ভ্রমণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভ্রমণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৫

অকপট চড়ুইভাতি ২০২৫


 ১৬শ শতাব্দীর শেষভাগ, দিল্লির মসনদে তখন প্রতাপশালী মুঘল- সম্রাট আকবর। 


দিল্লীশ্বর, বাংলা-বিহারের শাসনকর্তা হিসেবে উড়িষ্যা দখল করতে নির্দেশ দিলেন অম্বররাজ মানসিংহকে। মহারাজ মানসিংহ তার সুপুত্র জগৎসিংহকে এই কাজে নিয়োজিত করেন। সুদক্ষ যোদ্ধা রাজপুতবীর জগৎসিংহ বার বার সামরিক আক্রমণ করে পাঠানদের অতিষ্ট করে তোলে। এরকম সময়েই একদিন জগৎসিংহের সাথে স্থানীয় ভূস্বামী বিরেন্দ্র সিংহের একমাত্র ষোড়শী কন্যা, সুন্দরী তিলোত্তমার সাক্ষাৎ হয় শৈলেশ্বরের মন্দিরে। নিজের অজান্তেই উভয়ে একে অপরের প্রেমে পড়েন। উড়িষ্যা-অধিকারী পাঠানেরা মান্দারণ অঞ্চলের জমিদার বাড়ি লুট করতে এসে সস্ত্রীক জমিদার ও তার কন্যাকে বন্দী করে নিয়ে যায়। রাজপুতবীর কুমার জয়সিংহ তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পাঠানদের হাতে বন্দী হলেন।

চেনা গল্প তো! ঠিকিই ধরেছেন, এটা বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের পটভূমি। বাংলা সাহিত্যের জয়ঢাক বাজিয়ে জন্ম নেওয়া ‘দুর্গেশনন্দিনী’ মুঘল-পাঠান দ্বন্দ্বকে ভিত্তি করে, ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমিতে রচিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম বাংলা উপন্যাস, মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৮৬৫ সালে এটি প্রকাশিত হতেই, বাংলা গদ্য সাহিত্যে বিপ্লব ঘটায়। ব্যক্তি-আগ্রাসী সামন্তসমাজ, ব্যক্তি হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা ও ক্রন্দন, আবিষ্কারের ঐকান্তিকতা, বাংলা উপন্যাসের বৃহত্তর জীবনমুখী পটভূমিকে চিনতে বা জানতে ইচ্ছা যায়না? রোম্যান্সমধুর রহস্যলোক, ইতিহাসের স্বপ্নাবেশ আর আদর্শায়িত ব্যক্তি ও সমাজকেন্দ্রিকতা যে মাটিকে আবর্ত করে গড়ে উঠেছিলো, তাকে ছুঁয়ে দেখায় বাসনা যায়না? 

বাংলার আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক আবর্ত-সংঘাতে ঘূর্ণমান ও বিচূর্ণ-ভগ্ন মূল্যবোধ রূপায়ণের ঐকান্তিকতা এবং সমসাময়িক জীবনের চলমান বহির্বাস্তবতা অঙ্কনের অলক্ষ্য স্থান, আজ তার কিছুই রক্ষা করতে পারেনি কিছু ভাঙা ইট পাথর ব্যাতিত। ২০১৬ তে আমরা শরৎচন্দ্রের পানিত্রাসের ভিটেকে ছুঁতে পাওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছিলাম অকপট চড়ুইভাতির সৌজন্যে, সেখানে বঙ্কিমের সৃষ্টি সুখের গড়কে ছুঁয়ে দেখার একটা সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়! অনিশ্চয়তার এই তো জীবন, আজ আছি কাল নেই। অকপটেই বা সেই ২০১৬ এর কতজন টিকে আছি আজ ১০ বছর পর ২০২৫ এ এসে, জীবন নদীতে সময়ের স্রোত বয়েই চলেছে, নতুন জলের ধারায় কতজন হারিয়ে গেছে, আবার কত নতুন প্রাণেরা এসে ধরা দিয়েছে, এটাই জীবনের নিয়তি। তার আগে যেটুকু সুযোগ আসে, দেখে যায় প্রাণ ভরে।

বঙ্কিমের ‘দুর্গেশনন্দিনী’র সৃষ্টি সুখের গড়, সত্যিকারের গড়, নাম- গড় মন্দারণ। হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমার, গোঘাট ব্লকে অবস্থিত এই গড় মন্দারণ। দ্বারকেশ্বর নদ ও শিলাবতী নদীর মধ্যবর্তী তরঙ্গায়িত পললমাটির ওপর মন্দারণ দূর্গটি আজ আর নেই, সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে, রয়ে গেছে ইতিহাস। আজও মাটি খুঁড়লে সেই আমলের অস্তিত্ব মেলে যত্রতত্র। কে জানে কোন পথে ঘোড়া হাঁটিয়ে ছিলো দুর্গাধিপতি জয়ধর সিংহ, কোথায় রয়েছে রূপসী তিলোত্তমার হাতের ছোঁয়া, কোথায় ই বা সেই শৈলেশ্বর মহাদেবের মন্দির- কে জানে! নবাবজাদী আয়েষার অতৃপ্ত আত্মা হয়ত আজও খুঁজে ফেরে কুমার জগৎ সিংহকে।

গড় মান্দারণের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অসাধারণ, কাছেই বয়ে চলেছে আমোদর নদ। হুগলি ও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সীমানায় এই গড় মান্দারন, হুগলির অন্যতম বনাঞ্চল চাঁদুর ফরেস্ট এখানেই অবস্থিত। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের জন্মভূমি কামারপুকুর থেকে গড় মান্দারণে দূরত্ব মাত্র ৩ কিলোমিটার। নির্জনতা যাঁদের ভাল লাগে, এই জায়গা তাঁদের ভারি পছন্দ হওয়ার কথা। নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশে মাঝেমাঝে বয়ে চলা বাতাসের শন শন শব্দ আপনার শহুরে ক্লান্তি দূর করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বর্তমানে প্রায় ২০০ একর জমির উপরে গড়ে উঠেছে গড় মান্দারণ পর্যটন কেন্দ্র। কথিত রয়েছে গৌড়ের অধিপতি হুসেন শাহের সেনাপতির সমাধি রয়েছে এখানে, যা দরগা নামে পরিচিত। চুড়ুইভাতিতে আসার নামে শ্রীরামকৃষ্ণের ভিটেকে চোখে দেখা বোনাস প্রাপ্তির মতই সুখকর।

শাল, শিমুল, পিয়াল, সেগুন দিয়ে ঘেরা গড় মান্দারণের জঙ্গলে একটা দিন হৈহৈ করে জীবনকে উদযাপন করতে আসবেন নাকি! বাকি সব কিছু ভুলে যান, গড় মান্দারণের প্রকৃতি এখানে জীবন্ত ইজেল, রং-তুলি দিয়ে ক্যানভাসে আঁকা ছবি। অদ্ভুত শান্তি মিশে রয়েছে এখানকার বাতাসে, পাখির কলতান, গাছেদের ফিসফাস আর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে মিশে থাকা মাদকতায়। চড়ুইভাতি সেরে কামারপুকুর বা জয়রামবাটীতে একটা রাত থেকে যেতেই পারেন, শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদাময়ীয় স্মৃতি বিজড়িত স্থানের আধ্যাত্মিকতা ও ইতিহাস ছাড়াও এখানে গ্রামের সবুজ পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে। মঠ ও মিশনের শান্ত–সুন্দর পল্লী পরিবেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামের ইতিহাসের উপাদানগুলির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া একটা উপরি পাওনা বৈকি।

হাওড়া থেকে গোঘাট বা আরামবাগ গামী লোকাল ট্রেন ধরে খুব সহজে পৌঁছে যাওয়া যায় গড় মন্দারণ। সকালে হাওড়া স্টেশন থেকে ৭টা ২৫ এর গোঘাট লোকালটা বেস্ট। এছাড়া শ্যাওড়াফুলি থেকে ট্রেনে তারকেশ্বর-আরামবাগ হয়ে ভায়া কামারপুকুর, গড় মন্দারণ যাবার বিবিধ উপায় রয়েছে। কেউ যদি উত্তরের দূরবর্তী জেলা থেকে আসেন, কামরূপ এক্সপ্রেসে চড়ে পড়াটা বেষ্ট। মধ্যবঙ্গ থেকে এলে হাটেবাজারে এক্সপ্রেসে রাত ১২টার আশেপাশে চড়ে বসলে সকাল ৫টার আগেই হাওড়া পৌঁছে যাবেন। উত্তর চব্বিশ পরগণা বা নদীয়া থেকে এলে ব্যারাকপুর ফেরিতে মাত্র ৬ টাকায় গঙ্গা পার হয়ে শ্যাওড়াফুলি ঘাট, সেখান থেকে ২ মিনিটে শ্যাওড়াফুলি রেল স্টেশন। বাসে কিম্বা গাড়িতে চড়ে কামারপুকুর হয়ে পৌঁছে যাওয়াটা কোনো ব্যাপারই নয়। মেদিনীপুর শহর, খড়্গপুর, পাশকুড়া, চন্দ্রকোণা রোড, উলুবেড়িয়া, বাগনান, বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, বর্ধমান, মেমারি, নবদ্বীপ থেকে প্রচুর বাস রয়েছে ঘন্টায় ঘন্টায়, যাগুলো সরাসরি কামারপুকুরে পৌঁছে দেবে আপনাকে। সেখান থেকে অহরহ টোটো পাওয়া যায় পিকনিক স্পটে পৌঁছাবার জন্য। 

সকালে পাকোড়া আর চা/কপি, ব্যাস। এর বেশী খেলে মধ্যহ্নভোজে, পাকস্থলী আহত হতে পারে খাসির মাংসকে যথাযথ স্থান না দিতে পেরে। এরপর তুমুল আড্ডার ফাঁকে ততক্ষণে সাদা ভাত, সোনা মুগের ডাল, ঝুড়ি আলুভাজা, বাঁধাকপি দিয়ে মটরশুটির ঘন্ট, চাটনি, পাঁপড় আর রাজভোগ- পাতের সৌন্দর্য বর্ধন করার জন্য এগুলো প্রস্তুত হয়ে যাবে কষা কষা ঝাল ঝাল খাসির মাংসের সাথে। পার্কের এ্যান্ট্রি ফি, পিকনিক স্পটের ভাড়া, হাঁড়িকুড়ি ভাড়া, খাওয়ার প্লেট গ্লাস, রান্নার গ্যাস, বোতল বন্দি পানীয় জল, মাংস, মসলা, চাল সবজি, ঠাকুর চাকর, ইত্যাদি সব মিলিয়ে মাথাপিছু মাত্র ৬০০ টাকা করে চাঁদা ধার্য্য করেছি। ১০ বছরের নিচের বাচ্চা কমপ্লিমেন্টারি, তার উপরে আমরা সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক। এই হলো দেনাপাওনার গল্প।

আমাদের আয়োজন ৫০ জনের অধিক নয়, ৪০ এর আশেপাশে হলে সবথেকে ভালো। অধিক ভিড়ে আলাপের মাদকতা নষ্ট হয়, তাছাড়া আয়োজনেও কিছুটা অপারগতা রয়েছে। তাই আপনাকে নিয়েই যদি সংখ্যাটা পূরণ হয়ে যায়, তার চেয়ে ভালো আর কিচ্ছুটি হয়না। তাহলে, আসছেন নাকি আগামী ২১শে ডিসেম্বর ২০২৫ এর দুপুরে গড় মন্দারণে? কিছুটা ইতিহাস, কিছুটা আধ্যাত্মিকতা, কিছুটা সাহিত্যের গন্ধ গায়ে মেখে, অকপট চড়ুইভাতির নামে আসবেন নাকি একটা দিনের অবসরে?


বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৫

গণিতশিক্ষা

 

তখনও আমাদের এলাকাতে বিদ্যুৎ আসেনি, ওই নব্বই এর দশকের গোঁড়ার দিককার কথা। সন্ধ্যায় হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোতে খানিক ঢুলুনির পড়া- দুলে দুলে পড়ে ছাদে চলে যাওয়া, ওখানেই দাদু ক্যাম্পখাট বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে আকাশের তারা দেখতো। বাসু, পঞ্চানন, আল্লারাখা, নেপাল, মজনুর কেউ কেউ বা সব কজন মিলেই কেউ হাতপাখার বাতাস করত, কেউ বা হাতপা টিপে দিতে দিতে দাদুকে কোম্পানি দিতো। কখনও কালী নগরের চাষা বিষ্টু পাল, কখনও হাটের কেষ্ট ময়রা, কখনও ইস্কুল পাড়ার দুর্গা মাস্টার সঙ্গ দিতো, কিছু রেশনের মাল ফ্রিতে পাবার আশাতে। বুশ কোম্পানির একটা খাঁটি বিলাতী রেডিওতে সর্বক্ষণ বাজত, ঠুংরি, গজল, আধুনিক, লোকগীতি থেকে গজল, কীর্তন, কাওয়ালি সবই। মাঝেমাঝে সংবাদের সময় ভলিউমটা বেড়ে যেতো, তারপর আবার সেই একটানা শান্ত লয়ে ফিরে যাওয়া। বৃষ্টির দিন বাদে, মোটামুটিও সারাবছরই এই আসর জমত এক অদ্ভুত মৌতাতের সাথে।

ব্যবসায়িক মানুষের সারাদিনের উদয়াস্ত নানান কাজের শেষে এটাই ছিলো নিখাদ অবসরের সময়। যারা এই আসরে থাকত তারা অধিকাংশই ভৃত্য শ্রেনীর আর উমেদার গোছের মানুষ, তবে রোজই এক বা একাধিক সাহায্যপ্রার্থী ভদ্রজন পরিস্থিতির দায়ে কাঁচুমাচু মুখে ক্যাম্প খাটের পাশে রাখা হাতল ওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসত, বাকিরা ফরাশ ঢালা খেজুর পাতার মাদুরে। ভৃত্যদের দল অবশ্যই ছাদের মেঝেতে বসত। পাশেই দেবনাথ স্টোভে আগ্নেয়গিরির মত সর্বদা ফুটত চায়ের দুধ, জনতা স্টোভের নবদ্বীপীয় সংস্করণ ছিলো এই দেবনাথ স্টোভ। নিজেদের রেশন দোকান হেতু কেরোসিনের কোনো অভাব ছিলোনা, না চিনির ঘাটতি ছিলো, গোয়ালে খান বিশেক দুধেল গাই- শুধু চা টা বাইরে থেকে কিনতে হতো। এর মধ্যে ‘ডাকু সমর সেন’ এর টোঙ থেকে চপের বিবিধ পসরা আসত, সাধুচরণের ঘুগনি, আর কালুর দোকান থেকে গরম গরম রসগোল্লার সাপ্লাই আসতেই থাকত। ডায়াবিটিস বা কোলেস্টেরল মত বিদেশী রোগের নাম এ অঞ্চলে তখনও আবিষ্কারই হয়নি।

ও হ্যাঁ, সমর সেন কেন ডাকু তার আলাদা গল্প আছে, রাত ১০টার মধ্যে তেলেভাজার দোকান বন্ধ করে নিয়মিত শুঁড়িখানায় গিয়ে চোলাই পান করত। সাথী ছিলো কাঞ্চনতলার বিষে মাতাল, মোল্লারবিলের অতুল, বারোয়ারীতলার কানা পটল, চাষাপাড়ার পরেশ পালের মত অনেকে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে সকলেই মিছিল করে ভোর রাত অবধি পাকা রাস্তা জুড়ে তাদের মাতলামির পালাগান চালাতো। আমার দেখা মতে এরা কারোর কখনও ক্ষতি করেনি, রাত্রের ওই শব্দ উপদ্রব টুকু ছাড়া। প্রতিটা মাতালের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট ছিলো, ছিলো আলাদা আলাদা কাণ্ডকারখানা, সে গল্প আরেকদিন বলা যাবে। সমর সেন ছিলো দিনের বেলায় পেশাদার রাঁধুনি ঠাকুর, বিয়ে, শ্রাদ্ধ এমন অনুষ্ঠান বাড়িতে তাকে পাওয়ার জন্য রীতিমত ৩ মাস আগে বায়না করতে হতো, আর সন্ধ্যায় কালীতলা প্রাইমারি স্কুলের সামনে চপের দোকান দিতো। কিন্তু মদ পেটে গেলেই ইনি মনেপ্রাণে ডাকাত সর্দার হয়ে যেতো, বনবন করে একটা কঞ্চি বা ঢোলকলমির লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে ভোররাত অবধি এলাকার অলিগলি দিয়ে নেশার খেয়ালে ছোটাছুটি করতে করতে হাঁক পারত- হুঁশিয়ার, ডাকু সমর সিং, হুঁশিয়ার। এই এক লাইনের ডাইলোগ হাজার বার আউড়াতো, সেন বদলে যেতো সিং এ। রোজ সকালে তাকে কোনও না কোনো খাল বা নয়ানজুলিতে আবিষ্কার করত ভোরের বেলা মাছ ধরতে যাওয়া বাগদিদের দল। এই ছিলো সমর সেনের কাহিনী।

আমার দাদু, তার পাঁচ ছেলের একটাকেও তিনি মানুষ হওয়ার যোগ্য মনে করেননি আমৃত্যু, ফলত কাউকেই তিনি নাম ধরে ডাকতেননা, অমুকের বাচ্চা তমুখের ছেলে যোগে প্রত্যেকেরই একটা নাম খাস্ত করা ছিলো। জ্যেঠুর নাম বড় পাঁঠা, বাবার নাম তোতলা, সেজো কাকার নাম কানপচা, ন কাকার নাম ডোম, ছোট কাকার নাম ফেউ। পিসিদেরও এমন নাম ছিলো, এমনকি প্রতিটা জামাই এরও। জ্যেঠু প্রফেসর হয়েছিল শুনে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল বেচারা। সেজদাদু উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা চছিলেন বলে তিনি একপ্রকার অচ্ছুৎ নিম্নবর্গীয় ম্লেচ্ছ জাতের ছিলেন বাড়িতে। দাদুর প্রতাপের সামনে দাড়াবে সে মুরোদ কারো ছিলোনা। বাবাকেও চাকরি করতে দেননি, ছোটকাকা রীতিমত পালিয়ে গিয়ে আর্মিতে যোগ দেন। দাদুর একটাই সরল দর্শন ছিল, ব্যবসা কর, টাকা কামাও- লোকের চাকর হবি ক্যেনে হে…, ইত্যাদি।

স্বভাবতই বাবা-কাকাদের সাথে দাদুর সম্পর্ক ছিলো অহি-নকুলের, কখনও কাউকে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে দাদুর সাথে কথোপকথন করতে দেখিনি। একবার হিন্দুও হতে চেয়েছিলেন যাতে ছেলেদের ত্যাজ্য করা যায়, কারন ইসলামে সেই সুযোগ নেই। হাল জোতার কাজ করা করিমের বামন আধপাগলা ছেলে- কইসারকে প্রায় দত্তক নিয়েই ফেলেছিলেন আরকি! শেষে বটুকেশর মোক্তার বুঝিয়ে শুনিয়ে ক্ষান্ত করেন কর্তাকে। আরেকবার রেগে গিয়ে ঝাড়খণ্ডের কোনো এক এলাকা থেকে হতদরিদ্র কুর্মি ও চৌধুরীদের আন্ডাবাচ্চা সহ প্রায় দেড় ডজন পরিবারকে হাজির করলেন, এবং তাদের থাকার জন্য জমি ও রোজগারের কাজ দিলেন ক্ষেতে আপিসে। শর্ত একটাই, ওনাকে রাজা সাহেব বলে ডাকতে হবে। কয়েক বছর মিছিল করে সকালে তারা রাজা সাহেবকে প্রদক্ষিণ করত, শুরুতে বিষয়টা হাস্যকর লাগলেও ক্রমশ সয়ে গিয়েছিলো। আজও আমাদের গুল ফ্যাক্টারির গায়ে এই প্রজাদের দল বাস করে। এই প্রজারা ওনাকে নিয়মিত নজরানা দিতো, পুঁইশাক, কলাই এর ডাল, কাঁচা ভুট্টা, লাউ, ওল, শীতের সময় নানান পিঠে, খেজুর গুড় ইত্যাদি। সন্ধ্যার আসরে তারা মাঝেমাঝেই গাঢ় ঘণ দুধ দিয়ে যেত, সাথে গুড় আর ছাতুর নাড়ু, ঘরে বানানো বোঁদে জাতীয় মিষ্টান্ন, চিনেবাদাম ভাজা- হরেক রকমের আইটেম দিয়ে তাদের ‘রাজাসাহেব’কে খুশ করে দিতো।

সান্ধ্যকালীন ওই ছাদ আসরটা ছিলো জ্ঞানের খনি, এক তো সকলে সারাদিনের কাজের বর্ননা দিতো। মুন্সী, খাজাঞ্চির, দস্তিদারের দল ওখানে এসেই তাদের সারাদিনের হিসাবের ফিরিস্তি শোনাতো অনেকদিন। আমাদের মসজিদের ছোট মৌলানা মনসুর সাহেব আসতেন ‘বড় কর্তাকে’ নসিয়ত করতে। কখনও কখনও মুসাফিরের দলের কাউকে ছাদে ডেকে নিয়ে তাদের থেকে নানান গল্প শুনতেন দেশ বিদেশের। তেমনই একজন আসতেন দস্তগীর সাহেব নামে, ইয়া লম্বা দশাসই ফর্সা চেহারা, মাথায় সবুজ সিল্কের কাপরের ফেট্টি, লম্বা কালো দাঁড়ি, গোঁফ হীন মুখেমন্ডলে দু’চোখে মোটা সুর্মার রেখা। হাতে গোনা যে দু একজনকে দাদু সামান্য শ্রদ্ধা ভক্তি করতেন তার মধ্যে ইনি ছিলেন। কেউ বলত তার বাড়ি নাকি সেই ইরাণ দেশ, কেউ বলতো আরব মুলুক, কেউ নাকি তাকে আজমীঢ়ে এমনকি পাথরচাপড়িতেও দেখেছে- জ্বীন পোষা আছে। যারা ওনাকে সহ্য করতে পারতনা, তারা বলত ব্যাটা নাকি মুর্শিদাবাদের খুনে আসামি, পুলিশের ভয়ে ভেক ধরেছে।

এই প্রসঙ্গে যে কথাটা না বললেই নয়, তা হলো দাদুর উপাস্য। আমাদের মাদ্রসার হেড মৌলানা নঈম সাহেব কবে নাকি দাদুকে একবার সাহস করে বলেছিলেন- চাচাজী, আপনার তো সব ফরজ হয়ে গেছে, তা নামাজ রোজাটা…, দাদু বাকীটা আর শোনেননি। এবং ফরজ শব্দের মানে তার নিজের অভিধান মাফিক করে নিয়েছিলো, এর পর থেকে ঈদ বকরিদের নামাজ টুকু ছাড়া আর কিছুই করতেননা ধম্মকম্মের কাজ। শুধু বলতেন, তার তো সব ফরজ হয়ে গেছে, নঈম বলেছে। দাদুর ঘরে পূবের দেওয়াল জুড়ে ইয়াব্বড় একটা মোটা কাপরের উপরে আঁকা রঙচটা ডমরুধর নটরাজের ছবি টাঙানো ছিলো। ওনার আইডল ছিলো হিটলার, তার মত মাছি গোঁফ লালন করে গেছেন সারাজীবন।

আমরা সকল ভাইবোন ও আমাদের সমবয়সী বাবার তুতো ভাইবোনেরা মিলে সর্বক্ষণ ওই ছাদের আসরে যাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকত, যেন তেন ভাবে পড়া শেষ করেই দে ছুট। যেতে দেরি হলে দাদুই কাউকে না কাউকে দিয়ে সমানে তাগাদা দিতেন হাজির হওয়ার জন্য। মা কাকিমারা দালান বাড়িতে চলে যেতেন হেঁসেল সামলাতে, ব্যাস আমাদের আর বাঁধে কে! আসরের প্রধান আকর্ষণ হিসাবে তেলেভাজা, ঘুগনি, গরম রসগোল্লার নৈবিদ্যি তো ছিলোই, তার সাথে ছিলো বিড়ি খাবার বিষয়টা। ওটাই ছিলো শো স্টপার। ওই আসরেই নানান ধরণের জীবনশিক্ষার ক্লাস হত, বিড়ি টানাটাও তার মধ্যেই ছিলো। স্বভাবতই প্রত্যেক বোনেরাও সে বয়সে বিড়ি টানাতে উস্তাদ হয়ে গিয়েছিলো। বাবা কাকারা এসব তুচ্ছ বিষয়ে কখনই গুরুত্ব দিতেননা, মা কাকিমারা দাদির কাছে গজগজ করে তাদের রাগের বহিঃপ্রকাশ করত আর ওছিলা পেলেই আমাদের ধরে পেটাতো। দাদুর সামনে সে কথা বলার সাহস কারোরই ছিলনা।

বেলতলার পালবাড়ির শীলা পিসি আমার কাজরী পিসির ক্লাসমেট ছিলো, সান্ধ্য আসরে আমাদের উচ্ছুন্নে যাওয়া দেখে মা কাকিমা দাদি পিসিরা মিলে শলা করে শীলা পিসিকে আমাদের টিউশনি দিদিমনি নিযুক্ত করলেন। রাত হয়ে যাওয়ার দরুন পিসিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য দাদুর চৌধুরী প্রজাদের মধ্যে থেকে রামখিলোয়ান আর পাষাণ সিং কে পাহাড়াদার নিযুক্ত করেছিল দাদি। সেই টিউশনিও ৩ মাসের বেশী টেকেনি, দাদু জানতে পারার একমাসের মধ্যেই টিউশনি গোল্লায় গিয়েছিলো। একদিন দাদু শুধালেন, হ্যাঁরে হাফ পচা, এটাই আমার দাদুর দেওয়া নাম ছিলো। যাই হোক, দাদুর প্রশ্ন ছিলো- অধরের বেটির কাছে আমরা কী ধরণের পড়াশোনা করতাম! বললাম, গণিত, বিজ্ঞান আর সাধারণ জ্ঞান। একদিন সান্ধ্য আলাপ শেষ হওয়ার আগে মেয়েদের সকলকে নিচে পাঠিয়ে দিয়ে দাদু বললেন- বিয়ে কর, গণিত শিখে যাবি।

শুরুতেই বলেছি, বিভিন্ন বয়সি, ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক তবকার মানুষের সে এক আজব আড্ডাখানা ছিলো, রীতিমতো জ্ঞানের বিরিকণ হতো নানান অলঙ্কারের সহিত। কারো একটা এজাহারকে কেন্দ্র করে আসর শুরু হতো, এবারে চক্রাকারে আলাপ পাক খেতে খেতে জমে উঠত, উমেদার মোসায়েবের দল হৈ মেরে উঠত। দাদু বললেন, কিহে পশুপতি- এ বিষয়ে তোমার কী রায়! পশুপতির থালাবাসনের দোকান বর্ধমান শহরের কোথাও একটা, কর্তার তেজারতির ব্যবসার তামাদি হয়ে যাওয়া কাঁসা, পিতলের থালা বাটি গ্লাস কিনতে আসত মাসে এক দুই বার। তিনি বললেন, আজ্ঞে গণিতের বিষয়ে কর্তার চেয়ে আর পারদর্শী কেউ বা আছে! পরশুরাম দেবনাথ নিম্ন বুনিয়াদী পাঠশালার শিক্ষক, কন্যাদায়ের সাহায্যপ্রার্থী হেতু সদ্য মোসায়েবের দলে নাম লিখিয়েছে। কালনা কোর্টের পেসকার মনোতোষ ঘরামী, জমি মাপা আমিন সইফুল্লা উকিল, পাটের আড়ৎদার রাসু ভাদুড়ি, জমির দালাল মিহিজাম মুৎসুদ্দি, ইমারতি দ্রব্যের দোকানি পরিমল ঘটক, হোমিওপ্যাথি ডাক্তার তারাচরণ ভচ্চাজ্জ্যি সহ এমন অনেকেই নিজ নিজ উদ্দেশ্যে মণ্ডলীতে উপস্থিত হতো। সকলেই কিছু কিছু চটুল রসিকতা করলেও তার স্বর বেঁধে দিতো কর্তার সেই দিনের মেজাজ। তাই আড্ডা অবিচল থাকলেও মোসায়েব গুলো ঋতুর মতই বদলাতে থাকত।

বিপদতারণ সামন্ত ছিলো স্যাকরা, তিনিও কোনো উদ্দেশ্যে সেদিন হাজির ছিলো। সে নিক্তি মেপে ভরিতে সোনা কেনাবেচা করে অভ্যস্ত, সূক্ষ্মতা তার স্বভাব গুণ, তিনিই বিষয়টা আরো গভীরে নিয়ে গিয়ে ব্যাখ্যা করলেন। বিবাহিত পুরুষ যতই বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ, করণের ‘পঞ্চাঙ্গ’ মিলিয়ে পঞ্জিকা দেখে গননা করুক, ২৩ দিনের বেশী কিছুতেই হাতে পাবেনা মাসে। বাদ যাওয়া ৭ দি কালহরণ দশা, রক্তারক্তি বিষয় আরকি। দাদুর দুটো গুণ ছিলো অনন্য, যেমন সিমাহীন খিস্তিখেউর করতেন কারনে অকারনে, পাত্রমিত্রের ফারাক না করে; তেমনই অকারতে দান করতেন জাত ধর্ম বর্ণ বাছবিচার না করে। রেগে গেলে গালিগালাজ করতেন, আনন্দে ফুর্তিতে গালিগালাজ করতেন, টেনশনে গালিগালাজ করতেন, অসুস্থতাতে গালিগালাজ করতেন, শোকেও গালিগালাজই ছিলো তার যাবতীয় আবেগ প্রকাশের ভাষা।

কর্তা তোফা বলে কয়েকটা বাছা খিস্তি মেরে উঠতেই মোসাহেবের দল চাটুকারিতার জন্য তৃপ্তির সাথে পুণ্যবান হৈ মেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো। এক্ষেত্রেও বিপদতারণ অমুখের ভাই শব্দে ভূষিত হলে সম্মানের সহিত। মধুকর হালদার কিছুটা ঠোঁটকাটা ছিলো, যেন দুধের মাছি। তার পেশা ছিলো অভাবি লোককে খুঁজে খুঁজে তাকে চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়া, অনাদায় হলেই লেঠেল দিয়ে ভিটেমাটি দখল করাই ছিলো তার মূল কাজ। এর জন্য বড়কর্তার আশির্বাদ অত্যন্ত জরুরি, দারোগা সামাল দেওয়া থেকে শুরু করে মামলা হলে মুন্সেফ এজলাস বা মোক্তার সামল দেওয়া লাগতো। এ ছারা সারাবছর ভুষি মাল আর দাদনের অর্থের যোগানের জন্য এলাকাতে কর্তার দ্বিতীয় বিকল্প ছিলোনা।

হালদার মশাই বললেন- ওই ২৩ দিনেও কী রক্ষে আছে বিপদ ভায়া, মাগীদের নানান ছুতো আর নক্সা। কবে কবে মাথার ব্যামো, কবে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাওয়া, কবে তার তিরিক্ষি মেজাজ, কবে আবার মন খারাপ, কবে গরম লাগা, আবার কবে শীতের কাঁপুনি, বাপের বাড়ি যাওয়া, সই আসা, ছেলে কেঁদে মায়ের পাশে শুয়ে পরা, বাড়িতে অতিথি আসার দরুন পেরেসানি, মড়া বাপ মায়ের কথা মনে পরার বেদনা, তার উপরে শুয়োছো কি শোওনি হরদম পোয়াতি হয়ে যাবার ঝক্কি- এ সব বিবিধ ধরণের জটিল গণনা যুক্ত হিসাবনিকেশ হলো এই বিয়ে। পাঁজি জ্যোতিষ মিলিয়ে মাসে সাকুল্যে ৪-৫ দিন পাওয়া যায় খুব বেশি হলে। এটা সম্ভাব্যতা মাত্র, এবারে নিজেকে সেই সম্ভাব্যতা সাথে জরিপ করে কার্যসিদ্ধি করতে হয়। এর পর যদি সামান্য অশান্তি টুকুও হয়েছে কী হয়নি, অমনি মাগীরা গোসাঘরে খিল আঁটে। লগ্ন বয়ে গেলেও, হপ্তাগুলো ঝিলিক মেরে কোথাদিয়ে যে নিকেশ হয়ে যায়, টেরই পায়নামাগী মটকা মেরে এক কাতে সারারাত পাশে শুয়ে থেকে হাড় মটমটে রোগ বাঁধালেও, মুখ ফুটবেনা গয়না বা শাড়ির উৎকোচ বিনা। এটা আমার তৃতীয় পক্ষ, সব এক জাত, এক রোগ। অতএব উপবাসি জীবন রে ভায়া, পুরুষের জীবনটাই এমন কঠিন আঁক কষতে কষতে ফুরিয়ে যায়। আর এভাবেই প্রত্যেকটা মরদ মানুষ অশিক্ষিত হলেও গণিত ঠিকিই শিখে যায়।

আজকে আমি নিজেই চল্লিশের গন্ডি ছুঁয়েছি, বেঁচে থাকলে আগামী এক দশকে আমিও দাদু হয়ে যাব। পেশাদার জীবনের বাধ্যবাধকতায় বছরের অর্ধেক দিন বাইরে বাইরেই কাটে, এর মাঝে যে কটা দিন ঘরে ফিরি- ন্যাতানো জীবনে কখনই স্ত্রীর গণিতের সাথে আমার গণিত মেলাতে পারিনি। সে আপনি যতই বীজগনিত, জ্যামিতি, পরিমিতি, ক্যালকুলাস বা লগারিদম ব্যবহার করুননা কেন, কোনো রসায়ন কাজ করেনা। পুরুষ মানুষের জীবনে এসব শিক্ষা নুন্যতম কাজে লাগেনা- স্ত্রীচরিত্র গণনায়

আমাদের শিক্ষা জীবনে ইস্কুলে যা কিছু শিখেছিলাম তার প্রায় কোনো কিছুই কাজে লাগেনি দৈনন্দিন জীবনের আবর্তে। তারচেয়ে বরং দাদুর সাথে সান্ধ্য মন্ডলীর ওই খেউর আড্ডায় শেখা গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, নীতিকথা গুলোই অনেক কার্যকরী এই পোড়ার জীবনে।

 

মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫

বিল্বমঙ্গল

 


(১)

সেটা ২০০৮ এর শেষ নভেম্বর কী ডিসেম্বরের শুরু নাগাদ হবে। তখন রমরমিয়ে চলা রাইসমিলের সাথে চাল এক্সপোর্টের জাঁকানো ব্যবসা। আমরা মূলত দুবাই এর এজেন্ট দের LC মারফৎ CIF পশ্চিম আফ্রিকার কোনো বন্দরে মোটা চাল পাঠাতাম। কখনও কখনও আতপ চালের অর্ডারও আসত, সেই সুত্রে আমাদের হয় ছত্রিশগড় কিম্বা অন্ধ্রপ্রদেশ দৌড়াতে হতো, কোন বন্দর দিয়ে এক্সপোর্ট হবে তার উপরে নির্ভর করে। সেবারে আতপের অর্ডারটা বেশ মোটা ছিলো, তাছাড়া ভাইজাক পোর্টে নতুন এক ক্লিয়ারিং এজেন্ট নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে নিজেকে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলো।

দাক্ষিণাত্যের এই দিকটাতে এলে সর্বক্ষণ যেন ইতিহাসের পথ বেয়ে হেঁটে চলি অবচেতনে। অন্ধ্রের এই অঞ্চলগুলো কতই না সাম্রাজ্যের সাক্ষী, কখনও নন্দ ও মৌর্যদের অধীনে ছিল। কখনও সাতবাহনদের, মাথার রাজবংশ, ইক্ষ্বাকু, কাকতীয়, বিষ্ণুকুণ্ডিনদের শাসনে সেজে উঠেছিলো। চালুক্যদের পুলকেশী, বিষ্ণু বর্ধন, চোলা সাম্রাজ্য, নাম গুলো শুনলেই গায়ে কাঁটা দেয়। কত শত শাসক কত শত বার এই অঞ্চলের উপর আধিপত্য পেতে যুগে যুগে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে রাজত্ব বিস্তার করেছিলেন, সকল প্রতাপকে মিথ্যা প্রমাণ করে আবার তারা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এলাকার প্রতিটি নদী, প্রতিটা পাহাড়, প্রতিটি ধূলিকণা সেই ইতিহাসের সাক্ষী। অতীতের উত্তরাধিকার নিয়ে আজও জনপদ গুলো সেই দিনের মতই সজীব আর প্রাণবন্ত।

অন্ধ্রের পূর্ব গোদাবরী জেলাকে চালের বাটি নামে ডাকা হয়, স্বভাবতই রাজামুন্দ্রি শহরে সেখানকার মূল চালের গদি গুলো অবস্থিত। আমাদের গন্তব্যও সেখানে, সঙ্গী আমার এক একাউন্টেন্ট কাম এ্যাটেন্ডেড জনা। জনা জাতে উড়িয়া, মিশমিসে কালো, গাঁট্টাগোট্টা ও প্রচণ্ড ধর্মভীরু। পুরো নামটা বড় বিচিত্র ‘জনাঞ্জলী ভয়’, এর কান্ড কারখানা নিয়েই একটা গোটা উপন্যাস লেখা যায় ‘ভয়’ নামে। আমাদের মিলের বিনোদ সর্দারের মজুরদের খাতা লেখার কাজে এসেছিলো। অত্যন্ত গরীবের ছেলে, বাপ মরে যাওয়াতে একাউন্টেন্সী নিয়ে আর বি-কম পাশ করা হয়ে উঠেনি। খাওয়া থাকা মাসিক ৩৫০০ টাকায় খাজাঞ্চীর চাকুরি। মিলে আসার বছর দেড়েক পর আমি তাকে কিছুটা শিখিয়ে পড়িয়ে একপ্রকার পার্সোনাল এ্যাসিস্টেন্ট বানিয়ে নিই। অনেক কাজের সাথে রান্নাটা বড় ভালো করত সে, এটা ছিলো তাকে নিয়ে সফর করার মস্ত কারন।

হাওড়া চেন্নাই মেইন লাইনের সব ট্রেনই রাজামুন্দ্রি ছুঁয়ে যায়। শেষ নভেম্বরের ঠান্ডা- অন্ধ্রকে ততটা শীতল করেনা মধ্য বাংলার মত। রাজামুন্দ্রির বিকিকিনির কাজ ২ দিনেই মিটে গেলো, যেসব মিল থেকে শিপমেন্ট যাবে তাদের কয়েকটাতে ভিজিট করে আমরা চলে গেলাম বিশাখাপত্তনম। সেখানে আমাদের কোম্পানির এক মারাঠা ফাইনান্সারও আসবে নতুন ক্লিয়ারিং এজেন্টের সাথে মিটিং এ যোগ দিতে। ব্যবসায়ী ছাড়াও তার অন্যতম পরিচয় হচ্ছে তিনি শিবসেনা দলের ক্ষমতাবান বিধায়ক ও সঙ্ঘ ঘনিষ্ট। যথারীতি তিনি পরপর ২ বার মিটিং পোস্টপোন্ড করাতে বহুবার ঘোরা ভাইজাককে আবার একবার চষে ফেললাম। অবশেষে তৃতীয় দিনে এসে তিনি পৌঁছালেএবং স্বস্ত্রীক। মহিলাটি সত্যিকারের ‘আলফা ফিমেল’, কুতকুতে চোখ বিশিষ্ট খর্বাকৃতির মানুষটি আক্ষরিক অর্থেই জীবন্ত ফুটবল, পুরো গোল। 

আমাদের ফাইনান্সার ভদ্রলোকটির নাম ধরে নিন- গাইকোয়াড় সাহেব। সৌম্যকান্তি মারাঠা সুপুরুষ সাথে রাশভারি ব্যাক্তিত্বের। স্ত্রী সাথে আসার কারনে হোক বা ব্যবসায়িক লেনদেনের গোপনীয়তা রক্ষাত্রে; সাথে তৃতীয় কোনো ব্যাক্তি ছিলোনা, দুই মানুষে মুম্বই থেকে সোজা ভাইজ্যাক এয়ারপোর্ট। কিছু মহিলাকে দেখলেই মনে হয় ভয়ানক ঝগরুটে ও সন্দেহবাতিক, মিসেস গাইকোয়াড় সেই প্রজাতির, এবং আসলেও তাই। গাইকোয়াড় সাহেব যেভাবে মেনি বিড়ালের মত মুখ করে কুঁচকে গিয়ে বউ এর সামনে খাড়া রয়েছেন, দেখলে মায়াই হয়। এয়ারপোর্টেই আমার একদফা জিজ্ঞাসাবাদ চলল, বুঝলাম আবার আমাকে ওনার ময়না তদন্তের সামনা হতে হবে। আমি নিশ্চিত, মহিলা নিজে কোনো বড় সরকারি পদ অধিকার করে আছেন, কিম্বা এনার পিতৃকুল অমিত সম্পদশালী ও তার দৌলতেই গাইকোয়াড়- আজকের গাইকোয়াড় সাহেব হয়েছেন, সবটাই অনুমান মাত্র। নতুবা যত জাঁদরেল মহিলাই হোক, এভাবে স্বামীকে কেঁচো করে রাখতে আমি অন্তত কাউকে দেখিনি, কিছু তো স্পেশাল রয়েছেই যা গাইকোয়াড় সাহেবের নেই।

ঔরাঙ্গাবাদ আম্বেদকর মারাঠওয়াড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে M.Phil করা এই মানুষটি সত্যিই বিস্ময়। ওনার আসল ব্যাবসাই নাকি এই লগ্নি করা, কিন্তু এতো টাকার উৎস কি সেটা ঠারেঠোরে বোঝার চেষ্টা করেও কোনো তল পাইনি। বললেন, ২ দিন দেরি হওয়ার কারন নাকি লঙ্কা। CIF ইন্দোনেশিয়া না থাইল্যান্ডের কোথাও একটা বন্দরে যাবে এই শুকনো লঙ্কা, দুবাই এর এক ইজিপ্সীয় শেঠ তাকে এই ট্রান্সসিপমেন্ট অর্ডারটা দিয়েছেন। আমি যেন মাত্র ১০ কন্টেনারের এই ‘ছোট্ট’ শিপমেন্টটা উৎরে দিই। ওনার ভাষায়- জানোই তো আমার হাতে সময় কত কম। নতুন সুযোগ হাতছাড়া করার দলে আমি কখনই ছিলামনা, আর উদ্যমেও সদাই ফুর্তি। ঠিক হলো গুন্টুর যাব।

পরের দিন ভোরের ট্রেনে রওনা দিলাম, আমার ও গাইকোয়াড় সাহেব দুজনেরই কন্টাক্ট কাজে লাগিয়ে পরবর্তী দেড় দিনে গুন্টুরের লঙ্কা-কান্ড শেষ করলাম, বাকীটা ফোনে ফোনেই হয়ে যাবে। অর্ডারের ২৫ দিন পর লোডিং, তখন QC সার্টিফিকেটিং এর সময় আবার আসতে হবে। স্বভাবতই রাত্রের ট্রেনে হাওড়া ফেরার টিকিট কেটে নিলাম। সন্ধ্যায় গাইকোয়াড় সাহেব হোটেলের লবিতে চা খেতে ডাকলেন। বললেন ম্যাডাম পুজো দিতে যেতে চাইছেন, এতো কাছে এসে জ্যোতির্লিঙ্গটা মিস করতে চাইছে না। তাছাড়া গুরু প্রদোষ ব্রত পালনটাও করে নেবেন, মানত রয়েছে। আমিও ওনাকে দারুন উৎসাহ দিলাম, ততক্ষণে ম্যাডামও এসে গেছেন। হঠাৎ গাইকোয়াড় সাহেব প্রশ্ন করলেন, তন্ময় তুমি কী এ দিকটা ঘুরেছো! আমি ক্যাজুয়ালি মাথা নেড়ে না বললাম, কে জানত এটাই ছিলো ফাঁদ! ম্যাডাম সমানে তার কুতকুতে চোখে আমাকে জরিপ করে চলেছেন, এমন সময় গাইকোয়াড় সাহেব বলে উঠলেন- তুমিও কাল চলো না আমাদের সাথে। এটা অনুরোধ না আদেশ বুঝলামনা। শ্রীমতী গাইকোয়াড় সাহেবা নির্বিকার, ওনাকে মিছিমিছি বোঝার চেষ্টা করে আর অসুস্থ হতে চাইলামনা ।

আমি খেই হারিয়ে কিছু বলতে গিয়ে দেখলাম সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। আমার ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা দেখে গাইকোয়াড় সাহেব বললেন- আমরা একটা প্যাকেজ বুক করেছি দর্শনের, অনেকের সাথে একটা ট্রাভেলারে করে যাব গুন্টুর থেকে। তোমারা একটা গাড়ি করে নাও বরং, রিসেপসন থেকে, ওতে সুবিধা হবে। বুঝলাম আমার ইচ্ছা অনিচ্ছা সম্পূর্ণ মূল্যহীন, পরে বুঝেছিলাম গাইকোয়াড় সাহেব আমাকে কোম্পানি হিসাবে নিয়ে গিয়েছিলেন। ডিনারের টেবিলে বুকে সাহস সঞ্চয় করে, ম্যাডামের দিকে চেয়ে বললাম- গুন্টুর প্রাচীন শহর, অগস্ত্যেশ্বরি শিবালয়ম্‌ নামে অতি প্রাচীন একটি শিবমন্দির রয়েছে এখানেরিসেপশনের মেয়েটির থেকে তথ্যটা যোগার করেছিলাম, আবার ভয়ে ভয়েই বললাম, ম্যাডাম এখানে সারা যায়না পুজোটা! তাতে তিনি যে দৃষ্টি হানলেন- সত্য যুগ হলে নির্ঘাত ভষ্ম হয়ে যেতাম।

যেতে যখন হবেই, রাত্রেই রেল স্টেশন থেকে একটা ভ্রমণ গাইড বই কিনে নিলাম। তখন কী আর ইন্টারনেট এমন সহজলভ্য ছিলো! পড়লাম কৃষ্ণা নদীর উপর নির্মিত শ্রীশৈলম বাঁধ দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তম বাঁধগুলির মধ্যে একটি, এটা দর্শনীয় স্থান সন্দেহ নেই। এছাড়া ভারতের বৃহত্তম বাঘ সংরক্ষণাগার ‘নাগার্জুনসাগর-শ্রীশৈলম টাইগার রিজার্ভ’টি ৩৫০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। স্থানীয় নাল্লামালা জঙ্গলও দেখার জাইগা বটে। পাহাড়, জঙ্গল নদী আমার চিরকালের প্রিয়, তাই মন থেকে হতাশার ভাবটা ঝেড়ে ফেললাম

রাত্রের দিকে গাইকোয়াড় সাহেব ফোন করে আবার একবার মনে করিয়ে দিতে ভুললেন না- তন্ময় মিস কোরোনা, এখানে মন্দির ছাড়াও বেড়াতে মন্দ লাগবেনা। পুঁজি লগ্নিকারক ব্যক্তিকে না বলা যায়না, অগত্যা নিমরাজি হয়েই গেলাম। হোটেলের রিসেপশনে শ্রীশৈলম যাতাযাতের জন্য একটা ছোট গাড়ির কথা বলে দিলাম পরদিন ভোরের জন্য। রাত সাড়ে তিনটের সময় দেখি এক ব্যাটা ফোন করে হাঁকডাক করছে, বুঝলাম গাড়ির ড্রাইভার। স্যান্ট্রো নিয়ে একটা ১৭-১৮ বছরের ছেলে হাাজির। ঘুম চোখে লটবহর গুছিয়ে ‘ভয়’কে সাথে নিয়ে রওনা দিলাম।

ড্রাইভারটা তিলে খচ্চর টাইপের সবজান্তা, শুরুতে সারাক্ষণ উচ্চস্বরে তেলেগু গান চালিয়ে মাথা ধরিয়ে রেখেছিলো, সেটা বন্ধ করতেই- জনার সাথে তার ১০% হিন্দি পুঁজি করে সে কী গভীর আলোচনা, যা আরো ভয়াবহ মাথাব্যাথার কারন হয়ে দাঁড়ালো। এর মাঝে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম জানিনা, জনার ডাকে ঘুম ভাঙলো। অকারন বকবক করতে করতে কখন যে ব্যাটা রাস্তা ভুলে যে অন্য পথ ধরেছে তা জনার জ্ঞানের বাইরে। যতদূর চোখ যায় ধু ধু জনহীন অরণ্য, জনার দিকে চাইতে সে বলল- শেষ ২ ঘন্টা ধরে এমন জঙ্গল পেরিয়েই এসেছি। অগত্যা সামনে এগোনই স্থির করলাম। গুন্টুর থেকে শ্রীশৈলম মেরেকেটে ২২০ কিলোমিটারের মত রাস্তা, চার ঘন্টায় স্বচ্ছন্দ্যে পৌঁছে যাওয়া উচিৎ, সেখানে ইতিমধ্যেই ৬ ঘন্টা পার হয়ে গেছে, ঘড়িতে বেলা ১১টা।

আত্মাকুর থেকে শ্রীশৈলম অবধি পায়ে হেঁটে অনেক ভক্ত আসে, যারা মানত করে। ঘণ জঙ্গলের মাঝে কোনো দোকানপাট নেই, না বসতি রয়েছে। পথটি সম্পূর্ণরূপে নল্লামালা পাহাড়ের ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যায়। তেমনই একটা ভক্তের দল রাস্তার ধারে বসে আহারাদি করছিলো। তাদের সামনে গিয়ে গাড়িটা দাঁড় করাল ড্রাইভার। আমাদের ওই দিশেহারা দশা দেখে তাদের একজন এগিয়ে আসতে, ড্রাইভার স্থানীয় ভাষায় বিষয়টা বলে বোঝালো যে আমরা রাস্তা ভুল করেছি। ভয়ের চোটে এতক্ষণ খিদে না পেলেও, এবারে সেটা যেন চিৎকার করে হাঁক ছাড়লো পেট থেকে। ভক্তেরা সাথে করে নিজস্ব খাবার এবং পানীয় সামগ্রী নিয়ে এসেছে, তাদের দয়ায় সে যাত্রায় খিদের হাত থেকে রেহাই পেলাম। ওদের বাতলে দেওয়া পথ ধরে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই শ্রীশৈলম পৌঁছে গেলাম।

 

(২)

শিবা রেসিডেন্সী নামের একটা মধ্যম মানের হোটেলে ঢোকার পর ফ্রেস হয়ে আমি গাইকোয়াড় সাহেবকে ধরার জন্য রওনা দিতে, জনা আমার দিকে জুলুজুলু চোখে চেয়ে রইতে শুধালাম- কিছু বলবি! সে অস্ফুট উড়িয়াতে বলল- ‘মু সে সক্কালেরু জগ্রত রহিছি, এবে কি সইবারি পারিবু!’, বুঝলাম ঘুমাতে চাইছে। আমি আর কথা না বাড়িয়ে একাই বেড়িয়ে গেলাম। ফোনে জানলাম ম্যাডামের সাথে সাহেব আপাতত হটকেশ্বরমের পথে।

মল্লিকার্জুন অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলম শহরে কৃষ্ণা নদীর তীরে একটি টিলা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। জ্যোতির্লিঙ্গটি একটি অতি প্রাচীন মন্দির যা দ্রাবিড় শৈলীতে নির্মিত, এখানে বিজয়নগর স্থাপত্যের নমুনা দেখা যায়ম্যাডাম গাইকোয়াড়ের তালিকা অনেক লম্বা, সাক্ষী গণপতি, হটকেশ্বরম, শিখরেশ্বরম, ফলধারা পঞ্চধারা এমন অনেক কিছুকে দেখে তারপর নাকি মল্লিকার্জুন দর্শন করতে হয়। এসব একদিনে শেষ হলে হয়।

হটকেশ্বরম পৌঁছাতেই দেখলাম পাঞ্জাবি পায়জামা শোভিত গাইকোয়াড় সাহেব একটা গুমটির আড়ালে ধুম্র সহযোগে চা-পান করছেন। আমার জন্যই প্রতীক্ষা করছিলেন, দেরির কারন জানতে পেরে তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন। তবে এটাও বুঝলাম, স্ত্রীর সামনে ধূমপানের অনুমতি নেই। আমাদের বয়সের ফারাক দেড় গুণ, উনি ৫৩- তাই আমি শুধু চায়ে যোগ দিলাম। কথায় কথায় শুধালাম এতোগুলো মন্দির ঘুরলেন, আপনার মাথায় চন্দন বা তিলক কই! তিনি যা বললেন তাতে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, ধর্মে নাকি তার তেমন ভক্তিই নেই, কখনই ছিলোনা- তিনি নাকি ঘোরতর নাস্তিক। রাজনীতির দায় ও সামাজিক স্বার্থে যেটুকুতে না গেলেই নয়, ব্যাস অতটুকুই। অথচ মিডিয়াতে উনি চরম হিন্দুত্ববাদী, বক্তব্য শুনলে মনে হবে ক্ষতস্থানে কেউ বাঁটা লঙ্কা ডলে দিয়েছে। একটা মানুষের মধ্যে এমন পরস্পর বিরোধী দ্বৈত্ব স্বত্বা কীভাবে থাকতে পারে! এই কারনেই কী স্ত্রী অমন চড়ে থাকে!

আমার ভ্যাবাচ্যাকা ভাব দেখে গাইকোয়াড় সাহেব হেসে বললেন, বড় হও তন্ময়- সব বুঝবে। এর পর তিনি মল্লিকার্জুন এর লোককথা শোনাতে লাগলেন। কথিত আছে প্রতি অমাবস্যায় স্বয়ং মহাদেব, পুত্র কার্তিককে এখানে খুঁজতে আসেন। আবার পূর্নিমাতে নাকি দেবী মহামায়াও মর্ত্যের এই এলাকাতেই বিরাজ করেন। পুরাণমতে দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের সময় ‘উপরোষ্ঠ’ এই মল্লিকার্জুনে পড়েছিল, তাই এটা ১৮টি মহাশক্তিপীঠের একটি- অগত্যা। বুঝলাম লোকটি পণ্ডিত মানুষ বটে, তারপরে নাস্তিক, আর সবার উপরে উগ্র হিন্দুত্ববাদ রাজনীতিতে সফল ব্যাক্তি- আজব সঙ্গম।

দিনটা সোমবার, রীতিমত গলদঘর্ম হয়ে আজই বেলা থাকতে থাকতে মল্লিকার্জুন পৌঁছাতেই হবে যেভাবেই হোক, সুতরাং শ্রীমতী গাইকোয়াড়ের তাড়ার শেষ নেই। দুপুরে লাঞ্চ করলাম ভাকরি-পিঠলা সাথে ভাজি নামক পদ দিয়ে, মোটা মোটা জোয়ার বা বাজরার রুটি আর পেঁয়াজ রসুনে ঠাসা এক জাতীয় তীব্র মসলাদার সব্জির ঘন্ট। খিদের পেটে ওই খেলাম সাঁটিয়ে। দুচোখ মেলে প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে যখন মল্লিকার্জুন এসে পৌঁছালাম, তখন সূর্য ঢলে গেছে।

গাড়ি থেকে নেমেই ম্যাডাম সটান মন্দিরে ঢোকার লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন, প্রথম দফায় কবার নাকি প্রদক্ষিণ করে আবার ঢুকবেন পুজো দিতে, সাহেবকে নির্দেশ দিলেন ততক্ষণে পুজোর উপাচার যোগার করে আনতে। গোল বাঁধল ফুলের দোকানে গিয়ে, ঘ্যেটুর মত বিজাতীয় ফুল সহ আকন্দের ফুল পাতাও পাওয়া গেলো। স্থানীয় নানা জাতের অচেনা ফুলের মালার সাথে বেলফুলের মালাটিকেও চিনতে পারলাম। জবা, রজনীগন্ধারও অভাব ছিলোনা, নেই শুধু বেলপাতা এই বস্তুটি অবশ্য এতো গুলো মন্দিরের কোথাও সেভাবে দেখিনি, হয়ত সেভাবে চল নেই কিম্বা আমিই ভাল করে নজর করিনি। তবে সজনে পাতার মত এক ধরণের পাতা এরা ঘট সাজিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

লাইনে দাঁড়ানো ম্যাডামের কানে সে কথা তুলতেই তার মুখ রক্তবর্ণ ধারন করল, গাইকোয়াড় সাহেব প্রমাদ গুণলেন। আমার দিকে জুলজুল করে তাকাতে আমি প্রায় স্প্রিন্টারের মত দৌড় লাগালাম ওই এলাকার সকল ফুলমালার দোকান গুলোতে ঢুঁ মেরে বিল্বপত্রের অন্বেষণে। প্রায় সবটা চষে যখন ব্যর্থ মনোরথে ফিরছি, একটা গলির শেষের গুমটিতে বিশাল রেশন দোকানের মত লাইন দেখে সামনেটাতে গিয়ে উঁকি মেরে দেখি- রয়েছে। আর কী, আমিও ওই লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। করোনাকালে যদি এমন জমাটি লাইন কোনো বিজ্ঞানী বা ডাক্তার দেখতেন, নিশ্চিত তারা নিজেরাই আতঙ্কে অক্কা পেতেন। মিনিট দশেক পর যতক্ষণে গুমটির সামনে সৌভাগ্যক্রমে পৌঁছালাম, ততক্ষনে আমার মাথার ঘাম মেরুদণ্ড বেয়ে অকুস্থলের উপত্যকা, খাঁজ সর্বত্র লোনা জলময় করে তুলেছে। পাতা তখন অতি সামান্যি অবশিষ্ট রয়েছে, শেষ অবধি আমার ভাগ্যে জুটবে তো! উত্তেজনা আর আশঙ্কাতে এমন দোদুল্যমান অবস্থা যে শরীরের সমস্ত রক্ত মাথায় এসে ফেটে পরতে চাইছে, শেষে চ্যাংদোলা করে হাসপাতালে না নিয়ে যেতে হয়।

সমানে জপে যাচ্ছি- মেরা নাম্বার কব আয়েগা। ওমা, দোকানি অবধি পৌঁছাবার ২ জন আগেই খেল খতম। বিনা নোটিসে ঝাঁপ বন্ধ। বেলপাতা ছাড়া স্বয়ং মহাদেব সন্তুষ্ট হলেও হতে পারেন, কিন্তু ম্যাডাম গাইকোয়াড়কে কীভাবে সন্তুষ্ট করব! পিছন থেকে তেলেগুতে অনেকেই নানা পরামর্শ দিলো, সে সব শুনে আমার পিছনে থাকা জনা পঞ্চাশেক ভক্ত উলটো পথ ধরেলো। সে ভাষা বোঝা কী আর আমার কম্ম, আমার পা যেন ২০০ মন ভারি হয়ে গেলো, উঠাতেই পারিনা এমন দশা। সামনে রণচণ্ডী রূপে ম্যাডামের মুখ ভেসে উঠতেই, ধড়ফড় করে আমিও স্ববেগে সেই পথে পা বাড়ালাম, দেরি করে পৌঁছালেও কি আর কম বিপদ!

ফিরে গিয়ে গাইকোয়াড় সাহেবকে জানাতে তিনি আরো কাকুতিমিনতি করে বললেন, ড্রাইভারকে নিয়ে আশেপাশের মন্দিরগুলোতে গিয়ে দেখোনা ভাইটি। অগত্যা দৌড়ালাম গাড়ির দিকে। ড্রাইভার ঘুমাচ্ছিলো, তেতো মুখে ব্যাজার ভাবে চেয়ে দেখে গাড়িতে স্টার্ট লাগালো। ওদিকে দিনের আলো ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে, সন্ধ্যার পর সাধারানত ছোট মন্দিরের এলাকা গুলোতে আর কেউ থাকেনা, টিমটিমে আলো আর ভুতুরে পরিবেশ। আশেপাশের ৩-৪ কিমির মধ্যে অধিকাংশ দোকানই বন্ধ, এক আধটা যেগুলো খোলা তার কোনোটাতেই বেলপাতা খুঁজে পেলামনা। হতাশ হয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেটে মন দিয়েছি, পশ্চিমাকাশে তখনও রক্তাভ একটা নিশান ঝুলে আছে লেজ কাটা ঘুরির মত।

হঠাৎ, সেই আলো আঁধারিতে মনে হলো, ওই দূরে একটা ঝুঁকে পরা বেল গাছ না? ইউরেকা বলে দৌড় লাগালাম, নির্ঘাত বেলই বটে, ডাবল শিওর হওয়ার জন্য ড্রারভারকেও ডাকলাম, সে যেন অনিচ্ছুক ঘোড়া, বিকারহীন মুখে বলল- এটা বেলগাছই বটে। ‘দুটো পাতা পেরে দে না ভাই’- অনুরোধ করতে সটান মুখের উপরে না বলে হাঁটা দিলো। যেতে যেতে তার তেলেগু সর্বস্ব হিন্দিতে যেটা বললো, তার বাংলা মানে দাঁড়ায়- মন্দিরের ড্রেনে প্রচুর বেল পাতা পরে রয়েছে, সেখান থেকে কুড়িয়ে দিলে অসুবিধা কোথায়, কে দেখতে পাবে! কথাটা আমারও মনে ধরলো, পরক্ষনেই মনুষ্যত্ব বিবেক জেগে উঠলো। বেলপাতাতে আমার ধর্ম বিশ্বাস জুড়ে না থাকলেও, যিনি আমাকে বিশ্বাস করে বেলপাতা আনতে পাঠিয়েছেন, তার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখাটা আমার কর্তব্য, ওটাই তো ধর্ম। তৎক্ষণাৎ ড্রেনের প্ল্যান ক্যান্সিল করে দিলাম।

একটা ছোট মত নালা কিম্বা খাল, রাস্তা থেকে ৩০-৪০ ফুট দূরে। তারই পাড়ে গাছটা প্রায় ৫০ ডিগ্রি কোনে হেলে রয়েছে। গুঁড়িটা বেশ মোটাসোটা শক্তপোক্ত হলেও সেখানটা বেশ অন্ধকার ও উঁচু ঘাসের ঝোপ জঙ্গল রয়েছে, সমস্যা হলো হাতের নাগালে কোনো পাতা নেই। গাইকোয়াড় সাহেবকে বিষয়টা জানাতে ফোনেই শুনলাম ম্যাডামের তীক্ষ্ণ বাক্যবাণের সামনে তিনি ঢালহীন জবুথবু অবস্থায় সহ্য করছেন। শুধু বললেন- প্লিজ তন্ময়, বুঝে গেলাম বেগতিক। এ দিকে দিনের অবশিষ্ট আলো উড়ন্ত ফড়িং এর ডানার উপরে মুছে যাওয়ার শোকে কিম্বা পরের দিনের প্রতীক্ষাতে তিরতির করে কাপঁছে। আরেকবার সাহায্যের জন্য ড্রাইভারের সামনে গেলাম, আমাকে আসতে দেখেই বোধহয় মুখে রুমাল দিয়ে শুয়ে পড়ল, ওদিকে মিউজিক সিস্টেমে তারস্বরে তেলেগু গান চলছে।

সদ্য কেনা মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে একটু দেখে নিলাম, পাথুরে নালাটা ঘাস লতাপাতায় ঢাকা। পায়ে উডল্যান্ডস এর জব্বর বুট রয়েছে সমস্যা নেই, সাপখোপের ভয় থেকে অন্তত মুক্ত। গাছের উপরের দিকটা ঝাঁকড়া গোছের হলেও, নিচের দিকে শুধুই ডালপালার কঙ্কাল, অথচ সব ডালেই এক হওয়া উচিৎ ছিলো। এটা বেলের মরসুম নয়, হয়ত বেলের পাতা ঝরে যায় এই সময়ে। তার উপরে রোজ রোজ পাতা পেড়ে নিয়ে যাওয়ার কারনে যতদূর হাত যায় সবটাই ন্যাড়া, বেশ খানিকটা উপরে চড়ে তবে অবশিষ্ট পাতার নাগাল পেতে হবে। একটা লগা বানাবো তেমন জুতসই একটা লাঠিও পেলামনা, এদিকে দ্রুত সময় পেড়িয়ে যাচ্ছে। দোনামনা করতে করতে ছেলেবেলার পুরাতন অভ্যাস স্মরণ করে গাছে চড়ে যাওয়াটাই ধার্য্য করলাম। তাতে কী আর সমস্যা মেটে, কিশোর বেলায় ছিলাম রোগা প্যাঁকাটি মার্কা, আর এখন প্রায় সাত মাসের গাভিনের মত থলথলে চর্বির একটা আড়াই মণের নধর লাশ। এদিকে যতবার মনে পড়ছিলো এনারা ফাইনান্সার, উদ্দীপনা সপ্তমে চড়ে যাচ্ছিলো। অগত্যা, সুভানাল্লা বলে গাছে চড়ে বসলাম।

গুঁড়িটা যেখানে দুটো ভাগ হয়ে গেছে সেই অবধি পৌঁছাতে কোনো সমস্যা হলোনা, মাটি থেকে ফুট চারেক মাত্র, খাল থেকে ফুট ছয়েক বটে। এর পর হলো আসল সমস্যা, শুধু জুতো পিছলে যায়। অথচ বেল গাছে কাঁটা থাকা উচিৎ ছিলো, বছরের পর বছর ধরে ‘পত্রশিকারীদের’ দৌড়াত্বে সে সব মসৃণ ‘কান্ড’ হয়ে গেছে। বুকে পেটে হিঁচড়ে আরো ২-৩ ফুট উঁচুতে অপেক্ষাকৃত সরু ডালে উঠলাম, তাতেও পাতার নাগাল নেই। ওদিকে জিন্সের পকেটে তখন সমানে বেজে চলেছেন গাইকোয়াড় সাহেব, ফোন ধরব সে উপায় নেই। শুঁয়োপোকার মত আবার খানিক বুকে হেঁটে চলার চেষ্টা করতে গিয়ে, একটা ভাঙা বেল কাঁটার উদ্ধত অংশে লেগে জামাটা আর্তনাদ করে ছিঁড়ে গেলো। ক্ষণিকের জন্য বোধহয় মাথাটাও সামান্য টলে গেলো। খানিক ধাতস্ত হতে এবারে শরীরে যেন অদ্ভুত বল পেলাম।

পৃথিবীর বুকে তখন আলো আঁধারের দড়ি টানাটানি চলছে, আমিও বেলপাতার ঝাড়ের অন্ধকারে পাতা ধরে টান পাড়াপাড়ি করছি, তবুও পাতা আর হাতে আসেনা। এবারে বাইকে বসার মত করে ডালের আসনে বসে যতটা সম্ভব জোড়ে টান দিতেই একটা ময়লা মত কাপড় এসে হাতে ঠেকলো। যাব্বাবা, এ আবার কি কেলো! আচমকা দেখি আমারই মত আরেকটা ভুঁড়িওয়ালা টাকমাথা লোক পাতা পাড়তে উঠেছে, ওরই ধুতি আমার হাতে। হতচ্ছাড়া আমি শেষ ১০ মিনিট ধরে কী লঙ্কাকান্ডটাই না করছি, আর ব্যাটাচ্ছেলে বেল্লিক গাছে চড়ে উপর থেকে আমার অসহায়তার মজা নিচ্ছিলো! ইচ্ছে হলো দিই খানকতক বাছাবাছা খিস্তি, কিন্তু দ্বিগুণ মন খারাপ করে থেমে গেলাম। তেলেগুভাষী মানুষ, সুললিত বাংলা গালির মর্ম এ ব্যাটা বুঝবে কীভাবে! মিছে পন্ডশ্রম।

আশ্চর্য হওয়ার আরো বাকি ছিলো, লোকটা পরিষ্কার বাংলাতে বলে উঠলো- কটা পাতা চাই খোকা। মানে কী, আমি কোন এ্যাঙ্গেল থেকে খোকা! কিন্তু আচমকা ওই বাংলা উচ্চারন খোকা ডাকের অপমান ভুলিয়ে দিলো। মুখ থেকে আপনা হতেই বেড়িয়ে এলো- আপনি বাংলা জানেন! জবাব এলো- জানি বৈকি, এবারে হাতে কটা পাতা নিয়ে তিনিও কাঠবেড়ালির মত সরু ডাল বেয়ে নেমে আমার প্রায় মুখোমুখি চলে এলো। বয়স্ক লোক, খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর ইয়া মোটা ঝাঁটার মত অপরিচ্চছন্ন গোঁফ। আমাদের কালীনগরের ষষ্টি গোয়ালার এমন বিচ্ছিরি গোঁফ আছে।

বললাম- চটপট পাতা গুলো দিন, তাড়াতাড়ি যেতে হবে, গাইকোয়াড় ম্যাডাম অপেক্ষা করছে। বৃদ্ধ খানিক হাই তোলার মত ভঙ্গি করে পিঠ চুলকে বললো- পারিশ্রমিক দাও। মনে মনে খুব রাগ হলো, নিশ্চিত এই বুড়ো ব্যাটাই নিচের সব ডাল ফাঁকা করে রেখেছে, আবার গালি দেওয়ার বাসনাটা জাগার আগেই সংবরণ করে নিলাম। শুধালাম, এ কী তোমার গাছ! বুড়ো বললো- কাগজে কলমে আমার নয় বটে, তবে দখল স্বত্বের দিক দিয়ে যদি হিসাব করা হয় তাহলে আমিই এর মালিক। আমি আর কথা না বাড়িয়ে পকেটে হাতটা চালান করলাম, একটা ৫ টাকার কয়েন খুঁজে আনার লক্ষ্যে। ওমা কোথায় কি, পকেট তো গড়ের মাঠ; অথচ আমি মানি ব্যাগ কোনোকালেই ব্যবহার করিনা, ডান পকেটেই আমার যাবতীয় টাকাপয়সা থাকে। পড়ে গেলো নাকি নিচে! বৃদ্ধ একটা অশ্লীল হাসি হেসে বললো- নেই বুঝি! আমি কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে খেই হারিয়ে জবাব দিলাম- নেই মানে, থাকতেই হবে, যাবে কোথায়!

পরিষ্কার মনে আছে আমি জিন্স পরে এসেছিলাম, অন্ধকারে কেন যে ঠিক ঠাউর করতে পারছিনা- মাথায় ঢুকলনা। আমার রীতিমতো কাঁচুমাচু অবস্থা, হা হতোস্মি করতে করতে দ্রুত বিষয়টা ধামাচাপা দিতে চাইলাম। ওদিকে ফোন আসা আচমকাই থেমে গেছে, আঁধারটাও বেশ গাঢ় হতে বুড়োকে আরো ভালভাবে যেন দেখতে পেলাম। বুড়ো শুধালো- বেল খাবে! বললাম- ইয়ে, কাঁচা বেলে আঠা থাকে, জিভ ঠোঁট কয়েসে জ্বালা করে বড়। একটু শরবৎ করার ব্যবস্থা হলে ভালো হতো। বুড়ো বলল, এ আর এমন বড় কথা কি, তুমি আব্দার করেছো যখন আলবাৎ হবে, হতেই হবে।

আমি শুধালাম- তা কর্তা, আপনার ঘর কোথায়! বুড়ো খানিকটা উদাস গলায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, এই দশাতে এসে পড়লে বাবা কার ঘর, আর কিসের ঘর! বুঝলাম, ছেলেপুলে নেই বা তারা খেতে পরতে দেয়না হয়ত। আহা রে, এই বুড়ো বয়সে বেলপাতা বেচে পেট চালায়, একটু মায়াই হলো। কিছুটা আর্থিক সাহায্য করতে মন চেয়ে শূন্য পকেটের দিকে হাতটা যেতেই আবার বুকটা হু হু করে উঠলো- অনেকগুলো টাকাই খোয়া গেছে। মাঝখান থেকে অন্ধকারে হাতড়ানোর দরুন হাতের কব্জিতে একটা কাঁটা ফুটে সেই জ্বালা করতে লাগল।

তা বাপু তুমি এ লাইনে কদ্দিন? আমি হো হো করে হেসে বললাম- আরে কাকা, আমার এক বন্ধুর স্ত্রী পুজো দেবেন, বেলপাতা নেই তাই তার জন্য বেলপাতা আনতে এসেছিলাম। বুড়ো যারপর নাই আশ্চর্য হয়ে আমাকে বলল- পুজো আর তুমি! বলো কী খোকা! এবারে আমি বেশ চটেই গেলাম, হতেই পারি আমি মুসলমান, তা বলে কোনো হিন্দু বন্ধু থাকতে নেই, নাকি সেই বন্ধুর যদি কিছু দরকার হয় সেটা আমি করবনা, হলোই বা সেটা বেলপাতার মত তুচ্ছ কিছু। বলতে গিয়েও চেপে গেলাম। বললাম, কাকা পাতা কটা দাও, আমাকে এগোতে হবে, গাইকোয়াড় সাহেব অপেক্ষা করছে। বুড়ো খেঁকিয়ে উঠে বলল- মস্করা হচ্ছেটেনে এক থাপ্পড় মারব যে হাড়েহাড়ে গিঁট পেকে যাবে। তবে রে হারামজাদা বুড়ো, দরকার নেই তোর বেলপাতার, আমিও দাঁত খিঁচিয়ে বললাম- সাইড দাও দেখি, আমার তাড়া আছে, যত্তসব জোটেও মাইরি।

বুড়ো সরে যাবার কোনও উদ্যোগই নিলোনা, উলটে বললো- চটছো কেন ভায়া, একটু পরে চাঁদ উটবে, চাঁদ দেখতে আমার বড় ভালো লাগে। আমি বললাম- তুমি একা একা এই নিশুতি রাত্রে চাঁদ দেখ আর বেলের আচার, মোরব্বা, শরবৎ খাও, পারলে কিছুটা শুঁট বানিয়েও খেয়ো, সকালে হাগা ভালো হবে। বুড়ো আমার কথা অগ্রাহ্য করে এবারে শুধালো, তা বাপু তোমার প্রকার কী, কুল কী? আমি বললাম, এই তো খানিক আগেই জাত তুলে খোঁটা দিলে, আবার শুধানো কেন! এবারে কেমন যেন সন্দেহ হলো, ব্যাটা চোর নয়ত! পকেটে টাকা না থাকলেও, সদ্য কেনা আইফোন রয়েছে। হাতে খান দুই আঙটি আছে, একটাতে হিরে বসানো। বুড়ো কথা না বাড়িয়ে আমার দিকে একটা শরবতের গ্লাস বাড়িয়ে দিতে, সন্দেহ আমার তিনগুণ হয়ে গেলো। নিশ্চই এতে অজ্ঞান করার ট্যাবলেট বা বিষ মেসানো আছে, নতুবা শরবৎ এর বোতল নিয়ে গাছে কে উঠে! আমি অচৈতন্য হলেই ব্যাটা সব লুঠ করবে।

তবে রে ঠ্যাঁটা বুড়ো, আমি খানিকটা তেড়ে যেতেই, আমার চোখের সামনে গিরগিটির মতো সরসর করে মগ ডালের দিকে গিয়ে কন্টকাকীর্ণ সরু ডালে চড়ে বসল। আমি তখন এক হাতে তার ধুতির খুঁট ধরে টানছি, আর সেই বুড়ো আমার দিকে বেলের শরবৎ ছেটাচ্ছে। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ঘেমে উঠলাম, শরীর দিয়ে আগুন আর ঘাম পাল্লা দিয়ে বের হচ্ছে। এবারে আবার একটা হ্যাঁচকা টান দিতে ধুতিটা খুলে হাতে এলো ঠিকিই, তার সাথে দেখলাম বুড়ো একটা সাদা বক হয়ে মিলিয়ে যেতে যেতে কেমন করে যেন গাইকোয়াড় সাহেব হয়ে গেলেন, আমার হাতে ওনার পাঞ্জাবির একটা ছেঁড়া অংশ। দূর আকাশের গোল থালার মত চাঁদটা ক্রমশ একটা নার্স এর মুখ হয়ে গেলো, যিনি আমার মুখে জলের ছিটে দিচ্ছিলেন। যাব্বাবা, কেমন যেন সব গুলিয়ে গুবলেট গেলো আবার।

আমার চোখ মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেলো, চারপাশে চেয়ে দেখলাম- একটা হাসপাতালের বেডে আমি শুয়ে। হাতের কব্জিতে বেল কাঁটার বদলে স্যালাইনের সিরিঞ্জ গাঁথা রয়েছে। জনা দেখলাম খুশি চেপে রাখতে না পেরে- ‘চেতনা অসি যাইছি’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো উল্লাসে। এতক্ষণে গাইকোয়াড় ম্যাডামের মমতাময়ী আওয়াজ পেলাম, কী দরকার ছিলো বাবা ওই সন্ধ্যাবেলায় বেলগাছে চড়ার! গাইকোয়াড় সাহেব বললেন, চোট তেমন মারাত্বক নয়, ভাগ্যিস ঘাসের গাদার উপরে পরেছিলে। পাথরে পড়োনি বলে রক্ষে, তবে হাড় ভাঙেনি এটাও তোমার তোমার গুরুজনের আশির্বাদ, ইত্যাদি। তা বাবা, ওই ভাবে পাঞ্জাবি ধরে টানাটানি করছিলে কেন! তোমার ভুল বকা দেখে আমার খানিক ভয় ভয়ই লাগছিলো।

সকলে নানা কথাবার্তা বলা কওয়া করতে লাগল, গায়ে ধুম জ্বর ঘাম দিয়ে ছাড়ছে বলে মাথা শরীর ভিজে গেছে। এর মাঝে যে কথা কটা কাউকে বলতে পারলামনা- সেই বুড়োর কাহিনীটা। ওটা স্বপ্ন ছিলো নাকি সত্যিকারের ভুত দর্শন করেছিলাম তাও মনে পরছেনা! কে জানে কখন পা ফসকে নালায় পড়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম, ওই কাঁটায় বিঁধে যখন জামাটা ছিঁড়েছিল তখনই বোধহয়। যাই হোক, ২ দিন পর ছাড়া পেয়েছিলাম হাসপাতাল থেকে, গাইকোয়াড় সাহেব ব্যস্ত মানুষ, প্রায় জোর করেই ওনাদের ফেরত পাঠিয়ে দিলাম। জনা থাকলে আমার কোনো অসুবিধা নেই, সে হোটেলে থাকাতেই তো আমার এই বিপত্তি।

এর পর থেকে আজও, যখনই বেল গাছ দেখি, সেই বৃদ্ধ বক ভুতকে দেখার বা খোঁজার চেষ্টা করি, কে জানে কোন অন্ধকারে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে কার মুখে শরবৎ ছেটাচ্ছে!

 

শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৫

নাস্তিক পণ্ডিতের ভ্রমণ

(১)

ভ্রমণের নেশা সর্বনাশা, আর সেই সুত্রেই দেশে বিদেশের নানান ধর্মস্থানে যাবার সৌভাগ্য হয়েছে, সেটা মসজিদ, মাজার, গুরদুয়ারা, বৌদ্ধ স্তুপা ও মনেষ্ট্রি, দেরাসর বা বসডি, চার্চ, সিনাগগ, এমনকি শাক্ত, পার্শি, আদিবাসী, বাহাই, বৈষ্ণব মঠ, টাও, কনফুসিয়ানিজম, শিন্তো, রাস্টাফি, জেন, হোয়া, কাও এর মত ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় উপাসনালয় সহ আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক ছোট ছোট স্বতন্ত্র নৃ-গোষ্ঠীর থান তথা উপাসনালয়েও যাবার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশী গেছি হিন্দু মন্দিরে।

আজকের গল্পটা ধর্মস্থান গননার নয়, না কোনো ভক্তি বা আস্থার। এটা পাতি জীবনের রোজনামচা আর ভ্রমণের গল্প।

বহু হিন্দু পূন্যার্থীর স্বপ্ন থাকে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের সবকটা স্থান দর্শনের। আমি তথাকথিত ম্লেচ্ছ হয়েও ১০টা জ্যোতির্লিঙ্গ ঘুরে দেখেছি। কেদারনাথ, বৈদ্যনাথ, বিশ্বনাথ মন্দিরে তো বেশ কয়েকবার যাওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলমে মল্লিকার্জুন, মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে মহাকালেশ্বর, মধ্যপ্রদেশের নর্মদা নদীর তীরে ওমকারেশ্বর, তামিলনাড়ুরামেশ্বরম, গুজরাটের সোমনাথে ১ বার করে গিয়েছিলাম। নাসিকের ত্রিম্বকেশ্বর আর ঔরঙ্গাবাদে গ্রীষ্ণেশ্বরে এই তো গত বছর ২০২৪ এর জুলাই মাসে- আমি আর সুব্রতদা মহারাষ্ট্র সফরে ঢুঁ মেরে এসেছি। বাকি রয়েছে কেবল পুণের ভীমাশঙ্কর, গুজরাটের দ্বারকানাগেশ্বর মন্দির। সেগুলোও কোনো দিন ঠিক পৌঁছে যাব ঘুড়তে ঘুড়তে।

আমি এমনিতেই নবদ্বীপের মানুষ, মঠ মন্দির আর কীর্তনের আবহাওয়াতেই বড় হয়ে উঠা। তার পরও গোটা ভারতজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকশো মন্দির সহ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ গুলোর অধিকাংশেই উপস্থিত হয়েছিলাম নানান উদ্ভুত পরিস্থিতিতে। একবার লৌক্ষৌ ভ্রমণ করছিলাম ২০১৮ সালে আমি ও সুব্রত মন্ডল দাদা, উভয়েই স্বপরিবারে। লৌক্ষৌ জুড়ে বিরিয়ানি, তন্দুরি, ফিরনি আর গালৌটি কাবাব ধ্বংসের সাথে সাথে, গোটা বেনারস জুড়ে ২টো দিন পেঁড়া, কচুরি, লাড্ডু আর স্বাত্তিক আহারের ফাঁকে বৌদির কল্যাণে এলাকার বহু ঘাট ও মন্দিরের দর্শন আমার হয়ে গিয়েছিলো।

এদিকে সুব্রতদা কঠোর নাস্তিক ও পন্ডিত মানুষ, শুধু ভাবনাতে নয়- ব্যাক্তিজীবনের আচার বিচারেও তাই। তবে ধর্মবিশ্বাসীদের সাথে তার কোনো বিরোধ নেই, কাউকে মানাও করেননা। সুতরাং, তিনি কোনোভাবেই ভক্তির কারনে মন্দির মসজিদ চার্চে ঢুকতে নারাজ, বাইচান্স ঢুকলেও স্থাপত্য দেখতে বা তার সাথে জুড়ে থাকা ইতিহাসকে ছুঁতে, প্রণাম বা নমস্কারের ধার ধারেন না। ওদিকে বৌদিকে একা ছাড়াও যায়না ওই ভিড়ে, অগত্যা আমিই দোসর। আমি আস্তিক মানুষ, মুর্তি পুজাতে বিশ্বাস না থাকলেও ভুত-ভগবান- দৈববাণীতে আস্থার ঘাটতি নেই, তাই বিসমিল্লাহ্‌ বলে সর্বত্র ঢুকে যেতে পারি সহজে। বড়জোর মালাউন মুনাফেক ডাকে খিস্তি খাবো, তাও ফেসবুকে, ব্যাস। তাতে কী আর আমার ভিতরের ইসলাম বিশ্বাস বদলে যাবে! যাই হোক-

একটা মজার ঘটনা ঘটে লৌক্ষৌ থেকে বেনারস ফেরার পথে। কোলকাতা থেকে নিজেরা SUV গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম, যাতে যেখানে খুশি দাঁড়াতে পারি, আর সময়ের যেন কোনো বাঁধন না থাকে। সুব্রতদা মির্জাপুর যাবে বলে শুরু থেকেই পণ করে বসে ছিলেন। এই মির্জাপুর শুধু ‘কাট্টা’ বন্দুক আর ওয়েব সিরিজের জন্য বিখ্যাত নয়, আমাদের সমগ্র দেশের যে ধ্রুবক সময় +5.30 GMT, সেটাও এই মির্জাপুরেরই। আদত ৮২°৩০' পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এই মির্জাপুরের উপর দিয়েই গেছে। আমাদের মির্জাপুর যাত্রায় খুব স্বাভাবিকভাবেই মেয়েদের কোনো আগ্রহ ছিলোনা, সুতরাং সেই সুযোগে রত্না বৌদির ভক্তি জেগে উঠল প্রয়াগের ত্রিবেণী সঙ্গমে পুজো দেওয়ার।

যাবার সময় আমরা বিহারের সাসারামে শেরশাহ সুরির সমাধি দেখার প্ল্যান করেছিলাম। দিনের বেলায় যাবার সময় এই অঞ্চলে দেখেছিলাম বিপুল সংখ্যায় রাইস মিল তৈরি হচ্ছিলো প্রায় সার বেঁধে, পশ্চিমবাংলার চাল শিল্পের অস্তাচলে যাওয়ার উপন্যাস সেই আমলেই লেখা হয়েছিলো। সেদিন বিজয়া দশমী, মোড়ে মোড়ে রামলীলার মেলা চলছে, সর্বত্র জনস্রোত। তাছাড়া রাস্তা জুড়ে বিশাল বিশাল শোভাযাত্রা চলছে প্রতিমা নিয়ে, তাসা ঢাক ঢোল কাঁসি সহযোগে ডিজে বক্সে উৎকট ভোজপুরী গান আর গেরুয়া আবীরের ভিড়ে গাড়ি এগোনোই দায়। স্থানীয় মানুষের দশেরা পালনের রীতিনীতি দেখতে দেখতে, তাদের আলুর বোন্দা, চাটনি, আচার আর গজা জাতীয় মিষ্টি খেতে খেতে- দীর্ঘ সময় রাস্তার যানজটে আঁটকে তখন মাঝরাত ছুইঁছুঁই।

রাস্তার ধারে কোনো দিক নির্দেশনার বোর্ড নেই, গুগুল ম্যাপে নির্দেশিত রাস্তায় সারারাত শোভাযাত্রার মিছিল চলবে। সেই বিচিত্র পরিস্থিতিতে এক পুলিশ গাড়ি দেখতে পেয়ে তাদেরকে রাস্তা শুধাতে, অদ্ভুতভাবে তারা উৎসবের আনন্দ নিতে বললো। বারকয়েক শুধাতে তারা রাস্তার বাতলানোর বদলে যথারীতি দশেরার বখশিস চেয়ে বসলো। সুব্রতদা ট্যাঁরে গিয়ে সেটাকে পাত্তা না দেওয়াতে এক কনস্টেবল তাচ্ছিল্যের একটা রাস্তা দেখিয়ে দেওয়াতে বিপদের মূল সূত্রপাত। ভোরবেলা যখন ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরে একটা হোটেলে গিয়ে পৌঁছালাম, তারা সব দেখে ও শুনে একই সাথে আতঙ্কিত ও হতবাক হয়ে গেলো।

আমরা যে অঞ্চলটাতে আঁটকা পড়ে সারারাত গোলগোল ঘুরে মরেছি, সেটা নাকি স্থানীয় বাহুবলী কুখ্যাত রাজা ভাইয়ার অঞ্চল। বিপদের গভীরতা অনুমান না করতে পারার দরুন আমরা ততটা ভয় না পেলেও, রিসেপশনের মেয়েটির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। চেক-ইন ফর্মালিটি পূরণ করতে করতে বললো- বাল বাল বাঁচ গ্যায়া আপলোগ। গাড়িতে ৩টে বাচ্চা, ৩ জন মহিলা, দুজন আনফিট ‘হাই ট্রাইগ্লিসারাইড’ পুরুষ- পুলিশের ভুলের মাশুল শুধুমাত্র সারারাত গোলকধাঁধার উপর দিয়েই সে যাত্রায় ফাঁড়া কেটেছিলো বরাতজোরে।

অজানা রাস্তা দিয়ে আনাড়ির মত গাড়ি চালিয়ে গাজিপুর, আজমগড়, সুলতানপুর রুটে লৌক্ষৌ পৌঁছেছিলাম, তাই ফেরার পথে বৌদির প্রয়াগ দর্শন পূর্ণ করতে এলাহাবাদ না যাওয়ার কোনো কারন ছিলনা। আমরা মুঘলসরাইতেও গিয়েছিলাম ‘দীনদয়াল পরোটা’ পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে, সেই দিনই স্টেশনের বাইরের বোর্ডে ‘দীনদয়াল’ নাম লেখা হচ্ছিলো, কাকতালীয় ভাবে সেই কুৎসিত ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম। শেষ অবধি শেরশাহ সুরির সমাধি দর্শনও আর সে যাত্রায় হয়ে উঠেনি।


(২)

যাই হোক, লৌক্ষৌ থেকে ফেরার পথে শেষ বিকালের দিকে আমরা এলাহাবাদে গঙ্গা যমুনার সঙ্গমে গিয়ে পৌঁছালাম, সুব্রতদা যথারীতি গাড়িতেই বসে ঘুমাবার তাল ফেঁদে রেখেছে। ওদিকে এ যাত্রায় বৌদিরও এক গোঁ, দাদাকে যেতেই হবে নতুবা বেণীদান সম্পাদন করা যাবেনা। ওনাদের এই ক্যাঁচালের ফাঁকে আমি ঘাটে গিয়ে একটা নৌকার সাথে দড়দাম করে প্রাথমিকভাবে বিষয়টা কিছুটা এগিয়ে রাখলাম। এখানে নৌকার মাঝি ও পুরুত ঠাকুরের কম্বো প্যাকেজ, সাথে যাবতীয় পুজো ও তর্পনের রেডিমেড আয়োজনের কোনো ত্রুটি নেই নৌকাতে। অবশেষে সুব্রতদাকে আসতে দেখলাম, গাই দোয়ানোর সময় এঁড়ে বাছুর গুলোকে যেমন টেনে হিঁচড়ে দূরের খুঁটিতে নিয়ে বাঁধা হয়, ওনাকে তেমনই জবরদস্তি করে পাড়ে এনে হাজির করানো হলো।

এসে আরেক ক্যাঁচাল, মাঝিকে সটান তার বলা রেটের অর্ধেক বলে মাঝির সাথে জানপ্রাণ লাগিয়ে দর কষাকষি করতে লেগে গেলো। বিষয়টা বৌদি তৎক্ষণাৎ ধরতে না পারলেও, আমি প্রমাদ গুনলাম- নির্ঘাৎ এটা সময় নষ্টের ফন্দি, কোনো মতে সন্ধ্যা হয়ে গেলেই কেল্লাফতে, আর যেতে হবেনা। কিন্তু উনি শেয়ানা হলেও ছোকরা পুরুত ঠাকুরটি সেয়ানার বাপ, তারা রোজ এমন ভক্তের দল দেখছে, সে বেশী কথা না বাড়িয়ে দুপক্ষের মাঝে মধ্যস্থতা করিয়ে প্রায় দাদার রেটেই রাজি হয়ে গেলো। নৌকায় চড়া ইস্তক সুব্রতদা পুরুত ঠাকুরের দিকে না তাকিয়ে মাঝির দিকে ফিরে বসে দূরে আলোআঁধারির বালুচর দেখছিলো, গোল বাঁধল সঙ্গমে পৌঁছে।

পুরুত ঠাকুরের নিদান, আচারের সাথে মন্ত্রোচ্চারণও করতে হবে, সুব্রতদার মেদিনীপুরিয়ান গোঁ- তিনি কিছুই করবেনা। অনেক বোঝালাম, মহামতি মার্ক্স বা কমরেড লেনিনের আত্মার জন্য অন্তত তর্পন করুন। ভারতে এসে কী এতো দিনে ওনাদের আত্মাও কী সনাতনী হয়ে যাননি! ওনাদেরকে আপনার পিতৃপুরুষ ভেবে নিয়েই নাহয় তাঁদের আত্মার উদ্দেশ্যে পিন্ডদান করুন। শুধু মন্ত্রের শুরুতে কমরেড আর শেষে ইনকিলাব জিন্দাবাদ জুড়ে নিলেই বিষয়টা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ দোষ মুক্ত হয়ে যাবে। নাহ, সমস্ত জোরাজুরি ভেস্তে যাওয়ার সাথে সাথে দিনের আলোও ক্রমশ ফুরিয়ে যাবার পথে, অগত্যা আমিই বৌদি সাথে সাথে মন্ত্রোচ্চারণের ভার কাঁধে তুলে নিলাম। নবদ্বীপের মাটির সন্তান আমি, ক্লাস সিক্স থেকে মাধ্যমিক অবধি সংস্কৃত পড়েছি ইস্কুলে, ও ভাষা জিভে আঁটকায়না, তাই মনে মনে সুভানাল্লা বলে শুরু করে দিলাম- যা আছে কপালে।

কালো তিল, যব, কুশ ঘাস, গঙ্গা জল এবং সাদা ফুল সহ তর্পণ মন্ত্র উচ্চারণ করে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি ও তৃপ্তি কামনা করে সেই জলই নদীতে অর্পণ- এই ছিলো মূল বিষয়টা। পূর্বপুরুষদের আত্মার উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান, পিতৃদোষ মুক্তি আশীর্বাদ চাওয়া, ও শুদ্ধাচারে আত্মাকে পবিত্র করে নিজের আধ্যাত্মিক উন্নতি করা। এই প্রক্রিয়া গুলো আমি এই দফায় শিখেছিলাম। পুরুত বেটা শুরুতে কম টাকায় রাজি হয়ে গেলেও, প্রতিবার নতুন আচারের মন্ত্র পড়ার সময় ফুল, বেলপাতা, নারকেল সব আলাদা আলাদা করে ১০ গুণ দামে বিক্রি করছিলো, বৌদি তখন ভক্তিতে চূড়, তিনি বিনা বাক্যব্যায়ে হ্যাঁ এ হ্যাঁ মিলিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি এই সব তর্পনের সিস্টেম জানিনা, তাই এ যাত্রায় চুপ চেয়ে থাকা ছাড়া বিশেষ কিছু করার ছিলোনা। এর পর ব্রাহ্মণ ভোজন করানোর জন্য- ‘আপকো যো আচ্ছা লাগতা হ্যায় দিজিয়ে’ বলে যতক্ষণে তর্পনের অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করলেন, ততক্ষণে নৌকাতে একটা ব্যাটারির LED বাল্ব টিমটিম করে জ্বলে উঠেছে।  

এবারে শুরু হলো মূল খেলা। পুরুত ঠাকুর যত বলে এটাই তিনটে নদীর সঙ্গম স্থান, সুব্রতদার সেই গোঁ- খাঁটি বাংলাচ্চোরণের কিম্ভূত হিন্দিতে বলতে শুরু করলেন- গঙ্গা যমুনা তো দেখতা পায়া, সরস্বতী কিধোর গয়া? তুম ছাগল বলির মন্ত্র পড়া হ্যায়, সব জিনিসে বেশী বেশী দাম ধরা হ্যাঁয়, তুমারা নারকেল অনেক পুরানো, ঝুনো হ্যায়। ফুল বেলপাতা সব বাসি হ্যায়, সব নদী থেকে তুলে ডাবল ট্রিপিল বার ব্যবহার করতা হ্যায়- ইত্যাদি, লেগে সেই তর্ক। এরপর পুরুত ঠাকুরের এক্সট্রা যোগ করা অতিরিক্ত বাজেটের প্রায় ৮০% কেটে পেমেন্ট করে যতক্ষণে নৌকা থেকে নামলাম তৎক্ষণে রাত্রি নেমে গেছে প্রয়াগের তীরে।

ব্রাহ্মণ ভোজনের দরুণ- আপকা মর্জি সেগমেন্টে, সুব্রতদা ৫১ টাকা দিয়ে পুরুত ঠাকুরকেই অনেক আশির্বাদ দান করলেন- চলো আশির্বাদ কর দিয়া, ও ভি বিনা পয়সা মে। ফেরার পথে আধাঁরে চেয়ে দেখলাম, বেচারা পুরুত বিহ্বল হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে রয়েছে, জীবনে প্রথমবার হয়ত নিজেকে এমন মুরগি হতে দেখেলো।

 

রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫

দুবলাগুড়ি


 

Dublagadi Sea Beach দুবলাগাড়ি সমুদ্র সৈকত

বাঙালীর ভ্রমণ এখন আর শুধু দীপুদাতে আঁটকে নেই। পাহাড় ব্যতিরেকে সমুদ্র বলতেই দীঘা আর পুরী দুচোখের মনিতে ভাসে আম বাঙালীর, তার বাইরে মন্দারমনি, তাজপুর মোটামুটি এই বৃত্তেই ঘোরাঘুরি করে গন্তব্য গুলো। এবারে যদি স্বাদ বদলাতে চান, তাহলে হাওড়া থেকে ট্রেন যোগে মাত্র ঘন্টা চারেকের দুরত্বে পড়শি রাজ্যের একটা সমুদ্র সৈকত থেকে নাহয় টুক করে একটু ঘুরে আসুন। ঘুড়ে দেখুন দুবলাগারি সমুদ্রসৈকত। ধু ধু বালিয়ারি, ঝাউবনকে সঙ্গী করে যারা নির্জনতাকে উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য ‘পারফেক্ট ডেস্টিনেশন’। কোলাহল মুক্ত দুষণহীন পরিবেশে খানিক লাল কাঁকড়ার সাথে লুকোচুরি নেহাত মন্দ লাগবেনা

দুদিনের ছুটিতে হাওড়া থেকে টুক করে বালাসোর স্টেশনে নেমে পরুন। সিজেন টাইমে গেলে হোটেল বুক করে রাখা উত্তম, সেক্ষেত্রে হোটেলে বলে রাখলেই তারা স্টেশনে গাড়ি পাঠিয়ে দেবেদুবলাগাড়ি নির্জন মানে জনহীন এমনটা নয়, সপ্তাহান্তে বা ছুটির দিনগুলোতে অল্পবিস্তর পর্যটক সমাগম হয় বৈকি, তবে সেটা দীঘা বা পুরীর তুলনাই নেহাতই নগণ্য, তাই প্রশান্তি খুঁজলে এই গন্তব্যের বিকল্প কম। ছোট বড় নানা মানের ক্যাম্প, রিসর্ট, হোমস্টে বা হোটেল পেয়ে যাবেন সুলভে, আবার রুমেরও নানান মান আছে- স্ট্যান্ডার্ড-ডিলাক্স এসি বা নন এসি সবই আছে।

খাবার দাবার সাধারনত রিসর্ট/ক্যাম্পেই পেয়ে যাবেন। ডাবের জল দিয়ে খানিকটা নিজেকে রিফ্রেস করে মধ্যাহ্নভোজন আর তারপর ক্লান্তি জুড়িয়ে নিতে একটা ছোট্ট করে ভাতঘুম। বাঙালী ঘাবারদাবারের কোনো কমতি পাবেননা এখানে। কাছেই পাঁচুপাড়া-বারাদিয়া নদীর মোহনা ও সেই সংলগ্ন একটা মাছ বাজার থাকাতে সি-ফুডের বিপুল সম্ভার পেয়ে যাবেন। ইলিশ, ভেটকি, পাবদা, পারসে, আমুদি, চিঙড়ি, কাঁকড়া, পমফ্রেট কোন মাছ চাই আপনার, রসনা তৃপ্তির সমস্ত উপাদান পেয়ে যাবেন। সন্ধ্যায় বন্ধু বা পরিবারের সাথে বসে জমাটি আড্ডার সময় বারবিকিউ’ এর স্বাদ নিতেই পারেন এমন অবসরে। রাত্রে কব্জি ডুবিয়ে খাসির মাংস খেয়ে সদলবলে নৈশ ঝাউবন অভিসারে যাওয়াটা বেশ এডভেঞ্চারাস অভিজ্ঞতা।

এখানকার এই ঘন ঝাউবন বরাবর তিনটে সৈকত পরে, দুবলাগারি, বাগদা আর পারিখি, একটাই লম্বা সমুদ্রতট- আলাদা আলাদা নাম। এখানে সমুদ্রের জল জোয়ার ভাঁটার সাথে বেশ খানিকটা এগিয়ে পিছিয়ে যায়। ভাঁটা পরলে সৈকত জুড়ে অসংখ্য রংবেরংয়ের বিভিন্ন সাইজের ঝিনুক, শামুক, শঙ্খ দেখে মন পুলকিত হবেনা এমন মানুষ পাওয়া ভার

এখানে ঘুরতে এসে খুব বেশী লম্ফঝম্প, সাইটিসিয়িং এর নামে গলদঘর্ম হওয়ার মাঝে তেমন সার্থকতা নেই। তবে ঐতিহাসিক বুড়িবালাম নদীর পাশে গিয়ে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা অর্পন করাটা নাগরিক কর্তব্য। অন্যথায় চুপটি করে বন্ধুদের সাথে বা প্রেয়সীর সাথে নির্জন দুপুরের ঝাউবনে নাম না জানা পাখিদের সাথে নাহয় একটু নিভৃত যাপন করলেন। মন চাইলে একটু সমুদ্র স্নান, আর বাকি সময় নিখাদ ল্যাদ খেয়েই কাটিয়ে দিন। তবে হ্যাঁ, স্থানীয় বাজার খানিকটা দূরে। ধূমপায়ী ও সুরাপায়ীরা অবশ্যই তাদের পাথেয় আগাম মজুদ করেই নিয়ে আসবেন, চা বা কফিপ্রেমীরা তাদের যাবতীয় উপাদান হোটেলেই পেয়ে যাবেন।

ভাপা ইলিশ, সরষে ইলিশ, ডাব চিঙড়ি বা চিঙড়ির মালাইকারি, ভেটকির পাতুরি, পমফ্রেটের রোষ্ট, পাবদার ঝাল, গন্ধরাজ কাঁকড়া, পারশে মাছের তেল ঝোল, কুড়কুড়ে আমুদে, চিকেন বার্বিকিউ কিম্বা মাটন কষা- এই নিরিবিলির রাজ্যে দুদিনের রাজা হতে আর কিইবা চায়! রাজকীয় খাওয়াদাওয়া, আন্তরিক আপ্যায়ন, প্রকৃতির সাথে তার মত করে দুটো দিনের এই অবসর যাপনের অভিজ্ঞতাকে সহজে ভোলা যাবেনা। তাহলে প্ল্যান বানান, আর উপভোগ করুন একটা দুর্দান্ত উইকএন্ড।

 

 

মঙ্গলবার, ১০ মে, ২০১৬

মানালি ভ্রমণ

 


গরমে প্রা হাঁসফাঁস, রোদের তেজে চাঁদি টকবগ করে ফুটছে, গায়ে ফোষ্কা পরার জোগাড়। ঘনঘন ঠান্ডা জল পান করার পরেও গলা শুকিয়ে কাঠ। এরপর আছে সবার উপরে ঘাম সত্য তাহার উপরে ডিও। সামনেই স্কুলে স্কুলে গরমের ছুটি, ভোটের ফলাফলও আসন্নপ্রায়। ডান-বাম-রাম যে খুশি আসুক অশান্ত বাংলায় উষ্ণতা যে আরো বাড়বে তাতে আর আশ্চর্যের কি!

কথিত আছে বাঙালির পায়ের তলায় সর্ষে, কিন্তু 'থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়' দীপুদার বাইরে তো ওই শুধু গ্যাংটক, আম বাঙালির এটাই ছুটির অতিপরিচিত গন্তব্য। তবে বাঙালী সুযোগ পেলে মাস্কের রকেটে চড়ে মঙ্গলেও যাওয়ার জন্য প্রস্তুত

তাহলে আর দেরি কেন, চলুন দীপুদার বাইরে একটা ভ্রমন সুচী তাহলে বানিয়েই ফেলা যাক- চলুন যাই দেবভূমি

গরমের শান্তি শীতলতায়, আর সেটার জন্য বাতানুকুল যন্ত্র ব্যাতিরেকে একমাত্র শান্তি বরফের দেশে। সেই বরফের দেশে অন্যতম সেরা গন্তব্য কুলু উপত্যাকার মানালি শৈল শহর। শান্ত ছিমছাম, আপেল আর পাম গাছে ঘেরা স্বপ্নের দেশ। স্ট্রবেরির লতার ফাঁকে স্বপ্নরা যেখানে বাসা বাঁধে। দুপাশে খাড়া পাহাড়, মাঝে অতল খাদ, কচি মেঘেদের ইতিউতি ছোটাছুটি, তীব্র মিঠে রোদ্র, মাঝে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, আর মধ্যে পাহাড়ের বুক চিড়ে একপাস দিয়ে ছুটে চলেছে পর্যটকদের যানবাহন। দুপাশে কত শত পাহাড়ি ঝর্ণা, অজানা অচেলা লতা গুল্ম, ফুল, অর্কিড, প্রাথমিকভাবে নেশা ধরিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। যদিও হিমাচল প্রদেশ রাজ্যের গোটাটাই পোষ্টকার্ডের ছবির মত সুন্দর। ভিডিও গ্যামসের কম্পিউটারাইজড দুর্গম রাস্তা গুলো এখানে জ্যান্ত হয়ে উঠে, দিনের বেলায় এই পথে সাওয়ারি করলে তবেই পথের মজাটা উপভোগ করা যা

মানালি, কথিত আছে, সনাতন ধর্মের আদি পুরুষ মনুর বাসভুমি ছিল এই মানালি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৭০০ ফুট উচ্চতায়, খরস্রোতা বিপাসা নদের তীরে অবস্থিত এই শৈলশহর। মনু আলয়া কথাটি থেকেই হয়ত মানালি শব্দটার উৎপত্তি। অসংখ্য মুনি ঋষিবরেরা পুরাকালে এই সকল অঞ্চলেই নাকি ধ্যন সাধনায় বসতেন। মহাভারতের পান্ডবদের বনবাস পর্ব ও নাকি এখানেই হয়েছিল। এই কারনেই মানালিকে দেবভূমি রূপে চিহ্নিত করা হয় মুলত পর্যটন এখানকার মুল রুটিরুজি, তাই স্থানীয় মানুষেরা অত্যন্ত পর্যটক সচেতন। এদের দ্বিতীয় আয় আসে আপেল থেকে, তাই আপেল বিলাসী বাঙালীদের সেরা গন্তব্য মানালি। আপেলের সাদা ফুলে দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট, চাওয়া-পাওয়াকে ভুলে থাকতে, কটাদিন মানালিতে নিশ্চিন্ত যাপন করতেই পারেন।

কিভাবে যাবেন? ট্রেনে হাওড়া বা শিয়ালদা স্টেশন থেকে সোজা দিল্লি বা চন্ডীগড়। কালকা মেলে ডাইরেক্ট কালকা পর্যন্তও যেতে পারেন। ট্রেন ভেদে ১৭ থেকে ২৬ ঘন্টা পর্যন্ত সময় লাগে। দিল্লি পর্যন্ত ভাড়া স্লিপার ক্লাসে ৬০০-৭০০ টাকা, 3AC তে ১৫০০ থেকে ২১০০ টাকা পর্যন্তরেস্ত বেশি থাকলে বিমানে কোলকাতা থেকে দিল্লি, চন্ডিগড় বা মানালির সবচেয়ে নিকটবর্তী ভুন্তার বিমানপোত অবতরন করতে পারেন। ভুন্তারকে মিনি ইজরায়েল বলা হয়ে থাকে।

বাসে/মোটোর গাড়িতে ৮ থেকে ১১ ঘন্টার জার্নি। দিল্লি চন্ডিগড় থেকে বৈকাল চারটে থেকে, প্রতি আধাঘন্টায় ২/২ পুশব্যাক ভলভো বাস পেয়ে যাবেন। দিল্লির আজমিরী গেট, পাহাড়গঞ্জ, মজনু কা টিলা ইত্যাদি বাসস্টপ থেকে বাস পেয়ে যাবেন। তবে অগ্রিম অনলাইন বুকিং করে নেওয়া ভালো, RED BUS, yatra.com, makemytrip ইত্যাদি সাইট গুলো থেকে বাস বুকিং করা যায়। সিজেন ভেদে AC তে সিট প্রতি ভাড়া ৯০০ থেকে ১৬০০ টাকা পর্যন্ত।

কমপক্ষে জনের গ্রুপ তথা ২-৩ টে পরিবার একসাথে থাকলে, সেক্ষেত্রে Tempo Traveler ভাড়া করে নেওয়া অত্যন্ত সাশ্রয়ী। ৯, ১২, ১৫, ও ১৮ সিটারের পর্যন্ত টেম্পো পাওয়া যায়। ৩ রাত-৪ দিন, ৫ রাত-৬ দিন, ৬রাত-৭ দিন হিসাবে ভাড়া পেতে পারেন। মোটামুটি ২০০০০/- টাকা থেকে ৫০০০০/- টাকা পর্যন্ত ভাড়া পরে

সকালে রোদের সাথে চোখ খুললেই ভেসে উঠবে কবির কল্পনায় উঠে আশা সকল দৃশ্যপট, যেন কোন শিল্পীর লাইভ চিত্র প্রদর্শনী দেখছেন। পাহাড়ের আড়ালে হঠাৎ করে উদয় হওয়া দিগন্ত বিস্তৃত চোখ জুড়ানো সবুজের প্রান্তে বরফের মুকুট পরে হিমালয় আপনাকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত। আরেকটু সময় এগোলেই যখন সুর্যের প্রথম কিরন ওই বরফে প্রতিফলিত হবে, সেই রূপ কল্পনারও অতীত। যেন হিরকের দ্যুতি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভিরে শহরের সৌন্দর্য খুজতে গেলে একটু কষ্টই পাবেন। অন্যান্য শৈল শহরগুলোর মতই মানালির মূল শহরতলীরাস্তার দুধারে হোটেল, রেস্তোরা, ট্রাভেল এজেন্টদের অফিস, আর পর্যটকদের যানবাহনের ভিড়। পরিচ্ছন্নতায় মানালি শহর মধ্যম মানের, অনেক স্থানেই নর্দমার জল সোজা নদীতে গিয়েই পড়ছে। গাড়ির কালো ধোঁয়াতে বরফ পর্যন্ত কালো কয়লার মতন দেখতে লাগে সোলাং ভ্যালির ওই দিকটাতে। এগুলোকে অবশ্যই ভাবনার মধ্যে রাখতে হবে।

কোথায় থাকবেন? এক রাত্রি ট্রেন জার্নির পরদিন সারারা বাসে বা গাড়িতে এসে যখন পৌছাবেন, ইচ্ছা তো করবে যেখানে খুশি শুয়ে পরতে। কুলকুল শব্দে বয়ে চলা নদী তীরই হোক বা সবুজ ঘাসের গালিচা কিম্বা আপেল বাগান, যেখানে শোবেন সেখানেই ঘুম আসতে বাধ্য, অন্তত মানালিতে।

সরাই খানা বা মুসাফিরখানা থেকে এক্কেবারে সাততারা বিশিষ্ট হোটেল মজুদ রয়েছে মানালিতে। সস্তার ডর্মেটরিও পেয়ে যেতেই পারেন খুঁজলে। যদি ট্যাঁকের জোর থাকে সেক্ষেত্রে নদীর এক্কেবারে তটে বা বরফের চাদরের উপরে টেন্ট হাউস নিতেও পারেন, যা এক কথায় অনবদ্য। তবে বাচ্চা বা বয়স্কদের জন্য সম্পূর্ন নিরাপদ নয়। হোটেল এড়িয়ে সবচেয়ে ভালো বিভিন্ন জাতের হলিডে হোম, বাংলো, কটেজ, হোমস্টে ইত্যাদি, এখানে মান অনুযায়ী রেস্তটা খসবে। মোটামুটি ৫০০ টাকা প্রতি রাত থেকে ২০০০০/- টাকা প্রতি রাত পর্যন্ত বাজেটের পাওয়া যায়। হানিমুন কাপলদের জন্য সর্বত্র বিশেষ প্যাকেজ বা সুবিধা থাকে, এখানেও তার ব্যতিক্রম নেই। অবিশ্যি মনের মাঝে প্রেম জ্যান্ত থাকলে যে কোন কাপলই হানিমুন করতেই পারেন। তাতে বয়স ১৮ হোক বা ৮১, মনটা যুবক থাকলেই হল। তবে কটেজে থাকার অভিজ্ঞতা সবচেয়ে অনন্য, নিজেরা থেকে এই রিভিউ দিচ্ছি। গ্রুপ ট্যুর বা ফ্যামিলি ট্যুরে ৩-৪ বেডরুম বিশিষ্ট একটা গোটা কটেজ বুক করতে পারলে আপনি সত্যিই জিতে যাবেনগোটা বিল্ডিং এ নিজেদের লোক ছাড়া কোন ঝঞ্ঝাট নেই, মোবাইলটা সাইলেন্ট মোডে রেখে দিলেই- শান্ত নিস্তব্ধ নিরুপদ্রব জীবনযাপন। যদিও এখানে সর্বত্র মোবাইলের সিগন্যাল পাওয়া যায়না, তা সত্বেও অন্তর্জাল দুনিয়া থেকে এই সময়টুকু দূরে থাকায় শ্রেয়।

সকল পাহাড়ি জায়গার মতন এখানেও খাবারের দাম সমতলের তুলনায় অনেকটায় বেশী, তবে নাগালের বাইরে নয়। অবশ্য ঘুতে গিয়ে খাবারের পিছনে পরে থাকা অর্থহীন বোকামি! দিনপ্রতি মাথাপিছু ২৫০-৪০০ টাকার মানসম্মত ব্রেকফাষ্ট থেকে ডিনার করা সম্ভব। জাঙ্কফুড বা বিরিয়ানি পোলাও এর মত ভারী খাবার না খাওয়াই ভাল। জলটা সকল সময় পাউচ বা সিল প্যাকড বোতল কিনে খাবার চেষ্টা করবেন। পাহাড়ি জল খেয়ে অনেক সময় পেটের সমস্যা তৈরি হয়।

কোথায় ঘুরবেন? গোটা হিমাচল প্রদেশটার প্রতিটা অংশই বোধহয় ভ্রমনপিপাসুদের স্বর্গ। তার মধ্যেও বিশেষ কিছু কিছু স্থানে গেলে কেকের উপরে চেরির কাজ করবে। পাহাড়ি খরস্রোতা বিপাসা নদটিকেই দেখার মতন, যদি কষ্টকরে এই প্রানবন্ত বরফ শীতল জলে সাহ করে পৌছাতে পারেন, তাহলে তার সুখানুভুতি অতীতের অনেক সুখকে ম্লান করে দেবার ক্ষমতা রাখে। লক্ষ কোটি নুড়ি পাথরের বাঁধাকে টপকে সমতলের উদ্দেশ্যে ছুটে চলা নদীতে- দুই তীরের অত্যাশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে র‍্যাফটিং অন্যতম আকর্ষন।

মহাভারতের একটা বড় অংশ এখানকার স্থানীয় ঘটনা। যেমন মহাবলী ভীমে ও রাক্ষসী হিড়িম্বার পরিনয়, তাদের পুত্র ঘটোৎকচের জন্ম। সুতরাং ধর্মে বিশ্বাস থাকুক বা না থাকুক, সুন্দর বনানীতে ঘেরা কাঠের কারুকার্য খচিত প্যাগোডা ধাঁচের হিড়িম্বা মন্দিরটি মানালির অন্যতম আকর্ষন।

সোলাং ভ্যালি। একে আপনি বাংলায় বলতেই পারেন সিনেমায় যেমনটি হয়। আসলেও তাই। শীতকালে পুরু বরফের চাদরে মোড়া, মাথার উপরে রোপওয়ে সাথে স্কি সহ নানা আইস গেম। বরফ না থাকলে, যেন একটুকরো সুইজারল্যান্ড, সব পেয়েছির দেশ। প্যারাগ্লাইডিং অন্যতম আকর্ষন। বহু বলিউডি বা বাংলা সিনেমায় দেখা দৃশ্য হঠাৎ নিজের চোখে আবিষ্কার করলে চমকানোর কিছু নেই। আসলে আপনিও ঠিক সেই খানেই আছেন, যেখানে আপনার স্বপ্নের নায়ক নায়িকারা বিচর করেছিল

ইয়ে ইস্ক হায়... শাহিদ কাপুর আর করিনা কাপুর অভিনিত জাব উই মেট সিনেমাটার দৃশ্যটা একবার জাষ্ট চোখবুজে কল্পনা করে নিন। ঠিক ধরেছেন, অন্তত ১৫-২০ ফুট বরফ গভীর ভাবে কেটে রাস্তা বানিয়ে নায়ক নায়িকা জিপ গাড়ি করে গান গেয়ে চলেছেন, দুপাশে বরফের দেওয়াল। রোটাং পাস হল সেই জাইগা। এখানে এলে মনে হবে পৃথিবিতে অদৌ মাটি আছে! নাকি সবটাই বরফ? আসলে এখানে যতদুর চোখ যাবে সবটাই বর বরফ আর বরফ। এমন নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে পাবেন রোটাং পাসে। যেটা কেবল মাত্র গ্রীষ্মকালেই উপলব্ধ, কারন গ্রীষ্মে যেখানে এতো বরফ, শীতে যে সেই রাস্তা যান চলাচলের অযোগ্য, তা বলাই বাহুল্য।

নাজ্ঞার ক্যাসেল, যেখানে নাজ্ঞা রাজাদের স্থাপত্য আপনাকে এক লহমায় পাঁচ সাতশো বছর পিছনে নিয়ে যাবেই। মণিকরণ উষ্ণ প্রসবন, সে এক অপরুপ দৃশ্য। নিজের চোখে না দেখলে এই স্থানের বর্ননা করা মুসকিলএছারা বিপাসা কুন্ড, ভৃগু কুন্ড, যোগিনী প্রপাত, ভ্যানবিহার, কলা মিউজিয়াম, গুলাবা, মনু মন্দির, ইত্যাদি দর্শনীয় স্থান

রক ক্লাইম্বিং, ট্রেকিং প্যারাগ্লাইডিং, জাম্পিং, সহ বাইক ট্যুর আপনি করতেই পারেন। এখানে প্রতি দিন হিসাবে মোটর বাইক ভাড়া পাওয়া যায়। সুতরাং শখ থাকলে একবার ট্রায় করতেই পারেন। খরচ নাগালের মধ্যেই।

কুলু উপত্যাকা, ফুলের সমারোহ। বহু এ্যালোপ্যাথি ওষুধের কারখানা বা রসায়নাগার এখানেই তাদের কারখানা খুলে বসেছে। মানালী শীত প্রধান অঞ্চল, তাই এখানে বাহারী শাল- সোয়েটার টুপি মাফলার অত্যন্ত সস্তাতে পাওয়া যায়, নক্সাদার শীত বস্ত্রের নিজশ্ব ঠিকানা।

দৈনিক অর্ধ দিবস ও পূর্ন দিবসের ভিত্তিতে লোকাল সাইট সিয়িং এর জন্য গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। ১২০০ টাকা থেকে ৩০০০ টাকা দৈনিক ভাড়া। অল্টো থেকে ইনোভা যা খুশি আপনি ভাড়া করতে পারেন। এছারাও অনেক ছোট ছোট স্থান পথে পরবে , যা আপনাকে বিমোহিত করার জন্য যথেষ্ট।

এবার ফেরাফেরার রাস্তাটা যদি মানালি থেকে ভায়া সিমলা হয়ে করতে পারেন এবং সেটা দিনের বেলায়, তাহলে পয়শা উশুল ট্রিপ হতেই হবে। এক্কেবারে সোনায় সোহাগা। পৃথিবীর অন্যতম ভয়ঙ্কর দুর্গমতম সুন্দর রাস্তার শিরোপা পেয়েছে এই রাস্তাটি। সুতরাং সুযোগ হাতছারা না করাই ভাল। এর পরে সম্ভব হলে আধাবেলা চন্ডীগড় মার্কেটটা ঘুরে দেখুন, আপনার ভাল লাগতে বাধ্য।

অবশ্য করনীয়শীত পোষাক অবশ্যই সাথে রাখতে হবে, বিশেষ করে বাচ্চা আর বয়ষ্কদের জনা। পরিচয় পত্র, জলের বোতল বা ক্যান, রোদ চসমা, সানক্রিম, স্পোর্টস স্যু, এটিএম কার্ড আর যতটা সম্ভব কম লাগেজ। চার রাত পাঁচদিনের ট্যুরে কমপক্ষে মাথাপিছু ১৬- থেকে কুড়ি হাজারের মত খরচ হবে সর্বমোট।

ব্যাস আর কি তাহলে ব্যাগ প্যাক করে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করা যাকআর হ্যাঁ, আমি আবার সপরিবারে যাচ্ছি মানালির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে আরো একবার নিজেকে হারিয়ে ফেলতে। আমাদের রওনা ২৩শে মেচলেই আসুন, হয়তো একসাথেই এঞ্জয় করা যাবে

 

১০/০৫/২০১৬

 

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...