ব্যক্তিগত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ব্যক্তিগত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মুকুল রায়


বাংলায় সন্তজলীয় রাজনীতির অনুপেক্ষনীয় জনক


মুকুল রায়, যিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন, শুধু এমনটা নয়; তিনি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতেন ছলে বলে কৌশলে। কেউ তাকে চাণক্য বলেন কেউ বলে চোর, যে যা খুশি বলুক তার নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে, আমি তাকে ‘মুকুল রায়’ই বলব। বাংলার বুকে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক পান্ডিত্যের উর্ধ্বে প্রণব মুখার্জির সমমানের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক যদি কারো হয়ে থাকে, সেটা মুকুল রায়। চাণক্য তোপ বা পরমাণু বোমা ছিলেন হয়তবা, সেখানে মুকুল রায় সামান্য সূচ; কিন্তু সেই প্রায় অক্ষম সূচই এতটা বিষাক্ত হয়ে তার বিরোধী রাজনীতির শরীরে মনে গেঁথে গিয়েছিল, যেখান থেকে আজও কংগ্রেস ও বামেরা বের হতে পারেনি। 

মমতা ব্যানার্জী তৃণমূল দল তৈরি করেননি, দল অজিত পাঁজা বানিয়েছিলেন। মুকুল রায় সেই সদ্য ভূমিষ্ঠ তৃণমূলেরর সমস্ত ব্যাক অফিস পিঠে করে বয়ে নিয়ে একটা দল বানিয়ে তুলেছিলেন নেপথ্যে থেকে। মুকুল রায়ের ৩০% রাজনৈতিক প্রাজ্ঞতা, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, রিস্ক নেওয়ার সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যদি আজকের বামেদের সবকটা নেতা মিলিয়েও থাকতো, দলটা কবে দাঁড়িয়ে যেতো। লোকে এটা ভুলে গেছে, মুকুল রায় ২০১৬ সালে তৃণমূল থেকে চলে যেতে আইপ্যাককে আসতে হয়েছিল মমতার পরামর্শদাতা হিসাবে। 

অত্যন্ত লো-প্রোফাইল, ভীষণ ডিসিপ্লিন, সাথে আন্তরিকতা- এটাই তাকে দক্ষ সংগঠক করে তুলেছিলো। যে মানুষ রাগে না, তার চেয়ে ডেডিকেডেট ত্রাস কম জনই হতে পারে, মুকুল রায় ছিল সেই ব্যতিক্রমী চরিত্র, যাকে রাগানো একপ্রকার অসম্ভব ছিল। একটা মানুষ কখন এগিয়ে যায় জানেন? না, প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী কাউকে ধড়াচূড়া শিক্ষিত বানালেও জ্ঞানী বানাবে তার নিশ্চয়তা নেই। জ্ঞানী সেই লোক যিনি শুধু নিখুঁত পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত বিশ্লেষণ করে ফেলতে পারেন পরিস্থিতি বা ঘটনাকে। জ্ঞানী সেই লোক, যে বলে কম, শোনে বেশি- মুকুল রায় দ্বিতীয় ক্যাটেগরির লোক ছিলেন, যিনি নিজে হামবড়া না সেজে, রাজ্যের প্রায় প্রতিটা হামবড়াদের পথে বসিয়ে দিয়েছিল। এমনকি শেষ কালেও বিজেপি আর তৃণমূলে যে কোনো প্রভেদ নেই, এটাও তিনিই প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন অফিসিয়ালি, এটাই মুকুল রায়। সৌজন্যবোধ আর শালীনতা তাকে অহংকারী আর অতিচালাকি করে তোলেনি, তাই তিনি তার রাজনৈতিক লক্ষ্যে অবিচল ও সফল ছিলেন।

তিনি শৈল্পিক ঘরানায় এসরাজ বেহালা তবলা বাজাতেননা, এক উদাসীন ভঙ্গিমায় প্রিলিউড ইন্টারলিউড গাইতেন কথ্য ভাষায়, তাতেই তার বিরোধী রাজনৈতিক মহলে হাহাকার পরে যেত। এটাই শিল্পী মুকুল রায় স্টাইল। মুকুল রায়ের মতন প্রোফাইল প্রতিটা রাজনৈতিক দলে হাজারে হাজারে আছে তারপরেও লোকটা 'স্বতন্ত্র' মুকুল রায় হয়ে বঙ্গীয় রাজনীতিতে অনন্য নিজস্ব ধারা সেট করে যেতে সক্ষম হয়েছে। আপনি ডানধারায় থাকুন কিংবা বামধারায়, মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতিকে উপেক্ষা করার উপায় নেই আপনার। আজকের পশ্চিমবঙ্গে যে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ফর্মটাকে আমরা দেখছি, তার ইঞ্জিনিয়ারিং মুকুল রায়ের হাতে তৈরি করা। বঙ্গীয় রাজনীতিতে ঘোড়া কেনাবেচা মুকুল রায়ের তৈরি। চিটফান্ডকে সরাসরি দলীয় ফান্ড হিসেবে ব্যবহার করা, প্রশাসন আর দলকে গুলিয়ে দেওয়া- অত্যন্ত দক্ষতা ও কনফিডেন্টের সাথে প্রতিটা দুষ্কর্ম করেছেন।

এথিক্সহীন নোংরা রাজনৈতিক জামানার জননী মমতা ব্যানার্জী হলে, মুকুল রায় তার সুযোগ্য পালকপিতা। এটার সুচারু শুরু বা এটার গুরুও এই মুকুল রায়ই। তারপরেও একটা সুক্ষ পার্থক্য রয়ে গেছে উভয়ের মাঝে, প্রায় একই নামগোত্রহীন সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে উঠে আসা মুকুল রায়ের তথাকথিত শিক্ষাগত যোগ্যতার অস্তিত্বকে জাহির করতে কোন অসততা তঞ্চকতার পথ নিতে হয়নি। কথায় কথায় মিথ্যাচার করতে হয়নি, নিজেকে শিল্পী কবি সাহিত্যিক বানাবার চেষ্টা করতে হয়নি, তার এক ও অকৃত্রিম পরিচয় ছিলো- রাজনীতিবিদ। সেই অর্থে মিডিয়ার ব্লু-আইড বয় ইমেজও কখনও ছিল না। মুকুল রায়ের মূল কৃতিত্ব তার ভাবলেশহীন মুখের অসাধারণ ফ্লেক্সিবিলিটি এবং গোপনীয়তা রক্ষা করার এক অনন্য সাধারণ দক্ষতা। এক‌ই পার্টির দুই লবি বা গোষ্ঠী বানানো এবং সেখান থেকে জন্মানো দ্বন্দ কীভাবে মেটাতে হয়, এটার উপরে তার মাস্টার্স করা ছিল। 

পশ্চিমবঙ্গের এত বছরে বাম লেগাসিকে কেলিয়ে লাট করে, নৈতিকতার মুখোশ খুলিয়ে আর্থিক লোভের ফাঁদে ফেলে, যাকে যেভাবে পেরেছে ন্যাংটা করে হাতে বাটি ধরিয়ে, তাদের তীব্র অহং আর ঔদ্ধত্যকে দেওয়াল ধরিয়ে, পিঠের চামড়া গুটিয়ে পোঁদে নামিয়ে দিয়েছিল যে লোকটা- তার নাম মুকুল রায়। শুধু তাই নয়, গোটা বাম সমাজ আজ বাম রাজনীতির নামে যে ‘পার্লামেন্টারি আর জুডিশিয়ারি প্র‍্যাক্টিসের’ নাগপাশে বন্দি, সেই বৃত্তে তাদের গোলগোল ঘুরিয়ে বেরাবার যে ব্লুপ্রিন্ট তা মুকুল রায়ের তৈরি, মমতার নয়। নকশাল, কংগ্রেস, অতিবাম, এসোসুই, NGO, সিদ্দিকুল্লাহ, রাজবংশী, গোর্খা বিচ্ছিন্নতাবাদী, সিমি, জামাত, বিজেপি থেকে মাওবাদী- সমস্ত আলবালছাল এই সকলকে এক ছাতার তলায় আনার ক্রেডিট মুকুল রায়ের, সূচ হয়ে এদের সকলকে এক চাদরের নিচে সেলাই করেছিলেন তিনি। মমতার অগ্নিকন্যা আর সততার প্রতীক ইমেজ ছিল, সেই ইমেজের পারফেক্ট ব্যবহার মুকুল রায় করেছিল। 

ওই যে তাৎক্ষণিক মারপ্যাঁচ ও সেই মতো দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সকলকে যোগাড় করে এনে একটা চাদর বোনা- এটা বিরল কৃতিত্ব ছিল বাম বিরোধী রাজনীতিতে। না তিনি ভাল মঞ্চের বক্তা ছিলেন, না ক্যারিশ্ম্যাটিক উপস্থিতি, না ব্লু-ভেইন বংশমর্যাদা, না হাইফাই শিক্ষাগত যোগ্যোতা, তার পরেও একটা ৩৪ বছরের ক্যাডারভিত্তিক ক্ষমতাসীন আদর্শবাদী পার্টিকে সরাতে এই লোকটা কৃষ্ণের মতো যোগ্য সারথির মতো কাজ করে গেছেন। যিনি জানতেন তার সেই উজ্জ্বল ক্যারিশ্মা নেই, না তার পিছনে জেভিয়ার্স, যাদবপুর বা JNU ট্যাগ রয়েছে, না তিনি আইনজীবি বা অর্থনীতিবিদ, গায়ক, নায়ক ছিলেন। অনেকে বলেন তিনি নাকি ওয়াগান ব্রোকার বা সাট্টা দলের চাঁই ছিলেন- সত্যিও হতে পারে মিথ্যা হতে পারে। ধরে নিলাম এটাই সত্যি, তাহলে সেই নর্দমা থেকে উঠে এসে, কোলকাত্তাইয়া রাজনীতির বৃত্তে ঢুকে পড়ে, একটা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের দলকে পথে বসিয়ে দিয়েছিল, CPIM বাদে বাকি দলগুলোকে সাইনবোর্ড বানিয়ে দিয়েছিল তার কুৎসিত দুর্বুদ্ধি দিয়ে। তিনি তার সমস্ত লিমিটেশন ঢেকে দিয়েছিলেন ক্ষুরধার শয়তানি বুদ্ধি দিয়ে। মমতার ইমেজকে ব্লেডের মতো ব্যবহার করে সর্বত্র ফালাফালা তিনি করেছিলেন।

শত্রুকে ঘৃণা করতেই হবে, কিন্তু রাজনীতি করতে এসে রাজনৈতিক ব্যক্তিকে যে শুধু ঘৃণার বসে যারা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য উপহাস করে, তার মতো হতচ্ছাড়া মূর্খ গাম্বাট আর কেউ হয় না। সমালোচনা হতে পারে তীব্র ভাবে কিংবা প্রশংসা করতে পারেন, উপেক্ষা করতে পারেন না। তার সময়ে তাকে নিয়ে কেউ কেউ আশায় থাকত, কেউ আবার আশঙ্কায়। কিন্তু, এটা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই, যে তিনি যদ্দিন প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে সুস্থ শরীরে ছিলেন- তাঁর নিজের মতো করেই ছিলেন।

এটা হচ্ছে মুকুল রায়ের সম্বন্ধে আমার মূল্যয়ন। আমি তার রাজনৈতিক আদর্শকে ঘেন্না করি, কিন্তু উপহাস করতে পারি না, কারণ সে চোখে আঙুল দিয়ে তার বিরোধী প্রতিটা রাজনৈতিক দলের ফাঁকফোঁকর দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। দম্ভ অহমিকার হাড়ে মজ্জায় জন্মানো ক্যান্সার খুঁচিয়ে দিয়ে তাসের ঘরের মতো একটা নীতি আদর্শবাদী দলকে প্রায় ডোডো পাখি করে দিয়ে গেছেন তার সময়ে। মরে যাওয়ার পর তাকে গালিগালাজ দিয়ে নিজের অপরাগতার ঘায়ে উপশম দেওয়ার ছলনা করা যায়, নিজেদের ব্যর্থতাকে জাস্টফাই করা যায় না। আগামীকাল আপনি সফল হবেন তখনই, যখন মুকুল রায়কে পর্যালোচনা করে দেখবেন যে, সে কোন পথে বাম সাম্রাজ্যকে ধ্বসিয়ে দিয়েছিল। যারা অতীতকে অন্তঃসারশূন্য হয়ে উন্মত্ত ভাবে কেবল ঘৃণা করতে শেখে, সেখান থেকে শিক্ষা নেয় না, তারা কখনও সোজা মানুষ হতে পারে না।


নদী যদি তার স্রোত হারায় তাকেও নর্দমায় পরিণত হতে হয়, শেষ জীবনে মুকুল রায়েরও সেটাই হয়েছিলেন। মৃত্যুর পর একটা মানুষকে সবাই মিলে শ্রদ্ধা দেখাতে হবেই বা কেন? কেনই বা তাকে সবাই মিলে মূল্যায়ন করতে হবে, প্রয়োজন নেই তো, যোগ্যতাই বা কজনের আছে? যারা রাজনীতির ছাত্র, তারা তথ্যগতভাবে ও সময়ের নিরিখে সুক্ষ বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার মন্দ রাজনৈতিক দিকগুলো নিয়ে মূল্যায়ন করবে, প্রয়োজনে তীব্র আক্রমনাত্বক হলেও তাতে দোষ নেই। কিন্তু ২ পয়সার জ্ঞান নিয়ে আপনি তাকে উপহাস তাচ্ছিল্য করতে পারেন না, কারণ এই ব্যাক্তিই আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শকে তার ক্ষমতা দিয়ে দুর্বল করার সাথেসাথে, আপনাকেও তুচ্ছ হাসির পাত্র বানিয়ে যাবার কারিগর। আজ সোস্যাল মিডিয়ার সর্বত্র যে সব নপুংসক, ঘরে বসে জাতীয় কংগ্রেস বা কমিউনিস্ট রাজনীতির নামে বিশ্বজয় করে ফেরে, সেই সব কঙ্গু বা বাম্বাচ্চা যাদের প্যাকাটির মতো মেরুদন্ড, এদের প্রত্যেকের জন্ম মুকুল রায়ের বীর্যে। কারণ এদের বাপেদের ধরে ধরে মুকুল রায় খোজা করে দিয়েছিল তার সময়ে।

বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫

দাম্পত্য কলহঃ নেপথ্যে

 

কলহ

আমদের ব্যাক্তি জীবনে প্রত্যেকের নিজ নিজ নীতি ও আদর্শ রয়েছে। সৎ মানুষের সৎ নীতি, সৎ আদর্শ; অসৎ এর তার নিজের মত করে, নীতিহীনের আদর্শ দুর্নীতি- ক্ষ্যাপা ছাড়া প্রত্যেকে আমরা আদর্শের উপরে মোটামুটি অটল থাকি। এরপর রোজ জীবনে বহু ঝড়ঝাপটা আসে, রোজকার লড়াই নিজের নিজের মত করে নিজ নিজ পরিসরে লড়তে হয়। বহু ভাবে আমরা আদর্শচ্যুত হই রোজ, আপস করি, দ্বন্দে ও ধন্দে পরে নিজেকে দুমড়ে মুচরে নিত্য ভাঙাগড়া করে নিই- বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। জীবন খরস্রোতা নদীর মত, পরিকল্পনার ধার ধারে না। তাই দৈনিক কিছু সমস্যা অযাচিতভাবে উদয় হয়। তবে মনের অন্দরে ‘আমি একলা’ অনুভূতি ঢুকে গেলে, যাবতীয় সম্পর্কের চেনা পরিসরটাও অচেনা লাগা শুরু হয়। ক্রমশ চির চেনা ‘আমি’র সাথেই দুরত্ব বাড়তে থাকে

বাচ্চা বয়সে যত দ্রুত শিখি আমরা, ভুলেও যায় তত দ্রুতই। সাইকেল চালানো বা সাঁতারের মত কিছু অভ্যাস ব্যাতিরেকে বাকি সমস্ত শিক্ষাকে নিয়মিত অনুশীলন না করলে ভুলতে বেশী সময় নেয়না আমাদের মস্তিষ্ক। সামাজিক ও সম্পর্কের জটিল বিষয়গুলো উন্মত্ত যৌবনে আমাদের মাথার উপর দিয়ে বয়ে যায়, কিন্তু আমাদের এই চল্লিশের কোটার বয়সটা বড্ড দুর্বোধ্য, কে ঠকাচ্ছে, কোনটা রহস্যময়, কোনটা ছলনা, কোনটা অস্পষ্ট, কোনটা ইচ্ছাকৃত পর্দাটানা হয়েছে, এই সকল নিগূঢ় বিষয় গুলো মস্তিষ্ক ধরে ফেলে। ধরে ফেলার পর বিশ্লেষণ করে একটা সিদ্ধান্তেও এসে পৌঁছে যায়, সমস্যা হলো স্পষ্টভাবে মনের সেই ভাবকে প্রকাশ করতে পারিনা। একটা সামাজিক সংশয়, চক্ষুলজ্জা জনিত কুন্ঠা, সম্ভাব্য অস্থিরসঙ্কল্পতা, মানসিক অনিশ্চয়তা- স্পষ্টবাদী হতে নিবৃত্ত করে আমাদের।

তাই চোখের সামনে গোটাগোটা মিথ্যাচার, মোটাদাগের ছলনাময় মৈত্রী বা অনুরক্তি, কৌশলগত কথোপকথন, এর সাথে নির্লজ্জ ও বেহায়ার মত একটা ব্যবধানের সীমারেখা টেনে নেওয়াকে আমরা কেবল সহ্য করে নিই। অসহনীয় হয়েছো মানেই ধরণী পপাত চ। সমস্যা তার বেশী হয়, যে নিজে থেকে আগ্রহী হয়ে সম্পর্কের ছিঁড়ে যাওয়া তন্ত্রীটিকে আবার গিঁট বেঁধেছিল। সে না পারে কইতে, না পারে সইতে। এক দমবন্ধ প্রেসারকুকার পরিস্থিতি জীবনের স্বাভাবিক স্বস্তি কেড়ে নেয়

কেন হয় এই অশান্তি?

মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলে, প্রায় ৭০% দাম্পত্য কলহের পেছনে সরাসরি দায়ী ভুল যোগাযোগ বা যোগাযোগের অভাব। কী বলছি, কী বলতে চাইছি তার মধ্যে আকাশ পাতালের ফারাক। মন দিয়ে শুনতেই চায়না কে কী বলছে, ফলত অধিকাংশটাই অনুমান করে নিতে হয়। বহু দাম্পত্যে যখন তারা একত্রে বসার সময় ও সুযোগ পায় পৃথিবীর সমস্ত কাজ ও দায় মিটিয়ে, তখন সেই মুহুর্তেও কেউ অফিসের কাজে, ফোন ঘাঁটতে বা বই পড়তে ব্যস্ত হয়ে যায়, কেউ কেউ আবার ঘুমিয়ে যায় অদ্ভুতভাবে। এরপর যখন সোহাগ ভালবাসার প্রশ্ন আসে, কথা মন দিয়ে শোনা তো অনেক দূর- সম্ভাষণেই রাগে ফেটে পড়ি। সামান্য ভুলগুলো, যেগুলো আসলেই পাতি গুরুত্বহীন, সেই বিষয় গুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে দিন রাত ঝগড়া অশান্তি নিত্যকার চিত্র হয়ে উঠে। আমাদের দম্ভ, জেদ, অহংকার ভুলিয়ে দেয় যে- স্পষ্ট, সরল ও সময়োপযোগী যোগাযোগই ভুল বোঝাবুঝির প্রাথমিক প্রতিষেধক

এর সাথে থাকে অতীতের আঘাত ও অবিশ্বাস, যে ক্ষত পুরোপুরি শুকায় না, ফলত বারবার ফিরে আসে। নতুন প্রতিটি ঘটনাকে পুরাতন চশমা দিয়ে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়, সামান্য নির্বিরোধী নির্দোষ আচরণও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অবিশ্বাসের পরিবেশে অশান্তির ছত্রাক নিজের স্বাধীনতায় কলেবরে বৃদ্ধি পায়। এই দুরত্ব ক্রমশ একে অপরের কাছে অভিব্যক্তি প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করে, কিম্বা প্রকাশ করলেও সেটা ভুল পদ্ধতিতেই করে। ফলত নিজের কষ্ট, অভিমান, চাহিদাগুলো জমতে জমতে হঠাৎ কোনও তুচ্ছ ঘটনার মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয়। এই রাগ বা কষ্ট প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে চিৎকার, খিস্তিখেউর জন্ম দেয়

বাজারে সামান্য বেগুন কিনতে গেলে টিপেটাপে দেখে বুঝে কিনি, কিন্তু যখন প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে আমরা জীবন সঙ্গী নির্বাচন করি, যার সাথে গোটা জীবন কাটায় আমরা- সেখানে তেমন বাছবিচার করিইনা একপ্রকার। অথচ জীবনের সবচেয়ে কাঠিন ও জটিল এই অধ্যায়ে প্রবেশ করার জন্য ভাবা উচিৎ ছিলো। বরং বলতে পারা যায় যে আমরা ঝাঁপ দিই- কিছু না শিখে, না জেনে এবং না বুঝে একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায়। ফলত, সর্বপ্রথম মন ভেঙে যায়, এই পথ বেয়ে অর্ধেকের ঘর ভেঙ্গে যায়, বাকিদের ঘর হয়ত টিকে যায়, কিন্তু শান্তি নেই হয়ে যায়। এই কারণেই সংসারে থেকেও অনেকেই একাকিত্বে ভুগতে থাকেন। এটা এমন একটা সমস্যার ফাঁদ, না কাউকে বলা যায় আবার সহ্যও করা যায়না

জীবন রুটিন মেনে চলেনা, সে তার নিজস্ব ছন্দে চলে। যেখানে দুটো আলাদা আলাদা মানুষকে উভয়ের সাথে তাল মিলিয়ে একটা ‘কমন’ ছন্দ বানাতে হয়, সেখানে উভয়কেই কিছু ছাড়তে হয়, কিছু ধরতে হয়। পরিস্থিতি কখনো কখনো এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, এই সম্পর্কের কুম্ভীপাকে আর সব বাস্তবতাই মনে হয় তুচ্ছ। সর্বক্ষণ এক অদৃশ্য পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মোকাবিলা করাই তখন জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে উত্তরপত্রে নির্দিষ্ট জবাব লিখলে সফলতা মেলেনা, লিখতে লিখতে বারবার সময়ের পাতা উল্টে অতীতের সাথে বর্তমানকে মিলিয়ে, ভবিষ্যৎ কল্পনা করে করে উত্তর লিখে যেতে হয়। সময় প্রতি মুহুর্তে বদলে যাচ্ছে, তার সাথে বদলাচ্ছে বাস্তবতা, সেই মত একই প্রশ্নের শত সহস্র উত্তর তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সেই জবাবকে সময়মত ধরতে না পারলেই ব্যর্থতা চিরসঙ্গী। এভাবেই একসময় সময় পেরিয়ে যায়, সব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকা সত্ত্বেও ঠিকভাবে লিখতে না পারার ব্যার্থতা- জীবনকে কঠিন করে তোলে

আসলে আমরা সুস্থ থাকার লোভের ফাঁদে পরে, স্থিতিশীল জীবনকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলি। একা থাকার নানা অসুবিধা আছে, কিন্তু সুবিধা হচ্ছে দায় নিতে হয়না, জবাবদিহি নেই, বাধ্যবাধকতা নেই। এখানে এসেই স্বেচ্ছাচার আর স্বাধীনতার সুক্ষ ফারাক টুকু ঘুঁচে যায়। ভেতরে জমে রয়ে যায় কঠিন নীরবতা। ছোট্ট একটি কথার জের, কাজের বাহানাতে উপেক্ষা করা একটি ফোনকল বা মেসেজ, অজান্তে বা অনিচ্ছাকৃত করা কোনও মন্তব্য– এগুলোই সমস্যা তৈরি করে দুজনের মাঝখানে। প্রতিটি জীবনের নিজস্ব গতির ছন্দ রয়েছে, কিন্তু একটা নিভৃত পরিবারেরও রয়েছে নানা প্রত্যাশার চাহিদা। এই তাল মেলাতে গিয়েই অশান্তি আমাদের নিত্যসঙ্গী। এতে সম্পর্কের ভিতটা যেমন টলমল হয়ে যায়, তেমনই উষ্ণতাও ক্রমশ মিইয়ে যায়। তখন পরে থাকে কিছু তাত্ত্বিক কচকচি, আর বাস্তব জীবনে প্রয়োগের অনুপযোগী কিছু হারানো স্নিগ্ধতা

জীবনের এই বাঁকে এসে দাম্পত্য বিষয়টি সমস্যার পর্যায়ে চলে যায়, অকারনে আমাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা এবং হতাশার উপসর্গ দেখা দেয়। অস্থিরতা বোধ নিত্য সঙ্গী হয়ে যায়, দুশ্চিন্তার মুহূর্তে হাত-পা ঘামতে থাকা, বুক ধড়ফড় করা আমাদের ভয়াবহ হতাশায় ডুবিয়ে দিয়ে বিষণ্ন করে তোলে। আমাদের খাবারে রুচি কমে যায়, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, বহুলাংশে নিজেকে বন্দি বানিয়ে ফেলি, অসামাজিক হয়ে যায়, ফলত নানা ধরণের ক্রনিক অসুস্থতার উপসর্গ দেখা দেয়। যা সত্যিকারের অসুস্থ করে তোলে

এক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী আদর্শলিপি মানা সমাধান নেই। হয় ভোগ করে যেতে হবে, মন্থনে একদিন অমৃত উঠবে- এই আশাতে নীলকণ্ঠ হয়ে অবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিয়ে পদ্মপাতার মত পাঁকে থেকেও জলস্পর্শ না করে টিকে থাকতে হয়। অথবা সর্বত্যাগী হয়ে একা-বোকা ঋষি সুলভ সন্ন্যাস জীবনে জ্ঞানার্জনের পিছনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। দুটোই কঠিন, কিন্তু তৃতীয় কোনো উইন-উইন সমাধান কিছু নেই

মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৫

অকপট চড়ুইভাতি ২০২৫


 ১৬শ শতাব্দীর শেষভাগ, দিল্লির মসনদে তখন প্রতাপশালী মুঘল- সম্রাট আকবর। 


দিল্লীশ্বর, বাংলা-বিহারের শাসনকর্তা হিসেবে উড়িষ্যা দখল করতে নির্দেশ দিলেন অম্বররাজ মানসিংহকে। মহারাজ মানসিংহ তার সুপুত্র জগৎসিংহকে এই কাজে নিয়োজিত করেন। সুদক্ষ যোদ্ধা রাজপুতবীর জগৎসিংহ বার বার সামরিক আক্রমণ করে পাঠানদের অতিষ্ট করে তোলে। এরকম সময়েই একদিন জগৎসিংহের সাথে স্থানীয় ভূস্বামী বিরেন্দ্র সিংহের একমাত্র ষোড়শী কন্যা, সুন্দরী তিলোত্তমার সাক্ষাৎ হয় শৈলেশ্বরের মন্দিরে। নিজের অজান্তেই উভয়ে একে অপরের প্রেমে পড়েন। উড়িষ্যা-অধিকারী পাঠানেরা মান্দারণ অঞ্চলের জমিদার বাড়ি লুট করতে এসে সস্ত্রীক জমিদার ও তার কন্যাকে বন্দী করে নিয়ে যায়। রাজপুতবীর কুমার জয়সিংহ তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পাঠানদের হাতে বন্দী হলেন।

চেনা গল্প তো! ঠিকিই ধরেছেন, এটা বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের পটভূমি। বাংলা সাহিত্যের জয়ঢাক বাজিয়ে জন্ম নেওয়া ‘দুর্গেশনন্দিনী’ মুঘল-পাঠান দ্বন্দ্বকে ভিত্তি করে, ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমিতে রচিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম বাংলা উপন্যাস, মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৮৬৫ সালে এটি প্রকাশিত হতেই, বাংলা গদ্য সাহিত্যে বিপ্লব ঘটায়। ব্যক্তি-আগ্রাসী সামন্তসমাজ, ব্যক্তি হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা ও ক্রন্দন, আবিষ্কারের ঐকান্তিকতা, বাংলা উপন্যাসের বৃহত্তর জীবনমুখী পটভূমিকে চিনতে বা জানতে ইচ্ছা যায়না? রোম্যান্সমধুর রহস্যলোক, ইতিহাসের স্বপ্নাবেশ আর আদর্শায়িত ব্যক্তি ও সমাজকেন্দ্রিকতা যে মাটিকে আবর্ত করে গড়ে উঠেছিলো, তাকে ছুঁয়ে দেখায় বাসনা যায়না? 

বাংলার আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক আবর্ত-সংঘাতে ঘূর্ণমান ও বিচূর্ণ-ভগ্ন মূল্যবোধ রূপায়ণের ঐকান্তিকতা এবং সমসাময়িক জীবনের চলমান বহির্বাস্তবতা অঙ্কনের অলক্ষ্য স্থান, আজ তার কিছুই রক্ষা করতে পারেনি কিছু ভাঙা ইট পাথর ব্যাতিত। ২০১৬ তে আমরা শরৎচন্দ্রের পানিত্রাসের ভিটেকে ছুঁতে পাওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছিলাম অকপট চড়ুইভাতির সৌজন্যে, সেখানে বঙ্কিমের সৃষ্টি সুখের গড়কে ছুঁয়ে দেখার একটা সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়! অনিশ্চয়তার এই তো জীবন, আজ আছি কাল নেই। অকপটেই বা সেই ২০১৬ এর কতজন টিকে আছি আজ ১০ বছর পর ২০২৫ এ এসে, জীবন নদীতে সময়ের স্রোত বয়েই চলেছে, নতুন জলের ধারায় কতজন হারিয়ে গেছে, আবার কত নতুন প্রাণেরা এসে ধরা দিয়েছে, এটাই জীবনের নিয়তি। তার আগে যেটুকু সুযোগ আসে, দেখে যায় প্রাণ ভরে।

বঙ্কিমের ‘দুর্গেশনন্দিনী’র সৃষ্টি সুখের গড়, সত্যিকারের গড়, নাম- গড় মন্দারণ। হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমার, গোঘাট ব্লকে অবস্থিত এই গড় মন্দারণ। দ্বারকেশ্বর নদ ও শিলাবতী নদীর মধ্যবর্তী তরঙ্গায়িত পললমাটির ওপর মন্দারণ দূর্গটি আজ আর নেই, সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে, রয়ে গেছে ইতিহাস। আজও মাটি খুঁড়লে সেই আমলের অস্তিত্ব মেলে যত্রতত্র। কে জানে কোন পথে ঘোড়া হাঁটিয়ে ছিলো দুর্গাধিপতি জয়ধর সিংহ, কোথায় রয়েছে রূপসী তিলোত্তমার হাতের ছোঁয়া, কোথায় ই বা সেই শৈলেশ্বর মহাদেবের মন্দির- কে জানে! নবাবজাদী আয়েষার অতৃপ্ত আত্মা হয়ত আজও খুঁজে ফেরে কুমার জগৎ সিংহকে।

গড় মান্দারণের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অসাধারণ, কাছেই বয়ে চলেছে আমোদর নদ। হুগলি ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সীমানায় এই গড় মান্দারন, হুগলির অন্যতম বনাঞ্চল চাঁদুর ফরেস্ট এখানেই অবস্থিত। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্মভূমি কামারপুকুর থেকে গড় মান্দারণে দূরত্ব মাত্র ৩ কিলোমিটার। নির্জনতা যাঁদের ভাল লাগে, এই জায়গা তাঁদের ভারি পছন্দ হওয়ার কথা। নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশে মাঝেমাঝে বয়ে চলা বাতাসের শন শন শব্দ আপনার শহুরে ক্লান্তি দূর করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে প্রায় ২০০ একর জমির উপরে গড়ে উঠেছে গড় মান্দারণ পর্যটন কেন্দ্র। কথিত রয়েছে গৌড়ের অধিপতি হুসেন শাহের সেনাপতির সমাধি রয়েছে এখানে, যা দরগা নামে পরিচিত। চুড়ুইভাতিতে আসার নামে শ্রীরামকৃষ্ণের ভিটেকে চোখে দেখা বোনাস প্রাপ্তির মতই সুখকর।

শাল, শিমুল, পিয়াল, সেগুন দিয়ে ঘেরা গড় মান্দারণের জঙ্গলে একটা দিন হৈহৈ করে জীবনকে উদযাপন করতে আসবেন নাকি! বাকি সব কিছু ভুলে যান, গড় মান্দারণের প্রকৃতি এখানে জীবন্ত ইজেল, রং-তুলি দিয়ে ক্যানভাসে আঁকা ছবি। অদ্ভুত শান্তি মিশে রয়েছে এখানকার বাতাসে, পাখির কলতান, গাছেদের ফিসফাস আর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে মিশে থাকা মাদকতায়। চড়ুইভাতি সেরে কামারপুকুর বা জয়রামবাটীতে একটা রাত থেকে যেতেই পারেন, শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদাময়ীয় স্মৃতি বিজড়িত স্থানের আধ্যাত্মিকতা ও ইতিহাস ছাড়াও এখানে গ্রামের সবুজ পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে। মঠ ও মিশনের শান্ত–সুন্দর পল্লী পরিবেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামের ইতিহাসের উপাদানগুলির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া একটা উপরি পাওনা বৈকি।

হাওড়া থেকে গোঘাট বা আরামবাগ গামী লোকাল ট্রেন ধরে খুব সহজে পৌঁছে যাওয়া যায় গড় মন্দারণ। সকালে হাওড়া স্টেশন থেকে ৭টা ২৫ এর গোঘাট লোকালটা বেস্ট। এছাড়া শ্যাওড়াফুলি থেকে ট্রেনে তারকেশ্বর-আরামবাগ হয়ে ভায়া কামারপুকুর, গড় মন্দারণ যাবার বিবিধ উপায় রয়েছে। কেউ যদি উত্তরের দূরবর্তী জেলা থেকে আসেন, কামরূপ এক্সপ্রেসে চড়ে পড়াটা বেষ্ট। মধ্যবঙ্গ থেকে এলে হাটেবাজারে এক্সপ্রেসে রাত ১২টার আশেপাশে চড়ে বসলে সকাল ৫টার আগেই হাওড়া পৌঁছে যাবেন। উত্তর চব্বিশ পরগণা বা নদীয়া থেকে এলে ব্যারাকপুর ফেরিতে মাত্র ৬ টাকায় গঙ্গা পার হয়ে শ্যাওড়াফুলি ঘাট, সেখান থেকে ২ মিনিটে শ্যাওড়াফুলি রেল স্টেশন। বাসে কিম্বা গাড়িতে চড়ে কামারপুকুর হয়ে পৌঁছে যাওয়াটা কোনো ব্যাপারই নয়। মেদিনীপুর শহর, খড়্গপুর, পাশকুড়া, চন্দ্রকোণা রোড, উলুবেড়িয়া, বাগনান, বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, বর্ধমান, মেমারি, নবদ্বীপ থেকে প্রচুর বাস রয়েছে ঘন্টায় ঘন্টায়, যাগুলো সরাসরি কামারপুকুরে পৌঁছে দেবে আপনাকে। সেখান থেকে অহরহ টোটো পাওয়া যায় পিকনিক স্পটে পৌঁছাবার জন্য। 

সকালে পাকোড়া আর চা/কপি, ব্যাস। এর বেশী খেলে মধ্যহ্নভোজে, পাকস্থলী আহত হতে পারে খাসির মাংসকে যথাযথ স্থান না দিতে পেরে। এরপর তুমুল আড্ডার ফাঁকে ততক্ষণে সাদা ভাত, সোনা মুগের ডাল, ঝুড়ি আলুভাজা, বাঁধাকপি দিয়ে মটরশুটির ঘন্ট, চাটনি, পাঁপড় আর রাজভোগ- পাতের সৌন্দর্য বর্ধন করার জন্য এগুলো প্রস্তুত হয়ে যাবে কষা কষা ঝাল ঝাল খাসির মাংসের সাথে। পার্কের এ্যান্ট্রি ফি, পিকনিক স্পটের ভাড়া, হাঁড়িকুড়ি ভাড়া, খাওয়ার প্লেট গ্লাস, রান্নার গ্যাস, বোতল বন্দি পানীয় জল, মাংস, মসলা, চাল সবজি, ঠাকুর চাকর, ইত্যাদি সব মিলিয়ে মাথাপিছু মাত্র ৬০০ টাকা করে চাঁদা ধার্য্য করেছি। ১০ বছরের নিচের বাচ্চা কমপ্লিমেন্টারি, তার উপরে আমরা সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক। এই হলো দেনাপাওনার গল্প।

আমাদের আয়োজন ৫০ জনের অধিক নয়, ৪০ এর আশেপাশে হলে সবথেকে ভালো। অধিক ভিড়ে আলাপের মাদকতা নষ্ট হয়, তাছাড়া আয়োজনেও কিছুটা অপারগতা রয়েছে। তাই আপনাকে নিয়েই যদি সংখ্যাটা পূরণ হয়ে যায়, তার চেয়ে ভালো আর কিচ্ছুটি হয়না। তাহলে, আসছেন নাকি আগামী ২১শে ডিসেম্বর ২০২৫ এর দুপুরে গড় মন্দারণে? কিছুটা ইতিহাস, কিছুটা আধ্যাত্মিকতা, কিছুটা সাহিত্যের গন্ধ গায়ে মেখে, অকপট চড়ুইভাতির নামে আসবেন নাকি একটা দিনের অবসরে?


বুধবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৫

দেশবন্ধু

দেশবন্ধু 

সকালের বদলে আজ বাজারে বের হতে বেলা ৯টা বেজে গিয়েছিলো। আমাদের এলাকাতে শীত না পরলেও, AC আপাতত লম্বা ছুটিতে গেছে, আজই ভোরে ফ্যানও বন্ধ করে দিয়ে হয়েছিল উত্তুরে হাওয়ার শিরশিরানির দাপটে। বাজারে নতুন মরসুমি সব্জির সাথে কাঁচা তেঁতুল, চালতা এমনকি কাঁচা আমও রয়েছে। সাথে আমলকি, জলপাই, পেঁয়াজকলি, সার হীন দিশি মুলো, দিশি পালং ও শিমের ভালো আমদানি রয়েছে। দীঘার ইলিশ ১৪০০, গঙ্গার তাজা চিংড়ি- সেও ৭০০ টাকা কেজি। পাবদা, ভোলা, ভেটকি, পার্শে, দিশি পোনা, পাঙাস, রূপচাঁদা, লোটে, সিলভারকার্প, পমফ্রেট সহ চালানি ও সামুদ্রিক মাছের বহরে সারা বাজার থইথই কছে।

কিছু বারোভেজালি ছোট মাছ নিতেই হয় মায়ের বাটি চচ্চরি জন্য, বাবার জন্য বরাদ্দ তাজা দিশি পোনা, ওনার আবার না ভেজে কাঁচা মাছের ঝোল প্রিয়। আমার জন্য বাটা, রিটা, আর পাবদা মাস্ট। শশা, কাঁকুড়, কাঁঠালি কলা, ডাঁসা পেয়ারা সহ প্যাকেটের দুধ, দই, লেড়ো বিস্কুট ইত্যাদি নিয়ে, হাড়কাটা গলির সামনে ওই ভিড়ে টোটোর জন্য প্রতীক্ষা করছি। ভারি ৩টে ব্যাগ নিয়ে রাস্তা পার হওয়াই মুশকিল, জ্যোতি আর চন্দ্রমূখী মিলিয়ে আলুই ৭ কেজি। একটা টোটো এসে দাঁড়ালো, বিবিরহাট বলাতে সে সটান না বলে, সামনে ২০ মিটার মত এগিয়ে গিয়েও আমাকে নাম ধরে ও হাতের ইশারাতে ডাকতে লাগল।

আসলে আমি যেদিকে যাব, সেই রাস্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, চলতি টোটোকে ইউটার্ণ নিয়ে ঘুরে যেতে হবে। বাইক নিয়ে আসিনা, ভিড়ে পার্কিং করা মহাঝক্কি। ৭-৮ দিনের সব্জি আর আনাজপাতির ব্যাগ লটবহর আড়েবহরে কম হয়না মোটেও, সাধারণনত টোটোতে ২টো সিটের ভাড়াই আমি গুনি। সেই টোটোওয়ালা নিজেই এসে দু’হাতে দুটো ব্যাগ তুলে নিলো, আমি একটা ব্যাগ নিয়ে তার পিছুপিছু গিয়ে গাড়িতে চড়ে বললাম, একজন প্যেসেঞ্জার ইতিমধ্যেই রয়েছে। বললাম, চলো আরো ১০টাকা বেশী নিও না’হয়। টোটো চালক অদ্ভুত হাসি হাসি মুখ করে বললো- তুমি তন্ময়ই তো, আমাকে চিনতে পারোনি! আমি সেই দেশবন্ধু।

এমনিতেই মাথায় হাাজার ফিৎনা, এই মাসেই ৩টে মামলার ডেট আছে, যে কারনে পাহাড়ে উঠতে পারিনি। ফেসবুক ইউটিউবে এ্যাড ক্যাম্পেইন চলছে ট্রাভেল এজেন্সির, ফোনগুলো ভয়েস কল আর মেসেজে গিজগিজ করছে। বাবা তার মেয়ের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ২ দিন হাবজিগুবজি গিলে সমানে হেগে যাচ্ছে, উনাকে আনতে মা বোনের বাড়ি যাবে আমার জন্য রান্না করে দিয়ে, তাই বাজার সহ ঘরে ফেরার তাড়া রয়েছে। সেই সব কিছুর বর্মকে ভেদ করেও দেশবন্ধু নামটা যেন বুলেটের মত সজোরে ব্রহ্মতালুতে গিয়ে আঘাত করল। এক লহমাতে এই দু’কুড়ির জীবনের সেই সুদূর বিদিশা কালের অতীতের ধুলোয় ঢাকা স্মৃতির পাতায় কেউ যেন সজোরে ধাক্কা মারলো।

মুহুর্তে ধুলোর আস্তরণ সরে যেতে দেখলাম, স্মৃতির দলেরা নিবিষ্ট বুদ্ধের মত মহানির্বানের পথে পাড়ি দেওয়ার জন্য যেখানে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদনে নাম লিখিয়ে অনন্ত প্রতীক্ষারত। হঠাৎ একটা শব্দের আঘাত, ধুসর কোষেদের দুনিয়াতে সে এক লণ্ডভণ্ড কান্ড বাঁধিয়ে হুলুস্থুল বসিয়েছে। সেই বিশৃঙ্খলার ফাঁকে, কোনো এক ‘টিপলার সিলিন্ডার’ বা ‘ওয়ার্মহোলের’ পথ বেয়ে এক লহমাতে ১৯৯১ সালে, ক্লাস ফাইভের প্রথম দিনে পৌঁছে গেলাম।  

গত সাড়ে ৩ দশক সময়ে আমাদের সমুদ্রগড়ের প্রায় সবকিছুই বদলে গেছে, বসাকদের কাপড়ের ব্যবসার উত্থানে স্থানীয় অর্থনীতির জোয়ারের সাক্ষী হওয়া থেকে, আজকে সেই বসাক পরিবারের পুরুষদের পরিযায়ী হতে দেখছি, এর মাঝে গোটা এলাকার ভূগোল ও রসায়ন বদলে গেছে। বদলায়নি শুধু ইতিহাস, তাই আজকেও প্রায় ৩৪ বছর পর, এক মাথা টাকওয়ালা, জালার মত ভুঁড়ি সহ, একমুখ দাড়িগোঁফের জঙ্গল থাকা সত্বেও কেউ, সেই প্রস্তর যুগের ছবির সাথে মিলিয়ে আজকের আমাকে চিনতে পারে। বলল, সে নাকি আমার হাসিমুখ দেখে চিনেছে, কে জানে হাসির মানচিত্র হয়ত বদলায়না। আমি অবশ্য তাকে চিনিনি, শুধু দেশবন্ধু শব্দটা আমাকে ঝাঁকিয়ে দিয়েছে।

দ্রুত গাড়িতে বসতেই সে আমাকে একটা বিড়ি অফার করল, আমি চেইন স্মোকার হলেও বিড়ি খাইনা, তাও ভদ্রতার খাতিরে নিলাম। খেয়াল করলাম সে আমাকে বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার বদলে উল্টোদিকে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষটা মিশকালো রঙের, তারও একমুখ দাড়ি, স্বাস্থ্য বেশ ভালো, কিন্তু খুব সাধারণ চেহারা, যেখানে আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই হাজার মানুষের ভিড়ে স্বতন্ত্র হওয়ার জন্য। নিজেই বললো- আমাকে চিনতে পারোনি তো! কী করেই বা চিনবে বলো, কম দিন কী হলো! আমি দাস, সেই হাই ইস্কুলে তোমার দেশবন্ধু। সব কেমন যেন দ্রুত মনে পড়ে যেতে লাগলো। এটুকু মনে আছে হাই ইস্কুলে আমার প্রথম ও ঘনিষ্ট বন্ধুটির পদবী ছিলো দাস, কিন্তু তার সাথে বন্ধু যোগ করাতে- দাস থেকে কীভাবে যেন দেশবন্ধু হয়ে গিয়েছিলো।

একদম ছোট বেলাকার বন্ধুগুলোর প্রতি আমাদের বাপ মায়েদেরও বিশেষ লক্ষ্য থাকে, সন্তান কার সাথে মিশছে এ বিষয়ে কড়া নজর থাকে। মন্বন্তরের অপুষ্টিতে ভোরা রিকেটগ্রস্থদের মত সে কালে আমার গড়ন ছিলো। একমাথা শজারুর কাঁটার মত ঝুপসি চুলের নিচে, একটা লিকলিকে হাত’পা ওয়ালা মিশকালো কঙ্কালসার শরীর, সাথে হাড় জ্বালানো তিলে খচ্চর একটা জীব। তারপরেও যেদিন প্রথম হাই ইস্কুলে গিয়েছিলাম মায়ের হাত ধরে, অত বড় ইস্কুলে শত শত ছেলেপিলের ভিড়ে নিজেকে ভয়ানক একা লেগেছিলো। ইয়া বড় দালান বাড়ির ঘরটিতে চুপচাপ এককোনের একটা কাঠের বেঞ্চিতে গিয়ে জবুথবু হয়ে বসেছিলাম, একটা এ্যালুমিনিয়ামের ‘নাম খোদাই’ করা বাক্স নিয়ে। আমারই পাশে আমার থেকেও জবুথবু আরেকজন বসেছিলো হাবাগোবা মুখশ্রী করে। আমার হাই ইস্কুল বেলার প্রথম সাথী, সেই দেশবন্ধু। এর সাথে মেশার জন্য মায়ের তরফে ‘ছাড়পত্র’ ছিলো।

আমরা একসাথেই বাড়ি ফিরতাম, আমাদের বাড়ি টপকে ওদের বাড়ি যেতে হতো, গৌরাঙ্গ পাড়ার ভিতরের দিকে কোথাও একটা ছিলো। আমার নিজের টিফিন নিয়ে যাওয়ার বালাই কোনোকালেই ছিলনা, কিন্তু দেশবন্ধু রোজই কিছু না কিছু আনত ঘর থেকে। মার্বেলের সাইজের তিলের নাড়ু, চালভাজা আর চিনি, ঘরের ঘি মাখানো চিঁড়ে ভাজা, গোলগোল বাদাম চাপ, মুড়কির মোয়া, চালের আটা গুড় আর পাকা কলা দিয়ে মাখা একধরণের দধিকর্মা জাতীয় খাবার, ইত্যাদি গুলোর কথা স্পষ্ট মনে রয়েছে আজও। আমাদের মুসলিম বাড়িতে এই ধরণের অনেক খাদ্যসম্ভার থাকেনা সাধারনত। ফেরার পথে একসাথে গাছে চড়ে কামরাঙ্গা, আঁশফল, কুল আর কদবেল পাড়া, বর্ষার দিনে ঢাউস কচুপাতার নিচে বাক্স বাঁচিয়ে, ভেজা কাক হয়ে কাদা রাস্তায় খেলতে খেলতে ফেরা- স্মৃতিতে আজও অমলিন, শুধু সাথীটার নাম হারিয়ে ফেলেছিলাম।

ইস্কুল বেলার কতশত গল্প দেখলাম তার স্মৃতিতে অবিকল রয়েছে, যার প্রতিটা আমারও জীবনের ঘটনা। ততক্ষণে তুমি বলার সামাজিক দায় ঝেড়ে ফেলে আরো আপন করে তুই সম্বোধনে নেমে এসেছে। বই দেখে পড়ার মত মুখস্ত বলে যেতে লাগল, পাশের জনও দেখলাম সমান সঙ্গত দিচ্ছিলো। উল্টোদিকে চলছি, কিন্তু সে বিষয়ে যেন আমার হুঁশই নেই। পারুলডাঙ্গা ইস্কুলটা পার করে একটা মিষ্টির দোকানে দাঁড়িয়ে পেটাই পরোটা আর দই খাওয়ালো, আমি পয়সা দিতে যাওয়াতে বিচ্ছিরি ধরণের রাগও দেখালো। আবার সামনের দিকে এগোতে থাকল নানান গল্প করতে করতে। গোয়ালপাড়ার আখের পাইকারি বাজারটাকে পাশে রেখে, ঢালাই রাস্তা ধরে ভিতর পানে এগোতে এগোতে শুধালাম- এখানে কোনও প্যাসেঞ্জার আছে নাকি রে! সে জবাব দিলোনা।

জানলাম তার তিনটে মেয়ে, তারপর ১টা ছেলে। খুব ভোরে উঠে একদফা কাপড়ের ডেলিভারি দিয়ে আসে নবদ্বীপে, তারপর ঘরে ফিরে মেয়েদের সাথে হাতেহাতে একটু রান্নাবান্না করে আবার টোটো নিয়ে বেরিয়ে পরে। ছেলেমেয়েরা নিজেরাই খেয়েদেয়ে ইস্কুলে, কলেজে চলে যায়। শুধালাম, বউ কী চাকরি করে! কেমন একটা বেদনা মাখা মুখে একটা কাঁচা খিস্তি সহযোগে বললো- আরে ফোন, ওই ফোনে একজনার পিরিতে মজে সে শালী পালিয়েছে, সুরাত না বোম্বতে থাকে এখন। তার মুখের সেই বেদনামাখা অভিব্যাক্তিতে স্ত্রী হারানোর যন্ত্রণা নাকি সিঙ্গেল ফাদারের জীবন সংগ্রাম ফুটে উঠেছে- ঠাহর করতে পারলামনা। সে বলে চললো- বড় মেয়েটা ১৯শে পরেছে, কলেজ যায়, বড় লক্ষী মেয়ে আমার। কিন্তু কপালটা দেখ, মা অন্য মানুষের সাথে পালিয়েছে, কোন ভালো ঘরের ছেলে ওদের বিয়ে করবে বলল তো ভাই!

তার আক্ষেপ ঝরতেই লাগল- প্রেম করেই বিয়ে করেছিলাম খুব ছোট বয়েসে। ইস্কুল ছাড়ার পর তাঁতের কাজে লেগে যাই, একটু বড় হতে বাইরে বাইরে কাপড় বেচতে যেতাম, বেশ দু’পয়সা কামিয়ে ছিলাম। যে দোকানটাতে টিফিন করলি, সেটাও কিনেছিলাম, করোনার পর বেচে দিয়েছি। শালীটাও ওই সময় ভেগে গেলো, সে সময় নেশা করতাম ভাই সর্বক্ষণ, তাই ধারদেনায় ডুবে গিয়েছিলাম। মেয়েগুলো বড় হচ্ছে, বে’থা দিতে হবে- আবার ভালো হয়ে গেছি। তুই কী করছিস ভাই! কোথায় থাকিস! আমি আমতা আমতা করে জবাব দিলাম। টোটোটা গোয়ালপাড়া গ্রামের অনতি ভিতরে একটা টিনের বাড়ি দেখিয়ে বলল, সেটাই তার মেয়েদের মামার ঘর। আমার গলায় যেন একটা অব্যক্ত আবেগ দলা পাকিয়ে কণ্ঠরোধ করে ধরলো, আওয়াজ বের হচ্ছিলো না। 

আমার সুবিধা হলো আমি দিনের বেলায় রাস্তায় বের হলে সানগ্লাস পরি, কিন্ত সে দামী ফ্রেমের রে-ব্যান চোখ ঢেকে রাখলেও আবেগকে কীভাবে ধামাচাপা দেবে!  আজ ৫ বছর হলো, বিবাহিত স্ত্রী মানুষ একটা পরপুরুষের সাথে পালিয়েছে, তাও কতটা ভালবাসা বেঁচে থাকলে সেই কবে কার বাল্যকালের বন্ধুকে গল্পের ছলে এককালের প্রেমিকার বাড়ি দেখাতে নিয়ে আসে! তার বলার ধরনে মনে হলো সবটা যেন আমার সাথেই ঘটেছে। ক্লাস সেভেনের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার পর দেশবন্ধু আর স্কুলে আসেনি, শুনেছিলাম তার মা কিম্বা বাবা গত হয়েছিলো, তাই ইস্কুলে আসার বিলাসিতা ফুরিয়ে ছিলো। অথচ আমার শৈশব কৈশোর সবই ‘পিকচার পারফেক্ট’ ভাবে কেটেছিলো, যেমনটা গ্রামীণ মধ্যবিত্তের ছেলেপুলের কাটে। আনন্দে না হলেও, কষ্টের জাইগাতে আমরা সবাই কী সহজে মিশে যেতে পারি।

আসলেই এটা একটা শ্রমজীবী আম মানুষের জীবনের উপন্যাস, যার উপসংহার টানা হয়নি। কিসের বিজেপি, কিসের তৃনমূল আর কিসের সিপিএম, কে হিন্দু, কেই বা মুসলমান। কিসের হানাহানি, কিসের পরকীয়া, রোজ লড়াই এর ময়দানে প্রতিটা মুহুর্তে সময় বদলে যাচ্ছে, বহু কিছুই আমাদের ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা ভুঁই-এ লুটিয়ে থাকছি। কিসের লোভ, কিসের মোহ মায়া, কার পিছনেই বা ছোটা, ৩৫টা বছর পাড় হয়ে গেছে, অথচ মনে হচ্ছে এই তো সেদিন। এভাবেই একদিন সত্তরে পৌঁছে যাব বেঁচে থাকলে। সেদিনও পিছন ফিরে তাকালে অর্থ সম্পদ কিছুই নজরে আসবেনা, শুধু রোজগার করা সম্পর্ক গুলোকে মনে থাকবে। যাদের কেউ রয়ে গেছে, কেউ ছেড়ে গেছে, কেউ হারিয়ে গেছে।

ফেরার পথে ইচ্ছা গেলো ওর মেয়ে গুলোকে দেখে আসি, ওদিকে ফোনে মায়ের সমানে তাড়া, ঘড়িতে বেলা ১১টা ছুইঁছুঁই। এ যাত্রায় আর দেশবন্ধুর ঘরে যাওয়া হলোনা, সে আমাদের গাড়ি বারান্দা অবধি ব্যাগ গুলো পৌঁছে দিয়ে বললো- যাস ভাই আমাদের বাড়ি। আমিও তাকে স্বপরিবারে পাহাড়ে ঘুরতে যাবার নিমন্ত্রণ জানালাম। যেতে যেতে একসাথে আরো একটা বিড়ি টানতে টানতে বললাম, আরেকটা বিয়েই না হয় কর, তোকে দেখবে কে বুড়ো বয়সে! খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থেকে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন ভরা চোখে চেয়ে বলল, আমি ওকে তাড়িয়েছি নাকি! আমি ডিভোর্সও দিইনি। সে নেশায় গেছে, নেশা কেটে গেলে ঠিক ফিরবে রে ভাই।

কী সাবলীল ভাবে কথাগুলো বলে দিলো। ভালবাসা প্রকাশের জন্য লক্ষ টাকার হিরের আঙটি লাগে! নাকি বুকে আই লাভ ইউ এর উল্কি আঁকতে হয়! আমরা কত সহজে একটা সম্পর্ককে ঠুনকো তুচ্ছ বিষয়ে ভেঙে দিই, সামান্য রিপালসান টুকুও হয়না পরবর্তীতে। হতেই পারে দেশবন্ধু মাতাল ছিলো, চন্ডাল রাগী ছিলো, কোনো অবৈধ পরকিয়ায় জড়িয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু সংসার ছেড়ে পালায়নি, দায়িত্ব এড়ায়নি। তার স্ত্রী’টি সবকিছুই দেখেছিলো, শুধু এই আদিম নাছোড় ভালবাসাটা খুঁজে পায়নি, যেটা আগলে কতশত দেশবন্ধুরা বেঁচে আছে প্রতীক্ষাতে। হ্যান্ডসেক করি না কোলাকুলি, বুঝে উঠতে না পেরে শেষেরটাই করলাম, সে এটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা, তাই গদগদ হয়ে গেলো।

বড় আশ্চর্য এই মানবজীবন। একজন সংসারের সব কিছুকে মিথ্যা করে স্বামী সংসার সব কিছু ত্যাগ করে নিজের ‘ভালবাসার’ টানে দেশান্তরী হয়েছে। অন্যজন সেই তারই প্রতীক্ষাতে সংসার সাজিয়ে বসে আছে, স্মৃতি আঁকড়ে। তার জীবন সেই বিয়ের দিন, সন্তানের জন্ম, তাদের বেড়ে ওঠার দিনের ‘স্বামী-স্ত্রী’র মিষ্টি খুনসুটির ঘোরেই আচ্ছন্ন। আমাদের ছেলেবেলা, আমাদের সম্পর্ক গুলো এভাবেই এলাকার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে, একটু খুঁজলেই তাদের দেখা মেলে। চারিদিকে এতো সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পারিবারিক হানাহানি, এর মাঝে এমন মিথ্যা প্রেমের গল্প, ফাঁপা হয়ে যাওয়া সংসারের স্বপ্ন, এমন শৈশবের গল্প গুলো বড় দুর্লভ।

লজ্জার কথা হলো, আমি দেশবন্ধুর নামটা ভুলে গেছি, সাথে থাকা ছেলেটিও আমাদেরই সহপাঠী ছিলো, তার যাত্রা ১ বছরই ছিলো, তারপর তাকেও কর্মক্ষেত্রে ঢুকে যেতে হয়েছিলো পেটের দায়ে, সত্যি বলতে তাকে আমি এই লেখা অবধিও মনে করতে পারিনি। শরমের মাথা খেয়ে নাম জিজ্ঞাসা করার সাহসও জোটাতে পারিনি, কী দরকার এমন একটা সুন্দর সম্মীলনীর তাল কেটে দেওয়ার! দেশবন্ধু, ওই নামেই থেকে যাক বাকি জীবনটা। সেক্সপিয়ার তো বলেই গেছেন, "What's in a name?   

মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫

আপনি, ফেসবুক ও বাকিরা


 


(১)

কথা ছিল অকপট নিয়ে লেখার, কারণ অকপটের জন্মতিথি উদযাপনী পক্ষ চলছে। কিন্তু অকপট একটা অন্তর্জালীয় ভার্চুয়াল জগত, আমরা জোর করে গুটিকয়েক মানুষ একে একচুয়াল রূপ দিয়েছি বটে, তবে তাতে ভার্চুয়াল এসেন্সটা হারিয়ে যায়নি মোটেও। মোদ্দা কথা হোয়াটস অ্যাপ, টেলিগ্রাম হয়ে টুইটার, তারই মাঝে নানান মাধ্যমের পত্রিকা সাজলেও- আদতে আসল গ্রুপ বললে কিন্তু এই ফেসবুকীয় গ্রুপটিকেই বুঝি। তাই এই পর্যায়ে ফেসবুকে থাকা আপনি আর বাকিদের নিয়ে একটা অ-দরকারী আলাপচারিতা ভাঁজব, যার মাঝখানে রয়েছে ফেসবুক। আরও খান দুয়েক প্রবন্ধ লেখার ইচ্ছা আছে এই জন্মতিথিতে- একটা খাদ্য বিষয়ক, অন্যটা করোনা উত্তর পৃথিবী। যাই হোক বাজে না বকে, চলুন শুরু করা যায়-

আপনি চোর বা ডাকাত! নির্জীব না সিপিএম! কেপমারি করেন কিম্বা তোলামূল! হাতেনাতে ধরা পড়েছেন? জেল জরিমানা খেটে সমাজের পরিচিত বা বিখ্যাত তথা কুখ্যাত মুখ! তাহলে চিন্তা নেই, নিশ্চিন্তে ফেসবুক করুন। ধর্ষণ করেছেন? রাজনীতিও করেন! আরিব্বাস, তাহলে সোনায় সোহাগা। ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, পিছনে হাঁড়িচাঁচার দল ভিড় জমাবে শিগগিরই, নিশ্চিন্তে ফেসবুক করুন। আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক, ডেজিগনেশন নিয়ে। আপনি কোনো উগ্রবাদী দলের সমর্থক? বজরং দল কিম্বা বাংলাপক্ষ! গরম গরম বিস্ফোরক লাইন ঝাছেন নিজ সংগঠনের সমর্থনে? তাহলে তো কথাই নেই বস, আপনাকে যমেও ছোঁবে না। বরং যমের সহোদরা তাঁর অনুপ্রেরণা, ইয়ে জেন্ডারে গন্ডগোল হয়ে যাচ্ছে- মানে শনি মহারাজ স্বয়ং আপনার উপরে তুষ্ট হবেন নীলা রত্ন ধারণ না করেও, ফলত কিছু গুয়ে মাছি ভনভনিয়ে ভিড় জমাবে আপনাকে কেন্দ্র করে

কিন্তু, যদি আপনি দুকলম লিখে ফেলেন এই সকলের বাইরে- তাহলে আর রক্ষে নেই! কী লিখেছেন সেটা বড় কথা নয়, কেন লিখেছেন সেটাই বড় কথা। অতএব আপনিই হলেন সেই ‘বিষয়’। অবশ্য আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে প্রায় সকলেই লেখক, কমেন্টও তো লেখে রে বাবা। সুতরাং লেখকময় দুনিয়াতে আপনি যদিও একটা সংখ্যা, তবুও অনু বাবুদের ভিড়ে, ঐ যেমন- অনু সাংবাদিক, অনু ঔপন্যাসিক, অনু প্রতিবেদক, অনু কাব্যের জন্মদাতা প্রমুখরা, যারা লেখক নন- তারা পাঠক, কিন্তু ওই- অনু পাঠক। এনারা প্রথম দু'লাইনের বেশি পড়বেন না বা পড়েন না। যা বোঝার ওতেই তারা বুঝে যান।

যদিও অনু কবিদের আজকাল দেখা যায় না করোনার পরে, শুনেছি তারা নাকি আজকাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হয়েছে। অনু কবিতা প্রসবের চেয়ে ক্যামেরার সামনে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে নাচা, বা কাপল ব্লগের নামে ন্যাকামি ও ভন্ডামি করা কতটা বৈপ্লবিক না জানলেও, যুগের নিরিখে নিঃসন্দেহে কাব্যিক একটা শিল্প বটে। ইয়ে, এই ক্রিয়েটর গিরিতে অবশ্য কুণাল ঘোষ নেই; থাকলে শুধু খিস্তি খেয়ে একটা লোককে মাসে কোটি টাকা কামাতে দেখতাম। সুতরাং, এমন একটা সামাজিক অবস্থায় একটু বড় যেই না লিখবেন, ওমনি আপনি নিজেই একটা ‘সাবজেক্ট’ হয়ে যাবেন। আগেই বলেছি জেন-জি ও নেটিজেন পাঠকেরা বড় লেখা পড়েনা-

আসলে আমরা সেই অন্তিম প্রজন্ম যারা জন্মের সময় ডুলি, পালকি, ছই-গাড়ি দেখিছি, মধ্য বয়সে পৌঁছাবার পূর্বেই শব্দভেদী বিমান দেখছি। আমরাই শেষ প্রজন্ম যারা কমপক্ষে ৫টা উপন্যাসের গোটাটা পড়েছি। ১০ জন বাঙালী কবি সাহিত্যিকের নাম বলতে পারি একটানে। পোস্টবক্সকে চ্যাটবক্সে বদলিয়ে যেতে দেখলাম এই আমরাই। অসম্ভবকে সম্ভব হতে দেখেছি একটা জিনিসেরই কল্যাণে- সেটার নাম বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের চেয়ে বড় আবিষ্কার আর নেই এই ধরাধামে। বিদ্যুৎ না এলে কিছুই আসত না, না ইন্টারনেট না শব্দভেদী কোনোকিছু। দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণশক্তিই এই বিদ্যুৎ

এবার আসি একটু অ-প্রয়োজনীয় ইতিহাসচর্চাতে

সদ্য ব্যবসাতে ঢুকেছি তখন, গোঁফের রেখা সবে স্পষ্ট হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া বলতে অর্কুটকেই বুঝি। তখনও ওয়াল বিষয়টা বাজারে আসেনি, ছিল স্ক্র্যাপবুক। কলেজের বন্ধু অয়ন তখনও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, গবেষণারত। কোলকাতাতে কোনো কাজে গিয়ে মেসের কথা মাথায় আসতেই পাড়ি লাগিয়েছিলাম যাদবপুরের ঝিল রোডের সেই মেসের উদ্দেশ্যে, যেখানে জীবনের ৩টি সুবর্ণ বছর কেটেছিল

ইন্টারনেট তখনও চাঁদমারি, সন্ধ্যাতে এক রেস্টুরেন্টে টিফিন খেয়ে ঢুকতাম কোনো ইন্টারনেট কাফেতে। সেদিন আমি অর্কুট খুলছি, অয়ন বলল নতুন একটা কিছু অর্কুটের মতো এসেছে, নাম ফেসবুক; সেই শুরু আজও চলছে। নাহ, আজ আর চলেনি- বাবুল সুপ্রিয়র রাজনীতি ত্যাগের মতোই ফেসবুক ত্যাগ করেছিলাম। ইয়ে, ‘এখন নিজেকে অস্বাভাবিক রকম একা লাগছে’ না- এটাই পার্থক্য। তবে গিয়ে এসেছি, না ‘এসে গিয়েছি’ এই নিয়ে ধন্দ রয়ে গেছে

আসলে কি জানেন, প্রিয় লেখকের সেই বইটাও একদিন পুরনো হয়ে বইয়ের তাকে ধুলো ধারণের মাধ্যম হিসাবে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বছরের পর বছর, সবচেয়ে পছন্দের সেই লাল কাপড়টাও একদিন অলক্ষ্যে ন্যাপথালিনের সাথে সোহাগে মেতে উঠে একাকিত্বের জ্বালায়। প্রথম পাওয়া লুকানো চিঠিটা কবেই হলুদ হয়ে আধখানা হয়ে পাঁপড়ের মতো টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেছে। পুরাতন হয় সকল কিছুই, বদলে যায় সময়, বদলায় মানুষ, সেই সাথে বদলে যায় উপলব্ধি তাই বদলায় আবেগ ও অনুভূতি- শুধু বদলায় না প্রেম

কাঁচ কাটা পোকার মতোই একটা অলীক কিছু এই প্রেম, নিজে অবিকৃত থেকে বাকি সকলকে বদলে দেয়। কারণ পুরাতন হয়ে যায়, ক্ষণ বদলে যায়- বদলায় না অক্ষরেরা। মাঝরাত্রে যখন ভাঙা ঘুমে জেগে উঠি, সর্বাঙ্গে বিন্দু বিন্দু ঘামের সাথে খুঁজে পায় শব্দগুলোকে, প্রতিটা অক্ষর খুঁজে পাওয়া যায়, হাত বুলোতে বুলোতে মনে হয় শব্দগুলো আজও জীবন্ত। কিম্বা ওরা জীবন্ত বলেই আমিও সজীব আছি, বাক্যের অলিতেগলিতে তখন গুপ্তজালের বিমোহ গভীরভাবে লেপ্টে রয়। নিজেকে মনে হয়  ফ্রান্‌ৎস কাফকার ‘মেটামর্ফসিসের’ এর- গ্রেগর।  জীবনের ক্যানভাসে প্রেম হারায় না, একটা প্রেমের রঙ ধীরে ধীরে ফিকে হতে হতে মুছে যায়। ঘটনাচক্রে সেই ফিকে রঙে যদি ভুল করে আবারও তুলির আঁচড় পরে, সে প্রেম অক্ষয় হয়ে যায়। ও প্রেমের চিত্র আরও গভীর হয়, ছড়িয়ে সংক্রামক হয়ে বাঁচে বহু প্রেমিকের মনে

আমরা এই প্রজন্মের অর্ধশিক্ষিত উন্মাদ, না মানুষ হয়েছি না মুনিষ। তেতো বাস্তবের অঙ্গারে পা ফেলতে ভয় লাগে বলে আমরা কল্পনা বিলাসী হয়েই বেঁচে থাকি। রোজ জীবনের বেঁচে থাকার লড়াই লড়তে লড়তে, যারা জীবনের দুই তৃতীয়াংশ সময় ফুরিয়ে ফেলে ক্রমশ বুড়িয়ে যাওয়ার দিকে হাঁটা দেয়, এই চল্লিশের ঘন্টা পার করা জীবনে সুররিয়ালিজমই বেঁচে থাকার রসদ। যে বয়সে চিবুকে চর্বি জমে, জুলফির চুলে শুভ্রতার ছোঁয়া লাগে, সেই বয়সে এসে সালভাদর ডালি, ফ্রিদা, রেনে, হুগো, কাম্যু, ডিকেন্স বা চসারকে আর জানা হয়ে উঠেনা। বণলতা সেনকে প্রেমিকা নয়, বেশ্যাই মনে হয়।

শিল্প, সাংস্কৃতি, অবচেতন মন, স্বপ্ন, লুকানো চিন্তাভাবনা, সবই অনুপ্রাণিত হয় অন্তর্জাল থেকে। আমাদের যুক্তিবুদ্ধি, সচেতন চিন্তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই মাধ্যম থেকেই- বহমান সমাজকে আমরা সংজ্ঞায়িত করি, সোস্যালমিডিয়ার আয়নাতেই।  ২ দশক আগে যা কিছু উদ্ভট ও আশ্চর্যকর রূপকল্প মনে হতো, আজ সেগুলোই বাস্তব। আমাদের সুররিয়ালিজম বাস্তব অবাস্তব বাছবিচার না করে তাদের একত্রিত করে, শিল্প, সাহিত্য সহ সমস্ত শিল্পকলা এক অভিনব মাধ্যমের দ্বারা মুঠোযন্ত্রে উদ্ভাসিত হয়।

হয়ত এই বর্ণনাটা বেশিই কাব্যিক হয়ে গেল, কিন্তু ফেসবুকের প্রতি এই নেশাটাকে যদি প্রেম না বলি কাকে প্রেম বলব? প্রতিটি অক্ষরকে বড় আদরে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে হয় যে, এভাবে আর কাকেই বা ছোঁয়া যায়?

 

(২)

ফেসবুক...

দিনের অনেকটা অংশই আমাদের এই ‘মুহূর্তের’ হাত ধরে কেটে যায়। সেই ২০০৮ এর প্রায় শুরুর দিন থেকে থাকার সুবাদে গত দেড় দশকের অধিক কাল ধরে জমা অভিজ্ঞতাটা নিতান্ত কমও নয়। মাঝখানে চিংড়ির খোলস ত্যাগের মত বেশ কিছু প্রোফাইলের মায়া ত্যাগ করতে হয়েছে। কত নতুন বন্ধু, পুরাতন ইয়ার-দোস্ত, আত্মীয় পরিজন, ভাই-বন্ধু-বান্ধবী নিয়ে গোটা একটা পরিপূর্ণ সংসার, তবে ভার্চুয়াল। ভার্চুয়ালেরই আবার নানা বিভাগ- কিছু পাংচুয়াল, কিছু মিউচুয়াল, কিছু কনসেপচুয়াল, কিছু কনটেক্সচুয়াল, পারসেপচুয়াল, কনসেনসুয়াল, নন-ফাংচুয়াল, সাবটেক্সচুয়াল, কনভেঞ্চুয়াল ইত্যাদি কত দ্যোতনা। এনারা ফলত, তথাপি বস্তুত নয়।

অবশিষ্ট কিছু জনই একচুয়াল, বন্ধুত্বেও- উপস্থিতিতেও, জীবনেও। আমার মতো অনেকেই শুরুর দিকে ভীষণ ন্যালা-খ্যাপা গোছের ছিল ও থাকে। উপক্রমণিকাপাতে টানা ৩ বছর প্রায় তেমন কিছুই জানতাম না বা বুঝতাম না; বলা ভাল চেষ্টাও করিনি জানার। সেকালের অধিকাংশই অবশ্য আমারই মতন, ব্যতিক্রম বাদে। পুরাতন বহু সদস্যদেরই আমি চিনি তারা আমাকে না চিনলেও, তেমনিই আমাকেও অনেকেই স্বনামে বেনামে-চেনেন বা জানেন আমি তাদের না চিনলেও। বয়সটাও বাড়ছে, তাই কালের নিয়মেই হয়ত এখন সামান্য অল্প অল্প কিছু বুঝতে শিখেছি এই ইথারীয় জগতের অধিবিদ্যা সম্বন্ধে। তাহলে কী সেই অভিজ্ঞতা তথা উপলব্ধি!

বছর পনেরো আগেও ফেসবুক ধারণাটা তেমন জেঁকে বসেনি সমাজে, আজকের মতো। অনেকে অনেক কিছুই করত, তার সাথে ফেসবুকও। মানুষের চরিত্রই হলো পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে বাকিটা নিজের আয়ত্তে নিয়ে চলে আসা, ফেসবুককেও তেমনই করে নিয়েছে। বাংলাতে লিখছে, বাংলাতে পড়ছে আর কী চাই! রাজনীতি, লেঙ্গি, খেলা, সংবাদ, আবহাওয়া, জ্ঞান, ধর্মচর্চা, গান-নাচ-সিনেমা, সহ সম্পূর্ণ বিনোদন, পরনিন্দা- মনোরঞ্জনের উপাদানে আর বাকি কী রইল! টিকটক পরবর্তী নতুন যুক্ত হয়েছে রিলস। একটা টিপিক্যাল বাঙালিয়ানা সংস্কৃতির ঘরানা ফেসবুকে আনতে সক্ষম হয়েছে- বাঙালী নেটিজেনরা। মূলত তিন ধরনের চরিত্রের খোঁজ মেলে এই ফেসবুকে; এক ধরনের মানুষ যারা বিনোদন জগতের সাথে যুক্ত, ছোট হোক বা বড়, নামি হোক বা অনামী- তারা সাহিত্য বা শিল্পকর্মের সাথে যুক্ত, নিত্যাবসরে বিনোদনের পসরা সাজিয়ে বসেন

দ্বিতীয় দলটি উপরোক্ত ও তৃতীয় দল থেকে নিজ নিজ পছন্দের বিনোদন সামগ্রী চয়ন করে নিজেকে বিনোদিত করে থাকেন। এদের কারোর সাথে কোনো বিরোধ ঘটেনা সাধারণত, ঘটলে তা সংবাদ শিরোনামে যাওয়ার মতই গুরুত্বপুর্ণ কিছু ঘটে, খাপও বসে। মুশকিলটা তৃতীয় লিঙ্গদের নিয়ে থুড়ি তৃতীয় পন্থা অবলম্বনকারীদের নিয়ে

এনারা খান কম ছড়ান বেশি, শোনেন কম বকেন বেশি, এনারা পরামর্শ দানের নিমিত্তেই মূলত জন্মগ্রহণ করেছেন। সব কিছুতেই ফোঁপরদালালি মাস্ট, জীবনের সব কিছুতেই অধিকিন্তুসর্বত্র গূঢ় জুগুপ্সা, কী বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন, সেটা বড় কথা নয়, কাকে দিচ্ছেন সেটাও নয়; কীভাবে দিচ্ছেন সেটাও বিচার্য নয়- সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে তিনি বিষয়টিতে ঢুকে পরেছেন, এটিই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ। তার যা খুশি করার অধিকারটা স্বলব্ধ। অনু থেকে অনুব্রত হয়ে জ্যোর্তিবিদ্যা থেকে জ্যোতিষচর্চা সকল বিষয়েই এনাদের অবাধ যাতায়াত, গতিবেগ আলোর চেয়েও সময়ে সময়ে বেশি, তাই আমরা এদের উল্টো দিকেও হাঁটতে দেখি কখনও কখনও। খাটের তলা থেকে ঝাঁপানতলা সর্বত্র মাসরুমের মত জ্ঞানের চাষ করে চলেন

এনাদের পোষাকি নাম সমালোচক

সনাতন ধর্ম মতে বিদেহী আত্মারা পুণরায় ধরাধামে জীবদেহে জন্মগ্রহণ করেন। পাপী আত্মারা কাক, শৃগাল বা সারমেয় রূপে এলেও অতৃপ্ত আত্মারা মনুষ্যরূপেই ধরাধামে অবতীর্ন হন। এনাদের থেকেই যোগ্যতমের উদবর্তনের নিয়ম মেনে সমালোচক নামক প্রাণীটি বিকাশ লাভ করেছে বলেই বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস। এমনিতে এদের বিশেষ কোনো বিশেষত্ব নেই চরিত্রে বা রূপে। এনারা দুইটি অবস্থার সামান্যতম তারতম্যকে খুব দ্রুত অনুধাবন করতে পারে, তাই দ্রুত পাল্টি খেতে এনারা ওস্তাদ। একটি নাসিকা, যেটা মিষ্টতার আস্বাদ পেলেই সেই পানে দ্রুত ধাবিত হয়ে পরেন।

একটি জিভ, চাঁটার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত। দুইটি কান থাকলেও সেগুলো অ্যাপেনডিক্সের ন্যায় নিষ্কর্মা, কারণ সমালোচকরা কারও কোনো কথা শুনেছেন বলে কেউ বদনাম দিতে পারবে না। দুটো প্রসারিত হাত রয়েছে এই প্রজাতির, একই সাথে একটি গলাতে ও অন্যটি পদযুগল স্পর্শ করার মতো বিলুপ্তপ্রায় ক্ষমতা যুক্ত। প্রয়োজন অনুসারে এনারা যে হাতটা দরকার সেটাই ব্যবহার করে থাকেন। এদের দুইটি রিকেটগ্রস্ত কিন্তু সবল পা বর্তমান, যা পলায়নে উপযুক্ত। ঝামেলা লাগিয়ে দিয়ে ভদ্রতার দোহাই দিয়ে এনাদের পালানোর কৌশল বিশ্ববন্দিত। বাকি জননাঙ্গ সম্ভবত ক্লীব শ্রেণীর, হয়তবা ক্লাউন ফিসের মতো বদলিযোগ্য। সম্ভবত বললাম এইজন্য, কারণ ব্যক্তিগতভাবে কখনও এদের সাথে মৈথুনের সুযোগ পাইনি, পেলে সেই বিষয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ চটি লেখার অগ্রিম প্রতিশ্রুতি দিলাম

রিস্তে মে তো হাম সবকে বাপ লাগতে হ্যাঁয়, নাম হ্যাঁয় সমালোচকএই প্রজাতিটির এমনই গুণ যে কঠিনপণ তপস্যাকারীকেও এনারা নির্বীজ করে দিতে সক্ষম, এনাদের জিহ্বা নামক অস্ত্র প্রয়োগে। অন্তর্জালীয় এই ভূমে থকথকে পিঁচুটির এঁটুলি ঝোলা কুতকুতে চোখের কোন থেকে লালসা ঝরে পরে যাদের, তারাই আমার এই পর্যায়ের আলোচ্য- ফেসবুকীয় সমালোচক, অতএব তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক

ধরা যাক একজন বিজ্ঞানী যিনি ইসরো মঙ্গলযান প্রজেক্টের সাথে যুক্ত, কিন্তু মনের দিক থেকে ইনি কবিও বটে, ফেসবুকে কবিতা লিখতে শুরু করেছেন হালফিল। তার গুণমুগ্ধ পাঠকের সংখ্যাও নেহাত কম নেই, অতএব সমালোচকের নজর গেল, ব্যাস। বিজ্ঞান চর্চা বিষয়ে জ্ঞান থাকতেই হবে এমন মাথার দিব্যি যেহেতু কেউ দিইনি অতএব সমালোচক ‘তাঁর’ সমালোচনা শুরু করে দিলেন

তার বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া ঘটনা দিয়ে রটনা স্টার্ট, বিজ্ঞানী জ্ঞানী হলেও প্যান্টের ভিতরে জাঙিয়া পরেন না, এবং বাসর রাতে ইনি নাক খুঁটে হাত ধোনি, সাথে বুড়ো আঙুলও। সমস্বরে বলুন- ম্যা গো… আর কী চাই, লাইক- কমেন্ট- শেয়ারের বন্যা। ফেসবুকে অধিকাংশ সময়ই সত্যতা প্রমাণের দায় থাকে না, তাই স্বঘোষিত অভিভাবক হতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। ‘সমালোচনা ব্যবসা’ পচা ছানার মতো ফুলে ফেঁপে উঠতে দেরি হয় না

মন্টু মাতব্বর আমাদের চেনাজানা এরকমই একজন বিশিষ্ট বিদ্বজ্জন তথা ফেসবুক সমালোচক। ইনি সম্ভবত সেই হিমু ট্রমার শিকার, যিনি বিশ্বাস করেন তালিম দিলেই মহাপুরুষ হওয়া সম্ভব

কিন্তু তেমন ইস্কুল কী আর এই পোড়া ভূ-ভারতে আছে! অগত্যা নিজে থেকেই শুরু করে দিলেন পাঠশালা, অর্থাৎ শালা শব্দ পাঠের জন্য প্রস্তুতি, যেখানে তিনিই অধ্যাপক আবার তিনিই ছাত্র। যথারীতি শোরগোলের সাথে ফেসবুকের পাড়াতে নিজের অস্তিত্ব জাহির করলেন। ইনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, গান লেখেন, গান গান, বাজনা বাজান, নিজেই নাচেন, ছবি আঁকেন, পুতুল গড়েন, কবিতা লেখেন, গদ্য বমিও করেন- আর কবিতাটা তো এনার বাই নেচার প্রতিভা, কাব্যেই কথা বলেন। তবে এনার পছন্দের বিষয়টা হলো জীবনশৈলী। ধর্মে নাস্তিক, নাম দেখে বোঝার উপায় নেই ইনি কোন জাতের। রামের আদর্শে জীবন গড়ে তোলা এমন গোঁড়া তথা পাঁড় কমিউনিস্ট, যিনি মমতার মাঝে লেনিনের ছায়া দেখতে পান। তাই সর্ব ধর্মকে নিয়ে খিল্লি করার লাইফটাইম লাইসেন্স এনার কোঁচড়ে বাঁধা আছে। আর সেটাই করেন, ফেসবুকের দেওয়াল জুড়ে নিজস্বতার ‘বিজ্ঞাপন’এর রেতঃপাতে চুনকাম করে চলেন মুহুর্মুহ

মন্টুদা তথা ফেলেব সমালোচকদের অন্যতম বড় গুণ হচ্ছে প্রায় সর্বত্র এনাদের নীরব উপস্থিতি। অকুস্থলে এনারা কেউই কিছু বলেন না বা করেন না। এনারা সর্বঘট থেকে কাঁড়া আকাঁড়া খুদ কুঁড়ো নিয়ে বেশ গুছিয়ে নিজের পাড়ায় এসে গোছা করে কালিপটকার পেটো ফাটান। পুরাণে নানা ধরনের অস্ত্রশস্ত্রের উল্লেখ থাকলেও বর্তমান ফেসবুক সমালোচকদের অস্ত্র হচ্ছে ‘SS’ নামক মারণাস্ত্র। কপি-পেস্টে এনাদের দ মেলা ভার। তাবলে এনারা সর্বত্র মন্তব্য করেন না, তাতে নাকি ইজ্জতের হানি হয়! মেকুরের মতো মাটি যদি নরম বোঝেন তবেই সেখানে বাহ্য করেন রীতিমতো আঁচড় কেটে- নচেৎ নয়। হ্যাঁ, জ্ঞানত এনারা পাণ্ডিত্য আর রেচন পদার্থ ছাড়া কিছুই ত্যাগ করেন না

মন্টুবাবুদের মতো নমুনাগুলো নিজেকে নিম্নমেধার বলেই পরিচয় দেন স্বগর্বে। ধরুন আপনি ভবঘুরে ফেসবুকার, মেধার গভীরতা খুঁজতে গিয়ে গুগুলে মেধা পাটেকরের জীবনীতে পি.এইচ.ডি করে ফেলেছেন প্রায়, তবুও মেধার পরিভাষা রপ্ত করতে পারেননি। অগত্যা মন্টুদার দেওয়াল টপকে গ্রুপে ঢুঁ মারলেন। হ্যাঁ, গ্রুপ। কদিন আগেও সমালোচক বাবুদের একটা প্রসিদ্ধ খিল্লি করার বিষয় ছিল গ্রুপবাজি। আশ্চর্যজনক ভাবে এনারা প্রত্যেকেই নিজেরা একাধিক গ্রুপ খুলে বসেছিলেন কিম্বা পেজের এডমিন। অধিকাংশ জন হালে সেভাবে পানি না পেয়ে গণেশ উল্টিয়ে আবার পুনঃর্মূষিক ভব, পেশাদার সমালোচনা ব্যবসাতে মন দিয়েছেনস্বাদ বদলাতে বাংলাদেশী ফেসবুকারদের ‘সেমি পানু’ ব্লগ পড়ে, মোহনার প্রমাণ সাইজের স্তনের সামান্য খাঁজের তীরে ‘আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো…’ ভেবে বিশ্রাম করেন।

 

(৩)

ফেসবুকের সংসারে মুখ্য যে কয় ধরনের পাবলিক দেখা যায় তাদের দিকে একটু দৃষ্টিপাত করা যাক। রিলস দেখে ক্লান্ত হয়ে একদল টাইমলাইনের অন্যদিক গুলোতে দৃষ্টি দেন ‘সপ্তম ভাব’ থেকে। কিছু লোক শুধুই জোকসের ভক্ত, কেউ প্রিয়জনের মৃত্যু সংবাদ দিলেও এনারা একটা অট্টহাস্যের ইমোজি নেদে দেবেন। একদল সারাদিনই কমেন্ট করেন, এনারা মূলত কমেন্টার। জেনিভা চুক্তি থেকে হরপ্পা সভ্যতা হয়ে আমস্টারডামের ব্রথেল হোক বা তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্রতা সকল বিষয়েই এনারা চটপট কমেন্ট করে দেন, তীব্র জ্বালাময়ী সব ভাষণ দিয়েই এনারা বিখ্যাত। অন্যান্য সমমতাদর্শীরা তর্কস্থলে এদের নাম উল্লেখ করে ডেকে এনে রীতিমতো স্টারের মর্যাদাও প্রদান করে থাকেন।

সারা বছরে কালেভদ্রে এনারা মৌলিক পোস্ট বা শেয়ার করেন। কুণাল বনাম শতরূপের খেউর, ‘তমাল কেন তালিবানদের’ বিরুদ্ধে বললেন না, সৌরভের শালবনীর কারখানা বা পোশাক ব্রান্ডের কী হবে, কিম্বা দরে উঠা ‘সুপ্রিম কোর্ট ও একটি কুকুর’ শীর্ষক আলাপ, অথবা রোজকার হটকেক- শোভন বৈশাখী কিম্বা মহুয়াতে পিনাকীর বাণ, মুগরি রেসকিউ করা হাতি আম্বানিরবনতারা’ যা খুশি আসুক, কমেন্টারদের মত ঘেঁটে দেবার শক্তি অমিত মালব্যেরও এরও নেই। সিলেবাসের বাইরের যেকোনো কঠিন প্রশ্নের চটজলদি কমেন্টের জন্যই ইনারা বিখ্যাত, যাই হোক ট্র্যাকে ফিরি

একদল বোদ্ধা শুধুই কবিতা, গল্প, উপন্যাস আমাশার মতন করে ডেলিভারি করেন, নির্দিষ্ট অবকাশে। তবে ঐ, টুক করে পোস্ট করে দিয়ে ফেরারি আসামির মতো গায়েব হয়ে যান পরবর্তী পোস্টের আগে পর্যন্ত। একদল ফেসবুকার পেজ বা গ্রুপের এডমিন, এনারা সারাদিন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর ব্রতে দীক্ষিত। এনারাই আসলে মিনি সেলিব্রিটির মর্যাদা ভোগ করে নিজ নিজ এলাকাতে। এদের আচরণ অনেকটা আমলা বা মন্ত্রীসুলভ, যাবতীয় নিত্যনতুন আইডিয়াগুলো এদেরই মস্তিষ্কপ্রসূত

একদল আছেন, যারা সারাদিন শেয়ার করেন। সেটা ধর্ষণের খবর হোক বা বর্ষণের, ডোন্ট কেয়ার। একদলের আবার গ্যালপিং চিন্তাভাবনা, তাও আবার হাই লেভেলের, এদের ছোটখাটো স্টেশন ধরে না। এদের বিষয় কূটনীতিক না হয়েও সোর্জিও গোরকে কেন ট্রাম্প ইন্ডিয়াতে রাষ্ট্রদূত করে পাঠালো, নতুবা ৫ বছর আগে রাফালের বরাত ছোট আম্বানিকে যে মোদীজি দিয়েছিলেন, তারই ঘরে CBI-ED পাঠানো কি চাট্টিখানি কথা, কিন্তু তিনি করেছেন- কারণ ঝোলা উঠিয়ে চলে যাবার সময় দ্বারপ্রান্তে। তাঁর শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডলই তো অনুপ্রেরণা (কালীঘাট নয়, কারণ সেখানে খেলা হচ্ছে আজকাল)। চীন নিয়ে জয়শঙ্করের কূটনীতি কী হওয়া উচিত! মার্কিন শুল্ক বিশ্ব বাণিজ্য মানচিত্রে কতটা এফেক্ট ফেলল ইত্যাদি। ইরাণ কী পরমানু বোবা বানিয়েই ফেলেছে, কিম্বা গাজায় আসলে কে জিতল তা নিয়ে এদের ভাবনার শেষ নেই। এর মাঝে সময় পেলে একটু ক্রিকেট, একটু মোহন ইষ্ট হয়ে রোলান্ডো-মেসী সাবড়ে নেটিজেনদের মনোরঞ্জনে ত্রুটি রাখেননা

কিছুজন সজ্জনব্যাক্তি- মুসলমানেরা কত খারাপ আর কেন তাদের তাড়ানো হবে না, এই নিয়েই দ্বিতীয় ভাবনার ফুরসতই পায় না, তাদের যোগ্য সঙ্গত দেয় কিছু আরবি নামধারী- পক্ষে হোক বা বিপক্ষে। কেউ মোদীর ভক্ত তো কেউ লেলিনীয় বীর্যে জারিত হয়ে চীনাবাজারের সস্তা রেস্তঁরাতে ফিদেল খোঁজে, বর্ষার সন্ধ্যায় জার্মান শেফার্ড বাগিয়ে- আর সেটার হ্যাংওভারই হাগে ফেসবুকের ওয়ালে। কিছু জন অতীব ইন্টালেকচুয়াল, এরা যে কার পক্ষে কেউ জানেনা, কিন্তু লম্বা লম্বা হ্যাজ নামায়। কিছু আছে নেপোকিড, ১০টা ৫টার বেসরকারি চাকরির ফাঁকে, বাপের অতীত কর্মকান্ডের দয়ায় কোনো একটা রাজনৈতিক দলের লেজুড় বৃত্তি এমন ভাবে করে, যেন দলের উত্তরাধিকার একা কুম্ভ হয়ে ওকেই বইতে হচ্ছে। এদের ভিড় ঠেলে বাকি অবশিষ্টরা হয় ‘চ্যাঁচ্যাঁই মাতা’, ‘লাল সেলাম’ কিম্বা ‘খেলা হবে’র বৈধ গর্ভপাত

আজকাল ক্রিয়েটরদের যুগ চলছে। মোদ্দাকথা পোঁদ নাচাবার যুগ, একসময় ধনীরা লুচ্চা পুরুষের দল বাইজি বাড়ি যেতো গরীবের মেয়ের শরীর নাচানো দেখতে, তাকিয়াতে আধাশোয়া হয়ে টাকা ছুঁড়ে মারত। একখন বড় লোকের মেয়েরা ক্যামেরার সামনে এসে ‘ভিউ’ বাড়াবার জন্য প্রায় খোলা বুক দুলিয়ে আধা ন্যাংটা হয়ে পোঁদ নাচাচ্ছে, আর দুনিয়ার বুভুক্ষু শ্রমিক কৃষক বেকার ভবঘুরের দল চোখ দিয়ে সেগুলো গিলছে। গোটা সোস্যাল মিডিয়াই এখন বাইজিবাড়ি। এর পরের দল ফুড ব্লগার, ফ্রি খাবারের ধান্দায় রাজুদা থেকে ঝরে ঝরে পরছে- এক অদ্ভুদ মন্তাজ সৃষ্টি করেছে। একদল সারাদিন ট্যুরের উইন্ডো শপিং করেন, অন্যদল বিজ্ঞাপন দেয়। কেউ শাড়ি বিক্রি করে, কেউ কুকুরের জন্মদিন পালনের ৭ দিন ব্যাপী সঙ্গীত অনুষ্ঠানের লাইভ দেখায়। সবচেয়ে সেরা হচ্ছে ব্যারাকপুরে AC লোকাল ট্রেনের ব্লগার হওয়া। মাইরি বলছি, কুনাল ঘোষ বা শতরূপ হওয়ার চেয়েও সোজা। এগুলোই বর্তমান ফেসবুকের ‘হট ট্রেন্ডিং’।

একদল নিজের ও নিজের পরিবারের বস্তা বস্তা ছবি শেয়ার করেই সেলিব্রিটি, কেউ কেউ ঘন্টায় ২৮টা করে নিজের ছবি দিচ্ছে নানান এ্যাঙ্গেলে। কেউ কেউ আবার ওই করেই এক আধটা পেজও খুলেছেন বলে খবর আছে। কেউ বিরহ গায়, তার সবেতেই বিরহ- পরিস্থিতি যা খুশি হোক। আরেকটা দল, যারা গ্রুপ গ্রুপে পুরস্কার বিতরণ করে রোজ, নিত্য, নিয়মিত। ফলত আপনি যদি তেমন গোটা সাতেক গ্রুপের মেম্বার থাকেন, রোজই কিছু না কিছু একটা শিরোপা জুটবেই, ধ্বজভঙ্গ বঙ্গ সিপিএমের বৃদ্ধতন্ত্রের মতই সত্য ঘটনা এটাও ট্রাম্প যদি ‘নোবেলেরলোভে যুদ্ধের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে, একজন সত্যকারের ফেস-‘বুকার’ কেন রোজ পুরষ্কার দাবী করতে পারবে না! যদিও প্রেরকদের কে ওই বিচারকের আসনে বসিয়েছে এ সত্য জানার কোনও উপায় নেই। শেষের দলটি ‘আমি আর ফেসবুক করব না’, ‘বিদায় বন্ধু’, ‘ফ্রেন্ডলিষ্টের আগাছা পরিষ্কার করব’, ‘ফেসবুক রিচ কমিয়ে দিয়েছে, প্লিজ স্টিকার কমেন্ট করো’, ‘আগামীকাল একটা বড় দিন…’, 'সুপ্রভাত', 'শুভরাত্রি', ‘এতো কষ্ট কেন”, এই ধরনের আঁতলামো পোস্ট করেই মানসিক তৃপ্তি লাভ করেন

বাপে বলেছে সুধীরভাই, আনন্দের আর সীমা নাই, এই একটা প্রজাতীর প্রাণী ফেসবুকের সমাজে সবর্ত্র বিরাজমান, এবং এরাই সংখ্যাধিক্য। এরা সকল কিছুতেই ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর জটিল, বাছা বাছা কঠিন অব্যয় আর বিশেষণ ব্যবহার করেন। এরাই সমালোচকদের মূল খদ্দের। কারণ বাকি সকলেই নিজ নিজ কর্মে ব্যস্ত, সুতরাং মধু আর মালতির এ এক বিচিত্র গন্ধ শোঁকাশুঁকি

বাকিরা? নাহ এখানেই শেষ নয়, শেষেরও একটা শেষ থাকে, বাকি হলে তারা...

আরে বাওয়া, এরাই তো হলেন ওই মন্টু বাবুর বাপ, বিদগ্ধ সমালোচকদেরও সমালোচক। নাম না দিয়ে কেউ যদি একটা রবি ঠাকুরের কবিতা বা সেক্সো কবির ড্রামা পোস্ট করে ফেলেছেন, এনারা নির্দ্বিধায় তার মা-মাসি উদ্ধার করে দেবেন অবলীলাক্রমে

কবি ঠাকুরের কথায় মনে এল, ইনি অনেক বই ছাপিয়েছিলেন বা প্রকাশকও এনার বই ছাপে। আজকের এই ট্যাকস্যাভি যুগে আড্ডার পরিসরটা বা চেনা পরিচিতের গণ্ডিটা ফেসবুক ভায়া হয়েই বস্তু দুনিয়ার প্রান্তে উন্মুক্ত হচ্ছে। অনামি তথা শখের লেখকেরাও একটা চটজলদি পাঠক প্রতিক্রিয়াও পাচ্ছেন, হ্যাঁ-না করতে করতে কিছু জন বইও ছাপিয়েই ফেলছেন। মুশকিল হচ্ছে, ফেসবুকে ৩ লাইনের ‘স্ট্যাটাস’ দেওয়া লোকটাও নিজেকে লেখক ভাবছে, না তার ব্যকরণ জ্ঞান রয়েছে, না আছে বাক্য গঠনের আসত্তি জ্ঞান, না রয়েছে বাংলা বিশেষণের মজুদ, না আছে অর্থপূর্ণ ভাব প্রকাশের জন্য শব্দভান্ডার, না রয়েছে বাক্যাংশ পরিস্ফুটনের অলঙ্কার, তার সাথে পদে পদে বানান ভুলে ভরা মানুষটাও নিজেকে লেখক ভেবে বই ছাপিয়ে ফেলছে, সমস্যা এটা। তার পরেও ঘটনা হচ্ছে ছাপাছাপির বিষয়টা আগের চেয়ে অনেক অনেক কমে গেছে, যেটা বই পাড়াতে যাতায়াত করলেই মালুম হয়। কিন্তু ছাপার অক্ষরে নিজেকে দেখার বাসনা কার না হয়- একটা আম জীবনে অন্নপ্রাশন, বিয়ে আর শ্রাদ্ধ ছাড়া কার নামই বা আর ছাপার কালিতে ছাপে! সুতরাং, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবাদেই ফেসবুকের মঞ্চ থেকে আরও অনেক সংগঠিত কর্মের মতো বই ছাপানোও হচ্ছে

তাহলে আর কী! হাত গুটিয়ে বসে থাকার প্রশ্নই নেই? কিছু লেখিকা (WBCS অফিসারও বটে) লেখেন- সম্পূর্ণ কাল্পনিক কিন্তু গবেষণাধর্মী ইতিহাসশ্রয়ী উপন্যাস, যা আমাদের গৌরবময় অতীতকে মনে করাবে”। পুরো পুদিচ্চেরি কেস, লেখেন বললাম, আসলে এনারা ছাগলের চেয়েও উন্নত প্রসবশীল প্রাণী, বছরে ৫-৭টা উপন্যাস স্বয়ং কবি ঠাকুরও লেখেননি, ইনারা ছাপাচ্ছেন- স্বগর্ভে থুক্কুরি স্বগর্বে। বাঁশবনে শেয়াল রাজা, নব্বই এর দশকের বাংলা সিনেমা আর আজকের বাংলা ভাষায় আধুনিক লেখকদের বেশিরভাগ অংশটা- হোল…বোল…, এরা রোজগার করে খায় এটাই সত্য। বাংলায় শিল্প যেখানে চপ, সেখানে মুদ্রাক্ষরিক পেশাতে মুনিশেরা জুটবে এটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু ইজ্জতেরও প্রশ্ন আছে বস! সমালোচনা মাংতা হ্যাঁয়, অতএব লাগাও কাঠি

ফিরে যাই শুরুর লাইনে, আপনি যদি রাজনৈতিক নেতা হন, চোর, ডাকাত, খুনী, ধর্ষক হন আপনি অনেকটা সেফ- সমালোচকদের থেকে। কারণ কোষ বলতে এদের শুধুই অণ্ড, বাকিটা চর্বি আর জ্ঞান। সুতরাং পাল্টা আসতে পারে এমন বাক্সের ধারেকাছে এনারা যান না। আসলে ময়ূখ ঘোষ লেলিয়ে দেয়- কুসম কুসুম করে মাথার চুল ছিঁড়ে নেবে। কিন্তু যদি আপনি নিরীহ নির্বিরোধী লেখক হন! তাহলে আর আপনার রক্ষে নেই। আপনার যাবতীয় সকল কিছু ভালমন্দ বিচারের ঠিকেদারি এনারা নিজ দায়িত্বে কাঁধে তুলে নেবেন। শুরু হয়ে যাবে নিরন্তর কাঠিবাজী, কাঠির টান পড়লে হাতে পায়ে কুড়িটা আঙুল হ্যায় না...

কেউ মদের নেশা করেন, কেউ মেয়েছেলের, কেউ রেসের মাঠে যান। গাঁজা, চরস, হেরোইন তো আছেই। একটাকেও সমাজ ভাল চোখে নেয় না। কিন্তু আপনি যদি বই লেখা বা ছাপানোর মতো নিরীহ নেশা করেছেন!! অমনি সমালোচকের দল এমন ফেনাতে শুরু করে দেবে, যে আপনার খাটের তলা অবধি পৌঁছে যাবে। আপনি হয়ত বিনিদ্র রজনীতে পেটে অম্বলের দোষ করে বসে আছেন। আনন্দের বিষয় হলো আপনার পায়ুরন্ধ্রে সমালোচকের দল হয় কাঠি বা আঙুল কিছু একটা গুঁজে রেখেই দিয়েছেন। সমালোচোকরা সেটা টেনে মাঝে মাঝে বের করে শুঁকবেন, দেখবেন গন্ধটা ঠিকঠাক মনমতো ঝাঁঝালো হলো কিনা

সমালোচক সকল কিছুই করেন শুধু এটুকু বোঝেন না, আঙুল বা কাঠি করতে করতে আঙুলের ডগাতে যে হলুদ বর্ণটা শোভা বর্ধন করে ওটা তরল কাঞ্চণ নয়, পাতি নরগোবর। কিন্তু বিজ্ঞ সমালোচককে কে বোঝাবে! তিনি ওতেই মোক্ষ লভেছেন

ফেসবুক পূর্ব জীবনের এক পর্যায়ে সময় সময় মনে হতো, ছোট বেলায় কত কষ্ট করে নামতা, ব্যাকরণ ও মাস্টার টেন্সের গজগজে ভিড় ঠেলে মাতৃভাষায় নানা ধরনের গালি শিক্ষা অর্জন করে নিজেকে ঋদ্ধ করেছিলাম। কিন্তু কলেজ শেষে পেশা জগতে ঢুকে চর্চার অভাবে অধিকাংশ গালিই ভুলে যেতে বসেছিলাম। তবে, বিগত প্রায় দেড়দশক ধরে আবাল সমালোচকদের দেখলেই মনের মাঝে চু-কিত-কিত খেলে যায় সেই কৈশোরে শেখা গালিগুলো, সঠিক পরিবেশে পুনরায় চর্চিত হয় স্বস্নেহে। এই সমালোচকদের কল্যাণেই ঐতিহ্যবাহী বাংলা খিস্তিখেউর গুলো আজ বিলুপ্তির পথ থেকে ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে স্বমহিমায় নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়ে যায়। এভাবেই ইতিহাস সচল থাকার পথ খুঁজে নেয়। রয়ে যায় সেই ভাষা, অক্ষরের প্রেম, হারিয়ে যায় মানুষ, হারায় সময়, রয়ে যায় প্রেম

বর্তমান সমাজ- ফেসবুকীয় পরাকাষ্ঠা, স্ট্যাটাসের ভিড়ে অক্ষম রমনের প্রয়াসে নিত্যনতুন খুঁত খুঁজে ফেরা অতৃপ্ত আত্মার সাথে প্রতিষিদ্ধ স্বমৈথুন

 

 

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...