শুভেন্দু সরকারের কাছে আসন্ন কুরবানিটা পার করা এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শ্যাম রাখি না কুল দশায় আঁটকে- গো হত্যার নির্দেশ দিলে ভক্তকুল ক্ষেপে যাবে, না দিলে মুসলমান পাড়ায় হওয়া অশান্তির চেয়েও, পশুপালন ইন্ড্রাস্ট্রির স্ট্রাকচারটা ভেঙে যাবে, যেটা সরকারের আমলারা জানে। শুভেন্দু সরকারের এই হাল আমাদের মতো অনেকের কাছে এক উপভোগ্য বিড়ম্বনা।
গরু কি শুধু মুসলমান খায়? দেশের ২০ শতাংশ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, যাদের মাঝে জৈন ছাড়া সকলেই গোমাংস খায়। ৯% আদিবাসীদের সকলে গরুও খায়, শুয়োরও খায়। দেশের ১৭% তফশিলি, যাদের মাঝে চামার দলিত শ্রেণির তারাও প্রায় সকলেই গোমাংস খায়, সস্তার প্রোটিনের উৎস হিসাবে। এছাড়া বহু উচ্চবর্ণের হিন্দুও কোনো না কোনো সাহাবুদ্দিনের বাড়িতে ‘তিন বাটি’ খেতে চলে যায়, প্রকাশ্যে স্বীকার করে না। দেশের প্রায় অর্ধেক জনগণ যেখানে গরু/মহিষের মাংস খায়, সেখানে কীভাবে বিজেপি গোমাংস বন্ধ করতে পারবে? হ্যাঁ, যেটা সম্ভব সেটা হলো প্রকাশ্যে গোহত্যা বন্ধ, আর এটাকে সমর্থন করা উচিত। কোলকাতার বিফ হোটেলগুলোতে কি শুধু মুসলমানেরা খায়? একবার জরিপ করে দেখে নেবেন না হয়!
অনিয়ন্ত্রভাবে গরু/মহিষ জবাই কেন বিজেপি বন্ধ করতে চায়, সবার আগে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। বিজেপি কিন্তু কেরল, গোয়া, সিকিম বা উত্তরপূর্ব ভারতে গোহত্যা বিরোধী নয়, সেখানে প্রকাশ্যে সমর্থন না করলেও বিরোধিতা করে না। সেখানে আবার মিথুন তত্ত্ব বিরাজমান। বিশ্বে গোমাংস রপ্তানিতে ভারতের স্থান দ্বিতীয়, যার বাজার মূল্য ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মূল্যে ৩২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এই রপ্তানি কোম্পানিগুলোর মালিকদের অধিকাংশই জৈন, মারোয়াড়ি ও বর্ণ হিন্দু পরিবারের লোকজন, মুসলমানও তাদের মধ্যে রয়েছে আলানা ও লুলু গ্রুপের মতো। অতুল সাবরওয়াল, সুনীল কাপুর, অজয় সুদ, মদন এ্যবটেরা কোটি কোটি টাকা ইলেকশন বন্ডের মাধ্যমে চাঁদা দেয় বিজেপিকে। সুতরাং, এই চাঁদা ওয়ালাদের রিটার্ন গিফট তথা তাদের ব্যবসা সুরক্ষিত করার জন্য, সস্তায় গরু সাপ্লাই দেওয়াটা বিজেপি তথা RSS এর দায়িত্ব। এই কারণেই দেশের গোমাংস খোরদের ‘গোরক্ষা সমিতির’ মাধ্যমে গোহত্যা আঁটকে দিয়ে, সেই গরু যাতে বিজেপির কনফিডেন্সে থাকা গোমাংস রপ্তানি করা কোম্পানির কসাই খানায় পৌঁছে যায় এটাকে নিশ্চিত করে। এটাই মূল ও সহজ সত্য।
বিজেপি সরকারে এলেই তারা গরু, শুয়োর, মন্দির মসজিদ ও পাকিস্তান নিয়ে আসে। পশ্চিমবঙ্গের সীমানাতে পাকিস্তান নেই, তাই পূর্ব পাকিস্তান আর অনুপ্রবেশ এনে ফেলেছে, যদিও সেই অনুপ্রবেশের ৯৯%ই অমুসলিম। তবে ২০১৬ নাগাদ গরু নিয়ে দেশ জুড়ে যে সেনসেশন ছিল, আজ তার ভগ্নাংশও নেই, তাই বাংলাতে গরু রাজনীতি লকলকে বেড়ে ওঠার আগেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। গরু জবাই নিয়ে তোলামুলের ৮০ পিস বিধায়ক এবং তাদের সিভিক আইনজীবী নেত্রীর কিছু বক্তব্য শোনা গেছে কি? আসলে বক্তব্য এলে এদের পিতা নাগপুর থেকেই কান মুলে দেবে। গোমাংস রপ্তানি কোম্পানির থেকে প্রাপ্ত আয় নাগপুরেরও অন্যতম বড় উৎস, রুটিরুজিতে কাউকে বরদাস্ত করবে না ওরা, তাই এরাও চুপ।
গত কালকের সরকারি নোটিফিকেশন পড়ে যা বুঝলাম, এক কথায় গো-মাতা বৃদ্ধ ও অচল হলে জবাই করে খাওয়া যাবে। কোরবানি সংক্রান্ত রাজ্য সরকারের ফরমানে নতুন কিছু নেই, যা ১৯৫০ সালের কংগ্রেস প্রণীত আইনে ছিল, আজও সেটাই আছে। সেই আইনের পাশাপাশি ০৫/০৭/২০২২ তারিখে জাস্টিস অরিজিৎ ব্যানার্জী ও জাস্টিস রাই চট্টোপাধ্যায়ের একটা ডাবল বেঞ্চের রায়, ১৭/০৭/২০২৩ তারিখে কোলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জাস্টিস শিভগনামনের একটা রায়ের কপি জুড়ে দিয়েছে ১৩/০৫/২০২৬ এর নবান্নের অধ্যাদেশের সাথে। যেটা অনুচ্চারিত সেটা হল, আমরা শুধু সংবিধান আর আদালতের অর্ডার ইমপ্লিমেন্ট করেছি মাত্র। তাই যারা গেল গেল রব তুলছে তারা আসলে ইচ্ছাকৃত তুলছে, যাতে তৃণমূল কংগ্রেসের দুধেল গাই রাজনীতি জীবিত থাকে এবং RSS এর প্রচ্ছন্ন মদতে এগুলোকে সমাজমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে যাতে অস্থিরতাটা বজায় থাকে।
☞ পাবলিক প্লেসে কোরবানি করা যাবে না।
☞ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি ও ভেটেরিনারি ডাক্তারের যৌথ সার্টিফিকেট লাগবে।
☞ লোকালে সার্টিফিকেট না পেলে রাজ্য সরকারের কাছে দরখাস্ত করতে হবে।
☞ অমান্য করলে ৬ মাসের জেল কিম্বা ১০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে অথবা দুটোই হতে পারে।
☞ গরুর বয়স ১৪ বছরের বেশি হতে হবে, কাজের জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য হতে হবে অথবা আঘাতপ্রাপ্ত কিংবা নিরাময়-অযোগ্য রোগে আক্রান্ত হতে হবে, তবেই সার্টিফিকেট পাওয়া যাবে।
অসুস্থ গরু কখনোই কুরবানি হবে না, আর সুস্থ গরু কুরবানির বৈধ সার্টিফিকেট তুমি পাবে না, তাহলে? এলাকার ভেটেরিনারি ডাক্তার না হয় সরকারি কর্মচারী, তাকে তো পাওয়া যাবে; কিন্তু পঞ্চায়েত সমিতির যিনি সভাপতি, তিনি তো তোলামুলের- তাকে কীভাবে পাওয়া যাবে! সে তো ধনেপ্রাণে বাঁচার তাগিদে এলাকা ছাড়া, তাহলে! কোন রকম অসুস্থ প্রাণি কুরবানির জন্য কতটা সঠিক সেটাও তো ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। সুতরাং, ব্যক্তিগত ভাবে আমি মন থেকে চাইছি এ বছর কুরবানি গরু বাদে অন্য কিছুতে হোক, উত্তরটা সময় দিয়ে দেবে। যদিও গরুর বয়স মাপের যে একক, সেটা বেশ জটিল; ফলত এই জানালা খোলা রেখে শুভেন্দু সরকার বিড়াল মারার বন্দোবস্ত করে রেখে দিল।
টিভি চ্যানেলে আজকাল সবকিছুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবর, সব কিছুই ব্রেকিং নিউজ। কিন্তু যতক্ষণে এ সব সংবাদ টিভিতে আসে, তার বহুক্ষণ আগেই সোশ্যাল মিডিয়াতে চলে আসে, তাহলে কেন কেউ টিভি চ্যানেল দেখবে! তাছাড়া ২৪ ঘন্টা ধরে চালাবার মতো খবর কই! অতএব, রাস্তায় ঈদের নামাজ আর কোরবানি উপলক্ষে ওই ২টো লাইনই সারাদিন ধরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। যে বা যারা এই চ্যানেল ভুল করে দেখে ফেলছে, ভাবছে- উফ, বিজেপি সরকার কী চাঁদমারিটাই না করে ফেলেছে হিন্দু হিতার্থে। মোদ্দাকথা, এমন কিছু দেখাও যেগুলো একটা শ্রেণির অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ ঘটবে, কেউ তুরীয় সুখে দেখবে, কেউ আতঙ্কে বারবার শিহরিত হতে চেয়ে দেখবে।
বিজেপির আঁটিসেল যতটা প্রোপ্যাগান্ডা চালাচ্ছে মসজিদ বা গরু নিয়ে, তার চেয়েও মমতার দুধেল গাইগুলো AI জেনারেটেড পোস্টার ভিডিও দিয়ে বেশি বেশি মিথ্যাচার ও আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করছে। আজকে ১০ দিন হলো বিজেপি ক্ষমতায়, সেই অর্থে বড় কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার খবর নেই, এটা তোলামুল ও তাদের কাঠমোল্লাগুলোর জন্য বুকে ব্যথার বড় কারণ। বিজেপি এই মুহূর্তে ক্ষমতায়, তাদের সেভাবে দাঙ্গার আর প্রয়োজন নেই অন্তত পঞ্চায়েত ভোটের আগে, কিন্তু দুধেল গাই সমাজে ‘বিজেপি জুজু’ জিইয়ে রাখতে গেলে কামব্যাক করতে চাওয়া তৃণমোল্লাদের জন্য দাঙ্গা একান্ত আবশ্যিক; সুতরাং প্রোপ্যাগান্ডায় কোনো মন্দা আসেনি বরং বেড়েছে। তোলামুল ক্যালানি খেলেই মুসলমান এর জামা পরে নিচ্ছে, যেটা পক্ষীদের গর্গ করতে পারেনি বলে অ্যারেস্ট হয়ে গেছে। আগের দিন সুজিত গেছে, আজ রথিনের পালা, মুসলমান সাজার উপায় নেই এদের।
গো-পালন মূলত আমাদের রাজ্যের সদগোপ সমাজ আর আদিবাসী সমাজ করে। ১০টা হেলে/বদল গরু বছরে বেচতে পারলে লাখ তিনেক টাকা আমদানি হয়ে যায়, যা দিয়ে একটা পরিবারের সারাবছর চলে যায়। আরেকটু বিশদে গিয়ে বলা যায়- ভূমিহীন কৃষক, তফসিলি জাতি, বেশিরভাগ কৃষিজীবী পরিবার দুধ ও গোবর জৈব সারের জন্য গরু পালন করে। রাজ্যের ৮০% গোপালন অমুসলিম সম্প্রদায় করে, কিন্তু গরু কেনাবেচা, পরিবহণ, চামড়া শিল্পের সাথে যুক্ত ৮০% এর বেশি মানুষ মুসলমান সম্প্রদায়ের। এখানেই হচ্ছে RSS মূল সুবিধা, যদিও সমাজের নিচুতলায় এই ইকোসিস্টেম শতকের পর শতক ধরে চলছে কোনো সমস্যা ছাড়াই। তাই গো-রক্ষা সমিতির নামে সনাতনী জঙ্গিগোষ্ঠী বানাতে হয়েছে রাজ্যে রাজ্যে। সেই সনাতনী গোরক্ষা সমিতির যে নেতা, তাকে বানানোই হয়েছে রোজ মগজধোলাই করে লুম্পেনগিরি করার জন্য, সে কেন আজ ইকোনোমিকস বুঝবে? অতএব শমীক যতই ক্যামেরার সামনে সাধু সন্তের মতো প্রবচন দিন, শুভেন্দুর সরকার যতই কৌশল অবলম্বন করুক কোরবানিটা উতরে দিতে, গোরক্ষা বাহিনীর দল তান্ডব করবেই কিছু পকেটে।
পশ্চিমবঙ্গে কুরবানির বাজার বিশাল অর্থনৈতিক মার্কেট। কমবেশি ৮ লাখের উপরে গরু জবাই হয় শুধুমাত্র ঐ ১ দিনে। একটা সুস্থ স্বাভাবিক প্রমাণ সাইজের গরুর দাম ২০-২৫ হাজারের মধ্যে হয়। কোরবানির বাজারে সেটাই নূন্যতম ৩৫-৪৫ হাজারে পৌঁছায়। দালাল, হাটমালিক সম্মিলিতভাবে এই অতিরিক্ত দামের থেকে ১০০০ টাকার বেশি ভাগা পায় না, অর্থাৎ সেটা যিনি গোপালক তিনিই পায়। এই ৮ লাখ গরু, তাকে কেন্দ্র করে কমবেশী ৫০০০ কোটির ব্যবসা, যার সাথে হাড়, চামড়ার ব্যবসা, মুচি, পরিবহন, সব মিলিয়ে বিপুল টাকার ব্যবসা। যে ৯টা জেলায় শাসক বিজেপি একচ্ছত্রভাবে জিতেছে, অরতিটা জেলায় পশুপালন বেশী, সমস্যার সুত্রপাতও এখান থেকেই হবে।
সুতরাং, গরু কাটা বন্ধ হলে মোটেও সেটা অনায়াস হবে না রাজ্যের পশুপালক সম্প্রদায়ের জন্য। কোরবানির টাকাটা না এলে দুধ/ঘি/পনির সমস্ত শিল্পে তার আঁচ পড়বে, ভয়াবহভাবেই পড়বে। উত্তরপ্রদেশে বুলডোজার দেখে খুশি হওয়া বীর সনাতনীরা যারা গানও বেঁধেছিল বুলডোজার আর যোগীকে নিয়ে, আজ চোখের জলে তারা মূল্য চোকাচ্ছে। বাঙালি ততটা শিক্ষা না নিলেও, উন্মত্ততার পাগলা ঘোড়ায় কিছুটা লাগাম যে পরবে বা পরেছে তাতে সন্দেহ নেই। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি ততক্ষণ দেখতে ভালো, যতক্ষণ না সেটা নিজের ঘরের ভেতরে সেটা ঢুকে যাচ্ছে।