মানবতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মানবতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২৫

অনুপ্রবেশের নেপথ্যে- ২

 


পর্ব~ ২

চলুন বিস্তারিতভাবে দেখে নিই কেন বাংলাদেশী বা নেপালিরা এদেশে ঢুকে আসে। 

১) ভারতের মতো “SC/OBC রিজার্ভেশন সিস্টেম” বাংলাদেশে/নেপালে কোথাও নেই। এই কোটা সিস্টেমে একবার ঢুকে যাওয়া মানেই দেশের ৬০% জনগণকে টুপি দিয়ে বঞ্চিত করে টপকে, নিজেদের আগামী প্রজন্মকে শিক্ষা, চাকরি সহ প্রায় সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে রেখে দেওয়া গেলো। এই কারনে শেষ ৩০ বছরে এদেশে আসা ৯৯% বাংলাদেশী ও নেপালী হিন্দুরা SC/OBC এই দুটোর একটাতে ঢুকে রয়েছে। শুধু আমাদের দেশের অর্থনীতি, সমাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কাজের গুণগত মান এবং সংখ্যা সুযোগ বেশি বলে লোক আসছে না। ওই সার্টিফিকেটের লোভেও বহু লোক ঢুকেছে। নব্য বাঙাল আর সে জেনারেল কাস্ট- এমন উদাহরণ বিরল। এদেশে বাঙাল কেন আসবেনা?

২) বিনামূল্যে চিকিৎসাঃ নেপালে এমন কিছুই নেই। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারদের জন্য সরকারী ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ফ্রি বা প্রায় ফ্রি চিকিৎসা দেওয়ার আলাদা সরকারি ব্যবস্থা আছে। এর বাইরে নির্দিষ্ট কিছু সরকারী হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে আউটডোর টিকিট ও খুব অল্প ফি এর বিনিময়ে ডাক্তার দেখানোর পরিষেবা আছে, কিন্তু তার মান যে ঠিক কতটা নিকৃষ্ট, সেটা আমাদের কোলকাতার বাইপাসের ধারে বেসরকারী হাসপাতাল গুলোতে গেলেই বুঝে যাবেন বাংলাদেশী রোগীদের ভিড় দেখে। কোনো মৌলিক ওষুধ বা খুব সাধারণ ল্যাব টেস্টও বাংলাদেশে সরকারীভাবে দেওয়া হয়না, কোথাও কখনো শিবির করে পরিষেবা দিলেও তার যা মান, তাতে রোগ সারার বদলে বেড়ে যায়। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সেভাবে কোনো সামগ্রিক টিকাকরণ কর্মসূচী নেই তাদের। এদিকে আমাদের ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, গ্রামীণ, মহকুমা, জেলা সদর হাসপাতাল হয়ে কোলকাতার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সিস্টেমে নানান দুর্নীতির পরেও, বাংলাদেশের তুলনাতে ধ্বন্বন্তরী চিকিৎসা বলাই যায়। এর সাথে ভেলোর, পুত্তাপুত্তির মত দাতব্য হাসপাতাল গুলোতে পৌঁছে যেতে পারলে তো সান্ধ্য টিফিনের খরচাতে মহাব্যাধির চিকিৎসা হয়ে যায়। এদেশে নেপালি-বাঙাল অনুপ্রেবশকারী আসবেনা তো কোথায় যাবে?

৩) ফ্রি শিক্ষাঃ বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা ফ্রি ও বাধ্যতামূলক, কিন্তু বাস্তবে খরচ পুরোপুরি শূন্য থাকে না। সেখানে ভারতে উচ্চমাধ্যমিক অবধি সেই অর্থে কোনো টিউশন ফি’ই নেই সরকারি স্কুলে। সামান্য ভর্তি ফি, পরীক্ষার ফি, ব্যাস। প্রাইমারিতে ইউনিফর্ম অবধি দেওয়া হয়, যাতায়াতের জন্য সাইকেল, বই, খাতা–কলম, সবই ফ্রি। এর পর আছে মিড-ডে মিল। দিনের সবচেয়ে বড় খাবারটা ইস্কুলেই মিটে যায় বাচ্চাদের, বাপমা এটুকু দুশ্চিন্তা মুক্ত যে, তাদের সন্তান ইস্কুলে গেলে অপুষ্টিতে ভুগে না খেতে পেয়ে মরবেনা। এরপর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এ পড়াশোনার খরচা। সরকারি কলেজগুলোতে টিউশন ফি বাৎসরিক মোবাইল রিচার্যের চেয়েও কম, কিছু ক্ষেত্রে টিউশন ফি মকুব হয়ে যায় নানান বৃত্তিতে। ভারতীয় ইঞ্জিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করা ছেলেপুলেদের দাম বিশ্ব IT বাজারে বিপুল, বাংলাদেশী হলেই আর জাতে উঠবেনা। ভারতীয় পাসপোর্টও বাংলাদেশীদের চেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্য। তাই তাদের শিক্ষিত প্রজন্মের ধান্দাই হচ্ছে যেকোনো মূল্যে উচ্চশিক্ষার পড়াশোনাটা ভারতে এসে করা, এবং ভারতীয় পাসপোর্ট হাতানো। SC-OBC হলে তো রীতিমত জামাই আদর, কেন বাংলাদেশীরা এদেশে কাঁটাতার গলে ঢুকবেনা?

৪) ফ্রি রেশনঃ বাংলাদেশে দরিদ্র ও দুর্যোগ কবলিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে খাদ্যশস্য বিতরণের সরকারী প্রকল্প রয়েছে কাগজে কলমে। নতুবা এই খাতে বিদেশী অনুদান কীভাবে আসবে? এই কর্মসূচিগুলো Vulnerable Group Feeding এর আওতাধীন, যেখানে কেবলমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে দরিদ্র পরিবারগুলোকে বিনামূল্যে চাল, গম বিতরণ করা হয়। বাস্তবে, দুটো ঈদের আগে ছাড়া এই সহায়তা কেউ পেয়েছে বলে এমন অভিযোগ নেই কারো। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সকলকে বিনামূল্যে ত্রাণটুকু পৌঁছে দিতে পারেনা বাংলাদেশ সরকার, আজও। সেখানে আমাদের রাজ্যে দুর্যোগের জন্য বরাদ্দ চাল আর ত্রিপল ঝেঁপে অট্টালিকা বানাবার লোভেই একটা গোটা রাজনৈতিক দল রমরমিয়ে চলছে। 

এদিকে ভারত সরকারের খাদ্য ও গণবন্টন বিভাগের প্রকল্পের অভাব নেই দেশের মানুষের মুখে প্রায় বিনামূল্যে, সারা বছর ধরে অন্ন তুলে দেওয়ার বন্দোবস্তে। অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা (Antyodaya Anna Yojana - AAY), অন্নপূর্ণা যোজনা (Annapurna Yojana - APY),  অগ্রাধিকার পরিবার প্রকল্প (Priority Household - PHH), প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা (PMGKAY), সমন্বিত শিশু বিকাশ পরিষেবা (ICDS)-এর মতো অন্যান্য পুষ্টি-সম্পর্কিত প্রকল্পগুলি রমরমিয়ে চলছে। এদেশে ঢঙের কিছু কাজ জুটুক বা না জুটুক, রেশনের চাল খেয়ে পেটের জ্বালাটা অন্তত মিটবেই মিটবে। কেন বাংলাদেশীরা এদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশকারি হবেনা?

৫) বাংলাদেশের আয় মূলত পোশাক শিল্প ও কামলাখাটা শ্রমিকদের পাঠানো প্রবাসী আয়ের (Remittances) উপর নিরর্ভরশীল। এর বাইরে কৃষি খাত, মৎসচাষ ও পশুপালন, এই সবগুলো দিয়ে গ্রামীণ অঞ্চলে দারিদ্র্য হ্রাস করা যেতে পারে, উন্নত বৈচিত্র্যপূর্ণ ও কিছুটা বিলাসী জীবনযাপন করা যায়না। বাংলাদেশ থেকে ভারত আর মিয়ানমার ব্যাতিরেকে যেখানেই যাক, বিমানে যাতায়াত হয়, যা বিপুল খরচা সাপেক্ষ। সেখানে ভারতে আসার জন্য পকেটে ১০০ টাকা থাকলেই যথেষ্ট। আর কোলকাতা থেকে গোটা ভারত জুড়ে কাজ খুঁজে ফিরতে খুব বেশী খরচাকর নয়। বহু বাংলাদেশী রীতিমত শুক্রবার ওদেশে ফিরে ২ রাত কাটিয়ে আবার সোমবার সকালে কোলকাতায় নিজের কাজে ফেরে অফিস টাইমে। এরা অনুপ্রবেশ করবেনা তো কে বা কারা করবে?

৬) ভারতের উন্নত টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র বাংলাদেশের চেয়ে যোজন কিলোমিটার এগিয়ে। সহজলভ্য ইন্টারনেট পরিষেবা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও বিস্তৃত মোবাইল নেটওয়ার্ক ভয়াবহ লোভনীয়। স্পিডটেস্ট গ্লোবাল ইনডেক্সের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের মোবাইল ও ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গড় গতি বাংলাদেশের চেয়ে ঢের বেশি। ২০২৫ সালে সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯০ কোটি বা ৬২%, সেখানে প্রতি তিনমাসে একবার রিচার্যের হিসাবে মাত্র ২৭% মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে বাংলাদেশে। ১ জিবি ডেটার দাম ভারতে গড়ে ৯ টাকা, সেটাই বাংলাদেশে ৩২ টাকা গড়ে। তাই ওই দেশের ওদের শিক্ষিত প্রজন্ম একবার ঢুকলে আর বার হতে চায় না।

৭) পরিকাঠামো ও সুযোগঃ বাংলাদেশের আয়তন ১৪৮০০০ বর্গ কিমি, সেখানে ভারতের আয়তন ৩২ লক্ষ ৮৭ হাজার বর্গ কিমি, মানে ২২ গুনের চেয়েও বেশী বড় দেশ। গোটা ইউরোপের চেয়ে ৩ গুন বড় আয়তনের দেশ আমাদের ভারত। ইউরোপ মানে অনেকগুলো দেশের সমষ্টি, ভারতের প্রত্যেকটা রাজ্যকে একটা দেশ ধরে নিলে- কতগুলো দেশ হয়? আমাদের বিপুল জনসংখ্যা আন্তঃদেশীয় ভাবেই বিপুল বাজার সৃষ্টি করেছে। দেশে বিপুল মাত্রার নানা মাপের শিল্প কলকারখানা রয়েছে। এ প্রান্তে কাজ না জুটলে আরেক প্রান্তে চলে যেতে রেলপথে মাত্র কয়েকশো টাকাতে বিনা ভিসা, বিনা প্রশ্নে চলে যাওয়া যায়, যা গোটা পৃথিবীতে কোথাও সম্ভব নয়। উপরন্তু ভারতের একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর আছে, সেই সুবিধার লোভে এখানে অনুপ্রবেশ ঘটে চলেছে।

অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো পরিবহন ব্যবস্থা, যা পণ্য ও মানুষের চলাচল সহজ করে। মহাসড়ক, সেতু, কালভার্ট বা সেতু, উন্নত গ্রামীণ রাস্তাঘাট। দেশজোড়া বিস্তৃত রেললাইন, আধুনিক রেলস্টেশন, উন্নত ট্রেন পরিষেবা। বন্দর, জেটি, ফেরিঘাট, নৌ-চলাচল উপযোগী নদীপথ। পর্যাপ্ত বিমানবন্দর, নিয়মিত সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ হলো আধুনিক ভারতের প্রাণশক্তি। ভারতীয় রেলকে দেশের ‘লাইফলাইন’ বলা হয়। বার্ষিক যাত্রী ধারন সংখ্যা, গুণগত রেলপথ ও দেশ জুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এর নিরিখে ভারতের স্থান গোটা বিশ্বে দ্বিতীয়, সেখানে বাংলাদেশ তালিকার প্রথম ১০০ এর মধ্যেও আসেনা। বাংলাদেশে সড়ক যোগাযোগ ভালো, কিন্তু সেটা ভারতের তুলনাতে নেহাতই বালখিল্য। আজও নদী পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের বিবিধ স্থানে নদীপথই একমাত্র বিকল্প, কোনো ব্রিজ বা পাকা সড়ক নেই। বাংলাদেশে বেসরকারী পরিবহণনই মূল ভরষা, কারন অনুন্নত সরকারী বাস পরিষেবা, যার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত এবং প্রতিটা ক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সময়ানুবর্তিতা রক্ষিত হয়না, ফলে সাধারণ মানুষ সরকারী পরিষেবা এড়িয়েই চলে। গণ পরিবহণ ব্যবস্থাতে ভারত অবশ্যই ইউরোপের তুলনাতে অনেক পিছিয়ে, কিন্তু বাংলাদেশের তুলনাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে ভারত অন্তত ৫০ বছর এগিয়ে। 

এর সাথে  বিদ্যুৎ ও শক্তি খাত হলো- শিল্পায়ন এবং দৈনন্দিন জীবনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। সেখানে বাংলাদেশের তুলনাতে ভারত স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রায় প্রতিক্ষেত্রেই। বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যেমন কয়লা, গ্যাস, জলবিদ্যুৎ, পারমাণবিক এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে একপ্রকার স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর সাথে সরবরাহ ব্যবস্থাতেও অনেক অনেক এগিয়ে,  ট্রান্সমিশন লাইন এবং ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক স্থাপনে এতো বিশাল বড় দেশে একটা নজির। এরপর রয়েছে পরিশুদ্ধ জল সরবরাহ, স্যানিটেশন, কৃষিতে পর্যাপ্ত সেচ ব্যবস্থা, উন্নত মানের সার ও আধুনিক কৃষিজ যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা। এ সবের লাভ তো কেবল ভারতীয়েরাই পায়। কেন কেউ অবৈধ ভাবে ভারতীয় হতে চাইবেনা?

৮) মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অনুভূতি এবং চুরি বা হামলার ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া জননিরাপত্তা সূচকে ভারত অনেক এগিয়ে। অপরাধ, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাজনিত আইন শৃঙ্খলার নিজস্ব সমস্যা দুই দেশেই রয়েছে। নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, ওয়াশিংটন ভিত্তিক বিশ্লেষণ সংস্থা গ্যালপ (Gallup) দ্বারা প্রকাশিত 'ল অ্যান্ড অর্ডার ইনডেক্স' (Law and Order Index) অনুযায়ী, ভারতীয়েরা ব্যক্তিগতভাবে নিজেদেরকে বাংলাদেশীদের চেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করে।
 
৯) আর্থিক বৈষম্য আরো একটা বড় কারন এই অনুপ্রবেশের। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (SBI)-এর ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে চরম দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশেরও কম। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ সালে ভারতে চরম দারিদ্র্যের হার- প্রতিদিন ২.১৫ মার্কিন ডলারের কম আয় কমে ২.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ গৃহস্থালী আয় ও ব্যয় জরিপ (HIES) ২০২২ অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ১৮.৭ শতাংশ। এর মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার হলো ৫.৬ শতাংশ।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত ২০%, সেখানে ভারতে ৩১% এরও বেশী। ক্রয়ক্ষমতার সমতা (PPP) বিবেচনা করলে, ভারতের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। এর ফলে ভারতীয় মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই বেশি। ভারতের বিশাল শিল্প ও পরিষেবা খাত, বিশেষ করে আইটি সেক্টর শহরাঞ্চলে উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ তৈরি করে, যা মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিলাসবহুল জীবনযাত্রা এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পণ্য ও পরিষেবার প্রতি বেশি আগ্রহী, যা ভারতের বড় অর্থনীতির কারণে সহজলভ্য। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত মূলত মৌলিক চাহিদা পূরণের পর সঞ্চয়ের দিকে নজর দেয়। ফলত, ঢাকা ও মুম্বাইয়ের মধ্যে বাড়ি ভাড়া, মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার খচরে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতে মধ্যবিত্তের সংখ্যা কমার পাশাপাশি গরিবের সংখ্যা বেড়েছে, তবুও ভারতের বহু অংশের গরিব এখনো বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের সঙ্গে তুল্যমূল্য বিচারে লড়াই দিতে পারে।

মালদা মুর্শিদাবাদের নদী ভাঙ্গনের বিপর্যস্ত মানুষের কথা আগে চিন্তা করা হবে, নাকি হিন্দুত্ত্বের দোহায় দিয়ে এসব অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কথা চিন্তা করা হবে- রোহিত শর্মা চুর, আর সূর্যকুমার যাদবের পা বাউন্ডারির বাইরে খুঁজতে প্রানাতিপাত করে দেয়, তাদের? যে দেশে কামলা খাটতে যাওয়াটা সমাজের মূল ধারার সবচেয়ে বড় পেশা, সেখানে এগুলো কী যথেষ্ট কারন নয় এই গণহারে অনুপ্রবেশের? 

সুতরাং, কৃত্রিম ভেকধারী উদবাস্তু মানেই আমার ভাই, বাংলাদেশী হিন্দু মানেই ছিন্নমূল, বাংলাদেশী হিন্দু মানেই সে মোল্লাদের দ্বারা অত্যাচারিত, এই সব গণহারে খেয়ালি পোলাও পাকাবার আগে উপরের তথ্য গুলো মিলিয়ে নেবেন আশাকরি। হয় আমি অনুপ্রবেশকে সমর্থন করব, বা বিপক্ষে থাকব। এখানে আমি যদি তোলামুল হই, আমার ধান্দাবাজ হতে সমস্যা নেই, এটাই আমার রুটিরুজি। আমি বিজেপি হলে মুসলমাদের প্রতি ঘৃনা ও হিন্দুত্বই আমার একমাত্র হাতিয়ার। কিন্তু যখন আমি বাম, আমি কেন জাতের বিচার করব? আমি তো গোটা বিশ্বজুড়ে যেখানে বঞ্চনা হচ্ছে, যাদের উপরে অত্যাচার হচ্ছে, আমি তাদের পক্ষে। মুসলমান বাংলাদেশী হলে সে রোহিঙ্গা, সে অবৈধ, আর হিন্দু বাংলাদেশী হলে এদেশের নাগরিকত্ব নাকি তার প্রাপ্য অধিকার? দেয় কে আপনাদের? আপনার সাথে RSS এর ভাষার ফারাক কোথায়? এমনি এমনি দলটা শূন্যে পৌঁছে যায়নি, আপনি ও আপনার মত ভন্ড মানুষদের মেহেনতে এটা সম্ভব হয়েছে। 


আপনি কী ভাবে দেখেন এই গণহারে অনুপ্রবেশকে?


অনুপ্রবেশের নেপথ্যে- ১


পর্ব~১

ডাঙ্কি সিনেমাটা দেখে ছিলেন?


আপনি যদি অবৈধ পথে পৌঁছে আমেরিকাতে নাগরিকত্ব চান, সেখানকার আইন অনুযায়ী- একজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তি হিসাবেই রাজনৈতিক আশ্রয় দাবি করতে হবে মার্কিন ফেডারাল সরকারের কাছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিকে আদালতে প্রমাণ করতে হয় যে, তার নিজ দেশে বর্ণ, ধর্ম, জাতীয়তা, নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্যপদ বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কিম্বা প্রাণনাশের গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে। 

কীভাবে এসব প্রমাণ যোগার হয়? সব বন্দোবস্ত আছে, শুধু ফেলো কড়ি মাখো তেল সিস্টেম। ২০২৪ সালে ৮৯২,৯০৪টি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জমা পড়েছিলো মার্কিন আদালত গুলিতে, যেখানে ৭০% এর বেশী আবেদনকারী নাগরিকত্ব পেয়েছে নানান শর্তের বিনিময়ে। ওবামা, ট্রাম্পের প্রথম দফা ও বাইডেনের আমল মিলিয়ে শেষ ১২ বছরে ৭৬% আবেদনকারী নাগরিকত্ব পেয়েছে, ট্রাম্পের আমলে এটা কমলেও সেটা ২০২৫ এ ইতিমধ্যেই ৪৭% পাড় করে ফেলেছে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশেও এই একই আইন কিছু রকম ফেরে।

২০২৪ সালে ৪৯,৭০০ জন ভারতীয় মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়েছে এই ভাবে, যাদের মধ্যে মাত্র ২৮২ জন অ-হিন্দু। এবারে আপনি বলুন, হিন্দু হৃদয় সম্রাট মোদি শোভিত RSS শাসিত ভারত রাষ্ট্রে এরা কোন ধর্মীয়/রাজনৈতিক অত্যাচারের শিকার হয়েছিলো? এদের জীবন কোথায় কীভাবে গুরুতর ঝুঁকিতে ছিলো? আপনি জানেন সবটা মিথ্যা, আপনি জানেন উন্নত জীবনের খোঁজে তারা জালি কাগজ বানিয়ে সে দেশের আদালতকে বোকা বানিয়েছে। কিন্তু খাতায় কলমে ওরা সকলেই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক হিংসার শিকার, দস্তুর মত ‘খাঁটি’ প্রমাণ পেয়েছে বলেই আদালত তাদেরকে নাগরিকত্ব মঞ্জুর করতে কসুর করেনি। এটা শুধু আমেরিকার তথ্য দিলাম, এমন করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ সর্বত্র দলে দলে ভারতীয় হিন্দুরা পাড়ি জমাচ্ছে একই উদ্দেশ্যে, একই অজুহাত খাঁড়া করে। 

২০১৪ থেকে এদেশে অত্যাচারের শিকার মুসলমান আর দলিতেরা, তাদের কতজন এই অজুহাতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে? ২০২০ এর দিল্লি দাঙ্গায় কতজন মুসলমান দেশ ছেড়ে পালিয়েছে? নব্য আমেরিকান ৪৯৭০০ জন ভারতীয়র মধ্যে সবচেয়ে বেশী মানুষ গুজরাত থেকে গেছে, দ্বিতীয় পাঞ্জাব থেকে, তৃতীয় মহারাষ্ট্র থেকে। গুজরাত মডেল, RSS এর আরেক ছানা APP ও মহারাষ্ট্রের ডবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্য গণতান্ত্রিক কাঠামোটা পরখ করে নিতে পারবেন এখানে। মোল্লা শাসিত গণতন্ত্রহীন মধ্যপ্রাচ্যে ভারতে অসুরক্ষিত ‘অত্যাচারিত’ হিন্দুরা কিসের আশায় আশ্রয় নিতে গেছে? এই ব্যাখ্যাটা যদি নাগপুর করে দেয় তো বড় ভালো হয়।

পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে কোনো হিন্দু চুরির পথে এদেশে এলে, সে সত্যিকারের ‘মোল্লাদের অত্যাচারের’ শিকার হয়ে যায়। তার আর কোনো ধান্দা আছে কল্পনা করাও যেন মহাপাপ। যুধিষ্টিরের পর সত্যবাদীতাতে একমাত্র মানদণ্ড হচ্ছে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী অবৈধ হিন্দুটি। এদের হয়ে রুদালি গাইতে ডান, বাম, রাম সব দলের একই নীতি, বিশেষ করে ব্যাক্তিটি যদি পঞ্চম প্রজন্মেরও বাঙাল হয়, সে ও ফুঁপিয়ে উঠছে রীতিমত। বস্তুত, যে ১৯৪৭ সালে এসেছে এবং যে ২০২৪ সালে এসেছে উভয়ের মধ্যে বক্তব্যের কোন পার্থক্য নেই। ধর্মীয়ভাবে হিন্দুর ক্ষেত্রে- আমি একবার ঢুকে পড়েছি অতএব এই দেশ আমার বাপের দেশ, আমি ফিরে যাব না। বাঙালদের পূর্ববর্তী, বর্তমান বা পরবর্তী প্রজন্মের ৯৯%কে দেখবেননা তারা দেশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত হতে চেয়েছে বা চাইছে। দু একটা ব্যাতিক্রম ছাড়া কেউ ভারতীয় সেনাবাহিনী, বিএসএফ বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হয়ে কাজ করেনা।

কদিন আগেও একটা প্রতিবেদন লিখেছিলাম এই বিষয়ে- কেন বাংলাদেশীরা এদেশে আসে! আচ্ছা, ধর্মীয় অত্যাচারের কারনে পালিয়ে এসেছে বলে যারা দাবী করে, তাদেরই বাবা, মা, বোন, মাসি, পিসি, মামা, কাকা, জ্যাঠা সহ অধিকাংশ আত্মীয়স্বজন গুলোকে কোন মোল্লার ভরষাতে ও দেশে রেখে আসে? কীভাবে তাদের পেট চলে বছরের পর বছর? কোন ইউনিয়নের কোন থানাতে গিয়ে তাদের উপরে হওয়া অত্যাচারের বর্ননা নথিবদ্ধ করে আসে? এদেশে একবার স্থায়ী হয়ে গেলেই, প্রতি বছর যে নিত্য দু-দেশের মাঝে যাতায়াত, সেখানে কেন কোনও সমস্যা হয়না ধর্ম নিয়ে? এত শয়ে শয়ে অবৈধ মুসলমান অনুপ্রবেশকারী দেখা যাচ্ছে উত্তর ২৪ পরগণার হাকিমপুর, নদীয়ার হাঁসখালি, সুন্দরবনের ফ্রেজারগঞ্জ সহ নানান বর্ডারে, এদের উপরে কোন ধর্মীয় অত্যাচার হয়েছিলো? 


আসলে ধর্মীয় মোড়ক হলো বুজরুকি, ভণ্ডামি, এবং ৯৯% মিথ্যাচার। ধর্মকে হাতিয়ার এদেশে ঢুকে পরাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য, যেমন ইউরোপ আমেরিকায় করে। আমেরিকা যেতে গেলে লক্ষ কোটির গল্প, ভাষার সমস্যা, চামড়ার রঙের সমস্যা। ভারতে সে সব বালাই নেই, উপরন্তু ২০০ টাকার খরচাতে ঢুকে পরা যায়। এই কারনে এরা ভারতে এসেছে, এর মধ্যে কোনো হিন্দু প্রেম নেই, কোনো হিন্দুরাষ্ট্রের গল্প নেই। একবার নিজের পা জমে গেলে তখন একে একে আত্মীয় পরিজনকে নিয়ে এসে স্থায়ী হয়। এদিকে ১৯৯৭ সালে কলকাতার পিজি হসপিটালে জন্মেছিল যে বাবুটি, যে জীবনে বাংলাদেশের বর্ডার চোখে দেখেনি, সে অবধি ফেসবুকে আড়াই লাইনের হ্যাজ লিখছে- মোল্লাদের অত্যাচারে ও দেশের লোক ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।

মেদিনীপুর শহরের একটা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একটা প্রান্তে পুরো একটা ছোটখাটো গ্রাম গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের ভোলা জেলার মানুষদের দিয়ে। তাদের দাবী, আমফান ঝড়ে সর্বহারা হয়ে এদেশে চলে এসেছে। আইতে শাল যাইতে শাল, তার নাম বরিশাল; এই দেশে এসে গল্প শোনানো সেই লড়াকু বরিশালীদের ভোলার বুকে শুধু আইলা আমফান ঝড় আছড়ে পড়েনি, আমাদের দেশের অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা, পূর্ব মেদিনীপুর কিম্বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার মানুষেরা দগদগে ঘা নিয়ে নিয়মিত লড়াই করে টিকে আছে। নদী ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারানো মালদা মুর্শিদাবাদের মোল্লারা কেউ আরব দুনিয়ায় ‘ভীর’ সেজে ছুটে পালিয়ে যায়নি। শুধুই মেদিনীপুর শহর নয়, হুগলি জেলার ডানকুনি, গোবরা, রিড়ষা, বাঁশবেড়িয়া, হাওড়া জেলার বাঁকড়া, রামরাজাতলা, বালি, বেলুড়, উত্তর ২৪ পরগনার বিধাননগর, নিউটাউন, গোপালপুর, সেক্টর ফাইভ সমেত বেশিরভাগ অঞ্চলে যা খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে তার সবগুলোই মূলত অবৈধ বাংলাদেশীদের দ্বারা গঠিত হিন্দু বস্তি।

বনগাঁ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা, নদীয়া, পূর্ব বর্ধমানের কথা আলাদা করে বললামনা, এখানে ঠগ বাছতে গাঁ উজার হয়ে যাবে। মেদিনীপুরের এই বাংলাদেশী লোকগুলো অবলীলায় বলছে আমাদের কার্ড থাকুক না থাকুক আমরা এদেশেই থাকবো, অর্থাৎ মধুটা ধর্মে নয়- কাজের সুযোগের গল্পে এমন মরিয়া হয়ে উঠেছে এদেশে থেকে যেতে। সুতরাং, মুখে স্বীকার করুক বা না করুক, তারা মোল্লার অত্যাচারে নয়, পাতি না খেতে পেয়ে চোরের মত রাতের আঁধারে দালাল ধরে সীমান্ত টপকে এসে এখন ‘হিন্দু’ সাজছে। এদেশে একবার পা জমে গেলেই এরা আমাকে আপনাকে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেবে আর আরএসএস শিবিরে নাম লিখিয়ে পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচর বৃত্তির ইতিহাসে নাম লিখে অমর হয়ে যাবে।

২০১৬ পরবর্তী এ রাজ্যের যেকোনো সাল থেকে যেকোনো নির্বাচন মিলিয়ে দেখলে বুঝবেন, উদ্বাস্তু কলোনী গুলিতে সিপিআইএম তথা বামফ্রন্টের ভোট - তৃণমূল বা বিজেপির পেছনে তৃতীয় স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। কোথায় গেল সেইসব বাঁশবেড়িয়া, কাটোয়া, দমদম, টিটাগড়, নোয়াপাড়া, বিজয়গড়, যাদবপুর, বেহালার লেলিন কলোনির আন্দোলনের ইতিহাস? পাথরের মত জমাট বাঁধা ভোট? ইতিহাসের কোন গহ্বরে লুকিয়ে গেল প্রশান্ত শূর জামানার পরবর্তী প্রজন্ম !

সেইকালে এরা সিপিএমকে ব্যবহার করেছিলো, রক্তে বেইমানি, তাই সিপিএমকে ল্যাঙ মেরে এদের উত্তর পুরুষেরাই আজ বলে কমিউনিস্ট মানেই দেশের শত্রু। স্বাভাবিকভাবেই আজকে যারা সদ্য সদ্য ভিখারিপনা করে এখন এদেশের নাগরিকত্ব দাবী নিয়ে হাহাকার করছে, পা জমে গেলেই এরা আমাকে আপনাকে দেশদ্রোহী হিসাবে দাগিয়ে দেবে, এদের জিনে রয়েছে হারামিপনা, বেইমানি, পলায়নপর ধান্দাবাজি।


আপনি এদের জন্য আহা ভেবে আকুল হয়ে যাচ্ছেন, প্রতিটা দলের আঁটি সেলের হ্যাজ আর ফরোয়ার্ডেড হোয়াটস্যাপ মেসেজের ভিড়ে আবেগের সিকনিতে বুক ভিজিয়ে ফেলছেন। কতগুলো ধান্দাবাজ, চিটিংবাজ, মিথ্যেবাদী, পলায়নপর মানসিকতা যুক্ত লোকের জন্য দরদ উথলে পড়লে বুঝে নিতে হবে, আপনার শরীরেও দিনের শেষে সেই একই জিন দৌড়াচ্ছে।। আবেগটা শুধু মাত্র সঠিক ব্যাক্তিদের জন্যই নাহয় সংরক্ষিত থাকুক, যারা সত্যি সত্যি বাধ্য হয়েছেন ছিন্নমূল হয়ে। প্রতিটি অবকাঠামোগত বিষয়ে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, খাদ্য, প্রযুক্তি, রেলপথ, সড়কপথ এবং বিমান পরিবহণে ভারত- বাংলাদেশ বা নেপালের তুলনায় বিপুল বড় এবং উন্নত নেটওয়ার্ক যুক্ত। ভারতের বিশাল অর্থনীতি এবং শিল্পায়নের কারণে এখানে উন্নত জীবনযাত্রা জনিত সুযোগ-সুবিধা ও বিলাসবহুল পণ্যের সহজলভ্যতা বেশি। উচ্চতর মাথাপিছু অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে জীবনযাত্রার উন্নত মান বজায় রাখা ভারতে তুলনামূলক সহজ। আর এটাই এই অনুপ্রবেশের একমাত্র কারন, এখানে ধর্মের ভাঁওতাবাজি স্রেফ মুখোশ।

একটা মিম বাজারে ঘুরছে, ‘বিবাহিত মহিলারা সাবধান হয়ে যাও। বহু পীড়িত স্বামী নাকি ইচ্ছাকৃত ভুলভাল SIR ফর্ম ফিলাপ করে দজ্জাল বৌকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে চাইছে ভায়া ডিটেনশন ক্যাম্প”। সন্দেহ নেই, বিষয়টা নিছক মজার জন্য বানানো, কিন্তু সত্যিই যাদের বাংলাদেশ বা ডিটেনশন ক্যাম্পে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের মাঝে ঠিক কতটা আতঙ্ক কাজ করছে তা আমরা কল্পনা করতে পারবনা কোনোভাবেই। ধান্দাবাজদের অবশ্য ততটা সমস্যা নেই, ওপাড় বাংলাতে তাদের সকলের বাবা, মা, আত্মীয় স্বজনেরা আছে। ছিন্নমূলদের পাশাপাশি সমস্যা হচ্ছে সেয়ানাদের, যারা উত্তরবঙ্গের সিতাই, হেমকুমারী, দক্ষিণবঙ্গের সন্দেশখালি, ধামাখালি, বয়রা, ঘোজাডাঙ্গা ও বনগাঁর আশপাশ দিয়ে দালাল ধরে রাতের আঁধারে এ দেশে ঢুকে ভেবে নিয়েছিলো- এটাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, মোক্ষ লাভ হয়ে গেছে। ওপাড়ের সব ধীরে সুস্থে বেচে দিয়ে এপাড়ে এসে ‘ভিরাট’ হিন্দুবীর হয়ে বসে গেছেন- সমস্যা মূলত এনাদের।

সমস্যা আরেকটা গোষ্ঠীর আছে। গতবছর বাংলাদেশের পালাবদলের পর আওয়ামী লীগের বড় অংশের লোক ভারতে ঢুকে পড়েছিলো। এদেরকে হয়তবা খানিকটা ছাড় দিয়েই বর্ডার পেরোতে সাহায্য করেছিলো ভারত সরকার, সেই ফাঁকে আওয়ামীলীগের ছদ্মবেশে বহু ধান্দাবাজও ঢুকে পরেছিলো। তাই এখন, এমন মুসলমানও ধরা পড়বে, যারা আদব কায়দাতে একটু ভদ্রলোকও বটে, এরা কেউ কিন্তু স্থায়ীভাবে থাকতে আসেনি, প্রাণের ভয়ে পালিয়ে এসেছিলো। এতোদিন উভয়েই বেশ সানন্দ্যে ও সাচ্ছন্দ্যেই ছিলো, এখন মুসলমান গুলো ফিরে যাচ্ছে। ফলত, যাদের বর্ডারে দেখা যাচ্ছে এরা প্রায় সকলেই মুসলমান, কিন্তু যেগুলো হিন্দু আওয়ামিলীগ, তারা কিন্তু কোনোমতেই এ দেশ থেকে আর যেতে চাইছে না। 

সীমান্তের বিভিন্ন ভিডিওতে স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশী মুসলমান মূলত কর্মসূত্রে এদেশে এসেছিল অবৈধ উপায়ে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তারা ওই দেশের কোন জেলা, কোন ইউনিয়নে বাড়ি স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছে। পরিস্থিতি ও গন্ডগোলের কারনে ফিরে যেতে হচ্ছে বলে মনে কোন দ্বিধা দুঃখ নেই। কিন্তু হিন্দুরা কোনো শর্তে যেতে রাজি নয়। দালালের মাধ্যমে ভারতে ঢুকে এসে, তিন দিন পরে এরাই বলবে রক্ত দিয়ে কেনামাটি, ইত্যাদি। সুতরাং, বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী হিন্দু মানেই সে মুসলমানের অত্যাচারের শিকার ব্যাপারটা তেমন নয়। এতদিন এদেশের জলহাওয়া খেয়ে, বিজেপি-RSS এর সাথে থাকতে থাকতে একটা বুলি শিখে গেছে- আমাকে মোল্লারা মেরছে। এটাই তার কাছে এদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার গায়েত্রী মন্ত্র।


এই মুহুর্তে আমাদের সমাজের মূল সমস্যা তিনটে। প্রথম হচ্ছে বেকারত্ব, মানুষের হাতে কাজ নেই। দ্বিতীয়ত, ঘরে একটা গৃহসহায়ক, ড্রাইভার, মালি কিম্বা ভালো একটা কর্মচারীর সন্ধান করুন, দেখবেন লোক খুঁজে পাবেননা। অর্থাৎ কাজের মানুষ নেই। তৃতীয়, আমাদের আশেপাশে যে সকল লোকজন কাজ করছে, তাদের দিকে চেয়ে দেখুন; সেটা আমার আপনার ঘরে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হোক, সর্বত্র একটাই সমস্যা- এরা কোনো কাজের নয়, পুরো বেকার লোকজন। বিশেষ করে সরকারী দপ্তরগুলোতে, দুটো লোকও সঠিক কাজের কাজী এমন পাবেননা খুঁজে। এটাই হচ্ছে দেশের মূল সমস্যা। সুলভ হলো শুধু সময়, সকলের হাতে বিপুল সময়। সুতরাং, জনগণ হুলিয়ে সারা সারা দিনরাত কূটকচালি, কলতলার ঝগড়া, খাপ বসানো, বিশেষজ্ঞ, আঁতেলপনা, ফুট কাটা ফুটো মস্তান, নীরব দর্শক, বিপ্লবী ইত্যাদির সাথে অকারন নিন্দাচর্চার জন্য সময়ই সময়। সোস্যাল মিডিয়াই আজকের মনোরঞ্জনের মূখ্য মাধ্যম, তাই SIR কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ‘টপিক’ এর ঘাটতি নেই দেশে।

এপার ওপার বলে কিছু হয় না, হিন্দু মুসলমান বলেও নেই। দেশ ভাগ বাঙালির বুকে একটা দগদগে ঘা। কিন্তু দেশভাগের ছিন্নমূল হওয়ার ইতিহাস আর ধান্দাবাজির পলায়ন বৃত্তি দুটোকে এক সুতো দিয়ে বাঁধা যাবে না।


...ক্রমশ

শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫

SIR- একটি মানবিক বিপর্যয়


বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় সমস্যার প্রায় গোটাটাই হচ্ছে SIR এর কারনে, অন্তত রাজ্যের শাসক শিবিরের মতে সেটাই। প্রায় লক্ষাধিক BLO গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে কাজ করছেন নৈপুন্যতার সাথেই; তবে, প্রত্যেকের অতীতে শারীরিক অসুস্থতা হয়েছিলো, আগামীতেও হবে। কিন্তু এই মুহুর্তে অসুস্থ হওয়া মানেই সেটা ‘কাজের প্রেসার’। আচ্ছা, এই SIR এর সাথে যুক্ত না হলে এই ১ লক্ষ মানুষের কারো কোনো রোগজ্বালা হতোনা এই সমসাময়িক কালে? হাঁচি, কাশি, গ্যাস, অম্বল, আমাশা, মাথাব্যাথা, দাম্পত্য কলহ, পথ দুর্ঘটনা- যে কারো যখন খুশি মৃত্যুও তো হতেই পারত বা পারে! কিন্তু না, যেহেতু কালিঘাট অফিসিয়ালি SIR এর বিরোধী, তাই সব দোষ একা SIR এর।

SIR বিষয়টা ঠিক না ভুল, প্রসেসটা সঠিক নাকি বেঠিক, উদ্দেশ্য সাধু না অসাধু তা আলাদা ও বিষদ আলোচনার বিষয়, আজ আমরা সেখানে ঢুকবোনা। আজ একটু অন্য দিকটা দেখি।

একটা পোলিং বুথ মানে এলাকাটা একটা পাড়ার একটু বেশী। আজকাল একটা বুথে সর্বোচ্চ ভোটার সংখ্যা ১০০০ এর নিচে, ব্যাতিক্রমী ছাড়া, কমবেশী ২৫০টি পরিবার। ৮ ঘন্টা কর্ম দিবসের মধ্যে ৬ ঘন্টা করেও যদি ফর্ম বিলি ও জমা নেওয়ার প্রসেস চলে, সব মিলিয়ে সেটা ১৪ দিনও লাগেনা। ফর্ম ফিলাপের দায় BLO এর নয়, না সেখানে ভুল আছে কিনা তা অরিজিনাল নথির সাথে মিলিয়ে দেখার দায় রয়েছে। এরপর রইল এই ১০০০ ফর্ম অনলাইনে তুলে দেওয়া ঘরে বসে। আমাদের মত যাদের কোনও এ্যাকাডেমিক ডিগ্রি নেই কম্পিউটার বিষয়ে বা ডেটা এন্ট্রিতে, তারাও দিনে ৮০/১০০টা ফর্ম আপলোড করেই দেবো সারাদিনে- যখন এটাই আমার একমাত্র পেশাজনিত ডিউটি। এই কাজের মধ্যে সেই মহামারী ‘প্রেসার’টা কোথায়?

আমরা যারা ব্যবসা করি তারা সকাল ৭টার আশেপাশে দোকান খুলি, কেউ দুপুরে বন্ধ করি, কেউ করিনা। আবার রাত ৯টা অদধি ঝাঁপ খুলে প্রতীক্ষা করতে থাকি খরিদ্দারের। যারা গতরে খাটি, তাদেরও সামান্য অবসর বাদে বাকি কর্মদিবসের সময়টা শরীরের ঘাম রক্ত নিংড়ে নেয়। আমার নিজের বর্তমান পেশা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলসের, হোটেলে থাকলে সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা অবধি সমানে টহল মারতে হয় যখন যে লোকেশনে থাকি। এর সাথে মার্কেটিং এর জন্য ৩টে ফোনে ৫টা সিম, একটা ট্যাব একটা ল্যাপটপে সমানে কল-মেসেজের জবাব, রেট দেওয়া, বার্গেনিং, আইটিনিনারি বানানো সবটাই একপ্রকার নিজেকে করতে হয়। যতই ম্যানেজারেরা থাকুক, রানিং টুরিষ্টদের নানান সুবিধা অসুবিধার একটা অংশ আমাকেই সামলাতে হয়।

তাতে রাত ১২টা না ভোর ৫টা বাজে সেই গণনা করার সুযোগই নেই! কাস্টমারকে রেট/আইটিনিনারি দিতে লেট করলে সে অন্যত্র পালাবে, আমার ভাগে ফক্কা। ভোটের ট্রেনে নেমে ড্রাইভারকে খুঁজে না পেলে ফোনটা আমাকেই রিসিভ করতে হয়। এরপর যেদিন যে কর্মচারী আসেনি, নিজেকে সেই পদে বহাল হতে হয়। ধোপা, কুক, হাউজ কিপিং, সুইপার, রিসেপসনিষ্ট, ক্যাশিয়ার, বাজার সরকার, দারোয়ান সব পদে স্বনিয়োজিত হতে হয়, কারন আমি জানি আমি গাফিলতি করলে লোকসান একমাত্র আমার। লোকের অভাবে পরিষেবায় ঘাটতি হলে টুরিস্ট সেটা বুঝবেনা, গুগুলে নেগেটিভ রিভিউ খেলে আমারই ব্যবসা ঝাড় খাবে। এরপর ব্যাঙ্ক, GST সহ অন্যান্য সরকারী অফিসিয়াল কাজ রয়েছে, সব কাজ এক সমান্তরালে চলতে থাকে, এবং বিষয়টাকে দারুন এঞ্জয়ও করি। অভিযোগ কিছু থাকলেও শুনছেটা কে?

আমি আমার তথ্যটা দিলাম, প্রতিটা বেসরকারি চাকুরে, ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসাদার, শ্রমিক, কৃষকের একই হাল। প্রত্যেককে একই সাথে একাধিক ঝক্কি এক সমান্তরালে পোয়াতে হয়, এটাই জীবন, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ জানতে বাধ্য হতে হয়। যেহেতু আমাদের মাসিক মাইনের সুরক্ষা নেই, PF নেই, DA নেই, গ্রাচুইটি নেই, পেনশান নেই- তাই আমাদের কখনই প্রচণ্ড ‘প্রেসার’ সেভাবে অনুভূত হয়না জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে। আসলে BLO লেভেলের কর্মীদের ‘আসল’ কাজের দায়িত্ব কতটুকু থাকে? হয় তাঁরা প্রাথমিক শিক্ষক/শিক্ষিকা বা গ্রুপ ডি কর্মী। তাদের কাজকে সম্মান জানিয়েই বলছি, তাদের চেয়ে একজন প্রাইভেট টিউটরকে অনেক বেশী শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করতে হয়, অনেক বেশী দায়িত্ব আর অনেক বেশী জবাবদিহিতা করতে হয়, আর এটা রোজকার বিষয়। অনেক বেশী অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত হয় যেকোনো বেসরকারী কর্মী বা ব্যবসায়ীদের। তাই SIR এর ১ মাসের প্রেসারে যে কর্মীরা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন, তাদের সরকারী চাকরি থেকেও অব্যাহতি দেওয়ার ঘোষণা হোক। শরীরের সমস্ত ব্যাথা বেদনা পর মুহুর্তে গায়েব হয়ে গিয়ে আরবি ঘোড়ার মত মাঝরাত্রেও দেখবেন দৌড়াবে। এনারা বাস্তবিকিই আনফিট অকর্মন্য। ভাবুন একজন যেকোনো পদের আমলা, একজন পুলিশকর্মী, একজন ডাক্তার তাহলে কী পরিমান প্রেশার নেন রোজ!

কখনও ভেবে দেখেছেন যারা দিনমজুর, যারা পরিযায়ী তাদের কথা? যারা বৈধ হয়েও SIR এর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে তাদের কথা? যারা তথাকথিত ‘অবৈধ’- এদের না আছে কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, না আছে কোন সেভিংস, না আছে কোন পিছুটান। মরলে কোথায় কি নামে পোড়ানো হবে, নাকি কবর দেওয়া হবে কেউ কিছু জানে না। এবেলা কামিয়ে না আনলে ওবেলা কি খাবে তার কোন হিসাব নেই। সেখানে পরের দিন কি খাবে সেই ভাবনা তো বাহুল্যতা। তবুও স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে আগলে রাখে, তাদের সন্তানকে আগলে রাখে। যাদের বাবা-মা আছে, তাদেরকেও নিজেদের পাশে পাশে রাখে।

গরীব যে সকল মানুষ সামনের মাসে ‘অবৈধ নাগরিক’ হয়ে যাবে, সেই লোকটা কোথায় জন্মেছিল তার কোন ঠিক ঠিকানা রইবেনা। কোথায় কার সাথে কি ভাবে বিয়ে হইয়েছি তার কোন লেখাজোখা নেই, আদৌ কে তার নাম রেখেছিল, কি কারণে নাম রেখেছিল, কি ধর্ম, কি করেই বা তার ধর্ম ঠিক হয়েছিল তার কোন হদিশ পাওয়া যাবে না। কার সন্তান কার গর্ভে কবে জন্মগ্রহণ করছে, কি তাদের বয়স, কোথায় শিক্ষা হবে, কিভাবে শিক্ষা হবে, কি তাদের মাতৃভাষা হবে, কি তাদের শিক্ষার মাধ্যম হবে- কারোর কাছে কোন কিছুর হদিস থাকবে কী? পুঁজিবাদের কাছে শুধু এদের একটাই পরিচয়- কম পয়সায় লেবার। এদের কতজনের স্ট্রোক হয়েছে? কতজনের ‘প্রচন্ড প্রেসার’ নিয়ে মিডিয়া সরগরম হয়েছে? কেউ কি তার খবর রেখেছে?

কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে যখন নাৎসিরা ইহুদিদের ধরে এনেছিল তখনও তাদের একটা নাম ছিল, সংখ্যা ছিল, একটা অস্তিত্ব ছিল, আজকে যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন বর্ডারের ধারে ভিড় জমিয়েছে তাদের অধিকাংশের সেটুকুও নেই। আপনি হয়ত মিডিয়ার পড়ানো চসমাতে দেখে ওদের মুসলমান বা হিন্দু হিসাবে দেখছেন, আসলে তো তারা আমার আপনার মত রক্তমাংসের মত মানুষ। অথচ কী নির্লিপ্ত। একজন অবলীলায় বলে চলেছে- আমাকে আবার মায়ানমারের ওই রিফিউজি ক্যাম্পে ফেরত যেতে হবে। সাথের মহিলাটা অনেক বেশি সজাগ, সে বলছে- ওখানে যাওয়া যাবে কিনা সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পৃথিবীর ইতিহাসে যারা ঘোষিত যাযাবর জাতি তাদেরও একটা চলার ছন্দ ছিলো বা আছে, এদের ক্ষেত্রে সেটুকু খুঁজে পাওয়া গেল না, এটাই চরম আফসোস।

আগামীতে SIR কেন্দ্রিক শয়ে শয়ে মহাকাব্য লিখবেন সাহিত্যিকেরা, কিন্তু আমরা চোখের সামনে যেগুলো দেখছি দু-একটা, যদি সেখান থেকে কিছু তুলে রাখা যেত আগামী প্রজন্মের জন্য, তাহলে তারা সিনেমা উপন্যাস কিংবা অন্য কোন মাধ্যমের কাছে আদান-প্রদানের জন্য গবেষণার কাজে ব্যবহার করতে পারত। এই ‘নেই’ মানুষদের মধ্যে যৌন উত্তেজনা স্বাভাবিক, শুধু সেই কামনার বসেই হয়তো অনেক মানুষের জন্ম হয়ে গেছে- সেই দোষের দোষী এই নব প্রজন্মটা, সে জানেইনা কোন দোষে তার কোনো দেশ নেই। পাল ছিঁড়ে যাওয়া নৌকাটা কোনদিকে যাবে সে জানেনা, কিন্তু এটুকু অন্তত জানে যে আমি নদীর বাইরে যাব না। এর ক্ষেত্রে সেইটুকু নিশ্চয়তাও নেই।

আমাদের মত স্থায়ী বাসিন্দা হবার সৌভাগ্য যাদের জুটেছে, তাদের সবচেয়ে গরিব যে মানুষটা দিন আনে দিন খায়- তারও কিন্তু একটা নিজের ঠিকানা রয়েছে। খেয়াল করে দেখবেন, আপনার হয়ত শরীর চলছে না, হয়তো ব্যবসা বা পেশা আপনাকে সেভাবে সহায়তা করছে না, কিন্তু আপনি জানেন যে আমার একফালি জমি আছে গাঁয়ে, যেখান থেকে ফসল ফলিয়ে অন্তত বেঁচে যাব, কিম্বা দিনমজুরি করে খাবো। দুর্ঘটনাতে বা অপঘাতে মৃত্যু হলেও শব যাত্রায় অন্তত চারটে লোক যাবেই, যদিনা দূর বিদেশ বিভূঁইতে বেওয়ারিস হয়ে মারা যায়। এখানে যারা ‘অবৈধ’, তার জাত যা খুশি হোক, সেই লোকটা মরলে তার হয়ে কাঁদার মত কেউ থাকছে না। একটা দল এগিয়ে চলেছে অজানার দিকে, এতদিনের চেনা পরিচিত পরিবেশ, পাশের লোককে ফেলে দিয়ে। তার জন্য অনুশোচনা করার সময়টুকু অবধি কারো নেই। ছিন্নমূল শব্দটা শুনেছিলাম, এভাবে চোখে দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলামনা মোটেও।

কটাদিন ধরে আমি কিছুই লিখতে পারছি না, মানে কিরকম একটা করছে শরীরের ভেতরটা। পলায়নরত মানুষের ইন্টারভিউ গুলো দেখছি আর শুনছি, ভাবলেশহীন শূন্য চোখ গুলো দেখে বুকের ভেতরটা কি রকম কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই পরিবেশ পরিস্থিতিতে কে তৃণমূল কে বিজেপি কে সিপিএম, এই সব ছাপিয়ে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টা বড় হয়ে উঠেছে। ৩০ বছর পর যারা আজকের দিনকে পিছন ফিরে দেখবে, তারা আজকের এই অসহায় পরিস্থিতি নিয়ে, মানবিক বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা করবে। তৃণমূল বা বিজেপি কেউ কোথাও থাকবেনা সেদিন। তৃণমূল নামটারই অস্তিত্বই হয়ত মুছে যাবে। সেদিন আলোচনার বিষয়বস্তু থাকবে শুধু কম পয়সার লেবার, অর্থনীতি, মানবিক বিপর্যয় এবং মানুষের অসহায়ত্ব।


হিন্দু, মুসলমান, বিজেপি, তৃনমূলের বাইরে গিয়ে আপনি কীভাবে দেখছেন গোটা প্রক্রিয়াটাকে?

শনিবার, ১১ জুলাই, ২০১৫

কোরানের অপব্যাখ্যা

 


আজকাল কোরানকে অপব্যাখ্যা করে পোষ্ট করাটা ভক্তদের কাছে ফ্যাশন হয়ে উঠেছে, ভক্তগ্রুপে জাতে উঠার মই। প্রশ্ন হল, নাথুরাম গড়সে কি কোরান পড়তেন? মানব বোমার আধুনিক জনক LTT দেশপ্রেমিকরা কি কোরান মেনে চলতেন? ক্রুসেড, দুটো বিশ্বযুদ্ধ, আমেরিকাতে ইউরোপীয়দের রাজত্ব স্থাপন করতে গিয়ে জেনোসাইড, পৌরাণিক রামায়ন মহাভারত ট্রয়ের যুদ্ধ, আধুনিক হিটলার এরা কোরাণ পড়েছিলো? গু সকলের পিছনেই আছে, সুতরাং অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেকে দেখা উচিৎ, নাহলে চারটে আঙুল আপনার দিকেই তাক করে আছে

চেঙ্গিস খান সাড়ে তিন কোটি মানুষ হত্যা করেছিলও, তার উত্তরসুরীরা আরো ৪ কোটি গণ হত্যা করেছিলো। এর পরেও গোটা মানব ইতিহাসে যত মানুষ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে তার ৭৮ শতাংশই ছিল বিগত সাড়ে পাঁচশ বছরে। বস্তুত এই যুদ্ধগুলো আমেরিকা, ইউরোপ ও পশ্চিমাবিশ্ব নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্যই বাঁধিয়েছিল। এরাই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাঁধিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে। আমেরিকায় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নামে ৫০ বছরে ১০ কোটির বেশি রেড ইন্ডিয়ানকে হত্যা করা হয়েছে। ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন বিপ্ল­বেও ৮ কোটির বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকায় বিপ্ল­ব সৃষ্টির জন্য ২ কোটি মানুষ নিহত হয়।

১৭৭৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত আমেরিকার সশস্ত্র বাহিনী ২৭৭ বার বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। মাত্র ২৩৯ বছরে ২৭০-এর বেশি সংঘর্ষের এই হার যে কোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলে পাশবিকতা ও বর্বরতায় বিশ্বের শীর্ষস্থানটিও আমেরিকারই দখলে। আফ্রিকাতে ৬ কোটি, ভিয়েতনামী ১০ কোটি, ইরাকী ৩০ লাখ, ৫ লাখ আফগানী। আমেরিকার রাষ্ট্রীয় গ্রন্থের নাম কোরান নাকি তারা ইসলামের অনুসারী?

একসময় মঙ্গোলরা বলতো পৃথিবীতে একমাত্র কর্তৃত্ব করার অধিকার শুধু তাদের।  ১৯৪৫ সাল থেকে জার্মানির একই দাবি ছিল। ১৯৫০ সালের পর রাশিয়া এল এই অবস্থানে। ১৯৯০ এর পর আমেরিকা সেই ভাবনার পথিক। আর আজকের ইজরায়েল আমেরিকাকে টপকে সকলের বাপ হতে চায়, তাদের ধর্মগ্রন্থ মতে ইহুদি ছাড়া বাকি কেউ বেঁচে থাকার অধিকারই রাখেনা। এরা কেউ কোরাণ পড়েনি।

ভক্তেরা এসব প্রেক্ষাপট বিচার বিশ্লে­ষণ করার অউকাত রাখেনা, তাদের দৌড় হোয়াটস্যাপে পাওয়া ৪ লাইনের শেয়ার জ্ঞান, যা বিজেপির দু পয়সার ভাড়াটে আঁটি সেল লিখে দেয়।

আমি আগে মানুষ, তার পরে ভারতীয়, তারপর বাঙালী ও সবশেষে মুসলমান। কোরান আমার মননে, আমার পরিচয় ও অস্তিত্বের একমাত্র কারন। তার অপব্যাখ্যা বা মিথ্যা সমালোচোনা করলে নিঃসঙ্কোচে আমার থেকে দুরত্ব বজায় রাখুন। কারন আমি বা আপনি কেও কারো যোগ্য নই, আমি উদ্দেশ্যমূলক অপব্যাখ্যা কারীকে ঘৃনা করি

আমি সাম্প্রদায়িক নই যে উগ্রতা চাষের জন্য এক জাতীয় বানোয়াট ইসলামকে সমর্থন করি, যারা করে তাদের জন্যও একরাশ ঘৃনা। ধর্মকে হাতিয়ার করে যারা নিরীহ মানুষকে হত্যা করে বা অত্যাচার করে, তারা যে ধর্মেরই হোক- তারা নরকের কীটের অধম, ক্লীব হিজরে। আমি নাস্তিকও নই, অন্য সকল ধর্মকে শ্রদ্ধা করি, তাদের আচারকে সম্মান করি, তার মানে এই নয় যে তাদের বিশ্বাসে আমাকেও বিশ্বাসী হতে হবে। চোরের জাতে ৭০ % মুসলিমান হলে যদি কেও সমগ্র জাতিকে গালি দেয়, তাহলে তথ্য দিয়ে সামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে, কেন সে চোর? মুখ বুজে ভাঁটের গল্প শুনবনা। পশ্চিমবাংলাতে ২৭% মুসলমান, সরকারি চাকরিতে ১% এরও কম। মুসলমান সম্প্রদায়ের হকের চাকরিগুলো যারা খেয়েছে তারা সংখ্যাগুরু, শিক্ষিত ও ক্ষমতাবান বলে চোরের হিসাবে আসেনি।

তথ্য উপাত্তকে দূরে রেখে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটির জ্ঞান নিয়ে কেউ যদি কোরান ব্যাখ্যা করতে আসে, কিম্বা সেটাকে সাইকোর মত সমর্থন করেন, নিশ্চিন্তে আমাকে আপনি উন্মাদ মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক। আপনি সমাজের পক্ষে বিষাক্ত ছত্রাক সন্দেহ নেই।

বিধবাদের পুড়িয়ে মারা কোন অহিংসার শিক্ষা দেয়? নারীকে পরিকল্পিত খুন করে কার ধর্মকে রক্ষা করা হতো বলতে পারেন? কৃষ্ণ যখন অর্জুনকে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন মহাভারতের যুদ্ধের ময়দানে,  অর্জুন জানতেননা যে যুদ্ধে জয়লাভের জন্য তাকে তার বিরুদ্ধে থাকা পুরো বংশকে হত্যা করতে হবে। ভগবান কৃষ্ণ কি মানা করেছিলেন নাকি উৎসাহ দিয়েছেন? অর্জুনকে দেওয়া বক্তৃতাই তো ভগবৎ গীতা।

পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মে হত্যার অনুমতি রয়েছে। আব্রাহামীয় সকল ধর্মেই হত্যার জন্য সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। অহিংসাবাদী বুদ্ধ নিজে শুকরের পচা মাংস খেয়ে বিষক্রিয়াতে মারা গিয়েছিলেন, সেই শুকরকে কী হত্যা করা হয়নি? জৈন ধর্মকে অহিংসার পরাকাষ্ঠা হিসাবে বিবেচনা করা হয়, অথচ বৃদ্ধ বয়সে নিজেরাই আত্মহত্যা করে। অহিংসা নাকি সনাতন ধর্মের প্রধান নীতি। অতথচ বেদ বা পুরাণ সে কথা বলেনা। এটা আজকের হিন্দুধর্মের কারবারিদের নতুন আবিষ্কার- নিরামিশাষী, অথচ তাদের মূল উপাস্য শ্রী রামচন্দ্র নিজে ক্ষত্রিয় ছিলেন, তথায় মাংস খেতেন

বিষ্ণু নাকি নিরামিষাশী ছিলেন, তাহলে মৎস্য, কূর্ম, নৃসিংহ, রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ এনারা কী ঘাস পাতা খেয়ে বেঁচে ছিলেন? ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলের হিসাবে শিবঠাকুর আমিষাশী, সে সময় কী তার জাত গেলো বলে কেউ রব তুলেছিলো?

কচি ছাগ মৃগ মাংসে ঝাল ঝোল রসা।

কালিয়া দোলমা বাগা সেকচী সমসা।।

অন্ন মাংস সীকভাজা কাবাব করিয়া।

রান্ধিলেন মুড়া আগে মসলা পুরিয়া।।”

মা কালীর প্রশ্ন উঠলে সেখানে আমিষ ছাড়া সেভাবে কিছুই নেই ছাগল, ভেড়া বা মহিষ বলি ছেড়েই দিন, নরবলির ইতিহাস ভুলে গেলেন? শাস্ত্রে আমিষ, নিরামিষ বলতে কোন কথাই উল্লেখিত নেইযেট আছে তা হলো- সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক আহারের কথা। গীতায় স্পষ্ট স্লোক রয়েছে-

-      "যে আহার আয়ু, সত্ত্ব, বল, আরোগ্য, সুখ ও প্রীতি বর্ধনকারী এবং রসযুক্ত, স্নিগ্ধ, স্থায়ী ও মনোরম, সেগুলো সাত্ত্বিক আহার হিসেবে সর্বদা বিবেচ্য হয়ে থাকে" (গীতা, ১৭/৮)

-      "যে আহার অতি তিক্ত, অতি অম্ল, অতি লবনাক্ত, অতি উষ্ণ, অতি তীক্ষ্ণ, অতি শুষ্ক, অতি প্রদাহকর এবং দুঃখ, শোক ও রোগপ্রদ সেগুলো রাজসিক আহার হিসেবে বিবেচ্য" (গীতা, ১৭/৯)

-      "যে আহার অনেক পূর্বে রাঁধিত, যা নীরস, দুর্গন্ধযুক্ত, বাসী, পচা, যার ঘ্রান গ্রহনে নাসিকা সরে আসে এবং অপরের উচ্ছিষ্ট দ্রব্য ও অমেধ্য দ্রব্য, সেই সমস্ত তামসিক হিসেবে বিবেচ্য" (গীতা, ১৭/১০)

 

বেদের শান্তিময় বাণী শুনুন- ছত্রে ছত্রে অবিশ্বাসীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য ক্ষত্রিয়দের আহ্বান জানানো হয়েছে। সত্য প্রকাশ সরস্বতী, সত্যকাম বিদ্যালঙ্কার, দেবী চাঁদ, বৈদ্যনাথ শাস্ত্রী, ক্ষেমকরন্দ দাস ত্রিবেদী, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, শ্রীপাদ দামোদর সাতভালেকরের আর্য সমাজী অনুবাদ, স্বামী কার্পাত্রী এবং শ্রী রাম শর্মা আচার্য (গায়ত্রী পরিবার) এর অর্থোডক্স অনুবাদ পড়ুন। গ্রিফিথের অনুবাদ পড়ুন, সেখানে অ-হিন্দুদের বোঝাতে কাদের নির্দেশ করা হয়েছে। আদিদেব, আদিদেব্যু যার অর্থ ঈশ্বরহীন, অনিন্দ্র যার অর্থ ইন্দ্রের বিরুদ্ধে, আয়জ্যু, আয়জওয়ান যার অর্থ ত্যাগহীন, অব্রাহ্মণ, অন্যব্রত যার অর্থ অন্যান্য দেবতাদের অনুসারী, অপভ্রত, আভ্রত যার অর্থ নিষ্ঠাহীন, দেবানিদ যার অর্থ দেবতাদের বিদ্বেষী, ব্রহ্মদ্বিষ যার অর্থ ভক্তির বিদ্বেষী এবং যারা বেদকে নিন্দা করে তাদের সকলকে হত্যার বিধান দেওয়া রয়েছে।

     ~ধর্মের বাইরে যারা সবাইকে যুদ্ধের মাধ্যমে বশ্যতা স্বীকার করাতে হবেযজুর্বেদ ৭/৪৪,

অনুবাদঃ দেবী চাঁদ, আর্য সমাজ। স্বামী দয়ানন্দের ভাষ্য হতে সরাসরি অনুবাদ

     -অতঃপর রাজার প্রতি আদেশ, এদের পুড়িয়ে মার। যজুর্বেদ ১৩/১২,

অনুবাদঃ দেবী চাঁদ, আর্য সমাজ। স্বামী দয়ানন্দের ভাষ্য হতে অনুবাদিত

 

-      এরপর তাদের জায়গা জমি এবং রান্নাঘর ধংস কর, যজুর্বেদ ১৩/১৩,

শুধু শত্রুদের ধংস করেই ক্ষান্ত নয়, বরং তাদের পরিবারের সদস্যাদেরকেও হত্যা করতে বলছে বেদ,

- “সেনাপ্রধান হিংস্র ও নির্দয়ভাবে শত্রুদের পরিবারের সদস্যদের সাথে যুদ্ধ করবে।” যজুর্বেদ ১৭/৩৯,

-      - শত্রুদের পরিবারকে হত্যা কর, তাদের জমি ধংস করযজুর্বেদ ১৭/৩৮

শান্তিময় বেদের এটাও তো একটা রূপ, এইসব যুদ্ধের মুল প্রেরনা কি? মূল প্রেরনা হচ্ছে শত্রুদের লুট করে ধনসম্পদ বৃদ্ধি। বেদের স্পষ্ট বানী,

-  যুদ্ধই তোমাদের উন্নতির উৎস, এজন্যই তোমাদেরকে আমি যুদ্ধে প্রেরন করি” যজুর্বেদ ৭/৩৮,

 

    হে সেনাপ্রধান, আমাদের আশা পুর্ণ করো। হে ধনসম্পদের বাদশা, তোমার সহায়তায় আমরা যেন সম্পদশালী হতে পারি এবং যুদ্ধে জয় লাভ করে প্রচুর ধন সম্পদের মালিক হতে পারি।” যজুর্বেদ ১৮/৭৪,

 

অর্থাৎ শত্রু পরিবারের নারীরাও যাবে দখলকারীর ভোগের জন্য। ধনসম্পদ লুট খুনের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ব দখল করতে বলছে। একসাথে এই মন্ত্রে স্পষ্টভাবে কোন আত্মরক্ষার্থে নয় বরং যারা শান্তিপ্রিয় তাদেরকে আক্রমন করে দখল করতে বলছে,

- আমরা যেন সামরিক অস্ত্রের মাধ্যমে বিশ্ব দখল করতে পারি, আমরা যেন শান্তিপ্রিয় বা আরামপ্রিয় শত্রুদের বিরুদ্ধে জয় লাভ করতে পারি। অস্ত্র দিয়ে আমরা যেন সারা বিশ্বের সকল অঞ্চলকে বশ্যতা স্বীকার করাতে পারি।” যজুর্বেদ ২৯/৩৯ এ,

অর্থাৎ জ্ঞান বা ভালবাসা দিয়ে নয়, বরং অস্ত্র দিয়ে, শান্তিপ্রিয় মানুষদের হত্যা করে ও তাদের এলাকা দখল করে সমগ্র বিশ্ব দখল করতে নির্দেশ দিচ্ছে বেদ

তার প্রতি শ্রদ্ধা, যার রয়েছে তলোয়ার, তীর। তার প্রতি সন্মান, যার রয়েছে ধারালো অস্ত্র। তার প্রতি খাদ্য নিবেদন, যার রয়েছে ভাল অস্ত্রযজুর্বেদ ১৬/৩৬,

এভাবে যদি বেদের বাণী সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায়, দুনিয়ার অবস্থা কেমন হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। বেদের অজস্র হিংসাত্মক মন্ত্র হতে শুধু অল্প কয়েকটি উল্লেখ করলামএবারে বলুন, এটা কোন সর্বশক্তিমান সৃষ্টার সৃষ্টি? এটা তো যুদ্ধবাজ, ধংসপ্রিয় ও লুঠেরা আর্যজাতীর বাণী তা সহজেই বোধগম্য

যজুর্বেদের কথা সংহিতা, শাণ্ডিল্য উপনিষদে অন্য সত্তাকে অকারন আঘাত করতে নিষেধ করেছে। কিন্তু সহিংসতার বিপরীতে আক্রমণকারীর উপর সহিংসতা ফিরিয়ে না দিলে কর্মফল হিসাবে নরকপ্রাপ্তি ঘটবে। মানে হত্যা করার অনুমতি রয়েছে। ছান্দোগ্য উপনিষদ অনুযায়ী- ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ধার্মিকদের রক্ষা করার জন্য কেবল হত্যা করাই একমাত্র নিতী হিসাবে উল্লেখ রয়েছে। একখন এখানে ধর্মের মাত্রা কে নির্দধারণ করবে, আর ন্যায়টা কার প্রতি রাখা হবে? হিন্দুধর্ম ঐতিহ্যগতভাবে মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে। আসলে হিন্দু ধর্মে হত্যা সম্পূর্ণরূপে অনুমোদিত, বিশষেশষকরে তারা যদি অব্রাহ্মণ হয়

পিতার শ্রাদ্ধের জন্য পরশুরাম  ক্ষত্রিয় রাজা সহস্রার্জুন কর্তৃক তার পিতা জমদগ্নির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ক্ষত্রিয়দের গণহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। মহাভারত, আদি ২.৫-৭, ৬৬-৬৯ অধ্যায়

মনুসংহিতার দিকে ভুলেও তাকাবেননা, ব্রাহ্মণ না হলে সহ্য করতে পারবেননা, মনে হবে আন্ত্রিকগ্রস্থ নরগোবর খেয়ে হেগে হেগে আত্মহত্যা করি। সেখানে ছত্রে ছত্রে কীভাবে নিম্নবর্ণের মানুষ আর মহিলাকে শোষণ, লুন্ঠন ও ধর্ষণ করতে হবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়া রয়েছে।

-গাড়ি, ঘোড়া, হাতি, অর্থ, শস্য, গবাদিপশু ও নারী তার দখলে যে যুদ্ধের মাধ্যমে তা জয় করে।” মনুসংহিতা ৭/৯৬,

আপনারা করতে আসেন কোরানের বিচার? আগে নিজের ধর্মকে অন্বেষণ করুন, পড়াশোনা করুন। বহু ভালো ভালো জিনিস রয়েছে আপনাদের বেদ, উপনিষদ, পুরাণে, সেগুলোকে নিজের জীবনে অভ্যাস করুন, দেখবেন পৃথিবীটা সুন্দর হয়ে উঠেছে।

শুক্রবার, ১২ জুন, ২০১৫

প্রতিবাদের আপেক্ষিকতা



ফ্রান্সে জঙ্গীহানার জন্য যেকোন ধরনের প্রতিবাদ অবশ্যই কম। কারন এই নৃসংসতা অমানবিক। দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করণ করে, তাদের খুঁজে বার করে, কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি থেকে শুরুকরে ভবিষ্যতে এধরনের বর্বরতা থেকে সভ্যতাকে বাঁচাতে জোটবেধে সিদ্ধান্ত সবই নেবার প্রয়োজন। শুধু শুধু হাম মারেঙ্গা তাম মারেঙ্গা, লম্ফ মারেঙ্গা ঝম্প মারেঙ্গা বলে মুখে তরপিয়ে লাভ নেই। ওই জন্যই এই নরপশুরা ফাঁক পেয়ে যায়। সমাজকে দুষিত করে তোলে।

কিন্তু আনন্দবাজারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কিছু ছবি দেখে আবার শিউড়ে উঠলাম।

"কে জঙ্গী?

সিরিয়া এই মুহূর্তে একের পর এক বোমারু বিমান হানায় বিধ্বস্ত। রাশিয়া সহ অনান্য প্রথম বিশ্বের দেশের দাবি হামলা চলছে শুধুমাত্র জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করেই। কিন্তু ঠিক এর উল্টো কথা বলছেন সিরিয়ার সাধারণ মানুষ। তাঁদের দাবি একের পর এক হামলায় অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ। সোশ্যাল মিডিয়ায় সিরিয়ানদের পোস্ট করা একের পর এর ছবি বলছে মিসাইলে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে ইমারত। ভেঙে পড়ছে বসত বাড়ি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে অসহায় শিশুদের রক্তাক্ত মুখের সারি"।

জঙ্গী নির্মূলের নামে এ কি চলছে?   কালকে যদি এই বাচ্চাগুলো এই আবহে বড় হয়ে প্রতিশোধের জিগাংঘায় নিজেই মারন বোমা বনে যায়? এই অদক্ষ রাষ্ট্রনায়ক দের দোষেই জন্ম নিচ্ছে এমন কত শত সহস্র জঙ্গী জেহাদী। তেলের লোভে আমেরিকা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে জঙ্গী বানিয়ে ছেরেছে। ইরাক যুদ্ধ যে স্রেফ একটা ধাপ্পা ছিল সেটা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে সম্প্রতি। আসলে এই বর্তমান পশ্চিমি সভ্যতা তেলের জন্য এই ধাপ্পাবাজি দীর্ঘ দিনই খেলে যাচ্ছে। মুষিকের মুষিকই প্রসবই বারবার হচ্ছে, অথচ বাকি বিশ্ব সার্কাসের জোকারের মত মাঝেমাঝে হাততালি দেওয়া বা উচ্চস্বরে বিলাপের বাইরে কিছুই করতে পারেনি। মিডিয়াকে দিয়ে নিজেদের মত খবর বানিয়ে বাজারে পেস করছে। প্রসঙ্গত মধ্যপ্রাচ্যের ওই অঞ্চলের সংখ্যগুরু বাসিন্দাই ইসলাম সম্প্রদায় ভুক্ত। যার অতিসরলীকরণে আমরাও মানে প্রতিটি মুসলমানই আজ প্রায় জঙ্গী। অন্তত সন্দেহ টা আছেই। 

আমেরিকায় বন্দুকবাজের ঝামেলা হলে সেটা মানসিক বিকারগ্রস্থের হামলা, আমাদের দেশের মধ্যপ্রদেশে বিস্ফোরণ হলে সেটা গ্যাস বিষ্ফোরন, সংবাদ পত্রে খুঁজেই পাওয়া যাবে না ওই খবর। দুষ্কৃতি তো সকল ধর্ম সকল জাতীদের মধ্যেই বিদ্যমান। কিন্তু মুসলমান হলেই সে জঙ্গী। দেখা যাবে কোন একটা সংগঠন দায় ও স্বীকার করে নিয়েছে। কার কাছে কে দায় স্বীকার করে, এ কথা অবশ্য কখনই জানা যায়না। তাছারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নীতিই হল, নিজের পাদে গন্ধ নেই। কিন্তু অপর কে খুঁচিয়ে ঘাঁ করে দিয়ে, সেখান থেকে পচা গন্ধ বেরোলেই, ফায়ারিং স্কোয়াড।

এ এক যুগসন্ধিক্ষন সন্দেহ নাই। যে ক্ষমতাবান, সে আজ তার ক্ষমতা দেখাচ্ছে। কাল কালের নিয়মেই আজকের এই পশ্চিমি সাম্রাজ্য অস্ত যাবে। যাবেই। আগেও গেছে। রোমান রা গেছে, মুঘলরা গেছে, ব্রিটিশরা গেছে, সম্প্রতি আমাদের রাজ্যে বামেরাও গেছে। মার্কিনরাও যাবে। 

প্রশ্ন হল, রেখে কি যাবে? পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কি থাকবে কিছু অবশিষ্ট? 

ধরুন ওই মানব বোমারা নিজে বোমা হয়ে না মরলেও , দেখা যাবে পশ্চিমি বিশ্বের মিসাইলের শিকারে মরবে। যেকোন মুহুর্তে, যে কোন সময়। এর উপর গোদের উপর বিষফোঁড়া উগ্রবাদী ধর্মগুরুরা, অপব্যাখ্যা করে তীব্র মগজ ধোলাই যন্ত্রে পেষণ করে যতক্ষনে বাজারে আসবে, ততক্ষনে তারা আর মানুষ নেই, একটা যন্ত্র। ভয় নেই , বিকার নেই, আর মানবিকতাও নেই। তাই তীব্র একটা ঘৃনা নিয়ে হয়ত সে ফাটবে কোন পশ্চিমি দুনিয়াতে। কোন কারন ছারাই। কিছু নিরীহ মানুষের প্রান বলি হবে। যেমন এদের আত্মীয় স্বজনেরা হচ্ছে আজকের মধ্যপ্রাচ্যে, ইরাকে সিরিয়া গাজায়। তখন তো বাকি অবশিষ্ট দুনিয়া বুক ফাটানো বাপ-মা মরা কান্না জুরবে। সাদা চামরার মৃত্যুই একমাত্র শোকের, বাকিরা তো মড়ার জন্যই জন্মেছে। মালিতে জঙ্গী হামলায় মৃত্যুতে কোন নিউজ কভারেজই নেই। কেন দেবে? ওরা তো কালো চামরার। তাদের মৃত্যু আবার মৃত্য? ছোঃ... 

এবার আবার ভাবার সময় হয়েছে বোধহয় বন্ধু।
তাই প্রতিবাদ করতে হলে তার পাল্লাটা টা সমান সমান রাখুন। সকল মৃত্যুই বেদনাদায়ক। কারন পাসের বাড়ি পুরে খাক হয়েগেলে আমার বাড়িতেও যথেষ্ট আঁচ লাগবেই।

ভালবাসার যেমন কোন ধর্ম থাকেনা, ঘৃনার ও কোন ধর্ম থাকে না।

বুধবার, ৪ মে, ২০১১

মৌলবাদী

 


সাতদিন না খেয়ে থাকুন, তারপরে কোন হিন্দুকে গিয়ে বলুন- আমি রামভক্ত, আমি হিন্দু, শুধু এই কারনে আমাকে দুটো ভাত দিন। দেখি কয়জন আপনাকে খেতে দেয়। একই ব্যাপার আমি ধর্মান্ধ মুসলীম বা অন্য সম্প্রদায়কেও করে দেখতে বলি। দরিদ্র মুসলমান যদি পয়সাওয়ালা মুসলিমকে বলে আমি আল্লাহর একনিষ্ঠ মুমিন, আমায় শুধু এই কারনে সারা জীবন ভাতকাপড় দিন, তাকে দেবে?

যতক্ষন ভরাপেট ততক্ষনই ধর্মের জিগির তুলতে মজা লাগে। সমস্ত দাড়িওয়ালা, টিকিওয়ালা, জোব্বা আর নামাবলীধারীদের খাওয়া পরা বন্ধ করে দিয়ে জিজ্ঞাসা করুন পেট আগে না ধর্ম? যদি কোথাও কাজ করেন তাহলে সেখানকার হিন্দু মালিককে গিয়ে বলুন আমি হিন্দু, তাই আমার মাইনে বাড়ান, যদি মুসলমান হয়ে কোন মুসলিম মালিকের অধীনে কাজ করেন, তাহলে তাকে গিয়ে বলুন আমি পাঁচবেলা নামাজ পড়ি, আমাকে বছরে পাঁচবার বোনাস দিন, দেখুন তো দ্যায় কিনা? বাড়িতে রাজমিস্ত্রী, প্লাম্বার আর কুয়ো কাটার লোক ঢোকানোর আগে জাত জিজ্ঞাসা করে নেবেন।

রাস্তায় কিছু খাওয়ার আগে, কাপড় সেলাই করাবার আগে দোকানী বা দর্জির জাত জেনে নেবেন। ডাক্তার দেখানোর আগে আর গাড়িতে চড়ার আগে ডাক্তার আর ড্রাইভারের জাতধর্ম জেনে নেবেন। তিনিদিন এইভাবে সমাজে চলাফেরা করুন- যদি পাগল প্রতিপন্ন হয়ে কোথাও গনধোলাই না খান, তাহলে তিনদিন পরে আমার ঠিকানাতে লিখবেন। সমস্ত ধর্মের মৌলবাদীদের উদ্দেশ্য করে লিখলাম

বৃহস্পতিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

Missing Goat Syndrome


 
অনুপস্থিত ছাগল সিন্ড্রোম বা অনুপস্থিত টাইলস সিন্ড্রোম (Missing Tiles Syndrome)


পড়ন্ত বিকেলে ক্লাস শেষে, কয়েকজন ছাত্র স্কুলের খেলার মাঠে খেলছিল। শেষ বিকেলে হঠাৎ তারা আবিষ্কার করল, খেলার মাঠের অন্য দিকে তিনটি ছাগল ঘাস খাচ্ছে। দলের নেতার মাথায় হঠাৎ একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে অন্যান্য ছেলেদের বোঝাল, "ছাগলগুলোর মাথায় নম্বর লিখে দিলে কেমন হয়?" তিনটি ছাগলকে ধরা হোল, রং এবং ব্রাশের ব্যবস্থাও হয়ে গেল।
ছাগলগুলিকে নম্বর দেওয়া হল; ১, ২, ৪, উদ্দেশ্যমূলকভাবে তারা “৩” নম্বরটি লিখল না। এরপর তারা তিনটি ছাগলকে সারা রাতের জন্য পর্যাপ্ত ঘাস এবং ঝোপঝাড়ের পাতা সমেত স্কুল ভবনের ভিতরে ঠেলে দিল। ততক্ষণে বিকেল শেষ, ছেলেগুলি নিজেদের বাড়ি চলে গেল।
পরের দিন সকালে স্কুল খোলার জন্য চাবি নিয়ে পিওন ঠিক সময়ে হাজির। তালা খুলতে গিয়ে নাকে এল তীব্র প্রস্রাব এবং বিষ্ঠার গন্ধ। তিনি অনুমান করতে পারলেন, নিশ্চয়ই কোন গবাদি পশু, স্কুল ভবনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তালা না খুলে, অন্যদের আসার জন্য কিছু সময়ের জন্য অপেক্ষা করল। কয়েক মিনিট পরে, প্রিন্সিপাল, সমস্ত শিক্ষক, ছাত্র, অফিস স্টাফ ধীরে ধীরে স্কুল-ভবনের গেটে জড়ো হয়ে গেল। যথারীতি, প্রিন্সিপাল নেতৃত্ব দিলেন এবং তালা খোলা হল।
একজন অতি উৎসাহী ছাত্র গেটের কাছে সিঁড়িতে ছাগলের বিষ্ঠা দেখে চেঁচিয়ে উঠল। বোঝা গেল, যে ভাবেই হোক স্কুল-ভবনে ছাগল প্রবেশ করেছে।
প্রিন্সিপালের নির্দেশে অনুসন্ধান শুরু হয়ে গেল। বারান্দা, শ্রেণিকক্ষ, অফিস এবং এমনকি ওয়াশরুম পর্যন্ত খুঁজে শেষ পর্যন্ত তিনটি ছাগল আবিষ্কার করা গেল। ছাগলগুলিকে অধ্যক্ষের ঘরে নিয়ে আসা হল। দেখা গেল, প্রত্যেকটি ছাগলের মাথায় একটি করে সংখ্যা লেখা আছে। অবাক কান্ড, সংখ্যা গুলি ১, ২ এবং ৪; সমস্যা হল যেহেতু ৪-নম্বরের ছাগল পাওয়া গেছে, তা হলে ৩-নম্বরের ছাগলটি গেল কোথায়?
প্রিন্সিপাল, সিনিয়র শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করলেন এবং আরও একবার গভীর অনুসন্ধানের নির্দেশ দিলেন।
কৃতিত্ব নিতে প্রত্যেকে, পাগলের মত, ৩-নম্বর ছাগল খুঁজতে লাগল। আশ্চর্যভাবে ৩-নম্বর ছাগল সন্ধানকারীদের মধ্যে কেউই ৫-নম্বর ছাগলের সম্ভাবনা ভেবে দেখল না। যেহেতু ৪-নম্বর ছাগল পাওয়া গেছে, তাই তারা নিশ্চিত ছিল, ৩-নম্বর ছাগল নিশ্চয়ই আছে।
সারাদিন অনুসন্ধান চলতে থাকল। ক্লাস বন্ধ করে দেওয়া হল। সবাই ক্লান্ত। ধীরে ধীরে আতঙ্ক ও হতাশার সৃষ্টি হল। অনিবার্যভাবে ৩-নম্বর ছাগলটি খুঁজে পাওয়া গেল না। কারণ এটির কখনও অস্তিত্ব ছিল না।
গল্পটি খুবই ছোট এবং মজার। তবে এটি এক গভীর শিক্ষা দেয় এবং তা সমস্ত মানব সমাজের জন্য প্রযোজ্য।
আমাদের মধ্যে অনেক আছেন, যারা একটি ভাল জীবন এবং তাদের প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই থাকা সত্ত্বেও, সবসময় একটি "তৃপ্তির অভাব" বোধ করতে থাকেন। করুণভাবে, হন্যে হয়ে খুঁজছেন সেই ছাগল নম্বর-৩, যেটি বাস্তবে অনুপস্থিত বা অধরা। মনস্তত্ববিদরা এটিকে বলেন "মিসিং গোট সিনড্রোম" বা " মিসিং টাইলস সিনড্রোম"। এটি হল যা আছে তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে, সোনার হরিন খুঁজে বেড়ানো। সব জিনিসের উপস্থিতি সত্বেও যা নেই তার জন্য বিলাপ করা। নিখোঁজ ছাগল নম্বর-৩ এর বিলাপ এড়ানোর সর্বোত্তম উপায় হ'ল ওইসব ব্যক্তিদের দিকে তাকানো, যারা বিলাসিতা তো দূর, তাদের প্রাথমিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
একটু ভেবে দেখুন:
  • “যদি আপনার ফ্রিজে খাবার থাকে, আপনার পরনের কাপড় থাকে, আপনার মাথার উপর একটি ছাদ থাকে এবং ঘুমানোর একটি জায়গা হয় তবে আপনি বিশ্বের ৭৫ শতাংশের চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ।
  • যদি আপনার ব্যাঙ্কে টাকা থাকে, আপনার মানিব্যাগ এবং কিছু খুচরো থাকে, তবে আপনি বিশ্বের ৮ শতাংশ ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন।
  • যেহেতু, সুস্থ শরীরে আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেছেন, তবে আপনি এক মিলিয়ন লোকের চেয়ে বেশি ভাগ্যবান যারা এই সপ্তাহে বেঁচে থাকবে না।
  • আপনি যদি কখনও যুদ্ধের ঝুঁকি, কারাবন্দি বা নির্যাতনের যন্ত্রণা বা অনাহারে ভয়াবহ যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা না পেয়ে এখন ও বেঁচে আছেন তাহলে আপনি ৫০০ মিলিয়ন মানুষের চেয়ে বেশি ভাগ্যবান।
  • যদি আপনি এই লেখাটা পড়তে পারেন, আপনি বিশ্বের ৩ বিলিয়ন মানুষের চেয়ে যারা এ সব পড়তে পারে না তাদের চেয়ে বেশি ভাগ্যবান।
কোনরকম উদ্বেগ ছাড়াই জীবনটি অনেক বেশি সুখী হবে, যদি আমাদের যা আছে তা উপলব্ধি করি, জীবনের রঙগুলির প্রশংসা করি, আমাদের জীবনে প্রতিটি ব্যক্তির অনন্য গুণাবলীর প্রশংসা করি। সুতরাং, সুখ বা সাফল্যকে তাড়া করবেন না। এটি পৌঁছনোর কোনও গন্তব্য নয়, কেবলমাত্র হয়ে ওঠার যাত্রা। আপনার যে কোন অবস্থায়, পছন্দ করার অধিকার আছে একটি সুখী ও সফল জীবনের। কারণ ৩-নম্বর ছাগল কখনই খুঁজে পাবেন না, কারন এর বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই।
জীবন যেমনটি আছে, সেইভাবে উপভোগ করুন। আপনার যা আছে তা দিয়ে আপনার জীবন উপভোগ করুন। প্রথমে আপনার পরিবারের সাথে এটি শুরু করুন, আপনার স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ির দুর্দান্ত গুণাবলী দেখুন এবং তারপরে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন এবং সহকর্মীদের কাছে যান।
কাল্পনিক, অস্তিত্ববিহীন সোনার হরিন বা ৩-নম্বর ছাগল খুঁজে, আর আপনার সময় এবং সুখ নষ্ট করবেন না।
@

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...