আমাদের জীবনকে ভাগ করলে দেখা যাবে, সবচেয়ে মধুর সময় কেটেছিল ইইস্কুল জীবনটাই। এটা প্রায় সকলেই একবাক্যে
স্বীকার করবেন। কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষণ আসলে মানব
জীবনের সাতকাহন মানে ‘অপরিমাপযোগ্য’ একটা কাল, যাকে অঙ্কের হিসাবে
ধরা যায়না।
তখন না ছিলো কোন পিছুটান, না ছিলো কোন টেনশন নামক মহামারী। খাওয়া পরার চিন্তা
মুক্ত। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা কোনকিছুই আলাদা করে মনে রাখার দায় থাকতনা। শত্রুতা মনে রাখার দায় ছিলোনা। একটা মুচকি
হাসিতেই বিনা কারনে বন্ধুত্ব গড়ে উঠত। রাজনীতি আর ধর্মের
কূটকচালির পাঁকে নিমজ্জিত ভাবনারা তখনও জন্ম নেয়নি।
সামাজিক ভালমন্দের কোনো দায়ভার
নিতে হতনা। কঠিন ভুল করে ফেললেও একবার ভ্যা... করে
কেঁদে ফেল্লেই সব মাফ। জুতোটা পালিশ আছে কিনা, জামা ইস্তিরি করা আছে কিনা, আয়নাতে কেমন দেখতে লাগছে, চুলের জন্য ছোট চিরুনি, ডিওড্রিন্টের সুগন্ধ রয়েছে কিনা, পকেটে রুমাল, সানস্ক্রিন বা কোল্ড ক্রিম মাখা হয়েছে কিনা- ইত্যাদির মত সকল মামলার উর্ধ্বে থাকার সময়কাল সেটা। পকেটে একটা টাকা থাকলে, সেই দিনের জন্য আমিই
রাজা। বড় সুখের ছিল সে সময়।
হৃদয়ে যৌবনের রঙ লাগে, না কি হৃদয়ের রঙই যৌবনকে রাঙায়!
যেটাই হোক, বয়ঃসন্ধির পরে তখন খুব একা লাগত, চারপাসে কত আত্মীয়স্বজন, তাও যেন কেমন
ফিকে হয়ে গিয়েছিল জীবনটা। ইইস্কুল, টিউশনি, খেলার মাঠ, হ্যারিকেনের আলোতে পড়তে বসে ঢুলুনি, আর সাথে সাথে পৌঁছে যাওয়া এক কল্পলোকে। কোন এক নাম না জানা স্বপ্নচরী
মুখের উপর এক অদৃশ্য মায়াভরা আলতো পরশ ছুঁইয়ে দিত, বড় সুখ ছিলো
সেই স্বপ্নে। চেষ্টা করতাম তাকে ছোঁয়ার, অস্থির ভাবে হাত বাড়াতাম। মিলিয়ে যেত স্বপ্নের মধ্যেই। “ওঠ ভাত খেয়ে নে”–
মায়ের ডাকে তন্দ্রা কাটত, মনে রয়ে যেত
সেই স্বপ্নের আবেশ। পরদিন ইস্কুলে, খেলার মাঠে, টিউশনিতে, পথে চলতে চলতে অবচেতনে সারাক্ষণ মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেত সেই ছায়াবৃত
স্বপ্নটা।
জানতামনা সেটাকেই প্রেম বলে
কিনা, আজও বুঝিনি। প্রেমিক হবার একটা মন
ছাড়া কিছুই থাকেনা ওই বয়সের প্রায় সব পুরুষের। মজা হচ্ছে এই সত্যটা আজ উপলব্ধি করলেও, সেদিন এটুকুও বোধও ছিলোনা। একসাথে বড় হওয়া প্রতিবেশী, খেলার সাথী
বান্ধবীদের কাছে গেলে তারা কেমন একটা দুরত্ব মাপা শুরু করেছিলো। আমিও অজানা কারনে সেই দুরত্বটাকে একটা
কৌতুহলী সম্মান করতাম, অবচেতন মন চাইত
তাদের সাথে মন খুলে গল্প করি, কিন্তু বাহ্যিক সামাজিক আচার বাঁধা দিতো।
ইইস্কুলে, টিউশনিতে সহপাঠিনীদের
হঠাৎ করেই অধিকাংশ ছেলে বন্ধুদের
থেকে আলাদা বলে মনে হতে লাগল। এটা আরো মারাত্বক আকার নিল, যখন ক্লাস নাইনে উঠলাম। মেয়েরা গাঢ় সবুজ পাড়ের শাড়ি পরে আসত, বামদিকের সারির বেঞ্চ তাদের জন্য নির্দিষ্ট হলো। আমাদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া তখনও কেউ ফুলপ্যান্ট টুকু পরতনা। মাস চারেক যেতে
না যেতে,
এক অদ্ভুত স্ব-অভিযোজনের
দরুন, এক আধজন ছাড়া সকলেই ফুলপ্যান্টের অনুবর্তিতায় সহগমন করল।
নরোত্তম, যে বর্তমানে
আমাদের ইস্কুলেই শিক্ষক পদে চাকুরীরত। আমাদের
মাঝে তারই মত মুষ্টিমেয় হাতেগোনা
ছেলের বলার মত দাড়ি গোঁফ ছিলো, আমাদের গ্রুপের ৮-১০ জনের কাররই নুন্যতম গোঁফের রেখাটুকু উঠেনি। আমার আবার এক কাঠি বাড়া ছিল, মাথায় বাবুই পাখির বাসার মত এক ঝাঁকা কোঁকড়া চুল বাদে বাকি গোটা শরীরটা ছিলো লোমহীন, এমনিকি ভ্রু’তেও তেমন লোম ছিলনা। ক্লাস এইটে আমার ওজন ছিল সাতাশ
কেজি। খুসখুসে চামড়ার নিকষ কালো রঙ। লম্বা ডিমের মত
থুতনির হাড় বের করা মুখ। দুর্ভিক্ষের কবলে পরা- মধ্য আফ্রিকার মানুষের মত পাঁজর বের করা
শরীরের সাথে, রিকেট রোগীর মত মানানসই চারপিস হাতপা। আমাজনের জঙ্গলে ছেড়ে দিলে কোন একটা জংলীর দল- স্বজাতী বলে ঠিক নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নিত। তার
উপরে সম্বৎসর কাল রোগে ভোগার দরুন, হাতে পায়ে, মাজায়, গলায় মিলিয়ে কেজি খানিক মাদুলি, তাবিজ, কবজ, শিকড়বাকরের কোন অভাব ছিলোনা। এককথায় কিম্ভূতকিমাকার দু’পেয়ে জন্তু।
এই বিশেষ প্রজাতির দেহ বৈশিষ্টের দরুন, একটা নেতীবাচক দৃঢ় প্রত্যয় সবসময় কাজ করত, ফলত মনের ভিতর কখনই প্রেমের পাখি স্থায়ী বাসা বাঁধতে পারেনি।
অন্যকে দেখে ভাবনা এলেও, জন্ডিস, আমাশা আর ম্যালেরিয়া ভোগা জীবনে সে আত্মবিশ্বাস কখনই
বাড়তে পারেনি। তবে গাছে চড়া, সাইকেল চালানো, দৌড়ে পগার পাড়, বা গঙ্গাতে সাঁতার কাটতে আমার জুড়ি মেলা ভার ছিল। একই জীবদ্দশাতে আন্ডার
ওয়েটে ও ওভার ওয়েটের সুফল ও কুফল খুব কম মানুষই
পেয়েছেন। আক্ষরিক অর্থেই ঝড়ের সময় মা আশঙ্কায় থাকতেন যে, সামান্য
বেগের বাতাসেও আমি উড়ে যেতে পারি। এমনই কেটেছে আমার কৈশোরবেলা।
পাঠ্য পুস্তকের চেয়ে
দৈনিক খবরের কাগজ, বিশেষ করে খেলার পাতা, মাসিক ও পাক্ষিক পত্র পত্রিকা এসবের আমদানি
ছিলো বাবার সৌজন্যে। বাড়িতে দুই অববাহিত কলেজ পড়ুয়া পিসি থাকার কারনে, নানান ধরণের
গল্প, কবিতা আর উপন্যাসের বই এর কোনো ঘাটতি ছিলোনা। সামান্যতম ছুতো পেলেই, লুকিয়ে পড়ে
নিতাম ‘নিষিদ্ধ’ বই গুলো। ক্লাস এইটে উঠতে স্থানীয় কালীতলা পাঠাগারের সদস্য হয়ে যায়।
সেই বয়সে ইতিহাস ভূগোলের প্রতি তীব্র অসূয়া ও জিঘাংসা ছিলো,
অথচ আজ মধ্যবয়সে এসে সেই ইতিহাসের প্রেমেই হাবুডুবু খাচ্ছি। আবার
ফিরি ইইস্কুলের ঘটনায়।
ক্রমেই বুঝলাম, আমাদের মধ্যে
কিছু তো একটা পরিবর্তন ঘটছে। আজকালকার অতি আধুনিক বাচ্চাদের মত আমরা মোটেই পরিণত
বুদ্ধির ছিলামনা। আমি একা নই, আমাদের তৎকালীন বন্ধুচক্রের প্রায় সকলের একই দশা। পাঁচজন তাদের বাৎসরিক রেজাল্টের গুণে, রোল নাম্বার ৬০ এর ওপাড়ে হলেও আমাদের বাকি পাঁচ জন
প্রথম ১০ এর মধ্যেই ছিলাম। বন্ধুত্বের পথে রোলনাম্বার
কখনই অন্তরায় ছিলনা। প্রথম হত গৌরাঙ্গ, বর্তমানে নবদ্বীপ স্টেট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার, স্বভাবতই ও ছিল আমাদের সকলেরই জাতশত্রু।
সিক্স থেকে নাইনের চারটি বছর, কত বাবা মা যে নিজের সন্তানকে গৌরাঙ্গ বানানোর স্বপ্ন দেখত তার ইয়াত্তা
নেই। আমাদের, বিশেষ করে আমার বাবা মার
কাছে কিছু চাইলেই একটাই কথা, আগে গৌরাঙ্গের মত রেজাল্ট কর, তারপরে ভাবব। ওনাদের ভাবনাগুলো আমার পক্ষে যাবে না বিপক্ষে যাবে, এই সিদ্ধান্ত না নিতে পারার দরুন, পরবর্তীতে কখনই গৌরাঙ্গের মত রেজাল্ট করা হয়নি, আমাদের কারোরই।
এই বয়ঃসন্ধীকালেই প্রেমের
ভাইরাস আমাদের আক্রান্ত করে। অথচ টেকনিক্যালি এটা প্রেমের জন্য আদর্শ বয়সই নয়। সামনের
মানুষটার কাছে বসে গল্প করার জন্য তেমন কোনো স্টকই থাকেনা। শুধুমাত্র অনুভূতির ডিঙিতে ভেসে অজানার পথে পাড়ি দিই, যে
পথের প্রায় সবটাই বেদনার। সেই বয়সে প্রেমে
পরে আমরা কেউই নিজেদের গল্প করিনা, সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত একটা গ্রামীণ বা মফঃস্বলের ছেলে বা মেয়ে ঠিকঠাক রবীন্দ্রনাথ, শক্তি, সুনীলই
বলতে পারেনা; সেখানে বুকোস্কি, কাফকা, নেরুদা, সেক্সপিয়ার, কীটস,
কোহেন, বব ডিলান বা
রবার্ট ফ্রস্টেকে কীভাবে জানবে!
রাজনীতির বানান টুকুও
সেই বয়সের সিলেবাসে থাকেনা। দীর্ঘ আলাপটা জমবে কী দিয়ে! কাব্য,
উপন্যাসের কোটেশনের মত, মন চুরির সবচেয়ে বড় অস্ত্রই তূণীরে থাকেনা ওই বয়সে।
বরং বিশেষনের স্টকের ঘাটতি আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতো। ছেলেরা যেটা জানে সেটা হলো ক্রিকেট
বা ফুটবল বিষয়ে, অনেকটা গভীর সেই জ্ঞান মেয়েদের ইমপ্রেস করার জন্য কোনো কাজে আসেনা,
৯৯% বাঙ্গালী মেয়ে আজ IPL এর জামানাতেও স্পোর্টস সম্বন্ধে প্রায় কিছুই খোঁজ রাখেনা।
স্বভাবতই, কবি, লেখক, নির্দিষ্ট কোনো বই, ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতিহীন ওই বয়সের প্রেমে- ২ মিনিট পরেই কথা ফুরিয়ে যেত।
উর্দুতে একটা শের রয়েছে, “তোপ সে বারুদ নিকালনা
হর সিপাহিকা বসকা বাত নেহি।” আমি ছিলাম সেই না পারা সৈনিকের দলে।
বাসু, নিমাই, সুবীর উপরোল্লেখিত তিনজনই ক্লাস নাইনের হাফ ইয়ার্লির
আগেই বাকি পরিচিত অপরিচিত মেয়েদের সাথে দারুন সখ্যতা গড়ে তুলেছিল। অপরিচিত মেয়ে মানে, পাশেই দুটো গার্লস ইস্কুলে ক্লাস এইট অবধি ছিল, নাইনে পৌঁছে আমাদের ইইস্কুলেই একসাথে ক্লাস হত। ওদের মধ্যে বাসু ছিলো আদর্শ ভাই মার্কা রোগা পাতলা চেহারার। ভাইদ্বিতীয়া, রাখির দিনে সবাই দারুন শঙ্কাতে ইইস্কুলে অনুপস্থিত থাকলেও বাসু ছিল
বিন্দাস। নিমাই, বাসুর সাথে সাথেই থাকত। লম্বা কালো
প্যাকাটি মার্কা সজনে ডাঁটার মত চেহারা। চোখগুলো কোটরে
ঢোকা, উষ্কখুষ্ক চুল। নিন্মবিত্ত চাষী
পরিবারের সন্তান। মাঝখান থেকে ও কীভাবে যেন
ক্লাসের অন্যতম অতিসুন্দরী দীর্ঘাঙ্গী টুকটুকে সোমার সাথে ঘনিষ্ট হয়ে গেল। মানে টিফিনের সময়
তারা দুজনে বকুলতলায় গিয়ে বসে, সোমার আনা টিফিন নিমাই লজ্জা লজ্জা মুখ করে খেতো। সোমার পরিবার পুর্ববঙ্গের বসাক, লাল ইইইস্কুলের মেয়ে। পৈতৃক তাঁত কাপড়ের ব্যাবসা, হাতখরচের জন্য যথেষ্ট টাকা থাকত সাথে।
আমরা হা’ঘরে হা’ভাতের দল। প্রেমের জীবানুতে আক্রান্ত না হওয়ার দরুন, পড়াশোনাটা কিছুটা মন দিয়েই করতাম। বাড়ি থেকে হাতখরচা বাবদ কিছুই
বরাদ্দ ছিলোনা, দাদুর কাছে চেয়ে চিন্তে, মায়ের সাথে লড়াই
করে ছিনিয়ে আর বাবার ক্যাশবাক্স থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে যৎসামান্য জুটিয়ে নিতে
হতো।
বিড়ি কেনা আর খেলার সরঞ্জামের চাঁদার যোগান দিতেই সেটা অপ্রতুল ছিলো। সারাদিন উদ্দেশ্যহীন ভাবে সাইকেল চালাতাম, সাঁতার কাটতাম,
অকারনে ছোটাছুটি করতাম, ক্রিকেট, ফুটবল, ক্যারাম, নিদেনপক্ষে বর্ষায় লুডো, দাবা এমনকি তাস খেলাও
শিখেছিলাম। এহেনবস্তায় নিমাই এর কাজকর্ম
দেখে, শুধুমাত্র ঈর্ষা জনিত কারনেই, ও আমাদের ঘোষিত ও প্রকাশ্য শত্রু রূপে চিহ্নিত হল।
ইতমধ্যে বাসু ভাই সেজে গোপিনীকুলের মাঝে লীলা করতে করতে, অন্য কিছুর ফুরসৎ পেতোনা। অচিরেই
আমাদের দল থেকে প্রায় বিতারিতের দলে সে
নাম লিখিয়ে নিলো। সুবীর, বৈশাখি
নামের এক মাসীমা সদৃশ্য মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া শুরু করেছিলো। বৈশাখী আমাদের থেকে নাহলেও প্রায় বছর পাঁচ-সাতের
বড়। ভারী মহিলা সুলভ পরিনত
চেহারা, বুদ্ধিতেও পরিপক্ক। সুতরাং চোদ্দ
পনেরোর সুবীরকে কেন সে পাত্তা দেবে? এদিকে নাছোড়বান্দা সুবীর রোজ চিঠি লিখে চলে বৈশাখীকে। টিফিনে নারাণের দোকানের আলুকাবলি, কামরাঙ্গা, বিলাতি
আমড়া মাখা, তেঁতুলের আচার এনে খাওয়ার জন্য সাধে। বৈশাখী নট
নরনচরন, বরং হুমকি দেয় হেডস্যারকে বলে দেবার। কিন্তু কোনো এক
অজানা কারনে শেষ অবধি কোনদিনিই স্যারদের কানে সেকথা তোলেনি বৈশাখী। অগত্যা, সুবীরকেও আমরা
জেনেবুঝেই ত্যাগ করলাম।
গৌরাঙ্গ নির্বিকার চিত্ত, ওর এসব
কিছুতেই কোন হোলদোল ছিলনা। পুজো আসতে আসতে বাকি ছেলেরাও
কোন না কোন মেয়ের সাথেই সখ্য স্থাপন করেই নিল। রয়ে গেলাম
আমরা হতভাগা জনা ছয়েক। এতে করে ফ্রাস্টু খেয়ে আমাদের দৌরাত্বপনা মারাত্বক হারে
বেড়ে গেল। আমরা সব জুটিদের সামনে “দেখ কত ভাল আছি” গোছের
দেখাতে দেদার খরচ করতে লাগলাম, হাতখরচার জন্য বরাদ্দ টাকা
ওখানেই শেষ। সুতরাং খেলার ব্যাট বল, ফেদার র্যাকেট বা ফুটবল কেনার
জন্য অগত্যা সঙ্গদোষে চুরি বিদ্যাতে হাত পাকালাম।
চোর হলেও অত্যন্ত বিনয়ী আর ভাবাদর্শ মেনে চলা ছিঁচকেতে রুপান্তরিত হলাম। সন্ধ্যায় ইইস্কুলের নেপালী বাহাদুর, অন্যান্য দেশওয়ালি ভাইদের সাথে বাজারের কোল্ডস্টোরের আড্ডাখানায় গেলে, আমরা সরাসরি খেলার মাঠ থেকে ইস্কুলবাড়ির ছাদের গা পাইপ আর কার্নিশ ধরে সোজা চারতলার
বিল্ডিংএ উঠে যেতাম। তখন সবে
নতুন ক্লাস রুম সাজানো হয়েছিল চারতলাতে। ওখানে নিয়মিত ক্লাস হতোনা, বড় ক্লাসের ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি
আর গণিতের ক্লাসগুলো হত ৫-৭ জন ছাত্র নিয়ে। অতো উঁচুতে জানালা
দরজার বাহুল্য ছিলোনা, শুধু
চেয়ার আর বেঞ্চি। গোটা দুয়েক বেঞ্চ সমবেত ভাবে ধরাধরি করে, উপর থেকে সোজা মাটিতে ফেলে দেওয়া
শুধু। অতটা উঁচু থেকে পরতে পরতেই- বেঞ্চ উনুনে জ্বালানোর জন্য এক্কেবারে উপযুক্ত হয়ে যেত। এবার সেগুলোকে জড়ো করে সাইকেলের
ক্যারিয়ারে বেঁধে সোজা ময়রার দোকানে কিলো দরে বেচে দেওয়া। তাতে গোটা চারেক
ক্যাম্বিস বলের দাম উঠে যেত, মানে দু হপ্তার দায়ে নিশ্চিত।
আমরা প্রতিবেশীদের কাছে
এখনকার ভাষায় ‘তোলা’ তুলতেও
গেছিলাম। গ্রামের ছেলে, খেলার সরঞ্জামের
জন্য মাসিক সর্বোচ্চ ৫ টাকা চাঁদা ধার্য্য করেছিলাম। বলাই বাহুল্য, এক দুজন ছারা প্রত্যেকেই চাঁদার বদলে আমাদের বাড়িতে নালিশ করেছিলেন। সুতরাং, আমাকে গোয়ালে বেঁধে গনপিটুনির আয়োজন করেছিল
মা। আমার সাথীদেরও ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে একই দশার শিকার
হতে হয়। মনের মাঝে জ্বলে উঠে প্রতিশোধের স্পৃহা। সুতরাং সেই সকল কালপ্রিট
প্রতিবেশীদের সবক শেখানোটা অবশ্য কর্তব্যে দাঁড়িয়ে যায়।
সাথী হিসাবে আরো কয়েকজন পাড়ার ছোকরাকে পেতে কষ্ট হয়নি,
শুরু হয় নতুন ধরনের এক দুঃসাহসিক অভিযান।
ফি সপ্তাহে বুধ আর শনিবার
নির্দিষ্ট টার্গেটের বাড়িতে পৌঁছে, সেই বাড়ির গাছের নারকেল, কলা, সজনে ডাঁটা, কাঁঠাল হোক বা ইঁচড় কিম্বা আমগাছ- ফলন্ত যেকোনো গাছের যাবতীয় সমস্ত ফল পেরে পরদিন ভোর ভোর বেপাড়ার ফড়ের কাছে বেচে দিতাম। সেখানে থেকে প্রাপ্ত অর্থ থেকে, বাড়িতে বলার দরুন তিনগুন ক্ষতিপূরন সহ ধার্য্যকৃত চাঁদা, আমাদের ৯ জনের মজুরী বাবদ ২ প্যাকেট সিগারেটের দাম, চুরিকৃত পণ্য বাজারে ডেলিভারি দিতে যাওয়ার ভ্যানভাড়া বাবদ ফিক্সড ১০ টাকা কেটে নিয়ে যদি কিছু বেঁচে
থাকত, সেই অবশিষ্ট টাকা সন্ধ্যার
আশেপাশে উপরোক্ত বাড়ির জানালা/দরজার
ফাঁক দিয়ে গলিয়ে ফেলে দিতাম। আমি বরাবরই সমষ্টিকে
ব্যাক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে স্থান দিয়েছি, স্বভাবতই শুরুটা আমাদের ৯ জনের বাড়ির গাছ দিয়েই হাত পাকানো হয়েছিল। ফলপাকুর না পেলে, মাচার পাটকাঠি, পালার খড়, এমনকি কয়েকবার মোরগ এমনকি নধর পাঁঠাও বেচে দিয়েছিলাম গোহাটে।
তবে আমরা আদর্শ নিয়ে চলা মানুষ, সুতরাং মজুরি হিসাবে ধার্য্য সামান্য সিগারেটের পয়সার
বাইরে সেই অর্থে- আমরা কেউ ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটায়নি। পাড়ার সকলেই জানত এগুলো কাদের কান্ড, কিন্তু প্রায় সব বাড়িরই ছেলে আমাদের সাথে খেলত বলে
কোনদিনিই ধরা পরিনি বা আমাদের কেউ ধরতে চায়নি। তবে বেশ কয়েকবার তাড়া খেয়ে চম্পট দিতে হয়েছিল। একবার আমি একটা দু’তলা বাড়ি সমান উঁচু
নারকেল গাছে ডাব পারতে উঠেছি, আর সেই গাছে ছিল পেঁচা। পেঁচার ডানা ঝাঁপটানিতে বাড়ির নেড়িটা বেদম ক্যাও ক্যাও জুড়ে দিল।
নিচে যারা ছিল, তারা পাশের পানা
পুকুরের নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপন করে প্রাণ বাঁচালো, অগত্যা আমি সড়াৎ করে নামতে গিয়ে, বুকের আর দু বাহুর সমস্ত ছাল বাকল নারকেল গাছেই ছেড়ে রেখে এলাম। সে রাত্রে বাড়ি ফিরে আর কৈফিয়ত দেওয়া যায়না, উপরন্তু বাবা ফিরলে
ঠ্যাঙানি হবে, ভয়েই অস্থির।
বাবা আসার আগে জ্বর চলে এলো তেড়েফুঁড়ে, সে যাত্রায় মানে মানে রক্ষে পাওয়া গিয়েছিল। পাক্কা দু সপ্তাহ রোগভোগের পর ঘা’য়ে মামরি পরা বুক ফিরে পেতেই আবার মুক্তির নেশা পেয়ে
বসল। সেই আমার জীবনের শেষ চুরি, আর শেষ গাছে চড়া। অবশ্য এর পর মন চুরিতে মননিবেশ
করেছিলাম।
সেই ঘটনার মাস দেড়েক পর এলাকাতে বিদ্যুৎ আসে, ফলত
ক্রমশ আমাদের নৈশ অভিযানের পরিসমাপ্তি
ঘটে। ব্যাক টু আবার ইস্কুল। এবার আর বেঞ্চ নয়, এবার বাল্ব। একটা ৬০ ওয়াটের বাল্ব খুলে বেচলে দু’টাকা পাওয়া যেত, যদিও নতুনের দাম পাঁচ টাকা। গোটা দশেক বাল্ব বেচলেই তিন’হপ্তার কাজ কমপ্লিট। অবশ্য ওখানে কিছু ভাঙ্গা কাচ
ছিটিয়ে দিতে হতো, যাতে কোন নিশাচর
পাখীর কাণ্ডকারখানা বলে মনে হয়।
দেখতে দেখতে মাধ্যমিক এসে গেল। বাড়ি থেকে বেড়োনো প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। সকল অভিযানের
ওখানেই পরিসমাপ্তি ঘটল।
প্রায় নিরুপদ্রবেই মাধ্যমিক
দিলাম। ভেবেছিলাম অন্তত তিন মাস, মানে ছুটি রেজাল্ট বের হওয়া পর্যন্ত আবার পুরাতন সাথীদের সাথে পুরাতন জগতে
ফিরত যাব। কিন্তু ললাট লিখন অন্য ছিল, বাবা কান ধরে
হিড়হিড় করে সাথে করে দোকানে নিয়ে যাওয়া শুরু করলেন। আনুষ্ঠানিক ভাবে আমার
কর্মজীবনের সূচনা ঘটল শিক্ষানবিশি রূপে। কয়েকদিন নিরস
কাটলেও, সপ্তাদুয়েক পর থেকেই ওটাই অভ্যাস হয়ে গেল। দোকানে বসে খবরের কাগজ ও গল্পের
বই পড়াতে কোনো বাঁধা ছিলোনা, এটাই আমাকে আরো বেশী আকর্ষিত করেছিল। কোথা দিয়ে যে তিনটে মাস কেটে গেল বুঝতেই পারলামনা। যথারীতি সময়ে
রেজাল্ট বের হলো। রেজাল্ট দেখে
বাবা-মা অত্যন্ত হতাশ হলেন, তারা বোধহয় ভেবেছিলেন তাদের সন্তান বাংলায় প্রথম দশে থাকবে। তবে আমার
প্রাপ্ত নাম্বার, প্রতিবেশী
সহপাঠিগনের অবিভাবকদের ঈর্ষার কারনে, বাবামায়ের সে দুঃখ কিছুটা লাঘব হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য ভাবে আমি সেই গৌরাঙ্গের
থেকে অনেকটা ভাল রেজাল্ট করেছিলাম, নাম্বার বিচারে ইস্কুলে প্রথম।
ওই ইস্কুলেই ভর্তি হলাম, ইচ্ছা ছিল
সাহিত্য নিয়ে পড়ব। বাবার ইচ্ছা ছেলে বিজ্ঞানি হোক, মায়ের ডাক্তার। কিন্তু ছেলে জানত তার অদৃষ্টে উন্মাদ হওয়াই লেখা আছে। অনেক দড়ি টানাটানির
পর বাবা মায়ের মিলিত ইচ্ছার প্রকোপে বিজ্ঞান বিভাগেই ভর্তি হলাম। পুরাতন বন্ধুদের
একজনই আমার সাথে, সাইন্সে ভর্তি
হল- প্রদীপ। বাকি সকলেই অপরিচিত ছেলেমেয়ের ভিড়ে একজনই পরিচিত, সে হল গৌরাঙ্গ। যার সাথে সবচেয়ে
গাঢ় বন্ধুত্ব হয়েছিল পরবর্তীতে।
এই বয়সে কবিদের প্রফেট
বলে ভ্রম হয়। প্রথমবার জীবনানন্দ পড়েছিলাম, ‘নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়’। আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। ইংরেজিতে পোয়েট্রি, উর্দুতে শায়েরি, আরবিতে আশশির, জার্মানে গেদিখট, রাশিয়ানে স্তিখাতাভরেনিয়ে, চায়নিজে শি- সব কিছু থাকলেও, কবিতার যদি সুন্দর একটা
নাম হয়, সেটা কবিতাই। বুকের ভেতর ঝড়, গ্রীষ্মের দুপুরের
ধূ ধূ শূন্যতা, প্রেমিকের বুক যেন যুদ্ধাহত রক্তাক্ত ময়দান। বিজ্ঞান
বলে মৃত নক্ষত্র সুপারনোভা হয়ে প্রচন্ড
বিকিরণ ছড়ায়, সেই আলো পৃথিবীতে আসতে লক্ষ লক্ষ বছর লেগে
যায়। তেমনই কবিতা গুলোর বাস্তবতা যখন অনুভব করতে শিখি আমরা, ততদিনে লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে থাকা ‘আমি’ যেন মৃত
নক্ষত্র, বহু আগেই যার অস্তিত্ব নেই হয়ে গেছে বাস্তবতার
কানা গলিতে।
ইইস্কুলেরই এক শিক্ষকের কাছে সন্ধ্যাবেলা গণিত শিখতে যেতাম। তিনি আবার বনেদী পরিবারের সন্তান, ইইস্কুলের পাশেই বাড়ি। সেই পুরাতন আমলের ঢাউস কড়িবরগার
ঘরদোর। আমি ছাড়া আর তিনজন পড়ুয়া সহপাঠি ছিল। ক্লাস টুয়েলভের পাত্রদা, শ্রীরুপাদি, আর স্যারের দাদার পালিতা কন্যা। বড় দুজন দাদা দিদি, তারা ও আমি সর্বদাই নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখতাম। আমার কথা বলার কেও থাকতনা, একাই পড়াশোনা করে বাড়ি ফেরা।
স্যার এলে তবেই ওই অপরিচিতা মেয়েটি স্যারের পাশে এসে কেরোসিন বাতির কাছে মুখ ঝুঁকিয়ে একমনে পড়ত। দিনের আলোতে কখনই তাকে দেখিনি।
ওই কেরোসিনের আলোতেই দেখতাম, এক অল্প বয়সী মায়াবী একমনে
পড়াশোনা করে চলেছে। কেরোসিনের বাতির মৃদু আলোক যেন ওই লাবন্যকে আরো মোহময়ী করে তুলেতো। ধীরে ধীরে জানলাম সে ক্লাস এইটে উঠেছে সবে। নাম অভিশ্রী। আমার যাবতীয় লৌকিক চিন্তাধারার সমস্তটা আবর্তিত হতে থাকল ওই মৃদু আলোকে দেখা
একটা বালিকা মুখচ্ছবিকে ঘিরেই। কিছুদিন পর এমন দাঁড়ালো যে, শুধু মাত্র ওই মৃদু আলোকের রূপ দর্শনের জন্যই পড়তে যাওয়া, পড়া তো ছুতো। সে অবশ্য ততোদিনে কোনোদিনিই আমায় একবারের
জন্যও দেখেছে বলে মনে হয়নি। আমার মনে
হতে লাগল, এ ই তো সেই, যাকে আমি সেই কৈশরের সূচনালগ্নে অনুভব করেছিলাম, সন্ধ্যার
ঢুলুনির ঘোরে যে কুহকিনীকে
দেখতাম, সেটা তো এরই দৃশ্যরূপ। একেই যে আমি হন্যে হয়ে পথেঘাটে খুঁজে চলেছি অহর্নিশ।
পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী ফুল বোধহয় জুঁই। দাগহীন ধবধবে সাদা, মিষ্টি সুগন্ধ, অথচ টুপ করে মাটির
বুকে মুখ গুঁজে পরে থাকে। অনুভূতির যদি চেহারা থাকতো, তাহলে সেটা জুঁই ফুলের মতই দেখতে
হত।
আমার হৃদয়ের উঠোন জুড়ে বিছানো ভালোবাসা, মাটি হয়ে এই জুঁই এর জন্যই বুক পেতে রয়েছে অনন্ত প্রতীক্ষায়।
একটা একটা করে দিন গড়ায়, ওই ভাললাগাটা
ক্রমে নেশায় পরিণত হোল, পরে মহামারীতে। তাকে নিয়ে কত রংবেরঙের স্বপ্ন দেখা শুরু
হয়ে গেল। কিন্তু অপর প্রান্ত নির্বিকার। এরই মধ্যে সময় অসুঙ্কলান জনিত কোন কারনে
বড় দুই সহপাঠী দাদা দিদি, সকালের ব্যাচে
চলে যাওয়াতে, আমি একা হয়ে পরলাম। তাতে করে আমার কল্পলোকে বিরাজ করতে আরো
সুবিধেই হল। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটাতে টিউশনির সময় হলেও আমি
সেই পাঁচটা থেকেই স্যার বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরঘুর করতাম।
এমনই একদিন, স্যারের বাড়ির
প্রায় বাতিলের খাতায় নাম লেখানো, একটা কালিমাখা
কাঁচের হ্যারিকেন নিয়ে কিছু একটা ভাবছি, হঠাৎ অন্ধকার বলে উঠল “আজ ছোটকা বাড়ি নেই” । আমি আচ্ছা বলে বাইরে যাব, মনে পড়ল- কে
বলল এ কথা? দ্রুত আবার ঘরে
ঢুকতে গিয়ে সামনা সামনি ধাক্কা অন্ধকারের সাথেই। মা গো বলে, একটা মেয়েলী
কন্ঠ শুনে বাড়ির অন্যান্য মহিলারা ছুটে এলেন। দেখি সেই মনোমোহিনী। আঘাত সে পেয়েছিল, টলতে টলতে বাড়ি
ফিরলাম আমি।
পরদিন আবার সন্ধ্যা ছ’টাতে
হাজির হতে, কাজের মাসি হ্যারিকেন সাপ্লাই দিয়ে গেল। খানিক পরেই – “এ্যাই, কাল আমার ইইস্কুলের সামনে ঘুরঘুর করছিলে কেন”? আমি চমকিয়ে দেখি, মায়াবিনী। আমি থতমত খেয়ে বললাম,
- ইয়ে মানে এমনিই। তুমি ওই ইইস্কুলে পরো বুঝি!
- এমনি মানে কি? ওই কতগুলো
নচ্ছার ছেলেদের সাথে ঘোরাঘুরি! ছোটকাকে বলব?
- না মানে ওরা তো আমার বন্ধু, একসাথে পড়ি
- ম্যা গো, কি বন্ধুর ছিরি।
বলেই আবার তিন লাফে সিঁড়ি ডিঙিয়ে সোজা দোতলায়। মা ছাড়া অন্য কোন মহিলা এতটুকুও শাষনও করেনি আমাকে, কোনোদিনও। এমনকি আমার বোনও আমার বিরুদ্ধে
যেতনা, অন্তত প্রকাশ্যে। বেশ মিষ্টি লাগল এই অনভিপ্রেত শাসন। আমরা দলবেঁধে কোন কারন ছাড়া এমনিই বিভিন্ন গার্লস ইইস্কুলের সামনে সাইকেল নিয়ে টহল দিতাম। তবে
এটুকু বুঝলাম, ইইস্কুলের ভিতর থেকে ওতোটা দূর হতেও সে আমাকে নজরে রেখেছে। এটা ভেবেই আমার সারা
শরীরের রোম খাড়া হয়ে গেল উত্তেজনায়।
এর পর থেকে টিউশনিতে নোংরা হ্যারিকেনের বদলে একটা পরিষ্কার কাঁচের ডিমলাইট নিয়ে আমার সাথে
এসে যোগ দেওয়া শুরু হলো সেই জাদুকরীর। স্যার আসত প্রায়
আটটার সময় বা তারও দেরীতে, আমার লটারি লেগে গেল। এমন ভাবে
একমাসেই একটা সুন্দর বন্ধুত্ব হয়ে গেল। খুব যে কিছু কথা বলতাম তা নয়, ২টো ঘন্টার
মধ্যে ২-৪ মিনিটের কিছু এলোমেলো কথাবার্তা, ব্যাস। শুধু চোরা চাহনিতে একে অন্যকে চেয়ে
চেয়ে দেখা, চোখে চোখ পরলেই লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া পরবর্তী ২টো মাস। তখনও আমি তাকে দিনের আলোতে কখনো দেখিনি। একদিন হঠাৎ বললো , আজ আমাদের ইস্কুলে
বিজ্ঞান মঞ্চের বাস আসবে, তাতে নাকি নানা
ধরনের দর্শনীয় জিনিসপত্র থাকবে। যাবে?
শুধালাম- আমাকে ঢুকতে দেবে?
বলল- হ্যাঁ, কাল বন্ধুদের এল্যাও আছে। তবে একটা কথা, বাড়িতে আসবে না। আমি নবদ্বীপ বাসস্ট্যান্ডে থাকব, তুমি ওখানে এসো, দুজনে একসাথে যাবো।
বাড়ি থেকে ওদের ইস্কুল প্রায় ৮-৯ কিলোমিটার দূরে, পৌরসভা এলাকায়। সত্যি বলতে সে রাত্রে আমি ঘুমাতেই
পারিনি। এই প্রথম কোন মেয়ের নিমন্ত্রণে কোথাও যাব, যাকে ভালবাসি। সারা পৃথীবির যাবতীয়
সুখের ঘোর আমাকে ঘিরে ধরল। বুঝতেও পারছিলামনা এটাই প্রেম কিনা! আবার কাওকে শুধাতেও পারছিনা। এক দমবন্ধ
সুখানুভুতি। আগেই বলেছি, চোষা ডাঁটার মত আমার চেহারা, যে পোশাকই পরিনা
কেন, ঠিক মর্কটই লাগে। খুব ভাল মনে আছে, একটা ফুলহাতা ইস্ত্রি না করা চেক জামা সেদিন গুঁজে পরেছিলাম। মায়ের সেন্ট মাখলে সে নানা কৈফিয়ত, তাই কাকিমার কাছ থেকে লুকিয়ে আতর নিতে গিয়ে, কাকার একখানি পুরাতন বেল্টও পেয়ে গেলাম।
হুশ করে সাইকেল চালিয়ে সোজা বাসস্ট্যান্ড, উত্তেজনায় আমি তখন রোবট। দেখি কেও কোত্থাও নেই, সময় যেন কাটতেই
চায়না। যদিও সেটাই স্বাভাবিক ছিলো, কারন নির্ধারিত ১১টা বাজার
দেড় ঘন্টা আগে বেলা সাড়ে ন’টাতেই আমি যথাস্থানে হাজির। ঘড়ি তখন মাথায় নেই, উত্তেজনায়
ঘনঘন সিগারেট টানছি, হাতপা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিলো কয়েক যুগ যেন একা নিঃসঙ্গ
দাঁড়িয়ে রয়েছি, মনটা খারাপ করে প্রায় এক ঘন্টা পর এক্কেবারে
বিধ্বস্ত ভাঙ্গা মন নিয়ে যখন ফিরে আসব বলে সাইকেলে চড়ছি, হঠাৎ সামনের বাস থেকে চিৎকার-
- ওই, ওই... দাঁড়াও দাঁড়াও?
- আমাকে বলছেন?
- তো আর কাকে বলব, হুনুরাম
ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ক্ষানিক বাদেই বাস থেকে, হাঁটু খোলা কালো ফ্রম আর গোলাপী একটা টপ পরে একটা বছর তের চোদ্দোর মেয়ে দাঁড়ালো।
কোথায় যেন দেখেছি একে মনে করতে পারলামনা। ভীষন ফর্সা
হাতপা, গাল দুটো পুরো গোলাপী, যেন টোকা দিলে রক্ত ঝড়বে। টিকালো নাক, মায়াবী দুটো কালো চোখ,
হাতের গলার নীল শিরা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, ঠিক বিদেশী পুতুলের মত পুরো অবয়বটা। বয়সে তুলনায় বেশ লম্বা চওড়া।
আজও সরাসরি মেয়েদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারিনা, সেদিন তো আরো। মনটা এমনিতেই ভারাক্রান্ত। আড়চোখে ওই টুকু দেখে নিয়ে শুধালাম, কিছু বলবে?
- নেকু, কিছু বলবে! তোমার নাম কি?
- আমি বেশ আশ্চর্যের সাথে বললাম, নাম জানোনা যার, তার সাথে
আবার দরকার কি?
- বেশ বোলোনা, রাত্রে যেন আর
আমার সাথে কথা বোলোনা।
কথাগুলো সপাৎ করে ছড়ির ঘা’এর মত, মনখারাপের ঘোর কাটিয়ে বাস্তবের সামনে
নিয়ে এলো। চিনতে না পারলেও বুঝতে পারলাম, এ তো সেই অন্ধকারের লাবন্যময়ী। সে বেশ জোরের সাথে বলল, কি হলো টা কি?
- ইয়ে, আসলে আমি ঠিক তোমায় চিনতে
পারিনি, মানে কোন দিন দিনের আলোতে দেখিনি
তো,
তাই...
এক নিঃশ্বাসে কথা কটা বলেই থামলাম। আমার তখন ১০৫ জ্বর,
পায়ে পাহাড় বেঁধে দিয়েছে কেউ, কানে কোনো আওয়াজ যাচ্ছেনা, মাথা বনবন করে ঘুরছে, মনে
হচ্ছে ধপ করে পড়ে যাব।
- থাক আর মস্করা করতে হবেনা। এমা, এটা তো বাথরুমের পাশে, চলো ইস্কুল পানে
যাওয়া যাক।
একটা অবস ঘোরের মধ্যে, মন্ত্রাবিষ্টের মত ওর পিছন পিছন চলতে লাগলাম।
- আচ্ছা কুঁড়ে তো তুমি, সাইকেল রয়েছে তবে আমরা হাঁটছি কেন!
ঠিক কী বলা উচিৎ
তা বুঝতে না পেরে বললাম, ঠিক আছে তুমি চালাও, আমি হাঁটছি। একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে, দাঁড় করিয়ে সাইকেলের সামনের রডে চড়ে বসল। অনুভব করলাম ওর দুধ সাদা ঘাড়ের কাছে ঘোড়ার লেজের মত করে বাঁধা ইঞ্চি
৬ এর একটা কালো ঝুঁটি। কাঁধ থেকে কেমন
একটা মাতাল করা সুমিষ্ট গন্ধ আসছে, আলগা চুলগুলো হাওয়ায় উড়ে আমার
মুখচোখ ছুঁয়ে যাচ্ছে, ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছি। সারা শরীর কাঠের মত প্রায় নিশ্চল হয়ে যেতে চাইছে, শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা হিমেল স্রোত। কেও যদি দেখে ফেলে কী হবে এই ভাবনাতেও আমার
হার্ট ফেল করার দশা। এর পর ঠিক কি কথা বার্তা বলেছিলাম মনে নেই।
কারো প্রতি
গভীর আকর্ষণ, উষ্ণতা- ভালোবাসার একটি শক্তিশালী অনুভূতি। যা একই সাথে আনন্দ, বেদনা, সুখ ও দুঃখের মতো
বিভিন্ন আবেগ দ্বারা সম্পূর্ণ স্বত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ভালোবাসা সবচেয়ে অস্থির আত্মাকেও নিরাময় করতে
পারে, সবচেয়ে কঠিন হৃদয়কেও মোমে
রূপান্তরিত করতে পারে। সত্যিকারের প্রেম এক বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক তৈরি করে, যেখানে একে অপরের মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও জীবনের লক্ষ্যগুলি বোঝা যায়। ভালোবাসার মাধ্যমেই মানুষ
নিজের সত্তাকে সম্পূর্ণভাবে বিকশিত করতে পারে, শর্তহীনভাবে গৃহীত হওয়ার অনুভূতি লাভ করে।
প্রেমের
অনুভূতি একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা, যা গভীর মানসিক সংযোগের মাধ্যমে বিকশিত হয়, যেটা
জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রথমদিকে প্রেম কেবলমাত্র তীব্র উত্তেজনা, প্রত্যাশা এবং
রোমান্টিক অনুভূতির সাথে জড়িত থাকে, অন্তত ওই বয়সে। যাকে বড়জোর মোহ বা
আকর্ষণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। একটা নির্দিষ্ট বয়সে না পৌঁছালে
অনুভূতিরা শান্ত শীতলতা ও গভীরতা
পায়না, যা একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী বন্ধনের দিকে পরিচালিত
করে।
যাই হোক, ইস্কুলের গেটে ঢুকতে গিয়েই দেখি আমার নিজের বোন, খুড়তুতো বোন সহ ওদের বান্ধবীদের পুরো টিম যথারীতি হাজির। অদূরে
বিজ্ঞান মঞ্চের জাপানি বাস। ওমা সাথে দেখি আমার মা ও এসেছেন ওদের অভিভাবক হিসাবে। আমার
সমস্ত চেতনারা বিদ্যুৎ বেগে ফিরে এলো নেশার ঘোর কাটিয়ে। তিন লাফে
হ্যাঁচকা টানে নিরাপদ দূরে এসে বললাম- তুমি এগোও, আমি কোনমতেই ইস্কুলে ঢুকবনা। কারনটাও
বললাম। জবাবে বলে গেল- খানিক
দাঁড়াও, যাব আর আসব। চলে যেওনা যেন, গঙ্গার ধারে যাব।
আমি একটা ময়রার দোকানের
বেঞ্চিতে বসে ভাবতে লাগলাম, এ কি ওই মেয়েটাই? পৃথিবীতে কেউ এতো রূপসীও হতে পারে? ওর রূপচ্ছটায় সূর্যকেও সেদিন যেন ম্লান লাগছিল। দুনিয়ার সমস্ত কিছুকে
ভালো লাগতে শুরু করেছিলো। রাগ, বিদ্বেষ, দুরন্তপনা যেন এক লহমার জন্য কোনো বিস্মৃত
অতীতের ছায়া মাত্র হয়ে গিয়েছিলো। প্রতীক্ষাতেও যে এত সুখ, কেউ কী জানত তার আগে! সে
যাই হোক, মা’কে বাইরের দিকে আসতে দেখে, সে যাত্রায় আর তার কথা রাখা যায়নি, হাওয়ার সাথেই
মিলিয়ে গিয়েছিলাম একপ্রকার।
‘তুমি ময়ুরাক্ষী নদীর নাম শুনেছো?’
বলেছিলাম শুনেছি,
কখনও দেখিনি। আমি কেবল ভাগীরথী গঙ্গাই দেখেছি। সে বলেছিলো ‘আমাদের ঘর ময়ূরাক্ষীর তীরে, বলতে পারো আমি নিজেই
ময়ুরাক্ষী, তুমি আমার দুরন্ত দামোদর। তোমাতে মিশে আমি মিলনের গান শোনাবো, তোমার দুরন্ত স্রোতে আমি ডুবে যেতে যেতে প্রতিবার বেঁচে
উঠব। আমাদের উপনদীরা সংসার
ভরিয়ে তুলবে ব্রাহ্মণী, বক্রেশ্বর, কোপাই, দ্বারকা, কুশকর্ণী সেজে, কলকলিয়ে
উঠবে জীবনের বারান্দা। এতো কাব্য আমি সেদিন বুঝিনি, না তার গুরুত্ব ধরতে পেরেছিলাম।
সদ্য কিশোরীর অন্তরে এতো গভীর ভাবনারা সেদিন খেলে গিয়েছিল, আজ ভাবলেও আশ্চার্যান্বিত হই। শুধু এটুকু বুঝেছিলাম- বয়স তার যা খুশি হোক,
সে আমার চেয়ে অনেক অনেকটা পরিনত।
এক বিকালে পুজোর
কোনো একটা দিনে সাদা খোলের শাড়ি পড়ে এসেছিলো, আমার সাইলেকে চড়ে অনেকদূর ‘কোবলার বিলের’ ধারে চলে গিয়েছিলাম। অনভ্যস্ত শাড়ির আঁচল ঠিক করার বাহানাতে প্রথমবারের জন্য সে আমার
হাত ধরেছিলো, পুরো একটা বিকেল জুড়ে সন্ধ্যা নেমেছিলো বুকে মাথা
গোঁজার ছলে। সেদিন সে ‘আমরা’ হবার গল্প শুনিয়েছিলো, একটা বাড়ির গল্প, ছোট্টো একটা বাসা বাঁধার
গল্প। একটা ঘর, অনেকগুলো বড় জানালা, যাতে অনেক বেশী আলো বাতাস আসবে, একটা বারান্দা,
সামনে উঠোন। তারপর প্রাচীর, ভালবাসার প্রাচীর, যাতে কেউ ব্যাঘাত না ঘটাতে পারে আমাদেরকে। একটা বুকশেলফ, দুটো চেয়ার, একটা কাঠের টেবিলে দুটো চায়ের কাপ, দূরে একটা অপরিপাটি বিছানা, যা আমাদের আদিম উদ্দমতার সাক্ষী।
সূর্য ডুবে যেতে, আমি ও সে ক্রমশ আমরা হয়ে গিয়েছিলাম। দুজনের চোখেই নিরব
অথচ জ্বলন্ত সর্বনাশা নেশা, হৃদয়ের সর্বোচ্চ গভীরে জমিয়ে ফেলা কালকূট। দুজন দুদিক থেকে হেলান দিয়ে প্রথমবারের
জন্য চোখের তারার দিকে তাকানো, অন্ধকারে। তার সমস্ত ভার আমার ওপর সঁপে নির্ভার হয়ে মাথা রেখেছিলো নিবিড় ভরষাতে। আলতো
হাতে চুল সরিয়ে তার কাঁটা হয়ে থাকা ঘাড়ের কম্পিত ত্বকে
নাক ঘষলেও, চুমুর রেখা আঁকতে পারিনি
কেউ। সেটার জন্য যে সাহস দরকার, সেটা আমাদের ছিলোনা- ওই নিশুতি আঁধারেও।
লজ্জায় কান গরম হয়ে গেলেও, মোহগ্রস্ত
সমাধির মত শুধু শুনেছিলাম সেদিন। আগামীর কাল্পনিক সংসারের জলছবি, যা আমি আঁকতে না জানলেও সে তার পুরো ইজেল রাঙিয়ে গেলেছিলো
আমার রঙে। আমাকেও শুধিয়েছিল, তুমি কিছু বলো- আমার সামনে ছিলো শুধুই অন্ধকার আকাশ। বলেছিলাম-
যেদিন আকাশভর্তি
তারাদের কারো কোনো দীর্ঘশ্বাস থাকবে না, সেদিন তোমাকে সব বলবো। অনেকটা রাত করে বাড়ি ফিরেছিলাম,
ছিপছিপে বৃষ্টি নেমেছিলো সেদিন। ঠাকুর
দেখার ওছিলাতে বৃষ্টিতে ভিজে দুজন হেঁটে হেঁটে ফিরেছিলাম প্রায়
মাঝরাতে, দুজনেই ভিজে জবুথবু। শেষ বিদায়ের দিন ছিলো সেটা, আমার চুলের জল মুছে দিয়েছিলো ভেজা আঁচল দিয়ে, পরম আদরে মমতায়। স্মরণীয় সেই সন্ধ্যার আকাশেই ছিল বজ্রগর্ভ মেঘের বিষাক্ত বজ্রের ছোবল। যা একজনকে অন্যের
কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল।
এরপর? এরপর বিচ্ছেদ। কেউ কারো হৃদয় ভাঙিনি। ঝগড়া করে মান অভিমান করিনি, কোনো প্রতারণা ছিলোনা। কিন্তু আমাদের প্রেম থমকে গিয়েছিলো। কেউ কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে চাইনি এরপর।
শুধু জানতাম এই যোগাযোগ বন্ধ করার মধ্যেই বেঁচে থাকা
আমাদের দুজনের। আমাদের সাতকাহন থেমে গিয়েছিলো। কেউ বুঝতোনা কেন ইস্কুল পড়ুয়া একটা ছেলে উন্মাদ উদাসীন হয়ে গিয়েছিলো। পাহাড়সম অভিমান বুকে নিয়ে নিজের অস্তিত্বকে নিরুদ্দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। খেলাধুলো অন্তপ্রাণ একটা দামাল, কেমনভাবে যেন নির্জীব হয়ে গিয়েছিলো, ঘন্টার পর ঘন্টা একাই কেটে যেত কৌতুহলী চোখে চেয়ে
থেকে। যেন এই মাত্র তাকে দেখতে পাবো, আর
দৌঁড়ে গিয়ে জানাবো- আমি তাকে
কতটা মিস করছি। আফসোস, লাল স্কার্ট আর সাদা
জামার ইউনিফর্ম পরা সেই মেয়েকে আর কখনই খুঁজে পাইনি।
“চোরি কী মোহাব্বত মে আকসর ইয়ে হি হোতা হ্যাঁয়,
এক স্যাহেমি সি চাহ হো য্যাইসে-
কি প্যায়ার করনা গুনাহ হো য্যাইসে।
মাগর, দোনো হি মোহাব্বতকে জাসবাতো মে জ্বলতে
থে”।
আমাদের সময়ে অরিজিৎ সিং না থাকলেও আলতাফ রাজা
ছিলো। গানের কথার মধ্যে শের, শায়ারি ও নাজম গুলো ছ্যাঁকা খাওয়া হৃদয়ে তীরের মত বিঁধতো।
কীভাবে বা কাদের জন্য সেই সম্পর্ক ভেঙেছিলো, সেটা গোপন থাকার মধ্যেই সামাজিক সম্মান
বজায় থাকে সকলের।
অতঃপর জীবন যেন কেমন
বদলে গেলো। আসি যায় ক্লাস করি, কেমন একটা গা ছাড়া ভাব। আরো মাস চার পাঁচ কাটার পর আমি মোটামুটি বাবার আস্থাভাজন হয়ে উঠলাম দোকানে। অন্যমনস্ক থাকতাম,
ফলত গালি খাওয়ার পরিমান বহুগুন বেড়ে গিয়েছিলো। মাধ্যমিকের আগে বাবাকে দেখলেই তার সামনে থেকে
পালাতাম, রাশভারী মানুষ, সপ্তাহে কদিচ কদাচিৎ মুখোমুখি হতাম। এখন পড়াশোনার
সময়টুকু ছাড়া প্রায় সর্বক্ষনই পিতৃ সহচর্যে। ইতিমধ্যে বোন কিছুটা বড় হওয়াতে সে মায়ের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছিলো। এটাই সেই সময়, যখন পারিবারিক ইকোসিস্টেম গুলো নিজ নিজ মেরুতে কেন্দ্রীভুত
হয়।
ব্যাবসার গদিতে বসার দরুন হাতে পয়সার অভাব মিটে গিয়ে যোগ্যতার তুলনায় অপ্রতুল টাকা থাকত পকেটে। খেয়াল করলাম, টাকা আসার সাথে সাথেই সেই ক্লাস সেভেন এইটেই ইচ্ছা গুলোও মরে গেছে অলক্ষ্যে। তখন ভাবতাম, যেদিন টাকা রোজগার করব, সেদিন গোটা ঘুগনির গামলাটাই কিনে নেব। অথচ মাত্র তিন চার
বছরের ব্যবধান, পকেটে টাকা আছে, অথচ সামনের বাচ্চা বাচ্চা ভাইগুলোর “কাকু আমাকে দাও, কাকু আমাকে দাও” করে অধৈর্য চিৎকার ডিঙিয়ে একপ্লেট
ঘুগনিও খেতে পারিনি।
কৈশোরকাল,
জীবনের এক অনন্য অধ্যায়, যা আমাদের স্মৃতির পাতায় চিরকাল অম্লান থাকে। এই সময়ে আমাদের জীবনের প্রতিটি
মুহূর্ত যেন এক একটি রঙিন ক্যাপশন, যা আমরা আমাদের মনের অ্যালবামে যত্নসহকারে সংরক্ষণ করে রাখি। কৈশোরের স্মৃতিগুলোই আমাদের পরবর্তী জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। হৃদয় নামের অঙ্গটিকে প্রথমবারের জন্য ছুঁয়ে অনুভব করার বয়স এটা, প্রাপ্তবয়সে এসে কারনে অকারনে যখন এই মজার অতীত যাত্রায় যাবেন, আকর্ষণীয় এক
প্রফুল্লতা ভাবনাকে উজ্জ্বল করে
তুলবেই।
কৈশোরে
মানসিক গঠন ও চিন্তাভাবনার প্রভাব তাদের জীবনের গতিপথ তৈরি করে দেয়। শৈশবে পরিবারের নিয়ম-কানুনের যে বাঁধন থাকে তা কৈশোরে অনেকখানি শিথিল
হয়ে পড়ে। এদিকে বয়ঃসন্ধি কিশোর-কিশোরীদের দেহ ও মনে অনেকখানি
পরিবর্তন ঘটায়। নিজেদের শরীরের পরিবর্তন যেমন বুঝতে পারা
যায়,
তেমন ভাবে মানসিকতাও
পাল্টাতে থাকে। এই সময়ে পরিবারের সঙ্গ ভালো লাগে না, শাসনের
গণ্ডির বাইরের জগৎ হাতছানি দেয়। মানসিক গঠন ও বিকাশ সুস্থ না হলে বয়ঃসন্ধিকালের সংকটপূর্ণ মুহূর্তগুলো বাকি জীবনভর কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না। ফলে শৈশবের ভালো ছেলে বা ভালো মেয়ে কৈশোরে উচ্ছৃঙ্খল ও
বিপথগামী হয়ে যায়।
একটা মনের কাছাকাছি
থাকা কোনো বন্ধু, বলা ভালো বিপরীত লিঙ্গের সমবয়সীর সঙ্গ- কৈশোরের মানসিক
গঠন ও বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ বানিয়ে সুস্থ মনের অধিকারী হতে সাহায্য করে। নতুবা বদ্ধ সামাজিক পরিবেশ কিশোর-কিশোরীদের অপরাধপ্রবণ ও
বিকৃতমনা করে থাকে। এই সময় প্রতিষ্ঠাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকেনা,
চরিত্রের কঙ্কাল গঠন হয়, যা বাকী জীবনটাকে বয়ে নিয়ে যায়। আজকাল তো মোবাইল সমাজজীবনকে পঙ্গু করে ফেলছে। অপেক্ষা আর লুকিয়ে পাঠানো চিঠির রোমান্টিকতা
গুলোই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাহুল্যের কারনে সৃষ্ট কৃত্রিম অভাব-অনটন
মানসিক দ্বন্দ্ব-হতাশার সৃষ্টি করছে। আজকাল কিশোরবেলা বিদ্রোহী
হয়ে যাচ্ছে, তারা শরীর খুঁজছে প্রেমের বদলে।
আমাদের সে সময়ে দ্রুত সময় বদলে যাচ্ছিল। দেশের উন্নয়নের পালে বিশ্বায়নের হাওয়া লেগেছিলো, যেটা প্রতক্ষ্য পরিলক্ষিত হচ্ছিল সমাজের
সর্বস্তরে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি আর যোগাযোগ ব্যাবস্থা উন্নত হতে শুরু করার
দরুন সহজে কাঁচা টাকার আমদানি শুরু হয়ে যায়। দ্রুত
এলাকার ইতিহাস ভূগোল বদলাতে থাকে, তাঁত শিল্পকে কেন্দ্র করে এলাকার ভোল বদলে যাওয়া
শুরু হয়। সাধারনত গরীব গ্রামাঞ্চলে যেমনটি হয়ে থাকে, অধিকাংশ সহপাঠীই “অনেক পড়াশোনা হয়েছে,” ভেবে নিয়ে টাকা রোজগারের তাগিদে জীবনযুদ্ধে নেমে পরেছিলো। সুতরাং হারাধনের অন্তিম কয়েকটি সন্তান রূপে আমরা
কয়েকজন টিমটিম করে পড়াশোনায় টিকে রইলাম গোটা এলাকায়।
তখন বাবার দুটো বাইক, একটা বাজাজ M-80, আরেকটা পানাগড় থেকে কেনা জাঁদরেল
সেকেন্ডহ্যান্ড আর্মির বুলেট। ওই ভারী বুলেট সামলানো আমার কম্ম ছিলোনা, তাই মাঝে মাঝে মা’কে পটিয়ে, বাবার অলক্ষ্যে ওই M-80 নিয়েই ইস্কুলে
যেতে লাগলাম। কিছুদিন পর ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলেও বাবা আর উচ্চবাচ্য না করার
দরুন,
ওই M-80 একপ্রকার আমারই হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু বুলেটর প্রতি একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। আজও সেই মোটর সাইকেলের বিলাসিতা
আমি কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
ধীরে ধীরে ইলেভেনের পাঠ শেষ করে এবার বারো ক্লাশ। কঠিন সময়। কিন্তু ততদিনে
আমার প্রথম প্রায়োরিটি হয়ে উঠেছে ব্যাবসা। সারাদিন ব্যাবসা সংক্রান্ত নানান
কাজকর্মের ফাঁকে সময় পেলে তবেই পড়াশোনা। এই প্রত্যক্ষ ব্যাবসাতে থাকার কারনে আমার
মনস্তত্বেরও চরম পরিবর্তন খেয়াল করছিলাম। খেলাধুলার পাঠ প্রায় ডকে উঠেছিল, আড্ডা মারার সময় ছিলনা। তাছারা সব থেকে বড় কথা তখন হাতে
হঠাৎ করে লক্ষীর ঝুলি খুলে গিয়ে শখ গুলো সব বিভিন্ন দিকে মোড় নিয়ে নেয়, যেগুলোর ভাবনা একবছর আগে কল্পনাতেও
ছিলনা। যেমন, তখন সবে স্পাইস মোবাইল কোম্পানি উঠেছে, কোলকাতা ছাড়া কোথাও টাওয়ার নেই। কিন্তু পকেটে পয়সা থাকলে, আর খরচের স্থান না থাকলে যা হয়, এক ঢাউস মোটোরোলার সেট কিনে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম। জীবনে শনির দৃষ্টি শুরু হল এই পর্যায় থেকেই।
বাবা বুঝে গেছিলেন, ছেলে আমার
অজ্ঞান,
সুতরাং বিজ্ঞানী হবার ভাবনা কবর দিলেও, মা তার ছেলেকে ডাক্তার করার স্বপ্নে জল ঢালতে নারাজ।
অতএব,
কোলকাতায় চাকুরিরতা মামার সাথে শলাপরামর্শে
আমাকে কোলকাতায় রেখে পড়াশোনা করানোর পরিকল্পনা পাকা হয়ে গেল। এদিকে বাবা বেঁকে
বসলেন,
কারন ততদিনে ব্যাবসার ৮০ % দৈনন্দিক কাজকর্ম
আমাকেই করতে হয়। আর মা সেটা লক্ষ্য করেন, যে এই ব্যাবসা আর কাঁচা টাকার পাল্লায় পরে ছেলে উচ্ছুন্নে যাচ্ছে। বাবার
তীব্র অমত সত্বেও আমি রাজি হয়ে গেলাম। কারন কোলকাতার হাতছানি। এভাবেই সমাপ্তি ঘটল
আমার ইস্কুলজীবনের।
জীবনের কোন এক সময় যাকে নিয়েই শুধু আমার সকল স্বপ্ন, সকল আশা, সকল চাওয়া পাওয়া ছিল অভিশ্রী কেন্দ্রিক। বলাই যায় আমার প্রথম সফল প্রেম, যা দুই তরফেই অর্গানিক ছিলো। আমার প্যারালাল পৃথিবী ছিল ওই পুতুল পুতুল
মেয়েটি। আজকে কেউ ভাবতেই পারে এগুলো নিছক কথার কথা! সে যে যা ভাবে ভাবুক, আমি ভাবতে পারিনা, কারন আমি
আর সে জানি আমরা একে অন্যকে কতটা
ভালোবেসে ছিলাম। সময়ের ঢেউ, তৎকালীন বাস্তবতা- আমাদের
ছিন্ন করে দিয়েছিল। অবুঝ কৈশোর যুক্তি মানেনা, ফলত তীব্র অভিমান ক্রমশ রাগে রুপান্তরিত
হয়। সেই সময় জবরদস্তি ভুলতে চেয়েছিলাম,
মুক্তি পেয়ে চেয়েছিলাম সেই বন্ধ্যা
স্মৃতিগুলো থেকে। অসাধারন মিথ্যা দিয়ে সেই বয়সেই অভিনয় করেছি নিজের সাথে, অহেতুক জুলুম করে নিজেকে কষ্ট দিয়েছি। হয়ত আমার মত অনেকেই এমনটাই
করে, হয়ত ব্যার্থ কৈশোরের এটাই সিস্টেম।
আজ মধ্য যৌবনে এসে যখন ভাবি,
হঠাৎ এত বদলে কীভাবে গিয়েছিলাম! তখন সত্যিই আমি বদলে গিয়েছিলাম, তার মত,
সময়ের মত। মৃত সময়ের লাশেরা এক অদৃশ্য বাঁধ তৈরি করেছিলো, অপেক্ষারা
ক্রমশ ভুলতে শিখে নিয়েছিল দ্রুত। মনকে বুঝিয়ে ছিলাম, তার জন্য হৃদয়ে কখনও ভালবাসা ছিলোনা। বুঝিনি,
তাকে ভুলতে চাওয়াটাই ছিল তার বলিষ্ট উপস্থিতির প্রমাণ। তাই আজও প্রেমের কথা উঠলে চতুর্দশী
অভিশ্রীর মুখটাই ভেসে উঠে মানসপটে। কালিমাখা লন্ঠনের নরম আলোতে দেখা কষ্টটাকে ভুলতে চাইতাম একটা
মিরাকেলের আশাতে, কোনো এক পথের বাঁকে দুম করে তার সাথে দেখা
হয়ে যাক। অনেকটা সময় তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রেখে, সমস্ত রাগ সেখানেই বিসর্জন
দেব।
ভালোবাসার মানুষ জীবন বদলের কারিগর,
পথ্যও বটে। ভালবাসা এক অলীক সুখ, যে সুখের জন্য মানুষ সব কিছু করতে পারে। হৃদয় ভাঙ্গতে পারে, জুড়তেও পারে। আজ ঠিক এই ৩৭ বছর বয়সে এসে আমি জানি তার কোথায় বিয়ে হয়েছে, তার
কটা সন্তানাদি ইত্যাদি। কখনও ইচ্ছা যায়নি দেখা করতে, ফেসবুকে তার প্রোফাইল খুঁজে দেখেও
দ্বিতীয়বার আর যায়নি, বরং ব্লক করে দিয়েছি। চাইনি আমার কৈশোরবেলা
আঘাত পাক। একটা দীর্ঘ মিষ্টি স্বপ্ন যেন বাস্তবের রুক্ষ জমিতে প্রখর তাপে উবে না যায়।
এর পরেও একাধিক প্রেম এসেছে, আত্রেয়ী, রূপা, শ্রেয়সী, রিঙ্কি এমন অনেক অনেক নাম এসেছে।
কিচছু সফল প্রেম ছিলো, কিছু ধান্দাবাজি, বাকীটা টাইমপাস কিম্বা একপেশে।
আত্রেয়ীকে নিয়ে একটা
গোটা উপন্যাস লেখা যায়, তার ভালবাসা, তার ত্যাগ, শহরে গাড়ি চালানো শেখানো, নিজের পকেটে
খরচার ভাগ দেওয়া, বাড়ির সাথে অশান্তির দিনে আমার অভিভাবক হয়ে যাওয়া, আমাকে আস্তানা
দেওয়া, মানুষ করা, একটা গেঁয়ো ভুতকে কীভাবে শহুরে বানানো যায় তার আপ্রাণ চেষ্টা- সব
করেছিলো আত্রেয়ী। শেহনাজও এসেছিল পরকীয়া হিসাবে, তাকে নিয়েও দু-চার খানা নানা রসের
নানা পর্যায়ের কাব্য লেখা যায়। তাকে নিয়েও কম কবিতা লিখিনি, কম বিনিদ্র রজনী কাটায়নি
শুধু কথা বলে। আজ সে আমার গৃহিণী, রুমির সাথে সাথে তাকে নিয়ে আমাদের ভরা সংসার। তাই
সকল অতীতের নষ্ট সম্পর্কের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার মধ্যেই মানসিক ও সাংসারিক সুখ
লুকিয়ে। তবুও একান্তে স্মৃতিসাগরে ডুব দিই- একটু অলীক সুখের
সন্ধানে
আজও কবিতার রাশিয়ান প্রতিশব্দ খুঁজে ফেরা আমি, বিষন্ন জুঁই ফুলের মতই অবহেলায় ঝড়ে
পরে থাকি। আজ কেউ শুধায়না নক্ষত্রের মৃত্যু হলে কি
হয়! আজ আমার চারপাশে উজ্জ্বল আলো, স্ত্রী সন্তানেরা
জীবনের আকাশে স্বগর্বে বিরাজমান। সকল ভিড়, হৈচৈ পেড়িয়ে আজও উচ্ছল ময়ূরাক্ষীকে
খুঁজে ফিরি মনখারাপের দিনে। অবচেতন মন সেই কৈশোরের সন্ধ্যার অনুজ্বল হ্যারিকেনের নিভুনিভু মায়াবি আলোয়
দেখা সেই চোখ দুটো খুঁজে ফেরে- যা কখনও আর ফিরবেনা। যে চোখের দিকে তাকিয়ে বুকটা প্রথমবারের
জন্য ধক করে উঠেছিলো; সেই চোখে আজ তার নিজ সংসারের মায়া,
হয়ত দায়ভারে ক্লান্ত। আমার চিরদিনের-
কালকূট।
প্রেমের বিপরার্তথক
শব্দ হওয়া উচিৎ ছিলো- কালকূট। যে বিষে প্রতিটা সুস্থ মানুষের
হৃদয়ের শরীর নীলাভ কালশিটে হয়ে আছে। বিচ্ছেদে
অপ্রাপ্তির সাময়িক বেদনা থাকে, পরিনতিতে চিরস্থায়ী দুর্বিকপাক। যেন শেহনাজের বিষাদনামা।
আমৃত্যু যন্ত্রণা ও নিত্যদিনের অভিযোগ আর ক্লেদাকীর্ণ অসহনীয়তা। সেদিনে মাথাভর্তি কোঁকড়া চুলের স্থানে আজ মাথাভর্তি বিশাল টাক, বছরের অধিকাংশ
দিন ন্যাড়া হয়েই থাকি। দু’চোখে আজ অর্থ
উপার্জনের নেশা, মুখভর্তি আধপাকা দাড়ি গোঁফের
জঙ্গল, তালপাতার সেপাই এর শরীরে ইয়াব্বড় জ্বালার মত ভুঁড়ি আর সিগারেটের
তাপে পোড়া কালো ঠোঁটে শুকনো হাসি। পেশাগত
বাধ্যবাধকতার বাইরে আজ সারাদিন কাটে রাজনীতি আর ইতিহাস ঘেঁটে। সেই কোবলার বিলের ধারে অভিশ্রীর স্বপ্নদেখা- ব্রাহ্মণী, বক্রেশ্বর, কোপাই, কুশকর্ণী এরাও এসেছে রুমি শেহনাজের গর্ভে, মিঠি দিয়া সারা জিয়া নাম নিয়ে। তারা নিজ
নিজ জীবনে ছুটে চলেছে নিজ নিজ পরিসরে, নিজ নিজ দায়িত্বে তাদের মায়েদের তত্ত্বাবধানে।
ওদিকে তারও চোখের নিচে
সংসারের কালিঝুলি, তার চুলেও পাক ধরেছে নিশ্চই। শরীরের শ্রী ঝুলে গিয়েছে বয়সের দাবী
মেনে, প্রসাধনের আড়ালে কবিতারা চাপা পরে গেছে। মৃত স্বপ্নের বেড়া দিয়ে ঘেরা তার মননে
আর কল্পনারা আসেনা, দিন কাটে রান্নাঘরে বা কোনো অফিসের কাজে। আমাদের শূন্য হৃদয় ভালোবাসার জন্য তৃষ্ণার্ত ছিলো, আমাদের স্ত্রী/স্বামীরা শ্রাবণের বৃষ্টি হয়ে সেই তৃষ্ণা মিটিয়েছে সন্দেহ নেই। যৌবনের খিদে মেটানো হয়েছে কালের নিয়ম মেনে, যন্ত্রের মত। গালিব কি আর এমনি লিখেছিলেন- ‘যখনই দেখেছি তাকে আমি অন্য কারো সাথে, বুঝেছি
খোদা কেন শিরক পছন্দ করেন না’। তাই আর কখনও তাকে দেখতে মন চায়নি অন্যের স্ত্রী
বা মা হিসাবে, তার ভাবনাও হয়ত এমনই কিছু ছিলো। যে কারনে আজ সর্বত্র
শুধুই তারাদের দীর্ঘশ্বাস, একে অন্যের কালকূট হিসাবে রয়ে গেছি
হৃদয়ের সর্বোচ্চ গভীরে।
সব মিলিয়ে এক দুরন্ত
ছেলেবেলা কাটিয়ে এসেছি, সেই সময়ে নানা আক্ষেপ থাকলেও আজ কোনো অভিযোগ অনুযোগ নেই জীবনের
প্রতি। বরং নিজেকে ভাগ্যমান মনে করি। জীবনভর কতো যে নাম না জানা মানুষের প্রেমে পরেছি, একতরফা- তার কোনো
লেখাজোখা নেই। এটাই বোধহয় মধ্যবিত্ত জীবনের মাধুর্য্য। প্রেম
পূর্ণতা পেলে, তার অপমৃত্যু ঘটে। বরং বিচ্ছেদ সম্পর্ককে অমর করে দেয়, নতুন নতুন কাহিনী
দেয়। প্রখ্যাত গীতিকার সন্তোষ আনন্দের একটা কবিতা আছে, সেটাই
যেন মানুষের জীবনের টেমপ্লেট-
উন আঁখোঁ কা
হাসনা ভি ক্যায়া,
জিন আঁখোঁ
মে পানি না হো।
ওহ জওয়ানি
জওয়ানি ন্যাহি,
জিসকি কোই কাহানি না হো।।
#হককথন