বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২০

প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমান ~ ১



প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ নারকীয় ধ্বংস যজ্ঞ পর্ব

প্রথম কিস্তি

আমাদের দেশের সবচেয়ে বিচক্ষণ ব্যক্তি বোঝাতে চালু উপমাটা হলো- ‘চাণক্য’; যার কূটনীতি দিয়ে ২৩৪ বছরের একটা সাম্রাজ্য মেয়াদী হয়েছিল, অথচ যে কূটনীতি দিয়ে প্রায় হাজার বছরের ইসলামিক শাসনের ইতিহাস, তাদের নাকি কোনো জ্ঞানীগুণী, বিচক্ষণ ব্যক্তিই ছিল না; সকলেই হিংস্র আর বর্বর ছিল। এ লজ্জা মুসলমানেদের নিজেদের একান্ত লজ্জা। মনুবাদীরা ২০০০ বছরের পুরাতন মনীষীকে আদর্শ হিসাবে খাড়া করতে পারে, তার গৌরবের ছটায় সকলে উদ্ভাসিত হয়। ইহুদীরা, খ্রিস্টানেরা হাজার বছরের গৌরবে গৌরাবান্বিত, আর মুসলমান সামান্য ২০০ বছর পিছনের অতীতকে সোজা কবরে চালান করে দিয়ে মুসলমানত্ব বজায় রেখেছে- লুঙ্গি, দাড়ি, সুরমা, আতর, বিরিয়ানি আর ‘বছর বিয়ানি’ খানকতক বিবি দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে। না এগুলো করার মাঝে দোষ কিছু নেই, কিন্তু অতীতকে না জানার প্রচেষ্টা, নিজেকে শিক্ষিত হওয়ার বাসনা থেকে দূরে রাখা ও প্রজন্মকে শিক্ষিত করার দায়বোধ না থাকা- শাস্তিযোগ্য অপরাধ; আর এই শাস্তিটাই ভারতের মুসলমানেরা ভোগ করছে সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন শাখা দ্বারা।

বাংলাদেশের দিকে নজর দিলে তো সেখানে অবস্থা আরও ভয়াবহ, তারা যে গত শতকের মধ্যভাগ পর্যন্তও ভারতেরই অংশ ছিল সেটাকে প্রায় ভুলিয়ে দিতে পেরেছে তাদের নব প্রজন্মকে। তারা যে একটা মহান ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় সভ্যতার অংশ ছিল সেটা প্রাণপণে মুছে ফেলে বাঁচতে চাইছে, ইংরেজদের ভাগ করে দেওয়া পরিচয় বুকে আঁকড়ে, এদের ইসলামী পরিচয়ের সেই জোর নেই যা দিয়ে আরববিশ্বে ‘সহি মুসলমান’ হিসাবে স্বীকৃতি পাবে, অগত্যা গরুখোর ভারতবিদ্বেষী সারশূন্য জাতি হিসাবে বেড়ে উঠছে- ‘ইমাম মাহদির’ প্রতীক্ষাতে। এদেশে সঙ্ঘ পরিবার যেটা করেছে, বাংলাদেশেও উগ্র মৌলবাদী সংগঠনগুলো সেটাই করেছে, অতীত থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে; আর শিকড়হীন গাছ সামান্য ঝড়েই যেমন পড়ে যায়, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। এখন দেখতে সব ‘ওক্কে মামা’ লাগলেও তাদেরও দুর্দিন ঘনিয়ে আসবে, আর দুর্দিনের জন্য যে অন্য জাতি লাগে না, সেটা বাংলাদেশিদের চেয়ে ভাল আর কে বোঝে! পাকিস্তানিরাও মুসলমানই ছিল, যারা আম বাংলাদেশিদের প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করত। ভারতের সেনাবাহিনীর সাথ না পেলে যে আজও পাকিস্তানিদের গোলামি করতে হতো সেটা তারা ভুলে গেছে। তাদের নেতারা ভারতকে শত্রু হিসাবে খাড়া করে দিয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থে; আত্মবিস্মৃত জাতি হিসাবে এদেরও পতন অনিবার্য, না হলে ইতিহাসের মৌলিক সূত্রই বদলে যাবে।

পাকিস্তানের বিষয়ে প্রায় কিছুই জানি না, তাই তারা ঠিক কতটা নিজেদের অতীতকে ভুলেছে সে আলোচনা করার সুযোগ নেই। তাহলে দেখা গেল, ইতিহাস বিস্মৃত হওয়ার জন্য মনুবাদের প্রয়োজন নেই, ইসলামিক জামাতি মৌলবাদের দল হোক বা খ্রিস্টিও বা জায়নবাদীদের দল- ক্ষমতার চক্করে ইতিহাসকে হয় এরা ভুলিয়ে দেয় বা নতুবা বিকৃত করে; খোজা প্রজন্ম বাধ্য হয়ে পশ্চিমা ন্যাংটা সংস্কৃতির মাঝে নিজের আইডল খুঁজে ফেরে। চলুন আবার প্রবন্ধের বিষয়ে ফিরি-

সুমেরীয়, হুরিয়ান, ব্যাবিলনীয়, অসিরিয়ান, আক্কিডিয়ান, হিট্টিয়ান, মেদিয়ান, কার্থাগিনিয়ান, পার্থিয়ান ইত্যাদি সাম্রাজ্যের সমসাময়িক কোনো ভারতীয় সাম্রাজ্যের স্পষ্ট ঐতিহাসিক দলিল সম্বলিত উল্লেখ নেই ইতিহাসে। পারস্য সাম্রাজ্যের ইলামাইট সংস্কৃতি ও তৎপরবর্তী ফেনিসিয়া, আখমেনিড, সাসানিড প্রমুখ সাম্রাজ্যের সমসাময়িক কাল থেকে তৎকালীন ভারতের সামাজিক ইতিহাস নিয়ে দু’কলম লেখার মতো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। যদিও মধ্য এশিয়ার পাশাপাশি আফ্রিকার মিশরীয় সাম্রাজ্য তো খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ বছরেরও বেশি পুরাতন, যার পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও রাজনৈতিক লিপিবদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। সেটা মিশরের আদিকালের থেনিস মেমফিস থেকে শুরু করে, পিরামিড কালের ‘খুফু, খাফ্রে, মেনকুরে’ ফ্যারাও হয়ে ‘সাক্কারার ডিজেসার’ হোক বা গিজার ‘গ্রেট স্ফিংস’– এদের ইতিহাস মোটামুটিভাবে অক্ষত প্রায়। এর পরবর্তীতে আমেনহোতেপ, রামোসিস, সিয়ামুন, ওসোরকোন হয়ে খ্রিস্টের জন্মের মাত্র কয়েক'শ বছর আগের নেকানতাবোর ইতিহাস পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ আছে।

...ক্রমশ

বুধবার, ১ জুলাই, ২০২০

প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ ৩



প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ আত্মবিস্মৃত পর্ব


তৃতীয় কিস্তি

ভারতের ইতিহাস অতি সুপ্রাচীন। ধ্রুপদী ভারতীয় যে ইতিহাস তার সূত্রপাতের আগে প্লেস্তোসিন ও মেসোলিথিক যুগের তেমন বিশেষ ইতিহাস পাওয়া যায় না, তবে সেগুলো যে ছিল এই ভূখণ্ডে তার প্রমাণ রয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। পরবর্তীতে প্যালিওলিথিক যুগেরও সামান্য কিছু ধ্বংসাবশেষ ওই যুগ সম্বন্ধে সামান্য ভাসা ভাসা ধারণার বেশি কিছু দিতে পারেনি। ১৯২৯ সালে ‘জারিস-মিডৌর’ মাটি খুঁড়ে মেহেরগড় সভ্যতার আবিষ্কার নিওলিথিক যুগের ভারতীয় সভ্যতা সম্বন্ধে অকাট্য প্রমাণ দাখিল করে; কিন্তু এ সকল ক্ষেত্রেই সমাজব্যবস্থা সম্বন্ধে কোনো প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি, যার উপরে ভিত্তি করে তৎকালীন সামাজিক ইতিহাস রচনা করা যেতে পারে।

এর পরের ইতিহাসটা ব্রোঞ্জ যুগের, ‘ঘগগর হারকা’ নদী উপত্যকা অঞ্চলের সিন্ধু সভ্যতার। হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো, গানেরিওয়ালা, রুপার, ধোলাবীরা, লোথাল, কালিবঙ্গান, রাখিগড়ি ইত্যাদি স্থানে আবিষ্কৃত হওয়া হরেক ধ্বংসস্থান থেকেও ভারতীয় উপমহাদেশের সভ্যতার প্রাচীনত্বতা বিষয়ে বলিষ্ঠ প্রমাণ রেখেছে, কিন্তু এখানেও সামাজিক গঠন কাঠামোর কোনো অকাট্য ইতিহাস নেই, যার কোনো লিখিত রূপ করা যেতে পারে।

লিখিত ইতিহাস যদি কোথাও থেকে শুরু হয়ে থাকে তাহলে সে সকলই বৈদোত্তর যুগের ইতিহাস। ‘অপৌরুষেয়’ ধারণার ধর্ম ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে এদেশে এসে পৌঁছায় আর্য জাতিরা, এর পরবর্তী যে সমাজব্যবস্থা সেখান থেকে সমাজের খুঁটিনাটি বিষয়ক ইতিহাস পাওয়া যায়, যাকে মোটামুটিভাবে বৃহদর্থে পুঙ্খানুপুঙ্খ বলা যেতে পারে। ভাষাতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান এবং জিনতত্ত্ব থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত সংশ্লেষণের মাধ্যমে অনুমান করা হয়, আর্যদের অনেকগুলো জাতি ভারতের দিকে এসেছিল এবং তাদের মাঝে বেশ কিছু প্রভেদও ছিল।

‘হিট্টিয়ান ও লুইয়ান’ ভাষাভাষী যে দুইটি ইন্দো-ইউরোপিয়ান যাযাবর জাতি এসে পৌঁছেছিল, তারা ছিল শিকারি ও যোদ্ধাদের দল। দানিয়ুব উপত্যকার প্রোটো সেল্টিক ও বাল্টো স্লাভিক জাতি, এই দুয়ের প্রথম অংশ উত্তর-পশ্চিম অভিমুখে যাত্রা করেছিল, অপরটি পূর্বপানে যাত্রা শুরু করে আনাতোলিয় অনার্য সমাজে এসে পৌঁছায় ও মেরেধরে তাদের থেকে চাষের জমি ছিনিয়ে নিয়েছিল; এরাই ‘আন্দ্রনোভা সংস্কৃতির’ উদ্ভব করেছিল। এরই সাময়িককালে প্রোটো-ইতালীয় একটা গোষ্ঠী ‘ইয়াসন্যা’ (বর্তমানের পারস্য) অঞ্চলে এসে ঘাঁটি গেঁড়ে তারা আরও উত্তর-পুর্ব ‘ওসুন’ (বর্তমানের চীন) অভিমুখে যাত্রা করে। এর কয়েক শতাব্দী পর উক্ত ‘ইয়াসন্যা’ অঞ্চলের পার্থেয়ান ও মেদিয়ান’ গোষ্ঠীগুলি আরও পূর্বে আফগানিস্তান অভিমূখে যাত্রা শুরু করে। এই যে যাত্রাগুলো কোনোটাই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, সবটাই রক্তের পিচ্ছিল পথ ধরে এগিয়েছিল।

এই সময়কার শুরুর দিকের জাতিগুলোর মধ্যে ব্যাক্টেরিয়ান-মার্জিয়ানা নামের এক মিশ্র জাতির উদ্ভব ঘটেছিল, যা বর্তমানে আফগানিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত। বিশিষ্ট নৃবিজ্ঞানী ‘ডেভিড অ্যান্টনি’ তার পুস্তকে দাবি করেছেন যে- ইন্দো-আর্য জাতিগুলির প্রবর্তন হয়েছিল ‘সিনতাশতা সংস্কৃতির জাতিগোষ্ঠী’ থেকে- যা ‘বাক্টরিয়ান-মার্জিয়ানা’ সংস্কৃতির একটা অভিশ্রুত রূপ; এরাই পরবর্তীতে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং মায়ানমারের আদিবাসী মানুষদের মাঝে অভিযোজিত হয়েছিল। এই সমস্ত অভিবাসনগুলি আনুমানিক ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সমসাময়িক ঘটনাপঞ্জি, যেগুলো সম্ভব হয়েছিল একমাত্র যুদ্ধের মাধ্যমে, কারণ সেই সময়েই চাকা যুক্ত ঘোড়ায় টানা রথের আবিষ্কার হয়েছিল। অর্থাৎ বিনা যুদ্ধে আর্যরাও এদেশের মাটিতে তাদের সভ্যতা স্থাপনা করেনি, তারাও স্থানীয় অধিবাসী ও তাদের সংস্কৃতি হত্যা করেছিল নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে।

এর পরবর্তীতে লৌহ যুগের সূচনা হয়, যা মূলত সিন্ধু অববাহিকা কেন্দ্রিক হলেও গাঙ্গেয় অববাহিকার বর্তমান বিহার অঞ্চল ও দক্ষিণ ভারতের তেলেঙ্গনা ও কর্ণাটকের হলুর অঞ্চলেও এর নিদর্শন পাওয়া যায়। গাঙ্গেয় অববাহিকা অঞ্চলে নগরায়নের ইতিহাসও এই সময়েই শুরু হয়েছিল। চারণভূমি ছেড়ে জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপনের দিকে এই সময়েই ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল, কারণ লৌহ মূলত ধারালো ও টেকসই অস্ত্র তৈরির কাজেই ব্যবহৃত হতো।

কৌসম্বী (এলাহাবাদ), চিরান্দ, মালওয়া, মহিষাদল, পান্ডু রাজারা, বনাসিয়ান, কায়া, বেনারসের দক্ষিণে চান্দৌলি জেলার মলহার অঞ্চল, মহারাষ্ট্রের জোর্হয়ে সহ তৎকালীন ভারতে বহু নিদর্শন পাওয়া যায় হরেক ঢিবিতে। এই সময়কার শ্রেষ্ঠ নিদর্শগুলোর মধ্যে হাড় এবং হাতির দাঁতের উপরে কারুকার্য সম্বলিত হরেক ধরনের চুড়ি, চিরুনি এবং চুলের পিন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য, যেগুলো লোহার তৈরি অস্ত্র দিয়ে খোদাই করা হয়েছিল। টেরাকোটার মূর্তিও এই সময়ের এক অনন্য নিদর্শন; ষাঁড়, পাখি, ম্যামথের মতো কিছু প্রাণী রূপ পাওয়া যায়।

কাস্তে, কাটারি, কুড়ুল, লাঙলের ফলার মতো কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি সহ, লৌহ নির্মিত অসাধারণ সব যুদ্ধাস্ত্রের নিদর্শন পাওয়া গেছে; যেমন বর্শার ফলা, তীরের ফলা, সকেটেড রিং, ছোট ছুরি এবং টাঙির মতো দেখতে যদিও খুবই অনুন্নত মানের। এর সাথে পাওয়া গেছে কাঠ, পোড়ামাটি ও হাড় দ্বারা নির্মিত ধর্মীয় জপমালা, অর্থাৎ সে যুগের সমাজেও কোনো না কোনো ধর্ম ব্যবস্থা ছিল। সুতরাং সে যুগেও যে ধর্মই থাকুক, ধার্মিক সমাজের সেনারা বা হয়ত সকলেই বাঁচার ও খাদ্যের প্রয়োজনে বা অন্য যেকোনো প্রয়োজনে যুদ্ধ বিগ্রহ করত এগুলো তারই প্রমাণ দর্শায়।

সুতরাং, ইসলামের বহু আগেও যুদ্ধ বিগ্রহ ছিল; কোনও জাতিই লাঠির ডগায় তুলো জড়ানো মধু দিয়ে অন্য জাতির মুখে আলতো ভালবাসাবাসি করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেনি।

দেখা হবে পরের পর্বে।

মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০

প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ ২



প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ আত্মবিস্মৃত পর্ব

দ্বিতীয় কিস্তি

ইতিহাসের আহমেদ শাহ্ আবদালি হোক বা নাদির শাহ্, প্রতিটি মুসলমান শাসকের ভারত আক্রমণের দায়ের বেশ কিছুটা অংশ আজকের মুসলমান ছেলেপুলেদের কমবেশি বইতে হয়, যদিও ঠিকঠাক ইতিহাস না পড়ার দরুন অধিকাংশ ছেলেপুলে জানেই না এনারা কারা। কিন্তু ক্ষমতাসীন, সংখ্যাগুরু জনগণ বা রাষ্ট্র যখন প্রশ্ন তুলেছে তখন হয়ত বা ‘আমরাই’ দায়ী এর জন্য- এমনটা মেনে নিয়ে আমরা মুসলমানেরা চুপ থেকে যাই। একজনও মনুবাদীকে দেখবেন না কোনো শিক্ষিত মুসলমানকে এরা যত্রতত্র পেটাচ্ছে তথা ‘মব লিঞ্চিং’ এর শিকার করতে পেরেছে। শিক্ষিতদের জন্য আইনের নামের প্রহসন আছে, যেখানে লড়াইয়ের জন্য অল্প হলেও ‘সময় ও সুযোগ’ পাওয়া যায়। মব লিঞ্চিং এর জন্য এদের লক্ষ্য অশিক্ষিত গরীব মুসলমান বা দলিত।

তাই এই মব লিঞ্চিং বা অপবাদের যতটা দায় তাদের, তার চেয়ে আমাদের দায় কম কিছু নয়, কারণ এদের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার মতো যথেষ্ট জ্ঞান আমরাই আমাদের উত্তর প্রজন্মকে দিতে পারিনি। আমরা এই মনুবাদীদের নকল করতে গিয়ে নিজস্ব সত্ত্বাকেই হারিয়ে বসেছি; আর আত্মবিস্মৃত জাতির জন্য লাঞ্ছনাই তো একমাত্র পুরস্কার। ইসলাম কোনো ধর্মকে অপমান করার শিক্ষা দেয় না, যারা এটা করে তারা যে ধর্মেরই হোক সেটা ওই ব্যক্তি বা তাদের গোষ্ঠীর বিকৃত ব্যাখ্যা, যা নিজ স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য অপব্যাখ্যা করেছে। মনুবাদীরা আবার মধ্যযুগের অন্ধকারে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে সমাজকে, সূর্য সিদ্ধান্তের নামে জ্যোতিষ আর জ্যামিতিকে মিশিয়ে দেওয়া হোক বা গণেশের মুণ্ডুর প্লাস্টিক সার্জারির তত্ত্ব- আমাদের শেখানো হচ্ছে এটাই আসলে আধুনিকতা, যেমন পশ্চিমারা ‘উলঙ্গ সভ্যতাকে’ আধুনিকতা হিসাবে জাহির করে।

এরা কেউ যেটা স্বীকার করে না যে, ভারতের দীর্ঘ ৮০০ বছরের ইসলামিক শাসনামলে যদি অমুসলিমদের উপরে অত্যাচারই করত তাহলে আজও কেন অমুসলিমরা ভারতের মোট জনসংখ্যার ৮৬%? এই তথ্য শুধালেই আপনাকে প্রথমেই দেশদ্রোহী বলে দেগে দেবে; তারপরেও যদি আপনি বাগে না আসেন- আপনার জন্য থাকবে UAPA এর মতো আইন, একবার গারদে ভরে দিলে তো ভারতীয় আইন ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা সহ জাস্টিস রঞ্জন গগৈ এর মতোন দালালদের খপ্পরে পরে জীবন শেষ হয়ে যাবে, নতুবা জাস্টিস লোয়া।

বর্তমানের ‘হিন্দুত্ববাদী’ শাসকেরা তথ্য ও যুক্তির ধার ধারে না, যেমন তালিবান বা আইসিস জঙ্গি গোষ্ঠীরা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করেনা, আল্লাতন্ত্রের বদলে এরা মোল্লাতন্ত্র কায়েম করে ক্ষমতা ভোগ করে। আসলে স্থান কাল পাত্র ভেদে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো ধর্মের মোড়কে ভেক বদলায়, এদের উদ্দেশ্য ও বিধেয় একটাই- ‘রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা দখল’; আর তার জন্য একটা শত্রু খাড়া করতে’ই হয়। হিটলার ইহুদীদের শত্রু সাব্যস্ত করেছিল দেশপ্রেমের প্রতিরুপ হিসাবে, এদেশীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা মুসলমানেদের সেই স্থানে নিয়ে গেছে।

আপনাকে সুচারুভাবে শেখানো হয়েছে মুসলমানেরাই একমাত্র হিংস্র খুনি লুঠেরা জাতি, এরাই ডজন ডজন বাচ্চা দেয়। এরা যেটা বলেনা- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ থেকে প্রণম্য স্বামী বিবেকানন্দ, এনারাও প্রায় ডজন খানেক ভাইবোন ছিলেন; কিন্তু ওই- যে যা করে করুক, দোষ কেবল মুসলমানের।

এই দোষীদের তালিকাতে আরেকটা নামও এদের হিটলিষ্টে, সেটা হলো কমিউনিস্টরা। আচ্ছা, একটা কথা আমি বুঝিনা যে, পশ্চিমা মিডিয়া সহ আমাদের সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন রাজনৈতিক মুখ, যেমন বিজেপি, তৃনমূল, শিবসেনা, আকালি, বিজেডি প্রমুখেরা বলে কমিউনিস্ট দেশে গণতন্ত্র নেই, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নেই; সেখানে ডিক্টেটরশিপ চলে ইত্যাদি ইত্যাদি। মোদ্দা কথা কমিউনিস্টদের পোঁদে গু, কারণ তারা বর্বর ও ম্লেচ্ছ গোষ্ঠী। এরই সাথে সাথে তারা প্রতিদিন বিভিন্ন মাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশ করে যে, কমিউনিস্ট শাসিত দেশের মানুষ ঠিক কতটা অত্যাচারিত, কতটা লাঞ্ছিত; কোথায় কোথায় তারা গণ বিদ্রোহের আঁচ পাচ্ছে, সে দেশের ক্ষমতাসীন নেতারা কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি বুঝে পাইনা, এরা কোত্থেকে তাদেরই ভাষাতে ‘অগণতান্ত্রিক কমিউনিস্ট’ শাসিত দেশ গুলোর খবর যোগাড় করে, কীভাবে? তারা বিদেশী হয়ে যখন ‘গোপন’ খবর আনতে পারছে তাহলে সেখানে সাধারণ মানুষদেরও ‘গণতন্ত্র বা স্বাধীনতা আছে’; নতুবা তারা প্রতিদিনিই গালগল্প বানিয়ে কেচ্ছাকাহিনি প্রকাশ করে ‘নিজস্ব সংবাদদাতা’ নামের বেশ্যাবৃত্তির পিছনে। দুয়ের যেটাই সত্য হোক, তারা যে প্রকাশ্য মিথ্যাচার করে এ বিষয়ে- তা নিয়ে কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের অন্তত কোনও সন্দেহ থাকা উচিত না।

আচ্ছা বলুন তো, স্বৈরাচারী কিম-জং-উন একটাই ‘পোষ্ট’ তাদের দেশে, এটা ঘোষিত। আমাদের রাজ্যেও তো ‘মান্নিয়া’ বাদে সবই ল্যাম্পপোস্ট- তারজন্য কি মান্নিয়াকে কমরেড হতে হয়েছে? মান্নিয়া ছাড়া একজনের নাম বলুন যার শিরদাঁড়া আছে, যিনি পুরুষ! দিব্বি হিজাব পরিধান করে দুর্গা কার্নিভালে চলে যেতে পারেন ভেকধারী হয়ে। আসলে সমস্যাটা তো ব্যক্তি কেন্দ্রিক, পুঁজিবাদী-মৌলবাদী বিশ্ব এদেরকে একটা ‘কমন’ ছাঁচে ফেলে দিয়ে নিজেদের স্বার্থে চরিতার্থ করে- যার নাম কখনও ইসলামোফোবিয়া কখনও কমিউনিজমফোবিয়া। পুরুষত্বহীনেদের বীরত্বই বিভাজনে।

অনেক ভণিতা হলো, মূলত যুক্তি ও তথ্য দিতেই এই প্রবন্ধের অবতারণা, নিজের বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে আপনিই বিচার করবেন, কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা অপপ্রচার। এরপর আমরা একে একে পর পর ভারতবর্ষের বিভিন্ন সাম্রাজ্য ও তৎকালীন সময়ের যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব। এতে করে বুঝতে সুবিধা হবে এদেশের মাটিতে ইসলাম ও কমিউনিস্ট ভাবাদর্শ আসার আগে ঠিক কতটা ‘মৌনী’ জাতি সকল বসবাস করত। চলুন মূল প্রবন্ধে যাওয়া যাক-

... ক্রমশ

সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০

প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ প্রাক কথন


প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ আত্মবিস্মৃত পর্ব


প্রাক কথন
মুসলমান মানেই খুনে হিংস্র বর্বর জাতি, এটাই বর্তমানে ‘মনুবাদী-হিন্দুত্ববাদী’নাগপুরীয় দেশপ্রেমের মৌলিক স্তম্ভ। ‘মুসলমানেরাই আসলে এই ভারতবর্ষের যাবতীয় দুর্দশার জন্য দায়ী’, এই ইতিহাসই মোটামুটিভাবে পড়ানো শুরু হয়েছে সমাজের সর্বত্র। এর সাথে তো আছেই- বিভিন্ন গণমাধ্যম জুড়ে লাগাতার “মুসলমান=জঙ্গী”ও “মুসলমান=অশিক্ষিত বর্বর”এই দুই ইষ্ট মন্ত্রকে পুঁজি করে বানানো অসংখ্য নাটক, সিনেমা, উপন্যাস, গল্প, টিভি সিরিয়াল সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের হরেক প্রচারণা।
এর দৌলতে খোদ মুসলমান ঘরের সন্তানদের অনেকে সারাক্ষণ অপরাধবোধ ও হীনমন্যতায় ভোগে। একটু লিবারাল কিন্তু পড়াশোনা বিমুখ ‘আধুনিক’ মুসলমান পরিবার নিজের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মাঝে কোনও আইডল খুঁজে পায় না, অথচ গোটা পৃথিবীজুড়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কমবেশি ১২০০ বছর ছেড়েই দিন, আমাদের ভারতবর্ষকে ৮০০ বছর শাসন করেছিল মুসলমান শাসকেরা, যাদের বদৌলতে আমরা আজকে মুসলমান। আসলে মুসলমানদের ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, ইংরেজদের ২০০ বছরের শাসনের নামে লুন্ঠনের ইতিহাস আমাদের পাঠ্য, আমরা তাদের সম্বন্ধে পড়ছি, জানছি; কিন্তু যারা ৮০০ বছর ধরে হাজারে হাজারে সুলতান, নবাব দিয়ে গেল তাদের নাকি সবটাই কাপুরুষতার ইতিহাস। তাহলে মহাপুরুষ আর বীর কারা?
আমাদের শেখানো হয়েছে তৎকালীন বর্গী বা ডাকাত দলের সর্দার শিবাজী ভোশলের আজকের প্রজন্ম হচ্ছে বীর, যারা মুসলমান সুলতান-নবাবদের অধীনস্থ করদ রাজা বা জমিদার ছিল, তাদের প্রজন্মেরাই আসল বীর। ৮০০ বছরের নবাবী-সুলতানী আমলে তাদেরই গোমস্তা, কর্মচারীদের বংশধরেরাই আসলে বীর। সুতরাং, তাদের থেকেই বীরের আইডল খুঁজে নিতে হয়। মুসলমানেরা এদেশ থেকে লুন্ঠন করে নিয়ে যায়নি, তারা এখানেই এদেশের নাগরিক হয়ে মৃত্যু বরণ করছে। লুন্ঠন তো করেছে ইংরেজ, ফরাসিরা; যে ধারা আজও বহাল সুইস ব্যাঙ্কে টাকা পাঠানোর নামে, এটাও তো লুন্ঠনই- দেশে সম্পদের পাচার। অথচ আমাদের আইডল খুঁজতে একমাত্র এনারাই বিকল্প।
হ্যাঁ, আজকের ভারতীয় সংখ্যাগুরু সমাজে কি ‘আইডল’ হওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব নেই! নিশ্চয়ই আছে, বহু বরেণ্য স্মরণীয় ব্যক্তিরা আছেন; কিন্তু তার সাথে মুসলমানেরা ভারতে ইসলামিক শাসনামলের জ্ঞানীগুণীদের বিষয়ে জানবে না? শুধুই শিখবে মুসলমানেরা বর্বর? নিজেকে সম্মান করার অর্থ তো অন্যকে অসম্মান করা নয়, আজকের মহান ব্যাক্তিরাও আমাদের আদর্শ হোক, সাথে সাথে আমরা আমাদের অতীতকেও জানি, এটাই তো সংস্কৃতির অঙ্গ হওয়া উচিৎ ছিল। বর্বরতা দিয়ে ৬ বছরের মোদী সরকার ল্যাজে গোবরে, আর মুসলমানেরা ৮০০ বছর রয়ে গেল শুধুই তরোয়ালের জোরে- এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু হয় না; কিন্তু এটাই আমাদের ইতিহাসের নামে গেলানো হচ্ছে পরিকল্পিত ভাবে। এটাই তো একটা জাতির কাছে সবচেয়ে বড় প্রহসন যারা আপন কৃষ্টির গৌরবময় অতীত জানে না, তারা তো দাসত্বই করবে।
আজকে অধিকাংশ ‘প্রগতিশীল’ মুসলমান, ইসলামী আদব কায়দা, চালচলন, বন্ধুবৃত্ত, খাওয়াদাওয়া সহ নিজের নামধাম থেকেও, পারলে মুসলমানত্বকে এক্কেবারে ধুয়ে পুঁছে ‘খাঁটি’ হিন্দুত্ববাদীদের ‘মতোন’ ‘আদর্শ’ করে তুলতে চায় নিজেদের। কারণ এদের জানানো হয়েছিল তোমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) একজন নারী লোলুপ বদলোক ছিলেন, নামধারী মুসলিম পরিবারগুলো এটাকেই ধ্রুব সত্য হিসাবে মেনেও নেয়। এছাড়া ‘জিহাদি’ মুসলমান মানেই মৃত্যু পরবর্তী ‘৭২ হুর প্রাপ্তির লোভনীয় গল্প’বাজারে দারুণ কাটতি; ‘মনুবাদীরা’ এদের জানায়নি যে, মাত্র ৪০-৫০ বছর আগেও এই মনুবাদীদের পূর্বপুরুষেরা কুল রক্ষার দোহাই দিয়ে বুড়ো বয়স পর্যন্ত শত শত কচি কচি মেয়েদের বিয়ের নামে প্রহসন করে নিজেদের বিকৃত যৌনতাড়না পূর্ণ করত। মানব জন্মেই তো তারা ৭২ বা তারও বেশি ‘হুর প্রাপ্তি’ করে নিয়েছে, এরপর স্বর্গে গিয়ে তাদের যৌনাঙ্গ দিয়ে বীর্য বের হতো, নাকি ‘The End’ লেখা স্লিপ! শুধু কি তাই! আরেকটু পিছিয়ে গেলে, ওই কুলীন বুড়োর মৃত্যুর পর ওনার প্রতিটি বিধবাকেও চিতাতেও তোলা হতো এই গত শতাব্দীতেও; যাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাসই এমন বিকৃত ন্যাক্কারজনক, তারা যে আজ ইসলাম, দলিত, কমিউনিস্টদের ইতিহাস বিকৃত করবে তাতে আর আশ্চর্য কোথায়!
বলা হয় সিনেমা, নাটক, টিভি সিরিয়াল নাকি সমাজের প্রতিচ্ছবি। সেখানে কী বাংলা, কী হিন্দি সিরিয়াল- সর্বক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি TRP পাওয়া ধারাবাহিক গুলো হচ্ছে- এক জন বিবাহিত পুরুষের একাধিক নারী সম্পর্ক, যার কিছু বৈধ বাকিগুলো অবৈধ। দেশের ১৪% তো মাত্র মুসলিম, বাকি ৮৬ শতাংশের ঠিক কত শতাংশের পরস্ত্রী বা একাধিক নারীতে তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলে এই ধরনের সিরিয়াল গুলো দিনের পর দিন জনপ্রিয় হয়ে রয়ে যেতে পারে!
আসলে এটাই তো সমাজের প্রতিচ্ছবি, মুসলমানেরা সামাজিক স্বীকৃতি দিয়ে বিয়ে নামের পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ করে নিলে সে ম্লেচ্ছ বর্বর, বাকিরা ‘স্টেপনি’ হিসাবে মধু খেয়ে নিয়ে ও প্রয়োজন ফুরালে ছেড়ে দিলেই সে আধুনিক, সভ্য হয়ে যায়। মুসলমানেদের ইনস্ট্যান্ট তিনতালাক এদেশে সাজা যোগ্য অপরাধ, আর মোদীজীর মতো মানুষেরা তার অভাগিনী স্ত্রী যশোদা বেনকে ছেড়ে দিলে তা আইনের আওয়াতেই আসেনা, এটাই তো মনুবাদীদের হিপোক্রেসি। গুড়ের স্বাদ সকলেই পেতে চায়, মুসলমান দেখিয়ে ও বলে খায় বলে সে দোষী, বাকিরা প্রকাশ্য প্রতারণা করে বলে সে সৎ- এটা কোনো ন্যায়দন্ড ভাই? যদিও হিপোক্রেটদের কাছে ন্যায়ের আশা রাখেই বা কে?
...ক্রমশ

শনিবার, ২৭ জুন, ২০২০

ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মিথ্যাবাদী রাষ্ট্রনেতা

 


মিথ্যেন্দ্র ধোঁকাদাস ফেকু

‘তিনি’ গালওয়ান উপত্যকা ও দেশের ভূখণ্ডে অবৈধ চীনা অগ্রাসন সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলে চলেছেন অনর্গল, এতে আমরা আশ্চর্যান্বিত নই; কারণ এটাই তার পরম্পরা, ঐতিহ্য। উনি যাদের আদর্শ তারা এই মিথ্যাটিকেই অলঙ্কার বলে মনে করেন।

• তিনি তার শৈশবের গল্পগুলি সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি তার শৈশবের কুমির সম্পর্কে মিথ্যা রটনা ছড়িয়েছেন।
• তিনি ভাদনগর রেল স্টেশনে চা বিক্রি সম্পর্কে ডাহা মিথ্যা কথা বলেছেন
• তিনি তার পড়াশুনা ও ডিগ্রী সম্পর্কে নিখাদ মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি তার বিবাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি তার স্ত্রী ‘যশোদা বেন’ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছিলেন।
• তিনি তার ৫৬ ইঞ্চি বুকের মাপ নিয়ে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি তার ‘ই-ইমেল ও ডিজিটাল ক্যামেরা’ ব্যবহার সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিমি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন, গুজরাটে চীনা ব্যবসায় সমর্থন করার বিষয়ে তিনি মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি ‘প্রতি একাউন্টে ১৫ লক্ষ পৌঁছে যাবে’ নামের মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি ‘পুলওয়ামা’ জঙ্গি হামলা নিয়ে মিথ্যা কথা বলেছেন।
• তিনি ‘আচ্ছে দিন’ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলেছিলেন।
• তিনি ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ সম্বন্ধে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি পেট্রোলিয়াম তেলের দাম সম্পর্কে বলেছেন।
• তিনি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলেছেন।
• তিনি নতুন চাকরির ‘সৃজন’ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি তার ব্যর্থ অর্থনীতি ও তার ফলস্বরূপ মুদ্রাস্ফীতি সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি কালো টাকা সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি বুলেট ট্রেন সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি নোটবন্দী সম্পর্কে ভুরিভুরি মিথ্যা বলেছিলেন।
• তিনি ইতিহাস বিকৃত করে নিয়মিত মিথ্যা বলেন।
• তিনি তার সব অক্ষমতা দুর্বলতা ঢাকতে নেহেরুর উপর দোষ চাপাতে মিথ্যা বলেন।
• তিনি ‘গাটার গ্যাস’ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলেছেন।
• তিনি বিদেশী ‘অভিবাসীদের’ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি লাল আঁখ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি CAA-NRC সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি দেশের করোনা-সংকট সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলেছেন।
• তিনি পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে মিথ্যা কথা বলেছেন।
• তিনি PM Care সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি ‘প্রধানমন্ত্রী তহবিল’ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলেছেন।
• তিনি করোনাকালের আর্থিক ‘প্যাকেজ’ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি করোনার অজুহাতে বিশ্ব থেকে বিপুল ঋণের বিষয়ে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি দেশের সেনা অপহরণ নিয়ে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি এমন একটা প্রাণী- যার গোটাটাই রাশি রাশি মিথ্যাচার।

যেকোনো দাঙ্গা, মুসলমানের উপরে মব লিঞ্চিং, দলিত হত্যা, লেখক হত্যা, সঙ্ঘ পরিবারের শাখা সংগঠনগুলোর জঙ্গীপনা, নেপাল-ভুটান সমস্যা সহ, বহু সংবেদনশীল বিষয়ে মুখে ছিপি এঁটে তামাশা দেখেছেন, মুখ ফসকে টুঁ শব্দটুকু করেননি।

তার হিম্মৎ বা মুরোদ হয়নি, প্রধানমন্ত্রীত্বকালে একটা সাংবাদিক সম্মেলন করার; কারণ এগুলো করতে গেলে পুরুষত্ত্ব লাগে, তিনি ময়ূরপুচ্ছধারী কাক। আদতে তিনি হলেন উভলিঙ্গ কিন্নর, সে বিষয়েও মিথ্যাচার করেছেন। যে দেশীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের (চামচা নয়) সামনে আসতে ভয় পায়, সে শত্রুদের সামনে কীভাবে লড়বে? কীভাবে বীর সেনারা তার মতো ক্লীব রাষ্ট্রপ্রধানকে সামনে রেখে শত্রু সংহারে যাবে?

‘তিনি মিথ্যা কথা বলেননি’ এমন কিছু আছে কি? দেশজ মিডিয়া হাউজ ‘গোদি মিডিয়া’কে অর্থের দ্বারা খরিদ করে তাদের দিয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েই তো আর রাজনৈতিক উত্থান।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফেকু, ধোঁকাবাজ, ও ভীতু ‘সেন্ডিপড’ সদৃশ্য প্রাণী।

এত মিথ্যাচারের পরেও মোদী কেন জিতল, কারণ ইহুদী জায়নবাদীদের দ্বারা ১০০% নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা মিডিয়ার প্রোপাগান্ডায় ‘মুসলমান মানেই জঙ্গি’ এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে গোটা বিশ্বের জনমানসে; ভারতও যার ব্যতিক্রম নয়।

ভারতেও এমন কিছু সুবিধাবাজ, ধান্দাবাজ, ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যক্তিবর্গ আছে যারা সমাজের বুকে বিভেদ সৃষ্টি ও জিইয়ে রাখার মাধম্যে নিজেদের আখের গুছিয়ে রাখতে চায়। কিছু অশিক্ষিত বিকৃতমনস্ক ‘মানুষের’ অন্তরে বাস করা হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণাকে, ‘ইসলামবিরোধী দেশভক্তি’র সমার্থক করে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে মোদীর মেকানিজম। যে পদ্ধতিতে ব্রেন ওয়াস করে ইসলামী জঙ্গি সংগঠনেরা মানববোমা বানায়, এদের ভক্ত তৈরির পদ্ধতিও হুবহু নকল।

জাতীয় কংগ্রেসের ব্যর্থতা, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, আর RSS এর পরিকল্পিত বিভাজনমূলক এজেন্ডার ফাঁদে পড়ে গেছে প্রায় ৩০% মূর্খ জনগণ; যারা মনে করেছিল ১৪% মুসলমানই বাকি অমুসলিম ৮৬% এর যাবতীয় দুঃখ-দুর্দশার জন্য দায়ী। এই ৩০%ই, সাম্প্রদায়িক উত্তেজক কথাবার্তা বলা RSS এর মুখ- মোদীকে নিজেদের ত্রাতা হিসাবে আঁকড়ে ধরেছিল।

RSS ও মোদীর সহযোগিতা করার জন্য মমতা, মায়াবতী, জয়ললিতা, নীতিশ কুমার, নবীন পট্টনায়ক, প্রকাশ আম্বেদকর, আসাউদ্দিন ওয়াইসির মতো ছদ্মবেশী দালালদের দিয়ে দলিত ও মুসলমানদের মাঝে মেরুকরণ করে, বিজেপি বিরোধী ভোটকে শতভাগে বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম হয়েছে। এর সাথে গোটা ভারতের প্রতিটি রাজ্যের প্রতিটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সরাসরি মদত দেওয়ার ঐতিহ্য অতি সুপ্রাচীন, তারাও বিজেপি বিরোধী বিপুল অংশের জনগণকে নিয়মিত বিভ্রান্ত করে বহু দ্বন্দ্বে খণ্ড খণ্ড করে দিতে সক্ষম হয়েছে, ফলস্বরূপ বিজেপির পক্ষে ওই ৩০-৩৫% ভোট একবাক্সে জমা হতেই এই দেশদ্রোহী শক্তি রাষ্ট্র পরিচালনায় চলে এসেছে।

আজ ফলাফল চোখের সামনে, সেই মানুষগুলো যারা ১৪% মুসলমানদের ভয়ে মোদীকে ভোট দিয়েছিল তারাই আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অদৃষ্টের পরিহাসে, দারিদ্রতা, বেকারত্ব, অনাহার, যন্ত্রণাক্লিষ্ট যহ নানান দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে- কারণ তাদেরই ধাপ্পা দিয়ে ‘মিথ্যুক’ নিজে ও তার সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীদের ভোগ ও সম্পদ আহরণের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে।

আজ আর নতুন করে হিন্দু-মুসলমান, মন্দির-মসজিদ, গরু-শুয়োর খাবে না বা খাচ্ছে না। নোটবন্দী, জিএসটির পর অপরিকল্পিত লকডাউনের ফলে কাজ খোয়ানো কোটি কোটি ‘ভক্ত সম্প্রদায়ের’ পেটে এখন রুটির খিদে; মুসলমান তাড়ানোর গল্প ভুলে এখন অনাহারক্লিষ্ট সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখার লড়াই চলছে। আজ ভক্ত সম্প্রদায়ের তুলনাতে কমিউনিস্ট বা আম মুসলমানেদের অবস্থা তুলনামূলক ভাবে ভাল জায়গাতে রয়েছে, কারণ বিজেপি ও সঙ্ঘপরিবার এই মুসলমান ও কমিউনিস্টদের উপরে নিয়মিত অন্যায় অত্যাচার করতে করতে তাদের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাঁচার কৌশল শিখিয়ে দিয়েছে, শিখিয়ে দিয়েছে কীভাবে একত্র হয়ে সদ্ভাব রেখে সকলকে নিয়ে বাঁচতে হয়। কমিউনিটি বন্ডিং দৃঢ় হয়েছে এদের মাঝে, যা আগের থেকে অনেক বেশি।

আজকে চীন, নেপাল, ভুটনা তো বাহানা মাত্র- আসলে এ হলো ওই ৩০% মানুষের বোকামির দন্ড, তাদের অন্তরে চাষ করা ঘৃণার ফসল কেটে যারা লাভ নেওয়া নিয়ে গেছে, এখন ধুধুল চুষছে ওই ৩০-৩৫% ভক্ত, যারা মূলত বিজেপির ভোটার। মহার্ঘ পেট্রোলিয়াম কি শুধু মুসলমান আর কমিউনিস্টদের কিনতে হচ্ছে? নাকি দুর্মুল্য বাজারে অগ্নিমূল্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি শুধু মাত্র মুসলমানদের জন্য! দেশপ্রেমিক বিজেপিদের জন্য কি কোনো আলাদা কাউন্টার আছে? আছে শুধুই ভাঁওতা, যে ভাঁওতাকে তারা অলঙ্কার করে মোদীর মতো ব্লাফমাস্টারকে গদিতে এসেছিল, মাস্টার যথারীতি তার মাস্টারস্ট্রোক দিয়ে গেছে বা যাচ্ছে।

মুসলমানেরা বা কমিউনিস্টরা আর আশ্চর্য হয় না, মুসলমান বিদ্বেষী ৩০% এর দল সময়ের মারে ‘আশ্চর্য’ হতে ভুলে গেছে। বাকিরা তো ক্লীব নপুংশক, না ঘরকা না ঘাটকা।

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২০

অখণ্ড শক্তিশালী ভারতই চীনের সমস্যা কারণ


 
অখণ্ড শক্তিশালী ভারতই চীনের সমস্যা কারণ

এই মুহুর্তে ভারতের প্রয়োজন যেকোনো মুল্যে দেশের অখণ্ডতা বজার রাখার জন্য সবধরনের শক্তি নিয়ে ঝাঁপানো, দলমত নির্বিশেষে। সাম্রাজ্যবাদী চীনের লক্ষ্য ব্যবসা, তার জন্য নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ বা শ্রীলংকার মত ছোট ছোট দেশ সৎ হবে তাদের জন্য তা ততই সহজ হবে নিয়ন্ত্রণ। ভারতের মত বৃহৎ জনশক্তি ও সেই মানানে অর্থ ও সমরশক্তি বিশিষ্ট দেশ যে সব সময় অন্য সকল ‘আমরা পৃথীবি শাসন করব’ ভাবনার দেশ গুলোর জন্য যে অন্তরায় সেটা বলাই বাহুল্য। আর এই জন্যই আমেরিকা, ইজরায়েল সহ রাষ্ট্রপুঞ্জ কেউ সামান্যতম নিন্দা টুকু করেনি চীনের এই অবৈধ অগ্রাসনে, মোদী সরকারের ব্যর্থ বিদেশনীতি আজ উলঙ্গ হয়ে গেছে। তাই কাদা ছড়াছুড়ি না করে দেশের অখন্ডতার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে শত্রু মোকাবিলা করা হোক, কূটনৈতিক স্তর সহ অস্ত্রের ঝনঝনানিতেও।
গালওয়ানের পর সাম্রাজ্যবাদী চীন এবারে আবার ডোকালাম অঞ্চলে অশান্তি বাঁধাবার তাল করেছে, চীন বুঝে গেছে স্বাধীনতার পর এই প্রথম ভারতে ফাঁপা ডায়লগবাজি সর্বস্ব ‘দুর্বল সরকার' গঠিত হয়েছে, যাদেরকে আক্রমণ করাই যায়। তার উপরে সারেন্ডার মোদীর চীনের কাছে প্রায় আত্মসমর্পন একপ্রকারে ভারতীয় সার্বভৌমত্ব ও সেনার গরিমাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। আমেরিকার চামচাগিরি করতে গিয়ে পড়শি সব কটি দেশের সাথে সম্পর্ক তলানিতে, ভুটানও চীনা সেনাদের মদতে তলে তলে ছোবলের প্রতীক্ষায় করছে, নেপাল তাদের সীমান্ত অঞ্চলে ভারী নির্মানে হাত লাগিয়েছে, পাকিস্তান শ্রীলঙ্কা তো অফিশিয়ালি চীনের উপনিবেশ- বাকি বাংলাদেশ; তাহলেই ষোলকলা পূর্ণ হয়।
ভারতের রাষ্ট্রনেতারা বিদেশ কূটনীতি ভুলে, দেশের মানুষকে পড়ুন (মুসলমানকে) রাষ্ট্রহীন করতে NRC এর নীলনক্সা আঁকতে ব্যাস্ত ছিল, ব্যাস্ত ছিল দেশের মাটিতে জাতিদাঙ্গা সংগঠিত করিয়ে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ দ্বারা রাজনৈতিক ক্ষমতা সুনিশ্চিত করা। তার জন্য জঙ্গি যোগসাজশে RSS নামের দেশদ্রোহী সংগঠন পাঠানকটের মত পরিকল্পিত হামলা সংগঠিত করেছিল, যাতে দেশের মানুষের কাছে সেনামৃত্যুর আবেগ দেখিয়ে ভোটে জেতা যায়, ভোটে তো জিতে এসেছে- কিন্তু এভাবে নিজের সেনা যারা নিজেরা খুন করে সেটা কি বিদেশী শক্তি লক্ষ্য করবেনা? যখন প্রতিপক্ষের নাম চীন, যারা কমিউনিজমের ভেকধারী নব্য পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ- তারা সুযোগ কাজে লাগিয়েছে পূর্ণ ভাবে।
অধিক মার্কিন ঘনিষ্টতা পুরাতন বন্ধু রাশিয়াকে রিঙের বাইরে করে দিয়েছিল, নতুন কোনো বন্ধু তো জটাতে সক্ষম হয়নি উপরন্তু শত্রু বাড়িয়েছে। মোদী সরকারের বিদেশনীতি আসলে স্বপার্ষদ মোদীর ব্যাক্তিগত ভ্রমণের ইচ্ছাপূরণ ছাড়া কোনও কাজে আসেনি।
ফেসবুক বা টুইটার তো আর পরীক্ষার হলের প্রশ্নপত্র নয় যে উত্তর অজানা থাকবে, তাই সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রতিটি ভক্ত সব প্রশ্নের জবাব নিয়ে হাজির, সেটা বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত হোক বা না হোক। উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে রাখা ‘পবিত্র বিশ্বাসী’ভক্ত প্রজন্ম তৈরি করার কৃতিত্ব নিশ্চয়ই দাবী করতে পারে ‘সঙ্ঘ পরিবার’, কিন্তু এর মাশুল চরম মূল্যে দিতে হবে আগামী প্রজন্মকে।
কিন্তু সঙ্ঘ-পরিবারের কী যায় আসে! তারা তো ঐতিহ্যগতভাবেই উপনিবেশের পক্ষে, আগে ব্রিটিশ ছিল এখন না হয় চীন হবে!

সোমবার, ২২ জুন, ২০২০

আ'মোদী'ত অ'চীন' কথা


চীনে কি আমাদের মতো ‘সাধারণ মানুষ’ বাস করে না! এই ধরুন যাদের আমাদের ভাষায় বলি অকম্মা বা নিষ্কর্মা! নূন্যতম যোগ্যতাহীন আম-পাবলিকেরা যারা ‘গুড ফর নাথিং’ তারাও গতরে খাটা ‘নাট, বল্টু, বাইকের যন্ত্রাংশ, মায় টুনি বাল্ব’ পর্যন্ত বানায়। তাদের দেশের সরকারি অথবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেগুলোর জন্য অগ্রিম লোন দেয়, ও ফিনিস গুডস কিনে নিয়ে বিদেশের বাজারে তা বিক্রি করে দেশের চূড়ান্ত অকম্মাগুলোকেও আত্মনির্ভর বানিয়ে দিয়েছে। এদিকে চীনা সরকার বৈদেশিক মুদ্রার বিপুল সঞ্চয় গায়ে তুলছে, যে সম্পদ দিয়ে নতুন করে তাদের সাম্রাজ্যবাদী কার্যকলাপ রোজ বাড়িয়ে যাচ্ছে।

আমার দেশের দিকে তাকিয়ে দেখুন, মাতাল বেওড়া ধরনের লোকজন এখানে চা দোকানে আড্ডা দেয়, রাজনৈতিক দলের হয়ে ঝান্ডা নিয়ে মারামারি করে- আর কাজ বলতে, পঞ্চায়েতের লুঠের বখরার জন্য খেয়োখেয়ি, চালচুরি, গাছচুরি, ত্রিপল চুরি।
সব শেষে আসে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রকল্প, ১০০ দিনের কাজ। কী যে ছাতার মাথা দেশের উন্নতি হয় এখানে কেউ জানে না, কংগ্রেসের পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি আমদানি করে দিয়েছে। পুকুর পাড়, নয়ানজুলির আগাছা পরিষ্কার, নদী তীরের কাশবন সাফ করা, সহ যত ধরনের অকাজ যার কোনও বস্তুগত গুরুত্ব নেই সেই ধরনের কাজ করানো হয়। কাজ হওয়া তো বাহানা, যে কাজ একজন স্বাভাবিক রোজের শ্রমিক ১ জনে ১ দিনে করবে, সেটাই ১০০ দিনের সরকারি প্রকল্পে ৫০ জন শ্রমিক মিলে ৪ দিনেও শেষ করতে পারবে না- প্রকাশ্য প্রহসন। গরীবেরা ধাপ্পা দিয়ে টাকা পেয়ে খুশি, সরকার এভাবে বিলিয়ে ভোটের রাজনীতি করতে পেয়েই খুশি। আমরা মধ্যবিত্তেরা এসব দেখে নাটক দেখে খুশি।
আমরা ভাবছিও না, যে টাকাটা খরচা হচ্ছে এই ১০০ দিনের প্রকল্পের মজুরিতে সেটার জন্য আমাদেরই ৮০ টাকা লিটার পেট্রোল কিনতে হচ্ছে, কিম্বা রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাকে পুঁজিপতিদের কাছে বেচে দিয়ে হচ্ছে , অথবা চীন, আমেরিকা বা আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডারের থেকে ঋণ করে এনে সেটা দিচ্ছে।
এতে ডান, বাম, মধ্য, টিকি, দাড়ি, নেড়া সবাই সমান দোষী; কারণ এ বিষয়ে সকলেরই মুখে কুলুপ। দেশের জনগণকে মূর্খ ‘মুফত খোর’ অশিক্ষিত বানিয়ে রেখে নিকৃষ্ট অশিক্ষিত নেতাদের দিয়ে বিশ্বের সেরা হব এমন ভাবনা পাগল ছাড়া কেউ ভাবে না। তাই তিন পা এগোনোর আগেই তাসের ঘরের মতো হুড়মুড়িয়ে পরে যায় প্রতিবার; শ্রমের উপযুক্ত প্রয়োগের জন্য দরকার শিক্ষিত রাষ্ট্রনায়ক যে বা যারা দিশা দেখাবে জাতিকে। এই নিয়ে আমরা ‘জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’ ভাবনা ভাবা গাঁজায় দম দিয়ে চাঁদে যাওয়ারই সামিল।
আমরা ব্যস্ত মমতা না দিলীপ ঘোষ কে আজ বেশি ভুল বকল! মাননীয় পদ্মপাল জগদীশ ‘অপমানখোর’ এর সাথে রাজ্যের সংবাদে দ্রুত শিরোনাম দখল করতে চেয়ে স্বঘোষিত ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্রা পালের ‘গণশক্তি’ অভিযানের ফ্লপ-শো এর চেয়েও বেশি হাস্যকর ছিল জয় ব্যানার্জী নামের লম্পটের ভাষণ। এগুলোই আমাদের আলোচ্যসূচী। একটা ফেকু বেওড়া মাল, না সে সিনেমা জগতে কোনো কিছু ঠিক করে করতে পেরেছিল, না বিজেপিতে জয়েন করে আহামরি কিছু করতে পেরেছে; অকাল কুষ্মান্ড হয়ে যা হয় আর কি। ঘরের বৌকে যে সামলাতে পারে না, সে আবার হুমকি দেয় মানুষজনকে মেরে জ্বালিয়ে দেওয়ার, অবশ্য এতে করে তার পেটে থাকা কুচো কৃমিগুলোও যে হেসে অস্থির সেটা পাঁচুইখোর জয়ের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তবুও প্রাত্যহিক জীবনের হরেক লড়াইতে ‘জয়’ দের মতো ক্লাউনের ‘সার্কাস’ দেখতে মন্দ লাগে না। আর এখানেই আমাদের বর্তমান নেতাদের সাফল্য, তারাও আমাদের সামনে এমন রামদাস আটাউলে, অনুব্রত, জয় ব্যানার্জির মতো গাম্বাটগুলোকে সাপ্লাই দিয়ে যাচ্ছে নিরবচ্ছিন্নভাবে।
এটাই আমাদের রাজনীতি সর্বস্ব গণতন্ত্রের বন্ধ্যা প্রসব। যেখানে পরিকল্পনাই নেই মেয়াদী জনস্বার্থে। কেউ বলার নেই, কেউ ভাবার নেই।

রবিবার, ২১ জুন, ২০২০

গালওয়াল কি ও কেন?



লাদাখের যে অঞ্চলে বর্তমানে ভারত চীন দ্বন্দ্ব চলছে সেই অঞ্চলটির নাম আমরা সকলেই জেনে গেছি, ‘গালওয়ান উপত্যকা’; কিন্তু এটা কি জানি- কেন এই অঞ্চলের নাম গালওয়ান?
এটি বিরল উদাহরণগুলির মধ্যে একটি, যেখানে একটি বিশিষ্ট ভৌগলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পন্ন অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছিল তথাকথিত ‘নেটিভ’ এক্সপ্লোরারের নামে।
সমুদ্র পৃষ্ঠের ৫০০০ থেকে ৭০০০ মিটার উচ্চতার হিমালয়ে, যেখানে স্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ৩০ ডিগ্রী, এমন সব অগম্য দুর্গম স্থানে, পাহাড়ি চিতার মতো অনায়াস পথ খুঁজে সভ্যতার সামনে নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করে গেছেন সারাজীবন ধরে যে মানুষটি, তার নাম- গোলাম রসূল গালওয়ান।
‘লেহ’ থেকে লাদাখের পথ অন্বেষণকারী প্রথম ব্যক্তির নাম ‘গোলাম রসূল গালওয়ান’। আয়ারল্যাণ্ডের অভিজাত কাউন্টি ডানমোরের সপ্তম আর্ল ‘ডুনমোর মুর’ সাহেব এলেন হিমালয় অভিযানে, সেটা তখন ১৮৯২ সাল; এই আইরিস-ব্রিটিশ অভিযাত্রী দলটি ‘চ্যাং চেনমো’ উপত্যকার উত্তর দিকের অঞ্চল অন্বেষণ করছিল। একদিকে রাশিয়ান অভিযাত্রীদের সাথে তিব্বত দখলের লড়াই- অন্যদিকে ব্রিটিশদের আগের প্রতিবারের ব্যর্থ অভিযানের ইতিহাস বেয়ে, একসময়ে মুর সাহেবরাও ভ্রমবশত পূর্ব দিকে এক অজানা নদী উপত্যকায় এসে পড়েছিল, যেখান থেকে সামনে দুর্ভেদ্য খাড়াই হিমালয়ের প্রাচীর ছাড়া আর কিছুই ছিলনা।
দুর্গম অঞ্চলে পথ হারিয়ে যখন প্রায় মৃত্যুমুখে অবতীর্ণ হতে বসেছে অভিযাত্রী দলটি, ঠিক তখনই একটি ১৪ বছরের বালক কুলি, গোটা দলটাকে একটা এমন পথে দিয়ে বের করে নিয়ে আসে, যা ওই অভিযানের সবচেয়ে সহজলভ্য পথ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করে দেয়।
কোনও ধরনের পুর্ব অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া, আশ্চর্য অনুমান ক্ষমতা, সাহস, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা, আর কঠিন পরিস্থিতিতে স্নায়ুর উপরে পূর্ন নিয়ন্ত্রণ রেখে, সাথে হিমালয়কে অনুসন্ধানের এক অবিশ্বাস্য নেশার দৌলতে সে যাত্রায় গোটা অভিযাত্রি দলটা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়। আজও ওই অঞ্চলে যাতায়াতের জন্য এই পথের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সহজ কোনো উত্তরণের পথ পাওয়া যায়নি।
জীবন বাঁচানোর কৃতিত্বে মুগ্ধ হয়ে যান আর্ল ‘ডুনমোর মারে’, কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সেই বালকের কাছে জানতে চান- ‘তোমার কী পুরস্কার চাই বলো’! তখন বালক গোলাম রসূল বলেন- ‘যে পাহাড়ী নদীটি আছে এটি আমার উপজাতির নামে রাখা হোক ‘গালওয়ান নাল্লা’। নূন্যতম কালক্ষেপ না করে অভিযাত্রী দলটি তৎকালীন ব্রিটিশ বাহাদুরকে যে নথি পাঠায় সেখানে প্রায়োরিটি হিসাবে নদীর নাম ‘গোলাম রসূল গালওয়ান’ এই পুরো নামটাই উল্লেখ করে পাঠান।
সেইমতো পরবর্তী ব্রিটিশ মানচিত্র প্রকাশিত হলে দেখা যায়, ওই অঞ্চলের ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ যে নদী, সরকারি ভাবে তার নাম রাখা হয়েছে ‘গালওয়ান নদী’; যা লাদাখের পূর্ব অংশে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পাড় বরাবর যে পথ, সেই নতুন পথেরও নাম রাখা হয়েছিল গালওয়ান পাস। শুধু তাইই নয়, অঞ্চলটির নামও গালওয়ান উপত্যকা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল মানচিত্রে। গালওয়ান নদীটি বর্তমান ‘আকসাই চিন’ অঞ্চলের একটি ছোট অনাম্নী হ্রদ থেকে উদ্ভূত হয়ে চীনের সীমান্ত বরাবর পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ভারতের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে ‘শায়ক’ নদীর সাথে মিলিত হয়েছে, এই শায়ক নদী সিন্ধু নদীর একটি গুরুত্বপুর্ণ শাখা।
‘ফোরসাকিং প্যারাডাইজঃ স্টোরিস অফ লাদাখ, বই অনুসারে যে তথ্য পাওয়া যায়-
বইতির লেখক, ব্রিটিশ ‘রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির’ ১৯১৯ সালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ‘লেফটেন্যান্ট কর্ণেল স্যার ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’; যিনি তার সেনা কর্মজীবনে তিব্বত অঞ্চলের কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৮৯০ সালের শীতে তিনি কাশগরে শীত কাল কাটিয়ে সেখান থেকে হিমালয়ের পাদদেশ বরাবর অভিযান শুরু করেন, সহজে ‘চাইনিস তুর্কিস্তানে’ যাবার রাস্তা খোঁজার মিশনে পাঠানো হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার বাহাদুরের তরফে। বলাই বাহুল্য সেই মিশন সাফল্যের মুখ দেখেনি। এই একই রাস্তা খুঁজছিল বেশ কয়েকটি রাশিয়ান, ফরাসি, মার্কিন ও অস্ট্রেলীয় অভিযাত্রী দল; প্রসঙ্গত কেউই সফলতার মুখ দেখেনি চূড়ান্ত পর্যায়ের দুর্গম আবহাওয়ার জন্য।
ডুনমোর আর্লের পাঠানো নথিতে বিস্ময় বালকের সন্ধান পেতেই ব্রিটিশ বাহাদুর পুনরায় ‘ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’কে তিব্বত অভিযানে পাঠায় পথের সন্ধান করতে; তবে এবারে অর্ডার ছিল ‘গোলাম রসূল গালওয়ান’ কে গাইড হিসাবে নেওয়ার। ব্যাস, ১৮৯৯ সালে শুরু হওয়া অভিযান অচিরেই সফলতা অর্জন করে ও পরবর্তীতে ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’ তিব্বতের কমিশনার পদে নিযুক্ত হন।
আরও পরবর্তীতে ‘ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’ মাউন্ট এভারেস্ট কমিটির চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন, যার দরুন ১৯২১ সালের ‘ব্রিটিশ রিকনোসায়েন্স এক্সপিডিশন টু মাউন্টে এভারেস্ট’ মিশনে মুখ্য কোঅর্ডিনেটর নিযুক্ত হন; আবার সেই গোলাম রসূল গালোয়ানের দ্বারস্থ হয় গোটা অভিযাত্রি দলটি। এমন হরেক বীরত্বে ঠাসা তথ্য সযত্নে লিখিত রয়েছে রয়েছে ‘ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’ রচিত ২৬টি পুস্তকে, যা ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত রাখা আছে। তাছাড়া আরো অন্তত ৫০ জন আলাদা আলাদা অভিযাত্রীর লেখা বইতে ‘গোলাম রসূল গালওয়ানের’ গৌরবান্বিত উপস্থিতি রয়েছে।
গোলাম রসূল গালওয়ান সারা জীবন ধরেই বহু দুর্গম অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্থানীয় গাইড হিসাবে। তিনি ব্রিটিশ, ইতালিয়ান এবং আমেরিকান এক্সপ্লোরারদের নেতৃত্বে হরেক অভিযানগুলিতে শুধুই গাইড হিসাবে সহায়তা করেননি, বরং একজন নিখুঁত পরিকল্পনাকারী ও তার সফল রূপায়নকার হিসাবে নির্দিষ্ট করে নিজের কর্মের ছাপ রাখতেন। তিব্বত, জিনজিয়াংয়ের ইয়ারকান্দ যা বর্তমানে চীনের উইঘুর প্রদেশের কাছে অবস্থিত, কারাকোরাম শৈলসীমা, পামির মালভূমি অঞ্চল সহ অন্যান্য মধ্য এশিয়ার দুর্গম থেকে দুর্গমতম অঞ্চল গুলোতে কেউ অভিযানের কথা ভাবলে সকলের আগে তারা গালওয়ানকে ভাবতেন।
১৮৭৮ সালে লেহ’তে জন্মগ্রহন করা গোলাম রসূল গালওয়ান মাত্র ১২ বছর বয়সের আর্থিক দুরবস্থার কারণে, ঝুঁকিপূর্ণ, পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘ-দূরত্বে অভিযান চালানো বিভিন্ন দলের সাথে গাইডের কাজে নিযুক্ত হয়ে যান। কাজের সন্ধানে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাড়ি ত্যাগ করেন, নতুন জায়গা সন্ধানের প্রতি তাঁর অসীম আগ্রহ ও আবেগ তাকে ব্রিটিশদের প্রিয় গাইড হিসাবে গড়ে তুলেছিল।
গোলাম রসূল গালওয়ান প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু ভীষণ পণ্ডিত মানুষ ছিলেন। একজন আগ্রহী শিক্ষানবিশ কিশোরের সামান্য মুটে থেকে অপ্রতিরোধ্য গাইড হিসাবে বেড়ে উঠার কথা, ফ্রান্সিস ইয়াংহাজবেন্ডের প্রতিটি লেখায় ফুটে উঠেছে। চোস্ত ইংরাজির সাথে সাথে, চীনা, রাশিয়ান, তুর্কি, তিব্বতি, ইতালীয় ও স্প্যানিশ ভাষায় তার দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। এর সাথে সাথে নেটিভ ভারতীয়দের ভাষা, যেমন লাদাখি, উর্দু, হিন্দি, কাশ্মীরি, পুস্তু, আফগানী, গাড়োয়ালী, কিন্নরী ইত্যাদি সহ প্রায় ১৮টি ভারতীয় ভাষায় অনর্গন কথা বলতে পারতেন। একজন সামান্য কুলি এবং টাট্টু ঘোড়ার সহিস হিসাবে জীবন শুরু করে, ১৯১৭ সালে লেহ’এর ব্রিটিশ যুগ্ম কমিশনারের প্রধান সহকারী পদে উত্তীর্ন হয়েছিলেন।
গোলাম রসূল গালওয়ানেরা কাশ্মীরি ‘গালওয়ান’ উপজাতির অন্তর্ভুক্ত, যার অর্থ কাশ্মীরি ভাষায় ‘ঘোড়ার রক্ষক’; আমরা বাংলায় যাকে উচ্চারণ করি ‘গাড়োয়ান’। কথিত আছে যে, গোলাম রসূল গালওয়ানের মাতামহ ‘কারা গালওয়ান’ নামের কুখ্যাত ছিল, কাশ্মীরি ভাষায় যার অর্থ ‘কালো দস্যু’। ‘কারা’ সে সময় তার উপজাতির গোষ্ঠী প্রধান ছিল, এবং তারা শুধুমাত্র ধনী জমিদারদের সম্পদ লুঠ করত, যা তার জ্ঞাতিভাইদের মাঝে বিতরণ করত। এক সময় কাশ্মীরের ডোগরা রাজার ঘরে দস্যু বৃত্তি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় ‘কারা’, ফলস্বরূপ গোটা উপজাতি দলটির উপরে নেমে আসে সাহার খাঁড়া। গালওয়ান উপজাতিকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে দিয়ে একটাকে লেহ আর অন্যটিকে বালোচিস্তানের ঊষর অঞ্চলে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। লেহ এর দুর্গম আবহাওয়া সহ্য না করতে পেরে বহু ‘গালওয়ানিস’ মারা যাওয়া শুরু হলে, তখন তারা হিমালয় টপকে উইঘুর প্রদেশের ইয়ারকান্দে বসতি স্থাপন করেছিল, যদিও গোলাম রসুলের পরিবার লেহ তেই রয়ে যায় কয়েকঘর স্বজাতির সাথে। তার পারিবারিক জীবনের ইতিহাস তিনি নিজেই তার লিখিত বইতে উল্লেখ করে যান, যা তিনি তার মা ও স্বজাতিদের কাছে শুনেছিলেন।
১৯৪৫ সালে এক দুর্গম অভিযানে গিয়ে আর ফেরা হয়নি গালওয়ানের, হিমালয়ের কোনো এক দুর্গম অঞ্চলে বরফের মাঝেই তার নশ্বর দেহ চিরতরে হারিয়ে যায় মাত্র ৪৭ বছর বয়সে। এভাবেই একটা বর্ণময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। বর্তমান দিনে, ওল্ড লেহ’এর চামসপা ইয়ার্টং সার্কুলার রোডে গোলাম রসূলের চতুর্থ প্রজন্মের সদস্য বসবাস করেন। সেখানের সরকারি গেস্টহাউজ ‘গালওয়ান গেস্ট হাউস’টি ওনারই সম্মানার্থে নামকরণ করা হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার দ্বারা, যা আজও রয়েছে।
কিন্তু এত সবের পর আর গালওয়ানের নাম থাকবেনা কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। ইতিমধ্যেই এলাকাটিকে চীন তাদের দেশের অংশ বলে অন্যায় দাবী করে নতুন নাম দিয়েছে; আর চীনকে সমুচিত জবাব দিয়ে যদি আমাদের সেনা ওই এলাকা পুনরুদ্ধার করে আনে, যোগী আদিত্যনাথ কি আর হাত গুটিয়ে বসে থাকবে! হাজার হোক নামটা গোলাম রসূল, গৌড় বা রাসেল নয়, তাই অতি শীঘ্রই এমন একটা ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে তা বলাই বাহুল্য।
তথ্য সুত্রঃ
indian defence research wing এর ওয়েবসাইট

শনিবার, ২০ জুন, ২০২০

দেশদ্রোহী BJP সরকার



প্রধানমন্ত্রী অফিসিয়ালি ঘোষনা দিয়েছিলেন, যে গালওয়ান উপত্যকা অঞ্চলে ২০ জন ভারতীয় সেনা শহীদ হয়েছিল সেটা ভারতীয় সীমা নয়, মানে ভারতীয় সীমায় চীনা অনুপ্রবেশ করেনি। যেটা উহ্য ছিল সেটক হল- আমাদের সেনা চীনা ভুখন্ডে ঢুকে আত্মহত্যা করতে গেছিল।


ব্যাস, মোদীজির কথাকে মান্যতা দিয়ে এবং ওনার ইঙ্গিতের ভিত্তিতে, চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে পুরো পৃথিবীর কাছে গোটা গলওয়ান উপত্যকার দাবির পুনরাবৃত্তি করেছে।

মোদীজি ভেবেছিলেন ভক্তদের মন কি বাত শোনাচ্ছেন, যা বলবে তাতেই ভক্তরা হৈ মেরে উঠবে। চীনও যে মোদীর মত বড় বক্ত আজকে প্রমান পাওয়া গেল। অক্ষরে অক্ষরে মোদীর কথা কেমন সুরসুর করে মেনে নিল!

চীনে মোদীজির জনপ্রিয়তা হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে গাধার কানের খবর, তারা নাকি বলছে "ভারতের প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রধানমন্ত্রী"।

বাহ মোদিজী বাহ
মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়।


শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২০

ট্রাম্প ও মোদীর নোংরা সম্পর্ক

 


আমেরিকায় ভোট, ট্রাম্পের নির্দেশে তার বন্ধু শিনপিং এর ভারতে পরিকল্পিত হামলা, সহযোগী মোদী।
মেকি দেশপ্রেমিক ভক্তদের বাপ মোদীর মিত্রোঁ "ডোলান"- আরো কিছু হাজার ডলারের অস্ত্র বিক্রি করাতে চায়। আমাদের সৈনিক খুন করিয়ে মসনদে আসতে চায়, যেমন পুলওয়ামাতে সেনা খুন করিয়ে- মিত্রোঁ আচ্ছে দিন এনেছিল দ্বিতীয় দফাতে। যার কোনো তদন্ত হয়নি।
সাম্রাজ্যবাদী চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে শয়তান ট্রাম্প এর ঘনিষ্ঠতা ফাঁস করে দিয়েছে ট্রাম্প জামানারই প্রাক্তন জাতীয় নিরপত্তা উপদেষ্টা জন বুল্টন।
গত বছর জুনে চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে আলাপ হয়েছিল ট্রাম্পের, অক্টোবরে সিংপিং এদেশে এনেছিল মোদীর সাথে চুক্তি করতে। সেই মতই শীত কমতেই দেশের সার্বভৌমত্ব ও সেনাদের প্রাণ বলিদান দিয়ে দালাল মোদীর দুই অবৈধ পিতাদের কার্যকারিতা। এক বাপ ভয় দেখাবে, অন্যবাপ অস্ত্র বেচবে, ফুল প্যাকেজ।
সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন-চীনা জোট, সাথে দালাল মোদী ও RSS, আমাদের সেনাদের জীবন ও ভারত ভূমি প্রতিবেশীদের কাছে বিকিয়ে দিয়ে নিজেদের কুর্সি সুরক্ষিত করেছে।
আজকের চীনা হামলা নিয়ে মোদী সরকার আগে থেকেই ওয়াকিবহাল। জেনেবুঝেই সেখানে বিহারের ও বাংলার সেনাদের রেজিমেন্ট পাঠানো হয়েছে, যাতে আসন দুই রাজ্যের ভোটে দেশপ্রেমের সেন্টিমেন্ট তুলতে পারে।
চাড্ডী বাছুর গুলো এদেশীয় মুসলমান ও কমিউনিষ্টদের পিছনে লেগেছে, আসলে তো দেশদ্রোহী এরা নিজেরা। আগে ব্রিটিশদের গোলামি করত, মাঝে আমেরিকার এখন নতুন 'বাবু' ঘরেছে RSS নামের গনিকারা, নাম "চীন",
এদের বিচার চাই।

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...