(১)
সেটা ২০০৮ এর শেষ
নভেম্বর কী ডিসেম্বরের শুরু নাগাদ হবে। তখন রমরমিয়ে চলা রাইসমিলের সাথে চাল এক্সপোর্টের
জাঁকানো ব্যবসা। আমরা মূলত দুবাই এর এজেন্ট দের LC মারফৎ CIF পশ্চিম আফ্রিকার কোনো
বন্দরে মোটা চাল পাঠাতাম। কখনও কখনও আতপ চালের অর্ডারও আসত, সেই সুত্রে আমাদের হয় ছত্রিশগড়
কিম্বা অন্ধ্রপ্রদেশ দৌড়াতে হতো, কোন বন্দর দিয়ে এক্সপোর্ট
হবে তার উপরে নির্ভর করে। সেবারে আতপের অর্ডারটা বেশ মোটা ছিলো, তাছাড়া ভাইজাক পোর্টে
নতুন এক ক্লিয়ারিং এজেন্ট নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে নিজেকে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলো।
দাক্ষিণাত্যের এই দিকটাতে এলে সর্বক্ষণ যেন ইতিহাসের
পথ বেয়ে হেঁটে চলি অবচেতনে। অন্ধ্রের এই অঞ্চলগুলো কতই না
সাম্রাজ্যের সাক্ষী, কখনও নন্দ ও মৌর্যদের অধীনে ছিল। কখনও সাতবাহনদের, মাথার রাজবংশ, ইক্ষ্বাকু, কাকতীয়, বিষ্ণুকুণ্ডিনদের শাসনে সেজে উঠেছিলো। চালুক্যদের পুলকেশী, বিষ্ণু বর্ধন, চোলা সাম্রাজ্য,
নাম গুলো শুনলেই গায়ে কাঁটা দেয়। কত শত শাসক কত শত বার এই
অঞ্চলের উপর আধিপত্য পেতে যুগে যুগে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে রাজত্ব বিস্তার করেছিলেন, সকল প্রতাপকে মিথ্যা প্রমাণ করে আবার তারা কালের
গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এলাকার প্রতিটি নদী, প্রতিটা পাহাড়, প্রতিটি ধূলিকণা সেই ইতিহাসের সাক্ষী। অতীতের উত্তরাধিকার নিয়ে আজও জনপদ গুলো সেই দিনের মতই সজীব আর প্রাণবন্ত।
অন্ধ্রের পূর্ব গোদাবরী
জেলাকে চালের বাটি নামে ডাকা হয়, স্বভাবতই রাজামুন্দ্রি শহরে সেখানকার মূল চালের গদি
গুলো অবস্থিত। আমাদের গন্তব্যও সেখানে, সঙ্গী আমার এক একাউন্টেন্ট কাম এ্যাটেন্ডেড
জনা। জনা জাতে উড়িয়া, মিশমিসে কালো, গাঁট্টাগোট্টা ও প্রচণ্ড ধর্মভীরু। পুরো নামটা
বড় বিচিত্র ‘জনাঞ্জলী ভয়’, এর কান্ড কারখানা নিয়েই একটা গোটা উপন্যাস লেখা যায় ‘ভয়’
নামে। আমাদের মিলের বিনোদ সর্দারের মজুরদের খাতা লেখার কাজে এসেছিলো। অত্যন্ত গরীবের
ছেলে, বাপ মরে যাওয়াতে একাউন্টেন্সী নিয়ে আর বি-কম পাশ করা হয়ে উঠেনি। খাওয়া থাকা মাসিক
৩৫০০ টাকায় খাজাঞ্চীর চাকুরি। মিলে আসার বছর দেড়েক পর আমি তাকে কিছুটা শিখিয়ে পড়িয়ে একপ্রকার পার্সোনাল
এ্যাসিস্টেন্ট বানিয়ে নিই। অনেক কাজের সাথে রান্নাটা বড় ভালো করত সে, এটা ছিলো তাকে
নিয়ে সফর করার মস্ত কারন।
হাওড়া চেন্নাই মেইন
লাইনের সব ট্রেনই রাজামুন্দ্রি ছুঁয়ে যায়। শেষ নভেম্বরের ঠান্ডা-
অন্ধ্রকে ততটা শীতল করেনা মধ্য বাংলার মত। রাজামুন্দ্রির বিকিকিনির কাজ ২ দিনেই মিটে
গেলো, যেসব মিল থেকে শিপমেন্ট যাবে তাদের কয়েকটাতে ভিজিট করে আমরা চলে গেলাম বিশাখাপত্তনম।
সেখানে আমাদের কোম্পানির এক মারাঠা ফাইনান্সারও আসবে নতুন ক্লিয়ারিং এজেন্টের সাথে
মিটিং এ যোগ দিতে। ব্যবসায়ী ছাড়াও তার অন্যতম পরিচয় হচ্ছে তিনি শিবসেনা দলের ক্ষমতাবান
বিধায়ক ও সঙ্ঘ ঘনিষ্ট। যথারীতি তিনি পরপর ২ বার মিটিং পোস্টপোন্ড
করাতে বহুবার ঘোরা ভাইজাককে আবার একবার চষে ফেললাম। অবশেষে তৃতীয় দিনে এসে তিনি পৌঁছালেন এবং স্বস্ত্রীক। মহিলাটি সত্যিকারের
‘আলফা ফিমেল’, কুতকুতে চোখ বিশিষ্ট খর্বাকৃতির মানুষটি আক্ষরিক অর্থেই
জীবন্ত ফুটবল, পুরো গোল।
আমাদের ফাইনান্সার
ভদ্রলোকটির নাম ধরে নিন- গাইকোয়াড় সাহেব। সৌম্যকান্তি মারাঠা সুপুরুষ সাথে রাশভারি
ব্যাক্তিত্বের। স্ত্রী সাথে আসার কারনে হোক বা ব্যবসায়িক লেনদেনের গোপনীয়তা রক্ষাত্রে;
সাথে তৃতীয় কোনো ব্যাক্তি ছিলোনা, দুই মানুষে মুম্বই থেকে সোজা ভাইজ্যাক এয়ারপোর্ট।
কিছু মহিলাকে দেখলেই মনে হয় ভয়ানক ঝগরুটে ও সন্দেহবাতিক, মিসেস গাইকোয়াড়
সেই প্রজাতির, এবং আসলেও তাই। গাইকোয়াড় সাহেব যেভাবে
মেনি বিড়ালের মত মুখ করে কুঁচকে গিয়ে বউ এর সামনে খাড়া রয়েছেন, দেখলে মায়াই হয়। এয়ারপোর্টেই
আমার একদফা জিজ্ঞাসাবাদ চলল, বুঝলাম আবার আমাকে ওনার ময়না তদন্তের সামনা হতে হবে। আমি
নিশ্চিত, মহিলা নিজে কোনো বড় সরকারি পদ অধিকার করে আছেন, কিম্বা এনার পিতৃকুল অমিত
সম্পদশালী ও তার দৌলতেই গাইকোয়াড়- আজকের গাইকোয়াড় সাহেব হয়েছেন, সবটাই অনুমান মাত্র। নতুবা যত জাঁদরেল মহিলাই
হোক, এভাবে স্বামীকে কেঁচো করে রাখতে আমি অন্তত কাউকে দেখিনি, কিছু তো স্পেশাল রয়েছেই
যা গাইকোয়াড় সাহেবের নেই।
ঔরাঙ্গাবাদ আম্বেদকর মারাঠওয়াড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে M.Phil করা
এই মানুষটি সত্যিই বিস্ময়। ওনার আসল ব্যাবসাই নাকি এই লগ্নি
করা, কিন্তু এতো টাকার উৎস কি সেটা ঠারেঠোরে বোঝার চেষ্টা করেও কোনো তল পাইনি। বললেন,
২ দিন দেরি হওয়ার কারন নাকি লঙ্কা। CIF ইন্দোনেশিয়া না থাইল্যান্ডের কোথাও একটা বন্দরে
যাবে এই শুকনো লঙ্কা, দুবাই এর এক ইজিপ্সীয় শেঠ তাকে এই ট্রান্সসিপমেন্ট অর্ডারটা
দিয়েছেন। আমি যেন মাত্র ১০ কন্টেনারের এই ‘ছোট্ট’ শিপমেন্টটা উৎরে দিই। ওনার ভাষায়-
জানোই তো আমার হাতে সময় কত কম। নতুন সুযোগ হাতছাড়া করার দলে আমি কখনই ছিলামনা, আর উদ্যমেও
সদাই ফুর্তি। ঠিক হলো গুন্টুর যাব।
পরের দিন ভোরের ট্রেনে
রওনা দিলাম, আমার ও গাইকোয়াড় সাহেব দুজনেরই কন্টাক্ট কাজে
লাগিয়ে পরবর্তী দেড় দিনে গুন্টুরের লঙ্কা-কান্ড শেষ করলাম, বাকীটা ফোনে ফোনেই হয়ে যাবে।
অর্ডারের ২৫ দিন পর লোডিং, তখন QC সার্টিফিকেটিং এর সময় আবার আসতে হবে। স্বভাবতই রাত্রের
ট্রেনে হাওড়া ফেরার টিকিট কেটে নিলাম। সন্ধ্যায় গাইকোয়াড় সাহেব
হোটেলের লবিতে চা খেতে ডাকলেন। বললেন ম্যাডাম পুজো দিতে যেতে চাইছেন, এতো কাছে এসে
জ্যোতির্লিঙ্গটা মিস করতে চাইছে না। তাছাড়া গুরু প্রদোষ ব্রত পালনটাও
করে নেবেন, মানত রয়েছে। আমিও ওনাকে দারুন উৎসাহ দিলাম, ততক্ষণে ম্যাডামও এসে গেছেন।
হঠাৎ গাইকোয়াড় সাহেব প্রশ্ন করলেন, তন্ময় তুমি কী এ দিকটা
ঘুরেছো! আমি ক্যাজুয়ালি মাথা নেড়ে না বললাম, কে জানত এটাই ছিলো ফাঁদ! ম্যাডাম সমানে
তার কুতকুতে চোখে আমাকে জরিপ করে চলেছেন, এমন সময় গাইকোয়াড় সাহেব
বলে উঠলেন- তুমিও কাল চলো না আমাদের সাথে। এটা অনুরোধ না আদেশ বুঝলামনা। শ্রীমতী গাইকোয়াড় সাহেবা নির্বিকার, ওনাকে মিছিমিছি বোঝার চেষ্টা করে আর
অসুস্থ হতে চাইলামনা ।
আমি খেই হারিয়ে কিছু
বলতে গিয়ে দেখলাম সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। আমার ফ্যালফ্যাল করে
চেয়ে থাকা দেখে গাইকোয়াড় সাহেব বললেন- আমরা একটা প্যাকেজ বুক
করেছি দর্শনের, অনেকের সাথে একটা ট্রাভেলারে করে যাব গুন্টুর থেকে। তোমারা একটা গাড়ি
করে নাও বরং, রিসেপসন থেকে, ওতে সুবিধা হবে। বুঝলাম আমার ইচ্ছা অনিচ্ছা সম্পূর্ণ মূল্যহীন,
পরে বুঝেছিলাম গাইকোয়াড় সাহেব আমাকে কোম্পানি হিসাবে নিয়ে
গিয়েছিলেন। ডিনারের টেবিলে বুকে সাহস সঞ্চয় করে, ম্যাডামের দিকে চেয়ে বললাম- গুন্টুর প্রাচীন শহর, অগস্ত্যেশ্বরি শিবালয়ম্
নামে অতি প্রাচীন একটি শিবমন্দির
রয়েছে এখানে। রিসেপশনের মেয়েটির থেকে তথ্যটা যোগার
করেছিলাম, আবার ভয়ে ভয়েই বললাম, ম্যাডাম এখানে সারা যায়না
পুজোটা! তাতে তিনি যে দৃষ্টি হানলেন- সত্য যুগ হলে নির্ঘাত ভষ্ম
হয়ে যেতাম।
যেতে যখন হবেই, রাত্রেই রেল স্টেশন
থেকে একটা ভ্রমণ গাইড বই কিনে নিলাম। তখন কী আর ইন্টারনেট এমন সহজলভ্য ছিলো!
পড়লাম কৃষ্ণা নদীর উপর নির্মিত শ্রীশৈলম বাঁধ দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তম বাঁধগুলির
মধ্যে একটি, এটা দর্শনীয় স্থান সন্দেহ নেই। এছাড়া ভারতের বৃহত্তম
বাঘ সংরক্ষণাগার ‘নাগার্জুনসাগর-শ্রীশৈলম টাইগার রিজার্ভ’টি ৩৫০০ বর্গকিলোমিটার
জুড়ে বিস্তৃত। স্থানীয় নাল্লামালা জঙ্গলও দেখার জাইগা বটে। পাহাড়, জঙ্গল নদী আমার চিরকালের প্রিয়, তাই মন
থেকে হতাশার ভাবটা ঝেড়ে ফেললাম।
রাত্রের দিকে গাইকোয়াড় সাহেব ফোন করে আবার একবার মনে করিয়ে দিতে ভুললেন না- তন্ময়
মিস কোরোনা, এখানে মন্দির ছাড়াও বেড়াতে মন্দ লাগবেনা। পুঁজি লগ্নিকারক ব্যক্তিকে না বলা যায়না, অগত্যা নিমরাজি
হয়েই গেলাম। হোটেলের রিসেপশনে শ্রীশৈলম যাতাযাতের জন্য একটা ছোট গাড়ির কথা বলে দিলাম পরদিন ভোরের
জন্য। রাত সাড়ে তিনটের সময় দেখি এক ব্যাটা ফোন করে হাঁকডাক করছে, বুঝলাম গাড়ির ড্রাইভার।
স্যান্ট্রো নিয়ে একটা ১৭-১৮ বছরের ছেলে হাাজির। ঘুম চোখে লটবহর গুছিয়ে ‘ভয়’কে সাথে
নিয়ে রওনা দিলাম।
ড্রাইভারটা তিলে খচ্চর
টাইপের সবজান্তা, শুরুতে সারাক্ষণ উচ্চস্বরে তেলেগু গান চালিয়ে মাথা ধরিয়ে রেখেছিলো,
সেটা বন্ধ করতেই- জনার সাথে তার ১০% হিন্দি পুঁজি করে সে কী গভীর আলোচনা, যা আরো ভয়াবহ
মাথাব্যাথার কারন হয়ে দাঁড়ালো। এর মাঝে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম জানিনা, জনার ডাকে ঘুম
ভাঙলো। অকারন বকবক করতে করতে কখন যে ব্যাটা রাস্তা ভুলে যে অন্য পথ ধরেছে তা জনার জ্ঞানের
বাইরে। যতদূর চোখ যায় ধু ধু জনহীন অরণ্য, জনার দিকে চাইতে সে বলল- শেষ ২ ঘন্টা ধরে
এমন জঙ্গল পেরিয়েই এসেছি। অগত্যা সামনে এগোনই স্থির করলাম। গুন্টুর থেকে শ্রীশৈলম মেরেকেটে
২২০ কিলোমিটারের মত রাস্তা, চার ঘন্টায় স্বচ্ছন্দ্যে পৌঁছে যাওয়া উচিৎ, সেখানে ইতিমধ্যেই
৬ ঘন্টা পার হয়ে গেছে, ঘড়িতে বেলা ১১টা।
আত্মাকুর থেকে শ্রীশৈলম অবধি পায়ে
হেঁটে অনেক ভক্ত আসে, যারা মানত করে। ঘণ জঙ্গলের মাঝে কোনো দোকানপাট নেই, না
বসতি রয়েছে। পথটি সম্পূর্ণরূপে নল্লামালা পাহাড়ের ঘন জঙ্গলের
মধ্য দিয়ে যায়। তেমনই একটা ভক্তের দল রাস্তার ধারে বসে আহারাদি করছিলো। তাদের
সামনে গিয়ে গাড়িটা দাঁড় করাল ড্রাইভার। আমাদের ওই দিশেহারা দশা দেখে তাদের একজন এগিয়ে
আসতে, ড্রাইভার স্থানীয় ভাষায় বিষয়টা বলে বোঝালো যে আমরা রাস্তা ভুল করেছি। ভয়ের চোটে
এতক্ষণ খিদে না পেলেও, এবারে সেটা যেন চিৎকার করে হাঁক ছাড়লো পেট থেকে। ভক্তেরা সাথে
করে নিজস্ব খাবার এবং পানীয় সামগ্রী নিয়ে এসেছে, তাদের দয়ায়
সে যাত্রায় খিদের হাত থেকে রেহাই পেলাম। ওদের বাতলে দেওয়া পথ ধরে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই
শ্রীশৈলম পৌঁছে গেলাম।
(২)
শিবা রেসিডেন্সী
নামের একটা মধ্যম মানের হোটেলে ঢোকার পর ফ্রেস হয়ে আমি গাইকোয়াড় সাহেবকে
ধরার জন্য রওনা দিতে, জনা আমার দিকে জুলুজুলু চোখে চেয়ে রইতে শুধালাম- কিছু বলবি! সে
অস্ফুট উড়িয়াতে বলল- ‘মু সে সক্কালেরু জগ্রত রহিছি, এবে কি সইবারি পারিবু!’, বুঝলাম
ঘুমাতে চাইছে। আমি আর কথা না বাড়িয়ে একাই বেড়িয়ে গেলাম। ফোনে জানলাম ম্যাডামের সাথে
সাহেব আপাতত হটকেশ্বরমের পথে।
মল্লিকার্জুন অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলম শহরে কৃষ্ণা নদীর তীরে একটি টিলা পাহাড়ের চূড়ায়
অবস্থিত। জ্যোতির্লিঙ্গটি একটি অতি প্রাচীন মন্দির যা দ্রাবিড় শৈলীতে নির্মিত, এখানে বিজয়নগর স্থাপত্যের নমুনা দেখা যায়। ম্যাডাম
গাইকোয়াড়ের তালিকা অনেক লম্বা, সাক্ষী
গণপতি, হটকেশ্বরম, শিখরেশ্বরম, ফলধারা পঞ্চধারা এমন অনেক কিছুকে দেখে তারপর নাকি মল্লিকার্জুন দর্শন করতে হয়। এসব একদিনে শেষ হলে হয়।
হটকেশ্বরম পৌঁছাতেই দেখলাম পাঞ্জাবি পায়জামা
শোভিত গাইকোয়াড় সাহেব একটা গুমটির আড়ালে ধুম্র সহযোগে চা-পান
করছেন। আমার জন্যই প্রতীক্ষা করছিলেন, দেরির কারন জানতে পেরে তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন।
তবে এটাও বুঝলাম, স্ত্রীর সামনে ধূমপানের অনুমতি নেই। আমাদের বয়সের ফারাক দেড় গুণ,
উনি ৫৩- তাই আমি শুধু চায়ে যোগ দিলাম। কথায় কথায় শুধালাম এতোগুলো মন্দির ঘুরলেন, আপনার
মাথায় চন্দন বা তিলক কই! তিনি যা বললেন তাতে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, ধর্মে নাকি তার
তেমন ভক্তিই নেই, কখনই ছিলোনা- তিনি নাকি ঘোরতর নাস্তিক। রাজনীতির দায় ও সামাজিক স্বার্থে যেটুকুতে না গেলেই নয়, ব্যাস অতটুকুই। অথচ মিডিয়াতে উনি
চরম হিন্দুত্ববাদী, বক্তব্য শুনলে মনে হবে ক্ষতস্থানে কেউ বাঁটা লঙ্কা ডলে দিয়েছে।
একটা মানুষের মধ্যে এমন পরস্পর বিরোধী দ্বৈত্ব স্বত্বা কীভাবে থাকতে পারে! এই কারনেই
কী স্ত্রী অমন চড়ে থাকে!
আমার ভ্যাবাচ্যাকা ভাব
দেখে গাইকোয়াড় সাহেব হেসে বললেন, বড় হও তন্ময়- সব বুঝবে। এর পর
তিনি মল্লিকার্জুন এর লোককথা শোনাতে লাগলেন। কথিত আছে প্রতি
অমাবস্যায় স্বয়ং মহাদেব, পুত্র কার্তিককে এখানে খুঁজতে
আসেন। আবার পূর্নিমাতে নাকি দেবী মহামায়াও মর্ত্যের এই এলাকাতেই বিরাজ করেন। পুরাণমতে দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের সময় ‘উপরোষ্ঠ’ এই মল্লিকার্জুনে পড়েছিল, তাই এটা ১৮টি মহাশক্তিপীঠের একটি- অগত্যা। বুঝলাম লোকটি পণ্ডিত মানুষ
বটে, তারপরে নাস্তিক, আর সবার উপরে উগ্র হিন্দুত্ববাদ রাজনীতিতে সফল ব্যাক্তি- আজব
সঙ্গম।
দিনটা সোমবার, রীতিমত
গলদঘর্ম হয়ে আজই বেলা থাকতে থাকতে মল্লিকার্জুন পৌঁছাতেই হবে যেভাবেই হোক, সুতরাং শ্রীমতী
গাইকোয়াড়ের তাড়ার শেষ নেই। দুপুরে লাঞ্চ করলাম ভাকরি-পিঠলা সাথে ভাজি নামক পদ দিয়ে,
মোটা মোটা জোয়ার বা বাজরার রুটি আর পেঁয়াজ রসুনে ঠাসা এক জাতীয় তীব্র মসলাদার সব্জির
ঘন্ট। খিদের পেটে ওই খেলাম সাঁটিয়ে। দুচোখ মেলে প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে যখন মল্লিকার্জুন
এসে পৌঁছালাম, তখন সূর্য ঢলে গেছে।
গাড়ি থেকে নেমেই ম্যাডাম সটান মন্দিরে ঢোকার
লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন, প্রথম দফায় কবার নাকি প্রদক্ষিণ করে আবার ঢুকবেন পুজো দিতে, সাহেবকে
নির্দেশ দিলেন ততক্ষণে পুজোর উপাচার যোগার করে আনতে। গোল বাঁধল ফুলের দোকানে গিয়ে, ঘ্যেটুর মত বিজাতীয় ফুল সহ আকন্দের ফুল পাতাও পাওয়া গেলো। স্থানীয় নানা জাতের অচেনা ফুলের মালার সাথে বেলফুলের
মালাটিকেও চিনতে পারলাম। জবা, রজনীগন্ধারও অভাব ছিলোনা, নেই শুধু বেলপাতা। এই বস্তুটি অবশ্য এতো গুলো মন্দিরের কোথাও সেভাবে দেখিনি, হয়ত সেভাবে
চল নেই কিম্বা আমিই ভাল করে নজর করিনি। তবে সজনে পাতার মত এক ধরণের পাতা এরা ঘট সাজিয়ে
নিয়ে যাচ্ছে।
লাইনে দাঁড়ানো ম্যাডামের
কানে সে কথা তুলতেই তার মুখ রক্তবর্ণ ধারন করল, গাইকোয়াড় সাহেব প্রমাদ গুণলেন। আমার
দিকে জুলজুল করে তাকাতে আমি প্রায় স্প্রিন্টারের মত দৌড় লাগালাম ওই এলাকার সকল ফুলমালার
দোকান গুলোতে ঢুঁ মেরে বিল্বপত্রের অন্বেষণে। প্রায় সবটা চষে যখন ব্যর্থ মনোরথে ফিরছি, একটা গলির শেষের গুমটিতে বিশাল রেশন দোকানের
মত লাইন দেখে সামনেটাতে গিয়ে উঁকি মেরে দেখি- রয়েছে। আর কী, আমিও ওই লাইনে দাঁড়িয়ে
গেলাম। করোনাকালে যদি এমন জমাটি লাইন কোনো বিজ্ঞানী বা ডাক্তার দেখতেন, নিশ্চিত
তারা নিজেরাই আতঙ্কে অক্কা পেতেন। মিনিট দশেক পর যতক্ষণে গুমটির সামনে সৌভাগ্যক্রমে পৌঁছালাম, ততক্ষনে আমার মাথার ঘাম মেরুদণ্ড
বেয়ে অকুস্থলের উপত্যকা, খাঁজ সর্বত্র লোনা জলময় করে তুলেছে। পাতা তখন অতি সামান্যি
অবশিষ্ট রয়েছে, শেষ অবধি আমার ভাগ্যে জুটবে তো! উত্তেজনা আর আশঙ্কাতে এমন দোদুল্যমান
অবস্থা যে শরীরের সমস্ত রক্ত মাথায় এসে ফেটে পরতে চাইছে, শেষে চ্যাংদোলা করে হাসপাতালে না নিয়ে যেতে হয়।
সমানে জপে যাচ্ছি-
মেরা নাম্বার কব আয়েগা। ওমা, দোকানি অবধি পৌঁছাবার ২ জন আগেই
খেল খতম। বিনা নোটিসে ঝাঁপ বন্ধ। বেলপাতা ছাড়া স্বয়ং মহাদেব সন্তুষ্ট হলেও হতে পারেন,
কিন্তু ম্যাডাম গাইকোয়াড়কে কীভাবে সন্তুষ্ট করব! পিছন থেকে তেলেগুতে অনেকেই নানা পরামর্শ
দিলো, সে সব শুনে আমার পিছনে থাকা জনা পঞ্চাশেক ভক্ত উলটো পথ ধরেলো। সে ভাষা বোঝা
কী আর আমার কম্ম, আমার পা যেন ২০০ মন ভারি হয়ে গেলো, উঠাতেই পারিনা এমন দশা। সামনে
রণচণ্ডী রূপে ম্যাডামের মুখ ভেসে উঠতেই, ধড়ফড় করে আমিও স্ববেগে সেই পথে পা বাড়ালাম,
দেরি করে পৌঁছালেও কি আর কম বিপদ!
ফিরে গিয়ে গাইকোয়াড় সাহেবকে জানাতে তিনি আরো কাকুতিমিনতি করে বললেন,
ড্রাইভারকে নিয়ে আশেপাশের মন্দিরগুলোতে গিয়ে দেখোনা ভাইটি। অগত্যা দৌড়ালাম গাড়ির দিকে।
ড্রাইভার ঘুমাচ্ছিলো, তেতো মুখে ব্যাজার ভাবে চেয়ে দেখে গাড়িতে স্টার্ট লাগালো। ওদিকে
দিনের আলো ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে, সন্ধ্যার পর সাধারানত ছোট মন্দিরের এলাকা গুলোতে আর কেউ
থাকেনা, টিমটিমে আলো আর ভুতুরে পরিবেশ। আশেপাশের ৩-৪ কিমির মধ্যে অধিকাংশ দোকানই বন্ধ,
এক আধটা যেগুলো খোলা তার কোনোটাতেই বেলপাতা খুঁজে পেলামনা। হতাশ হয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে
একটা সিগারেটে মন দিয়েছি, পশ্চিমাকাশে তখনও রক্তাভ একটা নিশান ঝুলে আছে লেজ কাটা ঘুরির
মত।
হঠাৎ, সেই আলো আঁধারিতে মনে হলো, ওই দূরে একটা ঝুঁকে পরা বেল গাছ না? ইউরেকা
বলে দৌড় লাগালাম, নির্ঘাত বেলই বটে, ডাবল শিওর হওয়ার জন্য ড্রারভারকেও ডাকলাম, সে যেন
অনিচ্ছুক ঘোড়া, বিকারহীন মুখে বলল- এটা বেলগাছই বটে। ‘দুটো পাতা পেরে দে না ভাই’- অনুরোধ
করতে সটান মুখের উপরে না বলে হাঁটা দিলো। যেতে যেতে তার তেলেগু সর্বস্ব হিন্দিতে যেটা
বললো, তার বাংলা মানে দাঁড়ায়- মন্দিরের ড্রেনে প্রচুর বেল পাতা পরে রয়েছে, সেখান থেকে কুড়িয়ে
দিলে অসুবিধা কোথায়, কে দেখতে পাবে! কথাটা আমারও মনে ধরলো, পরক্ষনেই মনুষ্যত্ব বিবেক জেগে উঠলো। বেলপাতাতে আমার ধর্ম বিশ্বাস
জুড়ে না থাকলেও, যিনি আমাকে বিশ্বাস করে বেলপাতা আনতে পাঠিয়েছেন, তার বিশ্বাসের মর্যাদা
রাখাটা আমার কর্তব্য, ওটাই তো ধর্ম। তৎক্ষণাৎ ড্রেনের প্ল্যান ক্যান্সিল করে দিলাম।
একটা ছোট মত নালা কিম্বা খাল, রাস্তা থেকে
৩০-৪০ ফুট দূরে। তারই পাড়ে গাছটা প্রায় ৫০ ডিগ্রি কোনে হেলে রয়েছে। গুঁড়িটা বেশ মোটাসোটা
শক্তপোক্ত হলেও সেখানটা বেশ অন্ধকার ও উঁচু ঘাসের ঝোপ জঙ্গল রয়েছে, সমস্যা হলো হাতের
নাগালে কোনো পাতা নেই। গাইকোয়াড় সাহেবকে বিষয়টা
জানাতে ফোনেই শুনলাম ম্যাডামের তীক্ষ্ণ বাক্যবাণের সামনে তিনি ঢালহীন জবুথবু অবস্থায় সহ্য করছেন। শুধু বললেন-
প্লিজ তন্ময়, বুঝে গেলাম বেগতিক। এ দিকে দিনের অবশিষ্ট আলো উড়ন্ত ফড়িং এর ডানার উপরে মুছে
যাওয়ার শোকে কিম্বা পরের দিনের প্রতীক্ষাতে তিরতির করে কাপঁছে। আরেকবার সাহায্যের জন্য
ড্রাইভারের সামনে গেলাম, আমাকে আসতে দেখেই বোধহয় মুখে রুমাল দিয়ে শুয়ে পড়ল, ওদিকে মিউজিক
সিস্টেমে তারস্বরে তেলেগু গান চলছে।
সদ্য কেনা মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে একটু
দেখে নিলাম, পাথুরে নালাটা ঘাস লতাপাতায় ঢাকা। পায়ে উডল্যান্ডস এর জব্বর বুট রয়েছে
সমস্যা নেই, সাপখোপের ভয় থেকে অন্তত মুক্ত। গাছের উপরের দিকটা ঝাঁকড়া গোছের হলেও, নিচের
দিকে শুধুই ডালপালার কঙ্কাল, অথচ সব ডালেই এক হওয়া উচিৎ ছিলো। এটা বেলের মরসুম নয়,
হয়ত বেলের পাতা ঝরে যায় এই সময়ে। তার উপরে রোজ রোজ পাতা পেড়ে নিয়ে যাওয়ার কারনে যতদূর
হাত যায় সবটাই ন্যাড়া, বেশ খানিকটা উপরে চড়ে তবে অবশিষ্ট পাতার নাগাল পেতে হবে। একটা
লগা বানাবো তেমন জুতসই একটা লাঠিও পেলামনা, এদিকে দ্রুত সময় পেড়িয়ে যাচ্ছে। দোনামনা
করতে করতে ছেলেবেলার পুরাতন অভ্যাস স্মরণ করে গাছে চড়ে যাওয়াটাই ধার্য্য করলাম। তাতে
কী আর সমস্যা মেটে, কিশোর বেলায় ছিলাম রোগা প্যাঁকাটি মার্কা, আর এখন প্রায় সাত মাসের
গাভিনের মত থলথলে চর্বির একটা আড়াই মণের নধর লাশ। এদিকে যতবার মনে পড়ছিলো এনারা ফাইনান্সার,
উদ্দীপনা সপ্তমে চড়ে যাচ্ছিলো। অগত্যা, সুভানাল্লা বলে গাছে চড়ে বসলাম।
গুঁড়িটা যেখানে দুটো
ভাগ হয়ে গেছে সেই অবধি পৌঁছাতে কোনো সমস্যা হলোনা, মাটি থেকে
ফুট চারেক মাত্র, খাল থেকে ফুট ছয়েক বটে। এর পর হলো আসল সমস্যা, শুধু জুতো পিছলে যায়।
অথচ বেল গাছে কাঁটা থাকা উচিৎ ছিলো, বছরের পর বছর ধরে ‘পত্রশিকারীদের’ দৌড়াত্বে সে সব মসৃণ ‘কান্ড’ হয়ে গেছে। বুকে পেটে হিঁচড়ে আরো ২-৩
ফুট উঁচুতে অপেক্ষাকৃত সরু ডালে উঠলাম, তাতেও পাতার নাগাল নেই। ওদিকে জিন্সের পকেটে
তখন সমানে বেজে চলেছেন গাইকোয়াড় সাহেব, ফোন ধরব সে উপায় নেই। শুঁয়োপোকার মত আবার খানিক বুকে হেঁটে চলার চেষ্টা
করতে গিয়ে, একটা ভাঙা বেল কাঁটার উদ্ধত অংশে লেগে জামাটা আর্তনাদ করে ছিঁড়ে গেলো। ক্ষণিকের
জন্য বোধহয় মাথাটাও সামান্য টলে গেলো। খানিক ধাতস্ত হতে এবারে শরীরে যেন অদ্ভুত বল
পেলাম।
পৃথিবীর বুকে তখন
আলো আঁধারের দড়ি টানাটানি চলছে, আমিও বেলপাতার ঝাড়ের অন্ধকারে পাতা ধরে টান পাড়াপাড়ি
করছি, তবুও পাতা আর হাতে আসেনা। এবারে বাইকে বসার মত করে ডালের আসনে বসে যতটা সম্ভব
জোড়ে টান দিতেই একটা ময়লা মত কাপড় এসে হাতে ঠেকলো। যাব্বাবা, এ আবার কি কেলো! আচমকা
দেখি আমারই মত আরেকটা ভুঁড়িওয়ালা টাকমাথা লোক পাতা পাড়তে উঠেছে, ওরই ধুতি আমার হাতে।
হতচ্ছাড়া আমি শেষ ১০ মিনিট ধরে কী লঙ্কাকান্ডটাই না করছি, আর ব্যাটাচ্ছেলে বেল্লিক
গাছে চড়ে উপর থেকে আমার অসহায়তার মজা নিচ্ছিলো! ইচ্ছে হলো দিই খানকতক বাছাবাছা খিস্তি,
কিন্তু দ্বিগুণ মন খারাপ করে থেমে গেলাম। তেলেগুভাষী মানুষ, সুললিত বাংলা গালির মর্ম
এ ব্যাটা বুঝবে কীভাবে! মিছে পন্ডশ্রম।
আশ্চর্য হওয়ার আরো
বাকি ছিলো, লোকটা পরিষ্কার বাংলাতে বলে উঠলো- কটা পাতা চাই খোকা। মানে কী, আমি কোন
এ্যাঙ্গেল থেকে খোকা! কিন্তু আচমকা ওই বাংলা উচ্চারন খোকা ডাকের অপমান ভুলিয়ে দিলো।
মুখ থেকে আপনা হতেই বেড়িয়ে এলো- আপনি বাংলা জানেন! জবাব এলো- জানি বৈকি, এবারে হাতে
কটা পাতা নিয়ে তিনিও কাঠবেড়ালির মত সরু ডাল বেয়ে নেমে আমার প্রায় মুখোমুখি চলে এলো।
বয়স্ক লোক, খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর ইয়া মোটা ঝাঁটার মত অপরিচ্চছন্ন গোঁফ। আমাদের কালীনগরের
ষষ্টি গোয়ালার এমন বিচ্ছিরি গোঁফ আছে।
বললাম- চটপট পাতা
গুলো দিন, তাড়াতাড়ি যেতে হবে, গাইকোয়াড় ম্যাডাম অপেক্ষা করছে। বৃদ্ধ খানিক হাই তোলার মত ভঙ্গি করে পিঠ চুলকে বললো-
পারিশ্রমিক দাও। মনে মনে খুব রাগ হলো, নিশ্চিত এই বুড়ো ব্যাটাই নিচের সব ডাল ফাঁকা
করে রেখেছে, আবার গালি দেওয়ার বাসনাটা জাগার আগেই সংবরণ করে নিলাম। শুধালাম, এ কী তোমার
গাছ! বুড়ো বললো- কাগজে কলমে আমার নয় বটে, তবে দখল স্বত্বের দিক
দিয়ে যদি হিসাব করা হয় তাহলে আমিই এর মালিক। আমি আর কথা না বাড়িয়ে পকেটে হাতটা চালান
করলাম, একটা ৫ টাকার কয়েন খুঁজে আনার লক্ষ্যে। ওমা কোথায় কি, পকেট তো গড়ের মাঠ; অথচ
আমি মানি ব্যাগ কোনোকালেই ব্যবহার করিনা, ডান পকেটেই আমার যাবতীয় টাকাপয়সা থাকে। পড়ে
গেলো নাকি নিচে! বৃদ্ধ একটা অশ্লীল হাসি হেসে বললো- নেই বুঝি! আমি কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ়
হয়ে খেই হারিয়ে জবাব দিলাম- নেই মানে, থাকতেই হবে, যাবে কোথায়!
পরিষ্কার মনে আছে
আমি জিন্স পরে এসেছিলাম, অন্ধকারে কেন যে ঠিক ঠাউর করতে পারছিনা- মাথায় ঢুকলনা। আমার
রীতিমতো কাঁচুমাচু অবস্থা, হা হতোস্মি করতে করতে দ্রুত বিষয়টা
ধামাচাপা দিতে চাইলাম। ওদিকে ফোন আসা আচমকাই থেমে গেছে, আঁধারটাও বেশ গাঢ় হতে বুড়োকে
আরো ভালভাবে যেন দেখতে পেলাম। বুড়ো শুধালো- বেল খাবে! বললাম- ইয়ে, কাঁচা বেলে আঠা থাকে,
জিভ ঠোঁট কয়েসে জ্বালা করে বড়। একটু শরবৎ করার ব্যবস্থা হলে ভালো হতো। বুড়ো বলল, এ
আর এমন বড় কথা কি, তুমি আব্দার করেছো যখন আলবাৎ হবে, হতেই হবে।
আমি শুধালাম- তা
কর্তা, আপনার ঘর কোথায়! বুড়ো খানিকটা উদাস গলায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে
বললো, এই দশাতে এসে পড়লে বাবা কার ঘর, আর কিসের ঘর! বুঝলাম, ছেলেপুলে নেই বা তারা খেতে
পরতে দেয়না হয়ত। আহা রে, এই বুড়ো বয়সে বেলপাতা বেচে পেট চালায়, একটু মায়াই হলো। কিছুটা
আর্থিক সাহায্য করতে মন চেয়ে শূন্য পকেটের দিকে হাতটা যেতেই
আবার বুকটা হু হু করে উঠলো- অনেকগুলো টাকাই খোয়া গেছে। মাঝখান থেকে অন্ধকারে হাতড়ানোর দরুন হাতের কব্জিতে একটা কাঁটা ফুটে সেই জ্বালা করতে লাগল।
তা বাপু তুমি এ লাইনে
কদ্দিন? আমি হো হো করে হেসে বললাম- আরে কাকা, আমার এক বন্ধুর স্ত্রী পুজো দেবেন, বেলপাতা
নেই তাই তার জন্য বেলপাতা আনতে এসেছিলাম। বুড়ো যারপর নাই আশ্চর্য হয়ে আমাকে বলল- পুজো
আর তুমি! বলো কী খোকা! এবারে আমি বেশ চটেই গেলাম, হতেই পারি আমি মুসলমান, তা বলে কোনো
হিন্দু বন্ধু থাকতে নেই, নাকি সেই বন্ধুর যদি কিছু দরকার হয় সেটা আমি করবনা, হলোই বা
সেটা বেলপাতার মত তুচ্ছ কিছু। বলতে গিয়েও চেপে গেলাম। বললাম, কাকা পাতা কটা দাও, আমাকে
এগোতে হবে, গাইকোয়াড় সাহেব অপেক্ষা করছে।
বুড়ো খেঁকিয়ে উঠে বলল- মস্করা হচ্ছে। টেনে এক থাপ্পড় মারব যে হাড়েহাড়ে গিঁট পেকে যাবে। তবে রে হারামজাদা
বুড়ো, দরকার নেই তোর বেলপাতার, আমিও দাঁত
খিঁচিয়ে বললাম- সাইড দাও দেখি, আমার তাড়া আছে, যত্তসব জোটেও মাইরি।
বুড়ো সরে যাবার কোনও উদ্যোগই নিলোনা, উলটে
বললো- চটছো কেন ভায়া, একটু পরে চাঁদ উটবে, চাঁদ দেখতে আমার বড় ভালো লাগে। আমি বললাম-
তুমি একা একা এই নিশুতি রাত্রে চাঁদ দেখ আর বেলের আচার, মোরব্বা, শরবৎ খাও, পারলে কিছুটা
শুঁট বানিয়েও খেয়ো, সকালে হাগা ভালো হবে।
বুড়ো আমার কথা অগ্রাহ্য করে এবারে শুধালো, তা বাপু তোমার প্রকার কী, কুল কী? আমি বললাম,
এই তো খানিক আগেই জাত তুলে খোঁটা দিলে, আবার শুধানো কেন! এবারে কেমন যেন সন্দেহ হলো,
ব্যাটা চোর নয়ত! পকেটে টাকা না থাকলেও, সদ্য কেনা আইফোন রয়েছে। হাতে খান দুই আঙটি আছে,
একটাতে হিরে বসানো। বুড়ো কথা না বাড়িয়ে আমার দিকে একটা শরবতের গ্লাস বাড়িয়ে দিতে, সন্দেহ
আমার তিনগুণ হয়ে গেলো। নিশ্চই এতে অজ্ঞান করার ট্যাবলেট বা বিষ মেসানো আছে, নতুবা শরবৎ
এর বোতল নিয়ে গাছে কে উঠে! আমি অচৈতন্য হলেই ব্যাটা সব লুঠ করবে।
তবে রে ঠ্যাঁটা বুড়ো,
আমি খানিকটা তেড়ে যেতেই, আমার চোখের
সামনে গিরগিটির মতো সরসর করে মগ ডালের দিকে গিয়ে কন্টকাকীর্ণ
সরু ডালে চড়ে বসল। আমি তখন এক হাতে তার ধুতির খুঁট ধরে টানছি,
আর সেই বুড়ো আমার দিকে বেলের শরবৎ ছেটাচ্ছে। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ঘেমে উঠলাম, শরীর
দিয়ে আগুন আর ঘাম পাল্লা দিয়ে বের হচ্ছে। এবারে আবার একটা হ্যাঁচকা টান দিতে ধুতিটা
খুলে হাতে এলো ঠিকিই, তার সাথে দেখলাম বুড়ো একটা সাদা বক হয়ে মিলিয়ে যেতে যেতে কেমন
করে যেন গাইকোয়াড় সাহেব হয়ে গেলেন, আমার হাতে
ওনার পাঞ্জাবির একটা ছেঁড়া অংশ। দূর আকাশের গোল থালার মত চাঁদটা ক্রমশ একটা নার্স এর
মুখ হয়ে গেলো, যিনি আমার মুখে জলের ছিটে দিচ্ছিলেন। যাব্বাবা, কেমন যেন সব গুলিয়ে গুবলেট
গেলো আবার।
আমার চোখ মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেলো, চারপাশে চেয়ে দেখলাম-
একটা হাসপাতালের বেডে আমি শুয়ে। হাতের কব্জিতে বেল কাঁটার বদলে স্যালাইনের সিরিঞ্জ
গাঁথা রয়েছে। জনা দেখলাম খুশি চেপে রাখতে
না পেরে- ‘চেতনা অসি যাইছি’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো উল্লাসে। এতক্ষণে গাইকোয়াড় ম্যাডামের
মমতাময়ী আওয়াজ পেলাম, কী দরকার ছিলো বাবা ওই সন্ধ্যাবেলায় বেলগাছে চড়ার! গাইকোয়াড় সাহেব
বললেন, চোট তেমন মারাত্বক নয়, ভাগ্যিস ঘাসের গাদার উপরে পরেছিলে। পাথরে পড়োনি বলে রক্ষে,
তবে হাড় ভাঙেনি এটাও তোমার তোমার গুরুজনের আশির্বাদ, ইত্যাদি। তা বাবা, ওই ভাবে পাঞ্জাবি
ধরে টানাটানি করছিলে কেন! তোমার ভুল বকা দেখে আমার খানিক ভয় ভয়ই লাগছিলো।
সকলে নানা কথাবার্তা
বলা কওয়া করতে লাগল, গায়ে ধুম জ্বর ঘাম দিয়ে ছাড়ছে বলে মাথা শরীর ভিজে গেছে। এর মাঝে
যে কথা কটা কাউকে বলতে পারলামনা- সেই বুড়োর কাহিনীটা। ওটা স্বপ্ন ছিলো নাকি সত্যিকারের
ভুত দর্শন করেছিলাম তাও মনে পরছেনা! কে জানে কখন পা ফসকে নালায় পড়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম,
ওই কাঁটায় বিঁধে যখন জামাটা ছিঁড়েছিল তখনই বোধহয়। যাই হোক, ২ দিন পর ছাড়া পেয়েছিলাম
হাসপাতাল থেকে, গাইকোয়াড় সাহেব ব্যস্ত মানুষ, প্রায় জোর করেই ওনাদের ফেরত পাঠিয়ে দিলাম।
জনা থাকলে আমার কোনো অসুবিধা নেই, সে হোটেলে থাকাতেই তো আমার এই বিপত্তি।
এর পর থেকে আজও, যখনই
বেল গাছ দেখি, সেই বৃদ্ধ বক ভুতকে দেখার বা খোঁজার চেষ্টা করি, কে জানে কোন অন্ধকারে
ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে কার মুখে শরবৎ ছেটাচ্ছে!