গত ১২ বছর যাবৎ অমৃতকালের শাসন ব্যবস্থায় আমাদের সুপ্রিম কোর্ট নিজেই একটা সিলবন্ধ প্রহসনে পরিণত হয়েছে। শাসকের প্রতি আনুগত্যে গদগদ অধিকাংশ জোব্বাধারী ভাঁড়, যাদের কাজ শুধু সরকারকে পরিত্রাণ দেওয়া। কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপির আদর্শিক অভিভাবক RSS- শুরু থেকেই সুপরিকল্পিতভাবে ভারত রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বিচারব্যবস্থাকে ব্যবস্থা নিজেদের অধীনস্ত দাসানুদাস ও পোষ্য পর্যায়ে টেনে নামিয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণই যখন একমাত্র লক্ষ্য, যেখানে গণতন্ত্র বাঁচল কি মরলো তার কোনো দায় নেই।
সুস্থ গণতন্ত্রে বিচার ব্যবস্থাই গণতন্ত্রের মূল রক্ষাকবচ, যা রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শাসক ও আমলাতন্ত্রের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে, নাগরিকদের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা ও সংবিধানকে প্রতিষ্ঠা রাখাই বিচার ব্যবস্থার একমাত্র কাজ। ফ্যাসিস্ট শাসকরা সাধারণত নিজেদের ক্ষমতাকে কায়েমি করতে এবং সমস্ত বিরোধিতা দমন করতে শাসনকালের শুরুতেই আইন ব্যবস্থাকে দুর্বল করা শুরু করে। RSS ঠিক এটাই করেছে একদম গোড়াতে। অমিত শাহ তো এক কাঠি সরেস হিসাবেই নিজের সর্বভারতীয় কার্যকাল শুরু করেছিল, জাস্টিস লোয়াকে স্বহাঃ করে দিয়ে।
ফলত, নিম্ন মেধার বিচারক, দলদাস বিচারক, উগ্র মৌলবাদী ভাবধারার বিচারকের পাশাপাশি- বিচার ব্যবস্থার মধ্যে থাকা দুর্নীতিপরায়ণ এমন সমস্ত ব্যক্তিকে খুঁজে তাদের সিস্টেমের শীর্ষ পসে বসানো, যারা ইতিমধ্যেই নানান ধরণের আর্থিক বা নারীঘটিত কেলেঙ্কারিতে গলা অবধি ডুবে। ফলত, তাদের অণ্ডকোষ চিপে রেখে ইচ্ছামত ‘যা খুশি’ কাজ করিয়ে নেওয়া যায় এবং যাচ্ছে। RSS অত্যন্ত মোটা দাগে এটাই করে চলেছে সাফল্যের সাথে প্রকাশ্যে।
বিচারপতি দাত্তু অবধি RSS নামের ভাইরাস ততটা জেঁকে বসেনি বিচার ব্যবস্থাতে। এর পর টি.এস. ঠাকুর, রঞ্জন গগৈ, দীপক মিশ্র, চন্দ্রচূড় হয়ে আজকের মহামহিম সূর্যকান্ত। এনাদের আমলে বিচারের বাণী যেন গুপ্তাঙ্গের লোম, প্রকাশ্য আদালতে দেখানো যা অশোভনীয়। তাই সরকার ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে দাখিল হওয়া প্রতিটি স্পর্শকাতর মামলার তদন্ত রিপোর্ট ‘সিলবন্ধ’ খাম নামের ‘খুড়োর কলে’ জমা পরে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এবং প্রতিটা মামলাতে অভিযুক্তরা বেকসুর ছাড়া পেয়ে গেছে, অভিযোগকারী সহ দেশের জনগণ জানতেই পারেনি- তদন্তে ঠিক উঠে এসেছিল। সাধে কি ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ লিগ্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের কাছ থেকে ডিগ্রি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আগামীতে এই প্রবণতা বৃদ্ধি পাবেই।
গণতন্ত্রকে পঙ্গু করে দেওয়া এমন অনুগত পদলেহনকারী এই সকল দলদাস বিচারকদের নাম গোবরের জলে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে লেখা থাকবে- সেটা বলাই বাহুল্য। কাল্পনিক শত্রুর ভয় দেখিয়ে দেশে দীর্ঘমেয়াদী জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে ২০১৪ থেকেই, ভোটের আগে দেশপ্রেমের সুড়সুড়ি দিতে পাকিস্তান আর জঙ্গিবাদ চলে আসে। এরপর মন্দির, মসজিদ, গরু শুয়োরের রাজনীতি। একটাই রাষ্ট্রীয় স্লোগান – হিন্দু খতরেমে হ্যাঁয়। পাকিস্তান, হিন্দু, মুসলমান, গরু- এই চারটে শব্দ বাদ দিলে RSS হাতে বক্তব্য দেওয়ার মতো ১০ মিনিটের কোনো সাবজেক্ট যেহেতু নেই, টেলিপ্রম্পটার লাগিয়েও; অতএব প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ১৫০ কোটি জনসংখ্যার দেশে কায়েমি শাসন প্রতিষ্ঠা করতে রঞ্জন গগৈদের মতো চোর শয়তানদের বিকল্প ছিল না নাগপুরের কাছে। এরাই Sealed Cover Jurisprudence এর ব্যবহার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করে- জাতীয় নিরাপত্তা, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলাগুলোতে প্রতিনিয়ত আপোষ করেছে নির্লজ্জভাবে, রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
২০১৪ সালে আইপিএল (IPL) স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারির তদন্তে বিচারপতির মুকুল মুদগল কমিটি তাদের রিপোর্ট একটি সিলবন্ধ খামে আদালতে জমা দেওয়া থেকে যে পরম্পরা শুরু হয়েছিল, সংখ্যার বিচারেই সেই তালিকা শুধু সুপ্রীম কোর্টের স্পর্শকাতর গুরুত্বপূর্ণ মামলার নিরিখে এমন ‘জাঙিয়ার আড়ালে রাখা যৌনাঙ্গ’ এর অনুরূপ সিলবন্ধ বিচার ব্যবস্থা- বেহায়াপনার সমস্ত সীমারেখা পার করে গেছে। একে একে রাফাল বিমানের দাম কেলেঙ্কারি, আসাম NRC আসাম মামলা, ভীমা কোরেগাঁও মামলা, CBI কর্তা অলোক ভার্মার ঘুষকান্ড, পি. চিদাম্বরম এর জামিন এর বিরোধিতা মামলা, বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর বিরুদ্ধে ওঠা যৌন কেলেঙ্কারি মামলা, শাহিনবাগ মামলা, কেরল-ভিত্তিক নিউজ চ্যানেল 'মিডিয়া ওয়ান'-এর সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিল মামলা, আদানি-হিন্ডেনবার্গ মামলা, ৩৭০ ধারা বিলোপ মামলা, দিল্লি বার কাউন্সিল নির্বাচন বিতর্ক মামলা, NEET পেপার লিক মামলা, আম্বানির নরহস্তির পেয়ারের ‘বনতারা মামলা’, মণিপুর জাতিগত সহিংসতা অডিও ক্লিপ মামলা, মানে এভাবে যদি তালিকা করা যায় সেটার সংখ্যা এতোদিনে ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। আজকে ভাইপোর বিদেশ যাত্রার অনুমতি, ঠিক কোন গ্রাউন্ডে মহামান্য বিচারপতিরা অনুমোদন দিয়েছেন, সেটা সিলবন্ধ খামেই হয়ত আঁটকা পরে গেছে। কোনো সন্দেহ নেই, RSS এর অনুমতিক্রমেই এই ‘ডিল’ সম্পন্ন হয়েছে। এর পরেও সুপ্রিম কোর্টের ধারাচূড়ো ধারী ‘খোজা’ বিচারপতিরা আর কিছু পারুক বা না পারুক, আমাকে এই লেখার জন্য বিনা বিচারে উমর খালিদ বানিয়ে দিতেই পারে।
দুর্নীতিবাজ সরকার বা তার পেয়ারের ডাকাত শেঠেরা যখন জবাবদিহি করার মতো অবস্থায় থাকে না, কিম্বা যে জবাবদিহি পাব্লিক জানতে পারলে হেসেই খুন হবে এবং মূত্র বিসর্জন করে দেবে সিস্টেমের মুখমন্ডলে; সেই হেতু সিলবন্ধ খামে রিপোর্ট জমা দেওয়ার চেয়ে সুরক্ষিতভাবে ‘চুতিয়া’ বানিয়ে গোটা খেল খতম করে দাও। এটাই তো মাস্টারস্ট্রোক, না রইল বাঁশ না বাজবে বাঁশি। এটাই দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কলঙ্কময় বাস্তবতা, আশ্চর্যজনকভাবে এতে এদের কারও নূন্যতম লাজলজ্জা নেই; কোনো এক দার্শনিক বলে গিয়েছিলেন- পতিতাপল্লীতে বসবাস করা বেশ্যাদের নিজেদের পরিবারের মাঝে লজ্জা পেতে নেই, পেলে রুজিরুটি চলবে না। এই লজ্জাহীনতার উপরে ভিত্তি করে দেওয়া বিচারের জন্য- পারম্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে, আইনের মা-বোনকে একসাথে বলাৎকার করে অযোধ্যার বিতর্কিত জমি রামমন্দির কমিটি পেয়ে যায়। এখানে একমাত্র সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল ‘নাগপুরের’ প্রতি বিচারকের প্রশ্নহীন আস্থা। ফাঁপা বিশ্বগুরুর ছবিকে লটকে রাখতে মন্দির প্রোজেক্ট বাস্তবায়ন করতেই হতো, অতএব সিলবন্ধ খামই একমাত্র হাতিয়ার। রিপোর্টে কি আছে যেহেতু কেউ জানতে পারলনা, তাই সেই গাঁজাখুরি রিপোর্ট বা নগ্ন সত্যকে সামনে রেখে নতুন করে প্রশ্ন উঠার বদলে, গোটাটাকেই ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হল।
এভাবে প্রতিটা সিলবন্ধ মামলার ময়না তদন্ত করাই যায়, আশা রাখব পরবর্তী এ্যান্টি RSS সরকার যেদিনই ক্ষমতায় আসুক, তারা প্রকৃত বিচার করবে। জানি না, আমাদের গণতন্ত্রের কঙ্কালটা সেদিন ঠিক কোন লজঝড়ে অবস্থায় থাকবে যখন RSS কে রাজনৈতিক চিতায় বিজেপির সাথে সহমরণে পাঠানো হবে। এই লজঝড়ে অসার গণতন্ত্রের কঙ্কাল নিয়ে এই দেশ কতক্ষণ লড়াই করতে পারবে চিন, পাকিস্তানের মতো শত্রুদের বিপক্ষে?
এদিকে বাংলাতে মেজোখোকা সরকার ৩ মাসেই চাড্ডিতে ভড়ভড়িয়ে হেগে ফেলেছে। যখন প্রতিটা প্রতিশ্রুতিতে ফেল মেরেছে, তখন মেজোখোকা তার মুখ্যমন্ত্রীত্বের বাসর সাজালেও, কেন্দ্রের ‘আচ্ছে দিন’ এর আরকের নেশা ছুটে গেছে ভক্তদেরও। তার উপরে টিভি মিডিয়া ও আঁটিসেল তুলসীতলায় অন্তিম শ্বাস নিচ্ছে। স্বভাবতই বাংলাতেও শুরুতে RSS এর এ্যাজেন্ডা মতো গরু কুরবানি ঠেকাতে গিয়ে- সেই গরুই বিজেপি ভোটব্যাঙ্কের পায়ুপথে ঢুকে পড়েছে। এরপর রাস্তায় নামাজ নিয়ে ক্যাঁচাল, আম মুসলমান কিচ্ছু প্রতিক্রিয়া দেয়নি। এখন মসজিদে মাইকে আজান বন্ধ আর ঝটকা মাংসকে মূল ইস্যু বানাচ্ছে, চাড্ডির গুয়ের গন্ধ ঢাকতে। মাইকের সামনে এসে যাত্রাপালার বিবেকের মত ‘আমরা অভয়াকে ভুলিনি’ বলে গলার শিরা ফোলাতে হচ্ছে। সমীকবাবু কি ভালো তোলামুল খুজতেই অতিব্যস্ত!! নতুবা ওনাকে কেউ মনে করিয়ে দিচ্ছেনা কেন, যে- এই মুহুর্তে আপনিই পুলিশ মন্ত্রী, জনগণ যাত্রাপালার সংলাপ নয়, কাজ দেখতে চাইছে, অপরাধের বিচার চাইছে।
যেকোনো মূল্যে আলোচনাকে গরু-শুয়োর, মন্দির-মসজিদের বৃত্তে আঁটকে রাখতেই হতো। এদিকে কেন্দ্রের ১২ বছর অমৃতকালে সার্ভাইভ করা মুসলমানও তো চালাক হয়েছে, তারা শিখে নিয়েছে- এদের দৌড় কদ্দুর। অতএব, বিভেদের রাজনীতিতে সেভাবে লাভ হচ্ছে না। আম মুসলমান সমাজ শুধু তাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসি দিয়েই মেজোখোকাকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। ইস্যুর মা রোজ গর্ভবতী হয়ে যাচ্ছে জাস্ট ‘উপেক্ষার’ বীর্যে; ফলত ‘ভালো তোলামূল’ সরকারের হাতে হ্যাঁরিকেন, পেছনে বাঁশ। মেজোখোকাকেও আগামীতে সিলবন্ধ খামের প্রমাণিত সিস্টেমে ফিরে যেতে হবে, নতুবা বিজেপিকে ভোট দেওয়া তথাকথিত ‘কট্টর হিন্দুরাই রেডি রয়েছে থুতু, পচা ডিম, পচা আলু নিয়ে।
তবে একটা কথা বলা যেতেই পারে, তোলামূলের বিসর্জনের পর তারা মারধোর আর ডিম থেরাপিতেই পার পেয়ে গেছে বৃহত্তর পরিসরে। RSS এর ক্ষেত্রে কিন্তু সেটা হবে না, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যাওয়া মাত্র পরবর্তী ১ মাসে গোটা দেশ জুড়ে কয়েকলক্ষ RSS এর সন্ত্রাসী কারিয়াকর্তা, বিজেপির উগ্রপন্থী নেতামন্ত্রীরা গুম, খুনের শিকার হবে জনরোষের বলি হয়ে। হিন্দুত্বের গাঁজা খাওয়া হিন্দুদের ঘরের ছেলেরাই আজ বেকার, ওদিকে RSS বিজেপির সন্তানেরা বিদেশে বসবাস করে ও কোটি টাকার মালিক। কে জানে, RSS বিজেপির উপরে হওয়া আক্রমণের বিচারও সেদিন সিলবন্ধ খামের তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে করা হবে কিনা, ঠিক আজকের মতো করে।
বিজেপির শেষের শুরু হয়েছে, ব্রেণ ক্যান্সার- এটাই আশার কথা। বিশ্বগুরুর অন্তর্জলি যাত্রা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। এরপর এই সমস্ত মামলা পুণরায় চালু হয়ে নতুন করে তদন্ত হবে, আর বলাই বাহুল্য- প্রতিটা ক্ষেত্রে ফলাফল কী হবে! ততদিন একটু ধৈর্য ধরুন, সুযোগ আসবে আইনিভাবে RSS কে সমূলে নির্মুল করার, বিচারব্যবস্থাকে কলঙ্কমুক্ত করে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করার।