অতিথি লেখকের কলম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অতিথি লেখকের কলম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদঃ সন্ত্রাসী তৈরির আঁতুড়ঘর

 


লেখকঃ রূপ ভট্টাচার্য

ন্যুরেমবার্গ দেখলাম, অবশ্যই সিনেমাটা, জায়গাটা গিয়ে দেখার সৌভাগ্য হয়নি এখনও। ডিসক্লেইমার দিতে হয় কারণ অনেকে এখন এতটাই ছেলেমানুষ যে ভেবে বসবে, আমি সত্যিই সত্যিই গেছি জায়গাটায়, ঠিক যেভাবে ভেবে নেয় তৃণমূল বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ছে।

এই জিনিস আদিকাল থেকে হয়ে আসছে। ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ সহ ইউরোপের তাবৎ বড় শক্তি মনে করেছিল জার্মানিতে নাৎসিদের উত্থান তেমন সমস্যার নয়, মনে করেছিল যে হিটলার, সোভিয়েত দেশ আক্রমণ করলে ওদেরই ভালো, নবজাতক সমাজতন্ত্রের অঙ্কুরেই বিনাশ হবে, শুরু হয়েছিল অ্যাপিসমেন্ট পলিসি বা বাংলা মাধ্যমের ইতিহাস বইতে লেখা “তোষণনীতি”। জার্মানির মধ্যে যেটা হচ্ছিল সেটা আরো ভয়ানক। ইউরোপের অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে যে দম ফেলার সময়টুকু থাকে, দেশের মধ্যে তো সেটা থাকেনা তাও তৎকালীন জার্মানির কমিউনিস্ট, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট, সোস্যালিস্ট সবাই নাৎসিদের এই উত্থানকে তুচ্ছজ্ঞান করেছিল এটা জেনেও যে, এই শক্তি ক্ষমতায় আসলে প্রথম আক্রমন হবে তাদেরই উপর। যে মার্ক্সীয় বিশ্বদর্শন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে, যার মাধ্যমে সমাজ বিশ্লেষণ মোটামুটিভাবে অভ্রান্ত সেই তত্ত্বের দিকপাল তাত্ত্বিকেরা সেই সময়ে জার্মানিতে ছিলেন, তাও তারা ধরতে পারেননি কোন উচ্চকোটির অপশক্তি তার সর্পিল দেহ ঘষে ঘষে, অতি সন্তর্পনে জার্মান রাষ্ট্রযন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে।

মানুষ ভুল করে কিন্তু মানুষই সেই ভুল শুধরে নিয়ে এমন একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয় যে নতুন ইতিহাস রচিত হয়। নাৎসি শাসিত জার্মান রাইখের বিধ্বংসী সেনার নাম ছিল ওয়ারমাখ্ট, যাদের যুদ্ধনীতি ব্লিৎজক্রিগ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে ছিল একটা দুঃস্বপ্নের নাম। জার্মান প্রযুক্তির বলে বলীয়ান প্যানজার (যুদ্ধ ট্যাংক) বাহিনীর প্রবল গোলাবর্ষণ, সাথে লুফ্তওয়াফার (বিমান বাহিনী) আকাশ বাতাস ফালাফালা করে দেওয়া গুলিবর্ষন এবং তার পরে প্রায় সাথে সাথেই ইনফ্যান্ট্রি অ্যাসল্ট, এই হচ্ছে ব্লিৎজক্রিগ যুদ্ধ পদ্ধতি। 

এই অজেয় সেনা নিয়ে, একের পর এক ইউরোপের স্বাধীন দেশ দখল করে, ইংল্যান্ড ফ্রান্সকে পায়ের নিচে চেপে, হিটলার আস্তে আস্তে এগোচ্ছিল তার স্বপ্নের থার্ড রাইখের (জার্মান সাম্রাজ্য) দিকে, স্বপ্নের বেলুন ফাটল পোল্যান্ড ক্রস করার পর। অতি বড় কনজারভেটিভও ঢোক গিলে স্বীকার করবে যে নাৎসি দানবকে কে কবর চেনালো, স্বীকার করবে সে হল সদ্যজাত USSR, সোভিয়েত দেশ, লেনিন স্টালিনের সোভিয়েত। যে কমিউনিস্টদের খুন করে, হিটলার, গেরিং, হিমলার, গোয়েবেলসদের ক্ষমতা দখল, সেই কমিউনিস্টদের সোভিয়েত লাল ফৌজ বার্লিন ধ্বংস করে ভাঙা রাইখস্ট্যাগের চূড়ায় উড়িয়ে দিল লাল ঝান্ডা, ঠুকে দিল শেষ পেরেক নাৎসিদের কফিনে। ইতিহাস তার বদলা নিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে কোনো সিনেমা, বা ডকুমেন্টরি বানানোর সময় পুঁজিবাদী মিডিয়াকে একটু বেশি দক্ষতার সাথে কাজ করতে হয়। তারা ভালোই জানে, হিটলার, মুসোলিনি, তোজো ইত্যাদি সবার জন্ম ওদেরই গর্ভে কারণ সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের শেষ স্তর। নিজের দেশে জিনিস বেচা যাচ্ছেনা, ইকোনমি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে, সেটা কাটানোর জন্য প্রাচ্যের কৃষিপ্রধান জাতিগুলোকে জোর করে নিজের কন্ট্রোলে নিয়ে আসা। কে করেনি এই কাজ? ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন সবাই উপনিবেশ করেছে, লুঠ করেছে অন্য দেশ। এই সব দেশ মিলিত ভাবে বা একা একাই যথেষ্ট স্বেচ্ছাচার করেছে, খুন, ডাকাতি করেছে, যার ফলে ঘুমন্ত দানব জেগে উঠেছে। তাই যুদ্ধে খেলাটা ঘুরেছে যখন সেই দানব এসে দাঁড়িয়েছে স্টালিনগ্রাদে, মুক্ত মানুষের ফৌজের সামনে, যাদের কিছু হারানোর নেই, যারা মানবিকতার সবচেয়ে পবিত্র আবেগে একজোট হয়েছে আর সেটা হল ভালোবাসা। আচার্য ব্রহ্মানন্দ পারেনি বিক্রমের দিকে তাকাতে কারণ সে ছিল নিষ্পাপ, অজাতশত্রু। এই জিনিস খুব ভালো করেই জানে পুঁজিবাদী মিডিয়া, তাই এইসব সিনেমায় যখন নিজেদেরকে হিরো হিসেবে দেখাতে যায়, প্রাণপণ কৌশলে কয়েকটা জিনিস বাদ দেয়।

ন্যুরেমবার্গ দেখে ভালো লাগলো, কারণ গোটা সিনেমাটা যে ন্যারেটিভের উপর দাঁড়িয়ে অর্থাৎ, মানুষের ভুলেই দানব তৈরি হয় আর সেই মানুষই আবার ভীষণ গোলায়েথের সামনে ক্ষুদ্র কিন্তু মূর্তিমান শমনরূপে ডেভিড হয়ে এসে দাঁড়ায়, সেটা তৈরিই হয়েছে এক নবজাতক সমাজতন্ত্রের অনুগ্রহে। ভালো লাগার একটা কারণ হচ্ছে, পরিচালক থেকে প্রযোজক এই বিষয়টা ভালো করেই জানেন যে যখন বিচারক জ্যাকসন জুরি প্যানেলের দিকে ফিরে বলছেন যে সমস্ত দেশকেই আগ্রাসনের রাজনীতি থেকে সরে আসতে হবে, আইনের শাসনের প্রতি দায়বদ্ধ হতে হবে তখন প্যানেলে বসা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধি মনে মনে হয়ত বা মুচকি হাসছেন কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন একমাত্র মিত্র শক্তি যারা নিজেদের সাম্রাজ্য বাঁচানোর দায় নিয়ে যুদ্ধে যুক্ত হয়নি, প্রকৃতপক্ষেই হয়েছিল পিতৃভূমি রক্ষার দায় নিয়ে আর ফ্যাসিবাদের হাত থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করার জন্য। 

ছবির প্রযোজক এটাও জানেন, গত শতাব্দীর শেষ থেকে পুঁজিবাদ, বিশ্বকে একমেরু করার জন্য কি পরিমাণ অর্থ আর শ্রম ব্যয় করেছে। সোভিয়েত সহ প্রায় সব সমাজতান্ত্রিক দেশে ঝামেলা করিয়ে, গোলাপী বিদ্রোহ, গুমখুন, বেআইনি আন্তর্জাতিক ট্রায়াল ইত্যাদি সব রকমের পদ্ধতি ব্যবহার করেছে যাতে সমাজতন্ত্রের বদলে বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে স্থাপন করা যায়। আজকের দিনে এই একমেরু দুনিয়া আরেকটা দানবের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিণত হচ্ছে এবং তাকে ঠেকানোর জন্য আর কোনো সোভিয়েত বেঁচে নেই। জাস্টিস জ্যাকসন সিনেমায় বলছেন, আমরা কোর্ট মার্শালের বদলে ট্রায়াল করছি কারণ আমরা চাইনা আমাদের কোনো ভুলে এই অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি হোক। 

জ্যাকসন উকিল মানুষ, জানতেন না যে আইনি ট্রায়াল এই রোগের একটা তুচ্ছ সাময়িক উপশম মাত্র। যে বিশ্ব অন্যায় অন্যায্যতাকে মান্যতা দেয়, বৈষম্যকে ভবিতব্য হিসেবে প্রতিপন্ন করে, বড়লোকের হয়ে কাজ করে, সেই বিশ্বে বারবার আর্থসামাজিকভাবে বিপর্যস্ত, বিপথুমান, অতি ক্ষুব্ধ যুবক হিটলার হিসেবে তৈরি হবে।


শুক্রবার, ২ মে, ২০২৫

বঙ্গে গাঁজা

 


 ১) “ডলার এবং মেমসায়েবের লোভে সুকণ্ঠ ভেকধারী বাউলরা ক্রমে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। বাউল-ফকিররা গাঁজা খান। বাউলদের গাঁজা যৌনাচার হিপি ঐতিহ্যের স্মারক। অতএব ওই পথের পথিক মেমসায়েব বাউলের সঙ্গ ধরবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই

সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, দৈনিক আজকাল, ৩০শে মে, ২০০৪; সুধীর চক্রবর্তীর বই নানা মনের চোখে, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, পৃ ১১৪

২) বিদ্যাসাগর জিজ্ঞাসা করলেন, "কি হারান, শুনলাম তুমি নাকি কাশীবাসী হয়েছ? গাঁজা খেতে শিখেছ কি?” হারানবাবু উত্তর দেন, "কাশীবাসী হওয়ার সঙ্গে গাঁজা খাওয়ার কি সম্পর্ক' বুঝতে পারলাম না।" বিদ্যাসাগর বলেন, "এত সহজ ও সোজা সম্পর্ক'টা বুঝতে পারলে না? জান তো, লোকের বিশ্বাস কাশীতে যাঁর মৃত্যু হয় তিনি সাক্ষাৎ শিব হন। শিব হলেন পাঁড় গাঁজাখোর। কাশীতে মৃত্যুর পর যখন শিব হবে তখন তোমাকেও তো গাঁজা খেতে হবে। তাই বলছিলাম, মৃত্যুর আগেই যদি একটু প্র্যাকটিস করে রাখতে, তা হলে শিব হওয়ার সুবিধে হত

কেদারনাথ ভট্টাচার্য, প্রবন্ধ: শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনন্য পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিস্যাসাগর, 'বঙ্গীয় নবজাগরণের অগ্রপথিক' বইয়ে সংকলিত, পৃ ১৭৪, নবপত্র প্রকাশন, ১৯৫৯, কলকাতা

৩) ৩০ নং পদে প্রধান প্রধান হিন্দু সমাজের সম্প্রদায়গুলির বৈশিষ্ট্যসহ পরিচয় পাওয়া যায়। বৈষ্ণবেরা বিষ্ণুরূপ ধ্যান করত, মালা-তিলক ব্যবহার করত। শাক্ত করত শক্তির সাধনা। পঞ্চতত্ত্বজ্ঞানী পঞ্চোপাসনা করতেন। সপ্তপন্থী ব্যাখ্যা করতেন সপ্তরূপ। আগম-নিগমের উল্লেখ আছে গানে; আছে জটা, লোহার ত্রিশূল, গাঁজা প্রভৃতি ব্যবহারকারী শৈব, শাক্ত সাধুদের ছবি। অনেকে গাঁজা খেয়ে "ব্যোম কালী" ধ্বনি দিতেন। মদ খেয়েও মাতাল হতো অনেকে। নানারকম মালা, মড়ার মাথার খুলি, হাড় ও হাড়ের মালা এরা ব্যবহার করত।

শক্তিনাথ ঝা, ফকির লালন সাঁই: দেশ কাল ও শিল্প, পৃ ২৫৮, সংবাদ প্রকাশ, কলকাতা, ১৯৯৫

৪) গাঁজা খাওয়ার ব্যাপারে আমাদের সরকার মনে হয় নমনীয়। মাজার মানেই গোল হয়ে গাঁজা খাওয়া। লালনের গান শুনতে কুষ্টিয়ায় লালন শাহর মাজারে গিয়েছিলাম। গাঁজার উৎকট গন্ধে প্রাণ বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। এর মধ্যে একজন এসে পরম বিনয়ের সঙ্গে আমার হাতে দিয়ে বলল, 'স্যার, খেয়ে দেখেন। আসল জিনিস। ভেজাল নাই।' সিগারেটের তামাক ফেলে গাঁজা ভরে এই আসল জিনিস বানানো হয়েছে।

হুমায়ুন আহমেদ, হিজিবিজি, প্রবন্ধ: নিষিদ্ধ গাছ, পৃ ৬৫, প্রিন্ট: ২০১৩ 

৫) তবে গাঁজা মহালের প্রজাদের সঙ্গে মিশে আমার একটা শিক্ষা হয়েছিল। ওরা হাতে কলমে শিখেছিল কেমন করে গণতন্ত্র চালাতে হয়, সমাজতন্ত্রের জন্যে এগিয়ে থাকতে হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রামে গ্রামে সমবায় পদ্ধতিতে চাষবাস প্রবর্তন করতে যান। এর জন্যে ভিত পাতা হয়েছিল পঞ্চাশ বছর আগে নওগাঁয়। এখন তার কী অবস্থা জানিনে। কারণ গাঁজা যারা কিনত তারা প্রধানত হিন্দু ও তাদের বাস প্রধানত আজকের দিনের ভারতে। বাংলাদেশ এখন তার গাঁজার বাজার হারিয়েছে। খান সাহেব মোহাম্মদ আফজল লিখেছেন বর্তমানে গাঁজা চাষ ১০০ বিঘা জমির মধ্যে সীমাবদ্ধ। আগেকার সীমা ছিল ৯০০০ একর।

অন্নদাশংকর রায়, যুক্তবঙ্গের স্মৃতি, পৃ ১১, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কলকাতা

৬) অভীষ্ট বস্তুর অনুসন্ধানে অভয়াচরণ সতের বৎসর পাহাড়-পর্বত পরিভ্রমণ করিলেন। বহু সাধু সন্ন্যাসীর সঙ্গে তাঁহার ( অভয় ব্রহ্মচারীর ) সাক্ষাৎ হইল। গঞ্জিকা-সেবন তাঁহার সাধন-ভজনের সহায়ক মনে করিয়া, তিনি ইহা অভ্যাস করিয়াছিলেন। সতের বৎসর পর তিনি পুনরায় ময়মনসিংহে ফিরিয়া আসিয়া নেত্রকোণা মহকুমায় মালনী গ্রামে একটি আশ্রম স্থাপন করিলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁহার আশ্রমটির সংবাদ চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল, এবং তিনি "অভয় ব্রহ্মচারী" নামে অভিহিত হইলেন। নানা শ্রেণীর বহু লোক তাঁহার শিষ্য ও ভক্ত হইতে লাগিল।

শ্রী রমেশ চন্দ্র সরকার বি. এ. বি. টি. ; গ্রন্থ: বারদীর শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী, পৃষ্ঠা নং ৯৯; প্রেসিডেন্সী লাইব্রেরী, কলিকাতা-১২; প্রকাশ: ১৮৯০ সাল

৭) অভয়াচরণ প্রায় প্রতি মুহূর্তেই গাঁজা খেতেন। কিন্তু শিব চতুর্দশীর দিন জীবন্ত শিবের দর্শন পাবেন বলে গাঁজার পিপাসা অতি কষ্টে দমন করে আছেন। অভয়াচরণ আশ্রমে আসার সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্যামী বাবা লোকনাথ তাঁর গাঁজার পিপাসা মেটান তাতে অভয়াচরণের মনে হয়েছিল, বাবার কৃপা অবশ্যই তিনি লাভ করবেন। কিন্তু তিনি যখন বাবার কৃপা প্রার্থনা করেন, তখন বাবা তাঁকে বলেন, তুই নিজেই ত ব্রহ্মচারী। আমার কাছে কৃপা প্রার্থনা করছিস কেন?

পরমপুরুষ শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী, পৃষ্ঠা নং ১৬৫

৮) শ্রীযুত তারাকিশোর চৌধুরী মহাশয়ের একবার খুব জ্বর হয়। তখন তিনি কলিকাতার "হাইকোর্টে" ওকালতি করেন। তাঁহার মনে হইল, শ্রীযুত বাবাজী মহারাজ গাঁজা খান, তাঁহাকে গাঁজা ভোগ দিয়া যদি সেই প্রসাদ পান, তাহা হইলে তাঁহার জ্বর ছাড়িয়া যাইবে। এই মনে করিয়া তিনি শ্রীযুত বাবাজী মহারাজকে গাঁজা ভোগ দিলেন এবং নিজে সেই গাঁজা খাইলেন। গাঁজা খাওয়া তাঁহার কখনও অভ্যাস ছিল না; কিন্তু সেই প্রসাদী গাঁজা যথেষ্ট পরিমাণ খাওয়া সত্ত্বেও তাঁহার কিছুই হইল না, জ্বর ছাড়িয়া গেল

কয়েক মাস পরে তিনি বৃন্দাবনে যান। তাঁহার সেখানে থাকিবার সময় শেষ হইলে তিনি কলিকাতায় ফিরিবার দিন স্থির করিলেন। রওয়ানা হইবার কিছু সময় পূর্ব্বে শ্রীযুত বাবাজী মহারাজ গাঁজার কল্কি হাতে দিয়া বলিলেন-"এ প্রসাদী গাঁজা, তুমি খাও।” সেখানে কয়েকজন ব্রজবাসী বসিয়াছিল, এত সময় শ্রীযুত বাবাজী মহারাজ তাঁহাদের সঙ্গেই গাঁজা খাইতেছিলেন। তন্মধ্যে একজন জিজ্ঞাসা করিল -"বাবু কি গাঁজা খান?" শ্রীযুত বাবাজী মহারাজ-“না, বাবু গাঁজা খান না বটে; তবে জ্বর হ'লে আমাকে ভোগ দিয়ে প্রসাদ পান।” ভাবিয়া দেখ, প্রকৃত সদ্গুরুর শক্তি কি অসীম!

শিশিরকুমার সাহা, কাঠিয়া বাবা, (শ্রীযুক্ত রামদাস কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের জীবনী), পৃ ৮২-৮৩, প্রিন্ট ১৯৩০, কলকাতা

৯) ওরশের সময়ে এখানে হিন্দুয়ানী কায়দায় মেলা বসে। মেলায় নারী-পুরুষ সকলেই আসে। গান-বাজনা, মদ-গাঁজা, জুয়ার আড্ডা কিছুই বাদ যায় না। এখানকার খাদেমরা বেশরাহ ফকির। এদের ইংগিতে এখানে অনেক বেশরাহ কার্যকলাপ চলে। হযরত শাহজালালের নামে লেখা বহু গান প্রচলিত আছে। মারেফতী গান গাইলে সওয়াব মিলে, এমন একটা ধারণা অজ্ঞ মুসলমানদের মধ্যে এখনও রয়েছে। তাই নারী-পুরুষে সমস্বরে মারেফতী গান গায়। এ-রকম একটি গান:-

'তুমি রহমতের নদীয়া

দয়া করো মোরে হযরত

শাহজালাল আউলিয়া।'

এই গান যারা গায়, তারা জানে না যে, রহমত একমাত্র আল্লাহর এক্তিয়ারে।

মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান, কিতাব: হযরত শাহজালাল (রহ.), পৃ ৪১, জয় প্রকাশন, ঢাকা, প্রিন্ট: ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

১০) উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর জেলায় কৃষকদের এক আঞ্চলিক ঠাকুর আছেন, যাঁর নাম 'কাণ্ডী'ইনি স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে তাঁদের গবাদি পশুসমূহের রক্ষাকর্তা এবং ঐ সমস্ত পশুদের যন্ত্রণাদায়ক রোগের পরিত্রাতারূপে গণ্য হন। এখন এই দেবতাকেও প্রসন্ন করার জন্য গাঁজা দেওয়া হয় এবং যাতে তিনি ধূমপান করতে পারেন তার জন্য হুঁকা এবং ছিলিমও নিবেদন করা হয়।

— 'উত্তরবঙ্গের গ্রাম্য দেবতা-সমূহ': 'হিন্দুস্থান রিভিয়্যু' ফেব্রুয়ারি ১৯২২; পৃ. ১৫৩-৫৪; বাঘ ও সংস্কৃতি, সনৎকুমার মিত্র সম্পাদিত, পৃ ১৬, পুস্তক বিপণি, কলকাতা, প্রিন্ট ১৯৮০

 

১১) সমস্ত বাউল গাঁজা খায় না। বাউলদের একাংশ গাঁজার ভক্ত কিন্তু মদের বিরোধী। সাঁই এবং রাঢ়ের বহু গায়ক মদ্য-মাংসের একনিষ্ঠ সেবক

লালনের গান থেকে তাঁর সময়ের বহু তথ্য ও ইতিহাসের বহু উপাদান সংগ্রহ করা যেতে পারে। সেকালে তামাক, গাঁজা এবং মদ মাদকদ্রব্য হিসাবে সমাজে প্রচলিত ছিল। লালন নিজে গাঁজা খেতেন কি? তাঁর শিষ্য দুদ্দু গাঁজার তীব্র বিরোধী ছিলেন। প্রবাসীতে লালনের রচিত 'হুকার গান' নামে একটি পদ প্রকাশিত হয়েছিল। এ পদটি থেকে মনে হতে পারে যে তিনি 'হুকা' খেতেন।

শক্তিনাথ ঝা, ফকির লালন সাঁই: দেশ কাল ও শিল্প, পৃ ১৫৭ ও ২৪১, প্রিন্ট: ১৯৯৫, সংবাদ প্রকাশ, কলকাতা

 

১২) হালিশহর কোনা মোড় ছাড়িয়ে বিশালাক্ষ্মী ঘাট পেরোলেই শীতলাতলার সম্মুখে পূর্ণ সাধুর আশ্রম। লোকমুখে তিনি ফক্করবাবা। আশ্রম বলতে গঙ্গার কিনারায় বন-জঙ্গলে ঘেরা খানিকটা পরিত্যক্ত জমি, জমির আসল মালিক শুনেছি শ্যামদাস গুপ্তবাবুরা। পূর্ণ তার উপরে ঘর বেঁধে আছে বহুকাল ধরে জমিটার মাঝ বরাবর। মাথায় চালা ঠ্যাকে। হাত ছয় সাত প্রস্থে দৈর্ঘ্যে ছোট, বারান্দাসহ মাটির দেয়াল দেওয়া ঝুপড়ি ঘরখানিতে পূর্ণ থাকে। উত্তর সীমানায় আর একটু বড় আকারের প্রায় অনুরূপ বেড়া দেওয়া টালির ছাউনি ঘর। ওখানেই থাকেন মহেশ বাবা। সঙ্গে আছেন ওঁর সাধনসঙ্গিনী লীলা মা। নিভৃত নিলয়। পশ্চিমে গা ঘেঁষে গঙ্গা বইছে

বর্ষাকালে সীমানার ভাঙন পেরিয়ে উঠে আগে আসত গঙ্গা। এখন প্রতিরোধ পেয়েছে। সরকারি ওয়াল। এর ধারেই অন্য আর এক মালিকের একখণ্ড জমি। সেখানে ইট বাঁধানো দুর্গামাতার আশ্রমবাড়ি। মূর্তি নেই। ঘটে পুজো হয়। লীলা মা পুজো সারেন। মহেশ বাবার দুর্গামূর্তিতে বিশ্বাস নেই। বললে বলেন, শরীরের ভেতরই দুর্গা রয়েছেন। আলাদা করে আর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করার দরকার কী? মহেশ বাবা তাহেরপুরের বয়সের গাছ-পাথর পেরোনো সাধক দয়াল বাবার শিষ্য। কেউ বলেন, বাবার বয়স একশ বিশ, কেউ বা একশ তিরিশ। আমি গেছি ওঁর ওখানেছিন্নমস্তার উপাসক। বহাল তবিয়তে বেঁচেবর্তে আছেন দিনে একবার গাঁজা সেবা।


সুধাসুন্দরীর কাছ থেকে কোনওমতে পালিয়ে বেঁচেছি আমি। তিনি আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন কথা কিছুদূর এগোতে তাঁর বুকে হাত রাখতে। তাতেই না কি আমি বুঝতে পারব যে, সেখানে কেমন নদী বইছে। তিনি আমাকে এও বলেছিলেন যে, বীর্যধারণ আমাকে তিনি নিজে হাতে শিখিয়ে দেবেন। এতে যার-তার সঙ্গে যখন-তখন শোয়া যাবে। বাচ্চা হওয়ারও ভয় থাকবে না। একসময় তিনি চরম হতাশায় বললেন, 'বিন্দু ধরতে দম লাগে। এ ভৈরব এখন পারেন না। শালার দম নেই। সাধনে আসবেন। সব শেখায়ে দেবো আপনেরে। চলেন পালাই। আশ্রম বানাই।' একবার এক ভৈরব-ভৈরবী দুজনেই আমাকে শেষে বলে বসলেন, 'আপন শক্তিরে এখানে নিয়ে আসবেন। মা আপনার শক্তির দম-শ্বাস শেখাবেন। আমি আপনারে। কত লোকে শিখতে আসে।' বুঝতে আমার একটু অসুবিধে হল না শেখার নামে এখানে শরীর ব্যবসা আসলে চলে রমরমিয়ে। আর এক ভৈরবী আমাকে আরও অবাক করে বলেছিলেন, তাঁদের দেহমিলনের ছবি পর্যন্ত তুলে নিয়ে যায় অনেকে। এ ছবি নাকি ভালো বিক্রি হয়। লোকে দেখেদুখে শেখে। এভাবেই যুগল সাধনায় শরীরী ব্যবসা, নীল ছবির ব্যবসা চলছে রমরম করে প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে। অনেক সময় নিজে দেখেছি প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা পর্যন্ত গিয়ে উঠেছেন তান্ত্রিকদের ডেরায়। মদ-গাঁজা-চরসের প্রাপ্য হিস্যা বুঝে নিতে, আবার মেয়েমানুষের লোভে। তন্ত্রসাধনার এও এক দিক। যেদিকে বিন্দুধারণের নামগন্ধে ম ম করছে কামগন্ধ, ব্যভিচার, যৌনবৃত্তি আর চোরাকারবার। তবে তার আলোর দিকটি গ্রীষ্মজীবনের বাইরে নক্ষত্রে নক্ষত্রে আকাশ ঝিকমিক

হালিশহর শাশানঘাটে বসে মূলাধার চক্রের ব্যাখ্যা এভাবেই আমাকে শোনাচ্ছিলেন তান্ত্রিক আলো সাধু। শ্মশানঘাটে মা ছিন্নমস্তার মন্দির বহুদিন ধরে সামলাচ্ছিলেন তিনি। প্রাজ্ঞ মানুষ তিনি। শাস্ত্রজ্ঞ। আমার সঙ্গে অনেকদিনেরই পরিচয়। আমার কৌতুহলকে তিনি মাঝে মাঝেই নিশ্চিহ্ন করতে সহায়ক হয়ে ওঠেন। আসতে বলেন। বিশেষত অমাবস্যায়। নিজে হাতে ভোগ রান্না করে তিনি তিনি প্রতি অমাবশ্যাতে মা-কে দেন। আমাকে বলেন প্রসাদ নেওয়ার জন্য। আমাকে তিনি তন্ত্রের নানা আয়োজন সম্পর্কে মাঝেসাজেই পাঠ দেন। তবে আমি জিজ্ঞাসা করলেই। না হলে তিনি সদাই ভাবমগ্ন। চুপ করে থাকেন। ভক্ত-শিষ্য আসেন। মদ-গাঁজা আনলে জোরাজুরিতে তিনি একটু প্রসাদ করে দেন।

সোমব্রত সরকার, কাপালিক তান্ত্রিক যোগী কথা, পৃ ১৩, ১০৬, ১৭০

১৩) এ গোকুলে শ্যামের প্রেমে কেবা না মজেছে সখি

কারো কথা কেউ বলে না আমি একা হই কলঙ্কী

অনেকে তো প্রেম করে

এমন দশা ঘটে কারে

গঞ্জনা দেয় ঘরে পরে

শ্যামের পদে দিয়ে আঁখি

তলে তলে তল গাঁজা খায়

লোকের কাছে সতী বলায়,

এমন সৎ অনেক পাওয়া যায়

সদর যে হয় সেই পাতকী

অনুরাগী রসিক হ'লে,

সে কি ডরায় কুলশীলে

লালন বেড়ায় কুছি খেলে

ঘোমটা দিয়ে চায় আড়চোখি ॥

লালন সাঁইয়ের গান, পূর্ণদাস বাউল সম্পাদিত, বই: বৃহৎ বাউল সঙ্গীত, পৃ ৫১, প্রিন্ট: জুলাই, ১৯৫৫, কলকাতা; লালন-গীতিকা, মতিলাল দাশ ও পীযূষকান্তি মহাপাত্র সম্পাদিত, ৩৬৪ নং গান, পৃ ২৫০, প্রিন্ট: ১৯৫৮, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত

১৪) বাসার সামনে এলে হারান ফকির আমার আগ্রহ দেখে আরও কয়েকটা গান শোনাল। প্রশ্ন করে জানতে পারলাম- গানগুলো লালন সাঁইজির। ছেউড়িয়া গ্রামে তাঁর আখড়া। এটা শুনবার পর, পরদিন সেখানে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। তখন কেউই লালন ফকির এবং তাঁর গান সম্বন্ধে জানে না। ছেউড়িয়ার বন্ধু ইসমাইল বলল- তাদের গ্রামেই লালনের আখড়া। বললে, -তুই যাসনে। ওরা গাঁজা খায়। মেয়ে ছেলে একসাথে থাকে। সারারাত গান করে। তুই নামাজ পড়িস। ওখানে গেলে তোকে তুকতাক করে ফেলবে।

ড. সুজিতকুমার বিশ্বাস, বাংলার লোক ঐতিহ্যের অধিকারী যতীন্দ্রনাথ রায়, পৃ ৪২, প্লাসেন্টা পাবলিকেশন্স, নদীয়া, কলকাতা বইমেলা ২০২৪

১৫) "গাঁজা খোর গাঁজার মর্ম বুঝে মান্য করে মারে

বাদশা উজির নেশার ঘোরে

যখন গাঁজা খায় নবাবী ভয়পায়-দমে দম লাগায়

নেশায় ইস্তি কোন খোন্ডা দেবে

তালের আঁটি বানিয়ে খোলা বলে ব্রহ্মার কমণ্ডুল

বলে কৃষ্ণের হাতে বাঁশি

ডুমুরের ডাল লয়েছে করে; এক ছিলিম পুরে

চারইয়ারে লক্ষটাকার মজা মারে

নেশাতে হয় বিদগ্ধ, বলে পেলাম ব্রহ্মপদ যেমন ধারা চতুষ্পদ

কলুর ঘানি আছে ঘাড়ে, গাঁজার পাতা ভাসিয়ে জলে

ধূয়া কলের জাহাজ চলে

বসে থাকে নোঙর ফেলে অকূল পাথার সমুদ্দরে

গোঁসাই চরণ-চাঁদে বলেন কুবির, ভবির কথায় ভুলিসনারে"।

কুবির গোঁসাইয়ের রচিত লোকগীতি, 'সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে নদীয়ার গ্রাম' বইয়ে রণজিৎ কুমার বিশ্বাস কর্তৃক উদ্ধৃত, পৃ ১৯৯, ইন্দিরা প্রকাশনী, কলকাতা, ২০০২

 

   -তাহসিন আরাফত

বুধবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৪

মব-জাস্টিস ও মব-জাজমেন্ট


 

“মব-জাস্টিস ও মব-জাজমেন্ট— দুটিকেই আমি প্রচণ্ড ভয় পাই। 


মবের হাতে, অর্থাৎ গণমানুষের হাতে সবকিছু বিচারের ভার তুলে দেয়াটা বিপজ্জনক। কারণ গণমানুষের হার্ড-ইনস্টিঙ্কট রয়েছে। ঝোঁকের বশে পাল বেঁধে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা তাদের আছে। যারা বিহ্যাভিয়োরাল ইকোনোমিক্স বা মব-সাইকোলোজি পড়েছেন, তারা ‘ইনফরমেশন ক্যাসকেড’ নামে একটি বিষয়ের সাথে পরিচিত থাকবেন। ইনফরমেশন ক্যাসকেডে কী ঘটে? ধরা যাক কোনো এলাকায় আপনি বেড়াতে গিয়েছেন। সেখানে আপনার ক্ষুধা পেয়েছে, এবং খাবার খাওয়ার জন্য রেস্তোরাঁর সন্ধান করছেন। হঠাৎ দুটি রেস্তোরাঁর দেখা পেলেন। একটির নাম ‘A’, আরেকটির নাম ‘B’। দুটি রেস্তোরাঁই খালি। সেগুলোতে কোনো কাস্টমার নেই। আপনি বুঝতে পারছেন না কোন রেস্তোরাঁটির খাবারের মান ভালো। 


এ অবস্থায় র্যান্ডোমলি, অর্থাৎ দৈব চৈয়নের ভিত্তিতে রেস্তোরাঁ ‘A’-তে ঢুকে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর আরও একটি লোক সেখানে খাবারের সন্ধানে এলো। সে দেখলো যে— রেস্তোরাঁ ‘B’ খালি পড়ে আছে, কিন্তু রেস্তোরাঁ ‘A’-তে একজন লোক বসে খাবার খাচ্ছে। সে ভাববে, রেস্তোরাঁ ‘B’-এর চেয়ে ‘A’-এর খাবারের মান নিশ্চয়ই ভালো। এ জন্য ‘A’-তে কাস্টমার আছে, ‘B’-তে নেই। লোকটি করবে কী, আপনার দেখাদেখি ‘A’-তে ঢুকে পড়বে। এভাবে আরও যারা আসবে, তাদেরও একটি বড় অংশ ‘A’-কে বেছে নেবে। এই যে একজনের দেখাদেখি আরেকজনের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা, এটি গণমানুষের মধ্যে খুব দেখা যায়। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অন্যের সিদ্ধান্তকে অনুকরণ করে থাকে। নিজের বুদ্ধি-বিবেককে তারা সহজে খাটাতে চায় না। আগামীকাল যদি টেলিভিশনে কোনো জনপ্রিয় ব্যক্তি বলে ফেলেন— অমুক লেখক চোর, তার সব লেখা নকল, তাহলে গণমানুষদের একটি অংশ চোখ বুজে এ মিছিলে যোগ দিয়ে দেবে। তারা জানতে চাইবে না— ‘জনপ্রিয় স্যার, অমুক লেখকের কোন কোন লেখার কোন কোন বাক্য নকল? তিনি কোন মনীষীর কোন বইয়ের কোন পৃষ্ঠা থেকে নকল করেছেন? নকল কাকে বলে? আমাদেরকে দেখান, আমরা নিজে পড়ে, নিজে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চাই।’ ফেসবুকে আমরা যে-ভাইরাল কন্টেন্টগুলো দেখি, সেগুলোও ইনফরমেশন ক্যাসকেডের ফসল। কেউ একজন কোনো জিনিস নিয়ে মাতামাতি করলো, আর অমনি তার অনুসরণকারীরাও এটি নিয়ে তুলকালাম শুরু করে দিলো। সবাই দলবেঁধে প্রথম জনের মতামতের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে।


সেলেব্রিটি মন্টু যদি বলে— রবীন্দ্রনাথ ইসলাম-বিদ্বেষী লেখক, তাহলে তার বুদ্ধিবিমুখ অনুসারী পালও বলতে শুরু করবে— ‘রবীন্দ্রনাথ ইসলাম-বিদ্বেষী লেখক; তাঁকে জুতো মারতে হবে।’ কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কোন কোন লেখার কোন কোন বাক্য ইসলাম-বিদ্বেষী, ইসলাম বিদ্বেষ কাকে বলে, কোনো লেখা ইসলাম-বিদ্বেষী কি না এটি কীভাবে নির্ধারিত হয়, একজন লেখকের ইসলাম-বিদ্বেষী বা ইসলাম-বিরোধী হওয়ার অধিকার আছে কি না, নাস্তিক-বিদ্বেষ জায়েজ হলে ইসলাম-বিদ্বেষ কেন জায়েজ নয়, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন গণমানুষ করবে না। তারা চাইবে কেবল অন্যের টানা উপসংহার নকল করতে। কোনো বিষয়ে অন্যের দেখাদেখি সিদ্ধান্ত নেয়ার এই যে সংস্কৃতি, এটিকে গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করি। অমুকে অমুককে ভোট দিচ্ছে, তাই আমিও অমুককে ভোট দেবো, অমুকে অমুককে ঘৃণা করছে, তাই আমিও অমুককে ঘৃণা করবো, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যে-জাতি নিমজ্জিত থাকে, গণতন্ত্র তাদের জন্য উপযুক্ত নয়। রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক কাঠামো সৃষ্টির জন্য তাদের কোনো বুদ্ধনির্ভর প্রস্তুতি নেই।

হ্যাঁ, মানুষ যখন জঙ্গলে ছিলো, তখন হার্ড-ইনস্টিঙ্কট বেশ উপকারী ছিলো। এটি আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে অনেক বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করতো। সমাজে সবার পক্ষে সব বিষয়ে ইনফর্মড ডিসিশন নেওয়া সম্ভব নয়। কোনো ফল বিষাক্ত কি না, কোনো প্রাণী বিপজ্জনক কি না, এ বিষয়গুলো একজন অনভিজ্ঞ শিশুর পক্ষে জানা কঠিন। বাবা-মা’র দেখাদেখিই তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একজন বয়স্ক মানুষ বাঘ দেখে দৌড় দিলে, একজন শিশুরও উচিত বাঘ দেখে দৌড় দেয়া। হার্ড-ইনস্টিঙ্কটের এটি একটি বড় ইভোলিউশোনারি কারণ। আমাদের মন বা বুদ্ধি এভাবেই বিবর্তিত হয়েছে। যে-মানুষ বাঘ দেখে পালিয়ে যায় না, তার পক্ষে প্রকৃতিতে টিকে থাকা কঠিন। তবে আদিম মানুষদের হার্ড-ইনস্টিঙ্কট আধুনিক মানুষদের মতো হুজুগে ও ভিত্তিহীন ছিলো না। বাই ইনডাকশন, অর্থাৎ পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তারা বুঝতে পারতো, কোন কোন বিষয়ে অন্যের সিদ্ধান্ত নকল করতে হবে। বিপদের সাথে লড়াই করে করে তারা বুঝতো, এই এই ব্যাপারে বিজ্ঞজনের মতামত অগ্রাহ্য করা বিপজ্জনক। আধুনিক সমাজে এমনটি ঘটছে না, কারণ এ সমাজ জঙ্গলের সমাজ থেকে একেবারেই আলাদা। মানুষের হার্ড-ইনস্টিঙ্কট এখন বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, ও সোশ্যাল মিডিয়াতে।

প্রতিবাদীদের দিকে তাকান। সেখানে কী হচ্ছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ পালবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করছে। অন্ধ ভাল্লুকের মতো আচরণ করছে। প্রতিবাদী মানুষদের আমি সম্মান করি। তাদের কাছে সভ্যতার ঋণ রয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদকে পেশা হিশেবে নিলে বিপদ। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে পেশাদার প্রতিবাদজীবী রয়েছেন। নানা বিষয়ে বুঝে না বুঝে তারা প্রতিবাদ করেন। যেন প্রতিবাদ করার জন্যই জন্মেছেন। প্রতিবাদের বিষয় নির্বাচনেও তারা অসৎ। কর্মের চেয়ে কর্তা তাদের কাছে অধিক মুখ্য। সবাই প্রতিবাদ করছে, তাই আমাকেও করতে হবে— এমন প্রবণতা সমাজের জন্য আত্মঘাতী। আমি চাই মানুষ নিজ বুদ্ধি খাটিয়ে প্রতিবাদ করুক। অন্যের দেখাদেখি বা অন্যকে অনুসরণ করে যে-প্রতিবাদ হয়, তা সবসময় ভালো ফল বয়ে আনে না। বোধ-বিবেচনা হারিয়ে সারাক্ষণ অন্যের কণ্ঠের চিৎকার নকল করাকে প্রতিবাদ বলে না। বরং এটি ‘হার্ড বিহ্যাভিয়ার’ বা ‘পাল বেঁধে চলার সংস্কৃতি’-কে উৎসাহিত করে। ফ্যাসিবাদের মূল কারণ কিন্তু মানুষের এই ‘হার্ড বিহ্যাভিয়ার’। ভুলে গেলে চলবে না, ফ্যাসিজম ধারণাটির উদ্ভব ঘটেছিলো ‘লাঠির বান্ডিল’ থেকে। অনেকগুলো লাঠি মিলে একটি মুগুর তৈরি হয়। এ মুগুর যখন ভিন্নমতের মানুষদের মাথায় বাড়ি মারতে থাকে, তখন এটিকে ফ্যাসিবাদ বলে। শব্দটি এসেছিলো ইতালীয় ভাষার 'Fascio' থেকে, যার অর্থ বান্ডিল। সমাজে বাস করা প্রতিটি মানুষই লাঠি। এরা যদি কোনো রাজনীতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের পক্ষে একত্রিত হয়, এবং ভিন্নমতের মানুষদের উপর চড়াও হয়, তখন বুঝতে হবে সমাজে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে। পশুরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এ জন্য কোনো কাজ করার আগে ভেবে দেখা উচিত— আপনি ফ্যাসিবাদের লাঠি রূপে ব্যবহৃত হচ্ছেন কি না।

ফ্যাসিবাদবিরোধী মানুষও ফ্যাসিবাদী হতে পারেন। ফেসবুকে আমাকে প্রায়ই নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হয়। এসব পরীক্ষায় দেখেছি, এ দেশে যারা ফ্যাসিবাদ শব্দটি বেশি উচ্চারণ করেন, বা এর বিরুদ্ধে নিয়মিত শ্লোগান দেন, তারা নিজেরাও ফ্যাসিবাদী। এমন অনেককেই পেয়েছি, যারা ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করছেন— কিন্তু নিজেরা ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলন নন। অপছন্দের লেখা লেখেন, এমন লেখকদের শত্রু জ্ঞান করেন। প্রতিপক্ষের প্রতি মনে তীব্র বিদ্বেষ লালন করেন। পছন্দের বিশ্বাস, প্রতিষ্ঠান, হুজুর, নেতা, ও সেলেব্রিটির পক্ষে তারা যে-ভঙ্গিতে পাল বেঁধে কথা বলেন, এবং অপছন্দের লোকজনের বিরুদ্ধে যেভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে কুৎসা রটান, তাতে তারা মানুষ নাকি ভেড়া— এটি বোঝা কঠিন। ইংরেজিতে ‘Sheeple’ নামে একটি শব্দ আছে, যেটি তৈরি হয়েছে ‘Sheep’ ও ‘People’—কে একত্রিত করে। পিপল বা জনগণ তখনই শিপল হয়ে ওঠে, যখন তার ভেতর শিপ বা ভেড়ার গুণাবলী সংক্রমিত হয়। ভেড়া পাল বেঁধে চলতে পছন্দ করে। কারণ তার বুদ্ধি কম। গায়ের জোরও বেশি নয়। একা থাকলে সে নিরাপদ বোধ করে না। কিন্তু মানুষ বুদ্ধিমান। তার গায়ে জোর আছে, ব্যাংকে টাকা আছে। ফলে মানুষ যদি ভেড়ার মতো ইনস্টিংকটিভ আচরণ করে, তাহলে সমাজে রাজনীতিক ও অর্থনীতিক ঝুঁকি তৈরি হয়। দেখা যাবে, নেকড়েরাই ভেড়া সেজে শিকার নিয়ে ঢুকে পড়েছে অরণ্যে।”


—মহিউদ্দিন মোহাম্মদ

সোমবার, ১১ মে, ২০২০

লকডাউন ও লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক


প্রতিদিন আমরা দেখতে পারছি লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক শ'য়ে শ'য়ে কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বা সাইকেল চালিয়ে নিজের দেশে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে শহরগুলো থেকে। অনেকে শেষ অবধি পৌঁছতে পারছে না, রাস্তাতেই হার স্বীকার করে নিচ্ছে। মৃত শ্রমিকের সংখ্যা করোনায় মৃতের সংখ্যার মত গোনা হচ্ছে না, কোনো ওয়েবসাইট মৃত শ্রমিকের সংখ্যার "ইউনিফর্ম" বা "লগারিদমিক" - কোনো স্কেলেই "কার্ভ" তৈরি করে দেখাচ্ছে না। হাতে গোনা কিছু খবর আসছে যেমন ট্রাকের ধাক্কায় গুজরাটে ৫ জনের মৃত্যু বা অরঙ্গাবাদে ট্রেনের তলায় ১৫ জন অথবা আম বোঝাই ট্রাক উল্টে ৫ জন। এর বাইরেও যে অনেক বড় সংখ্যক শ্রমিক মাঝরাস্তায় হারিয়ে যাচ্ছে সেই নিয়ে সন্দেহ নেই।

তবে করোনায় মৃত্যুর সঙ্গে শ্রমিকের মৃত্যুর একটা তফাৎ রয়েছে। করোনায় মৃত্যু ভাইরাসে, আর শ্রমিকের মৃত্যু রাষ্ট্রের জন্য। করোনায় মৃত্যুগুলো রোখা সম্ভব ছিল না, শ্রমিকদের মৃত্যুগুলো রোখা যেত। রাষ্ট্র যদি এদের থাকার-খাওয়ার ব্যবস্থা করতো, অথবা প্রত্যেকের হাতে এক মাসের রোজগার পৌঁছে দিত তাহলে এই পরিণতি হতো না। কিছু কিছু বিজ্ঞ দেখছি বলছে যে সরকারের কী দোষ, সরকার কী করবে ইত্যাদি। তাদেরকে শুধু একটাই কথা বলব যে অপেক্ষা করুন, যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে চলেছে দেশ এবং বিশ্ব তাতে সরকারি চাকুরেদেরও মাইনে এবং চাকরিতে কাট ছাঁট হতে চলেছে, বেসরকারি চাকরি... হেঁ হেঁ। আপনি আইটিতে কাজ করেন? ভাবছেন আইটিতে ওয়ার্ক ফ্রম হোম হয়, চাকরিতে টান পড়বে না? কে নেবে আপনার সার্ভিস? কে হবে আপনার ক্লায়েন্ট? আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান - যে দেশগুলোয় ভারতের সবচেয়ে বেশি আইটি রফতানি সেখানকার সব থেকে বড় বড় কোম্পানিগুলোও চরম অর্থনৈতিক সংকটে। ২০০৮-এর মত এখনো লেম্যান ব্রাদার্স বা এআইজি দেখতে পাননি তার কারণ এদের ব্যালেন্স শিট এবং ব্যাংকগুলোর কাছে প্রকৃত বকেয়া ঋণের হিসেব এখনো করে ওঠা হয়নি। লকডাউন ওঠার পরেই আসল চিত্র দেখতে পাবেন। আমেরিকায় বেকারত্ব ১৫%-এ পৌঁছেছে যা ঐতিহাসিক। সেখানকার সরকারও আউটসোর্সিংয়ের ওপর বিধিনিষেধ চাপাবে। মার্কিনী বিশেষজ্ঞরা সকলেই এক মত যে এই ক্রাইসিস ২০০৮-এর গ্রেট রিসেশনের থেকেও অনেক গ্রেটার। তাই আইটি ভাই বোনেরা একটু ধৈর্য ধরুন, আমি নিশ্চিত যারা এখনো পরিযায়ী শ্রমিকদের সাথে সমব্যথী হতে পারছেন না তারা কয়েক মাস পরেই হতে পারবেন।
তবে শুধু কয়েক কোটি পরিযায়ী শ্রমিকই এতে বিপর্যস্ত এটা খুব ভুল ধারণা। তাদের কষ্টটা হয়ত সর্বাধিক এবং তারা শ'য়ে শ'য়ে কিলোমিটার হাঁটছে বলে সেটা সামনে আসছে, কিন্তু অর্থনৈতিক বিপর্যয় চিত্রটা যে অনেক বিপুল বুঝতে পারবেন যখন আপনি নিজের পাড়ায় খোঁজ নেবেন। ছোট কারখানা, রেস্তোরাঁ, দোকান, ট্যাক্সি বা অটোচালক, রিকশাচালক, হকার - এই বিপুল সংখ্যক মানুষ, যারা ছোট ব্যবসা বা অস্থায়ী চাকরি করে পেট চালান তাদের রেশনের চাল আর আটা ছাড়া বাকি কোনো কিছু কেনার আর পয়সা নেই। শুধু এরাই নন, টিউশন করে পেট চালানো, অথবা স্কুল বা কলেজের অস্থায়ী শিক্ষক/শিক্ষিকা, যারা আপাত মধ্যবিত্ব তাদেরও অনেকের অবস্থা এরকম, আত্মীয় স্বজনের থেকে ধার চাইতে হচ্ছে বিদ্যুতের বা টেলিফোনের বিল দিতে। যাঁরা ত্রাণ দিচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়, অথবা কমিউনিটি কিচেন চালাচ্ছেন তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, কত মধ্যবিত্ব বাড়ির লোকজনকেও খাবার দিতে হচ্ছে কারণ তাদের বাড়িতে গ্যাস কেনার টাকা নেই।
অথচ এই অর্থনৈতিক সংকট আটকানো না গেলেও কিছুটা সুরাহা মানুষকে হয়ত দেওয়া যেত। আমেরিকা ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশের সরকার নিঃশর্তে প্রত্যেকটা মানুষের একাউন্টে বেশ কিছু টাকা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উচ্চবিত্ত বাদ দিয়ে বাকি প্রতিটা মানুষের একাউন্টে ১,২০০ ডলার দিয়েছে, ৯০,০০০ টাকা। জার্মান সরকার প্রত্যেকের একাউন্টে দিয়েছে ৮০০ ইউরো, তা ছাড়া ছোট ব্যবসায়ীদের দিয়েছে ৫০০০ ইউরো করে যাতে তারা কর্মচারীদের মাইনে দিতে পারে। উন্নত দেশ বাদ দিন, অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশও ভারত সরকারের চেয়ে বেশি ত্রাণ দিয়েছে। নীচে একটি গ্রাফ রয়েছে (চিত্র-১)। ইউরোপের সেন্টার ফর ইকোনোমিক পলিসি রিসার্চ বিশ্বের অর্থনৈতিক গবেষণার একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তারা প্রতি সপ্তাহে কোভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে কিছু গবেষণাপত্র প্রকাশ করছে। এই গ্রাফটি সেখানকারই একটি গবেষণাপত্র থেকে নেওয়া যার লিংক শেষে পাবেন (লিংক-১)। এই গ্রাফে এক একটা নীল বিন্দু হলো এক একটি দেশ। এই গ্রাফে এক একটি দেশের অর্থাৎ বিন্দুর অবস্থান নির্ভর করছে দুটো সংখ্যার ওপর - এক, সে দেশের সরকার কতটা কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে এবং দুই, সে দেশের সরকার কতটা ইকোনোমিক রিলিফ দিয়েছে জাতীয় আয়ের শতাংশের হিসেবে। যে দেশের সরকার যত বেশি কঠোর লকডাউন ঘোষণা করবে তত বেশি সেই দেশের মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং তাই মানবতার খাতিরে ধরে নেওয়া যায় যে সেই দেশের সরকার তত বেশি অর্থনৈতিক ত্রাণ দেবে। ওই চিত্রটিতে দেখা যাচ্ছে যে অধিকাংশ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই সেটা সত্যি - যত কঠিন লকডাউন তত বেশি ত্রাণ, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনো দেশের নাগরিকদের আধ পেটা খেয়ে থাকতে বাধ্য করতে পারে না। কিন্তু দেখুন, একমাত্র ব্যতিক্রম কে? ভারতবর্ষ! এই দেশ লকডাউনের দিক দিয়ে প্রায় কঠোরতম অথচ অর্থনৈতিক ত্রাণের দিক দিয়ে প্রায় কৃপণতম। ভুল বুঝবেন না, এখানে কিন্তু ত্রাণের হিসেবটা জাতীয় আয়ের শতাংশে করা হচ্ছে তাই আমাদের দেশ গরিব সেই যুক্তি খাটবে না। ও হ্যাঁ, এই গ্রাফ তৈরির জন্য সমস্ত তথ্যই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কোভিড ডেটাবেস থেকে জোগাড় করা। এই ডেটাবেসের হিসেবেই ভারতের লকডাউনকে বিশ্বের মধ্যে কঠিনতম বলা হয়েছিল, যা দেখিয়ে ভারতের সরকারপন্থী মিডিয়া মোদির গুনগান গেয়েছিল। তখন বোধয় তারা জানতো না যে সেই ডেটাবেসে অর্থনৈতিক ত্রাণেরও হিসেবও দেওয়া থাকে।
অর্থাৎ ভারতের রাষ্ট্র বিশ্বের সমস্ত দেশের তুলনায় সব থেকে শ্রমিক বিরোধী অবস্থান নিয়েছে করোনাযুদ্ধে। কিন্তু প্রশ্ন হলো - কেন? এই কোটি কোটি মানুষের তো ভোটাধিকার আছে, ভারত এখনো গণতন্ত্র, এখনো ভোট হয়, তাহলে কী এমন দায় পড়লো সরকারের যে তারা এই কোটি কোটি মানুষের চরম বিপর্যয়ে একটু সাহায্যের হাতও বাড়াতে চাইছে না? কার স্বার্থ কোটি কোটি শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের চেয়েও বেশি? এর উত্তর আছে দ্বিতীয় চিত্রে। দ্বিতীয় চিত্রে ফের এক একটি বিন্দু হলো এক একটি দেশ এবং এই গ্রাফে এক একটি দেশের অবস্থার নির্ধারিত হয়েছে ফের দুটি সংখ্যামানের দ্বারা যার একটি আগের মতোই অর্থনৈতিক ত্রাণ কিন্তু অপরটি হলো "সভরেন ক্রেডিট রেটিং"। সভরেন ক্রেডিট রেটিং কী? এটি হলো একটা মাপকাঠি যা নির্ধারণ করে কোন দেশের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে কতটা আকর্ষণীয় হওয়া উচিত। সভরেন ক্রেডিট রেটিং যদি খারাপ হয়ে যায় কোনো দেশের তাহলে সে দেশের শেয়ার বাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পয়সা তুলে নেবে, সে দেশের কোম্পানিগুলোর বিদেশ থেকে ঋণ পাওয়া মুশকিল হবে বা সুদের হার বেশি দিতে হবে, সে দেশের সরকারকেও বিদেশ থেকে ধার করলে সুদের হার বেশি দিতে হবে। এই গ্রাফটিতে দেখতে পাচ্ছেন যে যেসব দেশগুলির ক্রেডিট রেটিং খারাপ সেই দেশগুলো করোনার জন্য অর্থনৈতিক ত্রাণও কম দিয়েছে এবং ভারতও সেই দেশগুলির মধ্যে একটা। এর কারণ হলো সরকারি খরচ বাড়ালে ক্রেডিট রেটিং কমার সম্ভাবনা থাকে, তাই যাদের ক্রেডিট রেটিং আগের থেকেই খারাপ তারা ত্রাণও কম দেবে এই ভয়ে যে রেটিং তাতে আরো খারাপ হয়ে যেতে পারে।
তাহলে এটা বোঝা গেল যে ভারত সরকার শ্রমিক বিরোধী অবস্থান নিচ্ছে, ত্রাণ দিচ্ছে না তার কারণ ক্রেডিট রেটিংয়ের ভয়। কিন্তু ক্রেডিট রেটিং খারাপ হলেই বা কী? অসুবিধে কোথায়? আগেই বলেছি যে তাতে শেয়ার বাজার ধাক্কা খাবে কারণ বিদেশি বিনিয়োগ বেরিয়ে যাবে। শেয়ার বাজারে এই বিদেশি বিনিয়োগটা মূলত ফাটকা পুঁজি। কিন্তু তা বেরিয়ে গেলেই বা কী? অনেকেরই ভুল ধারণা থাকে যে শেয়ার বাজারের ওপর অর্থনীতির স্বাস্থ্য নির্ভর করে, কিন্তু আসলে বিষয়টা উল্টো - অর্থনীতির স্বাস্থ্যর ওপর শেয়ার বাজার নির্ভর করে (যদিও সেটাও সবসময় হয় না)। তাই শেয়ার বাজার পড়লে অর্থনীতির আলাদা করে বড় ক্ষতি হবে না, বিশেষ করে যেখানে আমাদের দেশে খুব কম সংখ্যক মানুষ শেয়ার বাজারে অনেক টাকা বিনিয়োগ করে। তাহলে? শেয়ার বাজারে বড় বিনিয়োগকারীদের অনেকের সাথে বিজেপি আরএসএস-এর দহরম মহরম কোনো গোপন তথ্য নয়, তাদের স্বার্থ রক্ষা করাটা হয়ত একটা উদ্দেশ্য হতে পারে। অপর একটা যুক্তি হতে পারে যে বিদেশি ফাটকা পুঁজি বেরিয়ে চলে গেলে টাকার দাম পড়বে। সেটার একটা সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এ কথাও সত্যি যে ভারতের বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার বিশ্বের মধ্যে অন্য বৃহত্তম, তা ছাড়া তেলের ও সোনার দাম তলানিতে। এই দুটো দ্রব্য ভারতের সবচেয়ে বড় আমদানি, তাই এদের দাম কমলে/বাড়লে টাকার দামও বাড়ে/কমে। সেই দিক দিয়ে তাই এক্ষুনি টাকার ওপর চাপ আসার তেমন কারণ নেই। সম্প্রতি, আইএমএফ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রার দাম করোনা সংকটের জন্য যাতে হঠাৎ করে পড়ে না যায়, আর তাদের বিদেশি মুদ্রার কোষাগার যাতে ফাঁকা না হয়ে যায়, তার জন্য সব উন্নয়নশীল দেশকে ব্যাপক বিদেশি মুদ্রা ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় (স্পেশ্যাল ড্রয়িং রাইটসের লিমিট বাড়িয়ে), কিন্তু ভারত একমাত্র উন্নয়নশীল দেশ যে এটার বিরোধিতা করেছে। তাই ধরে নেওয়া যায় যে ভারত সরকার টাকার মূল্য পড়া নিয়ে ভাবিত নয়।
তাহলে ক্রেডিট রেটিং খারাপ হলে আর কী কী ক্ষতি হতে পারে যার জন্য সরকার এত ভাবিত? ভারত সরকার বিদেশ থেকে ঋণ নিতে চাইলে সুদ বেশি দিতে হতে পারে। কিন্তু ভারত সরকারের বিদেশ থেকে ঋণ খুবই সামান্য, আর যেটুকু সেগুলোও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মত সংস্থা থেকে স্পেশ্যাল ডেভেলপমেন্টাল লোন যাতে সুদ নামমাত্র। তাহলে? দেখুন আরো একটা কারণ ওপরে লেখা রয়েছে। দেখছেন? - ভারতীয় "কোম্পানিগুলোর বিদেশ থেকে ঋণ পাওয়া মুশকিল হবে বা সুদের হার বেশি দিতে হবে"। এই, এইটেই হলো সেই গোপন কথাটি যেটা সরকার কোনোদিন উচ্চারণ করবে না। ব্যাংক অফ ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট জানাচ্ছে যে ভারতের কর্পোরেট সেক্টরের মোট বিদেশী ব্যাংকগুলো থেকে বিদেশী মুদ্রার ঋণ হলো ৫৯০০ কোটি ডলার, ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি টাকা (লিংক-২)। এটা শুধুই কিন্তু বিদেশী ব্যাংক থেকে। অন্য জায়গা থেকে বিদেশী মুদ্রার ঋণ ধরলে সংখ্যাটা আরো বেশি। শুধু ২০-টা বৃহত্তম কর্পোরেট সংস্থার বিদেশী ঋণই ১৮০০ কোটি ডলার, ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে রিলায়েন্স, টাটা, বিড়লা - সবই আছে (কোম্পানিগুলির ব্যালেন্স শিট থেকে এই তথ্য পেয়ে যাবেন।) সভরেন রেটিং খারাপ হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে এদের ওপরেই। এই ঋণের ওপর সুদ বেড়ে যাবে, নতুন ঋণ পেতে অসুবিধে হবে, লাভ কমবে।
তাহলে বোঝা গেল যে ভারতের কোটি কোটি শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী, দিন আনি দিন খাই মানুষের প্রতি সরকারের অমানবিক আচরণ এবং পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ত্রাণ দেওয়ায় অনীহার পেছনে কারণ হলো যে এই সরকার বৃহৎ পুঁজিপতি ও শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে বেশি ব্যস্ত। শ্রমিকদের ট্রেনের টিকিটের টাকা না দেওয়ার অমানবিক সিদ্ধান্তের পেছনেও রয়েছে টাটা আম্বানি - যারা বিজেপির ইলেক্টরাল বন্ডে হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েছে - সেই তাদের স্বার্থ রক্ষার তাগিদ। ভারতের শ্রেণী সংঘাত বোধয় এতটা সরাসরি এবং এতটা ক্ষিপ্র আকার ইদানিংকালে নেয়নি। কিন্তু অধিকংশ মানুষ জানবে না যে লক্ষ লক্ষ মানুষ হাজার হাজার কিলোমিটার হাঁটছে আসলে শ্রেণী সংঘাতের কারণে, তারা জানবে না যে তাদের ওপর শ্রেনিযুদ্ধর ঘোষণা হয়েছে। ভাববার সময় হয়েছে যে এই বৃহৎ পুঁজিপতিরা কতটুকু সম্পদ ও চাকরি তৈরি করে দেশের জন্য যার জন্য এরকম কোটি কোটি মানুষ আধপেটা খাবে? যারা এখনও পুঁজিপতিদের পক্ষ নেবে তাদের সাথে এখনই কোনো তর্ক করবো না, তিন মাস পর করবো কারণ আমি নিশ্চিত যে তিন মাসের মধ্যে এর আঁচ কর্পোরেট চাকরি করা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গায়ও লাগবে। তখন না হয় তাদের মতামত শুনতে চাইবো।

পুরন্দর

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...