অকপট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অকপট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৫

অকপট চড়ুইভাতি ২০২৫


 ১৬শ শতাব্দীর শেষভাগ, দিল্লির মসনদে তখন প্রতাপশালী মুঘল- সম্রাট আকবর। 


দিল্লীশ্বর, বাংলা-বিহারের শাসনকর্তা হিসেবে উড়িষ্যা দখল করতে নির্দেশ দিলেন অম্বররাজ মানসিংহকে। মহারাজ মানসিংহ তার সুপুত্র জগৎসিংহকে এই কাজে নিয়োজিত করেন। সুদক্ষ যোদ্ধা রাজপুতবীর জগৎসিংহ বার বার সামরিক আক্রমণ করে পাঠানদের অতিষ্ট করে তোলে। এরকম সময়েই একদিন জগৎসিংহের সাথে স্থানীয় ভূস্বামী বিরেন্দ্র সিংহের একমাত্র ষোড়শী কন্যা, সুন্দরী তিলোত্তমার সাক্ষাৎ হয় শৈলেশ্বরের মন্দিরে। নিজের অজান্তেই উভয়ে একে অপরের প্রেমে পড়েন। উড়িষ্যা-অধিকারী পাঠানেরা মান্দারণ অঞ্চলের জমিদার বাড়ি লুট করতে এসে সস্ত্রীক জমিদার ও তার কন্যাকে বন্দী করে নিয়ে যায়। রাজপুতবীর কুমার জয়সিংহ তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পাঠানদের হাতে বন্দী হলেন।

চেনা গল্প তো! ঠিকিই ধরেছেন, এটা বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের পটভূমি। বাংলা সাহিত্যের জয়ঢাক বাজিয়ে জন্ম নেওয়া ‘দুর্গেশনন্দিনী’ মুঘল-পাঠান দ্বন্দ্বকে ভিত্তি করে, ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমিতে রচিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম বাংলা উপন্যাস, মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৮৬৫ সালে এটি প্রকাশিত হতেই, বাংলা গদ্য সাহিত্যে বিপ্লব ঘটায়। ব্যক্তি-আগ্রাসী সামন্তসমাজ, ব্যক্তি হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা ও ক্রন্দন, আবিষ্কারের ঐকান্তিকতা, বাংলা উপন্যাসের বৃহত্তর জীবনমুখী পটভূমিকে চিনতে বা জানতে ইচ্ছা যায়না? রোম্যান্সমধুর রহস্যলোক, ইতিহাসের স্বপ্নাবেশ আর আদর্শায়িত ব্যক্তি ও সমাজকেন্দ্রিকতা যে মাটিকে আবর্ত করে গড়ে উঠেছিলো, তাকে ছুঁয়ে দেখায় বাসনা যায়না? 

বাংলার আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক আবর্ত-সংঘাতে ঘূর্ণমান ও বিচূর্ণ-ভগ্ন মূল্যবোধ রূপায়ণের ঐকান্তিকতা এবং সমসাময়িক জীবনের চলমান বহির্বাস্তবতা অঙ্কনের অলক্ষ্য স্থান, আজ তার কিছুই রক্ষা করতে পারেনি কিছু ভাঙা ইট পাথর ব্যাতিত। ২০১৬ তে আমরা শরৎচন্দ্রের পানিত্রাসের ভিটেকে ছুঁতে পাওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছিলাম অকপট চড়ুইভাতির সৌজন্যে, সেখানে বঙ্কিমের সৃষ্টি সুখের গড়কে ছুঁয়ে দেখার একটা সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়! অনিশ্চয়তার এই তো জীবন, আজ আছি কাল নেই। অকপটেই বা সেই ২০১৬ এর কতজন টিকে আছি আজ ১০ বছর পর ২০২৫ এ এসে, জীবন নদীতে সময়ের স্রোত বয়েই চলেছে, নতুন জলের ধারায় কতজন হারিয়ে গেছে, আবার কত নতুন প্রাণেরা এসে ধরা দিয়েছে, এটাই জীবনের নিয়তি। তার আগে যেটুকু সুযোগ আসে, দেখে যায় প্রাণ ভরে।

বঙ্কিমের ‘দুর্গেশনন্দিনী’র সৃষ্টি সুখের গড়, সত্যিকারের গড়, নাম- গড় মন্দারণ। হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমার, গোঘাট ব্লকে অবস্থিত এই গড় মন্দারণ। দ্বারকেশ্বর নদ ও শিলাবতী নদীর মধ্যবর্তী তরঙ্গায়িত পললমাটির ওপর মন্দারণ দূর্গটি আজ আর নেই, সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে, রয়ে গেছে ইতিহাস। আজও মাটি খুঁড়লে সেই আমলের অস্তিত্ব মেলে যত্রতত্র। কে জানে কোন পথে ঘোড়া হাঁটিয়ে ছিলো দুর্গাধিপতি জয়ধর সিংহ, কোথায় রয়েছে রূপসী তিলোত্তমার হাতের ছোঁয়া, কোথায় ই বা সেই শৈলেশ্বর মহাদেবের মন্দির- কে জানে! নবাবজাদী আয়েষার অতৃপ্ত আত্মা হয়ত আজও খুঁজে ফেরে কুমার জগৎ সিংহকে।

গড় মান্দারণের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অসাধারণ, কাছেই বয়ে চলেছে আমোদর নদ। হুগলি ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সীমানায় এই গড় মান্দারন, হুগলির অন্যতম বনাঞ্চল চাঁদুর ফরেস্ট এখানেই অবস্থিত। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্মভূমি কামারপুকুর থেকে গড় মান্দারণে দূরত্ব মাত্র ৩ কিলোমিটার। নির্জনতা যাঁদের ভাল লাগে, এই জায়গা তাঁদের ভারি পছন্দ হওয়ার কথা। নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশে মাঝেমাঝে বয়ে চলা বাতাসের শন শন শব্দ আপনার শহুরে ক্লান্তি দূর করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে প্রায় ২০০ একর জমির উপরে গড়ে উঠেছে গড় মান্দারণ পর্যটন কেন্দ্র। কথিত রয়েছে গৌড়ের অধিপতি হুসেন শাহের সেনাপতির সমাধি রয়েছে এখানে, যা দরগা নামে পরিচিত। চুড়ুইভাতিতে আসার নামে শ্রীরামকৃষ্ণের ভিটেকে চোখে দেখা বোনাস প্রাপ্তির মতই সুখকর।

শাল, শিমুল, পিয়াল, সেগুন দিয়ে ঘেরা গড় মান্দারণের জঙ্গলে একটা দিন হৈহৈ করে জীবনকে উদযাপন করতে আসবেন নাকি! বাকি সব কিছু ভুলে যান, গড় মান্দারণের প্রকৃতি এখানে জীবন্ত ইজেল, রং-তুলি দিয়ে ক্যানভাসে আঁকা ছবি। অদ্ভুত শান্তি মিশে রয়েছে এখানকার বাতাসে, পাখির কলতান, গাছেদের ফিসফাস আর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে মিশে থাকা মাদকতায়। চড়ুইভাতি সেরে কামারপুকুর বা জয়রামবাটীতে একটা রাত থেকে যেতেই পারেন, শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদাময়ীয় স্মৃতি বিজড়িত স্থানের আধ্যাত্মিকতা ও ইতিহাস ছাড়াও এখানে গ্রামের সবুজ পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে। মঠ ও মিশনের শান্ত–সুন্দর পল্লী পরিবেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামের ইতিহাসের উপাদানগুলির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া একটা উপরি পাওনা বৈকি।

হাওড়া থেকে গোঘাট বা আরামবাগ গামী লোকাল ট্রেন ধরে খুব সহজে পৌঁছে যাওয়া যায় গড় মন্দারণ। সকালে হাওড়া স্টেশন থেকে ৭টা ২৫ এর গোঘাট লোকালটা বেস্ট। এছাড়া শ্যাওড়াফুলি থেকে ট্রেনে তারকেশ্বর-আরামবাগ হয়ে ভায়া কামারপুকুর, গড় মন্দারণ যাবার বিবিধ উপায় রয়েছে। কেউ যদি উত্তরের দূরবর্তী জেলা থেকে আসেন, কামরূপ এক্সপ্রেসে চড়ে পড়াটা বেষ্ট। মধ্যবঙ্গ থেকে এলে হাটেবাজারে এক্সপ্রেসে রাত ১২টার আশেপাশে চড়ে বসলে সকাল ৫টার আগেই হাওড়া পৌঁছে যাবেন। উত্তর চব্বিশ পরগণা বা নদীয়া থেকে এলে ব্যারাকপুর ফেরিতে মাত্র ৬ টাকায় গঙ্গা পার হয়ে শ্যাওড়াফুলি ঘাট, সেখান থেকে ২ মিনিটে শ্যাওড়াফুলি রেল স্টেশন। বাসে কিম্বা গাড়িতে চড়ে কামারপুকুর হয়ে পৌঁছে যাওয়াটা কোনো ব্যাপারই নয়। মেদিনীপুর শহর, খড়্গপুর, পাশকুড়া, চন্দ্রকোণা রোড, উলুবেড়িয়া, বাগনান, বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, বর্ধমান, মেমারি, নবদ্বীপ থেকে প্রচুর বাস রয়েছে ঘন্টায় ঘন্টায়, যাগুলো সরাসরি কামারপুকুরে পৌঁছে দেবে আপনাকে। সেখান থেকে অহরহ টোটো পাওয়া যায় পিকনিক স্পটে পৌঁছাবার জন্য। 

সকালে পাকোড়া আর চা/কপি, ব্যাস। এর বেশী খেলে মধ্যহ্নভোজে, পাকস্থলী আহত হতে পারে খাসির মাংসকে যথাযথ স্থান না দিতে পেরে। এরপর তুমুল আড্ডার ফাঁকে ততক্ষণে সাদা ভাত, সোনা মুগের ডাল, ঝুড়ি আলুভাজা, বাঁধাকপি দিয়ে মটরশুটির ঘন্ট, চাটনি, পাঁপড় আর রাজভোগ- পাতের সৌন্দর্য বর্ধন করার জন্য এগুলো প্রস্তুত হয়ে যাবে কষা কষা ঝাল ঝাল খাসির মাংসের সাথে। পার্কের এ্যান্ট্রি ফি, পিকনিক স্পটের ভাড়া, হাঁড়িকুড়ি ভাড়া, খাওয়ার প্লেট গ্লাস, রান্নার গ্যাস, বোতল বন্দি পানীয় জল, মাংস, মসলা, চাল সবজি, ঠাকুর চাকর, ইত্যাদি সব মিলিয়ে মাথাপিছু মাত্র ৬০০ টাকা করে চাঁদা ধার্য্য করেছি। ১০ বছরের নিচের বাচ্চা কমপ্লিমেন্টারি, তার উপরে আমরা সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক। এই হলো দেনাপাওনার গল্প।

আমাদের আয়োজন ৫০ জনের অধিক নয়, ৪০ এর আশেপাশে হলে সবথেকে ভালো। অধিক ভিড়ে আলাপের মাদকতা নষ্ট হয়, তাছাড়া আয়োজনেও কিছুটা অপারগতা রয়েছে। তাই আপনাকে নিয়েই যদি সংখ্যাটা পূরণ হয়ে যায়, তার চেয়ে ভালো আর কিচ্ছুটি হয়না। তাহলে, আসছেন নাকি আগামী ২১শে ডিসেম্বর ২০২৫ এর দুপুরে গড় মন্দারণে? কিছুটা ইতিহাস, কিছুটা আধ্যাত্মিকতা, কিছুটা সাহিত্যের গন্ধ গায়ে মেখে, অকপট চড়ুইভাতির নামে আসবেন নাকি একটা দিনের অবসরে?


রবিবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৫

একাদশে অকপট


 


কথা কও, কথা কও।

অনাদি অতীত, অনন্ত রাতে

কেন বসে চেয়ে রও?

কথা কও, কথা কও”

বাঙালি মানুষ, কবিগুরুকে পাশ কাটিয়ে কোনো কিছুর উদযাপন করবে এমন ভয়াবহ ও অসম্ভবতম দুঃস্বপ্ন কোনো শিক্ষিত বাঙালিই দেখতে পারে না। অকপট, দিনের শেষে শত তর্ক-বিতর্ক, রাজনীতি-সমাজনীতি, আড্ডা-মন্তাজ, দেশীয়-আন্তর্জাতিক, খেলা-তামাশা ইত্যাদির মাঝে সাহিত্যকে ভালোবেসে এর চর্চা করে যাওয়াটাকেই মূল পরিচয় হিসাবে আঁকড়ে ধরে বেড়ে উঠেছে জন্মলগ্নকাল থেকে।

সুতরাং কবিগুরুর চরণস্পর্শ না করে এই পথের পথিক হওয়া গেলেও টিকে থাকা যায় না। তা সে যাই হোক- এরপর সময়ের চাকা দ্রুত ঘুরেছে, আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হরেক দোলাচলের মাঝে, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টিয়ে স্মৃতিগুলো অবগুণ্ঠনের জট পাকিয়ে বুকের অতল গভীরে সেঁধিয়ে গেছে, কিন্তু তারা এতোটা দূরেও যায় নি যে- আত্মিক নাড়া দিলে তা ভোরের শিউলির মতো ঝরে পড়বে না। তাইতো কবিগুরুর লাইন ধার করে মনে করিয়ে দিই-

তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর,

যবে আমার জনম হবে ভোর

চলে যাব নবজীবন-লোকে,

নূতন দেখা জাগবে আমার চোখে,

নবীন হয়ে নূতন সে আলোকে

পরব তব নবমিলন-ডোর

তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর”

স্মৃতিগুলোকে ফিরে পাওয়া, ফিরে দেখা, সাম্প্রতিক সমসাময়িকালের সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশায় বিতর্কের আয়োজনে বসা মিলন মেলার মানচিত্রে 'অকপট' আসলে একটা ঐতিহ্যবাহী মেলবন্ধন- নবীন ও প্রবীণ কিছু মানুষের মাঝে, যে মেলবন্ধন আয়োজন করে মাত্র ৪২টা রেলের কনফার্ম টিকিটে ৫২জনের একটা দলের প্রফুল্লতামাখা যাত্রাপথ, যার কোথাও কোনও অভিযোগ নেই; অকপট মানে সেই ফেলে আসা দিন, ফেলে আসা শৈশবের সরলতা মাখা বন্ধুত্ব- যাকে চাওয়া ও পাওয়ার মাপকাঠিতে পরিমাপ করা যায় না। আজকাল তো আর কেউ জিজ্ঞাসাও করেনা কোথায় গেট্টু করতে যাওয়া হচ্ছে, যাব বললেই সবাই রেডি। বহু ক্ষেত্রেই পৌঁছে যাবার পর শুধায়- এটাই কি আমাদের গন্তব্য ছিল! আসলে এটা ভরষা, এটা ভালবাসা একে অপরের প্রতি, এটাই অকপট। গুরুদেবের ভাষায় অকপট মানে-

নাই, নাই, কিছু নাই, শুধু অম্বেষণ--

নীলিমা লইতে চাই আকাশ ছাঁকিয়া

কাছে গেলে রূপ কোথা করে পলায়ন,

দেহ শুধু হাতে আসে-- শ্রান্ত করে হিয়া”

অকপট শিক্ষা দেয় নতুন করে পুরাতনকে জানার, নিত্য অন্বেষণের। ইতিহাসের গলি বেয়ে ভবিষ্যতের ওয়ারর্মহোল আবিষ্কারের যৌথ খামার। ক্ষুদ্রজীবনে বিরামহীন যে খোঁজ- তার মাঝেই আমার আমিকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। অকপট অন্বেষণের মোক্ষ তো তখনই, যখন কেউ নিজেকে উপলব্ধি করতে পারে এককভাবে এই বিশ্বচরাচরে

জন্মজয়ন্তীর উৎসব পালনে দৃষ্টিগোচর বাঁধ ভাঙা উল্লাসের পুনরাবৃত্তি এবারে হয়নি আনুষ্ঠানিকতার বাগড়ম্বরা সহ, কিন্তু অকপটের যে মূল চালিকা শক্তি তা হলো- সম্পর্কের বন্ধন; পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস। অকপটের যে প্রত্যয় তা আসলে সম্পর্কের সংস্কৃতিতে উচ্চমর্যাদা দিয়ে, সেই কৃষ্টিকে পারিবারিকভাবে হৃদয়ে লালন করার মাধ্যমে, এর জন্য কে কোথায় ভৌগলিকভাবে অবস্থান করছে তার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দেয়- আমার হৃ্দয়ে তাকে বা তাদের আসন দিতে পেরেছি কিনা! এভাবেই রাত্রি দেড়টার সময় হিমালয়ের পাদদেশে, ৩ ডিগ্রি শীতল আবহাওয়াতে বিনা নুনের বিরিয়ানিও অমৃতের স্বাদে ধরা দেয় অকপটুদের কাছে, আসলে এটা কোনো একক প্রচেষ্টার সফলতা নয়, দলগতভাবে আমিত্বের বিসর্জন দিয়ে আমরা হয়ে উঠার নামই 'অকপট'তাই তো কবিগুরু লিখেছেন-

মুক্ত করো হে মুক্ত করো আমারে,

তোমার নিবিড় নীরব উদার

অনন্ত আঁধারে

নীরব রাত্রে হারাইয়া বাক্

বাহির আমার বাহিরে মিশাক,

দেখা দিক মম অন্তরতম

অখণ্ড আকারে”

'অকপট' মানে তো নস্টালজিয়া, যেখানে হারিয়ে যায় উত্তর ও দক্ষিণের ভেদাভেদ, মুছে যায় পূর্ব-পশ্চিমের সীমানা। অবসরপ্রাপ্ত সম্মানীয় সদস্যেরাও অনায়াসে পাল্লা দেয় সদ্য যুবকের সাথে, আসলে বয়স এখানে কেবলই একটা ধ্রুবক মাত্র, অকপট আসলে একটা নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়, যেখানে আমরাই আমাদের শিক্ষক, আবার সকলেই মনোযোগী শিক্ষার্থী।

যে যেভাবে পারে খুঁজে ফেরে জীবনের একান্ত স্বাদটুকু, অকপট ‘ডেকার্স লেনের’ ব্যস্ত ফুটপাতের একটা ছোট্ট কাউন্টার স্বরূপ। এখানে খাবারের নামে আদর পরিবেশনা করা হয়, বিনিময়ে ঘৃণা দিলে অগ্নিবর্ষণ করতে পিছুপা হয় না কেউ- এটাই 'অকপট'যারা মানিয়ে নিতে পারেনা, তারা হয় সাথে পথচলা থামিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়, কেউ বা কক্ষ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। ইতিউতি আলাপচারিতায় ভেসে বেড়ায় অকপটের সমাপ্তিকাব্য। যখনই এমন কিছু শ্রুতিগোচর হয়, মনে পড়ে যায় কবিগুরুর অমোঘ সৃষ্টি-

শেষের মধ্যে অশেষ আছে,

এই কথাটি মনে

আজকে আমার গানের শেষে`

জাগছে ক্ষণে ক্ষণে

সুর গিয়েছে থেমে তবু

থামতে যেন চায় না কভু,

নীরবতায় বাজছে বীণা

বিনা প্রয়োজনে”

আসলে শেষের যে শেষ নেই এটাই তো অকপটের ধমনীর মূল তন্ত্র, ব্যস্ত জীবনের মাঝে ঝরে পড়া শিউলির গন্ধ নিয়ে মাতোয়ারা হতে অকপটের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ঠিকানা আর কিই বা হতে পারে, এখানে জীবন আছে, তাই তো বিচ্ছেদ আছে, অভিমান আছে, বিষাদ আছে, প্রেম আছে, পরিণয় আছে, আছে কত শত অপত্য, রয়েছে মিলনান্তক-বিয়োগান্তক কতই না অধ্যায়, আসলে ব্যক্তিপরিসর যেখানে দলে এসে মিশে যায় তখন তাকে ‘অকপট’ ডাকনামে ডাকা হয়।

চলার পথে দিন যাপনের নানা ধরণের গ্লানির পলি জমে জমে অকপটের ভিত মজবুত না হলে, জনসেবার নামে লক্ষ লক্ষ টাকার সংস্থান করা সম্ভব হতো না, কৈশোরের অকপট সেই স্মৃতির ভারে তলিয়ে না গিয়ে তাকে ভর করেই নতুন উচ্চতায় উঠে এসেছে, মাথা তুলেছে নতুন ভোরের স্বপ্নে। অতিক্রান্ত ঋতুপর্যায়ে শীতের শেষে নব বসন্তের দখিনা হওয়ার সাথে অকপট প্রতিদিন চোখ মেলে পৃথিবীর পানে নতুন প্রত্যাশাতে। মনে পড়ে যায় কবিগুরুর লেখনী-

মনে করি এইখানে শেষ

কোথা বা হয় শেষ

আবার তোমার সভা থেকে

আসে যে আদেশ

নূতন গানে নূতন রাগে

নূতন করে হৃদয় জাগে,

সুরের পথে কোথা যে যাই

না পাই সে উদ্দেশ”

'অকপট' মানে তো নতুনকে গড়ে তোলার স্বপ্নকে লালন করা, পথ ভিন্ন হতেই পারে, মতের অমিল হতেই পারে কিন্তু অকপট শেখায় গন্তব্য যখন একটিই তখন সকল বৈরিতাকে একটি খোলসের মাঝে আবৃত রেখে যদি আমরা সাথে সাথে পথ চলি তাহলেই তো প্রাণে সমৃদ্ধি আসে জীবনীশক্তিতে- আর এই প্রাণশক্তিটার নামই তো আসলে অকপটতা। অকপট ভীরুতা, কাপুরুষতাকে প্রশ্রয় দেয় না, কিন্তু অশ্লীলতাকে কঠোর ভাবে দমন করার প্রেরণা দেয়, ক্ষমতার চোখে চোখ রাখতে শেখায়। দাসত্ব, অন্ধত্বের গরল থেকে স্বতন্ত্রতার গরিমার পথের প্রতিটি যাত্রীই আসলে একজন অকপটুএকাদশের অকপট আজ সত্যিকারের একটা ক্রিকেট/ফুটবলের টিম হয়েছে- বয়স নামের সংখ্যার নিরিখে।

ওজোনের চাদর যেমন ঢেকে রাখে প্রকৃতির শুদ্ধতাকে, অকপটের শ্রেষ্ঠ সদস্যেরা পরিচালক রূপে অকপটের সেবা করে চলেছে প্রতিনিয়ত। বিদ্বেষ, হীনতা, স্বার্থপরতা, মিথ্যাচারের উত্তুরে হাওয়া যখন মুহূর্তে কাঁপন ছড়িয়ে দেয় শিরা-উপশিরায়, শক্ত হাতে তাঁরা পাল সামলে অকপট নামের ডিঙিকে ভাসিয়ে রাখে এই মহাসমুদ্রে।

আজকে ‘একাদশে অকপট’ অকপটজয়ন্তী উৎসবের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন, দেশ ব্যাপী স্বৈরাচারের করাল থাবা রোগের মত সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। সর্বগ্রাসী চোরের দল রাজনৈতিক ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ, ক্লীব ও মানসিক পঙ্গুত্বে ভোগা একদল মানসিক বৃদ্ধ বিরোধীর ভূমিকাতে হামাগুড়ি দিচ্ছে। সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া দেউলিয়া রাজনীতির নগ্নতা, অপরিকল্পিত রাষ্ট্রব্যবস্থা, অতি দক্ষিনপন্থী পুঁজিবাদী হায়েনার ক্যানাইন, সাম্রাজ্যবাদীদের যুদ্ধের দামামার সাথে সর্বগ্রাসী কর্পোরেটের ক্ষিদের সাথে যুঝতে গিয়ে আমরা সকলেই রণক্লান্ত, আমাদের হৃদয়ের উষ্ণতা হারিয়ে গেছে সামান্য খিদের চাহিদা মেটাতে। মিথ্যা প্রচারের অনন্ত শীতলতায় ঢেকে যাওয়া সমাজের বুকে একটুকরো রোদ হয়ে বুকের ভিটেতে একটুখানি ওম পৌঁছে দেওয়ার নামই অকপটতা। এ উষ্ণতায় কোনো ভেদাভেদ নেই, আছে মিলন পিয়াসী শুধু সুখ, আর ভাগ করে নেওয়া সুখানুভূতি।

সামাজিক বৈষম্য, জাত, ধর্ম, বর্ণ কিছুই অকপটের বাধা হতে পারে না, আর যেখানে এই বন্ধন আছে তা কখনও অকপট হতে পারে না। তাইতো কবিগুরু বলে গেছেন-

ললাটে দিয়েছে চিহ্ন ‘তুমি আমাদের চেনা' বলে

খসে পড়ে গিয়েছিল কখন পরের ছদ্মবেশ;

দেখা দিয়েছিল তাই অন্তরের নিত্য যে মানুষ;

অভাবিত পরিচয়ে

আনন্দের বাঁধ দিল খুলে

ধরিনু চিনের নাম, পরিনু চিনের বেশবাস

এ কথা বুঝিনু মনে,

যেখানেই বন্ধু পাই সেখানেই নবজন্ম ঘটে

আনে সে প্রাণের অপূর্বতা”

আর এই প্রাণের অপূর্বতা আছেই বলেই কখনও একঘেঁয়েমি গ্রাস করে না অকপটকে, অকপট কঠোর কিন্তু স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, ব্যক্তিত্ববোধের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের সহায়ক, মোহনীয় মানবিক গুণের পৃষ্ঠপোষক। অকপট বর্তমানে বাঁচে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে এঁকে, কিন্তু নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে বর্তমানের অকপটুদের সাথে ভাগ করে নিয়ে স্মৃতিময় করে তোলে বর্তমানকে, আগামীর জন্য।

অকপট মানে তো সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের উজ্জ্বল্যের গান, স্মৃতিচারণা কেবলই একটা পথ নির্দেশনা মাত্র- সমাজের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত অকপটুদের সাথে নিশ্চিন্তে বেড়ে উঠে নব প্রজন্ম, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে প্রেরণা নিয়ে বস্তু জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারার নামই অকপট অনুশীলন। স্মৃতিধন্য বর্তমান প্রজন্মই পারে আগামীর স্বপ্ন পূরণে আন্তরিকতার অভিব্যক্তিময় পরম্পরা চালিয়ে যেতে। অকপট জানে কবিগুরুর এই কবিতাখানি-

সমুখে শান্তিপারাবার,

ভাসাও তরণী হে কর্ণধার

তুমি হবে চিরসাথি,

লও লও হে ক্রোড় পাতি,

অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি ধ্রুবতারকার”

অকপট সদা সর্বদা একটি অকৃত্রিম সংস্করণ, এখানে থাকা মানেই মনের স্ফূর্তি। সংসার-জীবনের কৃত্রিমতার বাধা পেরিয়ে সবাই নিজেকে হালকা করতে অকপট হওয়া, যেখানে কোনো অভিনয় থাকে না। নিজেকে খোলস থেকে বের করে আনার একটা প্রক্রিয়ার নাম 'অকপট'অকপট আসলে অনেক নাম, হরেক চেহারা, ভিন্ন ভিন্ন চঞ্চলতা, অপ্রতুল হর্ষ, অনিঃশেষ পরিতৃপ্তি ঘিরে ভিড় করে থাকা মানুষের দল। তাদের সামঞ্জস্যই হলো তাদের তারতম্যতায়, যেখানে রঙ, রূপ, বর্ণ, গন্ধ সবেতেতেই আছে দৃষ্টান্তমূলক ভিন্নতা; তা সত্ত্বেও প্রত্যেকের উজ্জ্বলতা ও আত্মার পরিশুদ্ধতা একইরকম দীপ্তিময়। একে বিচ্ছিন্ন করে এমন সাধ্যি কার!

কথিত আছে- ‘বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’; কিন্তু অকপট একটা ভার্চুয়াল মাধ্যম হয়েও এর মানে হলো- বিগলিত আবেগের বারিধারা। জীবিকার তাগিদে যতই যান্ত্রিকতায়- বস্তুজীবনের মানবিকতা পথ হারিয়ে ফেলুক, অন্তরের আবেগ কখনও ফুরিয়ে যায় না, আর এই আবেগকেই পুঁজি করে যারা বাসা বেঁধেছে, তাদের সেই বাসার নামই যে 'অকপট'নিরন্তর সংগ্রামে লিপ্ত সকলেই এক সমান্তরালে এসে পূর্ণ করে তুলেছে শ্রদ্ধা ও স্নেহের অপূর্ব এক মেলবন্ধনে। এমনই কোনো জন্মদিনের অবসরে কবিগুরু বলে গেছেন-


আজি এই জন্মদিনে

দূরের পথিক সেই তাহারি শুনিনু পদক্ষেপ

নির্জন সমুদ্রতীর হতে”

চোখ আমাদের সামনের দিকে হলেও আমরা দেখতে পায় কেবলমাত্র পিছনের অতীতকে, সেই নির্লোভ, নির্ভেজাল, নিষ্কলুষ শৈশবের কাছে বাঁধা আছে আমাদের প্রাণভোমরা। যাকে আক্ষরিকভাবে ছোঁয়া যায় না ঠিকই, তাই তো অকপট নামের এমন মঞ্চের প্রবর্তনা। অসীম আকুলতা মহাকালের পথ দিয়ে আমরা জীবনের সেই চরম সত্যের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে যায়- ‘সময় কখনও ফিরবার নয়’। তবুও মনের জানালা খুলে দিলে অকপট সমাজ আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় মূর্তিমান হয়ে। তাই তো কবিগুরু প্রশ্ন করেছেন-

তোমার গেছে যে দিন সে কি একেবারেই গেছে? কিছুই কি নেই বাকি?

বিড়বিড় করতে করতে মন বলে উঠে- ‘রাতের সব তারা-ই আছে দিনের আলোর গভীরে’

কবি শঙ্খ ঘোষের একটি লাইন দিকে আমি নিজেকে অকপটের সাথে সম্পর্ক সম্পৃক্ত করতে পারি আজকের ন্যাংটা সমাজে, যেখানে আমার যা কিছু আছে সবটাই আসলে অকপটের জন্য- তাই তো এই কবিতাটা ‘আমি ও অকপটের’ মাঝে যোগসূত্র স্বরূপ


আমার জন্য একটুখানি কবর খোঁড়ো সর্বসহা

লজ্জা লুকোই কাঁচা মাটির তলে --

গোপন রক্ত যা-কিছুটুক আছে আমার শরীরে, তার

সবটুকুতে শস্য যেন ফলে”

শুভ জন্মবার্ষিকী 'অকপট', পায়ে পায়ে এই পথ চলা শতাব্দীর প্রাচীরকে ভেদ করে কালের গর্ভে যাত্রা করুক এটাই তো অকপট কামনা

শেষে বলি, কবিগুরু যেন অকপটের জন্যই এমন একটা কবিতা এঁকেছিলেন বোধহয়- একে ছাড়া যেন এই আত্মচর্চাটাই অসম্পুর্ণ-

 

সীমার মাঝে, অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর

আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর

কত বর্ণে কত গন্ধে, কত গানে কত ছন্দে,

অরূপ তোমার রূপের লীলায় জাগে হৃদয়পুর

আমার মধ্যে তোমার শোভা এমন সুমধুর

তোমায় আমায় মিলন হলে সকলি যায় খুলে--

বিশ্বসাগর ঢেউ খেলায়ে উঠে তখন দুলে

তোমার আলোয় নাই তো ছায়া, আমার মাঝে পায় সে কায়া,

হয় সে আমার অশ্রুজলে সুন্দরবিধুর

আমার মধ্যে তোমার শোভা এমন সুমধুর”


-চরৈবেতি



রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২১

অকপট চড়ুইভাতি ২০২১



সম্পূর্ণ সিডিউল

শেষ কয়েক বছরের পরম্পরা মেনে করোনাকাল-২০২০ সালে অকপট চড়ুইভাতির আয়োজন করতে পারেনি টিম ‘অকপট’। ২০২১ এর শুরুর লগ্নে যখন প্রায় সকল কিছু আবার ছন্দে ফিরেছে, অকপটও সেই তালে পা মিলিয়ে কিছুটা মুক্তির স্বাদ পেতে মরিয়া।

অকপট চড়ুইভাতি মানে- শুধুই তো আর খাওয়াদাওয়া নয়, বরং এটা বাৎসরিক পারিবারিক মিলনোৎসব। অকপটুরা নিজ নিজ পরিবারের সাথে ৩টে দিন একসাথে থেকে, ভ্রমণ করে নিজেদের হৃদয়ের উষ্ণতা ভাগ করে নেয় এমন একটা সম্মিলনীতে। এটাকে যেমন শুধুই পিকনিক বলা যায়না তেমনই একে শুকনো ভ্রমন ও বলা চলেনা, এ আসলে অকপট চড়ুইভতি, এখানে ভ্রমণ ও চড়ুইভাতির সম্মিলনী ঘটে অন্তরের টানে।

এ বছর আমাদের যাত্রা শুরু হচ্ছে আগামী ২৯শে জানুয়ারি শুক্রবার, ২০২১। ঠেক- গিধনি।

গিধনি, এটি হল পশ্চিবঙ্গের অন্তিম রেলস্টেশন। মাইলের পর মাইল খাঁ খাঁ ঢাড় জমির ওপর দিয়ে হুমহাম শব্দে তীর ধনুক নিয়ে এখান দিয়েই শিকারে যেত আদিবাসীরা, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। বাজার দোকান সবই এই শেষ কয়েক দশকের দান, একটা সময় ড্যাঞ্চি বাবুদের চেঞ্জে আসার নিশ্চিন্ত আস্তানা ছিল এই গিধনি। লাল মোটা ধানের ভাত আর স্থানীয় বুনো কপির তরকারি দিয়ে হাউহাউ করে গোগ্রাসে গিলতো- পাথুরে হজমি জল পেটে পড়তেই। সপ্তাহান্তের হাট থেকে আনা মাছ কিংবা বনমুরগি দিয়ে স্বল্প মশলার আমিষান্ন- সে এক পরম সুখের দিন ছিল।

সেই গিধনি আজ জমজমাট মফঃস্বল। বেশ বড় বাজার, টোটো গাড়ির ভিড়ের সন্ধ্যা যেন জনঅরণ্য। কিন্তু লোকালয় ছেড়ে দু’পা এগিয়ে গেলেই শ্যামল গ্রাম, উঁচুনিচু মাঠ, তেপান্তরের সীমা অবধি ছড়িয়ে থাকা পাথুরে জমির বুকে সারি সারি তাল আর খেজুরের সারি; আরো দূরে মহুয়া, শাল, পিয়াল, সোনাঝুরি, শিরিষ, ইউক্যালিপটাসের সবুজের সমারোহ- আর নাম না জানা ছোট্ট নদীর তিরতিরিয়ে বয়ে যাওয়া- হাজার বছর আগেও যেমন ছিল, আজও তেমনই রয়েছে- হয়ত অবিকল। মস্ত দীঘি ভরা শালুক ফুলেল জলে স্নানরত ছেলেপুলের দল।

রওনা- ২৯শে জানুয়ারি, শুক্রবার, ২০২১। সন্ধ্যা ৫টা ৩০ মিনিটে হাওড়া স্টেশন থেকে রওনা হওয়া “12813 - স্টিল এক্সপ্রেসে” চড়ে বসবে অকপট পরিবার- যারা উত্তরবঙ্গ, মধ্যবঙ্গ ও কলিকাতা সংলগ্ন অঞ্চল থেকে আসবেন। রাত্রি ৭টা ৫৫ মিনিট নাগাদ ট্রেনটি আমাদের নামিয়ে দেবে ঝাড়গ্রাম স্টেশনে, সেখানে ‘অকপটের টিম বাস’ অকপটুদের রিসিভ করে ‘গিধনি’র নৈশ আবাসের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাবে। সেদিন রাত্রে দুটো মরশুমি সব্জির তরকারির সাথে মুরগির মাংসের পাতলা ঝোল দিয়ে দুটি ভাত খেয়ে গল্পগাছা করতে করতে ঘুমের দেশের পাড়ি দেওয়া হবে ক্লান্ত শরীরে।

সকল পুরুষদের জন্য এক বা একাধিক স্থানের বন্দোবস্ত থাকবে, যেখানে পর্যাপ্ত টয়লেট ফেসিলিটির সাথে, পরিচ্ছন্ন বালিশ, বিছানা, বিছানার চাদর, কম্বল, তোষক ইত্যাদি যথেষ্ট পরিমাণ মজুত থাকবে শীত নিবারণের প্রয়োজনে। মহিলা ও শিশুদের রাত্রিনিবাসের স্থানটি এলাকার অন্যতম সুরক্ষিত স্থানে করা হয়েছে, যেখানে উপরোক্ত পরিমাণে শীতবস্ত্র, বিছানা কম্বল ও পর্যাপ্ত বাথরুম থাকবে।

৩০শে জানুয়ারি, শনিবার, ২০২১। এটি আমাদের ভ্রমণ দিবস। সকালে প্রাত্যহিক কর্ম সম্পাদন করে প্রস্তুত হওয়া মাত্রই, জলখাবারের ব্যবস্থা থাকবে। যেখানে, পুরী-সব্জি, ইডলি-সাম্বর, ধোসা-বড়া-সাম্বর ইত্যাদি বিকল্প ধরনের প্রাতঃরাশের ঢালাও ব্যবস্থাপনা থাকবে।

এরপর আমাদের টিমবাস বেড়িয়ে পড়বে বাংলার জঙ্গলরানী জামবনী ব্লকের উদ্দেশ্যে। সেখানে তিরতির করে বয়ে চলা ড়ুলং নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে মহারাজা গোপীনাথ সিংহের তৈরি- ঐতিহাসিক ‘চুয়াড় বিদ্রোহের’ সাক্ষী বহন করে চলা ‘চিল্কিগড় রাজবাড়ী’ প্রাঙ্গণ। বৃহৎ তোরণ দ্বার পেরিয়ে গবুজ ঘাসের গালিচা বেছানো পথে উন্মুক্ত প্রান্তরের বামদিকে সুপ্রাচীন অশ্বত্থ গাছ আপনাকে সেই ১৭৬৯ সালের গল্প শোনাবে ফিসফিসিয়ে। অদূরে মন্দির, পরিত্যাক্ত কর্মীআবাস, আউটহাউসকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে আছে রাজপ্রাসাদের মূল অংশ। অপুর্ব সুন্দর মনোরম পরিবেশে কিছুক্ষণ থিতু হয়েই আমরা রওনা দেব অদূরের কনকদুর্গা মন্দিরের উদ্দেশ্যে।

মালভূমির উপর দিয়ে বয়ে চলা নামটির মত জলতরঙ্গ খেলিয়ে বয়ে চলা নদী ডুলং। কিছুটা জঙ্গলে ঢাকা কংক্রিটের পথ পেরিয়ে যেতে হবে মন্দিরে, এই জঙ্গলটির নাম ভূষণ। সরকারি হিসাবে প্রায় ৪৩৩ ধরনের বিরল উদ্ভিদের দেখা মেলে এই জঙ্গলে, যার অনেকগুলিই ভেষজ হিসাবে দুষ্প্রাপ্য। নিম, বাবলা, বাঁদরলাঠি, অর্জুন, শিরীষ, গুলঞ্চ, পিপুল, সঞ্জীবনী সহ কতধরনের অজানা বনানীর যে সমাহার রয়েছে তার গণনা করা ভীষণ কঠিন। হরেক ফুল, প্রজাপতি, বাঁদর আর পাখীর ডাকের আলোআঁধারি পরিবেশটাই যেন শতাব্দী প্রাচীন মন্দির চত্বরটিকে একটা আশ্রমের মেজাজ দিয়েছে। কিছুটা এবড়োখেবড়ো পথ অতিক্রম করে পৌঁছাতে হবে মিষ্টি ডুলং নদীর পাড়ঘেষা কনকদুর্গা মন্দির চত্বরের জঙ্গলটিতে। মন্দির সংলগ্ন অঞ্চল ভ্রমণ শেষে আমরা রওনা দেব গদরাশোল গ্রামের উদ্দেশ্যে, এটি আদিম উপজাতি লোধা ও শবরদের গ্রাম, দেখে নিতে পারব আমাদের আদিম ভারতের জনজাতির নিজস্ব সংস্কৃতি।

ততক্ষণে বেলা অনেকটাই হয়ে গেছে, কিন্তু কুছ পরোয়া নেহি। গদরাশোল হাটচালাতে আমাদের মধ্যাহ্নভজন পৌঁছে যাবে অন্য গাড়িতে, ‘ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন’। ভরপেট খেয়ে দেয়ে আমরা বাসে বিশ্রাম করতে করতে রওনা দেব ২৭ কিমি দক্ষিণে সুবর্নরেখা নদীর তীরবর্তী গোপীবল্লভপুর ইকোপার্কের উদ্দেশ্যে। প্রসঙ্গত, এই ভ্রমণে পার্কের এন্ট্রি ফি, বা কেউ যদি কোনো রাইড (নৌকা বা প্যাডেল বোট) নিতে চায় সেক্ষেত্রে খরচা অতিরিক্ত ও ব্যাক্তিগত।

চোখজোড়ানো মনভোলানো উদ্যানটি ঘুরে ফিরে দেখে নিয়ে রওনা দেব ‘ঝিল্লি পাখিরালয়’ এর উদ্দেশ্যে। ঘন প্রাকৃতিক জঙ্গলের মাঝে এক অপূর্ব মনোরম সরোবরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ঝিল্লি পাখিরালয়, যা মূলত পরিযায়ী পাখীদের নিশ্চিন্ত শীতকালীন আবাসস্থল। উড়ে বেড়ানো বান্টিকের ঝাঁকের সাথে দেখা মিলবে চাঁদি ঠোঁট, বালি হাঁস, নিরল পরিনা, নীলকণ্ঠী ফিদ্দা, চুনী কন্ঠী, শিলাফিদ্দা, ছোট সারস, ছোটন ভোমরা, ভরত পাখী কিম্বা হরেক ক্যামফ্লেজে আপনাকে টুকি দেওয়া মুনিয়ার ঝাঁক। এই পাখিরা এখানে খাদ্য আহরন করে, বাসা বাঁধে এবং ছানা ফুটিয়ে বড় করে; অতঃপর শীতকাল কাটিয়ে বসন্তে আবার উত্তরে উড়ান দেয়। পর্যটকদের জন্য ঝিলের একপাড়ে বেশ সাজানো গোছানো ছোট্ট পার্ক মতন করা রয়েছে। সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা পাড়ি দেব আমাদের রাত্রিযাপনের স্থান গিধনির উদ্দেশ্যে, কিন্তু তার আগে আমরা একবার ঢুঁ মেরে নেব ‘হাতিবাড়ি অরণ্যের’ মাঝে।

গ্রামছাড়া রাঙামাটির পথ পেরিয়ে প্রাকৃতিক শাল-পিয়ালের অরণ্যের মাঝখান দিয়ে, পটে আঁকা ছবির মত শান্ত স্নিগ্ধ বয়ে চলা সুবর্ণরেখা নদীর সাথে লুকোচুরি খেলার স্থানটির নামই হলো 'হাতিবাড়ি অরণ্য'। লাল বালির পাড় বেয়ে নেমে শান্ত স্থির সুবর্ণরেখার বুকে, অস্তগামী সুর্যকে সাক্ষী করে পানসীতে খানিকটা ভেসে বেড়াবার সুখের মত নৈসর্গিক সুখ কমই আছে বাংলার ভূমিতে। অবশেষে সুর্য যখন গাছপালার মাঝে অস্ত যাবে- আমাদের বাসও রওনা দেবে তখন।

সন্ধ্যায় ফিরে হাতমুখ ধুয়েই গরম কফির সাথে বেগুনী বা বিউলি ডালের বড়া দিয়ে নৈশভোজের ফিতে কাটা হবে। মহুলের জঙ্গল থেকে যখন হিম পড়ার আওয়াজ আসবে টিপিটুপটাপ করে, দূর হতে রেলগাড়ির হুইসেল ছাড়া কেবল মাত্র রাতচড়া পাখী আর ঝিঁঝিঁ পোকাদের কলতান শোনা যাবে তখনই আমাদের ‘ক্যাম্পফায়ার’ শুরু হবে। স্তূপীকৃত শুকনো কাঠের আগুনের ‘ওম’ নিতে নিতে, ‘ইয়েল’ এর নেতৃত্বে শুরু হওয়া আড্ডা, গান, খুনশুটির ছলে নিজেদের মাঝের বন্ধনকে মজবুত করে নেওয়ার পালা। সাথে থাকবে ঢালাও চিকেন পকোড়া আর উষ্ণ কফি। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে আগামীকালের জন্য প্রাণকে সতেজ রাখার তরে ক্যাম্পফায়ারের মত নির্মল চিত্তবিনোদনের কোনো বিকল্প নেই।

রাত্রি একটু গভীর হলে ডাইনিং হল থেকে ডাক আসবে পাচকের, জামবাটি ভরে উঠবে দিশি মুরগি কিম্বা হাঁসের মাংসের ঝোলে। আপনি যদি চালের আটার রুটি বিলাসী হন, তাহলে তো কথাই নেই, এদিন সেই ব্যবস্থাই থাকবে, আর নিতান্তই যদি ভেতো বাঙালী হন তাহলে গরম ভাত আর যাচ্ছে কোথায়, হাতে বেলা আটার রুটির সাথে সেও থাকবেই পাতে- যদি আপনি তা একান্তই বলে রাখেন আগে ভাগে। এর পর আর কী, ঘুমের দেশে পাড়ি দেওয়া…

৩১শে জানুয়ারি, রবিবার, ২০২১। এই দিনটি আমাদের বাৎসরিক চড়ুইভাতির দিন। যদি কোনো বন্ধু কেবলমাত্র এই দিনেই অংশগ্রহন করে চলে যেতে চান, তেমনটাও করতে পারেন।

এদিনও সকালটাও শুরু হবে গত দিনের মতই চা/কফি বিস্কুট দিয়ে। তার পরেই আমরা তৈরি হয়ে রওনা দেব গিধনি থেকে ৩২ কিমি দূরে বেলপাহাড়ি ব্লকের জঙ্গলঘেরা ‘আমলাশোল’ গ্রামে। হ্যাঁ, ২০০৪ সালের সেই আমলাশোল, যে সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছিল। এখানেই রয়েছে ‘খাড়ারানী সরোবর’, এবড়োখেবড়ো মেঠো আলপথ বেয়ে, এর বাড়ির উঠোন- তার বাড়ির গোয়ালের ছাঁচতলা দিয়ে পৌঁছাতে হবে এই সরবরের তীরে। তারপর?

আর কী, পরিস্কার ঝকঝকে মেঘমুক্ত আকাশ, সবুজ জঙ্গলময় টিলায় ঘেরা নীল জলের বিশাল জলাধার, যা মূলত বৃষ্টির জলে পুষ্ট। স্বচ্ছ, টলটলে সরোবরে একটি বাঁধ রয়েছে, বাঁধের লকগেট খুলে জল সরবরাহ হয় আশেপাশের গ্রামগুলিতে। বাঁধের উপরের সরু কংক্রিটের রাস্তার ওপারে যতদূর চোখ যায় শুধুই জঙ্গলে ঢাকা। নীলাকাশের নীচে সবুজ অনুচ্চ পাহাড়ে ঘেরা টলটলে কালো জলের বিশাল জলাধারের দৃশ্য এক কথায় অতুলনীয়।

দৃশ্য সুখের অপ্রার্থিব সুখ পুরোটা ঠিকমতো আত্মস্ত করার আগেই হালুইকর হাজির করবে গরম ফুলকো রাধাবল্লভি আর চানা মশালা, সাথে থাকবে ডিমসিদ্ধ আর সন্দেশের টুকরো। দ্রিমিদ্রিমি মাদলের তালের মত বয়ে চলা বাতাসের খেলে বেড়ানো- খঞ্জনা, শামুকখোল, দেশী বক, শ্যামসুন্দর, পানকৌড়ি, বেনে বৌ, মাছরাঙা বা কিম্ভূত ভাবে উড়তে থাকা সায়োলোরের খেলা দেখতে দেখতে বুঝে উঠার আগেই বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে যাবে যদি না কেউ ডেকে দেয় আপনাকে। এখানে কিছু পাখী নাচে, কিছু পাখী গায়, কেউ শান্ত তো কেউ চঞ্চল, কেউ ওৎ পেতে থাকে আবার কেউ স্বশব্দে নিজের উপস্থিতি জানান দেবে চড়কি কেটে।

জলখাবার খেতে খেতে, সরোবর, প্রকৃতি আর পাখীদের যুগলবন্দী দেখতে দেখতেই রওনা দেব ২ কিলোমিটার দূরের ছোট্ট একটা টিলা পাহাড়ের উদ্দেশ্যে- ‘গাদ্রাসিনি হিল’। যারা ট্রেকিং এর শখ রাখেন, তাদের জন্য এ যেন সব পেয়েছির দেশ। সোজা হয়ে আকাশ ছুঁতে চাওয়া লম্বা লম্বা পিয়াল-মহুলের গুঁড়ির ফাঁকে পাথুরে পথের উপরে বিছিয়ে থাকা শুকনো পাতাগুলোকে মচমচ শব্দে মাড়িয়ে যাওয়া সে এক অকৃত্রিম সুখানুভুতি রয়েছে। যদি পাহাড়ের উপরে পৌঁছে যান, তাহলে তো গোটা বেলপাহাড়ি অঞ্চলটাকে দেখে নিতে পারবেন ‘ঈগলের চোখের’ মতন, নিচে নিবিড় অরণ্য, তার অপরে আপনি আর মাথার উপরে শুধুই নীল আকাশ, কেউ কোত্থাও নেই। অদূরেই রয়েছে একটি প্রাকৃতিক আদিম গুহা, চাইলে যে কেউ সেটা চাক্ষুষ করতেই পারেন, সময়ে কুলালে।

পাহাড় থেকে নেমে এসেই আমাদের গন্তব্য অদূরেই ঝাড়খন্ড লাগোয়া ‘ঢাঙিকুসুম’ গ্রাম। গ্রামটির মানুষজনের মূল জীবিকাই হল পাথরের বাসনপত্র তৈরি করা। শহুরে বা সমতলের মানুষের কাছে বেশ খানিকটা কঠিন তথা ‘মিনি’ দুর্গম চড়াই উৎরাই পথ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় ‘হদহদি’ ঝর্নার সামনে। ঘন কালোছায়া বিশিষ্ট এই অরণ্যের মাঝেই ‘ছুঁচোর ডনবৈঠক’ শুরু হয়ে যাবে সকলের পেটে, অনভ্যস্ত পায়ে এতোটা হাঁটাহাঁটি করলে পেট বেচারার আর দোষ কিসের! এর মাঝে যদি পেট সাথ দেয় তাহলে ডুংরি ঝর্নাটাও একবার চোখের দেখা দেখে নেওয়া যেতেই পারে।

আবার খাড়ারানী সরোবরের তীরে যতক্ষণে ফিরে আসব, ততক্ষণে খাসির মাংসের সুগন্ধ জিভের স্বাদকোরক গুলোকে জাগ্রত করে ‘নিশির ডাকের’ মত পাতের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। সাদা ভাত, লেবু লবণ, ঝুড়ি আলুভাজা, নবরত্ন সব্জি, সোনা মুগের ডাল, আলুপোস্ত, খাসির মাংস কষা, চাটনি, পাঁপড় আর গুড়ের রসগোল্লা সহযোগে চেটেপুটে খাবারই তো দিন এটা।

গল্পগুজব করতে করতে এবার সরোবরকে টাটা বলার পালা, ফেরার পরে একবার ঢুঁ মেরে নেওয়া ‘ঘাগরা’ জলপ্রপাত। নামে জলপ্রপাত হলেও আসলে এটা একটা জলাবর্ত, হাজার হাজার বছর ধরে ছোটনাগপুরের কঠিন আগ্নেয় শিলাপাথরের উপর দিয়ে ‘তারাফেনি’ উপনদী তার পথ তৈরি করে নিয়েছে গভীরভাবে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দুপাড়ে ঘিরে থাকা জঙ্গল, ঝরে পড়া পাতা, কাঠবেড়ালীর ছুটোছুটি, পাখিদের ডাকের মাঝে লুকিয়ে থাকা রহস্যময়ী ঘাগরা, যেন প্রকৃতির ক্যানভাসে নদীর শিল্পকলা মাখা সৌন্দর্যের প্রতিমুর্তি।

নিস্তব্ধ চুপচাপ সুন্দর গ্রামে রাঙা মাটির পথ, সরষের ক্ষেত, আলপনা আঁকা লালমাটির ঘর, পরিশ্রমী জীবনযাযাত্রী বনবাসী, জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনা কাঠুরের দল, বিনোদনের জন্য মোড়গ লড়াই, নেশার জন্য হাঁড়িয়া,মহুয়া বা তাড়ীর রস, উঠোনে ধানের ছোট্ট গোলা সমৃদ্ধ অসম্ভব সুন্দর গ্রাম্যপরিবেশের এই জঙ্গলেই টেনিদা খ্যাত “চার মূর্তি” সিনেমার শুটিং হয়েছিল। গাদ্রাসিনি, খাড়ারাণী সরোবর, ঢাঙিকুসুম, ঘাঘরাকে কেন্দ্র করেই শেঠ ঢুন্ডুরাম সহ স্বামী ঘুটঘুটানন্দের দাড়ি উপড়ে ছিল টেনিদা সমেত প্যালা, হাবুল আর ক্যাবলার চারমুর্তি।

সুতরাং, খাঁড়ার মত নাক থাকুক বা নাইবা থাকুক, গড়ের মাঠে গোরা পেটানো শরীরও না থাকলে চলবে- কিন্তু গলা ছেড়ে ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো…” গাইতে হলে যে আসতে হবে অকপটের এই যাত্রায়, তবে না প্রাণ খুলে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠতে পারবেন “ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক”।

সন্ধ্যায় গিধনি ফিরে, চা জলখাবারের সাথে শুধুই মজলিশি আড্ডা। রাত্রে নৈশভোজে গরম ভাতের সাথে মটরসুটি দিয়ে মুগের ডাল, আলু ফুলকপি রসা, পাবদা মাছের ঝাল আর চাটনি দিয়ে উদরপুর্তি করার বন্দোবস্ত থাকবে। যারা মাছে আসক্ত নন, তাদের জন্য রইবে ‘কবিরাজি চিকেন কষা’। জ্যোৎস্নার আলোয় মোহময়তাকে পূর্নতা দেয় বুনো ফুলের সুগন্ধ, ততক্ষণ আড্ডা চলতেই থাকবে- যতক্ষননা, জ্যোৎস্নালোকে ধুয়ে যাওয়া আলোকিত জঙ্গলময় উপত্যকা বেয়ে ঘুমপরীরা ভর করবে চোখের পাতায় পাতায়।

১লা ফেব্রুয়ারি, রবিবার, ২০২১। এদিনটা একটু সকাল সকালই শুরু হবে। গত দুদিনের মতই চা বিস্কুট রুমে খেলেও, প্রাতঃরাশ সারা হবে বাসের মধ্যে- রুটি, কলা, ডিম সিদ্ধ আর সন্দেশ সহযোগে। ভাগ্যক্রমে যদি পথে লুচি আলুর দম পাওয়া যায় সেটাতেও কোনও মানা নেই।

সকালের নরম রোদে দেখে নেওয়া হবে ঝাড়গ্রামের ঐতিহ্যশালী রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ। বহু ঐতিহ্যমণ্ডিত ভাস্কর্য ও শিল্পকলায় নির্মিত ৩০ একর জুড়ে সুবিন্যস্ত সুবিশাল এই রাজপ্রাসাদ পশ্চিমবাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার মান সিংহের আমলে, ‘রাজপুত চৌহান’ রাজা সর্বেশ্বর সিংহের ব্যবস্থাপনায় এই স্থাপত্য ১৫৯২ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় মাল আদিবাসী রাজাদের পরাজিত করেছিলেন বলে এই প্রাসাদের শাসকরা “মল্লদেব” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। চুয়ার বিদ্রোহের পর ১৭৯৯ সালে প্রাসাদটি ব্রিটিশ কর্তৃত্বধর জমিদারী এস্টেটে পরিণত হয়েছিল। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে স্থানীয় মিউজিয়াম ও ডিয়ার পার্কে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বেলা ১১ টার মধ্যে মাছেভাতে/মাংসভাতে মধ্যাহ্নভোজন সাঙ্গ করা হবে ঝাড়গ্রামেরই কোনো বাঙালী ভোজনালয়ে।

এর পর আমাদের অরণ্যসুন্দরীকে বিদায় জানাবার পালা। শালের জঙ্গলের ভিতর লাল মাটির রাস্তা বেয়ে আমাদের বাস এগিয়ে চলবে খড়্গপুর রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে। পড়ে থাকবে সবুজে ঘেরা বনাঞ্চল, শান্তপুস্করিনি, কুলুকুলু ঝর্ণা, পিচঢালা সরু রাস্তার দুপাশের জঙ্গলের মাঝে রয়ে যাওয়া শান্ত গ্রামীণ পরিবেশ। ছোট্ট নদীগুলো তেমনই বইতে থাকবে যেমন ভাবে বয়ে চলেছে লক্ষ বছরের অভ্যাসে। স্কুল ফেরত দলবাঁধা বাচ্চার ফিরে যাবে তাদের নির্মল গ্রাম্য জীবনে। জানালার বাইরে ক্রমশই ফিকে হয়ে আসবে সবুজের সমারোহ, ফিরে আসবে নগরজীবনের দৈনন্দিনতার দোকানপাট ও বাস স্ট্যান্ড। রয়ে যাবে ঝাড়গ্রাম, জঙ্গলমহল, অরণ্যসুন্দরী- আমাদেরই মত অন্য কারোর প্রতীক্ষায়।
এই খড়গপুরেই আমাদের অকপট চড়ুইভাতি ২০২১ এর যাত্রার পরিসমাপ্তি দুপুর ২টোর মধ্যে, এখান থেকে যে যার নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা দেবে, বাসে ট্রেনে বা নিজ বাহনে।

গোটা এই ভ্রমণের জন্য আমাদের প্রতিজন প্রাপ্তবয়স্ক অকপটুর জন্য খরচা রাখা হয়েছে মাথা পিছু ২০০০/- টাকা (দুই হাজার মাত্র)। ২৯শে জানুয়ারি ২০২১ সন্ধ্যায় ঝাড়গ্রাম হতে রিসিভ করা থেকে- ১লা ফেব্রুয়ারী ২০২১ খড়্গপুরে ড্রপ করে দেওয়া অবধি (থাকা, খাওয়া ও পিকনিক) সমস্ত খরচা সহ ( পার্কের এন্ট্রি ফি অ রাইড খরচা বাদে)। ৫ বছরের নীচের সকল বাচ্চাদের খরচা বিনামূল্যে, ১০ বছর পর্যন্ত বাচ্চাদের খরচা মাথাপিছু ১০০০/- টাকা।

যারা শুধুমাত্র চড়ুইভাতিতে অর্থাৎ ৩১/০১/২০২১ তারিখ রবিবার উপস্থিত থাকতে চান, তারা সরাসরি বেলপাহাড়ি বাজার অবধি চলে আসতে পারেন, সেখানে আমাদের গাড়ি আপনাকে খাড়ারাণী সরোবর অবধি নিয়ে আসবে। এই দিনের জন্য খরচা ধরা হয়েছে মাথাপিছু ৫০০ টাকা মাত্র। ১০ বছর বয়সী বাচ্চাদের জন্য ৩০০ টাকা, ৫ বছর বয়সের নীচে সম্পূর্ন বিনামূল্যে। সেই রাত্রিতে থেকে গেলে তার জন্য অতিরিক্ত ২০০/- টাকা মাথাপিছু বেশি গুনতে হবে।

যারা এই অকপট ভ্রমণ তথা চড়ুইভাতিতে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী, তারা ২০ই জানুয়ারির মধ্যে অফেরৎযোগ্য ৫০০/- টাকা করে জমা করুন। কেন অফেরৎযোগ্য? কারন- হালুইকর, বাসভাড়া, একমডেশন সকল কিছুই আগে থেকে কনফার্ম করতে হবে পরিচালকদের, শেষ মুহুর্তে বাতিল করলে খাবার খরচা টুকুর বাইরে সকলকিছুরই পেমেন্ট করতেই হবে পরিচালকদের। যেহেতু অকপট চড়ুইভাতি কোনও ব্যবসায়িক স্বার্থে করা নয়, বরং সবচেয়ে কম খরচে উৎকৃষ্ট গুণমান দিতে অকপট দায়বদ্ধ কারন অকপটুদের নিজেদের পরিবার গুলোই থাকবে এখানে; সেহেতু কে অন্যের শেষ মুহুর্তের বাতিলের দায়ভার বহন করবে! তাই এই অফেরৎযোগ্য অগ্রিমের ব্যবস্থা।

২৬শে জানুয়ারি ২০২১ এর মধ্যে সম্পূর্ণ চাঁদা জমা করতে হবে আমাদের নির্দিষ্ট একাউন্টে, অন্যথায় সকল ব্যবস্থাপনা করা সম্ভবপর হবেনা। যারা শুধু চড়ুইভাতি বা বনভোজনের নির্দিষ্ট দিনেই আসবেন, তাকেও ২৬ তারিখের মধ্যেই ৫০০/- টাকা জমা করতে হবে। যারা হাওড়া থেকে ‘স্টিল এক্সপ্রেস’ ট্রেনে যাবেন টিম অকপটের সাথে দল বেঁধে, তাদের টিকিট আমরা স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে কাটিয়ে দেব, আপনি স্টেশনে পৌঁছে সেই স্বেচ্ছাসেবকের কাছে রিজার্ভেশন বাবদ প্রদেয় অর্থ নগদে মিটিয়ে দেবেন।

টাকা পাঠাবার ঠিকানাঃ
KINGSHUK HALDER
S B I, BEHALA BRANCH
A/C NO. 11170337153
IFSC SBIN0001522
MICR 700002115
UPI: hkingshuk-1@oksbi

তাহলে, আর কী! গেলে দেখা হবে হাওড়া ঝাড়গ্রামে। একসাথে গাওয়া যাবে ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো…” কিম্বা প্রাণ খুলে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠব “ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক”।

স্বাগতম।




সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২০

গুরুদেব ও অকপট

 

কথা কও, কথা কও।
অনাদি অতীত, অনন্ত রাতে
কেন বসে চেয়ে রও?
কথা কও, কথা কও”

বাঙালি মানুষ, কবিগুরুকে পাশ কাটিয়ে কোনো কিছুর উদযাপন করবে এমন ভয়াবহ ও অসম্ভবতম দুঃস্বপ্ন কোনো শিক্ষিত বাঙালিই দেখতে পারে না। অকপট, দিনের শেষে শত তর্ক-বিতর্ক, রাজনীতি-সমাজনীতি, আড্ডা-মন্তাজ, দেশীয়-আন্তর্জাতিক, খেলা-তামাশা ইত্যাদির মাঝে সাহিত্যকে ভালোবেসে এর চর্চা করে যাওয়াটাকেই মূল পরিচয় হিসাবে আঁকড়ে ধরে বেড়ে উঠেছে জন্মলগ্নকাল থেকে।

সুতরাং কবিগুরুর চরণস্পর্শ না করে এই পথের পথিক হওয়া গেলেও টিকে থাকা যায় না। তো সে যাই হোক- এরপর সময়ের চাকা দ্রুত ঘুরেছে, আশা-নিরাশা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হরেক দোলাচলের মাঝে, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টিয়ে স্মৃতিগুলো অবগুণ্ঠনের জট পাকিয়ে বুকের অতল গভীরে সেঁধিয়ে গেছে, কিন্তু তারা এতোটা দূরেও যায় নি যে- আত্মিক নাড়া দিলে তা ভোরের শিউলির মতো ঝরে পড়বে না। তাইতো কবিগুরুর লাইন ধার করে মনে করিয়ে দিই-

তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর,
যবে আমার জনম হবে ভোর
চলে যাব নবজীবন-লোকে,
নূতন দেখা জাগবে আমার চোখে,
নবীন হয়ে নূতন সে আলোকে
পরব তব নবমিলন-ডোর
তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর”

স্মৃতিগুলোকে ফিরে পাওয়া, ফিরে দেখা, সাম্প্রতিক সমসাময়িকালের সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশায় বিতর্কের আয়োজনে বসা মিলন মেলার মানচিত্রে 'অকপট' আসলে একটা ঐতিহ্যবাহী মেলবন্ধন- নবীন ও প্রবীণ কিছু মানুষের মাঝে, যে মেলবন্ধন আয়োজন করে মাত্র ৪২টা রেলের কনফার্ম টিকিটে ৫২জনের একটা দলের প্রফুল্লতামাখা যাত্রাপথ, যার কোথাও কোনও অভিযোগ নেই; অকপট মানে সেই ফেলে আসা দিন, ফেলে আসা শৈশবের সরলতা মাখা বন্ধুত্ব- যাকে চাওয়া ও পাওয়ার মাপকাঠিতে পরিমাপ করা যায় না। গুরুদেবের ভাষায় অকপট মানে-

নাই, নাই, কিছু নাই, শুধু অম্বেষণ--
নীলিমা লইতে চাই আকাশ ছাঁকিয়া
কাছে গেলে রূপ কোথা করে পলায়ন,
দেহ শুধু হাতে আসে-- শ্রান্ত করে হিয়া”

অকপট শিক্ষা দেয় নতুন করে পুরাতনকে জানার, নিত্য অন্বেষণের। ক্ষুদ্রজীবনে বিরামহীন যে খোঁজ- তার মাঝেই তো আমার আমিকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আর অকপট অন্বেষণের মোক্ষ তো তখনই, যখন কেউ নিজেকে উপলব্ধি করতে পারে এককভাবে এই বিশ্বচরাচরে

জন্মজয়ন্তীর উৎসব পালনে দৃষ্টিগোচর বাঁধ ভাঙা উল্লাসের পুনরাবৃত্তি এবারে হয়তো হয় নি আনুষ্ঠানিকতার বাগড়ম্বরা সহ, কিন্তু অকপটের যে মূল চালিকা শক্তি তা হলো- সম্পর্কের বন্ধন; পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস। অকপটের যে প্রত্যয় তা আসলে সম্পর্কের সংস্কৃতিতে উচ্চমর্যাদা দিয়ে সেই কৃষ্টিকে পারিবারিকভাবে হৃদয়ে লালন করার মাধ্যমে, এর জন্য কে কোথায় ভৌগলিকভাবে অবস্থান করছে তার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দেয়- আমার হৃ্দয়ে তাকে বা তাদের আসন দিতে পেরেছি কিনা। এভাবেই রাত্রি দেড়টার সময় হিমালয়ের পাদদেশে, ৩ ডিগ্রি শীতল আবহাওয়াতে বিনা নুনের বিরিয়ানিও অমৃতের স্বাদে ধরা দেয় অকপটুদের কাছে, আসলে এটা কোনো একক প্রচেষ্টার সফলতা নয়, দলগতভাবে আমিত্বের বিসর্জন দিয়ে আমরা হয়ে উঠার নামই 'অকপট'তাই তো কবিগুরু লিখেছেন-

মুক্ত করো হে মুক্ত করো আমারে,
তোমার নিবিড় নীরব উদার
অনন্ত আঁধারে
নীরব রাত্রে হারাইয়া বাক্
বাহির আমার বাহিরে মিশাক,
দেখা দিক মম অন্তরতম
অখণ্ড আকারে”

'অকপট' মানে তো নস্টালজিয়া, যেখানে হারিয়ে যায় উত্তর ও দক্ষিণের ভেদাভেদ, মুছে যায় পূর্ব-পশ্চিমের সীমানা। অবসরপ্রাপ্ত সম্মানীয় সদস্যেরাও অনায়াসে পাল্লা দেয় সদ্য যুবকের সাথে, আসলে বয়স এখানে কেবলই একটা ধ্রুবক মাত্র, অকপট আসলে একটা নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়, যেখানে আমরাই আমাদের শিক্ষক, আবার সকলেই মনোযোগী শিক্ষার্থী।

যে যেভাবে পারে খুঁজে ফেরে জীবনের একান্ত স্বাদটুকু, অকপট ‘ডেকার্স লেনের’ ব্যস্ত ফুটপাতের একটা ছোট্ট কাউন্টার স্বরূপ। এখানে খাবারের নামে আদর পরিবেশনা করা হয়, বিনিময়ে ঘৃণা দিলে অগ্নিবর্ষণ করতে পিছুপা হয় না কেউ- এটাই 'অকপট'যারা মানিয়ে নিতে পারেনা, তারা হয় সাথে পথচলা থামিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়, কেউ বা কক্ষ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। ইতিউতি আলাপচারিতায় ভেসে বেড়ায় অকপটের সমাপ্তিকাব্য। যখনই এমন কিছু শ্রুতিগোচর হয়, মনে পড়ে যায় কবিগুরুর অমোঘ সৃষ্টি-

শেষের মধ্যে অশেষ আছে,
এই কথাটি মনে
আজকে আমার গানের শেষে`
জাগছে ক্ষণে ক্ষণে
সুর গিয়েছে থেমে তবু
থামতে যেন চায় না কভু,
নীরবতায় বাজছে বীণা
বিনা প্রয়োজনে”

আসলে শেষের যে শেষ নেই এটাই তো অকপটের ধমনীর মূল, ব্যস্ত জীবনের মাঝে ঝরে পড়া শিউলির গন্ধ নিয়ে মাতোয়ারা হতে অকপটের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ঠিকানা আর কিই বা হতে পারে, এখানে জীবন আছে, তাই তো বিচ্ছেদ আছে, অভিমান আছে, বিষাদ আছে, প্রেম আছে, পরিণয় আছে, আছে কত শত অপত্য, রয়েছে মিলনান্তক-বিয়োগান্তক কতই না অধ্যায়, আসলে ব্যক্তিপরিসর যেখানে দলে এসে মিশে যায় তখন তাকে ‘অকপট’ ডাকনামে ডাকা হয়।

চলার পথে দিন যাপনের নানা ধরণের গ্লানির পলি জমে জমে অকপটের ভিত মজবুত না হলে, জনসেবার নামে লক্ষ লক্ষ টাকার সংস্থান করা সম্ভব হতো না, কৈশোরের অকপট সেই স্মৃতির ভারে তলিয়ে না গিয়ে তাকে ভর করেই নতুন উচ্চতায় উঠে এসেছে, মাথা তুলেছে নতুন ভোরের স্বপ্নে। অতিক্রান্ত ঋতুপর্যায়ে শীতের শেষে নব বসন্তের দখিনা হওয়ার সাথে অকপট প্রতিদিন চোখ মেলে পৃথিবীর পানে নতুন প্রত্যাশাতে। মনে পড়ে যায় কবিগুরুর লেখনী-

মনে করি এইখানে শেষ
কোথা বা হয় শেষ
আবার তোমার সভা থেকে
আসে যে আদেশ
নূতন গানে নূতন রাগে
নূতন করে হৃদয় জাগে,
সুরের পথে কোথা যে যাই
না পাই সে উদ্দেশ”

'অকপট' মানে তো নতুনকে গড়ে তোলার স্বপ্নকে লালন করা, পথ ভিন্ন হতেই পারে, মতের অমিল হতেই পারে কিন্তু অকপট শেখায় গন্তব্য যখন একটিই তখন সকল বৈরিতাকে একটি খোলসের মাঝে আবৃত রেখে যদি আমরা সাথে সাথে পথ চলি তাহলেই তো প্রাণে সমৃদ্ধি আসে জীবনীশক্তিতে- আর এই প্রাণশক্তিটার নামই তো আসলে অকপটতা। অকপট ভীরুতা, কাপুরুষতাকে প্রশ্রয় দেয় না, কিন্তু অশ্লীলতাকে কঠোর ভাবে দমন করার প্রেরণা দেয়, ক্ষমতার চোখে চোখ রাখতে শেখায়। দাসত্ব, অন্ধত্বের গরল থেকে স্বতন্ত্রতার গরিমার পথের প্রতিটি যাত্রীই আসলে একজন অকপটু

ওজোনের চাদর যেমন ঢেকে রাখে প্রকৃতির শুদ্ধতাকে, অকপটের শ্রেষ্ঠ সদস্যেরা পরিচালক রূপে অকপটের সেবা করে চলেছে প্রতিনিয়ত। বিদ্বেষ, হীনতা, স্বার্থপরতা, মিথ্যাচারের উত্তুরে হাওয়া যখন মুহূর্তে কাঁপন ছড়িয়ে দেয় শিরা-উপশিরায়, শক্ত হাতে তাঁরা পাল সামলে অকপট নামের ডিঙিকে ভাসিয়ে রাখে এই মহাসমুদ্রে। আজকে ‘সাথে সাত’ অকপটজয়ন্তী উৎসবের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন, বিশ্বব্যাপী মারণ রোগের সাথে ছড়িয়ে পড়া দেউলিয়া রাজনীতির নগ্নতা, অপরিকল্পিত রাষ্ট্রব্যবস্থা, সাম্রাজ্যবাদীদের যুদ্ধের দামামার সাথে সর্বগ্রাসী কর্পোরেটের ক্ষিদের সাথে যুঝতে গিয়ে আমরা সকলেই রণক্লান্ত, আমাদের হৃদয়ের উষ্ণতা হারিয়ে গেছে সামান্য খিদের চাহিদা মেটাতে। মিথ্যা প্রচারের অনন্ত শীতলতায় ঢেকে যাওয়া সমাজের বুকে একটুকরো রোদ হয়ে বুকের ভিটেতে একটুখানি ওম পৌঁছে দেওয়ার নামই অকপটতা। এ উষ্ণতায় কোনো ভেদাভেদ নেই, আছে মিলন পিয়াসী শুধু সুখ, আর ভাগ করে নেওয়া সুখানুভূতি।

সামাজিক বৈষম্য, জাত, ধর্ম, বর্ণ কিছুই অকপটের বাধা হতে পারে না, আর যেখানে এই বন্ধন আছে তা কখনও অকপট হতে পারে না। তাইতো কবিগুরু বলে গেছেন-

ললাটে দিয়েছে চিহ্ন ‘তুমি আমাদের চেনা' বলে
খসে পড়ে গিয়েছিল কখন পরের ছদ্মবেশ;
দেখা দিয়েছিল তাই অন্তরের নিত্য যে মানুষ;
অভাবিত পরিচয়ে
আনন্দের বাঁধ দিল খুলে
ধরিনু চিনের নাম, পরিনু চিনের বেশবাস
এ কথা বুঝিনু মনে,
যেখানেই বন্ধু পাই সেখানেই নবজন্ম ঘটে
আনে সে প্রাণের অপূর্বতা”

আর এই প্রাণের অপূর্বতা আছেই বলেই কখনও একঘেঁয়েমি গ্রাস করে না অকপটকে, অকপট কঠোর কিন্তু স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, ব্যক্তিত্ববোধের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের সহায়ক, মোহনীয় মানবিক গুণের পৃষ্ঠপোষক। অকপট বর্তমানে বাঁচে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে এঁকে, কিন্তু নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে বর্তমানের অকপটুদের সাথে ভাগ করে নিয়ে স্মৃতিময় করে তোলে বর্তমানকে, আগামীর জন্য।

অকপট মানে তো সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের উজ্জ্বল্যের গান, স্মৃতিচারণা কেবলই একটা পথ নির্দেশনা মাত্র- সমাজের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত অকপটুদের সাথে নিশ্চিন্তে বেড়ে উঠে নব প্রজন্ম, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে প্রেরণা নিয়ে বস্তু জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারার নামই অকপট অনুশীলন। স্মৃতিধন্য বর্তমান প্রজন্মই পারে আগামীর স্বপ্ন পূরণে আন্তরিকতার অভিব্যক্তিময় পরম্পরা চালিয়ে যেতে। অকপট জানে কবিগুরুর এই কবিতাখানি-

সমুখে শান্তিপারাবার,
ভাসাও তরণী হে কর্ণধার
তুমি হবে চিরসাথি,
লও লও হে ক্রোড় পাতি,
অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি ধ্রুবতারকার”

অকপট সদা সর্বদা একটি অকৃত্রিম সংস্করণ, এখানে থাকা মানেই মনের স্ফূর্তি। সংসার-জীবনের কৃত্রিমতার বাধা পেরিয়ে সবাই নিজেকে হালকা করতে অকপট হওয়া, যেখানে কোনো অভিনয় থাকে না। নিজেকে খোলস থেকে বের করে আনার একটা প্রক্রিয়ার নাম 'অকপট'অকপট আসলে অনেক নাম, হরেক চেহারা, ভিন্ন ভিন্ন চঞ্চলতা, অপ্রতুল হর্ষ, অনিঃশেষ পরিতৃপ্তি ঘিরে ভিড় করে থাকা মানুষের দল। তাদের সামঞ্জস্যই হলো তাদের তারতম্যতায়, যেখানে রঙ, রূপ, বর্ণ, গন্ধ সবেতেতেই আছে দৃষ্টান্তমূলক ভিন্নতা; তা সত্ত্বেও প্রত্যেকের উজ্জ্বলতা ও আত্মার পরিশুদ্ধতা একইরকম দীপ্তিময়। একে বিচ্ছিন্ন করে এমন সাধ্যি কার!

কথিত আছে- ‘বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’; কিন্তু অকপট একটা ভার্চুয়াল মাধ্যম হয়েও এর মানে হলো- বিগলিত আবেগের বারিধারা। জীবিকার তাগিদে যতোই যান্ত্রিকতায়- বস্তুজীবনের মানবিকতা পথ হারিয়ে ফেলুক, অন্তরের আবেগ কখনও ফুরিয়ে যায় না, আর এই আবেগকেই পুঁজি করে যারা বাসা বেঁধেছে, তাদের সেই বাসার নামই যে 'অকপট'নিরন্তর সংগ্রামে লিপ্ত সকলেই এক সমান্তরালে এসে পূর্ণ করে তুলেছে শ্রদ্ধা ও স্নেহের অপূর্ব এক মেলবন্ধনে। এমনই কোনো জন্মদিনের অবসরে কবিগুরু বলে গেছেন-

আজি এই জন্মদিনে
দূরের পথিক সেই তাহারি শুনিনু পদক্ষেপ
নির্জন সমুদ্রতীর হতে”

চোখ আমাদের সামনের দিকে হলেও আমরা দেখতে পায় কেবলমাত্র পিছনের অতীতকে, সেই নির্লোভ, নির্ভেজাল, নিষ্কলুষ শৈশবের কাছে বাঁধা আছে আমাদের প্রাণভোমরা। যাকে আক্ষরিকভাবে ছোঁয়া যায় না ঠিকই, তাই তো অকপট নামের এমন মঞ্চের প্রবর্তনা। অসীম আকুলতা মহাকালের পথ দিয়ে আমরা জীবনের সেই চরম সত্যের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে যায়- ‘সময় কখনও ফিরবার নয়’। তবুও মনের জানালা খুলে দিলে অকপট সমাজ আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় মূর্তিমান হয়ে। তাই তো কবিগুরু প্রশ্ন করেছেন- তোমার গেছে যে দিন সে কি একেবারেই গেছে? কিছুই কি নেই বাকি? বিড়বিড় করতে করতে মন বলে উঠে- ‘রাতের সব তারা-ই আছে দিনের আলোর গভীরে’

কবি শঙ্খ ঘোষের একটি লাইন দিকে আমি নিজেকে অকপটের সাথে সম্পর্ক সম্পৃক্ত করতে পারি আজকের ন্যাংটা সমাজে, যেখানে আমার যা কিছু আছে সবটাই আসলে অকপটের জন্য- তাই তো এই কবিতাটা ‘আমি ও অকপটের’ মাঝে যোগসূত্র স্বরূপ

আমার জন্য একটুখানি কবর খোঁড়ো সর্বসহা
লজ্জা লুকোই কাঁচা মাটির তলে --
গোপন রক্ত যা-কিছুটুক আছে আমার শরীরে, তার
সবটুকুতে শস্য যেন ফলে”

শুভ জন্মবার্ষিকী 'অকপট', পায়ে পায়ে এই পথ চলা শতাব্দীর প্রাচীরকে ভেদ করে কালের গর্ভে যাত্রা করুক এটাই তো অকপট কামনা

শেষে বলি, কবিগুরু যেন অকপটের জন্যই এমন একটা কবিতা এঁকেছিলেন বোধহয়- একে ছাড়া যেন এই আত্মচর্চাটাই অসম্পুর্ণ-

সীমার মাঝে, অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর
কত বর্ণে কত গন্ধে, কত গানে কত ছন্দে,
অরূপ তোমার রূপের লীলায় জাগে হৃদয়পুর
আমার মধ্যে তোমার শোভা এমন সুমধুর
তোমায় আমায় মিলন হলে সকলি যায় খুলে--
বিশ্বসাগর ঢেউ খেলায়ে উঠে তখন দুলে
তোমার আলোয় নাই তো ছায়া, আমার মাঝে পায় সে কায়া,
হয় সে আমার অশ্রুজলে সুন্দরবিধুর
আমার মধ্যে তোমার শোভা এমন সুমধুর”

-চরৈবেতি

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...