শনিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৬


 

ষষ্ঠ পর্ব


উপরোক্ত সকল তথ্যমতে কোন উদগাণ্ডু বিশ্লেষক মিমকে বিজেপির দালাল বলে দাবী করতে পারে অন্তত এই বিহার পর্যায়ে? আসলে কংগ্রেস জাতীয় ক্ষেত্রে মিমের উপরে দায় চাপিয়ে নিজেদের সংগঠন না থাকার ব্যর্থতা ও হারের দায় চাপিয়ে খালাস হয়েছে। বিজেপিও মিমকে ‘ভোট কাটুয়া’ হিসাবে প্রচার করে প্রমাণ করতে চাইছে যে মুসলমানেরা সর্বত্র একজোট হয়েছে, অতএব ‘হিন্দু খতরেমে হ্যাঁয়’। এতে করে অন্য যেসকল রাজ্যে আসন্ন ভোট আছে, সেই সকল রাজ্যের মুসলমানেরা বিভ্রান্তিতে পড়ে যাচ্ছে যে, “সত্যিই যদি গোটা ভারত মিমের পক্ষে যায়, আমরা কি দলছুট হয়ে যাচ্ছি”! এ এক চরম মানসিক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার মাঝে ফেলে দিয়েছে মুসলমানেদের। আর এই কাজে কিছু নামধারী মুসলমানই বিজেপির কাজকে সোজা করে দিচ্ছে মিম বিরোধী প্রচার করে।

জাতপাতের নিরিখে হওয়া ভোটের প্রসঙ্গে বিহারের জাতপাতের তথ্যে নজর রাখলে দেখা যাবে-

যাদব OBC- ১২%,
কুর্মি OBC - ৪%,
কুশাওহা, কৈরি, কাছি, মুরাও OBC - ৮%
তেলি OBC - ৩%
৭১টি ক্ষুদ্র EBC/ OBC জাতি- ২৫%
মহাদলিত দুষাদ- ৫%
মহাদলিত চামার- ৫%
মহাদলিত মুশাহার- ৩%
অন্যান্য মহাদলিত- ২%
ব্রাহ্মণ (উচ্চবর্ণ)- ৪%
ভূমিহার (উচ্চবর্ণ)- ৬%
ক্ষত্রিয় (উচ্চবর্ণ)- ১%
রাজপুত (উচ্চবর্ণ)- ৩%
কায়স্ত (উচ্চবর্ণ)- ১%
আদিবাসী- ১.৩%
খ্রিস্টান, জৈন, বৌদ্ধ অন্যান্য সংখ্যালঘু- ০.৪%

মুসলমান হচ্ছে ১৭%

সুতরাং বহুভাগে বিভক্ত মনুবাদী হিন্দু সমাজের মাঝে সবচেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু মুসলমানেরাই। ৪% ব্রাহ্মণ ও বাকি ১১% উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব করা RSS যদি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি করতে পারে, অবশ্যই ওয়াইসি-আজমলদের মুসলমানবাদী রাজনীতি করার অধিকার আছে। RSS নিজের সুবিধার্থে AIMIM বা AIUDF দের বাজারে নামিয়ে লেজ কাটা শেয়ালের মতো জাতপাতভিত্তিক রাজনীতির চর্চাকে গতি দিয়েছে।

মোদীজির সৌজন্যে আজকের অখন্ড মানচিত্র যদি না বদলে যায়, তাহলে আগামী দিনে লেবাননের মতো ধর্মকেন্দ্রিক প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

RSS নিজে যুক্তিহীন উগ্র ধর্মান্ধ রাজনীতি করে ভোটের মেরুকরণ করে, এদের মুখ্য রাজনৈতিক দল বিজেপি। কিন্তু প্রতিটি রাজ্যে এদের একটা করে ‘নরম হিন্দুত্ববাদী’ দল আছে। যে সকল জনগণের প্রকাশ্যে উগ্র ধর্মীয় রাজনীতি করতে চক্ষুলজ্জা লাগে RSS এর এই B-Team গুলো তাদের জন্য উগ্র হিন্দুত্ববাদীতার প্রাথমিক ইস্কুল। তৃণমূল কংগ্রেস এদেরই একজন, নতুবা সদ্য দল গঠন করা তৃণমূল ১৯৯৯ সালের লোকসভা ভোটে যাওয়ার সাহস ও অর্থের উৎস কী ছিল! বিজেপিতে যাওয়ার দুটোই রাস্তা, সরাসরি RSS থেকে অথবা ভায়া তৃণমূল। দু’একটা বাম বা কংগ্রেসী যে বিজেপিতে যাচ্ছে না এ রাজ্যে তা নয়, কিন্তু তা নিতান্তই ব্যতিক্রম। বিজেপির নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবাদর্শ আছে তা আপনি পছন্দ করুন বা বিপক্ষে থাকুন, বামেদেরও তা আছে, কিন্তু তৃণমূলের এ সকল বালাই নেই। তাদের জন্মটাই কংগ্রেস থেকে সুবিধাবাদী হিসাবে, এই জন্যই এদের বিজেপিতে যাওয়াটা কোনো সমস্যা হয় না।

তৃনমূলের ২১ বছর অতিক্রান্ত তার মধ্যে ১০ বছর ক্ষমতায়। তৃণমুল কংগ্রেসের হাত ধরে বাংলার বুকে ছাপ ফেলা বিজেপির আর দরকার নেই তাকে, সে নিজেই ক্ষমতায় ফিরতে চায় একা। বস্তুত গোটা ভারত জুড়েই এই মধ্যস্বত্তাভোগী দালাল B-Team দলগুলোকে আর দরকার নেই RSS এর, টিভি মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে নব্য ভোটারদের নিয়ন্ত্রণ করা এখন অনেক সোজা। এর বাইরে অঙ্ক কষে কীভাবে ভোটের ভাগাভাগি করে জিততে হয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বিহার নির্বাচন, উন্নয়নের দিক থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে চূড়ান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরেও তারা জিতেছে। তাই RSS এবারে অলআউটে খেলতে নেমেছে। উত্তরপ্রদেশের পর বিহারেও মুসলমান বিহীন মন্ত্রিসভা গঠন করে বাংলা ও আসামের সুর বেঁধে দিয়েছে।

এই মতো রাজনৈতিক চিত্রনাট্যে ২০২১ এর ভোট যে কারোর জন্যই ‘সুবিধার’ হবে না তা বলাই বাহুল্য। এই সকল হরেক ফ্যাক্টরের মাঝে মিম এসে জুটলে পরিস্থিতি কী হতে পারে! তার আগে দেখে নেওয়া যাক সাম্প্রতিক অতীতের পরিসংখ্যান- ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল পেয়েছিল ৪৩.৬৯%, বিজেপি ৪০.৬৪%, বামফ্রন্ট- ৬.৩৪% ও কংগ্রেস ৫.৬৭%। কিন্তু ২০১৬ সালের শেষ বিধানসভা নির্বাচনে এই অঙ্কটা ছিল- তৃণমূল ৪৪.৯১%, বামফ্রন্ট- ২৫.৬৯%, কংগ্রেস ১২.২৫%, বিজেপি ১০.১৬%। পঞ্চায়েত, পুরসভা বা উপনির্বাচনের ভোট করতেই দেয়নি তৃণমূলের উন্নয়ন বাহিনী, তাই এই সকল ভোটের হিসাবের কোনো দাম নেই।

‘চাণক্য’ নামের একটি সমীক্ষা সংস্থা দেখিয়েছিল যে পশ্চিমবাংলার প্রতিটি ভোটের ‘টার্ণ আউটের’ (প্রদত্ত ভোট) হিসাবে মুসলমান ভোট অন্তত ৩৯.৭৭%, যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা ২৭.২%। হিসাব পরিষ্কার, হিন্দু সম্প্রদায়ের চেয়ে মুসলমানেদের মাঝে ভোট দানের প্রবণতা অনেকটাই বেশি। এদের সাথে প্রতি বছর বিপুল হারে নতুন যুবসমাজ যুক্ত হচ্ছে ভোটার তালিকাতে, এরা কোন পক্ষ কেউ জানে না। মাত্র ১% ভোটের সুইং ফলাফল উল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

সুতরাং তৃণমূলকে ভোট না দিলেই বিজেপি এসে যাবে এটা একটা নিখাদ মিথ্যা অপপ্রচার।

শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২০

বাবু রন্তিদেব ,আইটি অপপ্রচার ও একটি নিরীহ ভ‍্যাকসিন

 


এবছর যখন দেশীয় কোভিন-১৯ প্রতিষেধক কোভ‍্যাক্সিনের ট্রায়াল শুরু করেছিল আইসিএম‌আর ,তখন পূর্ব ভারতে প্রাথমিকভাবে পটনায় টীকাটির ট্রায়াল ডোজ গ্রহণের সুবিধা ছিল।পশ্চিমবঙ্গের আবেদনকারী হিসেবে  দুর্গাপুরের একটি প্রাথমিক বিদ‍্যালয়ের শিক্ষক চিরঞ্জিত ধীবর এ রাজ‍্য থেকে তখন টীকাটির ডোজ নেওয়ার সুযোগ পান আবেদনকারীদের মধ‍্য থেকে।যদিও পরবর্তীতে ভুবনেশ্বরে গিয়ে তাঁকে টীকাটির ডোজগুলি নিতে হয়েছিল।স্বাভাবিকভাবেই এই মানবিক উদ‍্যোগটি  যথাযথ প্রচার পেয়েছিল,এমনকী ভারত সরকারের নিজস্ব প্রচারযন্ত্র পিআইবি(প্রেস ইনফরমেশন ব‍্যুরো)ও ফলাও করে ওই সংবাদটি প্রকাশ করেছিল।

অতি সম্প্রতি কোভ‍্যাক্সিনের ট্রায়াল এ রাজ‍্যেও শুরু হয়েছে।আর তার প্রথম ডোজটি নিয়েছেন রাজ‍্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম,যিনি কলকাতা পুরনিগমের বর্তমান প্রশাসক‌ও বটে।

স্বভাবতই মিডিয়িকুল‌ও এই ঘটনা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই প্রচার করছে।

কিন্তু এই নিয়ে বিজেপির সেই বিখ‍্যাত আইটি সেলের ঢঙে অশ্বত্থামা হত ইতি কুঞ্জর স্টাইলে খেলা শুরু করলেন বর্তমান পত্রিকার একদা প্রখ‍্যাত সাংবাদিক ,বিজেপির টিকিটে লোকসভা ভোটে প্রার্থী হিসেবে পরাজিত তথা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের নিজস্ব মুখপত্র 'স্বস্তিক'(বাংলা সংস্করণ)এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক রন্তিদেব সেনগুপ্ত।

তিনি বলছেন--- এরাজ‍্য থেকে কোভ‍্যাক্সিনের প্রথম ডোজ নিয়েও  চিরঞ্জিৎ ধীবর কোনও প্রচারে আসতে চাননি,কিন্তু ফিরহাদ হাকিমের টীকার ডোজ নেওয়া নিয়ে সুকৌশলে  প্রচার চলছে। ব‍্যস এই পোস্ট হুড়মুড়িয়ে বিজেপি সমর্থক রা শেয়ার করছেন।

প্রকৃত ঘটনা: 

দেশীয় টীকা কোভ‍্যাক্সিনের প্রথম ট্রায়াল(তখন এরাজ‍্যে ট্রায়াল চালায়নি আইসিএম‌আর) ‌এরাজ‍্য থেকে প্রথম নিয়েছিলেন চিরঞ্জিৎ ধীবর‌ই।চিরঞ্জিত বাবুকে নিয়ে ও প্রচুর প্রচার হয়েছিল।উল্লেখ‍্য চিরঞ্জিত বাবু আর‌এস‌এসের সক্রিয় সদস‍্য ও কিছুদিন আগে দুর্গাপুর অঞ্চলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে বিজেপির টিকিটেই লড়েছিলেন।

আর এরাজ‍্যে যখন আইসিএম‌আর ও ভারত বায়োটেক রাজ‍্য সরকারের সম্মতিতে কোভ‍্যাক্সিন টীকার‌ই এই রাজ‍্যের জন‍্য ট্রায়াল চালু করল,তখন এরাজ‍্যের ট্রায়ালে ফিরহাদ হাকিম প্রথম ডোজ নিলেন।

এই ঘটনাকে নিয়েই রন্তিদেববাবু আইটি প্রচারটি যে উদ্দেশ‍্যে চালাচ্ছেন,তার অভিমুখ কোন দিকে তা বিজ্ঞ পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন!

এরকম আইটি অপপ্রচার রোধে আপনিও সদর্থক ভূমিকা রাখবেন,রাজনৈতিক রঙ নির্বিশেষে--এই আশা রাখি।


লেখাঃ তন্ময়

বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৪



চতুর্থ পর্ব


হায়দ্রাবাদে মক্কা মসজিদ বিস্ফোরণ, মহারাষ্ট্রের মালেগাঁওতে বিস্ফোরণের সাথে মোদী মিডিয়ার লাগাতার মিথ্যা ঘৃণা সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন, মব লিঞ্চিং, বিজেপি-RSS নেতাদের বিষাক্ত ভাষণ সহ নানা কারণের ফলে মুসলমান সমাজ ক্রমেই একঘরে হয়ে গেছিল। আন্তর্জাতিক ভাবে সারাক্ষণ ইসলামোফোভিয়ার চাষে প্রতিটি ভারতীয় মুসলমান নিজ ভূমেই যখন অবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল – মিডিয়া জুড়ে ভিক্টিম হয়ে উঠেছিল, স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাছে একটা ত্রাতার প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল।

এমনিতে ইসলামে কাস্ট সিস্টেম না থাকলেও, সিয়া সুন্নি, ওয়াহাবি, সহ বেশ কিছু বিভেদ তো আছেই, একে কীভাবে কেউ অস্বীকার করবে! এছাড়া হরেক পীরপন্থীদের আলাদা আলাদা মাজহাব বা উপদল, সেখানে ‘নরেন্দ্র মোদীর’ মতো হিন্দু হৃদয় সম্রাট হয়ে কোনো মুসলমানের মুসলমান হৃদয় সম্রাট হয়ে উঠে আসা অসম্ভব ছিল।

কংগ্রেসের বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, সেখানেই RSS সুকৌশলে মিমকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ‘কংগ্রেস মুক্ত’ ভারতের লক্ষ্যে, আসামেও এটাই করেছিল বদরুদ্দিন আজমলকে দিয়ে। আগামীতে বাংলাতে ফুরফুরার পীরবেশী দালালগুলোকে দিয়েও এই খেলা খেললে আশ্চর্যের কিছু নেই, কারণ তারা অনেকেই মুকুল রায় ঘনিষ্ঠ।

২০১৪ পরবর্তী সময়টা একটা লাইনে বললে দাঁড়ায়- দেশজ রাজনীতিতে বিজেপির নেতা মন্ত্রীদের ক্রমাগত মুসলমান বিদ্বেষী মন্তব্য, মব লিঞ্চিং, গোমাংস অজুহাতে হত্যা। পাশাপাশি একটা রাষ্ট্রযন্ত্রে ‘মেজোরিটি র্যাডিক্যাল পলিটিক্যাল পার্টি’ থাকলে বিজ্ঞানের নিয়মেই ‘মাইনরিটি র্যাডিক্যাল পলিটিক্যাল অর্গানাইজেশনের’ উৎপত্তি ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে ভারতীয় রাজনীতিতে যেখানে বহু ভাষাভাষী বহুদলীয় রাজনীতি মূলত জাতপাতের উপরে নির্ভর করেই কেন্দ্রীভূত হয়, সেহেতু এখানে সংখ্যালঘুদের পক্ষে দানা বাঁধাটা অত্যন্ত দুরুহ একটা কাজ ছিল।

বাঙালী মুসলমানের সাথে হিন্দিভাষী মুসলমান বা কেরালার মুসলমানের ততটাই ফারাক, যতটা উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের। এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে RSS নিজেই অতি উৎসাহী হয়ে ‘রাতারাতি এখনই আমার সকল ক্ষমতা চাই’ এর মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে মিমকে লাগিয়ে দিত মুসলমান ভোটকে পোলারাইজড করে উল্টো দিকের হিন্দু ভোটকে একটা বাক্সে জমা করার প্রয়াসে। আগামীতে মিম থাকবে কি যাবে তা জানিনা, কিন্তু উগ্র ইসলামিক রাজনৈতিক দল গুলোই যে এই সম্প্রদায়কে নিয়ন্ত্রণ করবে তা বলাই যায়।

সুতরাং- RSS দু'ক্ষেত্রেই সফল। ক্রমাগত মুসলমানফোবিয়া আর পাকিস্তান ভিতি দিয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে একটা অশিক্ষিত সোস্যাল মিডিয়া প্রজন্মের জিনের মাঝে সেঁধিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি, এটাই তাদের সাফল্য।

RSS দীর্ঘদিন মাটির সাথে লেগে থেকে সংগঠন বাড়ানোর সুফল আজকের নরেন্দ্র মোদী বা যোগি আদিত্যনাথ। ১৯% সংখ্যালঘু মুসলমানেদের মাঝে সারাক্ষণ- ‘এই বোধহয় আমাকেও জঙ্গি বলে দাগিয়ে দেবে’ বা ‘দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দিল’ ভয়ে থাকা সম্প্রদায়ের মাঝে নেতার জন্ম হতে পারে না তাৎক্ষণিকভাবে, জন্ম হয়ও নি।
RSS ই মিমকে প্রমোট করেছিল প্রকাশ্যে, নতুবা মসলমান অধ্যুষিত নাগপুর সেন্ট্রাল সিটে কংগ্রেসের ‘বান্টি বাবা সেলকে’কে ৪০০০ ভোটে হারাতে পারত না বিজেপির বিকাশ কুম্ভারে। প্রসঙ্গত এখানে মিম প্রার্থী ভোট পেয়েছিল সাড়ে আট হাজারের একটু বেশি। এ যাবৎ যাবতীয় ইতিহাসে, মিম যত না বিজেপির পক্ষে ছিল তার চেয়েও কংগ্রেসী ভোটকে ভাগ করতে RSS এর একটা সফল রাজনৈতিক চাল ছিল।

এই পথ বেয়েই RSS ঘনিষ্ঠ প্রণব মুখার্জী ‘ওয়েইসি’কে ২০১৪ সালে সংসদ রত্নের পুরষ্কারে ভূষিত করে তার পেডিগ্রী বাড়িয়ে দিয়েছিল জাতীয় রাজনীতির স্তরে। এ যাবৎ জাতীয় স্তরে মিমের রাজনীতি নির্ভর পরিচিতি যে অতি ক্ষুদ্র প্রান্তিক উপস্থিতির বাইরে কোনো অস্তিত্ব ছিল না তা উপরে জেনেছেন।

মোদীর এই নতুন সাম্প্রদায়িক ঘৃণার যে চাষ, তার পিতামাতা RSS-BJP হলে- শিক্ষক হিসাবে যার নাম না নিলে ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান ডেমোক্রেটিক সার্কাস’ অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে, সেই রিংমাস্টারের নাম হলো ‘প্রশান্ত কিশোর’। মোদী-২০১৪, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তেলেঙ্গনা, অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহারের পর আধুনা তৃণমূলের হয়ে খেপ খাটতে এসেছেন বাংলাতে। বিজেপির এখন আর কোনো হাইপ্রোফাইল প্রশান্ত কিশোরকে দরকার নেই, তারা এর অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গেছে মিথ্যার চাষে।

সরাসরি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপকেই নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আম্বানিকে লেলিয়ে দিয়ে সেটিং করে নিয়েছে। খাতায় কলমে প্রশান্ত কিশোরের স্থলাভিষিক্ত করেছে অমিত মালব্য, যার কাজই হলো লাগাতার মিথ্যা সম্প্রচার করে মগজে দাঙ্গার চাষ করা। আগামীতে বাংলা নির্বাচনে বিজেপির এই মিথ্যাচারের সাথে মূল লড়াই তৃণমূলের মিথ্যাচারের, এই ডুয়েলে বামেরা কতটা লড়াই দিতে পারবে বা আদৌ দিতে পারবে কিনা সেটাই কোটি টাকার প্রশ্ন।

মোদীফায়েড মিডিয়ার দ্বারা ক্রমাগত সমাজের মাঝে প্রতিটি বিষয়ে মুসলমানেদের দোষী সাব্যস্ত করে দাগিয়ে দেওয়া, কথায় কথায় পাকিস্তান পাঠাবার ধমকি, NRC এর নামে মুসলমানেদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া বা D-voter করে দেওয়ার ঢক্কানিনাদের মাঝে চলে আসে লকডাউনের মার ও তৎপরবর্তী বিহার নির্বাচন।

...ক্রমশ

মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৩



তৃতীয় পর্ব


১৯২৭ সালে তৎকালীন হায়দ্রাবাদের নিজামের পরামর্শ ও পৌরোহিত্যে জন্ম নেওয়া ‘All India Majlis-e-Ittehadul Muslimeen’ সংক্ষেপে AIMIM, ডাকনামে মিম’ও অনেক ওই সকল একটা বিধানসভার মাঝে থাকা দলগুলোর তালিকার মাঝেই ছিলো ২০০৯ সাল পর্যন্ত। বর্তমান এই মিম দলের বর্তমান সর্বেসর্বা ‘আসাউদ্দিন ওয়াইসির’ দাদু ‘আব্দুল ওয়াহিদ ওয়াইসি’ ছিলেন মিমের তৃতীয় সভাপতি কাসেম রিজভির আইনজীবী।

স্বাধীন হায়দ্রাবাদের দাবীর পক্ষে থাকা রিজভিকে জেলে পাঠায় নেহেরু সরকার, হায়দ্রাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। জেলবন্দি কাসেম রিজভিকে সদ্য স্বাধীন ভারত, পাকিস্তানে চলে যাওয়ার শর্তে মুক্তি দেওয়ার সময় ‘মিম’ দলটি রিজভি তার আওইনজীবী ‘আব্দুল ওয়াহিদ ওয়াইসি’কে সোপর্দ করে যান। সেই থেকেই মিম দলটি ওয়াইসি পরিবারের হাতে।
আব্দুল ওয়াহিদের নেতৃত্বেই ১৯৬০ সালে হায়দ্রাবাদ পুরসভায় সর্বপ্রথম ভোটে অংশগ্রহণ করে ২৪টি কেন্দ্রে বিজয় হাসিল করেছিল। ১৯৭৫ সালে আব্দুল ওয়াহিদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সালাউদ্দিন ওয়াইসির রাজনৈতিক উচ্চাশাও তৎকালীন অন্ধ্রপ্রদেশের হায়দ্রাবাদ পুরসভাটুকুর মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল।

সালাউদ্দিন ওয়াইসি তাঁর আমলে নিজেদের নির্বাচনী এলাকাতে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অংশ হিসাবে। সংখ্যালঘুদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিক্ষাগত অগ্রগতির জন্য বিপুল কাজ করে গেছেন; ইঞ্জিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ, ফার্মাসি স্কুল, ৯টি ডিগ্রি কলেজ, হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট কলেজ, এমবিএ কলেজ, এমসিএ কলেজ এবং ৫ নার্সিং ট্রেনিং সেন্টার, একটি সমবায় ব্যাংক, একটি শিল্প প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং দুটি বড় হাসপাতাল, ১৭টি ছোট মাপের হাসপাতাল ও অসংখ্য চিকিৎসাকেন্দ্র খোলার পাশাপাশি নিজস্ব উর্দু সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করার সাথে; উর্দু ভাষা, ভারতীয় ইসলামী সাহিত্য, সংস্কৃতি প্রচার ও সুরক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠার দরুন সালাউদ্দিন ওয়াইসি জীবনে কখনও নির্বাচনে হারেননি সেই ১৯৬০ সালের পর থেকে। অন্ধ্র বিধানসভার ৫ বারের বিধায়কের সাথে সাথে ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৪ পর্যন্ত হায়দ্রাবাদ লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ ছিলেন।

এরপর ২০০৪ সালে পিতার স্থলাভিষিক্ত হোন সালাউদ্দিন ওয়াইসির বড় ছেলে আসাউদ্দিন ওয়াইসি। যথারীতি তিনিও লোকসভায় যান ভোটে জিতে। হায়দ্রাবাদের ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়েছিলেন, সেই সময় রাজ্য ক্রিকেট দলে ফার্স্ট বোলার হিসাবে কয়েকটি ম্যাচে ডাকও পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে লন্ডনের লিঙ্কনস ল’কলেজ থেকে আইনের উপরে ব্যারিস্টারি ডিগ্রী দখল করেন। এই পর্যন্তও হায়দ্রাবাদ পুরসভায় সর্বোচ্চ ৪৩টা আসনে জেতাই ছিল মিমের সবচেয়ে বড় সাফল্য, আর এই আসন কটাকে কেন্দ্র করে ৭টা বিধান সভা ও ১টি লোকসভা আসনের বাইরে যাওয়ার খুব একটা ইচ্ছাও ছিল না পরিবারকেন্দ্রিক এই দলটির। এই গোটা সময়টা জুড়ে হায়দ্রাবাদের বাইরের সকল অংশে তারা কংগ্রেসকে সমর্থন করতো।

এভাবেই চলছিল, সর্বপ্রথম তারা নজরে আসে তখন, যখন ২০০৯ সালে হায়দ্রাবাদ পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয় মিম দলের, কংগ্রেসের সাথে জোট করে। কেন্দ্রে তখন UPA-2 সরকার, যারা একের পর এক দুর্নীতিতে ডুবে যাচ্ছে রোজ। ২০০৮ সালে বামেরা তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করলেও মিম ১টা আসন নিয়েও তাদের সমর্থন জারি রেখেছিল UPA সরকারের উপর। এদিকে নিয়তি সেই সুযোগটাকে বিজেপির পক্ষে দেওয়ার অপেক্ষায় দিন গুণছে আদবানি-বাজপেয়ী জুটিকে সরিয়ে গুজরাতি মোদী-শাহ জুটিকে সামনে রেখে।

এই ২০০৯ সালে বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিল মহারাষ্ট্রের নিতীন গড়করি, মহারাষ্ট্রে দ্বিতীয় দফার লাগাতার কংগ্রেস সরকার ক্ষমতাসীন তখন, এই সময় নাগপুর মাস্টারস্ট্রোকটা দিল গড়করিকে দিয়ে। গড়করি আসাউদ্দিনকে লেলিয়ে দিল ২০১৪ মহারাষ্ট্র বিধানসভা ভোটে, যে রাজ্যের ৭০% মুসলিম ভোটারই দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থান করে। এরই সাথে হিন্দুত্ববাদী ভোটকে যাতে কনসেনট্রেড করা যায় তার জন্য রাজ ঠাকরের দলকে উগ্র মারাঠি ভোটের ভাগ বসাতে নামিয়ে দিল আরও উচ্চাঙ্গের স্বর বেঁধে মূলত NCP এর ভোটে চিড় ধরাতে।

অঙ্কের হিসাবে মিম সেভাবে হয়ত প্রভাব ফেলতে পারেনি সেদিনের মহারাষ্ট্র বিধানসভা ভোটে, ২৩টা আসনে লড়ে মাত্র ২টি বিধানসভা আসনে জিততে পারলেও সাড়ে চার লাখের সামান্য বেশি ভোট পেয়েছিল সর্বমোট, যা মোট প্রদত্ত ভোটের মাত্র ০.৮৯% ছিল। এটাই কিন্তু ভবিষ্যৎ ভারতীয় রাজনীতির জন্য নতুন ট্রেন্ড সেটের ধাত্রীভূমি ছিল। রাজ ঠাকরে সাময়িক ভাবে ফিনিশ হয়ে গেলেও মিম কিন্তু বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার লক্ষ্য পূরণের সৌজন্যে একটা প্রশস্ত মঞ্চ পেয়ে গেল কিছুটা অযাচিত ভাবে।

বিজেপি হিন্দুত্ববাদী সেজে যে অংশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে তাদের দিকে নিতে পেরেছে তা ৩০ শতাংশের আশাপাশে, এর পরেও ৭০% জনগণ রয়ে যায়। ওই ৭০% কেও খন্ডে খন্ডে বিভক্ত না করতে পারলে যে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টেকা যাবে না। শুরু হলো বিভাজনের রাজনীতির নতুন খেলা, একদিকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী আর তাদের বিরুদ্ধে উগ্র ইসলামিক র্যাডিকালিস্টিক গণতান্ত্রিক দল। এ যেন সোনার পাথরবাটি, অবশ্যই ভারত জুড়ে মিমের বংশবিস্তারের জন্য প্রত্যক্ষভাবে RSS ই একমাত্র দায়ী, মিম নয়।

...ক্রমশ

সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ২



দ্বিতীয় পর্ব

আশ্চর্যজনক ভাবে অমিত শাহ্ কোনো সভা করেননি এই বিহার নির্বাচনে, মোদীজি প্রতিটি দফায় মাত্র ৪টে করে র্যালি করেছিলেন। যোগীর মতো স্টার ক্যাম্পেনারও ৩ দিনে ১৮টা র্যালি করেছিলেন। বিজেপি ও নীতিশ কুমারের প্রতিটি সভায় উপস্থিত মানুষের চেয়ে গ্রামের বাজারে মাদারির খেলা দেখতে বেশি মানুষ হয় এটার সাক্ষী গোটা পৃথিবী ছিল; কিন্তু তেজস্বীর সভায় যে ভিড় হয়েছিল সেটা শুধুমাত্র হেলিকপ্টার যে দেখতেই সেটাও প্রমাণিত গত ১০ই নভেম্বরের ফলাফলে।

সারা পৃথিবীতেই জাতপাতের নিরিখে ভোট হচ্ছে, তা আমেরিকা হোক বা বিহার; কালো-সাদা দ্বন্দ্ব RSS এর হিন্দু মুসলমানের চেয়ে কম কিছু নয়। সুতরাং উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে ভোট চাওয়ার কোনো কারণ আগামী দিনে থাকবে বলে মনে হয় না। অবশ্য গণতন্ত্রই কদ্দিন থাকবে সেটাও গবেষণার বিষয়, চীন তো ছিলই এখন রাশিয়া, ইজরায়েল সহ বহু দেশই একনায়কতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে। RSS তথা বিজেপিও অখন্ড ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। এই সংক্রান্ত বিষয়ে যোগী আদিত্যনাথ দারুণ সৎ, কোনো ভণিতা রাখে না ভোটপ্রার্থীর হয়ে প্রচারে, যা মনে সেটাই মুখে বলে দেয়। যোগীর হিসাবে- গণতন্ত্র তো থাকবেই, কিন্তু ভোট আমার বাইরে কাউকে দিলে তাকে ঘৃণায় মেরে সরকার আমরাই গড়ব, শাহ্‌নামায় অবশ্য একটা বিকিকিনি অধ্যয় রয়েছে। আধুনিক ভারতীয় গণতন্ত্রের এটাই সংজ্ঞা। প্রাচীন গণতন্ত্রের যারা জনক ছিল তাদের ভাবনাতেও ছিল না এমনটা কখনও ঘটতে পারে, থাকলে এগুলোকে রোখার জন্য নিশ্চই কোন মৌলিক আইন থাকতো।

আগামী ২০২১ এ আমরা আমাদের বাংলাতে এক অভূতপূর্ব নির্বাচন দেখতে যাচ্ছি। আমাদের অতীতের যে সকল ধ্যান-ধারণা ছিল তার অধিকাংশই গুলিয়ে যাবে নিশ্চিত। চলুন সে বিষয়ে কিছুটা আলাপ করার প্রচেষ্টা করি ইতিহাস, মিম, বিহার ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশের নিরিখে।

এ দেশে পঞ্চাশে দশকের শুরুতে জনসঙ্ঘ সেই যে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি শুরু করেছিল তা নানান উত্থান-পতনের সাথে তালমিলিয়ে শেষমেশ ১৯৮০ সালে বিজেপি নামে পরিণতি পায়। ইন্দিরা গান্ধী যে শুধু পাকিস্তানকেই ভেঙে দু’টুকরো করেছিল তা নয় RSS কেও ঘোল খাইয়ে দিয়েছিল। ‘এমার্জেন্সি’ হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী জনসঙ্ঘকে- জনতা পার্টিতে মিশিয়ে দিয়েছিল, এবং এমার্জেন্সি উত্তর নির্বাচনের পরপরই ইন্দিরা কূটনীতি জনতা পার্টিও ভেঙে দেয়। জনতা পার্টি থেকে বিচ্ছিন্ন বাজপেয়ী-আদবানী জুটি মিলে ‘রাম’ কেন্দ্রিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্ম দিয়েছিল ‘হে রাম’ গান্ধীর দেশে, যেখানে জনসঙ্ঘের পূর্বতন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সম্পুর্ণ অক্ষুণ্ণ ছিল।

গান্ধীবাদী সেকুলার অহিংস নীতির উল্টোপিঠে জন্ম নেওয়া ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমের’ ভেকধারী ‘সন্ত্রাসী’ দলটি ২০১৪ সালে এসে ভারতের জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে সাড়ে ১৯ কোটির মুসলমানের জন্যই ৯৭ কোটি ‘হিন্দু’ বিপদে আছে। আসলে এই সন্ধিক্ষণেই আগামীর ভারতবর্ষের রূপরেখা আঁকা হয়ে গিয়েছিল, যার পরিণতি আজকের বিহার ভোট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। সুতরাং আগামীর বাংলা, আসাম ও উত্তরপ্রদেশের ভোট সহ প্রতিটা নির্বাচনই যে তীব্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মধ্যেই সম্পন্ন হবে তার জন্য জোত্যিষ চর্চার প্রয়জনীয়তা নেই।

স্বাধীনতা উত্তর দীর্ঘ কংগ্রেসী শাসনামলে তারা নিজেরা নরম হিন্দুত্বের পথেই ছিল, এদের পাশাপাশি যেমন হিন্দুত্ববাদী জনসঙ্ঘ ছিল তেমন কয়েকটি র্যাডিকাল ইসলামী রাজনৈতিক দলও ছিল, মুসলিম লিগ, জমিয়ত উলামা, মুসলিম মজলিশ, মুসলিম ফোরাম, উলামা কাউন্সিল, মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন ইত্যাদি। এদের প্রত্যেকের নামের সামনে একটা ‘অল ইন্ডিয়া’ ট্যাগ লাগানো ছিল, যতই এদের অনেকের অস্তিত্ব একটা মাত্র কমিউনিটি ব্লক বা তার একটু বেশি- সর্বোচ্চ একটা বিধানসভা কেন্দ্রের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই হিসাবে আজকের তৃনমূল দাবী করতেই পারে যে, আমাদের সামনে অল ইন্ডিয়া লাগালে কেন মিম (meme) করা হয়।

হ্যাঁ, মিম তবে তা AIMIM। এটাই আসলে আলোচনার মূল বিষয় বস্তু, উপরের গোটা আলাপটা এটারই ভণিতা ছিল। বিহারে জিতেছে বিজেপি, হেরেছে নীতিশ, দাম-দর করার মতো স্থানে ভিআইপি আর হাম, স্বপ্ন ভেঙেছে তেজস্বীর আর মন্দিরের সামনে শুয়ে থাকা হাত-পা হীন অন্ধ বধির ভিখারির মতো রয়েছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের অবস্থা হচ্ছে রাজনৈতিক রমনে সে চড়ার স্থানে তো নেই মোটেই, উল্টে কতজনের সাথে, তাদের নিচে শুতে হবে সেটা তাদের কাছে ভাবনার।

কোথায় তেজস্বী কীভাবে ‘তড়িপার শাহ্’ এর ‘গণতান্ত্রিক’ সূত্র মেনে কীভাবে মুখ্যমন্ত্রী হতে পারে সেই আলোচনা করবে, কেন জিতিনরাম মাঝি স্বরাষ্ট্র দপ্তর চেয়েছে বিজেপির কাছে, কেন বিজেপি এতগুলো আসন পেয়ে নীতিশকে মুখ্যমন্ত্রীত্ব দিল, কেন দুজন উপমুখ্যমন্ত্রী গুঁজে দিয়েছে অমিত শাহ্‌, কোন দামে মাঝী-মাল্লাদের নেতা মুকেশ সাহানি তেজস্বীর কাছে বিক্রি হবে আগামীতে- সে সব নিয়ে তেমন আলাপই নেই সর্বভারতীয় মিডিয়াতে; এরা কেউই আলোচনায় নেই জনগণের, রাষ্ট্রীয়ভাবে। আলোচনার একটাই লক্ষ্য, আর তা হলো মিম।

...ক্রমশ 

রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ১

 


বিহার নির্বাচনের প্রেক্ষিতে দলগুলির অবস্থান ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

দেশ রামরাজ্য হোক বা না হোক, দেশজ অর্থনীতি সীতাকে অনুসরণ করে পাতাল প্রবেশ করা শুরু করেছে সাফল্যের সহিত। তার অন্যতম কারণ হিসাবে যে ঢালের আড়ালে ব্যর্থ কেন্দ্রীয় সরকার নিজেকে লুকাবার দাম্ভিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, সেই ‘লকডাউনের’ ভয়াবহ পরিস্থিতি পেরিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিচয়বাহক ‘ভোট’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিহারে।

কোন বিহার? যে বিহারের জনগণ রাজ্যের আয়তনের অনুপাতে সবচেয়ে বেশি জন মানুষ ভিনরাজ্যে কাজে যায়, দেশের মোট পরিযায়ী শ্রমিকের মধ্যে অবস্থিত- উত্তরপ্রদেশের ৩১% এর ঠিক পরেই বিহারের ১৬%।

আমাদের পশ্চিমবঙ্গ এই তালিকার প্রথম সাতে নেই, কিংবা থাকলেও নথি নেই। সেখানে উপরোক্ত দুটো রাজ্যের পরেই রয়েছে- রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্রিশগড়। বিহারে ৪০টা লোকসভা আসন, উত্তরপ্রদেশে ঠিক তার দ্বিগুণ- ৮০টা, এই হিসাবেও বিহারই আনুপাতিক হারে বেশি পরিযায়ী শ্রমিকের যোগান দেয় এই দেশে।

কেন্দ্র সরকারের অপরিকল্পিত লকডাউন ও তাকে কেন্দ্র করে ঘটানো রাষ্ট্রীয় সার্কাসের পরে যে সকল পরিযায়ীদের আর পুরাতন কাজটি ফেরেনি, তাদের মোট পরিমাণটা scroll মিডিয়ার এক সমীক্ষার মতে প্রায় ১২৪ মিলিয়ন, মানে কোটির হিসাবে সাড়ে বারো কোটির একটু কম। এটা প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, যা খুঁজে পাওয়া গেছে, এর বাইরে থাকা হিমশৈলের পরিমাণ কেউই জানে না। যিনি দিতে পারতেন তথ্য- তথা যার রাখার কথা, তিনি ময়ূরকে দানা খাইয়ে দাড়ি বাড়িয়েছেন, মার্গদর্শকমন্ডলীর চেয়ারম্যানের হাতে জন্মদিনের ক্ষীর খাওয়ার আগেই দায় ঝেড়ে বলে দিয়েছেন- “মিত্রো, ডেটা নেহি হ্যাঁয়- due to act of God”.

তো যাই হোক, ভোটের দামামা বাজল, ভোটও হলো। বুথ জ্যাম, ছাপ্পা, বোমাবাজি তথা রক্তপাতহীন ভোট দেখে ‘সঙ্গে সুমনকে’ রাখা আম বাঙালির চোখ তো বটেই, বাকি আর অনেক কিছুই যা অঙ্কদেশের জিনিসপত্র, তা দিব্যি মাথায় উঠে গেছিল। এমন শান্ত ভোটও সম্ভব, তাও বিহারে! বিহার আর যাই হোক পশ্চিমবঙ্গ যে নয় সেটা তারা প্রমাণ করে দিতে পেরেছে, তাতে তাদের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশই হোক বা তেজস্বী- তাদের এই পরিবর্তনটার জন্য বিজ্ঞাপন দিতে হয়নি, মানুষ বুঝে গেছে।

মার্কিন মুলুকে ডোনাল ট্রাম্প হারতেই করোনা ‘আল-গায়েব’ হয়ে যাওবার উপক্রম হয়েছে, ভ্যাকসিন কোম্পানিগুলো টাকা কামাবার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাবার জন্য করোনা রয়ে গেছে কেবল পরিসংখ্যানে, তাই বাকি লেজুড়টা যেতে কিছুদিন সময় লাগবে। তেমনই অর্নব জেলে যেতেই গোদি মিডিয়ার যাবতীয় এক্সিট পোলের হিসাব গোলমাল হয়ে গিয়ে, প্রায় সকল মিডিয়া মিলেই ক্লোজ কনটেস্টে তেজস্বীর মহাগঠবন্ধনকে জিতিয়ে দিয়েছিল।

২০২৮ সালে ইভাঙ্কা ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হবে কিনা, নাকি তার আগে কমলা হ্যারিসিই প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি হবে তা সময়ই বলবে। কিন্তু এদেশে সংঘ পরিবারই যে রাজত্ব করবে তা বলাই বাহুল্য, যদি না ৫৬ ইঞ্চির নের্তৃত্বে চীনের সামনে হাঁটু গেঁড়ে, মুঘল পূর্ববর্তী ভারতবর্ষের মানচিত্র ফিরিয়ে আনে। নেতৃত্বে মোদী, যোগী বা তৃতীয় কোনো উন্মাদ আসবে কিনা তা সময়ের গর্ভে, তবে কংগ্রেস বা অন্য তথাকথিত কোনো সেকুলার দলের একার পক্ষে ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা শূন্য।

বিহার নির্বাচনে সংঘীরা জিতে গেল কেবলমাত্র অঙ্কের খেলায়। শাম, দাম, দন্ড, ভেদ; বিজেপি দ্রুত বুঝে গেছিল পালের হাওয়া কোনদিকে বইছে। বিজেপি ঘুণাক্ষরেও কখনও উন্নয়নের কথা বলেনি বিহারে, রামমন্দির, বিনামূল্যে ভ্যাকসিন আর জাতপাতের গল্পের বাইরে এতটুকুও বের হয়নি। মাল্লাদের সাহানিকে ১১টা আসন দিয়েই ম্যানেজ করতে পেরেছিল অমিত শাহ্, যা রাহুল পারেনি সমপরিমাণ আসন দিয়ে।

চিরাগ পাশোয়ানকে দিয়ে নীতিশ কুমারের ‘উত্তর’ প্রজন্মহীন দলকে খেয়ে ফেলার মাস্টার প্ল্যানও ছিল, তবে চিরাগ আর যাইহোক রামবিলাশ নয় এটা প্রমাণিত। তাই সে মোদী ভজনা করে রাজ্যসভায় একটা আসন হাসিল করতে পারলেই সুখী, বিজেপিরও তেমন কোনও মুখ নেই বিহারে, আগামীতে চিরাগই বিজেপির চিরাগ হয়ে বিহার জুড়ে ‘বিহার’ করলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

জিতিনরাম মাঝিকেও ম্যানেজ করতে পারেনি মহাগঠবন্ধন, এই পরিস্থিতিতে যেটা হওয়ার সেটাই হয়েছে, তেজস্বীর মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। গণতন্ত্রে বিরোধী দল যদি প্রান্তিক ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে আনতে না পারে, তাদের ক্ষমতায় ফেরার অধিকার থাকে না, স্বভাবতই মাত্র ৫০% এর বেশি ভোট টার্নআউটের বিহারে তেজস্বীর ক্ষমতায় না আসাটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

প্রান্তিক মানুষগুলোই ১৫ বছরের নীতিশ শাসনের ও কেন্দ্রের মারণ নীতির শিকার। জাতপাত ভোট ব্যাংকের রাজনীতির মাস্টাররা তাদের পকেট ভোটকে বুথে আনতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু বিক্ষুব্ধ ভোটকে ভোট বাক্সে এনে ফেলতে পারেনি মহাগঠবন্ধন।

-ক্রমশ

বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

ফ্রি অ্যাপসের ফাঁদঃ ঠিক কতটা বিপদের মাঝে রয়েছি আমরা?

 


কাশেম সুলাইমানির কথা স্মরণে আছে?

আমেরিকা ২০২০ এর শুরুটা করেছিল ইরানের এই কমান্ডারকে হত্যা করে। ১৭টি একই রঙের গাড়ির কনভয়ের মাঝে স্পেশ্যাল একটিকেই নিশানা বানিয়ে তাকে ছোট্ট একটা ড্রোন মিসাইল দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল বাকিগুলোকে কোনো ক্ষতি না পৌঁছে, এতই নিখুঁত ছিল এই অপারেশন।

ইরান সেনাবাহিনী মার্কিনিদের গুগল ম্যাপ বা ওই জাতীয় কোনো পরিষেবা পায় না মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের দরুন, তারা নিজেরাও মার্কিনি পণ্য ব্যবহারে উৎসাহী নয় ততটা। তার পরেও কীভাবে এত নিখুঁত ভাবে একজন ব্যক্তিতে নির্দিষ্টভাবে টার্গেট করতে সক্ষম হয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনী! সেদিন উত্তর না মিললেও ২০২০ ই জবাব দিয়ে গেল শেষের বেলায়।

গত ২০১৭ এর ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান দেশ ‘কেনিয়ার’নির্বাচনে এমনই এক চরম নিকৃষ্ট কাজ করেছিল ফ্রান্সের সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান, যেটা ধরা পড়ে এই ২০১৯ এর শেষে। ফ্রান্সের সেই কোম্পানি যারা বিনামূল্যে EVM সরবরাহ করেছিল অবাধ গণতন্ত্রের নামে, ওই EVM এর সুইচে বায়োমেট্রিক সেন্সার লাগিয়ে সকল ভোটদানকারীর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু তারা সফলভাবে সেই ডেটার সবটা নিজেদের দেশে পাচার করার আগেই ধরা পড়ে যায়। এই বিপুল ডেটার সবটা পাচার হয়ে গেলে ৭৭% কেনিয়ান ভোটারের আইডি, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, জন্ম শংসাপত্র, জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কার্ড, জাতীয় হাসপাতাল বীমা তহবিল কার্ড, কেনিয়া রাজস্ব কর্তৃপক্ষের ট্যাক্স পিন সবই হস্তগত করে ফেলত ফ্রান্স সরকার। শোষণের এ এক নতুন প্রক্রিয়া, আসলে আমরা নিজেরাও জানি না এই হাই-টেক দুনিয়াতে কখন কীভাবে কার দ্বারা প্রতারিত হয়ে যাচ্ছি।

ধোঁকাবাজেরা ক্রমাগত প্রযুক্তির সুফলকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে সর্বশ্রান্ত করার ফন্দি এঁটেই যাচ্ছে, তাদের নতুন হাতিয়ার হচ্ছে ফ্রি অ্যাপসের ফাঁদ।

আমরা আমাদের ফোনে অনেকেই হরেক অ্যাপস ডাউনলোড করে ফেলি, যাদের অধিকাংশই ফোটো কেন্দ্রিক, গান ও ভিডিও সম্বন্ধীয়, গেমস এর অ্যাপস ইত্যাদি। মুসলমানেদের মধ্যে অনেকেই হাদিস, কোরান ও নামাজের সময় জানতে বহু অ্যাপস ডাউনলোড করে নির্দ্বিধায়। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের ৯৯.৯৯% মানুষের মোবাইলে ১০০% ফ্রি অ্যাপস বোঝাই রয়েছে, কারণ আমরা ফ্রি কিছু পেলে আর কিচ্ছুটি চাই না।

অ্যাপস মূলত তিন ধরনের হয়,
১) ‘পেইড অ্যাপস’, এইগুলো ডাউনলোড করতে গেলেই নির্দিষ্ট পরিমাণে মূল্য দিতে হয় ও বাৎসরিক ভাবে রিনিউ করতে হয় নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা পেতে।
২) ‘ইন অ্যাপ পার্চেস’, এই অ্যাপগুলো বিনামূল্যে ডাউনলোড করা গেলেও বেশি কিছু পরিষেবা পেতে দাম দিতে হয়।
৩) ‘ফ্রি অ্যাপস’, এগুলোতে সকল ধরনের বা অধিকাংশ পরিষেবাই সম্পূর্ণ ফ্রি।

আচ্ছা কখনও মনে হয়েছে, এরা এত খেটেখুটে অ্যাপস বানিয়ে নিয়মিত পরিষেবা কেন দেয় আপনাকে? কী লাভ সেই সংস্থার! তারা কি জনসেবা করে এগুলো দ্বারা! উত্তর হলো- ‘না’। তারা মোটেও জনসেবা করে না বরং আপনাকে বিনামূল্যে দেওয়ার নামে ডাউনলোড করিয়ে দিতে পারলেই তাদের রোজগার। এবারে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তারা বিজ্ঞাপনদাতাদের থেকে রোজগার করতে শুরু করে। ফ্রি ও সেমি-ফ্রি অ্যাপসগুলোতে মোটামুটি চার প্রকারের বিজ্ঞাপন/অ্যাড দেখতে পাওয়া যায় বর্তমানে। যথাক্রমে, (i) ইন্টারস্টিসিয়াল অ্যাডস, (ii) ব্যানার বা ডিসপ্লে অ্যাড, (iii) ইন-অ্যাপ অ্যাড এবং (iv) ন্যাটিভ অ্যাড। এই সকল অ্যাড নিয়ে পরে কোনো প্রবন্ধে আলাপ করা যাবে। কিন্তু রোজগার এখানেই শেষ হয়ে যায় না, বরং এর পরেই অনৈতিক কাজকর্ম শুরু হয় যা আমাদের সকলের অগোচরে।

আজকের এই বাইনারি মাধ্যম সর্বস্ব 5G গতির দুনিয়াতে সম্পদের মানে বদলে গেছে, যার কাছে যত তথ্য আছে সে বা তারাই সবচেয়ে ক্ষমতাধর, আর ক্ষমতাধরের কাছে অর্থ তো পায়ের ধুলো। তথ্য অর্থাৎ ‘ডেটা’, যাকে বলা হচ্ছে ‘Data is new oil’ অর্থাৎ তথ্যই হচ্ছে বর্তমানে খনিজ তেল। আর এই তেল উত্তোলন যে যত হারে করতে পারছে, সে তত কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। ঘটনা হচ্ছে কী করে বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এই ডেটা ভান্ডার কীভাবে গড়ে তুলেছে, পায় কোথা থেকে? আমরা তো কাউকে কোনোদিন কোনো তথ্য দিইনি। আসলে ‘ফ্রি’ মাধ্যমের মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রতিটি বিনামূল্যে পরিষেবা প্রদান করা কোম্পানিগুলোর মুনাফা। সেই কোম্পানিটি গুগল, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি যে কেউ হোক।

আমরা এই সকল অ্যাপসের থেকে পরিষেবা নিই আমাদের হরেক ব্যক্তিগত তথ্যের বিনিময়ে, আমরা প্রতিটি ব্যক্তিই আসলে ‘পণ্য’ এই অ্যাপস কোম্পানিগুলোর কাছে। আমাদের সেই পছন্দপঞ্জী তথ্য বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে ফ্রি এ্যপস কোম্পানি গুলো। ধরুন আপনি অনলাইনে জামা কেনার জন্য সার্চ দিলেন, দেখবেন সারাদিন আপনি অন্যান্য যেসব ব্রাউজিং করছেন, সেই সকল ক্ষেত্রেই হরেক জামার বিজ্ঞাপন দেখছেন। এখন জামার পরিবর্তে টিভি, ফোন, ট্যুর ডেস্টিনেশন ইত্যাদি যা খুশি পণ্য আপনি একটিবার সার্চ করুন সারাদিন ওটাই দেখবেন সর্বত্র। যদি কৌতূহল মেটাবার জন্য কালাজাদুর বিষয়ে সার্চ করেন, তাতেও দেখবেন সর্বত্র ওই বিষয়েই নানান বিজ্ঞাপন আসছে বিবিধ বিকল্পের সাথে।

এই সকল অ্যাপসগুলোতে এক বিশেষ ধরনের কম্পিউটার প্রযুক্তি নক্সা ব্যবহার করা হয়, যাকে এককথায় ‘অ্যালগরিদম’ বলা হয়। এই অ্যালগরিদমই অ্যাপস বা ওয়েবসাইটটির মূল সার্ভারে তথ্য পাঠিয়ে দেয় যে- আপনি কী খুঁজছেন। ল্যাপটপের কোনো ব্রাউজারে এমন কিছু করতে গেলে সেখানে ‘accept cookies’ বলে একটা অপশন আসে, এই কুকিস মানে বিস্কুট নয়, এই কুকিস হলো টিকটিকি বা গোয়েন্দা। এক বিশেষ ধরনের গোয়েন্দা সফটওয়্যার, যারা আপনার পছন্দ-অপছন্দ ও ব্রাউজিং জগতের যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করে তাদের জন্য, যে ওয়েবসাইট তাকে বসিয়ে রেখেছে আপনার কম্পিউটারে, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে তথ্য পাচার করার জন্য।

সুখের বিষয় হলো ব্রাউজারে আপনি কুকিস ‘কন্ট্রোল’ করতে পারেন, মোবাইল অ্যাপসের ক্ষেত্রে তেমনটার অপশন থাকে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। মোবাইল ব্রাউজারের সেটিংসে গিয়ে আপনি কুকিস ব্লক করে আমাদের আনন্দবাজারের ওয়েবসাইট খুলতে যান, দেখলেই তারা কুকিস অ্যাল্যাও না করলে অ্যাক্সেসই করতে দেবে না, অর্থাৎ সিম্পলি গিভ এন্ড টেক পলিসি।

প্রায় প্রতিটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীই প্রতিটি অ্যাপসকে মোবাইলের লোকেশনের তথ্য থেকে শুরু করে ফোনের কললিস্ট, ফোনের ফোটো গ্যালারি ও ভিডিও ফাইল, ফোনের যেকোনো ধরনের মিডিয়া ফাইল সহ কী কী ধরনের তথ্যের অ্যাকসেস দিয়ে দিই তা আমরা নিজেরাই জানি না। আমরা কেউ কখনও কি পড়ে দেখি, লম্বা ওই ‘টার্মস এন্ড কণ্ডিশন’ লিস্টে কী কী লেখা আছে, আমরা জাস্ট OK বটন ক্লিক করে দিই। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা-ফেসবুকের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর কিছু মানুষ বুঝতে পেরেছে যে, ফ্রি পরিষেবা দেওয়া কোম্পানিগুলো আমাদের তথ্য অবৈধ বিক্রয় করেও অনেক টাকা কামাই করছে। প্রতিটি অ্যাপসে লগ ইন করতে ফোন নম্বর বা ইমেল আইডি দিতে হয়, স্বভাবতই যে কোম্পানি যত বড় তার কাছে তত বড় তথ্য ভান্ডার রয়েছে আমাদের সম্পর্কে। এটি যেমন নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে, সেভাবেই ভয়ঙ্কর ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

প্রায় প্রতিটি দেশেই যেকোনো ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা অবৈধ। কিন্তু এটা নেহাতই কথার কথা, আজকের দিনে অবাধে চুরি হচ্ছে আমাদের অজ্ঞতার সুযোগে। এমন ক্ষেত্রে কিছু দালাল কোম্পানির জন্ম হয়েছে যারা বিভিন্ন অ্যাপস কোম্পানি থেকে মোটা অর্থের বিনিময়ে ডেটাগুলো কিনে নেয় ও বড় বড় বিজ্ঞাপনদাতা বা গবেষণাকারীদের কাছে একাধিকবার বিক্রি করে মোটা টাকা রোজগার করে। একটা তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালে ইউরোপের একটা দেশের নির্বাচনে বিরোধী রাজনৈতিক দল ফেসবুকের থেকে এমনই তথ্য কিনেছিল, ঠিক কী কি বিষয়ে জনগণ সোশ্যাল মিডিয়াতে আলাপ আলোচনা করছে নির্দিষ্ট শহর গ্রাম বা বিধানসভা কেন্দ্রের। সেখানে প্রতিটি ব্যক্তির শেষ ৩ মাসের তথ্যের দাম ছিল ১৭১১টাকা, ভাবুন আমাদের বিপুল জনসংখ্যার দেশে কোনো রাজনৈতিক দল এমনটা করলে, তা থেকে কী বিপুল পরিমাণ টাকা রোজগার করতে পারে বড় বড় সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট গুলো।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত এমনটাই ছিল, যেখানে শুধুমাত্র অ্যাপস কোম্পানিগুলোই ডেটা বেচে আয় করত অনৈতিকভাবে, কিন্তু এখন শুধুমাত্র ডেটা কালেকশন করার জন্য হরেক মনোরঞ্জনকারী অ্যাপস ও সাইটের জন্ম দিয়েছে বহু গোয়েন্দা সংস্থা- তাদের এক ও অদ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে ডেটা মাইনিং করা। ফেসবুক, টুইটারে হরেক মজাদার এমন লিঙ্ক আসে টাইমলাইন সার্ফিং করার সময়, যেখানে আমরা ক্লিক করি কিছু না ভেবেই। মজাদার সব সাইট সেগুলো, পূর্বজন্মে কী ছিলেন, আপনার লাভমেট কী, কবে আপনার বিয়ে হবে, আপনার বর্তমান বয়সের ছবির বিকৃতি ইত্যাদি হরেক মজাদার সাইট, এরা আসলে প্রত্যেকটি ডেটা মাইনিং সংস্থা। সেখানে ঢুকতে গেলে বেশ কতগুলো পার্মিশন চাওয়া হয় তাদের তরফে, সেগুলোকে ok করলে তবে ওই সকল মজাদার পরিষেবা পেতে পারবেন। এমনই একটি ফ্রি এ্যপস হচ্ছে ‘Muslim Pro’।

‘Muslim Pro’ হচ্ছে অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড করা ইসলামিক অ্যাপস, গোটা বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ এটার ব্যবহার করত এই শুরুর নভেম্বরেও। এরাই X-mode নামের এক দালাল ডেটা মাইনিং কোম্পানিকে তাদের যাবতীয় ডেটার অবৈধ বিক্রি করত সেই ২০১৮ সাল থেকে, খবরটি সম্প্রতি ফাঁস হয়ে গেছে হরেক মিডিয়াতে। এই X-Mode কে কাজে লাগিয়েছিল US militery।

মার্কিন মিলিটারি এমন অসংখ্য ছোট ছোট কোম্পানিকে দিয়ে অজস্র ফ্রি অ্যাপস বানিয়ে ছেড়ে দেয় সেই সকল নির্দিষ্ট অঞ্চলে, যেখানে তাদের নজরদারি চালাতে নিখুঁত তথ্য দরকার। সাধে কি আর চীন কোনো ধরনের মার্কিন-ইউরোপীয় ইন্টারনেট মাধ্যমের প্রযুক্তি কোম্পানিকে দেশে ঢোকার পার্মিশন দেয়নি, একই কারণেই শত শত চাইনিজ অ্যাপস ব্যান হয়েছে আমাদের দেশেও।

নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির উপরে, কোনো গোষ্ঠীর উপরে, কোনো বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলে নজরদারি চালাবার জন্য এমন অ্যাপস হাতিয়ার ব্যবহার করছে কিছু দেশ। আমাদের মতো অতি সাধারণ ব্যবহারকারীরাও জানি যে গুগল, ফেসবুক দ্বারা আমাদের সহজে ট্র্যাক করা যেতে পারে, তেমনই মার্কিন সেনাবাহিনী, CIA, মোসাদ, MI-6, ISI এর মতো ধুরন্ধর বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও জানে এ কথা। সুতরাং সেয়ানাদের ধরতে গুগল-ফেসবুকের মতো চিহ্নিত মাধ্যম ব্যবহার করে ট্র্যাক করতে পারবে না। তাই সেয়ানাদের জন্য এমন অসংখ্য মনোরঞ্জন ও প্রয়োজনীয় অ্যাপস বাজারে ছেড়ে রেখে তারা লক্ষ্যে পৌঁছে যাচ্ছে; ব্যাপারটা এমনই ভয়াবহ দিকে চলে যাচ্ছে যে- আমি আপনি যে কেউ তাদের জন্য ঘরের পোষা মুরগির মতো সহজলভ্য নিশানা হয়ে যাচ্ছি।

মার্কিন সেনাবাহিনী ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি এমন হরেক অ্যাপস বাজারে সরাসরি আছে ছদ্মবেশে। এই ২০২০ সালের এপ্রিলে মার্কিন কংগ্রেস ‘বাবেল স্ট্রিট’ নামের একটা প্রযুক্তি সংস্থাকে ৮৯ লক্ষ ডলার পেমেন্ট করেছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ অনুমোদনে। এদের কর্ণধার টিম হকিন্স’ সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিল, “মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ছোট ছোট জনজাতি, মিলিট্যান্ট-মিলিশিয়া গ্রুপদের লোকেশন ট্র্যাক করতে পারা জরুরী জঙ্গীবাদ নিকেশ করতে, সেই প্রযুক্তির উদ্ভাবনের জন্যই এই বিনিয়োগ”। এই ‘বাবেল স্ট্রিট’ কোম্পানির একটি প্রোডাক্ট বা সফটয়্যার আছে ‘LOCATE X’ নামে, এর দ্বারা আপনার ফোনের লোকেশন বন্ধ থাকলেও ‘বাবেল স্ট্রিটের’ সার্ভার নিখুঁত অবস্থান পেয়ে যাবে যে ডিভাইসে এটা ইনস্টল আছে, এমনভাবেই এগুলো তৈরি।

এই ভয়াবহ প্রযুক্তিগত ফাঁদগুলো এই ‘Muslim Pro’ স্ক্যামের উন্মোচনের পরেই ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি মুসলমান দেশগুলোর। আগামীতে এটা খোদ আমেরিকারই উপরেই যে অন্য কেউ প্রয়োগ করবে না তা কে বলতে পারবে! ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্প তো আমরা অনেকেই জানি। তবে তারা ক্ষমতাধর- প্রযুক্তি, অর্থ সকল দিক দিয়ে। ওরা নিজেরা নিজেদের সুরক্ষিত করে নেবে; কিন্তু আমাদের মতো ছাপোষা মানুষের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কী হবে!

উপরে কেনিয়ার ঘটনা সে জন্যই বলেছি শুরুতে। জটিল অ্যালগরিদমের মাধ্যমে আমাদের প্রতিটি গতিবিধি সমন্ধীয় পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য কোন দপ্তরে পৌঁছে যাচ্ছে আমাদের অজান্তে তার খোঁজ কেউ জানি না।

মুসলমানেদের জন্য যেমন ‘Muslim Pro’ সেজে এসেছিল মার্কিন সেনা, তেমনই হিন্দুদের, খ্রিস্টানদের, বৌদ্ধদের জন্য কিছু এমন অ্যাপস আছে কিনা আমরা কেউ জানি কি? এর সাথে যদি সেই অ্যাপস দর্শনধারী হওয়ার সাথে বেশ খানিকটা প্রয়োজনও মিটিয়ে দেয়, সেক্ষেত্রে আমরা নিজেরাই শত শত বন্ধুদের কাছে সংশ্লিষ্ট অ্যাপসের প্রচার করে দিয়ে থাকি, এটাই আমাদের স্বাভাবিক চরিত্র।

অনেকে ভাববেন আরে অমুক অ্যাপস তো আমাদের সাচ্চা ভারতীয়র তৈরি, কিংবা তার মালিক হিন্দু বলে হিন্দুদের ক্ষতি হবে না নিশ্চিত ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের জন্য একটা তথ্য দিই, Muslim Pro অ্যাপসের মালিকও আরবের মুসলমানই ছিল, যদিও তাদের ফান্ডিং করেছিল এক মার্কিন কোম্পানি। আমাদের দেশের দিকেই দেখুন, গরু রাজনীতি এখন ভীষণ জনপ্রিয়। তথাপি গোমাংস রপ্তানি বন্ধ তো হয়নি, উল্টে প্রতি বছর তা বেড়ে চলেছে। প্রথম ১০টি ভারতীয় গোমাংস রপ্তানিকারক কোম্পানির ৭টিই অমুসলিমদের, যদিও প্রতিটি নামই আরবি শব্দ দ্বারা তৈরি। এদের মাঝে কয়েকজন আবার জৈন ধর্মেরও আছে, যারা আজন্ম নিরামিষাশী। আরও বড় তথ্য হচ্ছে ওই ৭টি বড় কোম্পানির মধ্যে অন্তত ১৯ জন এমন পার্টনার আছে যারা বিজেপির বড় বড় নেতা। সঙ্গীত সোম বা অনিল ভিজদের মতো প্রথম সারির গোহত্যা বন্ধ বিষয়ে রাজনীতি করেই তাদের পরিচিতি পাওয়া ব্যক্তিরা ওই ১৯ জনের তালিকাতে রয়েছে। সুতরাং হিন্দু বলেই হিন্দুরা সেফ, বা মুসলমানের কাছে মুসলমানেরা সেফ, বিষয়টা এতটাও অতি সরল নয়। নতুবা প্রতি বছর এদেশে ধরা পড়া ISI এর চরেদের ৯৫% অমুসলিম হতো না।

‘PINGDOM’ নামের ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনি নিজেই দেখে নিতে পারবেন আমাদের বহু চেনা ও অচেনা অ্যাপস বা ওয়েবসাইটগুলো কীভাবে কোন কোন তথ্য চুরি করতে কীভাবে আমাদের ফোনকে ব্যবহার করে। সুতরাং এখন বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কীভাবে কাসেম সুলাইমানিকে এক্কেবারে পিন পয়েন্টে টার্গেট করে খুন করা সম্ভব হয়েছিল।

এমনিতেই আমরা হরেক চাইনিজ কোম্পানিদের ফোন, টিভি, অ্যাপস, ফান্ডিং দ্বারা নাগপাশে বন্দী। আগামীকাল তাদের সাথে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে, তারা আমাদের দেশে ওই কায়দাতেই ক্ষতি করেবে কিনা কে তার গ্যারান্টি দেবে! আমাদের দেশের শিল্পপতিরা, বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও আগামীকাল এমন কিছুর শিকার হতেই পারেন, যদি না আজই এগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বিকল্প সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে রাখে রাষ্ট্র। জনপ্রিয় অ্যাপসগুলোর আদলে সরকারই এমন পরিষেবা দিলে রাষ্ট্রের জনগণের তথ্য বিদেশী শত্রুদের হাতে যাওয়া থেকে অবশ্য রক্ষা পায়, কিন্তু সেটা করবেটা কে! সামান্য আরোগ্যসেতু এ্যপসের বিষয়েই কোনও তথ্য নেই সরকারের কাছে।

বহিঃশত্রু ভুলে যান, তারা আমাদের নাগালের বাইরে। ফেসবুক, গুগলের মতো কোম্পানিগুলোও আমরা ধরাছোঁয়ার বাইরে, তারা অধিকাংশ দেশের সরকারের চেয়েও বেশি ধনী ও ক্ষমতাবান। বিভিন্ন সরকারই এদের সাথে হরেক ডিল করে। যাতে কেউ বিদ্রোহ ঘোষণা করলে সেই বিদ্রোহীদের গতিবিধির সবটাই ট্র্যাক করতে পারে সরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর এই তরজাকে কাজে লাগিয়ে ফ্রি পরিষেবা দিয়ে রাজনৈতিক ডেটা মাইনিং করতেই বা কতক্ষণ এদের!

যেকোনো স্বৈরাচারী শাসক চাইলেই প্রতিটি সরকার বিরোধী বিদ্রোহকে অঙ্কুরেই ‘খতম’ করে দিতে পারে। গণতন্ত্রের সংজ্ঞাই বদলে যেতে পারে এর বিকল্প না এলে। এমন কোনো অ্যাপসের দ্বারা খুব সহজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পথচলতি অবস্থায় ট্র্যাক করে খতম করে দেবে বা পুলিশ দিয়ে তুলে নেবে, অথচ আপনার লোকেশন সার্ভিস বন্ধই ছিল ফোনে। এছাড়া প্রোপাগান্ডা ছড়াবার জন্য ফেসবুক, ওয়াটস অ্যাপ, টুইটার কীভাবে ব্যবহার করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাসীন দল তা আমাদের চেয়ে ভাল কে জানে। তাই গুগল বা ফেসবুককে কোনো সরকারই ঘাঁটায় না, বরং ব্যবহার করে বিপুল অর্থের বিনিময়ে।

আমাদের দেশেরই কোনো ডাকাতগোষ্ঠী, পাচারকারী বা সমাজবিরোধীরা এমন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করলে সাধারণ জনগণের অবস্থা কী হবে বুঝতে পারছেন? আমরা এই ভারত উপমহাদেশের প্রায় প্রতিটি জনগণই ফ্রি পেলে আলকাতরাও খেয়ে নিই পেট ভরে, সেটা কি কারো অজানা রয়েছে! সুতরাং আমাদের এখনই সাবধান হওয়ার সময় চলে এসেছে, নতুবা আগামীতে আপনাকে এক্কেবারে সেখানেই পাকড়াও করবে এরা, যেখানে পেতে চায় তাদের ফাঁদ।

কিন্তু এর মানে কি আমরা ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন ব্যবহার করা ছেড়ে দেব! মোটেই তা নয়, নিশ্চয়ই এ বিষয়ে কোনো সমাধান নেবে সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞেরা ও রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। তবে আমরা নিজেরাও এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি অনেকটাই।

আমাদের প্রত্যেকের ফোনেই কমবেশি ৮০-১০০ বা তারও বেশি নানান অ্যাপস থাকে। যেগুলোর মধ্যে ৫-১০%ই আমরা ব্যবহার করি নিয়মিত। বাকিগুলো দৈনিক ব্যবহার না করলেও সেগুলো ফোনে রয়েই যায়, যেগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে সচল থাকে, ইন্টারনেট কানেকশন পেলেই তারা ডেটা মাইনিং শুরু করে নিজেদের সার্ভারে তথ্য পাচার করতে থাকে।
মোবাইলে নেট চালু করলেও সংশ্লিষ্ট অ্যাপসগুলোতে যদি নেট পরিষেবা বন্ধ করে রাখতে পারেন সেক্ষেত্রে আমার ছোট বুদ্ধিতে মনে হয় অনেকটাই এই অবৈধ ডেটা মাইনিং বন্ধ করে রাখা যাবে। এখানে ইন্টারনেটই এই পাচারের একমাত্র মাধ্যম। কিছু থার্ড পার্টি অ্যাপসের সন্ধান দিলাম নিচে, যেগুলো অ্যান্ড্রয়েড, আইফোন সহ প্রতিটি বড় বড় অপারেটিং সিস্টেমে উপলব্ধ। ‘কোন অ্যাপস নেট কানেকশন পাবে আর কোনটা পাবে না’ এই ধরনের অ্যাপসগুলোর যেকোনো একটি দ্বারা আপনি নিজে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। যখন যে অ্যাপসে নেট প্রয়োজন সেটা অন করে নিলেন, কাজ মিটে গেলেই আবার বন্ধ।

এভাবে আপনি আপনার মোবাইলের অপ্রয়োজনীয় নেট খরচাতেও রাশ টানতে পারবেন। অবশ্যই এই ফায়ারওয়েলের নেটটিও বন্ধ রাখতে ভুলবেন না।

I. NoRoot Firewall
II. NoRoot Data Firewall
III. LostNet NoRoot Firewall
IV. NetGuard
V. DroidWall

সুতরাং আমরা সকলেই পকেটে গোয়েন্দা নিয়ে ঘুরছি অদৃশ্য মাইন বেছানো যুদ্ধক্ষেত্রে। ‘আস্তিনে সাপ পুষে বাঁচা’ প্রবাদের জীবন্ত স্বরূপ প্রজন্মের আমরা। কীভাবে এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবো কেউ জানি না এই মুহুর্তে, তবে শুরুটা করতেই পারি। আমারটা আমি জানালাম, আপনার কাছে কোনো আইডিয়া বা প্রযুক্তি থাকলে কমেন্টে শেয়ার করতেই পারেন।

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...