সমাজ দর্পন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমাজ দর্পন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

 


ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী আশাবাদী হয়ে লাভ নেই আসন্ন নির্বাচনে। একটা নেহাৎ উদগান্ডু সম্প্রদায় এরা, পুঁথিগত শিক্ষাদীক্ষা কমবেশি সকলের থাকলেও বাস্তব বোধের দিক থেকে ও বোধবুদ্ধিতে এরা গাঁড়লদের চেয়ে সামান্য নিচুতে ও দাড়িওয়ালা ছাগল তথা পাঁঠার চেয়ে সামান্য উচ্চ মর্যাদার। এরা মূলত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, যারা যুগে যুগে দেশ কাল সীমানার গন্ডি পেরিয়ে ভীরু ধান্দাবাজ লোভী ও পলায়নপর কাপুরুষ মানসিকতার জন্য সুপরিচিত।

তোলামূল বা বিজেপির সাথে অহেতুক তুলনা টেনে লাভ নেই, তোলামুল মানেই চোর বা স্বীকৃত সমাজবিরোধী। বিজেপি মানে মগজহীন কিছু ধর্মান্ধ অশিক্ষিত বর্বর অন্ধভক্ত, এদের চরিত্র নিয়ে সাম্প্রতিক অতীতে একটা রিসার্চ পেপার পাবলিস করেছিলাম, 'ভক্ত' নামে; টাইমলাইন ঘেঁটে দেখে নিতেই পারেন। এই দুই দলের একটা বড় গুণের কথা উল্লেখ না করলেই নয়, সেটা হলো যে- শিক্ষা দীক্ষার বিষয়ে এরা কোনো দাবী বা তর্কে যায়না, সততার বিষয়েও নূন্যতম বিজ্ঞাপন করেনা নিজেদের ও তাদের দলের বিষয়ে। এরা সকলেই জানে এদের নেতারা প্রত্যেকেই দুশ্চরিত্র, তোলাবাজ, কাটমানি খোর, মিথ্যাবাদী, লম্পট, সাম্প্রদায়িক লুম্পেন, এবং যে কোনোদিন দল পালটে অন্য দলে চলে যেতে পারে; এদের কোনো কর্মী সমর্থক আঁতলামো করেনা বা ভাবের ঘরে চুরি করেনা অতএব এই দুই দলের কর্মী সমর্থক জাত-কুল নিয়ে আলোচনাই চলেনা। 

👉 অনেকগুলো ছাগল একসঙ্গে একটা মঞ্চে কোনো নেতার পিছনে দাঁড়ালে, একগাদা ছাগল মিলে যদি কোনো সোস্যালমিডিয়া পেজ চালায় ও সেটাকে ফলো করে, একটা ছাগলের দল যদি কোনো হোয়াটস্যাপ বা ফেসবুক গ্রুপ খুলে বসে, চোখ বন্ধ করে নিশ্চিতভাবে জানবেন পেজ/গ্রুপটা সিপিএমের সমর্থকদের দ্বারা পরিচালিত। এদের মূল দাবী এরা সৎ ও শিক্ষিত সম্প্রদায়। 

 

✅ ছাগলের আবার সৎ আর অসৎ, আপনি পৃথিবীতে কোনো একটা দেশ থেকে একটা অসৎ ছাগল খুঁজে এনে দেখান! আইপ্যাক বা আঁটিসেল গত ১৫ বছরে যা করতে পারেনি কাড়ি কাড়ি অর্থ খরচা করে, এই অবৈতনিক স্বেচ্ছাসেবকের দল দলবেঁধে আক্রমণ করা বা প্রোপ্যাগান্ডা ছড়ানোতে বাকি সকলের চেয়ে কয়েক আলোকবর্ষ এগিয়ে। ক্যাপ্টেন আমেরিকার মত দেশ ও জাতি রক্ষার ভার একা হারকিউলিস হয়ে এরা সমস্ত বিরোধ বিক্ষোভ প্রদর্শনের দায় নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিয়েছে। কিন্তু ওই- ফিউজ হয়ে যাওয়ার আনগাউইডেড কামিকাজি আত্মঘাতী ড্রোনের মত। শত্রুকে আক্রমণ করার পরিবর্তে নিজের ভূমেই ছারখার করে দিয়ে নিজেরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। 

এরা মূলত কি করে? 

✊ এরা মূলত খিল্লি করে, কাকে খিল্লি করছে সেটা বড় বিষয় নয়, রোজ কোনো না কোনো একটা সাবজেক্ট বেছে নিলেই হয়। তাতে সেই ব্যাক্তি বা দলের নেগেটিভ প্রচারটা হচ্ছে কিনা- সে সব ভাবা নেহাৎ বাজে সময় খর্চা। জীবন পন করে ট্রোল করার মাঝেই বিপ্লবের যজ্ঞে এরা ঘৃতাহুতি দিয়ে, চে এবং লেনিনের আত্মার প্রতি তর্পন করে। 

✊ দ্বিতীয়ত, এরা রোজ খাপ পঞ্চায়েত বসায়, SS চালাচালি করে এবং দ্রিঘাংচুর মত মাঝে মাঝে গম্ভীর ভাবে কেউ একজন ‘কঃ’ বলে ডেকে উঠলে, বাকিরা মাথা চুলকে টাকের ছালচামড়া তুলে ফেলে ভাব সম্প্রসারন করতে বসে যায় জটিল সব আঁক কষতে কষতে। 

✊ তৃতীয়ত, লাল পতাকা বা নিজেদের নেতার ছবি সম্বলিত কোনো পোষ্ট, আনন্দ চ্যানেলে বলা নেতার অগ্নগর্ভ ভাষণ, বিরোধীদের আক্রমণ করে কোনো বিবৃতি বা পোষ্টার পেলে- সেটার ফ্যাক্ট চেক না করেই; হুলিয়ে শেয়ার করতে শুরু করে দেয়, পরিনাম না জেনেই। যেন একটা শেয়ার একটা পঞ্চায়েত/ওয়ার্ডে জিতে যাওয়া। একজন হুক্কাহুয়া করলেই বাকিরা সমস্বরে সেই টোনেই হু হু করে ডেকে উঠে। 

✊ এরা প্রত্যেকে বিশেষজ্ঞ, প্রতিটা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, যে কোনো দ্বিতীয় ব্যাক্তির চেয়ে যে কোনো মূহুর্তে এরা বিজ্ঞ, নতুন করে এদের শোনা বা জানার আর কিচ্ছুটি অবশিষ্ট নেই ধরাধামে। আপনি যদি এদের কথা শুনতে অস্বীকার করেন, আপনি প্রগতিবিরোধী, অতি প্রতিক্রিয়াশীল, লুম্পেন জাতের শ্রেনীশত্রু।

✊ কমেন্ট বক্সে এদের চেনার উপায় হচ্ছে লাল সেলাম, রেড স্যালুট, মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের ইমোজি কিম্বা সাবাস কমরেড। এছারা বিপ্লব, লড়াই লড়াই লড়াই চাই, ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াই হবে, শূন্যকে এতো ভয় কেন, হারলেও বাম জিতলেও বাম, রাস্তাই রাস্তা, এভাবেও ফিরে আসা যায়, শিরদাঁড়া বিক্রি নেই, ফেরাতে হাল ফিরুক লাল, রক্তিম অভিবাদন, চোখে চোখ রেখে লড়াই হবে- এই কটা শব্দ ও লাইনের মাঝে প্রতিটা ফেসবুকীয় বাম্বাচ্চাকে নিখুঁত ভাবে শনাক্ত করে ফেলবেন মূহুর্তে।

এবারে কংগ্রেসের সাথে জোট নেই, অতএব বুড়ো হাবড়া কচি হাবা নেকু ডাঁসা ঝিঙ্কু সেয়ানা সহ, যত প্রজাতির বামমনস্ক ‘মাল’ হতে পারে, তেনারা প্রকাশ্যে-গোপনে গুদাম বা ভাঁড়ারে যেখানে যত মজুদ ছিলো, সবাই গোঁফে তা দিয়ে দাবনা চাবকে টাইমলাইনে বেরিয়ে পরেছে। সময় এগিয়ে গেলেও এনারা মানসিকভাবে সেই আশির দশকের শুরুতেই রয়ে গেছেন, ৯০ এর দশকের মত ছড়া কেটে দেওয়াল লিখছে, তারপর সেটারই ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করছে। পাড়ায় মিটিং হলে মঞ্চের ধারে ভিড় করে দাঁড়াচ্ছে, সবাই মিলে একই লাইভ করছে, সবাই মিলে একই ছবি তুলছে। সবাই ‘অনলি ফ্রেন্ড’ করে পোষ্ট করছে, এবং এরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের বন্ধু যারা নিজেরা বাকিদের সকলকে ট্যাগও করছে। যদিও ছবি ভিডিও দেখে বোঝার উপায় নেই এটা শ্রাদ্ধ বাড়ির গুমোট পরিবেশ, নাকি গায়ে হলুদের ফাজিল হুল্লোর কিম্বা কোনো রাজনৈতিক গুরুগম্ভীর সভা। মিছিল হলে এরা নেতাদের পিছু পিছু হাঁটছে। এই সব কিছুর মাঝে প্রতি ২ ঘন্টা অন্তর ১১টা সেলফি আর ৩টে গ্রুপ ফটো ফোনের SD কার্ডে জমা হচ্ছে। সেগুলোকে কেটে ছেঁটে with অমুক নেতা & 99 others ট্যাগ মেরে বিপ্লবকে গর্ভবতী করে দিচ্ছে। 

এরপর দুপুরে অধিকাংশ দিন মাটিতে বসে নেতা/নেত্রীর সাথে বসে ছ্যাঁচড়া, ডাল ও মাংস ভাত সাঁটিয়ে, অন্তর থেকে ‘সিপিএমে’ অন্তর্ভুক্তির ব্যাপ্টিস্টকরণ সম্পন্ন করছে অত্যন্ত ভক্তির সাথে। যারা হিন্দু, তারা জবরদস্তি সেকুলার সাজতে গিয়ে সর্বক্ষণ বিজেপি এবং RSS কে এলোমেলো আক্রমণ করছে, যে যেখানে সুযোগ পাচ্ছে। যারা মুসলমান, তারা সহানুভুতি আর আর্তির দোকান খুলে- আমার সব গেলো, আমি বঞ্চিত বলে “জীবনটা বেদনা” নামের পণ্য লেনদেনের পসরা সাজিয়ে বসছে।

ক্রিকেটের নিয়ম বলে, কোন বলটা অফ স্ট্যাম্পের ১ ইঞ্চি বাইরে বিষাক্ত বাউন্সার, কোনটা অনসাইডের লোপ্পা ফুলটস আর কোন বলটা ইয়ার্কার সেটা দেখে, তবে তো সেইভাবে ব্যাট চালাতে হবে। ফেসবুকের বাম্বাচ্চারা বল দেখলেই চোখ বন্ধ করে চালাচ্ছে, সেটাতে নিজেদের নেতার মাথার খুলি উড়ে যাক কি আম্পায়ারের হাড় ভাঙুক কিচ্ছু দেখার দরকার নেই।

পৃথিবীতে যে কোন রাজনৈতিক দলের চারটি স্তর থাকে। ১) মূল নেতৃত্ব, ২) কর্মী, ৩) দরদী সমর্থক ও ৪) জনগন। প্রতিটা রাজনৈতিক দলের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে দরদী সমর্থকের উপরে। এরাই মূলত জনগণকে প্রভাবিত করে নিয়মিত ও সমাজের সর্বত্র। ফেসবুকীয় বামেরা তাদের সামাজিক সমস্ত দরজা জনলা মোটামুটি বন্ধ করে একটা ছোট্ট বৃত্তের মাঝে নিজেদের বন্দি করে নিয়েছে। একে অন্যের পোষ্টে লাইক কমেন্ট করে নিজেদের গা শোঁকাশুঁকি করে। অথচ, এখন অবধি যতগুলো সাক্ষাৎকার দেখেছি বা শুনেছি CPIM West Bengal পার্টির সম্পাদক সহ বাকি শীর্ষ নেতৃত্বের- সেখানে প্রত্যেকে বারবার একটা জিনিস বলার চেষ্টা করেছে যে, বৃত্তটা বাড়াতে হবে। দরদী সমর্থককে আরো বেশি প্রসারিত হতে হবে, জনগণের কাছে পৌঁছবার যতরকম বৈধ পথ আছে, তার প্রত্যেকটি পথ অবলম্বন করতে হবে। 

পার্টির সর্বজনীন সিদ্ধান্ত ‘গ্যায়া ভার মে’, ফেসবুক খুলে অ্যাং ব্যাং চ্যাং যা খুশি লিখে, সেটাকে পার্টির মতামত বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টাতে বাম্বাচ্চাদের মেহনতের ঘাটতি নেই। মনের মাধুরী মিশিয়ে গল্প উপন্যাস বা ডেলি সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট লেখা যায়, রাজনৈতিক বার্তা বা কূটনৈতিক ভাবে এগিয়ে গিয়ে মাত করে দেওয়া যায়না। 

উদাহরণ হিসাবে সম্প্রতি উত্তরপাড়ার দীপাঞ্জন বা হুমায়ুনকে তেড়ে ন্যাংটা হয়ে আক্রমণকে উল্লেখ করা যেতে পারে। আরে বাবা ঢঙী দীপাঞ্জন কিছু ভক্তের ভোট কাটলে, কিম্বা রাজনৈতিক পতিতা হুমায়ূন কিছু দুধেল গাই এর ভোট কাটলে তবে উত্তরপাড়ার বামপ্রার্থী কিম্বা অন্যান্য সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনে বামেরা খাতা খোলার গণিতে একলপ্তে প্রথম দুই-এ পৌঁছে যাবে। নতুবা ওই ভোট গুলো সব তোলামুলের ঝাঁপিতে গিয়ে জড়ো হবে। রাজনীতি তো মারপ্যাঁচের খেলা, নিজের ভোট নিজের প্রতীকে ফেলার পাশাপাশি অন্যের শিওর ভোটকেও ল্যাঙ মেরে মেলোমেলো ডাইভার্ট করে দেওয়ার নাম ভোটের রাজনীতি। 

পানিহাটিতে বিজেপি প্রার্থীর নাম ঘোষণা হয়ে গেছে, দেওয়ালে দেওয়ালে সবর্ত্র রত্না দেবনাথের নামের পাশে বড় বড় করে আঁকা পদ্মফুল চিহ্ন, তবুও আলগা পিরিতে কোনো ঘাটতি নেই। কখনও অভয়ার মা, কেউ আবার কাকিমা- একাত্ম হওয়ার চেষ্টাতে এ যেন এক প্রতিযোগিতা চলছে। কেন রে ভাই, তিনি কি কোনো ছাড় দিচ্ছে সিপিএমকে? বরং চূড়ান্ত আক্রমণ করে চলেছেন অশালীন ভাষাতে; কারণ ওনাকে লাইম লাইটে আসতে গেলে দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। আমার প্রতিপক্ষকে আমি কতটা ধরব, কোথায় কতটা ছাড়ব- এটাও তো রাজনীতির অন্যতম বড় শিক্ষা। অসম্মান করব না বা অলআউট আক্রমণও করব না, তা বলে হেদিয়ে আত্মীয়তার শুকনো পিরিত দেখাতে যাব কেন? এই গোটা সিস্টেমটাকে বাম্বাচ্চারা দায়িত্ব নিয়ে রোজ ধর্ষন করে দিচ্ছে।

এদের অভিশাপ থেকে পার্টি কীভাবে মুক্তি পাবে তা অজানা, এর কোনও এ্যান্টি ডোট বাজারে নেই। আয়নাতে আপনি আবার কোনো বাম্বাচ্চাকে দেখেননা তো রোজ?

রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬

ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে গ্রাম বাংলার মা বোনেরা

 

❌ ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে গ্রাম বাংলার মা-বোনেরা ও তৃণমূল এর তোলাবাজি আর কাটমানির অন্ধকারের রাজত্ব। ❌

🟥 অনিয়ন্ত্রিত ঋণ + উচ্চ সুদ + কম আয় = ঋণের ফাঁস

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ এখন “double-edged sword”, সঠিক ব্যবহার হলে উন্নয়ন, ভুল ব্যবস্থায় ঋণের ফাঁস। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (Self-Help Group) ঋণ বর্তমান ক্ষেত্রে গরিব মানুষের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষুদ্র ঋণের প্রাথমিক উদ্দেশ্য অত্যন্ত ভালো ছিলো। এতে করে গ্রামীণ মহিলাদের স্বনির্ভরতা বেড়েছিলো। নানান ধরণের ছোট ব্যবসা, পশু পালন, মাছচাষ ইত্যাদি শুরুও হয়েছিলো। ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা একটা বিপুল সংখ্যার মানুষ বিশেষত মহিলারা, রাষ্ট্রের মূল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে চলে এসেছিলো। গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছিলো। তোলাবাজ সরকারের অপদার্থতা আজকে এটাকে মারন ফাঁদে পরিণত করেছে।

বিগত ১৫ বছরে রাজ্যে কোনো শিল্প আসেনি, ভারি বহু কোম্পানি রাজ্য ছেড়ে পালিয়েছে; ফলত কর্মসংস্থান নেই। কৃষি পণ্যের দাম নেই, রাজ্যের ১৮% চাষযোগ্য জমি অনাবাদি হয়ে পরে রয়েছে। সারের কালোবাজারি, কীটনাশকের অভাবের সাথে রয়েছে কৃষিতে কাজ করা শ্রমিকের সমস্যা। কারন, বহু গ্রামীণ মানুষ যারা জমিতে ‘মুনিশ’ খাটতেন তারা পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিনরাজ্যে চলে গেছে। ভাতা রাজনীতি আর করোনার সময় থেকে পাওয়া ‘ফ্রি’ চালের কল্যাণে সমাজের একটা কর্মঠ অংশের মানুষকে মানসিকভাবে ঘড়কুনো কুঁড়ে বানিয়ে দিয়েছে। 

🟢 বাংলার প্রেক্ষাপটে সমস্যা কেন বেড়েছে? 

প্রথমেই রয়েছে কৃষিতে প্রাকৃতিক অনিশ্চয়তা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি তো আছেই; উচ্চমূল্যের ডিজেল, ততোধিক চড়া বিদ্যুতের বিল, বহু স্থানে জলস্তর নেমে যাওয়াতে গভীর নলকূপ সেচ বন্ধ, মেলা খেলার সরকার নদী থেকে ক্যানালের মাধ্যমে সেচের বন্দোবস্ত করতে পারেনি। ফলত, রাজ্যজুড়ে কৃষিতে একটা হাহাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এরপর ফসলের ন্যায্য দাম পেতে গেলে সেখানেও শাসক দলের ভয়াবহ তোলাবাজি। অধিকাংশ ‘কোটা’ ফড়েরা ভুয়ো কাগজ জমা করে ভরিয়ে দিচ্ছে তৃণমূলের ক্যাডার আর কিছু অসৎ অফিসারের সাথে ষড়যন্ত্র করে, আসল চাষীরা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। স্থানীয় নেতাদের চাঁদাবাজি, রাস্তায় পুলিশের তোলাবাজির উৎপাতে ভিনরাজ্যে কৃষিপন্য রপ্তানি শিল্প এক দুঃস্বপ্ন আজকের পশ্চিমবঙ্গে। ফলত চাষীর হাতে টাকা নেই, গ্রামীণ অর্থনীতি বন্ধ্যা হয়ে গেছে একপ্রকার। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, শ্রমজীবী পরিবারগুলোতে নুনভাত টুকু কোনোক্রমে জুটে গেলেও, অন্য মৌলিক চাহিদা মিটছেনা।

যেহেতু নির্দিষ্ট আয়ের উৎস নেই, ব্যবসা নেই, চাকরি নেই। শিল্প বলতে তোলাবাজি, কাটমানি আর চপ ঘুগনি। প্রথম দুটো তোলামূলের জন্য সংরক্ষিত, বাকি দুটো রাজ্যে শিক্ষিত বেকারদের নিয়ে চরম তাচ্ছিল্য। সরকারের গৃহ প্রকল্পে যে টাকা আসে, তা কাটমানির নামে অর্ধেক আগেই কেটে রাখে তোলামুলের সম্পদেরা, ফলে সেই ঘর শেষ করতে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে দরিদ্র মানুষেরা। এমন উদাহরণ ভুরিভুরি রয়েছে। এরপর, মেয়ের বিয়ে, চিকিৎসা, পড়শির সাথে তাল রেখে ঠাটবাট বাড়াতে গিয়ে ভোগ্যপন্য ক্রয়ের ফাঁদ ইত্যাদিতে, মানুষ মাকরসার জালের মত আঁটকা পরে গেছে। ফলত, ঐ ঋণের টাকা কোনো লাভজনক ব্যবসায় না খাটিয়ে পারিবারিক খরচ বা আপদকালীন প্রয়োজনে ব্যয় করলে তা আর ফেরত দেওয়ার ক্ষমতা থাকছে না। লোন নেওয়া পর থেকে- Collection agent-এর চাপ, সাপ্তাহিক মিটিংয়ে অপমান, পরিবারের ওপর মানসিক চাপ ও শেষে গয়না/সম্পত্তি বিক্রি; এই হচ্ছে চক্র।

গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী (SHG), মাইক্রোফাইন্যান্স কোম্পানি বা NGO গুলো খুব সহজ শর্তে ঋণ দেয়। ক্ষুদ্রঋণের সুদ সাধারণ ব্যাঙ্কের তুলনায় ভয়ানক বেশি, অনেক সময় ২৪%–৩৬% পর্যন্ত হয়। ফলে ঋণ ছোট অঙ্কের হলেও অল্প দিনেই সুদ জমে বিপুল বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই উচ্চ সুদের হার সর্বগ্রাসী হয়ে লেলিহান আগুনের মত গ্রাস করেছে গোটা সমাজকে। প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ঋণদানকারী সংস্থাগুলোর সুদের হার ভয়াবহ, সেই সুদ মেটাতে গিয়ে গরিব মানুষ আরও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। একটা ঋণের কিস্তি মেটাতে গিয়ে আরেকটা ঋণ নিচ্ছে, ফলত চক্রবৃদ্ধি ঋণের ফাঁদ জড়িয়ে যাচ্ছে গরীব মানুষ। 

পাহাড়প্রমাণ সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তির কড়াকড়ি গরিব মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। যাচ্ছে। আয়ের স্থায়িত্ব না থাকা কৃষক, দিনমজুরের নিয়মিত কিস্তি দেওয়া কঠিন। সারামাসে যা খুদকুঁড়ো জুটিয়ে আনছে, এই মহাজনী সুদের চক্করে ঘটি বাটি সব বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এরপর শুরু হচ্ছে আসল যন্ত্রণা, অধিকাংশ গ্রামীণ গরীব পরিবারগুলো চরম আতঙ্কে থাকে, এ এক ভয়ানক সামাজিক চাপ। ঋণের কিস্তি সময়মতো দিতে না পারলে গোষ্ঠীর অন্য সদস্যদের চাপ ও সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, যা চরম ক্ষেত্রে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে। 

✅ সমাধান-

🔸সর্বপ্রথম প্রতিটা হাতে স্থায়ী কাজের যোগান দিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে, দয়া ভিক্ষা নয়, কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে দিলে শ্রমজীবী মানুষ খেটে খাবে। আগামী সরকারকে সকলের হাতে কাজের বন্দোবস্ত করতে হবে। 

🔸 দুর্যোগ হলে যাদের আয় বন্ধ হয়ে যায়, ও যারা মৌসুমি কৃষি শ্রমিক হিসাবে কাজ করে, তাদেরকে বৃত্তিমূলক কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘অফ সিজেনে’ রোজগারের বিষয়টা সুনিশ্চিত করতে হবে।

🔸 উৎপাদনমুখী কাজে ঋণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

🔸 গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত মানুষের মাঝে আর্থিক সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে এই চক্রব্যূহ্যে না ফেঁসে যায়। 

🔸 প্রয়োজনে সরকারের তরফে একবার গণহারে ঋণমুক্তি করে পুনরায় এই সাইকেল নতুনভাবে চালু করতে হবে। 

🔸 কম সুদের বিকল্প ঋণ দিতে হবে সরকারি ও কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের মাধ্যমে। 

🔸 সুদের সর্বোচ্চ হার বেঁধে দিয়ে ‘টেনিয়োর’ বাড়িয়ে দিতে হবে। 

🔸 অধিক সুদের লোভে যে সকল সংস্থ পুরাতন ঋণের স্ট্যাটাস না দেখে তার উপরে পুনরায় ঋণ দেয়, তাদের কালো তালিকা ভুক্ত করতে হবে। 

🔸 সরকারি নজরদারি ও নিয়ম কঠোর করতে হবে।

🔸 সরকারকে বাজারের সাপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে।



রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬

যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা।

 


গতকালের গিরীশ পার্কের ‘হামলা’, এটা তাদের ভোট প্রচারের ‘আত্মার’ প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতেই।

যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা।

ডিসক্লেইমারঃ- আইপ্যাক অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিল দলদাস পুলিশ সরে গেলেই, স্যাটাভাঙা ক্যালানি দিয়ে চোর, কাটমানিখোর তোলাবাজগুলোর পিঠের চামড়া খিঁচে চুরির মাল বের করে নেবে জনতা। সেই ভয়ে ভীত তোলামুলের ওই চোর, কাটমানিখোর তোলাবাজ সম্প্রদায়কে ভরষা দিতেই লেখা হয়েছে এই চরম দূরদর্শী স্লোগানটা- যতই করো হামলা, আবার জতবে বাংলা। বার্তা পরিষ্কার, এই দফাতে ক্যালানি খেয়ে টিকে যেতে পারলে আবার চুরিচামারির সুযোগ পাবি। তাই হামলা হলে ভেঙে পড়িস না, এটুকু সইতেই হবে, পেটে খেলে পিঠে সয়।

এই ছবিটা গত ২৭শে ডিসেম্বর তোলামূলের অফিসিয়াল পেজে প্রকাশিত হয়েছিল। এটাই এবারের ভোট বৈতরণী পেরোতে আইপ্যাকের মস্তিষ্কপ্রসুত ন্যারেটিভ, যেমন একবার ছিল ‘পরিবর্তন চাই’, একবার ‘খেলা হবে’ ইত্যাদি। তা সে যাই হোক, ন্যারেটিভ না হয় নামানো হলো, কিন্তু শাসক দলই যে তোলামূল, হামলা করবেটা কে? করলেই সরকারি পুলিশ প্রশাসন দিয়ে গাঁজা কেস, সাজানো রেপ কেস, মার্ডার কেস ইত্যাদি, এমন শিল্পের তো অভাব নেই প্রতিটা থানার IC/OC ও লোকাল BDO/SDO দের অস্ত্রভান্ডারে।

এদিকে হামলা না হলে ন্যারেটিভ দাঁড় করানো যাচ্ছে না, আবার হামলা হলে আইনশৃঙ্খলা ও গোয়ান্দা ব্যর্থতার দায়ও ঘুরেফিরে পুলিশমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর উপরেই এসে পড়ে। উভয়সঙ্কট পরিস্থিতি। এগোলে সর্বনাশ, না এগোলে নির্বংশ। এদিকে সিপিএম/ISF এর হাতে মার খেলে শুধু জাত যাবে তা ই নয়, প্যান্ডরার বাক্স খুলে যাবার চান্স প্রবল- বাংলা জুড়ে ছোঁয়াচে রোগের মতো কুত্তা ক্যালানি শুরু হয়ে যেতে পারে পাড়ায় পাড়ায়। নিদেন পক্ষে হুমায়ুনের উপরেও ক্যালানি বিষয়ে ভরষা করতে পারেনি কালীঘাট, পাছে সত্যি সত্যি কেলিয়ে লাট করে দেয়। 

তাহলে সব বাঁচিয়ে, কীভাবে ‘হামলা’ পরিস্থিতি তৈরি করা যায়, যেখানে মান খোয়ালেও জাত যাবে না। RSS প্রভুর দারস্থ হতেই, তাদের মূল প্রোডাক্টে সিগন্যাল দিয়ে দেওয়া হলো, বাকিটা তো স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী একটা লং সিন শ্যুট করা। বিজেপিও তাদের প্রভুর সভার দিন মেইনট্রিম টিভি মিডিয়াতে, ‘ব্রিগেড’ শিরোনামে নিরবচ্ছিন্ন বিজ্ঞাপন দেখাবার সুযোগ পেয়ে গেলো সকাল থেকেই। অতএব, মোদীর ব্রিগেডকে লক্ষ করে ব্রাহ্মমুহুর্ত স্থির করা হলো, মোদীর বদলে যদি যোগী বা জুমলা শাহও এমন বড় কোনো পাবলিক মিটিং করতেন এই সময়, সেখানেও এমন হামলা নামের চিৎপুরের যাত্রাপালাটা অনুষ্ঠিত হতো।

এমতাবস্থায়, গতকালের তারিখটাকে বেছে নেওয়া, আসলে আইপ্যাকের এবারের ‘থিম সং’ স্লোগানটা বাস্তবের মঞ্চে মঞ্চস্থ করতে। এমনিতেই ব্রিগেডে বিজেপির সভাতে আসাম, ঝাড়খন্ড বিহার থেকে কয়েক লাখ ভাড়াটে দিনমজুরকে নিয়ে আসেতে হয় মাঠ ভরাতে; এই দিন ‘হামলা’ হলে এই অজ্ঞাত পরিচয়দের নামে বিল ফেড়ে দিলে, জাত কুল দুটোই রক্ষা হবে। হামলাও হলো, দোষও কারো ঘাড়ে পরল না, পারফেক্ট উইন উইন সিচুয়েশান। 

সোনাগাছি থেকে দালাল শ্রেণির কিছু মালকে দিয়ে র‍্যান্ডম ঢিল ছোঁড়ানো চলছিল কোলকাতা পুলিশের কঠোর তত্ত্বাবধান ও নজরদারিতে। প্রথম আধাঘন্টায় কেউ সেভাবে বিষয়টাকে আমলে নেয়নি, কিন্তু একটা বাসে ‘বিজেপি’র কিছু মাতাল বোঝাই ছিল, সেখানে ঢিল পড়তে তারাও খানিক ঢিল ছুঁড়ে ব্রিগেডের দিকে রওনা হয়ে যায়। এ অবধি ঠিকই ছিল, প্রশ্ন হলো এতো ঢিল কোলকাতা শহরের বুকে এলো কীভাবে? হোয়াইট হাউস থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তি থেকে জানলাম, NASA স্যাটেলাইট চিত্র মোতাবেক, কোলকাতা পুলিশই নাকি পার্কসার্কাস রেললাইনের ধার থেকে খোয়া এনে ‘হামলা’র মঞ্চ প্রস্তুত করে রেখেছিল, কীজানি হবেও হয়তো বা, যারা আন্তর্জাতিক মিডিয়া ফলো করে তারাই ভালো বলতে পারবে এই দাবীর সত্যতা। তো ছিল গতকালের গোটা গল্পটা।

তোলামূলের এবারের থিম যেহেতু ‘হামলা’, আগামীতে ভোটের অন্তিম দিন অবধি আবার এরা নিয়মিত পাতানো ম্যাচে হালকা ফুলকো ক্যালানি খেয়ে সহানুভূতির দোকান খুলে বসবে রোজ। গতকাল যেমন জামার উপর দিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা আহত রোগী দেখলাম, ভয়ঙ্কর অসুস্থ শশী পাঁজা যিনি নাকি বসতে পারছিলেন না, তিনিও অবলীলায় ১ ঘন্টার উপরে সাংবাদিক সম্মেলন করে গেলেন। এমন টিভি সিরিয়াল মার্কা ‘হামলা’ শুটিং আগামীতে যখনই হবে, জনগণের উচিৎ হাতের কাছে ঝাঁপের লাঠি, খুঁটির বাঁশ যা কিছু পাবে, তাই দিয়ে এলোপাথাড়ি ভাবে ফেলে ক্যালানো চোর, কাটমানিখোর তোলাবাজ সম্প্রদায়কে। ডজন খানকে চোর, কাটমানিখোর তোলাবাজকে সত্যি সত্যি হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলেই, এদের এবারের ন্যারেটিভ ধ্বসে যাবে ভোটের আগে।

সিপিএম, কংগ্রেস ও ISF, এদের প্রত্যেকের নৈতিক ও সামাজিক দায় রয়েছে এই হামলাতে অংশ নেওয়া, প্রত্যক্ষ পরোক্ষ যেভাবে খুশি হোক। পাতানো ম্যাচে হামলা নামের খেলা হলে, সেটাকে কাঠে কপাটে লাগিয়ে গণধোলাই এর বন্দোবস্ত করা- জাতির সাথে সাথে আইপ্যাকও সেটাই চাইছে। ফাঁসির আসামীরও শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করা হয়, সেখানে তোলামূলের ক্যালানি খাওয়ার শেষ ইচ্ছা পূর্ণ না করলে ‘রাজনাথ সিং’ও আপনাদের জন্য কক্ষণও কড়ি নিন্দা করবে না। আপনারা মহাপাতকের দলে পরিগণিত হবেন। 

তামাম পাবলিককে বিষয়টা জানিয়ে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব আপনার, কারণ এবারে ক্যালানি খাবে বলেই বাংলার সর্বত্র হোর্ডিং টাঙিয়েছে তোলামূল, ওদের মনোবাসনা পূর্ণ করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য। নতুবা ওরা আবার ফিরে এলে কেন ‘হামলা’ করিনি, এই অপরাধে আমার আপনার চামড়া খিঁচে নেবে, যেমনটা গত ১৫ বছর ধরে করেছে।

শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ফ্যাসিজম ও আজকের পৃথিবী


সমগ্র বিশ্বজুড়ে 'ফ্যাসিবাদী ডানপন্থা' ছত্রাকের মত আষ্টেপৃষ্টে বর্বরতার নাগপাশে বেঁধে ফেলেছে। বর্ডারের সীমানা পেরিয়ে মাকিন মুলুকের ট্রাম্প হোক কিম্বা মোল্লাদের সৌদি, ভোগবাদী ইউরোপ  বা RSS এর ভারত- উগ্র জাতীয়তাবাদী মিথ্যা ভুয়ো দেশপ্রেমের নামে দেশের সম্পদ নির্দিষ্ট কিছু পুঁজিবাদী শোষক সংস্থার কাছে তুলে দেওয়ার জন্য যাবতীয় নিপীড়নের আয়োজন। 

১২ বছরের BJP শাসন রাষ্ট্রের প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দিয়েছে, সর্বত্র নোংরা ধর্মীয় মেরুকরন করা হয়েছে ভোটের বাক্সে তাৎক্ষণিক ফায়দা লুঠতে আর এই জন্য যেকোনো মাত্রার সহিংসতাতে মেতে উঠতে এদের কোনো ক্ষেপ-আক্ষেপ থাকেনা। আমাদের ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী সংবিধান ও তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে রোজ আক্রমণের মুখে ফেলে ভঙ্গুর করে তোলা হচ্ছে। সিভিল সোসাইটি উদভ্রান্ত, আদালতের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ, নির্বাচন সংস্থার ভূমিকা শাসকের দলদাসের, সর্বত্র একটা অশান্তি আর অবিশ্বাসের পরিবেশ। কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যাক্তি তথা কয়েকটি পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে। এরা যেকোনো মূল্যে নির্বাচন বা গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিলোপ চায়।

বিরোধী কন্ঠস্বরকে তাচ্ছিল্ল্যের সাথে হিংস্রভাবে দমন করা হচ্ছে সর্বত্র, যাতে প্রশ্ন করতে ভয় পায়। জাতিগত হানাহানি, ধর্মীয় বা অভিবাসী সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক নীতি গ্রহণ করে এরা নাগরিক অধিকার সংকুচিত করতে মরিয়া, তাই কখনও NRC তো কখনও SIR এর মত নিরীহ পদ্ধতিকে ধারালো অস্ত্রের মত ব্যবহার করছে সংখ্যালঘু সংহারের জন্য। ভিন্নমতাবলম্বীদের যেকোনো মুল্যে নৃশংস হাতে দমন করা নিত্য নৈমিত্তিক প্র্যাকটিস। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বৈষম্য বা নিপীড়ন করাটাকে রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো বানিয়ে ফেলেছে এই চরম ফ্যাসিবাদী RSS. 

স্বাধীন সাংবাদিকতা যা সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখে, তাদের সিংহভাগকে কিনে নিয়ে পোষ্য কুকুর বেড়ালে পরিনত করেছে, তারা সেটাই বলছে যা শাসক চায়। যাদের কিনতে পারেনি তাদের গলায় মামলার বেড়ি লাগিয়ে দিয়েছে, তাতেও না হলে হত্যা করে দিয়েছে। এই হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের ঘুণে ধরা দশা, কোনটা সংবাদ আর কোনটা প্রোপাাগান্ডা সেটার ফারাক করাই আজ জনগণের কাছে কঠিন হয়ে গেছে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের প্রকোপ আজ সর্বত্র, তা প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া হোক কিম্বা সোশ্যাল মিডিয়া।
.
আমাদের রাজ্যের দিকে তাকালেও একই দশা, একটু অন্য আঙ্গিকে কিন্তু লক্ষ্য সেই এক- প্রশ্নহীন আনুগাত্য। শাসক দল, রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশ একদেহে লীন হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় বলে আর কোনো শব্দ নেই, সবটাই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। সর্বত্র চুরি রাহাজানি আর লুঠপাঠ অন্ধকারের রাজত্ব। সরকার নিজে তার কর্মীদের টাকা চুরি করছে প্রাপ্য DA না দিয়ে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কোমায় পাঠিয়ে কর্পোরেট পুঁজির জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করে গেছে গত ১৫ বছর ধরে। RSS এর মন্দির মসজিদ গরু শুয়োরের রাজনীতিকে যথাযত প্রয়োগ করে ঠিক ভোটের আগে দাঙ্গার রাজনীতি করা, ধর্মীয় মেরুকরন ও ভোট লুঠের উদ্দেশ্যে গাঁ-গঞ্জে রক্তের নদী বইয়ে দিয়ে নির্লজ্জ নিরুত্তাপ থাকার এক অদ্ভুত কৌশল আমরা দেখেছি RSS স্পনসর্ড তৃনমূল সরকারের আমলে।

পশ্চিমা ভাবধারার দক্ষিণপন্থা, দিনের শেষে আপনার টুঁটি ধরবেই- তা সে যে ভেক ধরেই আসুকনা কেন। একে প্রতিহত করার নামই বিজয়। গণতন্ত্রে ভোটের মাধ্যমেই নীরব বিপ্লব সংগঠিত হয়, আগামীতে আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে সেই বিপ্লবের সাক্ষী হতে, যোদ্ধা হতে, যুগ বদলের অন্যতম কাণ্ডারি হতে। চলুন সমূলে উপড়ে দিয়ে, ছুঁড়ে ফেলি এই বিষাক্ত ফ্যাসিবাদী শক্তিকে।

রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

শৃঙ্খলা ও বামপন্থা

 


(১)

টিভি মিডিয়ার সান্ধ্য খেঁউড়ের আসর আর সোশ্যাল মিডিয়ায় সর্বজ্ঞানী আখড়া থেকে- ২০০৯ পরবর্তী জন্মানো নেতাদের সেন্সর করুন, দেখবেন রাজ্য CPIM পার্টি দু'দিনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। মূর্খ সমর্থকের দল শূন্য পাবে এটাই স্বাভাবিক ঘটনা। প্রজা রাজা নির্বাচন করবে, এটাও গণতন্ত্রেরই নিয়ম। বস্তুত, বামপন্থা, বিপ্লব এগুলো গণতন্ত্রের তরোয়াল, আর তরোয়াল মূর্খ গাধার হাতে মানায় না। সমর্থককূল মেরুদন্ড ফেরত পেলে, দল হরিণের মতো ছুটবে, এর জন্য সবার আগে শৃঙ্খলা প্রয়োজন।

কমিউনিস্ট পার্টিগুলো সমগ্র বিশ্বজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে শৃঙ্খলার উপরে। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের CPIM সহ বাকি বাম দলগুলোর বর্তমান মূল সমস্যা দেখা দিয়েছে শৃঙ্খলাতে। ২০০৯ পরবর্তী যে সকল তরুণ মুখ এসেছে ভায়া SFI, সবচেয়ে বড় সমস্যা এদের মাঝে। টিভির বুম পেলেই এদের প্রায় সকলে মুখ দিয়ে হাগতে শুরু করে দেয়। আজকাল আবার সেজেগুজে পডকাস্ট নামের এক শ্যো-অফ সাক্ষাৎকার শুরু হয়েছে। ফুটেজের কী নিদারুন লোভ! ফেসবুক ইউটিউভ খুললেই সদ্য লোম গজানো নেতানেত্রীরাও এমন ‘পোস্ট ও বাইট’ দিচ্ছে, যেন আদর্শ নৈতিকতার প্রশ্নে চে, ফিদেল বা চমস্কিকে এনারাই শিক্ষিত করেছিলেন। অধিকাংশ কথাবার্তায় রাজনীতির দূরদূরান্তে কোনো সম্পর্ক নেই। দলেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এদের উপরে। 

ছাত্রাবস্থায় বামপন্থা আঁকড়ে ধরে বহু ছেলেমেয়ে মানুষ হয়; সমাজবাদ, সাম্য, বিপ্লব নামের শব্দগুলো তখন নেশার মতো বুড়বুড়ি কাটে চেতনা জুড়ে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে মানসিকভাবে এই ভাবনাগুলোকে, মানে বামপন্থাকে নিয়মিত অনুশীলন তথা লালন করতে হয়। যেটা ৯০% ছেলেমেয়ে পারে না, পারিবারিক, সামাজিক, পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি নানা কারণে। কিন্তু সদ্য যৌবনের শেখা বামধারার চেতনা, আর ফলিত বাস্তবের লোভ, লালসা ও ভোগের তীব্র আকাঙ্ক্ষা কামনা বা অভিলাষ- মন আর শরীরকে দুটো পৃথক দিকে চালনা করে। পুরনো শিক্ষাও ফেলনা নয়, তাই সেগুলো মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসে কিম্বা বের করে আনে সুযোগ সুবিধা মতো। গরুর মতো চর্বিত চর্বন করে জাবর কাটে, যা বিজ্ঞাপিত করে বেচাকেনার বাজারে নিজের দর বাড়িয়ে নেয়। 

২০০৯ সাল থেকে এ রাজ্যে যারা SFI এর শীর্ষপদ দখল করেছে, সংগঠনটার সেক্রেটারি প্রেসিডেন্ট পদে থাকার সুবাদে অটোমেটিক রাজ্য কমিটিতে চলে গেছে ‘কোটা’র বলে। কৌস্তভ চ্যাটার্জি-সায়নদীপ মিত্র, দেবজ্যোতি দাস-মধুজা সেন রায়, সৃজন ভট্টাচার্য-প্রতিকুর রহমান অবধি সেই একই ধারা। এরা কোন বিশেষ যোগ্যতায় পার্টির রাজ্য কমিটি অবধি যেতে পেরেছে কেউ জানে না। শেষের দুজনের আমলের মতো জঘন্য পিরিয়ড SFI এর জীবনকালে বেনজির। একের পর এক কলেজে সংগঠনের ঝাঁপ বন্ধ হয়েছে, সৃজন গিটার বাজিয়েছে আর অমেরুদণ্ডী পরজীবী প্রতীকুর হাত্তালি দিয়েছে। এটা আজ বলছি না, সেই ২০২১ থেকে নিয়মিত বলে এসেছি, আমার টাইমলাইন ঘাঁটলেই পেয়ে যাবেন। কোন বিশেষ অউকাতে বা গুণের কারণে তারা প্রতিটা নির্বাচনে লড়ার টিকিট পেয়েছে- ফেলুদার ভাষায় ‘হাইলি সাসপিসাস’। ক্রমশ পাতালে প্রবেশ ছাড়া দল বা সমাজের প্রাপ্তি কী এদের থেকে? 

আমাদের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশের রাজনীতিতে ‘সহানুভূতি’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোয়ালিফিকেশন; যে কারণে দলত্যাগ করে পালিয়ে যাবার আগে একটা সহানুভূতির জামা পরিধান করে, ঠিক কাউকে না কাউকে একটা ভিলেন বানিয়ে যাবে- এটাই প্যাটার্ণ। RSS-এর পরিসরে এটা খুব চেনা ছক- দলে থেকে কাজ করতে পারছি না বা আমাকে গলা টিপে ধরা হয়েছিল। তৃণমূল হোক বা বিজেপি, দিনের শেষে সেই তো RSS নামের গু, একটা কাঁচা আর একটা শুকনো। 

বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বের প্রায় সকলেরই কলেজ জীবন শেষ হওয়ার আগে পার্টি ক্ষমতায় চলে এসেছিল। রাতারাতি প্রশাসক হয়ে গিয়েছিলেন, সময়ের পরিভ্রমণে মধ্য পঞ্চাশ তথা ষাট ছোঁয়ার আগেই এনারা বিরোধী আসনে। ফলত রাস্তায় নেমে যে জঙ্গী আন্দোলনের ধারা, এনারা তেমন কিছুই জানেন না। স্বভাবতই বর্তমান প্রজন্মের মাঝেও সেই স্পৃহা, সেই স্ফুলিঙ্গ ভরে দিতে পারেননি এনারা। ভারতীয় স্পেস টেকনোলজি চাঁদে চলে গেলেও, CPIM পার্টি রয়ে গেছে ষাটের দশকের আমলাতান্ত্রিক শিকলের গেরোতে, যেখানে হেঁচকি তুলতে গেলে লোকাল কমিটি থেকে পলিটব্যুরো- অনুমতি পেতে পেতেই ঈশ্যু পটল তোলে। ফলত আধুনিক ট্যেকস্যাভি সময়ের সাথে পার্টির ফলিত কার্যগত পরিচালনাতে এক ভয়াবহ দ্বান্দ্বিক ফাটল তৈরি হয়েছে, যা শীর্ষ নের্তৃত্বের সংজ্ঞার বাইরে; আর এইখান থেকে যাবতীয় উৎশৃঙ্খলতার সৃষ্টি। 

ভাইপো প্লান্টেড পরগাছা রাজনৈতিক সমাজের বুকে, পিসি যদ্দিন ক্ষমতায় আছে তদ্দিন ইনিও আছেন। ক্ষমতা হারালে সবার আগে যে লোকটি তৃণমূল ছেড়ে চম্পট দেবে- তার নাম ভাইপো। সুতরাং, আজকের দিনের তৃণমূল দল যে কোনো স্থায়ী আস্তানা নয়, চার অক্ষরের বোকা ছাড়া তা সকলেই বোঝে। ফলত যা কিছু লেনদেন সবই তাৎক্ষণিক ও সবটাই আর্থিক। তৃণমূল দল উঠে গেলে এই সব দলবদলুদের ছোট একটা অংশ জাতীয় কংগ্রেসের ঘরে পরিচারিকা সেজে ক্ষুন্নিবৃত্তি করবে, বাকিরা "I beg to remain, Sir, Your most obedient servant" জপতে জপতে নাগপুরের গোয়ালঘরে গোমুত্র সেবন করবে। এটাই ভবিতব্য। by the way,  মহুয়া মৈত্র কেন কাউকে ৪(চার) লাখের গুচি/লুইভিটোর হাত ব্যাগ গিফট করেছে, এসবের খোঁজও সেলিমকেই একা দায়িত্ব নিয়ে করতে হবে কেন? দলের অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর লালুভুলুর দল কি জাবর কেটেই ক্লান্ত? 

দোষ সেলিম সাহেবেরও আছে, একে হাঁড়িতে চাল বাড়ন্ত, তার উপরে রাজ্যেজুড়ে অন্তত ৬টা আলাদা আলাদা শিবির তৈরি হয়েছে; এর দায় মহঃ সেলিম এড়াতে পারেন না CPIM রাজ্য সম্পাদক হিসাবে। SFI এর পারফরম্যান্স ২০১১ পরবর্তী সময়টা আতস কাঁচের তলায় আনা হোক, মিলিয়ে দেখা হোক- অপদার্থ লোক ক্ষমতার বৃত্তে ঢুকে পড়ে কী কী আচরণ করেছিল, এদের সঙ্গে ঋতব্রতর পার্থক্য আসলে কতটা! তবে, কার সদস্যপদ দিল্লিতে আর সেটা সে রিনিউ করল কিনা, সেটার দায় সেলিমের নয়। আমাদের গ্রাম বাংলার রাজনীতিতে আদৌ চুল পরিমান গুরুত্ব রাখেনা এই সব আপদের ‘গলা নাচানো’ উপস্থিতি। কে শতরূপের বিরুদ্ধে প্রার্থী হবে আর কে মীনাক্ষীর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে- এসব হিসাবনিকাশের গল্পও কানে আসছে বৈকি। দাঁত কেলিয়ে ‘জল মাপছি’ বলে ফুটেজ খাওয়ার দিন শেষ, হয় এস্পার নয় ওস্পার। আসলে শৃঙ্খলা অবলুপ্ত হলে বেহায়াপনাই সংস্কৃতি হিসাবে নিজেকে জাহির করে। 

এদিকে সারদার টাকা চোর কুনাল ঘোষ প্রকাশ্যে জোর গলায় বলছে- আলিমুদ্দিনের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এর মিনিটস ১০ মিনিটে তার কাছে পৌঁছে যায়। পার্টির অভ্যন্তরের গোপনীয়তা, আস্থা ও পারস্পরিক ভরষার বিসর্জনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এই দাবী। এখান থেকে কিন্তু পার্টি বের হতে পারবে না। শুধু একা সেলিম সাহেব নন, গোটা আলিমুদ্দিনকে এই প্রশ্নের জবাব আজ হোক বা কাল দিতেই হবে। সবাই মিলে দল বেঁধে কুণাল ঘোষকে খিল্লি করতেই পারেন, গোপনীয়তার প্রশ্নে কুনাল ঘোষ CPIM দলের প্যান্ট জামা খুলে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রোগ সেই শৃঙ্খলাহীনতা। আসলে পার্টির কলকাতার বৃত্তের একটা অংশ কুনাল ঘোষের হারেমে খোজা সেজে উপুড় হয়ে শুয়ে পয়সা রোজগার করে।

কোলকাতার বাবু কালচারে জন্ম নেওয়া মধ্যমেধার কিছু উন্নাসিক দাম্ভিক লোকজন নিজেদের কমিউনিস্ট দাবী করে দলটাকে অক্টোপাশের মতো আষ্টেপৃষ্টে  বেঁধে রয়েছে। এই সব কলকাত্তাইয়া বাম, ফেসবুকের নির্বোধ বাম, কলেজ স্ট্রীটের আঁতেল বাম, JNU বাম, হারামের টাকায় আজও ক্যান্টিন চালানো যাদবপুরী বাম, এই সবগুলো অনেকটা ঘেয়ো কুত্তার মতো- কামড়ালেই ১৪টা ইঞ্জেকশন। ভোটের রাজনীতিতে এদের মূল্যমান জাস্ট শূন্য, অথচ এরাই পার্টির নিয়ন্ত্রক। শেষ ১৫ বছরে এই সেক্টর থেকেই বামেদের তথাকথিত ‘তরুন মুখে’দের ৮০% উঠে এসেছে। এদের পাশে গ্রাম মফঃস্বল থেকে আসার নেতানেত্রীরা নেহাতই সংখ্যালঘু, অথচ রাজ্যের ৭০%ই গ্রামাঞ্চল, যেখানে কৃষক পরিযায়ী শ্রমজীবী মানুষের বাস। উপরোক্ত শহুরে অন্তঃসারশূন্য ফাঁপা আদর্শের বুলি কপচানো মধ্যমেধার বামেদের কারণেই CPIM দলের মধ্যে কম্প্রোমাইজ করা অসৎ অংশের সৃষ্টি হয়েছে, এরাই পার্টির পতনের অন্যতম বড় কারণ, এদেরই কেউ কেউ প্যাক মানে খেয়ে দলের অভ্যন্তরে থেকে বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছে।

(২)
আমাদের মা মেয়ে বোনেরা যবে থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হন, প্রতিমাসে একটা করে ডিম্বাণু জন্ম দেন। অধিকাংশই রজঃস্রাবে বের হয়ে যায় অনিষিক্ত অবস্থায়, কিছু নিষিক্ত হলেও অকালে গর্ভপাত হয়ে খানিকটা রক্তমাংসের দলার সাথে অনেকটা ব্যথা বেদনা উপহার দিয়ে যায়। এটা জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা। ১০০০টা চারাগাছ পুঁতলে তবে ১০০টা বাঁচার সম্ভাবনা থাকে। কিছু ছাগলে খাবে, কিছু রোদে শুকাবে, কিছু ঝড়ে উড়বে, কিছু বাঁদরে ভাঙবে ইত্যাদি। মহীরুহ রাতারাতি হয়না, বট, পাকুর বা অশ্বত্থের চারা নার্সারিতে তৈরি হয়না। তাই কে কোথাকার ছেঁড়া লোম যে, সেই গর্ভঃস্রাবের কথাকে ধ্রুবক মেনে গুরুত্ব দিতে হবে! বাজারি সংবাদ মাধ্যম তাদের মালিকের সদ্য কেনা ‘পাঁঠা’কে কাঁঠাল পাতা খাওয়াবার ভিডিও করবেই। CPIM পার্টির দেওয়া আলঙ্কারিক পদগুলো ছিলো বলেই বিক্রির বাজারে পাঁঠার দামটা মিলেছে। তৃণমূলের হারামের চুরির টাকায় ফুর্তি মারবে বলে যে দল ছেড়েছে, আজ শুধু দল ছাড়েনি কাল বউও ছাড়বে, পরশু ঘর ছাড়বে। কারণ লীলাতে এদের আদর্শ পার্থ আর শোভন, চুরিতে ভাইপো। যেখানে ঘরে বউ এর সাথে কয়েকটা রক্ষিতা রাখা যে দলের অন্যতম রাজনৈতিক ক্যালিবার- সেখানে কালো মোটা গেঁয়ো বউ খুব বেশি দিন পছন্দ হবে না বিপ্লবী বাবুর।

বিক্রির লাইনে তো অনেকেই আছে, ভট্টাচার্য থেকে সেন, রায়, দাস, মিত্র, ঘোষ, বোস, খান, সেখ অনেকেই। কিন্তু ভাইপোর ‘ভট্টাচার্য’ সহ বাকিদের ততটা দরকার নেই যতটা একটা রেডি দুধেলগাই বলদ দরকার ছিল। ওহ, আপনি তো আবার লালবাবু ভক্ত, এই সব ভট্টাচার্য, সেন, রায়, দাস, মিত্র, বোস, খান, সেখ, ঘোষেদের নাম শুনলে আপনার পবিত্র ঈমান টলে যায়। আপনি হালকা মুতে শুয়ে পড়ুন, কিম্বা খোঁচর নেত্রী যিনি দাদু থেকে বাবার জিন সেঁচে ‘ধর ধর’ রবে DNA বেয়ে বামপন্থা বয়ে এনেছেন, আপনি বরং সেই হেমাটোলজি জেনেটিক্স নিয়ে PhD করুন, জুটিতে মিলবে ভালো। দোষটা একা এই ভট্টাচার্য, সেন, রায়, দাস, মিত্র, বোস, খান, সেখ, ঘোষদের যতটা, আলিমুদ্দিনের বাস্তুঘুঘুদেরও দায় ঠিক ততটাই। যৌবনে স্খলন কোনো পাহাড় ভাঙা হাহাকার ব্যতিক্রমী নয়, উল্টোদিকে যখন চুরির টাকার কুমিরেরা সমানে হাতছানি দেয়। নিয়ন্ত্রণ আপনাকে করতে হবে, বেছে নেওয়ার দায় আপনার। উঠতি মূলো ঋতব্রতে চেনা যায়। 

৯৩ টা বুড়ো খাসি জবাই করা হবে, এই খাসি সব পিসি তোলামূলের হারেমের। কসাইখানার মালিকানা বদলেছে, তাই বাজারে নতুন পাঁঠা খোঁজার কাজ চলছে ভাইপোনিকেতনের খোঁয়াড়ের জন্য। মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক কেরিয়ার বয়সের কারণেই অস্তাচলে, ভাইপো নতুন টিম তৈরি করছে তার মতো। পাঁঠা বা পাঁঠি হিসাবে বিক্রি হতে অনেকেই রাজি কিন্তু ক্রেতাও চাইত। শাসক মমতার জামানাতে কোনো যুব নেতা নেত্রী তৈরি হয়নি, তারা চোর তৈরি করেছে। স্বভাবতই ভাইপো তার চারপাশে কাউকে পাচ্ছে না, যে হোমে যজ্ঞিতে লাগবে। এদিকে তিনি নিজেই ব্যানার্জী, ফলত যতটা মুসলমান তার দরকার, ততটা ভট্টাচার্য মিত্র দাস দরকার নেই ঠিক এই মুহূর্তে। তাই অনেকেই লাইনে থাকলেও সেভাবে দাম না পাওয়ার দরুন অনেকেই ‘আদর্শে’ অবিচল রয়ে গেছে এই যাত্রাতে। একটা কথা মনে রাখবেন, কমিউনিস্ট পার্টিতে ভোট হয় চিহ্ন দেখে, ব্যক্তি নয়।

সমস্যা সমর্থকদের তরফেও রয়েছে, তারা ভাবে আমাদের নেতাও ‘ওদের’ মতো করে বলুক সর্বত্র। জামা পরে থাকবো কমিউনিস্ট পার্টির, চাইব পুঁজিবাদী সিস্টেমের ভোগবাদী বিলাসিতা, ন্যাংটামো করব তৃণমূলের মতো- দুটো একসাথে হয় না। জাতীয় কংগ্রেস বা তৃণমূলের মতো পার্টির নেতাদের যেভাবে বলতে দেখে অভ্যস্ত, সেইভাবে দেখেই তাদের ভোটারেরা ভোট দেয়। প্রত্যেকটা সিস্টেম তার নিজের মতো করে আলাদা, গাছেরও খাবো আবার তলারও কুড়াবো একসাথে হয় না, অগত্যা দল পাল্টাতেই হবে। সমর্থকেরা অনেকেই ভাবে, এই তো খানিক আগেই ‘আমার’ সঙ্গে কথা বলল, সে তো আমাদের নিজেদের লোক। আসলে মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় নিজের মতো করে, তখন আর কেউ নিজের লোক থাকে না। বিবাহিত মেয়েই যেখানে জন্মদাতা বাবার থাকে না, সেখানে আপনি তো কেবল পরিচিত মাত্র।

হোটেলের ওয়েটার বা পাড়ার মোড়ে পান বিড়ির টোঙ চালায় কিম্বা অনুষ্ঠানের সিজেনে ক্যাটারিং এ কাজ করে- মোদ্দাকথা কোনো ঢং এর কাজ যাদের জোটেনি, তারাই আজকাল সাংবাদিক। সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা বা জ্ঞান ওসব গাধার ঘাড়ে যাক, হাতে একটা ক্যামেরা মোবাইল আছে, ফেসবুক ইউটিউবে একটা পেজ- আর কী চায়! ঠিক আজকের দিনে দেশ জুড়ে ৯৯% সাংবাদিকই এই জাতের টুকটুকে গাব, যাদের না খাওয়া যায় না গায়ে মাখা যায়। এরা মূলত ক্ষমতার পদতলে চামচাগিরি করে পেট চালায়। বছরে যা মূলধারার রোজগার এদের, তাতে যেকোনো দক্ষিণপন্থী দলের নেতাদের উচ্ছিষ্টটুকু মাঝেসাঁঝে পেলেই এদের জীবনে অষ্টমী বা ঈদের সন্ধ্যা নেমে আসে। এদের সামনেই মুখ দিয়ে হাগতে শুরু করে দেয় উশৃঙ্খল স্বঘোষিত ‘বাম’ নেতানেত্রীর দল।

এটাকে কঠোর ভাবে বন্ধ করতে হবে, দ্বিতীয় কোনো অপসন নেই।

তোলামূলের ২২৫ জন MLA আছে কালিম্পং এর বিষ্ণু প্রসাদকে ধরে, ২৯ জন সদস্য লোকসভায় আর ১৩ জন রাজ্যসভার MP আছে। মেরেকেটে ৩০ জন বাদে বাকি ২৪৬ জনের কারো নামই আপনি জানেন না। সারা বছর তাদের পার্টির তরফে মূলত কুণাল ঘোষ কথা বলে, আলফাল বকার দপ্তরে দেবাংশু রয়েছে। পার্টির মালিক হিসাবে মমতা ব্যানার্জী আর ভাইপো কথা বলেন। বাকি কোনো নেতাকে দেখেছেন মাইক পেলেই উন্মত্ত হয়ে বিজ্ঞ সেজে জ্ঞানের জাঙিয়া মেলে ধরে? টিভিতে তাদের হয়ে আসে দেবনারায়ন আর বিজন মাস্টার, এরা তৃনমূলের কোন পদে রয়েছে? অনুরূপ বিজেপির ১২টা লোকসভা সদস্য, ২ জন রাজ্যসভা সদস্য, ৬৪ জন MLA আছে, কজন বিজ্ঞবিচি সর্বজ্ঞ সেজে টিভির খেঁউড়ে পৌঁছে যায় আর মাইকের বুম পেলেই মুখ দিয়ে বাতকর্ম করতে থাকে?

এই প্রজন্মের মধ্যে শতরূপই একমাত্র, যে দুর্দান্তভাবে মিডিয়া হ্যান্ডেল করে। বাকি প্রায় সকলেই যারা মূলত সোশ্যাল মিডিয়াতে ফুটেজ খায়, তারা রাজনীতির বাইরে সব কিছু করে। এদের সবার আগে রেস্ট্রিকশন করতে হবে। পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরের পঙ্কজ রায় সরকারও বিক্রি হয়ে গেছিল কিছু মাস আগে, আজ সে কোথায়? শোনা কথা- দুর্গাপুর পশ্চিম আসনের জন্য সে প্রত্যেকদিন ইচ্ছা প্রকাশ করছে আর আইপ্যাক তাকে রিজেক্ট করছে। মুখের সামনে ক্যামেরা ধরলেই যে গড়গড় করে বলতে আরম্ভ করবে, তাকে আমতলার পার্টি অফিসে পৌঁছে দেওয়া হোক জঞ্জাল ফেরার গাড়ি করে। ফেসবুকটাকে বারোয়ারী উঠোন বানিয়ে যারা ‘পার্টিকে’ বাপত্ব সম্পত্তি মনে করে, লাগামহীন নিজস্ব মতামত প্রকাশ করে চলেছে- হয় তাদের হুঁশিয়ার করা হোক, নতুবা লাথি মেরে তাড়ানো হোক। ভাবখানা এমন যেন একটা বামপন্থী দল নয়, সোশ্যাল মিডিয়ার পেজ চালাচ্ছে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হয়ে, প্রতিটা বিষয়ে রোজ নিজের মতামত দিয়ে যাচ্ছে। কোথায় থামতে হয় কেউ জানে না।

পুনশ্চঃ- কেউ দলত্যাগ করছে বা পার্টি সদস্যপদ রিনিউ করছে না বলেই, তার তোলা প্রশ্নগুলো ভিত্তিহীন অযৌক্তিক বলে দাগিয়ে দেয় যারা, তারাও আসলে শয়তান বা পার্টির ভাষায় প্রতিক্রিয়াশীল। সেই বক্তব্যগুলোর সবটা মিথ্যে বা অসমর্থনীয় নয়, ব্যক্তির স্খলনের বিরোধিতা করতে গিয়ে প্রদীপের নিচের আঁধারকে জাস্টিফাই করা যাবেনা। শৃঙ্খলা জরুরী, তার জন্য সেন্সরও জরুরী যদি প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু পার্টির অভ্যন্তরে খোলামেলা আলোচনা যদি না হয়, ভুল বা দোষগুলো কিন্তু ঘা-আলসারের মতো আড়ালে বাড়তেই থাকবে ক্যান্সার না হওয়া অবধি।

২০১৬ সালের ব্রিগেডে ময়দানে CPIM এর তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র প্রকাশ্য সমাবেশে বলেছিলেন- আমাদের পার্টিতে এমন অনেকে আছে, যাদের আমাদের দিকে থাকা উচিৎ নয়; আবার ওইদিকে এমন অনেক লোক আছে যাদের আমাদের দিকে থাকা উচিত ছিল। দশ বছর পরেও এখনো এই বাক্যের তাৎপর্য সেদিনের মতোই সমান উজ্জ্বল।



শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫

SIR- একটি মানবিক বিপর্যয়


বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় সমস্যার প্রায় গোটাটাই হচ্ছে SIR এর কারনে, অন্তত রাজ্যের শাসক শিবিরের মতে সেটাই। প্রায় লক্ষাধিক BLO গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে কাজ করছেন নৈপুন্যতার সাথেই; তবে, প্রত্যেকের অতীতে শারীরিক অসুস্থতা হয়েছিলো, আগামীতেও হবে। কিন্তু এই মুহুর্তে অসুস্থ হওয়া মানেই সেটা ‘কাজের প্রেসার’। আচ্ছা, এই SIR এর সাথে যুক্ত না হলে এই ১ লক্ষ মানুষের কারো কোনো রোগজ্বালা হতোনা এই সমসাময়িক কালে? হাঁচি, কাশি, গ্যাস, অম্বল, আমাশা, মাথাব্যাথা, দাম্পত্য কলহ, পথ দুর্ঘটনা- যে কারো যখন খুশি মৃত্যুও তো হতেই পারত বা পারে! কিন্তু না, যেহেতু কালিঘাট অফিসিয়ালি SIR এর বিরোধী, তাই সব দোষ একা SIR এর।

SIR বিষয়টা ঠিক না ভুল, প্রসেসটা সঠিক নাকি বেঠিক, উদ্দেশ্য সাধু না অসাধু তা আলাদা ও বিষদ আলোচনার বিষয়, আজ আমরা সেখানে ঢুকবোনা। আজ একটু অন্য দিকটা দেখি।

একটা পোলিং বুথ মানে এলাকাটা একটা পাড়ার একটু বেশী। আজকাল একটা বুথে সর্বোচ্চ ভোটার সংখ্যা ১০০০ এর নিচে, ব্যাতিক্রমী ছাড়া, কমবেশী ২৫০টি পরিবার। ৮ ঘন্টা কর্ম দিবসের মধ্যে ৬ ঘন্টা করেও যদি ফর্ম বিলি ও জমা নেওয়ার প্রসেস চলে, সব মিলিয়ে সেটা ১৪ দিনও লাগেনা। ফর্ম ফিলাপের দায় BLO এর নয়, না সেখানে ভুল আছে কিনা তা অরিজিনাল নথির সাথে মিলিয়ে দেখার দায় রয়েছে। এরপর রইল এই ১০০০ ফর্ম অনলাইনে তুলে দেওয়া ঘরে বসে। আমাদের মত যাদের কোনও এ্যাকাডেমিক ডিগ্রি নেই কম্পিউটার বিষয়ে বা ডেটা এন্ট্রিতে, তারাও দিনে ৮০/১০০টা ফর্ম আপলোড করেই দেবো সারাদিনে- যখন এটাই আমার একমাত্র পেশাজনিত ডিউটি। এই কাজের মধ্যে সেই মহামারী ‘প্রেসার’টা কোথায়?

আমরা যারা ব্যবসা করি তারা সকাল ৭টার আশেপাশে দোকান খুলি, কেউ দুপুরে বন্ধ করি, কেউ করিনা। আবার রাত ৯টা অদধি ঝাঁপ খুলে প্রতীক্ষা করতে থাকি খরিদ্দারের। যারা গতরে খাটি, তাদেরও সামান্য অবসর বাদে বাকি কর্মদিবসের সময়টা শরীরের ঘাম রক্ত নিংড়ে নেয়। আমার নিজের বর্তমান পেশা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলসের, হোটেলে থাকলে সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা অবধি সমানে টহল মারতে হয় যখন যে লোকেশনে থাকি। এর সাথে মার্কেটিং এর জন্য ৩টে ফোনে ৫টা সিম, একটা ট্যাব একটা ল্যাপটপে সমানে কল-মেসেজের জবাব, রেট দেওয়া, বার্গেনিং, আইটিনিনারি বানানো সবটাই একপ্রকার নিজেকে করতে হয়। যতই ম্যানেজারেরা থাকুক, রানিং টুরিষ্টদের নানান সুবিধা অসুবিধার একটা অংশ আমাকেই সামলাতে হয়।

তাতে রাত ১২টা না ভোর ৫টা বাজে সেই গণনা করার সুযোগই নেই! কাস্টমারকে রেট/আইটিনিনারি দিতে লেট করলে সে অন্যত্র পালাবে, আমার ভাগে ফক্কা। ভোটের ট্রেনে নেমে ড্রাইভারকে খুঁজে না পেলে ফোনটা আমাকেই রিসিভ করতে হয়। এরপর যেদিন যে কর্মচারী আসেনি, নিজেকে সেই পদে বহাল হতে হয়। ধোপা, কুক, হাউজ কিপিং, সুইপার, রিসেপসনিষ্ট, ক্যাশিয়ার, বাজার সরকার, দারোয়ান সব পদে স্বনিয়োজিত হতে হয়, কারন আমি জানি আমি গাফিলতি করলে লোকসান একমাত্র আমার। লোকের অভাবে পরিষেবায় ঘাটতি হলে টুরিস্ট সেটা বুঝবেনা, গুগুলে নেগেটিভ রিভিউ খেলে আমারই ব্যবসা ঝাড় খাবে। এরপর ব্যাঙ্ক, GST সহ অন্যান্য সরকারী অফিসিয়াল কাজ রয়েছে, সব কাজ এক সমান্তরালে চলতে থাকে, এবং বিষয়টাকে দারুন এঞ্জয়ও করি। অভিযোগ কিছু থাকলেও শুনছেটা কে?

আমি আমার তথ্যটা দিলাম, প্রতিটা বেসরকারি চাকুরে, ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসাদার, শ্রমিক, কৃষকের একই হাল। প্রত্যেককে একই সাথে একাধিক ঝক্কি এক সমান্তরালে পোয়াতে হয়, এটাই জীবন, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ জানতে বাধ্য হতে হয়। যেহেতু আমাদের মাসিক মাইনের সুরক্ষা নেই, PF নেই, DA নেই, গ্রাচুইটি নেই, পেনশান নেই- তাই আমাদের কখনই প্রচণ্ড ‘প্রেসার’ সেভাবে অনুভূত হয়না জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে। আসলে BLO লেভেলের কর্মীদের ‘আসল’ কাজের দায়িত্ব কতটুকু থাকে? হয় তাঁরা প্রাথমিক শিক্ষক/শিক্ষিকা বা গ্রুপ ডি কর্মী। তাদের কাজকে সম্মান জানিয়েই বলছি, তাদের চেয়ে একজন প্রাইভেট টিউটরকে অনেক বেশী শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করতে হয়, অনেক বেশী দায়িত্ব আর অনেক বেশী জবাবদিহিতা করতে হয়, আর এটা রোজকার বিষয়। অনেক বেশী অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত হয় যেকোনো বেসরকারী কর্মী বা ব্যবসায়ীদের। তাই SIR এর ১ মাসের প্রেসারে যে কর্মীরা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন, তাদের সরকারী চাকরি থেকেও অব্যাহতি দেওয়ার ঘোষণা হোক। শরীরের সমস্ত ব্যাথা বেদনা পর মুহুর্তে গায়েব হয়ে গিয়ে আরবি ঘোড়ার মত মাঝরাত্রেও দেখবেন দৌড়াবে। এনারা বাস্তবিকিই আনফিট অকর্মন্য। ভাবুন একজন যেকোনো পদের আমলা, একজন পুলিশকর্মী, একজন ডাক্তার তাহলে কী পরিমান প্রেশার নেন রোজ!

কখনও ভেবে দেখেছেন যারা দিনমজুর, যারা পরিযায়ী তাদের কথা? যারা বৈধ হয়েও SIR এর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে তাদের কথা? যারা তথাকথিত ‘অবৈধ’- এদের না আছে কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, না আছে কোন সেভিংস, না আছে কোন পিছুটান। মরলে কোথায় কি নামে পোড়ানো হবে, নাকি কবর দেওয়া হবে কেউ কিছু জানে না। এবেলা কামিয়ে না আনলে ওবেলা কি খাবে তার কোন হিসাব নেই। সেখানে পরের দিন কি খাবে সেই ভাবনা তো বাহুল্যতা। তবুও স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে আগলে রাখে, তাদের সন্তানকে আগলে রাখে। যাদের বাবা-মা আছে, তাদেরকেও নিজেদের পাশে পাশে রাখে।

গরীব যে সকল মানুষ সামনের মাসে ‘অবৈধ নাগরিক’ হয়ে যাবে, সেই লোকটা কোথায় জন্মেছিল তার কোন ঠিক ঠিকানা রইবেনা। কোথায় কার সাথে কি ভাবে বিয়ে হইয়েছি তার কোন লেখাজোখা নেই, আদৌ কে তার নাম রেখেছিল, কি কারণে নাম রেখেছিল, কি ধর্ম, কি করেই বা তার ধর্ম ঠিক হয়েছিল তার কোন হদিশ পাওয়া যাবে না। কার সন্তান কার গর্ভে কবে জন্মগ্রহণ করছে, কি তাদের বয়স, কোথায় শিক্ষা হবে, কিভাবে শিক্ষা হবে, কি তাদের মাতৃভাষা হবে, কি তাদের শিক্ষার মাধ্যম হবে- কারোর কাছে কোন কিছুর হদিস থাকবে কী? পুঁজিবাদের কাছে শুধু এদের একটাই পরিচয়- কম পয়সায় লেবার। এদের কতজনের স্ট্রোক হয়েছে? কতজনের ‘প্রচন্ড প্রেসার’ নিয়ে মিডিয়া সরগরম হয়েছে? কেউ কি তার খবর রেখেছে?

কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে যখন নাৎসিরা ইহুদিদের ধরে এনেছিল তখনও তাদের একটা নাম ছিল, সংখ্যা ছিল, একটা অস্তিত্ব ছিল, আজকে যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন বর্ডারের ধারে ভিড় জমিয়েছে তাদের অধিকাংশের সেটুকুও নেই। আপনি হয়ত মিডিয়ার পড়ানো চসমাতে দেখে ওদের মুসলমান বা হিন্দু হিসাবে দেখছেন, আসলে তো তারা আমার আপনার মত রক্তমাংসের মত মানুষ। অথচ কী নির্লিপ্ত। একজন অবলীলায় বলে চলেছে- আমাকে আবার মায়ানমারের ওই রিফিউজি ক্যাম্পে ফেরত যেতে হবে। সাথের মহিলাটা অনেক বেশি সজাগ, সে বলছে- ওখানে যাওয়া যাবে কিনা সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পৃথিবীর ইতিহাসে যারা ঘোষিত যাযাবর জাতি তাদেরও একটা চলার ছন্দ ছিলো বা আছে, এদের ক্ষেত্রে সেটুকু খুঁজে পাওয়া গেল না, এটাই চরম আফসোস।

আগামীতে SIR কেন্দ্রিক শয়ে শয়ে মহাকাব্য লিখবেন সাহিত্যিকেরা, কিন্তু আমরা চোখের সামনে যেগুলো দেখছি দু-একটা, যদি সেখান থেকে কিছু তুলে রাখা যেত আগামী প্রজন্মের জন্য, তাহলে তারা সিনেমা উপন্যাস কিংবা অন্য কোন মাধ্যমের কাছে আদান-প্রদানের জন্য গবেষণার কাজে ব্যবহার করতে পারত। এই ‘নেই’ মানুষদের মধ্যে যৌন উত্তেজনা স্বাভাবিক, শুধু সেই কামনার বসেই হয়তো অনেক মানুষের জন্ম হয়ে গেছে- সেই দোষের দোষী এই নব প্রজন্মটা, সে জানেইনা কোন দোষে তার কোনো দেশ নেই। পাল ছিঁড়ে যাওয়া নৌকাটা কোনদিকে যাবে সে জানেনা, কিন্তু এটুকু অন্তত জানে যে আমি নদীর বাইরে যাব না। এর ক্ষেত্রে সেইটুকু নিশ্চয়তাও নেই।

আমাদের মত স্থায়ী বাসিন্দা হবার সৌভাগ্য যাদের জুটেছে, তাদের সবচেয়ে গরিব যে মানুষটা দিন আনে দিন খায়- তারও কিন্তু একটা নিজের ঠিকানা রয়েছে। খেয়াল করে দেখবেন, আপনার হয়ত শরীর চলছে না, হয়তো ব্যবসা বা পেশা আপনাকে সেভাবে সহায়তা করছে না, কিন্তু আপনি জানেন যে আমার একফালি জমি আছে গাঁয়ে, যেখান থেকে ফসল ফলিয়ে অন্তত বেঁচে যাব, কিম্বা দিনমজুরি করে খাবো। দুর্ঘটনাতে বা অপঘাতে মৃত্যু হলেও শব যাত্রায় অন্তত চারটে লোক যাবেই, যদিনা দূর বিদেশ বিভূঁইতে বেওয়ারিস হয়ে মারা যায়। এখানে যারা ‘অবৈধ’, তার জাত যা খুশি হোক, সেই লোকটা মরলে তার হয়ে কাঁদার মত কেউ থাকছে না। একটা দল এগিয়ে চলেছে অজানার দিকে, এতদিনের চেনা পরিচিত পরিবেশ, পাশের লোককে ফেলে দিয়ে। তার জন্য অনুশোচনা করার সময়টুকু অবধি কারো নেই। ছিন্নমূল শব্দটা শুনেছিলাম, এভাবে চোখে দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলামনা মোটেও।

কটাদিন ধরে আমি কিছুই লিখতে পারছি না, মানে কিরকম একটা করছে শরীরের ভেতরটা। পলায়নরত মানুষের ইন্টারভিউ গুলো দেখছি আর শুনছি, ভাবলেশহীন শূন্য চোখ গুলো দেখে বুকের ভেতরটা কি রকম কেঁপে কেঁপে উঠছে। এই পরিবেশ পরিস্থিতিতে কে তৃণমূল কে বিজেপি কে সিপিএম, এই সব ছাপিয়ে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টা বড় হয়ে উঠেছে। ৩০ বছর পর যারা আজকের দিনকে পিছন ফিরে দেখবে, তারা আজকের এই অসহায় পরিস্থিতি নিয়ে, মানবিক বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা করবে। তৃণমূল বা বিজেপি কেউ কোথাও থাকবেনা সেদিন। তৃণমূল নামটারই অস্তিত্বই হয়ত মুছে যাবে। সেদিন আলোচনার বিষয়বস্তু থাকবে শুধু কম পয়সার লেবার, অর্থনীতি, মানবিক বিপর্যয় এবং মানুষের অসহায়ত্ব।


হিন্দু, মুসলমান, বিজেপি, তৃনমূলের বাইরে গিয়ে আপনি কীভাবে দেখছেন গোটা প্রক্রিয়াটাকে?

সোমবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৫

হ্যাজের দুনিয়া

 

এই বাঁধভাঙা উচ্ছাস, আবেগের মেয়াদ সর্বোচ্চ আজ সন্ধ্যা বা রাত অবধি। তার চেয়েও বড় হচ্ছে ১১ জন মেয়ের মধ্যে ৭/৮ জনেরই নাম না জানা, ফেকুটিও স্বগর্বে বলছে- আজ স্বপ্ন সত্যির রাত! ভাই কভার আর এক্সট্রা কভারের ফারাক টুকুও বুঝিসনা, কখন কটা ফিল্ডার ৩০ গজ বৃত্তের ভিতরে আর বাইরে থাকবে তা জানিসনা, ফাইন লেগ মানে ওটা ক্রিকেট মাঠের একটা অংশের নাম, দীপিকা পাড়ুকোনের পা নয়- এটা যাদের বুঝিয়ে দিতে হয়, তাদেরও আজ 'নারীশক্তির' জয়ে আপ্লুত হওয়ার দিন বৈকি।

ওরে বঞ্চিতের দল, তোদের রাত মানে স্বপ্নদোষের, স্বপ্ন পূরণের নয়। আসলে সকলেই একটা ইভেন্ট চায়, সেটা যা খুশি হোক, যেমন এখন SIR এর মরসুম, তার মাঝে মহিলা বিশ্বকাপ জয় ১ দিনের ফুরফুরে অন্যস্বাদের পদ, আজ রাত থেকে না হলেও আগামীকাল সকালে আবার সেই মতুয়া, বিজেপি আর প্রদীপ করের আঙুলহীন বিদেহী আত্মার গল্প। কার্বলিক এ্যাসিড ঢালা বঙ্গ রাজনীতিতে সেই আদি অকৃত্রিম হেলে আর কেউটের পালাগান তরজা।

অমল মজুমদার না ওমোল মুজুমদার এ নিয়ে রীতিমতো সে কী তর্কাতর্কি আর খাপ পঞ্চায়েত, বাপ্রে। এর ফায়সালা না হলে বাবা ভাঙ্গার অভিশাপে দুনিয়া রসাতলে যাবে। অর্শের নাড়ি যেন পুনরায় পায়ুপথে রিটার্ণ করবেইনা না, মিতালি রাজ কে ট্রফি তুলতে না দেখলে। কে মিতালি রাজ? আরে  করোনার পর 'ট্যাপসি' পান্নু একটা সিনেমা এনেছিলোনা, সেটার আসল নায়িকাটা। তাও ভালো, কাউয়া বিরিয়ানির বিজয় রাজের বোনের মেয়ে বলেনি এই ভাগ্য। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি- হারলিন, সানি দেওয়লের কেউ হয়না, শার্দুল ঠাকুরের পরিবারের কোনো মহিলা ক্রিকেট খেলেনা। ঘোষ পদবী মানেই রঞ্জিত ঘোষের কেউ হতে হবে কেন? স্মৃতি মান্দানা রশ্মিকার "খালাতো বোইন" নয়। রাধা যাদব RJD কোটার খেলোয়ার নয়। এই রেনুকা সিং ছত্রিশ গড়ের বিজেপির MLA নয়। সাই কিশোর আর শ্রী চড়নী আত্মীয় নয়, যতই মাথার চুলে আঁটা ব্যান্ড একই রকম দেখতে লাগুক। আপনি বরং সৌরভ গাঙ্গুলির কবেকার করা কটাক্ষ নিয়ে সারগর্তের বুদ্বুদের মত উপরে চড়ে বসুন, ওটাতে মিষ্টতা পাবেন।

একজন দার্শনিকের প্রশ্ন- মাঠে আজ ৩০ টা মেয়ে খেলছে দু'দল মিলিয়ে, ৩ জন অনফিল্ড আম্পায়ার। এদের কী কারো পিরিয়ড হয়নি? কত কষ্ট নিয়ে দৌড়ায়। কমেন্ট একজন পুরুষ দরদী লিখেছে- ছেলেদের ঝুলন্ত বিচি সহ এ্যাবডোমেইন গার্ড নিয়ে দৌড়াবার যন্ত্রণা মেয়েরা বোঝে? আরেকজনের প্রশ্ন- আচ্ছা, বোলারের পিরিডয় হলে বল বেশী সুইং করে না মুড? আরো কিছু প্রশ্নমালা- আচ্ছা হরমনপ্রীত,স্মৃতি মান্ধানা, জেমিমা রদ্রিগেজ এনারা কী অপারেশন করে বুকের চর্বি বাদ দিয়েছে? কিম্বা হট প্রেসিং ট্রিটমেন্ট নিয়েছে? আচ্ছা এই মেয়ে গুলো স্বামীকে মানবে বিয়ের পর? কিরকম সব ব্যাটাছেলে মার্কা হাড়কাঠ বেড় করা দেখতে। দু একটা বাদে সবকটা কাজের মাসি মার্কা খেঁদি পেঁচি, কোনো লাবণ্য নেই। বাপ্রে বাপ, ওই থাই পাছা নিয়ে দৌড়ুচ্ছে দেখো!!  এই অবধি পড়া শোনার পর আর দেখার সাহস হয়নি দার্শনিকদের ওয়াল গুলো।

এরপর আছে কবির দল। ওষ্ঠো, অধর, স্তন, নিতম্ব, নাভী, যোনী, জরায়ু, চোখ, কাজল এর সাথে কয়েকটা ক্রিকেটীয় শব্দ, আর শ্রী চড়ণী, স্মৃতি, শেফালি এমন কিছু শব্দ জুড়ে সে কী সব কবিতার রক্ত আমাসা, টাইমলাইনে ঢুকলেই পিছলে যাচ্ছি সেই থকথকে স্রোতে। 

এর পর হ্যাজারের দল। রিচা ঘোষের মেসোমশাই এর ছোট শালার কাকাতো ভাই এর প্রমিকা লিখছে- রিচা দই খেতে ভালোবাসে। ব্যাস আরেক শিলিগুড়িয়ান চে এর ট্যাটু করা টঙ্কার ঘোষ বলছে, আমরা ২৬শে ক্ষমতায় এলে CAB এর নাম GAB করে দেব। কে জানে G ফর ঘোষ ভেবে দিলুদা মুকচি হাসলেও কুণাল শতরূপ হালকা কাশি সহযোগে সম্মতি দিয়েছে বলে 'ঘন্টাখানেক' ব্রেকিং নিউজ। এর পর স্মৃতি মান্ধানার চিকনা বয়ফ্রেন্ড, ক্রান্তি গৌড় এর পুলিশ পিতার চাকরি চলে যাওয়া, জেমাইমকে হিন্দুত্ববাদীদের ট্রোল, শেফালির উপরে ১ সপ্তাহ জুড়ে হনুমানের গদা ট্যাটুর কৃপায় ম্যাজিক পার্ফর্মেন্স ঢুকে যাওয়া। হর্ষিতের রানা পদবীর দায়ে স্নেহ রানার বাদ পরা, উমা ও শাশা দুই ছেত্রীর মধ্যে কে বেশী প্রতিভাবান! ঝুলনের কীসের এতো তাড়া ছিলো অবসর নেওয়ার! যা, বুঝলাম- দেশে হ্যাজ এর সাবজেক্টের অভাব পরেনি। এমনকি বাংলাদেশ থেকেও নাস্তিক নারীবাদীর হাহাকার ঝরে পরছে- কেন আমি ভারতীয় নই! এতো দুক্ষু রাখি কোথায়!

এর পর আসল খেলা, মোদী ম্যাজিক। দেশের তাবড় জনসংখ্যা জেনে গেছে- এই জয়ে সবচেয়ে বড় অবদান মোদীজির। তিনি এমনই অনামুখো যে, অতীতে যেখানে যেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন- সেটা চন্দ্রযান হোক বা পুরুষ ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপ, নিশ্চিত ভরাডুবি করিয়ে এলাকা ছেড়েছেন। গতকাল DY Patil স্টেডিয়ামে এ উপস্থিত না থেকে যে এভাবে জেতানো যায়, সেটা বিরল প্রতিভা। মোদি হ্যায়, তো মুমকিন হ্যায়। 

যাবার বেলায়, ট্রল বাহিনী মমতাকে ট্রল করে সে কী অর্গাজম। দেখো তারা রাত ১২টার পর জিতেছে- বলে সে কী উল্লাস। তাদের বলি, ২০০০ পুলিশ, প্রায় ৫০ হাজার ছুঁইছুঁই জনগন আর লক্ষ ওয়াটের আলো সরিয়ে নিলে, ঝুলন্ত বিচিওয়ালা ৫৫ ইঞ্চি ছাতিওয়ালা পুরুষ পুঙ্গবটি রাত্রের আঁধারে নিজে সেফ তো? সেখানে রাত বারোটার সময় হাতে দুটো ব্যাট, ৬টা উইকেট আর ১টা বল ধরিয়ে এই ২২টি মেয়েকে রাস্তায় ছেড়ে দিলে আমাদের দেশের কোন শহর বা গ্রাম সেফ? আপনি দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত? কোনো ঋজুদার দরকার নেই- you are looking good in Sharee বলার জন্য, সামান্য সুযোগ পেলে আপনিই হয়তবা - চলতি ক্যায়া বলে, রেট শুধাবেন।

তবে ছেলেদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেটের জয় অপারেশন সিঁদুরের অংশ হলেও হলে মেয়েদের জয় শুধুই জয়। এখানে না হ্যান্ডসেক তরজা না তৃতীয় কোনো ভ্যেনুতে খেলার জন্য কোঁদল। তবে কাপটা জিতে গিয়ে জয়টা ক্রীড়ার জয় নয়, নারীবাদীদের হয়। মা দুর্গার জয়। ভারত মাতার জয়। মেয়েদের জয়টা নিয়ে দেশপ্রেমের আবেগ লক্ষ্যনীয় ভাবে অনুপস্থিত। আর দীপ্তি শর্মার টিপ নিয়ে কোনো হ্যাজ এই অবধি নামেনি। আমাদের ভারতীয় পুরুষতান্ত্রিক আধা রক্ষণশীল মাইন্ডসেটে এর চেয়ে বেশী ভালো হওয়া সম্ভব নয়, সে আপনি আমি নিজেকে যতই উদার আধুনিক মক্তমনা বলে দাবী করিনা কেন! তবে আশা করতেই পারি, গতকালের এই জয় আগামীতে অনেক কিছুই বদলে দেবে। অনেকে আকৃষ্ট হবে। আশা টুকুই সম্বল।

ক্যাপিটার মার্কেট মুনাফা বোঝে, তাই পুরুষের অন্তর্বাসের বিজ্ঞাপনেও নারী মুখ ছাড়া চলেনা। খেলাতে দর্শন টানতে গেলে যে পারফর্মেন্স দরকার, পুরুষ ক্রিকেটের নিরিখে। সেটা নেই মহিলা ক্রিকেটে, তাই অর্থ নেই- এটা যুক্তি হতে পারে। কিন্তু পারফরম্যান্স দেখাতে গেলে যে পরিমাণ পরিবেশ দরকার, প্রস্তুতি দরকার এবং পরিকাঠামো দরকার সেগুলো কী করে উঠতে পেরেছে ক্রিকেট বোর্ড বা সরকারের ক্রীড়া দপ্তর করতে পেরেছে যারা সবেতে কর বসিয়ে রোজগার করে? মহিলা ক্রিকেট ছেড়েই দিন, পুরুষ ক্রিকেট ছাড়া দেশের বাকি কোনো স্পোর্টসে সেই অর্থ আধুনিক পরিকাঠামো রয়েছে যাকে বিপননের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনদাতারা আয় করতে পারে? সবটাই দিনের শেষে বিজ্ঞাপনী চমক। বাজারই তৈরি করে দেয় কে থাকবে আর কে থাকবেনা। বাজার বিরাট কোহলি যেতে না যেতেই শুভমন গিলের উপরে লগ্নি করে বসে আছে, তাই যতই যে শেষ ১৫টা ODI/T20 তে ১৩ গড়ে রান করুন, তাকে সহজে বাদ দেওয়া যাবেনা। এই কারনেই বুড়ো ধোনী আজও IPL খেলে, কারন স্পনসরদের লগ্নি রয়েছে তাদের উপরে। 

এবারে মহিলা ক্রিকেটে প্রচুর টাকা আসবে, সফল ও সুন্দরী মহিলা ক্রিকেটারদের প্রচুর ভাবে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হবে। তারা কোটিতে রোজগার করবে, মধ্যবিত্ত অসংখ্য বাবা মা তাদের বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে ক্রিকেট একাডেমিতে দৌড়াবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ফিল্ডিং অনেক উঁচু জায়গায় চলে যাবে। ক্রিকেটীয় বিচারে, সেই লেগে টেনে টেনে মারে রাণ করছে অধিকাংস দল, দক্ষিণ আফ্রিকার মেয়েরাও তাই। সে তুলনাতে আমাদের দেশের ব্যাটারটা অনেক বেশী উন্নত। তবে মেয়েদের বোলিং এর হাল অতি বাজে।  এদের ইয়র্কর হয়না সেভাবে, তার জন্য যে গতি লাগে সেটা এরা এ্যাচিভ করতে পারেনা। লেগস্পিনার একটাও নেই, বাকিদের বলও স্পিন হচ্ছে কই! সব ওই স্লো মিডিয়াম, ফ্লাইটেড ডেলিভারি। বোলিং এ বৈচিত্র্য খুবই কম মেয়েদের ক্রিকেটে। আগামীতে বেশ কয়েকটা পেস বোলিং অলরাউন্ডার খুঁজে পাওয়া যাবে। অন্তত ৫ ফুট ১০/১১ ইঞ্চি বোলারদের বলের গতি ১৩০ এর বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে। অনেক প্রাক্তন মহিলা খেলোয়াড় আম্পায়ার হবার জন্য হাজির হয়ে যাবে। 


ইয়ে, আমারটা এইটাও হ্যাজ, আগামীকাল আর এটার তেমন মার্কেট ভ্যালু রইবেনা, বাসি হয়ে যাবে। তাই টাটকা হ্যাজ নামিয়ে নিলাম আরকি। আপনি এমন কোন হ্যাজ দেখে হেজিয়ে গেলেন, করবেন নাকি আপনার অভিজ্ঞতার শেয়ার!!


#হককথন

সোমবার, ৩ মে, ২০২১

২০২১ নির্বাচনের ফলাফলঃ সিপিএমের কী করা উচিত আর কী নয়

তৃতীয় পর্ব

সিপিএমের কী করা উচিত আর কী নয়। রইল ব্যাক্তিগত মতামত।

বেলা দুপুর গড়িয়ে ঘড়িতে ২টো অতিক্রান্ত, রাজ্যের ভোটের ফলাফল পরিষ্কার। রাজ্যের প্রতিটি কেন্দ্রে বামপ্রার্থীরা সহ জোট কার্যত কোথাও লড়াইয়ে নেই। খুব কষ্ট করে একটা আধটা দ্বিতীয় স্থান পেলেও বাকিগুলোতে জামানত বাঁচানো সম্ভব কিনা সেটাই প্রশ্ন। কোথাও কোথাও ভোট শতাংশ সামান্য বৃদ্ধি হলেও সেটাও প্রাপ্তি নয়, এই মুহূর্তে ২০১৯ লোকসভার চেয়েও ২% ভোট কম পেয়েছে। আমার অনুমান- এটা মূলত মোদী বিরোধী ভোট, লকডাউনে নাজেহাল মানুষের ভোট, পাশাপাশি NRC এর ভয়ে ভীত সংখ্যালঘু ভোটের প্রায় সবটাই তৃণমূলের ঝুলিতে গেছে। মিডিয়াতে একতরফাভাবে বিজেপির সাম্প্রদায়িকতা প্রোপাগান্ডা প্রচার, আর তৃণমূলের ‘দানের রাজনীতি’- এই পর্যায়ে সফল, দুটোরই লাভ তৃণমূল পেয়েছে।
যে সকল তথাকথিত বামপন্থী গর্বের সাথে বলেন- আমরা ভোটের জন্য রাজনীতি করি না, আমরা রাস্তায় থাকি- তাদের মনোস্কামনা পূর্ণ হয়েছে। যারা ভোটের রাজনীতি করে তারাই ভোট পেয়েছে, মানুষ তাদেরই বিকল্প বেছে নিয়েছে। রাস্তায় থাকা আপনার গর্ব, আপনাকে সেখানেই স্থান দিয়েছে- উল্টে আপনার হাতে জুটেছে একটা ফুটো বাটি। এইবার ন্যূনতম লাজলজ্জা থাকলে ওই হেজে যাওয়া আঁতলামো-মাতলামো ভক্তমার্কা ডায়লোগ কপচাবেন।
একজন পার্টি কর্মী হিসাবে- এই পর্যায়ে কিছু পরিষ্কার কথাবার্তা বলি, যা মনে এল। কেউ আবার বলবেন না যেন- ভিতরে আলোচনা করতে হয়, প্রকাশ্যে নয়। গোটা সিস্টেমটাই যেখানে ন্যাংটা হয়ে গেছে যেখানে, সেখানে কীসের ভিতর আর কীসের বাইরে! তাই আপনাদের জন্য জন্য ছোট্ট টিপস- আপনারা বিশাল মাতব্বর, চেকা গিরি ঘরে বসে দেখান, নতুবা গণধোলাই এর শিকার হবেন।
১) কোনোভাবেই কোনো অজুহাত সৃষ্টি করা যাবে না। নীতিগতভাবে এই নির্বাচনে রাজ্যের সাধারণ মানুষ বিপুলভাবে বামপন্থীদের প্রত্যাখ্যান করেছেন৷ কোনো বাম প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করে নিজেদের খিল্লি করা যুক্তিহীন। তারা নিজেদের মতো চেষ্টা করেছে, বাকিটা জনতা জনার্দন।
২) মানুষের রায় সার্বিকভাবে মেনে নিতে হবে। রাজ্যের মানুষ সঠিক অর্থে বামপন্থীদের বিরোধী দলের মর্যাদাটুকুও কেড়ে নিয়েছে। মানুষ বামপন্থীদের ন্যূনতম যোগ্য বলে মনে করেনি। বামেদের বিকল্প বার্তা এই পর্যায়ে কোনো কাজে আসেনি, সেটা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। ফেব্রুয়ারীর ব্রিগেডে আসা মানুষ ও তাদের পরিবার গুলোও সকলে ভোট দেননি।
৩) ‘আমরা মানুষকে বোঝাতে পারিনি’ এসব ছেঁদো গল্প নয়, আসলে আমাদের মধ্যে মানুষকে বুঝতে পারার শক্তি আদৌ অবশিষ্ট আছে কি- এটা নিয়ে ভাবনা দরকার, আমার ব্যক্তিগত হিসাবে এটা নেই। তাই আদ্যিকালের ভাবনা ছেড়ে আরও সংস্কার আসুক দলে।
নিজেরা শ্রমিকের ৭০০ টাকা নুন্যতম দৈনিক মজুরীর জন্য আন্দোলন করব, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা ভাষনে শোনাবো- "মাসে নুন্যতম ২১ হাজার টাকা আয় না থাকলে একটা সংসার চলেনা"। আর পার্টির সর্বক্ষণের কর্মীদের ৪-৫ হাজার টাকা দেবো। জানি এটা বেতন নয়, এটা ভাতা; কিন্তু একজন হোলটাইমার তো অন্য কোনো পেশার সাথে যুক্ত নন, তাহলে তার সংসার কীভাবে চলবে? হোলটাইমার বলে তার পরিবার থাকবেনা বা তার খিদে অন্যের তুলনায় কম লাগবে এমন তো নয়। ভাতা হোক বা যা খুশি, হোলটাইমার রাখতে হলে তাকে নুন্যতম সাম্মানিক দিন, যাতে তার প্রয়োজন মেটে। ভাঁড়ারে চালের পরিমান বুঝে নিমন্ত্রণ করুন, ৩৪১ ব্লকে ১টা করে হোলটাইমার থাক প্রয়োজনে, কিন্ত তারা যেন সাম্মানজনক একটা ভাতা পাক। দরকারে গ্রেড সিস্টেম হোক। নতুবা এ পদ তুলে দিন। বিকল্পের কথা মুখে বলব আর নিজেদের দলের পার্টিজানদের জন্য সেই আদ্যিকালের রদ্দি মার্কা নীতি- এটা স্পষ্ট দ্বিচারিতা। এগুলো ত্যাগ করতে হবে।
৪) ২০১১ নির্বাচনের পর থেকে দলের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সিনিয়র নেতাদের মানুষ ন্যূনতম বিশ্বাস করছে না, এটা আবারও প্রমাণিত, তাদের মুখ দেখলেই জনগণ তেড়ে বিরুদ্ধে যাচ্ছে। সেই নেতারা সহ তাদের আশেপাশে থাকা সকলে একযোগে সরে না গেলে এটাই স্বাভাবিক পরিণতি হতে থাকবে। প্রার্থী তরুণ দিয়ে লাভ হয়নি, কারণ ভাবনাতে তারুণ্য নেই। পার্টির ভিতরে সংস্কার আনতে হলে ওই প্রত্যাখিত নেতাদের সামনে রেখে করা অসম্ভব। আপনারা যথেষ্ট মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছেন, এবারে ছাত্রযুবদের স্ট্রোক দিতে দিন। এটা কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির বিষয় নয়, সংসদীয় গণতান্ত্রিক পশ্চিমবঙ্গে বামেদের নিজেদের আগামীর অস্তিত্বের প্রশ্ন।
৫) এখন আর কোনো অজুহাত নয়, না পরবর্তী সম্মেলনের অপেক্ষা। ন্যূনতম চক্ষুলজ্জা থাকলে- যত দ্রুত সম্ভব রাজ্যের সমস্ত জেলা সম্পাদক, জেলা কমিটি এবং রাজ্য কমিটির সদস্যরা পদত্যাগ করুন। অধিকাংশ জেলা কমিটি, এরিয়া কমিটি কার্যত ঘুঘুর বাসা, অধিকাংশ জনই কাজকর্ম করে না মাটিতে, কবে ঘি দিয়ে ভাত খেয়ে বিপ্লব করে ছিল- সেইটার গল্প বলে ‘কোটায়’ রয়ে গেছে। সারাক্ষণ লবিবাজি করে, পদ বাঁচিয়ে রাখতে। কেউ কেউ তো সরকার পোষিত বামপন্থী।
সংগঠনকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে দিন তরুণ প্রজন্মকে, তারা এর চেয়ে বেশি কীই বা খারাপ করবে যেখানে আপনারা ছেড়ে গেলেন (যদি ছেড়ে যান তবেই)? তার সাথে অবশ্যই বিভিন্ন গণ সংগঠনগুলির মুখগুলিও পদত্যাগ করুন। এখানে বাস্তুঘুঘুদের বাস অধিকাংশ ক্ষেত্রে। চেকা গুলোকে চিহ্নিত করে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হোক।
৬) পার্টির কিছু নেতাদের ছেলে, মেয়ে, আত্মীয়, চামচা এমন বহু প্যারাসাইট অযোগ্য সদস্য থিকথিক করছে দলে- যারা এই নির্বাচনে প্রচার সামলানো সহ নানান গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে- যথারীতি দায়িত্ব নিয়ে ডুবিয়েছে দলকে। তারাও ব্যর্থতার দায় নিয়ে, সম্মান বজায় থাকতে থাকতে নিজেরাই পদত্যাগ করুন নতুবা পার্টিকর্মীরা ঘাড় ধরে আপনাদের নামিয়ে দেবে এবং সেটা ভীষণ অসম্মানজনকভাবে। লেভির টাকায় এসব অপুষ্যি পোষা বন্ধ করতে হবে।
৭) রেড ভলেন্টিয়ার্স নামের হুজুগে আঁতলামো বন্ধ করুন। মানুষ সরকার বেছে নিয়েছে, পরিষেবা দেওয়া সরকারের কাজ। আমাদের কাজ আমাদের পার্টি কর্মী কমরেডদের বিপদে-আপদে পাশে থাকা আর সংগঠন বাড়ানো, সরকারের ব্যর্থতার জায়গাতে গিয়ে NGO বা প্যারালাল সরকার চালানো নয়। এটা রাজনৈতিক দল, কোনো সেবাশ্রম বা ক্লাব নয়। সোস্যাল মিডিয়াতে বহু স্থানে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছে- একশ্রেনীর ছদ্মবেশী বামপন্থী ভেক ধরে থাকা দুর্বৃত্তরা, পার্টি শীর্ষ নেতৃত্বের বিশ্বাস ও সরলতার সুযোগ নিয়ে এই গোটা পরিকল্পনাটা PK এর কাছে টাকা খেয়ে তৃণমূলের অপদার্থতা ঢাকার জন্য করেনি তো? এটা অন্তর্ঘাত নয় তো? ভোটের ফলে পরিষ্কার, আমরা মানুষের পাশে থাকতে গেলেও-
মানুষ আমাদের পাশে রাখার যোগ্য মনে করেনি। অনেকে ব্রিটিশ জামানার বিপ্লব কিম্বা তেভাগার সাথে তুলনা করছেন, তারা ইতিহাস জানে না- ব্রিটিশ জামানাতে সংসদীয় গণতন্ত্র তথা ভোটের রাজনীতি ছিল না, ছিল বাঁচার লড়াই। তেভাগা ছিল নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াই! ভলেন্টিয়ার্সের নামে এই শ্রম ফেরি করা কোন অধিকারের লড়াই?
৮) পার্টির ছাত্র যুবদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে, এই মহামারীকালে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া তাদের রাস্তায় নামিয়ে, কোভিডে আক্রান্তদের বাড়ি বা সংস্পর্শে পাঠিয়ে দিয়েছে। যেখানে পলিটব্যুরো সদস্য মহঃ সেলিম বিবৃতি দিয়ে মিটিং-মিছিল করব না বলে ঘোষণা দিলেন, যখন আংশিক লকডাউন চলছে, ইস্কুল-কলেজ, হাটবাজার সব বন্ধ, আক্রান্তের সংখ্যা রোজ বাড়ছে পাল্লা দিয়ে, এলোপাথাড়ি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, সেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ- ছাত্রযুবরা শুধুমাত্র একটা কাপড়ের মাস্কের ভরসা করে রাস্তায় ছুটে চলেছে। কাল এদের কিছু হয়ে গেলে কে তার দায় নেবে? কিছু ফেসবুক বিপ্লবী ও আলিমুদ্দিনে থাকা কোটার প্যারাসাইট এই কাজগুলো করছে, যাদের সাথে মাটির যোগাযোগ নেই। এটা অবিলম্বে বন্ধ করুন, আমাদের প্রতিটি কমরেড আমাদের সম্পদ, তাদের জীবন এভাবে বিপন্নতার মুখে ঠেলে দেওয়া- আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এটা বিপ্লব নয়, তা যদি হতো- সেক্ষেত্রে গত লকডাউনে রাজ্য জুড়ে পাশে থেকেও ভোটবাক্সে এই দশা হতো না। রাজনীতিটা করুন গুছিয়ে স্বল্প শক্তি নিয়েই এবং করতে দিন মন দিয়ে যারা এটা করছে।
১০) সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন করে একটা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী তরুণ মুখের দল পার্টির মধ্যেও উঠে আসুক, নেতৃত্বের হাল ধরুক। সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে হারতে হারতে তারাও নিজেদের তৈরি করে নেবে, যাদের নিয়ে আগামী ২০২৪ ও ২০২৬ নির্বাচনের আগে মানুষের কাছে একটা স্পষ্ট সুভদ্র মুখের বার্তা দেওয়া যাবে। দলে আইনের ছাত্রদের, অর্থনীতি জানা কমরেডদের সামনে নিয়ে আসা হোক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে।
১১) খেতমজুর সংগঠন এর উপর জোর দেয়া হোক। এই নির্বাচনে পার্টির সর্বাধিক সদস্য ABTA থেকে এসেছিল৷ সবচেয়ে বেশি দ্বায়ভার নিশ্চিত ভাবেই তাদের নিতে হবে। গত এক বছর ধরে লকডাউনে বেশিরভাগ শিক্ষক- সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন, তারই একটা ভার একটা নির্বাচনে দলকে বইতে হলো। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মীয়ভাবে নয় সরাসরি স্পষ্ট করে কেরলের মত কর্মের দিকে তাকাতে হবে। তারুণ্যের দিকে তাকাতে হবে।
সুদীর্ঘ পথে আমাদের জন্য নিশ্চিত ভালো কিছু অপেক্ষা করে আছে ৷
১২) তথ্য, বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা ও রূপায়ন- এটা নিয়ে আলাদা সেল খোলা হোক। আগামীর নির্বাচন নিয়ে দ্রুত কর্মশালা করে প্রস্তুতি নেওয়া হোক, সেই মতো দায়িত্ব বণ্টন করে সেখানেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের এখন থেকে কাজে লাগিয়ে দেওয়া হোক। সোশ্যাল মিডিয়া টিম পেশাদারভাবে চালানো হোক, পার্টি লাইনের মধ্যে থেকে। রাজ্য জুড়ে জেলা ওয়ারি ভৌগোলিক পরিবেশ অনুযায়ী ডেমোগ্রাফি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা, পরিচ্ছন্ন ধারণা থাকা মানুষদের সামনে আনুন। তরুণেরা অনেকেই ভোট বোঝে না, তাদের জন্য কর্মশালা হোক, ভোট ম্যানেজারেরা সারা বছর মাটিতে থেকে প্রার্থীদের জন্য ডেটা রেডি করুক।
১৩) শরিক দলগুলোকে আর কতদিন ও কেন বইবে এই নিয়েও আলোচনা হোক। কারোর কোথাও কোনো সংসঠন নেই সেই অর্থে। CPIM থাকলে তবে তারা আছে, এখন নিজেরাই সমস্যাতে, সেখানে কীসের শরিক আর কীসের বামফ্রন্ট? আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মূল্যায়ন করুন।
১৪) কংগ্রেস নিয়ে মোহভঙ্গ কবে হবে সেটা নিয়ে ভাবতে বসুন।
১৫) শহুরে সস্তা প্রচারের রাজনীতিতে না গিয়ে সিটু, কৃষকসভা এগুলোতে জোর দেওয়া হোক। এখানে খোলনাচলে নেতৃত্ব বদল হোক। SFI ও DYFI তৈরি আছে যোগ্য সঙ্গত দেওয়ার জন্য। দলের ব্যাটনটা তাদের হাতেই যাক এবারে।
আমাদের সময় লাগতে পারে কিন্তু বামপন্থীরা নিশ্চিত ভাবে ঘুরে দাঁড়াবেই। ইতিহাস সাক্ষী।

রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২০

অনলাইন শিক্ষা




আমরা সেই ক্ষণজন্মা প্রজন্ম যারা যুগ সন্ধিক্ষণে জন্মেছি। শেয়াল ডাকা বাঁশবনের ধারে গা ছমছমে সন্ধ্যায় হ্যারিকেনের বাতি জেলে পড়া শুরু করে এখন কিন্ডেলে সদ্যপ্রকাশিত উপন্যাস দেখি। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহের টং এর ঘর থেকে ফেলা আলোয় রুপোলি পর্দা বদলে গিয়ে এখন OTT প্ল্যাটফর্মে হাতেগরম সরবরাহ, মাঝখানে এই আমরাই দেখেছি টিভির দাপাদাপি। এই আমরাই সাইকেল চলার অনুপযুক্ত মোরামের রাস্তাকে বদলে যেতে দেখলাম এসফল্টের পরত দেওয়া খেলনা গাড়ির দৌড় প্রতিযোগিতার ট্র্যাকে। পাড়ার সাপ্তাহিক হাট-বাজারও আজ একটা ক্লিকের অপেক্ষায় দুয়ারে এসে দাঁড় করিয়ে দেবে ‘ডেলিভারি বয়’ নামক রানারদের। হাতের মুঠোয় সবকিছুই প্রায় হাজির। জীবনটা এতটা দ্রুত বদলে গেল যে, কবে ক্যাসেট ফুরিয়ে সিডি এল, ডিভিডি এল, আর কবেই বা মাইক্রো চিপস এল- তার গ্রাফটাই এঁকে উঠতে পারলাম না।
এরই মাঝে আরেক ক্রান্তিকাল, গরিব ও মধ্যবিত্তের চরম বিভীষিকাময় অধ্যায়- করোনাকাল। করোনাকাল জীবনের বহু গতানুগতিক রীতিনীতিই বদলে দিয়েছে, শিক্ষাও যার ব্যতিক্রম নয়। স্বভাবতই গত এক শিক্ষা বছরে গতানুগতিক শিক্ষা আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিকেরা নানান তথ্য-তত্ত্ব দিয়ে গোটা বিষয়টার পিছনে কোনো অসাধু উদ্দেশ্যকে চিহ্নিত করতেই পারেন, কিন্তু তাতে আম মানুষের রোজনামচাতে কোনও পরিবর্তন ঘটবে না। যা পরিবর্তন ঘটার ছিল সেটা ঘটে গেছে, এখান ভাল হোক বা মন্দ- সেটাকে সাথে করে নিয়েই আগামীর পথ চলতে হবে। আমরা একটি নতুন যুগে প্রবেশ করছি- অনলাইন শিক্ষা যুগে। সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং মেন্টেনের যুগে ক্লাসরুমে শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকে শিক্ষালাভই একমাত্র উপায় নয়- পঞ্চম প্রজন্মের গতিময় ইন্টারনেট এবং তার সাথে সঙ্গত রেখে নিত্য প্রযুক্তির বিকাশ ও উত্থানের এই সমাজব্যবস্থায় অভ্যস্ত হতে হবে বিকল্পতে। প্রয়োজন শুধু নিজস্ব ইচ্ছা সাথে কিছুটা অর্থনৈতিক সামর্থ্য, আর পরিকাঠামোর সহযোগিতা- এই ত্রিবেণী সঙ্গমে আপনি যখন যেখানে চান, একটি মানসম্মত শিক্ষার প্রবেশদ্বার পেয়ে যাবেন।
ইন্টারনেট মাধ্যমে শিক্ষাকে ঘিরে সংশয় নিয়ে আমার এই প্রবন্ধ নয়, সব কিছুরই ভাল ও মন্দ দুটো দিক থাকে। বর্তমানে অনলাইন শিক্ষার নামে যা শুরু হয়েছে তা একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে। এর ব্যাপ্তিও বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল, আর হাতেগোনা একআধটা সরকারি স্কুল ছাড়া সেভাবে উপলব্ধ নেই। সেটাও কতটা কার্যকরী তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে, কারণ অনলাইনে মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী আদপে কতটা শিখছে সেটার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। এর মূল কারণ দুটো- প্রথমত, আমাদের গতানুগতিক মানসিকতা, দুই- অনলাইন শিক্ষার পরিকাঠামো। এই পরিকাঠামো তৈরি হলেই- বাচ্চা আদৌ শিখছে কিনা তার পর্যবেক্ষণের নিয়ম এসে যাবে।
শত সহস্র বছর ধরে প্রচলিত ক্লাসরুম ভাবনাকে এক লহমায় কয়েক মাসের মধ্যে ভুলে যাওয়া যাবে- এই ধারণাটি ভাবনাতে আনাও অপরাধ। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী কঠিন হলেও অসাধ্য নয়, কারণ ইন্টারনেটের মাধ্যমে ধরতে পারা পৃথিবীর ব্যাপ্তিটা ক্লাসরুমের চেয়ে ঠিক কতটা বিশাল- সেটা আমরা কল্পনাতেও আনতে পারি না। আজ করোনা পরিস্থিতি আমাদের ইন্টারনেটের মুখোমুখি দাঁড় না করালেও মুখাপেক্ষি করে তুলেছে।
বিকল্পকে সকল সময় স্বাগত জানাতে হয়, বিকল্প শক্তির পরিচায়কও বটে। এদেশের শিক্ষার্থীরা ডিসট্যান্স এডুকেশন বিষয়টার সাথে পরিচিত থাকলেও, সেটার অনলাইন মাধ্যমের সাথে পরিচিতই নই। ওদিকে পশ্চিমা দেশগুলোতে শিক্ষার্থীরা বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে হাতেকলমে শিখছে, আর একাডেমিক শিক্ষা শিখছে অনলাইনে ডিসট্যান্স কোর্সে। বিকল্পের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, তারা পরিকাঠামোগত বাধা সরিয়ে ভাল দিকটা গ্রহণ করেছে, তাই তারা এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি প্রাপ্তবয়স্ক হলে অনলাইন শিক্ষা সবসময় একটি বুদ্ধিদ্বীপ্ত বিকল্প। একটি কঠিন বিষয়ে দক্ষতাকে তীক্ষ্ণ করার জন্য অথবা নতুন দক্ষতা রপ্ত করার জন্য একজন ছাত্রের কাছে অনলাইন শিক্ষা অতি কার্যকরী বিকল্প। কিন্তু শিশু ও কিশোরদের জন্য বিষয়টি এখনও পরীক্ষিত নয়, এটাই এই মাধ্যমের মূল সমস্যা।
অনলাইন শিক্ষা সহজবশ্য। শিক্ষক এবং ছাত্রকে তাদের নিজস্ব সময়সূচি নির্ধারণের অতিরিক্ত নমনীয়তা রয়েছে যা প্রত্যেকের কর্মসূচির সাথে খাপ খায়। চলতি কিছু না ছেড়েই অনলাইন শিক্ষার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পেশা ও পড়াশোনার একটি ভাল ভারসাম্য তৈরি করা যায়। অনলাইন অধ্যয়ন সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা শেখায়, যা জীবনে ভারসাম্য আনতে সাহায্য করে। এই মাধ্যমের যৌথ কর্মসূচি উভয় পক্ষকেই নতুন দায়িত্ব গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে।
ইন্টারনেটের মতো বিস্তৃত স্থানে শেখানোর এবং শেখার জন্য অসীম দক্ষতা এবং বিস্তৃত বৈষয়িক পরিসর রয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে সমসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা স্কুল সেভাবে তৈরি হয়নি আমাদের দেশে। অনলাইন সংস্করণ শিক্ষায় সংগীত শিক্ষা থেকে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান, সব ধরনের শিক্ষার্থীর জন্য একাধিক বিকল্প রয়েছে। ক্যাম্পাসে পা না রেখেও অফিসিয়াল সার্টিফিকেট, ডিপ্লোমা বা ডিগ্রি পাওয়ার জন্য অনলাইন শিক্ষা দুর্দান্ত বিকল্প। বস্তুত বলতে গেলে আমরা গৃহিণীরা আজকাল ইউটিউব দেখে রান্না করি, এটাও তো এক ধরনের অনলাইন শিক্ষাই। আসলে শিক্ষাকে যদি এন্টারটেনমেন্টের পর্যায়ে উন্নীত করা যায়, তাহলেই শিক্ষা সহজ হয়ে যায়।
এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত না করেই অনলাইন মাধ্যম বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে শিক্ষা দিতে সক্ষম করে। এতে কেবল সময়ই বাঁচে তাই নয়, অর্থ সঞ্চয়ও হয়, যা অন্যান্য অগ্রাধিকারগুলিতে ব্যয় করা যেতে পারে। ভ্রমণে থাকাকালীনও ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের সুবিধা নেওয়া যায়। ব্যক্তিগত শিক্ষা পদ্ধতির বিপরীতে, অনলাইন শিক্ষা সাশ্রয়ী হতে পারে। আপনি যাতায়াত এবং শ্রেণীর উপকরণ থেকেও ভালো অর্থ সাশ্রয় করতে পারেন। শিক্ষককেও আর্থিক বিনিয়োগ কম করতে হয়।
অনলাইন শিক্ষার নমনীয়তা অধ্যয়নের গতি নির্ধারণ করতে সাহায্য করতে পারে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বতন্ত্র প্রয়োজনীয়তা এবং যোগ্যতার স্তরের জন্যও এই মাধ্যম যথেষ্ট নমনীয়। প্রথাগত ক্লাসরুম শিক্ষার চেয়ে অনলাইন ক্লাসগুলি আকারে-আয়তনে চেয়ে ছোট হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্ত্রীর মধ্যে অধিক মিথস্ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ এনে দেয়। ভিডিও, ফোটো এবং ইবুকের মতো খুব বৈচিত্র্যময় সামগ্রী অনলাইনে অতিসহজেই অ্যাক্সেস করা যায়, যা আগেকার দিনের ছাত্রবন্ধু কিংবা পাঠাগারের বিকল্প। পাঠ উন্নত করতে ফোরাম বা আলোচনার মতো বিবিধ ফর্ম্যাটগুলিকে অনলাইন শিক্ষা সংহত করতে পারে সহজেই। এই অতিরিক্ত বিকল্প বাস্তবে কোনো একটি মুহূর্তে একটি স্থানে পাওয়া অসম্ভব, ফলে শিক্ষাব্যবস্থাকে ভীষণ গতিশীল করে তোলে।
আমাদের প্রত্যেককে অবশ্যই অনন্য পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে হয় এবং সময়ের চাহিদা ও লক্ষ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রথাগত শিক্ষার পরিবর্তে এই বিকল্প আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে সবার জন্য নয়, এই বাস্তব পরিস্থিতিতে যাকে উপেক্ষা করতে পারি না আমরা। অবশ্যই এটি একটি সুবিধাজনক বিকল্প যা বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক ছাত্রদের জন্য অনুকল্প- কিন্তু সেই আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত হওয়ার জন্য যে মৌলিক শর্তগুলো পূরণ করতে হয় আমাদের পরিকাঠামো তার শুরুটাই করে উঠতে পারেনি, অথচ অনলাইনে পঠনপাঠন শুরু করে দিয়েছে।
স্বভাবতই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিশু ও কিশোর ছাত্রছাত্রীরা এই লকডাউনে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে গেছে বিনা দোষে, সমাজের মাঝে শিক্ষায় স্পষ্টত দুটো বিভেদ তৈরি হয়েছে অভিভাবকের অর্থ আর ডেমোগ্রাফিক লোকেশনের উপরে ভিত্তি করে। গুটিকতক ছাত্রছাত্রী যেখানে ২ বছর এগিয়ে গেলো সেখানে অবশিষ্ট গোটা ছাত্রসমাজ স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই ২০২০ সালের মার্চ মাসেই, কে জানে কতজন পড়াশোনার অভ্যাসটাই ভুলে গেছে। কিম্বা পেটের জ্বালা মেটাতে কতজন কতজন সস্তার শ্রমিক হয়ে গেছে, কত বালিকা বাল্য বিবাহের অভিশাপে পাতিত হয়েছে। এদের চিহ্নিত করে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে অনলাইন শিক্ষার বিকল্পকেই গ্রহণ করতে হবে। যাতে শ্রমিক তথা বালিকাবধুটি যেন শিক্ষাটা পায় তার বর্তমান অবস্থাতেও।
অনলাইন কোর্সের কিছু অসুবিধা~
  • অনলাইন ক্লাস পরিচালনার জন্য যে পরিকাঠামোর দরকার হয় আমাদের দেশের তার ন্যূনতম অবকাঠামো নেই। দেশের ৪২% মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যার মধ্যে ৮৪ শতাংশ আর্বান নাগরিক। তাছাড়া ১৩৯ কোটি জনসংখ্যার ১০৫ কোটি মানুষ জানেইনা স্মার্টফোনটা খায় না গায়ে মাখে। যে দেশে প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বা আশেপাশে বসবাস করে সেখানে অনলাইন শিক্ষা সোনার পাথরবাটির বাইরে কিছু নয়।
  • অনলাইন ক্লাস ক্যাম্পাস ক্লাসের চেয়ে বেশি সময় নেয়। প্রথাগত শিক্ষার সময়সীমার মতো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। উদাহরণস্বরূপ কোনো এক ইংলিশ মিডিয়ামের ছোট বাচ্চাকে সন্ধ্যে সাতটাতেও অনলাইন ক্লাস করতে হচ্ছে।
  • অনলাইন শিক্ষাতে যেহেতু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে শারীরিক দূরত্ব থাকে, তাই প্রথাগত শিক্ষার মতো তাদের মাঝে আত্মিক যোগাযোগ গড়ে উঠে না। প্রত্যক্ষ সংযোগের অভাব পঠনপাঠনে একটা সময়ের পর অমনোযোগিতা দেখা দেয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে টেকনোলজির অপব্যবহারে শুধুমাত্র উপস্থিতি জানান দিয়ে ক্লাসে মানসিক ভাবে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা বাড়তে থাকে। বাচ্চারা ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে যাচ্ছে, সারাক্ষণ ইউটিউব সহ নানান মাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকছে, বস্তু জগতের সাথে একপ্রকার কোনও সম্পর্কই থাকছেনা।
  • প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের নিজেদের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে৷ একসাথে পাশাপাশি বসে ছোট থেকে তারা বড় হয়। তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা আত্মিক সম্পর্ক শিশুর বিকাশে সাহায্য করে। শিক্ষার্থীরা মানবিক গুণাবলী রপ্ত করে প্রাকৃতিক ভাবেই। এসব যান্ত্রিক অনলাইন শিক্ষায় সম্ভব হয় না।
  • শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার বয়সে খেলাধুলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য। অনলাইন ক্লাসের বিপুল চাপে খেলার অবসর হারিয়ে যাচ্ছে। মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।
  • অনলাইন ক্লাস বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি করে, কারণ এখানে পেশাদারিত্বই শিক্ষকের কাছে শেষ কথা।
  • অনলাইন ক্লাস মাত্রাছাড়া বেয়াড়া স্বাধীনতা দেয়, অধিকাংশ সময়েই যা ছাত্রের চরিত্র গঠনের পরিপন্থী।
  • অনলাইন ক্লাসে জন্য আপনাকে একজন সক্রিয় শিক্ষার্থী হতেই হবে। কিছু এড়িয়ে গেলে তা ছাত্রেরই যাবে, রিপিটের তেমন সুযোগ নেই। এটা কিছুটা কলেজের প্রফেসরদের লেকচারের মত।
  • অনলাইন কোর্সে কোন প্রশিক্ষক থাকে না যিনি নির্দিষ্ট ছাত্রের জন্যই লেগে থাকে।
  • অনলাইন ক্লাস একটি ছাত্রকে অনেক বেশি চাপ প্রদান করে যতটা সে সামলাতে পারেন তার চেয়ে অনেক বেশি!

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা :
করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ অচলাবস্থা চলতেই থাকছে। তার দরুন বেশ কয়েক মাস আমার কর্মক্ষত্রের সহকর্মীরা মিলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনলাইন ক্লাস শুরু করেছি, যা এখনো চলছে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটা বড় অংশ আর্থিক দিক থেকে নিম্নমানের। তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে এই কর্মসূচিতে। অনলাইন শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার মাধ্যম, যার দ্বারা শিক্ষা বাড়ি বসে পৌঁছানো হয়। আর্থ-সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শয়ে শয়ে পরিবারের মধ্যে হাতেগোনা কিছু পরিবারের কাছে এই মাধ্যম, অর্থাৎ ন্যূনতম একটা স্মার্ট ফোন ও ইন্টারনেট পরিষেবা উপলব্ধ। ফলত এই উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে বা হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়।
শিক্ষক হিসেবে প্রাথমিক ভাবে ব্যক্তিগত স্তরে নতুন ব্যবস্থার জড়তা আমাদের মধ্যেও ছিল। তা কাটিয়ে উঠে অপর দিকের শিক্ষার্থীদের দিকে হাত বাড়ালেই যে তারা খুব সহজে তা ধরে নেবে তা কিন্তু নয়। কারণ প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার মূল অনেক গভীরে। হঠাৎ করে তা উপড়ে একশ শতাংশ পরিকাঠামো থাকলেও অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার মূল অত গভীরে যাবে না সহজে। যার উপলব্ধি প্রত্যক্ষভাবে লাভ করেছি।
পরিশেষে আশা করি, এই করোনাকালকে হারিয়ে ফিরে আসুক প্রথাগত শিক্ষার পুরাতন ব্যবস্থা নতুন আঙ্গিকে। অনলাইন শিক্ষাও বিস্তার লাভ করুক সময় নিয়ে। একটি চারাগাছকে মহীরুহ হতে পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি সবদিক থেকে শৃঙ্খলাপরায়ন হতে হয়, যা প্রথাগত শিক্ষার অন্যতম সুফল।


ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...