুরুষ।

কিন্তু লোকসমাজে পৌরুষত্বের উপরে কালিমা লিপ্ত হইতে দেওয়া যায়না, সুতরাং শ্বশুর-শাশুড়ি ও তাহার জ্ঞাতিগোষ্ঠী দল সমবেতভাবে মিলিয়া আমাকে, হরেকরকমের পরীক্ষানিরীক্ষার জীবন্ত গবেষণাগার বানাইয়া তুলিল। তাহারা স্বীকারই করিতনা যে তাহাদের পুত্রের কোনো প্রকারের যৌনত্রুটি থাকিতে পারে, সুতরাং নিত্যুনতুন গাছগাছড়া, লতাপাতা, ফলমূল, হাকিমি কবিরাজী পথ্যাচার চলিতে লাগিল। শিন্নি, বাতাসা, ধাগা, ধুলফুল সহ সাপ-ব্যাং-গিরগিটির ঠ্যাং খাইনাই এমন অখাদ্য কুখাদ্য ইহজগতেই সম্ভবত অবশিষ্ট নাই। স্বাভাবিকভাবে সকল ক্রিয়াদি নিষ্ফলা হইলে, স্বামী প্রবাসে থাকিবার সুযোগে প্রথমে সাধুসন্ন্যাসীদের কাছে রাখিয়া আসিত, যাহাদের অনেকেই আমাকে সংজ্ঞাহীন করিয়া সতীত্ব বিনাশ করিত সমস্ত রাত্রি যাবত। এমনকি শ্বশুর মহাশয়ের দূরসম্পর্কের কিছু আত্মীয় পুরুষও আমার কক্ষে আসিয়া আমাকে বলপূর্বক বলাৎকার করিয়াছিল। কিন্তু প্রতিবারই আমি গর্ভনিরোধক বাটিকা সেবন করিয়া জারজের জন্মদান হইতে নিজেকে রক্ষা করিয়াছি"।

 গোটাটা পড়িয়া অন্তর অত্যন্ত ব্যাথাতুর হইয়া উঠিল, কী বলিয়া সান্ত্বনা প্রদান করিব তাহা খুঁজিয়া পাইলামনা। সম্যক অনুধাবন করিলাম তাহাদের স্বগৃহ ত্যাজিবার হেতু। যথারীতি তাহার বার্তাপেটিকায় নীলবর্নের অধিকৃত মোহর প্রত্যায়িত হইতেই আমার প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই সে পুনরায় লিখিল, "আগামীকাল শ্বশুর মহাশয় তাহার এক সাধক বান্ধবের সহিত এখানে আসিবেন, সংক্রান্তির পূন্যলগ্নে আমাকে নিরীক্ষণের তরে। এহার কারনে আমি যথেষ্ট পরিমাণে শঙ্কিত রহিয়াছি। ইহাদের প্রতিহত করিবার পন্থা জানা আছে কি? কোনো প্রকারের সহযোগিতা কী সম্ভব তোমার পক্ষ হইতে! আচ্ছা তোমার সাকিন কোথায়"!

 শেষ প্রশ্নের উত্তর আমার ওষ্ঠে বাস করে, কহিলাম- "আমার সাকিন তো আপনার হৃদয়ে"। সে বিগলিত হইয়া জবাব দিল, "তুমিও কী তাহা হইলে শেষমেশ প্রণয়জালে আবদ্ধ হইয়াই গেলে"? পরবর্তীতে হরেকরকমের গল্পগাছাতে আমার মাতিয়া উঠিলেও, হিনার শ্বশুরকে জব্দ করিবার ফন্দিফিকির খুঁজিতে লাগিলাম মনেমনে। 

(৪)

 দ্বিপ্রহরে ভোজনে বসিয়া পরিচারিকার মুখে শুনিলাম, পল্লীতে সদ্য ফিরত পরিযায়ী যুবকের দল চোপরদিবস গৃহবন্দি থাকিবার আদেশ অমান্য করিয়া সমগ্র উপকন্ঠে ঘুরিয়া পল্লিবাসীর প্রাণ অতিষ্ট করিয়া দিতাছে। চকিতেই বুদ্ধি খেলিয়া গেল, শুধাইলাম- “পিসি, উহাদের মাঝে যে সর্দার গোছের তাহার নাম কহিতে পারো”? তিনি কহিলেন, “হারু, বুড়ো, কেষ্টা প্রমুখ, সকলেই ওই ছারিগঙ্গার গাবায় ঘাঁটি গাঁড়িয়া থাকে বৈকালে”। সূর্য পশ্চিমে কিছুটা ঢলিতেই মৎস ধরিবার ছিপখানি লইয়া রওনা দিলাম গঙ্গার উদ্দেশ্যে, গ্রামের অভ্যন্তরে আরক্ষাবাহিনীর তরফে কেউ প্রহরাতে থাকেনা সুতরাং শঙ্কা বিহীন যাত্রায় মেজাজ বেশ ফুরফুরেই রহিল।

 যথারীতি মুখে ধুলানিরোধক বদনবর্ম ও মস্তকাভরন শোভিত আমাকে কেহই ঠাহর করিতে পারিলনা, এই হারু কিম্বা কেষ্টাদের পিতাদের সহিত আমার পরিচয় থাকিলেও, উপস্থিত এই প্রজন্মের সকলেরই বয়স অনুর্ধ্ব বিশবর্ষীয় যাহারা বিগত একদশক ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কর্মে রত। সুতরাং তাহাদের পিতামাতা ও নিকটাত্মীয় ভিন্ন অপর কাহারো পক্ষেই উহাদিগকে সনাক্ত করা অতি দূরহ বিষয়। এই সুত্র তাহাদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য আমাদের নিমিত্ত, যাহারা কালেভদ্রে মহল্লাতে প্রবেশ করে।

 ভণিতা পর্ব মিটিতে, তাহাদের সম্মুখে কর্মের বিষয়টি উত্থাপন করিতেই তুমুল উৎসাহ লক্ষ্য করা যাইল, যেন চড়ক সংক্রান্তির মেলা ও সেই সংক্রান্ত আমোদ বিনষ্ট হইবার আক্ষেপ মেটাইবার এক দারুণ সৌকর্য আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। অর্থবিষয়ক পারিশ্রমকের প্রশ্নই উঠলনা; বরং সস্তার কুক্কুটমাসের গুরুপাকের পরিতোষিকেই তাহারা প্রানবন্ততার সহিত সকল কিছু বুঝিয়া লইল। অনুমান করিলাম তাহারা দলে প্রায় এক ডজন সদ্য যুবক, ধোলাই যে উত্তম প্রকারেই হবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। শুধু তাইই নয়, এক্ষেত্রে ওই ছেলের দলের নিকটে আমি অপরিচিত আগন্তুক, পরিচয় ফাঁস হইবার কোনো শঙ্কা নাই।

 এই দিনগত রাত্রিকালে হিনা সেইভাবে প্রকট হইলনা তরঙ্গমাধ্যমে, নৈশভোজের পর তাহার তরফে একটি বৈদ্যুতিন ডাক পাইলাম। সাথে সাথেই একটি সন্দেশ আসিল বার্তাপ্রেরক মাধ্যমে, “রাত্রি তৃতীয় প্রহরের সূচনা লগ্নে এই ডাক উন্মোচন করিবে, তাহার আগে নহে”। ভাবিলাম, কিইবা আর নতুন লিখিবে আপন বেদনাগাথা ছাড়া, তাই আমি সেই আব্দার মানিয়া ঠিক রাত্রি ১২টা বাজিতেই ডাকবাক্স খুলিয়া দেখিলাম তাহা শূন্য, সাথে সাথে তাহাকে তার পাঠাইলাম। অবগত করাইলাম যে তাহার প্রেরিত ডাকে কিছুই আসে নাই। সে আশ্চর্য জনক ভাবে প্রত্যুত্তর দিল, “আমি অত্যন্ত খুশি। আমার মান রাখিয়াছো, আমি পরখ করিতে চাইছিলাম যে তুমি আমার ভাবনাকে কতটা মান্যতা দাও। এছাড়া তুমি ভাবিতেই পারো- ডাকখানি আমার হৃদয়ের অনুরূপ, শূন্যতায় পরিপূর্ণ, তুমি তোমার অনুরাগ দিয়া শূন্যস্থান পূরণ করিয়া দাও”।

 উদ্বেগ হইল, পরকীয়ার এই ক্রীড়নক না সাজায় পর্যবাসিত হয়। কারন দুজনেই একে অনের নিকট পরিচয় গোপন করিয়া প্রোমোদলীলাতে রত হইয়াছি, এক্ষনে তাহা পরিপক্ক হইয়াছে আপন নিয়মে। কিন্তু ভাবগতিক যাহা ঠাহর হয় তাহাতে অধিক পক্কতার ফলে পচিয়া দুষিত না হইবা পর্যন্ত কেহই ক্ষান্ত দিবনা। শীঘ্রই শুইয়া পরিলাম সেই রাত্রে, তবুও অবচেতন মনে রাত্রি চতুর্থ প্রহরের প্রাক্কালে পুনরায় সেই কাব্যগাথা শুনিতে পাইলাম।

 

(৫)

 আগামীকাল পয়লা বৈশাখ, প্রশাসনের তরফে আজ কুলুপাধিনতা কঠোরতা অনেকটাই শিথিল, আগামীকাল প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ প্রদান করিবেন। নববর্ষ, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাৎসরিক বকেয়া পরিশোধের মুখ্য সময়। যদিও পথে গনপরিবহণ ব্যবস্থার সামান্যতম উন্নতি ঘটে নাই, তথাপি যন্ত্রচালিত দ্বিচক্রয়ান, ত্রিচক্রয়ান, পণ্যবাহী শকট, তোপশ্রেনী চালিত “নিরীহ-শকট” ইত্যাদিতেই অধিবাসীবৃন্দ পরিবহণের তরে স্থানান্ততরিত হইতেছে। আজই সেই সংক্রান্তির রাত্রি, বিশেষ উপাচারে হিনার জন্য সন্তানসাধন উপাসনা করিবেন কোন এক তান্ত্রিক আত্মীয়। তিনি সন্ধ্যায় আসিবেন শ্বশুর শ্বাশুরি সনে। কোন বাহনে তাহারা আসিবে সেটা হিনার নিকট হইতে জানিয়া লইয়াই যায়, কিন্তু সন্ধ্যায় যদি কোনো প্রকারের গোলযোগ হয় সেক্ষেত্রে আমি সন্দেহের তালিকাতে রহিয়া যাইব, হাজার হউক হিনার স্বামী দারোগা, কোটালের চাকুরি করে; সাবধানের মার নাই।

 সমগ্র দিবস ভীষণ উৎকণ্ঠার সহিত কাটিল সন্ধ্যার প্রত্যাশায়। বৈকাল হইতেই গৃহঅভ্যন্তর হইতেই খেয়াল করিলাম রাস্তায় সেই কুক্কুটখোরেদের জমায়েত হইয়াছে। সুতরাং, শ্বশুর ও তাহার স্যাঙাত ঠ্যাঙাইয়া, হিনাকে চমকপ্রদভাবে বিস্মিত করিয়া উপহার প্রদান করিব; এবং অভিলাই এইরূপ যে- নববর্ষের দিনই আমি আমার পরিচয় উন্মোচন করিব। তাহার প্রাথমিক চমক ভাঙিলে পরে একটা সুস্থ স্থিতিশীল সম্পর্কের পানে বিষয়টাকে অভিমুখ প্রদান করিব এমনই মনোবাঞ্ছা।

 আঁধার সামান্য গাঢ় হইতেই আমি গগনচন্দ্রাতপে উপস্থিত হইলাম, প্রকৌশলী হিসাবে গোটা বিষয়টির সাক্ষী স্বরূপ বিদ্যমান থাকিতে। সামান্য পরেই একটা কোলাহল ও পরে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার শব্দ শুনিলাম, বাজারের বিবিধ বিপণি, গুদাম, ভাণ্ডারগুলি বন্ধ থাকিবার কারনে আলোর প্রকাশ ক্ষীন, ফলত ঘটনাক্রমটি চাক্ষুষ করিতে সক্ষম হইলামনা। দ্বিতলে অবতরণ করিয়া কক্ষের বাতি অক্রিয় করিয়া হিনার তারের প্রতীক্ষাতে প্রীতাক্ষাতে করিতে লাগিলাম।

 কিয়ৎক্ষণ পর, রাজা ও বাবলু নাম্নী দুজন প্রতিবেশী যুবক আসিয়া আমার নাম লইয়া অত্যন্ত চঞ্চল ও সশঙ্কভাবে হাঁকডাক পাড়িতে লাগিল। মাতৃদেবী নিলম্বিত দেউড়িতে যাইয়া কিজানি কী শুনিয়া উর্ধ্বশ্বাসে গৃহ হইতে বাহির হইয়া গেলেন, তাঁকে অনুসরণ করিবার আদেশ করিতে করিতে। সদর হইতে আনুমানিক একশত গজ উত্তরে, অন্ধকারের ভিতরে একটা ছোট্ট জটলা। দুইজন রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটাইয়া রহিয়াছে, ভিড়ের গুঞ্জন হইতে শুনিলাম পথিক দুইজন সশস্ত্র দস্যু দলের সম্মুখে পড়িয়াছিল। চকিতেই জনসমাগম হইতে সেই দস্যুদল পলায়ন করিয়াছে, কিন্তু যাইতে যাইতে দুজনকেই বেধড়ক প্রহার করিয়াছে। একজন জল আনিল, অন্যজন বৈদ্যুতিন মশাল প্রজ্বলিত করিতেই চক্ষু চড়কগাছে চড়িয়া পরবার উপক্রম হইল। দুইজনের একজন আমার পিতাশ্রী, নাতনীদের সহিত নববর্ষ উদযাপনের জন্য যিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন। অন্যজন পঞ্চাশোর্ধ নিরীহ প্রজাতির এক মানুষ, দেখিলাম উপস্থিত কাহারোই পরিচিত নন তিনি। তাহার মুখমণ্ডলে ডাণ্ডাঘাত হইয়াছে, প্রায় সংজ্ঞাহীন।

 ছাউনি হইতে খনিজতৈল চালিত শকট বাহির করিয়া, সকলে মিলিয়া ধরাধরি করিয়া ওনাদের দুজনকে চড়াইয়া দিলেন। দুইজন সঙ্গী সহযোগে অনতিদূরের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লইয়া যাইলাম। চিকিৎসক মহোদয় অতীব সজ্জন ব্যাক্তি, করোনা আবহের মাঝেও তিনি কর্তব্য পালনে অবিচল। তিনিই কহিলেন, “দুজনেই সম্পূর্ণ বিপোন্মুক্ত, শারীরিক আঘাত সামান্যই তবে মানসিক ভাবে অত্যন্ত সন্ত্রস্ত হইয়া রহিয়াছেন। কয়েকদিনের বিশ্রাম প্রয়োজন, এই করালিভাব হইতে উদ্ধারের হেতু। দ্বিতীয় ভদ্রলোকের জ্ঞান ফিরিয়াছে, তাহার জেবস্থিত দূরভাষ যন্ত্র বাজিয়াই চলিতেছিল। ভদ্রলোকের অনুমতি লইয়া যন্ত্রটিকে কানে লাগাইলাম, কেহ একজন মহিলা কহিতেছেন- “কোথায় রহিয়াছো, বাবা আজিকে আসিতে পারেন নাই যানবাহনের সঙ্কটে”। আমি থরথর করিয়া ভিতর হইতে কয়েকবার কম্প-দিয়া যন্ত্রটি মাতৃদেবীর হাতে সমর্পন করিলাম, তিনিই অবশিষ্ট বার্তালাপটি সারিলেন। আমি ওই কণ্ঠস্বরের সহিত পূর্বপরিচিত।

 আরো দেড় ঘন্টাকাল পর অবশেষে সকলে গৃহে উপস্থিত হইলাম, বাপিবাবু অনেকটাই চাঙ্গা হইয়া উঠিয়াছেন। আমার পিতাশ্রী অবশ্য উনার আগেই সুস্থ হইয়া, চা-পান সহযোগে স্বাস্থ্যালয়েই প্রশাসনের কিছু বাক্তিবর্গের সহিত- লকডাউনের প্রভাবে দস্যুবৃত্তি কীভাবে ও কতটা সমাজের বুকে ছড়াইয়া যাইবে সেই বিষয়ে জ্ঞানদান করিতে ব্যাস্ত ছিলেন।

 বাপিবাবুকে আপন স্কন্ধের ভারে লইয়া তাহার কক্ষ অবধি পৌঁছাইয়া দিলাম, তাহার স্ত্রী কপাট খুলিয়া উচ্চস্বরে রোদন শুরু করিয়া দিলেন। বাপীবাবুর স্ত্রী প্রকৃতঅর্থে তাহার কন্যাসমা, বয়সের দিক হইতে। আমার মাতৃদেবী ও খুড়িমাদ্বয় মিলিয়া তাহাকে শান্ত করিল। আমি ফিরিয়া আসিবার জন্য উঠিতেই বাপীবাবু চা-পানের নিমন্ত্রণ দিয়া বসিলেন। ওনার স্ত্রী পাকশালায় যাইতেই আমি স্বচ্ছন্দ পিরিয়া পাইলাম, এদিকে বার্তা বাক্সে মুহুর্মুহ শিহরন হইতে লাগিল। তার চেয়েও বড় শিহরণ বাপিবাবুর প্রত্যয়ী বাক্যবাণে নিবদ্ধ ছিল, “একটু সুস্থ হইয়া নিই, তাহারপর দেখিব কোন বাপের ব্যাটা আমার লাঠিপেটা করে”।

 অতঃপর পড়শী হিসাবে তাহার দূরভাষ যন্ত্রের সংখ্যা সমষ্টি প্রত্যায়িত করিবার উদ্দেশ্যে, অলত্তয়া আহ্বান করিতেই বিগত কয়েক সপ্তাহ যাবৎ রাত্রি চতুর্থ প্রহরের সেই মহিলা কন্ঠের কাব্যাবৃত্তি বাজিয়া উঠিল, বুঝিলাম কোনও এক নির্দিষ্ট কারনে ওই নির্দিষ্ট সময়ে রাত্রির চতুর্থ প্রহরে- স্ত্রী তাহার স্বামীকে দূরভাষে আহ্বান বসত যন্ত্রটিকে উচ্চনাদে ‘অভ্যাগত রাগিণী’ বাজাইত।

 চায়ে চুমুক মারিয়া উপলব্ধি করিলাম, আমার পরকীয়ার সলিলসমাধি বিষয়ে সামান্যটুকুও সন্দেহের অবকাশ নাই। শুধু আক্ষেপ রহিয়া গেল, দৃশ্যৎ বৃদ্ধ বাপি-পুলিসের স্ত্রীরত্নটি অপ্সরার ন্যায় সুন্দরী, তথাপি বিষাদের বসনে ঢাকা। নকল পরিচয়বহ আননকিতাবের নকল পরিলেখাবৃত পরিচিতি অচিরেই বিনষ্ট হইবে, ফুরাইবে বিবাহত্তর প্রণয়ের এই খতিয়ান। আর যাহাই হউক, কোতোয়ালীতে মুগুরপেটা হজম করিবার চেয়ে প্রণয়াশক্তির ভূত পরিত্যাগ করা অধিকতর সহজ।

 শেষমেশ পুনরায় সেই অঙ্কশীর্ষক পরিগণক যন্ত্রকে সঙ্গী করিয়া ব্যার্থ কাহিনীকার হইবার অপচেষ্টা ব্যাতিরেকে কিইবা অস্তিমান রহিল জীবনে!


তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...