রবিকাহন
প্রেম প্রেম খেলা
সম্পর্কের টানাপোরেন আনেক দিনের, শেষমেশ যেটা ভেঙেই গেল। হঠাৎ করেই কাল বৈশাখি যেন সব কিছু ওলঠ পালট করে দিল। সুদীপ্তর জীবনে এটাই ছিল সব চাইতে বেশি হারানোর যন্ত্রণা, কারন রীতিকাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে ছিল সে। জীবনের প্রথম ভালো লাগা, প্রথম প্রেম। এভাবে সব কিছু শেষ হয়ে যাবে কোনো দিন কল্পনাও করেনি সুদীপ্ত । শ্রাবনে অঝোর ধারায় যেমন বৃষ্টি ঝরে তেমনি প্রতি রাতেই বালিশ ভিজে যেত কান্নায়, দুচোখ বাঁধ মানেনি। রীতিকার হঠাৎ করে এই পরিবর্তনের মানে খুঁজতে গিয়ে বারবার জড়িয়ে পরেছে স্মৃতির অন্তরালে। মনে পরে যায় সেই সব দিন গুলোর কথা, একদিন রীতিকা সুদীপ্তকে না দেখলে থাকতে পারতো না। আজ ভাবলে অবাক লাগে সুদীপ্তর।
এ কী সেই রীতিকা যে সুদীপ্তর মুখে একবার “এই শোনোনা” শোনার জন্যে হাপিত্যেশ করে বসে থাকত। হ্যাঁ, সত্যিই সব কিছুর পরিবর্তন হয় সময়ের সাথে, তাই আজ সব কিছু নকল লাগে, নকল ভালোবাসা, মনে হয় সবই অভিনয়! কাছে আসা, হাজার প্রতিশ্রুতি আর ভালোবাসা। তবু তো চলতে হবেই, জীবন থেমে থাকেনা। সুদীপ্তও তাই ব্যাথাকে সঙ্গী করেই আইন পড়া শেষ করে। দেখতে দেখতে অনেক গুলো বছর কেটে যায়, শুনেছে রীতিকার বিয়ে হয়ে গেছে এ শহরেরই এক বড় শিল্পপতির সাথে। সেটাও নাকি আবার লভ ম্যারেজ।
সুদীপ্ত ‘ভালবাসাকে’ তার জীবনের অভিশাপ মেনে নিয়ে
দ্বিতীয়বার আর কাউকে আনতে চাইনি জীবনে, কিম্বা বলা ভাল আনতে পারেনি। অবশ্য মনে মনে স্ত্রী জাতির প্রতি কেমন যেন একটা বিতৃষ্ণা। দেখতে দেখতে আরো তিনটে বছর কেটে যায়। আজও স্মৃতির কপাট গলে থেকে ঝরে পরে অতীতের টুকরো টুকরো মান, অভিমানে জড়ানো কথার দলেরা। এখনো
মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায়, অজান্তেই চোখ
দিয়ে জল গড়িয়ে পরে। সে রাতে আর
ঘুম আসেনা। মোবাইলে আজগুবি জিনিস খুঁজতে থাকার বাহানাতে ডুবে যায়
সুদীপ্তও বড় আইনজীবি আজ, সুনামও করেছে
আনেক। লক্ষীর কৃপায় ধন সম্পদ উপচে পরেছে। হাজারো বস্তু সুখের ভিড়েও মানসিক সুখ যেন চাতক পাখি, আজও প্রথম প্রেমকে ভুলতে পারেনি। মাঝে মাঝে ককিয়ে ওঠে মনের অন্তঃকোনে
লুকিয়ে থাকা নিষ্পেষিত যন্ত্রণারা। তাই
কাজের ব্যাস্ততার মধ্যে জোর করে ভুলে থাকার চেষ্টা।
সেদিন সুদীপ্ত তার বৈঠকখানায়
বসে মক্কেলদের সাথে কথা বলছিল, হঠাৎ
চমকে ওঠে একটা চেনা গলার স্বর শুনে। আসতে পারি সুদীপ্ত
বাবু? পক্ককেশ এক বৃদ্ধ দ্বারপ্রান্তে, রীতিকার
বাবা। যিনি এক সময়
সুদীপ্তকে নিজের সন্তানের থেকে কম স্নেহ করতেননা, সুদীপ্তও তাঁকে বাবামশাই বলে ডাকতো। তাই নাম ধরে ডাকা মানুষটার কন্ঠে ‘বাবু’ ডাক শুনে সুদীপ্ত একটু চমকেই উঠেছিল। সে উঠে গিয়ে প্রণাম করে, তাঁকে নিয়ে
অতিথিশালায় গেল। সোফায় বসে অমল বাবু
সুদীপ্তর দিকে কাষ্ঠল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তাঁর চোখ
এড়াইনা সুদীপ্তর পরিপাটি করে সাজানো গোছান ঘরবাড়ি। সুদীপ্তর কথাতেই ধ্যান ভাঙার মতো চমকে ওঠে,
~কেমন আছেন বাবামশাই,
~তোমার কিছুই পাল্টাইনি সুদীপ্ত, তুমি সেই আগের মতই আছো।
সুদীপ্ত এবার তার আবেগ
আর ধরে রাখতে পারেনা, হ্যাঁ বাবা মশাই
আমি সেই আগেরই সুদীপ্ত। শুধু মনের গভীরে একটা বিরাট এক
জ্বালাময় ক্ষত জীবনের
গতিপথটাই পরিবর্তন করে দিয়েছে।
মজার ব্যাপার হল সেটা আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় না। অমল বাবু মাথা নিচু করে নিশ্চুপ
হয়ে যান।
সুদীপ্ত- ছাড়ুন সে সব কথা, বলুন আজ এতো গুলো বৎসর পর!
চোখের কোনায় তখন জল অমল বাবুর। জানো সুদীপ্ত, “জীবন বড় বৈচিত্রময়, কখন আলো আবার কখন আঁধার, কখনো ভালো কখনো মন্দ, আবার কখনো জোয়ার তো কখনো আবার ভাটা, অসহিষ্ণু সময়ে আজ আমরা বড় অসহায় সুদীপ্ত। পেনশানের সঞ্চয় বেঁচে আর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকায় তোমার মাসিমার চিকিৎসা করা হয়, তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি।
মাসিমার ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই- রোড এক্সিডেন্টে রীতিকাও বিধবা হয়। শেষের দিকে ব্যাবসা ভালো যাচ্ছিল না, মোটা টাকার লোন নিয়েছিল রমেশ। এক্সিডেন্টের পর ওর সব সম্পত্তি নিলাম করিয়ে নেয় ব্যাঙ্ক কতৃপক্ষ। রীতিকা এখন আমার কাছেই থাকে, পেনশানের সামান্য টাকায় কোনোমতে চলে যাচ্ছে।
সুদীপ্তর মনে হল- যেন মথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল, এই পরিস্থিতির জন্য ও মোটেও প্রস্তুত ছিলনা। ঠিক কি উত্তর দেবে, বা কি উত্তর হওয়া উচিৎ সেটা ভুলে খানিক ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে থাকল। আনন্দ হচ্ছে, নাকি করুণা হচ্ছে, নাকি প্রিয়জন বিয়োগের বেদনা- নাহ সুদীপ্ত কিছুই মনে করতে পারলোনা।
ভৃত্য মন্টুর ডাকে সুদীপ্তর সম্বিৎ ফিরল। কল্পনার জগত এক লহমায় বাস্তবের রুক্ষ জমিতে আসতেই সে ভাবল- এই রীতিকাই একদিন তাকে অপমান আর অস্বীকার করে চলে গেছিল, কারন সেদিন তার কাছে আয়েশ করার মত যথেষ্ট ধনসম্পদ ছিলনা। সেদিনের বাগদত্তা দীর্ঘ দিন বিয়েটা ঝুলিয়ে রেখেছিল স্থায়ী রোজগার আসার বাহানা দেখিয়ে। সেদিন দোষ ছিল বেকারত্বের, ওর সরকারি চাকুরে বাবার তুলনায় বড্ড গরীব ছিলাম, অসহায়ও বটে। সেদিন সকলেই দায় এড়িয়েছিল। সামনে বসা বাবামশাইও......
সুদীপ্ত কেমন যন্ত্রের মত বলে ফেলল, এখন আমি কী করতে পারি
বাবা মশাই! আমার কাছে কী ধরণের প্রত্যাশা রাখেন!
~ রীতিকা ভীষন ভেঙে পরেছে। কারোর সাথে কথা বলেনা, ঘর থেকে বাইরে বের হয়না নিতান্ত প্রয়োজন না হলে। তোমার
সামনে এসে দাঁড়াবে তার সে সাহসই বা কোথায়। নিয়তির মারে সব হরিয়ে আমাদের শেষ সম্বল রমেশের করা ইন্সুরেন্সের এর টাকা টুকু।
কিন্তু ইন্সুরেন্স কোম্পানি নানা আজুহাত আর কাগজ পত্র চেয়ে ক্রমাগত হয়রান করাচ্ছে, যদি আমাদের একটু আইনি সাহায্য করো, চিরজীবন ঋণী হয়ে
থাকব।
সুদীপ্ত আমতা আমতা করে শুধাল,
~ সব কগজ পত্র এনেছেন।
~ না বাবা সবতো আনা হয়নি, তবে কাল যদি তুমি একবার আমাদের বাড়িতে আসো তাহলে ভালো হয়। এটা আমার অনুরোধ।
সুদীপ্ত আজান্তেই হারিয়ে
যায় পুরানো স্মৃতির সরণীতে, এমন কত শত
বিকালেই সে রীতিকার সাথে দেখা করতে যেত ওদের বাড়িতে। মনে পরে সেদিন
বিকালের কথা, যেদিন আকাশে কালো মেঘে
ছেয়ে ছিল। মুষলধারে বৃষ্টি
শুরু হলে
সুদীপ্ত ভেবেছিলো আজ বিকালে আর গিয়ে কাজ নেই, বৃষ্টি থামলে দেখা যাবে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছিলো,
তবু সেদিন বৃষ্টি চছিলো নাছোড়বান্দা মেজাজে। মোবাইলে রীতিকার নাম ভেসে উঠল, হ্যালো বলতেই -সোনা তুমি আজ এলেনা
যে।
দেখনা মা -বাবা নেই বাড়িতে, শপিং করতে গিয়ে বৃষ্টির জমা জলে আঁটকে পরেছে, ছোট মাসির বাড়িতে রয়ে যেতে পারে।
কাতর কন্ঠে রীতিকা বলে- আমার
ভীষন ভয় করছে, তারাতারি এসো না প্লিজ। সুদীপ্ত আর কিছু ভাবতে পারেনা, রীতিকার কাতর মায়াভরা কন্ঠে বশ হয়ে যাওয়া সুদীপ্ত ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পরে। আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ, সারা শহর যেন একটা বিশাল দিঘী। সুদীপ্ত ডোর বেল বাজাতেই ত্রস্তপদে বেরিয়ে আসে রীতিকা, সুদীপ্তর জন্যই সে অপেক্ষায় বসে ছিল। বিদ্যুৎহীন শহরের এই বাড়ির চতুর্দিকও
ঘন অন্ধকারে ঠাসা।
মোমবাতির নরম আলো তুলে ধরে রীতিকা শুধালো-
এমা তুমি তো একদম ভিজে গেছো
সুদীপ্ত মুচকি হাসি হেসে
মুখে- তুমিও তো ভিজেই রয়েছো।
বাইরের বজ্রপাত রীতিকা আর সুদীপ্তকে আলিঙ্গন বদ্ধ করার জন্য অনুঘটকের কাজ করল। দুজনের শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলা করে। এই প্রথম এতো কাছে আসা, বৃষ্টিতে ভেজা শীতল শরীরে সুদীপ্ত তপ্তদিনের সুর্যের উষ্ণতা খুঁজে পায় এক আজানা শিহরনে। রীতিকার চিবুক তুলে ধরে কম্পিত ওষ্ঠে এঁকে দেয় প্রথম চুম্বনের রেখা।
সুদীপ্তকে উন্মত্তের মত আঁকড়ে ধরে রীতিকা, আন্ধকার ঘরে দুজনেই চুপ। সলজ্জ আকুতি তাকে সাহষী হতে তখনও বাঁধা দিচ্ছে। আরেকটা বজ্রপাত... তার পর আর কোন বাধা মানেনি দুটি ঘামে ভেজা শরীর। জীবনের প্রথম আলিঙ্গনে হয়ে ওঠে যৌবনের আদিম খেলা। থরথর করে কাঁপা উষ্ণ ঠোঁট, প্রতিটা রোমকূপ বিন্দু বিন্দু যৌনতার মধু শুষে নিচ্ছে। শৃঙ্গার ভালোবাসার আজানা সুখের পরশ, উত্তেজিত মাংসপেশীর আঘাত করাঘাতের পর, দুজনেই দুজনকে আরো মোহিত করে, শৈথিল্য সুখের সাগরে ভেসে যায়। বিছানার চাদর সাক্ষী থেকে যায় সেই মধুর সন্ধ্যার... কারন চাঁদ তারা কেউ ছিলনা সেদিন।