ভালবাসা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভালবাসা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫

দাম্পত্য কলহঃ নেপথ্যে

 

কলহ

আমদের ব্যাক্তি জীবনে প্রত্যেকের নিজ নিজ নীতি ও আদর্শ রয়েছে। সৎ মানুষের সৎ নীতি, সৎ আদর্শ; অসৎ এর তার নিজের মত করে, নীতিহীনের আদর্শ দুর্নীতি- ক্ষ্যাপা ছাড়া প্রত্যেকে আমরা আদর্শের উপরে মোটামুটি অটল থাকি। এরপর রোজ জীবনে বহু ঝড়ঝাপটা আসে, রোজকার লড়াই নিজের নিজের মত করে নিজ নিজ পরিসরে লড়তে হয়। বহু ভাবে আমরা আদর্শচ্যুত হই রোজ, আপস করি, দ্বন্দে ও ধন্দে পরে নিজেকে দুমড়ে মুচরে নিত্য ভাঙাগড়া করে নিই- বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। জীবন খরস্রোতা নদীর মত, পরিকল্পনার ধার ধারে না। তাই দৈনিক কিছু সমস্যা অযাচিতভাবে উদয় হয়। তবে মনের অন্দরে ‘আমি একলা’ অনুভূতি ঢুকে গেলে, যাবতীয় সম্পর্কের চেনা পরিসরটাও অচেনা লাগা শুরু হয়। ক্রমশ চির চেনা ‘আমি’র সাথেই দুরত্ব বাড়তে থাকে

বাচ্চা বয়সে যত দ্রুত শিখি আমরা, ভুলেও যায় তত দ্রুতই। সাইকেল চালানো বা সাঁতারের মত কিছু অভ্যাস ব্যাতিরেকে বাকি সমস্ত শিক্ষাকে নিয়মিত অনুশীলন না করলে ভুলতে বেশী সময় নেয়না আমাদের মস্তিষ্ক। সামাজিক ও সম্পর্কের জটিল বিষয়গুলো উন্মত্ত যৌবনে আমাদের মাথার উপর দিয়ে বয়ে যায়, কিন্তু আমাদের এই চল্লিশের কোটার বয়সটা বড্ড দুর্বোধ্য, কে ঠকাচ্ছে, কোনটা রহস্যময়, কোনটা ছলনা, কোনটা অস্পষ্ট, কোনটা ইচ্ছাকৃত পর্দাটানা হয়েছে, এই সকল নিগূঢ় বিষয় গুলো মস্তিষ্ক ধরে ফেলে। ধরে ফেলার পর বিশ্লেষণ করে একটা সিদ্ধান্তেও এসে পৌঁছে যায়, সমস্যা হলো স্পষ্টভাবে মনের সেই ভাবকে প্রকাশ করতে পারিনা। একটা সামাজিক সংশয়, চক্ষুলজ্জা জনিত কুন্ঠা, সম্ভাব্য অস্থিরসঙ্কল্পতা, মানসিক অনিশ্চয়তা- স্পষ্টবাদী হতে নিবৃত্ত করে আমাদের।

তাই চোখের সামনে গোটাগোটা মিথ্যাচার, মোটাদাগের ছলনাময় মৈত্রী বা অনুরক্তি, কৌশলগত কথোপকথন, এর সাথে নির্লজ্জ ও বেহায়ার মত একটা ব্যবধানের সীমারেখা টেনে নেওয়াকে আমরা কেবল সহ্য করে নিই। অসহনীয় হয়েছো মানেই ধরণী পপাত চ। সমস্যা তার বেশী হয়, যে নিজে থেকে আগ্রহী হয়ে সম্পর্কের ছিঁড়ে যাওয়া তন্ত্রীটিকে আবার গিঁট বেঁধেছিল। সে না পারে কইতে, না পারে সইতে। এক দমবন্ধ প্রেসারকুকার পরিস্থিতি জীবনের স্বাভাবিক স্বস্তি কেড়ে নেয়

কেন হয় এই অশান্তি?

মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলে, প্রায় ৭০% দাম্পত্য কলহের পেছনে সরাসরি দায়ী ভুল যোগাযোগ বা যোগাযোগের অভাব। কী বলছি, কী বলতে চাইছি তার মধ্যে আকাশ পাতালের ফারাক। মন দিয়ে শুনতেই চায়না কে কী বলছে, ফলত অধিকাংশটাই অনুমান করে নিতে হয়। বহু দাম্পত্যে যখন তারা একত্রে বসার সময় ও সুযোগ পায় পৃথিবীর সমস্ত কাজ ও দায় মিটিয়ে, তখন সেই মুহুর্তেও কেউ অফিসের কাজে, ফোন ঘাঁটতে বা বই পড়তে ব্যস্ত হয়ে যায়, কেউ কেউ আবার ঘুমিয়ে যায় অদ্ভুতভাবে। এরপর যখন সোহাগ ভালবাসার প্রশ্ন আসে, কথা মন দিয়ে শোনা তো অনেক দূর- সম্ভাষণেই রাগে ফেটে পড়ি। সামান্য ভুলগুলো, যেগুলো আসলেই পাতি গুরুত্বহীন, সেই বিষয় গুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে দিন রাত ঝগড়া অশান্তি নিত্যকার চিত্র হয়ে উঠে। আমাদের দম্ভ, জেদ, অহংকার ভুলিয়ে দেয় যে- স্পষ্ট, সরল ও সময়োপযোগী যোগাযোগই ভুল বোঝাবুঝির প্রাথমিক প্রতিষেধক

এর সাথে থাকে অতীতের আঘাত ও অবিশ্বাস, যে ক্ষত পুরোপুরি শুকায় না, ফলত বারবার ফিরে আসে। নতুন প্রতিটি ঘটনাকে পুরাতন চশমা দিয়ে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়, সামান্য নির্বিরোধী নির্দোষ আচরণও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অবিশ্বাসের পরিবেশে অশান্তির ছত্রাক নিজের স্বাধীনতায় কলেবরে বৃদ্ধি পায়। এই দুরত্ব ক্রমশ একে অপরের কাছে অভিব্যক্তি প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করে, কিম্বা প্রকাশ করলেও সেটা ভুল পদ্ধতিতেই করে। ফলত নিজের কষ্ট, অভিমান, চাহিদাগুলো জমতে জমতে হঠাৎ কোনও তুচ্ছ ঘটনার মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয়। এই রাগ বা কষ্ট প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে চিৎকার, খিস্তিখেউর জন্ম দেয়

বাজারে সামান্য বেগুন কিনতে গেলে টিপেটাপে দেখে বুঝে কিনি, কিন্তু যখন প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে আমরা জীবন সঙ্গী নির্বাচন করি, যার সাথে গোটা জীবন কাটায় আমরা- সেখানে তেমন বাছবিচার করিইনা একপ্রকার। অথচ জীবনের সবচেয়ে কাঠিন ও জটিল এই অধ্যায়ে প্রবেশ করার জন্য ভাবা উচিৎ ছিলো। বরং বলতে পারা যায় যে আমরা ঝাঁপ দিই- কিছু না শিখে, না জেনে এবং না বুঝে একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায়। ফলত, সর্বপ্রথম মন ভেঙে যায়, এই পথ বেয়ে অর্ধেকের ঘর ভেঙ্গে যায়, বাকিদের ঘর হয়ত টিকে যায়, কিন্তু শান্তি নেই হয়ে যায়। এই কারণেই সংসারে থেকেও অনেকেই একাকিত্বে ভুগতে থাকেন। এটা এমন একটা সমস্যার ফাঁদ, না কাউকে বলা যায় আবার সহ্যও করা যায়না

জীবন রুটিন মেনে চলেনা, সে তার নিজস্ব ছন্দে চলে। যেখানে দুটো আলাদা আলাদা মানুষকে উভয়ের সাথে তাল মিলিয়ে একটা ‘কমন’ ছন্দ বানাতে হয়, সেখানে উভয়কেই কিছু ছাড়তে হয়, কিছু ধরতে হয়। পরিস্থিতি কখনো কখনো এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, এই সম্পর্কের কুম্ভীপাকে আর সব বাস্তবতাই মনে হয় তুচ্ছ। সর্বক্ষণ এক অদৃশ্য পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের মোকাবিলা করাই তখন জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে উত্তরপত্রে নির্দিষ্ট জবাব লিখলে সফলতা মেলেনা, লিখতে লিখতে বারবার সময়ের পাতা উল্টে অতীতের সাথে বর্তমানকে মিলিয়ে, ভবিষ্যৎ কল্পনা করে করে উত্তর লিখে যেতে হয়। সময় প্রতি মুহুর্তে বদলে যাচ্ছে, তার সাথে বদলাচ্ছে বাস্তবতা, সেই মত একই প্রশ্নের শত সহস্র উত্তর তৈরি হয়ে যাচ্ছে। সেই জবাবকে সময়মত ধরতে না পারলেই ব্যর্থতা চিরসঙ্গী। এভাবেই একসময় সময় পেরিয়ে যায়, সব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকা সত্ত্বেও ঠিকভাবে লিখতে না পারার ব্যার্থতা- জীবনকে কঠিন করে তোলে

আসলে আমরা সুস্থ থাকার লোভের ফাঁদে পরে, স্থিতিশীল জীবনকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলি। একা থাকার নানা অসুবিধা আছে, কিন্তু সুবিধা হচ্ছে দায় নিতে হয়না, জবাবদিহি নেই, বাধ্যবাধকতা নেই। এখানে এসেই স্বেচ্ছাচার আর স্বাধীনতার সুক্ষ ফারাক টুকু ঘুঁচে যায়। ভেতরে জমে রয়ে যায় কঠিন নীরবতা। ছোট্ট একটি কথার জের, কাজের বাহানাতে উপেক্ষা করা একটি ফোনকল বা মেসেজ, অজান্তে বা অনিচ্ছাকৃত করা কোনও মন্তব্য– এগুলোই সমস্যা তৈরি করে দুজনের মাঝখানে। প্রতিটি জীবনের নিজস্ব গতির ছন্দ রয়েছে, কিন্তু একটা নিভৃত পরিবারেরও রয়েছে নানা প্রত্যাশার চাহিদা। এই তাল মেলাতে গিয়েই অশান্তি আমাদের নিত্যসঙ্গী। এতে সম্পর্কের ভিতটা যেমন টলমল হয়ে যায়, তেমনই উষ্ণতাও ক্রমশ মিইয়ে যায়। তখন পরে থাকে কিছু তাত্ত্বিক কচকচি, আর বাস্তব জীবনে প্রয়োগের অনুপযোগী কিছু হারানো স্নিগ্ধতা

জীবনের এই বাঁকে এসে দাম্পত্য বিষয়টি সমস্যার পর্যায়ে চলে যায়, অকারনে আমাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা এবং হতাশার উপসর্গ দেখা দেয়। অস্থিরতা বোধ নিত্য সঙ্গী হয়ে যায়, দুশ্চিন্তার মুহূর্তে হাত-পা ঘামতে থাকা, বুক ধড়ফড় করা আমাদের ভয়াবহ হতাশায় ডুবিয়ে দিয়ে বিষণ্ন করে তোলে। আমাদের খাবারে রুচি কমে যায়, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, বহুলাংশে নিজেকে বন্দি বানিয়ে ফেলি, অসামাজিক হয়ে যায়, ফলত নানা ধরণের ক্রনিক অসুস্থতার উপসর্গ দেখা দেয়। যা সত্যিকারের অসুস্থ করে তোলে

এক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী আদর্শলিপি মানা সমাধান নেই। হয় ভোগ করে যেতে হবে, মন্থনে একদিন অমৃত উঠবে- এই আশাতে নীলকণ্ঠ হয়ে অবেগ অনুভূতি বিসর্জন দিয়ে পদ্মপাতার মত পাঁকে থেকেও জলস্পর্শ না করে টিকে থাকতে হয়। অথবা সর্বত্যাগী হয়ে একা-বোকা ঋষি সুলভ সন্ন্যাস জীবনে জ্ঞানার্জনের পিছনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। দুটোই কঠিন, কিন্তু তৃতীয় কোনো উইন-উইন সমাধান কিছু নেই

মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৫

অকপট চড়ুইভাতি ২০২৫


 ১৬শ শতাব্দীর শেষভাগ, দিল্লির মসনদে তখন প্রতাপশালী মুঘল- সম্রাট আকবর। 


দিল্লীশ্বর, বাংলা-বিহারের শাসনকর্তা হিসেবে উড়িষ্যা দখল করতে নির্দেশ দিলেন অম্বররাজ মানসিংহকে। মহারাজ মানসিংহ তার সুপুত্র জগৎসিংহকে এই কাজে নিয়োজিত করেন। সুদক্ষ যোদ্ধা রাজপুতবীর জগৎসিংহ বার বার সামরিক আক্রমণ করে পাঠানদের অতিষ্ট করে তোলে। এরকম সময়েই একদিন জগৎসিংহের সাথে স্থানীয় ভূস্বামী বিরেন্দ্র সিংহের একমাত্র ষোড়শী কন্যা, সুন্দরী তিলোত্তমার সাক্ষাৎ হয় শৈলেশ্বরের মন্দিরে। নিজের অজান্তেই উভয়ে একে অপরের প্রেমে পড়েন। উড়িষ্যা-অধিকারী পাঠানেরা মান্দারণ অঞ্চলের জমিদার বাড়ি লুট করতে এসে সস্ত্রীক জমিদার ও তার কন্যাকে বন্দী করে নিয়ে যায়। রাজপুতবীর কুমার জয়সিংহ তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পাঠানদের হাতে বন্দী হলেন।

চেনা গল্প তো! ঠিকিই ধরেছেন, এটা বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের পটভূমি। বাংলা সাহিত্যের জয়ঢাক বাজিয়ে জন্ম নেওয়া ‘দুর্গেশনন্দিনী’ মুঘল-পাঠান দ্বন্দ্বকে ভিত্তি করে, ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমিতে রচিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম বাংলা উপন্যাস, মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৮৬৫ সালে এটি প্রকাশিত হতেই, বাংলা গদ্য সাহিত্যে বিপ্লব ঘটায়। ব্যক্তি-আগ্রাসী সামন্তসমাজ, ব্যক্তি হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা ও ক্রন্দন, আবিষ্কারের ঐকান্তিকতা, বাংলা উপন্যাসের বৃহত্তর জীবনমুখী পটভূমিকে চিনতে বা জানতে ইচ্ছা যায়না? রোম্যান্সমধুর রহস্যলোক, ইতিহাসের স্বপ্নাবেশ আর আদর্শায়িত ব্যক্তি ও সমাজকেন্দ্রিকতা যে মাটিকে আবর্ত করে গড়ে উঠেছিলো, তাকে ছুঁয়ে দেখায় বাসনা যায়না? 

বাংলার আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক আবর্ত-সংঘাতে ঘূর্ণমান ও বিচূর্ণ-ভগ্ন মূল্যবোধ রূপায়ণের ঐকান্তিকতা এবং সমসাময়িক জীবনের চলমান বহির্বাস্তবতা অঙ্কনের অলক্ষ্য স্থান, আজ তার কিছুই রক্ষা করতে পারেনি কিছু ভাঙা ইট পাথর ব্যাতিত। ২০১৬ তে আমরা শরৎচন্দ্রের পানিত্রাসের ভিটেকে ছুঁতে পাওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছিলাম অকপট চড়ুইভাতির সৌজন্যে, সেখানে বঙ্কিমের সৃষ্টি সুখের গড়কে ছুঁয়ে দেখার একটা সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়! অনিশ্চয়তার এই তো জীবন, আজ আছি কাল নেই। অকপটেই বা সেই ২০১৬ এর কতজন টিকে আছি আজ ১০ বছর পর ২০২৫ এ এসে, জীবন নদীতে সময়ের স্রোত বয়েই চলেছে, নতুন জলের ধারায় কতজন হারিয়ে গেছে, আবার কত নতুন প্রাণেরা এসে ধরা দিয়েছে, এটাই জীবনের নিয়তি। তার আগে যেটুকু সুযোগ আসে, দেখে যায় প্রাণ ভরে।

বঙ্কিমের ‘দুর্গেশনন্দিনী’র সৃষ্টি সুখের গড়, সত্যিকারের গড়, নাম- গড় মন্দারণ। হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমার, গোঘাট ব্লকে অবস্থিত এই গড় মন্দারণ। দ্বারকেশ্বর নদ ও শিলাবতী নদীর মধ্যবর্তী তরঙ্গায়িত পললমাটির ওপর মন্দারণ দূর্গটি আজ আর নেই, সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে, রয়ে গেছে ইতিহাস। আজও মাটি খুঁড়লে সেই আমলের অস্তিত্ব মেলে যত্রতত্র। কে জানে কোন পথে ঘোড়া হাঁটিয়ে ছিলো দুর্গাধিপতি জয়ধর সিংহ, কোথায় রয়েছে রূপসী তিলোত্তমার হাতের ছোঁয়া, কোথায় ই বা সেই শৈলেশ্বর মহাদেবের মন্দির- কে জানে! নবাবজাদী আয়েষার অতৃপ্ত আত্মা হয়ত আজও খুঁজে ফেরে কুমার জগৎ সিংহকে।

গড় মান্দারণের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অসাধারণ, কাছেই বয়ে চলেছে আমোদর নদ। হুগলি ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সীমানায় এই গড় মান্দারন, হুগলির অন্যতম বনাঞ্চল চাঁদুর ফরেস্ট এখানেই অবস্থিত। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্মভূমি কামারপুকুর থেকে গড় মান্দারণে দূরত্ব মাত্র ৩ কিলোমিটার। নির্জনতা যাঁদের ভাল লাগে, এই জায়গা তাঁদের ভারি পছন্দ হওয়ার কথা। নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশে মাঝেমাঝে বয়ে চলা বাতাসের শন শন শব্দ আপনার শহুরে ক্লান্তি দূর করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে প্রায় ২০০ একর জমির উপরে গড়ে উঠেছে গড় মান্দারণ পর্যটন কেন্দ্র। কথিত রয়েছে গৌড়ের অধিপতি হুসেন শাহের সেনাপতির সমাধি রয়েছে এখানে, যা দরগা নামে পরিচিত। চুড়ুইভাতিতে আসার নামে শ্রীরামকৃষ্ণের ভিটেকে চোখে দেখা বোনাস প্রাপ্তির মতই সুখকর।

শাল, শিমুল, পিয়াল, সেগুন দিয়ে ঘেরা গড় মান্দারণের জঙ্গলে একটা দিন হৈহৈ করে জীবনকে উদযাপন করতে আসবেন নাকি! বাকি সব কিছু ভুলে যান, গড় মান্দারণের প্রকৃতি এখানে জীবন্ত ইজেল, রং-তুলি দিয়ে ক্যানভাসে আঁকা ছবি। অদ্ভুত শান্তি মিশে রয়েছে এখানকার বাতাসে, পাখির কলতান, গাছেদের ফিসফাস আর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে মিশে থাকা মাদকতায়। চড়ুইভাতি সেরে কামারপুকুর বা জয়রামবাটীতে একটা রাত থেকে যেতেই পারেন, শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদাময়ীয় স্মৃতি বিজড়িত স্থানের আধ্যাত্মিকতা ও ইতিহাস ছাড়াও এখানে গ্রামের সবুজ পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে। মঠ ও মিশনের শান্ত–সুন্দর পল্লী পরিবেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামের ইতিহাসের উপাদানগুলির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া একটা উপরি পাওনা বৈকি।

হাওড়া থেকে গোঘাট বা আরামবাগ গামী লোকাল ট্রেন ধরে খুব সহজে পৌঁছে যাওয়া যায় গড় মন্দারণ। সকালে হাওড়া স্টেশন থেকে ৭টা ২৫ এর গোঘাট লোকালটা বেস্ট। এছাড়া শ্যাওড়াফুলি থেকে ট্রেনে তারকেশ্বর-আরামবাগ হয়ে ভায়া কামারপুকুর, গড় মন্দারণ যাবার বিবিধ উপায় রয়েছে। কেউ যদি উত্তরের দূরবর্তী জেলা থেকে আসেন, কামরূপ এক্সপ্রেসে চড়ে পড়াটা বেষ্ট। মধ্যবঙ্গ থেকে এলে হাটেবাজারে এক্সপ্রেসে রাত ১২টার আশেপাশে চড়ে বসলে সকাল ৫টার আগেই হাওড়া পৌঁছে যাবেন। উত্তর চব্বিশ পরগণা বা নদীয়া থেকে এলে ব্যারাকপুর ফেরিতে মাত্র ৬ টাকায় গঙ্গা পার হয়ে শ্যাওড়াফুলি ঘাট, সেখান থেকে ২ মিনিটে শ্যাওড়াফুলি রেল স্টেশন। বাসে কিম্বা গাড়িতে চড়ে কামারপুকুর হয়ে পৌঁছে যাওয়াটা কোনো ব্যাপারই নয়। মেদিনীপুর শহর, খড়্গপুর, পাশকুড়া, চন্দ্রকোণা রোড, উলুবেড়িয়া, বাগনান, বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, বর্ধমান, মেমারি, নবদ্বীপ থেকে প্রচুর বাস রয়েছে ঘন্টায় ঘন্টায়, যাগুলো সরাসরি কামারপুকুরে পৌঁছে দেবে আপনাকে। সেখান থেকে অহরহ টোটো পাওয়া যায় পিকনিক স্পটে পৌঁছাবার জন্য। 

সকালে পাকোড়া আর চা/কপি, ব্যাস। এর বেশী খেলে মধ্যহ্নভোজে, পাকস্থলী আহত হতে পারে খাসির মাংসকে যথাযথ স্থান না দিতে পেরে। এরপর তুমুল আড্ডার ফাঁকে ততক্ষণে সাদা ভাত, সোনা মুগের ডাল, ঝুড়ি আলুভাজা, বাঁধাকপি দিয়ে মটরশুটির ঘন্ট, চাটনি, পাঁপড় আর রাজভোগ- পাতের সৌন্দর্য বর্ধন করার জন্য এগুলো প্রস্তুত হয়ে যাবে কষা কষা ঝাল ঝাল খাসির মাংসের সাথে। পার্কের এ্যান্ট্রি ফি, পিকনিক স্পটের ভাড়া, হাঁড়িকুড়ি ভাড়া, খাওয়ার প্লেট গ্লাস, রান্নার গ্যাস, বোতল বন্দি পানীয় জল, মাংস, মসলা, চাল সবজি, ঠাকুর চাকর, ইত্যাদি সব মিলিয়ে মাথাপিছু মাত্র ৬০০ টাকা করে চাঁদা ধার্য্য করেছি। ১০ বছরের নিচের বাচ্চা কমপ্লিমেন্টারি, তার উপরে আমরা সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক। এই হলো দেনাপাওনার গল্প।

আমাদের আয়োজন ৫০ জনের অধিক নয়, ৪০ এর আশেপাশে হলে সবথেকে ভালো। অধিক ভিড়ে আলাপের মাদকতা নষ্ট হয়, তাছাড়া আয়োজনেও কিছুটা অপারগতা রয়েছে। তাই আপনাকে নিয়েই যদি সংখ্যাটা পূরণ হয়ে যায়, তার চেয়ে ভালো আর কিচ্ছুটি হয়না। তাহলে, আসছেন নাকি আগামী ২১শে ডিসেম্বর ২০২৫ এর দুপুরে গড় মন্দারণে? কিছুটা ইতিহাস, কিছুটা আধ্যাত্মিকতা, কিছুটা সাহিত্যের গন্ধ গায়ে মেখে, অকপট চড়ুইভাতির নামে আসবেন নাকি একটা দিনের অবসরে?


বুধবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৫

দেশবন্ধু

দেশবন্ধু 

সকালের বদলে আজ বাজারে বের হতে বেলা ৯টা বেজে গিয়েছিলো। আমাদের এলাকাতে শীত না পরলেও, AC আপাতত লম্বা ছুটিতে গেছে, আজই ভোরে ফ্যানও বন্ধ করে দিয়ে হয়েছিল উত্তুরে হাওয়ার শিরশিরানির দাপটে। বাজারে নতুন মরসুমি সব্জির সাথে কাঁচা তেঁতুল, চালতা এমনকি কাঁচা আমও রয়েছে। সাথে আমলকি, জলপাই, পেঁয়াজকলি, সার হীন দিশি মুলো, দিশি পালং ও শিমের ভালো আমদানি রয়েছে। দীঘার ইলিশ ১৪০০, গঙ্গার তাজা চিংড়ি- সেও ৭০০ টাকা কেজি। পাবদা, ভোলা, ভেটকি, পার্শে, দিশি পোনা, পাঙাস, রূপচাঁদা, লোটে, সিলভারকার্প, পমফ্রেট সহ চালানি ও সামুদ্রিক মাছের বহরে সারা বাজার থইথই কছে।

কিছু বারোভেজালি ছোট মাছ নিতেই হয় মায়ের বাটি চচ্চরি জন্য, বাবার জন্য বরাদ্দ তাজা দিশি পোনা, ওনার আবার না ভেজে কাঁচা মাছের ঝোল প্রিয়। আমার জন্য বাটা, রিটা, আর পাবদা মাস্ট। শশা, কাঁকুড়, কাঁঠালি কলা, ডাঁসা পেয়ারা সহ প্যাকেটের দুধ, দই, লেড়ো বিস্কুট ইত্যাদি নিয়ে, হাড়কাটা গলির সামনে ওই ভিড়ে টোটোর জন্য প্রতীক্ষা করছি। ভারি ৩টে ব্যাগ নিয়ে রাস্তা পার হওয়াই মুশকিল, জ্যোতি আর চন্দ্রমূখী মিলিয়ে আলুই ৭ কেজি। একটা টোটো এসে দাঁড়ালো, বিবিরহাট বলাতে সে সটান না বলে, সামনে ২০ মিটার মত এগিয়ে গিয়েও আমাকে নাম ধরে ও হাতের ইশারাতে ডাকতে লাগল।

আসলে আমি যেদিকে যাব, সেই রাস্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, চলতি টোটোকে ইউটার্ণ নিয়ে ঘুরে যেতে হবে। বাইক নিয়ে আসিনা, ভিড়ে পার্কিং করা মহাঝক্কি। ৭-৮ দিনের সব্জি আর আনাজপাতির ব্যাগ লটবহর আড়েবহরে কম হয়না মোটেও, সাধারণনত টোটোতে ২টো সিটের ভাড়াই আমি গুনি। সেই টোটোওয়ালা নিজেই এসে দু’হাতে দুটো ব্যাগ তুলে নিলো, আমি একটা ব্যাগ নিয়ে তার পিছুপিছু গিয়ে গাড়িতে চড়ে বললাম, একজন প্যেসেঞ্জার ইতিমধ্যেই রয়েছে। বললাম, চলো আরো ১০টাকা বেশী নিও না’হয়। টোটো চালক অদ্ভুত হাসি হাসি মুখ করে বললো- তুমি তন্ময়ই তো, আমাকে চিনতে পারোনি! আমি সেই দেশবন্ধু।

এমনিতেই মাথায় হাাজার ফিৎনা, এই মাসেই ৩টে মামলার ডেট আছে, যে কারনে পাহাড়ে উঠতে পারিনি। ফেসবুক ইউটিউবে এ্যাড ক্যাম্পেইন চলছে ট্রাভেল এজেন্সির, ফোনগুলো ভয়েস কল আর মেসেজে গিজগিজ করছে। বাবা তার মেয়ের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ২ দিন হাবজিগুবজি গিলে সমানে হেগে যাচ্ছে, উনাকে আনতে মা বোনের বাড়ি যাবে আমার জন্য রান্না করে দিয়ে, তাই বাজার সহ ঘরে ফেরার তাড়া রয়েছে। সেই সব কিছুর বর্মকে ভেদ করেও দেশবন্ধু নামটা যেন বুলেটের মত সজোরে ব্রহ্মতালুতে গিয়ে আঘাত করল। এক লহমাতে এই দু’কুড়ির জীবনের সেই সুদূর বিদিশা কালের অতীতের ধুলোয় ঢাকা স্মৃতির পাতায় কেউ যেন সজোরে ধাক্কা মারলো।

মুহুর্তে ধুলোর আস্তরণ সরে যেতে দেখলাম, স্মৃতির দলেরা নিবিষ্ট বুদ্ধের মত মহানির্বানের পথে পাড়ি দেওয়ার জন্য যেখানে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদনে নাম লিখিয়ে অনন্ত প্রতীক্ষারত। হঠাৎ একটা শব্দের আঘাত, ধুসর কোষেদের দুনিয়াতে সে এক লণ্ডভণ্ড কান্ড বাঁধিয়ে হুলুস্থুল বসিয়েছে। সেই বিশৃঙ্খলার ফাঁকে, কোনো এক ‘টিপলার সিলিন্ডার’ বা ‘ওয়ার্মহোলের’ পথ বেয়ে এক লহমাতে ১৯৯১ সালে, ক্লাস ফাইভের প্রথম দিনে পৌঁছে গেলাম।  

গত সাড়ে ৩ দশক সময়ে আমাদের সমুদ্রগড়ের প্রায় সবকিছুই বদলে গেছে, বসাকদের কাপড়ের ব্যবসার উত্থানে স্থানীয় অর্থনীতির জোয়ারের সাক্ষী হওয়া থেকে, আজকে সেই বসাক পরিবারের পুরুষদের পরিযায়ী হতে দেখছি, এর মাঝে গোটা এলাকার ভূগোল ও রসায়ন বদলে গেছে। বদলায়নি শুধু ইতিহাস, তাই আজকেও প্রায় ৩৪ বছর পর, এক মাথা টাকওয়ালা, জালার মত ভুঁড়ি সহ, একমুখ দাড়িগোঁফের জঙ্গল থাকা সত্বেও কেউ, সেই প্রস্তর যুগের ছবির সাথে মিলিয়ে আজকের আমাকে চিনতে পারে। বলল, সে নাকি আমার হাসিমুখ দেখে চিনেছে, কে জানে হাসির মানচিত্র হয়ত বদলায়না। আমি অবশ্য তাকে চিনিনি, শুধু দেশবন্ধু শব্দটা আমাকে ঝাঁকিয়ে দিয়েছে।

দ্রুত গাড়িতে বসতেই সে আমাকে একটা বিড়ি অফার করল, আমি চেইন স্মোকার হলেও বিড়ি খাইনা, তাও ভদ্রতার খাতিরে নিলাম। খেয়াল করলাম সে আমাকে বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার বদলে উল্টোদিকে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষটা মিশকালো রঙের, তারও একমুখ দাড়ি, স্বাস্থ্য বেশ ভালো, কিন্তু খুব সাধারণ চেহারা, যেখানে আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই হাজার মানুষের ভিড়ে স্বতন্ত্র হওয়ার জন্য। নিজেই বললো- আমাকে চিনতে পারোনি তো! কী করেই বা চিনবে বলো, কম দিন কী হলো! আমি দাস, সেই হাই ইস্কুলে তোমার দেশবন্ধু। সব কেমন যেন দ্রুত মনে পড়ে যেতে লাগলো। এটুকু মনে আছে হাই ইস্কুলে আমার প্রথম ও ঘনিষ্ট বন্ধুটির পদবী ছিলো দাস, কিন্তু তার সাথে বন্ধু যোগ করাতে- দাস থেকে কীভাবে যেন দেশবন্ধু হয়ে গিয়েছিলো।

একদম ছোট বেলাকার বন্ধুগুলোর প্রতি আমাদের বাপ মায়েদেরও বিশেষ লক্ষ্য থাকে, সন্তান কার সাথে মিশছে এ বিষয়ে কড়া নজর থাকে। মন্বন্তরের অপুষ্টিতে ভোরা রিকেটগ্রস্থদের মত সে কালে আমার গড়ন ছিলো। একমাথা শজারুর কাঁটার মত ঝুপসি চুলের নিচে, একটা লিকলিকে হাত’পা ওয়ালা মিশকালো কঙ্কালসার শরীর, সাথে হাড় জ্বালানো তিলে খচ্চর একটা জীব। তারপরেও যেদিন প্রথম হাই ইস্কুলে গিয়েছিলাম মায়ের হাত ধরে, অত বড় ইস্কুলে শত শত ছেলেপিলের ভিড়ে নিজেকে ভয়ানক একা লেগেছিলো। ইয়া বড় দালান বাড়ির ঘরটিতে চুপচাপ এককোনের একটা কাঠের বেঞ্চিতে গিয়ে জবুথবু হয়ে বসেছিলাম, একটা এ্যালুমিনিয়ামের ‘নাম খোদাই’ করা বাক্স নিয়ে। আমারই পাশে আমার থেকেও জবুথবু আরেকজন বসেছিলো হাবাগোবা মুখশ্রী করে। আমার হাই ইস্কুল বেলার প্রথম সাথী, সেই দেশবন্ধু। এর সাথে মেশার জন্য মায়ের তরফে ‘ছাড়পত্র’ ছিলো।

আমরা একসাথেই বাড়ি ফিরতাম, আমাদের বাড়ি টপকে ওদের বাড়ি যেতে হতো, গৌরাঙ্গ পাড়ার ভিতরের দিকে কোথাও একটা ছিলো। আমার নিজের টিফিন নিয়ে যাওয়ার বালাই কোনোকালেই ছিলনা, কিন্তু দেশবন্ধু রোজই কিছু না কিছু আনত ঘর থেকে। মার্বেলের সাইজের তিলের নাড়ু, চালভাজা আর চিনি, ঘরের ঘি মাখানো চিঁড়ে ভাজা, গোলগোল বাদাম চাপ, মুড়কির মোয়া, চালের আটা গুড় আর পাকা কলা দিয়ে মাখা একধরণের দধিকর্মা জাতীয় খাবার, ইত্যাদি গুলোর কথা স্পষ্ট মনে রয়েছে আজও। আমাদের মুসলিম বাড়িতে এই ধরণের অনেক খাদ্যসম্ভার থাকেনা সাধারনত। ফেরার পথে একসাথে গাছে চড়ে কামরাঙ্গা, আঁশফল, কুল আর কদবেল পাড়া, বর্ষার দিনে ঢাউস কচুপাতার নিচে বাক্স বাঁচিয়ে, ভেজা কাক হয়ে কাদা রাস্তায় খেলতে খেলতে ফেরা- স্মৃতিতে আজও অমলিন, শুধু সাথীটার নাম হারিয়ে ফেলেছিলাম।

ইস্কুল বেলার কতশত গল্প দেখলাম তার স্মৃতিতে অবিকল রয়েছে, যার প্রতিটা আমারও জীবনের ঘটনা। ততক্ষণে তুমি বলার সামাজিক দায় ঝেড়ে ফেলে আরো আপন করে তুই সম্বোধনে নেমে এসেছে। বই দেখে পড়ার মত মুখস্ত বলে যেতে লাগল, পাশের জনও দেখলাম সমান সঙ্গত দিচ্ছিলো। উল্টোদিকে চলছি, কিন্তু সে বিষয়ে যেন আমার হুঁশই নেই। পারুলডাঙ্গা ইস্কুলটা পার করে একটা মিষ্টির দোকানে দাঁড়িয়ে পেটাই পরোটা আর দই খাওয়ালো, আমি পয়সা দিতে যাওয়াতে বিচ্ছিরি ধরণের রাগও দেখালো। আবার সামনের দিকে এগোতে থাকল নানান গল্প করতে করতে। গোয়ালপাড়ার আখের পাইকারি বাজারটাকে পাশে রেখে, ঢালাই রাস্তা ধরে ভিতর পানে এগোতে এগোতে শুধালাম- এখানে কোনও প্যাসেঞ্জার আছে নাকি রে! সে জবাব দিলোনা।

জানলাম তার তিনটে মেয়ে, তারপর ১টা ছেলে। খুব ভোরে উঠে একদফা কাপড়ের ডেলিভারি দিয়ে আসে নবদ্বীপে, তারপর ঘরে ফিরে মেয়েদের সাথে হাতেহাতে একটু রান্নাবান্না করে আবার টোটো নিয়ে বেরিয়ে পরে। ছেলেমেয়েরা নিজেরাই খেয়েদেয়ে ইস্কুলে, কলেজে চলে যায়। শুধালাম, বউ কী চাকরি করে! কেমন একটা বেদনা মাখা মুখে একটা কাঁচা খিস্তি সহযোগে বললো- আরে ফোন, ওই ফোনে একজনার পিরিতে মজে সে শালী পালিয়েছে, সুরাত না বোম্বতে থাকে এখন। তার মুখের সেই বেদনামাখা অভিব্যাক্তিতে স্ত্রী হারানোর যন্ত্রণা নাকি সিঙ্গেল ফাদারের জীবন সংগ্রাম ফুটে উঠেছে- ঠাহর করতে পারলামনা। সে বলে চললো- বড় মেয়েটা ১৯শে পরেছে, কলেজ যায়, বড় লক্ষী মেয়ে আমার। কিন্তু কপালটা দেখ, মা অন্য মানুষের সাথে পালিয়েছে, কোন ভালো ঘরের ছেলে ওদের বিয়ে করবে বলল তো ভাই!

তার আক্ষেপ ঝরতেই লাগল- প্রেম করেই বিয়ে করেছিলাম খুব ছোট বয়েসে। ইস্কুল ছাড়ার পর তাঁতের কাজে লেগে যাই, একটু বড় হতে বাইরে বাইরে কাপড় বেচতে যেতাম, বেশ দু’পয়সা কামিয়ে ছিলাম। যে দোকানটাতে টিফিন করলি, সেটাও কিনেছিলাম, করোনার পর বেচে দিয়েছি। শালীটাও ওই সময় ভেগে গেলো, সে সময় নেশা করতাম ভাই সর্বক্ষণ, তাই ধারদেনায় ডুবে গিয়েছিলাম। মেয়েগুলো বড় হচ্ছে, বে’থা দিতে হবে- আবার ভালো হয়ে গেছি। তুই কী করছিস ভাই! কোথায় থাকিস! আমি আমতা আমতা করে জবাব দিলাম। টোটোটা গোয়ালপাড়া গ্রামের অনতি ভিতরে একটা টিনের বাড়ি দেখিয়ে বলল, সেটাই তার মেয়েদের মামার ঘর। আমার গলায় যেন একটা অব্যক্ত আবেগ দলা পাকিয়ে কণ্ঠরোধ করে ধরলো, আওয়াজ বের হচ্ছিলো না। 

আমার সুবিধা হলো আমি দিনের বেলায় রাস্তায় বের হলে সানগ্লাস পরি, কিন্ত সে দামী ফ্রেমের রে-ব্যান চোখ ঢেকে রাখলেও আবেগকে কীভাবে ধামাচাপা দেবে!  আজ ৫ বছর হলো, বিবাহিত স্ত্রী মানুষ একটা পরপুরুষের সাথে পালিয়েছে, তাও কতটা ভালবাসা বেঁচে থাকলে সেই কবে কার বাল্যকালের বন্ধুকে গল্পের ছলে এককালের প্রেমিকার বাড়ি দেখাতে নিয়ে আসে! তার বলার ধরনে মনে হলো সবটা যেন আমার সাথেই ঘটেছে। ক্লাস সেভেনের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার পর দেশবন্ধু আর স্কুলে আসেনি, শুনেছিলাম তার মা কিম্বা বাবা গত হয়েছিলো, তাই ইস্কুলে আসার বিলাসিতা ফুরিয়ে ছিলো। অথচ আমার শৈশব কৈশোর সবই ‘পিকচার পারফেক্ট’ ভাবে কেটেছিলো, যেমনটা গ্রামীণ মধ্যবিত্তের ছেলেপুলের কাটে। আনন্দে না হলেও, কষ্টের জাইগাতে আমরা সবাই কী সহজে মিশে যেতে পারি।

আসলেই এটা একটা শ্রমজীবী আম মানুষের জীবনের উপন্যাস, যার উপসংহার টানা হয়নি। কিসের বিজেপি, কিসের তৃনমূল আর কিসের সিপিএম, কে হিন্দু, কেই বা মুসলমান। কিসের হানাহানি, কিসের পরকীয়া, রোজ লড়াই এর ময়দানে প্রতিটা মুহুর্তে সময় বদলে যাচ্ছে, বহু কিছুই আমাদের ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা ভুঁই-এ লুটিয়ে থাকছি। কিসের লোভ, কিসের মোহ মায়া, কার পিছনেই বা ছোটা, ৩৫টা বছর পাড় হয়ে গেছে, অথচ মনে হচ্ছে এই তো সেদিন। এভাবেই একদিন সত্তরে পৌঁছে যাব বেঁচে থাকলে। সেদিনও পিছন ফিরে তাকালে অর্থ সম্পদ কিছুই নজরে আসবেনা, শুধু রোজগার করা সম্পর্ক গুলোকে মনে থাকবে। যাদের কেউ রয়ে গেছে, কেউ ছেড়ে গেছে, কেউ হারিয়ে গেছে।

ফেরার পথে ইচ্ছা গেলো ওর মেয়ে গুলোকে দেখে আসি, ওদিকে ফোনে মায়ের সমানে তাড়া, ঘড়িতে বেলা ১১টা ছুইঁছুঁই। এ যাত্রায় আর দেশবন্ধুর ঘরে যাওয়া হলোনা, সে আমাদের গাড়ি বারান্দা অবধি ব্যাগ গুলো পৌঁছে দিয়ে বললো- যাস ভাই আমাদের বাড়ি। আমিও তাকে স্বপরিবারে পাহাড়ে ঘুরতে যাবার নিমন্ত্রণ জানালাম। যেতে যেতে একসাথে আরো একটা বিড়ি টানতে টানতে বললাম, আরেকটা বিয়েই না হয় কর, তোকে দেখবে কে বুড়ো বয়সে! খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থেকে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন ভরা চোখে চেয়ে বলল, আমি ওকে তাড়িয়েছি নাকি! আমি ডিভোর্সও দিইনি। সে নেশায় গেছে, নেশা কেটে গেলে ঠিক ফিরবে রে ভাই।

কী সাবলীল ভাবে কথাগুলো বলে দিলো। ভালবাসা প্রকাশের জন্য লক্ষ টাকার হিরের আঙটি লাগে! নাকি বুকে আই লাভ ইউ এর উল্কি আঁকতে হয়! আমরা কত সহজে একটা সম্পর্ককে ঠুনকো তুচ্ছ বিষয়ে ভেঙে দিই, সামান্য রিপালসান টুকুও হয়না পরবর্তীতে। হতেই পারে দেশবন্ধু মাতাল ছিলো, চন্ডাল রাগী ছিলো, কোনো অবৈধ পরকিয়ায় জড়িয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু সংসার ছেড়ে পালায়নি, দায়িত্ব এড়ায়নি। তার স্ত্রী’টি সবকিছুই দেখেছিলো, শুধু এই আদিম নাছোড় ভালবাসাটা খুঁজে পায়নি, যেটা আগলে কতশত দেশবন্ধুরা বেঁচে আছে প্রতীক্ষাতে। হ্যান্ডসেক করি না কোলাকুলি, বুঝে উঠতে না পেরে শেষেরটাই করলাম, সে এটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা, তাই গদগদ হয়ে গেলো।

বড় আশ্চর্য এই মানবজীবন। একজন সংসারের সব কিছুকে মিথ্যা করে স্বামী সংসার সব কিছু ত্যাগ করে নিজের ‘ভালবাসার’ টানে দেশান্তরী হয়েছে। অন্যজন সেই তারই প্রতীক্ষাতে সংসার সাজিয়ে বসে আছে, স্মৃতি আঁকড়ে। তার জীবন সেই বিয়ের দিন, সন্তানের জন্ম, তাদের বেড়ে ওঠার দিনের ‘স্বামী-স্ত্রী’র মিষ্টি খুনসুটির ঘোরেই আচ্ছন্ন। আমাদের ছেলেবেলা, আমাদের সম্পর্ক গুলো এভাবেই এলাকার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে, একটু খুঁজলেই তাদের দেখা মেলে। চারিদিকে এতো সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পারিবারিক হানাহানি, এর মাঝে এমন মিথ্যা প্রেমের গল্প, ফাঁপা হয়ে যাওয়া সংসারের স্বপ্ন, এমন শৈশবের গল্প গুলো বড় দুর্লভ।

লজ্জার কথা হলো, আমি দেশবন্ধুর নামটা ভুলে গেছি, সাথে থাকা ছেলেটিও আমাদেরই সহপাঠী ছিলো, তার যাত্রা ১ বছরই ছিলো, তারপর তাকেও কর্মক্ষেত্রে ঢুকে যেতে হয়েছিলো পেটের দায়ে, সত্যি বলতে তাকে আমি এই লেখা অবধিও মনে করতে পারিনি। শরমের মাথা খেয়ে নাম জিজ্ঞাসা করার সাহসও জোটাতে পারিনি, কী দরকার এমন একটা সুন্দর সম্মীলনীর তাল কেটে দেওয়ার! দেশবন্ধু, ওই নামেই থেকে যাক বাকি জীবনটা। সেক্সপিয়ার তো বলেই গেছেন, "What's in a name?   

বুধবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৫

শুন্য পকেটের তৃপ্তি


স্কুল জীবনে বন্ধুদের সাথে কাড়াকাড়ি করে আলু কাবলি খাওয়া, আর চালসের কোঠায় ঢুকে যাওয়া হাফ বুড়ো বয়সের জীবনের আলুকাবলির স্বাদ কখনই এক নয়। শুধু স্বাদই বা কেন, উৎসাহ আর আনন্দের মাঝেও আকাশ পাতাল তফাৎ। ছোটোবেলায় কখনই হাতে টাকা থাকতনা, দিনে বড়জোড় আটআনা পাওয়া যেতো চেয়েচিন্তে, উৎসবে অথিতিদের দেওয়া উপহার দরুন টাকা আর সময় সুযোগ বুঝে মায়ের কৌটো থেকে চুরি, এটিই ছিলো সাময়িক আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের একমাত্র উৎস।

ইস্কুলের সামনে নারান ঘুগনি, বিলাতি আমড়া, টোপা কুল, কদবেল, কামরাঙ্গা এইসব বেচতো। একটু দূরে হরণ দাদু বেচতো আলুকাবলি, এদিকে মেয়েদের ভিড় তুলনামূলক কম হওয়াতে আমরা আজন্ম হা-ঘরের দল সেখানে সকলের পুঁজি যোগ করে আলুকাবলি কিনতাম। সেই পুঁজি কখনই দেড় টাকা ক্রশ করেনি, কারন আমি, গৌরাঙ্গ বা প্রদীপ গরীব ছিলাম, বাকি ৩-৪ জন ছিলো নিঃশ্ব। সেই আলুকাবলির উপরে কাঁচা ছোলা ছড়িয়ে দিতো, ছোট বকুলতলার ছায়াতে বসে আমরা কী যে পরম তৃপ্তিতে ওই টুকু পরিমান ৬-৭ জন ভাগ করে খেতাম তা আজ ভাবলে কেমন একটা মিশ্র ভাললাগার অনুভুতি কাজ করে। আমিনিয়া বা করিমসে বসে একটা ডিনারে ৬০০০ উড়িয়েও আজকাল সেই সুখকর পরিতৃপ্তি আসেনা।

আমাদের ছেলেবেলাতে ঘর থেকে টিফিন নিয়ে যাবার আয়েসি বড়লোকি আনা ছিলোনা। একান্নবর্তী সংসারে মা কাকিমারা দম ফেলার ফুরসৎ পেতোনা হেঁসেল থেকে, তার উপরে ঠাকমার চোখ এড়িয়ে আলাদা কিছু বানাবার সাহস টুকুও মায়েদের ছিলোনা। তাই দুই চার আনার পুঁজিতে ইস্কুলের বাইরের ওই ফেরিওয়ালারাই ছিলো আমাদের টিফিনবেলার আপনজন।

এক সময় কত স্বপ্ন দেখতাম, বড় হয়ে ঘুগনিওয়ালা হবো। নিজের হাঁড়ি হাঁড়ি ঘুগনি থাকবে, যা বিক্রি হবে হবে, নাহলে আমিই খেয়ে নেবো, কিছুটা বোন আর বন্ধুদের দিয়ে।

তবে সেই ঘুগনিওয়ালা না হলেও, হোটেলের ব্যবসার সুত্রে প্রায় প্রতিটা হোটেলেই ব্রেকফাস্টে লুচির সাথে সপ্তাহে ৩ দিন ঘুগনি হয় বটে, কিন্তু সেই হাঁড়ি ধরে সবটা খাওয়ার বাসনাটা আজ হারিয়ে গেছে।

আজকের আলুকাবলিটা মা বানিয়েছেন। ডায়াবিটিসের জন্য নানান বিধিনিষেধ, তবুও এই সান্ধ্য আলো আঁধারিতে আলুকাবলির পথ বেয়ে ইস্কুলের দিনগুলোতে ফিরে যেতে একটু নাহয় অনিয়মই করলাম-

শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

নিষিদ্ধ পত্র- একটি গদ্য কাব্য

 


প্রিয় প্রাক্তন,


পত্রের শুরুতেই আমার ভালোবাসা নিও। অন্তরের অন্তরস্থল থেকে পাঠানো একগুচ্ছ গন্ধরাজের শুভেচ্ছা গ্রহণ করলে আনন্দিত হবো। আজ তোমাকে লিখতে বসেছি, তুমি ভাবতেই পারো- আজ হঠাৎ কি এমন হলো! জানিনা কি হলো, তবে আমার বিচিত্র খেয়ালের কথা তো তুমি জানো, তবে আজ তোমাকেই লিখতে বসেছি। বিলাপী বৃষ্টি তান ধরছে জানালার বাইরে, বর্ষার সাথে অকৃত্রিম যুগলবন্দি। এই মুর্চ্ছনাতে আমি আজ তোমায় বিষাদের গল্প শোনাবোনা, তোমার উদ্দেশ্য কিছু কথা বলতে চেয়ে আমার এই লেখা।

আচ্ছা, আজকাল তুমি কি প্রেম কর কারো সাথে? সে করতেই পার, তবে যুগ-জামানা ভালো নয়, একটু বুঝে শুনে, একটু সাবধানী…এখন আবার কমপক্ষে খান দু’চার খানা ছাড়া নাকি চলেনা ‘আধুনিক’ সমাজে। শুধুই কী প্রেম করো? ভালোবাসোনা তাকে? ভালোবাসা ছাড়া প্রেম হয়? তার চোখের দিকে তাকাতে লজ্জা পাওয়া, চুম্বনে কঠোর নিষিদ্ধতা, আজও কী তোমার কাছে শুরুর প্রেমের এমনই মানে! তার সাথে নিয়মিত দেখা করো? কেমন লাগে তার আলিঙ্গণে নিজেকে সঁপে দিতে! তুমি নির্জনতা উপভোগ করো, নাকি তাকে? মগজে উত্তেজনা, হৃদয়ে কম্পন আর শরীরে শীতলতার সেই অসাধারণ সম্মেলন নিয়ে আসতে পারো আজকাল?
 
আজও তার সাথে একান্তে সময় কাটাও, হাতে হাত, কাঁধে মাথা রাখো! আজও কি এলোমেলো চুলগুলো ছুঁয়ে গেলে জানান দেয় তোমার হৃদয়ের আকুলতা! আজও কি কোনো নদীর ঘাটে, পার্কের কোনে, নিরিবিলি রাস্তায়, সিনেমা হলের অন্ধকারে তার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে দেখো- তার নিঃশ্বাসে বিষ আছে কিনা! কথা বলো রাত জেগে? অজস্র খুনসুটিসৌরভ মুখরিত করে তোমার সারাদিন? আসও ভালোবাসার প্রতিটা মূহুর্ত বসন্তের বিকালের মত অনুভূত হয়? আজও তার বুকে বিলীন হতে চায় বেহায়া মন? আদিম উন্মাদনার প্রলোভনে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারো আজও? আজও কী তার পাশে বসে নিঃশব্দে ধ্রুবতারা থেকে স্বপ্ন পেড়ে আনো? 
 
আজও কি বলো ‘বহিরঙ্গের রূপ নয়, আমি গুণের প্রেমে পরেছি’, আজও কি ‘জীবনের প্রথমখুঁজে ফিরছো- যে তোমাকে ভালোবাসে! আজও আলিঙ্গনের ইঙ্গিতেই তোমার গভীর অনুভূতিরা বাঙ্ময় হয়ে উঠে? আজও কি শরীরকে উদযাপন করো? করলে কীভাবে সান্ত্বনা দাও প্রতিটা কলঙ্ককে, কীভাবে নিজেকে মানসিক সমর্থন করো? আজকে তোমার কাছে স্নেহের সংজ্ঞা কি বদলে গেছে? সুযোগ নেওয়ার পরিভাষাই বা কী? আজ কীভাবে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো জীবনে, আজও কি তোমার নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব হয়?

তাকে অনুভব রো প্রতিটা মুহুর্তে, প্রতিটা নিশ্বাসে। তার হাসির মিষ্টতা তোমার দৃষ্টিতে মিশে মায়াবী চাহনি তৈরি করে? সেই পুড়িয়ে দেওয়া দৃষ্টি দিয়ে শরীর জুড়ে ভালোবাসার উষ্ণতা ছিটিয়ে পারো? লক্ষ কোটি বছর ধরে পলকহীন চেয়ে আজও কী হৃদয়ের সবচেয়ে শীতলতম স্থানটিতে ভালোবাসার চাষাবাদ হয়। আজও কি তার চোখের দিকে তাকিয়ে দিগন্ত জোড়া সোহাগের ময়দানে অবুঝ শিশুর মত ছুটে বেড়াও! আহ্লাদে স্পর্শরা কি সকল বাঁধ ধ্বসিয়ে দিয়ে লজ্জায় মুখ নীল করে চোখ বন্ধ করে দেয়?
 
নাহ, কোনো বিস্তৃত প্রেক্ষাপটের উপরে জবাবদিহি চাইছিনা, সামগ্রিকভাবে বদলে যাওয়া সময়ে তোমার আচরণ বিবেচনা করতে সাহস সঞ্চয় করতে পারার তাগিদও দিচ্ছিনা। জানো তো, পালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো কিছুই অপরিহার্য নয়শুধু থেকে যেতে, বহু কিছু লাগে, বহু কিছু।
 
আমি কী করছি? জানি তুমি জানতে চাইবেনা, তবুও বলি- আমি দেখি, কেবল দেখি। দেখতে দেখতে লিখি, লিখতে লিখতে দেখি।
 
দেখি, রাস্তার ধারের কোনো ছাওয়াতে বুড়ো কুকুরটা ক্লান্তিতে জিভ বের করে নিজেকে ঠান্ডা করছে। দুপুরের রোদে বিতৃষ্ণ পথিকের মুখে বিরক্তের বলিরেখা, মোছার ব্যার্থ চেষ্টা করছে জামার আস্তিন দিয়ে। উদাস এলোমেলো হাওয়া সমস্ত দুর্গন্ধ শুষে নিচ্ছে কি যেন মন্ত্রবলে। ঢেউহীন নির্ভীক নদী নিঃশব্দে বয়ে চলেছে অন্তহীন, যুগযুগান্ত ধরে নিঃস্ব, নিরাসক্তভাবে একই অভিমূখে, কখনও যার উল্টোপথে হাঁটার সাধ জাগেনা। তার বয়ে যাবার জন্য জমিকে জঞ্জালমুক্ত করতে হয়নি কখনও।  
 
শাশ্বত সভ্যতা রোজ বদলে যাচ্ছে সংস্কৃতির পথ বেয়ে, মানবতার স্বল্পায়ত জীবনসীমায় কিছু মহৎ শব্দেরা গদ্য এঁকে যায় আপন মনে। তবু ঘেঁটু, কলমি, হেলেঞ্চার মত আদুরে শিকড়ের বলে টিকে থাকা লতারা চেয়ে দেখে বাঁশবন, হিজলের ছায়া, আমবন, পুরোনো বটের শিকড়ে ঘিরে ধরা পোড়ো ভিটে, গুঁড়ি-মোটা পাকুরের ডালে গাংচিলের বাসা। কে জানে আজও কেন নিষ্ঠুর পৃথিবীটা শুধু ঘুরে চলে অক্লান্ত মোহে, কে জানে কোন উদ্দেশ্যে, কার টানে।
 
ছায়াচ্ছন্ন গুমোট প্রাণে খুঁজে ফিরি কর্মখালির বিজ্ঞাপন, প্রেমিকের কাজ জানা ‘লোক’ চাই। আমি অবসরে যাওয়া পরিত্যাক্ত প্রেমিক, যে নির্জলা ‘আদরের’ উপবাস করছি। পার্থিব হৃদয়ের পবিত্র বাসস্থানে বসে নগ্ন জীবনের ব্যর্থতাকে উপভোগ করছি চুটিয়ে। আনন্দঘণ শহরের পথে পথে নিপুনতার মুখোস, উপশিরা জুড়ে ক্রোধ আর ভাবনাতে ধর্মঘটআতঙ্কের ফাঁসি কাঠে ঝুলতে থাকা কারো কাছে, ভ্রমণের গল্পের চেয়ে বড় নির্যাতন আর হয়না। তাই মিলেমিশে চেয়ে থাকি অপেক্ষার সাথে, এক অস্থির কলহাস্যে অপেক্ষার মুখেও প্রশান্তি খেলে যায়, আবার হৃদয়ে গিঁট দিই সজোরে। মরমে আগুন জ্বালিয়ে এক দুর্বোধ্য অজুহাতে, সমস্ত লণ্ডভণ্ড হওয়ার প্রতীক্ষাতে বসে থাকা আমার হৃৎস্পন্দনেও হরতাল
 

 


মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

এলোমেলো ঘুড়ি


সুতো ছিঁড়ে যাবার পর ঘুড়িটা ভাবলো সে স্বাধীন, আজ নিজের খুশিতে উড়ছে। যতক্ষণ উড়লো, আনন্দের আতিসায্যে যে সে ভুলে গেল- এটা ছিল বহমান বাতাসের দয়া। 

দয়া খুবই সাময়িক, সামনের জনের উপরে নির্ভরশীল। ফলত ঘুড়িটা আর কোনোদিন আকাশ দেখলো না। গোঁত্তা খেয়ে মুখের বলে মাটিয়ে পরে ছিন্নভিন্ন হয়ে পরে রয়েছে কোথাও। অথচ সুতো ছিঁড়ে না গেলে বা দিলে সে  আবার পরদিন আকাশে পৌঁছে যেতো। আসলে লাটাই, যে সুরক্ষা দিতো- তাকেই বন্ধন বা শৃঙ্খলা মনে হয়েছিলো ঘুড়ির। পরিমিত ও বন্ধনের বাঁধনে থাকাটাকে পরাধীনতা মনে হয়েছিলো ঘুড়ির। সুতো কেটে দেবার মাঝে জীবনের স্বার্থকতা মনে করেছিলো।

আসলে দিনের শেষে সকলেই একটা সুতোর বাঁধন দিয়ে লাটাই নামের সংসারে বেঁধে থাকতে চায়। যেখানে শাসন থাকবে, মানা থাকবে, আদেশ, নিষেধ থাকবে। তবে সেখানে ভালবাসা শব্দটা মর্যাদা পাবে। সুতো কেটে গেলে কেউ কারো খোঁজ নেবেনা আর- কখনও। 

আমরা আকাশে উঠলে আগে লাটাইকে ভুলে যায়, আর সুতো কেটে স্বাধীন হতে গিয়ে- অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলি। ন্যংটা লোভ একাকিত্ব আর সামাজিক পঙ্গুত্ব দেয়। জুড়ে থাকার মাঝে যে আসল সুখ- তা আমরা হারিয়ে বুঝি।

শনিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৫

যৌনতাঃ সুস্থ দাম্পত্যের চাবিকাঠি


শখের পুরুষ/নারীকে বিয়ে করেছেন?

তার পরেও অকারন মনোমালিন্য; আর সেই থেকে নিত্য অশান্তি?
দাম্পত্য কলহ যে সকল সময় হাতাহাতি পর্যায়েই পৌছাতে হবে তেমন কোনো মানে নেই, মানসিক দুরত্ব সবচেয়ে বড় সমস্যার কারন। দীর্ঘদিনের এই দুরত্ব ক্রমশ ফাটলে পরিনত হয়, পরকিয়ার জীবানু বাসা বাঁধে।
‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর সেক্সুয়াল মেডিসিন’ নামের একটা আন্তর্জাতিক সংস্থা ২০২০ সালে একটা জরিপ করে ২০-৪৫ বছর বয়সী বেশ কয়েক হাজার স্যাম্পল দম্পতির উপরে। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই সংস্থার মতে, সেই সকল সম্পর্কই সুখী, যারা নিজেরা স্বেচ্ছায় যৌনতাকে উপভোগ করে, বাৎসরিক হিসাবে ১৫০ বার- সপ্তাহে নুন্যতম ৩ বার, অর্থাৎ মাসে ১২ যৌন মিলন করে।
পুরুষের চোখে নারী শরীরের সবটাই শিল্পকর্ম, তার কামনা কখনও শেষ হয়না। চোখের ভাষা, ঠোঁটের ইশারা, মুখশ্রীর মায়া, আলগা চুলের হালকা আলগোছামো, আঙুলের সরল সৌন্দর্য, ত্বকের কোমল উজ্জ্বলতা কিংবা নিতম্বের সূক্ষ্ম গড়ন- সব কিছুই মুগ্ধ বিস্ময়ে ছুঁয়ে যায় পুরুষের সচেতন অবচেতন অনুভব। পুরুষের ইন্দ্রিয়ের পর্দায়, কল্পনার ক্যানভাসে চিরস্থায়ী রঙিন মুর্তি কোন এক প্রেয়সীরই হয়। অপরদিকে শখের পুরুষের তারিফ করার মাঝেই নারী তার সৌন্দর্যের সার্থকতা খুঁজে পায়, নিজের পুরুষের শক্ত বাহুডোরেই তার যাবতীয় আত্মিক তৃপ্তি।
সুতরাং, পূর্ণ যৌবনে কোনো দাম্পত্যে যদি স্বাভাবিক যৌনমিলন না হয়, তা নারী পুরুষের স্বাভাবিক চরিত্রের পরিপন্থী, অসুস্থতার লক্ষণ- যেটা শারিরীক হতে পারে বা মানসিক।
একজন দম্পতির কতবার যৌন মিলন করা উচিত তা নির্ভর করে সেই দম্পতি এই বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার উপর। যেসব স্বামী স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া ও মনোমালিন্য বেশি হয়, তাদের ‘ডেটা’ পর্যালোচনা করলে দেখা গেছে, তারা নিয়মিত যৌন সহবাস করেনা।
সহবাস করলে দেহ থেকে অক্সিটোসিন সহ নানা হরমোন নির্গত হয়ে দেহ এবং মনে প্রশান্তি-স্বাচ্ছন্দ্য আনে। ঘুম ভালো রাখে, হৃৎপিণ্ড সুস্থ রাখে,শরীরের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ানো সহ বিভিন্নভাবে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। বিশেষ করে মহিলাদের জন্য সুস্থ যৌনসম্পর্ক তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ জরুরী। বিয়ের আগের মাইগ্রেন বিয়ের পর ভালো হয়ে গেছে এমন উদাহরণ ভারিভুরি।
স্বামী স্ত্রীর মধ্যে অনিয়মিত যৌন সহবাস এক অদ্ভুত ধরনের বৈরিতা শুরু করে, একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হওয়া শুরু হয় এবং যা বাড়তেই থাকে, ওভার থিঙ্কিং শুরু হয়, আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়, ডিপ্রেশন আসার ফলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। ফলে ছোটখাটো বিষয়, নন-ঈশ্যুকে ইশ্যু বানিয়ে নিয়ে আপসে ঝগড়া শুরু করে দেয়।
উপরোল্লেখিত সংস্থার জরিপ মতে, যে সকল স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক স্বাভাবিক ও হাসিখুশি, তারা সপ্তাহে অন্তত পক্ষে ৩ বার বা তার অধিকবার যৌনমিলন করে বাৎসরিক গড়ের হিসাবে। ডেটা এ্যানালিসিস করে দেখা গেছে যে দম্পতিদের মাঝে যৌনমিলন যদি সপ্তাহে ২ বারের কম হয়, তথা বাৎসরিক ৫০ বারের কম মিলিত হয় (২০-৪৫ বছরের দম্পতিদের মধ্যে), তাহলে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে যে দম্পতিটি তাদের দাম্পত্য নিয়ে অসুখী।
যৌনমিলন স্ত্রী-পুরুষকে সবচেয়ে কাছাকাছি নিয়ে আসে, নিজেদের মাঝে রসাত্বক একান্ত আলাপচারিতা সম্পর্ককে স্বাভাবিক করে, সন্দেহ দূর করে, পরকিয়ার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়, পর্ণ আশক্তিকে নির্মূল করে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই আত্মিক বন্ধন গভীর হয়। যে সম্পর্ক যতো গভীর, তাদের সুখী হওয়ার সম্ভাবনাও ততটাই বেশী।
স্পর্শ, দৃষ্টি বিনিময়, নিঃশ্বাসের উষ্ণতা অনুভবই হলো ভালোবাসার নীরব ভাষা। একসময় শরীর কেবলমাত্র আকর্ষণের বাহক হয়ে রয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের নিঃশব্দ সংলাপের সেতু। চরম মুহূর্তে কামনা আর ঐশ্বরিক প্রেম মিশে যায় এক অনির্বচনীয় পূর্ণতায়, যেখানে শরীর আর মন একে অপরকে জড়িয়ে এক পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতায় পরিনতি পায়।
সঙ্গীর প্রতি অধিক যৌনতা অনুভব কোনো কুপ্রবৃত্তি নয়, বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক আহ্বান, আগামীকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র পদ্ধতি। পুরুষের সহজাত আকর্ষণ চোখ দিয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করে, একজন স্ত্রী তার পছন্দের পুরুষের স্পর্শে আদরে তার মানসিক প্রশান্তি খুঁজে পায়। সুস্থ স্বাভাবিক সাংসারিক জীবনে যৌনতা হল পেন্ডুলামের ছন্দ, যাতে মিশে থাকে মায়াবী কোমলতা, যা হৃদয়ের মাঝে ভালবাসাকে উষ্ণ রাখার কৌশলও বটে।
ডিভোর্স হওয়া ৩০০০ স্যাম্পল দম্পতির মধ্যে দেখা গেছে ৮৩% ক্ষেত্রে সেই দম্পতিদের মধ্যে শেষ ৪ বছরের সম্পর্কে, বাৎসরিক গড়ে ৫০ বারেরও কম তারা যৌনসম্পর্কে মিলিত হয়েছিল।
দৈনিক শত সহস্র সংসার ভেঙে যায় অহেতুক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অ-কারনে, যার সত্যিই তেমন কোনো ভিত্তি নেই। সঠিক বোঝাপড়া না হওয়ার কারণে, বন্ধন দানা বাঁধতে বাঁধতে রয়ে যায়, এই সময় দম্পতির মাঝে নিয়মিত দৈহিক সম্পর্ক অনেক ফুটোফাটা মেরামত করে দেয় রাগে অনুরাগে।
তাই নিজের সঙ্গী/সঙ্গীনীর সাথে মনোমালিন্য থাকলে যত দ্রুত সম্ভব সমাধান করার চেষ্টা করুন উভয়ের ইচ্ছাকে সম্মান করে, অবশ্যই অনিয়মিত যৌনমিলনকে স্বাভাবিক করার মাধ্যমে, কারন একটা নারী পুরুষের জুটিকে এই সময়ের থেকে কাছে আর কোনো পরিস্থিতিই আনতে পারেনা।
পার্টনারের তরফে কবে শুরু হবে তার প্রতীক্ষায় সময় আর যৌবনকে খুন করবেন! নাকি আপনি নিজেই উদ্যোগী হবেন একটা দুর্দান্ত ‘শরীরী’ শুরুর জন্য, যা খাদের কিনারা থেকে দাম্পত্যকে বাঁচিয়ে একটা নতুন শুরু দেবে। আজই.....

ভালো থাকাটা জরুরী



শান্ত হও, মেনে নাও। যে যেতে বাধ্য করেছে, সে অনেক আগেই অন্যের নৌকায় সাওয়ার হয়েছে। চলে যাওয়াটা ফল, বিষ গাছের জন্ম অনেক অনেক আগে। তুমি বিষকে চিনতে পারোনি বা উপেক্ষা করে গেছো সেটা তোমার ব্যর্থতা। সে ভালো থাকতে চেয়ে তোমাকে তাড়িয়েছে, তার অধিকারে হস্তক্ষেপ কোরোনা। জোর করতে নেই। ভালোবাসার আগে ভালো থাকাটা জরুরী। শুধু সম্পর্ক রাখতে হবে বলেই জোর করতে নেই। লোক দেখানো ভালো থেকে তোমার কী লাভ? বাস্তবকে মেনে নাও।

সে তার স্বার্থে তোমাকে ব্যবহার করে ওয়াক থুঃ করে দিয়েছে, যখন তুমি সবথেকে অসহায়। যে পাখি কখনও তোমার ছিলোনা, তাকে ভালোবাসার শিকলে বাঁধতে চাওয়া- তোমার অন্য কোনো পাপের সাজা। সরল হবার আগে সহজ হওয়া জরুরী। মেনে নেওয়া কঠিন, কিন্ত শক্তি রাখা জরুরী। তোমাকেই আগলাতে হবে নিজেকে। যে মুহুর্তে সে সামাজিকভাবে যৌনতার স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছিল, তোমার সাথে আনুষ্ঠানিক দাম্পত্যের মধ্য দিয়ে- সেখানেই তার উদ্দেশ্য সাধন হয়ে গিয়েছিল। এই চালাকিটা হাসিলের জন্য এতো প্রেম ভালবাসার অভিনয় ছিলো, স্বীকৃতি.....
তুমি যে মূল্যহীন- তা বুঝতে সময় লেগেছে বলেই কষ্ট পাচ্ছো, মনে হচ্ছে ঠকে গিয়েছো। শুরু থেকেই তুমি বোঝা হয়ে গিয়েছিলে, মানুষ অনিচ্ছা সত্বেও তেতো অষুধ খায়- তোমাকেও তেমনই সহ্য করেছে সে, শুরুর দিন থেকে- নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে। আজকের দিনটা কোনো ব্যতিক্রমী নয়, ব্যতিক্রমী সেদিন ছিল যেদিন তুমি বিবেক বিসর্জন দিয়ে আবেগের বসে তাকে সৎ ভেবে বসেছিলে। এটা পাপ ছিল। পাপের সাজা ভুগতেই হবে।
তুমি ধোকা খাওনি, সে দিয়েছে। সাদাচোখে মনে হচ্ছে সে জিতে গেছে, বিশ্বাস করো- এটা তাৎক্ষণিক। যত সময় যাবে সামাজিক সুরক্ষার পর্দা সরে গিয়ে কামের লোলুপ দৃষ্টি বিষে যখন প্রতিনিয়ত দংশন জ্বালা অনুভব করবে, সেদিন সেই যাতনার কথা বলার মত কাউকে পাবেনা পাশে। বিশ্বাস করো, এমন দিন আসবেই।
ধোকা ততক্ষণ রোমান্টিক যতক্ষন নিজে না খাচ্ছো। সে যেদিন ধোকা খাবে- লুকানোর জাইগা পাবেনা এতোবড় পৃথিবীতে

রবিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৩

এক পাহাড় প্রেম



সৃষ্টিকর্তা পাহাড় বানিয়েছে, সেখানে সবুজ বন দিয়েছে, আর আছে সেই সবুজ বনের খাঁজে খাঁজে উচ্ছল ঝর্ণা। রয়েছে খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর কলধ্বনি যারা বাতাসের সাথে যুগলবন্দিতে একটা মিলনাত্বক বন্দিশের সৃষ্টি করে। পাহাড়ি বনের মাঝে জমে থাকা লক্ষ লক্ষ বছরের প্রাচীন দই-জমা কুয়াশাতে লেখা ছিল আমার ঠিকানা।

আমাদের জীবনটাও এই পাহাড়ের মতই, দাঁড়িয়েই থাকি অধিকাংশ সময়, কত এবড়োখেবড়ো পথ, কান্নার নদী, হাসির ঝর্ণা, অন্ধকার কুয়াশাচ্ছন্ন আগামীকাল, পাকদণ্ডী বেয়ে শুধুই চড়াই আর উৎরাই, দু'ধারে কত সম্পর্কেরা পরে রয়ে যায় রঙিন পাহাড়ি ফুলের মতো, মেঘের মতই ঋজু বনানীতে জমা থাকে বেদনা, হতাশা আর ব্যর্থতার বাষ্প, ভোরের সুর্যের মত উঁকি দেয় সুখ, তারপর সেই সুখ পুড়িয়ে দিয়ে অস্ত যায় আরেকটা সুখকে আনবে বলে। হিমেল ঠান্ডা, একটা অন্ধকারের চাদর গায়ে শুয়ে পরে পাহাড়, জীবনও। পাহাড়েও ভূমিধ্বস হয়, ঝরে যায় জীবন- কত সমার্থক এই জীবন নামের পাহাড়ের সাথে- জীবন্ত পাহাড়ের। আমরা তো শুধু হেঁটে পেড়িয়ে যাবার চেষ্টা করি মাত্র। না পাহাড়ে বাস করি, না জীবনে- শুধু দৌড়ে মরি।
অথচ আমরা কোথায় ঘুরে মরছি! ভেবে দেখেছেন, আমরা কার সাথে জিতে কী হাসিল করতে চাইছি? সত্যিই আমরা কত কাজ করি, পরিশ্রম করি, বাড়ি-গাড়ি-সংসার-অর্থসম্পদ সঞ্চয় করি, কিন্তু হিসাব কষে বলতে পারবেন- কদিন বেঁচেছিলেন ঠিক যেমনটা বাঁচতে চেয়েছিলেন বা বাঁচা উচিৎ ছিল! আপনার স্মৃতি পটে কী নিজেকে সঞ্চয় করতে পেরেছেন?
এমন কোথাও, এমন কোনোখানে, আমরা গোটা জীবনটা কাটিয়ে দিই, যে জায়গার অধিকাংশটা 'আমার' ছিলইনা কখনও। নিজের সাথে জেতার বদলে আমরা সেই মানুষগুলোর সাথে অলীক রেস লাগিয়ে দিই, যারা কখনই 'আমার' ছিলনা।
বিলাস বস্তু সুখ দিলেও, মানসিক শান্তি দিতে অক্ষম। অভিলাষ আর প্রয়োজনের মাঝে যে বিষয়টা থাকে তার নাম মানসিক পরিতৃপ্তি।
আর এই পরিতৃপ্তির জন্যই আমরা বেড়িয়ে পরি- সেই পরিবেশের উদ্দেশ্যে, যা আমাদের আসল ঠিকানা, যেখানে কৃত্রিমতা নেই, প্রকৃতির মোহনীয় রূপটানের কৌমার্য আজও অক্ষতযোনি-
সময় হলে আসবেন কখনও আমাদের পাড়ায়, হিমালয়ে- যেখানে আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তাল তাল জীবন.....

রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২১

অকপট চড়ুইভাতি ২০২১



সম্পূর্ণ সিডিউল

শেষ কয়েক বছরের পরম্পরা মেনে করোনাকাল-২০২০ সালে অকপট চড়ুইভাতির আয়োজন করতে পারেনি টিম ‘অকপট’। ২০২১ এর শুরুর লগ্নে যখন প্রায় সকল কিছু আবার ছন্দে ফিরেছে, অকপটও সেই তালে পা মিলিয়ে কিছুটা মুক্তির স্বাদ পেতে মরিয়া।

অকপট চড়ুইভাতি মানে- শুধুই তো আর খাওয়াদাওয়া নয়, বরং এটা বাৎসরিক পারিবারিক মিলনোৎসব। অকপটুরা নিজ নিজ পরিবারের সাথে ৩টে দিন একসাথে থেকে, ভ্রমণ করে নিজেদের হৃদয়ের উষ্ণতা ভাগ করে নেয় এমন একটা সম্মিলনীতে। এটাকে যেমন শুধুই পিকনিক বলা যায়না তেমনই একে শুকনো ভ্রমন ও বলা চলেনা, এ আসলে অকপট চড়ুইভতি, এখানে ভ্রমণ ও চড়ুইভাতির সম্মিলনী ঘটে অন্তরের টানে।

এ বছর আমাদের যাত্রা শুরু হচ্ছে আগামী ২৯শে জানুয়ারি শুক্রবার, ২০২১। ঠেক- গিধনি।

গিধনি, এটি হল পশ্চিবঙ্গের অন্তিম রেলস্টেশন। মাইলের পর মাইল খাঁ খাঁ ঢাড় জমির ওপর দিয়ে হুমহাম শব্দে তীর ধনুক নিয়ে এখান দিয়েই শিকারে যেত আদিবাসীরা, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। বাজার দোকান সবই এই শেষ কয়েক দশকের দান, একটা সময় ড্যাঞ্চি বাবুদের চেঞ্জে আসার নিশ্চিন্ত আস্তানা ছিল এই গিধনি। লাল মোটা ধানের ভাত আর স্থানীয় বুনো কপির তরকারি দিয়ে হাউহাউ করে গোগ্রাসে গিলতো- পাথুরে হজমি জল পেটে পড়তেই। সপ্তাহান্তের হাট থেকে আনা মাছ কিংবা বনমুরগি দিয়ে স্বল্প মশলার আমিষান্ন- সে এক পরম সুখের দিন ছিল।

সেই গিধনি আজ জমজমাট মফঃস্বল। বেশ বড় বাজার, টোটো গাড়ির ভিড়ের সন্ধ্যা যেন জনঅরণ্য। কিন্তু লোকালয় ছেড়ে দু’পা এগিয়ে গেলেই শ্যামল গ্রাম, উঁচুনিচু মাঠ, তেপান্তরের সীমা অবধি ছড়িয়ে থাকা পাথুরে জমির বুকে সারি সারি তাল আর খেজুরের সারি; আরো দূরে মহুয়া, শাল, পিয়াল, সোনাঝুরি, শিরিষ, ইউক্যালিপটাসের সবুজের সমারোহ- আর নাম না জানা ছোট্ট নদীর তিরতিরিয়ে বয়ে যাওয়া- হাজার বছর আগেও যেমন ছিল, আজও তেমনই রয়েছে- হয়ত অবিকল। মস্ত দীঘি ভরা শালুক ফুলেল জলে স্নানরত ছেলেপুলের দল।

রওনা- ২৯শে জানুয়ারি, শুক্রবার, ২০২১। সন্ধ্যা ৫টা ৩০ মিনিটে হাওড়া স্টেশন থেকে রওনা হওয়া “12813 - স্টিল এক্সপ্রেসে” চড়ে বসবে অকপট পরিবার- যারা উত্তরবঙ্গ, মধ্যবঙ্গ ও কলিকাতা সংলগ্ন অঞ্চল থেকে আসবেন। রাত্রি ৭টা ৫৫ মিনিট নাগাদ ট্রেনটি আমাদের নামিয়ে দেবে ঝাড়গ্রাম স্টেশনে, সেখানে ‘অকপটের টিম বাস’ অকপটুদের রিসিভ করে ‘গিধনি’র নৈশ আবাসের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাবে। সেদিন রাত্রে দুটো মরশুমি সব্জির তরকারির সাথে মুরগির মাংসের পাতলা ঝোল দিয়ে দুটি ভাত খেয়ে গল্পগাছা করতে করতে ঘুমের দেশের পাড়ি দেওয়া হবে ক্লান্ত শরীরে।

সকল পুরুষদের জন্য এক বা একাধিক স্থানের বন্দোবস্ত থাকবে, যেখানে পর্যাপ্ত টয়লেট ফেসিলিটির সাথে, পরিচ্ছন্ন বালিশ, বিছানা, বিছানার চাদর, কম্বল, তোষক ইত্যাদি যথেষ্ট পরিমাণ মজুত থাকবে শীত নিবারণের প্রয়োজনে। মহিলা ও শিশুদের রাত্রিনিবাসের স্থানটি এলাকার অন্যতম সুরক্ষিত স্থানে করা হয়েছে, যেখানে উপরোক্ত পরিমাণে শীতবস্ত্র, বিছানা কম্বল ও পর্যাপ্ত বাথরুম থাকবে।

৩০শে জানুয়ারি, শনিবার, ২০২১। এটি আমাদের ভ্রমণ দিবস। সকালে প্রাত্যহিক কর্ম সম্পাদন করে প্রস্তুত হওয়া মাত্রই, জলখাবারের ব্যবস্থা থাকবে। যেখানে, পুরী-সব্জি, ইডলি-সাম্বর, ধোসা-বড়া-সাম্বর ইত্যাদি বিকল্প ধরনের প্রাতঃরাশের ঢালাও ব্যবস্থাপনা থাকবে।

এরপর আমাদের টিমবাস বেড়িয়ে পড়বে বাংলার জঙ্গলরানী জামবনী ব্লকের উদ্দেশ্যে। সেখানে তিরতির করে বয়ে চলা ড়ুলং নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে মহারাজা গোপীনাথ সিংহের তৈরি- ঐতিহাসিক ‘চুয়াড় বিদ্রোহের’ সাক্ষী বহন করে চলা ‘চিল্কিগড় রাজবাড়ী’ প্রাঙ্গণ। বৃহৎ তোরণ দ্বার পেরিয়ে গবুজ ঘাসের গালিচা বেছানো পথে উন্মুক্ত প্রান্তরের বামদিকে সুপ্রাচীন অশ্বত্থ গাছ আপনাকে সেই ১৭৬৯ সালের গল্প শোনাবে ফিসফিসিয়ে। অদূরে মন্দির, পরিত্যাক্ত কর্মীআবাস, আউটহাউসকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে আছে রাজপ্রাসাদের মূল অংশ। অপুর্ব সুন্দর মনোরম পরিবেশে কিছুক্ষণ থিতু হয়েই আমরা রওনা দেব অদূরের কনকদুর্গা মন্দিরের উদ্দেশ্যে।

মালভূমির উপর দিয়ে বয়ে চলা নামটির মত জলতরঙ্গ খেলিয়ে বয়ে চলা নদী ডুলং। কিছুটা জঙ্গলে ঢাকা কংক্রিটের পথ পেরিয়ে যেতে হবে মন্দিরে, এই জঙ্গলটির নাম ভূষণ। সরকারি হিসাবে প্রায় ৪৩৩ ধরনের বিরল উদ্ভিদের দেখা মেলে এই জঙ্গলে, যার অনেকগুলিই ভেষজ হিসাবে দুষ্প্রাপ্য। নিম, বাবলা, বাঁদরলাঠি, অর্জুন, শিরীষ, গুলঞ্চ, পিপুল, সঞ্জীবনী সহ কতধরনের অজানা বনানীর যে সমাহার রয়েছে তার গণনা করা ভীষণ কঠিন। হরেক ফুল, প্রজাপতি, বাঁদর আর পাখীর ডাকের আলোআঁধারি পরিবেশটাই যেন শতাব্দী প্রাচীন মন্দির চত্বরটিকে একটা আশ্রমের মেজাজ দিয়েছে। কিছুটা এবড়োখেবড়ো পথ অতিক্রম করে পৌঁছাতে হবে মিষ্টি ডুলং নদীর পাড়ঘেষা কনকদুর্গা মন্দির চত্বরের জঙ্গলটিতে। মন্দির সংলগ্ন অঞ্চল ভ্রমণ শেষে আমরা রওনা দেব গদরাশোল গ্রামের উদ্দেশ্যে, এটি আদিম উপজাতি লোধা ও শবরদের গ্রাম, দেখে নিতে পারব আমাদের আদিম ভারতের জনজাতির নিজস্ব সংস্কৃতি।

ততক্ষণে বেলা অনেকটাই হয়ে গেছে, কিন্তু কুছ পরোয়া নেহি। গদরাশোল হাটচালাতে আমাদের মধ্যাহ্নভজন পৌঁছে যাবে অন্য গাড়িতে, ‘ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন’। ভরপেট খেয়ে দেয়ে আমরা বাসে বিশ্রাম করতে করতে রওনা দেব ২৭ কিমি দক্ষিণে সুবর্নরেখা নদীর তীরবর্তী গোপীবল্লভপুর ইকোপার্কের উদ্দেশ্যে। প্রসঙ্গত, এই ভ্রমণে পার্কের এন্ট্রি ফি, বা কেউ যদি কোনো রাইড (নৌকা বা প্যাডেল বোট) নিতে চায় সেক্ষেত্রে খরচা অতিরিক্ত ও ব্যাক্তিগত।

চোখজোড়ানো মনভোলানো উদ্যানটি ঘুরে ফিরে দেখে নিয়ে রওনা দেব ‘ঝিল্লি পাখিরালয়’ এর উদ্দেশ্যে। ঘন প্রাকৃতিক জঙ্গলের মাঝে এক অপূর্ব মনোরম সরোবরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ঝিল্লি পাখিরালয়, যা মূলত পরিযায়ী পাখীদের নিশ্চিন্ত শীতকালীন আবাসস্থল। উড়ে বেড়ানো বান্টিকের ঝাঁকের সাথে দেখা মিলবে চাঁদি ঠোঁট, বালি হাঁস, নিরল পরিনা, নীলকণ্ঠী ফিদ্দা, চুনী কন্ঠী, শিলাফিদ্দা, ছোট সারস, ছোটন ভোমরা, ভরত পাখী কিম্বা হরেক ক্যামফ্লেজে আপনাকে টুকি দেওয়া মুনিয়ার ঝাঁক। এই পাখিরা এখানে খাদ্য আহরন করে, বাসা বাঁধে এবং ছানা ফুটিয়ে বড় করে; অতঃপর শীতকাল কাটিয়ে বসন্তে আবার উত্তরে উড়ান দেয়। পর্যটকদের জন্য ঝিলের একপাড়ে বেশ সাজানো গোছানো ছোট্ট পার্ক মতন করা রয়েছে। সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা পাড়ি দেব আমাদের রাত্রিযাপনের স্থান গিধনির উদ্দেশ্যে, কিন্তু তার আগে আমরা একবার ঢুঁ মেরে নেব ‘হাতিবাড়ি অরণ্যের’ মাঝে।

গ্রামছাড়া রাঙামাটির পথ পেরিয়ে প্রাকৃতিক শাল-পিয়ালের অরণ্যের মাঝখান দিয়ে, পটে আঁকা ছবির মত শান্ত স্নিগ্ধ বয়ে চলা সুবর্ণরেখা নদীর সাথে লুকোচুরি খেলার স্থানটির নামই হলো 'হাতিবাড়ি অরণ্য'। লাল বালির পাড় বেয়ে নেমে শান্ত স্থির সুবর্ণরেখার বুকে, অস্তগামী সুর্যকে সাক্ষী করে পানসীতে খানিকটা ভেসে বেড়াবার সুখের মত নৈসর্গিক সুখ কমই আছে বাংলার ভূমিতে। অবশেষে সুর্য যখন গাছপালার মাঝে অস্ত যাবে- আমাদের বাসও রওনা দেবে তখন।

সন্ধ্যায় ফিরে হাতমুখ ধুয়েই গরম কফির সাথে বেগুনী বা বিউলি ডালের বড়া দিয়ে নৈশভোজের ফিতে কাটা হবে। মহুলের জঙ্গল থেকে যখন হিম পড়ার আওয়াজ আসবে টিপিটুপটাপ করে, দূর হতে রেলগাড়ির হুইসেল ছাড়া কেবল মাত্র রাতচড়া পাখী আর ঝিঁঝিঁ পোকাদের কলতান শোনা যাবে তখনই আমাদের ‘ক্যাম্পফায়ার’ শুরু হবে। স্তূপীকৃত শুকনো কাঠের আগুনের ‘ওম’ নিতে নিতে, ‘ইয়েল’ এর নেতৃত্বে শুরু হওয়া আড্ডা, গান, খুনশুটির ছলে নিজেদের মাঝের বন্ধনকে মজবুত করে নেওয়ার পালা। সাথে থাকবে ঢালাও চিকেন পকোড়া আর উষ্ণ কফি। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে আগামীকালের জন্য প্রাণকে সতেজ রাখার তরে ক্যাম্পফায়ারের মত নির্মল চিত্তবিনোদনের কোনো বিকল্প নেই।

রাত্রি একটু গভীর হলে ডাইনিং হল থেকে ডাক আসবে পাচকের, জামবাটি ভরে উঠবে দিশি মুরগি কিম্বা হাঁসের মাংসের ঝোলে। আপনি যদি চালের আটার রুটি বিলাসী হন, তাহলে তো কথাই নেই, এদিন সেই ব্যবস্থাই থাকবে, আর নিতান্তই যদি ভেতো বাঙালী হন তাহলে গরম ভাত আর যাচ্ছে কোথায়, হাতে বেলা আটার রুটির সাথে সেও থাকবেই পাতে- যদি আপনি তা একান্তই বলে রাখেন আগে ভাগে। এর পর আর কী, ঘুমের দেশে পাড়ি দেওয়া…

৩১শে জানুয়ারি, রবিবার, ২০২১। এই দিনটি আমাদের বাৎসরিক চড়ুইভাতির দিন। যদি কোনো বন্ধু কেবলমাত্র এই দিনেই অংশগ্রহন করে চলে যেতে চান, তেমনটাও করতে পারেন।

এদিনও সকালটাও শুরু হবে গত দিনের মতই চা/কফি বিস্কুট দিয়ে। তার পরেই আমরা তৈরি হয়ে রওনা দেব গিধনি থেকে ৩২ কিমি দূরে বেলপাহাড়ি ব্লকের জঙ্গলঘেরা ‘আমলাশোল’ গ্রামে। হ্যাঁ, ২০০৪ সালের সেই আমলাশোল, যে সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছিল। এখানেই রয়েছে ‘খাড়ারানী সরোবর’, এবড়োখেবড়ো মেঠো আলপথ বেয়ে, এর বাড়ির উঠোন- তার বাড়ির গোয়ালের ছাঁচতলা দিয়ে পৌঁছাতে হবে এই সরবরের তীরে। তারপর?

আর কী, পরিস্কার ঝকঝকে মেঘমুক্ত আকাশ, সবুজ জঙ্গলময় টিলায় ঘেরা নীল জলের বিশাল জলাধার, যা মূলত বৃষ্টির জলে পুষ্ট। স্বচ্ছ, টলটলে সরোবরে একটি বাঁধ রয়েছে, বাঁধের লকগেট খুলে জল সরবরাহ হয় আশেপাশের গ্রামগুলিতে। বাঁধের উপরের সরু কংক্রিটের রাস্তার ওপারে যতদূর চোখ যায় শুধুই জঙ্গলে ঢাকা। নীলাকাশের নীচে সবুজ অনুচ্চ পাহাড়ে ঘেরা টলটলে কালো জলের বিশাল জলাধারের দৃশ্য এক কথায় অতুলনীয়।

দৃশ্য সুখের অপ্রার্থিব সুখ পুরোটা ঠিকমতো আত্মস্ত করার আগেই হালুইকর হাজির করবে গরম ফুলকো রাধাবল্লভি আর চানা মশালা, সাথে থাকবে ডিমসিদ্ধ আর সন্দেশের টুকরো। দ্রিমিদ্রিমি মাদলের তালের মত বয়ে চলা বাতাসের খেলে বেড়ানো- খঞ্জনা, শামুকখোল, দেশী বক, শ্যামসুন্দর, পানকৌড়ি, বেনে বৌ, মাছরাঙা বা কিম্ভূত ভাবে উড়তে থাকা সায়োলোরের খেলা দেখতে দেখতে বুঝে উঠার আগেই বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে যাবে যদি না কেউ ডেকে দেয় আপনাকে। এখানে কিছু পাখী নাচে, কিছু পাখী গায়, কেউ শান্ত তো কেউ চঞ্চল, কেউ ওৎ পেতে থাকে আবার কেউ স্বশব্দে নিজের উপস্থিতি জানান দেবে চড়কি কেটে।

জলখাবার খেতে খেতে, সরোবর, প্রকৃতি আর পাখীদের যুগলবন্দী দেখতে দেখতেই রওনা দেব ২ কিলোমিটার দূরের ছোট্ট একটা টিলা পাহাড়ের উদ্দেশ্যে- ‘গাদ্রাসিনি হিল’। যারা ট্রেকিং এর শখ রাখেন, তাদের জন্য এ যেন সব পেয়েছির দেশ। সোজা হয়ে আকাশ ছুঁতে চাওয়া লম্বা লম্বা পিয়াল-মহুলের গুঁড়ির ফাঁকে পাথুরে পথের উপরে বিছিয়ে থাকা শুকনো পাতাগুলোকে মচমচ শব্দে মাড়িয়ে যাওয়া সে এক অকৃত্রিম সুখানুভুতি রয়েছে। যদি পাহাড়ের উপরে পৌঁছে যান, তাহলে তো গোটা বেলপাহাড়ি অঞ্চলটাকে দেখে নিতে পারবেন ‘ঈগলের চোখের’ মতন, নিচে নিবিড় অরণ্য, তার অপরে আপনি আর মাথার উপরে শুধুই নীল আকাশ, কেউ কোত্থাও নেই। অদূরেই রয়েছে একটি প্রাকৃতিক আদিম গুহা, চাইলে যে কেউ সেটা চাক্ষুষ করতেই পারেন, সময়ে কুলালে।

পাহাড় থেকে নেমে এসেই আমাদের গন্তব্য অদূরেই ঝাড়খন্ড লাগোয়া ‘ঢাঙিকুসুম’ গ্রাম। গ্রামটির মানুষজনের মূল জীবিকাই হল পাথরের বাসনপত্র তৈরি করা। শহুরে বা সমতলের মানুষের কাছে বেশ খানিকটা কঠিন তথা ‘মিনি’ দুর্গম চড়াই উৎরাই পথ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় ‘হদহদি’ ঝর্নার সামনে। ঘন কালোছায়া বিশিষ্ট এই অরণ্যের মাঝেই ‘ছুঁচোর ডনবৈঠক’ শুরু হয়ে যাবে সকলের পেটে, অনভ্যস্ত পায়ে এতোটা হাঁটাহাঁটি করলে পেট বেচারার আর দোষ কিসের! এর মাঝে যদি পেট সাথ দেয় তাহলে ডুংরি ঝর্নাটাও একবার চোখের দেখা দেখে নেওয়া যেতেই পারে।

আবার খাড়ারানী সরোবরের তীরে যতক্ষণে ফিরে আসব, ততক্ষণে খাসির মাংসের সুগন্ধ জিভের স্বাদকোরক গুলোকে জাগ্রত করে ‘নিশির ডাকের’ মত পাতের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। সাদা ভাত, লেবু লবণ, ঝুড়ি আলুভাজা, নবরত্ন সব্জি, সোনা মুগের ডাল, আলুপোস্ত, খাসির মাংস কষা, চাটনি, পাঁপড় আর গুড়ের রসগোল্লা সহযোগে চেটেপুটে খাবারই তো দিন এটা।

গল্পগুজব করতে করতে এবার সরোবরকে টাটা বলার পালা, ফেরার পরে একবার ঢুঁ মেরে নেওয়া ‘ঘাগরা’ জলপ্রপাত। নামে জলপ্রপাত হলেও আসলে এটা একটা জলাবর্ত, হাজার হাজার বছর ধরে ছোটনাগপুরের কঠিন আগ্নেয় শিলাপাথরের উপর দিয়ে ‘তারাফেনি’ উপনদী তার পথ তৈরি করে নিয়েছে গভীরভাবে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দুপাড়ে ঘিরে থাকা জঙ্গল, ঝরে পড়া পাতা, কাঠবেড়ালীর ছুটোছুটি, পাখিদের ডাকের মাঝে লুকিয়ে থাকা রহস্যময়ী ঘাগরা, যেন প্রকৃতির ক্যানভাসে নদীর শিল্পকলা মাখা সৌন্দর্যের প্রতিমুর্তি।

নিস্তব্ধ চুপচাপ সুন্দর গ্রামে রাঙা মাটির পথ, সরষের ক্ষেত, আলপনা আঁকা লালমাটির ঘর, পরিশ্রমী জীবনযাযাত্রী বনবাসী, জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনা কাঠুরের দল, বিনোদনের জন্য মোড়গ লড়াই, নেশার জন্য হাঁড়িয়া,মহুয়া বা তাড়ীর রস, উঠোনে ধানের ছোট্ট গোলা সমৃদ্ধ অসম্ভব সুন্দর গ্রাম্যপরিবেশের এই জঙ্গলেই টেনিদা খ্যাত “চার মূর্তি” সিনেমার শুটিং হয়েছিল। গাদ্রাসিনি, খাড়ারাণী সরোবর, ঢাঙিকুসুম, ঘাঘরাকে কেন্দ্র করেই শেঠ ঢুন্ডুরাম সহ স্বামী ঘুটঘুটানন্দের দাড়ি উপড়ে ছিল টেনিদা সমেত প্যালা, হাবুল আর ক্যাবলার চারমুর্তি।

সুতরাং, খাঁড়ার মত নাক থাকুক বা নাইবা থাকুক, গড়ের মাঠে গোরা পেটানো শরীরও না থাকলে চলবে- কিন্তু গলা ছেড়ে ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো…” গাইতে হলে যে আসতে হবে অকপটের এই যাত্রায়, তবে না প্রাণ খুলে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠতে পারবেন “ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক”।

সন্ধ্যায় গিধনি ফিরে, চা জলখাবারের সাথে শুধুই মজলিশি আড্ডা। রাত্রে নৈশভোজে গরম ভাতের সাথে মটরসুটি দিয়ে মুগের ডাল, আলু ফুলকপি রসা, পাবদা মাছের ঝাল আর চাটনি দিয়ে উদরপুর্তি করার বন্দোবস্ত থাকবে। যারা মাছে আসক্ত নন, তাদের জন্য রইবে ‘কবিরাজি চিকেন কষা’। জ্যোৎস্নার আলোয় মোহময়তাকে পূর্নতা দেয় বুনো ফুলের সুগন্ধ, ততক্ষণ আড্ডা চলতেই থাকবে- যতক্ষননা, জ্যোৎস্নালোকে ধুয়ে যাওয়া আলোকিত জঙ্গলময় উপত্যকা বেয়ে ঘুমপরীরা ভর করবে চোখের পাতায় পাতায়।

১লা ফেব্রুয়ারি, রবিবার, ২০২১। এদিনটা একটু সকাল সকালই শুরু হবে। গত দুদিনের মতই চা বিস্কুট রুমে খেলেও, প্রাতঃরাশ সারা হবে বাসের মধ্যে- রুটি, কলা, ডিম সিদ্ধ আর সন্দেশ সহযোগে। ভাগ্যক্রমে যদি পথে লুচি আলুর দম পাওয়া যায় সেটাতেও কোনও মানা নেই।

সকালের নরম রোদে দেখে নেওয়া হবে ঝাড়গ্রামের ঐতিহ্যশালী রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ। বহু ঐতিহ্যমণ্ডিত ভাস্কর্য ও শিল্পকলায় নির্মিত ৩০ একর জুড়ে সুবিন্যস্ত সুবিশাল এই রাজপ্রাসাদ পশ্চিমবাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার মান সিংহের আমলে, ‘রাজপুত চৌহান’ রাজা সর্বেশ্বর সিংহের ব্যবস্থাপনায় এই স্থাপত্য ১৫৯২ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় মাল আদিবাসী রাজাদের পরাজিত করেছিলেন বলে এই প্রাসাদের শাসকরা “মল্লদেব” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। চুয়ার বিদ্রোহের পর ১৭৯৯ সালে প্রাসাদটি ব্রিটিশ কর্তৃত্বধর জমিদারী এস্টেটে পরিণত হয়েছিল। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে স্থানীয় মিউজিয়াম ও ডিয়ার পার্কে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বেলা ১১ টার মধ্যে মাছেভাতে/মাংসভাতে মধ্যাহ্নভোজন সাঙ্গ করা হবে ঝাড়গ্রামেরই কোনো বাঙালী ভোজনালয়ে।

এর পর আমাদের অরণ্যসুন্দরীকে বিদায় জানাবার পালা। শালের জঙ্গলের ভিতর লাল মাটির রাস্তা বেয়ে আমাদের বাস এগিয়ে চলবে খড়্গপুর রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে। পড়ে থাকবে সবুজে ঘেরা বনাঞ্চল, শান্তপুস্করিনি, কুলুকুলু ঝর্ণা, পিচঢালা সরু রাস্তার দুপাশের জঙ্গলের মাঝে রয়ে যাওয়া শান্ত গ্রামীণ পরিবেশ। ছোট্ট নদীগুলো তেমনই বইতে থাকবে যেমন ভাবে বয়ে চলেছে লক্ষ বছরের অভ্যাসে। স্কুল ফেরত দলবাঁধা বাচ্চার ফিরে যাবে তাদের নির্মল গ্রাম্য জীবনে। জানালার বাইরে ক্রমশই ফিকে হয়ে আসবে সবুজের সমারোহ, ফিরে আসবে নগরজীবনের দৈনন্দিনতার দোকানপাট ও বাস স্ট্যান্ড। রয়ে যাবে ঝাড়গ্রাম, জঙ্গলমহল, অরণ্যসুন্দরী- আমাদেরই মত অন্য কারোর প্রতীক্ষায়।
এই খড়গপুরেই আমাদের অকপট চড়ুইভাতি ২০২১ এর যাত্রার পরিসমাপ্তি দুপুর ২টোর মধ্যে, এখান থেকে যে যার নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা দেবে, বাসে ট্রেনে বা নিজ বাহনে।

গোটা এই ভ্রমণের জন্য আমাদের প্রতিজন প্রাপ্তবয়স্ক অকপটুর জন্য খরচা রাখা হয়েছে মাথা পিছু ২০০০/- টাকা (দুই হাজার মাত্র)। ২৯শে জানুয়ারি ২০২১ সন্ধ্যায় ঝাড়গ্রাম হতে রিসিভ করা থেকে- ১লা ফেব্রুয়ারী ২০২১ খড়্গপুরে ড্রপ করে দেওয়া অবধি (থাকা, খাওয়া ও পিকনিক) সমস্ত খরচা সহ ( পার্কের এন্ট্রি ফি অ রাইড খরচা বাদে)। ৫ বছরের নীচের সকল বাচ্চাদের খরচা বিনামূল্যে, ১০ বছর পর্যন্ত বাচ্চাদের খরচা মাথাপিছু ১০০০/- টাকা।

যারা শুধুমাত্র চড়ুইভাতিতে অর্থাৎ ৩১/০১/২০২১ তারিখ রবিবার উপস্থিত থাকতে চান, তারা সরাসরি বেলপাহাড়ি বাজার অবধি চলে আসতে পারেন, সেখানে আমাদের গাড়ি আপনাকে খাড়ারাণী সরোবর অবধি নিয়ে আসবে। এই দিনের জন্য খরচা ধরা হয়েছে মাথাপিছু ৫০০ টাকা মাত্র। ১০ বছর বয়সী বাচ্চাদের জন্য ৩০০ টাকা, ৫ বছর বয়সের নীচে সম্পূর্ন বিনামূল্যে। সেই রাত্রিতে থেকে গেলে তার জন্য অতিরিক্ত ২০০/- টাকা মাথাপিছু বেশি গুনতে হবে।

যারা এই অকপট ভ্রমণ তথা চড়ুইভাতিতে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী, তারা ২০ই জানুয়ারির মধ্যে অফেরৎযোগ্য ৫০০/- টাকা করে জমা করুন। কেন অফেরৎযোগ্য? কারন- হালুইকর, বাসভাড়া, একমডেশন সকল কিছুই আগে থেকে কনফার্ম করতে হবে পরিচালকদের, শেষ মুহুর্তে বাতিল করলে খাবার খরচা টুকুর বাইরে সকলকিছুরই পেমেন্ট করতেই হবে পরিচালকদের। যেহেতু অকপট চড়ুইভাতি কোনও ব্যবসায়িক স্বার্থে করা নয়, বরং সবচেয়ে কম খরচে উৎকৃষ্ট গুণমান দিতে অকপট দায়বদ্ধ কারন অকপটুদের নিজেদের পরিবার গুলোই থাকবে এখানে; সেহেতু কে অন্যের শেষ মুহুর্তের বাতিলের দায়ভার বহন করবে! তাই এই অফেরৎযোগ্য অগ্রিমের ব্যবস্থা।

২৬শে জানুয়ারি ২০২১ এর মধ্যে সম্পূর্ণ চাঁদা জমা করতে হবে আমাদের নির্দিষ্ট একাউন্টে, অন্যথায় সকল ব্যবস্থাপনা করা সম্ভবপর হবেনা। যারা শুধু চড়ুইভাতি বা বনভোজনের নির্দিষ্ট দিনেই আসবেন, তাকেও ২৬ তারিখের মধ্যেই ৫০০/- টাকা জমা করতে হবে। যারা হাওড়া থেকে ‘স্টিল এক্সপ্রেস’ ট্রেনে যাবেন টিম অকপটের সাথে দল বেঁধে, তাদের টিকিট আমরা স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে কাটিয়ে দেব, আপনি স্টেশনে পৌঁছে সেই স্বেচ্ছাসেবকের কাছে রিজার্ভেশন বাবদ প্রদেয় অর্থ নগদে মিটিয়ে দেবেন।

টাকা পাঠাবার ঠিকানাঃ
KINGSHUK HALDER
S B I, BEHALA BRANCH
A/C NO. 11170337153
IFSC SBIN0001522
MICR 700002115
UPI: hkingshuk-1@oksbi

তাহলে, আর কী! গেলে দেখা হবে হাওড়া ঝাড়গ্রামে। একসাথে গাওয়া যাবে ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো…” কিম্বা প্রাণ খুলে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠব “ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক”।

স্বাগতম।




তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...