কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৯

মিথ্যার বেসাতি



মিথ্যা প্রেমের নাট্য শিল্পী, ধিক তোর জনমে;

স্বার্থবাজের মূর্ত প্রতীক, জুয়াচুরি রোমে রোমে।
প্রেমের ডালি সাজিয়ে ছিলি,
যবে ছিলনা ভবিষ্যৎ;
আঁধারেতে ঢাকা নিঠুর পৃথিবী,
ক্লান্তির বাঁধা গত।
ছলনাতে হায়, ভুলেছিনু তাই- লোপ পেয়ে বোধবুদ্ধি;
লক্ষ্মী পালালো, হইনু ভিখারি, হারায়ে ধন ঋদ্ধি।।

পরভাষা লয়ে প্রিয়া মোর তবে, যেন দূর দ্বীপবাসিনী;
শূন্য হৃদয় খুঁজে ফিরে চলে, মানস প্রতিমা- যে আসেনি।
    নিয়মিত- ছলনা ফাঁদে বেঁধে,
    বিষাদ প্রতিমা, ছন্দবদ্ধ কেঁদে--
    আত্মীয় যত ছিল তোর ঘরে,
    বর্বর দল একই চরাচরে।
কত প্রলোভন, লাখো উচাটন, দিবানিশি ছলাকলা;
সাথী ছিল তবু, অভিনয়ে ভুলে, নব অভিমুখে চলা।

ফল ফুলে ভরা সাজানো ডালি, উপেক্ষা করে তারে-
কোন সে পাপের সাজা খাটতে, তোকে চড়ালাম ঘাড়ে!
    চরিত্রহীনের পদবী জুটলো,
    বৃহস্পতিও মাথা কুটলো;
    দুয়ো দিয়ে গেল মোরে,
    ‘ছেড়ে গেলাম আজ তোরে।
ছদ্মবেশী পুতনা যক্ষী, গরিমা করেছে পান;
সর্বগ্রাসী ক্ষুধা নিয়ে তোর, ললাটে লয়েছে স্থান’।

সুখ পাবিনা দুনিয়া খুঁজেও, হয়ে গিয়ে উন্মাদ;
অপত্যটাও লুকাবে লাজে; শরমেতে বরবাদ।
    বুনিয়াদী শখ হবেনা পূর্ণ,
    হিংসা, লালসা- চিত্ত দীর্ণ।
    আরো লোভ, শুধু দাও দাও রব;
    পেয়ে স্বীকৃতি, হয়েছি যে শব।
অভিশপ্ত জীবন তোর, যে রাতের নেইকো ভোর।
মাথা উঁচিয়ে বাঁচার স্বপ্নে, হলাম শেষে চোর।।

সংসারে ঠিক যতটা অপটু, ততটা দক্ষ প্রতারক;
অপর ঔ-রসে, জঠর ভরায়ে, উচ্চ শ্রেনীর ঠগ।
    অশান্তিতে করলি নিঃস্ব,
    দেখল দাঁড়িয়ে সারা বিশ্ব;
    প্রতিশ্রুতির সরণিতে তুই,
    চিরকালই স্থান ছিল দুই।
মিথ্যা ফানুশ ফেটে গেছে বোঝ, নিয়তি পরিষ্কার;
‘আমি’ হারা হয়ে, বাঁচবি’রে নারী- সাথী হবে হাহাকার।

মঙ্গলবার, ১৪ মে, ২০১৯

রাষ্ট্র


 
রাষ্ট্র

প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র- কেমন আছো! শুভেচ্ছা নিও তুমি;
তোমার বুকেতে লালন করেছো, প্রণমী জন্মভূমি।
শিক্ষা দিয়েছো, দীক্ষা দিয়েছো, মান-বোধ-জ্ঞান-উন্মেষ;
তবু আজ দেখো তোমার শরীরে, ঘৃণা- জিঘাংসা- দ্বেষ।
কখনও নিজেকে শুধায়েছো! কীভাবে হল এমন
গণতন্ত্রে প্রশ্নরা আজ লুকাচ্ছে প্রাণপণ।
তোমার নেতারা পরিবৃত্ত, উমেদার চাটুকারে
মিথ্যা শকট সবেগেতে ধায়, কে আজ রুখিবে তারে!
রাষ্ট্র মানে কী? জনগণ! নাকি রাষ্ট্র-নেতার খেয়াল!
কায়েমি স্বার্থ চরিতার্থ, ভাবনার মাঝে দেওয়াল।
রাষ্ট্র তুমি পালনকর্তা, ইতিহাসে দায় তোমার;
আজ যে চালক, কাল সে হারাবে- করে দিয়ে ছারখার।
আজানে-ভজনে কলতান উঠে, ঐক্যের সুর বাতাসে-
জাতি বিদ্বেষী শ্বাপদের দল, আড়ালেতে কুট হাসে।
রোজগার নেই যুবক সমাজ, মাথা কুটে মরে ঘরে-
রাষ্ট্র মত্ত মিথ্যা প্রলাপে, অকালে মুকুল ঝরে।
প্রথমে নিলে মায়ের পয়সা, কোষাগার লোটে বণিকে;
দরিদ্রকে ভিখারি করেছো, রাজা বানিয়েছো ধনীকে।
প্রতিশ্রুতির মিথ্যা প্রচারে, প্ররোচনার হাতে ক্ষমতা
অর্থনীতি পাতালমুখী, দিশেহারা আজ জনতা।
রাষ্ট্র, আজ তুমি দুষ্টু ভীষন, ভাইয়ের ঘরে দিলে শোক;
তিন পুরুষের ভিটেয় তারা, হয়েছে আজ বিদেশী লোক।
রাষ্ট্র তোমার দলপতি শুধু, রাজনীতিটাই বোঝে;
মানুষে মানুষে লাগিয়ে দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার রাশ খোঁজে।
তুমি অসভ্য, তুমি কাপুরুষও বটে- সন্তানেরে দিলে বলি?
কেমন পিতা! পাষণ্ড পিশাচ- করো মায়ের কোল খালি।
তুমি ঠক, তুমি জোচ্চোর আজ, অহংকারীর শাসনে-
নিজের রক্তে আহুতি নিচ্ছ, অবিশ্বাস প্রতিজনে।
শোনো গো বধির ক্ষমতাওয়ালা, চেয়ে দেখো ওই দূরে-
ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে সমাজ, যাবে তুমি জ্বলে পুড়ে।
সংবিধান, আজ বাতিল কাগজ- তুমিই বানিয়েছো তারে,
ওহে মূর্খরা ইতিহাস দেখো, শাসক থাকবে আস্তাকুঁড়ে।
নিজের পাপেতে ডুবে যাবে কাল, বেঁচে নাও আজ সুখে;
স্বৈরাচারী-- তোমার বিচার হবেই, জনগণই দেবে রুখে।
পিছোতে পিছোতে দেওয়ালে পিঠ, ঠেকে গেছে জেনো মিথ্যুক;
বিস্ফোরণের প্রতীক্ষাতে, স্ফুলিঙ্গ ভরা কোটি বুক।।
সভ্যতার শিখরে উঠছি, তবু হৃদয়ে নোংরা গ্লানি;
বিনম্রতার মুখোশধারী, প্রজাপীড়ন হানাহানি।
অসহায়কে তাড়িয়ে তুমি, কী সুখ পাবে বলো-
মানব সকলে তোমার যন্ত্রে তৃণসম হারে দলো।
ধিক তোমার বিশালত্বে, যদি আর্তরে না দিলে ঠাঁই;
নির্যাতন আর জুলুমে ঠেসে- দেশপ্রেম খোঁজো তাই।
তুমি মৃত নাকি জীবিত- এটা জবাব দেওয়ার ক্ষণ
নতুবা তোমার প্রতিটি ইঞ্চি বুঝে নেবে জনগণ।
জনগণ দিয়ে তৈরি তুমি- নাকি ভূখন্ড দিয়ে ঘেরা!
পরিচয় দিতে বাধ্য, তোমায় আগামী করবে জেরা।
যুঝে নেবে তোমার মূর্খ রাজাকে, স্তাবক সপার্সদেরে-
রাজপথে তার হবে যে বিচার, ক্ষমতা লইবে কেড়ে।

বুধবার, ১ মে, ২০১৯

উপন্যাস



উপন্যাস

কলেজের প্রথম বেঞ্চের মৃদুভাষী মেয়েটি যখন
রাজনীতিতে নাম লেখাতে, সবাই আশ্চর্য হল তখন।
সুন্দরী বিদুষী, উপরি পাওনা কলেজের টপার-
পুরুষের প্রাণে ঢেউ তুলে সে, করত যে ছারখার।

চোখ তুলে সে চাইলে পরে বর্ষা যেত ছুটে-
মন খারাপে, মেঘের দল জমত এসে ছুটে।
অমিত গুণের সমন্বয়ে, বিদুষী লগ্নজিতা-
ছাত্রনেতা দেবুর প্রেমে পড়ল সুচরিতা।
আকাশ বাতাস তুফান তুলে, করে দিয়ে আশ্চর্য;
গ্রুপ স্টাডিতে পড়ার বাহানা, আসলেতে সহচর্য।
দিন যায়, ঘনিষ্টতা বাড়ে। ওদের বন্ধু সুদীপ,
আরেক বন্ধু দত্তার পাড়ে, ভিড়িয়ে নিজের ছিপ।

অপেক্ষাতে ছিলনা যে তার, বর্ষা শীত বা গর্মি-
গ্রাম্য আসাদ শান্ত ভীষণ, নিপাট সখী উর্মি।
লাইব্রেরি পাঠ সিদ্ধ করে, কফি হাউজের ঠেকে-
গ্রন্থমেলায় আরো কাছাকাছি, জীবন যে যায় ডেকে।
রাজনীতিতে অশান্ত দেশ, বন্ধু বৃত্তে ঝড়
প্রশ্ন যখন আদর্শের, তখন- কে আপন কে পর!
বহুমাত্রিক জ্ঞান বিনিময়, ঋদ্ধ সকল জনে,
বিধাতার খেলা বোঝা বড় দায়, কী ছিল তার মনে।

দুটি প্রাণ বেয়ে ফল্গু নদী, কত স্রোতে অভিলাষা
কত অভিযান, আগামী নকশা- কল্পলোকে ভাসা।
পনেরো মাসের প্রণয় শেষে, ব্যত্যয় বিরহময়,
জেনে রেখো উপন্যাসে সে- ‘প্রবঞ্চক্ষণে প্রণয়’।

বৃহস্পতিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৯

গল্পের আত্মহত্যার গল্প



গল্পের আত্মহত্যার গল্প

১)
ভীষণ রকম হতাশ হয়ে তিনকড়ি চাঁদ কুণ্ডু,
বিচ্ছিরি সিদ্ধান্ত নিল, যার নেইকো মাথামুণ্ডু;
নিরুদ্দেশে যাবে! নাকি করবে আত্মহত্যা!
কৌশল তার যাই হোক, সে রাখবেনা তার সত্ত্বা।
ভাবতে ভাবতে দিন ফুরিয়ে রাতের পরে ভোর,
ফকির সাধুর আবাস হয়ে গনৎকারের দোর;
তাবিজ কবজ ঝাড়ফুঁকেতে হয়নি কোনো কাজ,
বাস্তুশাস্ত্র যোগবিদ্যাও মিথ্যা হল আজ।
প্রথম বারে বিফল চেষ্টা, রেল লাইনে শুয়ে,
শিরদাঁড়াতে হিমেল স্রোত, ভয়ের পালক ছুঁয়ে।
জলে ডুবে মৃত্য! অতি উত্তম। সাঁতার সাধল বাধ,
উঁচু উঠলে ঘোরে মাথা, তাই ভাবনাতে নেই ছাদ।
গলায় দড়ি, কী বীভৎস- জিভ বেড়িয়ে ভয়ানক;
বিষ খেয়ে যে ছটপটানি, সয়ে থাকা যায় কাঁহাতক!
মরতে তাকে হবেই, সে স্বপ্নে দেখে রোজ-
কিন্তু সেটা কোন উপায়ে! চলছে তারই খোঁজ।
২)
চক বাজারে মোড়ের মাথায় দশকর্মার টঙ,
তিনকড়ি চাঁদ কবিতা লেখে, ভাবনাতে নেই জং।
গাজন মেলায় ফি-বছরে সাজে শিবের সঙ,
নিন্মবিত্ত জীবনযাত্রা, হরেক রকম রঙ।
পুরুল্যাতে শ্বশুরবাড়ি, ললিতার বাপ ঘর,
পাল-পাবনে পাড়ার সভায়, তিনুর ভীষণ দড়।
খুকির বিয়ে শ্রীরামপুরে, জামাই দা-রোগা
খোকাটাই শুধু অকর্মন্য, ভীষণ পেট রোগা।
গিন্নির উপর বলবে কথা, এমন সাধ্যি নাই,
তার আদরে বাঁদর খোকা, বাপের হোটেলে খায়।
কাজের প্রশ্নে ধমকায় মাকে, বয়স ছুঁয়েছে পঁয়ত্রিশ;
কথার মাত্রা- ‘ঘর ছাড়ব, কিম্বা খাবো বিষ’।
আট কেলাসে তিনবার ফেল, অঙ্কে ভিক্ষাজীবী,
ইতিহাস জ্ঞান ভুগোলের খাদে, বিলাপের পৃথিবী।
বসলে টঙে করে চুরি, কুঁড়ের হদ্দ খোকা;
বাজার গেলে কানা দরবেশ, চারঅক্ষরের বোকা।
৩)
নির্বোধ ওই ছেলের দয়ায়, মুখ লুকানো দায়-
আজকাল নাকি পড়েছে প্রেমে, মাঝরাতে গান গায়।
ছেলের মা সে ভীষণ খুশি, আহ্লাদে আটখানা,
বিয়ে দিলেই দুদিন পরে ঘরভর্তি ছানা।
তিনকড়ি চাঁদ ভাবে, ‘ছেলের নেই কোনো রোজগার-
ঝোঁকের মাথায় করলে বিয়ে, বাড়তি পেটের ভার…’;
ছেলের জন্য করল মানত, ভক্তি বাড়ল দেবদ্বিজে,
দোকানে কম, থানে বেশি- শঙ্কিতভাব নিজে।
বহুকষ্টে জুটিয়ে চাকুরী, পাঠিয়েও ছিল বিদেশ;
গুণধর ছেলে বিভূঁই গিয়েও, ঝামেলা বাধালো বেশ।
বিপুল ঋণে পনবন্দি, ঘরে পাঠালো তার,
ভগিনীপতি ফন্দি বানায়ে, সে যাত্রায় ছার।
রাজনীতিতেও হয়েছিল শখ, মাস আষ্টেক আগে;
নধর পাঁঠা, চামচার দল- পেল তাকে বেশ বাগে।
নেতার পাপ মাথায় নিয়ে গণপিটুনির শিকার,
ডান পায়েতে রিঙটাল হল, মস্তিষ্কে বিকার।
৪)
বহু শখ করে ছেলের নাম, রেখে- ছিল ঈশ্বর;
নামার্থ আজ গঞ্জনা দেয়, বুকে এসে বাঁধে শর।
ঈশের প্রণয়ী মেয়েটির পিতা, দালালির কারবারি
বদমেজাজী, অতিশয় ধুর- টাকা আছে কাঁড়ি কাঁড়ি।
কীভাবে যেন পেয়ে সে খবর, ছুটলো তিনুর বাড়ি
ধমকি দিলো- ‘বোঝাও ছেলেরে- নইলে ভাঙব হাঁড়ি।
তারও পরে না শোধরালে ভিটেয় চড়াবো শকুন,
আমার মেয়ের ছায়া মারালে, বংশ করব খুন’।
নিখোঁজ হল ঈশ্বরচাঁদ, সাথী সেই দালাল কন্যা!
সালিস সভায় তিনকড়ি চাঁদ, বেইজ্জতির বন্যা।
ভিন জাতেতে করল বিয়ে! এত্তোবড় সাহস!
শত অপমানেও তিনকড়ি চাঁদ- মনে পায় পরিতোষ।
ছেলের মা’ও কেঁদে ভাসে, সান্তনা দেয় স্বামী;
সময় থাকতে মানুষ করলে, হতনা সে আসামী।
জামাই বলে- ‘সাবালক, তাদের নেইকো কোনো ভুল।
থাকবে তারা, আমরা কারা? সরাও মনের ঝুল’।
৫)
মোল্লা পাড়ার নিদান আসে, মুন্ডুটা চায় কুন্ডুর
টিকিধারীরাও সমানে-সেয়ানে, ধর্ম যাতনা ভরপুর।
দুটো মানুষ নিজের মত, বাঁচতে চাওয়ার অধিকার,
সমাজ নামের ব্যবস্থা কেন করবে সেটা ছারখার?
তিনকড়ি চাঁদ নিঃশ্বাস নেয়, বুকে নিয়ে এসে বল-
করবে লড়াই সমাজের সাথে, নয় সে যে হীনবল।
ওমা সেসব কোথায় কী! পাঁচটি দিন পরে-
গুড়গুড়িয়ে ঈশ্বর চাঁদ এলো একা ফিরে ঘরে।
বলল এসে-‘ভুলবশত ভুল ট্রেনেতে চড়ে;
ভুল জায়গায় পৌঁছে- ভয়ে, ধরেছিল তাকে জ্বরে।
অচিন গঞ্জে চিকিৎসা সেরে, ফিরতি রেলের গাড়ি,
দিবা-রাত্রি সফর শেষে, ফিরল যে নিজ বাড়ি।
দালাল বাবুর কন্যাটি শাদি, করেছে চাকুরীজীবীকে
ঈশ্বর চাঁদ বিফল মাকাল, নির্গুন সবই দিকে।
এমন ছেলের বাপ হয়ে বেঁচে থাকাটাও পাপ-
আত্মহত্যা বিধির বিধান, নেই তাই কোনো মাফ।

বৃহস্পতিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৮

সম্পর্ক



আমি মোনালিসার মতো প্রহেলিকা, তুমি বলেছিলে-

মানসপটে আমার প্রতিকৃতি এঁকেছিলে, অভিলাষে;
ক্লান্ত মরিচীকা ধরা পরেছিল, সোহাগের জালে।
সুদূর সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতির কুলুঙ্গিতে রাখা প্রেম,
আজও ভীষণ প্রাসঙ্গিক, ব্যক্তি আমির কাছে-
সময়ের পরিধিতে দুরত্ব বেড়ে যায়, সম্পর্করা মরেনা।।
প্রেমের ব্রহ্মাণ্ডে কখনও তুমি নীহারিকা, চতুর্দিক ধোঁয়াশা;
কখনো কৃষ্ণগহ্বর, সর্বগ্রাসী প্রেমে গ্রাস করেছিল সত্ত্বা-
পিপাসিত তুমি, আমার বক্ষের গরল করেছিলে পান;
উরুসন্ধি রণাঙ্গনের তীব্র ঘ্রাণে হয়েছিলে উন্মাদ-
সম্পর্ক নিজেই নিজেকে গড়ে নেয়, সময়ের পলেস্তারায়।।
আমার যৌবনের মদে মাতাল হয়ে, আদরের নদীতে-
ঝাঁপ দিয়েছিলে, আজও দুজনে অতলে তলাচ্ছি অবিরাম;
শুধু সময় অনেকটা বয়ে গেছে পৃথিবীর নিয়মে,
এক আকাশ তৃষ্ণা নিয়ে আজও আমি তোমারই প্রতীক্ষায়-
সম্পর্কের মৃত্য হয়না জেনো, অভ্যাস দোষেই আমরা ভুলে যাই।।

মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০১৫

আত্নহত্যার প্রক্রিয়া



মায়ের গর্ভ থেকে যখন জন্ম নিলাম,
বাবা-মা,উঠোন,বরইতলা,
হ্যারিকেন,গেঁয়ো ভদ্রসিঁথি-
সবকিছুর জন্য একটু একটু করে মরে গেছি।
কৈশোরে ছিলো অবমুক্ত পৃথিবী।
সহজলভ্য কিছুকে পাবার লোভে
এবং ক্রমাগতঃ না জানাজনিত ভুলে
মরে গেছি আরো অনেকখানি;
ভুলে গেছি দুরন্ত আর অসম্ভবের পানে
সহজ পায়ে এগিয়ে যাবার কথা -
মরে গেছি নিজের অজান্তে;
আরো খানিকটা বেঁচে ছিলাম;
ইচ্ছা ছিলো-স্পৃহা ছিলো;
সেই ছেলেবেলা - যারা ভালবেসেছিলো-
তাদের মরে যাবার ইতিহাস -
আমার মাঝে রাখতে গিয়ে -
আজ মনে হয় -
পুরোপুরি মরে গেছি।

(একজন মানুষ অবশেষে আত্নহত্যা করলেন।তার ডায়েরী পড়ে জানা গেল শারীরিক মৃত্যুর অনেক আগেই তার অন্য এক মৃত্যু হয়েছিল।সেই মৃত্যুর প্রক্রিয়া নিয়ে এই লেখা।)

লেখক- চলমান

রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

কবিতার আধুনিকতা; ও বর্তমান পরিস্থিতি

 


কবিতার আধুনিকতা; ও বর্তমান পরিস্থিতি

 

কবিগুরুর কতগুলো লাইন ধার করে শুরু করি

আমরা সচরাচর কথোপকথনে যতটা অনুভাব প্রকাশ করি তাহারই চূড়ান্ত প্রকাশ করিতে হইলে কথোপকথনের ভাষা হইতে একটা স্বতন্ত্র ভাষার আবশ্যক করে। তাহাই কবিতার ভাষা- পদ্য। অনুভাবের ভাষাই অলঙ্কারময়, তুলনাময় পদ্য। সে আপনাকে প্রকাশ করিবার জন্য আঁকুবাঁকু করিতে থাকে -- তাহার যুক্তি নাই, তর্ক নাই, কিছুই নাই। চূড়ান্ত যুক্তির ভাষা গদ্য, চূড়ান্ত অনুভাবের ভাষা পদ্য

এমন যদি নিয়ম হইত যে, যে কবিতায় চতুর্দ্দশ ছত্রের মধ্যে, বসন্ত, মলয়ানিল, কোকিল, সুধাকর, রজনীগন্ধা, টগর ও দুরন্ত এই কয়েকটি শব্দ বিশেষ শৃঙ্খলা অনুসারে পাঁচ বার করিয়া বসিবে, তাহারই নাম হইবে কবিতা বসন্ত-- ও যদি কবিতাপ্রিয় ব্যক্তিগণ কবিদিগকে ফরমাস করিতেন, “ওহে চণ্ডিদাস, একটা কবিতা বসন্ত, ছন্দ ত্রিপদী আওড়াও ত! অমনি যদি চণ্ডিদাস আওড়াইতেন-

 

বসন্ত মলয়ানিল, রজনীগন্ধা কোকিল,

দুরন্ত টগর সুধাকর--

মলয়ানিল বসন্ত, রজনীগন্ধা দুরন্ত,

সুধাকর কোকিল টগর

 

ও চারি দিক হইতে "আহা আহা" পড়িয়া যাইত, কারণ কথাগুলি ঠিক নিয়মানুসারে বসানো হইয়াছে -- তাহা হইলে কবিতা কতকটা আধুনিক গানের মত হইত। ঐ কয়েকটি কথা ব্যতীত আর-একটি কথা যদি বিদ্যাপতি বসাইতে চেষ্টা করিতেন, তাহা হইলে কবিতাপ্রিয় ব্যক্তিগণ "ধিক্ ধিক্" করিতেন ও তাঁহার কবিতার নাম হইত "কবিতা জংলা বসন্ত।" এরূপ হইলে আমাদের কবিতার কি দ্রুত উন্নতিই হইত! কবিতার ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিণী বাহির হইত, বিদেশবিদ্বেষী জাতীয়ভাবোন্মত্ত আর্য্যপুরুষগণ গর্ব্ব করিয়া বলিতেন, উঃ, আমাদের কবিতায় কতগুলা রাগ রাগিণী আছে, আর অসভ্য ম্লেচ্ছদের কবিতায় রাগ রাগিণীর লেশ মাত্র নাই

এমন লোকও আছেন যাঁহারা ভাবিয়া পান না যে, ভাবগত কবিতা বস্তুগত কবিতা অপেক্ষা কেন উচ্চ শ্রেণীর ! তাঁহারা বলেন ইহাও ভাল উহাও ভাল। আবার এমন লোকও আছেন যাঁহারা বস্তুগত কবিতা অধিকতর উপভোগ করেন। উক্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে সুরুচিবান লোকদের আমরা জিজ্ঞাসা করি যে, ইন্দ্রিয়সুখ ভাল না অতীন্দ্রিয় সুখ ভাল? রূপ ভাল না গুণ ভাল? ভাবগত কবিতা আর কিছুই নহে, তাহা অতীন্দ্রিয় কবিতা। তাহা ব্যতীত অন্য সমুদয় কবিতা ইন্দ্রিয়গত কবিতা

কবিতাটি কবির সন্তানের স্বরুপ। সন্তানের জন্মোপলক্ষে ঘটিত সুখের চেয়ে একটা কবিতার জন্মে কবির কম সুখ অনুভূত হয়না। কচি মুখ, মিষ্ট হাসি, আধো-আধো কথা ইহার বিষয় নহে। একটি ক্ষুদ্রকায়া সদ্যোজাত শিশুর মধ্যে মিষ্টভাব কচিভাব ব্যতীত আরেকটি ভাব প্রচ্ছন্ন আছে, তাহা সকলের চোখে পড়ে না কিন্তু তাহা ভাবুক কবির চক্ষে পড়ে। সদ্যোজাত শিশুর মধ্যে একটি অপরিসীম মহান ভাব, অপরিমেয় রহস্য আবদ্ধ আছে, যেমনটি কবিতায় থাকে

সভ্যতার সমস্ত অঙ্গে যেরূপ পরিবর্তন আরম্ভ হইয়াছে কবিতার অঙ্গেও যে সেইরূপ পরিবর্তন হইবে ইহাই সম্ভবপর বলিয়া বোধ হয়। কবিতা সভ্যতা-ছাড়া একটা আকাশকুসুম নহে। কবিতা নিতান্তই আশ্মানদার নয়

এখনকার সভ্য সমাজে দশটাকে মনে মনে তেরিজ কষিয়া একটাতে পরিণত কর। কবিতাও সে নিয়মের বহির্ভূত নহে। সভ্য দেশের কবিতা এখন যদি তুমি আলোচনা করিতে চাও তবে একটা কাব্য, একটি কবির দিকে চাহিও না। যদি চাও ত বলিবে "এ কি হইল! এ ত যথেষ্ট হইল না! এ দেশে কি তবে এই কবিতা?

পূর্বে একজন পণ্ডিত না জানিতেন এমন বিষয় ছিল না। লোকেরা যে বিষয়েই প্রশ্ন উত্থাপন করিত, তাঁহাকে সেই বিষয়েই উত্তর দিতে হইত, নহিলে আর তিনি পণ্ডিত কিসের? এক অ্যারিষ্টটল দর্শনও লিখিয়াছেন, রাজ্নীতিও লিখিয়াছেন, আবার ডাক্তারিও লিখিয়াছেন। তখনকার সমস্ত বিদ্যাগুলি হ-য-ব-র-ল হইয়া একত্রে ঘেঁষাঘেঁষি করিয়া থাকিত। বিদ্যাগুলি একান্নবর্ত্তী পরিবারে বাস করিত, এক-একটা করিয়া পণ্ডিত তাহাদের কর্ত্তা। পরস্পরের মধ্যে চরিত্রের সহস্র প্রভেদ থাক, এক অন্ন খাইয়া তাহারা সকলে পুষ্ট। এখন অবশ্য সর্বজ্ঞ পন্ডিত না থাকিলেও সর্বজ্ঞ কবির অন্ত নাই, তাহাতে কাব্য থাকুক আর নাই বা থাকুক, কাগজের উপরে কলম চালাইতে পারিলেই নিজেকে কবিবর ভাবিয়া লইতে অসুবিধা কি”

শুরুর ভুমিকাটাই অনেক বড় হইয়া গেল, আসলে কবিগুরুর লাইন তো , সুতরাং অল্পেতে কি ভাবে হইবে!

শেষ লাইন দিয়েই শুরুকরি। আজিকাল সকলেই কবি, তাহাতে কাব্যরস থাকুক বা না থাকুক। গুরুদেব ইন্টারনেটের কথা কল্পনাও করিয়া যাইতে পারেন নাই, যদি কোনক্রমে তাহার নিকট বর্তমান কোন ফেসবুক গ্রুপের একটা দিনের পাতা খুলিয়া দেখানো সম্ভব হইত, নিশ্চিত তিনি সিলিং ফ্যানে গলায় গামছা বাধিবার পূর্বে অবশ্যই সুলালিত দাড়িটি “কবিতার” অন্ত্যেষ্টির জন্য কামাইয়া ফেলিতেন নিশ্চিত

বাঙালী ও কবিতা নাকি সমার্থক, আমি নিজেও তার বাহিরে নই। স্কুল কলেজে যতবার প্রেমে পড়িয়াছি ততবারই অন্তরের কবিত্ব জাগিয়া উঠিয়াছিল সন্দেহ নাই। অতঃপর প্রতিটি প্রেমকাহিনি সমাপ্তের সাথে সাথেই কবিতা বমনও আশ্চর্যজনক ভাবে স্তব্ধ হইয়া যাইত। আধুনা দুই এক বৎসর কাল এই পীড়া আপাতকালীন ভাবে দূরীভুত হইয়াছে

কিন্তু যেহেতু ইহা আমার মতে একটি পীড়া, সেই হেতু বহু মানবসন্তানই পোলিওর ন্যায় এই প্রকারের ছোঁয়াচে পীড়ার শিকার। বিশেষত যাহারা অন্তর্জালের পাড়ায় নিয়মিত যাতায়াত করিয়া থাকেন। তাহা অভ্যন্তরে আমার অত্যন্ত নিকট বন্ধুবাসরের সখার সংখ্যাও নেহাত কম নহে। এই বিষয় চয়ন করার অর্থ শত্রু সংখ্যা না বাড়লেও, বন্ধু যে কমিবে তাহার জন্য রকেট বিজ্ঞানি না হইলেও চলিবে। সুতরাং গালি খাইবার নিমিত্ত, যে আন্তরিক ভাবে প্রস্তুত থাকিতেই হইবে, ইহাও বলাই বাহুল্য

কবিতা কি? কবিতা হইল মনের ভাবধারার অন্তিম মন্থিত নির্যাস। যাহা আনন্দে ফল্গুধারার মত নির্ঝরিনির মত প্রবাহিত হইয়া অন্যকেও সেই সুখামৃত পান করাইয়া তৃপ্ত লভিয়া থাকে, অথবা তীব্র বিষাদসিন্ধু গরলের মত বক্ষে চাপিয়া যাবতীয় দুঃখবোধকে কাব্যিক সরলতায় প্রকাশ করে, কিছুটা উপশমের চেষ্টা

কবিতা কে লেখেন? কবিতা তিনিই লিখিয়া থাকেন যাহার মনের অভ্যন্তরের ভাবনাকে কাব্যের আকারে প্রকাশ করিবার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। আর যিনি এই কর্মটি সুচারুরুপে সম্পন্ন করিতে পারেন, তাহাকেই সেই কাব্যের জনকস্বরুপ কবি নামে অভিহিত করিতে পারি। কবিগুরু বলিয়াছেন, কবিতা আসলে কবির সন্তান স্বরুপ। কিন্তু আধুনিক এই কবির মেলাতে কজন সুস্থ সন্তানের জন্মদান করিয়াছেন বলিয়া দাবি করিতে পারেন? দু একটি ব্যাতিরেকে প্রায় সকলই পঙ্গু ও নিরেট। যাহার না আছে ধড় না পুচ্ছ

পৃথিবীর অধুনা সঙ্কট বিশ্বউষ্ণায়ন প্রথম হইলে দ্বিতীয়টা অবশ্যই তৃতীয় বিশ্বের জনবিষ্ফোরন। আর সাহিত্যের সঙ্কট হইল এই দ্রুত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রকাশিত প্রচারিত অপুষ্ট কঙ্কালসার ও বিষাক্ত শব্দগুচ্ছের তুমুল বিষ্ফোরনকে “কবিতা” নাম দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার কুৎসিত প্রচেষ্টা, আসলে আমাদের সাহিত্যকলার ঐতিহ্য আর ইতিহাসের পাশাপাশি যুবসমাজকেও সম্পূর্ন ভ্রান্তপথে বাধিত করিতেছে

জীবনানন্দের অমোঘ বানী- “ সকলেই কবি নয়, কেও কেও কবি” এই সার সত্যকে উপেক্ষা করেই ঘটে চলেছে, কাব্যকে গন বলাৎকার। সীমাবদ্ধ জীবনের ব্যাকুলতা কে ভাষা যোগানোর পরিবর্তে, এই সাহিত্যহন্তা শব্দব্রম্ভের স্রোত সমাজকে আলো দেখানোর পরিবর্তে মরিচিকার প্রহেলিকায় আচ্ছন্ন করিয়া দিচ্ছে। ব্যক্তির নিজস্ব সময়বোধ যখন তার একান্ত ব্যক্তিগত হইতে পারেনা, সেখানে কবিতা তো পাঠককুলের পরিশীলিত মনন বোধকে জাগ্রত করার অনুঘটক রুপে কার্য করিয়া থাকে, কবিতার দায় রহিয়াছে শিল্পোবোধএর ঐতিহ্যকে রক্ষা করার। সুতরাং কবি সেই দায় হইতে মুক্ত নন

এক্ষণে যদি বোদ্ধাদের প্রশ্নে আসা হই, তাহা হলে সকলের জন্য সকল কবিতা হয়, ইহা সত্য। আধুনিক কবিগনকে সসম্মানে উহ্য করিয়াও, জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে বা নির্মলেন্দুর সকল কবিতা কি সর্বসাধারনের বোধগম্য? নিশ্চই তাহা নহে। সকল কবিতা কি কালজয়ীই হইবে! না মোটেই তাহা নয়। কারন কবির ভাবনা আর পাঠকের সেই মুহুর্তের মনস্তত্বের টানাপোড়েনের উপরে অনেকটা নির্ভর করিয়া থাকে, বাকিটা ব্যক্তিগত রুচি। যদিও কিছু কিছু লাইন এতোটাই যুগান্তর যে, সেটা কালজয়ী হতে সময় নেয় না

পাঠকের সমাদর ব্যতিত কাব্যে প্রানের সঞ্চার হয়না। কিন্তু কবি কি পাঠকের কথা ভাবিয়া রচনা করেন? মোটেই না, সুতরাং কাব্যের অন্তর্নিহিত ভাবনা, শব্দচয়ন ও সমকালের প্রভাব কাব্যকে পাঠক মনের কাছাকাছি এনে দেয়। বাস্তব ঘটনামালার ভিন্নতাকে কাব্যিক ভাবে জারিত করে , কবির নিজস্ব চেতনার রঙে রাঙিয়ে যদি পাঠকের সম্মুখে পরিবেশন করা সম্ভবপর হয় তাহা হইলে সেই কবিতার মৃত্যু নেই। শুধু মাত্র লেখার জন্য কবিতা হয় না বা কবিতার জন্ম দশটা পাঁচটা চাকুরির মত নহে, যে খাতা আর কালি নিয়ে বসিলেই কবিতার জন্ম হইবে। কাব্যিক সাধনা প্রয়োজন। প্রখর বাস্তববোধ প্রয়োজন। সাথে নিষ্ঠা আর অধ্যাবসায়

কবিতার কোন নির্দিষ্ট সূত্র নেই, নেই কোন চমক সৃষ্টির তাৎক্ষনিক দুর্দান্ত পন্থা। সর্বপ্রথম প্রয়োজন কাব্যপাঠের নেশা, যাহা বিনা কবিতার জন্ম দেওয়া অসম্ভব। লেখনির সময় পাঠককে উপেক্ষা করা নিতান্ত প্রয়োজন, কিন্তু অবজ্ঞা নহে। কারন কবিতায় বহু মানুষ আশ্রয় গ্রহন করিয়া থাকেন, কিন্তু কবিতা কেবলমাত্র তাহার বরপুত্রদের উপরেই ভর করিয়া থাকে, অবশ্যই তাহারা ক্ষণজন্মা। লৌকিক জগতের যাবতীয় উপলব্ধির সহিত কল্পনার মাধুরীর সংমিশ্রণ ঘটানো সকলের কর্ম নহে। যিনি নিজেকে কবি বলিয়া প্রকাশের ইচ্ছা করেন, তাহার অনুভূতি জগতের সকল প্রতীকি চেতনা, তাহার সৃষ্টির প্রতিটি ছত্রে উপস্থিত থাকিতেই হবে, তবেই না কবি

আজিকালের আধুনিক কবিদের মধ্যে, বিশেষত এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যাদের মূলত প্রকাশ, তারা ঠিক উদ্দেশ্যে কবিতা লেখেন , অধিকাংশ জনেই তার ব্যাখ্যা দিতে অপারগ। কাজ নাই, চলো কবিতা লিখি এই গোছের। কেবলমাত্র, বন্ধু বৃত্তে আরো অনেকেই যেহেতু এই চর্চা করিয়া থাকেন, সেই হেতু “আমি” না লিখিলে কেমনে প্রশংশা পাইব? এই ভাবনা থেকেই বেশিরভাগ জনেই কবিতার নামে মল-মুত্র ত্যাগ করিয়া থাকেন। আর প্রশংসা শুনিবার জন্য যত জনকে সম্ভবপর ততজনকে সাথে বেঁধে নেন। জোর করে কি কবিতা শোনানো সম্ভব? সেই সুকুমারি ছড়ার একুশে আইন ন্যায় একটু পরিবর্তন ঘটাইয়া, সেথায় যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের ধরে ট্যাগের বলে, কানের কাছে নানার স্বরে, কবিতা শোনায় লক্ষ ড্যাস

কবিতা তো কবির আবেগ। তাহা জোর করিয়া একপ্রকার ঘাড় ধাক্কা দিইয়া শোনাইবার অপচেষ্টা আজিকাল শিল্পের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হইয়াছে। একটা সত্য ওনারা বুঝতে চাহেননা, যে তার কবিতা যদি সত্যিই উৎকর্ষতার মান অতিক্রম করিতে পারেন, পাঠককূলই তাহাকে সমাদরে মাথায় তুলিয়া রাখিবেন, ও তাহার পুনঃপুনঃ প্রচার করিতে থাকিবেন। একটা বিষয় মনে রাখিতে হইবে, সাফল্যের কোন হ্রস্বতর পথ হইতে পারেনা। সমালোচোনা সহিবার অসীম শক্তির সহিত নিরলস প্রয়াসের দীর্ঘ যুগলবন্দিই সফলতার বৃত্তের প্রবেশপথ দেখাইতে সক্ষম

কাব্য চর্চার সহিত প্রতিষ্ঠার আত্মীয়তা অত্যন্ত দুর্মূল্য। কারন সফলতার যে পথে প্রতিষ্ঠার মঞ্চ প্রস্তুত হয়, তাহা অত্যন্ত বন্ধুর। সাহিত্য জ্ঞান আমার মতে সর্বাধিক পাঠককুলের কাছেই সঞ্চিত। বাকি যারা সাহিত্যচর্চাটা দু কলম লেখালখির মাধ্যমে বহিঃপ্রকাশ করিয়া থাকেন তাহারা কেহই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নন, কারণ সাহিত্য সৃষ্টির নির্দিষ্ট পাঠ নেই, কবিত্ব আরো মারাত্বক, ইহা প্রায় সম্পূর্নটাই আত্মগত ও স্বাভাবিক পরিস্ফুটন। কবিগুণ একপ্রকারের স্বভাবগুণ, কোন গুরু ধরিয়া কবি হওয়া অসম্ভব

সমকালীন খ্যাতিমান কবিগনের কবিতাতেও, যাহাকে আমরা আধুনিক কবিতা বলিয়া জানি, সেই সকল কবিতার অভ্যন্তরে একটা গল্প থেকে থাকে, যদিও অধিকাংশ কবিতাতেই ছন্দের প্রভাব মুক্ত। কিন্তু সেগুলি বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনার সোনালী ফসল। কিন্তু সেই সকলকে অনুকরণ করিয়ে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্বঘোষিত কবির দল, কবিতার নামে যে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খল অত্যাচারে বিদ্ধ পাঠককূলকে খোঁচাইয়া খোঁচাইয়া কাব্যগরল পানে বাধ্য করিয়া থাকেন, তাহা হইতে নিষ্কৃতি কোথায়? আরে বাবা কবিতা অনুভব করিতে হয়, আত্মস্থ করিতে হয় উপলব্ধি করিতে হয়।

শুধু মাত্র “ বাহ, অপূর্ব, অনবদ্য, দারুন, সুন্দর, অবিশ্বাস্য ইত্যাদি” রোজ ব্যবহৃত ভোঁতা ভাষাগুলি শোনার অভিপ্রায়ে? আর কিছু হউক বা না হউক, এই কবিদের পাল্লায় পড়িয়া এই কতিপয় শব্দবন্ধগুলি তাহার কার্যকারিতা হারাইয়াছে নিঃসন্দেহে। কারণ আসলে কোনটা অপূর্ব? কোনটা অনবদ্য? কোনটা অবিশ্বাস্য? বনলতা সেন? নাকি দেবতার অভিষাপ? না কি ওই “রেচন পদার্থ “ গুলো। যাহারা প্রতিষ্ঠিত বা মহান তাহাদের কথা ছাড়িয়া দিন , বাকি যাহারা অধ্যবসায়ের সহিত প্রতিদিনিই চেষ্টা করিতেছেন, তাদেরও যে গুটি কয়েক সুন্দর সৃষ্টি, সেগুলিই বা কি ভাবে ই গনপ্রশংসার ভীড়ে আলাদা করিবেন হে কবিবর? একবার পরখ করে দেখুন আপনার সৃষ্টপদটি কি আদৌ খাদ্য তো? অখাদ্য বা সুখাদ্যের বিচার নাহয় পাঠক করিবেন পড়িবার পর। অন্যের কথা ছাড়িয়া দিন, নিজের তৈরি কান্ডকারখানায় কি মুড়ি মিছরি একই দড় হইয়া যায়নি আপনি নিজেও?

কবিতার শরীরে কাব্যালঙ্কার থাকতেই হবে, ইহাই কবিতার প্রাথমিক শর্ত। কবিতা পাঠের সময় পাঠকের মনে যদি কোন চিত্রকল্প না জাগ্রত হয়, কোন গল্প, বা চরিত্র, বো জীবনবোধ বা দর্শন খুঁজিয়া না পায়, তাহলে সেটা কি কবিতা? না কি কবিতার নামে আসলে কবিতার শ্রাদ্ধবাসর। কবিতার প্রথম শ্রোতা বা পাঠক তো আসলে যিনি লিখিতেছেন তিনিই। তিনি কি বলিতে পারিবেন যে তিনি ঠিক কি পরিমান কাব্যালঙ্কার- রুপক-অনুপ্রাশ-ছন্দ বা দর্শন জীবনবোধের দ্বন্দ্ব মশালা স্বরুপ মিশাইয়াছেন!! না, তিনি পারিবেন না, তিনি শুধু ট্যাগ নামক অস্ত্রের অপব্যবহার করিয়া, ঘাড় ধরিয়া আপনাকে পড়িতে বাধ্য করাইতে পারেন মাত্র। একটা নমুনা পরিবেশন করিলাম,

কবিতাটি নিম্নরূপ

ওগো আমার প্রেমিকা

কাল চুমেছিনু তব ললাটে

আজ তুমি নেই সাথে

তাই পাদিতেছি খাটে।

মানে ছন্দ মিলাইবার জন্য যা ইচ্ছে তাই কিছু একটা দিলেই হইল। অথবা নিন্মরূপ

গোরোস্থানে আসার আগে

টাটা করেছিলাম সকলকে,

সকলেও আমায় টিটকিরি করেছিল

তারপর বহুদিন আর খোঁজ নেয়নি কেউ

একা অন্ধকারে আছি রোজ বিড়ি খাই

ডিগবাজি ও খাই,

শুধু ভাত খাইনা, কারন আমার সুগার

তবে গালি খাই, কারন পাওনাদারদের ধার শোধ করতে পারিনি

আমি মাতালদের সর্দার ছিলাম

তাদের বউয়েরা আমার গুষ্ঠিদ্ধার করে আজও

এই নির্জন গোরোস্থানে বসে আমি রোজ সকলকে করি টাটা

ইহাও নাকি একটি আধুনিক কবিতা। ভাবিতে কষ্ট হয়, কেহ লেখে তিনি হাগেন, কেহ লেখেন তিনি গালিখান আর ডিগবাজি। ইহাদের কি কারাগারে অবরুদ্ধ করিবার প্রয়োজন নয় অবিলম্বে ,সুস্থ স্বাভাবিক মস্তিষ্কে যাহারা এগুলোকে জাহির করিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করিতে পারেন, তাদের মানসিক সুস্থতা লইয়া প্রশ্ন রহিল

কুমোর যেমন কাঠের কাঠামোর উপরে কাদামাটি লেপনের মাধ্যমে একটু একটু করিয়া মূর্তির মধ্যে সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করিয়া থাকেন, তেমনই কবিকেও তার চেতনার রঙে রাঙানো পাঁপড়ি দিয়া একটি একটি করিয়া কবিতার শব্দমালা গাঁথিতে হয়, তবেই না সেই কবিতা হয় কাব্যিক সৌন্দর্যের প্রেমময় মুর্তি। সামান্যতম বিচ্যুতিও যেখানে কবিতার অপঘাত মৃত্যু ঘটায় বলেই শিল্পরসিকদের অভিমত, সেখানে এমন কাব্যচর্চা একধরনে সামাজিক গর্হিত অপরাধ, যাহা অন্তত কবিতারই স্বার্থে আইন প্রনয়নের মাধ্যমে বন্ধ করা উচিৎ।প্রয়োজন গন প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধ

এর পর আসিবে কবির কাব্যচর্চার স্বাধীনতা। স্বাধীনতা আর স্বেচ্ছাচারিতা এক নহে। গোলাপ চাষ, বা ধানের চাষ আর গাঁজার চাষের সামাজিক মূল্য কি এক? সুতরাং যত্রতত্র খোলা স্থানে মলমুত্র ত্যাগ করিবেন না যেমন সত্য, তেমনই খোলা মঞ্চে যত্রতত্র কবিতার নামে রেচন ত্যাগিবেন না। অনেকেই ভাবিয়া নেন যে, তিনি ঢেকুর তুলিলেই একটি কবিতার জন্ম হয়, তাহাদের অনুরোধ, সেই সকল বদহজমের ফসলকে নিজস্ব সংগ্রহের রাখিয়া দিন দয়া করিয়া, সামাজিক ভদ্রতার খাতিরে প্রকাশ্যে আপনার এই ঢেঁকুরের বদনাম না করিলেও নিজস্ববৃত্তে আপনাকে লইয়া খোরাক পরিবেশন করিয়া থাকে আপনারই নিকট বন্ধুস্বজন।। কারন আপনার নিজস্ব রচনা (রেচন হইলেও) আপনার নিকটে অবশ্যই ভাল, কারন স্বিয় ত্যাগকৃত গন্ধবায়ুতে দুর্গন্ধের পরিমাপ নিরুপন করা সকল সময় সম্ভবপর হয়না নিজের দ্বারা। সামাজিক মাধ্যমেও বিভিন্ন মঞ্চ রহিয়াছে , যাহা উঠতি প্রতিভাদের জন্যই সংরক্ষিত। জল মাপিতে হইলে ওই স্থানই সর্বত্তোম

সময়ের তাড়নাতেই সময়োপযোগী কবিতার জন্ম হইয়াছে, এখনও হইতেছে, আগামীতেও হইবে। বাস্তবের প্রেক্ষিত হোক বা কল্পনার পটভূমিতে অঙ্কিত, প্রগতিশীলতা বা আধুনিকতার নামে যেন শৈল্পিক নান্দনিকতা না হারাইয়া যায়। সৎ চেষ্টা সফল হইতে বাধ্য, ইতিহাস সাক্ষী। পাঠকের চৈতন্যের প্রতি অবশ্যই সৃষ্টির দায় বর্তাইয়া থাকে। ফাঁপা শব্দবন্ধের মেকি গড্ডালিকাপ্রবাহে ভাষিয়া না যাইয়া সমালোচোনার জন্য আহ্বানও জরুরী।

মেদ যেমন সুন্দরী নারীর আবেদনকে কুশ্রী করিয়া দেয়, তেমনি কবিতারও অতিরিক্ত শব্দ কবিতাকে গুরুত্বহীন করিয়া তোলে, সমালোচোনার অনুশীলনই পারে আগামীর কবিতাকে মেদবর্জিত ঝরঝরে আকর্ষনীয় রুপ দিতে

কবিতা কবি বিনে জন্মলাভে অক্ষম। আর সেই পতাকা থাক যোগ্যের হাতে, আর নিজেকে যোগ্য বানাতে প্রয়োজন কাব্যবোধ, সাথে প্রচুর অনুশীলন, আর প্রতিষ্ঠা লিপ্সা। কবিতা হউক সাবলীল আর প্রাঞ্জল। মোটের উপর কবিতা মানুষ ও মানবতার কথা বলুক। তাহার জন্য কবি শিক্ষিত হউক বা না হউক, কাব্যজ্ঞানরহিত যেন না হন। কবিতা মাথা উঁচু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কারের সামাজিক চিন্তায় চিন্তিত হয়ে, অন্ধকার দূর করার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে, সমাজ বদলের অঙ্গীকারে উৎসাহ জোগাবে মানুষের হৃদয়কে। নিয়ে যাক রুপকথার অন্তরে, শোনায় সুখ দুখঃখের গীতমালা।

শুধু শব্দের খেলা নয়, সমকালীন কবিতায় থাক শব্দের সঙ্গে শব্দের মেলবন্ধন বা গাঁথুনি, প্রয়োজনে ছন্দও স্থান পাক অন্ত্যে। বাক্যবিন্যাসে থাকুক মজবুত ভিত, যা সমাজ ও কালকে স্পর্শ করার ক্ষমতা রাখবে, এই বিশ্বাসটা আগে নিজের মধ্যে জন্মাক। আর সেটা সম্ভব হইলে তবেই কবিতার শরীরে ধরা পড়িবে ভালোবাসা ও মমতার প্রলেপ


 

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...