রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

কবিতার আধুনিকতা; ও বর্তমান পরিস্থিতি

 


কবিতার আধুনিকতা; ও বর্তমান পরিস্থিতি

 

কবিগুরুর কতগুলো লাইন ধার করে শুরু করি

আমরা সচরাচর কথোপকথনে যতটা অনুভাব প্রকাশ করি তাহারই চূড়ান্ত প্রকাশ করিতে হইলে কথোপকথনের ভাষা হইতে একটা স্বতন্ত্র ভাষার আবশ্যক করে। তাহাই কবিতার ভাষা- পদ্য। অনুভাবের ভাষাই অলঙ্কারময়, তুলনাময় পদ্য। সে আপনাকে প্রকাশ করিবার জন্য আঁকুবাঁকু করিতে থাকে -- তাহার যুক্তি নাই, তর্ক নাই, কিছুই নাই। চূড়ান্ত যুক্তির ভাষা গদ্য, চূড়ান্ত অনুভাবের ভাষা পদ্য

এমন যদি নিয়ম হইত যে, যে কবিতায় চতুর্দ্দশ ছত্রের মধ্যে, বসন্ত, মলয়ানিল, কোকিল, সুধাকর, রজনীগন্ধা, টগর ও দুরন্ত এই কয়েকটি শব্দ বিশেষ শৃঙ্খলা অনুসারে পাঁচ বার করিয়া বসিবে, তাহারই নাম হইবে কবিতা বসন্ত-- ও যদি কবিতাপ্রিয় ব্যক্তিগণ কবিদিগকে ফরমাস করিতেন, “ওহে চণ্ডিদাস, একটা কবিতা বসন্ত, ছন্দ ত্রিপদী আওড়াও ত! অমনি যদি চণ্ডিদাস আওড়াইতেন-

 

বসন্ত মলয়ানিল, রজনীগন্ধা কোকিল,

দুরন্ত টগর সুধাকর--

মলয়ানিল বসন্ত, রজনীগন্ধা দুরন্ত,

সুধাকর কোকিল টগর

 

ও চারি দিক হইতে "আহা আহা" পড়িয়া যাইত, কারণ কথাগুলি ঠিক নিয়মানুসারে বসানো হইয়াছে -- তাহা হইলে কবিতা কতকটা আধুনিক গানের মত হইত। ঐ কয়েকটি কথা ব্যতীত আর-একটি কথা যদি বিদ্যাপতি বসাইতে চেষ্টা করিতেন, তাহা হইলে কবিতাপ্রিয় ব্যক্তিগণ "ধিক্ ধিক্" করিতেন ও তাঁহার কবিতার নাম হইত "কবিতা জংলা বসন্ত।" এরূপ হইলে আমাদের কবিতার কি দ্রুত উন্নতিই হইত! কবিতার ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী বাহির হইত, বিদেশবিদ্বেষী জাতীয়ভাবোন্মত্ত আর্য্যপুরুষগণ গর্ব্ব করিয়া বলিতেন, উঃ, আমাদের কবিতায় কতগুলা রাগ রাগিণী আছে, আর অসভ্য ম্লেচ্ছদের কবিতায় রাগ রাগিণীর লেশ মাত্র নাই

এমন লোকও আছেন যাঁহারা ভাবিয়া পান না যে, ভাবগত কবিতা বস্তুগত কবিতা অপেক্ষা কেন উচ্চ শ্রেণীর ! তাঁহারা বলেন ইহাও ভাল উহাও ভাল। আবার এমন লোকও আছেন যাঁহারা বস্তুগত কবিতা অধিকতর উপভোগ করেন। উক্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে সুরুচিবান লোকদের আমরা জিজ্ঞাসা করি যে, ইন্দ্রিয়সুখ ভাল না অতীন্দ্রিয় সুখ ভাল? রূপ ভাল না গুণ ভাল? ভাবগত কবিতা আর কিছুই নহে, তাহা অতীন্দ্রিয় কবিতা। তাহা ব্যতীত অন্য সমুদয় কবিতা ইন্দ্রিয়গত কবিতা

কবিতাটি কবির সন্তানের স্বরুপ। সন্তানের জন্মোপলক্ষে ঘটিত সুখের চেয়ে একটা কবিতার জন্মে কবির কম সুখ অনুভূত হয়না। কচি মুখ, মিষ্ট হাসি, আধো-আধো কথা ইহার বিষয় নহে। একটি ক্ষুদ্রকায়া সদ্যোজাত শিশুর মধ্যে মিষ্টভাব কচিভাব ব্যতীত আরেকটি ভাব প্রচ্ছন্ন আছে, তাহা সকলের চোখে পড়ে না কিন্তু তাহা ভাবুক কবির চক্ষে পড়ে। সদ্যোজাত শিশুর মধ্যে একটি অপরিসীম মহান ভাব, অপরিমেয় রহস্য আবদ্ধ আছে, যেমনটি কবিতায় থাকে

সভ্যতার সমস্ত অঙ্গে যেরূপ পরিবর্তন আরম্ভ হইয়াছে কবিতার অঙ্গেও যে সেইরূপ পরিবর্তন হইবে ইহাই সম্ভবপর বলিয়া বোধ হয়। কবিতা সভ্যতা-ছাড়া একটা আকাশকুসুম নহে। কবিতা নিতান্তই আশ্মানদার নয়

এখনকার সভ্য সমাজে দশটাকে মনে মনে তেরিজ কষিয়া একটাতে পরিণত কর। কবিতাও সে নিয়মের বহির্ভূত নহে। সভ্য দেশের কবিতা এখন যদি তুমি আলোচনা করিতে চাও তবে একটা কাব্য, একটি কবির দিকে চাহিও না। যদি চাও ত বলিবে "এ কি হইল! এ ত যথেষ্ট হইল না! এ দেশে কি তবে এই কবিতা?

পূর্বে একজন পণ্ডিত না জানিতেন এমন বিষয় ছিল না। লোকেরা যে বিষয়েই প্রশ্ন উত্থাপন করিত, তাঁহাকে সেই বিষয়েই উত্তর দিতে হইত, নহিলে আর তিনি পণ্ডিত কিসের? এক অ্যারিষ্টটল দর্শনও লিখিয়াছেন, রাজ্নীতিও লিখিয়াছেন, আবার ডাক্তারিও লিখিয়াছেন। তখনকার সমস্ত বিদ্যাগুলি হ-য-ব-র-ল হইয়া একত্রে ঘেঁষাঘেঁষি করিয়া থাকিত। বিদ্যাগুলি একান্নবর্ত্তী পরিবারে বাস করিত, এক-একটা করিয়া পণ্ডিত তাহাদের কর্ত্তা। পরস্পরের মধ্যে চরিত্রের সহস্র প্রভেদ থাক, এক অন্ন খাইয়া তাহারা সকলে পুষ্ট। এখন অবশ্য সর্বজ্ঞ পন্ডিত না থাকিলেও সর্বজ্ঞ কবির অন্ত নাই, তাহাতে কাব্য থাকুক আর নাই বা থাকুক, কাগজের উপরে কলম চালাইতে পারিলেই নিজেকে কবিবর ভাবিয়া লইতে অসুবিধা কি”

শুরুর ভুমিকাটাই অনেক বড় হইয়া গেল, আসলে কবিগুরুর লাইন তো , সুতরাং অল্পেতে কি ভাবে হইবে!

শেষ লাইন দিয়েই শুরুকরি। আজিকাল সকলেই কবি, তাহাতে কাব্যরস থাকুক বা না থাকুক। গুরুদেব ইন্টারনেটের কথা কল্পনাও করিয়া যাইতে পারেন নাই, যদি কোনক্রমে তাহার নিকট বর্তমান কোন ফেসবুক গ্রুপের একটা দিনের পাতা খুলিয়া দেখানো সম্ভব হইত, নিশ্চিত তিনি সিলিং ফ্যানে গলায় গামছা বাধিবার পূর্বে অবশ্যই সুলালিত দাড়িটি “কবিতার” অন্ত্যেষ্টির জন্য কামাইয়া ফেলিতেন নিশ্চিত

বাঙালী ও কবিতা নাকি সমার্থক, আমি নিজেও তার বাহিরে নই। স্কুল কলেজে যতবার প্রেমে পড়িয়াছি ততবারই অন্তরের কবিত্ব জাগিয়া উঠিয়াছিল সন্দেহ নাই। অতঃপর প্রতিটি প্রেমকাহিনি সমাপ্তের সাথে সাথেই কবিতা বমনও আশ্চর্যজনক ভাবে স্তব্ধ হইয়া যাইত। আধুনা দুই এক বৎসর কাল এই পীড়া আপাতকালীন ভাবে দূরীভুত হইয়াছে

কিন্তু যেহেতু ইহা আমার মতে একটি পীড়া, সেই হেতু বহু মানবসন্তানই পোলিওর ন্যায় এই প্রকারের ছোঁয়াচে পীড়ার শিকার। বিশেষত যাহারা অন্তর্জালের পাড়ায় নিয়মিত যাতায়াত করিয়া থাকেন। তাহা অভ্যন্তরে আমার অত্যন্ত নিকট বন্ধুবাসরের সখার সংখ্যাও নেহাত কম নহে। এই বিষয় চয়ন করার অর্থ শত্রু সংখ্যা না বাড়লেও, বন্ধু যে কমিবে তাহার জন্য রকেট বিজ্ঞানি না হইলেও চলিবে। সুতরাং গালি খাইবার নিমিত্ত, যে আন্তরিক ভাবে প্রস্তুত থাকিতেই হইবে, ইহাও বলাই বাহুল্য

কবিতা কি? কবিতা হইল মনের ভাবধারার অন্তিম মন্থিত নির্যাস। যাহা আনন্দে ফল্গুধারার মত নির্ঝরিনির মত প্রবাহিত হইয়া অন্যকেও সেই সুখামৃত পান করাইয়া তৃপ্ত লভিয়া থাকে, অথবা তীব্র বিষাদসিন্ধু গরলের মত বক্ষে চাপিয়া যাবতীয় দুঃখবোধকে কাব্যিক সরলতায় প্রকাশ করে, কিছুটা উপশমের চেষ্টা

কবিতা কে লেখেন? কবিতা তিনিই লিখিয়া থাকেন যাহার মনের অভ্যন্তরের ভাবনাকে কাব্যের আকারে প্রকাশ করিবার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। আর যিনি এই কর্মটি সুচারুরুপে সম্পন্ন করিতে পারেন, তাহাকেই সেই কাব্যের জনকস্বরুপ কবি নামে অভিহিত করিতে পারি। কবিগুরু বলিয়াছেন, কবিতা আসলে কবির সন্তান স্বরুপ। কিন্তু আধুনিক এই কবির মেলাতে কজন সুস্থ সন্তানের জন্মদান করিয়াছেন বলিয়া দাবি করিতে পারেন? দু একটি ব্যাতিরেকে প্রায় সকলই পঙ্গু ও নিরেট। যাহার না আছে ধড় না পুচ্ছ

পৃথিবীর অধুনা সঙ্কট বিশ্বউষ্ণায়ন প্রথম হইলে দ্বিতীয়টা অবশ্যই তৃতীয় বিশ্বের জনবিষ্ফোরন। আর সাহিত্যের সঙ্কট হইল এই দ্রুত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রকাশিত প্রচারিত অপুষ্ট কঙ্কালসার ও বিষাক্ত শব্দগুচ্ছের তুমুল বিষ্ফোরনকে “কবিতা” নাম দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার কুৎসিত প্রচেষ্টা, আসলে আমাদের সাহিত্যকলার ঐতিহ্য আর ইতিহাসের পাশাপাশি যুবসমাজকেও সম্পূর্ন ভ্রান্তপথে বাধিত করিতেছে

জীবনানন্দের অমোঘ বানী- “ সকলেই কবি নয়, কেও কেও কবি” এই সার সত্যকে উপেক্ষা করেই ঘটে চলেছে, কাব্যকে গন বলাৎকার। সীমাবদ্ধ জীবনের ব্যাকুলতা কে ভাষা যোগানোর পরিবর্তে, এই সাহিত্যহন্তা শব্দব্রম্ভের স্রোত সমাজকে আলো দেখানোর পরিবর্তে মরিচিকার প্রহেলিকায় আচ্ছন্ন করিয়া দিচ্ছে। ব্যক্তির নিজস্ব সময়বোধ যখন তার একান্ত ব্যক্তিগত হইতে পারেনা, সেখানে কবিতা তো পাঠককুলের পরিশীলিত মনন বোধকে জাগ্রত করার অনুঘটক রুপে কার্য করিয়া থাকে, কবিতার দায় রহিয়াছে শিল্পোবোধএর ঐতিহ্যকে রক্ষা করার। সুতরাং কবি সেই দায় হইতে মুক্ত নন

এক্ষণে যদি বোদ্ধাদের প্রশ্নে আসা হই, তাহা হলে সকলের জন্য সকল কবিতা হয়, ইহা সত্য। আধুনিক কবিগনকে সসম্মানে উহ্য করিয়াও, জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে বা নির্মলেন্দুর সকল কবিতা কি সর্বসাধারনের বোধগম্য? নিশ্চই তাহা নহে। সকল কবিতা কি কালজয়ীই হইবে! না মোটেই তাহা নয়। কারন কবির ভাবনা আর পাঠকের সেই মুহুর্তের মনস্তত্বের টানাপোড়েনের উপরে অনেকটা নির্ভর করিয়া থাকে, বাকিটা ব্যক্তিগত রুচি। যদিও কিছু কিছু লাইন এতোটাই যুগান্তর যে, সেটা কালজয়ী হতে সময় নেয় না

পাঠকের সমাদর ব্যতিত কাব্যে প্রানের সঞ্চার হয়না। কিন্তু কবি কি পাঠকের কথা ভাবিয়া রচনা করেন? মোটেই না, সুতরাং কাব্যের অন্তর্নিহিত ভাবনা, শব্দচয়ন ও সমকালের প্রভাব কাব্যকে পাঠক মনের কাছাকাছি এনে দেয়। বাস্তব ঘটনামালার ভিন্নতাকে কাব্যিক ভাবে জারিত করে , কবির নিজস্ব চেতনার রঙে রাঙিয়ে যদি পাঠকের সম্মুখে পরিবেশন করা সম্ভবপর হয় তাহা হইলে সেই কবিতার মৃত্যু নেই। শুধু মাত্র লেখার জন্য কবিতা হয় না বা কবিতার জন্ম দশটা পাঁচটা চাকুরির মত নহে, যে খাতা আর কালি নিয়ে বসিলেই কবিতার জন্ম হইবে। কাব্যিক সাধনা প্রয়োজন। প্রখর বাস্তববোধ প্রয়োজন। সাথে নিষ্ঠা আর অধ্যাবসায়

কবিতার কোন নির্দিষ্ট সূত্র নেই, নেই কোন চমক সৃষ্টির তাৎক্ষনিক দুর্দান্ত পন্থা। সর্বপ্রথম প্রয়োজন কাব্যপাঠের নেশা, যাহা বিনা কবিতার জন্ম দেওয়া অসম্ভব। লেখনির সময় পাঠককে উপেক্ষা করা নিতান্ত প্রয়োজন, কিন্তু অবজ্ঞা নহে। কারন কবিতায় বহু মানুষ আশ্রয় গ্রহন করিয়া থাকেন, কিন্তু কবিতা কেবলমাত্র তাহার বরপুত্রদের উপরেই ভর করিয়া থাকে, অবশ্যই তাহারা ক্ষণজন্মা। লৌকিক জগতের যাবতীয় উপলব্ধির সহিত কল্পনার মাধুরীর সংমিশ্রণ ঘটানো সকলের কর্ম নহে। যিনি নিজেকে কবি বলিয়া প্রকাশের ইচ্ছা করেন, তাহার অনুভূতি জগতের সকল প্রতীকি চেতনা, তাহার সৃষ্টির প্রতিটি ছত্রে উপস্থিত থাকিতেই হবে, তবেই না কবি

আজিকালের আধুনিক কবিদের মধ্যে, বিশেষত এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যাদের মূলত প্রকাশ, তারা ঠিক উদ্দেশ্যে কবিতা লেখেন , অধিকাংশ জনেই তার ব্যাখ্যা দিতে অপারগ। কাজ নাই, চলো কবিতা লিখি এই গোছের। কেবলমাত্র, বন্ধু বৃত্তে আরো অনেকেই যেহেতু এই চর্চা করিয়া থাকেন, সেই হেতু “আমি” না লিখিলে কেমনে প্রশংশা পাইব? এই ভাবনা থেকেই বেশিরভাগ জনেই কবিতার নামে মল-মুত্র ত্যাগ করিয়া থাকেন। আর প্রশংসা শুনিবার জন্য যত জনকে সম্ভবপর ততজনকে সাথে বেঁধে নেন। জোর করে কি কবিতা শোনানো সম্ভব? সেই সুকুমারি ছড়ার একুশে আইন ন্যায় একটু পরিবর্তন ঘটাইয়া, সেথায় যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের ধরে ট্যাগের বলে, কানের কাছে নানার স্বরে, কবিতা শোনায় লক্ষ ড্যাস

কবিতা তো কবির আবেগ। তাহা জোর করিয়া একপ্রকার ঘাড় ধাক্কা দিইয়া শোনাইবার অপচেষ্টা আজিকাল শিল্পের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হইয়াছে। একটা সত্য ওনারা বুঝতে চাহেননা, যে তার কবিতা যদি সত্যিই উৎকর্ষতার মান অতিক্রম করিতে পারেন, পাঠককূলই তাহাকে সমাদরে মাথায় তুলিয়া রাখিবেন, ও তাহার পুনঃপুনঃ প্রচার করিতে থাকিবেন। একটা বিষয় মনে রাখিতে হইবে, সাফল্যের কোন হ্রস্বতর পথ হইতে পারেনা। সমালোচোনা সহিবার অসীম শক্তির সহিত নিরলস প্রয়াসের দীর্ঘ যুগলবন্দিই সফলতার বৃত্তের প্রবেশপথ দেখাইতে সক্ষম

কাব্য চর্চার সহিত প্রতিষ্ঠার আত্মীয়তা অত্যন্ত দুর্মূল্য। কারন সফলতার যে পথে প্রতিষ্ঠার মঞ্চ প্রস্তুত হয়, তাহা অত্যন্ত বন্ধুর। সাহিত্য জ্ঞান আমার মতে সর্বাধিক পাঠককুলের কাছেই সঞ্চিত। বাকি যারা সাহিত্যচর্চাটা দু কলম লেখালখির মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ করিয়া থাকেন তাহারা কেহই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নন, কারণ সাহিত্য সৃষ্টির নির্দিষ্ট পাঠ নেই, কবিত্ব আরো মারাত্বক, ইহা প্রায় সম্পূর্নটাই আত্মগত ও স্বাভাবিক পরিস্ফুটন। কবিগুণ একপ্রকারের স্বভাবগুণ, কোন গুরু ধরিয়া কবি হওয়া অসম্ভব

সমকালীন খ্যাতিমান কবিগনের কবিতাতেও, যাহাকে আমরা আধুনিক কবিতা বলিয়া জানি, সেই সকল কবিতার অভ্যন্তরে একটা গল্প থেকে থাকে, যদিও অধিকাংশ কবিতাতেই ছন্দের প্রভাব মুক্ত। কিন্তু সেগুলি বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনার সোনালী ফসল। কিন্তু সেই সকলকে অনুকরণ করিয়ে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্বঘোষিত কবির দল, কবিতার নামে যে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খল অত্যাচারে বিদ্ধ পাঠককূলকে খোঁচাইয়া খোঁচাইয়া কাব্যগরল পানে বাধ্য করিয়া থাকেন, তাহা হইতে নিষ্কৃতি কোথায়? আরে বাবা কবিতা অনুভব করিতে হয়, আত্মস্থ করিতে হয় উপলব্ধি করিতে হয়।

শুধু মাত্র “ বাহ, অপূর্ব, অনবদ্য, দারুন, সুন্দর, অবিশ্বাস্য ইত্যাদি” রোজ ব্যবহৃত ভোঁতা ভাষাগুলি শোনার অভিপ্রায়ে? আর কিছু হউক বা না হউক, এই কবিদের পাল্লায় পড়িয়া এই কতিপয় শব্দবন্ধগুলি তাহার কার্যকারিতা হারাইয়াছে নিঃসন্দেহে। কারণ আসলে কোনটা অপূর্ব? কোনটা অনবদ্য? কোনটা অবিশ্বাস্য? বনলতা সেন? নাকি দেবতার অভিষাপ? না কি ওই “রেচন পদার্থ “ গুলো। যাহারা প্রতিষ্ঠিত বা মহান তাহাদের কথা ছাড়িয়া দিন , বাকি যাহারা অধ্যবসায়ের সহিত প্রতিদিনিই চেষ্টা করিতেছেন, তাদেরও যে গুটি কয়েক সুন্দর সৃষ্টি, সেগুলিই বা কি ভাবে ই গনপ্রশংসার ভীড়ে আলাদা করিবেন হে কবিবর? একবার পরখ করে দেখুন আপনার সৃষ্টপদটি কি আদৌ খাদ্য তো? অখাদ্য বা সুখাদ্যের বিচার নাহয় পাঠক করিবেন পড়িবার পর। অন্যের কথা ছাড়িয়া দিন, নিজের তৈরি কান্ডকারখানায় কি মুড়ি মিছরি একই দড় হইয়া যায়নি আপনি নিজেও?

কবিতার শরীরে কাব্যালঙ্কার থাকতেই হবে, ইহাই কবিতার প্রাথমিক শর্ত। কবিতা পাঠের সময় পাঠকের মনে যদি কোন চিত্রকল্প না জাগ্রত হয়, কোন গল্প, বা চরিত্র, বো জীবনবোধ বা দর্শন খুঁজিয়া না পায়, তাহলে সেটা কি কবিতা? না কি কবিতার নামে আসলে কবিতার শ্রাদ্ধবাসর। কবিতার প্রথম শ্রোতা বা পাঠক তো আসলে যিনি লিখিতেছেন তিনিই। তিনি কি বলিতে পারিবেন যে তিনি ঠিক কি পরিমান কাব্যালঙ্কার- রুপক-অনুপ্রাশ-ছন্দ বা দর্শন জীবনবোধের দ্বন্দ্ব মশালা স্বরুপ মিশাইয়াছেন!! না, তিনি পারিবেন না, তিনি শুধু ট্যাগ নামক অস্ত্রের অপব্যবহার করিয়া, ঘাড় ধরিয়া আপনাকে পড়িতে বাধ্য করাইতে পারেন মাত্র। একটা নমুনা পরিবেশন করিলাম,

কবিতাটি নিম্নরূপ

ওগো আমার প্রেমিকা

কাল চুমেছিনু তব ললাটে

আজ তুমি নেই সাথে

তাই পাদিতেছি খাটে।

মানে ছন্দ মিলাইবার জন্য যা ইচ্ছে তাই কিছু একটা দিলেই হইল। অথবা নিন্মরূপ

গোরোস্থানে আসার আগে

টাটা করেছিলাম সকলকে,

সকলেও আমায় টিটকিরি করেছিল

তারপর বহুদিন আর খোঁজ নেয়নি কেউ

একা অন্ধকারে আছি রোজ বিড়ি খাই

ডিগবাজি ও খাই,

শুধু ভাত খাইনা, কারন আমার সুগার

তবে গালি খাই, কারন পাওনাদারদের ধার শোধ করতে পারিনি

আমি মাতালদের সর্দার ছিলাম

তাদের বউয়েরা আমার গুষ্ঠিদ্ধার করে আজও

এই নির্জন গোরোস্থানে বসে আমি রোজ সকলকে করি টাটা

ইহাও নাকি একটি আধুনিক কবিতা। ভাবিতে কষ্ট হয়, কেহ লেখে তিনি হাগেন, কেহ লেখেন তিনি গালিখান আর ডিগবাজি। ইহাদের কি কারাগারে অবরুদ্ধ করিবার প্রয়োজন নয় অবিলম্বে ,সুস্থ স্বাভাবিক মস্তিষ্কে যাহারা এগুলোকে জাহির করিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করিতে পারেন, তাদের মানসিক সুস্থতা লইয়া প্রশ্ন রহিল

কুমোর যেমন কাঠের কাঠামোর উপরে কাদামাটি লেপনের মাধ্যমে একটু একটু করিয়া মূর্তির মধ্যে সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করিয়া থাকেন, তেমনই কবিকেও তার চেতনার রঙে রাঙানো পাঁপড়ি দিয়া একটি একটি করিয়া কবিতার শব্দমালা গাঁথিতে হয়, তবেই না সেই কবিতা হয় কাব্যিক সৌন্দর্যের প্রেমময় মুর্তি। সামান্যতম বিচ্যুতিও যেখানে কবিতার অপঘাত মৃত্যু ঘটায় বলেই শিল্পরসিকদের অভিমত, সেখানে এমন কাব্যচর্চা একধরনে সামাজিক গর্হিত অপরাধ, যাহা অন্তত কবিতারই স্বার্থে আইন প্রনয়নের মাধ্যমে বন্ধ করা উচিৎ।প্রয়োজন গন প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধ

এর পর আসিবে কবির কাব্যচর্চার স্বাধীনতা। স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচারিতা এক নহে। গোলাপ চাষ, বা ধানের চাষ আর গাঁজার চাষের সামাজিক মূল্য কি এক? সুতরাং যত্রতত্র খোলা স্থানে মলমুত্র ত্যাগ করিবেন না যেমন সত্য, তেমনই খোলা মঞ্চে যত্রতত্র কবিতার নামে রেচন ত্যাগিবেন না। অনেকেই ভাবিয়া নেন যে, তিনি ঢেকুর তুলিলেই একটি কবিতার জন্ম হয়, তাহাদের অনুরোধ, সেই সকল বদহজমের ফসলকে নিজস্ব সংগ্রহের রাখিয়া দিন দয়া করিয়া, সামাজিক ভদ্রতার খাতিরে প্রকাশ্যে আপনার এই ঢেঁকুরের বদনাম না করিলেও নিজস্ববৃত্তে আপনাকে লইয়া খোরাক পরিবেশন করিয়া থাকে আপনারই নিকট বন্ধুস্বজন।। কারন আপনার নিজস্ব রচনা (রেচন হইলেও) আপনার নিকটে অবশ্যই ভাল, কারন স্বিয় ত্যাগকৃত গন্ধবায়ুতে দুর্গন্ধের পরিমাপ নিরুপন করা সকল সময় সম্ভবপর হয়না নিজের দ্বারা। সামাজিক মাধ্যমেও বিভিন্ন মঞ্চ রহিয়াছে , যাহা উঠতি প্রতিভাদের জন্যই সংরক্ষিত। জল মাপিতে হইলে ওই স্থানই সর্বত্তোম

সময়ের তাড়নাতেই সময়োপযোগী কবিতার জন্ম হইয়াছে, এখনও হইতেছে, আগামীতেও হইবে। বাস্তবের প্রেক্ষিত হোক বা কল্পনার পটভূমিতে অঙ্কিত, প্রগতিশীলতা বা আধুনিকতার নামে যেন শৈল্পিক নান্দনিকতা না হারাইয়া যায়। সৎ চেষ্টা সফল হইতে বাধ্য, ইতিহাস সাক্ষী। পাঠকের চৈতন্যের প্রতি অবশ্যই সৃষ্টির দায় বর্তাইয়া থাকে। ফাঁপা শব্দবন্ধের মেকি গড্ডালিকাপ্রবাহে ভাষিয়া না যাইয়া সমালোচোনার জন্য আহ্বানও জরুরী।

মেদ যেমন সুন্দরী নারীর আবেদনকে কুশ্রী করিয়া দেয়, তেমনি কবিতারও অতিরিক্ত শব্দ কবিতাকে গুরুত্বহীন করিয়া তোলে, সমালোচোনার অনুশীলনই পারে আগামীর কবিতাকে মেদবর্জিত ঝরঝরে আকর্ষনীয় রুপ দিতে

কবিতা কবি বিনে জন্মলাভে অক্ষম। আর সেই পতাকা থাক যোগ্যের হাতে, আর নিজেকে যোগ্য বানাতে প্রয়োজন কাব্যবোধ, সাথে প্রচুর অনুশীলন, আর প্রতিষ্ঠা লিপ্সা। কবিতা হউক সাবলীল আর প্রাঞ্জল। মোটের উপর কবিতা মানুষ ও মানবতার কথা বলুক। তাহার জন্য কবি শিক্ষিত হউক বা না হউক, কাব্যজ্ঞানরহিত যেন না হন। কবিতা মাথা উঁচু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কারের সামাজিক চিন্তায় চিন্তিত হয়ে, অন্ধকার দূর করার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে, সমাজ বদলের অঙ্গীকারে উৎসাহ জোগাবে মানুষের হৃদয়কে। নিয়ে যাক রুপকথার অন্তরে, শোনায় সুখ দুখঃখের গীতমালা।

শুধু শব্দের খেলা নয়, সমকালীন কবিতায় থাক শব্দের সঙ্গে শব্দের মেলবন্ধন বা গাঁথুনি, প্রয়োজনে ছন্দও স্থান পাক অন্ত্যে। বাক্যবিন্যাসে থাকুক মজবুত ভিত, যা সমাজ ও কালকে স্পর্শ করার ক্ষমতা রাখবে, এই বিশ্বাসটা আগে নিজের মধ্যে জন্মাক। আর সেটা সম্ভব হইলে তবেই কবিতার শরীরে ধরা পড়িবে ভালোবাসা ও মমতার প্রলেপ


 

রবিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

মোসায়ের দলে

ভুল করে ভুল করে দেখা দেখি, কেমন ভাইপো হয়েছিস দেখি।


টাচ ফোনের বিক্রি ৭০% কমতে বাধ্য। সোনাপোনা দিলে নীল-সাদা খাম বেড়োবে।

আমি কিন্তু এখনো মোসায়ের দলেই আছি। রংহীন জীবনে একা কুম্ভের টিকে থাকার কড়াই... পানু দেখে দেখে মাথা টা গেছে, ওটা বড়াই.. ছি:। লড়াই। মোসায়ের দলে বাওয়া।

কোলাঘাটের ইলিশে নাকি টেষ্ট বেশি?? ভাবছি বাংলাদেশে গিয়ে ব্যাপার টা একবার চাক্ষুস না করলেই না। শালা ওজন নিয়ন্ত্রনে থাকছে না, রোজ সকালে হামবুর্গে মর্নিং ওয়াকে গেলে কেমন হয়?? তবে ইলিশে ওমেগা থ্রি আছে। থ্রি মাস্কেটিয়ার্স... ডক্টর হতেই হবে আমাকে। অন্তত বিজ্ঞাপনে তক সেটার উল্লেখ করলাম।


কি সব ছাইভস্ম খাও!! আমায় দেখো, তোমার মাথা ছারা কিচ্ছুটি আর এখন ভালো লাগে না। ভেবেছিলাম ভবান্তরী হবো। কিন্তু "পুরো মাখন" এর নাশা আমার জিভের ডগে। পারলে ওটা কি আর জ্যান্ত থাকবে?? মায়ের থানে ওটাই আগে বলিতে চড়বে।



দেখো আমি কত অসহায়... হায়। মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে। পোষ্ট মর্টেমের পর ডোমের কি কাজ?? ওই রমনের আগে কন্ডোমের যা....
সেন্সর কর, কাঁচি চালা। শালা ঊডবার্ণ ওয়ার্ড কি ফাঁকা আছে গান্ডু।

তবে সহজে ওটি হচ্ছে না। কারন হবার কথা ছিলো না তাই। পিলপিল করে সন্দেহ রা আসন গ্রহন করছে। ওরা কিন্তু অনাহুত। বরাবরের মত।


আমি তোমার কাছে কিচ্ছু চাই না.... চাইলে দিচ্ছে টা কে?? আর কি ই বা দিতে পারি?? ফনা উঁচিয়ে বসে আছেন, আপাত নিরিহ সর্পিলাকৃতি পথ। আচ্ছা ভুমধ্য সাগর কে ভূ-স্থলের মধ্যেই হতে হবে? বেষ্পতিতে কি কেউ খোঁজ নিয়ে দেখেছে??



দশ শব্দের খেল?? চতুর্দিকের আওয়াজ..... বাল বাল বাল... থুক্কুরি সিব টা জিব দিয়ে বেড়োই নি।

লন্ডনে কি আলিপুর আছে?? বা পিজি?? জোর আন্দোলন চাই। মনটা খুব খারাপ, সন্ত্রাস আর সন্ত্রাস। অরবিন্দ দা হেডলাইনে আসতেই পারছেন না।


কেউ কেউ ৫ ঘন্টার দাম চাই। সুদে আসলে। আমিই একমাত্র হাতিয়ার বেঁচে থাকার। আবার আমিই চুরান্ত ঘৃনার পাত্র। কেলটে মোদী কে দেখে প্যাসন কিছুই শেখা গেলো না। প্যারিস হিলটন ললিত কলাতে মুগ্ধ, কলা টাই যদিও মেন।


রকেটে চেপে সর্বদায় মহাশুন্যে যাওয়া যায়। সেখানে প্রথমে তেল না থাকলেও তেলতেলে একটা ভাব থাকে।তারপর গ্যাস। আরে বাবা জ্বালানি। বুদবুদযুক্ত ফেনিল বাকি অবশিষ্ট বিশ্ব। রাজনীতি কোলাহল, মাঝখান থেকে ইস্তিরি টা ই নষ্ট হলো।


সেদিন থেকেই দুজনার পথ দুদিকে চলে গেছে। তবে কেমন হয়েছে! আমি বলবো নি। ঘড়ে ষাঠোর্ধ পিসি। শুধু আইন তার নিজশ্ব পথে চলছে।



একদা ডাইনোসর ছিলো। তাদের চাটার্ড বাসভূমি ছিলো। সারা গায়ে ছুলি ভর্তি। এ তুমি কি সুখ দিলে?? না এতে আবার টাকার গন্ধ লেগে। প্রশাসক লেঙ্গি দেবে এক্ষুনি। তার আগে বন্যা দর্শনে বেড়োবো। ডাইনোসর কখনো চসমা পরেনি। আসলে প্রথম হোটেল টা ই তো ভুল ছিলো। রং নাম্বার।



কাসেম চাচা লম্বা দাড়ি নেড়ে বললেন, হিন্দু মারতে আমার ও বেশ ভালো লাগে। ও মা যেন না শোনা ভাইপোর আবদার, ও পিতি... আমি ও জঙ্গি পুষবো। দে.. আগে একটা স্ট্যাটাস দে। ওরে পাগল সামনেই পুজো, মোনাজাতের ছবি গুলো নামা। দে মা আমায় তবিলদারি।



এবার মাথা চুলকে, আঁ........ বজরঙ্গী থুরি বাহুবলী ভাইজান, চল বেটা সেলফি লে লে রে। ইউসুফ কে কি কেউ শুধিয়েছিল, এই যে আপনি মড়তে চলেছেন কি ভাবছেন এই সম্বন্ধে?? একটা স্ন্যাপ হবে নাকি??

মাথায় Goods উঠে গেলে এমনই হয় জ্যেঠু। ধুর্মারা.....


নানু সাইট বন্ধ, দেখতে কে বারন করেছে?? বাঁদরামি.... সানি লিওনির ছাতি ৫৬", অন গড, আজই দেখলাম।

নে... এবার পারমুটেসন কম্বিনেশন করে নিজের মতন করে সাজিয়ে নে।


দেখ কেমন লাগে। মগজে কার্ফু। 


সোমবার, ১১ আগস্ট, ২০১৪

উন্মাদ নামা ~ ১৬

অক্ষরজ্ঞান মানুষের জ্ঞানের পরিধিকে বিস্তারে সাহায্য করে, আর জীবন বোধ গড়ে উঠে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, ম্যল্যবোধ ও আত্মসম্মানযুক্ত সামাজিক শিক্ষা আর অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। যার প্রাথমিক পাঠশালা শিশুকালের পরিবার, যেটা একটা পরিপুর্ন জীবনগঠনে সাহায্য করে।


পুঁথিগত সু শিক্ষা যতক্ষন না নিজের জীবনের উপর ব্যাবহারিক প্রয়োগ হচ্ছে, ততক্ষন সেটার উপর জীবনবোধ লাগু হওয়া অসম্ভব।


পরিবর্ত পরিস্থিতির সাথে সাথে অন্যের নুন্যতম ক্ষতিসাধন না করে, নিজ স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে সামাজিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার নামই হল সুনাম। আর জীবনবোধের ভীতের উপরেই এই সুনামের অট্টালিকা দাঁড়িয়ে থাকে। এখন এখানে যত সুশিক্ষার আগমন ঘটবে, সেই অট্টালিকা ততই সুউচ্চ ও কারুকার্যখচিত গৌরবশালী হয়ে উঠবে।


উন্মাদ হার্মাদ

শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০১৪

রাবনের প্রতিভা

"রাবণের প্রতিভা"

================== 

রামায়ণ মহাকাব্যের নায়ক রামচন্দ্র রাজপুত্তর, ধর্মপরায়ণ, বীর, ধীর, সুসভ্য, সুকান্ত, জ্ঞান, গুণী ইত্যাদি শত শত গুণাত্মক বিশেষণে ভূষিত। পক্ষান্তরে রাবণ—বিললাঙ্গ (দশমুণ্ডু), স্বৈরাচারী, অসভ্য, রাক্ষস, কামুক ইত্যাদি শত শত দোষাত্মক বিশেষণে দুষ্ট। কিন্তু বাস্তবিকই কি তাই? হয়তো আর্য-ঋষি বাল্মীকি—আর্যপ্রীতি ও অনার্যবিদ্বেষ বশত শ্রীরামকে প্রদীপ্ত ও রাবণকে হীনপ্রভ করার মানসে একের প্রোজ্জ্বল ও অন্যের মসিময় চিত্র অংকিত করেছেন নিপুণ হস্তে রামায়ণের পাতায়। কিন্তু তাঁর তুলির আঁচড়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রকাশ পাচ্ছে রাবণের কৌলিন্য, শৌর্য-বীর্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আসল কান্তির ছিটেফোঁটা; যার ঔজ্জ্বল্য রামচরিত্রের উজ্জ্বলতার চেয়ে বহুগুণ বেশী।


রামচন্দ্র ছিলেন ক্ষত্রকুলোদ্ভব, চার বর্ণের দ্বিতীয় বর্ণের মানুষ। সেকালের ক্ষত্রিয়রা ছিলো বংশগত যোদ্ধা, অর্থাৎ নরখাতক। আর রাবণ ছিলেন ব্রাহ্মণ বংশীয়। এ কথাটা শুনে রামুভক্ত হিন্দু ভাইয়েরা হয়তো আঁতকে উঠতে পারেন। ‘ব্রাহ্মণ’-এর সাধারণ সংজ্ঞা হলো—ব্রহ্মাংশে জন্ম যার, অথবা বেদ জানে যে, কিংবা বেদ অধ্যয়ণ করে যে, নতুন ব্রহ্মের উপাসনা করে যে—সেই-ই ব্রাহ্মণ। ঋষিগণ সর্বত্রই উক্ত গুণের অধিকারী। তাই ঋষি মাত্রেই ব্রাহ্মণ। রাবণের দাদা পুলস্ত্য ছিলেন ব্রহ্মার মানসপুত্র এবং স্বনামধন্য ঋষি। কাজেই তিনি ছিলেন বংশে ও গুণে উভয়ত ব্রাহ্মণ। পুলস্ত্য ঋষির পুত্র অর্থাৎ রাবণের পিতা বিশ্রবাও ছিলেন একজন বিশিষ্ট ঋষি। কাজেই তিনিও ছিলেন বংশগত ও গুণগত ব্রাহ্মণ। তাই ব্রাহ্মণ ঋষি বিশ্রবার পুত্র রাবণ গুণগত না হলেও কুলগত ব্রাহ্মণ ছিলেন নিশ্চয়ই। এতদ্ভিন্ন নিম্নলিখিত আলোচনাসমূহে রাম ও রাবণের ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভার তুলনামূলক কিঞ্চিৎ পরিচয় পাওয়া যাবে।


১. রাবণের রাজমহলকে (কখনো লঙ্কাকেও) হলা হয়েছে ‘স্বর্ণপুরী’। এতে রাবণের ঐশ্বর্য, শিল্প-নিপুণতা, সৌন্দর্যপ্রিয়তা, রুচিবোধ ইত্যাদি বহু গুণের পরিচয় মেলে। কিন্তু রামচন্দ্রের বাড়িতে এমন কিছুর উল্লেখ দেখা য্যা না, যার দ্বারা তাঁর ওসব গুণের পরিচয় পাওয়া যায়।


২. লঙ্কায় সীতাদেবী রক্ষিতা হয়েছিলেন রাবণের তৈরী অশোক কাননে। তা ছিলো রাবণের প্রমোদ উদ্যান, যেমন আধুনিক কালের ইডেন গার্ডেন। সে বাগানটিতে প্রবেশ করলে কারও শোকতাপ থাকতো না। তাই তার নাম ছিলো অশোক কানন। সে বাগানটির দ্বারা রাবণের সুরুচি ও সৌন্দর্যপ্রিয়তার পরিচয় পাওয়া যায়। অধিকন্তু তিনি যে একজন উদ্ভিদবিদ্যা বিশারদ ছিলেন তা-ও জানা যায়। তার প্রমাণ মেলে একালের সুপ্রসিদ্ধ খনার বচনে। খনা বলেছেন—
“ডেকে কয় রাবণ,
কলা-কচু না লাগাও শ্রাবণ।”


শত শত জাতের ফল-ফুল ও লতাগুল্মের বৃক্ষরাজির একস্থানে সমাবেশ ঘটিয়ে তা লালন-পালন ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু জানা যায় না রামচন্দ্রের বাড়িতে কোনো ফুল-ফলের গাছ আদৌ ছিলো কি-না।


৩. রামচন্দ্র লঙ্কায় গিয়েছিলেন কপিকুলের (বানরের) সাহায্যে মাটি-পাথর কেটে বাঁধ নির্মাণ করে, দীর্ঘ সময়ের চেষ্টায়। কিন্তু লঙ্কা থেকে ভারতের দণ্ডকারণ্য তথা পঞ্চবটী বনে রাবণ যাতায়াত করেছিলেন “পুষ্পক” বিমানে আরোহন করে অতি অল্প সময়ে। রাবণ যে একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বা বৈমানিক এবং কারিগরিবিদ্যা-বিশারদ ছিলেন, তা তার জ্বলন্ত প্রমাণ! এ ক্ষেত্রে রাবণের সহিত শ্রীরামের তুলনাই হয় না।


৪. রামচন্দ্র যুদ্ধ করেছেন সিএ মান্ধাতার আমলের তীর-ধনু নিয়ে। আর রাবণ আবিষ্কার করেছিলেন এক অভিনব যুদ্ধাস্ত্র, যার নাম ‘শক্তিশেল’। তা শক্তিতে ছিলো যেনো বন্দুকের যুগের ডিনামাইট। নিঃসন্দেহে এতে রাবণের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় মেলে।
৫. রামচন্দ্রের নিক্ষিপ্ত শরাঘাতে রাবণের মুমূর্ষু সময়ে তাঁর কাছে গিয়ে রামচন্দ্র রাজনীতি সম্বন্ধে তাঁর উপদেশপ্রার্থী হয়েছিলেন এবং মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও তিনি রামচন্দ্রের সে প্রার্থনা পূর্ণ করেছিলেন ধীর ও শান্তভাবে, সরল মনে। এতে প্রমাণিত হয় যে, রাবণ সে যুগের একজন রাজনীতি-বিশারদ ছিলেন। অধিকন্তু ছিলেন ধৈর্য, সহন ও ক্ষমাশীল এবং প্রতিহিংসাবিমুখ এক মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী।


৬. রামায়ণ মহাকাব্যে রাবণকে বলা হয়েছে ‘দশানন’। কিন্তু বাস্তবে রাবণের দশটি মুণ্ডু নিশ্চয়ই ছিলো না। তবে তাঁর মাথায় মজ্জা অর্থাৎ জ্ঞান ছিলো দশটা মুণ্ডুর সমান। তা-ই রূপকে বিদ্রুপে অংকিত হয়েছে ‘রাবণ দশমুণ্ডু’ রূপে।


৭. রাক্ষস বা নরখাদক বলা হয়েছে রাবণকে। উপরোক্ত আলোচনাসমূহের পরে এ বীভৎস বিশেষনটি সম্বন্ধে আর কিছু সমালোচনা আবশ্যক আছে বলে মনে হয় না। তবুও প্রিয় পাঠকবৃন্দের কাছে একটি প্রশ্ন না রেখে পারছি না। রাবণের দাদা হচ্ছে পুলস্ত্য, পিতা বিশ্রবা, ভ্রাতা কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ, বৈমাত্রেয় ভ্রাতা কুবের এবং পুত্র ইন্দ্রজিৎ (প্রসিদ্ধ বৈমানিক); এঁরা সকলেই ছিলেন সভ্য, ভব্য, সুশিক্ষিত, গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তি। এঁরা কেউই ‘রাক্ষস’ বা কাঁচামাংসভোজী মানুষ ছিলেন না। রাবণও তাঁর শৈশবকালাবধি মাতা-পিতার রান্না করা খাবারই খেয়েছেন নিশ্চয়। অতঃপর যৌবনে হঠাৎ করে একদিন তিনি খেতে শুরু করলেন জীবের কাঁচামাংস! বিমান বিহার, শক্তিশেল নির্মাণ ও অশোক কানন তৈরী করতে জানলেও তিনি রান্নার পাকপাত্র গড়তে বা রান্না করতে জানেন নি। বেশ ভালো। কিন্তু তিনি কোথায় বসে, কোন দিন, কাকে খেয়েছেন—তার একটিরও নামোল্লেখ নাই কেন?


৮. রাবণের সন্তানাদি সম্বন্ধে একটি প্রবাদ আছে—
“একলক্ষ পুত্র আর সোয়ালক্ষ নাতি,
একজন না থাকিল বংশে দিতে বাতি।”
আর অপর একটি প্রবাদ আছে—
“যাহা কিছু রটে
তার কিছু বটে।”


প্রবাদবাক্যের লক্ষ পুত্র না হোক তার শতাংশ সত্য হলেও রাবণের পুত্রসংখ্যা হয় এক হাজার এবং তার অর্ধাংশ সত্য হলেও সে সংখ্যাটি হয় পাঁচশ’। আর তা-তো বিস্ময়ের কিছু নয়। জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্রও ছিলেন একশ’ এক পুত্রের জনক। আর রাম? তাঁর পুত্রের সংখ্যা কথিত হয় মাত্র দু’টি, বলা চলে একটি। কেননা তারা ছিল সীতার এক গর্ভজাত, যমজ সন্তান। তদুপরি সে পুত্রযুগল জন্মেছিলো নাকি রামচন্দ্রের বিবাহের তেপ্পান্ন বছর পর (বাস্তব ১২+১৪=২৬ বছর পর)। বছরের এ হিসেবটা প্রিয় পাঠিকদের কাছে একটু বেমানান বোধ হতে পারে। তাই বছরগুলোর একটা হিসাব দিচ্ছি। বিবাহান্তে রামচন্দ্র গৃহবাসী ছিলেন ১২ বছর, বনবাসী ১৪ বছর এবং গৃহে প্রত্যাবর্তন করে রাজাসনে কাটান নাকি বাকি ২৭ বছর (ঐ ২৭ বছর উদ্দেশ্যমূলক, কাল্পনিক)। এর পর ‘কলঙ্কিণী’ বলে প্রাথমিক অন্তঃসত্ত্বা সীতাদেবীকে নির্বাসিত করা হয় বাল্মীকির তপোবনে, সেখানে জন্মে সীতার যুগল সন্তান কুশ ও লব।


সীতাদেবী বন্ধ্যা ছিলেন না এবং উক্ত তেপ্পান্ন বছরের মধ্যে বনবাসকালের দশ মাস (অশোক কাননে রাবণের হাতে সীতা বন্দিনী ছিলেন ১০ মাস) ছাড়া বায়ান্ন বছর দু’মাস সীতা ছিলেন রামচন্দ্রের অঙ্কশায়িনী। তথাপি এ দীর্ঘকাল রতিবিরতি রামচন্দ্রের বীর্যহীনতারই পরিচয়, নয় কি?
৯. রামচন্দ্রের কাহিনীকারের মতে চোদ্দ বছর বনবাসান্তে রামচন্দ্র দেশে প্রত্যাবর্তন করে নির্বিঘ্নে সংসারধর্ম তথা রাজ্যশাসন করেছিলেন দীর্ঘ ২৭ বছর। অতঃপর প্রজাবিদ্রোহ দেখা দিয়েছিলো। কেননা লঙ্কার অশোক কাননে বন্দিনী থাকাকালে রাবণ সীতাদেবীর সতীত্ব নষ্ট করেছিলেন এবং অসতীকে গৃহে স্থান দেওয়ায় প্রজাগণ ছিলো অসন্তুষ্ট।


উপরোক্ত বিবরণটি শুনে স্বতই মনে প্রশ্নের উদয় হয়ে যে, মরার দু’যুগের পরে কান্না কেন? বনবাসান্তে রামচন্দ্র স্ববাসে প্রত্যাবর্তন করলে তাঁর বনবাসের বিবরণ তথা লঙ্কাকাণ্ড দেশময় ছড়িয়ে পড়েছিলো তাঁর দেশে ফেরার সংগে সংগেই এবং সীতাকলঙ্কের কানাকানিও চলছিলো দেশময় তখন থেকেই। আর গুজবের ভিত্তিতে সীতাদেবীকে নির্বাসিত করতে হলে তা করা তখনই ছিলো সঙ্গত। দীর্ঘ ২৭ বছর পর কেন?


রামচন্দ্র সীতাদেবীকে গৃহত্যাগী করেছিলেন শুধু জনগণের মনোরঞ্জনের জন্য, স্বয়ং তাঁকে নাকি ‘নিষ্কলঙ্কা’ বলেই জানতেন। এইরূপ পরের কথায় নিষ্কলঙ্কা স্ত্রী ত্যাগ করার নজির জগতে আছে কি? এই তো সেদিন (১৯৩৬) গ্রেট বৃটেনের সম্রাট অষ্টম এডোয়ার্ড মিসেস সিম্পসনকে সহধর্মিনী করতে চাইলে তাতে বাধ সাধলো দেশের জনগণ তথা পার্লামেণ্ট ‘মিসেস সিম্পসন হীনবংশজাত’ বলে। পার্লামেণ্ট এডোয়ার্ডকে জানালো যে, হয় মিসেস সিম্পসনকে ত্যাগ করতে হবে, নচেৎ তাঁকে ত্যাগ করতে হবে সিংহাসন। এতে এডোয়ার্ড সিংহাসন ত্যাগ করলেন, কিন্তু তাঁর প্রেয়সীকে ত্যাগ করলেন না। শুধু তা-ই নয়, তাঁর মেঝ ভাই ডিউক-অব-ইয়র্ককে সিংহাসন দিয়ে তিনি সস্ত্রীক রাজ্য ছেড়ে চলে গেলেন বিদেশে। রামচন্দ্রেরও তো মেঝ ভাই ছিলো।


সীতাদেবীর অসীত্ব রক্ষার জন্য রামায়ণের কাহিনীকার চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেননি। যেখানে তিনি লৌকিক অবলম্বন খুঁজে পাননি, সেখানে অলৌকিকের আশ্রয় নিয়েছেন। দু’-একটি উদাহরণ দিচ্ছি—
ক. রাবণের অশোক বলেন সীতার সতীত্ব রক্ষার কোনো অবলম্বন তিনি খুঁজে পাননি। তাই সেখানে বলেছেন যে, জোরপূর্বক কোনো রমণীর সতীত্ব নষ্ট করলে রাবণের মৃত্যু হবে, এই বলে কোনো ঋষি তাঁকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। কাজেই মৃত্যুভয়ে রাবণ সীতাকে স্পর্শ করেননি। সুতরাং সেখানে সীতার সতীত্ব বেঁচে আছে।


খ. সীতাকে নিয়ে রামচন্দ্র অযোধ্যায় পৌঁছুলে সেখানে যখন সীতাকলঙ্কের ঝড় বইছিলো, তখন বলেছেন যে, সীতাদেবীকে অগ্নিকুণ্ডে ফেলে তাঁর সতীত্বের পরীক্ষা করা হয়েছিলো, তাতে তাঁর কেশাগ্রও দগ্ধ হয়নি। সুতরাং সীতার সতীত্ব বেঁচে আছে।


গ. বহুবছর বাল্মীকির তপোবনে কাটিয়ে শ্রীরামের অশ্বমেধ যজ্ঞে কুশ-লবসহ বাল্মীকির সাথে সীতাদেবী রামপুরীতে উপস্থিত হলে পুনঃ যখন তিনি-লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ভোগ করতে থাকেন, তখন কবি বলেছেন যে, সীতাদেবীর অনুরোধে ধরণী দ্বিধাবিভক্ত হয়েছিল এবং সীতাদেবী সে গর্তমধ্যে প্রবেশ করে স্বর্গে বা পাতালে গিয়েছেন ইত্যাদি।


উপরোক্ত ঘটনাগুলো হয়তো এরূপও ঘটে থাকতে পারে। যথা—
ক. রাবণের রূপলাবণ্য ও শৌর্যবীর্য দর্শনে প্রীতা হয়ে সীতাদেবী রাবণকে স্বেচ্ছায় করেছেন দেহদান এবং তাঁকে রাবণ করেছেন বীর্যদান। সীতাদেবীর প্রতি রাবণ বলপ্রয়োগ করেন নি, তাই তিনি মরেননি। হয়তো এমনও হতে পারে যে, রাবণ যেদিন সীতার প্রতি বলপ্রয়োগ করেছেন, সেদিন তিনি রামের হাতে মরেছেন। আর সেইদিন সীতাদেবী হয়েছেন অন্তঃসত্ত্বা।


খ. সীতাদেবীকে নিয়ে রামচন্দ্র অযোধ্যায় পৌঁছুলে লঙ্কাকাণ্ড প্রকাশ হওয়ায় সেখানে তখন সীতাকলঙ্কের ঝড় বইছিলো নিশ্চয়ই। হয়তো সীতার স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য প্রথমত জেরা-জবানবন্দি, কটুক্তি, ধমকানি-শাসানি ও পরে মারপিট ইত্যাদি শারীরিক নির্যাতন চালাহয়ে হচ্ছিলো তাঁর প্রতি। কিন্তু তিনি নীরবে সহ্য করেছিলেন সেসব নির্যাতন, ফাঁস করেননি কভু আসল কথা। আর সেটাই হচ্ছে সীতার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।


গ. শ্রীরামের রাজপ্রসাদে সীতা প্রসঙ্গে অতঃপর থমথমে ভাব বিরাজ করছিলো কিছুদিন (২৭-২৮ দিন বা এক রজোমাস যাকে বলা হয় ২৭ বছর)। পরে সীতাদেবীর মাসিক পরিক্রমায় রামচন্দ্র যখন আসল খবর পেয়েছিলেন, তখনই তিনি অন্তঃসত্ত্বা সীতাদেবীকে নির্বাসিতা করেছিলেন বাল্মীকির তপোবনে এবং সেখানে জন্মেছিলো তাঁর যুগল সন্তান কুশ-লব।


সন্তান কামনা করে না, এমন কোনো লোক বা জীব জগতে নেই। কারো সন্তান না থাকলে তার দুঃখের অবধি থাকে না; বিশেষত ধনিক পরিবারে। আর রাজ্যেশ্বর রামচন্দ্রের বৈবাহিক জীবনের দীর্ঘ ২৬ বছর পরে আসন্ন সন্তান পরিত্যাগ করলেন শুধু কি প্রজাদের মনোরঞ্জনের জন্যে? নিশ্চয়ই তা নয়। তিনি জানতেন যে, সীতার গর্ভস্থ সন্তান তাঁর ঔরসজাত নয়, ঔরসজাত রাবণের। আর সঙ্গত কারণেই সীতার গর্ভজাত সন্তানের প্রতি তাঁর কোনো মায়ামমতা ছিলো না, বরং ছিলো ঘৃণা ও অবজ্ঞা। তাই তিনি সীতা-সুতের কোনো খোঁজখবর নেননি বহু বছর যাবত। বিশেষত ঋষি বাল্মীকির আশ্রম অযোধ্যা থেকে বেশি দূরেও ছিলো না, সে আশ্রম তিনি চিনতেন।


অতঃপর সীতাসহ কুশ-লব বিনা নিমন্ত্রণে (বাল্মীকির নিমন্ত্রণ ছিলো) ঋষি বাল্মীকির সাথে শ্রীরামের অশ্বমেধ যজ্ঞে উপস্থিত হয়ে যেদিন রামায়ণ কীর্তন করে, সেদিন কুশ-লবের মনোরম কান্তি ও স্বরে-সুরে মুগ্ধ হয়ে রামচন্দ্র তাদের ‘দত্তক’রূপে গ্রহণ করেন। হয়তো তখন তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে, ঘটনাক্রমে ফেলনা হলেও ছেলে দুটো (কুশ-লব) রাজপুত্র তো বটে।


কুশ-লবকে গ্রহণ করলেও সীতাকে গ্রহণ করেননি রামচন্দ্র সেদিনও। সীতাদেবী হয়তো আশা করেছিলেন যে, বহু বছরান্তে পুত্ররত্ন-সহ রাজপুরীতে এসে এবার তিনি সমাদর পাবেন। কিন্তু তা তিনি পান নি, বিকল্পে পেয়েছিলেন যতো অনাদর-অবজ্ঞা। তাই তিনি ক্ষোভে-দুঃখে হয়তো আত্মহত্যা করেছিলেন। নারীহত্যার অপবাদ লুকানোর উদ্দেশ্যে এবং ঘটনাটি বাইরে প্রকাশ পাবার ভয়ে শ্মশানে দাহ করা হয়নি সীতার শবদেহটি, হয়তো লুকিয়ে প্রোথিত করা হয়েছিল মাটির গর্তে, পুরীর মধ্যেই। আর তা-ই প্রচারিত হয়েছে ‘স্বেচ্ছায় সীতাদেবীর ভূগর্ভে প্রবেশ’ বলে।


সে যা হোক, অযোধ্যেশ্বর রাম ও লঙ্কেশ্বর রাবণের সন্তান-সন্ততি সম্বন্ধে পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, রাবণ ছিলেন শত শত সন্তানের জনক, আর রামের ছিলো না একটিও পুত্র। তিনি ছিলেন বন্ধ্য (আঁটকুড়া)।


লঙ্কেশ্বর রাবণের যাবতীয় গুণগরিমা ও সৌরভ-গৌরব গুপ্ত রাখার হীন প্রচেষ্টার মুখ্য কারণ—তিনি অধ্যাত্মবাদী ছিলেন না, ছিলেন জড়বাদী বিজ্ঞানী। বিশেষত তিনি আর্যদলের লোক ছিলেন না, ছিলেন অনার্যদলের লোক। এরূপ ‘অনুমান’ করা হয়তো অসঙ্গত নয়।


আর একটি কথা। শুধুমাত্র রাম ও রামণকে নিয়ে রামায়ণ হতে পারে না, হনুমানকে বাদ দিয়ে। তাই এখন হনুমান প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা করছি।
ঋষি বাল্মীকি ছিলেন প্রচণ্ড রামভক্ত। কৃত্তিবাসী রামায়ণে তার কিঞ্চিৎ আভাস পাওয়া যায়। কৃত্তিবাসী রামায়ণে কথিত হয়েছে যে, বাল্মীকি যৌবনে রত্নাকর নামে একজন দস্যু ছিলেন। পরে নারদের উপদেশে দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করে ছয় হাজার বছর একস্থানে উপবিষ্ট থেকে রামনাম জপ করেন। সেই সময় তাঁর সর্বশরীর বল্মীকে সমাচ্ছন্ন হয়। পরে তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করে বল্মীক হ’তে উত্থিত হওয়ায় তিনি বাল্মীকি নামে খ্যাত হন।


এক্সিনি আহার-নিদ্রা ও চলাফেরা পরিত্যাগ করে ছয় হাজার বছর বা ছয় বছরও রামনাম জপ করতে পারেন, রামের শৌর্য, বীর্য, গুণ-গরিমা ও ইজ্জৎ বৃদ্ধির জন্য তিনি কি না করতে পারেন? শ্রীরামের প্রাধান্য রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি গুণী, জ্ঞানী ও সুসভ্য রাবণকে রাক্ষস বানিয়েছিলেন, ভাগ্যিস পশু বানান নি। রামায়ণ মহাকাব্যের বনপর্বে এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে হনুমান, জাম্ববান, সুগ্রীব ও তার ভ্রাতা বালীরাজ। রামায়ণের কাহিনীকার তাদের সদলে অঙ্কিত করেছেন পশুরূপে। বিশেষত হনুমান, সুগ্রীব ও বালীরাজকে সদলে বানর বানিয়েছেন এবং জাম্ববানকে বানিয়েছেন ভালুক। কিন্তু তারা কি আওলেই পশু ছিলো?


সে যুগে স্বর্গাগত দেবতাদের কেউ কেউ মর্ত্যবাসী কোনো কোনো মানবীর সাথে যৌনাচারে লিপ্ত হতেন এবং তৎফলে কোনো সন্তানের জন্ম হলে সে ‘দেবতা’ হতো না বটে, কিন্তু সাধারণ মানুষও হতো না, হতো অসাধারণ মানুষ। যেমন—সূর্যদেবের ঔরসে কুমারী কুন্তির গর্ভে জন্ম নেন কর্ণ। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত যোদ্ধা ও দাতা। দেবতা যমের ঔরসে পাণ্ডুপত্মী কুন্তির গর্ভে জন্মলাভ করেন যুধিষ্ঠির। তিনি ছিলেন ধার্মিক চূড়ামণি, যার ফলে তাঁর নাম হয়েছিল ধর্মরাজ। ইন্দ্রদেবের ঔরসে কুন্তির ক্ষেত্রে জন্ম নেন অর্জুন। তিনি ছিলেন সে যুগের ভারতবিখ্যাত যোদ্ধা ইত্যাদি। কিন্তু কোনো দেবতা কখনো কোনো পশুর সাথে যৌনাচারে লিপ্ত হচ্ছেন এবং তাতে পশুরূপী সন্তান জন্ম নিচ্ছে, এমন কাহিনী কোথাও কোনো পুরাণশাস্ত্রে দেখা যায় না। পৌরাণিক মতে এখানে হনুমানের কিঞ্চিৎ পরিচয় দিচ্ছি। এতে দেখা যাবে যে, হনুমানরা সবাই ছিলো মানুষ। এবং ওদের আভিজাত্যও রামের চেয়ে বহুগুণ বেশি।


প্রথমত হনুমান—পবনদেবের ঔরসে মানবী অঞ্জনার গর্ভে এর জন্ম। কাজেই হনুমান দেব-মানবের বংশজাত একজন বীর্যবন্ত মানব।
দ্বিতীয়ত জাম্ববান—এ হচ্ছে দেবতা ব্রহ্মার পুত্র। জাম্ববানের কন্যার নাম জাম্ববতী এবং তাকে বিয়ে করেন হিন্দুদের পরম পূজনীয় শ্রীকৃষ্ণ। সুতরাং জাম্ববান হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের শ্বশুর। কাজেই সে ভালুক বা পশু হতে পারে না, সে ব্রহ্ম-বংশের মানুষ; সুতরাং ব্রাহ্মণ।


তৃতীয়ত বালী ও সুগ্রীব—দেবরাজ ইন্দ্রের (মতান্তরে সূর্যের) ঔরসে ও ব্রহ্মার মানসকন্যা রক্ষরজার গর্ভে বালী ও সুগ্রীবের জন্ম হয়। সুতরাং বালী ও সুগ্রীব হচ্ছে ইন্দ্রের বা সূর্যের পুত্র এবং ব্রহ্মার দৌহিত্র (নাতি)। বিশেষত ব্রহ্মার বংশজাত বলে তারা ব্রাহ্মণত্বের দাবীদার।


উপরোক্ত আলোচনাসমূহের দ্বারা অনুমান হয় যে, রামায়ণোক্ত বানররা পশু ছিলো না, তারা ছিলো ভারতের ‘কিষ্কিন্ধ্যা’ নামক অঞ্চলের আদিম অধিবাসী এবং আলোচ্য ব্যক্তিরা ছিলো সেকালের বিশিষ্ট ব্যক্তি। কেননা রামায়ণ মহাকাব্যে অজস্র বানরের আভাস থাকলেও প্রাধান্য পেয়েছে এরাই।
এ প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী মর্গানের মতবাদ অনুধাবনযোগ্য। মর্গানের মতে—বেঁচে থাকার তাগিদেই মানুষকে জোট বাঁধতে হয়েছে। জোট মানে দল। কিন্তু কোন সম্পর্কের ভিত্তিতে দল বাঁধবে? মর্গানের গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে, সে সময় মানুষ দল বেঁধেছিলো জ্ঞাতি সম্পর্কের ভিত্তিতে। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জ্ঞাতি, একই পূর্বপুরুষ থেকে তাদের জন্ম। মর্গান এমনি এক একটি দলের নাম দিয়েছিলেন গেনস্‌ (Gens)। মর্গানের পরের যুগের নৃবিদরা গেনস্‌ শব্দের বদলে ক্লান (Clan) শব্দের ব্যবহার করেছেন এবং ক্লান শব্দটিই চলছে।


কয়েকটি ক্লান একসঙ্গে জোট বাঁধলে যে বড়ো দলটি গড়ে ওঠে, তার নামে দেয়া হয়ছে ট্রাইব (Tribe)। আবার অনেকগুলো ট্রাইব মিলে আরো বড়ো একটি সংগঠন, তার নামে কন্‌ফেডারেসি অব ট্রাইবস্‌।


সাধারণ জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকেই ক্লানের নাম হ’তো। যেমন—ভালুক, নেকড়ে বাঘ, হরিণ, কাছিম ইত্যাদি। আবার ফুল, ফল, লতাপাতার নাম থেকেও ক্লানের নামকরণ হতো। এধরণের নামকরণের মূলে যে বিশ্বাসটি রয়েছে, তাকে বলা হয় টোটেম বিশ্বাস।


পাক-ভারত উপমহাদেশের সাঁওতাল উপজাতির শতাধিক গোত্র বা টোটেম আছে, হো উপজাতির আছে ৫০টিরও বেশী। এরূপ মুণ্ডা উপজাতির প্রায় ৬৪টি, ভীল উপজাতির ২৪টি, ছোটো নাগপুরের খারিয়া উপজাতির ৮টি এবং পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার ‘দৌড়ি’ উপজাতির মধ্যে ৪টি গোত্র বা টোটেম রয়েছে। এদের প্রত্যেক গোত্রই—পশু, পাখী, গাছপালা অথবা কোনো বস্তুর নামে পরিচিত। আমাদের দেশেও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এরূপ বহু গোত্রের বাম দৃষ্ট হয়, যদিও এগুলোকে ঠিক টোটেম বলা যায় না। যেমন—সেন (শ্যেন = বাজপাখী), নাগ (সর্প), সিংহ (পশুরাজ) ইত্যাদি। গোত্রের প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেকে তার গোত্রের টোটেমের নামে পরিচয় দিয়ে থাকে। যেমন—সিংহ গোত্রের সবাই সিংহ, বাঘ গোত্রের সবাই বাঘ, হরিণ গোত্রের সবাই হরিণ ইত্যাদি।

মর্গানের মতে বিশেষত আধুনিক বহু নৃতত্ত্ববিদের মতে—রামায়ণোক্ত জাম্ববান ও হনুমানাদি ভালুক ও বানররা পশু ছিলো না, তারা ছিলো সেকালের কিষ্কিন্ধ্যার (ভারতের দণ্ডকারণ্যের অংশবিশেষ, আধুনিক নাম নাশিক) অনার্য অধিবাসী (মানুষ)। বানরাদি ছিলো তাদের টোটেম বা বংশগত উপাধি মাত্র। অধিকন্তু এ-ও অনুমান হয়ে যে, হয়তো হনুমান ও সুগ্রীব ছিলো কোনো ‘ক্লান’ ও ‘ট্রাইব’-এর অধিকর্তা এবং বালী ছিলো কোনো ‘কন্‌ফেডারেসী অব ট্রাইবস্‌’-এর অধিপতি, অর্থাৎ রাজা।


পরিশেষে—রামভক্ত ভাইদের সবিনয়ে বলছি যে, মানুষ ও পশু-পাখীর চেহারা, চরিত্র ও ভাষা—এ তিনে প্রকাশ পেয়ে থেকে তাদের স্বকীয়তা বা ব্যক্তিত্ব। কিন্তু ‘ভাষা’র ক্ষেত্রে মানুষের সমকক্ষ অপর কোনো জীব নেই। কেননা মানুষের মতো অন্য কোনো জীবের—দন্ত, ওষ্ঠ, তালু, জিহ্বা ইত্যাদি স্বরযন্ত্র নেই। তাই রামায়ণে কবি কিষ্কিন্ধ্যাবাসীদের চেহারা বদলিয়া বানরাদি বানিয়েছেন বটে, কিন্তু তাদের ভাষা ও চরিত্র বদলাতে পারেননি, তা রেখেছেন সর্বত্রই মানুষের মতো। রামায়ণ গ্রন্থই তার সাক্ষী।

লেখাঃ আরজ আলী মাতুব্বর
স্বপ্নের ছেড়া পাতায় সংগৃহীত .......

শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

উন্মাদ নামা ~ ১৪

ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের জন্য কেবল ভক্তি আর শ্রদ্ধা ই যথেষ্ট।


কিন্তু অবিশ্বাস করতে হলে প্রচুর পড়াশোনা আর জ্ঞানের প্রয়োজন।

সোমবার, ৭ জুলাই, ২০১৪

বালখিল্যতা

ছোট বেলার ঘটনা।

বিচিত্র ইচ্ছা আমাদের অনেকের ই থাকে। আমার সেকেন্ডারি স্কুলের সময়কার ঘটনা, বাবা মাত্র ৫০ পয়সা বরাদ্দ দিতেন, সারাদিনে, স্কুলে যাবার সময়। এখন বিড়ির নেশা থাকার দরুন, জমা তো দুরস্থান, উল্টে প্রচুর ধার থাকতো, যেগুলো উৎসবের মরসুমে পাওয়া ভেট থেকে শোধ করতাম। এক ভদ্রলোক যাকে আমরা সকলেই দাদা বলতাম। তাকে নিয়েই ঘটনা।

তাকে তো আমি সহ আমার বন্ধুমহলের প্রায় সকলেই জাতিশত্রু করে রেখেছিলাম। এই মাস ছয়েক আগে হঠাৎ দেখা, প্রায় ১৬ বছর পর। একটা হোটেলে খেতে গিয়ে। উনি চিনতে পারেন নি সেটাই স্বাভাবিক। আমি কাছে গেলাম, একটু হাসলাম। জড়িয়ে ধরলাম। বললো ওনার একমাত্র ছেলে নাকি বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নাকি আর ফেরেনি। বেঁচে আছে কিনা তাও জানেন না।

বেচারা একটু হতভম্বময় অপ্রস্তুত অবস্থা, বয়স প্রায় ৬০ এর উপর। গরীব, হোটেলের থালাবাসন ধোয় বোধহয়। আমি যথাসাধ্য সাহায্যের প্রতিশ্রুতি সহ, কিছু নগদ ওনার হাতে দিয়ে এলাম।

আমার সাথের বন্ধু টি তো আকাশ থেকে পরলো, যে আমার হলো কি। অচেনা লোককে এভাবে...............

তখন ওকে বলিলাম:---
ইনি হলেন নারাণ দা, আমার বাবার ক্লাসমেট ছিলেন। আমার ভালোবাসা টা ওই জন্য নয়। আসলে আমি বহুদিন ওনাকে বাবা হিসাবে কামনা করেছি। এবং বড় হয়ে ওনার মত হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা তো আর উনি জানতেন না। তাই আমার মনের এই স্পেশাল ইচ্ছার জন্য, কোন স্পেশাল খাতির ও পেতাম না। সেখান থেকেই রাগের সুত্রপাত।

-আমার বন্ধু টি বললো, তো ওনার সাথে তোর সম্পর্ক কি??

-আমি বললাম, ইনি আমাদের স্কুলের সামনে আলুকাবলি, ছোলা বারোভাজা, আচার, পেয়ারা, কামরাঙা, কয়েতবেল ইত্যাদি বিক্রি করতেন। ওনার একমাত্র ছেলে পরেশ ও আমাদের সাথেই পড়তো। টিফিনের সময় বা ছুটির সময়, ওনার ছেলে ওনাকে হেল্প করতো।

আমার পকেট তখন এমনিতেই গড়ের মাঠ। আমার বন্ধুদের ও তথৈবচ অবস্থা। ওই চটকা খাবার লোভ হতো। মাঝেমাঝে ফ্রি খাওয়াতেন অনেককেই। আবার ধারও দিতেন। সেটা আমি অধিকার ভেবে নিয়েছিলাম। কিন্তু রোজ রোজ দেবেন কেন, আর ধার ই বা দেবেন কেন?? তাছারা ধারের কারবারে শোধ বলেও একটা চ্যাপ্টার আছে, আমি তো সেটা মানতাম না। রোজ ফ্রি তো দুরস্থান। তখন এখানে মানুষের অভাব টা একটু বেশিই ছিল। সেই থেকেই আমার রাগের সুত্রপাত।

বহুবার ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহি চেয়েছিলাম, যে ইনা কেই কেন আমার বাবা বানাওনি। কমপক্ষে ওই হেল্পারি করার ফাঁকে রোজ ও গুলো চাখতে তো পারতাম।ওনার ছেলের মত।

শেষে ওতে ফেল হয়ে, সিদ্ধান্তি নিয়ে ফেলেছিলাম। যে বড় হয়ে যদি কিছু হতেই, তো এই স্কুলের সামনে এই রকম একটা স্টল ঈ দেব। বিক্রিবাটা যা হলো হলো। বাকিটা আমিই খাবো। নিজের দোকান তো। সুতরাং পয়সা সেবার ঝামেলা টা থাকবে না।

সেই রাগ। আর রাগ থেকে শত্রু। শেষে তো স্কুলের পিছন গেট গিয়ে যাতায়াত করতাম, তখন ক্লাস সেভেন। তার পর হঠাৎ এই ভদ্রলোক গায়েব। খুব আনন্দ হয়েছিল, যে ব্যাটা ফ্রি দিবি না?? যাহ তোর দোকানটাই উঠে গেলো।

এখন বুঝি, ওনার ফ্রি খায়ানোর চোটে আর ধার শোধ না হিবার কারনে, পুঁজিতে টান পরেছিল, হয়তো অন্য বিকল্প কিছুর পেশা নিয়েছিলেন। বাকিটা আর জানি না। ছেলের পড়াশোনার পাসাপাসি সংসার চালানোর ও খরচ বাড়ছিলো। ক্লাস এইট থেকে নতুন দোকানদার বসতে শুরু করলো।

আমিও বাবার ব্যাবসার পার্টটাইম হেল্পার হয়ে যাওয়াতে, পকেটের টান তো ছিলোই না, উপরন্ত একটা পঞ্চাশ টাকার নোট সকল সময় পেনসিলের বাক্সে থাকতো।

সুতরাং এই নারাণ দা ই, আমার ব্যাবসায়িক জীবনের গুরু, যাকে দেখে নিজে কিছু ব্যাবসা করবো ভাবনা টা মাথায় এসেছিল।

আজকের দিনে নিছক মজার শোনাবে। কিন্তু সেদিনের ওই ১১-১২ বছরের ছেলের স্বপ্ন টাই আজকে ওই মানুষটিকে বুকে টেনে নিয়েছে। সময় চলে যায়, ওই সেইদিনকার হাসিমুখের নারান দার মুখটাকে মনে পরলেই, মনটা খুব নষ্টালজিক হয়ে যায়।

ভালো থেকো নারান দা।

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...