এই লেখার মূল উদ্দেশ্য ইরাণকে সমর্থন নয়, ইসরাইলের বিরোধিতা, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা।
সংবাদে প্রকাশ ‘যায়োনিষ্ট অকুপাইড ফিলিস্থিন’ (ZOP) তথা ইজরায়েল নাকি এক তৃতীয়াংশ
ধংস হয়ে গেছে, প্রাক্তন মার্কিন সেনা কর্তা ম্যাকগ্রেগরের দাবী মতে অন্তত সেটাই। ভুল
কথা, ইজরায়েলের ক্ষতি ১০০% পেরিয়ে এখন মাইনাসে রান করছে। পুরো উলঙ্গ হয়ে গেছে তাদের
দম্ভ, অহংকার আর মিথ। তাই সে এখন যুদ্ধ জয়ের চেয়ে নিজেদের দেশের ক্ষয়ক্ষতি লুকাতে ব্যস্ত,
প্রকাশ্যের আমেরিকার সাহায্য চাইছে, ধমকি দিচ্ছে, ভয় দেখাচ্ছে। নমঃ নমঃ করে আমেরিকা
ঘন্টি বাজাতে বাজাতে বোম্বার জেট নিয়ে হাজিরও হয়েছে। ইজরায়েল ভিক্টিম কার্ড খেলছে,
খড়কুটো আঁটকে যেমন ডুবে যাওয়া ব্যাক্তি বাঁচার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে- ইজরায়েল সেই চেষ্টা
করছে।
১৯৪৮ থেকে একটু একটু করে একটা পাহাড়সম মিথ গড়ে উঠেছিল- ইজরায়েল অপরাজেয়। দীর্ঘদিন
ধরে চালানো একতরফা একটা প্রপাগান্ডা মেসিনারি- পরিকল্পনা করেই এটাকে তৈরি করেছিল। ভক্তেরা
বা আমাদের দেশের একটা বড় অংশ আজও বিশ্বাস করে, ইজরায়েল ঠিক ইরাণকেও সিরিয়া বা ইরাক
বানিয়ে দেবে। তারা অতীতের ঘোরে বুঁদ হয়ে জলসাঘরের ছবি বিশ্বাস হয়ে বসে রয়েছে। প্রাক
সোস্যালমিডিয়া যুগে শুধু সংবাদ পত্র আর টিভি মিডিয়া ছিল, সেটা ছিল একতরফা। তারা যেটাকে
দেখাতো, যেটা বলতো, সেটাই একমাত্র সত্য ছিল। প্রশ্ন করা বা ফ্যাক্টচেকের প্রায় কোন
কিছুই ছিলোনা, বারংবার একই মিথ্যা শুনলে, দেখলে বা পড়লে একসময় সেটাই বিশ্বাস করতে শুরু
করি আমরা। কিন্তু আজকের যুগে প্রায় সকলের হাতে মোবাইল, সকলে ক্যামেরাম্যান। সস্তার
নেটে একটু শ্রম দিলে আসল তথ্য জানা খুব সহজ, তাই কোনো কিছুই আর একমুখী নয়। প্রোপাগান্ডার
আয়ু বেশিক্ষণ টেকেনা।
ইজরায়েলের প্রথম গর্ব ছিলো তাদের গোয়ান্দা সংস্থা- মোসাদ। মোসাদকে এমনভাবে পশ্চিমা
মিডিয়া উপস্থাপন করেছিল যে, সে অপরাজেয়, অপ্রতিরোধ্য। স্কোরসিটে প্রথম পঞ্চাশের সবকটা
স্থানে তারই নাম। তার প্রতিযোগীদের থেকে দুরত্ব কয়েক আলোকবর্ষের। মোসাদ যা খুশি, যেখানে
খুশি, যেভাবে খুশি করতে সক্ষম। ইরান দেখিয়ে দিলো- মোসাদ ফোলানো গ্যাস বেলুন, নিজেদের
সদর দপ্তর রক্ষা করতে ব্যর্থ। ইরাণের কোথায় অস্ত্র সম্ভার তা খুঁজেই পায়নি, পেলে কি
সেটা আস্ত রাখত? অথচ তথাকথিত মোসাদ থাকার পরেও গোটা ইজরায়েল প্রতিটি গুপ্ত ঘাঁটি ইরাণের
নখদর্পনে, রীতিমত থ্রিডি ম্যাপ রয়েছে ইজরায়েলের প্রতিটি অলিগলির। মোসাদ টেরও পায়নি
তাদের দেশেই ঘোগের বাসা রয়েছে। মোসাদের ফেল ইজরায়েলের মিথের সবচেয়ে বড় ক্ষতি, সবচেয়ে
বড় বেইজ্জতি।
ইজরায়েলের মিথ ভেঙে যাওয়ার দ্বিতীয় কারন- তাদের প্রযুক্তি সর্বাধুনিক, তাদের
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা state of the art। শ্বেতাঙ্গ প্রোপ্যাগান্ডা মেসিনারি প্রতিষ্ঠা
করেছিল- ইজরায়েলকে কেউ ছুঁতে পারবেনা। মারণ বিমান বাহিনী, আয়রণ ডোম, ডেভিডস স্লিং,
এ্যারো আর মার্কিন থাড- একযোগে বিপুল আয়োজন। প্রত্যাঘাত হানার জন্য ১৮টা মিলিটারি বেস
গোটা মধ্যপ্রাচ্যে, সাথে ছোট বড় মিলিয়ে এক ডজন ব্যাটেল-শিপ। এমন বিপুল আয়োজনের ভিড়ে
মাছি গলবে সাধ্যি কী! ইরান সেই মিথকে গুড়িয়ে মাটিতে মিসিয়ে দিয়েছে। ইরান রীতিমত রোজ
অন্তত ৫-৭ ঘন্টা আগে ম্যাপে এরিয়া সিলেক্ট করে দিয়ে হামলা করে, চেয়ে দেখা ছাড়া সেভাবে
কোন প্রতিরোধ করতে পারেনি। ইজরাইলের আকাশে রোজ অন্তত এক ঝাঁক ড্রোন উড়ে আসে মিসাইলের
আগে, যারা আইরন ডোমকে ব্যস্ত রাখে। এগুলো তো আর ইরান থেকে আসেনা, আশেপাশের কোথাও থেকে
আসে। ইজরায়েলের কোনও প্রযুক্তি ধরতে পারেনি, ড্রোন কোথা থেকে আসে। যারা দাবি করত
“We are the chosen one for the promised land.”
আর এই দাবীর সম্পক্ষে নির্বিচারে গনহত্যা করে রোজ একটু একটু করে অন্য রাষ্ট্রের
জমি দখল করত, আজ তারাই ইঁদুরের মত বাঙ্কারে লুকাচ্ছে, দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে দলে দলে করে
দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। প্রযুক্তি আর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার state of the art ফানুসকে ফাটিয়ে
দিয়েছে ইরানী মিশাইল।
পৃথিবীর সমস্ত টেক জায়েন্ট তাদের সমস্ত প্রযুক্তির সূতিকাগার বানিয়েছিলো ইজরায়েলে।
দাবী ছিলো- গোটা পৃথিবীর সেরা প্রযুক্তিতে ছিলো দখলদারদের একচ্ছত্র অধিকার। সমস্ত রোবটিক
টেকনোলোজির ধাত্রীগৃহ ছিল একান্তই ইজরায়েলে। ইরান প্রমাণ করেছে সে সব ফাঁপা ও মিথ্যা
বুলি ছিলো। ওয়েজম্যান ইন্সটিটিউট হোক বা মাইক্রোসফট অফিস- খোলামকুচির মত রাস্তায় মিসে
গেছে। দখলদারেরা পালাতে পারলে বাঁচে। যারা আছে, গর্তে লুকিয়ে নিজেদের মাঝে চুলোচুলি
করছে। প্রথম বিশ্ব থেকে সাতদিনের অন্তরালে উদ্বাস্তু শিবিরে পরিনত হয়েছে ‘যায়োনিষ্ট
দখলকৃত ফিলিস্তিন’।
আসলে ইজরায়েল রাষ্ট্র যে কারনেই বানাক ব্রিটেন ও রসচাইল্ড পরিবার, গত ৫০ বছর
ধরে এটা বিশ্বজুড়ে মস্তানি করা আমেরিকার তোলা আদায়ের ‘পার্টি অফিস’ ছিলো। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ
কালেকশন এজেন্ট বসিয়ে রেখে প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে তোলা
আদায় করে আসছে নানান উপায়ে। শেষ ৩৫ বছরে যত যুদ্ধ, সবটা এই নেতানিয়াহুর অধীনে, তার
পরিকল্পনাতে। নেতানিয়াহু আসলে আমেরিকার সবচেয়ে বড় ও বিশ্বস্ত কালেকসন এজেন্ট। প্রত্যক্ষ
রাজনীতিতে আসা ইস্তক এই লোক কখনও ২-৩ বছরের বেশী ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে থাকেনি। ছলে
বলে কৌশলে ইজরায়েলের মূল রাজনৈতিক সিস্টেমে নেতানিয়াহু বারে বারে ফিরে এসেছে বা আমেরিকা
তাকে ফিরিয়ে এনেছে।
নেতানিয়াহু যুগের শুরুতে ফিলিস্তিন নামের দেশটার অস্তিত্ব ছিলো, এরপর ধীরে ধীরে
দুনিয়ার বুক থেকে ফিলিস্তিন নামটাকেই গায়েব করে দিয়ে- গাজা আর ওয়েষ্ট ব্যাঙ্ক নামে
দুটো জেলখানাতে রুপান্তরিত করেছে। যাদের না আছে নিজশ্ব পার্লামেন্ট, না রাজনীতি, না
আছে নিজেদের মুদ্রা, না খাদ্য-পানীয়, না আছে নিজেদের কোনো স্বাধীনতা। গাজা জেনোসাইডের
মাস্টারমাইড এই নেতানিয়াহু। গনবিধ্বংসী অস্ত্রে থাকার দাবী তুলে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া
ছাড়খার করে দেওয়ার কারিগর- এই নেতানিয়াহুই। আইসিস ও আল-কায়েদা নামের জঙ্গিগোষ্ঠী এই
নেতানিয়াহুর আমলের সৃষ্টি। ‘ইসলামিক জঙ্গীবাদ’ শব্দের জনক ইনিই, এই কারনেই RSS এর পোষ্টার
বয় নেতানিয়াহু।
“মধ্যপ্রাচ্যে
একটা আরবী প্রবাদ রয়েছে- ‘আমাকে তো সেদিনই খেয়ে ফেলা হয়েছিল, যেদিন সাদা ষাঁড়টিকে খাওয়া হয়’। এই প্রবাদের
পেছনের গল্পটা হলো- তিনটি ষাঁড় ছিল– সাদা, কালো এবং লাল। তারা একসাথে থাকত। একদিন সিংহ প্রথমে কালো ও লাল ষাঁড়কে বলল, ‘তোমরা যদি আমাকে সাদা ষাঁড়টিকে খেতে বাঁধা না দাও, তাহলে আমি
তোমাদের ক্ষতি করব না’। তারা রাজি
হলো। এরপর সিংহ সাদা ষাঁড়টিকে খেয়ে ফেলল। কিছুদিন পর সিংহ আবার ফিরে এসে কালো
ষাঁড়কে বলল, যদি লাল ষাঁড়টিকে খেতে বাঁধা না দাও তাহলে তোমার কোন ক্ষতি করব না। ফলে কালো ষাঁড়টি নিশ্চুপ হয়ে লাল ষাঁড়ের বিনাস দেখেছিলো। সর্বশেষ যখন সিংহ কালো ষাঁড়টিকে
খেতে আসলো, তখন তাকে বাঁচানোর মতো কেউই ছিল না৷
ইরাক, সিরিয়া, ইজিপ্ট, সৌদি, আমিরাত সবাই সেই ষাঁড়ের দল।
ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ‘ইতামার বেন গাভির’ স্বীকার করেছে যে, নেতানিয়াহু নিজেকে
সিংহ ভেবে Operation Rising Lion নামে ইরাণকেও ষাঁড়ের দলের একটা ভেবে আক্রমণ করেছিলো।
ইরাণ সিংহ না হলেও অন্তত হায়েনা যে বটে, সেটার সাক্ষী আজ বিশ্বের সকলে। সিংহ সেজে আরবের
প্রায় সকল ‘মোল্লা ষাঁড়’ সাবার করে ইরানের দিকে হাত বাড়াতেই, ইজরায়েলের ভিতরের ছাল
ওঠা কুত্তাটা বের হয়ে গেছে।
ইজরায়েল এতদিন যখন যাকে ইচ্ছা গেছে তাকেই মেরেছে, বেহিসাবি মেরেছে। ত্রাসের
রাজত্ব কায়েক করে রেখেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে আমেরিকা আর ন্যাটো এ্যাম্বুলেন্সের
মত সাইরেন বাজাতে বাজাতে এসে, বোমা ভর্তি বিমান নিয়ে নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তকে নিঃশর্ত
পূর্ণ সমর্থন করেছে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই। আফ্রিকা থেকে ইউরোপের সাপ্লাই লাইন সক্রিয় রাখতে,
আর মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়াতে ‘ডর কা মাহল’ বানিয়ে রাখার জন্য ইজরায়েল হলো
আমেরিকা আর ইউরোপের প্রাণভোমরা, পাতি বাংলাতে কালেকশন এজেন্ট।
এতোদিন যে যুদ্ধগুলোই ইজরায়েল শুরু করেছে, সাথে সাথে আমেরিকা ও ন্যাটো ঝাঁপিয়ে
পরে সহযোগিতা করেছে। সেগুলো একপ্রকার প্রতিরোধহীন ও একতরফা ছিলো। ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্থান,
লেবানন, লিবিয়া, ইয়েমেন, ইজিপ্ট, সোমালিয়া, তিউনিসিয়া সহ সর্বত্র একতরফা আক্রমণ ছিল।
এই দেশগুলো সামরিক সক্ষমতায় আমেরিকার হাাজার ভাগের একভাগও ছিলোনা, কোনো তেমন অস্ত্র
সম্ভার ছিলোনা যা দিয়ে সামান্যতম প্রতিরোধ করতে পারে। ফলত ইজরায়েল বা আমেরিকা জোট একতরফা
বিজয় পেয়েছে, নিজেদের পুতুল সরকার বসিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের হরির লুঠ চালিয়েছে। সৌদি,
বাহারিন বা আমিরাতের মত হিজরে মোল্লা রাজা গুলো শুরুতেই আমেরিকার পায়ে পরে গিয়েছিল,
ষাঁড় সেজে। তাদের অভয়ারন্যে রেখে দিয়েছে ডামি রাজা বানিয়ে, আসল সব সিদ্ধান্ত আমেরিকা
যা ইজরায়েল কার্যকর করে। এই শতাব্দীর শুরুতেও পৃথিবী একমেরু ছিল, আমেরিকা কেন্দ্রিক।
ভেঙে যাওয়া সোভিয়েত থেকে জন্মানো রাশিয়া তখনও কিশোর, চীনও তাই। আজ ২০২৫ এর পৃথিবী দ্বিমেরু
যুক্ত। রাশিয়া, চীন রীতিমত আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ।
আমাদের দেশ ভারতও এগিয়ে যেতে পারত যদিনা ‘মুসলমান মারাটাকে’ সনাতনী এ্যাজেন্ডা
বানিয়ে ফেলতো বিজেপি। বিদেশনীতিতে জোর দেওয়া একটা শিক্ষিত রাষ্ট্রপ্রধান যদি থাকত,
আমাদের আজ সেই রেলা হতো, ১৪০ কোটির আওয়াজ কোনো ছেলেখেলা নয়। ক্লাস ফোর ফেইল একটা জোকারকে
ক্ষমতায় বসানোতে যা হবার সেটাই হয়েছে, সবর্ত্র ফেকলু গিরি।
ইরানের চেয়ে আমাদের সেনা সক্ষমতা, আমাদের অস্ত্রভান্ডার, আমাদের অর্থনীতি, আমাদের
ব্রেইন, আমাদের নিজশ্ব প্রযুক্তি- কিসে আমরা এগিয়ে নেই? ইরান যেখানে আমেরিকার একটা
ধমকিকেও আমল দেয়নি, সেখানে সারেন্ডার সাহেব, ট্রাম্পের ধমকিতে কুঁচকে গিয়ে এডভান্টেজ
পজিশন থেকে পিছিয়ে এসেছে হাঁটু গেঁড়ে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও বাকি রাষ্ট্রপ্রধানেরা
আসলে ক্লীব ও পশ্চিমাদের উচ্ছিষ্টভোগী দাস। শুধু আমাদের মোদীই নয়, বাংলাদেশের ইউনুস
ও পাকিস্তানের শরীফ, এই দুটোও ওয়াসিংটনের পাপেট, জড়ভরত সাক্ষীগোপাল। সিদ্ধান্ত সব কিছু
প্রভুর তরফে আসে, এনারা পাঠ করেন মাত্র।
ইরাণে এসে সর্বপ্রথম ইজরায়েল এই প্রথম কোনো ধাক্কা খেলো। কটা বিল্ডিং ধ্বসেছে
সেটা বড় কথা নয়, ছয় মাসের মধ্যে আমেরিকা সে সব আবার বানিয়ে ফেলতে সক্ষম। ইজরায়েল ধাক্কা
খেয়েছে তার মিথে, তার গর্বে, দম্ভে, অহংকারে। ইজরায়েল মিথ আজ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে,
বারংবার- যুগের পর যুগ ধরে বানানো মিথ্যা অপরাজেয়তার গল্পকে নিজেরাও বিশ্বাস করতে শুরু
করেছিলো। এমন দেশের সম্মুখীন এতোদিনে হয়েছে যাদের নূন্যতম প্রতিরোধ সক্ষমতা আছে, ব্যাস
অমনি হেগে ফেলেছে প্যান্টে।
আমেরিকাও কখনও একা যুদ্ধ করেনি, বরং পালাবার ইতিহাস রয়েছে। হলিউডি সিনেমাতে
প্রতিটি বিশ্ববিপর্যয় আমেরিকার সেনা একাই ঠেকিয়ে দেয়, তাদের আর্মি এলিয়েনকেও হারিয়ে
দেয়। সমস্ত ‘মাস মিডিয়া’ জুড়ে দীর্ঘ ৮০ বছর ধরে তাদের মিলিটারি সক্ষমতাকে ধরাছোঁয়ার
বাইরে নিয়ে গেছে প্রচারযন্ত্রের মহিমাতে। যেই মাত্র রাশিয়ার সম্মুখীন হয়েছে ইউক্রেনের
ছদ্মবেশে, লেজে গোবরে হয়ে গেছে। সামান্য নর্থ কোরিয়ার সাথে মেপে পা ফেলে যুক্তরাষ্ট্র,
আর চীনের বিয়য়ে আজকাল হম্বিতব্বি টুকুও করেনা। এটাই মহাশক্তিধর আমেরিকার আসল রূপ।
আমেরিকা নামেই তালপুকুর, আসলে কি ঘটি আদৌ ডোবে? অনেকেই আমাকে ট্রল করতে পারেন,
সমলোচনা হতে পারে, ক্ষতি নেই- সমালোচনা বা ট্রলের মধ্য দিয়ে আলোচনাটা তো হোক। আসলেই
কি আমেরিকা ততটা ক্ষমতাবান যতটা তারা দাবী করে বা দেখায়? কোন ভয়ে তারা সরাসরি রাশিয়ার
বিরুদ্ধে যায়নি? জোকার ট্রাম্প ৩ মিনিটে ৫টা ‘সারেন্ডার’ টুইট করলেও হোয়াইট হাউজ ১৪
দিনের সময় নেয়, পরদিন আবার B-2 বোম্বার থেকে অস্ত্র বর্ষণ করে। অবশ্যই যুদ্ধনীতি আমার
থেকে শেইখবেনা তারা, কিন্তু এমন দ্বিধাগ্রস্থ আমেরিকাকে কবে দেখেছে? আসলেই কি তারা
ভয় পাচ্ছে? হ্যাঁ পাচ্ছে। তাইতো ইজরায়েলকে প্রায় বলি চড়িয়ে দিয়েছে।
আমেরিকা সরাসরি নামলে বিপদ, না নামলে সর্বনাশ। মার্কিন
জিউ লবি আমেরিকাকেই আক্রমণ করবে প্রতিশোধে নিতে- ফুলফ্লেজে যুদ্ধে না নামলে। উভয়সঙ্কট,
এমন শাঁখের করাতে এর আগে কবে পরেছে আমেরিকা? ভিয়েতনামে দেশপ্রেমের কাছে হেরেছিল,
আফগানিস্তানে নাছোড়বন্দা
মানসিকতার কাছে পরাজিত
হয়েছে। এই প্রথমবার
ইজরায়েল নামের মুখোশে প্র্যাকটিক্যালি বিজ্ঞানসম্মতভাবে
এবং প্রযুক্তিগত ক্ষমতার
লড়াই হচ্ছে, প্রতিদিন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অহংকার, দম্ভ ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। পারমানবিক অস্ত্রের চেয়েও যে একটা পুতুল সরকার জরুরী, সেই এ্যাজেন্ডা এখন প্রকাশ্যে
জপছে ইজরায়েল। পশ্চিমা মিডিয়া যাদের জঙ্গি বলে দেখায়, তাদের চেয়েও কালো স্যুটের পশ্চিমা
নেতারা বেশী সন্ত্রাসী, আসল জঙ্গি।
মার্কিনীদের এই ভয়টা ইরাণকে নয়, উন্মাদ ছাড়া কেউ বিশ্বাস করবেনা ইরান আমেরিকার
চেয়ে সামরিক সক্ষমতায় এগিয়ে আছে। মরে যাওয়ার ভয় নয়, বেইজ্জত হয়ে যাবার ভয়, মিথ ভেঙে
যাওয়ার ভয়। আমেরিকা মানে দাদাগিরির চুড়ান্ত রূপ, আমেরিকার যুদ্ধ বহর মানে বিভিষিকা,
আতঙ্ক ও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। ইরান যদি তাদের পাঁচটা সামরিক ঘাঁটি উড়িয়ে দেয়, নৌবহর
তলিয়ে দেয়, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে তেলের বাজারে আগুন লাগিয়ে দেয়- এটাই আমেরিকার
যজ্ঞের অশ্বকে বেঁধে দেওয়া। এই থাপ্পর টুকুই যথেষ্ট আমেরিকার বেলুন চুপসে দেওয়ার জন্য।
ঘাড়ের কাছে ব্রিকস নিঃশ্বাস ফেলছে।
ইরান নামটা হয়ত মিশে যাবে, কিন্তু আমেরিকাকে আকাশ থেকে মাটিয়ে এনে ফেলবে। ইজরায়েল
নামের ছদ্মবেশে আদতে যা কিছু সবই তো আমেরিকার। বোমা তেল আবিবে পরলে ক্ষত ওয়াসিংটনে
হচ্ছে। প্রতিটা বোমার লক্ষ্য তেল আবিব হলেও নিশানা পরিষ্কার, আমেরিকাকে বার্তা দেওয়া।
আমেরিকার সমস্ত স্ট্রাটেজি পলিসি ব্যার্থ, অথচ এই স্ট্রাটেজিতেই গত ৩৫ বছর ধরে বাজি
মাত করে এসেছে।
আমেরিকা ভয় পেয়েছে, আরো ভয় পাবে। আর ভয় পেলেই পেট্রোডলার ভোগে যেতে সময় লাগবেনা।
পেট্রোডলার গেলে রিজার্ভ কারেন্সী হিসাবে ডলারের দিন শেষ হবে, একদা রুবেলের মত রাস্তায়
গড়াগড়ি খাবে। এ দিন আপনি আপনার জীবদ্দশাতে দেখে যাবেন, সিটবেল্ট বেঁধে বসে পড়ুন, ইরান
সেই শো এর মঞ্চ বেঁধে দিয়েছে। রাশিয়া আর চীন এবারে সেখানে তুরুক নাচ দেখাবে।
অশিক্ষিত মোদীর বদলে যদি নূন্যতম অটলবিহারীর মতনও একটা প্রধানমন্ত্রী থাকত,
রাশিয়ার সাথে মঞ্চে ইন্ডিয়াও থাকত নিশ্চিত। অমেরুদণ্ডী মোদী সিদ্ধান্ত নিতে পারুক বা
না পারুক, ব্রিকসের মত বিকল্প বানিজ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবেই। কাল আমেরিকা ৫০টা খন্ডে
ভেঙে যাবেই, তখন মিসিসিপি, লুইসিয়ানা বা ভার্জিনিয়ার সাথে রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরী
কিম্বা প্যারাগুয়ে, উরুগুইয়ে আর নিকারাগুয়ার সাথে কোনো তফাৎ থাকবেনা।
ইজরায়েল মুছে যাবেনা, সে থাকবে তার চরিত্র নিয়েই, তবে তাকে সাজানো সিংহ থেকে
ঘেয়ো ছাল ওঠা কুত্তা বানিয়ে রাখবে অন্তত আগামী কয়েক দশক। আমেরিকা শেষ ৩৫ বছর ধরে তার
সেরা মূল কালেকশন এজেন্ট নেতানিয়াহুকে বলি দিয়ে দেবে। আমেরিকার ঘরে বাইরে বিপদ, ট্রাম্পের
মন্ত্র ছিল MAGA, এগেইন গ্রেট কাকে করতে হয়, যে এই মুহুর্তে গ্রেট নয়। মার্কিনিরা বিশ্বাস
করে পুনরায় গ্রেট হতে হবে, এই জন্য তারা ট্রাম্পকে জিতিয়েছে, অর্থাৎ আমেরিকা নিজের
জ্বালায় জেরবার।
ইউরোপ চালকহীন গাড়ি, কোনো দিশা নেই। কেউ কেউ ফুট কাটছে মাঝেমধ্যে, যদি এই তালে
কিছুটা প্রচারের লাইমলাইট পায় এই লোভে। বিশ্ব কোন দিকে বাঁক নেবে সময় উত্তর দেবে। তবে
যা খুশি হোক, ইজরায়েল মিথ শেষ। আমেরিকা নিজেও জানেনা সে শেষমেশ কী করবে বা কতটা করবে।
তবে যা খুশি হোক- আমেরিকা মিথেরও অবসান শিয়রে, আমরাই দেখে যাব। হরমুজ প্রনালী সম্ভবত
বন্ধ এই লেখার সময়, বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে ভূমিকম্প এলো বলে। যুদ্ধ যে দিকেই গড়াক,
খুব শীঘ্র মিটবেনা এই অশান্তি, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে গেলেও সেটাই স্বাভাবিক। আমাদের
প্রধানমন্ত্রী যতই মুজরো করুক, আমরা যুদ্ধের আঁচ থেকে বাঁচতে পারবনা।