শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০১৪

রাবনের প্রতিভা

"রাবণের প্রতিভা"

================== 

রামায়ণ মহাকাব্যের নায়ক রামচন্দ্র রাজপুত্তর, ধর্মপরায়ণ, বীর, ধীর, সুসভ্য, সুকান্ত, জ্ঞান, গুণী ইত্যাদি শত শত গুণাত্মক বিশেষণে ভূষিত। পক্ষান্তরে রাবণ—বিললাঙ্গ (দশমুণ্ডু), স্বৈরাচারী, অসভ্য, রাক্ষস, কামুক ইত্যাদি শত শত দোষাত্মক বিশেষণে দুষ্ট। কিন্তু বাস্তবিকই কি তাই? হয়তো আর্য-ঋষি বাল্মীকি—আর্যপ্রীতি ও অনার্যবিদ্বেষ বশত শ্রীরামকে প্রদীপ্ত ও রাবণকে হীনপ্রভ করার মানসে একের প্রোজ্জ্বল ও অন্যের মসিময় চিত্র অংকিত করেছেন নিপুণ হস্তে রামায়ণের পাতায়। কিন্তু তাঁর তুলির আঁচড়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রকাশ পাচ্ছে রাবণের কৌলিন্য, শৌর্য-বীর্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আসল কান্তির ছিটেফোঁটা; যার ঔজ্জ্বল্য রামচরিত্রের উজ্জ্বলতার চেয়ে বহুগুণ বেশী।


রামচন্দ্র ছিলেন ক্ষত্রকুলোদ্ভব, চার বর্ণের দ্বিতীয় বর্ণের মানুষ। সেকালের ক্ষত্রিয়রা ছিলো বংশগত যোদ্ধা, অর্থাৎ নরখাতক। আর রাবণ ছিলেন ব্রাহ্মণ বংশীয়। এ কথাটা শুনে রামুভক্ত হিন্দু ভাইয়েরা হয়তো আঁতকে উঠতে পারেন। ‘ব্রাহ্মণ’-এর সাধারণ সংজ্ঞা হলো—ব্রহ্মাংশে জন্ম যার, অথবা বেদ জানে যে, কিংবা বেদ অধ্যয়ণ করে যে, নতুন ব্রহ্মের উপাসনা করে যে—সেই-ই ব্রাহ্মণ। ঋষিগণ সর্বত্রই উক্ত গুণের অধিকারী। তাই ঋষি মাত্রেই ব্রাহ্মণ। রাবণের দাদা পুলস্ত্য ছিলেন ব্রহ্মার মানসপুত্র এবং স্বনামধন্য ঋষি। কাজেই তিনি ছিলেন বংশে ও গুণে উভয়ত ব্রাহ্মণ। পুলস্ত্য ঋষির পুত্র অর্থাৎ রাবণের পিতা বিশ্রবাও ছিলেন একজন বিশিষ্ট ঋষি। কাজেই তিনিও ছিলেন বংশগত ও গুণগত ব্রাহ্মণ। তাই ব্রাহ্মণ ঋষি বিশ্রবার পুত্র রাবণ গুণগত না হলেও কুলগত ব্রাহ্মণ ছিলেন নিশ্চয়ই। এতদ্ভিন্ন নিম্নলিখিত আলোচনাসমূহে রাম ও রাবণের ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভার তুলনামূলক কিঞ্চিৎ পরিচয় পাওয়া যাবে।


১. রাবণের রাজমহলকে (কখনো লঙ্কাকেও) হলা হয়েছে ‘স্বর্ণপুরী’। এতে রাবণের ঐশ্বর্য, শিল্প-নিপুণতা, সৌন্দর্যপ্রিয়তা, রুচিবোধ ইত্যাদি বহু গুণের পরিচয় মেলে। কিন্তু রামচন্দ্রের বাড়িতে এমন কিছুর উল্লেখ দেখা য্যা না, যার দ্বারা তাঁর ওসব গুণের পরিচয় পাওয়া যায়।


২. লঙ্কায় সীতাদেবী রক্ষিতা হয়েছিলেন রাবণের তৈরী অশোক কাননে। তা ছিলো রাবণের প্রমোদ উদ্যান, যেমন আধুনিক কালের ইডেন গার্ডেন। সে বাগানটিতে প্রবেশ করলে কারও শোকতাপ থাকতো না। তাই তার নাম ছিলো অশোক কানন। সে বাগানটির দ্বারা রাবণের সুরুচি ও সৌন্দর্যপ্রিয়তার পরিচয় পাওয়া যায়। অধিকন্তু তিনি যে একজন উদ্ভিদবিদ্যা বিশারদ ছিলেন তা-ও জানা যায়। তার প্রমাণ মেলে একালের সুপ্রসিদ্ধ খনার বচনে। খনা বলেছেন—
“ডেকে কয় রাবণ,
কলা-কচু না লাগাও শ্রাবণ।”


শত শত জাতের ফল-ফুল ও লতাগুল্মের বৃক্ষরাজির একস্থানে সমাবেশ ঘটিয়ে তা লালন-পালন ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু জানা যায় না রামচন্দ্রের বাড়িতে কোনো ফুল-ফলের গাছ আদৌ ছিলো কি-না।


৩. রামচন্দ্র লঙ্কায় গিয়েছিলেন কপিকুলের (বানরের) সাহায্যে মাটি-পাথর কেটে বাঁধ নির্মাণ করে, দীর্ঘ সময়ের চেষ্টায়। কিন্তু লঙ্কা থেকে ভারতের দণ্ডকারণ্য তথা পঞ্চবটী বনে রাবণ যাতায়াত করেছিলেন “পুষ্পক” বিমানে আরোহন করে অতি অল্প সময়ে। রাবণ যে একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বা বৈমানিক এবং কারিগরিবিদ্যা-বিশারদ ছিলেন, তা তার জ্বলন্ত প্রমাণ! এ ক্ষেত্রে রাবণের সহিত শ্রীরামের তুলনাই হয় না।


৪. রামচন্দ্র যুদ্ধ করেছেন সিএ মান্ধাতার আমলের তীর-ধনু নিয়ে। আর রাবণ আবিষ্কার করেছিলেন এক অভিনব যুদ্ধাস্ত্র, যার নাম ‘শক্তিশেল’। তা শক্তিতে ছিলো যেনো বন্দুকের যুগের ডিনামাইট। নিঃসন্দেহে এতে রাবণের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় মেলে।
৫. রামচন্দ্রের নিক্ষিপ্ত শরাঘাতে রাবণের মুমূর্ষু সময়ে তাঁর কাছে গিয়ে রামচন্দ্র রাজনীতি সম্বন্ধে তাঁর উপদেশপ্রার্থী হয়েছিলেন এবং মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও তিনি রামচন্দ্রের সে প্রার্থনা পূর্ণ করেছিলেন ধীর ও শান্তভাবে, সরল মনে। এতে প্রমাণিত হয় যে, রাবণ সে যুগের একজন রাজনীতি-বিশারদ ছিলেন। অধিকন্তু ছিলেন ধৈর্য, সহন ও ক্ষমাশীল এবং প্রতিহিংসাবিমুখ এক মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী।


৬. রামায়ণ মহাকাব্যে রাবণকে বলা হয়েছে ‘দশানন’। কিন্তু বাস্তবে রাবণের দশটি মুণ্ডু নিশ্চয়ই ছিলো না। তবে তাঁর মাথায় মজ্জা অর্থাৎ জ্ঞান ছিলো দশটা মুণ্ডুর সমান। তা-ই রূপকে বিদ্রুপে অংকিত হয়েছে ‘রাবণ দশমুণ্ডু’ রূপে।


৭. রাক্ষস বা নরখাদক বলা হয়েছে রাবণকে। উপরোক্ত আলোচনাসমূহের পরে এ বীভৎস বিশেষনটি সম্বন্ধে আর কিছু সমালোচনা আবশ্যক আছে বলে মনে হয় না। তবুও প্রিয় পাঠকবৃন্দের কাছে একটি প্রশ্ন না রেখে পারছি না। রাবণের দাদা হচ্ছে পুলস্ত্য, পিতা বিশ্রবা, ভ্রাতা কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ, বৈমাত্রেয় ভ্রাতা কুবের এবং পুত্র ইন্দ্রজিৎ (প্রসিদ্ধ বৈমানিক); এঁরা সকলেই ছিলেন সভ্য, ভব্য, সুশিক্ষিত, গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তি। এঁরা কেউই ‘রাক্ষস’ বা কাঁচামাংসভোজী মানুষ ছিলেন না। রাবণও তাঁর শৈশবকালাবধি মাতা-পিতার রান্না করা খাবারই খেয়েছেন নিশ্চয়। অতঃপর যৌবনে হঠাৎ করে একদিন তিনি খেতে শুরু করলেন জীবের কাঁচামাংস! বিমান বিহার, শক্তিশেল নির্মাণ ও অশোক কানন তৈরী করতে জানলেও তিনি রান্নার পাকপাত্র গড়তে বা রান্না করতে জানেন নি। বেশ ভালো। কিন্তু তিনি কোথায় বসে, কোন দিন, কাকে খেয়েছেন—তার একটিরও নামোল্লেখ নাই কেন?


৮. রাবণের সন্তানাদি সম্বন্ধে একটি প্রবাদ আছে—
“একলক্ষ পুত্র আর সোয়ালক্ষ নাতি,
একজন না থাকিল বংশে দিতে বাতি।”
আর অপর একটি প্রবাদ আছে—
“যাহা কিছু রটে
তার কিছু বটে।”


প্রবাদবাক্যের লক্ষ পুত্র না হোক তার শতাংশ সত্য হলেও রাবণের পুত্রসংখ্যা হয় এক হাজার এবং তার অর্ধাংশ সত্য হলেও সে সংখ্যাটি হয় পাঁচশ’। আর তা-তো বিস্ময়ের কিছু নয়। জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্রও ছিলেন একশ’ এক পুত্রের জনক। আর রাম? তাঁর পুত্রের সংখ্যা কথিত হয় মাত্র দু’টি, বলা চলে একটি। কেননা তারা ছিল সীতার এক গর্ভজাত, যমজ সন্তান। তদুপরি সে পুত্রযুগল জন্মেছিলো নাকি রামচন্দ্রের বিবাহের তেপ্পান্ন বছর পর (বাস্তব ১২+১৪=২৬ বছর পর)। বছরের এ হিসেবটা প্রিয় পাঠিকদের কাছে একটু বেমানান বোধ হতে পারে। তাই বছরগুলোর একটা হিসাব দিচ্ছি। বিবাহান্তে রামচন্দ্র গৃহবাসী ছিলেন ১২ বছর, বনবাসী ১৪ বছর এবং গৃহে প্রত্যাবর্তন করে রাজাসনে কাটান নাকি বাকি ২৭ বছর (ঐ ২৭ বছর উদ্দেশ্যমূলক, কাল্পনিক)। এর পর ‘কলঙ্কিণী’ বলে প্রাথমিক অন্তঃসত্ত্বা সীতাদেবীকে নির্বাসিত করা হয় বাল্মীকির তপোবনে, সেখানে জন্মে সীতার যুগল সন্তান কুশ ও লব।


সীতাদেবী বন্ধ্যা ছিলেন না এবং উক্ত তেপ্পান্ন বছরের মধ্যে বনবাসকালের দশ মাস (অশোক কাননে রাবণের হাতে সীতা বন্দিনী ছিলেন ১০ মাস) ছাড়া বায়ান্ন বছর দু’মাস সীতা ছিলেন রামচন্দ্রের অঙ্কশায়িনী। তথাপি এ দীর্ঘকাল রতিবিরতি রামচন্দ্রের বীর্যহীনতারই পরিচয়, নয় কি?
৯. রামচন্দ্রের কাহিনীকারের মতে চোদ্দ বছর বনবাসান্তে রামচন্দ্র দেশে প্রত্যাবর্তন করে নির্বিঘ্নে সংসারধর্ম তথা রাজ্যশাসন করেছিলেন দীর্ঘ ২৭ বছর। অতঃপর প্রজাবিদ্রোহ দেখা দিয়েছিলো। কেননা লঙ্কার অশোক কাননে বন্দিনী থাকাকালে রাবণ সীতাদেবীর সতীত্ব নষ্ট করেছিলেন এবং অসতীকে গৃহে স্থান দেওয়ায় প্রজাগণ ছিলো অসন্তুষ্ট।


উপরোক্ত বিবরণটি শুনে স্বতই মনে প্রশ্নের উদয় হয়ে যে, মরার দু’যুগের পরে কান্না কেন? বনবাসান্তে রামচন্দ্র স্ববাসে প্রত্যাবর্তন করলে তাঁর বনবাসের বিবরণ তথা লঙ্কাকাণ্ড দেশময় ছড়িয়ে পড়েছিলো তাঁর দেশে ফেরার সংগে সংগেই এবং সীতাকলঙ্কের কানাকানিও চলছিলো দেশময় তখন থেকেই। আর গুজবের ভিত্তিতে সীতাদেবীকে নির্বাসিত করতে হলে তা করা তখনই ছিলো সঙ্গত। দীর্ঘ ২৭ বছর পর কেন?


রামচন্দ্র সীতাদেবীকে গৃহত্যাগী করেছিলেন শুধু জনগণের মনোরঞ্জনের জন্য, স্বয়ং তাঁকে নাকি ‘নিষ্কলঙ্কা’ বলেই জানতেন। এইরূপ পরের কথায় নিষ্কলঙ্কা স্ত্রী ত্যাগ করার নজির জগতে আছে কি? এই তো সেদিন (১৯৩৬) গ্রেট বৃটেনের সম্রাট অষ্টম এডোয়ার্ড মিসেস সিম্পসনকে সহধর্মিনী করতে চাইলে তাতে বাধ সাধলো দেশের জনগণ তথা পার্লামেণ্ট ‘মিসেস সিম্পসন হীনবংশজাত’ বলে। পার্লামেণ্ট এডোয়ার্ডকে জানালো যে, হয় মিসেস সিম্পসনকে ত্যাগ করতে হবে, নচেৎ তাঁকে ত্যাগ করতে হবে সিংহাসন। এতে এডোয়ার্ড সিংহাসন ত্যাগ করলেন, কিন্তু তাঁর প্রেয়সীকে ত্যাগ করলেন না। শুধু তা-ই নয়, তাঁর মেঝ ভাই ডিউক-অব-ইয়র্ককে সিংহাসন দিয়ে তিনি সস্ত্রীক রাজ্য ছেড়ে চলে গেলেন বিদেশে। রামচন্দ্রেরও তো মেঝ ভাই ছিলো।


সীতাদেবীর অসীত্ব রক্ষার জন্য রামায়ণের কাহিনীকার চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেননি। যেখানে তিনি লৌকিক অবলম্বন খুঁজে পাননি, সেখানে অলৌকিকের আশ্রয় নিয়েছেন। দু’-একটি উদাহরণ দিচ্ছি—
ক. রাবণের অশোক বলেন সীতার সতীত্ব রক্ষার কোনো অবলম্বন তিনি খুঁজে পাননি। তাই সেখানে বলেছেন যে, জোরপূর্বক কোনো রমণীর সতীত্ব নষ্ট করলে রাবণের মৃত্যু হবে, এই বলে কোনো ঋষি তাঁকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। কাজেই মৃত্যুভয়ে রাবণ সীতাকে স্পর্শ করেননি। সুতরাং সেখানে সীতার সতীত্ব বেঁচে আছে।


খ. সীতাকে নিয়ে রামচন্দ্র অযোধ্যায় পৌঁছুলে সেখানে যখন সীতাকলঙ্কের ঝড় বইছিলো, তখন বলেছেন যে, সীতাদেবীকে অগ্নিকুণ্ডে ফেলে তাঁর সতীত্বের পরীক্ষা করা হয়েছিলো, তাতে তাঁর কেশাগ্রও দগ্ধ হয়নি। সুতরাং সীতার সতীত্ব বেঁচে আছে।


গ. বহুবছর বাল্মীকির তপোবনে কাটিয়ে শ্রীরামের অশ্বমেধ যজ্ঞে কুশ-লবসহ বাল্মীকির সাথে সীতাদেবী রামপুরীতে উপস্থিত হলে পুনঃ যখন তিনি-লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ভোগ করতে থাকেন, তখন কবি বলেছেন যে, সীতাদেবীর অনুরোধে ধরণী দ্বিধাবিভক্ত হয়েছিল এবং সীতাদেবী সে গর্তমধ্যে প্রবেশ করে স্বর্গে বা পাতালে গিয়েছেন ইত্যাদি।


উপরোক্ত ঘটনাগুলো হয়তো এরূপও ঘটে থাকতে পারে। যথা—
ক. রাবণের রূপলাবণ্য ও শৌর্যবীর্য দর্শনে প্রীতা হয়ে সীতাদেবী রাবণকে স্বেচ্ছায় করেছেন দেহদান এবং তাঁকে রাবণ করেছেন বীর্যদান। সীতাদেবীর প্রতি রাবণ বলপ্রয়োগ করেন নি, তাই তিনি মরেননি। হয়তো এমনও হতে পারে যে, রাবণ যেদিন সীতার প্রতি বলপ্রয়োগ করেছেন, সেদিন তিনি রামের হাতে মরেছেন। আর সেইদিন সীতাদেবী হয়েছেন অন্তঃসত্ত্বা।


খ. সীতাদেবীকে নিয়ে রামচন্দ্র অযোধ্যায় পৌঁছুলে লঙ্কাকাণ্ড প্রকাশ হওয়ায় সেখানে তখন সীতাকলঙ্কের ঝড় বইছিলো নিশ্চয়ই। হয়তো সীতার স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য প্রথমত জেরা-জবানবন্দি, কটুক্তি, ধমকানি-শাসানি ও পরে মারপিট ইত্যাদি শারীরিক নির্যাতন চালাহয়ে হচ্ছিলো তাঁর প্রতি। কিন্তু তিনি নীরবে সহ্য করেছিলেন সেসব নির্যাতন, ফাঁস করেননি কভু আসল কথা। আর সেটাই হচ্ছে সীতার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।


গ. শ্রীরামের রাজপ্রসাদে সীতা প্রসঙ্গে অতঃপর থমথমে ভাব বিরাজ করছিলো কিছুদিন (২৭-২৮ দিন বা এক রজোমাস যাকে বলা হয় ২৭ বছর)। পরে সীতাদেবীর মাসিক পরিক্রমায় রামচন্দ্র যখন আসল খবর পেয়েছিলেন, তখনই তিনি অন্তঃসত্ত্বা সীতাদেবীকে নির্বাসিতা করেছিলেন বাল্মীকির তপোবনে এবং সেখানে জন্মেছিলো তাঁর যুগল সন্তান কুশ-লব।


সন্তান কামনা করে না, এমন কোনো লোক বা জীব জগতে নেই। কারো সন্তান না থাকলে তার দুঃখের অবধি থাকে না; বিশেষত ধনিক পরিবারে। আর রাজ্যেশ্বর রামচন্দ্রের বৈবাহিক জীবনের দীর্ঘ ২৬ বছর পরে আসন্ন সন্তান পরিত্যাগ করলেন শুধু কি প্রজাদের মনোরঞ্জনের জন্যে? নিশ্চয়ই তা নয়। তিনি জানতেন যে, সীতার গর্ভস্থ সন্তান তাঁর ঔরসজাত নয়, ঔরসজাত রাবণের। আর সঙ্গত কারণেই সীতার গর্ভজাত সন্তানের প্রতি তাঁর কোনো মায়ামমতা ছিলো না, বরং ছিলো ঘৃণা ও অবজ্ঞা। তাই তিনি সীতা-সুতের কোনো খোঁজখবর নেননি বহু বছর যাবত। বিশেষত ঋষি বাল্মীকির আশ্রম অযোধ্যা থেকে বেশি দূরেও ছিলো না, সে আশ্রম তিনি চিনতেন।


অতঃপর সীতাসহ কুশ-লব বিনা নিমন্ত্রণে (বাল্মীকির নিমন্ত্রণ ছিলো) ঋষি বাল্মীকির সাথে শ্রীরামের অশ্বমেধ যজ্ঞে উপস্থিত হয়ে যেদিন রামায়ণ কীর্তন করে, সেদিন কুশ-লবের মনোরম কান্তি ও স্বরে-সুরে মুগ্ধ হয়ে রামচন্দ্র তাদের ‘দত্তক’রূপে গ্রহণ করেন। হয়তো তখন তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে, ঘটনাক্রমে ফেলনা হলেও ছেলে দুটো (কুশ-লব) রাজপুত্র তো বটে।


কুশ-লবকে গ্রহণ করলেও সীতাকে গ্রহণ করেননি রামচন্দ্র সেদিনও। সীতাদেবী হয়তো আশা করেছিলেন যে, বহু বছরান্তে পুত্ররত্ন-সহ রাজপুরীতে এসে এবার তিনি সমাদর পাবেন। কিন্তু তা তিনি পান নি, বিকল্পে পেয়েছিলেন যতো অনাদর-অবজ্ঞা। তাই তিনি ক্ষোভে-দুঃখে হয়তো আত্মহত্যা করেছিলেন। নারীহত্যার অপবাদ লুকানোর উদ্দেশ্যে এবং ঘটনাটি বাইরে প্রকাশ পাবার ভয়ে শ্মশানে দাহ করা হয়নি সীতার শবদেহটি, হয়তো লুকিয়ে প্রোথিত করা হয়েছিল মাটির গর্তে, পুরীর মধ্যেই। আর তা-ই প্রচারিত হয়েছে ‘স্বেচ্ছায় সীতাদেবীর ভূগর্ভে প্রবেশ’ বলে।


সে যা হোক, অযোধ্যেশ্বর রাম ও লঙ্কেশ্বর রাবণের সন্তান-সন্ততি সম্বন্ধে পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, রাবণ ছিলেন শত শত সন্তানের জনক, আর রামের ছিলো না একটিও পুত্র। তিনি ছিলেন বন্ধ্য (আঁটকুড়া)।


লঙ্কেশ্বর রাবণের যাবতীয় গুণগরিমা ও সৌরভ-গৌরব গুপ্ত রাখার হীন প্রচেষ্টার মুখ্য কারণ—তিনি অধ্যাত্মবাদী ছিলেন না, ছিলেন জড়বাদী বিজ্ঞানী। বিশেষত তিনি আর্যদলের লোক ছিলেন না, ছিলেন অনার্যদলের লোক। এরূপ ‘অনুমান’ করা হয়তো অসঙ্গত নয়।


আর একটি কথা। শুধুমাত্র রাম ও রামণকে নিয়ে রামায়ণ হতে পারে না, হনুমানকে বাদ দিয়ে। তাই এখন হনুমান প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা করছি।
ঋষি বাল্মীকি ছিলেন প্রচণ্ড রামভক্ত। কৃত্তিবাসী রামায়ণে তার কিঞ্চিৎ আভাস পাওয়া যায়। কৃত্তিবাসী রামায়ণে কথিত হয়েছে যে, বাল্মীকি যৌবনে রত্নাকর নামে একজন দস্যু ছিলেন। পরে নারদের উপদেশে দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করে ছয় হাজার বছর একস্থানে উপবিষ্ট থেকে রামনাম জপ করেন। সেই সময় তাঁর সর্বশরীর বল্মীকে সমাচ্ছন্ন হয়। পরে তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করে বল্মীক হ’তে উত্থিত হওয়ায় তিনি বাল্মীকি নামে খ্যাত হন।


এক্সিনি আহার-নিদ্রা ও চলাফেরা পরিত্যাগ করে ছয় হাজার বছর বা ছয় বছরও রামনাম জপ করতে পারেন, রামের শৌর্য, বীর্য, গুণ-গরিমা ও ইজ্জৎ বৃদ্ধির জন্য তিনি কি না করতে পারেন? শ্রীরামের প্রাধান্য রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি গুণী, জ্ঞানী ও সুসভ্য রাবণকে রাক্ষস বানিয়েছিলেন, ভাগ্যিস পশু বানান নি। রামায়ণ মহাকাব্যের বনপর্বে এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে হনুমান, জাম্ববান, সুগ্রীব ও তার ভ্রাতা বালীরাজ। রামায়ণের কাহিনীকার তাদের সদলে অঙ্কিত করেছেন পশুরূপে। বিশেষত হনুমান, সুগ্রীব ও বালীরাজকে সদলে বানর বানিয়েছেন এবং জাম্ববানকে বানিয়েছেন ভালুক। কিন্তু তারা কি আওলেই পশু ছিলো?


সে যুগে স্বর্গাগত দেবতাদের কেউ কেউ মর্ত্যবাসী কোনো কোনো মানবীর সাথে যৌনাচারে লিপ্ত হতেন এবং তৎফলে কোনো সন্তানের জন্ম হলে সে ‘দেবতা’ হতো না বটে, কিন্তু সাধারণ মানুষও হতো না, হতো অসাধারণ মানুষ। যেমন—সূর্যদেবের ঔরসে কুমারী কুন্তির গর্ভে জন্ম নেন কর্ণ। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত যোদ্ধা ও দাতা। দেবতা যমের ঔরসে পাণ্ডুপত্মী কুন্তির গর্ভে জন্মলাভ করেন যুধিষ্ঠির। তিনি ছিলেন ধার্মিক চূড়ামণি, যার ফলে তাঁর নাম হয়েছিল ধর্মরাজ। ইন্দ্রদেবের ঔরসে কুন্তির ক্ষেত্রে জন্ম নেন অর্জুন। তিনি ছিলেন সে যুগের ভারতবিখ্যাত যোদ্ধা ইত্যাদি। কিন্তু কোনো দেবতা কখনো কোনো পশুর সাথে যৌনাচারে লিপ্ত হচ্ছেন এবং তাতে পশুরূপী সন্তান জন্ম নিচ্ছে, এমন কাহিনী কোথাও কোনো পুরাণশাস্ত্রে দেখা যায় না। পৌরাণিক মতে এখানে হনুমানের কিঞ্চিৎ পরিচয় দিচ্ছি। এতে দেখা যাবে যে, হনুমানরা সবাই ছিলো মানুষ। এবং ওদের আভিজাত্যও রামের চেয়ে বহুগুণ বেশি।


প্রথমত হনুমান—পবনদেবের ঔরসে মানবী অঞ্জনার গর্ভে এর জন্ম। কাজেই হনুমান দেব-মানবের বংশজাত একজন বীর্যবন্ত মানব।
দ্বিতীয়ত জাম্ববান—এ হচ্ছে দেবতা ব্রহ্মার পুত্র। জাম্ববানের কন্যার নাম জাম্ববতী এবং তাকে বিয়ে করেন হিন্দুদের পরম পূজনীয় শ্রীকৃষ্ণ। সুতরাং জাম্ববান হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের শ্বশুর। কাজেই সে ভালুক বা পশু হতে পারে না, সে ব্রহ্ম-বংশের মানুষ; সুতরাং ব্রাহ্মণ।


তৃতীয়ত বালী ও সুগ্রীব—দেবরাজ ইন্দ্রের (মতান্তরে সূর্যের) ঔরসে ও ব্রহ্মার মানসকন্যা রক্ষরজার গর্ভে বালী ও সুগ্রীবের জন্ম হয়। সুতরাং বালী ও সুগ্রীব হচ্ছে ইন্দ্রের বা সূর্যের পুত্র এবং ব্রহ্মার দৌহিত্র (নাতি)। বিশেষত ব্রহ্মার বংশজাত বলে তারা ব্রাহ্মণত্বের দাবীদার।


উপরোক্ত আলোচনাসমূহের দ্বারা অনুমান হয় যে, রামায়ণোক্ত বানররা পশু ছিলো না, তারা ছিলো ভারতের ‘কিষ্কিন্ধ্যা’ নামক অঞ্চলের আদিম অধিবাসী এবং আলোচ্য ব্যক্তিরা ছিলো সেকালের বিশিষ্ট ব্যক্তি। কেননা রামায়ণ মহাকাব্যে অজস্র বানরের আভাস থাকলেও প্রাধান্য পেয়েছে এরাই।
এ প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী মর্গানের মতবাদ অনুধাবনযোগ্য। মর্গানের মতে—বেঁচে থাকার তাগিদেই মানুষকে জোট বাঁধতে হয়েছে। জোট মানে দল। কিন্তু কোন সম্পর্কের ভিত্তিতে দল বাঁধবে? মর্গানের গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে, সে সময় মানুষ দল বেঁধেছিলো জ্ঞাতি সম্পর্কের ভিত্তিতে। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জ্ঞাতি, একই পূর্বপুরুষ থেকে তাদের জন্ম। মর্গান এমনি এক একটি দলের নাম দিয়েছিলেন গেনস্‌ (Gens)। মর্গানের পরের যুগের নৃবিদরা গেনস্‌ শব্দের বদলে ক্লান (Clan) শব্দের ব্যবহার করেছেন এবং ক্লান শব্দটিই চলছে।


কয়েকটি ক্লান একসঙ্গে জোট বাঁধলে যে বড়ো দলটি গড়ে ওঠে, তার নামে দেয়া হয়ছে ট্রাইব (Tribe)। আবার অনেকগুলো ট্রাইব মিলে আরো বড়ো একটি সংগঠন, তার নামে কন্‌ফেডারেসি অব ট্রাইবস্‌।


সাধারণ জন্তু-জানোয়ারের নাম থেকেই ক্লানের নাম হ’তো। যেমন—ভালুক, নেকড়ে বাঘ, হরিণ, কাছিম ইত্যাদি। আবার ফুল, ফল, লতাপাতার নাম থেকেও ক্লানের নামকরণ হতো। এধরণের নামকরণের মূলে যে বিশ্বাসটি রয়েছে, তাকে বলা হয় টোটেম বিশ্বাস।


পাক-ভারত উপমহাদেশের সাঁওতাল উপজাতির শতাধিক গোত্র বা টোটেম আছে, হো উপজাতির আছে ৫০টিরও বেশী। এরূপ মুণ্ডা উপজাতির প্রায় ৬৪টি, ভীল উপজাতির ২৪টি, ছোটো নাগপুরের খারিয়া উপজাতির ৮টি এবং পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার ‘দৌড়ি’ উপজাতির মধ্যে ৪টি গোত্র বা টোটেম রয়েছে। এদের প্রত্যেক গোত্রই—পশু, পাখী, গাছপালা অথবা কোনো বস্তুর নামে পরিচিত। আমাদের দেশেও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এরূপ বহু গোত্রের বাম দৃষ্ট হয়, যদিও এগুলোকে ঠিক টোটেম বলা যায় না। যেমন—সেন (শ্যেন = বাজপাখী), নাগ (সর্প), সিংহ (পশুরাজ) ইত্যাদি। গোত্রের প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেকে তার গোত্রের টোটেমের নামে পরিচয় দিয়ে থাকে। যেমন—সিংহ গোত্রের সবাই সিংহ, বাঘ গোত্রের সবাই বাঘ, হরিণ গোত্রের সবাই হরিণ ইত্যাদি।

মর্গানের মতে বিশেষত আধুনিক বহু নৃতত্ত্ববিদের মতে—রামায়ণোক্ত জাম্ববান ও হনুমানাদি ভালুক ও বানররা পশু ছিলো না, তারা ছিলো সেকালের কিষ্কিন্ধ্যার (ভারতের দণ্ডকারণ্যের অংশবিশেষ, আধুনিক নাম নাশিক) অনার্য অধিবাসী (মানুষ)। বানরাদি ছিলো তাদের টোটেম বা বংশগত উপাধি মাত্র। অধিকন্তু এ-ও অনুমান হয়ে যে, হয়তো হনুমান ও সুগ্রীব ছিলো কোনো ‘ক্লান’ ও ‘ট্রাইব’-এর অধিকর্তা এবং বালী ছিলো কোনো ‘কন্‌ফেডারেসী অব ট্রাইবস্‌’-এর অধিপতি, অর্থাৎ রাজা।


পরিশেষে—রামভক্ত ভাইদের সবিনয়ে বলছি যে, মানুষ ও পশু-পাখীর চেহারা, চরিত্র ও ভাষা—এ তিনে প্রকাশ পেয়ে থেকে তাদের স্বকীয়তা বা ব্যক্তিত্ব। কিন্তু ‘ভাষা’র ক্ষেত্রে মানুষের সমকক্ষ অপর কোনো জীব নেই। কেননা মানুষের মতো অন্য কোনো জীবের—দন্ত, ওষ্ঠ, তালু, জিহ্বা ইত্যাদি স্বরযন্ত্র নেই। তাই রামায়ণে কবি কিষ্কিন্ধ্যাবাসীদের চেহারা বদলিয়া বানরাদি বানিয়েছেন বটে, কিন্তু তাদের ভাষা ও চরিত্র বদলাতে পারেননি, তা রেখেছেন সর্বত্রই মানুষের মতো। রামায়ণ গ্রন্থই তার সাক্ষী।

লেখাঃ আরজ আলী মাতুব্বর
স্বপ্নের ছেড়া পাতায় সংগৃহীত .......

শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

উন্মাদ নামা ~ ১৪

ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের জন্য কেবল ভক্তি আর শ্রদ্ধা ই যথেষ্ট।


কিন্তু অবিশ্বাস করতে হলে প্রচুর পড়াশোনা আর জ্ঞানের প্রয়োজন।

সোমবার, ৭ জুলাই, ২০১৪

বালখিল্যতা

ছোট বেলার ঘটনা।

বিচিত্র ইচ্ছা আমাদের অনেকের ই থাকে। আমার সেকেন্ডারি স্কুলের সময়কার ঘটনা, বাবা মাত্র ৫০ পয়সা বরাদ্দ দিতেন, সারাদিনে, স্কুলে যাবার সময়। এখন বিড়ির নেশা থাকার দরুন, জমা তো দুরস্থান, উল্টে প্রচুর ধার থাকতো, যেগুলো উৎসবের মরসুমে পাওয়া ভেট থেকে শোধ করতাম। এক ভদ্রলোক যাকে আমরা সকলেই দাদা বলতাম। তাকে নিয়েই ঘটনা।

তাকে তো আমি সহ আমার বন্ধুমহলের প্রায় সকলেই জাতিশত্রু করে রেখেছিলাম। এই মাস ছয়েক আগে হঠাৎ দেখা, প্রায় ১৬ বছর পর। একটা হোটেলে খেতে গিয়ে। উনি চিনতে পারেন নি সেটাই স্বাভাবিক। আমি কাছে গেলাম, একটু হাসলাম। জড়িয়ে ধরলাম। বললো ওনার একমাত্র ছেলে নাকি বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নাকি আর ফেরেনি। বেঁচে আছে কিনা তাও জানেন না।

বেচারা একটু হতভম্বময় অপ্রস্তুত অবস্থা, বয়স প্রায় ৬০ এর উপর। গরীব, হোটেলের থালাবাসন ধোয় বোধহয়। আমি যথাসাধ্য সাহায্যের প্রতিশ্রুতি সহ, কিছু নগদ ওনার হাতে দিয়ে এলাম।

আমার সাথের বন্ধু টি তো আকাশ থেকে পরলো, যে আমার হলো কি। অচেনা লোককে এভাবে...............

তখন ওকে বলিলাম:---
ইনি হলেন নারাণ দা, আমার বাবার ক্লাসমেট ছিলেন। আমার ভালোবাসা টা ওই জন্য নয়। আসলে আমি বহুদিন ওনাকে বাবা হিসাবে কামনা করেছি। এবং বড় হয়ে ওনার মত হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা তো আর উনি জানতেন না। তাই আমার মনের এই স্পেশাল ইচ্ছার জন্য, কোন স্পেশাল খাতির ও পেতাম না। সেখান থেকেই রাগের সুত্রপাত।

-আমার বন্ধু টি বললো, তো ওনার সাথে তোর সম্পর্ক কি??

-আমি বললাম, ইনি আমাদের স্কুলের সামনে আলুকাবলি, ছোলা বারোভাজা, আচার, পেয়ারা, কামরাঙা, কয়েতবেল ইত্যাদি বিক্রি করতেন। ওনার একমাত্র ছেলে পরেশ ও আমাদের সাথেই পড়তো। টিফিনের সময় বা ছুটির সময়, ওনার ছেলে ওনাকে হেল্প করতো।

আমার পকেট তখন এমনিতেই গড়ের মাঠ। আমার বন্ধুদের ও তথৈবচ অবস্থা। ওই চটকা খাবার লোভ হতো। মাঝেমাঝে ফ্রি খাওয়াতেন অনেককেই। আবার ধারও দিতেন। সেটা আমি অধিকার ভেবে নিয়েছিলাম। কিন্তু রোজ রোজ দেবেন কেন, আর ধার ই বা দেবেন কেন?? তাছারা ধারের কারবারে শোধ বলেও একটা চ্যাপ্টার আছে, আমি তো সেটা মানতাম না। রোজ ফ্রি তো দুরস্থান। তখন এখানে মানুষের অভাব টা একটু বেশিই ছিল। সেই থেকেই আমার রাগের সুত্রপাত।

বহুবার ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহি চেয়েছিলাম, যে ইনা কেই কেন আমার বাবা বানাওনি। কমপক্ষে ওই হেল্পারি করার ফাঁকে রোজ ও গুলো চাখতে তো পারতাম।ওনার ছেলের মত।

শেষে ওতে ফেল হয়ে, সিদ্ধান্তি নিয়ে ফেলেছিলাম। যে বড় হয়ে যদি কিছু হতেই, তো এই স্কুলের সামনে এই রকম একটা স্টল ঈ দেব। বিক্রিবাটা যা হলো হলো। বাকিটা আমিই খাবো। নিজের দোকান তো। সুতরাং পয়সা সেবার ঝামেলা টা থাকবে না।

সেই রাগ। আর রাগ থেকে শত্রু। শেষে তো স্কুলের পিছন গেট গিয়ে যাতায়াত করতাম, তখন ক্লাস সেভেন। তার পর হঠাৎ এই ভদ্রলোক গায়েব। খুব আনন্দ হয়েছিল, যে ব্যাটা ফ্রি দিবি না?? যাহ তোর দোকানটাই উঠে গেলো।

এখন বুঝি, ওনার ফ্রি খায়ানোর চোটে আর ধার শোধ না হিবার কারনে, পুঁজিতে টান পরেছিল, হয়তো অন্য বিকল্প কিছুর পেশা নিয়েছিলেন। বাকিটা আর জানি না। ছেলের পড়াশোনার পাসাপাসি সংসার চালানোর ও খরচ বাড়ছিলো। ক্লাস এইট থেকে নতুন দোকানদার বসতে শুরু করলো।

আমিও বাবার ব্যাবসার পার্টটাইম হেল্পার হয়ে যাওয়াতে, পকেটের টান তো ছিলোই না, উপরন্ত একটা পঞ্চাশ টাকার নোট সকল সময় পেনসিলের বাক্সে থাকতো।

সুতরাং এই নারাণ দা ই, আমার ব্যাবসায়িক জীবনের গুরু, যাকে দেখে নিজে কিছু ব্যাবসা করবো ভাবনা টা মাথায় এসেছিল।

আজকের দিনে নিছক মজার শোনাবে। কিন্তু সেদিনের ওই ১১-১২ বছরের ছেলের স্বপ্ন টাই আজকে ওই মানুষটিকে বুকে টেনে নিয়েছে। সময় চলে যায়, ওই সেইদিনকার হাসিমুখের নারান দার মুখটাকে মনে পরলেই, মনটা খুব নষ্টালজিক হয়ে যায়।

ভালো থেকো নারান দা।

রবিবার, ২৯ জুন, ২০১৪

মোমবাতির ঠিকানা


স্লিভলেস সমাজসেবিকাদের বাড়িতে ও ভ্যানিটি ব্যাগে ও যত্রতত্র মোমবাত্তি পাওয়া যায়।


স্বয়ংসম্পূর্ন নারীয়ায়নের অন্যতম হাতিয়ার, মোমবাত্তি। জাদুদণ্ড বা ইঞ্জিরিতে জয়স্টিক।

শনিবার, ২১ জুন, ২০১৪

সময়চর্চা - ৩


সময় চর্চা 
তৃতীয় খন্ড 

কে কথা দেয় আর কে কথা রাখে?

এই বিচিত্র ট্যালিপ্যেথির জন্যই সংসদে দিদির গুনর্কীতন,

ফলাফল- হিরো হিরন (!)



আচ্ছে দিন আ আ গায়ে হ্যায়....

নেতা কি কম পরিয়াছে??


যাই হোক, বুলেটট্রেন আসার আগেই ডেমো হিসাবে তার ভাড়া উপস্থিত। একে সদা আনন্দ, তার উপরে গৌড়, প্রেমের সাগর, ভাবখানা যেন " ভর্তুকি বাবু " কে কন্যাদায় থেকে মুক্তিদানের কসম খেয়েছেন। সুতরাং ২য়ে ২ য়ে পাঁচ।
সস্তিকা মুখার্জী, বিচিত্র রকমের সমাজসেবি। যদিও উনি সু-মনের ও অধিকারিণী, তা ক্রমশ প্রকাশ্য হল, বেচারা স্ত্রী, থানাতেও গেলেন ছারাতে, টিপিকাল ভারতীয় নারী।

এতে করে সুদিন অর্নবের, চান্স অএ ডান্স। প্রতিবাদ কাহারে কয়?? অর্পিতা - প্রসেনজিৎ? না ব্রাত্য বসু? একবারে ঝোপবুঝে কোপ। আমাদের ছেলেবেলার স্বপ্ন:- পড়াশোনা থেকে ছুটি দিয়ে, বেড়াতে পাঠানো। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাশে.... ব্যাথা - অজুহাত - ব্রাত্য :)। 

প্রতিবাদ - নাচনি - ঝিঙ্কু - মীর........


ইলেক্ট্রনিক কমপ্লেক্স থানা.... ১০২ নং কেস, আমি আবার সমন পাবো না তো...??


ভাঙ্গাগড়া, মানে আগে ভাঙ্গো, পারলে গড়ো না পারলে ওই অবস্থায় ছেড়ে দাও, কিন্তু ভাঙ্গতেই হবে। তৃতীয় পান্ডব, মানে অর্জুন মানে পার্থ ( মুকুল - ও মদনের পর) শিল্পে ডিনামাইট সেট করে শিক্ষায় প্রবেশ। যদিও ভাঙার কিছু নেই, ত্রি-শঙ্কু দের নিশ্চয় গড়ে দিয়ে, শিক্ষাকে গড়ের মাঠে ঘোড়ার নাদের মধ্যে কবর দেবেন।

সুদিন আমারও, IPL শেষ তো কি? FIFA World Cup হাজির, সাথে ফ্রিতে রাত জাগা, যদিও বউ বলেছে, রাত ঘুমের নাকি দুর্দিন চলছে। তা চলুক (!), পতির পুন্যেই যে সতীর পুন্য...

সারাবছর বিশ্ব ফুটবলের শুধু মাত্র ছবিই দেখি, নেইমার - মেসি - রোনাল্ডো, আর্টিকেলের ৯০ শতাংশ ঈ পড়িনা কিন্তু বিশ্বকাপের সিজিন এলেই যেন "বাপ- মা" মড়া দায়, রাত হোক বা দিন, দেখতে তোমাই হবেই, 

বেচারা ব্রাত্য, অন্তত গোয়ার মন্ত্রী হলে সরকারি খরছে ব্রাজিলটা ঘোরা যেত। সবাই সুমন দে ও নয় আর সবার ABP আনন্দ ও নেই, তবে জাপানি তেল আছে, সোনি আট চ্যেনেলে দেখছি যে... 


সামনের বিশ্বকাপে রাশিয়ায়, ফ্রিতে নীল সাদা জার্সির খেলা দেখতে, রাজ্যপালের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠিত হল বলে, সঙ্গে দেব হিরন শঙ্কু ঝিঙ্কু.. আর কি চাই??


প্রথা ভেঙে ভুটান তালি বাজাচ্ছে, দিলমা রুফেজ ফাইনালে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, ভারতীয় কমিউনিস্ট পাটি (মম -তাবাদি), নবান্নে ছাপান্ন ভোগের মুলো নিয়ে, পাকা চুলে কলপ লাগাচ্ছে, যদিও তা গোবর। গৈরিক অভিনন্দন ছিল এখন নাকি সন্ত্রাস ও হয়। নীল সাদা কাপরের সাধুদের কোলকাতা শহরতলি তে সাড়ে ৩ শতক করে বিনামুল্যে জমি দান, কোথা থেকে আবার, মুস্কিল আসান - বন্ধ চটকল... আরো কত কি..।

কোলিকাতা কে লন্ডন বানাতে সর্বপ্রথম একজন "রানী " দরকার, মেজাজের উপর বিচার করে একজনইমাত্র যোগ্য,  তবে আমৃত্যু না হলে খেলব না।

আজকাল মা সিরিয়াল ছেড়ে " পাড়ুই " সিরিয়াল টা দেখছি, সাথে " চিট ইডি সিবি আই ", এক্কে বারে একতা কাপুর স্টাইল, ভ্রু কোঁচকালেন কেন?? ডোকোমো কেন? কাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন? হৃদয়ের ডিগবাজির অপেক্ষায় দিনগুনি, সাথে সাথী কেষ্ট।

চক্রান্ত?? সেও আছে বহাল তবিয়তে, রোদ নেই কিন্তু চটচটে ঘাম, পুরো চক্রান্ত।

রুদ্র রোষে আমরা তো দেশদ্রোহী,। ৬৪ তে বাংলাদেশ অল আউটের নো সেলিব্রেশন। এক দিক থেকে এই মাসে তা ভালোই। স্পেন আর ইংল্যান্ড এর দু:খে ৪দিন হোব্যিশি, আর ব্রাজিল - আর্জেন্টিনারর জয়ে রাত ৩ টেয় একটু হালকা ঢুকুঢুকু, আরে নাহ না, চুল্লু নয়, ফরেন...

এর পর কি, সামনে তো কোন ইস্যুঈ নেই.....


..................চলবে

শুক্রবার, ১৩ জুন, ২০১৪

রিপোর্টার উন্মাদ- ৭

আমার নিজস্ব সংবাদদাতার খবর অনুযায়ী বিশ্লেষণ



রিপোর্টারঃ হবু (মাতাল) সেখ।

পরমবীর চক্র হিন্দুহৃদয় সম্রাট রাজাধিরাজ শ্রী শ্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদীর থেকে, নাকি মুসলিম দরদী নাকি দেশে আর নেই। জয় নুরু বাবা কি।
আরে নুরুবাবা পার করেগা।
দাঙ্গা হাঙ্গামা, বাতেলা আতেলা, যেখানে ঠেকে যাইবে, আমাকে স্মরন করিও, ঝাড়িবাজি আপনে আপই এসে যাবে।
আরে নুরুবাবা পার করেগা।
(এটা মাল খেয়ে, লাল চোখে রিপোর্টিং)
দেখ ভায়া, কুরবানির ঠিক আগে, গোমাতা গোমাতা করে যদি এই হুজুক টা না তুলতো, এতো কি লুকোচুরি হতো? গরু জবাই নিয়ে।
লুকিয়ে চুরিয়ে জবাই করতে গিয়ে বিক্রিবাটা কমে গেলো, এমনিতেই ৪-৫ টা রাজ্যে গোমাংস বিক্রি বন্ধ। অতিরিক্ত গরু কোথায় যাবে?? সব মাল কমদামে ঝেরে দিলো। আরে ৩০ হাজারের গরু ১৬ হাজারে কিনেছি। বিক্রি করতেই হবে উপাই নাই। কারন বাংলাদেশ ও বন্ধ।
নরেন খান। আসলি পায়গম্বর।
(এটা সাদা চোখে, তবে বাবা খেয়েছিলো কিনা গ্যারান্টি দিতে পারবো না)
ভেবে দেখলাম, সত্যিই তো, শেষ নবী এসে গেছে তাই, সাক্ষাৎ পয়গম্বর ই বটে। আরব যাচ্ছে। মন্দিরের ঈশ্যু নিয়ে ভোট করছে, কিন্তু মন্দির করছে না। গরু সস্তা করছে। আরো কতকি।
জয় নরেন্দ্র মোদি খান।

রবিবার, ৮ জুন, ২০১৪

উন্মাদ নামা ~ ১৩


রসরঙ্গ : একটি ঋণগ্রস্ত জাতির সং সম্ভর্ধন


একটা ন্যাক্ক্যার জনক সামাজিক পাপ কার্য যখন সমবেত ভাবে উদযাপিত হয়, তখন তা কি শুধু আর পাপ কথাটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে??


শেষের বেশ কিছু বছর ধরেই এই অনাচার বা সামাজিক অবক্ষয় দ্রুত গতিতে বহমান। যার পুরোধায় সমাজের কতিপয় নেতৃ স্থানীয় ব্যাক্তিত্ব।


বিরক্তের মাত্রা তখন আরো চরমে উঠে, যখন দেখি, অতিথযশা বেশকিছু ব্যাক্তি, বিশেষ কাওকে  চামচান্যায় পরিবেষ্টিত করে রেখে, পরিবেশ আরো দূষিত করে তোলে। এক এক সময় মনে হয় খাঁমচে নিজের চামরাই তুলে ফেলি। পারিনা। 



কারন আমরা কাপুরুষ না হলেও বীরপুরুষ মোটেই নই যে।



ভবিষ্যতের আয়নায় এনারা নিজেদের দেখলে যে লজ্জিত হবেন, সে দু:রাশা করা অতি বড় মূর্খের ও সাহস হবেনা।

ইতিহাসের নিজস্ব একটা ঘরানা আছে। সে কালের গহ্বরে প্রতেকেই সমানভাবে স্থান দেয়। এনারাও স্থান পাবেন, আমাদের যুগের সংস্কৃতি কতটা উচ্চাঙ্গের ছিল, এই তামাসা গুলো না থাকলে, ভবিষ্যতের হয়ত সঠিক মুল্যায়ন করতে বেগ পেতে হত। 


ঘটনাচক্রে সমৃদ্ধ ভবিষ্য-ইতিহাসের জন্য মুল্য টা আমাদের দুর্বিসহ দৈনন্দিন জীবনের বিনিময়ে লব্ধ। কালের চক্রে প্রতেকেই চলনশীল ও বিলিয়মান, আজ যা সত্যি কাল তাহাই ইতিহাস।



আশা একটাই ** সুর্য মধ্যগগনে যেরকমভাবে সত্যি, সুর্য আস্ত যাবে তাহাও একই রকমভাবে সত্যিই। *



শুক্রবার, ৩০ মে, ২০১৪

সময় চর্চা ~ ১




সময় চর্চা 

প্রথম খন্ড

কদিন ধরেই মনটা বেশ খারাপ, দিন দিন সেটা আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। 




আসলে আমরা প্রতেকেই কিছু না কিছু বিষয়ের সাথে জুরে বা জরিয়ে থাকতে ভালোবাসি।


ভোট শুরু হবে শুরু হবে করে ২০ দিন কাটলো, দিন ঘোষনার উৎকন্ঠা শেষ হতে না হতেই চারিদিকেতে সাজসাজ রব, প্রচার প্রচার আর প্রচার। লাল সবুজ হলুদ গেরুয়া আরো কত রঙ। দেশপ্রেমী থেকে দেশদ্রোহী প্রতেকেই ভীষণ ভাবে ব্যাস্ত হয়ে পরল।তর্ক, তর্কের পিঠে তর্ক, আক্রমন প্রতি আক্রমন, প্রতিশ্রুতিপত্র, থেকে হিংসা।



রক্তপাতযুক্ত অথচ মৃত্যুবিহীন, সেই দিন প্রবল ভাবে উপস্থিত হল, একটা লুকানো ভয়ের পরিবেশের সাথে নিয়ে। আমরা যথারিতি সমোৎসাহে উৎযাপন করলাম, আরো একটা সরকারি ছুটির দিন, দুপুরে ভাত ঘুম, টিভি তে লাইভ ভায়োলেন্স,। কম্পলিট প্যাকেজ।


ভোটদিয়ে বাড়ি ফিরে শুরু অনন্ত প্রতিক্ষা, আবকি বার কে??? বাম না রাম?? দিদি না দাদা?? ইত্যাদি ইত্যাদি। এর ঈ মাঝে ভোর থেকে শেষ রাত পর্যন্ত ফেসবুক টুইটার ব্লগ ইত্যাদিতে বিপ্লবের বমনক্রিয়া। ঘামাচির ন্যায় পোষ্ট বপন, ভার্চুয়াল জীবনের অন্যতম শর্ত, " লাইক " বোতামে ধাক্কা। ফি সন্ধ্যে বৈদুতিন মাধ্যমে পরচর্চা পরনিন্দার চর্বিত চর্বণ, ঢকঢক করে গিলেছি। এর মাঝে বড় কোন হিন্দি সিনেমা রিলিজ নেই। সুতরাং চাপ কম।

বেশ ছিলাম,

তার আরো কারন আছে।

আই পি এল -৭


...............চলবে

শুক্রবার, ২৩ মে, ২০১৪

আধুনিক পোষ্টমাস্টার ~ ৩


কবিপক্ষের অবসান হইয়াছে, উন্মাদীয় সাহিত্যচর্চার প্রত্যক্ষ পক্ষাঘাতের জন্য সুধী মাননীয়/মাননীয়া গন আপনারা হারেহারে জর্জরিত??? সামান্য প্রহসনের আশ্রয়ে , গুরুদেবের পোষ্টমাস্টারের চরিত্রটি আগেই মন্দ হইয়াছে, উন্মাদের পাল্লায় পড়িয়া...

আধুনিক পোষ্টমাস্টার 

রোগসেবা হইতে নিষ্কৃতি পাইয়া রতন দ্বারের বাহিরে আবার তাহার স্বস্থান অধিকার করিল। কিন্তু পূর্ববৎ আর তাহাকে ডাক পড়ে না; মাঝে মাঝে উঁকি মারিয়া দেখে, পোস্টমাস্টার অত্যন্ত অন্যমনস্কভাবে চৌকিতে বসিয়া অথবা খাটিয়ায় চিৎ হইয়া শুইয়া আছেন। এযাবৎ এক টানা বেশ কিছু দিন সেবা করিয়া রতনের মনের কোণেও যেন একটি গোপন অভিসারের জন্ম হইয়াছিলো। রতন চঞ্চলা, প্রগলভ, অস্থির চিত্ত, চপলমতি, নিত্যগতীশিল মননের অধিকারিণী সন্দেহ নাই, কিন্তু তাহারও বক্ষের বামপার্শে মর্ম বলিয়া একটি মাংস পিন্ড বর্তমান, যাহা কাম ব্যাতিরেকেও অন্য কিছুর সন্ধান দেয়, প্রনয়ের অনুরাগ তার হৃদেও দোলা দিয়ে যায়।

রতন যখন দ্বারের বাহিরে আহ্বান প্রত্যাশা করিয়া বসিয়া আছে, তিনি তখন অধীরচিত্তে তাঁহার তরঙ্গায়িত দরখাস্তের উত্তর প্রতীক্ষা করিতেছেন। যুবতী কন্যা দ্বারের অভ্যন্তরে আসিয়া পরিগনক যন্ত্র টিকে চালু করিয়া, খটাং খটাং স্তনন সহকারে, পরিগনকের নিজস্ব বাকপ্রণালি সমূহ, বহুবার পরিমার্জন করার হেতু পোষ্ট মাষ্টারের দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করিল। পোষ্টমাষ্টার এর হৃদয়ের স্মৃতিপটে নিজের একটি প্রশংসনীয় উৎকর্ষিসম্পন্ন চিত্র অঙ্কনের জন্য, পাছে যেদিন সহসা ডাক পড়িবে সেদিন তাহার অবিন্যস্ত বর্নসজ্জা ও পরিগনকের বাকেরা নির্বাক না হইয়া যায়। তাহার মধ্যে কি নারীস্বত্তার বিকাশ পূর্ন মাত্রায় ঘটে নাই!! সে কি সত্যিই কুৎসিত তথা কি চরিত্রের অধিকারিণী? তাহার মধ্যে কি কমনীয়তা নেই? তাহা হইলে যে সকল দয়িতের দল তাহার পিছনে, মুষ্ঠি যন্ত্রে, ঈশারায় পঙ্গপালের ন্যায় ক্রমাগত ধাওয়া করে চলেছে, তাহারা কি ধর্ষকামি মনের অধিকারী সকলে? না হলে এই বাবু টি কেন তাহাকে এতো কাছে পাইয়া ও এই রুপে নির্লিপ্ত থাকিতে পারে? ইহাতে রতনের মনে প্রবল শঙ্কার উদ্রেগ হইলো।

অবশেষে সপ্তাহখানেক পরে একদিন সন্ধ্যাবেলায় ডাক পড়িল। উদ্‌‌বেলিতহৃদয়ে রতন গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়া বলিল, “দাদাবাবু, আমাকে ডাকছিলে? ”


পোস্টমাস্টার বলিলেন, “রতন, কালই আমি যাচ্ছি।”
রতন। কোথায় যাচ্ছ, দাদাবাবু।
পোস্টমাস্টার। বাড়ি যাচ্ছি।
রতন। আবার কবে আসবে।
পোস্টমাস্টার। আর আসব না।


রতন আর কোনো কথা জিজ্ঞাসা করিল না। পোস্টমাস্টার আপনিই তাহাকে বলিলেন, তিনি বদলির জন্য দরখাস্ত করিয়াছিলেন, নবান্ন তাহা নামঞ্জুর করিয়াছে; তাই তিনি কাজে জবাব দিয়া বাড়ি যাইতেছেন। অনেকক্ষণ আর কেহ কোনো কথা কহিল না। মিটমিট করিয়া জ্বলিত থাকা নিবিড় প্রতিপ্রভ বাতিটিও যেন রতন কে দ্বগ্ধ করিতে লাগিল এবং খোলা বাতায়ন দিয়ে দূরে কোথাও কোন এক রাজনৈতিক দলের সভাস্থল হইতে রোজ সন্ধ্যার মত উচ্চস্বরের প্রলাপ ভিন্ন নিশুতি যেন গ্রাস করিয়াছিলো।

কেননা এই সিঙ্গুর গ্রামটিতে কেবিল মাত্র পড়িয়া থাকিবার জন্য অনেক কিছুই আছে, ১০০০ বিঘা জমি সহ তাহার সুদীর্ঘ প্রাচীর। টাটা গোষ্ঠীর চতর্চক্রজানের কারখানার অবশিষ্ট কঙ্কাল সহ অনেক কিছু। পোষ্টমাস্টারের জীবন তো পাশ দিয়ে বয়ে চলা ঐ চতুর্গলি বিশিষ্ট পাকা রাস্তার ন্যায় হতে যায়, যাঁহার অবসান বলিয়া কোন শব্দবন্ধ থকিবে না, অবিরাম অবিরত ছুটে চলাই হবে যার জীবন। এই সিঙ্গুর তাহাকে নিঃসঙ্গ অবসন্নতা ভিন্ন কিছুই দেইনি। যদিও ইহা লইয়া তাহার তেমন কোন ক্ষোভ নাই, এই সিঙ্গুর আন্দোলনের ভারে আজ ক্লান্ত, আমাত্ব আজ শিক্ষকতা ছারিয়া ধীবরে পর্যবাসিত হইয়াছে, অবরোধ অনশনের প্রহসনে ঋদ্ধ আজ ৬০০-৪০০ এর দ্বন্দ্ব ভুলে রুজির সন্ধানে দিশেহারা।

ইহার কাছে তাই কোন কিছুর প্রত্যাশা করা নিতান্তই বাতুলতা, তাহা সম্বন্ধে পোস্টমাস্টার সথেষ্ট ওয়াকিবহাল। কিন্তু রতন? তাহার কাছে তো বিপুল প্রত্যাশা ছিলো, তাহার আবেগময় মনের সঙ্গিনী হিসাবে তো সে রতন কেই অঙ্কন করিয়াছিলো, তাহার মধ্যে তো কোনরূপ কুরুচিপূর্ন অমার্জিত কিছু ছিলো না, তাহা হইলে এতো নিরুত্তাপ কেন!! এই ভাবনা তাহারে ঘুণ পোকার ন্যায় কুরিয়া খাইতে লাগিল।

কিছুক্ষণ পরে রতন আস্তে আস্তে উঠিয়া রান্নঘরের হিমায়িত যন্ত্র হইতে ওবেলার বাসি ভক্ষ্যসামগ্রী গুলো উত্তাপ করনের জন্য উনুনের নিকট নিয়ে গেলো, শরীর ও অনেকটা এই রকম ই, যখন খুশি তাহাতে উত্তাপের সঞ্চারণ ঘটানো যায়, কিন্তু মন?? একটি দ্বীর্ঘশ্বাস ভিন্ন আর কোন আওয়াজ ই শোনা যাইলো না। অন্যদিনের মতো তেমন চট্পট্ হইল না। বোধ করি মধ্যে মধ্যে মাথায় আরো অনেক ভাবনা উদয় হইয়াছিল। পোস্টমাস্টারের আহার সমাপ্ত হইলে পর যুবতী তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “দাদাবাবু, আমাকে তোমাদের বাড়ি নিয়ে যাবে?”

এই প্রশ্ন শুনিয়া পোস্টমাস্টারের তাহার মনের কোনে দলা পাকিয়ে থাকা অপূর্নতার বাষ্প যেন শ্বাস নালি অবরুদ্ধ করিবার উদ্যম করিতেছিলো। পোস্টমাস্টার তাচ্ছিল্যের হাসি, হাসিয়া কহিলেন, “সে কী করে হবে।” ব্যাপারটা যে কী কী কারণে অসম্ভব তাহা আর বুঝানো আবশ্যক বোধ করিলেন না। 


সমস্ত রাত্রি স্বপ্নে এবং জাগরণে যুবতীর কানে পোস্টমাস্টারের তাচ্ছিল্যভরা হাস্যধ্বনির কন্ঠস্বর বাজিতে লাগিল— ‘সে কী করে হবে’। জীবনে সে ও বহু সংগ্রামের সাক্ষী, জয় পরাজয়ের নানা লেখচিত্রে ভরা তার জীবন। কি আজিকের মত এত যন্ত্রনা বোধ হয় আগে কখনো সে অনুভব করেনি।


ভোরে উঠিয়া পোস্টমাস্টার দেখিলেন, তাঁহার স্নানের জল ঠিক আছে; কলিকাতার অভ্যাস-অনুসারে তিনি গগনচন্দ্রাতপে অবস্তিত আধারের জলে স্নান করিতেন। এই স্থানে সেই সুবিধা নাই, তাই তোলা জলেই প্রত্যত স্নানাকার্য সম্পন্ন করিত। কিন্তু কখন তিনি যাত্রা করিবেন সে কথা ওই যুবতী কী এক অজানা কারণে জিজ্ঞাসা করিতে পারে নাই; পাছে প্রাতঃকালে জলের আবশ্যক হয় এইজন্য রতন তত রাত্রেই সে পার্শবর্তী নলকূপ হইতে তাঁহার স্নানের জল তুলিয়া আনিয়াছিল। স্নান সমাপন হইলে রতনের ডাক পড়িল। 

রতন নিঃশব্দে গৃহে প্রবেশ করিল এবং আদেশপ্রতীক্ষায় একবার নীরবে প্রভুর মুখের দিকে চাহিল। কহিল দাদাবাবু আপনার মুষ্ঠিবার্তালাপ যন্ত্রের চিহ্নিতকরণ অঙ্ক টি কহিবেন? আমি আপনার জন্য অন্তর্জাল হইতে আপনার যাত্রাপথের রেল অংশের নিদর্শন পত্র টি সংগ্রহ করিতে সক্ষম হইয়াছি, আপনার শিক্ষায় শিক্ষিত হইয়া, এখন যদি আজ্ঞা করিয়া আপনি আমার নিকট হইতে এই বার্তা টি আপনার যন্ত্রে প্রেরণ করিতে সক্ষম হই, তাহা হইলে আমি অত্যন্ত পরিতুষ্ট হইবো। পোস্টমাস্টার যত না বেশী আনন্দিত হইল, তাহার থেকেও অনেক বেশী বিস্মিত হইল। ইহা কি অস্ফুট প্রেমের বহিঃপ্রকাশ না কি তাহার উপস্থিতি চরম ভাবে উপেক্ষা!

পোষ্ট কহিলেন, “রতন, আমার জায়গায় যে লোকটি আসবেন তাঁকে বলে দিয়ে যাব, তিনি তোকে আমারই মতন যত্ন করবেন; আমি যাচ্ছি বলে তোকে কিছু ভাবতে হবে না। আগামিতে এস্থান মুদ্রালেনদেনের প্রতিষ্ঠান হইবে, তোর চাকুরিও পাকা হইয়া যাইবে, ভালো বেতন পাইবি ” এই কথাগুলি যে অত্যন্ত স্নেহগর্ভ এবং দয়ার্দ্র হৃদয় হইতে উত্থিত সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই, কিন্তু নারীহৃদয় কে বুঝিবে। রতন অনেকদিন প্রভুর অনেক তিরস্কার নীরবে সহ্য করিয়াছে কিন্তু এই নরম কথা সহিতে পারিল না।

একেবারে উচ্ছ্বসিত হৃদয়ে কাঁদিয়া উঠিয়া কহিল, “না না, তোমার কাউকে কিছু বলতে হবে না, আমি থাকতে চাই নে।”


পোস্টমাস্টার রতনের এরূপ ব্যবহার কখনো দেখেন নাই, তাই অবাক হইয়া রহিলেন।



ক্রমশ.....

একটি সম্পূর্ন উন্মাদীয় ভাবনার ফসল
****************************************
(নিজ দায়িত্বে পাঠ করিয়া মর্ম্নদ্ধার করিবেন, কারন ইহার বানান বিধিও উন্মাদীয়)

শুক্রবার, ১৬ মে, ২০১৪

আধুনিক পোষ্টমাস্টার ~ ১

কবিপক্ষের পূন্যলগ্ন চলিতেছে, উন্মাদীয় সাহিত্যচর্চার প্রত্যক্ষ পক্ষাঘাতের জন্য কি মাননীয়/মাননীয়া গন প্রস্তুত??? সামান্য প্রহসনের আশ্রয়ে , আজ উন্মাদের পাল্লায় পড়িয়া, গুরুদেবের অঙ্কিত কিছু চরিত্র মন্দ হইল, ...
একটি সম্পূর্ন উন্মাদীয় ভাবনার ফসল


আধুনিক পোষ্ট মাষ্টার 



প্রথম কিস্তি

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই সিঙ্গুর গ্রামে পোস্টমাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। কিছুকাল পূর্বে যদি টাটা দের বিতারিত না হইতে হইতো, তাহলে বলা যায় না, এখন আর এ গ্রাম অদৌ গ্রাম থাকিত কি না। নিকটে একটিই নতুন কৃষকমান্ডি গজাইয়াছে, তাই উন্নয়নের স্বার্থে রবিবাবুর কৃপায় ও ও উনার অনুপ্রেরনায়, বহু কষ্ট করিয়া এই পোস্টআপিস টি বন্ধের হাত থেকে রক্ষা করা গিয়াছে, সুতরাং কৃষক মান্ডির অভ্যন্তরেই আপাতত ঠিকানা।

আমাদের পোস্টমাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই শহীদের পূন্যভুমি তথা বিশ্ববাঙলা গ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্টমাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি শিলাপ্রেথিত অর্ধসমাপ্ত কৃষকমান্ডির পলেস্তারা বিহীন ঘরের মধ্যে তাঁহার দপ্তর; অদূরে একটি “পার্টি অফিস” এবং তাহার চারি ধারে বিশেষ গোত্রের পুষ্পরাজি শোভিত নিশান পতপত করিয়া অহঙ্কারের প্রামানই দিতেছে। পিছনে অবশিষ্ট স্ফটিক নির্মিত সুরা পাত্রের ধ্বংস স্তুপ। পার্টি অফিসে সে সকল ক্ষুদ্র বৃহৎ, কুচো প্রভৃতি যে-সকল নেতৃবৃন্দ আছেন, তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্তও মনে করেন না, কারন উনি এ অঞ্চলে ভোটাধিকার প্রদানের অধিকারী নন।

বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না, যেটুকু যোগাযোগ, কেবল মাত্র অন্তর্জালেই সীমাবদ্ধ, অথবা মস্তকশ্রবণ যন্ত্র কর্ণকুহরে লইয়া সংগীতের আস্বাদন। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন, মুখপুস্তকে। এখানে অন্তর্জালের “দ্বিতীয় প্রজন্মের” গতি ও অত্যান্ত মন্থর। সমস্ত দিন মুখপুস্তকে প্রজ্ঞাপনের কম্পন এবং “ভিক্টোরিয়ার গোপন দেবীদের ” দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায়— কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি সানি লিওনের মতো কোনো উষ্ণবালিকা আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই যাবতীর গোপনীয়তার সমস্ত লতাবিতানগুলা কাটিয়া চক্ষুতে রঙ্গিন কাজল পরাইয়া দেয় এবং “ও বেবি ডল ম্য সোনে দি” বলিয়া দ্বার রুদ্ধ করিয়া রাখে, তাহা হইলে এই আধমরা ভদ্রসন্তানটি পুনশ্চ নবজীবন লাভ করিতে পারে।

পোস্টমাস্টারের বেতন অতি সামান্য, পূর্বে কিছুদিন “শ্যামল নাগরিক স্বেচ্ছাসেবক” এর দ্বায়িত্ব পালন করিয়াছিলো। আজিকাল কেউ ই আর তেমন কাগজে কলমে চিঠিপত্র লেখালাখি করে না। তবুও ভবিষ্যতে আর্থনৈতিক লেনদেনের প্রতিষ্ঠান হইলে, বেতনের কিছু সুরাহা হইবে এই আশায় এই চাকুরিতে বহাল হইয়াছে।

মুষ্ঠিবার্তালাপ যন্ত্রের পূনর্জীবন, অন্তর্জালীয় মোড়ক, ধুম্রপান, দুর্গন্ধবিতারনকারক ইত্যাদি সহ, সপ্তাহয়ান্তে একবার বহুবিধ গৃহে  একা একা নৈশকালিন বিলাতী ছবি দেখার রোজগার টুকু হইলেই হইলো। দুপুরে নিজে রাঁধিয়া খাইতে হয়, সকালে ভূট্টার পরত ও রাত্রে ম্যাগি বানাইয়া খাইয়া থাকে। গ্রামের একটি পিতৃমাতৃহীন চপলা বালিকা তাহার কাজকর্ম করিয়া দেয়, আধুনিক কেতার বিলিতি গান শুনতে পাওয়ার লোভ আর, দ্বিপ্রহরে পোষ্ট মাস্টারের বাড়িতে স্টারজলসা বা জি-বাঙলা দেখিতে পাইবার সুযোগ, কোনরূপ পিছুটান ব্যাতিরেকে। মেয়েটির নাম রতন। বয়স উনিশ-কুড়ি।

বিবাহের বিশেষ সম্ভাবনা দেখা যায় না। সারাদিন কাজের ফাঁকে, অন্তত ছয় সাতটি পুরুষ মানুষের সহিত মুষ্ঠিবার্তালাপ যন্ত্রে সদা প্রেমালাপ করিতে থাকে।

সন্ধ্যার সময় যখন স্টারজলসা হইতে দিদি নাম্বার ওয়ান এর শীর্ষসঙ্গীত বাজিয়া উঠিত, পাখিকে দেখিবে বলিয়া গ্রামের সকল রমণীকুল, হেঁসেলের কর্ম দ্রুত গুছাইয়া লইতো , দূরে গ্রামের পার্টির দাদাদের দল “ডিজে-ব্যাঞ্জো” বাজাইয়া উচ্চৈঃস্বরে গান জুড়িয়া দিত— যখন ৫ ওয়াটের পিএল এর আধো অন্ধকার দাওয়ায় একলা বসিয়া কোন পূর্নযৌবনা রমনীকে, মুষ্ঠিবার্তালাপ যন্ত্রে তীব্র উষ্ণ বার্তালাপ শুনিলে কবিহৃদয়েও ঈষৎ হৃৎকম্প উপস্থিত হইত, তখন ঘরের কোণে একটি এন্ড্রোয়েড মোবাইলের স্ক্রিন জ্বালিয়া পোস্টমাস্টার ডাকিতেন 'রতন' ।

রতন দ্বারের আড়ালে বসিয়াই মুষ্ঠিবার্তালাপ যন্ত্রে প্রেমালাপ করিতে থাকিত কিন্তু এক ডাকেই ঘরে আসিত না- বলিত,
- “কী গা বাবু, কেন ডাকছ।”
পোস্টমাস্টার- তুই কী করছিস।
রতন। (দ্রুততার সাথে মুষ্ঠিবার্তালাপ যন্ত্র লুকাইতে লুকাইতে)—এখনই আপনার কফি টা বানাইতে যেতে হবে ___ হেঁশেলের—
পোস্টমাস্টার। তোর হেঁশেলের কাজ পরে হবে এখন— এক প্যাকেট বাদাম আর এক বোতল শীতল পানীয় আনিয়া দে তো।

অনতিবিলম্বে ঝোলা দোলাইয়া অতিরিক্ত একটি “কুরকুরের” থলি সহ রতনের প্রবেশ। হাত হইতে সকল বস্তু কটা লইয়া লইয়া পোস্টমাস্টার ফস্‌ করিয়া জিজ্ঞাসা করেন,
- “আচ্ছা রতন, তোর প্রেমের কথা কইতে ইচ্ছে করে না ? ”

- সে অনেক কথা; কতক মনে পড়ে, কতক মনে পড়ে না। পাড়ার ছেলেদের চেয়ে বেপাড়ার ছোকড়ারাই তাহাকে বেশি ভালোবাসিত, দুলে পাড়ার ষষ্টিকে অল্প অল্প মনে আছে। পরিশ্রম করিয়া যাহাকিছু রোজগার করিত সন্ধ্যাবেলায় আমার ঘরে আসিইয়া সকই ই দিয়া যাইতো, তাহারই মধ্যে দৈবাৎ দুটি-একটি সন্ধ্যা তাহার মনে পরিষ্কার ছবির মতো অঙ্কিত আছে। এই কথা হইতে হইতে ক্রমে রতন পোস্টমাস্টারের পায়ের কাছে মাটির উপর বসিয়া পড়িত। মনে পড়িত, তাহার একটি শিশুপ্রেম ছিল— বহু পূর্বেকার বর্ষার দিনে একদিন একটা ডোবার ধারে দুইজনে মিলিয়া গাছের ভাঙা ডালকে ছিপ করিয়া মিছামিছি মাছধরা খেলা করিয়াছিল, দু এক বার আরো অন্য কিছু প্রাপ্তবয়স্ক ক্রীড়া ও খেলিয়াছিলো— অনেক গুরুতর ঘটনার চেয়ে সেই কথাটাই তাহার মনে বেশি উদয় হইত।

এইরূপ কথাপ্রসঙ্গে মাঝে মাঝে বেশি রাত হইয়া যাইত, তখন আলস্যক্রমে পোস্টমাস্টার শুধু পানাহার করিয়াই সন্তুষ্ট থাকিত। রতন সকালের বাসী ব্যঞ্জন গুলা হিমায়ক যন্ত্রের অভ্যন্তরে ভরিয়া, নির্মেদ শরীর রক্ষার্তে সামান্য “লবন শর্করা” পান করিয়া, পুনরায় মুষ্ঠিবার্তালাপ যন্ত্রে মন নিবিষ্ট করিত। এভাবেই উভয়ের দিবারাত্রের নির্ঘন্ট চলিয়া যাইত।

.........ক্রমশ

****************************************
(নিজ দায়িত্বে পাঠ করিয়া মর্ম্নদ্ধার করিবেন, কারন ইহার বানান বিধিও উন্মাদীয়)
####################################################

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...