করোনা আবহে গৃহবন্দীর অস্বস্তি যখন কিছুটা সয়ে যাব যাব করছে, ঠিক তখনই ছাল ক্যালানো গরমটা আবির্ভুত হল এলাকাতে। কিছুদিন আগেই একটা বিধ্বংসী অগ্নিকান্ডে বাড়ির ইলেকট্রিক ওয়্যারিং সিস্টেমের অনেকটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছেতাই পরিস্থিতি করে দিয়েছিল। কিছু লাইট ফ্যান ছাড়া অধিকাংশ ইলেকট্রনিক্স গেজেটই বর্তমানে কোমায়, তার মাঝে এসি থেকে ইনভার্টার সবই আছে। লকডাউনের বাজারে এই গাঁ-ঘরে মিস্ত্রী পাওয়া দুষ্কর, থাকলেও তাকে ঘরে ঢুকতে দিতে মন সায় দেয়না, কে জানে সেই লোক করোনার বাহক কিনা। অগত্যা, ‘জান হ্যায় তো জাহান (নুসরত নয়) হ্যায়’, গরমকে এঞ্জয় করা ছাড়া উপায় থাকেনা। কারেন্ট চলে যাওয়া মানেই গরমের তাণ্ডবে মশাদের চড়ুইভাতির জন্য কুলকুল করে ঘামা কুঁদো শরীরটাকে আহুতি দেওয়া।
গতকাল রাত্রেও তার ব্যাতিক্রম হলনা, আকাশে মেঘের সঞ্চার হয়ে পরিবেশ গুমোট হতেই কারেন্ট চলে গেল। কিছুক্ষণ ছাদে
ঘোরাঘুরি করে অবশেষে নিচের তলার ঘরে সিফট হলাম বালবাচ্চা সহ। বালবাচ্চা মশারির
মাঝে খানিক বিদ্রোহ করে ঘুমিয়ে যেতেই তাদের মা ও আমার মা দুজনেই দ্রুত তাদের
অনুসারী হল। আমার এদিকে ঘুমই আসেনা, বারান্দায় এসে খানিক শুলাম- ওমা, সেটা শুধু মশাদেরই ‘ধারাবি’ ছিল তা নয়, বরং সামান্য দূরের উঠোনে হরেক কীটপতঙ্গ ও রাতচড়া পাখিদের রেওয়াজ করার
স্টুডিও ছিল সেটি। সুতরাং অবৈধ অনুপ্রেবেশের দায় থেকে মুক্তি নিয়ে অগত্যা দোতলার
দক্ষিণের ঘরে এসেই ডেরা নিলাম, মোবাইলেও চার্জ
নেই যে ফেসবুক টুইটারে গুঁতাবো।
জুলুজুলু চোখে জানালার গ্রিলের ওপাড়ে, পেয়ারা গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে- নিম গাছের কল্পিত পেত্নিকে খোঁজার চেষ্টা
করতে লাগলাম, তারপরই একটা ন্যাড়া শিমুল গাছ
কঙ্কালের মত দাঁড়িয়ে। সামনের ছোট্ট চত্বরটাকে ঘিরে থাকা কিছু হাতির শুঁড়, চটকাঠি, শেয়ালকাঁটার
ঝোপের মাঝে গলা উঁচিয়ে থাকা শ্যাওড়া, জিবলি, বাঁদরলাঠি, ফলসা, নারকেল, কাঁঠালগাছ ইত্যাদির মত জাঁদরেল পার্শ্ব চরিত্রদের
উপস্থিতি- পরিবেশের হন্টেড লুকটাকে একটা আদর্শ টেক্সচার দান করেছে। কোনও কিছুতেই
কিছু খুঁজে পেলামনা, অথচ মাঝরাত্রের
আদুরে চাঁদের আলো, সামান্য দূরে
কুকুরদের একটা স্ট্রীট কর্ণার, ব্যাঙেদের সমবেত
স্লোগান,
ঝিঁঝিঁদের গলা সাধা, ডাহুকের ছমছমানি ডাক, কয়েকটি পেঁচার পেট্রোল ডিউটির চোটে রাতকানা পায়রার ঝাঁকের কলরব ইতাদির
উপস্থিতি ব্যাকগ্রাউন্ডকে একদম সিনেমাটিক সিল্যুয়েড মোডে রেখেছিল ভয় পাওয়ানোর জন্য।
ভয় কিন্তু অধরায় রয়ে গেল। আসলে সেই যবে থেকে বিয়ে করেছি, যা কিছু প্রেতজনিত ক্রীড়াকলাপ সবই দাম্পত্যের মাঝে ঘটতে
দেখেছি একতরফা ভাবে। আমার চোখ স্ত্রীজাতির দানবীয় ঘটনার সাক্ষী বলেই হয়ত, ফচকে ভূত-পেত্নীর মত কোনো তুচ্ছ অতিপ্রাকৃত বিষয় ধরা
দেয়না চর্মচক্ষে। হয়ত সেই অশরীরীর দল ভাবে, “এই বেচারার কাঁধে এমনিতেই আমাদের গুরুমার বাস- অগত্যা কেন মিছিমিছি সেখানে
গিয়ে নিজেদের বেইজ্জত করব”! নিশ্চই বুঝতে পারছেন, সাধু-ফকিরেরা কেন প্রেতাত্মাদের দেখা পায় বা তাদের বশীকরণ করতে পারে। কারন
তাদের ঘরে বৌ থাকেনা বলেই ভূতপ্রেত আসতে সাহস পায়।
তো সে যাই হোক, চোখটা বুজে যেই
বালিশে মাথা রেখেছি- ওমা দেখি কে যেন পায়ের দিকটাতে কাঁদছে। ভূত দেখার যে আনন্দটা
ছিল সেটা ছোট্ট করে আতঙ্কে পরিণত হল, কয়েক মুহুর্তের সেই আতঙ্ক বিলাস সামলে কানটা খাড়া করে শুনতেই বুঝলাম, মাল সে যেই হোক- আছে কিন্তু ঘরের মধ্যেই। জেগে উঠে দেখার
চেয়ে ঘুমের ভান করে পরে রইলাম, কার্যক্রম বোঝার
জন্য। কান খাড়া করে শুনলাম- মিনমিনে আওয়াজ কিন্তু একজন নয়, অনেকের আওয়াজ।
- কাঁদিসনা ভাই, সবুর কর আরো কিছুদিন। নিশ্চই উপরওয়ালা আমাদের উপরে সদয় হবেন।
- সমানে মাথার উপরে টকাটক এমন বারি কাঁহাতক সহ্য হয়রে বোন!
- কিইবা করার আছে বল, আমিও তো কোমরের যন্ত্রণাতে মাজা সোজা করতে পারছিনা মোটেই।
- হুম পিঠে হাত রেখেই তো সারাক্ষণ কুট কুট করে ভাঙা জাইগাটাতে টিপে যাচ্ছে হতচ্ছাড়াটা।
তৃতীয় একজন কেউ ওমনি বলে উঠল,
- তবু তো তোদের টিপেটাপেই ছেড়ে দেয়, আর আমাকে তো জ্বালিয়ে রেখে দেয় দুপুর থেকে ভোর পর্যন্ত। এখান দিয়ে সেখান
দিয়ে গোঁজাগুঁজি চলে। আমি তো গরম হয়ে উঠি তীব্রতাতে, তবুও কী আমার নিস্তার মেলে!
একটা চোখের কোনা একটু খানি খুলে যা দেখলাম তাতে চক্ষু চড়কগাছ।
ল্যাপটপটা ভেন্টিলেশনে থাকা রোগীর মত ব্যাথাতুর আওয়াজে কথা বলছে কিবোর্ড আর
মাউসের সাথে। কিবোর্ডের সুইচ গুলো কোন নিয়মে ভাই হয়েছে সেটা যেমন বুঝতে পারলামনা, তেমনি মাউসকে কেন বোন বলে সম্বোধন করছে সেটাও অজানা; আজব কেলেঙ্কারিয়াস ব্যাপারস্যাপার।
হঠাৎ ডাইনিং থেকে একটা দেঁতো হাসির আওয়াজ এলো, অন্ধকারের মধ্যেই ঘাড়টা একটু তেরছাভাবে তাকাতেই পিলে
তড়াক তড়াক করে লাফাতে লাফাতে মুখ দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে আসার উপক্রম হল। দেখি ফ্রিজটা
হাতপা ছুড়ে গড়াগড়ি দিয়ে হাসছে, সাথে অনেক কিছুই
বলছে সবটা বুঝতে পারলামনা। এটুকু বুঝলাম যে সে ল্যাপটপকে নিয়েই তামাশা করছে।
ল্যাপটপ ও তার সম্প্রদায়েরা কখনও হয়ত ফ্রিজের ওই সারাক্ষণ চালু থাকা বিষয়ে কখনও
খোঁটা দিয়েছিল, এখন সেটাই উশুল করছে ফ্রিজ ব্যাটা। আমি যতটা সন্তর্পনে দেখতে গিয়েছিলাম, তার চেয়েও বেশি সাবধানতা অবলম্বন করে আবার স্বস্থানে
ফিরে এসে,
কিবোর্ডের সুইচগুলোর বেদনা গাথা শুনতে লাগলাম।
(২)
একটু ঢুলুনি এসেছে কী আসেনি, শুনলাম মাথার দিক থেকে বাঁশির মত পিঁ পিঁ আওয়াজে নাকডাকার শব্দ ভেসে আসছে।
নিজের নাকে হাত দিয়ে দেখলাম, উঁহু সেখানে
কোনো গোলোযোগ নেই। ভাবতে লাগলাম, হচ্ছেটা কী আজ
আমার সাথে! কিবোর্ডের মাথা যন্ত্রণা, ফ্রিজের হাত পা ছুড়ে নাচ, মোটেই গতিক ভাল
ঠেকছেনা। বৌকে হাঁক দিতে যাব, ওমনি মাথার নিচে
থেকে বালিশের আওয়াজ এলো-
- মরণ দশা, মিনসে নাক ডেকে ঘুমানোর ছিরি দেখো। বলি ও ঠাকুরপো, তোমার নাক ডাকাটা একটু কম করো বাপু, সারাদিন কনুয়েই গুঁতো খেয়ে খেয়ে আমার সারা পাঁজরে পাকা
ফোঁড়ার মত ব্যাথা তো ছিলই, এখন ওই ন্যাড়া
মাথার খোঁচা চুলের খোঁচায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। একটু শান্তিতে ঘুমোতে দাও বাপু।
পাশবালিশটা খৈনি মুখে রাখা আওয়াজে বলে উঠল, “ও ছোট, ওকে জাগাসনা ভাই। ও জেগে গেলেই
কর্তা আবার আমার উপরে তোকে ফেলে, মাথা চড়িয়ে
দেবে। বড্ড শ্বাসকষ্ট হয় রে আজকাল, ওকে শান্তিতে ঘুমোতে দে।
বিছানাটার ছাদরটা দেখি ফ্যাচ ফ্যাচ করে হেঁচে নিয়ে, সর্দি ধরা গলায় সুর করে বলল, “টয়লেটে যাওয়া
ছাড়া আমার কোনো রক্ষা আছে! এখানেই খাচ্ছে, হাত মুছছে, নাকের শিকনি
থেকে চোখে পিঁচুটি, কানের খোল, পাছার ফুসকুড়ির রস সব পুঁছছে আমার উপরে”। ভীষণ রকমের
চোটে গিয়ে গদিটা বলে উঠল, “ওলো চাদর মাগি-
তোর তো তবু শিফটের ডিউটি, হপ্তায় দু’দিন
চান করারও সুযোগ পাস, দড়িতে দোলনাতে হাওয়াও খেয়ে আসিস। আর আমরা! আমার কথা ভাব দেখিনি, সারাটা দিন আমার উপরে নেত্ত করছে, গড়াগড়ি খাচ্ছে, খেলা করছে, লাইট বন্ধ করে
অন্ধকারে শোয়ার নামে যা সব বিচ্ছিরি কাজকম্ম করে- ম্যা গো, ছিঃ ছিঃ ছিঃ, লজ্জায় তাকাতে
পারিনা নিজের পানেই। এসব তো আমাকেই সইতে হচ্ছে”।
এবারে একটা কফ বসা ধরা গলায়, গলাখাঁকারি দিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে খাটটা বলে উঠল, “আমি বুড়ো হয়ে গেছি বলে কি তোরা আমাকে হিসাবের মাঝেই
আনছিসনা মনে হচ্ছে। কাঠের তৈরি খাট বলে কী আমি মানুষ নয়! আমার এই চার পায়ার উপরেই
তো তোদের পৃথিবী। দীর্ঘদিন নড়াচড়া না করে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে বাতের ব্যাথায় বড়
কাহিল, অনেকদিন ইউরিক এ্যাসিডের লেভেলটাও চেক করা হয়নি রে। তার উপরে ওই হাতির মতন শরীর নিয়ে ধম্বল মারা, আর যে সহ্য হয়না রে। আগে তো এমন জলহস্তী ছিলনা, হঠাৎ এমনতর কেন হল রে!
এদের আলাপচারিতার মাঝেই, ‘ওরে আমার কি হলো রে, এবারে আমাদের কি গতি হবে রে!’ বলে কারা যেন মাতন করছে। রাজস্থানে রুদালি
নামের এক মহিলাদের দল আছে যারা দল বেঁধে এমন করে মড়াকান্না গেয়ে থাকে, পেশাদার বিলাপকারীর দল, কিন্তু আমার ঘরে আবার রুদালি কোত্থেকে এলো! ঘুরঘুট্টি অন্ধকারের মাঝে আমিও
যেমন কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা আমাকেও কেউ দেখতে পাচ্ছেনা। ল্যাপটপ সম্প্রদায়ের
খচরমচরের মধ্যেই আমি নিঃশব্দে উঠে গেলাম সেই রুদালির কান্না লক্ষ্য করে। কান খাড়া
করে সামান্য অনুসন্ধানের পরেই উৎসস্থল খুঁজে পেলাম, আমার জামাকাপড়ের আলমারি থেকে আওয়াজ আসছে।
খুব সন্তর্পনে দরজাটা ঈষৎ খুলতেই কে যেন হেঁড়ে গলায় গেয়ে উঠল, “We're on our
way, way, way/We're on our way somehow”। কথাটা বিশুদ্ধ সাহেবি উচ্চারণে, সাহেবি কেতায়, কতকটা যেন টনি গ্রেগের ধারাভাষ্য দেওয়ার মত লাগল। মনে
মনে ভাবলাম, ইংরেজ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে কী
এই আলমারিতেই কোনো গোরা ভুতের আরক রেখে গিয়েছিল নাকি! ভূত দেখার আতঙ্কে ও আনন্দে
একটা লাফ দিতে যাব, ওমনি একটা ডেঁপো
গোছের কেউ বিচ্ছিরি ভাবে বলে উঠল- “আরে ও কাক্কা, তোমাকে তো ওয়াড়া ঠিক কেউ না কেউ দখল করে গায়ে চড়াবেই। কখনও কাউকে দেখেছো
ব্লেজার-কোট ফেলে দিতে! অতো ইঞ্জেরি না ফুটিয়ে আমাদের কথাটা একটু ভাবো বস, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত শতচ্ছিন্ন ঘরমোছা ন্যাতা হয়ে বাঁচা
ছাড়া আমাদের আর কোনো গতি হবে”!
মাঝ বয়সী কাকু টাইপের কেউ একজন বলে উঠল, “ওরে ও জাঙিয়া, তুই থামতে বাপু
কত নিবি বলতো? অসভ্য স্থানে যাদের সাথে ঘরকন্না করিস, তাদের নাম নিয়ে কী ডাকাডাকি না করলেই নয়? ভদ্রসমাজে ওগুলোকে গালিগালাজ বলেরে হতভাগা, বলি মানুষ হবি কবে”! পাল্লাটা আরো একটু খুললাম, চোখ ততক্ষণে সয়ে গেছে অন্ধকারে। উদাস মুখে স্যান্ডো
গেঞ্জিটা যেন নিজেই নিজেকে বলল, “আগে বগলের গন্ধে
অতিষ্ট হয়ে, কিম্বা ডিও’র স্প্রের গন্ধে হেঁচে
হেঁচে প্রাণ যেন; এখন বাকি জীবনটা
রান্না ঘরের ন্যাতা হয়ে হাঁচতে থাকবো ফোঁড়নের গন্ধে। এই তো জীবন, টি-শার্টদা”।
আরেকটা ফুলহাতা জামা যেটা গতবছর কে যেন গিফট দিয়েছিল, সে মঞ্চে ভাষণের মত বলে উঠল- “বন্ধুগণ, সুখ দুঃখ নিয়েই
এই ক্ষণস্থায়ী পোশাকজীবন, তোমরা তবুও জানো
তোমাদের ভবিষ্যৎ কোনদিকে। আমাদের কথা ভাবো একবার, কোথায় ওয়াসিং মেশিনে স্নান করতাম দামি সুগন্ধি ডিটার্জেন্ট দিয়ে, কত সুন্দর ইস্তিরি করে ভাঁজে ভাঁজে রাখা হত, হাওয়া খাওয়ানোর জন্য হ্যাঙ্গার ছিল। দামি পারফিউমের
বিন্দু গুলোও তো আমার শরীরেই ছেটনো হত। এখন ভাবো, মালিকের বৌ নিশ্চই গরীবদের বস্ত্র দানের নামে আমাদের ইজ্জত লুন্ঠন করবে।
সেখানে কোথায় ডিটার্জেন্ট, কোথায় ইস্ত্রি
আর কিসের পারফিউম। মালটা যদি মাতাল হয় তাহলে তো কথায় নেই, আমার এই রেশমি শরীর মদের গন্ধে মাখামাখি হয়ে কোনো
নর্দমাতে পরে থাকবে, পারফিউমের বদলে
নেড়ি কুত্তার হিসু স্প্রে হবে”। বলেই ডুকরে কেঁদে উঠে হাতা দিয়ে চোখের জল মুছল।
তখনই একটা হাফহাতা জামা যেটাকে সেই বিয়ের আগে কিনেছিলাম, সে রাশভারি বয়স্ক গলায় বলে উঠল- “আচ্ছা তোমরা সবাই কি
গো! আমাদের মালিকের মৃত্যু হয়েছে। অশৌচ চলছে, কোথায় তোমরা কান্নাকাটি করবে তা নয়- খুনসুটি আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুরু করে
দিয়েছো,
বলিহারি তোমাদের পোশাকিকতা”। বুঝলাম দীর্ঘদিন
এদের ব্যবহার হয়নি বলে ওরা ভেবে নিয়েছে আমি নিশ্চিত মরে গেছি।
দরজাটা যেই বন্ধ করে খাটে ফিরৎ যাব, কেউ যেন সিটি মেরে ডাকল আমাকে। চতুর্দিকে জানলা দরজা সব দেখলাম, উঁহু কেউ তো কোথাও নেই। আবার আওয়াজ এলো, “করনা, দরজা বন্ধ
করনা”। শুনলাম সে আবার উর্দু শায়ারি বলছে- ‘কবসে ইস পিয়াসী কন্ডেন্সারমে বারিসকে
বুন্দ তক নেহি গিরি, আব বৈশাখী আয়া”।
নিশ্চই কোনো দুশ্চরিত্রা মেয়েমানুষ, নাহলে এভাবে সিটি মেরে, দরজা বন্ধ করার
অবৈধ ইঙ্গিত কে করবে! ভেবেই নিলাম, যে হবি হ বাবা- আমি আর তাকাবোনা। কে কে না কথাবার্তা বলছে আজকে, শেষে কী আমি ক্ষ্যাপাই হয়ে গেলাম! বালিশে যেই চিৎ শুয়েছি, দেখি উঁচু দেওয়াল থেকে কুৎসিত ইঙ্গিত করছে এসিটা।
ভাবখানা এমন, সে যদি নিচে চলাফেরা করতে পারত
এক্ষুনি আমার ইজ্জত লুটে নিত। এসিটা সমানে আমাকে হাকাডাকা করে যেতে লাগল যাতে তাকে চালু করি। আমরা মাত্র ১ মাসের
লকডাউনেই হাফিয়ে উঠেছি, সে বেচারি ৭-৮
মাস বন্ধ,
ব্যাকুলতা তো স্বাভাবিক।
(৩)
নাহ, ঘুম আসছেনা। ভাবলাম- যাই দেখি
বাইরের বাকি সব আসবাবপত্রের কী দশা। রান্নাঘর থেকে কিছু খেলাধুলার আওয়াজ পেলাম, কিন্তু যেতে সাহস পেলামনা। ওটা বৌ এর এক্তিয়ারে, তাছাড়া আমি দীর্ঘদিন ও মুখো হইনা- পরপুরুষ দেখে যদি
চালডাল,
শাকসব্জি, মশলাপাতি, হাঁড়িকুড়ির দল
চেঁচিয়ে উঠে- মানসম্মানের ব্যাপার। সিঁড়ি দিয়ে নিচে যেতে যেতে দেখলাম, বেসিন- ওয়াসিং মেসিন আর জলের দেওয়াল ফিল্টারটা মস্তিসে
গানের লড়াই আন্তাক্সরি খেলছে। তাদের
উপেক্ষা করে নিচের ড্রয়িংরুমে যেতেই দেখি বুক সেলফে কিসের যেন উৎসব চলছে জমায়েত
করে। মনে হল সবকটা বেল্লিকের কান থাবড়ে বলি- ওরে বোকাচন্দ্রের দল, দেশে লকডাউন চলছে; এভাবে গাদাগাদি ভিড় করে ফুর্তি করা মানা। যেই কথাটা বললাম, একটা মোটামত বই বেশ দাঁত খিচিয়ে বলে উঠল- “ওহে ছোকরা, আমরা বই- আমাদের বেশি জ্ঞান দিতে এসোনা, বিশ্বের যাবতীয় জ্ঞান সব আমাদের জ্ঞাতি ভায়েদের
বুকেপেটেই রাখা আছে। তাছাড়া গাদাগাদি করেই আমরা সেলফে থাকি চিরকাল, আমরা কেউ এয়ারপোর্ট হয়ে একখানে ঢুকিনি
যে করোনা হবে…”।
লম্বা ভাষণ দিতে শুরু করেছিল আরকি, পালিয়ে বাঁচলাম। যেটুকু বুঝলাম- বহুদিন পর ওদের ধুলো ঝেরে একে একে বের করে
পড়েছি বলে তাদের আতিসায্যের শেষ নেই, বারংবার হাতের ছোঁয়া পেয়ে তারা ভীষণ উজ্জীবিত। যদিও অন্ধকারে আমাকে চিনতেও
পারেনি ব্যাটারা, তাই ভুলকরে
মালিককেই দুটো ছোটবড় কথা কয়ে ফেলেছে মুখ ফসকে; ক্ষমাই করে দিলাম । গ্যারাজে গিয়ে দেখি বাইকটা আর গাড়িটা যুগলবন্দী করে
কীর্তন গাইছে। জুতোগুলো তাদের যোগ্য সঙ্গত দিচ্ছে দোহারে তালি বাজিয়ে। কী জানি
বাবা,
এরা হয়ত আমার শ্রাদ্ধ শান্তিই করে এখন
কীর্তনের আসর বসিয়েছে। সামনে যাওয়াটা সমীচীন মনে করলামনা, ধর্মকর্মে বাঁধা এলে রাগ হওয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া
অন্ধকারে জুতো পেটা হোক বা গাড়ির চাকায় পিষে যাওয়া, কোনোটাই সুখকর হবেনা।
মানে মানে পালিয়ে এসে দেখি, বালিশটা সমানে গজর গজর করে যাচ্ছে কারো একটা নাক ডাকাকে কেন্দ্র করে। এবারে
আমি সেই বাঁশির মত নাকডাকার পাত্রকে খুঁজতে গিয়ে দেখি, আমার মোবাইলটা ওই দুষ্কর্ম করছে। বালিশের হাঁকাহাকিতে সে
স্ক্রিন মেলে চাইল ম্যাড়ম্যাড়ে ব্রাইটনেসে। কিছুটা আড়মোড়া ভেঙে বলল, “তোদের এত সুখ তবুও অভিযোগের শেষ নেইরে বর্বরের দল। আমার
কথা ভেবেছিস কখনও, ঘুমের ঘোরে হাত
ফসকে মুখের উপরে না পরা পর্যন্ত, কবে আমাকে
ছেড়েছে বল দেখি! সারাটাক্ষন তো আমারই পিছনে পড়ে আছে কারনে অকারণে। বই পড়লেও আমায় দিয়ে ট্রান্সস্টেলর খোলাবে, উইকিপিডিয়া, গুগুল, ফেসবুক, টুইটার, ক্যামেরা, গেম খেলা, সিনেমা দেখা, গানশোনা, পেমেন্ট করা, কথা বলা সহ নটি আমেরিকা হয়ে ক্যালকুলেটর সেজে কিনা করতে
হয় বলতে পারিস? রণে বণে জলে জঙ্গলে স্বর্গে নরকে
তো বটেই,
বাথরুমেও আমাকে নিস্তার দেয়না। মালিক ঘুমালেও
কী আমার শান্তি আছে, ওমনি পিছনে
চার্জার গুঁজে দেবে সারারাত। তবুও তো তোরা কাঁদছিস, এদিকে আমি শোকে পাথর হয়ে গেছি।
এবারে আমাকে জেগে উঠতে দেখে- ল্যাপটপ সম্প্রদায়, বালিশ, বিছানা, খাট ও মোবাইল সবাই মিলে একসাথে প্রশ্ন করল। আমার এই ঘরে
থাকার পিছনের রহস্যটা কি! ধীরে সুস্থেই বললাম, বিশ্বজোড়া অতিমারি পরিস্থিতির জন্য দায়ী করোনা ভাইরাসের কথা। ওমা সে কথা
শোনা মাত্রই ল্যাপটপ থেকে মোবাইল হো হো করে হেসে উঠল। ল্যাপটপ বলল, এ আর কি এমন বড় কথা! ভাইরাস তো জলভাত ব্যাপার, আরেকবার আন ইনস্টল করে ইনস্টল করে নিলে মালফাংশন দূর
হবে। মোবাইল বলল- আরে বস লেটেস্ট ভার্সনটা আপডেট মেরে নাও না, বাজারে কি স্ক্র্যাপ মাল লিক হয়নি!। সমানে তাদের জ্ঞানের
ঝুলি থেকে একের পর এক পথ্য দিতে পাগল; বুঝলাম, এদের কাছে ভাইরাস নিয়ে আলোচনাই
বৃথা।
আমার নিজেরই কেমন মায়া হয়েছিল, সান্ত্বনা দিয়ে কিছু বলতে যাব ভেবেছিলাম, এখন ওদের ভাইসার জ্ঞানের ভাঁট আলোচনা শুনে কান গরম হয়ে উঠল। আমি চেঁচিয়ে
কিছু বলতে যাব, ঠিক তখনি খানিক দুলে উঠে সিলিং
ফ্যানটা ভয়ানক রাগী মুখে বলে উঠল- “আমাকেও কী একটু শান্তিতে বিশ্রাম নিতেও দিবিনা
আহাম্মকের দলেরা? সময়ে ঘুম তো
আমার জীবন থেকে কবেই গায়েব হয়ে গেছে, সামান্য লোডশেডিং এর সময় টুকুই তো বিশ্রাম এই জীবনে। আজকাল কারেন্টও যায়না
নিয়মিত,
এদিকে চৈত্রের শুরু থেকে তো সমানে চলেই
যাচ্ছি। আজকের এই সুখ টুকুও কি ছিনিয়ে নিবি উজবুকের দল”। বলেই ভীষণ রেগে গিয়ে বনবন
করে ঘুরতে লাগল নিজের চারপাশে।
ফ্যান অমন রেগে পাগলের মত বনবন করে ঘুরতে শুরু করতেই, আমি ধড়মড় করে জেগে উঠে বসলাম, নিরাপদ দূরত্বে সরে যাব বলে। জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি
বাইরের অমানিশা কেটে ভোরের আলো এই ফুটলো বলে, কারেন্ট চলে এসেছে তাই ফ্যানটা চালু হতেই ঘুমটা ভেঙে গেছে। মানে ওই গরমের
মধ্যেই চোখটা লেগে গিয়েছিল। তারপরেই মনে পরল সেই সব অদ্ভুতুড়ে ঘটনা গুলো। যাই হোক, আজ ল্যাপটপ মোবাইলকে কিছুটা বিরাম দিয়ে, জামাজুতো পরে গাড়িটা নিয়ে একটু চক্কর মেরেই আসি। যতই
স্বপ্ন হোক, ব্যাথার কথা গুলো তো নিজে কানেই
শুনেছি।
ও হ্যাঁ, তোমরা যেন আবার কেউ পাঁচকান কোরোনা এসব কথা, লোকে উন্মাদ বলবে।
-সমাপ্ত


