শুক্রবার, ৩ আগস্ট, ২০১৮

।। প্রসঙ্গঃ আসামে NCR ।।


যাদের "বাপ ঠাকুরদার" যে কোনো একজনের জন্ম বিদেশে (পড়ুন বাংলাদেশে), ফাটবে তাদের বেশি। তারা তবুও হাসছে, কারন ভাবছে সে বোধহয় টিকে যাবে ভক্তো হবার মন্ত্রবলে, আর পরিস্থিতি না বুঝে ওঠার কারনে। তথ্য বলছে বহু অসমিয়া ভক্তো অবৈধ হয়েছে, তারা হারিয়ে বুঝেছে। অবশ্য বুঝদার চিন্তাশীল কোনো মানুষ বিজেপি করে বলে শুনিনি। আরেক দল হাসছে অভ্যাসে, এদের বরাহনন্দন বললেও হাসে বৃহন্নলা নামেও খুশি হয়। এরা জানেনা বিজেপি মানেই 'ঘরের ষাঁড়ে গবনা হওয়া"

জানিনা আমার ফেবু পরিচয় তালিকার কতজনের বাবা-দাদুর জন্ম স্বাধীন ভারতে। তাদের জন্য এক মিনিট নিরবতা পালন হোক।

সদ্য তথা বিগত ৩০ বছরের মধ্যে আপনার এলাকার আশেপাশে যে কয়পিস "অবৈধ বাংলাদেশী" ডেরা গেড়েছে (as per Assam NCR conditions) , চেয়ে দেখুন প্রায় সব কটা মাল বিজেপির প্রকাশ্য সমর্থক। পাশাপাশি বখরার লোভে তিনুর সিন্ডিকেটেও নাম লিখিয়ে হারাম কামাচ্ছে ফ্যামিলির অনেকে। কেউ কেউ তো "কাইট্যা হালাইমু" জাতের উগ্র। যদিও নিজের নিন্মাঙ্গের লোমটুকু কাটার মত মরদ হয়ে উঠেনি।

এরাই আদি বিজেপি এই বঙ্গে। হর হর মোদীনাদে একদা বাতাস কাঁপিয়ে ছিল, এখন মোদীর NCR তাসে ঘুঁটে নাদছে। এরপর চোখ দিয়ে হিসি করবে, মুখ দিয়ে গালি আর পোঁদ দিয়ে লালনীল সুতো বেরোবে। আবকি বার কি মোদী সরকার হবে বন্ধু? জবাব আসার সম্ভাবনা ক্ষীন, খিস্তি আসলে আসতে পারে। এরা জানে আচ্ছে দিন কাকে বলে, ২০১১ পূর্ববর্তী বাংলা এরা দেখেছে অনেকেই।

আত্মলিঙ্গম পশ্চাদপুরম হয়ে শিখন্ডীর মত বুঝে নেবার চেষ্টা করছে, জল কদ্দুর গড়ালো, কার উঠোন পর্যন্ত। জাতের ফুঁপি প্রকাশ্যে টানা যাবেনা, তাই কোল্যাটারাল ড্যামেজে ১০০ কোটি হিন্দুর স্বার্থে ১-২ কোটি হিন্দু বলি অনৈতিক বা অযৌক্তিক কোনোটাই নয়। আচ্ছেদিনে উত্তীর্ন হতে গেলেও এই সামান্য ট্রাঞ্জিষ্ট লষ্ট মেনে নিতেই হবে অর্থনৈতিক সুত্র মেনে।

আপনি বোঝেননি আমি ঠিক কি বলতে চাইছি, তাই তো? আমি নিজেই বুঝিনি তো আপনি কি বুঝবেন।

ভক্তবৃন্দের, ছুঁচোর সাপ গেলার মত - চোখে মুখে বঞ্চিত বাঞ্চোত হয়ে যাবার রেখা স্পষ্ট। না গিলতে পারছে না উগরাতে।

মমতা ব্যানার্জীর, একদা স্পিকারকে লক্ষ্যকরে কাগজ ছুড়ে মারার ইতিহাস মিডিয়ার দৌলতে চোখে চোখে। শরনার্থী বা উদ্বাস্তু প্রশ্নে তার নিজ দলের লোকেরাই বিশ্বাস করে কিনা বুকে হাত রেখে বলতে পারবেনা। সততা আবার নিলামে চড়েছে সোনাগাছির হাটে। উন্মাদেরা প্রতিবেদন লিখছে, উন্নয়ন তবু অসমে যায়নি, কারা গেছে? মমতাবালা -মহুয়ার মত রাজনৈতিক অপাংক্তেয় কিছু ভেসে থাকা শিকরহীন কচুরিপানার দল। লাগলে তুক, না লাগলে তাক।
সত্যিই বাংলাতে আজ বড় অংশের নিন্মবর্ণের হিন্দুরা অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় ভবিষ্যতের সামনে। এতোদিন মোদী মুসলমান ঠেঙিয়ে এসেছে, এখন সেম সাইড গোলে হিন্দু উচ্ছেদ শুরু করেছে। এ বিষয়ে হিন্দু সংহতির তপন গোয়ালার কোনো মন্তব্য নেই, RSS এর তরফেও কোনো এঁড় কপালের অফিসিয়াল বিবৃতি নেই।

আগামীতে বাংলার এক খেই বালও ছিঁড়তে পারবেনা মোদী সরকার, এটা নিশ্চিত। কারন অল্পদিনেই তুলসিতলায় উঠবে গোটা সরকার। তবুও অশান্তি করাতে পারলেই মাংসলোভী কুত্তাদের লাভ। তাই বাঙালিকে দ্রুত শত্রু চিনে নিতে হবে, যাবতীয় পুরাতন ভুল শুধরে। এটা অস্তিত্বের প্রশ্ন। নতুবা প্রাক্তন বৃটিশ প্রভুদের কাছে মুচলেকা দেওয়া বাপের বীর্যে জন্মানো গোসন্তানেরা আবার বাংলাকে লুটে নিয়ে বেচে দেবে। রক্ত বেইমানি করেনা।

** বিজেপি তথা মোদী বাঙালী বিরোধী। প্রমানিত। মেদনীপুরের জোকারটা জানেনা যে, দুই ২৪ পরগনা হয়ে পূর্ব বর্ধমান, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা, দুই দিনাজপুরের বৃহত্তর অঞ্চলের বড় সংখ্যার মানুষ শেষ ৪০ বছরে এসেছে।

** কংগ্রেস নেই এ রাজ্যে। ওদের নিয়ে বলা বেকার।


** শাসক তৃণমূল বিজেপির বিপক্ষে গেলেই "ভাইপো" জবাই সময়ের অপেক্ষা। মোদী, রাজনাথ, আদবানীর ঝরে পরা অবাঞ্চিত লোম দিয়ে নির্মিত তাবিজ দিয়ে ভাইপো বাঁচানোর মিথ্যা চেষ্টা আরো মাস আষ্টেক চলবে। "নিজে বাঁচলে বাপের নাম" সুত্রে লোক দেখানো বিরোধিতা ছাড়া তৃণমূল কংগ্রেস প্রাঃ লিঃ এর কিচ্ছুটি করার নেই। করবেও না।

** সুসি, আর এস পি, সিপিআই ইত্যাদি নামক বালছাল দল গুলো সার্কাস পার্টি থেকে যাত্রাপার্টিতে পরিনত হয়েছে, যাদের সবকটার মুকাম চিৎপুর থুরি কালীঘাটে।

** বাকি রইল বাম....
বাকিরা তো অন্তত নামেও আছে। এনারা কোথায় কে জানে! একা বিকাশ কোনদিকে যায়! সুজন পাড়ার নেতা, বাকিরা শিশুশ্রেনীর কৌতুক অভিনেতাতে পর্যবাসিত হয়ে চলেছে। নব্য নেতাদের প্রাজ্ঞতা বটতলার সাহিত্যিকদের মানের।

মানুষ বড় অসহায়। পাশে কেউ নেই। বাঙালীর আজ নেতার অভাব। নতুবা একটা দাম্ভিক অরুচি বাতিকগ্রস্থ অসুস্থ মহিলা জাতির মাথায় নেত্ত করতে পারতনা।



বুধবার, ১ আগস্ট, ২০১৮

।। অলস কাব্য- ১ ।।


শ্রাবনের ঘনঘটা, মুখ ভার আকাশের,
প্রিয়তমা, তোমারও....

সাজানো উপবনের রেকাবি জুড়ে
 
রোজই প্রেমের হাট বসে.. আজও পৃথিবী জুড়ে।
চোখ ছোঁয়া প্রেম শরীর ছুঁয়ে শেষও হয়-
আদুর পায়ে মাড়িয়ে চলা বর্ষাস্নাত ঘাস, 
বিলয়িত হয়েছে সময়ের কাছে
বোঝোনি তুমি কি হারিয়েছো
খুশি হওয়ার চেষ্টাতে সুখের দিন অতিক্রান্ত

তবে তাই হোক...

তোমার ঠোঁটে ছুঁয়ে থাক অপবাদের পরত
তোমার হাসির কারণ হোক কান্না লুকানোর প্রয়াস,
 
পায়েপায়ে বয়ে নিয়ে চলা দলাপাকা অনিষিক্ত স্বপ্নেরা।
যাকে দেখা যায় কিন্তু চাখা যায়না, তোমারই মতো।
তবুও অন্তরের অন্তস্থলে তোমার বিপণি জুড়ে ছলনার বিজ্ঞাপন,
 
আলিঙ্গনে রোজ নতুন ঘামের গন্ধের দ্বৈধীভাব-

প্রেম- তবুও তুমি ধন্য, তোমায় সাধুবাদ।
নিরুদ্দেশের যাত্রী করেছো, বিকলনে জীর্ণ
পরিপত্র বিনাই হারিয়ে যাবো টুক করে
অনেকের মতো স্মৃতিতে রয়ে যেতে-
তোমাদের ভালো থাকার জন্য উৎসর্গীত যে জীবন
হাসিটুকু থাক শেষদিন পর্যন্ত জিয়ানো
 
এতটুকু আত্মত্যাগ যে নিয়তিরই লিখন।

আমাকে খুঁজে পাবে প্রতিটি তৃষ্ণার্ত অনুভবে
প্রেম তুমি বেঁচে থেকো আমার ডাকনামে।


মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

।। উন্মাদনামা- ৩২ ।।


Disclaimer: কাঁচা খিস্তিতে যাদের এলার্জি তারা এই বাটিকা সেবন থেকে বিরত থাকুন।
™™™™™™™™™™™™™™™™™™

চিন্তাটা আসলে আপনি ঘটি না বাঙাল সেটা নিয়ে নয়, সমস্যা হল আপনি নাগপুরের বলদগুলোর পূজারী কি না। ওখানেই যাবতীয় সিদ্ধান্ত লুকিয়ে। আসলে কি জানেন, একটা লোকেরও বাল ছিড়তে পারবেনা এই বিজেপি এন্ড কোম্পানি। আইন পালটা আইনের গ্যাঁড়াকলে পাবলিক ভুলে যাবে- কে কি ও কেন। কিন্তু এটাকে কেন্দ্র করে যে প্রবল আলোচনার সামিয়ানা খাটানো হয়েছে দেশ জুড়ে তার তলাতে মোদী সরকার আরো বেশ কিছু অবৈধ কাজ সেরে হাত ধুয়ে নেবে।

ওদের উপরে চোখ বুজে ভরষা করুন, কারন ওরা পেশাদার উন্নতশ্রেনীর চুতিয়া ধাপ্পাবাজ আর আমরা বোকাচোদা গান্ডু।
মিডিয়া, প্রোপাগান্ডা আর হুজুকে পাবলিকের এখন ত্রিসাম চোদনলীলা চলছে, মাল খসলে সবাই দেখবে আসলে সবাই যার যার লাভ ঘরে তুলেছে, শুধু পাবলিকের পোঁদ মারা গেছে আর রাষ্ট্রীয় বীর্যে গর্ভবতী সরি ঋণবতী হয়েছে। আবকি বার ফিরসে মোদী সরকার, কেন? যে জাতি নিজের পোঁদ মারিয়ে সুখ পায় তার জন্য এমন জুমলাবাজই আদর্শ নেতা।

মলম লাগাতে মিডিয়া মাসির কন্ডোম তো আছেই, যেটা আপনার মুখে গুঁজে দেবে। অপেক্ষা করুন, কোন জুমলা প্রকাশ পেল এই অসমিয়া জুমলার পাঁকে। কারো থেকে মন্তব্যের আশা রাখছিনা, তবুও জানতে চাই "মন্দির ওহি বানেঙ্গে" মাগর কাবতক!!

উদ্বাস্ত ও সমুদ্রগড়


লেখকঃ তন্ময় হক 

আমাদের সমুদ্রগড়
এমন বর্ষাদিনে আমাদের মায়েরা তখন স্কুল পর্যন্ত পৌঁছে দিতেন হাতে ধরে। ক্লাস ফাইভে উঠেছি , স্কুল বাড়ি থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে, তবুও। সেটা ১৯৯৩-৯৪ সাল, আমাদের বিবিরহাট গ্রামের অদূরে একটা মোল্লারবিল নামক গ্রামে বেশ কিছু বাঙালবাসা বেঁধেছে শুনেছি, শেষ ১৫-২০ বছরের হতদরিদ্র মানুষজনের কলোনি। সমুদ্রগড় মূলত হাঁড়ি, ধাঙড়, কিছু অত্যন্ত দরিদ্য শ্রেনীর মুসলমানদের সাথে কালীনগর ও জালাহাটির অবস্থাপন্ন সদগোপ চাষাদের বাস। দাদুর কাছে শোনা, ৭১ এর আগেই মোদকরা বর্তমান পূর্ব পাকিস্থান থেকে এসে কালীনগরের অদূরে কালীতলাতে বসবাস শুরু করে। ৭১ এর পরে দেবনাথ, বিশ্বাস, সরকার, হালদার, মজুমদার, মণ্ডল, ইত্যাদি পদবীর বাংলাদেশী লোকজন অল্প আকারে গ্রামের বাইরের দিকে চূড়ান্ত হতদরিদ্র পরিবেশে কেউ কেউ জলাজংলার মধ্যেই বসবাস শুরু করে, যেখানে যাতায়াতের কোনো রাস্তাঘাটও ছিলনা। আমি তখনও জন্মায়নি অবশ্য। জন্মের আগের একদশকের মাঝেরকার ঘটনা, তখনকার মিস্ত্রি পরিবারটিকে ঘিরেই সমুদ্রগড় নামক গা-গঞ্জের দিনাতিপাত। এটা নবদ্বীপ শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে, তবুও অজ পাড়াগাঁ বলতে ঠিক যা বোঝায় ঠিক তাই ছিল।

নবাব আমল, গৌড়রাজ, বর্ধমানরাজ, কৃষ্ণনগরের রাজা হয়ে বৃটিশদের সাথে চলাচলি হরেক চিঠিপত্র, সম্পত্তির দলিল, ব্যবসায়িক দস্তাবেজ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আমাদের মিস্ত্রি বংশের (পরবর্তীতে হক্‌) বাস এই অঞ্চলে প্রায় ৩০০ বছরেরও অধিক। যদিও মাঝে একবার এনারা মানে আমার পূর্বপুরুষেরা সুলুন্টু নামক একটা স্থানে থাকতেন, যেটা বর্তমান সমুদ্রগড় থেকে ১৬ কিমি উত্তরে। কোনো এক মড়কের কবলে সেই গ্রাম উলা হয়ে গেলে এরা বর্তমান এই স্থানে বসতি স্থাপন করে, সেটাও কমপক্ষে ২০০ বছর আগে। তারপরে কোম্পানির সাহেবইঞ্জিনিয়ারদের নক্সাতে তৈরি আমাদের দু-দুখানা কোঠাবাড়ি আজও ৩০ শতাংশ বসবাস যোগ্য হয়ে ইতিহাস বহন করে চলেছে। আমাদের বংশের অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষয়িষ্ণু দুটো ধারা আজও সেখানে বসবাস করে, এই ২০১৮ তেও।

আমিও বেশ কিছু কথা লিখে ফেললাম আবেগে, আসলে এই আচ্ছেদিনের ভারতে যেখানে প্রমথেশ বড়ুরার পরিবার থেকে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পরিবার সুরক্ষিত নয় সেখানে আমাদের মত বালস্য বাল তায় মুসলমান- কিভাবে আতঙ্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারি?

হ্যাঁ, চলুন ফিরি সেই নব্বই এর দশকে। বামফ্রন্টের বর্গাতে এই অঞ্চলের যাদের একমাত্র ক্ষতি হয়েছিল সেটা আমাদের পরিবারের। কারন তখন একলপ্তে এতোটা জমি এখানে কারোই ছিলনা। জমিই বা বলছি কেন! বলা ভাল চাষযোগ্য জমি, পুকুর, বাগান আর বনবাদাড়। বর্গা শুধু চাষ জমিতে হয়েছিল, তাই ওই মধ্য ৯০ এর দশকেও বনবাদাড় সাফ করে আবার প্রভূত জমি জন্মেছিল দাদু সহ তার ভাই দের হাতে, যেগুলো বিক্রয়যোগ্য। তখনও আজকের "সমুদ্রগড় বাজার" নামক স্থানটির জন্ম হয়নি, বিবিরহাটই স্থানীয় ব্যবসার ভরকেন্দ্র। যেটা আগামী ২৫ বছর পর ভারতবর্ষের এক নম্বর তাঁত কাপড়ের বাজার হবে, শত কোটি টাকা রোজ বাজারে উড়ে বেড়াবে, গোটা ভারত থেকে হাজারে হাজারে কারিগর, ফোড়ে, মহাজন, তাঁতিরা ভাগ্য অন্বেষণে এসে পসার জমিয়ে বসবে ইত্যাদি।

আজকের দিনে সন্ধ্যার সমুদ্রগড় বাজারের দু কিলোমিটারের যা যানজট তা কোলকাতার বড়বাজারকেও টেক্কা দেয় সময় সময়। নান্দাই গাবতলা থেকে নবদ্বীপের দিকে নিমতলা বাজার পর্যন্ত এই ৩-৪ কিলোমিটারে বিক্রিযোগ্য ফাঁকা জমিই অবশিষ্ট নেই রাস্তার ধারে, একচিলতে কারো বাড়ির উঠোন বা ছাঁচতলা থাকলেও তার যা দাম তাতে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে দিব্ব্যি একটা ফ্ল্যাট কেনা যাবে এমন অবস্থা। মূলকথা উদ্বাস্তুদের স্বস্তার শ্রম পুঁজিকে টেনে এনেছিল আমাদের সমুদ্রগড়ে, যার সুফল সবচেয়ে বেশি পেয়েছে ঘটিরাই। পুঁজি জাত, ধর্ম, রাষ্ট্র মানেনা কখনই, জীবনযাত্রার মান দ্রুত হারে বদলেছে এই 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' দের কল্যাণে। তাই কেউ ট্যাঁ ফুঁ করেনি।

কেন এমন অবস্থা?
নব্বই এর শুরু থেকেই আমাদের বাড়ির পূর্বদিকটা মানে যেদিকে বাংলাদেশ সেই বরাবর রেললাইনের ধার পর্যন্ত পতিত অঞ্চলগুলোতে ওপাড় বাংলার মানুষেরা পাটকাঠি, বাঁশের দরমা, তালপাতার ছাউনি দিয়ে ঘর বানিয়ে বাস শুরু করে। কেউই শনি খ করে এমন জীবন যে বেছে নেয়নি সেটা বলাই বাহুল্য। আজকের বিজেপির ভারতে যাদের পরিচয় অনুপ্রবেশকারী, এবং অবশ্যই অবৈধ।
ওপাড় থেকে যারাই এসেছিল বা আসে, তারা দুম করে কেউ আসেনি বা আসেনা। নির্দিষ্ট রুট মেনে এরা সকলেই গেদে-বসিরহাট বর্ডার হয়ে বনগাঁ বসিরহাট বারাসাত হয়ে নদীয়াতে অনেকটা দিন কাটিয়ে তবে ঢোকে। সে সমুদ্র গড়ে আসতে গিয়ে নদীয়া বা শান্তিপুরের জীবিকাটা কিছুটা চেনা ছিল। এই উদবাস্তুদের অলিখিত রাজধানী হল কল্যাণী, এর পর হাতে মজুদ অর্থের উপরে ভিত্তিকরে নিজেরাই ঠিক কর নিত তারা কলকাতা শহরতলিপান যাবে না গ্রামের দিকে। আজও কোনো বাঙাল দুম করে এখানে ওখানে ঘাঁটি গাড়েনা, তারা বর্ডার থেকে এক পা এক পা করে এসেই দু চার বছরে দই জমিয়ে নেয়। জীবন জীবিকার স্বার্থে এরা যা খুশি কিছু করতে তৈরি ছিল সে সময়। এভাবেই শান্তিপুর, ফুলিয়ার তাঁত শিল্পের পাশাপাশি নবদ্বীপের গামছা বয়ন শিল্পের মতন করে টাঙ্গাইল, বরিশাল, ফরিদপুর ও ঢাকার আশেপাশের দেবনাথ- বসাকেরা সামুদ্রগড়কে কেন্দ্রকরে পাইকারি হারে বসতি স্থাপন করতে শুরু করল। যে ধারা আজও বহমান। সমুদ্রগড়ে তাঁতশিল্পের রমরমা শুরু হয়ে গেল।

৯৩-৯৪ সালে মা ছেলেকে হাতে ধরে স্কুলে পৌঁছে দিতেন, পাছে শেয়ালে, নেকড়ে বা হায়নাতে টেনে না নিয়ে যায়, বা বনে জঙ্গলে ছেলেধরা বা ভুতে ধরে নিয়ে যায় সেই ভয়ে; সেখানে রীতিমত এখন গোটা ৮-১০ সিভিক পুলিস থাকে যানজট পাহাড়া দিতে, নতুন পুলিস থানাও হয়েছে স্কুল চত্বরেই। জনসংখ্যার নিরিখে আসানসোল দূর্গাপুর শহরের চেয়েও বেশি জনঘনত্ব সমুদ্রগড়-ধাত্রীগ্রাম অঞ্চলে, কালনা-নবদ্বীপ তো অনেক পিছনে। এই অঞ্চলের সমুদ্রগড়ের রেশন ডিলারটি আমাদের পরিবারের হওয়ার সুবাদে, কিভাবে কোন কৌশলে নতুন রেশন কার্ড পেয়ে যেত সেই উদ্বাস্তু মানুষজন সে সকলও মুখস্ত। যেটা লিখতে গেলে বড় রোমঞ্চকর উপন্যাস হয়ে যাবে। এটা কিন্তু আধার আর এই ডিজিটাল যুগের অনেক আগের গল্প, তখন পরিচয় পত্র বলতে রেশনকার্ডই মুখ্য ছিল।

তাহলে এরা কারা? এই উদ্বাস্তুদের কাছে বনবাদাড়কে বাস্তু জমি হিসাবে বেচে ঘটিরা একসময় লাল হয়ে গেছিল, কিন্তু আজকের দিনে আমাদের এলাকার গোটা অর্থনীতিটা এই নব্যভারতীয়দেরই দখলে। রাজনৈতিক দল হিসাবে এরা প্রথমে সব সিপিএম ছিল, তৃনমূল কংগ্রেস দলটার জন্মের পর থেকে ওদিকে ধাত্রীগ্রাম আর এদিকে কালেখাতলা (পূর্বস্থলী) পর্যন্ত প্রায় সবকটা অঞ্চলের গ্রাম পঞ্চায়েতই বামেদের হাতছাড়া হয়ে যায় বছর পাঁচেকের মধ্যে। কারন এই উদ্বাস্তুরাই ঠিক করে দিত রাজনৈতিক ভবিষ্যত। যেটা বাম নেতারা কোনোদিনিই ধরতে পারেনি। পরবর্তী আরো বছর পাঁচেকের মধ্যেই সেটার রং পাল্টাতে পাল্টাতে আজকের দিনে এই অঞ্চলগুলো বিজেপির অন্যতম শক্ত ঘাঁটি। আমরা যারা ব্যবসাদার মানুষ, আপাত রাজনীতির রঙ বিহীন, তাই সকলের সাথেই যথেষ্ট ঘনিষ্টতা রয়েছে, জাতি ধর্ম ও রাজনৈতিক সম্পর্কের উর্ধ্বে। কিন্তু তারও পরে আজকের এই হোয়াটসএপ ফেসবুক প্রজন্মের ছেলেরা যারা ২৫ বছর আগের সমুদ্রগড় অঞ্চলের বনবাদাড় দেখেনি, ভাল বা খারাপ সিপিএম কি জানেনা, এরা বোধ হয়ে অবধি অল্প সময় দাপুটে বিরোধী মমতা ব্যানার্জীকে দেখেছে তার পরে শাসক মমতাকে, এই মায়েরা বা মেয়েরা যারা হায়না, ছেলেধরা, ভুত বা শেয়ালের ভয় পায়নি তাদের এই পৈশাচিক উন্মত্ততা স্বাভাবিক আর সেটা আমাদের ভাবায় বৈকি, ভাবতে বাধ্য করে।

আজকের দিনে তো সমুদ্রগড়ের জনসংখ্যার ৯৫%ই বিগত ২৫ বছরে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষজন। আর তাদের ধর্মবিশ্বাস? এটুকু জানুন তারা কেউ মুসলমান অন্তত নয়। কেন তারা নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে এদেশে এসেছেন সেটা তারা আর তাদের ছেড়ে আসা রাষ্ট্রই ভাল বলতে পারবে। এটা বলা যায় কেউ মহানন্দে এই চ্যালেঞ্জ নিতে আসেনি। আমাদের ঘটিরা তাদের আপন করে নিতে, মিশে যেতে তেমন একটা অসুবিধা হয়নি। এরা প্রথম প্রথম উদাস্তু হয়ে এর তার বাগানে বাঁদাড়ে থাকত, স্থানীয়রা মেনেও নিত সানন্দে, পরবর্তীতে নিজ নামে পাট্টা বেড় করেছিল।

আজই হিসাব করছিলাম, এরাই পরবর্তীতে ভারত সরকারের যাবতীয় চাকরীর কোটাগুলো দখল করে নিয়েছে। তারও পরে এদেরকে প্রতিদ্বন্দী বা উড়ে এসে জুড়ে বসেছে মনে হয়নি কখনো, কিন্তু আজ হচ্ছে। কারন এদেরই উত্তরপুরুষদের, আসামের ঘটনার প্রেক্ষিতে ও তার সমর্থনে যেভাবে তারস্বরে উল্লাস ও মিছিল করছে, তাতে মনে করিয়ে দিচ্ছে- তোদের ঠিক আগের পুরুষটাই ছিন্নমূল হয়ে এই মাটিতে শেকড় গেড়েছিল। এই মডিফায়েড হুজুকে প্রজন্মটাই আসামে বিপদ ডেকে এনেছে।

এরা জানেনা সমুদ্রগড় ও তার পাশ্বর্বর্তী অঞ্চলে যাবতীয় প্রাচীন শিবমন্দির গুলো জনৈক সেখ বাবুলাল মিস্ত্রি ও তার তনয় নকিবুদ্দিন মিস্ত্রির অর্থব্যায়ে নির্মিত। যিনি তার কায়েমি প্রজাজের জন্য সমসংখ্যখ মসজিদ নির্মানের জন্যও অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন। প্রতিটি নির্মানের গায়ে আজও মর্মর পাথরে লিখিত সেই ব্যবসায়ীদের ইতিহাস ধরে রেখেছে। আমার টাইমলানে আমার অনেক স্থানীয় বন্ধুবান্ধব আছেন, কিছু ভুল বলে থাকলে শুধরে দিতে অনুরোধ রইল। আজকের এই হুজুকে প্রজন্মটা হিন্দুত্বের সেনা, জাতির সেনা নয়; হলে ইতিহাসকে পড়ে দেখত যে কোন জমিতে আমাদের সৃষ্টি। তাই ইতিহাস ভুলতেই হবে এবং গুলিয়েও দিতে হবে। কারন ভোটের রজনীতির কারবারিরা সেটাই চায়, সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার ভেকধরে আধুনা উন্নয়নের দলের দিকপালেরা ক্ষমতা ধরে রাখতে এই বিষবৃক্ষে সমানে সার-খোল দিয়ে চলেছে। ফলাফল আজকের এই উল্লাস।

আমাদের শৈশবের সমুদ্রগড় থেকে কালনা যেতে ভরষা ছিল একটা ক্ষয়ে যাওয়া ঝামা ফেলা রাস্তা, কোথাও সামান্য পিচ অবশিষ্ট ছিল। সেখানে চুপি-কালনানামের একটা লজ্ঝ্বরে বাস চলত, সাথে সামনে হ্যান্ডেল মারা একটা আপছদ্দির ডজ, কুঁতিয়ে চলাটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছিল যে বাসটি। কোলকাতা বা বর্ধমান গিয়ে দিনের দিন ফেরার কল্পনা ছিল চ্যালেঞ্জ নেবার নামান্তর। ট্রেন বলতে সকালের দিকে তিনটে- ফার্ষ্ট ট্রেন, সেকেন্ড ট্রেন, আর থার্ড ট্রেন, মাঝে ক্যাস গাড়ি, কিউল, একটা নলহাটি ব্যাস। ফেরার গাড়িও ওই গুলোই, নাম অবশ্য আলাদা হয়ে যেত। এই ছিল চালচিত্র। রেশন অফিসের জন্য সপ্তাহে নিয়ম করে কালনা যেতে হত দাদুকে, যাতায়াত মানে গোটা দিনের গেঁড়ো। আমার বিষয়ী দাদু তাই আমার বাবার বিয়ে কালনা শহরে দিয়েছিলেন, বোঝাই যায় একটা ঠেকের জন্য। এত কিছু বলা, আসলে এই ২৫ বছরের ফারাকটা বোঝানোর জন্য, আর এই সবটাই সম্ভব হয়েছে মূলত পূর্ববঙ্গ থেকে এসে ভারতীয় হওয়া মানুষদের কল্যাণে। নতুবা আজও পুরুলিয়া বা বাঁকুড়ার কোনো প্রতন্ত্য অঞ্চলের মত হয়ে থাকত আমাদের সমুদ্রগড়। তাই ওদের আসার একটা যেমন নেগেটিভ ইম্প্যাক্ট আছে তেমনই পজিটিভ দিকও প্রচুর। জীবন যেমন সুখ দুঃখ মিলিয়ে, এটাও যেন তাই। আর এটাকে আমরা যে মেনে নিয়েছি সহজে, সেটাই নির্লজ্জভাবে বিজেপি নামের কীটেরা রোজ কুড়েকুড়ে খাচ্ছে ঘুন পোকা সেজে।

উপসংহারে বলি , আজকের এই লেখাটা লিখতামই না, কালকেই এক দাদা তথা বন্ধুকে ফোনে বলছিলাম আমি কিছু লিখবনা এই সম্বন্ধে, কিন্তু আজকে সব্জি বাজারে গিয়ে পরিস্থিতি আঁচ করে লিখতে বাধ্য হলাম। বিশ্বাস করুন আজও কখনো মনে হয়না বা হয়নি এরা আমাদের স্বদেশী নয়। আমরা কিন্তু ঘরের মাঝে ভিডিও গেম খেলে বড় হয়নি, রীতিমত মাঠে ঘাটে বাঁদরামো করেই বড় হয়েছি। ৮ বছরের স্কুল জীবনে কত বাংলাদেশী ছেলেকে ডাইরেক্ট ভর্তি হতে দেখেছি, কখনো মনে হয়নি আমার ভাগে ভাগ বসালো। আমাদের বাড়ির সামনেই ডাক্তার দাদু, ভীষন গরীব অবস্থা থেকে ছেলে দুটোকে বড় করতে দেখেছি। সম্পর্কেই দাদু, কিন্তু বাবার বয়সী। আমার শৈশব কৈশরের প্রায় সমস্ত স্মৃতি জুড়েই উদ্বাস্তুদের বাস। কারন দাদুদের পূর্বপুরুষ ছোটোনাগপুরের আদিবাসী এনে রেখেছিল জমিতে কাজ করাবার মুনিশ হিসাবে, তারা ফেরেনি আর। এসেছে মুর্সিদাবাদ কান্দির কিছু বাগদি, গঙ্গাপাড়ের কপালি, সুন্দরবন অঞ্চলের মাহাতো সহ- ছেলেদের সাথে ঝগড়া করে আমার দাদু ফজলুল হক্‌ সাহেব- ২২ ঘর হতদরিদ্র চৌধুরী এনে মাগনা বসিয়ে যায় প্রজা হিসাবে। বিহারের ছাপরা জেলা থেকে। কিন্তু গঙ্গারপাড়ের জলমাটির এমনই গুণ যে, সকলেই আমরা সমুদ্রগড়ের লোকহয়ে যেতে সময় নিইনি।

আজকে যুব সমাজের একটা অংশ ভীষণ উল্লাসিত, এখানেও আসামের মতন করে উদ্বাস্তু হাঠাও অভিযান করবে। কারন তাঁত ব্যাবসার টানে বহু দেশ দুনিয়ার লোক বাসা গেড়েছে আমাদের সমুদ্রগড়ে, সেটা আসাম ত্রিপুরা সহ অন্যান্য প্রতিবেশী রাজ্য থেকে ও বিপুল পরিমাণে। তাদের তাড়াতে হবে। এরা পারবে কিনা, সে প্রশ্ন অবান্তর, কিন্তু এই যে উল্লাস; এটাই অশনী সঙ্কেত। কারন কাদের তাড়াবে এরা? এদের বাপ মায়েরাই তো উদ্বাস্তু হয়ে খুদ কুঁড়ো খেয়ে বনে বাদাড়ে এদের জন্ম দিয়েছিল। আমি দেশের তো দুরস্থান এ রাজ্যেরই অন্য অঞ্চলের বিষয় পরিস্থিতি সম্বন্ধে বিশদে ওয়াকিবহাল নই। তাই কোথায় মুসলমান অনুপ্রবেশ আছে জানিনা, আমি জানি আমাদের এলাকার মতই বাকিরাও হয়ত নমঃশুদ্র। কিন্তু আমি জানি এখানে এমন কিছু পরিকল্পনা করলে আসলে কিন্তু নিজেরাই নিজেদেরই সাম্প্রতিক অতীতকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসবে। ইতিমধ্যেই হিন্দু সংহতির ছায়াতলে তিন তিনবার মিনি দাঙ্গা ঘটে গেছে নসরতপুরের বুকে, সমুদ্রগড় বাজার নামক স্থানটা যে পঞ্চায়েতের অধীনে, সেখানে। আজ থেকে ১০ বছর আগেও যেটা ভাবা ছিল কষ্টকল্পনা মাত্র। আজকের একটা প্রজন্মের মজ্জায় মজ্জায় হিংসা আর বিভেদের বিষ ভরে দিতে সক্ষম হয়েছে RSS ও তার শাখা সংগঠন গুলো।

এখন এই কোটি কোটি রাষ্ট্রহীন মানুষ বর্তমান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ নেবে, বা আলাদা ভুখন্ডের দাবি করবে কিনা তা ইতিহাসের গর্ভে। আমার নয় জের বিশ্বাস কিস্যু হবেনা, বা বলা ভাল মোদী-সর্বানন্দ জুটি একটা পরিবারেও লোম বাঁকাতে পারবেনা। হয়ত তাদের উদ্দেশ্যও সেটা নয়, কারন ভারতীয় আইন ব্যবস্থার দীর্ঘসুত্রত্রিতা এতই দীর্ঘ যে গোটা প্রজন্মই হয়ত পাড় হয়ে যাবে সিদ্ধান্তে পৌছাতে। কিন্তু বিজেপির এই তাৎক্ষণিক হুলাবিলা মাচিয়ে দেওয়াটাই মুখ্য উদ্দেশ্য। কিছু মানুষকে সবসময় আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখে লাভের রাজনীতি করা। আদপে কিন্তু জাতি ধর্ম নির্বিশেষে অন্য সকল জুমলার মত আমাদের আমআদমিকেই কালীদাস করে ছাড়ছে। মজা হল যতক্ষণে এটা এই উল্লাসকরেরা বুঝবে ততক্ষণে নিজেরাই হয়ত আসামের ওই চল্লিশ লক্ষের পরবর্তী মিছিলে নিজেকে খুঁজে পাবে কিনা কে জানে!

ছোটোবেলা থেকে ভিটেমাটিহীন উদ্বাস্তদের সাথে থেকে ও দেখে যেটা উপলব্ধি করেছি, সেটা বড় ভয়াবহ। তা থেকে বলতে পারি- আগামীটা কিন্তু আমরা নিজেরাই পছন্দ করছি, যার শেষটা ভয়াবহ। এমনটা চলতে থাকলে আবার কিন্তু দেশভাগের ভ্রূকুটি খাঁড়া হবে, পেট কিন্তু জাত মানেনা, যেমন কবরে কাঁদলে কবর সাড়া দেয়না। তাই সময় থাকতে আশ্রয়স্থল হিসাবে সংবেদনশীল জ্যান্ত বুক খুঁজে তাতে আশ্রয় নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের। বিজেপি হচ্ছে সেই কবর, যেখানে ফাঁদ আছে, পরিনতিও আছে, কিন্তু সেটা একমুখী, যা বিভাজন ও নিজের অস্তিত্ব বিলয়ের মধ্যেই সম্পৃক্ত। যেখান থেকে ফেরার রাস্তা নেই। তাই সিদ্ধান্তটা এখনই নিন, কি করবেন, অন্তত যে এলাকা গুলো আমাদের সমুদ্রগড়ের মত তাদের প্রতি আবেদন রাখলাম। হিন্দুত্ববাদী হয়ে বাঁচবেন নাকি ভারতবাসী হিসাবে! যেমনটা এতদিন বেঁচে এসেছেন!

অসমের একজনও এমন বন্ধু আছেন যিনি দাবি করবেন তার বাড়িতে এই ৪০ লক্ষের একজনকে স্থান দিয়েছিলেন? একজনেরও খাদ্যের দায়িত্ব নিয়েছিলেন? তাহলে তারা গেল আর এলো আপনার কি এসে যায়? ভাত দেবার ভাতার নয় কিল মারার গোঁশাই। বহু ফেবু বিপ্লবীদের মাবাপ বৃদ্ধাশ্রমে পচছেন, কিজানি তারা কি নিয়মে অবৈধ। মারোয়ারিরা গোটা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে আছে জাতের দোয়ায় বা দয়াতে নয়, ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে, সুতরাং এদের সাফল্যে বা ব্যার্থতাতে নিজের অন্ডকোষ চুলকানো উন্মাদ ছাড়া আর আপনি কিছুটি নন। আজ এদের তাড়ালেও আপনারা কিছু করতে পারবেননা, কারন আপনারা সেই কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। আপনার জীবনটা হিন্দু-মুসলমান, গরু-শূয়োর, মিথ্যা দম্ভ আর অক্ষমের শিৎকারে ঘেরা, এখান থেকে বেড়োতে মনুষত্ব লাগে।

আচ্ছা এমন কোনো প্রতিবেদন কি কোনো আসমিয়া বন্ধু কি লিখেছেন? বোধনয় না, কারন তারা এখন মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল অবস্থা, প্রতিবেদন বিলাস তাদের মানায়না, তবে খোঁজ নিয়ে দেখবেন, এমন অনেক সমুদ্রগড়ও আসামের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে লুকিয়ে রয়ে গেছে। আমরা অনেকেই এমন প্রতিবেদন বিলাস করছি, করবও। কিন্তু কতক্ষণ?

বৈধ অবৈধের মাপকাঠি কি? আর কে মাপবে তৃনমূল স্তরে?



বুধবার, ১৮ জুলাই, ২০১৮

।। শিশুর ভালোবাসা ।।

ভালবাসার কোনো ভাষা হয়না, শর্তও হয়না। আবারও তা প্রমাণিত।
আমার ছোট মেয়ে সারাহ, বয়স সবে চার শেষ করেছে, কয়েক মাস হল স্কুলও যাচ্ছে। কথাবার্তা এখনও আধোআধো।
আজ স্কুল থেকে আসা অবধিই সমানে ফুঁপিয়ে কান্না। এমনিতে দস্যি, কোথাও না কোথাও চোট লাগাবেই। প্রথমে ওর মা ভেবেছিল তেমনই কিছু। কারন সারাহ এখনও গুছিয়ে কিছু বলতে পারেনা, মাঝেমাঝেই খেলা করছে - আবার কাঁদছে।
ভুল ভাঙল সন্ধ্যার পর। ওর স্কুলের ম্যাম ফোন করেছে সারাহকে। তার মন খারাপ, তাই সারার সাথে কথা বলবেন।
প্রথমে যবে শুধিয়েছিলাম তোমার মিসের নাম কি বাবু? সারাহ বলেছিল “পারোতা আর তিসিটা ম্যাম”।
এর মাঝে পাকা পেয়ারা, টফি, লজেন্স ইত্যাদি মাঝেমাঝেই দেখি ঘরে আসে, মেয়ের ব্যাগ বয়ে। মেয়ের গালেও লিপস্টিকের দাগ, পোষাকে সুগন্ধি পায় মেয়ের মা। বুঝতে অসুবিধা হয়না, ক্লাস টিচারের কোনো একে জন বা দুজনেই এই দুগ্ধপোষ্য শিশুটির বা শিশুগুলোর মনে অনেকটা স্থান করে নিয়েছেন।
আজকাল শিক্ষিক শিক্ষিকারা বড় ভয়ে ভয়ে থাকেন, এই বুঝি অতিরিক্ত আদর দিলে বা কিছু এদিক সেদিক হলে গার্জেনকুল সহ স্কুল কতৃপক্ষ বাপান্ত করে তোলেন। কারন সময় বড় অস্থির, নরম সম্পর্কগুলোর মাঝে কিছু জানোয়ার বিষাক্ত বাতাস ঢুকিয়ে দিয়েছে। সেখানে সারাহর মায়ের তরফে এই ভালবাসা গ্রহনে কোনো আপত্তি না থাকাতে সম্পর্কটা এতোটাই গভীরে, যে আজকের পরিস্থিতি। ইয়ে, আমি অবশ্য এতো কিছুর খবর জানতামই না। আপনাদের মতই আমিও খানিক আগেই জানলাম।
জানিনা এই প্রাইভেট ইংরাজি মাধ্যমের স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা কত বেতন পান, নিশ্চই যোগ্যোতার তুলনাতে অতি সামান্য। অনেকেই দূর দুরান্ত থেকে আসেন, শুধু মাত্র বেকার বদনাম ঘোচাতে বা সত্যকারের কিছু ভদ্রস্থ রোজগারের কারনে। শিক্ষাগত যোগ্যোতার সাথে কিন্তু এনাদের অতিরিক্ত যেটা থাকে সেটা হল এই আপন করে নেবার ক্ষমতা। শিশু চারাগাছে এনারাই জ্ঞানের প্রাথমিক সার-খোলটা দিয়ে আগামীকে তৈরি করেন।
আজ সেই তিসিটা ও পারোতা ম্যাম, সরি পারমিতা ও তিস্তা ম্যাডাম সারাহ’র গলা জড়িয়ে কেঁদেছে, বেলুন দিয়েছে, চকলেট দিয়েছে, সারাহর নোটবুকে ফোন নাম্বারও লিখে দিয়েছে আর অনেক অনেক আদর করে বলেছে- আমি আর আসবনা।
হয়ত কোনো বেটার অপারচুনিটি পেয়েছে মেয়েদুটি, বা হয়ত কোনো পারিবারিক অসুবিধা বা সুবিধার কারনে তারা আমাদের মেয়েদের মন ভেঙে নিজের দেশে বা অন্যত্র চলে যাচ্ছে। কিন্তু এই অবোধ শিশুর কান্না ওদের কর্মের সার্থকতা বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। শিশুরা স্বার্থ বোঝেনা, তারা ভালোবাসা বোঝে, তাই একটা ক্ষণে আমার নিজেরও মনটা একটু ভারি হয়ে গেছিল। শিশু মন নিশ্চই অচিরেই তার পারোটা আর তিসিটা ম্যামকে ভুলে যাবে- ম্যামও কালের নিয়মে সারাকে ভুলবেন।
মেয়েদুটি আমার বোনের চেয়েও বয়সে অনেক ছোট, ২১-২২ এর কোঠায়, আগে কোনোদিন দেখিনি ভবিষ্যতেও কখনো আর দেখা হবেনা, কিন্তু তারা ভালবাসার গুণে, সারাহর শিশুকালের সাথে আমাদের স্মৃতিপটে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিল। যতটা ভাবনা মনের মাঝে ছিল ততটার ২০%ও লিখতে পারলাম না। একটা অদ্ভুত খুশি অনুভূত হচ্ছে এই ভেবে যে, মেয়ে আমার আদরে শিখছে। এটাই চাই, শাসনের আদরে বড় হোক। শাষন করা তারই সাজে আদর করে যে।
কোমল নিঃস্বার্থ ভালবাসার প্রকৃত উদাহরন। ব্যাবসাতেও লেনদেন হয়, পেশাদারিত্বের মোড়কেও অনেক কিছু বিকিয়ে যায়, কিন্তু ভালোবাসার বন্ধন থাকলে তা জীবনের মাত্রা পায়, দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। অম্লান হোক এমন সকল শিশু-দিদিমনি সম্পর্ক।
থ্যাঙ্কু “পারোতা ম্যাম তিসিটা ম্যাম”, আপনারা দুজনে গিয়ে জানিয়ে গেলেন ভালবাসার পথটাই একমাত্র পথ, বাকি সব শূন্যগর্ভ বা মানিয়ে নেওয়া মাত্র।

রবিবার, ১৭ জুন, ২০১৮

।। জার্মান ফুটবলের সমর্থকদের জন্য ।।

দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে পড়ো দাদা
কেবল শুনবে মেক্সিকোর কাদাকাদা
সন্দীপন বাড়ি আছো?’
জার্মান অহং এখানে বারোমাস
এখানে কথা পিসির মতো ছোটে
পরাঙ্মুখ রাশিয়ান নালিঘাসে
মেক্সিকো চেপে ধরে–
অরিন্দম বাড়ি আছো?’
আধেকলীন হৃদয়ে পলিগামী
ব্যথার মাঝে ঘুমিয় পড়ো তুমি
সহসা শুনি মেক্সিকোর কড়ানাড়া
Archisman বাড়ি আছ?’

শনিবার, ১৬ জুন, ২০১৮

।। প্রসঙ্গঃ বাঙালির ফুটবল বিশ্বকাপ ।।



(১)
কাল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আয়োজক দেশ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন নিজের বক্তব্য রাখলেন নিজের ভাষাতেই। এবং স্বাভাবিকভাবেই আমরা কেউই কিছু বুঝলাম না তিনি কী বললেন! এবং আরও স্বাভাবিকভাবেই এই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস এর যুগে 'নিজেদের আইডেন্টিটি বাবলগাম ফুলিয়ে যত বড় করা যেতে পারে তত বড় করব' মতের অন্যতম ধারক বাঙালি ফেসবুকে আবেগজর্জর স্ট্যাটাস দিলো 'পুতিন যদি এমনধারা করতে পারে তাহলে বাংলা মায়ের সন্তান কেন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়বে?' হ্যাশট্যাগ বাংলা বাঙালি বাংলা মিডিয়াম।

নিজের স্কুলজীবন পুরোটাই বাংলা মাধ্যম। শুধু তাই নয়, মাতৃভাষা- শুধু এই দাবীর জন্য বাংলাকে গড়পড়তা যতটা ভালোবাসা যায় তার চেয়ে বোধহয় কিছুটা বেশিই ভালোবেসেছি, বাসি এখনও। মনে পড়ে, মেডিকেল কলেজে ইংরেজিতে ডায়াসিং করার দীর্ঘ ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাতেই গর্বের সাথে ডায়াসিং করার কথা এবং নিজের ও নিজ অর্গানাইজেশনের বক্তব্য সেই ভাষাতেই সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাকে সামান্য হলেও জনপ্রিয় করার কথা। মনে পড়ে দু'বছর আগে নিট-কে সর্বভারতীয় পরীক্ষা করার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে যে যে যুক্তি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম নিজের মতো করে কিছুটা হলেও, তারও একটা বড় জায়গা ছিল মাতৃভাষার মাধ্যমে পরীক্ষা দিতে দেওয়ার যুক্তিই। এবং একই সাথে মনে পড়ে নিজের হাসি কান্না ভালোবাসা যুক্তিবোধ অভাব অভিযোগের ভাষার নামও বাংলাই। তবু বাবলগামে যে আলপিনটি না ফোটালেই নয়।

(২)

দেশ হিসেবে ভারত একটি বহু ধর্ম এবং বহু সংস্কৃতির দেশই শুধু নয়, সে একটি বহু ভাষার দেশও বটে। সংবিধান স্বীকৃত বাইশটি ভাষা আমাদের, বাংলা অবশ্যই যার মধ্যে একটি। এবং অতি অবশ্যই উল্লেখ্য, হিন্দি আমাদের রাষ্ট্রভাষা নয়। আমাদের কোনও রাষ্ট্রভাষা নেই। হিন্দি হ'ল ভারতের অফিশিয়াল ভাষা, অর্থাৎ কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত একটা দেশ চালানোর জন্য দৈনন্দিনে যে লক্ষকোটি অফিশিয়াল কাজ করতে হয় তার ভাষা হিন্দি। এবং হ্যাঁ, ইংরেজিও।
ফলে আপিস কাছারিতে একটা ফর্ম থেকে শুরু করে জজসাহেবর রায়ের কপি থেকে শুরু করে সর্বভারতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এই দুই ভাষা ব্যবহৃত হয়। অন্তত, হওয়াটা উচিত। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, এদেশে পরীক্ষার দিক থেকে সবচেয়ে কুলীন ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষাটির (চলতি কথায় আইএএস পরীক্ষা) আপনি পুরো মেইনস এবং ইন্টারভিউ (যদ্দুর জানি) নিজের মাতৃভাষাতেই দিতে পারেন। আপনি চাইলে সরকার আপনাকে সে সুযোগ দিতে বাধ্য, এবং সরকার সে সুযোগ আপনাকে দেয়ও।

থিয়োরেটিক্যালি পারেন তো অবশ্যই, কিন্তু সেটা সম্ভব কি? সম্ভব হলে একটু ডেটা দিয়ে বলবেন আজ পর্যন্ত ক'জন বাঙালি/ বা অন্য ভাষার লোক নিজস্ব মাতৃভাষায় পরীক্ষা দিয়ে সিভিল সার্ভিস ক্র‍্যাক করেছে? শতাংশের হিসেবে সেটা কত? থিয়োরেটিক্যালি সে তো আপনি ইউনাইটেড নেশনসের প্রেসিডেন্টও হতে পারেন, বা প্রথম মঙ্গল অভিযাত্রী। সম্ভাবনার দিক থেকে ডেটা দিয়ে বিচার করলে সেটা প্র‍্যাক্টিক্যাল কি আদৌ?

প্র‍্যাক্টিক্যাল নয় তার কারণ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য যে সমস্ত বিষয় পড়তে হয় এবং বাজারে তার যা স্ট্যান্ডার্ড বই আছে সেগুলি সবই ইংরেজিতে। আপনি নিজের মাতৃভাষায় ইন্ডিয়ান পলিটি এবং ইকোনমির ওপর একটি (ঠিকঠাক) বইও খুঁজে পাবেন না। পেলেও তাতে ব্যবহৃত একটি নির্দিষ্ট 'টার্ম' এবং তার ব্যাখা আসলে ইংরেজিতেই, কারণ তার বাংলা হয়ই না। পরীক্ষা দিলেন মাতৃভাষায়, ধরা যাক সুযোগও পেলেন, কিন্তু এসডিও হিসেবে পোস্টিং বেলগাঁও বা দিসপুর। মাতৃভাষাকে সম্বল করে কাজ চালাতে পারবেন তো?
তাই থিয়োরেটিক্যালি হলেও প্র‍্যাক্টিক্যালি অনেকেই আটকে যান ভাষার প্রশ্নে। একটা পুরো পেপার Essay, সেটা ইংরেজিতে লিখতে হবে ভেবে বাঙালি পরীক্ষার্থী দু'বার ঢোঁক গেলে।

আমি হিন্দি নিয়ে একটা এক্সট্রা শব্দও খরচ করতে চাই না। সেটা একটা রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার অংশ হতে পারে, আমার তা নিয়ে আপত্তিও আছে। এবং বাংলা বনাম হিন্দি কাবাডিতে অন্তত আমি বাংলার দলেই। যদিও কাজের সূত্রে বা নিতান্ত ঘুরতে এ বঙ্গের বাইরে পা বাড়িয়ে দৈনন্দিনে নিজেই হিন্দি ব্যবহার করেছি, করতে বাধ্য হয়েছি। থ্যাঙ্কস টু সেট ম্যাক্স অ্যান্ড আজ তক। তবে সেটুকু পেরিয়ে ঘরে ফিরলে প্রেমে পকোড়ায় পার্কস্ট্রিটে আমি হার্ডকোর বাঙালি এবং আমার ভাষা বাংলা।

কিন্তু বাংলা বনাম ইংরেজিতে? আসুন দেখা যাক।

(৩)

হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তানের বিরুদ্ধে গলা ফাটানো ধুতি পাঞ্জাবির অনেক বাঙালিকে চিনি আমি। পড়াশুনো মেডিকেল কলেজ- হার্ভার্ড। যে পরীক্ষা দিয়েছিলেন, এবং দিতে হয় তাদের নাম জিআরই এবং টোয়েফল। যে ভাষায় কাজ, পড়াশুনো এবং নামের পাশের ডিগ্রী আসা তার নাম ইংরেজি। এবং হ্যাঁ, চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরও আরও আরও অনেকের গল্পটা একই। প্রতিটা চাকরির ইন্টারভিউ দিতে হবে ইংরেজিতে, প্রতিটা পিপিটি স্লাইড বানাতে হবে ইংরেজিতে, প্রতিটা মেইল করতে হবে ইংরেজিতে, প্রতিটা সেমিনারে বক্তব্য রাখতে হবে ইংরেজিতে এবং স্যার এবং ম্যাডাম সেটা করবেনও, কিন্তু ফেসবুকে ঢুকে আবেগী স্ট্যাটাস দেবেন ইংলিশ মিডিয়াম হায় হায়, জয় বাংলার জয় মর্মে। কারণ ফেসবুক সত্য, জগত মিথ্যা। তার লাইকে আর 'বাহ' এর ডিজেলে ইগোর ইঞ্জিন চলে। তাতে আরেকটা বাবল তৈরি করতে হলে করি না আমি, যে বাবলের ভেতর বসে অন্য একটা মফস্বল থেকে উঠে আসা আজীবন বাংলা মিডিয়ামের অন্য এক ছাত্রী ভাববে যে তার ইংরেজি না জানলেও চলে যাবে, কী যায় আসে!

সেই ছাত্রীটিকেই বলছি, না, চলবে না ইংরেজি না জেনে। আজ চলবে না, এদেশে চলবে না, এবং সামনের দিনগুলোয় সামনের কোনও জায়গাতেই চলবে না। দৈনন্দিন কাজ চালানোর জন্য, নিজের কেরিয়ার এবং কাজের স্বার্থেই ইংরেজি ভাষায় সড়গড় হতে হবে। আমরা একটা বিশ্বায়িত পৃথিবীতে বাস করি যার যোগাযোগের মাধ্যম ইংরেজি। হয় তুমি সেই ভাষা শেখো এবং পৃথিবীর উঠোনে এসে দাঁড়াও নয় জন্মসূত্রে প্রাপ্ত নিজের মাতৃভাষা নিয়ে ঘরের এককোণে পড়ে থাকো। যারা তোমায় এই ফেসবুকে বাংলা নিয়ে আবেগী করে দেয় তারা কাজের জগতে প্রত্যেকে ইংরেজিতে পারদর্শী। 

তাদের সাহিত্য, সিনেমা, পড়াশুনো থেকে শুরু করে নিজস্ব কাজের জগত ইংরেজির। এই মুহূর্তে বা অদূর ভবিষ্যতে তাদের নিজেদের সন্তানেরা পড়বে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলেই কারণ তারা ফেসবুকে আর চায়ের দোকানে যাই বলুক তারা নিজেরা বিলক্ষণ জানেন আজকের পৃথিবীতে ইংরেজি না জানা মানে তুমি শুরুই করছ একধাপ পিছিয়ে থেকেই। তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত হয়ত করছে না, কিন্তু রোজরোজ বাংলা নিয়ে এবং শুধুই বাংলা নিয়ে যেটা করছে সেটা আদতে তোমাকে একটা আবেগমাখা মিষ্টিমিষ্টি ছায়াবাবলের ভেতরে ঠেলে দিচ্ছে যার মধ্যে থেকে তুমি ভাবছো নিজের মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কিছু না জানাটাই যেন তোমার 'অধিকার'এর মধ্যে পড়ে। ভুল ভাবছো।

তুমি পুতিন নও (এবং বলে রাখা ভালো পুতিন নিজস্ব ভাষায় গোটা পৃথিবীর মানুষের কাছে নিজের বক্তব্য রেখে বিশাল কিছু ঠিক কাজ করেননি। আমরা কেউ জানিই না উনি কী বলেছেন। প্রশ্নটা জাত্যাভিমানের নয়, প্রশ্নটা প্রয়োজনীয়তার) এবং তোমার জন্ম এমন কোনও দেশে হয়নি যার একটাই রাষ্ট্রভাষা এবং অফিশিয়াল ভাষা। এ নিয়ে অভিমান করা যেতে পারে, রাগ করা যেতে পারে, আন্দোলনও করা যেতে পারে। কিন্তু তার আগে তোমায় একটা সিভি তৈরি করতে হবে ইংরেজিতে, মেইল করতে হবে ইংরেজিতে, ইন্টারভিউ দিতে হবে ইংরেজিতে, গেম অফ থ্রোন্স দেখতে হবে ইংরেজিতে। 

আমার বোনকে সংস্কৃত নামক একটা সম্পূর্ণ ভাষানির্ভর বিষয়ে শিক্ষকতা করার জন্যও এ শহরের সমস্ত স্কুলে ইন্টারভিউ দিতে হয় ইংরেজিতে। ক্লাস ফোরের একটা বাচ্চাকে বাড়িতে গিয়ে পড়ানোর প্রশ্নে তার বাবা ফোনের ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করেন 'আপনি ইংলিশ মিডিয়াম তো?'- না শুনে ভদ্রভাবে 'ওকে' বলে ফোন রেখে দেন। বাংলা আমার মাতৃভাষা এই আবেগ পেরিয়ে যে বাস্তবে ভাত আসে সেখানে বলা বাহুল্য, ধুতি পাঞ্জাবির কাউকে দেখা যায় না। আর জন্মসূত্রে যা পেয়েছি তার বাইরে নিজে থেকে কিছু অর্জন করব না, চেষ্টা করব না, শিখব না এটাই বা কোন দেশীয় যুক্তি হতে পারে!

দশকের পর দশক ইংরেজি শিক্ষাকে ব্রাত্য করে রেখে এ রাজ্যের পূর্বতন মহান শাসকগোষ্ঠী অলরেডি যা ক্ষতি করার করে দিয়ে গেছেন। বাকিদের কাছে অনুরোধ বাংলায় লিখুন, বাংলায় কথা বলুন, বাংলায় গান করুন কিন্তু মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ইজ ইক্যুয়ালস টু ইংরেজি না শিখলেও চলবে এই ভুল তথ্যটি ছড়ানো বন্ধ করুন। একসাথে দু'টো ভাষা শেখা যায়, মাতৃভাষাকে ব্রাত্য না করেই ইংরেজি যে একটি অত্যাবশ্যক ভাষা সেই কথা জোর দিয়ে বলা যায়। যে রবীন্দ্রনাথকে ফটো করে দেওয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছি তার কাজ বাংলায়, কিন্তু 'বিশ্বকবি' হয়ে ওঠা ইংরেজিতে এই সত্যিটা স্বীকার করি চলুন। যে বিবেকানন্দকে সামনে রেখে কর্মযোগের দীক্ষা তার বিশ্বমানব হয়ে ওঠা 'মাই সিস্টার্স অ্যান্ড ব্রাদার্স অব আমেরিকা...' দিয়ে সেটা আরেকবার বলে উঠি চলুন। যে সত্যজিৎ রায়, নীরোদ সি চৌধুরী আর অমর্ত্য সেনকে বাঙালি বলতে পেরে ধন্য হই তাদের ইংরেজী ভাষার ওপর দখল এবং ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ কী অসামান্য উচ্চতার সেটাও একই সাথে মনে পড়াই চলুন।

এবং এই সুযোগে এটাও বলি, বাংলা ভাষার ফর্ম নিয়ে এই আদেখলাপনাটাও বন্ধ করুন। বাংলায় লিখছি আর বলছি মানে তার সব হতে হবে বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায়, বাংলা শব্দে- এই হরপ্পা সভ্যতায় যারা এখনও বাস করেন তাদের একটা ছোট্ট স্মৃতি শেয়ার করেই লেখা গোটাচ্ছি। সেটা সাত আট বছর আগে হবে বোধহয়। এবিপি আনন্দ 'সেরা বাঙালি'র মঞ্চে সুনীল গাঙ্গুলিকে পুরষ্কৃত করার পরে সুমন প্রশ্ন করলেন "আজি হতে শতবর্ষ পরে, কে তুমি ইত্যাদি... সুনীল বাবু, আজ থেকে একশ বছর পরেও বাংলা ও বাঙালি যার লেখা পড়বে সে কি আপনিই? আপনার কী মত?" উনি বলেছিলেন "আজ থেকে একশ বছর পরে বাংলা ভাষা থাকবে বলে আমার মনে হয় না, আমাকে পড়া অনেক দূরের কথা..." একথা সুনীল গাঙ্গুলির! বাজারি কিন্তু বিগত কয়েক দশকে সর্বাধিক পঠিত ও শ্রদ্ধেয় বাংলা লেখকের!

ভাষা অনবরত বদলায়। সময়ের সাথে, তাকে ব্যবহারকারী মানুষের সাথে, পৃথিবীর সাথে, তার প্রয়োজনীয়তার স্বার্থে। বাবলগাম না ফুলিয়ে প্রয়োজনীয়তা এবং ভবিষ্যতের স্বার্থেই মাতৃভাষার বাইরে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে অন্তত ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব স্বীকার করে সেই পাঁচজন ছাত্রীকে বলি চলুন যে ইংরেজিটা শিখতে হবে।

দেয়ার ইজ নো অল্টারনেটিভ।
এর বাংলা কী কে জানে!

মঙ্গলবার, ১২ জুন, ২০১৮

।। প্রেমের স্বাধীনতা।।

#ছড়া

প্রেমের স্বাধীনতা
.....................

স্বাধীন আমি স্বাধীন তুমি স্বাধীন মোদের জাতি
তবুও কেন গোপন প্রেমে ফাটে বুকের ছাতি?
তুমি খানদানী আমি ছেঁড়াপাতি? কোন কানুনের রায়?
স্বাধীন দেশে স্বাধীন প্রেমের স্বাধীনতা চাই।

ধনী গরীব, জাতি ধর্ম, হরেক দ্বন্দ্ব ভাই
বেকার সকার, অরূপ কুরূপ বাঁধার অন্ত নাই
তার উপরে ফর্সা কালো- হৃদয় কেমনে পাই?
বিভেদ ভুলে প্রেমে ভীষণ স্বাধীনতা চাই।

দুধেআলতায় রাঙা শরীর, তোমার মায়া ভরা চোখ
পাগলপারা ভ্রমর প্রেমিক, তোমায় পাবার ঝোঁক।
কোনসে জীবের প্রেমে এমন নিঠুর রুদ্ধতা!!
আগল ভাঙো বদ্ধ প্রেমের, বাঁচুক স্বাধীনতা।

আমার ঠোঁটের চামড়া ফাটা, নিকোটিনের স্তর,
তোমার ঠোঁটে গোলাপ খেলে, লিপিস্টিকের সর,
ঐ ঠোঁটেতে ছাইব আমি ভালবাসার ঘর
ভাসবে ভেলা প্রেম নদীতে, অনপেখর পর।

কৈশোরেতে তোমার সাথে খেলবো লুকোচুরি
যৌবনেতে আমি মালী তুমি পুষ্প কুঁড়ি,
এর পরেতে তুমি লাটাই আমি হব ঘুড়ি
নাতিপুতির আহ্লাদেতে বাঁচব বুড়োবুড়ি।

এসব কিছুর জন্যই চাই স্বাধীনতা প্রেমে
দেশজুড়ে তাই আগুন জ্বলুক, সবকিছু যাক থেমে
মোহর লাগুক পছন্দেতে, প্রথম দয়িতা
স্বাধীন ভাবে না পেলে প্রেম, জীবনটাই যে বৃথা।
___________
উন্মাদ হার্মাদ

সোমবার, ১১ জুন, ২০১৮

।। ছেঁড়া মন্তাজ ।।

পরকিয়া আসলে নিষিদ্ধ সুখ-
নিষিদ্ধতা বিলাস একটা শিল্পের নাম।
শিল্পকলা অনেকটাই প্রতিভাগত, বাকিটা অনুশীলন। যারা এই শিল্পের দীর্ঘপথযাত্রী তাঁরাই অগ্রদূত ও প্রেরণাদায়ক। এর অভিধানে কোনো সফলতা হয়না, সফল হলেই সেটা আর পরকিয়া থাকেনা।
শৃঙ্খলা বা নৈতিকতা নামের জীবাণু পরকিয়া শিল্পের জন্য মহামারী।
অত্যন্ত শৌখিন ও বিলাসী এই শিল্পে গোপনীয়তাই প্রাথমিক নিধি। প্রতিভাষিত হওয়া আত্মহত্যার সমাংশ।
সুসময় থাকলে পরকিয়া বা সেই দক্ষতা, নান্দনিকতার জন্ম দেয়, যা আবেগময় নিকেষ প্রবৃত্তিমার্গের জন্ম দেয় নতুন রূপে। কালের নিয়মে ঠাট অস্তাচলে গেলে ব্যাক্তি- অবশিষ্ট মানের রূপে দৃশ্যগোচর হবেন ঠিকিই, কিন্তু টিকে যাবেন। ঘটনা হচ্ছে আমাদের টিপিক্যাল ভারতীয় সমাজকে আমরা সবসময় অপরিণত বলে ব্যাখ্যা করে আমাদের মুখোশধারী দ্বিচারিতাকে তোল্লা দিই।
মজা হচ্ছে, কখন ঠাট আছে আর কখন নেই এটা বোঝা দায়, ভীষন আপেক্ষিক।
বুঝে উঠতে পারাটাই জ্ঞান, ও খেলোয়াড়চিত আচরণ।
রোমান্টিসিজম আসলে একটা মুহুর্তের নাম, যেটা বিস্তার লাভ করে আপন গতিতে পরবর্তী মুহুর্তগুলিতে। সঞ্চারিত হয় সময়ের সর্বাঙ্গব্যাপী, শরীরের খাঁজে খাঁজে প্রস্ফুরিত হয় ষড়রস দ্বারা সংক্রামিত হয়ে।
চোখে থাকে নেশা, হৃদয়ে প্রত্যয়। শরীরে জাগে শিহরণ, অভিব্যাক্তিতে পুলকসঞ্চারিত হয়।
অনুভুতি চট করে সিদ্ধান্তে আসেনা, কারন এটা মননের সাথে সম্পৃক্ত। নারীপক্ষে- মা,স্ত্রী, কন্যার জন্য আলাদা অনুভুতি, আলাদা উপিলব্ধি। বোধ ও বোধের ফলিত রূপ- ফারাকটা গড়ে দেয় মানবীয় বিকৃতি হওয়া থেকে
পরস্ত্রীর প্রতি অনুভুত অব্যক্ত প্রেম পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু মিলনেচ্ছা অবশ্যই নিষিদ্ধতা- সমাজের কাছে। তাই সমাজকে উপলব্ধি করলে এই প্রেম নিষিদ্ধ, আর প্রেমকে আস্কারা দিলে সমাজ থেকে নিষিদ্ধ।
অতএব, অনুভুতির সিদ্ধ, অসিদ্ধ, নিষদ্ধতা আছে। উপলব্ধির একক সেই পরিস্থিতির নিরিখে সঠিক বা বেঠিক।
বিদ্যার্জনে চৈতন্যোদয় হলে তবেই পাণ্ডিত্যপূর্ণ বুৎপত্তি তথা প্রজ্ঞার রুপায়ন সম্ভেদপর হয়। জ্ঞান যখন অর্জন করছি তখন ভালো আর মন্দের ফারাকটা পড়ে বুঝি শিক্ষার আপন গুণে। কিন্তু যখন প্রয়োগের সময় আসে, তখন স্বভাবসিদ্ধ মানবীয় স্বার্থপরায়ণ গুণ সকলসময় আপন অনুকুলে পরিস্থিতিকে বাইতে দিতে চায়। পুঁথিগত জ্ঞান তখন অসহায় পরিস্থিতির কাছে।
তাই গভীরে আলোচনা সকলসময় পরিস্থিতিকে কেন্দ্রকরে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর পর্যালোচনা দাবি করে। নতুবা একতরফা চাপিয়ে দেওয়া সমাধান আসে, যেটা বিচারের সুষ্ঠুধারাকে খন্ডন করে।
জীবনটা গণিত শাস্ত্রের এক্তিয়ারের বাইরে কিছু নয়। প্রেমের আলাদা ভাষা আলাদা সংখ্যামান। সংখ্যার ভাজকতা অনুযায়ী মৌলিক ও যৌগিকও হয়। তাই প্রেমের পরিমিতি, জ্যামিতি, উপপাদ্য সকল সিদ্ধ প্রেমের সুত্র দ্বারাই ব্যাখ্যা বা কষে ফেলা সম্ভব। তবেই মৌলিকতা আসবে, নতুবা দুয়ে দুয়ে চার হয়ে যৌগিক হয়ে সম্পর্কটি কৌলীন্য হারাবে।
উদ্ভাবনীয় শক্তি ক্ষমতাধর, তাবলে ঐতিহ্যগত বুনিয়াদকে সমূলে উৎপাটন সম্ভব নয়।
অতএব নিষিদ্ধতা যতক্ষণ নিষিদ্ধতারুপে গ্রহণযোগ্য থাকবে, সর্বোৎকৃষ্ট সুখের মাত্রা সেই কালীনই সর্বোচ্চ হবে সেটা বলাই বাহুল্য। এটাই ফলিত সত্য।
অন্যথাতে কেবলই রোজনামচার অভ্যাস।

।। মিকসো ।।

সংক্রমণ আসলে সেই দেহেই সম্ভব যার প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর্বল। বালুঝড়ে আর যাই হোক শরীর মন কিছুই ভেজেনা উলটে শুষ্ক বালি শরীরের আদ্রতা শুষে নেয়। বালির রাজ্যে আলেয়াও অতিস্বাভাবিক, দৃষ্টিভ্রম। দৃষ্টিই মস্তিষ্কজাত, দ্রুত নিজের ঢঙে পরিস্থিতি পড়ে নেয়, এবিং সংক্রমণ টা ঠিক কোন শ্রেনীর সেই বুঝে নিজেকে গুটিয়ে নেয় বা মেলে দেয়। আসল জীবাশ্ম কিন্তু আমাদের স্মৃতি, যেগুলো বারে বারে অতীতকালকেকে স্মরণ করিয়ে দেয়, দলাপাকা বাষ্পেরা তো বুকের ওই খাঁচাতেই পথ ভুলে ঘুরপাক খায়, অনেক অনেক উত্তাপে অদৃশ্য কান্নারা বাষ্প হয়ে হৃদয়ের আকাশ আচ্ছন্ন করে রাখে, ওই বাষ্পই তো আলেয়ার পথ তৈরি করে দেয়।
কখনও অবাক হয়ে অবাক হয়ে দেখবেন, হঠাৎ করে আর অবাক হলে অবাক হবেননা। সৌন্দর্যতত্ত্ব আপেক্ষিক, কখন ও কোন পরিস্থিতিতে দৃষ্টি পুষ্ট হয়ে হৃদয় ও মস্তিষ্কে একযোগে সঙ্কেত পাঠালে তবেই সৌন্দর্যরূপ মূর্ত হয়। আপনি যদি উজানের যাত্রী হন, যেখানে ভাবার অবকাশ কম, পরিশ্রান্তি সৌন্দর্য বোঝেনা, তার তৃপ্তি বিশ্রামে; ভাটির টানে গতি এলোমেলোমি হলেও বিবেচনার বিলাসিনী হতেই পারা যায়। অতএব ইতিউতি উঁকিঝুঁকি নিঃসঙ্গতার মর্মপীড়া, হোক সে মিথ্যে, সুখ আসছে কিনা বিচার্য সেটা।
ব্যাভিচার?
দুরাচারী হবার চেয়ে ব্যাভিচারী হওয়া উত্তম, অন্তত একটা নির্দিষ্ট আচার রয়েছে গোটা প্রবৃত্তি মার্গে। কে বিচার করে, কেউ কি নিশ্চিত জানে যে ব্যাভিচার কোন অজানা দুরারোগ্য ব্যাধির পথ্য নয়?? হতেই পারে, যতটা না হবার শঙ্কা।

জীবন অঙ্ক কষেই চলে, তার যাবতীয় সুত্র পরিস্থিতিনির্ভর। ক্ষতহীন জীবন বলিপুষ্ট হয়ে যাবার সুযোগ বাড়িয়ে দেয়। বরং লজ্জা অনুশীলন করা উত্তম।
নিজেকে অনাবৃত করা ভূষন হতে, দৃষ্টি স্বচ্ছ রেখে- যৌনতা ব্যাতিরেকে, ওটাই লজ্জা। বাকি সবই শরীরবৃত্তীয়, আর চাহিদার লজ্জা থাকতে নেই, থাকলে দংশিত হতে হয়। মৌনতা থাক ক্ষিপ্র প্রকাশে, যৌনতা অনুভবে।
অনুভবই উপলব্ধি ঘটায়, উপলব্ধি আনে প্রত্যয়। প্রত্যয়িত ব্যাক্তি স্বতন্ত্রভাবে নিজের চাহিদাজনিত তৃপ্তি হাসিল করে নেয় যে কোনো উপায়ে।
সুতরাং, স্বপ্ন দেখুন; স্বপ্ন। ওতেই জীবন সুধা লুকিয়ে।

শনিবার, ৯ জুন, ২০১৮

।। শাককাহন।।


ছোটবেলায় বাবা বলতেন "শাগ খেলে বাঘের বল"।  যদিও তিনি ওটাকে শাকই বলতেন আমরা কচি কানে বাঘের সাথে মিলিয়ে শাগ শুনতাম।

এহেন পরিস্থিতিতে প্রতিদিননের মধ্যাহ্নভোজনে একটা বড় স্থান জুড়েই ছিল শাক অধ্যায়। আজও রয়েছে, তবে পছন্দের শাক গুলোই, অপছন্দ সব ডিলিট।

তখন সবে পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু "বাঙালেরা" থিতু হয়ে আমাদের একালাতে একটা মিশ্র সংস্কৃতি নিয়ে এসেছেন। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মতা যারা এলাকার ২-৩ শ বছরের স্থায়ী বাসিন্দা তাদের হেঁসেলেও সেই পরিবর্তন কিছুটা হলেও ছাপ ফেলেছিল। বাজারে হরেক ধরনের শাকের চোখজোড়ানো ঢলঢলে উপস্থিতি, বাজারু মানুষকে কতদিন আর না টেনে পারবে।

অত:পর শৈশব থেকে সেই শাকের গল্প শুরু। এই শাক দিয়ে দিব্ব্যি মাছ টুকু ঢাকা দিয়ে দিতাম, সুতরাং পরিমান অনুমেয়।

যেটা খাওয়া মোটে পছন্দ করতামনা সেটা দিয়েই শুরু করি।

কুলেখাড়া নামের একধরনের গাঢ় কালচে সবুজ বর্ণের শাকের রস আমাদের দুই ভাইবোনের কাছে রীতিমত বিভীষিকা ছিল। যেমন তেতো, তেমন বিশ্রীভাবে একটা বোঁটকা গন্ধ যুক্ত। আজ নিজে খাওয়া ছেড়েছি, আর বাড়ির ছোটরা আমাদের শিশুকালের ত্রাসের দিনে ফিরে গেছে।

এর পর ছিল কালো কচি নিমপাতা সহযোগে কচি বেগুন ভাজা, ওটি ভাতে মিশিয়ে খেতে হত। সেটাও ছিল একধরনের থার্ডডিগ্রি।

ভাতে ঘি মেখে খাবেন শান্তিকরে? না তার উপায় টুকুও ছিলনা, ঘি এর মধ্যেই থাকত ভেজে পোড়া 'ব্রাহ্মী শাক"। যেটা মোটের উপরে তেতোই বটে। স্মৃতিশক্তির বৃদ্ধিতে নাকি এই শাক ভীষন উপকারি।

এছাড়া তেতোর দুনিয়াতে সজনে শাক, হেলেঞ্চা, শিউলিফুল, দ্রোণ ঝোঁপ এমনকি চিরতাও থাকত চক্রাকারে নিয়ম করে। আসলে পিত্ত, কৃমি আরো হরেক ভয়ঙ্কর(!) বিষয়- যেগুলো সম্বন্ধে মা নিজেও জানতেননা, সেই সব অজানা ভয়ে উপর্যুপরি আমাদের তেতো গেলাতেন।

এরই মাঝে কিছু সুখ ছিল, যেমন মিঠা পাট। রসুন দিয়ে পাটশাক ভাজা বৈশাখের দুপুরে,  আহা সে যেন অমৃতসম। যিনি এ রসে বঞ্চিত তিনি কল্পনাতেও আনতে পারবেননা কি সুখ লুকিয়ে আছে পাটশাকে। এর পর ধরুন কলমি শাক ভাজা, বা শরু লন্বা লম্বা করে কাটা আলু আর কয়েকদানা ছোলাডাল সহযোগে চচ্চড়ি- এ স্বাদের কাছে আর কি লাগে!

শীতে পালং শাক বেগুন দিয়ে, মুলো শাক ভাজা। এর সাথে ছিল বাঙাল ডাঁটা বা কাটোয়া ডাঁটা নামের ফুট তিনেক লম্বা শাকের আমদানি। বেশ মিষ্টি মিষ্টি লাগত এই শাক। বিয়ে বাড়ির ল্যাবড়া নামক তরকারিতে এই বাঙাল ডাঁটা ছিল অপরিহার্য,  আজও আছে।

পুঁইশাক সহজলভ্য, হরেক উপায়ে রান্না হত, আজও হয়। কুমড়ো আলু দিয়ে, কচু আর ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে, ছ্যাঁচড়া, শুটকি বা নোনা ইলিশ দিয়ে রসা, পুঁইডাঁটা চেবানোর মজাই আলাদা। আজকাল বাজারে গেলে মায়ের অর্ডারি- ঢাকঢাক পাতা, মাচার পুঁই আনবি ডগ ডগ দেখে।

এর পর নটে, লাল নটেতে ভাত রাঙিয়ে খাবার শিশুশুলভ খেলা খেলেনি এমন মানুষ কম। সাদা নটে বাড়ির আশেপাশেই পাওয়া যেত, যেটা সিদ্ধ করে কাচা পেয়াজ, কাঁচালঙ্কা, নুন আর পাতিলেবু সহযোগে ভাতে মাখলে এমনিতেই পাত খালি হয়ে যেত। যদিও কাঁটানটে দেখলেই তখন নিজেকে বদল বলদ মনে হত, আসলে গোয়ালের গরুদের দুপুরের খাবারে বা জাবনাতে কাঁটানটে-খুদ সিদ্ধ থাকত,  গাই এর দুধ আর হেলের বল বাড়েতে।

লাউ শাকের চচ্চড়ি, ভাজা, ভাপা, কুমড়ো শাকেরও ওই ধরনেরই রেসিপি হত। পলতা বা পটলের শাক, রাঙা আলুর লতি, বাদাম শাক, এগুলোও মুখরোচক পদেই অন্তর্ভুক্ত ছিল। ছোলাশাক, তেউরা শাক, খেসারী শাক ইত্যাদি তো লোভনীয় পদ।

পাশের বাড়ির ডাক্তার ঠাকুমা আবার খারকোন নামের একটা শাক খেতেন বড় আমোদ করে। যেগুলো বাড়ির স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের কোনে জন্মাতো। পচা খড়ের পালুইতে যে ব্যাঙের ছাতা গজাতো, 'বিলেতিশাক' নামে সেই মাশরুম যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল পরিচিতমহলের রসুইঘরে। আমাদের রান্নাঘরে অবশ্য তা কখনও ঢোকেনি।

বাড়ির শাক বলতে মনে পড়ল, থানকুনি, শুশুনি, কুমড়োশাক, পুঁইশাক, বেতোর শাক, কচুডাঁটা, কচুরলতি, ওলের ডাঁটা, দণ্ডকলস, টক আমরুল,  ঢেঁকিশাক, তেলাকুচা লতা, ঝুড়ি শাক ইত্যাদি কিনতে হতনা। হয় বাড়িতেই হত নতুবা বাড়ির আশেপাশে ফেলা জমিতে দেখাযেত, যা চাষ করতে হতনা, আপনা থেকেই জন্মাতো।

শাক হিসাবে না গন্য করলেও; ধনেপাতা, লেবুবাতা, আমড়াপাতা, কারিপাতা, পুদিনাপাতা ইত্যাদি কিছু গরুর মত চিবিয়ে খাওয়াই হয় বা হত।

আজকাল শহর তো ছেড়েই দিলাম, গ্রামাঞ্চলেও বাড়ির আশেপাশে বনবাদাড় তেমন থাকেনা, অনাবাদী জমিও তেমন নেই, মাঠ আলেও হরেক ঘাসমারা আর কেয়ারিকরা বাগিচার দাপটে এই মাঠঘাটের শাক বৈচিত্র্য আজ বাংলার বুকে হারিয়ে যেতে বসেছে। গ্রাম বাংলা বা মফস্বল শহরে যে ছোট ছোট ডোবা থাকত, তার পাড়েও থাকত বুনো শাকেদের রাজ্য। শাকের ঐতিহ্য বাঙালীর চিরন্তন। গ্রামবাংলার দরিদ্র মানুষ এই লতাপাতা কন্দকান্ড খেয়েই পুষ্টি ও ঔষধি পেতেন। আজ আমরা সেটা দায়িত্ব নিয়ে নষ্ট করেছি ও করে চলেছি।

এর উপরে আছে পার্থেনিয়ামের সর্বগ্রাসী অভিযান, নতুবা রেললাইনের ধার দিয়ে বা পাকা রাস্তার নয়ানজুলী বরাবরও একটা সময় মেঠো শাকের স্বর্গ ছিল। তারই মাঝে একটা আধটা বহল, আকন্দ, ঢোলকলমি, ফলসা, বুনো জাম, ছোট ফলন্ত তালের গাছ, শ্যাওড়া গাছের আঁশফল,  বকুল, জামরুল বনে শৈশব ছুটে বেড়াতো। কেটেছড়ে গেলে দূর্বাঘাস চিবিয়ে দেওয়া বা চিড়চিড়ে গাছের কষ লাগিয়ে চিকিৎসা করা। সবই শাকের সাথেই বিদায় নিয়েছে আজকের শৈশব থেজে। আজ সেই রাস্তায় প্রচুর বাইক, মোটরভ্যান ট্রাকের দাপট। ধানচাষীর লোভ নয়ানজুলীকে বীজতলা বানিয়েছে। শৈশবও অগি-সিঞ্চ্যানে বন্দি।

তাই ভূত চতুর্দশী পালনে ১৪ শাক আজ প্রতীকি শাস্ত্রপালা হিসাবেই রয়ে গেছে।

আপনার অভজ্ঞিতা কি এই শাক নিয়ে?
_____________
©উন্মাদ হার্মাদ

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...