মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৫

অকপট চড়ুইভাতি ২০২৫


 ১৬শ শতাব্দীর শেষভাগ, দিল্লির মসনদে তখন প্রতাপশালী মুঘল- সম্রাট আকবর। 


দিল্লীশ্বর, বাংলা-বিহারের শাসনকর্তা হিসেবে উড়িষ্যা দখল করতে নির্দেশ দিলেন অম্বররাজ মানসিংহকে। মহারাজ মানসিংহ তার সুপুত্র জগৎসিংহকে এই কাজে নিয়োজিত করেন। সুদক্ষ যোদ্ধা রাজপুতবীর জগৎসিংহ বার বার সামরিক আক্রমণ করে পাঠানদের অতিষ্ট করে তোলে। এরকম সময়েই একদিন জগৎসিংহের সাথে স্থানীয় ভূস্বামী বিরেন্দ্র সিংহের একমাত্র ষোড়শী কন্যা, সুন্দরী তিলোত্তমার সাক্ষাৎ হয় শৈলেশ্বরের মন্দিরে। নিজের অজান্তেই উভয়ে একে অপরের প্রেমে পড়েন। উড়িষ্যা-অধিকারী পাঠানেরা মান্দারণ অঞ্চলের জমিদার বাড়ি লুট করতে এসে সস্ত্রীক জমিদার ও তার কন্যাকে বন্দী করে নিয়ে যায়। রাজপুতবীর কুমার জয়সিংহ তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পাঠানদের হাতে বন্দী হলেন।

চেনা গল্প তো! ঠিকিই ধরেছেন, এটা বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের পটভূমি। বাংলা সাহিত্যের জয়ঢাক বাজিয়ে জন্ম নেওয়া ‘দুর্গেশনন্দিনী’ মুঘল-পাঠান দ্বন্দ্বকে ভিত্তি করে, ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমিতে রচিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম বাংলা উপন্যাস, মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৮৬৫ সালে এটি প্রকাশিত হতেই, বাংলা গদ্য সাহিত্যে বিপ্লব ঘটায়। ব্যক্তি-আগ্রাসী সামন্তসমাজ, ব্যক্তি হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা ও ক্রন্দন, আবিষ্কারের ঐকান্তিকতা, বাংলা উপন্যাসের বৃহত্তর জীবনমুখী পটভূমিকে চিনতে বা জানতে ইচ্ছা যায়না? রোম্যান্সমধুর রহস্যলোক, ইতিহাসের স্বপ্নাবেশ আর আদর্শায়িত ব্যক্তি ও সমাজকেন্দ্রিকতা যে মাটিকে আবর্ত করে গড়ে উঠেছিলো, তাকে ছুঁয়ে দেখায় বাসনা যায়না? 

বাংলার আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক আবর্ত-সংঘাতে ঘূর্ণমান ও বিচূর্ণ-ভগ্ন মূল্যবোধ রূপায়ণের ঐকান্তিকতা এবং সমসাময়িক জীবনের চলমান বহির্বাস্তবতা অঙ্কনের অলক্ষ্য স্থান, আজ তার কিছুই রক্ষা করতে পারেনি কিছু ভাঙা ইট পাথর ব্যাতিত। ২০১৬ তে আমরা শরৎচন্দ্রের পানিত্রাসের ভিটেকে ছুঁতে পাওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছিলাম অকপট চড়ুইভাতির সৌজন্যে, সেখানে বঙ্কিমের সৃষ্টি সুখের গড়কে ছুঁয়ে দেখার একটা সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়! অনিশ্চয়তার এই তো জীবন, আজ আছি কাল নেই। অকপটেই বা সেই ২০১৬ এর কতজন টিকে আছি আজ ১০ বছর পর ২০২৫ এ এসে, জীবন নদীতে সময়ের স্রোত বয়েই চলেছে, নতুন জলের ধারায় কতজন হারিয়ে গেছে, আবার কত নতুন প্রাণেরা এসে ধরা দিয়েছে, এটাই জীবনের নিয়তি। তার আগে যেটুকু সুযোগ আসে, দেখে যায় প্রাণ ভরে।

বঙ্কিমের ‘দুর্গেশনন্দিনী’র সৃষ্টি সুখের গড়, সত্যিকারের গড়, নাম- গড় মন্দারণ। হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমার, গোঘাট ব্লকে অবস্থিত এই গড় মন্দারণ। দ্বারকেশ্বর নদ ও শিলাবতী নদীর মধ্যবর্তী তরঙ্গায়িত পললমাটির ওপর মন্দারণ দূর্গটি আজ আর নেই, সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে, রয়ে গেছে ইতিহাস। আজও মাটি খুঁড়লে সেই আমলের অস্তিত্ব মেলে যত্রতত্র। কে জানে কোন পথে ঘোড়া হাঁটিয়ে ছিলো দুর্গাধিপতি জয়ধর সিংহ, কোথায় রয়েছে রূপসী তিলোত্তমার হাতের ছোঁয়া, কোথায় ই বা সেই শৈলেশ্বর মহাদেবের মন্দির- কে জানে! নবাবজাদী আয়েষার অতৃপ্ত আত্মা হয়ত আজও খুঁজে ফেরে কুমার জগৎ সিংহকে।

গড় মান্দারণের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অসাধারণ, কাছেই বয়ে চলেছে আমোদর নদ। হুগলি ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সীমানায় এই গড় মান্দারন, হুগলির অন্যতম বনাঞ্চল চাঁদুর ফরেস্ট এখানেই অবস্থিত। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্মভূমি কামারপুকুর থেকে গড় মান্দারণে দূরত্ব মাত্র ৩ কিলোমিটার। নির্জনতা যাঁদের ভাল লাগে, এই জায়গা তাঁদের ভারি পছন্দ হওয়ার কথা। নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশে মাঝেমাঝে বয়ে চলা বাতাসের শন শন শব্দ আপনার শহুরে ক্লান্তি দূর করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে প্রায় ২০০ একর জমির উপরে গড়ে উঠেছে গড় মান্দারণ পর্যটন কেন্দ্র। কথিত রয়েছে গৌড়ের অধিপতি হুসেন শাহের সেনাপতির সমাধি রয়েছে এখানে, যা দরগা নামে পরিচিত। চুড়ুইভাতিতে আসার নামে শ্রীরামকৃষ্ণের ভিটেকে চোখে দেখা বোনাস প্রাপ্তির মতই সুখকর।

শাল, শিমুল, পিয়াল, সেগুন দিয়ে ঘেরা গড় মান্দারণের জঙ্গলে একটা দিন হৈহৈ করে জীবনকে উদযাপন করতে আসবেন নাকি! বাকি সব কিছু ভুলে যান, গড় মান্দারণের প্রকৃতি এখানে জীবন্ত ইজেল, রং-তুলি দিয়ে ক্যানভাসে আঁকা ছবি। অদ্ভুত শান্তি মিশে রয়েছে এখানকার বাতাসে, পাখির কলতান, গাছেদের ফিসফাস আর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে মিশে থাকা মাদকতায়। চড়ুইভাতি সেরে কামারপুকুর বা জয়রামবাটীতে একটা রাত থেকে যেতেই পারেন, শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদাময়ীয় স্মৃতি বিজড়িত স্থানের আধ্যাত্মিকতা ও ইতিহাস ছাড়াও এখানে গ্রামের সবুজ পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে। মঠ ও মিশনের শান্ত–সুন্দর পল্লী পরিবেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামের ইতিহাসের উপাদানগুলির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া একটা উপরি পাওনা বৈকি।

হাওড়া থেকে গোঘাট বা আরামবাগ গামী লোকাল ট্রেন ধরে খুব সহজে পৌঁছে যাওয়া যায় গড় মন্দারণ। সকালে হাওড়া স্টেশন থেকে ৭টা ২৫ এর গোঘাট লোকালটা বেস্ট। এছাড়া শ্যাওড়াফুলি থেকে ট্রেনে তারকেশ্বর-আরামবাগ হয়ে ভায়া কামারপুকুর, গড় মন্দারণ যাবার বিবিধ উপায় রয়েছে। কেউ যদি উত্তরের দূরবর্তী জেলা থেকে আসেন, কামরূপ এক্সপ্রেসে চড়ে পড়াটা বেষ্ট। মধ্যবঙ্গ থেকে এলে হাটেবাজারে এক্সপ্রেসে রাত ১২টার আশেপাশে চড়ে বসলে সকাল ৫টার আগেই হাওড়া পৌঁছে যাবেন। উত্তর চব্বিশ পরগণা বা নদীয়া থেকে এলে ব্যারাকপুর ফেরিতে মাত্র ৬ টাকায় গঙ্গা পার হয়ে শ্যাওড়াফুলি ঘাট, সেখান থেকে ২ মিনিটে শ্যাওড়াফুলি রেল স্টেশন। বাসে কিম্বা গাড়িতে চড়ে কামারপুকুর হয়ে পৌঁছে যাওয়াটা কোনো ব্যাপারই নয়। মেদিনীপুর শহর, খড়্গপুর, পাশকুড়া, চন্দ্রকোণা রোড, উলুবেড়িয়া, বাগনান, বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, বর্ধমান, মেমারি, নবদ্বীপ থেকে প্রচুর বাস রয়েছে ঘন্টায় ঘন্টায়, যাগুলো সরাসরি কামারপুকুরে পৌঁছে দেবে আপনাকে। সেখান থেকে অহরহ টোটো পাওয়া যায় পিকনিক স্পটে পৌঁছাবার জন্য। 

সকালে পাকোড়া আর চা/কপি, ব্যাস। এর বেশী খেলে মধ্যহ্নভোজে, পাকস্থলী আহত হতে পারে খাসির মাংসকে যথাযথ স্থান না দিতে পেরে। এরপর তুমুল আড্ডার ফাঁকে ততক্ষণে সাদা ভাত, সোনা মুগের ডাল, ঝুড়ি আলুভাজা, বাঁধাকপি দিয়ে মটরশুটির ঘন্ট, চাটনি, পাঁপড় আর রাজভোগ- পাতের সৌন্দর্য বর্ধন করার জন্য এগুলো প্রস্তুত হয়ে যাবে কষা কষা ঝাল ঝাল খাসির মাংসের সাথে। পার্কের এ্যান্ট্রি ফি, পিকনিক স্পটের ভাড়া, হাঁড়িকুড়ি ভাড়া, খাওয়ার প্লেট গ্লাস, রান্নার গ্যাস, বোতল বন্দি পানীয় জল, মাংস, মসলা, চাল সবজি, ঠাকুর চাকর, ইত্যাদি সব মিলিয়ে মাথাপিছু মাত্র ৬০০ টাকা করে চাঁদা ধার্য্য করেছি। ১০ বছরের নিচের বাচ্চা কমপ্লিমেন্টারি, তার উপরে আমরা সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক। এই হলো দেনাপাওনার গল্প।

আমাদের আয়োজন ৫০ জনের অধিক নয়, ৪০ এর আশেপাশে হলে সবথেকে ভালো। অধিক ভিড়ে আলাপের মাদকতা নষ্ট হয়, তাছাড়া আয়োজনেও কিছুটা অপারগতা রয়েছে। তাই আপনাকে নিয়েই যদি সংখ্যাটা পূরণ হয়ে যায়, তার চেয়ে ভালো আর কিচ্ছুটি হয়না। তাহলে, আসছেন নাকি আগামী ২১শে ডিসেম্বর ২০২৫ এর দুপুরে গড় মন্দারণে? কিছুটা ইতিহাস, কিছুটা আধ্যাত্মিকতা, কিছুটা সাহিত্যের গন্ধ গায়ে মেখে, অকপট চড়ুইভাতির নামে আসবেন নাকি একটা দিনের অবসরে?


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...