দেশের নিউজ মিডিয়ার লাগাতার ভয়ের প্রচার দেখে শুনে, সম্পূর্ণ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল সহ অধিকাংশ আমজনতা ‘ভ্যাক্সিন দাও ভ্যাক্সিন দাও’ বলে এক বিচিত্র আন্দোলন শুরু করেছে। ভ্যাক্সিন নিয়ে গত বছরের লেখাটা নিচে রইল, সেখানে আরো অনেক লেখার লিঙ্ক পাবেন। এছাড়াও এই গত মার্চে, গত এপ্রিলেও কিছু লেখা রয়েছে।
সেই ধারাবাহিকতাতেই কিছু প্রশ্ন রাখি আপনার সামনে, প্রশ্নগুলো নিজেকে করবেন, উত্তর পেলে ভ্যাক্সিনের জন্য আরো তেড়েফুঁড়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ুন।
১) COVID একটি RNA ভাইরাস। অন্যান্য RNA ভাইরাসের কী কী ভ্যাক্সিন বাজারে আছে? র্যা বিস, জিকা, সাইটোমেগাল, ডেঙ্গু এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি ভাইরাসের mRNA ভ্যাক্সিন বাজারে থাকলেও সেগুলো কোনো মেডিকেল কাউন্সিল দ্বারা স্বীকৃতি পায়নি কেন? অন্য কোনো RNA ভাইরাসের ভ্যাক্সিন যেখানে আবিষ্কৃতই হয়নি, সেখানে একই জাতের কোভিডের ভ্যাক্সিন কোন পদ্ধতিতে আবিষ্কৃত হলো?
২) যদি সত্যিই mRNA কোভিড ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হয়েই থাকে, তাহলে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটা যুগান্তকারী আবিষ্কার। তাহলে এমন মহান কীর্তি কে আবিষ্কার করল, সেই বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানী দলের নাম কী? তিনি বা তাদের জন্য নোবেল পুরষ্কারের দাবী উঠেনি কেন?
৩) কোন বড় ডাক্তার সংগঠন এই ভ্যাক্সিনকে এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে স্বীকৃতি জানিয়েছে?
৪) রাষ্ট্রীয় বা রাজ্যোয়ারি বিজ্ঞান মঞ্চগুলো ভ্যাক্সিনের পক্ষে পরিষ্কার লিখিত বিবৃতি দিয়েছে?
৫) দুই ভ্যাক্সিন কোম্পানি বাদে- অন্য কোনো ভাইরাস বিজ্ঞানী, গবেষক, মাইক্রোবায়োলজিস্ট কিম্বা বায়োটেকনোলজিস্টদের কোনো সংগঠন এই ভারতীয় ভ্যাক্সিনগুলোকে জেনুইন বলে লিখিত ঘোষণা দিয়েছে?
৬) কোভিশিল্ড নামের ভ্যাক্সিনের ওয়েবসাইটে সিরাম ইন্সটিটিউট গোটা গোটা অক্ষরে লিখে রেখেছে এটা কেবলমাত্র ‘ইমারজেন্সী’ রোগীদের ব্যবহারের জন্য। অতএব ভ্যাক্সিন নেবার পরও মরে গেলে তারা দায় নেবেনা, নেয়ওনি।
তাহলে মারাত্বক অসুস্থ রোগী ব্যাতিরেকে সকল সুস্থ মানুষকে এই ভ্যাক্সিন কেন জোর দেওয়ার জন্য আন্দোলন হবে?
৭) ভারত বায়োটেক নামের ভ্যাক্সিন কোম্পানি তার চতুর্থ অধ্যায়ের ট্রায়াল শুরু করেছে গত সপ্তাহে। ট্যুইটার-ফেসবুক সহ সমস্ত শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রে সে খবর বেরিয়েছিল। তাহলে ভ্যাক্সিনের নামে যেগুলো বিক্রি হচ্ছে সেটাও কী ওই ট্রায়ালের অন্তর্ভুক্ত? কোম্পানি তো বিজ্ঞাপন দিয়ে খোলসা করেছে, সরকার কি খোলসা করেছে এ বিষয়ে? এটা ট্রায়াল কিনা জানতে চেয়ে- কোনো মামলা হয়েছে হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে?
৮) ভ্যাক্সিন নেবার পর এর সাইড এফেক্টে কোনো সুস্থ মানুষের মৃত্যু হলে ‘কেন্দ্র-রাজ্য’ কোনো সরকার কোন দায় নিচ্ছে না, আগে থেকেই ডিক্লিয়ারেশন ফর্মে সই করিয়ে নিচ্ছে যে স্বেচ্ছায় নিচ্ছি। তাহলে ভ্যাক্সিন নেবার এই ভয়ানক প্রচারের ফাঁদে পরে যাদের মৃত্যু হচ্ছে সে দায় কার, শুধুই ব্যাক্তির?
৯) পৃথিবীতে অন্যান্য যত ভ্যাক্সিন বাজারে বেরিয়েছিল, এগুলোর ট্রায়াল পর্বে যাদের উপর ট্রায়াল করা হতো তাদের প্রত্যেককে বিপুল অর্থের বীমা করাতে বাধ্য ছিল বায়োটেক কোম্পানিগুলো। যাতে ঘটনাচক্রে সেই ব্যক্তি মারা গেলে তার পরিবার যেন আর্থিক ক্ষতিপূরণ পায়। এবারে তো আমরা নিজেরা বলছি- স্বেচ্ছায় নিচ্ছি।
১০) কোনো প্রশ্নের উত্তর না জেনেই কাতারে কাতারে সুস্থ মানুষ ভ্যাক্সিনেশন করিয়েছে- প্রথম ডোজ। তার ভ্যাক্সিন পরবর্তী জীবনের সাথে অন্যের জীবন ধারার বিন্দুমাত্র ফারাক নেই, সেই মাস্ক, সেই দুরত্ব মেন্টেন, সেই ঘরবন্দি, সেই ভয়। সেই তারা উতলা হচ্ছে দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার জন্য।
প্রথম দফার ভ্যাক্সিন নেওয়ার পরেও কত মানুষ মারা গেছে সে তথ্য কার কাছে আছে? আর দ্বিতীয় দফার ভ্যাক্সিন ডোজ নেওয়ার পরেও কত মানুষ মারা গেছে? ভ্যাক্সিন নেওয়ার আগে এটা জানার চেষ্টা করবেননা না? গত এক মাসে যারা করোনাতে মারা গেছেন তাদের সকলে না হলেও বিরাট একটা অংশের মৃত- ভ্যাক্সিন নেওয়ার দলে ছিলেন। একটু খোঁজ নিয়েই দেখুননা, সবটা সব সময় অন্যের কথা কেন বিশ্বাস করবেন!
১১) কখনও ভেবে দেখেছে, আমাদের দেশে এই মুহুর্তে ভ্যাক্সিন নিতে কে বলছে? সাংবাদিক, রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতানেত্রী, আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ, ক্রীড়াবিদ, অভিনেতা, শিল্পী সাহিত্যিক, কলা ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপকেরা, চায়ের দোকান বা ফেসবুকের সর্বজ্ঞ জ্যাঠামশাই প্রমুখেরা। অথচ যাদের বলার দরকার- সেই জীবাণুবিজ্ঞানীদের দল, স্বীকৃত ডাক্তার সংগঠন কিম্বা বায়োটেকনোলজিস্টরা কিছুই বলছেন না। মেরা ভারত মহান।
১২) WHO গতবছর প্যান্ডেমিক ঘোষণার শুরুর দিন থেকেই COVID বিষয়ে নিয়মিত মানুষকে বিভ্রান্ত করে এসেছে, যা আজও সফলতার সাথে করে চলেছে। কেন এটা কার স্বার্থে?
১৪) ট্রাম্প চলে যেতেই আমেরিকাতে করোনা প্রায় গায়েব হয়ে গেছে। সব লোক ভ্যাক্সিন নিয়ে নিয়েছে এমনটা মোটেও নয়, কিন্তু ভ্যাক্সিন দালালদের সাথে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র চালনা করা সরকারি দল অশুভ আঁতাত বন্ধ হয়েছে- তাই করোনা গায়েব। আমাদের মোদীজির সাথে গেটস ফাউন্ডেশনের পিরিত মাখামাখা, যাদের অর্থ লগ্নি আছে অক্সফোর্ড এস্ট্রোজেনিকা, এদই সাবসিডিয়ারি সিরাম ইন্সটিটিউট। ভারত বায়োটেকও গেটস ফাউন্ডেশনের বাইরে নয়। আমার আগের বহু পোস্টে ভুরি ভুরি তথ্য-প্রমাণ দেওয়া আছে।
১৫) মাননীয় মোদী ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে আসীন থাকবেন। অর্থাৎ করোনার পঞ্চম ঢেউকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। সে আপনি যত চেষ্টাই করুন- মৃত্যুমিছিল বা ভয়ের চিতা ছাড়া কিছুই দেখবেন না। নতুবা ভ্যাক্সিনের নামে ভয় বেচে দলীয় তহবিলে টাকা সাইফন কীভাবে হবে? দুটো ভ্যাক্সিন ভ্যাক্সিন কোম্পানিকে এই বছরে কত হাজার কোটি টাকার সাহায্য করেছে কেন্দ্রীয় সরকার সেটাতে চোখ বুলান- আরাম পাবেন। অথচ কেন্দ্রীয় ভাইরাস গবেষণা কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ তো বাড়েইনি, উল্টে কমেছে।
১৬) আগে ছিল চিনা স্ট্রেন, ইতালি স্ট্রেন, ব্রিটিশ স্ট্রেন ইত্যাদি। এখন হয়েছে কোলকাতা স্ট্রেন, উড়িষ্যা স্ট্রেন, দিল্লী স্ট্রেন, গুজরাত স্ট্রেন, বিহার স্ট্রেন ইত্যাদি। এরপর আসবে বর্ধমান স্ট্রেন, হুগলি স্ট্রেন, জলপাইগুড়ি স্ট্রেন। তারপর আসবে বিধানসভা ধরে ধরে স্ট্রেন, এভাবে পঞ্চায়েত স্ট্রেন। শেষে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে তন্ময় স্ট্রেন, মৃন্ময় স্ট্রেন, চিন্ময় স্ট্রেন আসতেই থাকবে।
কত ভ্যাক্সিন বানাবি বানা না। আমরা সব নেব- কারণ মিডিয়াতে যে ভয়ের দোকান। দেশে ১৪০ কোটি জনগণ, পড়শী দেশগুলোও আমাদেরই ফলো করে। এরপর পার্সোনালাইজড রঙবেরঙের মাস্কের মত, পার্সোনালাইড অর্ডারি করোনা ভ্যাক্সিনও বাজারে আসবে। ‘ধান্দা চল রাহা হ্যায় ভাই’।
১৭) আজও কোনো বস্তি এলাকাতে বা গ্রামীণ এলাকাতে সেই অর্থে সচেতনতা নেই, সেখানে মড়ক লেগেছে? কতজন মুসলমান মরেছে করোনাতে? কেন মৃত্যুহার কম এই বিশেষ সম্প্রদায়ের? আপনি খোঁজেননি, কারণ মিডিয়া আপনাকে দেখায়নি, তাই মাথাতেও আসেনি।
১৮) করোনাতে মৃত রোগীর কি পোস্টমর্টেম হচ্ছে? হলে সেই সব নমুনার রিপোর্ট কী ? কতজন গবেষক তার উপরে থিসিস লিখেছেন?
১৯) করোনার প্রকোপে বিশ্বজুড়ে ছিটিয়ে থাকা আরো হাজার রোগ অন্যান্য মৃত্যু কী বন্ধ আছে? বাকি রোগেরাও কি লকডাউনের আওতাতে কোয়ারেন্টিনে আছে? যাদের স্বাভাবিক ইনফ্লুয়েঞ্জার মৃত্যু, হাপানির মৃত্যু সহ নানান ধরনের চেনা রোগের যে সব মৃত্যু হতো সেগুলো কোথায়?
২০) একটা ভ্যাক্সিন কোম্পানি কিছুদিন আগে বলেছিল চার সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ, তারপর বলল ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ, অতঃপর ১২ থেকে ১৮ সপ্তাহ, এখন বলছে ৩২ সপ্তাহ পর, এরপর হয়ত বলবে এক বছর।
এরপরও এখন আপনি ভারতীয় ভ্যাক্সিনের মধ্যে বিজ্ঞান খুঁজছেন।
বিশ্বের কোনো সরকার ভ্যাক্সিন নেওয়া বাধ্যতামূলক করেনি, তবে উন্নত বিশ্ব মৃত রোগীর দায় নিচ্ছে- আমরা আচ্ছেদিনের নাগরিক তাই আমাদের উপরে গণ ট্রায়াল চলছে। আমরাই তো আন্দোলন করছি- দিতে হবে দিতে হবে। কী কিউট তাই না!
২০২১ এর করোনা উৎসব মে মাসটা পেরোলে হয়, সে আবার বাইশে আসবে ঈদের আগে আগে। চলুন বসে না থেকে কিছু তো করতে হবে, এই বারে লাল-সবুজ-গেরুয়া সব রঙ মিশে গিয়ে হ্যাসট্যাগ আন্দোলন করি ফ্রি ভ্যাক্সিন দিতে হবে। মামলা করি- সুপ্রিম কোর্টে।
কে বাঁচাবে আমাদের? আমরা তো নিজেরাই জীবন্ত গিনিপিগ।
টেলিগ্রাম গ্রুপের মেসেজে লেখকের নামহীন একটা ভালো পেলাম, সেটাই দিয়েই লেখাটা শেষ করি-
“সরকারী ফরমান নিয়ে একজন ফাঁসির আদেশ প্রাপ্ত আসামীর উপরে একটা গবেষণা করব বলে ঠিক করল বিজ্ঞানীরা। আসামীকে বলা হল- “আপনাকে ফাঁসি দেওয়া হবে না, সাপের দংশনে মারা হবে”। নির্দিষ্ট দিনে বিজ্ঞানীরা আসামীকে একটি চেয়ারে বসিয়ে হাত পা বেধে মুখ ঢেকে দিলো। বিজ্ঞানীরা একটি বিষহীন আলপিন দিয়ে তার পায়ের আঙুলে দুটো ফুটো করে দিলো। অল্প কিছু সময়ের মধ্যে লোকটি ভীষণ ঘেমে মারা গেলো।
বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে এলো- আসামীর শরীরে ভয়ানক রকমের নেগেটিভ এনার্জি কাজ করেছে, শেষ কয়েকদিন সারাক্ষণ ‘সাপের ছোবলে মারা যাবো’ এই চিন্তাই করেছে। পায়ে আলপিন ফুটতেই সেই ভয় ও নেগেটিভ এনার্জি তার হার্ট ফেল করিয়েছে।
মিডিয়ার কল্যাণে, করোনা নিয়েও মানুষের মনে নেগেটিভ এনার্জি কাজ করছে, এটা ভয়ঙ্কর প্রবনতা যা ছোঁয়াচে। যে কোনো মানুষ এই প্রবনতার শিকার হলে, তার বাঁচা মুশকিল। পজেটিভ ভাবুন, Covid মানেই হেরে যাওয়া নয়, এটা একটা স্বাভাবিক লড়াই। আক্রান্তদের ৯৭-৯৮% মানুষ, করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাধারন চিকিৎসা আর পুষ্টিকর খাবারেই সুস্হ হচ্ছে। তাই Covid লড়ায়ে জয়টাই সামনে থাকুক। মনে শরীরে সতেজ থাকুন, ভয় পাবেন না, কাউকে ভয় দেখাবেন না। সুস্থ থাকুন”।
___________
বিঃদ্রঃ- এই পোস্ট শিক্ষিত মানুষের জন্য। ডিগ্রীধারী মুর্খ বা ভক্তদের জন্য নয়।