ভালবাসা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভালবাসা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬

ইরান যুদ্ধঃ প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের এক অসম লড়াই


(১)

হিন্দ রজবকে চেনেন আপনারা? সম্ভবত না। ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’ নামের একটা সিনেমা আছে, দেখে নিতে পারেন। না চেনা অস্বাভাবিক নয়, হিন্দ রজবের নামানুসারে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হলকে ‘হিন্ডস হল’ (Hind’s Hall) নামে নামকরণ করা হয়েছে। কে এই হিন্দ রজব?

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গাজায় ইজরায়েলি হামলায় নিহত অপুষ্টিতে ভোগা ৫ বছরের এক নিরীহ ফিলিস্তিনি শিশুকন্যা, যার আর্তনাদ ও উদ্ধারের জন্য ফোনকলের অডিও আমাকে প্রতিবার কাঁদিয়ে দেয়। হিন্দ রজবের ভাষা আমি বুঝিনা, কেবল আকুতিটা বুঝি, তাই একজন সন্তানের বাবা হয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। গাজা ছেড়ে হিন্দের পরিবার যখন পালাচ্ছিল, সেই সময় ইজরায়েলি সেনারা তাদের গাড়িটিকে আক্রমণ করে। এরপর বেশ কয়েকটি ইজরায়েলি ট্যাঙ্ক ও সেনা সদস্য মিলে এক নৃশংস খেলায় মেতে উঠে, যার ভিডিও রেকর্ড করে তারা। খেলার ছলে তাড়িয়ে তাড়িয়ে গুলি করে পরিবারের সবাই খুন করে। 

গাড়িতে হিন্দ এবং তার কিশোরী দিদি লায়ান বেঁচে ছিল, যারা প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে (PRCS) ফোন করে সাহায্য চায়। প্রচণ্ড আতঙ্কে ও কান্নারত অবস্থায় হিন্দ ফোনে বলেছিল, ‘আমাকে আপনারা নিতে আসবেন? আমি খুব ভয় পাচ্ছি’। ওদের উদ্ধারের জন্য পাঠানো অ্যাম্বুলেন্সটিও ইজরায়েলি ট্যাঙ্কের গোলায় দুজন প্যারামেডিক স্টাফ সহ উড়ে যায়। অতঃপর সব চুপচাপ। ১২ দিন পর, হিন্দ, তার আত্মীয় মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, তার সাথে ফোনে রেকর্ড হয়ে থাকা, কচি গলার সেই মর্মান্তিক আর্ত বাঁচার আবেদন- ইজরায়েলি গণহত্যায় শিশু মৃত্যুর প্রতীক হচ্ছে হিন্দ রজব। এক নারকীয় উল্লাসে হিন্দের অতটুকু ছোট্ট শরীরে তারা মাত্র ৩৫০টা বুলেট গেঁথে দিয়েছিল।

হিন্দ রজবের খুনের বিচার হবে না? হবে নয়, হচ্ছে। তেল আবিব আর গাজা- ধ্বংসস্তুপ দেখে বোঝার উপায় নেই এটা কোন জাইগা। তেল আবিবের বিস্তীর্ন এলাকা, বাত ইয়াম, হোলোন, রামাত গান, বেরশেবা, হাইফা, রেহোভোট জুড়ে আজ চরম বিশৃঙ্খলা, রাজপথের সর্বত্র নাগরিক বিদ্রোহ। সর্বনাশা সাইরেন বাজলেই দৌড় দৌড় আর দৌড়ে পালিয়ে গর্তে আশ্রয়, কে জানে কার মাথায় নামে মৃত্যুর ছোবল। নেতানিয়াহুকে ঘিরে গুজব চরমে উঠেছে, মিথ্যা তথ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মতোই বিধ্বংসী। সোশ্যাল মিডিয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, ইজরায়েলি সরকার নীরব। যুদ্ধবাজদের ঘরে আজ যুদ্ধ ঢুকতেই তাদের ‘শক্তিশালী’ নেতারা অদৃশ্য হয়ে গেছে। তাদের প্রধানমন্ত্রী সহ অধিকাংশ কর্মকর্তা যেমন বেন গাভির, ইওভ গ্যালান্ট, হারজি হালেভিরা, হয় মরে গেছে অথবা পালিয়েছে। ইরানি ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রে দিশেহারা যুদ্ধোন্মাদ জায়োনিস্টরা, হিন্দ রজবের শরীরে বুলেট বেঁধানো কাপুরুষদের আজ ভূগর্ভস্থ পাতালবাসী করে দিয়েছে অদৃষ্টের পরিহাস।

পশ্চিমা সাম্রাজ্য সর্বশক্তিমান সাজার একটা মিথ্যা আখ্যান তৈরি করেছিল, আজকের বাস্তবতা এটিকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। এখানে ইরানি শৌর্যের রূপকথা লেখা হচ্ছে না, ৪৮ ঘন্টা ধরে একটা গাড়িতে বাবা মায়ের লাশের সাথে বন্দি থাকা হিন্দ রজবের ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বোবা কান্নার তীব্র শ্লেষ মাখানো ঘৃণামাখা অভিসম্পাতের চারণকাব্য আঁকা হচ্ছে। নরহত্যাকারী নেতানিয়াহু হয়তো মারা গেছে কিম্বা যায়নি, কিন্তু কাপুরুষদের সাহস মারা গেছে সন্দেহ নেই। তেল আবিবের রাস্তাগুলি খাঁ খাঁ শূন্য, মাটির নিচের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আতঙ্ক আর হিন্দ রজবের মত ১৯ হাজার ফিলিস্তিনি অবোধ শিশুর খুনিরা- দিশেহারা হয়ে ভয়াল ত্রাসকে আলিঙ্গন করে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছে। 

বিশ্ব মানচিত্র থেকে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রটা মানসিকভাবে মুছে গেছে গতবছর জুন মাসেই। প্রদীপের মতো নিভে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো জ্বলে উঠতে চেয়েছিল; কিন্তু একটু একটু করে গ্রাস হয়ে যাওয়া পূর্ণাঙ্গ ফিলিস্তিনের শেষ নায়ক- ইয়াসির আরাফাতের কবরে শ্রদ্ধা জানাতেই হোক, কিম্বা ছিটমহলের মতো টিকে থাকা একটুখানি গাজা, একটু খানি ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক অথবা গোলান উপত্যকার মানুষের বোবা কান্না মুছে দেবার দায়িত্বেই হোক, মধ্যপ্রাচ্যের নপুংশক মোল্লা রাজাগুলোর কবরের পথ প্রশস্ত করার তাগিদেই হোক, অথবা নিরপরাধ নিরীহ মানুষের রক্তঋণ শোধ করার সব দায়িত্ব একা নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে, বিশ্ব ইতিহাসকে নতুন করে লেখার তাগিদে, কয়েক হাজার বছরের পুরনো কৃষ্টি সংস্কৃতি ইতিহাস অর্থনীতি আর দেশের প্রত্যেকটি মানুষের জীবনকে বাজি রেখে, সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে দাঁড়িয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এস্পার-ওসপার নির্ণায়ক লড়াইতে অসম যুদ্ধ করছে ইরান।

ইজরায়েল নামের টিউমার রাষ্ট্রটা জন্মের পর প্রতিবেশী প্রায় সকলকে আঁচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে এসেছে ৭৭ বছর ধরে। এগুলো করতে গিয়ে তারা যখনই বিপদে পরেছে, অ্যাম্বুলেন্সের মতো সাইরেন বাজাতে বাজাতে আমেরিকা তার ন্যাটো বহর নিয়ে নির্বিচারে আসমানি বোমাবর্ষণ করে ইজরায়েলকে রক্ষা করার চেয়েও সংশ্লিষ্ট দেশটিকে ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছে। ইয়াম কিপুর আর ছয় দিনের যুদ্ধে মিশর, জর্ডান এবং সিরিয়ার বিশাল ভূখণ্ড দখল করে ইজরায়েল; প্রতিটাতে দুর্বল প্রতিপক্ষের সাথে জয়ী হয়, সৌজন্যে উপরোল্লেখিত আমেরিকা। ইতিহাসে প্রথমবার ইজরায়েলে এমন থার্ডডিগ্রি কম্বল ধোলাই খাচ্ছে, প্রতিবারের মত এবারেও আমেরিকাকে ডেকে এনেছিল ইরানকে জবাই করতে, উল্টে আমেরিকাই জীবনে প্রথমবার বেধড়ক স্যাটাভাঙা ক্যালানির সামনে দাঁড়িয়েছে। রাগে, হতাশায় উন্মত্ত হয়ে চীনের সহযোগিতা চাইছে, যাকে শায়েস্তা করতেই শেষ দু’বছর খরচা করে ফেলেছিলো ট্রাম্প। আজকে আবার বলেছে- “হয়তো আমাদের ইরানে যাওয়া একেবারেই উচিত হয়নি, কারণ আমাদের সেটার প্রয়োজন ছিলোনা। আমাদের কাছে প্রচুর তেল আছে।”

AIDS কোনো রোগ নয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা চলে যাবার লক্ষণ মাত্র, এটা সিস্টেমের পতন। এই রোগে সামান্য হাঁচি কাশি কিম্বা বাতকর্ম করতে গিয়েও স্ট্রোক হয়ে মারা যায় রোগী। সুরক্ষা বিনা লাগাতে গেলে AIDS অবশ্যম্ভাবী, আমেরিকা এই ভুলটাই করেছে, বিনা এক্সিট প্ল্যানে বিনা সুরক্ষাতে ইরানকে ঠুকে দিয়েছে। ফলাফল চোখের সামনে, আমেরিকার যাবতীয় ফাঁপানো ফোলানো পরাশক্তির মিথ, মেলার পাঁপড়ভাজা হয়ে হুড়মুড় করে ভেঙে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ইরানের এই স্যাটাভাঙা মারে হোয়াইট হাউজের প্রতিটা বক্তব্য এখন অক্সিমোরন। মিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে, সামান্য মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন, এগজহস্ট ফ্যানের ব্লেড, লেদ মেসিনে বানানো কাঠামোর ভেতরে, গন্ধক, কাঠকয়লার সাথে মেসানো সোরা দিয়ে বানানো পাতি হাউই বা ছুঁচোবাজি প্রযুক্তিতে বানানো, ঝাঁক ঝাঁক ড্রোন দিয়ে মার্কিন ঔদ্ধত্যের চামড়া খিঁচে নিচ্ছে ইরান। এভাবে আর কিছুদিন চললে ট্রাম্পের অণ্ডকোষই শেষ সম্বল হয়ে রয়ে যাবে আমেরিকার হাতে। 

ইরান হঠাৎ করে ঘুম থেকে উঠে আমেরিকাকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিগত ৩০ বছর ধরে তিল তিল করে অস্ত্র আর সাহস সঞ্চয় করেছে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখা নানান প্রতিবন্ধকতাকে টপকে। ইরান এই যুদ্ধে একবারও জেতার চেষ্টা করেছে কি? তারা যুদ্ধবাজ আমেরিকাকে হারাচ্ছে, যুদ্ধ শুধু মিসাইল দিয়ে লড়ছে না ইরান, আমেরিকার অর্থনৈতিক পাঁজরকে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে কার্ফিউ জারি রেখে রেখে। আচ্ছা, ইরানও কি জানত তারা এভাবে আমেরিকা ইজরায়েলকে একসাথে বেঁধে পেটাতে পারে? সম্ভবত তারাও জানত না আমেরিকাও আসলে কাগুজে বাঘ। এই আতঙ্কিত আমেরিকাকে সামনে থেকে পেটানো ইরান কি আর সেই আগের দুর্বল ইরানের মতো আচরন করে আমাদের ইন্ডিয়ার সাথে তথাকথিত 'বন্ধুত্ব' বজায় রাখবে? নাকি পাড়ার নতুন দাদা হিসাবে তারাও আমাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে শত্রু দেশ হিসাবে- সৌজন্যে বিশ্বগুরুর বিদেশনীতি! ক্ষমতার তো নিজস্ব পরিভাষা আছে, বাকিটা সময় জবাব দেবে আগামীতে।

ইরান কোনো এলোমেলো ভাবে এগোচ্ছেনা, অত্যন্ত অঙ্ক কষে দাবার বোর্ডের ঘোড়ার মত আড়াই চালে মাত করে দিচ্ছে। প্রতিটা মোল্লারাজাকে হারেমে থাকা তাদের বিবিদের আঁচলের খুঁটে বেঁধে রেখেছে চরম আতঙ্কের জোব্বায় ঢেকে রেখে, আমেরিকার ১টা মিত্র দেশ তাকে সাথ দেয়নি যুদ্ধে, রোজ একা ট্রাম্প আর তার যুদ্ধ মন্ত্রী খেঁকি কুত্তার মত চেঁচিয়ে যাচ্ছে। প্রথম দিন থেকে আজকের ১৬ তম দিনে, প্রতি মুহুর্তে আমেরিকার মুখ লুকাচ্ছে মিথ্যার পাহড়ের আড়ালে। সর্বক্ষণ কুৎসিত ঔদ্ধত্য দম্ভ ভরা মিডিয়া প্রেজেন্টেশন আসছে, যে- দেখো আমেরিকা আসলে কতটা শক্তিশালী, বস্তুত ন্যাংটাকেই প্রমাণ করতে হয় তার ইজ্জত অবশিষ্ট আছে। এর পরেও মিডিয়ার বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দিচ্ছে ট্রাম্প। বন্ধুপরিজন রহিত এই চরম দুরবস্থায় অবস্থায়, ট্রাম্প হয় পরমানু হামলা করবে কিম্বা কুত্তার মত লেজ গুটিয়ে পালানোর বাইরে বস্তুত কোনো তৃতীয় অপসন নেই আমেরিকার।

এপস্টিন গ্যাং ইরানের অস্ত্র ভান্ডার শেষ করতে গিয়েছিলো, উলটে তাদের অস্ত্র শেষ হয়ে বাকি দুনিয়া সেঁচে অস্ত্র জড়ো করে ইজরায়েলকে বাঁচাতে হচ্ছে। যে কটা রণতরী নিয়ে এসেছে তার অধিকাংশই বিকলাঙ্গ হয়ে গেছে, জেরাল্ড ফোর্ড ও ইউএসএস নিমিৎজ নামের আমেরিকার গৌরব, এই দুটো বিমানবাহী অত্যাধুনিক জাহাজকে লোহিত সাগরে মেরে তুবড়ে দিয়েছে। এই হচ্ছে পরাশক্তির বাস্তব অবস্থা, ওদিকে ইজরায়েলের কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। দেশের ৭০% নাগরিক পালিয়েছে, অবশিষ্ট ৩০% কে আমেরিকা মৃত্যুমুখে জিম্মি করেছে, ইরানের ক্ষেপনাস্ত্রের সামনে নিজেদের মুখ রক্ষার খাতিরে। দেশের ৪০% স্থাপনা সম্পূর্নভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়েছে। ককিয়ে কাঁদার মত শক্তি অবশিষ্ট নেই, সোস্যালমিডিয়াতে ত্রাণ ভিক্ষা করছে। 

ইজরায়েল আড়াই বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্ন হাজার হাজার টন বোমা বর্ষণ করেও হামাস শেষ করতে পারেনি, উলটে নিজেদের কিছু জনকে হামাস সাজিয়ে False Flag Operation করিয়েছে, যাতে গাজার উপরে মানবেতর হামলার পক্ষে ওজর খাড়া করতে পারে। গত ৪০ বছর ধরে চার হাজার বার ‘হিজবুল্লাহ’ খতম দাবী করা ইজরায়েলী সেনা আজও সেই হিজবুল্লাহ আতঙ্কে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বাধ্য হয়ে আজ ১৬ই মার্চ ২০২৬, লেবাননের ভূমি দখল করতে নেমেছে ইজরায়েল। আসলে এই proxy war এর মাধ্যমে আমেরিকাকে বুঝে নিতে চাইছে, স্থলযুদ্ধে ইরানের কতটা সক্ষমতা আছে। ওদিকে, হুথি বলছে বাব-আল-মান্দাব বন্ধ করে দিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে জিম্মি করে নেবে। আসলে এরা কেউ হামাস, হিজবুল্লাহ বা হুথি নয়, সবটাই ইরাণের আর্মি। যেমন আমাদের ভারতের মূল সেনা ইন্ডিয়ান আর্মি হলেও CISF, CRPF, BSF, ITBP, SSB, NSG, আসাম রাইফেলস ইত্যাদি নানা ধরণের ফ্রন্ট খুলে রাখা আছে আলাদা আলাদা এলাকার নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে; ইরানও দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় এলাকাতে বিভিন্ন ফ্রন্টে ভিন্ন ভিন্ন নামে বাহিনী রেখে দিয়েছে। তাই ইজরায়েল কখনই এগুলোকে শেষ করতে পারেনি, পারবেওনা। এপস্টিন গ্যাং ইরানের সামরিক শক্তিকে খাটো করে দেখাবার জন্য মিলিশিয়া নাম দিলেও , আজকে দিনে সবটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, এরা কি ও কেন!


 (২)

আজকের দুনিয়া বড় নির্মম আর প্রতিশোধ স্পৃহা অতি ভয়ংকর। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী রাশিয়া, চিন ও ইরানকে নিয়ে গড়ে ওঠা ত্রিভুজ এর যে অক্ষটা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে চলেছে, ব্রিকস এর ছাতার আড়ালে তারা যেকোনো মূল্যে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ পদ থেকে বিশ্বগুরুর রাজনৈতিক ধ্বংস চায়। দিল্লির বুকে একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রপ্রধানকে তারা চায়, যে আমেরিকার পোষ্য নপুংসক ক্লীব না হয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম ব্যক্তিত্বের সাথে। এটা শুধু তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষার তাগিদে নয়, বরং ভক্তরা সহ ১৪০ কোটি ভারতবাসীর প্রত্যেকের সম্মানজনক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনীতির নিরাপত্তা স্বার্থেও বিশ্বগুরুর বিসর্জনই এখন একমাত্র বিকল্প।

ফাইনান্সিয়াল টাইমস এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্স ও ইতালি বুঝতে পেরেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের অনুমতিই গুরুত্বপূর্ণ, আমেরিকা নয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড সহ বহু দেশ এখন সরাসরি ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আজ অবধি এটাকে ইরানের জন্য এটাকে বড় জয় বলা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধ ও আমেরিকাকে পাশ কাটিয়ে পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের এক বড় সুযোগ হতে চলেছে এটা। আটলান্টিকের পশ্চিম পাড়ের কানাডা, পূর্বপাড়ে ইংল্যান্ড ফ্রান্স জার্মানি স্পেন ইতালি ছাড়াও, আটলান্টিক থেকে বহু দূরে পূর্ব ইউরোপের বাল্টিক সাগর বা কাস্পিয়ান সাগরে কোলের রাষ্ট্রগুলি, এমনকি মধ্য ইউরোপের রাষ্ট্রগুলিকে অবধি ন্যাটো নামক সামরিক জোটের সদস্য করা হয়েছিলো ধীরে ধীরে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আমেরিকার সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিক্রির বাজার এটাই। 

আমেরিকার ছাতার তলায় থেকেও যদি ইসরাইল এইভাবে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তাহলে ইসরাইলের পশ্চিম দিকের ইষ্টব্লক এবং পূর্ব দিকে মধ্যপ্রাচ্য আগামীতে মার্কিন অস্ত্র কিনবে কেন? আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি অস্ত্র বিক্রি করতে না পারে তাহলে তাদের ডমিন্যান্স তাদের হেজিমনি ধরে রাখতে পারবেনা। এই কারনে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক বেস গুলো তারা ধরে রাখতে যেমন মরিয়া, তেমনই চীন রাশিয়া ব্লকও আমেরিকাকে এখানেই পুঁতে দিতে বদ্ধপরিকর। ইজরায়েলকে বাঁচাতে দুনিয়া সেঁচে অস্ত্র জড় করতে হচ্ছে, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে যেই মাত্র ‘থার’ তুলে আনছে, অমনি কিম জং উন মার্কিন সেনা ঘাঁটির কানের কাছ দিয়ে ১০টা ব্যালেস্টিক মিসাইল এর গান শুনিয়ে দিয়েছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতরে ঢুকেই রয়েছি আমরা, অফিসিয়ালি ঘোষনা তখনই হবে যখন আমেরিকা তার মিত্রদের সহ মধ্যপ্রাচ্যের মোল্লা রাজাগুলোকে যুদ্ধে সামিল করে নিতে সক্ষম হবে।

পশ্চিমা জায়োনিষ্ট প্রোপ্যাগান্ডা মিডিয়ার কাছে গোদি মিডিয়া নেহাতই দুগ্ধ পোষ্য শিশু। সেই পশ্চিমা মিডিয়া আজ অবধি আমেরিকাকে জেতাতে পারেনি ন্যারেটিভ বানিয়ে। অথচ ট্রাম্প, তার বিদেশ মন্ত্রী, যুদ্ধ মন্ত্রী, সেনাকর্তারা সকলে মিলে সমস্বরে দিনে চারবার করে শেষ ১৪ দিন ধরে দাবী করেছে- ইরান ধ্বংস হয়ে গেছে ও আমেরিকার বিজয় হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর রাডার, ইন্টারসেপ্টরকে কালী পুজোর পটকার পর্যায়ে এনে নামিয়ে দিয়েছে ইরান। ওদিকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থেকে F সিরিজে, B সিরিজ, MQ সিরিজ, A সিরিজ, EA সিরিজ, KC সিরিজ, এমনকি আর্মি কার্গো C সিরিজের বিমানকেও ভাদ্রমাসের পাকা তালের মত ঝরে পরতে দেখা যাচ্ছে অনবরত; আলজাজিরার মতে ৩১টি বিমান ঝরেছে, আমেরিকা ১৯টা স্বীকার করেছে। ১৭টি মার্কিন ফ্লাগের মার্চেন্ট নেভি ডুবে যাবার খবর হোয়াইট হাউস স্বীকার করেছে, ইরানের দাবী ৩৩ টা। ৯টা সর্বাধুনিক বিমানবাহী জঙ্গি যুদ্ধ জাহাজেরও পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হলে মিডিয়া ট্রায়াল হাস্যকর হয়ে যায়।  

পশ্চিমা মিডিয়ার আরেক চরম প্রোপ্যাগান্ডা হচ্ছে, যারা তার বিরুদ্ধে- তারাই চরম খারাপ। চিন, রাশিয়া, নর্থ কোরিয়া থেকে ইরান, কোথাও নাকি সাংবাদিক স্বাধীনতা নেই, নারীরা গৃহবন্দি। এই দেশগুলোর সব কিছুতে ভয়াবহ সেন্সরসিপ। অথচ এই যুদ্ধের সময় কি দেখা গেলো? ইরানের মাটিতে CNN আর BBC চুটিয়ে সংবাদ সংগ্রহের কাজ করছে, ওদিকে সৌদি, কুয়েত কাতার, বাহারিনের মার্কিন বেসের ছবি তুলতে গিয়ে সাংবাদিকেরা গুলি খেয়েছে, জেলে পচছে। ইজরায়েলে সাংবাদিক ঢোকা তো দূরঅস্ত, সাধারণ মানুষ অবধি মোবাইলে ছবি তুলতে গেলে তাকে জেলে ভরে দেওয়া হচ্ছে। তাদের নিজেদের হিব্রু সংবাদ মাধ্যম ছাড়া কেবল আদানি প্রভুর NDTV আর আজতককে রেখেছে ইন্ডিয়ার ভক্তদের সাথে সাথে বিশ্বজোড়া মার্কিন ভক্তদের চোখে ‘কিচ্ছু হয়নি’ ইমেজ টিকিয়ে রাখতে। ইরানের মিসাইল আঁটকাতে না পারা IDF সেনারা কেবল ভিডিও ক্যামেরা আঁটকাচ্ছে বা CCTV ভাঙছে, যাতে সুপার পাওয়ারের মার খাওয়ার ছবি, প্রকৃত মৃত্যু সংখ্যা বাইরে না যায়। এতেও হচ্ছেনা, আজকে ট্রাম্প দাবী করেছে মিডিয়া সঠিকভাবে আমেরিকা ইজরায়েলের পক্ষে বলছেনা, আসলে সোস্যালমিডিয়ার দাপটে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার মিথ্যার বেসাতিতে ত্রাহি মধুসূদন রব উঠে যেতে- তারা মাঝেমাঝে সত্যও দেখিয়ে ফেলছে, এখানেই আমেরিকার পরাশক্তি সাজা ‘শান্তিগোপালের’ পোশাক খুলে যাচ্ছে।

খামেইনির মৃত্যুর খবরে সমগ্র ফার্সি জাতি নিজেদের আভ্যন্তরীণ সকল দ্বন্দ্ব ভুলে, সিয়া-সুন্নি সহ নানান ধরনের ফিরকার ঊর্ধ্বে গিয়ে তারা এক হয়ে গেছে। নেতানিয়াহুর গায়েব হয়ে যাওয়া ও মৃত্যুর খবর চাউর করে ইজরায়েলও যে এমন কিছু একটা করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে না, সেটা কে বলতে পারে! ইরানের নকল করতে সক্ষম হলেও, ইরানের মানুষের মতো সাহস আর ইমানি জোশ কোথা থেকে আনবে দখলদারেরা? ফলত নেতানিয়াহু সত্যিই মারা যাক বা লুকিয়ে থাকুক, আজ ৮ দিন ধরে ইচ্ছাকৃত রহস্য জিইয়ে রেখেছে ইজরায়েল। অন্য আরেকটা সম্ভাবনাও রয়েছে, মৃত্যুর খবর বাইরে আসা মানেই পশ্চিমা পরাশক্তির চোখ উপড়ে নেওয়ার সামিল। তাদের সেনারা মানসিকভাবে হেরে যাবে, তাদের নেতার মৃত্যুর খবরে। এই কারনেই ক্রমাগত AI দিয়ে ভিডিও বানিয়ে ভক্তদের মুর্কখ বানানো হচ্ছে।

সমগ্র পৃথিবীতে মানবতা, শান্তি, গণতন্ত্র, নারী স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে বোমা মেরে মানুষ খুন করা পশ্চিমারা মধ্যপ্রাচ্যের মোল্লারাজাদের প্রাসাদে কখনও বোমা ফেলেনি, কারন ওই হারেম গুলোই পশ্চিমাদের পরাশক্তি সাজার ইন্ধন। অনেকেই উত্তর খুঁজে ফেরেন- কেন মোল্লা রাজাগুলো সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক, লেবাননের মুসলমানদের উপরে বোমা ফেলে? কেন মোল্লা রাজা গুলো নিজেরা বৈভবের নিকৃষ্ট প্রদর্শনে ব্যস্ত থাকলেও তারা গাজা, ইয়েমেন বা লেবাননের উদবাস্তু শিবিরে নিপীড়িত অসহায় মানুষকে নুন্যতম খাদ্য দেয়না? কেন মোল্লা রাজাগুলো আলকায়দা, আইসিস, IS এর মত জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষক? কি কারনে মোল্লারাজাগুলো জায়োনিষ্টদের সাথে আব্রাহাম চুক্তিতে গিয়ে ফিলিস্তিনি লেবাননি ইয়েমেনি শিশুদের রক্তে মাখা ভাত নিশ্চিন্তে খায়? মোল্লারাজা গুলো কেন কোনো মুসলমান দেশগুলোকে কেন রক্ষা করতে এগিয়ে আসছেনা? এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজেরা কোন্দলে জড়িয়ে পরছে।

যারা ভাবে মোল্লারাজা গুলো আসলে আমেরিকার দালাল, তারা গোড়ায় ভুল করছেন; এরা ব্রিটেন ও আমেরিকারই নপুংসক সন্তান। এদের নিজস্ব কোনো চিন্তাভাবনা নেই, শারীরিক আর মানসিক খিদে মেটানো জঘন্য পশু এরা। এদের জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যই খুব নির্দিষ্ট ছিলো- আজকের এই অত্যাচারকে মঞ্চস্থ করা, নৃশংস খুনিদের পৃষ্ঠপোষকতা করার মাধ্যমে আরব মুলুকের সম্পদকে যাতে পশ্চিমা শয়তানের দলেরা কুক্ষিগত করতে পারে। যারা নবী(সাঃ) এর দেশ, পবিত্র হজ্বের ভূমি বলে কেঁদে গাঁ মাথায় করছেন, তারা নবীর(সাঃ) দেশের বর্তমান জালিম শাসকের ইতিহাস আর অপকর্ম বিষয়ে চোখ নাক কান বন্ধ করে রেখে শুধু ফতোয়া দেয়। শেষ দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে, মধ্যপ্রাচ্য গত শতাব্দি অবধি কোনো না কোনো সাম্রাজ্য অথবা খিলাফতের অধীনে ছিলো, রাষ্ট্র হিসাবে এদের কখনও কোনো অস্তিত্ব ছিলোনা। আজকের আকারে যে দেশগুলো দেখছেন, এদের জন্মই দিয়েছে ইংল্যান্ড আর আমেরিকার ‘লরেন্স অফ আরাবিয়া’ জায়োনিস্টরা, গত শতাব্দীর তিনের দশকের আশেপাশে, একটা দেশেরও বয়স ১০০ বছর নয়। যে দেশগুলোর জন্ম জায়োনিস্টদের গর্ভে, কীভাবে তারা আমেরিকা ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যাবে?

গোটা বিশ্বজুড়ে একশ্রেণির মানুষ আবার ভয়াবহ হতাশার মাঝে ডুবে যাচ্ছে রোজ, ইরান কেন এখনও আত্মসমর্পন করেনি এই দেখে তারা স্থবির বাকরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এরা যে কেউ ইরানের ঘোর বিরোধী তেমনটা হয়, আবার চরম ইজরায়েল প্রেমীও নয়। কিন্তু এরা ভয়ানকভাবে আমেরিকান ড্রিমে বিশ্বাসী, পৃথিবীতে যদি সত্য বলে কিছু থাকে সেটা ‘সুপার পাওয়ার’ আমেরিকা। বিষয়টা আর কিছু নয়, মাসল মেমোরির সাথে বাস্তব যখন খাপে খাপে মিলছে না, অমনি এদের মাইগ্রেন শুরু হয়ে যাচ্ছে। এতদিন ধরে লালন করা পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা জনিত বিশ্বাসে এরা আমেরিকার উপরে ঐশ্বরিকত্ব আরোপ করে ফেলেছেন। মাইটি আমেরিকাকে এভাবে মার খেতে দেখে যুদ্ধ শুরুর প্রথম ৩ দিন চরম অবিশ্বাসে আয়না অবধি দেখেনি এরা, নিজের প্রতি ঘৃণায়। এরপর সেটা হজম হোক বা না হোক, গিলে নিলেও এখন চরম বিভ্রমে ফেঁসে রয়েছে। একটা বিশ্বাসে রোজ ঘুমাতে যাচ্ছে- কালকে ঠিক ইরান হেরে যাবে, আমেরিকান হেজিমনি আবার প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে। চোখের সামনে সত্যকে দেখতে পেলেও বিশ্বাসকে টোল খাওয়াতে নারাজ, এরা মিরাকেলের প্রত্যাশাতে রয়েছে, একমাত্র অন্ধ বিশ্বাসের বাইরে যার কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। 

ফারিস উদেহ, একটা ফিলিস্তিনি কিশোর। সমগ্র বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিরোধের মুখ এই কিশোরটি, যে সর্বাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত একটা ইজরায়েলি ট্যাঙ্কের সামনে সামান্য একটা মাটির ঢিল হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিল। কারণ তার খেলার সাথী খুড়তুতো ভাইকে ঘুমন্ত অবস্থায় ‘বাকিদের ভয় দেখাতে’ হত্যা করেছিল এই জায়নবাদি দখলদার বাহিনী। যে বয়সে রঙিন মাছ, মুনিয়া পাখি কিম্বা খরগোস পোষে সমস্ত পৃথিবী, যে বয়সে কোনো এক কিশোরীকে দেখে প্রথম প্রেমের অব্যক্ত রঙিন স্বপ্ন আঁকে, সদ্য গজানো গোঁফের রেখা নিয়ে স্কুল জীবনের বড় পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেয়, ক্রিকেট ফুটবল ভিডিও গেমসে বুঁদ থাকার বয়স যেটা- নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ফারিস ওই বয়সে এক আসামঞ্জস্য প্রতিরোধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, চরম ক্ষমতাবানের ঔদ্ধত্য, দম্ভ আর উন্মত্ততার সামনে। ফারিস জানত তার হাতের মাটির ঢিলে ওই শক্তিশালী ট্যাঙ্কের লোহার বর্মের শরীরে একটা আঁচড় অবধি কাটবে না, ফারিসেরা জানে তারা মৃত্যু থেকে মাত্র একটা বুলেট দূরে, যেকোনো মুহূর্তে দখলদারেরা তাকে হত্যা করে উল্লাস উদযাপন করবে। তাও তারা হাতের ঢিল নিয়েই রুখে দাঁড়ায়, লক্ষ দিন লক্ষ ফারিসের দল মরতে মরতে একদিন ঠিক তার উত্তরাধিকার প্রাপ্ত কেউ জিতে যুদ্ধে জিতে যায় কয়েকযুগ বা কয়েক শতাব্দী পর। প্রসঙ্গত, ইজরায়েলি সেনা ফারিসের গলায় গুলি করে হত্যা করেছিল। 

এটা লক্ষ লক্ষ শহীদ ফারিসদের প্রতিরোধের উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যুদ্ধ। এটা ফারিস উদেহদের জীবন উৎসর্গ করা প্রতিরোধের যুদ্ধ, সামান্য সক্ষমতা দিয়ে সাহস, আত্মবিশ্বাস দিয়ে শৌর্যবীর্যের লড়াই এটা। সেই মহাশক্তিধর নরপিশাচ কাপুরুষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, যারা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ কিশোরকে হত্যা করেছে, তাদের নিজস্ব ভূমির সম্পদ লুঠ করতে। এটা প্রতিশোধ নেওয়ার লড়াই, হিন্দ রজবের মতো দুই লক্ষ শিশুদের যারা বুলেট আর বোমার আঘাতে গত ৮০ বছর ধরে খুন করেছে, লাতিন আমেরিকা থেকে আফ্রিকা হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে, এশিয়ার অন্যান্য দেশে; সেই সকল নিষ্পাপ শিশুদের তরফে প্রতিশোধ নেওয়া পতাকাটার নাম আজ- হিন্দ রজব। 

এটা যুদ্ধক্ষেত্র, এখানে একমাত্র নিশ্চিয়তা হলো অনিশ্চয়তা। এটা কেবল ইরান আমেরিকার যুদ্ধ নয়, এটা প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের যুদ্ধ। এটা গাজার অপুষ্টিতে ভোগা নিরস্ত্র অবোধ শিশুটিকে ট্যাঙ্ক দিয়ে পিষে দেওয়া নয়, এটা সত্যিকারের যুদ্ধ। এটা সেটলার হয়ে গরিব ফিলিস্তিনি লেবানিজের বাড়িটা বন্দুকের ডগায় দখল করে নেওয়া নয়, এটা সেয়ানে সেয়ানে যুদ্ধ। এটা টিভিতে দেখা যুদ্ধের খবর নামের এন্টারটেনমেন্ট নয়, রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতীকী যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের আদুরে আলাপ নয়, এটা রক্তের বন্য বইয়ে দেওয়া যুদ্ধ, রক্তের বদলা হিসাবে রক্তাক্ত করার যুদ্ধ। শোষনের বিরুদ্ধে, বঞ্চনার বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ভন্ডামির বিরুদ্ধে, উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এটা গুজবের প্রহেলিকা, এটা ভয়ের সাম্রাজ্যকে ছারখার করে দেওয়ার যুদ্ধ। এটা যুদ্ধ, এটা পাপের শাস্তি, এটা ঔদ্ধত্যের সমাধি, এটা ভবিষ্যতকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তি দেওয়ার যুদ্ধ। 

বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫

দাম্পত্য কলহঃ নেপথ্যে

 

কলহ

আমদের ব্যাক্তি জীবনে প্রত্যেকের নিজ নিজ নীতি ও আদর্শ রয়েছে। সৎ মানুষের সৎ নীতি, সৎ আদর্শ; অসৎ এর তার নিজের মত করে, নীতিহীনের আদর্শ দুর্নীতি- ক্ষ্যাপা ছাড়া প্রত্যেকে আমরা আদর্শের উপরে মোটামুটি অটল থাকি। এরপর রোজ জীবনে বহু ঝড়ঝাপটা আসে, রোজকার লড়াই নিজের নিজের মত করে নিজ নিজ পরিসরে লড়তে হয়। বহু ভাবে আমরা আদর্শচ্যুত হই রোজ, আপস করি, দ্বন্দে ও ধন্দে পরে নিজেকে দুমড়ে মুচরে নিত্য ভাঙাগড়া করে নিই- বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। জীবন খরস্রোতা নদীর মত, পরিকল্পনার ধার ধারে না। তাই দৈনিক কিছু সমস্যা অযাচিতভাবে উদয় হয়। তবে মনের অন্দরে ‘আমি একলা’ অনুভূতি ঢুকে গেলে, যাবতীয় সম্পর্কের চেনা পরিসরটাও অচেনা লাগা শুরু হয়। ক্রমশ চির চেনা ‘আমি’র সাথেই দুরত্ব বাড়তে থাকে

বাচ্চা বয়সে যত দ্রুত শিখি আমরা, ভুলেও যায় তত দ্রুতই। সাইকেল চালানো বা সাঁতারের মত কিছু অভ্যাস ব্যাতিরেকে বাকি সমস্ত শিক্ষাকে নিয়মিত অনুশীলন না করলে ভুলতে বেশী সময় নেয়না আমাদের মস্তিষ্ক। সামাজিক ও সম্পর্কের জটিল বিষয়গুলো উন্মত্ত যৌবনে আমাদের মাথার উপর দিয়ে বয়ে যায়, কিন্তু আমাদের এই চল্লিশের কোটার বয়সটা বড্ড দুর্বোধ্য, কে ঠকাচ্ছে, কোনটা রহস্যময়, কোনটা ছলনা, কোনটা অস্পষ্ট, কোনটা ইচ্ছাকৃত পর্দাটানা হয়েছে, এই সকল নিগূঢ় বিষয় গুলো মস্তিষ্ক ধরে ফেলে। ধরে ফেলার পর বিশ্লেষণ করে একটা সিদ্ধান্তেও এসে পৌঁছে যায়, সমস্যা হলো স্পষ্টভাবে মনের সেই ভাবকে প্রকাশ করতে পারিনা। একটা সামাজিক সংশয়, চক্ষুলজ্জা জনিত কুন্ঠা, সম্ভাব্য অস্থিরসঙ্কল্পতা, মানসিক অনিশ্চয়তা- স্পষ্টবাদী হতে নিবৃত্ত করে আমাদের।

তাই চোখের সামনে গোটাগোটা মিথ্যাচার, মোটাদাগের ছলনাময় মৈত্রী বা অনুরক্তি, কৌশলগত কথোপকথন, এর সাথে নির্লজ্জ ও বেহায়ার মত একটা ব্যবধানের সীমারেখা টেনে নেওয়াকে আমরা কেবল সহ্য করে নিই। অসহনীয় হয়েছো মানেই ধরণী পপাত চ। সমস্যা তার বেশী হয়, যে নিজে থেকে আগ্রহী হয়ে সম্পর্কের ছিঁড়ে যাওয়া তন্ত্রীটিকে আবার গিঁট বেঁধেছিল। সে না পারে কইতে, না পারে সইতে। এক দমবন্ধ প্রেসারকুকার পরিস্থিতি জীবনের স্বাভাবিক স্বস্তি কেড়ে নেয়

কেন হয় এই অশান্তি?

মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলে, প্রায় ৭০% দাম্পত্য কলহের পেছনে সরাসরি দায়ী ভুল যোগাযোগ বা যোগাযোগের অভাব। কী বলছি, কী বলতে চাইছি তার মধ্যে আকাশ পাতালের ফারাক। মন দিয়ে শুনতেই চায়না কে কী বলছে, ফলত অধিকাংশটাই অনুমান করে নিতে হয়। বহু দাম্পত্যে যখন তারা একত্রে বসার সময় ও সুযোগ পায় পৃথিবীর সমস্ত কাজ ও দায় মিটিয়ে, তখন সেই মুহুর্তেও কেউ অফিসের কাজে, ফোন ঘাঁটতে বা বই পড়তে ব্যস্ত হয়ে যায়, কেউ কেউ আবার ঘুমিয়ে যায় অদ্ভুতভাবে। এরপর যখন সোহাগ ভালবাসার প্রশ্ন আসে, কথা মন দিয়ে শোনা তো অনেক দূর- সম্ভাষণেই রাগে ফেটে পড়ি। সামান্য ভুলগুলো, যেগুলো আসলেই পাতি গুরুত্বহীন, সেই বিষয় গুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে দিন রাত ঝগড়া অশান্তি নিত্যকার চিত্র হয়ে উঠে। আমাদের দম্ভ, জেদ, অহংকার ভুলিয়ে দেয় যে- স্পষ্ট, সরল ও সময়োপযোগী যোগাযোগই ভুল বোঝাবুঝির প্রাথমিক প্রতিষেধক

এর সাথে থাকে অতীতের আঘাত ও অবিশ্বাস, যে ক্ষত পুরোপুরি শুকায় না, ফলত বারবার ফিরে আসে। নতুন প্রতিটি ঘটনাকে পুরাতন চশমা দিয়ে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়, সামান্য নির্বিরোধী নির্দোষ আচরণও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অবিশ্বাসের পরিবেশে অশান্তির ছত্রাক নিজের স্বাধীনতায় কলেবরে বৃদ্ধি পায়। এই দুরত্ব ক্রমশ একে অপরের কাছে অভিব্যক্তি প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করে, কিম্বা প্রকাশ করলেও সেটা ভুল পদ্ধতিতেই করে। ফলত নিজের কষ্ট, অভিমান, চাহিদাগুলো জমতে জমতে হঠাৎ কোনও তুচ্ছ ঘটনার মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয়। এই রাগ বা কষ্ট প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে চিৎকার, খিস্তিখেউর জন্ম দেয়

বাজারে সামান্য বেগুন কিনতে গেলে টিপেটাপে দেখে বুঝে কিনি, কিন্তু যখন প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে আমরা জীবন সঙ্গী নির্বাচন করি, যার সাথে গোটা জীবন কাটায় আমরা- সেখানে তেমন বাছবিচার করিইনা একপ্রকার। অথচ জীবনের সবচেয়ে কাঠিন ও জটিল এই অধ্যায়ে প্রবেশ করার জন্য ভাবা উচিৎ ছিলো। বরং বলতে পারা যায় যে আমরা ঝাঁপ দিই- কিছু না শিখে, না জেনে এবং না বুঝে একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায়। ফলত, সর্বপ্রথম মন ভেঙে যায়, এই পথ বেয়ে অর্ধেকের ঘর ভেঙ্গে যায়, বাকিদের ঘর হয়ত টিকে যায়, কিন্তু শান্তি নেই হয়ে যায়। এই কারণেই সংসারে থেকেও অনেকেই একাকিত্বে ভুগতে থাকেন। এটা এমন একটা সমস্যার ফাঁদ, না কাউকে বলা যায় আবার সহ্যও করা যায়না

জীবন রুটিন মেনে চলেনা, সে তার নিজস্ব ছন্দে চলে। যেখানে দুটো আলাদা আলাদা মানুষকে উভয়ের সাথে তাল মিলিয়ে একটা ‘কমন’ ছন্দ বানাতে হয়, সেখানে উভয়কেই কিছু ছাড়তে হয়, কিছু ধরতে হয়। পরিস্থিতি কখনো কখনো এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, এই সম্পর্কের কুম্ভীপাকে আর সব বাস্তবতাই মনে হয় তুচ্ছ। সর্বক্ষণ এক অদৃশ্য পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মোকাবিলা করাই তখন জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে উত্তরপত্রে নির্দিষ্ট জবাব লিখলে সফলতা মেলেনা, লিখতে লিখতে বারবার সময়ের পাতা উল্টে অতীতের সাথে বর্তমানকে মিলিয়ে, ভবিষ্যৎ কল্পনা করে করে উত্তর লিখে যেতে হয়। সময় প্রতি মুহুর্তে বদলে যাচ্ছে, তার সাথে বদলাচ্ছে বাস্তবতা, সেই মত একই প্রশ্নের শত সহস্র উত্তর তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সেই জবাবকে সময়মত ধরতে না পারলেই ব্যর্থতা চিরসঙ্গী। এভাবেই একসময় সময় পেরিয়ে যায়, সব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকা সত্ত্বেও ঠিকভাবে লিখতে না পারার ব্যার্থতা- জীবনকে কঠিন করে তোলে

আসলে আমরা সুস্থ থাকার লোভের ফাঁদে পরে, স্থিতিশীল জীবনকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলি। একা থাকার নানা অসুবিধা আছে, কিন্তু সুবিধা হচ্ছে দায় নিতে হয়না, জবাবদিহি নেই, বাধ্যবাধকতা নেই। এখানে এসেই স্বেচ্ছাচার আর স্বাধীনতার সুক্ষ ফারাক টুকু ঘুঁচে যায়। ভেতরে জমে রয়ে যায় কঠিন নীরবতা। ছোট্ট একটি কথার জের, কাজের বাহানাতে উপেক্ষা করা একটি ফোনকল বা মেসেজ, অজান্তে বা অনিচ্ছাকৃত করা কোনও মন্তব্য– এগুলোই সমস্যা তৈরি করে দুজনের মাঝখানে। প্রতিটি জীবনের নিজস্ব গতির ছন্দ রয়েছে, কিন্তু একটা নিভৃত পরিবারেরও রয়েছে নানা প্রত্যাশার চাহিদা। এই তাল মেলাতে গিয়েই অশান্তি আমাদের নিত্যসঙ্গী। এতে সম্পর্কের ভিতটা যেমন টলমল হয়ে যায়, তেমনই উষ্ণতাও ক্রমশ মিইয়ে যায়। তখন পরে থাকে কিছু তাত্ত্বিক কচকচি, আর বাস্তব জীবনে প্রয়োগের অনুপযোগী কিছু হারানো স্নিগ্ধতা

জীবনের এই বাঁকে এসে দাম্পত্য বিষয়টি সমস্যার পর্যায়ে চলে যায়, অকারনে আমাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা এবং হতাশার উপসর্গ দেখা দেয়। অস্থিরতা বোধ নিত্য সঙ্গী হয়ে যায়, দুশ্চিন্তার মুহূর্তে হাত-পা ঘামতে থাকা, বুক ধড়ফড় করা আমাদের ভয়াবহ হতাশায় ডুবিয়ে দিয়ে বিষণ্ন করে তোলে। আমাদের খাবারে রুচি কমে যায়, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, বহুলাংশে নিজেকে বন্দি বানিয়ে ফেলি, অসামাজিক হয়ে যায়, ফলত নানা ধরণের ক্রনিক অসুস্থতার উপসর্গ দেখা দেয়। যা সত্যিকারের অসুস্থ করে তোলে

এক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী আদর্শলিপি মানা সমাধান নেই। হয় ভোগ করে যেতে হবে, মন্থনে একদিন অমৃত উঠবে- এই আশাতে নীলকণ্ঠ হয়ে অবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিয়ে পদ্মপাতার মত পাঁকে থেকেও জলস্পর্শ না করে টিকে থাকতে হয়। অথবা সর্বত্যাগী হয়ে একা-বোকা ঋষি সুলভ সন্ন্যাস জীবনে জ্ঞানার্জনের পিছনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। দুটোই কঠিন, কিন্তু তৃতীয় কোনো উইন-উইন সমাধান কিছু নেই

মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৫

অকপট চড়ুইভাতি ২০২৫


 ১৬শ শতাব্দীর শেষভাগ, দিল্লির মসনদে তখন প্রতাপশালী মুঘল- সম্রাট আকবর। 


দিল্লীশ্বর, বাংলা-বিহারের শাসনকর্তা হিসেবে উড়িষ্যা দখল করতে নির্দেশ দিলেন অম্বররাজ মানসিংহকে। মহারাজ মানসিংহ তার সুপুত্র জগৎসিংহকে এই কাজে নিয়োজিত করেন। সুদক্ষ যোদ্ধা রাজপুতবীর জগৎসিংহ বার বার সামরিক আক্রমণ করে পাঠানদের অতিষ্ট করে তোলে। এরকম সময়েই একদিন জগৎসিংহের সাথে স্থানীয় ভূস্বামী বিরেন্দ্র সিংহের একমাত্র ষোড়শী কন্যা, সুন্দরী তিলোত্তমার সাক্ষাৎ হয় শৈলেশ্বরের মন্দিরে। নিজের অজান্তেই উভয়ে একে অপরের প্রেমে পড়েন। উড়িষ্যা-অধিকারী পাঠানেরা মান্দারণ অঞ্চলের জমিদার বাড়ি লুট করতে এসে সস্ত্রীক জমিদার ও তার কন্যাকে বন্দী করে নিয়ে যায়। রাজপুতবীর কুমার জয়সিংহ তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পাঠানদের হাতে বন্দী হলেন।

চেনা গল্প তো! ঠিকিই ধরেছেন, এটা বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের পটভূমি। বাংলা সাহিত্যের জয়ঢাক বাজিয়ে জন্ম নেওয়া ‘দুর্গেশনন্দিনী’ মুঘল-পাঠান দ্বন্দ্বকে ভিত্তি করে, ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমিতে রচিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম বাংলা উপন্যাস, মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৮৬৫ সালে এটি প্রকাশিত হতেই, বাংলা গদ্য সাহিত্যে বিপ্লব ঘটায়। ব্যক্তি-আগ্রাসী সামন্তসমাজ, ব্যক্তি হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা ও ক্রন্দন, আবিষ্কারের ঐকান্তিকতা, বাংলা উপন্যাসের বৃহত্তর জীবনমুখী পটভূমিকে চিনতে বা জানতে ইচ্ছা যায়না? রোম্যান্সমধুর রহস্যলোক, ইতিহাসের স্বপ্নাবেশ আর আদর্শায়িত ব্যক্তি ও সমাজকেন্দ্রিকতা যে মাটিকে আবর্ত করে গড়ে উঠেছিলো, তাকে ছুঁয়ে দেখায় বাসনা যায়না? 

বাংলার আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক আবর্ত-সংঘাতে ঘূর্ণমান ও বিচূর্ণ-ভগ্ন মূল্যবোধ রূপায়ণের ঐকান্তিকতা এবং সমসাময়িক জীবনের চলমান বহির্বাস্তবতা অঙ্কনের অলক্ষ্য স্থান, আজ তার কিছুই রক্ষা করতে পারেনি কিছু ভাঙা ইট পাথর ব্যাতিত। ২০১৬ তে আমরা শরৎচন্দ্রের পানিত্রাসের ভিটেকে ছুঁতে পাওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছিলাম অকপট চড়ুইভাতির সৌজন্যে, সেখানে বঙ্কিমের সৃষ্টি সুখের গড়কে ছুঁয়ে দেখার একটা সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়! অনিশ্চয়তার এই তো জীবন, আজ আছি কাল নেই। অকপটেই বা সেই ২০১৬ এর কতজন টিকে আছি আজ ১০ বছর পর ২০২৫ এ এসে, জীবন নদীতে সময়ের স্রোত বয়েই চলেছে, নতুন জলের ধারায় কতজন হারিয়ে গেছে, আবার কত নতুন প্রাণেরা এসে ধরা দিয়েছে, এটাই জীবনের নিয়তি। তার আগে যেটুকু সুযোগ আসে, দেখে যায় প্রাণ ভরে।

বঙ্কিমের ‘দুর্গেশনন্দিনী’র সৃষ্টি সুখের গড়, সত্যিকারের গড়, নাম- গড় মন্দারণ। হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমার, গোঘাট ব্লকে অবস্থিত এই গড় মন্দারণ। দ্বারকেশ্বর নদ ও শিলাবতী নদীর মধ্যবর্তী তরঙ্গায়িত পললমাটির ওপর মন্দারণ দূর্গটি আজ আর নেই, সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে, রয়ে গেছে ইতিহাস। আজও মাটি খুঁড়লে সেই আমলের অস্তিত্ব মেলে যত্রতত্র। কে জানে কোন পথে ঘোড়া হাঁটিয়ে ছিলো দুর্গাধিপতি জয়ধর সিংহ, কোথায় রয়েছে রূপসী তিলোত্তমার হাতের ছোঁয়া, কোথায় ই বা সেই শৈলেশ্বর মহাদেবের মন্দির- কে জানে! নবাবজাদী আয়েষার অতৃপ্ত আত্মা হয়ত আজও খুঁজে ফেরে কুমার জগৎ সিংহকে।

গড় মান্দারণের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অসাধারণ, কাছেই বয়ে চলেছে আমোদর নদ। হুগলি ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সীমানায় এই গড় মান্দারন, হুগলির অন্যতম বনাঞ্চল চাঁদুর ফরেস্ট এখানেই অবস্থিত। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্মভূমি কামারপুকুর থেকে গড় মান্দারণে দূরত্ব মাত্র ৩ কিলোমিটার। নির্জনতা যাঁদের ভাল লাগে, এই জায়গা তাঁদের ভারি পছন্দ হওয়ার কথা। নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশে মাঝেমাঝে বয়ে চলা বাতাসের শন শন শব্দ আপনার শহুরে ক্লান্তি দূর করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে প্রায় ২০০ একর জমির উপরে গড়ে উঠেছে গড় মান্দারণ পর্যটন কেন্দ্র। কথিত রয়েছে গৌড়ের অধিপতি হুসেন শাহের সেনাপতির সমাধি রয়েছে এখানে, যা দরগা নামে পরিচিত। চুড়ুইভাতিতে আসার নামে শ্রীরামকৃষ্ণের ভিটেকে চোখে দেখা বোনাস প্রাপ্তির মতই সুখকর।

শাল, শিমুল, পিয়াল, সেগুন দিয়ে ঘেরা গড় মান্দারণের জঙ্গলে একটা দিন হৈহৈ করে জীবনকে উদযাপন করতে আসবেন নাকি! বাকি সব কিছু ভুলে যান, গড় মান্দারণের প্রকৃতি এখানে জীবন্ত ইজেল, রং-তুলি দিয়ে ক্যানভাসে আঁকা ছবি। অদ্ভুত শান্তি মিশে রয়েছে এখানকার বাতাসে, পাখির কলতান, গাছেদের ফিসফাস আর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে মিশে থাকা মাদকতায়। চড়ুইভাতি সেরে কামারপুকুর বা জয়রামবাটীতে একটা রাত থেকে যেতেই পারেন, শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদাময়ীয় স্মৃতি বিজড়িত স্থানের আধ্যাত্মিকতা ও ইতিহাস ছাড়াও এখানে গ্রামের সবুজ পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে। মঠ ও মিশনের শান্ত–সুন্দর পল্লী পরিবেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামের ইতিহাসের উপাদানগুলির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া একটা উপরি পাওনা বৈকি।

হাওড়া থেকে গোঘাট বা আরামবাগ গামী লোকাল ট্রেন ধরে খুব সহজে পৌঁছে যাওয়া যায় গড় মন্দারণ। সকালে হাওড়া স্টেশন থেকে ৭টা ২৫ এর গোঘাট লোকালটা বেস্ট। এছাড়া শ্যাওড়াফুলি থেকে ট্রেনে তারকেশ্বর-আরামবাগ হয়ে ভায়া কামারপুকুর, গড় মন্দারণ যাবার বিবিধ উপায় রয়েছে। কেউ যদি উত্তরের দূরবর্তী জেলা থেকে আসেন, কামরূপ এক্সপ্রেসে চড়ে পড়াটা বেষ্ট। মধ্যবঙ্গ থেকে এলে হাটেবাজারে এক্সপ্রেসে রাত ১২টার আশেপাশে চড়ে বসলে সকাল ৫টার আগেই হাওড়া পৌঁছে যাবেন। উত্তর চব্বিশ পরগণা বা নদীয়া থেকে এলে ব্যারাকপুর ফেরিতে মাত্র ৬ টাকায় গঙ্গা পার হয়ে শ্যাওড়াফুলি ঘাট, সেখান থেকে ২ মিনিটে শ্যাওড়াফুলি রেল স্টেশন। বাসে কিম্বা গাড়িতে চড়ে কামারপুকুর হয়ে পৌঁছে যাওয়াটা কোনো ব্যাপারই নয়। মেদিনীপুর শহর, খড়্গপুর, পাশকুড়া, চন্দ্রকোণা রোড, উলুবেড়িয়া, বাগনান, বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, বর্ধমান, মেমারি, নবদ্বীপ থেকে প্রচুর বাস রয়েছে ঘন্টায় ঘন্টায়, যাগুলো সরাসরি কামারপুকুরে পৌঁছে দেবে আপনাকে। সেখান থেকে অহরহ টোটো পাওয়া যায় পিকনিক স্পটে পৌঁছাবার জন্য। 

সকালে পাকোড়া আর চা/কপি, ব্যাস। এর বেশী খেলে মধ্যহ্নভোজে, পাকস্থলী আহত হতে পারে খাসির মাংসকে যথাযথ স্থান না দিতে পেরে। এরপর তুমুল আড্ডার ফাঁকে ততক্ষণে সাদা ভাত, সোনা মুগের ডাল, ঝুড়ি আলুভাজা, বাঁধাকপি দিয়ে মটরশুটির ঘন্ট, চাটনি, পাঁপড় আর রাজভোগ- পাতের সৌন্দর্য বর্ধন করার জন্য এগুলো প্রস্তুত হয়ে যাবে কষা কষা ঝাল ঝাল খাসির মাংসের সাথে। পার্কের এ্যান্ট্রি ফি, পিকনিক স্পটের ভাড়া, হাঁড়িকুড়ি ভাড়া, খাওয়ার প্লেট গ্লাস, রান্নার গ্যাস, বোতল বন্দি পানীয় জল, মাংস, মসলা, চাল সবজি, ঠাকুর চাকর, ইত্যাদি সব মিলিয়ে মাথাপিছু মাত্র ৬০০ টাকা করে চাঁদা ধার্য্য করেছি। ১০ বছরের নিচের বাচ্চা কমপ্লিমেন্টারি, তার উপরে আমরা সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক। এই হলো দেনাপাওনার গল্প।

আমাদের আয়োজন ৫০ জনের অধিক নয়, ৪০ এর আশেপাশে হলে সবথেকে ভালো। অধিক ভিড়ে আলাপের মাদকতা নষ্ট হয়, তাছাড়া আয়োজনেও কিছুটা অপারগতা রয়েছে। তাই আপনাকে নিয়েই যদি সংখ্যাটা পূরণ হয়ে যায়, তার চেয়ে ভালো আর কিচ্ছুটি হয়না। তাহলে, আসছেন নাকি আগামী ২১শে ডিসেম্বর ২০২৫ এর দুপুরে গড় মন্দারণে? কিছুটা ইতিহাস, কিছুটা আধ্যাত্মিকতা, কিছুটা সাহিত্যের গন্ধ গায়ে মেখে, অকপট চড়ুইভাতির নামে আসবেন নাকি একটা দিনের অবসরে?


বুধবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৫

দেশবন্ধু

দেশবন্ধু 

সকালের বদলে আজ বাজারে বের হতে বেলা ৯টা বেজে গিয়েছিলো। আমাদের এলাকাতে শীত না পরলেও, AC আপাতত লম্বা ছুটিতে গেছে, আজই ভোরে ফ্যানও বন্ধ করে দিয়ে হয়েছিল উত্তুরে হাওয়ার শিরশিরানির দাপটে। বাজারে নতুন মরসুমি সব্জির সাথে কাঁচা তেঁতুল, চালতা এমনকি কাঁচা আমও রয়েছে। সাথে আমলকি, জলপাই, পেঁয়াজকলি, সার হীন দিশি মুলো, দিশি পালং ও শিমের ভালো আমদানি রয়েছে। দীঘার ইলিশ ১৪০০, গঙ্গার তাজা চিংড়ি- সেও ৭০০ টাকা কেজি। পাবদা, ভোলা, ভেটকি, পার্শে, দিশি পোনা, পাঙাস, রূপচাঁদা, লোটে, সিলভারকার্প, পমফ্রেট সহ চালানি ও সামুদ্রিক মাছের বহরে সারা বাজার থইথই কছে।

কিছু বারোভেজালি ছোট মাছ নিতেই হয় মায়ের বাটি চচ্চরি জন্য, বাবার জন্য বরাদ্দ তাজা দিশি পোনা, ওনার আবার না ভেজে কাঁচা মাছের ঝোল প্রিয়। আমার জন্য বাটা, রিটা, আর পাবদা মাস্ট। শশা, কাঁকুড়, কাঁঠালি কলা, ডাঁসা পেয়ারা সহ প্যাকেটের দুধ, দই, লেড়ো বিস্কুট ইত্যাদি নিয়ে, হাড়কাটা গলির সামনে ওই ভিড়ে টোটোর জন্য প্রতীক্ষা করছি। ভারি ৩টে ব্যাগ নিয়ে রাস্তা পার হওয়াই মুশকিল, জ্যোতি আর চন্দ্রমূখী মিলিয়ে আলুই ৭ কেজি। একটা টোটো এসে দাঁড়ালো, বিবিরহাট বলাতে সে সটান না বলে, সামনে ২০ মিটার মত এগিয়ে গিয়েও আমাকে নাম ধরে ও হাতের ইশারাতে ডাকতে লাগল।

আসলে আমি যেদিকে যাব, সেই রাস্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, চলতি টোটোকে ইউটার্ণ নিয়ে ঘুরে যেতে হবে। বাইক নিয়ে আসিনা, ভিড়ে পার্কিং করা মহাঝক্কি। ৭-৮ দিনের সব্জি আর আনাজপাতির ব্যাগ লটবহর আড়েবহরে কম হয়না মোটেও, সাধারণনত টোটোতে ২টো সিটের ভাড়াই আমি গুনি। সেই টোটোওয়ালা নিজেই এসে দু’হাতে দুটো ব্যাগ তুলে নিলো, আমি একটা ব্যাগ নিয়ে তার পিছুপিছু গিয়ে গাড়িতে চড়ে বললাম, একজন প্যেসেঞ্জার ইতিমধ্যেই রয়েছে। বললাম, চলো আরো ১০টাকা বেশী নিও না’হয়। টোটো চালক অদ্ভুত হাসি হাসি মুখ করে বললো- তুমি তন্ময়ই তো, আমাকে চিনতে পারোনি! আমি সেই দেশবন্ধু।

এমনিতেই মাথায় হাাজার ফিৎনা, এই মাসেই ৩টে মামলার ডেট আছে, যে কারনে পাহাড়ে উঠতে পারিনি। ফেসবুক ইউটিউবে এ্যাড ক্যাম্পেইন চলছে ট্রাভেল এজেন্সির, ফোনগুলো ভয়েস কল আর মেসেজে গিজগিজ করছে। বাবা তার মেয়ের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ২ দিন হাবজিগুবজি গিলে সমানে হেগে যাচ্ছে, উনাকে আনতে মা বোনের বাড়ি যাবে আমার জন্য রান্না করে দিয়ে, তাই বাজার সহ ঘরে ফেরার তাড়া রয়েছে। সেই সব কিছুর বর্মকে ভেদ করেও দেশবন্ধু নামটা যেন বুলেটের মত সজোরে ব্রহ্মতালুতে গিয়ে আঘাত করল। এক লহমাতে এই দু’কুড়ির জীবনের সেই সুদূর বিদিশা কালের অতীতের ধুলোয় ঢাকা স্মৃতির পাতায় কেউ যেন সজোরে ধাক্কা মারলো।

মুহুর্তে ধুলোর আস্তরণ সরে যেতে দেখলাম, স্মৃতির দলেরা নিবিষ্ট বুদ্ধের মত মহানির্বানের পথে পাড়ি দেওয়ার জন্য যেখানে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদনে নাম লিখিয়ে অনন্ত প্রতীক্ষারত। হঠাৎ একটা শব্দের আঘাত, ধুসর কোষেদের দুনিয়াতে সে এক লণ্ডভণ্ড কান্ড বাঁধিয়ে হুলুস্থুল বসিয়েছে। সেই বিশৃঙ্খলার ফাঁকে, কোনো এক ‘টিপলার সিলিন্ডার’ বা ‘ওয়ার্মহোলের’ পথ বেয়ে এক লহমাতে ১৯৯১ সালে, ক্লাস ফাইভের প্রথম দিনে পৌঁছে গেলাম।  

গত সাড়ে ৩ দশক সময়ে আমাদের সমুদ্রগড়ের প্রায় সবকিছুই বদলে গেছে, বসাকদের কাপড়ের ব্যবসার উত্থানে স্থানীয় অর্থনীতির জোয়ারের সাক্ষী হওয়া থেকে, আজকে সেই বসাক পরিবারের পুরুষদের পরিযায়ী হতে দেখছি, এর মাঝে গোটা এলাকার ভূগোল ও রসায়ন বদলে গেছে। বদলায়নি শুধু ইতিহাস, তাই আজকেও প্রায় ৩৪ বছর পর, এক মাথা টাকওয়ালা, জালার মত ভুঁড়ি সহ, একমুখ দাড়িগোঁফের জঙ্গল থাকা সত্বেও কেউ, সেই প্রস্তর যুগের ছবির সাথে মিলিয়ে আজকের আমাকে চিনতে পারে। বলল, সে নাকি আমার হাসিমুখ দেখে চিনেছে, কে জানে হাসির মানচিত্র হয়ত বদলায়না। আমি অবশ্য তাকে চিনিনি, শুধু দেশবন্ধু শব্দটা আমাকে ঝাঁকিয়ে দিয়েছে।

দ্রুত গাড়িতে বসতেই সে আমাকে একটা বিড়ি অফার করল, আমি চেইন স্মোকার হলেও বিড়ি খাইনা, তাও ভদ্রতার খাতিরে নিলাম। খেয়াল করলাম সে আমাকে বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার বদলে উল্টোদিকে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষটা মিশকালো রঙের, তারও একমুখ দাড়ি, স্বাস্থ্য বেশ ভালো, কিন্তু খুব সাধারণ চেহারা, যেখানে আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই হাজার মানুষের ভিড়ে স্বতন্ত্র হওয়ার জন্য। নিজেই বললো- আমাকে চিনতে পারোনি তো! কী করেই বা চিনবে বলো, কম দিন কী হলো! আমি দাস, সেই হাই ইস্কুলে তোমার দেশবন্ধু। সব কেমন যেন দ্রুত মনে পড়ে যেতে লাগলো। এটুকু মনে আছে হাই ইস্কুলে আমার প্রথম ও ঘনিষ্ট বন্ধুটির পদবী ছিলো দাস, কিন্তু তার সাথে বন্ধু যোগ করাতে- দাস থেকে কীভাবে যেন দেশবন্ধু হয়ে গিয়েছিলো।

একদম ছোট বেলাকার বন্ধুগুলোর প্রতি আমাদের বাপ মায়েদেরও বিশেষ লক্ষ্য থাকে, সন্তান কার সাথে মিশছে এ বিষয়ে কড়া নজর থাকে। মন্বন্তরের অপুষ্টিতে ভোরা রিকেটগ্রস্থদের মত সে কালে আমার গড়ন ছিলো। একমাথা শজারুর কাঁটার মত ঝুপসি চুলের নিচে, একটা লিকলিকে হাত’পা ওয়ালা মিশকালো কঙ্কালসার শরীর, সাথে হাড় জ্বালানো তিলে খচ্চর একটা জীব। তারপরেও যেদিন প্রথম হাই ইস্কুলে গিয়েছিলাম মায়ের হাত ধরে, অত বড় ইস্কুলে শত শত ছেলেপিলের ভিড়ে নিজেকে ভয়ানক একা লেগেছিলো। ইয়া বড় দালান বাড়ির ঘরটিতে চুপচাপ এককোনের একটা কাঠের বেঞ্চিতে গিয়ে জবুথবু হয়ে বসেছিলাম, একটা এ্যালুমিনিয়ামের ‘নাম খোদাই’ করা বাক্স নিয়ে। আমারই পাশে আমার থেকেও জবুথবু আরেকজন বসেছিলো হাবাগোবা মুখশ্রী করে। আমার হাই ইস্কুল বেলার প্রথম সাথী, সেই দেশবন্ধু। এর সাথে মেশার জন্য মায়ের তরফে ‘ছাড়পত্র’ ছিলো।

আমরা একসাথেই বাড়ি ফিরতাম, আমাদের বাড়ি টপকে ওদের বাড়ি যেতে হতো, গৌরাঙ্গ পাড়ার ভিতরের দিকে কোথাও একটা ছিলো। আমার নিজের টিফিন নিয়ে যাওয়ার বালাই কোনোকালেই ছিলনা, কিন্তু দেশবন্ধু রোজই কিছু না কিছু আনত ঘর থেকে। মার্বেলের সাইজের তিলের নাড়ু, চালভাজা আর চিনি, ঘরের ঘি মাখানো চিঁড়ে ভাজা, গোলগোল বাদাম চাপ, মুড়কির মোয়া, চালের আটা গুড় আর পাকা কলা দিয়ে মাখা একধরণের দধিকর্মা জাতীয় খাবার, ইত্যাদি গুলোর কথা স্পষ্ট মনে রয়েছে আজও। আমাদের মুসলিম বাড়িতে এই ধরণের অনেক খাদ্যসম্ভার থাকেনা সাধারনত। ফেরার পথে একসাথে গাছে চড়ে কামরাঙ্গা, আঁশফল, কুল আর কদবেল পাড়া, বর্ষার দিনে ঢাউস কচুপাতার নিচে বাক্স বাঁচিয়ে, ভেজা কাক হয়ে কাদা রাস্তায় খেলতে খেলতে ফেরা- স্মৃতিতে আজও অমলিন, শুধু সাথীটার নাম হারিয়ে ফেলেছিলাম।

ইস্কুল বেলার কতশত গল্প দেখলাম তার স্মৃতিতে অবিকল রয়েছে, যার প্রতিটা আমারও জীবনের ঘটনা। ততক্ষণে তুমি বলার সামাজিক দায় ঝেড়ে ফেলে আরো আপন করে তুই সম্বোধনে নেমে এসেছে। বই দেখে পড়ার মত মুখস্ত বলে যেতে লাগল, পাশের জনও দেখলাম সমান সঙ্গত দিচ্ছিলো। উল্টোদিকে চলছি, কিন্তু সে বিষয়ে যেন আমার হুঁশই নেই। পারুলডাঙ্গা ইস্কুলটা পার করে একটা মিষ্টির দোকানে দাঁড়িয়ে পেটাই পরোটা আর দই খাওয়ালো, আমি পয়সা দিতে যাওয়াতে বিচ্ছিরি ধরণের রাগও দেখালো। আবার সামনের দিকে এগোতে থাকল নানান গল্প করতে করতে। গোয়ালপাড়ার আখের পাইকারি বাজারটাকে পাশে রেখে, ঢালাই রাস্তা ধরে ভিতর পানে এগোতে এগোতে শুধালাম- এখানে কোনও প্যাসেঞ্জার আছে নাকি রে! সে জবাব দিলোনা।

জানলাম তার তিনটে মেয়ে, তারপর ১টা ছেলে। খুব ভোরে উঠে একদফা কাপড়ের ডেলিভারি দিয়ে আসে নবদ্বীপে, তারপর ঘরে ফিরে মেয়েদের সাথে হাতেহাতে একটু রান্নাবান্না করে আবার টোটো নিয়ে বেরিয়ে পরে। ছেলেমেয়েরা নিজেরাই খেয়েদেয়ে ইস্কুলে, কলেজে চলে যায়। শুধালাম, বউ কী চাকরি করে! কেমন একটা বেদনা মাখা মুখে একটা কাঁচা খিস্তি সহযোগে বললো- আরে ফোন, ওই ফোনে একজনার পিরিতে মজে সে শালী পালিয়েছে, সুরাত না বোম্বতে থাকে এখন। তার মুখের সেই বেদনামাখা অভিব্যাক্তিতে স্ত্রী হারানোর যন্ত্রণা নাকি সিঙ্গেল ফাদারের জীবন সংগ্রাম ফুটে উঠেছে- ঠাহর করতে পারলামনা। সে বলে চললো- বড় মেয়েটা ১৯শে পরেছে, কলেজ যায়, বড় লক্ষী মেয়ে আমার। কিন্তু কপালটা দেখ, মা অন্য মানুষের সাথে পালিয়েছে, কোন ভালো ঘরের ছেলে ওদের বিয়ে করবে বলল তো ভাই!

তার আক্ষেপ ঝরতেই লাগল- প্রেম করেই বিয়ে করেছিলাম খুব ছোট বয়েসে। ইস্কুল ছাড়ার পর তাঁতের কাজে লেগে যাই, একটু বড় হতে বাইরে বাইরে কাপড় বেচতে যেতাম, বেশ দু’পয়সা কামিয়ে ছিলাম। যে দোকানটাতে টিফিন করলি, সেটাও কিনেছিলাম, করোনার পর বেচে দিয়েছি। শালীটাও ওই সময় ভেগে গেলো, সে সময় নেশা করতাম ভাই সর্বক্ষণ, তাই ধারদেনায় ডুবে গিয়েছিলাম। মেয়েগুলো বড় হচ্ছে, বে’থা দিতে হবে- আবার ভালো হয়ে গেছি। তুই কী করছিস ভাই! কোথায় থাকিস! আমি আমতা আমতা করে জবাব দিলাম। টোটোটা গোয়ালপাড়া গ্রামের অনতি ভিতরে একটা টিনের বাড়ি দেখিয়ে বলল, সেটাই তার মেয়েদের মামার ঘর। আমার গলায় যেন একটা অব্যক্ত আবেগ দলা পাকিয়ে কণ্ঠরোধ করে ধরলো, আওয়াজ বের হচ্ছিলো না। 

আমার সুবিধা হলো আমি দিনের বেলায় রাস্তায় বের হলে সানগ্লাস পরি, কিন্ত সে দামী ফ্রেমের রে-ব্যান চোখ ঢেকে রাখলেও আবেগকে কীভাবে ধামাচাপা দেবে!  আজ ৫ বছর হলো, বিবাহিত স্ত্রী মানুষ একটা পরপুরুষের সাথে পালিয়েছে, তাও কতটা ভালবাসা বেঁচে থাকলে সেই কবে কার বাল্যকালের বন্ধুকে গল্পের ছলে এককালের প্রেমিকার বাড়ি দেখাতে নিয়ে আসে! তার বলার ধরনে মনে হলো সবটা যেন আমার সাথেই ঘটেছে। ক্লাস সেভেনের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার পর দেশবন্ধু আর স্কুলে আসেনি, শুনেছিলাম তার মা কিম্বা বাবা গত হয়েছিলো, তাই ইস্কুলে আসার বিলাসিতা ফুরিয়ে ছিলো। অথচ আমার শৈশব কৈশোর সবই ‘পিকচার পারফেক্ট’ ভাবে কেটেছিলো, যেমনটা গ্রামীণ মধ্যবিত্তের ছেলেপুলের কাটে। আনন্দে না হলেও, কষ্টের জাইগাতে আমরা সবাই কী সহজে মিশে যেতে পারি।

আসলেই এটা একটা শ্রমজীবী আম মানুষের জীবনের উপন্যাস, যার উপসংহার টানা হয়নি। কিসের বিজেপি, কিসের তৃনমূল আর কিসের সিপিএম, কে হিন্দু, কেই বা মুসলমান। কিসের হানাহানি, কিসের পরকীয়া, রোজ লড়াই এর ময়দানে প্রতিটা মুহুর্তে সময় বদলে যাচ্ছে, বহু কিছুই আমাদের ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা ভুঁই-এ লুটিয়ে থাকছি। কিসের লোভ, কিসের মোহ মায়া, কার পিছনেই বা ছোটা, ৩৫টা বছর পাড় হয়ে গেছে, অথচ মনে হচ্ছে এই তো সেদিন। এভাবেই একদিন সত্তরে পৌঁছে যাব বেঁচে থাকলে। সেদিনও পিছন ফিরে তাকালে অর্থ সম্পদ কিছুই নজরে আসবেনা, শুধু রোজগার করা সম্পর্ক গুলোকে মনে থাকবে। যাদের কেউ রয়ে গেছে, কেউ ছেড়ে গেছে, কেউ হারিয়ে গেছে।

ফেরার পথে ইচ্ছা গেলো ওর মেয়ে গুলোকে দেখে আসি, ওদিকে ফোনে মায়ের সমানে তাড়া, ঘড়িতে বেলা ১১টা ছুইঁছুঁই। এ যাত্রায় আর দেশবন্ধুর ঘরে যাওয়া হলোনা, সে আমাদের গাড়ি বারান্দা অবধি ব্যাগ গুলো পৌঁছে দিয়ে বললো- যাস ভাই আমাদের বাড়ি। আমিও তাকে স্বপরিবারে পাহাড়ে ঘুরতে যাবার নিমন্ত্রণ জানালাম। যেতে যেতে একসাথে আরো একটা বিড়ি টানতে টানতে বললাম, আরেকটা বিয়েই না হয় কর, তোকে দেখবে কে বুড়ো বয়সে! খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থেকে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন ভরা চোখে চেয়ে বলল, আমি ওকে তাড়িয়েছি নাকি! আমি ডিভোর্সও দিইনি। সে নেশায় গেছে, নেশা কেটে গেলে ঠিক ফিরবে রে ভাই।

কী সাবলীল ভাবে কথাগুলো বলে দিলো। ভালবাসা প্রকাশের জন্য লক্ষ টাকার হিরের আঙটি লাগে! নাকি বুকে আই লাভ ইউ এর উল্কি আঁকতে হয়! আমরা কত সহজে একটা সম্পর্ককে ঠুনকো তুচ্ছ বিষয়ে ভেঙে দিই, সামান্য রিপালসান টুকুও হয়না পরবর্তীতে। হতেই পারে দেশবন্ধু মাতাল ছিলো, চন্ডাল রাগী ছিলো, কোনো অবৈধ পরকিয়ায় জড়িয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু সংসার ছেড়ে পালায়নি, দায়িত্ব এড়ায়নি। তার স্ত্রী’টি সবকিছুই দেখেছিলো, শুধু এই আদিম নাছোড় ভালবাসাটা খুঁজে পায়নি, যেটা আগলে কতশত দেশবন্ধুরা বেঁচে আছে প্রতীক্ষাতে। হ্যান্ডসেক করি না কোলাকুলি, বুঝে উঠতে না পেরে শেষেরটাই করলাম, সে এটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা, তাই গদগদ হয়ে গেলো।

বড় আশ্চর্য এই মানবজীবন। একজন সংসারের সব কিছুকে মিথ্যা করে স্বামী সংসার সব কিছু ত্যাগ করে নিজের ‘ভালবাসার’ টানে দেশান্তরী হয়েছে। অন্যজন সেই তারই প্রতীক্ষাতে সংসার সাজিয়ে বসে আছে, স্মৃতি আঁকড়ে। তার জীবন সেই বিয়ের দিন, সন্তানের জন্ম, তাদের বেড়ে ওঠার দিনের ‘স্বামী-স্ত্রী’র মিষ্টি খুনসুটির ঘোরেই আচ্ছন্ন। আমাদের ছেলেবেলা, আমাদের সম্পর্ক গুলো এভাবেই এলাকার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে, একটু খুঁজলেই তাদের দেখা মেলে। চারিদিকে এতো সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পারিবারিক হানাহানি, এর মাঝে এমন মিথ্যা প্রেমের গল্প, ফাঁপা হয়ে যাওয়া সংসারের স্বপ্ন, এমন শৈশবের গল্প গুলো বড় দুর্লভ।

লজ্জার কথা হলো, আমি দেশবন্ধুর নামটা ভুলে গেছি, সাথে থাকা ছেলেটিও আমাদেরই সহপাঠী ছিলো, তার যাত্রা ১ বছরই ছিলো, তারপর তাকেও কর্মক্ষেত্রে ঢুকে যেতে হয়েছিলো পেটের দায়ে, সত্যি বলতে তাকে আমি এই লেখা অবধিও মনে করতে পারিনি। শরমের মাথা খেয়ে নাম জিজ্ঞাসা করার সাহসও জোটাতে পারিনি, কী দরকার এমন একটা সুন্দর সম্মীলনীর তাল কেটে দেওয়ার! দেশবন্ধু, ওই নামেই থেকে যাক বাকি জীবনটা। সেক্সপিয়ার তো বলেই গেছেন, "What's in a name?   

বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫

শুন্য পকেটের তৃপ্তি


স্কুল জীবনে বন্ধুদের সাথে কাড়াকাড়ি করে আলু কাবলি খাওয়া, আর চালসের কোঠায় ঢুকে যাওয়া হাফ বুড়ো বয়সের জীবনের আলুকাবলির স্বাদ কখনই এক নয়। শুধু স্বাদই বা কেন, উৎসাহ আর আনন্দের মাঝেও আকাশ পাতাল তফাৎ। ছোটোবেলায় কখনই হাতে টাকা থাকতনা, দিনে বড়জোড় আটআনা পাওয়া যেতো চেয়েচিন্তে, উৎসবে অথিতিদের দেওয়া উপহার দরুন টাকা আর সময় সুযোগ বুঝে মায়ের কৌটো থেকে চুরি, এটিই ছিলো সাময়িক আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের একমাত্র উৎস।

ইস্কুলের সামনে নারান ঘুগনি, বিলাতি আমড়া, টোপা কুল, কদবেল, কামরাঙ্গা এইসব বেচতো। একটু দূরে হরণ দাদু বেচতো আলুকাবলি, এদিকে মেয়েদের ভিড় তুলনামূলক কম হওয়াতে আমরা আজন্ম হা-ঘরের দল সেখানে সকলের পুঁজি যোগ করে আলুকাবলি কিনতাম। সেই পুঁজি কখনই দেড় টাকা ক্রশ করেনি, কারন আমি, গৌরাঙ্গ বা প্রদীপ গরীব ছিলাম, বাকি ৩-৪ জন ছিলো নিঃশ্ব। সেই আলুকাবলির উপরে কাঁচা ছোলা ছড়িয়ে দিতো, ছোট বকুলতলার ছায়াতে বসে আমরা কী যে পরম তৃপ্তিতে ওই টুকু পরিমান ৬-৭ জন ভাগ করে খেতাম তা আজ ভাবলে কেমন একটা মিশ্র ভাললাগার অনুভুতি কাজ করে। আমিনিয়া বা করিমসে বসে একটা ডিনারে ৬০০০ উড়িয়েও আজকাল সেই সুখকর পরিতৃপ্তি আসেনা।

আমাদের ছেলেবেলাতে ঘর থেকে টিফিন নিয়ে যাবার আয়েসি বড়লোকি আনা ছিলোনা। একান্নবর্তী সংসারে মা কাকিমারা দম ফেলার ফুরসৎ পেতোনা হেঁসেল থেকে, তার উপরে ঠাকমার চোখ এড়িয়ে আলাদা কিছু বানাবার সাহস টুকুও মায়েদের ছিলোনা। তাই দুই চার আনার পুঁজিতে ইস্কুলের বাইরের ওই ফেরিওয়ালারাই ছিলো আমাদের টিফিনবেলার আপনজন।

এক সময় কত স্বপ্ন দেখতাম, বড় হয়ে ঘুগনিওয়ালা হবো। নিজের হাঁড়ি হাঁড়ি ঘুগনি থাকবে, যা বিক্রি হবে হবে, নাহলে আমিই খেয়ে নেবো, কিছুটা বোন আর বন্ধুদের দিয়ে।

তবে সেই ঘুগনিওয়ালা না হলেও, হোটেলের ব্যবসার সুত্রে প্রায় প্রতিটা হোটেলেই ব্রেকফাস্টে লুচির সাথে সপ্তাহে ৩ দিন ঘুগনি হয় বটে, কিন্তু সেই হাঁড়ি ধরে সবটা খাওয়ার বাসনাটা আজ হারিয়ে গেছে।

আজকের আলুকাবলিটা মা বানিয়েছেন। ডায়াবিটিসের জন্য নানান বিধিনিষেধ, তবুও এই সান্ধ্য আলো আঁধারিতে আলুকাবলির পথ বেয়ে ইস্কুলের দিনগুলোতে ফিরে যেতে একটু নাহয় অনিয়মই করলাম-

শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

নিষিদ্ধ পত্র- একটি গদ্য কাব্য

 


প্রিয় প্রাক্তন,


পত্রের শুরুতেই আমার ভালোবাসা নিও। অন্তরের অন্তরস্থল থেকে পাঠানো একগুচ্ছ গন্ধরাজের শুভেচ্ছা গ্রহণ করলে আনন্দিত হবো। আজ তোমাকে লিখতে বসেছি, তুমি ভাবতেই পারো- আজ হঠাৎ কি এমন হলো! জানিনা কি হলো, তবে আমার বিচিত্র খেয়ালের কথা তো তুমি জানো, তবে আজ তোমাকেই লিখতে বসেছি। বিলাপী বৃষ্টি তান ধরছে জানালার বাইরে, বর্ষার সাথে অকৃত্রিম যুগলবন্দি। এই মুর্চ্ছনাতে আমি আজ তোমায় বিষাদের গল্প শোনাবোনা, তোমার উদ্দেশ্য কিছু কথা বলতে চেয়ে আমার এই লেখা।

আচ্ছা, আজকাল তুমি কি প্রেম কর কারো সাথে? সে করতেই পার, তবে যুগ-জামানা ভালো নয়, একটু বুঝে শুনে, একটু সাবধানী…এখন আবার কমপক্ষে খান দু’চার খানা ছাড়া নাকি চলেনা ‘আধুনিক’ সমাজে। শুধুই কী প্রেম করো? ভালোবাসোনা তাকে? ভালোবাসা ছাড়া প্রেম হয়? তার চোখের দিকে তাকাতে লজ্জা পাওয়া, চুম্বনে কঠোর নিষিদ্ধতা, আজও কী তোমার কাছে শুরুর প্রেমের এমনই মানে! তার সাথে নিয়মিত দেখা করো? কেমন লাগে তার আলিঙ্গণে নিজেকে সঁপে দিতে! তুমি নির্জনতা উপভোগ করো, নাকি তাকে? মগজে উত্তেজনা, হৃদয়ে কম্পন আর শরীরে শীতলতার সেই অসাধারণ সম্মেলন নিয়ে আসতে পারো আজকাল?
 
আজও তার সাথে একান্তে সময় কাটাও, হাতে হাত, কাঁধে মাথা রাখো! আজও কি এলোমেলো চুলগুলো ছুঁয়ে গেলে জানান দেয় তোমার হৃদয়ের আকুলতা! আজও কি কোনো নদীর ঘাটে, পার্কের কোনে, নিরিবিলি রাস্তায়, সিনেমা হলের অন্ধকারে তার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে দেখো- তার নিঃশ্বাসে বিষ আছে কিনা! কথা বলো রাত জেগে? অজস্র খুনসুটিসৌরভ মুখরিত করে তোমার সারাদিন? আসও ভালোবাসার প্রতিটা মূহুর্ত বসন্তের বিকালের মত অনুভূত হয়? আজও তার বুকে বিলীন হতে চায় বেহায়া মন? আদিম উন্মাদনার প্রলোভনে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারো আজও? আজও কী তার পাশে বসে নিঃশব্দে ধ্রুবতারা থেকে স্বপ্ন পেড়ে আনো? 
 
আজও কি বলো ‘বহিরঙ্গের রূপ নয়, আমি গুণের প্রেমে পরেছি’, আজও কি ‘জীবনের প্রথমখুঁজে ফিরছো- যে তোমাকে ভালোবাসে! আজও আলিঙ্গনের ইঙ্গিতেই তোমার গভীর অনুভূতিরা বাঙ্ময় হয়ে উঠে? আজও কি শরীরকে উদযাপন করো? করলে কীভাবে সান্ত্বনা দাও প্রতিটা কলঙ্ককে, কীভাবে নিজেকে মানসিক সমর্থন করো? আজকে তোমার কাছে স্নেহের সংজ্ঞা কি বদলে গেছে? সুযোগ নেওয়ার পরিভাষাই বা কী? আজ কীভাবে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো জীবনে, আজও কি তোমার নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব হয়?

তাকে অনুভব রো প্রতিটা মুহুর্তে, প্রতিটা নিশ্বাসে। তার হাসির মিষ্টতা তোমার দৃষ্টিতে মিশে মায়াবী চাহনি তৈরি করে? সেই পুড়িয়ে দেওয়া দৃষ্টি দিয়ে শরীর জুড়ে ভালোবাসার উষ্ণতা ছিটিয়ে পারো? লক্ষ কোটি বছর ধরে পলকহীন চেয়ে আজও কী হৃদয়ের সবচেয়ে শীতলতম স্থানটিতে ভালোবাসার চাষাবাদ হয়। আজও কি তার চোখের দিকে তাকিয়ে দিগন্ত জোড়া সোহাগের ময়দানে অবুঝ শিশুর মত ছুটে বেড়াও! আহ্লাদে স্পর্শরা কি সকল বাঁধ ধ্বসিয়ে দিয়ে লজ্জায় মুখ নীল করে চোখ বন্ধ করে দেয়?
 
নাহ, কোনো বিস্তৃত প্রেক্ষাপটের উপরে জবাবদিহি চাইছিনা, সামগ্রিকভাবে বদলে যাওয়া সময়ে তোমার আচরণ বিবেচনা করতে সাহস সঞ্চয় করতে পারার তাগিদও দিচ্ছিনা। জানো তো, পালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো কিছুই অপরিহার্য নয়শুধু থেকে যেতে, বহু কিছু লাগে, বহু কিছু।
 
আমি কী করছি? জানি তুমি জানতে চাইবেনা, তবুও বলি- আমি দেখি, কেবল দেখি। দেখতে দেখতে লিখি, লিখতে লিখতে দেখি।
 
দেখি, রাস্তার ধারের কোনো ছাওয়াতে বুড়ো কুকুরটা ক্লান্তিতে জিভ বের করে নিজেকে ঠান্ডা করছে। দুপুরের রোদে বিতৃষ্ণ পথিকের মুখে বিরক্তের বলিরেখা, মোছার ব্যার্থ চেষ্টা করছে জামার আস্তিন দিয়ে। উদাস এলোমেলো হাওয়া সমস্ত দুর্গন্ধ শুষে নিচ্ছে কি যেন মন্ত্রবলে। ঢেউহীন নির্ভীক নদী নিঃশব্দে বয়ে চলেছে অন্তহীন, যুগযুগান্ত ধরে নিঃস্ব, নিরাসক্তভাবে একই অভিমূখে, কখনও যার উল্টোপথে হাঁটার সাধ জাগেনা। তার বয়ে যাবার জন্য জমিকে জঞ্জালমুক্ত করতে হয়নি কখনও।  
 
শাশ্বত সভ্যতা রোজ বদলে যাচ্ছে সংস্কৃতির পথ বেয়ে, মানবতার স্বল্পায়ত জীবনসীমায় কিছু মহৎ শব্দেরা গদ্য এঁকে যায় আপন মনে। তবু ঘেঁটু, কলমি, হেলেঞ্চার মত আদুরে শিকড়ের বলে টিকে থাকা লতারা চেয়ে দেখে বাঁশবন, হিজলের ছায়া, আমবন, পুরোনো বটের শিকড়ে ঘিরে ধরা পোড়ো ভিটে, গুঁড়ি-মোটা পাকুরের ডালে গাংচিলের বাসা। কে জানে আজও কেন নিষ্ঠুর পৃথিবীটা শুধু ঘুরে চলে অক্লান্ত মোহে, কে জানে কোন উদ্দেশ্যে, কার টানে।
 
ছায়াচ্ছন্ন গুমোট প্রাণে খুঁজে ফিরি কর্মখালির বিজ্ঞাপন, প্রেমিকের কাজ জানা ‘লোক’ চাই। আমি অবসরে যাওয়া পরিত্যাক্ত প্রেমিক, যে নির্জলা ‘আদরের’ উপবাস করছি। পার্থিব হৃদয়ের পবিত্র বাসস্থানে বসে নগ্ন জীবনের ব্যর্থতাকে উপভোগ করছি চুটিয়ে। আনন্দঘণ শহরের পথে পথে নিপুনতার মুখোস, উপশিরা জুড়ে ক্রোধ আর ভাবনাতে ধর্মঘটআতঙ্কের ফাঁসি কাঠে ঝুলতে থাকা কারো কাছে, ভ্রমণের গল্পের চেয়ে বড় নির্যাতন আর হয়না। তাই মিলেমিশে চেয়ে থাকি অপেক্ষার সাথে, এক অস্থির কলহাস্যে অপেক্ষার মুখেও প্রশান্তি খেলে যায়, আবার হৃদয়ে গিঁট দিই সজোরে। মরমে আগুন জ্বালিয়ে এক দুর্বোধ্য অজুহাতে, সমস্ত লণ্ডভণ্ড হওয়ার প্রতীক্ষাতে বসে থাকা আমার হৃৎস্পন্দনেও হরতাল
 

 


মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

এলোমেলো ঘুড়ি


সুতো ছিঁড়ে যাবার পর ঘুড়িটা ভাবলো সে স্বাধীন, আজ নিজের খুশিতে উড়ছে। যতক্ষণ উড়লো, আনন্দের আতিসায্যে যে সে ভুলে গেল- এটা ছিল বহমান বাতাসের দয়া। 

দয়া খুবই সাময়িক, সামনের জনের উপরে নির্ভরশীল। ফলত ঘুড়িটা আর কোনোদিন আকাশ দেখলো না। গোঁত্তা খেয়ে মুখের বলে মাটিয়ে পরে ছিন্নভিন্ন হয়ে পরে রয়েছে কোথাও। অথচ সুতো ছিঁড়ে না গেলে বা দিলে সে  আবার পরদিন আকাশে পৌঁছে যেতো। আসলে লাটাই, যে সুরক্ষা দিতো- তাকেই বন্ধন বা শৃঙ্খলা মনে হয়েছিলো ঘুড়ির। পরিমিত ও বন্ধনের বাঁধনে থাকাটাকে পরাধীনতা মনে হয়েছিলো ঘুড়ির। সুতো কেটে দেবার মাঝে জীবনের স্বার্থকতা মনে করেছিলো।

আসলে দিনের শেষে সকলেই একটা সুতোর বাঁধন দিয়ে লাটাই নামের সংসারে বেঁধে থাকতে চায়। যেখানে শাসন থাকবে, মানা থাকবে, আদেশ, নিষেধ থাকবে। তবে সেখানে ভালবাসা শব্দটা মর্যাদা পাবে। সুতো কেটে গেলে কেউ কারো খোঁজ নেবেনা আর- কখনও। 

আমরা আকাশে উঠলে আগে লাটাইকে ভুলে যায়, আর সুতো কেটে স্বাধীন হতে গিয়ে- অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলি। ন্যংটা লোভ একাকিত্ব আর সামাজিক পঙ্গুত্ব দেয়। জুড়ে থাকার মাঝে যে আসল সুখ- তা আমরা হারিয়ে বুঝি।

শনিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৫

যৌনতাঃ সুস্থ দাম্পত্যের চাবিকাঠি


শখের পুরুষ/নারীকে বিয়ে করেছেন?

তার পরেও অকারন মনোমালিন্য; আর সেই থেকে নিত্য অশান্তি?
দাম্পত্য কলহ যে সকল সময় হাতাহাতি পর্যায়েই পৌছাতে হবে তেমন কোনো মানে নেই, মানসিক দুরত্ব সবচেয়ে বড় সমস্যার কারন। দীর্ঘদিনের এই দুরত্ব ক্রমশ ফাটলে পরিনত হয়, পরকিয়ার জীবানু বাসা বাঁধে।
‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর সেক্সুয়াল মেডিসিন’ নামের একটা আন্তর্জাতিক সংস্থা ২০২০ সালে একটা জরিপ করে ২০-৪৫ বছর বয়সী বেশ কয়েক হাজার স্যাম্পল দম্পতির উপরে। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই সংস্থার মতে, সেই সকল সম্পর্কই সুখী, যারা নিজেরা স্বেচ্ছায় যৌনতাকে উপভোগ করে, বাৎসরিক হিসাবে ১৫০ বার- সপ্তাহে নুন্যতম ৩ বার, অর্থাৎ মাসে ১২ যৌন মিলন করে।
পুরুষের চোখে নারী শরীরের সবটাই শিল্পকর্ম, তার কামনা কখনও শেষ হয়না। চোখের ভাষা, ঠোঁটের ইশারা, মুখশ্রীর মায়া, আলগা চুলের হালকা আলগোছামো, আঙুলের সরল সৌন্দর্য, ত্বকের কোমল উজ্জ্বলতা কিংবা নিতম্বের সূক্ষ্ম গড়ন- সব কিছুই মুগ্ধ বিস্ময়ে ছুঁয়ে যায় পুরুষের সচেতন অবচেতন অনুভব। পুরুষের ইন্দ্রিয়ের পর্দায়, কল্পনার ক্যানভাসে চিরস্থায়ী রঙিন মুর্তি কোন এক প্রেয়সীরই হয়। অপরদিকে শখের পুরুষের তারিফ করার মাঝেই নারী তার সৌন্দর্যের সার্থকতা খুঁজে পায়, নিজের পুরুষের শক্ত বাহুডোরেই তার যাবতীয় আত্মিক তৃপ্তি।
সুতরাং, পূর্ণ যৌবনে কোনো দাম্পত্যে যদি স্বাভাবিক যৌনমিলন না হয়, তা নারী পুরুষের স্বাভাবিক চরিত্রের পরিপন্থী, অসুস্থতার লক্ষণ- যেটা শারিরীক হতে পারে বা মানসিক।
একজন দম্পতির কতবার যৌন মিলন করা উচিত তা নির্ভর করে সেই দম্পতি এই বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার উপর। যেসব স্বামী স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া ও মনোমালিন্য বেশি হয়, তাদের ‘ডেটা’ পর্যালোচনা করলে দেখা গেছে, তারা নিয়মিত যৌন সহবাস করেনা।
সহবাস করলে দেহ থেকে অক্সিটোসিন সহ নানা হরমোন নির্গত হয়ে দেহ এবং মনে প্রশান্তি-স্বাচ্ছন্দ্য আনে। ঘুম ভালো রাখে, হৃৎপিণ্ড সুস্থ রাখে,শরীরের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ানো সহ বিভিন্নভাবে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। বিশেষ করে মহিলাদের জন্য সুস্থ যৌনসম্পর্ক তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ জরুরী। বিয়ের আগের মাইগ্রেন বিয়ের পর ভালো হয়ে গেছে এমন উদাহরণ ভারিভুরি।
স্বামী স্ত্রীর মধ্যে অনিয়মিত যৌন সহবাস এক অদ্ভুত ধরনের বৈরিতা শুরু করে, একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হওয়া শুরু হয় এবং যা বাড়তেই থাকে, ওভার থিঙ্কিং শুরু হয়, আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়, ডিপ্রেশন আসার ফলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। ফলে ছোটখাটো বিষয়, নন-ঈশ্যুকে ইশ্যু বানিয়ে নিয়ে আপসে ঝগড়া শুরু করে দেয়।
উপরোল্লেখিত সংস্থার জরিপ মতে, যে সকল স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক স্বাভাবিক ও হাসিখুশি, তারা সপ্তাহে অন্তত পক্ষে ৩ বার বা তার অধিকবার যৌনমিলন করে বাৎসরিক গড়ের হিসাবে। ডেটা এ্যানালিসিস করে দেখা গেছে যে দম্পতিদের মাঝে যৌনমিলন যদি সপ্তাহে ২ বারের কম হয়, তথা বাৎসরিক ৫০ বারের কম মিলিত হয় (২০-৪৫ বছরের দম্পতিদের মধ্যে), তাহলে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে যে দম্পতিটি তাদের দাম্পত্য নিয়ে অসুখী।
যৌনমিলন স্ত্রী-পুরুষকে সবচেয়ে কাছাকাছি নিয়ে আসে, নিজেদের মাঝে রসাত্বক একান্ত আলাপচারিতা সম্পর্ককে স্বাভাবিক করে, সন্দেহ দূর করে, পরকিয়ার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়, পর্ণ আশক্তিকে নির্মূল করে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই আত্মিক বন্ধন গভীর হয়। যে সম্পর্ক যতো গভীর, তাদের সুখী হওয়ার সম্ভাবনাও ততটাই বেশী।
স্পর্শ, দৃষ্টি বিনিময়, নিঃশ্বাসের উষ্ণতা অনুভবই হলো ভালোবাসার নীরব ভাষা। একসময় শরীর কেবলমাত্র আকর্ষণের বাহক হয়ে রয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের নিঃশব্দ সংলাপের সেতু। চরম মুহূর্তে কামনা আর ঐশ্বরিক প্রেম মিশে যায় এক অনির্বচনীয় পূর্ণতায়, যেখানে শরীর আর মন একে অপরকে জড়িয়ে এক পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতায় পরিনতি পায়।
সঙ্গীর প্রতি অধিক যৌনতা অনুভব কোনো কুপ্রবৃত্তি নয়, বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক আহ্বান, আগামীকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র পদ্ধতি। পুরুষের সহজাত আকর্ষণ চোখ দিয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করে, একজন স্ত্রী তার পছন্দের পুরুষের স্পর্শে আদরে তার মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পায়। সুস্থ স্বাভাবিক সাংসারিক জীবনে যৌনতা হল পেন্ডুলামের ছন্দ, যাতে মিশে থাকে মায়াবী কোমলতা, যা হৃদয়ের মাঝে ভালবাসাকে উষ্ণ রাখার কৌশলও বটে।
ডিভোর্স হওয়া ৩০০০ স্যাম্পল দম্পতির মধ্যে দেখা গেছে ৮৩% ক্ষেত্রে সেই দম্পতিদের মধ্যে শেষ ৪ বছরের সম্পর্কে, বাৎসরিক গড়ে ৫০ বারেরও কম তারা যৌনসম্পর্কে মিলিত হয়েছিল।
দৈনিক শত সহস্র সংসার ভেঙে যায় অহেতুক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অ-কারনে, যার সত্যিই তেমন কোনো ভিত্তি নেই। সঠিক বোঝাপড়া না হওয়ার কারণে, বন্ধন দানা বাঁধতে বাঁধতে রয়ে যায়, এই সময় দম্পতির মাঝে নিয়মিত দৈহিক সম্পর্ক অনেক ফুটোফাটা মেরামত করে দেয় রাগে অনুরাগে।
তাই নিজের সঙ্গী/সঙ্গীনীর সাথে মনোমালিন্য থাকলে যত দ্রুত সম্ভব সমাধান করার চেষ্টা করুন উভয়ের ইচ্ছাকে সম্মান করে, অবশ্যই অনিয়মিত যৌনমিলনকে স্বাভাবিক করার মাধ্যমে, কারন একটা নারী পুরুষের জুটিকে এই সময়ের থেকে কাছে আর কোনো পরিস্থিতিই আনতে পারেনা।
পার্টনারের তরফে কবে শুরু হবে তার প্রতীক্ষায় সময় আর যৌবনকে খুন করবেন! নাকি আপনি নিজেই উদ্যোগী হবেন একটা দুর্দান্ত ‘শরীরী’ শুরুর জন্য, যা খাদের কিনারা থেকে দাম্পত্যকে বাঁচিয়ে একটা নতুন শুরু দেবে। আজই.....

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...