বন্ধু উন্মাদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বন্ধু উন্মাদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২০

বিদঘুটে খেয়াল


(১)

করোনা আবহে গৃহবন্দীর অস্বস্তি যখন কিছুটা সয়ে যাব যাব করছে, ঠিক তখনই ছাল ক্যালানো গরমটা আবির্ভুত হল এলাকাতে। কিছুদিন আগেই একটা বিধ্বংসী অগ্নিকান্ডে বাড়ির ইলেকট্রিক ওয়্যারিং সিস্টেমের অনেকটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছেতাই পরিস্থিতি করে দিয়েছিল। কিছু লাইট ফ্যান ছাড়া অধিকাংশ ইলেকট্রনিক্স গেজেটই বর্তমানে কোমায়, তার মাঝে এসি থেকে ইনভার্টার সবই আছে। লকডাউনের বাজারে এই গাঁ-ঘরে মিস্ত্রী পাওয়া দুষ্কর, থাকলেও তাকে ঘরে ঢুকতে দিতে মন সায় দেয়না, কে জানে সেই লোক করোনার বাহক কিনা। অগত্যা, ‘জান হ্যায় তো জাহান (নুসরত নয়) হ্যায়’, গরমকে এঞ্জয় করা ছাড়া উপায় থাকেনা। কারেন্ট চলে যাওয়া মানেই গরমের তাণ্ডবে মশাদের চড়ুইভাতির জন্য কুলকুল করে ঘামা কুঁদো শরীরটাকে আহুতি দেওয়া

গতকাল রাত্রেও তার ব্যাতিক্রম হলনা, আকাশে মেঘের সঞ্চার হয়ে পরিবেশ গুমোট হতেই কারেন্ট চলে গেল। কিছুক্ষণ ছাদে ঘোরাঘুরি করে অবশেষে নিচের তলার ঘরে সিফট হলাম বালবাচ্চা সহ। বালবাচ্চা মশারির মাঝে খানিক বিদ্রোহ করে ঘুমিয়ে যেতেই তাদের মা ও আমার মা দুজনেই দ্রুত তাদের অনুসারী হল। আমার এদিকে ঘুমই আসেনা, বারান্দায় এসে খানিক শুলাম- ওমা, সেটা শুধু মশাদেরই ‘ধারাবি’ ছিল তা নয়, বরং সামান্য দূরের উঠোনে হরেক কীটপতঙ্গ ও রাতচড়া পাখিদের রেওয়াজ করার স্টুডিও ছিল সেটি। সুতরাং অবৈধ অনুপ্রেবেশের দায় থেকে মুক্তি নিয়ে অগত্যা দোতলার দক্ষিণের ঘরে এসেই ডেরা নিলাম, মোবাইলেও চার্জ নেই যে ফেসবুক টুইটারে গুঁতাবো

জুলুজুলু চোখে জানালার গ্রিলের ওপাড়ে, পেয়ারা গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে- নিম গাছের কল্পিত পেত্নিকে খোঁজার চেষ্টা করতে লাগলাম, তারপরই একটা ন্যাড়া শিমুল গাছ কঙ্কালের মত দাঁড়িয়ে। সামনের ছোট্ট চত্বরটাকে ঘিরে থাকা কিছু হাতির শুঁড়, চটকাঠি, শেয়ালকাঁটার ঝোপের মাঝে গলা উঁচিয়ে থাকা শ্যাওড়া, জিবলি, বাঁদরলাঠি, ফলসা, নারকেল, কাঁঠালগাছ ইত্যাদির মত জাঁদরেল পার্শ্ব চরিত্রদের উপস্থিতি- পরিবেশের হন্টেড লুকটাকে একটা আদর্শ টেক্সচার দান করেছে। কোনও কিছুতেই কিছু খুঁজে পেলামনা, অথচ মাঝরাত্রের আদুরে চাঁদের আলো, সামান্য দূরে কুকুরদের একটা স্ট্রীট কর্ণার, ব্যাঙেদের সমবেত স্লোগান, ঝিঁঝিঁদের গলা সাধা, ডাহুকের ছমছমানি ডাক, কয়েকটি পেঁচার পেট্রোল ডিউটির চোটে রাতকানা পায়রার ঝাঁকের কলরব ইতাদির উপস্থিতি ব্যাকগ্রাউন্ডকে একদম সিনেমাটিক সিল্যুয়েড মোডে রেখেছিল ভয় পাওয়ানোর জন্য

ভয় কিন্তু অধরায় রয়ে গেল। আসলে সেই যবে থেকে বিয়ে করেছি, যা কিছু প্রেতজনিত ক্রীড়াকলাপ সবই দাম্পত্যের মাঝে ঘটতে দেখেছি একতরফা ভাবে। আমার চোখ স্ত্রীজাতির দানবীয় ঘটনার সাক্ষী বলেই হয়ত, ফচকে ভূত-পেত্নীর মত কোনো তুচ্ছ অতিপ্রাকৃত বিষয় ধরা দেয়না চর্মচক্ষে। হয়ত সেই অশরীরীর দল ভাবে, “এই বেচারার কাঁধে এমনিতেই আমাদের গুরুমার বাস- অগত্যা কেন মিছিমিছি সেখানে গিয়ে নিজেদের বেইজ্জত করব”! নিশ্চই বুঝতে পারছেন, সাধু-ফকিরেরা কেন প্রেতাত্মাদের দেখা পায় বা তাদের বশীকরণ করতে পারে। কারন তাদের ঘরে বৌ থাকেনা বলেই ভূতপ্রেত আসতে সাহস পায়

তো সে যাই হোক, চোখটা বুজে যেই বালিশে মাথা রেখেছি- ওমা দেখি কে যেন পায়ের দিকটাতে কাঁদছে। ভূত দেখার যে আনন্দটা ছিল সেটা ছোট্ট করে আতঙ্কে পরিণত হল, কয়েক মুহুর্তের সেই আতঙ্ক বিলাস সামলে কানটা খাড়া করে শুনতেই বুঝলাম, মাল সে যেই হোক- আছে কিন্তু ঘরের মধ্যেই। জেগে উঠে দেখার চেয়ে ঘুমের ভান করে পরে রইলাম, কার্যক্রম বোঝার জন্য। কান খাড়া করে শুনলাম- মিনমিনে আওয়াজ কিন্তু একজন নয়, অনেকের আওয়াজ

- কাঁদিসনা ভাই, সবুর কর আরো কিছুদিন। নিশ্চই উপরওয়ালা আমাদের উপরে সদয় হবেন

- সমানে মাথার উপরে টকাটক এমন বারি কাঁহাতক সহ্য হয়রে বোন!

- কিইবা করার আছে বল, আমিও তো কোমরের যন্ত্রণাতে মাজা সোজা করতে পারছিনা মোটেই

- হুম পিঠে হাত রেখেই তো সারাক্ষণ কুট কুট করে ভাঙা জাইগাটাতে টিপে যাচ্ছে হতচ্ছাড়াটা

তৃতীয় একজন কেউ ওমনি বলে উঠল,

- তবু তো তোদের টিপেটাপেই ছেড়ে দেয়, আর আমাকে তো জ্বালিয়ে রেখে দেয় দুপুর থেকে ভোর পর্যন্ত। এখান দিয়ে সেখান দিয়ে গোঁজাগুঁজি চলে। আমি তো গরম হয়ে উঠি তীব্রতাতে, তবুও কী আমার নিস্তার মেলে!

একটা চোখের কোনা একটু খানি খুলে যা দেখলাম তাতে চক্ষু চড়কগাছ

ল্যাপটপটা ভেন্টিলেশনে থাকা রোগীর মত ব্যাথাতুর আওয়াজে কথা বলছে কিবোর্ড আর মাউসের সাথে। কিবোর্ডের সুইচ গুলো কোন নিয়মে ভাই হয়েছে সেটা যেমন বুঝতে পারলামনা, তেমনি মাউসকে কেন বোন বলে সম্বোধন করছে সেটাও অজানা; আজব কেলেঙ্কারিয়াস ব্যাপারস্যাপার

হঠাৎ ডাইনিং থেকে একটা দেঁতো হাসির আওয়াজ এলো, অন্ধকারের মধ্যেই ঘাড়টা একটু তেরছাভাবে তাকাতেই পিলে তড়াক তড়াক করে লাফাতে লাফাতে মুখ দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে আসার উপক্রম হল। দেখি ফ্রিজটা হাতপা ছুড়ে গড়াগড়ি দিয়ে হাসছে, সাথে অনেক কিছুই বলছে সবটা বুঝতে পারলামনা। এটুকু বুঝলাম যে সে ল্যাপটপকে নিয়েই তামাশা করছে। ল্যাপটপ ও তার সম্প্রদায়েরা কখনও হয়ত ফ্রিজের ওই সারাক্ষণ চালু থাকা বিষয়ে কখনও খোঁটা দিয়েছিল, এখন সেটাই উশুল করছে ফ্রিজ ব্যাটা। আমি যতটা সন্তর্পনে দেখতে গিয়েছিলাম, তার চেয়েও বেশি সাবধানতা অবলম্বন করে আবার স্বস্থানে ফিরে এসে, কিবোর্ডের সুইচগুলোর বেদনা গাথা শুনতে লাগলাম

 

(২)

একটু ঢুলুনি এসেছে কী আসেনি, শুনলাম মাথার দিক থেকে বাঁশির মত পিঁ পিঁ আওয়াজে নাকডাকার শব্দ ভেসে আসছে। নিজের নাকে হাত দিয়ে দেখলাম, উঁহু সেখানে কোনো গোলোযোগ নেই। ভাবতে লাগলাম, হচ্ছেটা কী আজ আমার সাথে! কিবোর্ডের মাথা যন্ত্রণা, ফ্রিজের হাত পা ছুড়ে নাচ, মোটেই গতিক ভাল ঠেকছেনা। বৌকে হাঁক দিতে যাব, ওমনি মাথার নিচে থেকে বালিশের আওয়াজ এলো-

- মরণ দশা, মিনসে নাক ডেকে ঘুমানোর ছিরি দেখো। বলি ও ঠাকুরপো, তোমার নাক ডাকাটা একটু কম করো বাপু, সারাদিন কনুয়েই গুঁতো খেয়ে খেয়ে আমার সারা পাঁজরে পাকা ফোঁড়ার মত ব্যাথা তো ছিলই, এখন ওই ন্যাড়া মাথার খোঁচা চুলের খোঁচায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। একটু শান্তিতে ঘুমোতে দাও বাপু

পাশবালিশটা খৈনি মুখে রাখা আওয়াজে বলে উঠল, “ও ছোট, ওকে জাগাসনা ভাই। ও জেগে গেলেই কর্তা আবার আমার উপরে তোকে ফেলে, মাথা চড়িয়ে দেবে। বড্ড শ্বাসকষ্ট হয় রে আজকাল, ওকে শান্তিতে ঘুমোতে দে

বিছানাটার ছাদরটা দেখি ফ্যাচ ফ্যাচ করে হেঁচে নিয়ে, সর্দি ধরা গলায় সুর করে বলল, “টয়লেটে যাওয়া ছাড়া আমার কোনো রক্ষা আছে! এখানেই খাচ্ছে, হাত মুছছে, নাকের শিকনি থেকে চোখে পিঁচুটি, কানের খোল, পাছার ফুসকুড়ির রস সব পুঁছছে আমার উপরে”। ভীষণ রকমের চোটে গিয়ে গদিটা বলে উঠল, “ওলো চাদর মাগি- তোর তো তবু শিফটের ডিউটি, হপ্তায় দু’দিন চান করারও সুযোগ পাস, দড়িতে দোলনাতে হাওয়াও খেয়ে আসিস। আর আমরা! আমার কথা ভাব দেখিনি, সারাটা দিন আমার উপরে নেত্ত করছে, গড়াগড়ি খাচ্ছে, খেলা করছে, লাইট বন্ধ করে অন্ধকারে শোয়ার নামে যা সব বিচ্ছিরি কাজকম্ম করে- ম্যা গো, ছিঃ ছিঃ ছিঃ, লজ্জায় তাকাতে পারিনা নিজের পানেই। এসব তো আমাকেই সইতে হচ্ছে”

এবারে একটা কফ বসা ধরা গলায়, গলাখাঁকারি দিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে খাটটা বলে উঠল, “আমি বুড়ো হয়ে গেছি বলে কি তোরা আমাকে হিসাবের মাঝেই আনছিসনা মনে হচ্ছে। কাঠের তৈরি খাট বলে কী আমি মানুষ নয়! আমার এই চার পায়ার উপরেই তো তোদের পৃথিবী। দীর্ঘদিন নড়াচড়া না করে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে বাতের ব্যাথায় বড় কাহিল, অনেকদিন ইউরিক এ্যাসিডের লেভেলটাও চেক করা হয়নি রে। তার উপরে ওই হাতির মতন শরীর নিয়ে ধম্বল মারা, আর যে সহ্য হয়না রে। আগে তো এমন জলহস্তী ছিলনা, হঠাৎ এমনতর কেন হল রে!

এদের আলাপচারিতার মাঝেই, ‘ওরে আমার কি হলো রে, এবারে আমাদের কি গতি হবে রে!’ বলে কারা যেন মাতন করছে। রাজস্থানে রুদালি নামের এক মহিলাদের দল আছে যারা দল বেঁধে এমন করে মড়াকান্না গেয়ে থাকে, পেশাদার বিলাপকারীর দল, কিন্তু আমার ঘরে আবার রুদালি কোত্থেকে এলো! ঘুরঘুট্টি অন্ধকারের মাঝে আমিও যেমন কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা আমাকেও কেউ দেখতে পাচ্ছেনা। ল্যাপটপ সম্প্রদায়ের খচরমচরের মধ্যেই আমি নিঃশব্দে উঠে গেলাম সেই রুদালির কান্না লক্ষ্য করে। কান খাড়া করে সামান্য অনুসন্ধানের পরেই উৎসস্থল খুঁজে পেলাম, আমার জামাকাপড়ের আলমারি থেকে আওয়াজ আসছে

খুব সন্তর্পনে দরজাটা ঈষৎ খুলতেই কে যেন হেঁড়ে গলায় গেয়ে উঠল, “We're on our way, way, way/We're on our way somehow”কথাটা বিশুদ্ধ সাহেবি উচ্চারণে, সাহেবি কেতায়, কতকটা যেন টনি গ্রেগের ধারাভাষ্য দেওয়ার মত লাগল। মনে মনে ভাবলাম, ইংরেজ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে কী এই আলমারিতেই কোনো গোরা ভুতের আরক রেখে গিয়েছিল নাকি! ভূত দেখার আতঙ্কে ও আনন্দে একটা লাফ দিতে যাব, ওমনি একটা ডেঁপো গোছের কেউ বিচ্ছিরি ভাবে বলে উঠল- “আরে ও কাক্কা, তোমাকে তো ওয়াড়া ঠিক কেউ না কেউ দখল করে গায়ে চড়াবেই। কখনও কাউকে দেখেছো ব্লেজার-কোট ফেলে দিতে! অতো ইঞ্জেরি না ফুটিয়ে আমাদের কথাটা একটু ভাবো বস, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত শতচ্ছিন্ন ঘরমোছা ন্যাতা হয়ে বাঁচা ছাড়া আমাদের আর কোনো গতি হবে”!

মাঝ বয়সী কাকু টাইপের কেউ একজন বলে উঠল, “ওরে ও জাঙিয়া, তুই থামতে বাপু কত নিবি বলতো? অসভ্য স্থানে যাদের সাথে ঘরকন্না করিস, তাদের নাম নিয়ে কী ডাকাডাকি না করলেই নয়? ভদ্রসমাজে ওগুলোকে গালিগালাজ বলেরে হতভাগা, বলি মানুষ হবি কবে”! পাল্লাটা আরো একটু খুললাম, চোখ ততক্ষণে সয়ে গেছে অন্ধকারে। উদাস মুখে স্যান্ডো গেঞ্জিটা যেন নিজেই নিজেকে বলল, “আগে বগলের গন্ধে অতিষ্ট হয়ে, কিম্বা ডিও’র স্প্রের গন্ধে হেঁচে হেঁচে প্রাণ যেন; এখন বাকি জীবনটা রান্না ঘরের ন্যাতা হয়ে হাঁচতে থাকবো ফোঁড়নের গন্ধে। এই তো জীবন, টি-শার্টদা”

আরেকটা ফুলহাতা জামা যেটা গতবছর কে যেন গিফট দিয়েছিল, সে মঞ্চে ভাষণের মত বলে উঠল- “বন্ধুগণ, সুখ দুঃখ নিয়েই এই ক্ষণস্থায়ী পোশাকজীবন, তোমরা তবুও জানো তোমাদের ভবিষ্যৎ কোনদিকে। আমাদের কথা ভাবো একবার, কোথায় ওয়াসিং মেশিনে স্নান করতাম দামি সুগন্ধি ডিটার্জেন্ট দিয়ে, কত সুন্দর ইস্তিরি করে ভাঁজে ভাঁজে রাখা হত, হাওয়া খাওয়ানোর জন্য হ্যাঙ্গার ছিল। দামি পারফিউমের বিন্দু গুলোও তো আমার শরীরেই ছেটনো হত। এখন ভাবো, মালিকের বৌ নিশ্চই গরীবদের বস্ত্র দানের নামে আমাদের ইজ্জত লুন্ঠন করবে। সেখানে কোথায় ডিটার্জেন্ট, কোথায় ইস্ত্রি আর কিসের পারফিউম। মালটা যদি মাতাল হয় তাহলে তো কথায় নেই, আমার এই রেশমি শরীর মদের গন্ধে মাখামাখি হয়ে কোনো নর্দমাতে পরে থাকবে, পারফিউমের বদলে নেড়ি কুত্তার হিসু স্প্রে হবে”। বলেই ডুকরে কেঁদে উঠে হাতা দিয়ে চোখের জল মুছল। তখনই একটা হাফহাতা জামা যেটাকে সেই বিয়ের আগে কিনেছিলাম, সে রাশভারি বয়স্ক গলায় বলে উঠল- “আচ্ছা তোমরা সবাই কি গো! আমাদের মালিকের মৃত্যু হয়েছে। অশৌচ চলছে, কোথায় তোমরা কান্নাকাটি করবে তা নয়- খুনসুটি আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছো, বলিহারি তোমাদের পোশাকিকতা”। বুঝলাম দীর্ঘদিন এদের ব্যবহার হয়নি বলে ওরা ভেবে নিয়েছে আমি নিশ্চিত মরে গেছি

দরজাটা যেই বন্ধ করে খাটে ফিরৎ যাব, কেউ যেন সিটি মেরে ডাকল আমাকে। চতুর্দিকে জানলা দরজা সব দেখলাম, উঁহু কেউ তো কোথাও নেই। আবার আওয়াজ এলো, “করনা, দরজা বন্ধ করনা”। শুনলাম সে আবার উর্দু শায়ারি বলছে- ‘কবসে ইস পিয়াসী কন্ডেন্সারমে বারিসকে বুন্দ তক নেহি গিরি, আব বৈশাখী আয়া”। নিশ্চই কোনো দুশ্চরিত্রা মেয়েমানুষ, নাহলে এভাবে সিটি মেরে, দরজা বন্ধ করার অবৈধ ইঙ্গিত কে করবে! ভেবেই নিলাম, যে হবি হ বাবা- আমি আর তাকাবোনা। কে কে না কথাবার্তা বলছে আজকে, শেষে কী আমি ক্ষ্যাপাই হয়ে গেলাম! বালিশে যেই চিৎ শুয়েছি, দেখি উঁচু দেওয়াল থেকে কুৎসিত ইঙ্গিত করছে এসিটা। ভাবখানা এমন, সে যদি নিচে চলাফেরা করতে পারত এক্ষুনি আমার ইজ্জত লুটে নিত। এসিটা সমানে আমাকে হাকাডাকা করে যেতে লাগল যাতে তাকে চালু করি। আমরা মাত্র ১ মাসের লকডাউনেই হাফিয়ে উঠেছি, সে বেচারি ৭-৮ মাস বন্ধ, ব্যাকুলতা তো স্বাভাবিক

 

(৩)

নাহ, ঘুম আসছেনা। ভাবলাম- যাই দেখি বাইরের বাকি সব আসবাবপত্রের কী দশা। রান্নাঘর থেকে কিছু খেলাধুলার আওয়াজ পেলাম, কিন্তু যেতে সাহস পেলামনা। ওটা বৌ এর এক্তিয়ারে, তাছাড়া আমি দীর্ঘদিন ও মুখো হইনা- পরপুরুষ দেখে যদি চালডাল, শাকসব্জি, মশলাপাতি, হাঁড়িকুড়ির দল চেঁচিয়ে উঠে- মানসম্মানের ব্যাপার। সিঁড়ি দিয়ে নিচে যেতে যেতে দেখলাম, বেসিন- ওয়াসিং মেসিন আর জলের দেওয়াল ফিল্টারটা মস্তিসে গানের লড়াই আন্তাক্সরি খেলছে। তাদের উপেক্ষা করে নিচের ড্রয়িংরুমে যেতেই দেখি বুক সেলফে কিসের যেন উৎসব চলছে জমায়েত করে। মনে হল সবকটা বেল্লিকের কান থাবড়ে বলি- ওরে বোকাচন্দ্রের দল, দেশে লকডাউন চলছে; এভাবে গাদাগাদি ভিড় করে ফুর্তি করা মানা। যেই কথাটা বললাম, একটা মোটামত বই বেশ দাঁত খিচিয়ে বলে উঠল- “ওহে ছোকরা, আমরা বই- আমাদের বেশি জ্ঞান দিতে এসোনা, বিশ্বের যাবতীয় জ্ঞান সব আমাদের জ্ঞাতি ভায়েদের বুকেপেটেই রাখা আছে। তাছাড়া গাদাগাদি করেই আমরা সেলফে থাকি চিরকাল, আমরা কেউ এয়ারপোর্ট হয়ে একখানে ঢুকিনি যে করোনা হবে…”

লম্বা ভাষণ দিতে শুরু করেছিল আরকি, পালিয়ে বাঁচলাম। যেটুকু বুঝলাম- বহুদিন পর ওদের ধুলো ঝেরে একে একে বের করে পড়েছি বলে তাদের আতিসায্যের শেষ নেই, বারংবার হাতের ছোঁয়া পেয়ে তারা ভীষণ উজ্জীবিত। যদিও অন্ধকারে আমাকে চিনতেও পারেনি ব্যাটারা, তাই ভুলকরে মালিককেই দুটো ছোটবড় কথা কয়ে ফেলেছে মুখ ফসকে; ক্ষমাই করে দিলাম । গ্যারাজে গিয়ে দেখি বাইকটা আর গাড়িটা যুগলবন্দী করে কীর্তন গাইছে। জুতোগুলো তাদের যোগ্য সঙ্গত দিচ্ছে দোহারে তালি বাজিয়ে। কী জানি বাবা, এরা হয়ত আমার শ্রাদ্ধ শান্তিই করে এখন কীর্তনের আসর বসিয়েছে। সামনে যাওয়াটা সমীচীন মনে করলামনা, ধর্মকর্মে বাঁধা এলে রাগ হওয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া অন্ধকারে জুতো পেটা হোক বা গাড়ির চাকায় পিষে যাওয়া, কোনোটাই সুখকর হবেনা

মানে মানে পালিয়ে এসে দেখি, বালিশটা সমানে গজর গজর করে যাচ্ছে কারো একটা নাক ডাকাকে কেন্দ্র করে। এবারে আমি সেই বাঁশির মত নাকডাকার পাত্রকে খুঁজতে গিয়ে দেখি, আমার মোবাইলটা ওই দুষ্কর্ম করছে। বালিশের হাঁকাহাকিতে সে স্ক্রিন মেলে চাইল ম্যাড়ম্যাড়ে ব্রাইটনেসে। কিছুটা আড়মোড়া ভেঙে বলল, “তোদের এত সুখ তবুও অভিযোগের শেষ নেইরে বর্বরের দল। আমার কথা ভেবেছিস কখনও, ঘুমের ঘোরে হাত ফসকে মুখের উপরে না পরা পর্যন্ত, কবে আমাকে ছেড়েছে বল দেখি! সারাটাক্ষন তো আমারই পিছনে পড়ে আছে কারনে অকারণে। বই পড়লেও আমায় দিয়ে ট্রান্সস্টেলর খোলাবে, উইকিপিডিয়া, গুগুল, ফেসবুক, টুইটার, ক্যামেরা, গেম খেলা, সিনেমা দেখা, গানশোনা, পেমেন্ট করা, কথা বলা সহ নটি আমেরিকা হয়ে ক্যালকুলেটর সেজে কিনা করতে হয় বলতে পারিস? রণে বণে জলে জঙ্গলে স্বর্গে নরকে তো বটেই, বাথরুমেও আমাকে নিস্তার দেয়না। মালিক ঘুমালেও কী আমার শান্তি আছে, ওমনি পিছনে চার্জার গুঁজে দেবে সারারাত। তবুও তো তোরা কাঁদছিস, এদিকে আমি শোকে পাথর হয়ে গেছি

বারে আমাকে জেগে উঠতে দেখে- ল্যাপটপ সম্প্রদায়, বালিশ, বিছানা, খাট ও মোবাইল সবাই মিলে একসাথে প্রশ্ন করল। আমার এই ঘরে থাকার পিছনের রহস্যটা কি! ধীরে সুস্থেই বললাম, বিশ্বজোড়া অতিমারি পরিস্থিতির জন্য দায়ী করোনা ভাইরাসের কথা। ওমা সে কথা শোনা মাত্রই ল্যাপটপ থেকে মোবাইল হো হো করে হেসে উঠল। ল্যাপটপ বলল, এ আর কি এমন বড় কথা! ভাইরাস তো জলভাত ব্যাপার, আরেকবার আন ইনস্টল করে ইনস্টল করে নিলে মালফাংশন দূর হবে। মোবাইল বলল- আরে বস লেটেস্ট ভার্সনটা আপডেট মেরে নাও না, বাজারে কি স্ক্র্যাপ মাল লিক হয়নি!। সমানে তাদের জ্ঞানের ঝুলি থেকে একের পর এক পথ্য দিতে পাগল; বুঝলাম, এদের কাছে ভাইরাস নিয়ে আলোচনাই বৃথা

আমার নিজেরই কেমন মায়া হয়েছিল, সান্ত্বনা দিয়ে কিছু বলতে যাব ভেবেছিলাম, এখন ওদের ভাইসার জ্ঞানের ভাঁট আলোচনা শুনে কান গরম হয়ে উঠল। আমি চেঁচিয়ে কিছু বলতে যাব, ঠিক তখনি খানিক দুলে উঠে সিলিং ফ্যানটা ভয়ানক রাগী মুখে বলে উঠল- “আমাকেও কী একটু শান্তিতে বিশ্রাম নিতেও দিবিনা আহাম্মকের দলেরা? সময়ে ঘুম তো আমার জীবন থেকে কবেই গায়েব হয়ে গেছে, সামান্য লোডশেডিং এর সময় টুকুই তো বিশ্রাম এই জীবনে। আজকাল কারেন্টও যায়না নিয়মিত, এদিকে চৈত্রের শুরু থেকে তো সমানে চলেই যাচ্ছি। আজকের এই সুখ টুকুও কি ছিনিয়ে নিবি উজবুকের দল”। বলেই ভীষণ রেগে গিয়ে বনবন করে ঘুরতে লাগল নিজের চারপাশে

ফ্যান অমন রেগে পাগলের মত বনবন করে ঘুরতে শুরু করতেই, আমি ধড়মড় করে জেগে উঠে বসলাম, নিরাপদ দূরত্বে সরে যাব বলে। জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি বাইরের অমানিশা কেটে ভোরের আলো এই ফুটলো বলে, কারেন্ট চলে এসেছে তাই ফ্যানটা চালু হতেই ঘুমটা ভেঙে গেছে। মানে ওই গরমের মধ্যেই চোখটা লেগে গিয়েছিল। তারপরেই মনে পরল সেই সব অদ্ভুতুড়ে ঘটনা গুলো। যাই হোক, আজ ল্যাপটপ মোবাইলকে কিছুটা বিরাম দিয়ে, জামাজুতো পরে গাড়িটা নিয়ে একটু চক্কর মেরেই আসি। যতই স্বপ্ন হোক, ব্যাথার কথা গুলো তো নিজে কানেই শুনেছি

ও হ্যাঁ, তোমরা যেন আবার কেউ পাঁচকান কোরোনা এসব কথা, লোকে উন্মাদ বলবে

-সমাপ্ত

 

বৃহস্পতিবার, ৮ জুন, ২০১৭

।। নদিয়া ২ বর্ধমান ।।


নিরুপায় দশা মাঝামাঝেই চর্ম চক্ষুর সাথে সাথে মনের চোখও খুলে দেয়। নাহলে এই ভরা জ্যৈষ্ঠের গ্রীষ্মে কেনই বা বাইক নিয়ে সফরের ভূত মাথায় উঠবে। প্রান্তিক নদীয়া থেকে যাব আধুনা পূর্ব বর্ধমান জেলা সদর বর্ধমানে, মিহিদানার শহর বর্ধমান। গ্রামীণ বর্ধমানের গ্রামাঞ্চলের প্রবাদ “ধান-আগুরি-মুসলমান , তিন নিয়ে বর্ধমান”। কথাটা যে কতটা সত্যে, সেটা একমাত্র এসেই উপলব্ধি করতে হবে। অবশ্য বর্ধমানকে সাবেক বাম আন্দোলনের আতুর ঘর বললেও অত্যুক্তি হয়না। গতমাসে আমাদের পিসিমনি বর্ধমানের লেজ কেটে দিয়েছে, শিল্পাঞ্চল আলাদা, বাকিটা গ্রামীণ।

গ্যারাজে আমার বুলেট বাবাজি স্টার্ট নিলেননা সকালসকাল, অবশ্য সুইচ টিপেই চেষ্টাটা করছিলাম। মেন গেটের বাইরে ঠেলে এনে লাগালাম কিক, এ কি আর যার তার কম্ম! গতরাত্রের ঝড়-বৃষ্টির স্যাঁতসেঁতে পনাতে সম্ভবত ব্যাটারি চার্য ছেরে দিয়েছে। যাই হোক বার পাঁচেকের চেষ্টায় ৫০০ সিসি এর ইঞ্জিন গগনভেদি চিৎকার করে জানান দিল, সে ছোটার জন্য প্রস্তুত। পিঠে হালফ্যাসানের একটা ব্যাকপ্যাক; তাতে একটা গামছা, একটা লুঙ্গি, পাতলা টিশার্ট, ডেলি ব্যবহারের টয়লেট এক্সেসারিজ, পানীয় জলের, আধুনা মোবাইলের পাওয়ার ব্যাকআপ, একটা বোতল আর দুটো বিস্কুটের প্যাকেট একটা খোপে থাকেই থাকে। বাকিগুলোতে যে উদ্দেশ্য নিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছি, তার মানানের কাগজপত্র ফাইল ইত্যাদি। আমার কাছের দুটো পাওয়ার ব্যাকআপই জয়দার দেওয়া। এমাসের বাক্সপ্যাটরাতে নতুন সংযোজন বলতে একটা বিগসপার সাইজের ঢাউস নাইলন ব্যাগ। তাতে অত্যন্ত সযত্নে মুড়ে রাখা আমাদের অকপট সাহিত্য পত্রিকা। পথে যদি বড় ও চালু কোনো ম্যাগাজিন স্টল পায়, ২-৫ পিস রেখে যাব এই অভিপ্রায়ে।

আজকাল পিসির ‘সেফ ড্রাইভ- সেভ লাইফ’ বিজ্ঞাপনের জন্য নয়, সেই বাইক প্রেমের শুরুর দিন থেকেই স্টাইলিশ হেলমেটের প্রতিও একটা ভীষণ দুর্বলতা রয়েছে আমার। এখন অবশ্য স্টাইল আর বেঁচে নেই তেমন, কিন্তু হেলমেটের সু অভ্যাসটা যথারীতি রয়েছে। রওনা শুরু করতে করতে দেখি পৌনে নটা, প্রাতরাশ হয়নি; পথে কোথাও একটা করে নিলেই হবে।

প্রথম আধা ঘন্টা তেমন কিছু বলার মত নয়। গঙ্গার উপরে শ্রীচৈতন্য সেতু, পশ্চিমমুখী হয়ে ডানদিকে নদীর নিচে অনেকটা স্থান জুড়ে চড়া পরেছে, ডানদিকে নব নির্মীয়মান ISCON মন্দিরের সুউচ্চ চূড়া চূড়ান্ত বৈভবের প্রতিমূর্তী হয়ে নিজেকে জানান দিচ্ছে। রাস্তার দুধারে টিপিক্যাল নদীয়ার খালবিল, আর দূরে দিগন্তরেখানে কিছু গ্রাম ও মন্দিরের চুড়ো অথবা মসজিদের মিনার। নদীর চড়াতে বেশ কিছু সব্জির চাষ, ফুটি, তরমুজ, শশা, পটল, ঝিঙে ইত্যাদি। দূরে আখ ও ভুট্টার ক্ষেতও জনজরে আসছে। গাঙ্গেয় পলিমাটির উর্বরতার প্রভাবে গঙ্গার দুইপাড়ের বেলেমাটিতে সব্জির চাষ সেই নদীমাতৃক সভ্যতার শুরু থেকেই যে সমৃদ্ধ, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। নদীয়ার সীমানা অতিক্রম করে বর্ধমানে ঢুকে কয়েক কিমি এসেই একটা তেমাথার মোর মত জাইগাতে জানলাম দুটো রাস্তাই বর্ধমান যাচ্ছে; একটা ভায়া ধাত্রি গ্রাম, অন্যটা ভায়া কুসুমগ্রাম। শেষেরটা ৫-৭ কিমি কম ও সোজা রাস্তা, অতএব সেই পথেই পা বাড়ালাম। তবে আসার পর দেখলাম, এ পথের আসেপাসের ঘরবাড়িগুলোর উঠোন কিন্তু এই রাস্তাটাই।

রাস্তার কথাতে বলি, বেশ কিছুদিন ধরেই দেখছি, গ্রাম বাঙলার রাজ্যসড়ক গুলোর দারুণ ভাবে হাল ফিরেছে। বেশ চওড়া, দুপাশে সহ মাঝে সাধা রঙের বর্ডার, গাঢ় সবুজ বোর্ডে সাদা রঙ দিয়ে জনপদের নাম লেখা ইত্যাদিজনপদগুলোতে দেখি রাস্তার পিচে রেডিয়াম লাইট রিফ্লেক্টার বসানো। বেশ ঝকঝকে, আর বাইক আরহীদের জন্য এই ধরনের রাস্তা এক কথায় স্বর্গ। কিন্তু শুধু সুন্দর রাস্তা আমি বা আমরা বললে তো হবেনা, অন্যেদেরও সুন্দর লাগে অন্যভাবেঅতএব অনেক চাষির কাছে এটাই খামার, ফসল পেটাচ্ছে, শুকাচ্ছে, গাদা দিচ্ছে সহ আর কতো কি। দুএক স্থানে তো গোটা হাটটাই রাস্তার উপরে বসে পরেছে, সে এক কেলেঙ্কারিয়াস কাণ্ডকারখানা। আর সেই দানা বা শাকপাতারির লোভে যতো রাজ্যের পোষ্যের আমদানি এই রাস্তার উপরেই; হাঁস, মুরগি, ছাগল, ভেড়া, গোমাতা, গোপিতা, গোহধর সহ কুকুর, বেড়াল সকল কিছুর অবাধ বিচরন ক্ষেত্র। আর দুরন্ত আবাল মানবশিশুর কথা তো জাষ্ট ইচ্ছা করে উহ্য রাখলাম। জানিনা এমন রাস্তা বাঙলার আর কোথায় আছে গাড়ি ঘোড়ার চাপ তুলনামূলক বেশ কম, অথচ উপরোক্তদের দাপটে মাইল মিটারের কাঁটা ৩০ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।

বর্ধমান জেলা ঢুকে প্রায় ৫-৭ কিলোমিটার যাবার পরেই জীবনানন্দের বাংলার সেই চিরাচরিত রূপ। গ্রামীণ বর্ধমানের পরিবেশের সাথে আমি কিছুটা হুগলী, দক্ষিন ২৪ পরগনা আর পূর্ব মেদনীপুর জেলা ছারা সবুজের সাথে মাটির এমন মমত্ব ও এই বিপুল বৈচিত্র আর কোথাও দেখিনি। চাষি ধান কেটে নিয়ে গেছে গত মাসেই, কোথাও সামান্য পাটের ক্ষেত কোথাও কিছু তিল বোনা; বাকিটা কাটা ধান গাছের গোঁড়া বা চলতি ভাষায় নাড়া ভর্তি খালি জমি মাইলের পর মাইল। মাঠে ট্রাক্টারের চাকার ধান বয়ে নিয়ে যাবার দাগ এখনও স্পষ্ট, সেখান থেকে ঝরে পরা ধান গুলো ইতি মধ্যেই অঙ্কুরিত হয়ে বিঘৎ খানিক করে লম্বা হয়েছে বিনা পরিচর্যাতেই। দিগন্ত জোড়া সেই সবুজ গালিচার মধ্যে, জলে পচা, রোদে পোড়া সেই নাড়াগুলো গোটা মাঠটাকে একটা অদ্ভুত সুন্দর পান্ডুর সবুজাভ বর্ণ দান করেছে। মাটি যথারীতি ফুটিফাটা, চাষিও বৃষ্টির প্রতীক্ষায়, এই অনাহুত ঝরে পরা ধান থেকে জন্ম নেওয়া চারা গুলোও বৃষ্টির প্রতীক্ষাতে। অথচ দুজনের লক্ষ্য আলাদা, চাষী এই নাড়া সহ সবুজ চারাগুলোকে ট্রাক্টারের ধারালো ফাল দিয়ে কাঁদার মধ্যে মিশিয়ে দেবে। যেগুলো সার হিসাবে পুষ্টি প্রদান করবে বর্ষার ধানের চারাগুলোকে। আর এদিকে এই ঝরে পরা ধান থেকে জন্মানো চারাগুলো বৃষ্টির আকুল প্রতীক্ষাতে শুধু বেড়ে উঠার জন্য , বাঁচার জন্য। এ এক চরম ও অসম প্রতিযোগিতা।

গোমাতা-পিতা-ভাতৃ-ভগীনের দল রীতিমত পিকনিকের মুডে মাঠের আলের লকলকে ঘাস সহ, কচি ধানের চারা খেয়ে চলেছে। সাথে মোষও চড়ছে ভারী সংখ্যাতে। একটা জিনিস কিছুতেই ভেবে উদ্ধার করতে পারিনি, আজও সেই ভাবনাই ভাবতে লাগলাম। গরুও ঘাস খায়, খড় খায়, খোল খায়, পাচনের বারিও একই। দুজনেই গোবর নাদে, ছরছর করে বালতি বালতি মোতে, সিং আছে, একই ধরনের লেজ এমনকি গাছে মাছি ভনভন করে, গুঁতায় সুযোগ পেলেই এবং হাটেই কেনাব্রচা হয় উভয়েই হাম্বা ডাকে, জাবর কাটে, চাঁট মারে। দুজনেই দুধ দেয়, চারটে করে বাঁট। কারোরই ছাগলের মত দাড়ি নেই যে বুদ্ধিজিবী হিসাবে গন্য হবে। বরঞ্চ মোষ পরিমাণে অনেকটা বেশি দেয়। দুজনেরই মাংস খাওয়া হয়, সারা পৃথিবী জুড়ে। শরীরে যৌনাঙ্গের অবস্থান থেকে রতিক্রিয়ার পদ্ধতিও একই স্টাইলের।

পিতা মোষ বেশি শক্তিশালী গোপিতার চেয়ে, অতএব গাড়ি বা নাঙল- যোঙাল জুড়তে মোষই শ্রেষ্ঠ। গোপিতা মহাদেবের সাথে পূজিত হলে, মোষ মা দূর্গার সাথে পুজিত হয়। এমন কত্তো কি সিমিলারিটিস ছরাছরিঅথচ গো মাতা হয়ে গেল, আর মোষ? সে কিনা মোষই রয়ে গেল? সৎ মা না হয় নাইবা হল, মাতার পিতৃকুল মাতৃকুলের কোনো আত্মীয় তো হতেই পারত। শ্যালিকা, বৌদি, বান্ধবী, সই, সেলুজ ইত্যাদি গুলো নাহয় ফচকে সম্পর্ক, কিন্তু মাসীমা, পিসিমা ঠাকুমা, দিদিমা, রাঙ্গাপিসি, ফুল মাসি, ইত্যাদি নামে তো ডাকাই যেত, এগুলো কি গম্ভীর রিলেসন নয়! মায়ের অধিকার গোমাতা পেলেও এমন তো নয় যে গোমাতার জন্মদাত্রী মা টিকে দিদিমা ডাকার বিলটাও পাস হয়ে গেছে! চূড়ান্ত ফেমিনিজমে আক্রান্ত এই সমাজের সংবিধানে তো শুধুই মা শব্দ ভাই, ভগীনি, নাতি পুতি তো কোন ছার এমনকি পিতারও কোনো ক্রেডিট নেই। গোমাতা যেন এ্যামিবার মত নিজে নিজেই গোহদরা বা গোহদরি প্রসব করেন। 

গো পিতার এমন দুর্ভোগ যে গেরস্তের ঘরে থাকলে আগেই নর সন্তানেরা শিশুপিতার অন্ডকোষ কেটে খোঁজা করে হাতে ধরিয়ে দেয়, থুড়ি মুখে জাল পরিয়ে দেয়। অন্য ভাগ্য হল ভগার নামে রাস্তাতে ছেরে দেওয়া। যত রাজ্যের ফল পাকুরের দোকানে হুজ্জুতি বা তোলা আদায় করার পাশাপাশি ময়লা ফেলা ভ্যাটগুলোর সবুজ সাফ করা, পাইকারি হারে গুতানো ও রাস্তা অবরোধতার ফাঁকে রাস্তা গোবর নাদার ফাঁকে কোনো গোমাতা সু-নজরে এলো, নধর দেহ ছুটিয়ে ইমানদন্ড তরিবারির মত উঁচিয়ে তাঁকে ধাওয়া করে আদর সোহাগ করা। এবিষয়ে অবশ্য কুমারি বা বাচ্চার মাতা ইত্যাদির বাছবিচারের মত নিকৃষ্ট বিলাসিতা গোপিতাদের থাকেনা। অথচ এদিক থেকে মোষ এই সকল চরিত্র গুণ থেকে মুক্ত। প্রকাশ্য রাস্তাতে ধাওয়া করে লাগাতার অন্যের স্ত্রী কন্যা পুত্রবধু ইত্যাদি সম্পর্কিত মহিলাদের ধর্ষনের ইতিহাস মোষেদের বংশে নেই। পার্থক্য বলতে মোষের বাসস্থান খাটাল হয় আর গরুর গোয়াল। দু স্থানেই মশার ভনভনানি, রক্তচোষা ডাঁশ, আর বিচ্ছিরি গন্ধ।

তাহলে এই বৈষম্যের পিছনে কি কারন থাকতে পারে? একটা চক্রান্ত, সেই চিরাচরিত বর্ণ প্রথা। মোষ এলোমেলো লোমযুক্ত কালো বলে ব্রাত্য, আফ্রিকান মানুষদের মত। সেখানে গরু হল গিয়ে হিপিদের মত, কত রঙের বাহার, পেলব কোমল শরীর। তাই গো হল মাতা, আর মোষ রয়ে গেল অসুরই।

এরই নাম কপাল। সে যাই হোক, মাথা থেকে এই সকল আলতু ফালতু ভাবনা ঝেড়ে ফেলতে একটা সিগারেট না ধরালেই নয়, একটা ছোট জনপদে দাঁড়ালাম। আরো কিছু দূর চলে এসেছি, এখানে মাটির চরিত্রে কিছুটা বদল লক্ষ্যনীয় হলজনপদগুলোতে চা, পান, বিড়ি, মিষ্টান্ন, মোবাইল রিচার্জ এর দোকানই বেশি, তাছারা বাকিগুলো সবই প্রায় ব্যাবসায়িক ছোট ছোট আড়ত। গোটা রাস্তা জুড়েই ধানের বস্তা বোঝায় ট্রাকের ছড়াছরি, নিকটবর্তী চালকল গুলো খোরাক এই ট্রাক গুলোই প্রায় প্রতিটি জনপদের কাছে একটা করে স্কুল বিশেষ লক্ষ্যনীয়। দূরে ঘন কালচে সবুজ গাছের সারির ফাঁক দিয়ে ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম নজরে আসছে, বাকিটা সেই তেপান্তরের সমতুল্য। রাস্তার ধারের কয়েকটি  বাড়ির পাশের জমিতে কচু, ভেন্ডি, বরবটি, করলা বা উচ্ছে, বারমেসে লঙ্কা, বেগুন সহ বিক্ষিপ্তভাবে শব্জি চাষ হচ্ছে, তবে গোটা রাস্তা জুড়ে মাংসের জন্য বিক্রি হওয়া পোল্ট্রি ফার্ম বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যাতে চোখে পড়ল। এছারা বলার মত একমাত্র চালকলের চিমনীগুলো। পরিবেশ দূষনের ভারী ভারী আপ্তবাক্য তথা নিষেধাজ্ঞাকে মধ্যমা আঙুল দেখিয়ে গলগল করে ছাই সহ কালো ধোঁয়াতে আকাশকে ঢেকে দেবার ব্যার্থ প্রচেষ্টাতে রত।

যাত্রা শুরু থেকে প্রায় ৩৫ কিমি চলে এসেছি, সময় ৪৫ মিনিট। এবারে রোদের তেজ বেশ অনুভূত হচ্ছে। হেলমেট মাথাকে এক্সট্রা ঘামিয়ে দিচ্ছে। অতএব আবার বাইক দাঁড় করাতেই হত। কিন্তু রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে রাস্তার ধারের গাছগুলো সব আত্মাহুতি দিয়েছে, বেড়েছে শুধু দুধারের নয়ানজুলি গুলো, আড়ে ও বহরে। একটু ছাওয়া খুঁজতে গিয়ে সামান্য দুরেই সেটা পেলাম। একটা বাবলা গাছ। এই চাঁদি ফাটা রোদ্দুরে বাবলা গাছের ওই ছোটছোট পাতার পাতলা ছায়াও যে কতটা স্বস্তিদায়ক, সে শুধু ভুক্তভোগীই জানে। এর আগে বোধহয় কখনই বাবলা গাছকে এতোটা ভাললাগেনি, এতো ভালো করে দেখিওনিএই গরমেও দেখি কি সুন্দর হলুদ হলুদ ফুল ফুটেছে। দু ঢোক জল খেয়ে, একটা পিওর শান্তিনিকেতনী সুতির বড় রুমালকে; বীরেন্দ্র সেহবাগ স্টাইলে মাথায় ব্যান্ডেনা মত বেঁধে মুখটাও মাওবাদীদের মত করে চোখে খোলা রেখে আবৃত করে নিলাম।  নচেৎ পোড়া মুখ আরো পুড়ে জয় বজরঙবালীড় বংশতুতো ভাই সদৃশ্য ধারণ করব।

ওই বাবলার ছায়া এক আশ্চর্য পরিবর্তন আনল মনজগতে, আলফাল ভাবনা সরিয়ে হঠাত করেই দেখার পরিসরকে বিস্তৃত করে দিল। বাইক যত এগোয় ততই দুধারের অবশিষ্ট গাছগাছালি গুলোকে খেয়াল করি মন দিয়েতিরতিরে হাওয়ায় সোনাঝুড়ির ডালে যেন হলুদ রঙের বন্যা লেগেছে, আবার কোথাও কৃষ্ণচূড়ার লাল আগুনে ফুলে সেজে গ্রীষ্ম তার নিজের রূপ জাহির করছে। রংগনের লাল থোকা হোক বা শিরীষের সাদা তীব্র গন্ধ যুক্ত গোটা পরিবেশকে একটা অন্য মাত্রা দান করেছে। রাস্তার ধারের ঝোপ গুলোতেও টগর, জবা, বুনো বেলফুল, সহ অনামী নানান গুল্মতে যে কত রকমের রঙের পসরা, আমরা যাত্রা পথে যদি একটু খেয়াল করি, গরম কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়। হলুদ টিকুমা, রাধাচূড়া, কলকেফুল, চাঁপা এমনকি আকন্দও নিজেকে ফুলের সাজে সাজিয়ে রেখেছে। গোটা মাঠ জুড়ে অসংখ্য তাল গাছে জলভরা তালকাঁদি গুলো দুর থেকে পুঁই মিচুরির মত লাগছে, আবার পুরুষ তালগাছ গুলোতেও পুরুষ ফুলের দণ্ড অনেক সুউচ্চে কি গাম্ভির্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এলোমেলো হাওয়ার জন্য পথের ধারের কলাগাছের পাতা গুলো শতচ্ছিন্ন হয়ে কি সুন্দর ছন্দবদ্ধভাবে হাওয়াতে নেচে চলেছে। 

ইউক্যালিপটাস বা ওই জাতীয় কোন গাছের চ্যাপ্টা শুকনো কালো সিমের মত ফলগুলো গোটা রাস্তাময় বিছিয়ে ছরানো। দুধারে পিটুলি, বহল, আঁশ ফল, কড়ুই, গামারি, আঁটির আম, প্যাঁক গজানো সজনের গুড়ি, জারুল, ফলসা, পাকুড়, শ্যাওড়া, ঘোড়ানিম, পাহাড়ি শিমুল, বকুল, কদম সহ কত্তকি যে আমরা অদেখা করে চলে যায় তার লেখাজোখা নেই। বাঁশ ঝাড়েও নতুন কোঁড়া গজিয়েছে, কোঁড়া মানে নতুন চারা বাঁশ গাছ। একটা গ্রাম্যক উন্নয়ন সমিতি দেখলাম লোহার খাঁচা দিয়ে ঘিরে বেশ কয়েক কিলোমিটার জুড়ে রাস্তার দুধারে কলম আমের চারা বসিয়েছে, যদিও তাতে আমের চিহ্ন মাত্র নেই। তাছারা ফল যুক্ত গাছের মধ্যে জাম আর তেঁতুল লক্ষ্যনীয়, ফলের ভারে যেন প্রতিটি গাছই ভেঙে পড়ার উপক্রম। নয়ানজুলির ভিজে জমিতে বড় চওড়া ও ধারালো প্রান্ত যুক্ত লম্বা ঘাসেরই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, পাশে ঢোলকলমির ঝাড়, কোথাও নোটে শাক, কোথাও মেঠো লতানে কলমি, খারকোন, মানকচুর ঝোপ; এটাই তো আমার শস্য শ্যামলা বাংলা। শুধু কিছু স্থানে পার্থেনিয়ামের বিষ প্রায় সমগ্র অঞ্চলটাকে গ্রাস করে নিয়েছে, যা এক অশনি সঙ্কেত।

কতকিছুই আমাদের রোজকার চলতি পথে দেখেও অদেখা রয়ে যায়, অথচ আমরা বৈচিত্রের খোঁজে কি কি না করে বেড়ায়। সামান্য বট বা অশ্বত্থের নতুন গজানো কালচে পাতা গুলোতে এই নির্দয় জ্যৈষ্ঠের সূর্যকিরন প্রতিফলিত হয়ে চোখে আসলে যে কি এক অপরূপ রূপ পরিলক্ষিত হয় তা কেবল জনান্তিকিই জানে। এর মধ্যেই কখন যে এই গরম, দুরত্বকে অনায়াসে টপকে বর্ধমান শহরের উপকন্ঠে নির্মিয়মান রেলওভার ব্রিজে পৌঁছে গেলাম সেটাই জানিনা। এর পর তো সেই পুর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী কাজে হারিয়ে গেলাম। প্রাতরাশটাও কি সুন্দর মধ্যাহ্ন ভোজে রুপান্তরিত হয়ে গেল। 

বুধবার, ১৫ মার্চ, ২০১৭

মন ও বিশ্বাস


 

মানুষ।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব ও বুদ্ধিমান। প্রতিটি মানুষের নিজের মত করে একটা জীবন সৌন্দর্য থাকে, যেটা মূলত চেতনা, বিবেক, সংবেদনশীলতা, আর আবেগ দিয়ে পুষ্ট। জীবন শুরু হয় অতি অরক্ষিত ও অসহায় অবস্থার মধ্যদিয়ে। সেই পরিস্থিতি থেকে প্রতিনিয়ত জৈবিক বৃদ্ধির সাথে সাথে জ্ঞানার্জনও চলতে থাকে সমান গতিতে। ধীরে ধীরে যার মধ্যে মানবিক ও পাশবিক দুটো ধারাই বিকাশ লাভ করে। যাদের মধ্যে মানবিক গুনের মাত্রা সর্বচ্চো ও সর্বোৎকৃষ্ট মানের থাকে তিনি উচ্চ সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হয়ে উঠেন, দ্বিতীয়টা ঘটলে সেক্ষেত্রে তিনি ঘৃণিত ব্যাক্তি হিসাবে স্বিকৃত হন। যেকোন কিছু অর্জন করার জন্য একটি ভিত্তির প্রয়োজন , আর সেই ভিত্তিটির নাম হল বিশ্বাস।

সন্ত ব্যাতিত সকল মানবের জীবন ষড় রিপু দিয়েই ঘেরা। আর এই রিপুর ক্ষুন্নিবৃত্তি শুরুই হয় একটা আশাকে কেন্দ্র করে। প্রশ্ন উঠবে এই আশার উৎস কি? উৎস হল বিশ্বাস। বিশ্বাস হল একটা ভাবনাগত অবস্থান। যেটা সম্পূর্ন মস্তিষ্ক দ্বারা পরিচালিত ও হৃদয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মানসিক স্থিতির দুর্দম ও আচ্ছন্নকারি দশা। যেখানে সেই মানসিক দশা, যাবতীয় পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলী তথা সময় ও জীবনের সমান্তরাল গতি সমূহের সত্য বা মিথ্যাকে প্রতিনিয়ত বিচার বিশ্লেষণ করতে দেয়না, তাকেই বিশ্বাস বলে। মানুষ তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের উপর দাঁড়িয়ে যে মানসিক সংগঠন তৈরি করে, সেখানে বিভিন্ন ব্যাক্তিত্ব বর্গ, পুঁথিগত জ্ঞান, পরিক্ষালব্ধ জ্ঞান, ব্যাবহারিক জ্ঞান, গবেষণা অর্জিত জ্ঞান, অপরের প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধাবোধ, পরিস্থিতি ভেদে তাৎক্ষণিক আচরনের বহিঃপ্রকাশের উপরে ভিত্তি করে নিজেকে তৈরি করে। যেটা একটা পৃথক মৌলিক স্বত্তা। এই মৌলিক স্বত্তাকে যাহা সন্তুষ্টি প্রদান করে তাকেও বিশ্বাস বলে।

বিশ্বাসের আবাসস্থল মানুষের মন, তাহলে একবার দেখে নেওয়া যাক মনের কার্যপদ্ধতি।   মানুষের মনের দুটো দশা, একটা সচেতন দশা আর দ্বিতীয়টা অবচেতন দশা। আমরা যাকিছু দেখি বা শুনি সেগুলো সচেতন মনে, আর সেগুলো আমাদের মস্তিষ্কের ধূসর স্মৃতিপাত্রে সঞ্চিত ও সংরক্ষিত হতে থাকে। সেই স্মৃতিপাত্রের ক্ষমতা থাকেনা সেগুলির সত্যমিথ্যা যাচায়ের। যে অভ্যাসের স্মৃতিগুলো বারংবার করে সঞ্চিত হতে থাকে, আমাদের অবচেতন মনে সেগুলোর একটা স্থায়ী কাঠামো তৈরি হয়। তখন কোন দ্বিতীয় ভাবনাকে সচেতন মন উপস্থাপন করলেও , অবচেতন মন তাকে প্রত্যাখ্যান করে সযত্নে। কারন বারংবার পুনরাবৃত্তি হয়ে চলা ঘটনাকেই আমাদের অবচেতন মন সত্য বলে ধরে নেয়, এবং তার ভিত্তিতেই একটা আদর্শ তৈরি করে। মানব চরিত্রের যাবতীয় অভ্যাসগুলো আসলে পরিচালিত হয় অবচেতন মনের নেতৃত্বে।  যেমন যেকোন নেশা, যথা তামাকসেবন বা মদ্যপান বারংবার করে অভ্যাসিত হয়ে চললে আমাদের অবচেতন মনে তার একটি প্রতিভূ তৈরি হয়, এবং সেটাকেই সত্য বলে মেনে নেয়। এমতাবস্থাতে ওই সত্যকে, সচেতন মনের অর্জিত নতুন কোন সত্য, বা সেই পূর্ব সত্যের মিথ্যাচার সম্বন্ধীয় যাবতীয় সতর্কবার্তাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়। এটাই আসলে বিশ্বাস। অতএব আমাদের চরিত্রের অভ্যাস নির্মিত হয় আমাদের অবচেতন মনের নিয়ন্ত্রণে। অনুশীলন তথা পুনরাবৃত্তিই আমাদের চরিত্র গঠন করে।     

বিশ্বাসের জন্মদাতা সচেতন মন, কিন্তু বাসস্থান অবচেতন মনে। বিচিত্র কল্পনা, দর্শন আর দীর্ঘসময় যাবৎ সেই বিশ্বাসকে অবচেতন মনের জমিতে কর্ষন করে লালন পালন করতে করতে একসময় সেই জন্মদাতা সচেতন স্বত্তাকেও গ্রাস করে, এবং সম্পূর্ন জীবনের দখল নিয়ে নেয় সেই বিশ্বাস। আত্মহত্যা আসলেই এই ঘটনারই কার্যকরী রূপ। কোন একটি পরিস্থিতিকে আমরা যখন আমাদের অর্জিত জ্ঞান ও মেধার পরিস্ফুটন দ্বারা বিশ্লেষনে অক্ষম হই বা বিশ্লেষনে মানসিক ভাবে কোন শক্তি দ্বারা বাঁধা প্রাপ্ত হই তাকেও বিশ্বাস বলে। ঈশ্বরবাদের ধারনার শুরুও সম্ভবত এই পরিসর থেকেই। মানুষ শিশুকাল থেকে সে সমাজে বড় হয়, যেখানে জ্ঞানলাভ করে, যাকিছু চোখে দেখে, কানে শোনে, সেটাই মননে প্রতিফলিত হয়ে একটা ভাবমূলক বিমূর্ত ধারনার জন্ম দেয়, তাকেও বিশ্বাস বলে। এই বিশ্বাস গড়ে উঠতে অনেকটা সময় নেয়, কিন্তু এক লপ্তেই সেটা অবলুপ্ত হওয়ার ক্ষমতা রাখে।

আমরা মানুষ স্বনির্ভর নই। দুএকটি ক্ষেত্র ব্যাতিত প্রায় সকল ক্ষেত্রেই আমরা কারো না কারোর উপরে নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা থেকেই আমাদের মধ্যে বাকিদের সাথে একটা আদানপ্রদানের সম্পর্কসুত্র তৈরি হয়। দীর্ঘস্থায়ী এই লেনদেন একটা ভরষার স্থান তৈরি করে। মানুষের চাহিদা আর তার বাস্তবায়ন যদি সেই ভরষাস্থলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে তখন সেই ব্যাক্তি, বস্তু, বা আদর্শকে মানুষ ধ্রুবক হিসাবে মেনে নেয়। তখন সেই ধ্রুবককে ঘিরে স্বতঃস্ফুর্ততাকে মানুষের বিশ্বাস বলে অবহিত করি। সচেতন মনন যে কোন পরিস্থিতিকে সকল সময় পুঙ্খানুপুঙ্খ যুক্তি দিয়ে বিচার করে, ব্যাক্তি, বস্তু বা আদর্শকে। এখানকার লেনদেনে অর্ধাঅর্ধি লাভক্ষতির সম্ভাবনা সেটা সকলেই মানি ও জানি। কিন্তু অবচেতন মনের কোটরে লালিত বিশ্বাস যদি কোথাও সামান্যতমও পরাভুত বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, সেখান থেকেই হতাশার সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে প্রথম ফাটলটা দেখা যায় আত্মবিশ্বাসে।

যেকোন বিশ্বাসের মূলটা শুরু হয় সৃজনশীল ও কল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে, নিজস্বার্থে ও পরার্থে। মানুষ তার নিজস্ব বিশ্বাসকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সুদৃঢ়ভাবে মূল্যবোধ রূপে উপস্থিত করে থাকে। মূল্যবোধ এমনই একটি গুন, যার দ্বারা সমাজের বুকে ব্যাক্তি তার স্বকিয়তার ছাপ রেখে যেতে সক্ষম। নিজের অতুল্য বৈশিষ্ঠকে প্রতিষ্ঠা দান ও বাকিদের থেকে স্বতন্ত্রতা রক্ষিত করে এই মূল্যবোধ। এই মূল্যবোধের কাঠামোটাই তৈরিহয় ব্যাক্তির দর্শনের উপরে ভিত্তি করে, আর দর্শনের ভিত্তি সেই বিশ্বাস ও তার সার্থক বাস্তব প্রতিফলন। প্রতিটি মানুষ তার বিশ্বাসকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করতে ভালবাসে, বা সেই বিশ্বাস দ্বারা অন্যকে প্রভাবিত করে থাকে। সেই বিশ্বাসবাদের সার্থক প্রতিফলনে যদি বৃহত্তর সমাজের প্রতিচ্ছবি প্রতিভাত না হয়, তখন সেই বিশ্বাসের উপরে অভিঘাত এসে পরে। অবচেতন মন সত্যমিথ্যার পার্থক্য নিরূপণ করতে অক্ষম। যার জন্য জীবনের কোন একটি সময়কালে গৃহীত বিশ্বাস , একটি নির্দিষ্ট সময়ের পথ অতিক্রান্তে সেটাকে বড্ড জোলো মনে হলেও অবচেতন মন সেটাকে অগ্রাহ্য করে পূর্বতন ধারনাকেই মান্যতা দিয়ে থাকে, এই ধরনের বিশ্বাসকেই বলা হয় খেয়ালি বা উদ্ভট কল্পনা।

মহামানবেরা তাদের জীবন দর্শন দিয়ে সমাজের বুকে নানান ধরনের পৃথক পৃথক বিশ্বাসের জন্ম দিয়ে গেছেন। যেগুলোকে কেন্দ্র করে ধর্ম, বিজ্ঞান, রাষ্ট্র, পরিবার ইত্যাদি ছোট থেকে বড় নানান ধরনের গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। এই বিশ্বাস ঘরানা গুলোর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান ঘিরেও চলে নিরন্তর প্রতিযোগিতা। ভবিষ্যতের উন্নতির জন্য মানবের নিজের ক্ষমতা, জ্ঞান, প্রভাব ও বিচক্ষনতার উপরে বিশ্বাস রাখতে হয়, এই বিশ্বাসকে আত্মবিশ্বাস বলা হয়। আবার এই আত্মবিশ্বাস যখন সচেতন মনের অনুভুতিকে উপেক্ষা করে, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়, সেটাকেই অহংকার বলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে শেষমেশ নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে প্রকট হতে হয়। তিনিই সমাজের প্রভাবশালী ব্যাক্তি, যিনি নিজের মধ্যে থাকা বিশ্বাসকে জনসমাজে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।  

বিশ্বাস আঘাতপ্রাপ্ত, আজকের সমাজে এটা একটা বহুলপ্রচলিত শব্দ। দেখা যাক এটি কিভাবে সম্পাদিত হয়। অবচেতন মন প্রায় সর্বদা ব্যাক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই অবচেতন মনের শক্তির কেন্দ্রস্থল হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্কের স্মরণ কোষিকাগুচ্ছ। এরা সেই স্মৃতিশক্তি, যারা শুধুই সংরক্ষিত হয়, যাদের কোন অতীত নেই, বর্তমান নেই, ভবিষ্যতও নেই। শুধু ফিকে হয়ে যাবার ক্ষমতা রয়েছে। আর বিশ্বাসের ও দর্শনের বাস ওই স্মৃতিকোষের আস্তরনে ও পরতে পরতে।  আমরা যা কিছু দেখছি যা কিছু শুনছি, সচেতন মনের আরশিতে সকল কিছুই সেটা প্রতিফলিত হয়ে চলে। সচেতন মন সময়ের সারণির সাওয়ারি। যার জন্য প্রতিমূহুর্তেই দৃশ্য, পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট বদলে চলে, এখানে বিরাম বলে কিছু নেই। কিন্তু অবচেতন মনের কোন কাল জ্ঞান নেই, আর রয়েছে ভাবনার জন্য অফুরন্ত সময়। সকালের কোন ঘটনা তাৎক্ষণিক ভুলে গেলেও, দেখা যায় রাত্রিতে শুয়ে মনে মনে সেটারই বিচার বিশ্লেষণ করে চলেছি। আমাদের অন্তরের বিশ্বাসের ছাকনিতে যাকে চুলচেরা বিচার করে থাকি। যেখানে একটা মানসিক টানাপোড়েনের পরিস্থতির উদ্ভব হয়, যাকে মানসিক পীড়ন বা টেনসন বলে। এই পীড়ন যখন সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যায়, তখন সেই নব্য চিন্তাধারাকে মেনে নিতে না পারার দরুন ও নিজেকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ না খাওয়াতে পেরে, অন্যের কাছে বা নিজের কাছেই পরাজিত বোধ হয়। এটাকেই বিশ্বাসের ঘরে আঘাত বলে ধরা হয়। হিংসা, ক্রোধ, বৈরিতা ও সংহার প্রবৃত্তির বোধ মননে জাগ্রত হয় ও চরিত্রে ফুটে উঠে।

বিশ্বাস বদল হয়। কারন ওই আগেই বলা হয়েছে, অবচেতন মনের গহিনে কোন কালজ্ঞান নেই। অবচেতন মনের কোন ক্ষমতা নেই কোন প্রকারের প্রভাবকে শনাক্ত করা। যে ঘটনাটা এই মুহুর্তে আপনার মনের ভিতরে আপনাকে ব্যাস্ত রেখেছে, সেটাই আপনার অবচেতন মনের কাছে একমাত্র বাস্তব। সচেতন মনের দৃষ্টিতে আজকে কোন একটা দর্শন, আপনার জ্ঞানের ঘরে বাতি প্রজ্বলিত করে দিল, দেখা গেল তার সাথে অনেক পুরাতন ঘটনা স্মৃতিপটে নতুন করে ভেষে উঠল। যেমন শৈশবের অশরীরি অস্বিত্ব যতটা ভয় প্রদান করত, মধ্য বয়েসের কোন বিশেষ ঘটনাতে তার স্বরূপ উন্মোচন করলে সেই পুরাতন শিশুশুলভ বিশ্বাসের কথা স্মৃতিতে জেগে উঠে, ও স্বনিয়মেই বিশ্বাসের পরিমার্জন ও পরিবর্ধন ঘটে যায়। মানুষ ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখে সেটাও এই অবচেতন মনেরই কারসাজি। যে বিশ্বাসের প্রকোপে ব্যাক্তি বিভোর বা আতঙ্কগ্রস্থ, সাধারনত সেই ধরনের স্বপ্নই মানুষ দেখে থাকে। মজার বিষয় হল , যে বিশ্বাসের দরুন স্বপ্ন দেখা, সেই স্বপ্নকেই আবার বিশ্বাস করতে শুরু করে দেয়। যার জন্য  বিশ্বাসের কোন অন্ত নেই। সচেতন মন যুক্তি নির্ভর, হ্যাঁ বা না এ উত্তর দিয়ে দেয়, এবং ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু অবচেতন মনে সঞ্চিত বিশ্বাসের সাথে যুক্তির সমানে দ্বন্দ্ব চলে কারন তার ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। বলাই বাহুল্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশ্বাস বিজয়ী হয় মনের ঘরে। 

আবার ফেরা যাক সেই রিপুতে। বিচার ক্ষমতার গুণে সচেতন মন জানে নিজের এক্তিয়ার কতটা আর কতটা তার প্রাপ্য। কিন্তু অবচেতন মনের লালিত বিশ্বাস সেটাকে স্বিকার করতেই চাইনা। একটা সংঘাতের স্থান তৈরি হয়। আর যারা এই সংঘাত এড়াতে চান, তারা ওই বিশ্বাসকে একটা নতুন মোড়কে নিজের কাছে পরিবেশন করেন, যাকে অন্ধবিশ্বাস বলা হয়। যে বিশ্বাস কোন তথ্য মানেনা, যুক্তির আশপাশ দিয়ে হাটেনা, বিশ্লেষণ থেকে শতহস্ত দূরে অবস্থান করে, সেই বিশ্বাসই নিশ্চিত রূপে অন্ধবিশ্বাস। আর অন্ধবিশ্বাসে ভর করে সে সংস্কার ও সংস্কৃতি জন্মলাভ করে, তাদের যথাক্রমে কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতি নামেই আমরা চিনি। আমাদের সমাজে বহু কিছুর অভাব থাকতেই পারে, কারন এটা সত্য। তবে যেটার অভাব নেই সেটার নাম হল অন্ধবিশ্বাস। কিছু বিশ্বাস যতই ঠুনকো হোকনা কেন, যদি তাতে স্বার্থের আতর মেসানো থাকে, সেখানে তাঁকে নিদেনপক্ষে ঐতিহ্যের নাম দিয়েও বিশ্বাসকে জীবন্ত করে রাখা হয়।

যৌনতা, সংখ্যাগুরু ও লঘু, নাগরিকত্বের বৈধ ও অবৈধতা, কর্ম ও বয়েসের কল্পিত সীমারেখা, সামাজিক প্রভেদ সহ নারী পুরুষের অধিকারের চিরাচরিত ধারনা প্রভুত বিষয়ে আমাদের যুক্তির থেকে আবহমান কাল ধরে চলে আসা বিশ্বাসই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। তবেই না অধিকার নিয়ে এতো আন্দোলন। তাহলে এই সমস্যার মূলেও সেই বিশ্বাস।  জীবন যৌবন, দেশ কাল, জাতি ধর্ম, শিল্প কৃষ্টি, সহ প্রতিটি মুহুর্তেই অধিবিশ্বাসে বা অন্ধবিশ্বাসের বাড়বাড়ন্ত। একমাত্র উন্মাদ ব্যাতিত সকল সুস্থ মানুষই সচেতন মনের অধিকারী। সচেতন মন থাকা মানেই দেখা, শোনা, পড়া। যথারীতি এগুলো মস্তিষ্কে সংরক্ষিত হতেই থাকে ক্রমান্বয়ে। অনুশীলিত কর্মকান্ডগুলোর প্রভাবে নতুন নতুন বিশ্বাস জন্মনেয়, পুরাতন কিছু বিশ্বাস খন্ডিত হয় যুক্তির কাছে। কিছু মানুষ বলে থাকেন, তিনি কোন কিছুই বিশ্বাস করেননা। এটাও আসলে সত্যের অপলাপ। হতেই পারে কেও ঝাড়ফুঁক , তাবিক, কবজ, রত্নপাথর, মন্ত্রপূত সুতো বা জল তেলে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু তাতে তার কাঙ্খিত স্বার্থ চরতার্থ না ঘটতেই তিনি নাস্তিক হয়ে গেলেন। আসলে কিন্তু তার ঈশ্বর বিশ্বাসের মৃত্যু ঘটে ঈশ্বর নেই বিশ্বাসের সূচনা হল। আগে সকল কিছুতেই তিনি ঈশ্বর দেখতেন, এখন প্রমান করতে ব্যাস্ত যে কোথাও ঈশ্বর নেই। বস্তত বিশ্বাসের কোন পরিবর্তন ঘটলনা, শুধু বিশ্বাসের দিক পরিবর্তন ঘটল মাত্র। সমাজসংস্কারক গন যুগে যুগে আবির্ভুত হন দশক দশক ধরে চলে আসা ক্ষয়িষ্ণু মুল্যোবোধ যুক্ত বিশ্বাসগুলোকে পূনর্মুল্যায়ন করতে। আধুনিক সমাজের উন্মেষের যুক্তিতে আলোকিত করে সমাজের বুকে চেপে বসা জগদ্দল পাথর সরিয়ে, মুক্ত বাতাস আনয়ন করেন। যেখানে বিষ-শ্বাসের অবলুপ্তি ঘটিয়ে বিশ্বাসের পরিমার্জন ঘটে।     

শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

প্রতিষ্ঠান


বদলে চলা সমাজের চলচ্ছবির সাথে আমরাও অবিরাম বদলে চলেছি। আজকের সভা সমিতিও আমাদের প্রযুক্তিময়। আমাদের বন্ধুমহল, সংঘ অন্তর্জালের মাধ্যমে শয়নকক্ষের কুঠুরিতে বন্দি। সেখানে কিছু দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সভ্য, এই বহুজনের সমাগমকে নিছক সময় অতিবাহনের মাধ্যম হিসাবে না দেখে, নিজেদের চাওয়া পাওয়া দুঃখ আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত, সমাজের সকল বুনিয়াদি পেশার সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত মানুষদের, লেখক, পাঠক, সমালোচক,  ছাত্র,  শিক্ষানুরাগী, মাতাল,  দাঁতাল সহ অনেককে- বিশেষত একটি নতুন বন্ধুবৃত্তকে একত্র করে, এক ঘাটে এসে পর্যালোচোনার জন্য ভিন্ন নামের ভিন্ন চরিত্রের গ্রুপ নামক প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি করেছেন। সময়ের সাথে আরো গুনীজনের সমাগম ঘটে সেই ভাবনাদের পরিস্ফুটন ঘটায়।

এমনই এক গ্রুপে হঠাৎ করেই আমার জন্ম। যেখানে গ্রুপের বিষয়টা কেবলমাত্র এই বুড়োঙুলের ডগাতে না থেকে পারিবারিক সম্পর্কের বাঁধনে জড়িয়ে পড়েছি। এটা শুরুটা অন্তর্জালীয় হলেও সময়ের দাবি মেনেই আজ আমরা আত্মীয়, তা আমরা যেখানেই থাকিনা কেন। সেই দিনের খেয়ালে নামহীনতার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ন শুন্য থেকে শুরু করার মাধ্যমে যে ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাট এই কিম্ভূত নামের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই... গ্রুপ নামক 'পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে', আজ তা সকলের ভালোবাসা, শুভেচ্ছা আর আস্কারাতে তৃতীয় বর্ষ অতিক্রম করল। দেখতে দেখতে নানান ওঠাপড়ার মাধ্যমে, বন্ধুত্বের সংযোজন বিয়োজন সহকারে, নিত্যনতুন অস্থানে কুস্থানে নোঙর ফেলে আবার গুটিয়ে এই বান্দর বন্দর খোঁজার চেষ্টায় মুহ্যমান। বহুবার কিছু বন্ধু(!) অস্তিত্বটাকেই মুছে দিতে চেয়েছেন, কিন্তু আপনাদের এই আঁশটে সোহাগের লোভে সেই বিনাশের চিতা থেকেই পূনর্জন্ম লভেছি। এটাই উন্মাদের আনন্দ আর সাফল্য, কারন আমি একা উন্মাদ নই। আমার সাথের সকলেই একটা গন ভাবনার শরিক, যেটার নাম উন্মাদনা। দুঃখ ক্লেশ বিরহ ব্যাথা কার জীবনে নেই, সেটাকে দূরে রেখে জীবনকে উপভোগ করার উন্মাদনা। হাজার ব্যাস্ততার ফাঁকে নিজেকে সময় দেবার উন্মাদনা, নিজেকে বিনোদন দেবার উন্মাদনা, যেটার মুখ্যভাগে মর্কট নাচটা আমি নাচি প্রকাশ্যে এই যা ফারাক।  এই তৃতীয় বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আমার একটি ক্ষুদ্র প্রবন্ধ বিনম্র উৎসর্গ সকল গ্রুপ নামক পরিবারের কর্মকর্তাদের প্রতি-

প্রতিষ্ঠা

প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কিছু জীব বা মনুষ্য একান্তিভূত বা একত্রিভূত হয়ে, ব্যক্তি লক্ষ্যে বা যৌথ লক্ষ্যে, সঠিক সাথী বা পাথেয় বা গুনগত সদস্য নির্বাচন করে, কোন লক্ষ্যকে নির্দিষ্ট করে, যে কোন উদ্দেশ্যে, সাক্ষাৎ বা কয়েক জন কে নেতা নির্বাচন করার মাধ্যমে, একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের সংস্থাপনকে প্রতিষ্ঠা হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

প্রতিষ্ঠা নানা ধরনের হতে পারে, প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা হতে পারে, সমষ্টিগত প্রতিষ্ঠা হতে পারে। ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার অভ্যন্তরে ব্যক্তিজীবনের সকলকিছুই, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় বা বিনোদনমূলক দৈনন্দিন কার্যকলাপ, প্রচেষ্টা ও অনুশীলনের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করে। কিন্তু একজন ব্যক্তি আরো কয়েকজন সমমনষ্কদের সাথী করে, সমভাবনার যাত্রী হয়ে, সমস্বার্থে একটি সমবায় গঠনের মাধম্যে পরিষেবা দিতে বা পেতে শুরু করে তখন তাকে প্রতিষ্ঠান বলে।

ব্যক্তিস্বার্থের খাতিরেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদে পথ চলার সূত্রপাত হয়। কিন্তু কথায় আছে একা মানে বোকা। চলার পথে সহকারি প্রয়োজন, ব্যাধি, ক্লান্তি ও একঘেয়েমি দূর করার জন্য সাথী প্রয়োজন, উৎসাহ দান হোক বা সমালোচোনা তার জন্যও দ্বিতীয় ব্যক্তি বা বহু ব্যক্তিবর্গের প্রয়োজন। এর জন্যই একক ক্ষমতার অধিকারী সত্ত্বার প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরও বহুল সমাগম সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। সেখানে যোগ্যতা অনুসারে দায়িত্বের বন্টন হয় এবং সমাহারে অর্থনৈতিক লাভের ফসল ঘরে তোলেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পূর্ন প্রয়াসে দৈহিক ও মানসিক শ্রম প্রতিষ্ঠানে প্রদান করে।

প্রতিষ্ঠানের একবার শুরু হয়ে গেলে তাকে বলপূর্বক না থামালে তাহা কখনই থামে না। এখন নিউটনের সুত্রানুসারে সেই বল আভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক যে কোন প্রকারেরই হতে পারে। বিশুদ্ধবাদীরা ভ্রু কোঁচকাবেন। প্রত্যহই সকাল সন্ধ্যা হাজার প্রতিষ্ঠানের জন্ম হচ্ছে আবার সমহারে বন্ধ ও হয়ে যাচ্ছে। বিদ্বজ্জন বলবে ভাবনার পরিসরটাকে আরো বিস্তৃত করুন। লক্ষ্য করুন বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুলোর দিকে, মানব সভ্যতার ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোন প্রতিষ্ঠানই কী বন্ধ হয়েছে? রুপান্তরিত হয়েছে, তাও খুবই সামান্য রুপে। ইসলামের মত কোন কোন প্রতিষ্ঠানে তো বদল তো দূরস্থান, বদলের কথা বলাই অন্যায় ও প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার চরমতম ধাপ।

যে কোন প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা একটি গুরুত্বপূর্ন শর্ত তার দীর্ঘমেয়াদিত্বের জন্য, আর তার জন্য প্রয়োজন অনুশাসন। যে প্রতিষ্ঠান যত বড়, জানতে হবে সেই প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ার প্রসূতি গাহ ততটাই উন্নত। ক্রমউদ্ভাবনী শক্তি ভিন্ন, সমাজে টিকে থাকা দুরুহ।

যিনি প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন বা যার মস্তিষ্কপ্রসূত এবং যারা তার সহকর্মী তথা সহ উদ্যোগী ছিলেন তারা প্রত্যেকেই সর্বোচ্চ প্রসংসার যোগ্য, এবং তারাই মুখ্য উদ্ভাবক। তবে প্রতিষ্ঠানের জন্মদাতার দায় থাকে প্রতিষ্ঠান কে মসৃণ গতি প্রদানের। প্রতিষ্ঠানকে চালাবার দায় তার উপরেই সবচেয়ে বেশি বর্তায়। একটা প্রতিষ্ঠানকে চালনা করার জন্য পরিচালন মণ্ডলী আবশ্যক। যেখানে ভালো নেতার সাথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শী বৃত্তাংশকে জুড়তে সক্ষম হলে তবেই একটি উদ্ভাবক রসশালাতে পরিনত করা সম্ভব।

নেতাকে সকল বিষয়ে পারদর্শী না হলেও চলবে, কিন্তু তাৎক্ষণিক বিচক্ষনতা সহ প্রত্যুৎপন্নমতিত্বাও নেতৃত্বের গুণটা থাকা আবশ্যক। যিনি যে কোন পরিস্থিতিতে, উদ্ভূত সমস্যার হাল ধরে তার সুষ্ঠ সমাধান করতে পারেন। কিন্তু কালের নিয়মে মেধায় স্থবিরতা আসে, মস্তিষ্ক নতুন ভাবনার জন্ম দিতে পারে না, তার জন্য উদ্ভাবনী শক্তির সরবরাহের প্রতিবিধানটাও জরুরী। এবং এটা বর্তমান পরিচালকমণ্ডলীদের সহ নেতার দায়িত্ব, সেই সরবরাহের পথটা সকল সময় ক্রিয়াশীল রাখা। যেখানে ওই পরিচালকমন্ডলী বুদ্ধ্যাঙ্ক ও শ্রমের নিরিখে মেয়াদ উত্তীর্ণ করলেও, প্রতিষ্ঠান স্বমহিমায় বিরাজ করে।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটা ভিত্তি থাকে। আর সেই ভিত্তি ততটাই মজবুত যতটা বেশি ওই প্রতিষ্ঠানের শিকড় মাটির অন্তরে প্রেথিত। প্রতিষ্ঠান যত উচুতেই উঠুকনা কেন, তাকে টিকে থাকতে গেলে যেটা বা যিনি বা যারা মূল কাঠামো, সেটা বা তাদের মাটির সাথে সম্পর্ক আরো নিবিড় করতে হয়, আর এই সম্পর্কে ছেদ মানেই ধরাশায়ী হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।

নির্মান করা আর টিকিয়ে রাখার মাঝখানের অংশটুকুর নাম পরিচালনা। নির্মানের পিছনে থাকে একটি অভিলাষের রেখচিত্র আর শ্রমিকের শ্রমের সংমিশ্রণ। টিকিয়ে রাখতে চাই নিখুঁত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, এবং সাথে জুড়ে থাকা সকলের স্বার্থ সুরক্ষিত করা। আর এই জ্ঞানটুকুর নামই প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় ‘কৌশলি তদারক’। তারাই আসলে সমাজের অভিমুখ নির্ধারন করে দেয়।

একজন শিল্পী, যার শিক্ষনিবিশি কালে অথবা শিল্পকে যখন পেশা হিসাবে বাছলেন তখন তিনি এক্কেবারেই অচেনা। কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া, তাদের সেই সংগ্রামের পিছনে এই তথাকথিত প্রতিষ্ঠানেরাই আর্থিক ও যোগাযোগের উপস্থাপক রূপে কাজ করেন। আর এই প্রতিভাকে খুঁজে বের করেন সেই কৌশলি তদারকের দল যারা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার দায়িত্বে। একজন শিক্ষক, ডাক্তার, বড় শিল্পী, অভিনেতা, জননেতা যে কেউই এই তদারকের ভুমিকাতে উত্তীর্ন হতে পারেন। হয়ত তাঁরা কোন ঘোষিত আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের অংশ নন। কিন্তু একটু গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন করলেই দেখা যাবে আসলে এগুলো বা ওই ব্যাক্তি বর্গরা নিজেই এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা তার অংশ, যার সাথে আমাদের দৈনন্দিন ভালমন্দ গুলো জড়িয়ে থাকে। বিনোদনের ক্ষেত্রেও একই। 

বিশাল ধরাধামে বিপুল জনরাশি, এখানে স্থান কাল পাত্র ভেদে সমাজ একেক রকমের। তাদের জীবনধারনের নূন্যতম শর্ত থেকে চাহিদা, মূল্যবোধ সকল কিছুই আলাদা আলাদা। তাই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠানেরও শেষ নেই। বিভিন্ন রকমের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কিছু মূল প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ করলাম, যাহার মধ্যে প্রায় সকল ধরনের প্রতিষ্ঠানই ঠাঁই পেয়ে যাবে।

একক প্রতিষ্ঠানঃ যেমন রাষ্ট্র বা সংঘ, দাতব্য সংস্থা ইত্যাদি। এরা প্রায়শই স্বয়ংসম্পন্ন।

সহকারি প্রতিষ্ঠানঃ যেমন রাজনৈতিক দল, ধর্ম সমাজ ইত্যাদি। এদের কেবল মাত্র জনগনকে প্রয়োজন।

 

বৃহত্তর সমযোজী প্রতিষ্ঠানঃ যেমন পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সর্বোপরি প্রশাসন সহ ইত্যাদি ইত্যাদি, এটা রাষ্ট্রের বা রাষ্ট্র অনুমোদিত ব্যক্তি মালিকানাধীনস্ত, এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গুলোর সাথে সমন্বয় রেখে চলার মধ্যেই তাদের অস্তিত্ব। বিবাহও কিন্তু এক ধরনের সমযোজী প্রতিষ্ঠান।

পরজীবী প্রতিষ্ঠানঃ ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, ইউনিসেফ, কর্মী ইউনিয়ন, ইত্যাদি। এরা সকল সময়েই কারো না কারোর উপর বিভিন্ন ভাবে নির্ভরশীল।

কিছু ব্যাতিক্রমী ব্যাক্তিবর্গ, বিশ্বব্যাপি কোন নতুন যুক্তিবাদের আবির্ভাব ঘটিয়ে, বিশ্বসমাজকে নতুন পথে চালিত করে, এবং তাদের ভাবনাকে বিভিন্ন বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান, যেমন রাষ্ট্র ... নির্দ্বিধায় মেনে নেয় বা মানাতে বাধ্য করে। তারাও একটা গোটা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পেয়ে থাকে। যেমন ম্যান্ডেলা, গান্ধী, আইনস্টাইন, লিঙ্কন, মার্ক জুকেরবার্গ, বা স্টিভ জোবস সকলেই প্রতিষ্ঠান

সমগোত্রীয় বা সমস্বার্থের জন্য একটি সমাজে গড়ে উঠা প্রতিষ্ঠান গুলির মধ্যে সংঘাত অবশ্যম্ভাবী। সেটা স্বাস্থ্যকর বা হানাহানি যে কোন স্তরের হতে পারে, যতই উভয়েই সমাজের পক্ষে কল্যানকর হোক না কেন।
ডারউইনের তত্ব এক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য। যোগ্যতমের উদবর্তন। সেই টিকে থাকবে, যে লড়াই করে বিজয়ী হবে- এবং এই লড়াই নিরন্তর ঘটে চলা একটা প্রক্রিয়ার নাম। কখনো কখনো যা নিজের সঙ্গেও হতে পারে। টিকে থাকার জন্য উকর্ষের কোন বিকল্প নেই।

প্রতিষ্ঠা হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোন বিশেষ ক্ষনের নাম নয়, প্রতিষ্ঠা হলো একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, সেখানে ইচ্ছাশক্তির ফলিত রুপ লক্ষিত হয়। প্রতিষ্ঠালব্ধ মনুষ্য হইবার বাসনা উন্মাদ ভিন্ন সকলেই পোষণ করে থাকে। বুদ্ধি-শ্রম--ভাগ্য এই তিনের সঙ্গম সঠিক সময়েই হলে, প্রতিষ্ঠা পাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। প্রতিষ্ঠা লাভ করার জন্য পূর্বসুরি সফল প্রতিষ্ঠান গুলির নিয়ম বিধি গুলিকে অনুসরণ করার প্রয়োজন, অনেকে অনুকরন করে ফেলেন, কিন্ত পরিস্থিতি ভেদে অনুকরন বিপদ সৃষ্টি বা বৃদ্ধি করে, কিন্তু অনুসরণ সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ সুগম করে।

_______
@উন্মাদ হার্মাদ



তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...