“অর্থনীতির কানাগলিতে অবরুদ্ধ ইরাণ ও
মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন কালেকশন এজেন্ট ইসরাইল”
(1)
প্রতি আক্রমণ করা ছাড়া ইরাণের আর
কোনো পথ খোলা রয়েছে কি? আর সেই আক্রমণ বোমা
বারুদের যুদ্ধ হলে, সেটা পরমাণু
যুদ্ধের দিকে গড়াবে না, সেই নিশ্চয়তা
দেওয়ারও কেউ নেই। যে যতই ধর্মের জিগির তুলুক, গণতন্ত্র বা মোল্লাতন্ত্রের চশমাতে দেখার চেষ্টা করুক- অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই মূল
সমস্যা,
সেখান থেকেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক-সামাজিক সংকট জন্ম
নিয়েছে। তথ্যগত ভিত্তি অনুযায়ী চুম্বকে এটাই দৃশ্যমান কারণ।
মাৎস্যন্যায় শুরু হলে ঐতিহ্য পথের
ধুলোয় গড়াগড়ি খায়। হাজার বছরের পারস্য ঐতিহ্যের ইতিহাস এখন হাজার হাজার
মানুষের লাশের স্তুপ এর নিচে চাপা পড়ে যাবার প্রস্তুতি নিয়েছে। ধর্ম, রাজরোষ আর বিপ্লব- এই তিনটে শব্দবন্ধে পুরো সমস্যাকে খাটো
করে দেওয়ার উপায় নেই। পশ্চিমা বিশ্বের মোড়লদের অবরোধ না থাকলে অর্থনীতি এতটা ভাঙত
না,
ফলে মানুষের বেতন আটকে যেত না ও বিক্ষোভের মাত্রা এইরকম হতো
না। অবরোধের প্রভাব সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রশাসন, সামরিক খাতে অগ্রাধিকার বজায় রেখেও স্বচ্ছতার সাথে
দুর্নীতি মুক্ত ও দক্ষ হাতে সামাজিক সুরক্ষার ন্যূনতম দিকগুলি উপেক্ষা না করে
পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে সেদিকে আলোকপাত করা প্রয়োজন।
ইরাণের উপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার
প্রভাবে তেল রপ্তানি সীমিত হয়ে গিয়েছিলো আগেই, ফলত রাষ্ট্রীয় আয় কমে যায়। পাশাপাশি ইরাণ পশ্চিমা বানিজ্য ব্যবস্থা SWIFT থেকে বিচ্ছিন্ন, তাই বিদেশী লেনদেন রুদ্ধ, আমদানি ব্যাহত
হওয়ার পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগও বন্ধ, ফল স্বরূপ ইরাণী মুদ্রা রিয়াল ভয়াবহভাবে পড়তে শুরু করেছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি
ভয়াবহ হয়ে ওঠাটাও এটারই ফলাফল। আমরা ইরাণ সংক্রান্ত যে খবরগুলো শুনি বা দেখি
সেগুলো সবই পশ্চিমা মিডিয়ার তৈরি খোরাক, তারা যেভাবে উপস্থাপনা করে আমরা সেই চশমাতেই দেখি। আমাদের মধ্যে যাবতীয় ধারণা
তৈরি হয় পশ্চিমাদের তৈরি করা বাইনারিতে, তাই আসল সত্য জানতে গেলে পশ্চিমা মিডিয়ার বাইরে ও তাদের করায়ত্বের বাইরে থাকা
সংবাদ খুঁজে নিতে হয় কষ্ট করে।
একে তো ইরাণের এই অবরুদ্ধি, তার ওপর যুদ্ধ মানেই ঝুঁকি। আর যে সে দেশের সাথে যুদ্ধ নয়, একেবারে ইজরাইলের সাথে- মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নিজস্ব
কালেকশনে এজেন্ট কিম্বা বলা ভালো ঘুর পথে আমেরিকার সাথেই যুদ্ধ। নতুন শিল্প
বিনিয়োগ আগেই ছিল না, এরপর যুদ্ধের
বাইপ্রোডাক্ট হিসাবে নতুন অবকাঠামো শিল্প কারখানা সম্প্রসারণ বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ
করে অটোমোবাইল, পেট্রোকেমিক্যাল ও কনজিউমার গুডস
শিল্পে কর্মসংস্থান একেবারে তলানিতে চলে গেছে। পাশাপাশি CIA ও তাদের মধ্যপ্রাচ্যের জারজ শাখা মোসাদের লাগাতার ষড়যন্ত্র, উস্কানি এবং তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ইরাণকে অশান্ত করে
রাখাতে কোনো খামতি রাখেনি। কারণ, শক্তিশালী ইরাণ
দখলদার ইজরায়েলের অস্তিত্বের জন্য সবসময়ের জন্য ঝুঁকি।
ইহুদি নিয়ন্ত্রিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম
ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যুদ্ধের ঝুঁকি ও প্রোপ্যাগান্ডা যত বেড়েছে, ততই ইরাণের মানুষ সম্পদ/সোনা কিনে রিয়াল বাজারে ছেড়ে
দিয়েছে,
স্বভাবতই শেয়ার মার্কেট থেকে আম জনতার ঘর অবধি আতঙ্ক
ছড়িয়েছে। এভাবেই ইরাণী রিয়াল প্রত্যেকদিন দুর্বল হয়েছে আর যেসব দ্রব্য আমদানি
পণ্য করতে হয় যেমন- খাবার ওষুধ কিংবা বিভিন্ন রকম স্পেয়ার পার্টস ইত্যাদির দাম
লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। যুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েল লেজে গোবরে হয়েছে, ফলে তাদের তরফে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরো বেড়েছে। অসভ্য
ট্রাম্পের মাতলামি, নিত্য নতুন স্যাংশন, কড়াকড়ি আর আর্থিক নজরদারিতে ইরাণ একেবারেই এক ঘরে হয়ে
গেছে। চীন, ভারত সমেত মধ্যপ্রাচ্যের ক্রেতারা
ইরাণের সঙ্গে লেনদেনের বিষয়ে আগের থেকে আরও অনেক বেশী সতর্ক। ইরাণের তেল বিক্রি
হয়ত স্তব্ধ হয়নি কিন্তু দামদড়ে ছাড় বাড়াতে হয়েছে, পেমেন্ট পেতে দেরি হচ্ছে, আর সেটাও রুবেল, ইউয়ান বা সেই প্রাচীন বার্টার পদ্ধতি অবলম্বন করতে হচ্ছে।
ফলত দেশের বর্তমান অর্থনীতির নিরিখে অনেক কিছুই আজ অপ্রয়োজনীয়। অর্থনীতির সহজ
ভাষায় Cost
of Doing Business বেড়েছে। তারই ধাক্কায় ইরাণের
এই ভয়ংকর মুদ্রাস্ফীতি, ক্ষোভ বিক্ষোভ আর
রাষ্ট্র ক্ষমতায় বর্তমান শাসকের টিকে থাকা নিয়ে এই অরাজকতা।
একটি রাষ্ট্রের হাতে নগদ অর্থ না
থাকলে অর্থনীতির নিয়মে যা যা হওয়ার ছিল, ইরাণে সেটাই হচ্ছে। সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং শিল্প-শ্রমিক
সমেত প্রায় সবার ক্ষেত্রেই বেতন দেরিতে হচ্ছে অথবা আংশিক দেওয়া হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাবে
বাজারে মানি সারকুলেশন ভয়ঙ্কর ভাবে প্রভাবিত হয়েছে, এই পথ ধরে সিঁড়ি ভাঙ্গা অংকের মতো করে একটি সমাজব্যবস্থায়
যা যা বিশৃঙ্খলা হবার সেগুলোই হয়ে চলেছে। কাজ আছে, আয় নেই, মাসের পর মাস বেতন নেই, শিক্ষিত যুবক বেকার আর অল্প শিক্ষিত যুব ও ছাত্র কর্মহীনতার
সাগরে ডুবে আছে, দেশের বিপুল পরিমাণ নারীশক্তি
সামাজিকভাবে অবরুদ্ধ।
দ্রব্যমূল্য এমনভাবে নিয়ন্ত্রণের
বাইরে গেছে যে, মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা কৃষ্টি সংস্কৃতি
রুচি ঐতিহ্য ইত্যাদি সবকিছু ভুলে গিয়ে শুধু দুবেলা দুটো অন্নের চিন্তায় দ্বিতীয়
কোন কিছু নিয়ে মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করতে রাজি নয়। যায়নবাদী আমেরিকা, আর দখলদার ইজরায়েলের সেটাই মোক্ষ ছিল। এই পরিস্থিতিতে
প্রাচীন পশ্চিমা গ্রীক সমাজবিজ্ঞানের যে টেমপ্লেট, ইরাণেও সেই পালাগানই মঞ্চস্থ হচ্ছে। মানুষের মধ্যে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ, প্রতিবাদ হয়ে নামে রাস্তায় নেমে এসেছে। দেশের প্রায়
প্রত্যেকটি সংস্থায় ধর্মঘট শুরু হয়েছে, কিন্তু সেই পথেও সমাধানের কোন সূত্র খুঁজে না পেয়ে শেষে রাজনৈতিক বিক্ষোভ
শুধু দেশের বড় বড় শহরে সীমাবদ্ধ নেই, একেবারে প্রকাশ্যে ছোট বড় একশটি শহরকে মানুষ ঘিরে ফেলেছে। বিগত ৫ দশক ধরে এমন
পরিস্থিতি তৈরির যে স্বপ্ন আমেরিকা দেখেছিল, তাতে তারা অনেকটাই সফল হয়েছে ২০২৫ এর শেষে এসে।
অবরুদ্ধ অর্থনীতিতে বৈধ আমদানি
রপ্তানি কমে যায়, ফলে সত্যিই বাধ্য
হয়ে সরকারকে গোপন বা ঘুরপথে লেনদেন করতে হয়; তাই খুব স্বাভাবিক নিয়মে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা গুটিকয় ব্যবসায়ী ও সামরিক
গোষ্ঠী লাইসেন্স দেওয়া-নেওয়া, তেল রপ্তানি, ডলার লেনদেন জাতীয় কাজগুলি নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করে
রেখেছে,
ফলস্বরূপ রাষ্ট্রের টাকা জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে না এবং
বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এটাই একটা black parallel economy তৈরি করেছে।
অবরুদ্ধ সরকার সবার আগে কী করে? প্রথম সিদ্ধান্ত নেয়, ‘রাষ্ট্র আগে বাঁচুক, মানুষ পরে’, এর হাতে-কলমে ফল হয়- সেনা, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র এবং
রেভল্যুশনারি গার্ড খাতে বাজেট বৃদ্ধি। স্বভাবতই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শ্রমিক বেতনে কাটছাঁট হয় ব্যাপক ভাবে। বাস্তবে
সামরিক খাত কোনো কর্ম সৃষ্টি করে না, উল্টে অর্থনীতির উৎপাদনশীল অংশ শুষে নেয় এবং যুবকের কর্মহীনতার কারণে
বেকারত্ব ও ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধ অর্থনীতি রাষ্ট্রকে হয়ত ভৌগোলিক সীমানার
গরিমায় টিকিয়ে রাখে কিন্তু সেই রাষ্ট্রের সমাজব্যবস্থাকে নিচে থেকে উপর অবধি
ভেতরে ভেতরে ঘুণ পোকার মতো ঝাঁঝরা করে দেয়। একই সাথে জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই
দিয়ে তথ্য গোপন করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, ফলে প্রকৃত রাষ্ট্রীয় আয়, কোন খাতে কত ব্যায়
আর বাস্তব ঘাটতি- সবকিছুই জনগণের কাছে অজানা অস্পষ্ট হয়ে যায়।
ইজরাইলের ওপর হামলা ইরাণের
অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দেবে তা ইরাণ জানত। তাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর
জনগণের উপর চাপ বাড়বে না, এটা কি তাদের দেশে
অর্থনীতিবিদরা জানতেন না? কিন্তু আঞ্চলিক
শক্তির ভাবমূর্তি ধরে রাখতে হলে, মার্কিন শোষণ
যন্ত্রে দেশের সম্পদ লুন্ঠন থেকে রক্ষা পেতে গেলে নিজেদের ‘দুর্বল দেখালে’ শাসক এর
আসন টিকবে না। সুতরাং মেনে নিতেই হবে পেজেস্কিয়ান তথা খামেইনি সরকার জেনেশুনেই এই
ক্ষতি মেনে নিয়েছে। এছাড়া শুধু কি ইজরায়েলের সাথে সরাসরি ১২ দিনের যুদ্ধ! মোটেই
নয়,
ওই যুদ্ধ ছাড়াও আছে ৩৫৬ দিন ধরে চলা নানা ফ্রন্টের প্রক্সি
যুদ্ধ,
হিজবুল্লাহ, হামাস, মিলিশিয়া, হুথি, ইত্যাদি ক্ষুদ্র
ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগুলোকে সারাবছর পোষার খরচ- হাতি পোষার থেকে কোনো অংশে কম নয়। যুদ্ধ
আমেরিকাও করে, তারাও প্রক্সি পোষে, কিন্তু তারা যুদ্ধের মাধ্যমে সেই দেশ থেকে নানান ছলে সম্পদ
লুঠ করে নিয়ে যায়, যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি
করে;
যুদ্ধই আমেরিকার মুখ্য ব্যবসা। এদিকে যুদ্ধ থেকে ইরাণের
কোনো ব্যবসা বা লাভ নেই। যুদ্ধ থেকে ইরাণের অর্থনৈতিক রিটার্ন নেই কিন্তু রাজনৈতিক
বাধ্যবাধকতা থেকে দিনের পর দিন ধরে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ কুয়োতে ঢেলে যাওয়া, অর্থনীতির আদর্শ ব্ল্যাক হোল।
(২)
যেহেতু
আমেরিকান ড্রিম আপনাকে বিক্রি করতে হবে, আপনাকে
গেলাতে হবে তাদের নগ্ন সভ্যতাই আসলে আধুনিকতা~ তাই আমেরিকা
বা ইজরায়েলের সাধারণ নাগরিকের সমস্যা ও সেখানকার প্রতিবাদ আন্দোলন কিছুই আপনাকে
দেখানো হবেনা। কিন্তু ইরাণের আন্দোলন, আমার আপনার তৃতীয়
বিশ্বের আন্দোলন প্রতিমুহূর্তে বারংবার আপনাকে আমাকে দেখানো হবে যাতে মনে হয়
পশ্চিমা সভ্যতা ছাড়া বাকি সকল রাষ্ট্র বর্বর ইত্যাদি।
সমস্যা কি
শুধু একা ইরাণের? মোটেই তা নয়, ইজরায়েলেও সমানে বিক্ষোভ হচ্ছে। এই শতকে ইরাণের সাথে
সত্যিকারের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ছাড়া ইসরাইলকে কোনো রকম সমস্যার মুখোমুখি হতে
হয়নি এতদিন, উল্টে ইজরাইল রীতিমতো বিপুল ভাতা
প্রাপ্ত মার্কিন মদতপুষ্ট দেশ, কারণ মার্কিন
কালেকশন এজেন্ট হিসেবে ইজরায়েলের পারফরম্যান্স রীতিমতো সন্তোষজনক। এর আগে ইজরায়েল
শেষ যুদ্ধ করেছিল ১৯৭৩ সালে ইয়ুম কিপুরের যুদ্ধে। দুর্বল ফিলিস্তিনের সাথে একতরফা
আক্রমণ আর নানান মিলিশিয়া প্রক্সি যোদ্ধাদের সাথে নিয়মিত সংঘর্ষের বাইরে, এতদিনে ইজরায়েল সত্যিকারের লড়াই করতে গিয়ে প্যান্টে হেগে
ফেলেছে ইরাণের বিপক্ষে। এখানেই ইজরাইলের জনগণও দেশব্যাপী ভয়ঙ্কর বিক্ষোভ
দেখাচ্ছে। কিন্তু কেন?
ইজরায়েলেদের
দাবী তাদের দেশের বর্তমান বিক্ষোভ ‘বামপন্থী ষড়যন্ত্র’, এটা আর নতুন করে হাসির উদ্রেগ করে না, কারণ মার্কিনী ও তাদের মিত্রদের কমিউনিজমের ভূত তাড়া করে
ফিরবে এটাই স্বাভাবিক। আসলে এটা নিজের জনগণের সরকারের উপরে আস্থা হারানোর ফল, এটা সরাসরি যায়োনবাদীদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা। ইজরায়েল
অবরুদ্ধ নয়, কিন্তু যুদ্ধকেন্দ্রিক ভুল রাজনৈতিক
সিদ্ধান্তে নিজেই নিজের অর্থনীতির কবর খুঁড়ে ফেলেছে। যুদ্ধের সাথে জুড়ে আছে
রাজনৈতিক ব্যর্থতা, যা ভেঙে দিয়েছে
বহুল আলোচিত ‘আইরন ডোম’ আর মোসাদের ফানুস, সেই মিথ আর আক্ষরিক ধ্বংসস্তূপের দাঁড়িয়ে চলছে- পৃথিবীর ব্যাংকার রাষ্ট্রের
স্থপতিদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিক্ষোভ।
ইজরাইলের
‘ভাতাখোর’ অপুষ্যি মানুষের দল বুঝতে পেরেছে- ভূমধ্যসাগরের তীরে বন্ধুর প্রকৃতির
মধ্যে আতঙ্ককে সঙ্গী করে নেওয়া মানুষের প্রতি ‘পশ্চিমা সমর্থন আছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নেই’। ঠিক অপর পারে ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম
প্রান্তে ইউক্রেনের জনগণ বুঝতে না পারলেও, ইজরাইলের সেয়ানা জনগণ ইরাণ কর্তৃক আক্রান্ত হবার পর হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে-
আমেরিকা অস্ত্র দেবে কিন্তু সন্তান মরেছে তাদের। ফিলিস্তিনে ঢুকে অন্যের নিরস্ত্র
সন্তান মেরে আসা আর তেল আভিভের বুকে, ক্ষেপনাস্ত্র যুদ্ধের মাঝে সাইরেন শুনে বাঙ্কারের মধ্যে ছেলের লাশ আগলে থেকে
কবরের জন্য অপেক্ষা করা- এক নয়। স্বভাবতই প্রতি মুহূর্তে ইসরাইলি সমাজ দ্বিখণ্ডিত
হচ্ছে আর তাদের অর্থনীতি ভাঙছে। তাদেরও প্রাপ্তি বলতে শুধুই ধ্বংস। ইজরায়েল এর
জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে- যায়োনিস্ট সরকার যুদ্ধ চালাচ্ছে তাদের দেশের জন্য
নয়,
নিজেদের পেটোয়া গুটিকয় লোকের আখের গোছানোর জন্য এতো
আয়োজন। তাদের দেশের মানুষ জানতে চাইছে- গাজা যুদ্ধ আর কতদিন চলবে? হামাসের হাতে বন্দিদের মুক্তি কবে? আর কতদিন ৪০০০ বছর আগের ধর্মীয় আরক মাখানো ‘মাসায়া’র গল্প
শুনিয়ে ইহুদিদের অর্ধচন্দ্র বানানো হবে? এই নিরিবচ্ছিন্ন অশান্তির শেষটা কী?
যথারীতি
যায়নিস্ট শাসকের কাছে কোনো প্রশ্নের উত্তর নেই। মিডিয়া সবচেয়ে বেশি অবরুদ্ধ যদি
উত্তর কোরিয়াতে হয়, ইজরায়েল অবশ্যই
দ্বিতীয় স্থানে আসবে সেন্সরের নিরিখে, ইরাণের চেয়েও ইজরায়েলের মিডিয়া বেশি সেন্সরড; তাই তাদের আন্দোলনের ছবি খবর ইহুদি নিয়ন্ত্রিত কোনো সোশ্যালমিডিয়া, ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়াতে আসছেই না।
ইজরায়েলের
মার্কিন সাহায্য আসে মূলত সামরিক খাতে। অস্ত্র কেনায় লোন দেওয়া আর প্রতিরক্ষা
ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়ে তোলার কাজ আমেরিকা করে। এবারে যুদ্ধটা একবার যদি লাগিয়ে
দেওয়া যায়, তবে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধকালীন
লজিস্টিক সাপোর্ট হিসাবে অর্থের যোগান দেওয়া আর একটা দেশের সাধারণ অর্থনীতি চালনা
এক নয়। যুদ্ধের জন্য টাকা এলে সেগুলো অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, কর্মসংস্থান, পর্যটন, প্রযুক্তি কোনো শিল্পে লগ্নি হয়না, ফলত সেই টাকা থেকে দেশ ও জনগণ লাভবান হয়না। শেষমেষ যুদ্ধ
ছাড়া কোনো শিল্পই বাঁচে না।
ঠিক এই
ফর্মুলা অনুসরণ করে ইজরায়েলের অর্থনীতির উপরে একবার আলো ফেলা যাক।
ইসলামিক
মিলিশিয়া গোষ্ঠীদের সাথে লাগাতার প্রক্সি যুদ্ধ ও সংঘর্ষ বিরতি মাঝে দম নিয়ে নূতন
করে মোকাবিলা করার জন্য রসদ সংগ্রহ করে নেওয়া- এটাই চুম্বকে শেষ সাড়ে তিন দশকের
ইজরায়েল। লাভ বলতে গরীব ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ, জবরদখল করে প্রতিটা প্রতিবেশীর জমি হাতিয়ে নেওয়া, এটাই ইজরায়েলের একমাত্র সফলতা। ইজরায়েলের পশ্চিমের জলসীমা
প্রাকৃতিক কারণেই সুরক্ষিত, মিশরের
হোসেন-ই-মোবারক আর সিরিয়ার আসাদের পতনের পর ইজরায়েলের সীমানা যেমন বেড়েছে, উল্টো দিক থেকে আক্রমণের তীব্রতা ততই কমেছে। লেবানন বলে
একটা সুপ্রাচীন বাজারের কথা শুধুমাত্র ম্যাপ বইয়ের পাতা ছাড়া মানুষ ভুলতে বসেছে।
একতরফা ভাবে গাজাতে বর্বর আক্রমণ আর দিনশেষে উল্লাস এটুকুই প্রাপ্তি। তবুও তার
মধ্যে বোড়ে খোয়ানো বা অন্য শিবিরে বন্দী হওয়া জাতীয় ছোটখাটো ক্ষতি পুষিয়ে
নেওয়া যাচ্ছিল এতদিন; কিন্তু ইরাণের মতো
এরকম সর্বগ্রাসী ঘোষিত আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা অতীতে ইজরাইলের কখনও ছিল
না,
এমনকি আরব ইসরাইল যুদ্ধেও না।
ইজরায়েলের
জনসংখ্যা বলতে ওখানে জন্মানো নাগরিক ছাড়া পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের ধর্মীয়ভাবে
ইহুদির একটা লিংক থাকলেই হয়। অনেকটা আমাদের SIR প্রক্রিয়ায় লিংক দিয়ে জুড়ে নাগরিকত্ব প্রমাণ করার মতো। রাষ্ট্রের প্রতি
আনুগত্যের শপথ মানে- আগামী দিনে কোনো ভক্ত যদি এই ফাঁদে পা দেয় তার পথ খুলে রাখা।
বাস্তবে ইহুদি নাগরিক বলতে আশকেনাজি, সেফার্দি, মিজরাহি এবং রাশিয়া, ইউক্রেন, ইথিওপিয়া ইত্যাদি
থেকে আসা মানুষেরা মোট জনসংখ্যার ৭৩–৭৪%। দ্রুজ, চের্কেস ও অন্যান্য বিদেশি বংশোদ্ভূত কিন্তু নাগরিকত্ব প্রাপ্ত- এমন সব
মিলিয়ে ৫-৬ %। এদের অধিকাংশই ভবঘুরে, কুঁড়ে, দাগী অপরাধী বা ভাতা পেয়ে বসে খাবো
মানসিকতার। ইজরায়েল আসলেই ইউরোপ ও আমেরিকার পাতাখোর বা ড্রাগের নেশা করা রাষ্ট্রের
জঞ্জাল ইহুদিগুলোকে রিহ্যাব করার ওপেন হাসপাতাল।
ইজরাইল
নিজেকে "Jewish State" বললেও তাদের
নাগরিকদের সবাই ধর্মীয়ভাবে ইহুদি নয়- এদের জেনটাইল নামে ডাকা হয়। যারা ধর্মে ইহুদি, সে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক সে ইজরায়েলের নাগরিক। কিন্তু
যারা ওই দেশের মাটিতে ঐতিহাসিকভাবে ছিল ও আছে- তারা নাগরিক কিনা সেটা ঠিক করে
তাদের যায়োনিস্ট সরকার। ক্রমবর্ধমান ভূখণ্ডের মধ্যে আরব জাতির ২০–২১%, এরা ইজরাইলি নাগরিক কিন্তু এদের ধর্ম মুসলিম, খ্রিস্টান, দ্রুজ। এদের মাতৃ
ভাষা আরবি, যাদের সকলেই ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র
প্রক্রিয়া শুরুর সময় ঐ ভৌগোলিক সীমার ভেতরে থাকা ফিলিস্তিনি পরিবার। এরা নাগরিক
হলেও জমি,
চাকরি, রাজনৈতিক অধিকার সব
ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।
অবৈধ খাজনা
আদায় করতে গেলে পেয়াদা দলের ক্ষতি হবেই। এই বাস্তব সত্য স্বীকার করে নিয়ে
ইজরাইলে ১৮ বছর বয়স হলে সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক, মানে গোটা দেশের সব নাগরিককে ছলে বলে কৌশলে সামরিক বাহিনীর
অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। আর সমস্যা এখানেই সবচেয়ে বেশি। বাস্তবে ইজরায়েল
রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে পুরাতন বস্তাপচা আব্রাহামীয় ধর্মীয় বিশ্বাস, হিটলারের গণহত্যার ভয়, অবৈধ দখলদারি আর পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে। তাই সামরিক
প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ভাগাভাগি আছে, যেমন ইহুদী হলে পুরুষ নারী উভয়েই বাধ্যতামূলক, দ্রুজ আর চের্কেস এর মধ্যে পুরুষরা বাধ্যতামূলক। ২০% জেনটাইল আরব নাগরিক
প্রশিক্ষণের তালিকা থেকে বাদ অবিশ্বাসের কারণে। এর বাইরেও বিরাট ধার্মিকের ছাড়
পাওয়ার জন্য একটা গোঁজামিল পদ্ধতি আছে, যারা ধর্মীয় নেতা রাব্যাই এর দল- মূলত যারা ইজরায়েল এর সমাজ ও সরকার নিয়ন্ত্রণ
করে তারাও সামরিক প্রশিক্ষণের বাইরে থাকে। ইজরাইলে প্রতিমুহূর্তে NRC চালু করা রয়েছে। ফলে, গোলান উপত্যকার বড় অংশ ইজরায়েলের দখলে এসে গেলেও, দ্রুজদের অধিকাংশই সিরিয়ান নাগরিকত্ব ছাড়েনি। ফলে যুদ্ধের
মুখোমুখি হতেই, অলঙ্ঘনীয় আইরন ডোমের কার্যকারিতার
মতোই- সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুদক্ষ নাগরিকের দেশপ্রেম উধাও হয়ে গেছে। বিশ্ব
নাগরিকের অবশ্য মাথাব্যথা নেই এইসব বেকার ঝুট ঝামেলা নিয়ে, তাদের দ্বৈত্ব নাগরিকত্ব আছে, ঝামেলা বাঁধলেই পালিয়ে যায় তারা।
এই যুদ্ধ
বিধ্বস্ত পরিস্থিতি দেখার পর- প্রাণ হাতে করে কোনো পর্যটক আসছে না, ফলে ইজরায়েলের পর্যটন শিল্প প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। পরিস্থিতির
বিপাকে মেধার সাথে সাথে, প্রতিনিয়ত দেশ
ছাড়ছে টেক স্টার্ট-আপ এর ইনভেস্টমেন্ট, সেটা সাময়িক হলেও সরছেই। শুধু ল্যান্ড আর ক্যাপিটাল থাকলেই তো শিল্প হবে না, উৎপাদনের অন্যতম বড় শর্তই হলো শ্রমিক তথা লেবার। বর্বর
অত্যাচারের ফলে স্বল্পমূল্যের ফিলিস্তিনি ‘জেনটাইল’ কমছে রোজই, যে কারণে অবকাঠামো ও নির্মাণ শিল্প প্রায় থমকে গেছে। যুদ্ধ
বিধ্বস্ত অংশের পুনঃনির্মাণের জন্য পৃথিবীর অন্য অংশ থেকে লেবার আনতে গিয়ে ঢাকের
দায়ে মনসা বিকিয়ে যাচ্ছে, চুকাতে হচ্ছে
তিনগুণ চার গুণ অর্থ। অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি ছোট ব্যবসা গতি হারিয়েছে, কারণ চাহিদা নেই, মানুষ যুদ্ধের ভয়ে টাকা/সম্পদ জমাতে আগ্রহী, খরচ করছে না।
২০২৩–২০২৫
সময় কালেই লক্ষ লক্ষ ইজরায়েলি জনগণকে রিজার্ভ সেনা হিসেবে যোগ দেবার জন্য নোটিশ
জারি করে ডাকা হয়েছে, ফলে উৎপাদনশীল বয়সী
পুরুষ জাতীয় কর্মক্ষেত্রের বাইরে চলে গেছে। একই সাথে বহু ব্যবসা, স্টার্ট-আপ ও ফ্যাক্টরি আংশিক বা পুরো বন্ধ, ফলত বিপুল মেধা দেশ ছেড়েছে। অবরুদ্ধ ইরাণ ফাটা বাঁশে আটকে
গিয়ে অর্থনীতিকে কার্যত ‘মিলিটারাইজড’ করে ফেলেছে বলে পশ্চিমে দুনিয়া অভিযোগ
করছে,
কিন্তু মুক্ত হওয়াতে বাস করেও ইজরাইলের অর্থনীতি যে কার্যত
‘মিলিটারাইজড’ হয়ে গেছে এটা স্বীকার করতে তারা লজ্জা পাচ্ছে। তাই লুকাচ্ছে।
ইরাণের সাথে তুলনা করলে- ইজরাইলের সাথে প্রায় সবার সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু
আছে,
ডলার ও ইউরো প্রবাহ আছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীন ভাবে
কাজ করতে পারছে। তবুও ইজরাইলের প্রায় সব সেক্টর ভেঙে পড়েছে। ইম্মিডিয়েড পড়শী দেশ
থেকে কিছু স্থায়ী লুঠপাঠের বন্দোবস্ত না করলে তাদের অর্থনীতিও পাতালে চলে যাবে।
দেশের
বেকারত্বের হার লুকাতে গিয়ে সরকারকে মিথ্যা সংখ্যাতত্ত্ব প্রকাশ করতে হচ্ছে।
ভয়ংকর বেকারত্ব একমাত্র বাস্তব সত্য আর আমাদের দেশের মতো পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে
কোনোমতে নিজেকে টিকিয়ে রাখার মতো কোন অবস্থা ঐ দেশে নেই। ফলে কর্মক্ষম মানুষ
ভয়ংকর ভাবে কর্মহীনতায় ভুগছে। এখনো কর্মক্ষম অংশের যেটুকু নিজেদের সামরিক
বাহিনীর বাইরে রাখতে পেরেছে, তারা বাস্তবেই
কর্মহীন। এই পরিস্থিতিতে ইজরায়েলের শেকেল, ইরাণের রিয়ালের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পডার কথা কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে
গেলেও শেকেল কোনমতে টিকে আছে কিভাবে? ইজরাইল ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক অনুদান পেয়েছে আমেরিকার কাছ থেকে, সঙ্গে যুদ্ধের সময় অতিরিক্ত সহায়তা। এভাবেই ভেন্টিলেশনে
চলে যাওয়া অর্থনীতিতে শুধুমাত্র বাইরে থেকে পাম্প করে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।
ইউক্রেন বা
ইজরাইল নয়, যুদ্ধকালীন এরকম অনুদান পাওয়ার
তালিকাটি সুদীর্ঘ। নাইজেরিয়া, লাউস, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া, ইথিওপিয়া ও সাম্প্রতিককালে তালিকায় যুক্ত হওয়া প্রতিবেশী
বাংলাদেশ। আর এই অনুদান বাজেটের চাপ প্রশমিত করার করার তাগিদেই ভেনেজুয়েলা সহ
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নিত্য নতুন তেল তথা সম্পদ ভান্ডারে আক্রমণ বাড়বে বই কমবে
না। ভবিষ্যতে মাদুরোর নামের পাশে আরো এমন অনেক নাম যে যুক্ত হবে, সে কথা এখনই বলে দেওয়া যেতে পারে।
অতীতে
স্প্যানিস সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ
ও সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতন এভাবেই হয়েছিলো। স্পেন সময় নিয়েছিলও ১০ বছর, ইংল্যান্ড ৫ বছর আর সোভিয়েত মাত্র দেশ বছরের একটু বেশী।
পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের একই নীল নক্সাতে তৈরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদও উপরোক্ত ৩
ধরনের আগ্রাশনের বাইরে কিছু নয়, স্থান ও কালভেদে
মোড়কটা শুধু আলাদা। ক্রণোলজি মেনে চললে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দুম করে কয়েক মাসের
মধ্যে ধ্বসে পড়লে আশ্চর্য হবেন না। আমেরিকার এখন চাই বিপুল টাকা, তার জন্য বিপুল লুঠের সুযোগ, সুযোগ না পেলেই যুদ্ধ অবধারিত। আমেরিকা নিজেদের তৈরি বৈশ্বিক যে বন্দোবস্ত
বানিয়েছিলো, সেই UN, WMF, WHO জাতীয় সমস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেই বিলিয়ে যাবার মুখে।
পেট্রো ডলার অর্থনীতি অতীত, ৯ই জানুয়ারি পেট্রো
ডলার চুক্তি শেষ হয়েছে সৌদির সাথে। তাই হুমকি ধমকি দিয়ে নতুন ভাবে মধ্যযুগীয়
উপনিবেশ প্রথা চালুর চেষ্টা চলছে। কিন্তু চেষ্টা করা আর সফল হওয়া এক নয়। বর্তমান
পৃথিবী আর একমেরু নেই, বন্ধুর সমস্যাতে
চীন হিজড়ের মতো আচরণ করলেও শক্তিধর সন্দেহ নেই, রাশিয়া, আমাদের ভারত সকলে রয়েছে। এই সকল
রাষ্ট্র মেনে নেবে কী? পরমাণু অস্ত্র যে
অনেকেই রাখে আজকের দিনে।
আমাদের
রাজ্যে একটা চালু কথা আছে- যার মাথায় ‘ওনার’ হাত, তিনি খাবেন জেলের ভাত। এই বাক্যটির আন্তর্জাতিকরণ করলে দাঁড়ায়- “পশ্চিমা
সমর্থন আছে মানেই অর্থনীতি মায়ের ভোগে যাবে” এই ধারণাটা মিথ হয়ে গেছে। ইউক্রেন, ইজরাইল হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে এবং অতীতের আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, মিশর এমনকি লতিন
আমেরিকার আর্জেন্টিনা, ইউরোপের ঐতিহ্যশালী
দেশ স্পেন ও গ্রীস, সর্বশক্তিমান
ন্যাটো ও গোটা ইউরোপের সীমানা মুছে ‘এক মহাদেশ এক মুদ্রার’ মতো যুগান্তকারী
ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সাহস দেখানো ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী; আর হাতের কাছে সবচেয়ে বড় উদাহরণ পাকিস্তান তো আছেই।
সুতরাং,
মস্তিষ্কের ঝুল ফাঁদগুলো সরিয়ে ‘আমেরিকান ড্রিম’ এর কাজল
মুছে বোঝার চেষ্টা না করলে এই ইম্পিরিয়াল পতনের পদধ্বনি শুনতে পাবেন না।
তাই আজকে
ইরাণের মুদ্রার মান প্রায় শূন্য করে দেওয়ার পর, তাদের কী হচ্ছে তার উপরে বিশ্বের স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ইউক্রেন
যুদ্ধ নিয়ে ন্যাটো লেজে গোবরে, তাদের লুন্ঠনের
রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে ট্রাওরের আফ্রিকা। ইরাণ যদি আজকের পর ৬ মাসও টিকে যায়, ডলারের হাল শুরুর ৯০ এর দশকের রুবেলের চেয়ে খারাপ হবে সেটা
লিখে রাখুন। সেক্ষেত্রেও আমেরিকা ভাঙবে, আবার যুদ্ধ বাঁধিয়েও যে বেঁচে যাবে তারও নিশ্চয়তা নেই, সেখানেও রসদে ঘাটতি হবে এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন
দাদাগিরির অস্ত্র- সেনাঘাঁটি গুলো গায়েব হয়ে যাবে। ১৪ই জানুয়ারির
আগে অবধি ট্রাম্প রোজ হাড়হিম করা ধমকি দিচ্ছিলো, যেন কালই খামেইনিকে ছিপে তুলে নেবে। ওদিকে মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম আর শাহি কট পড়ে রাজ মুকুটের স্বপ্নে বিভোর রেজা পল্লব রোজই মিটিনং করছিলো কীভাবে ইরাণকে ‘দিশা’ দেখাবে।
১৪ই জানুয়ারি রাত্রে অন্যান্য সমস্ত দেশ
ইরাণ থেকে তাদের দেশের নাগরিকদের ডেকে নেয়। কাতারের সেনা ঘাঁটি খালি- এই আক্রমণ হয় তো সেই আক্রমণ হয়। পরদিন সকালে ফুস…, মোসাদ,
MI-6, CIA সকলের সমস্ত কিছু ব্যর্থ হয়েছে, গাঁড়ল ট্রাম্পের মুখে পরাজয়ের ছাপ স্পষ্ট।
এর আগে যায়নিষ্ট ‘গোদি মিডিয়া’ কী তাদের তরফে প্রোপ্যাগান্ডা চালাতে কসুর কম করেছে?
BBC,
Fox, ABC, হারেৎজ, টাইমস, রয়টার্স সহ সবাই মিলে ১০ হাজার লোকের মৃত্যুর গল্প ফেঁদে একটা হেজিমনি
খাড়া করতে গিয়েছিল। পরে নিজেরাই ‘সরি বাবু’ বলে সেটাকে ৬৬৭ তে এনে থামিয়েছে,
যার মধ্যে ইরাণের সেনাবাহির সদস্যই ৭০% এর অধিক, এই হল চুম্বকে সংবাদ।
সমস্ত ধরনের
অতীতের নির্লজ্জতাকে এরা ছাপিয়ে গিয়েছে এবারে, কানাডার এক মেয়ের
ছবিকে ইরাণের বলে ভাইরাল করেছিলো সোস্যাল মিডিয়াতে; যেখানে খামেইনির ছবি পুড়িয়ে মেয়েটিকে
সিগারেট জ্বালাতে দেখা যাচ্ছিলো। খামেইনি ভালো না খারাপ সেই বিচারে যাচ্ছিনা, কিন্তু
যে লোকটা আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়ছে, সে যে খুশি হোক, আমি তার পক্ষে।
মিডল ইস্টের
১৯টা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে ইরান প্রাথমিক লক্ষ্য বানিয়ে ছিলো তো বটেই, আর এগুলো মুছে গেলে দেশ হিসাবে
ইজরায়েলের আয়ু আর আধাঘন্টা বড় জোর। তাছাড়া পরমানু অস্ত্রের ভয় থেকে আঙ্কেল শ্যাম নিজেও কি মুক্ত? সবচেয়ে বড় কথা বিশ্বের একটা রাষ্ট্রও তার বন্ধু নয়, সামান্য দুর্বল হলে পাশের প্রতিটা জনই টিপে ধরবে মার্কিন
সাম্রাজ্যবাদকে শ্বাসরোধ করার জন্য। নতুন করে অর্থের একমাত্র সংস্থান তো লুণ্ঠন, সেই লুঠ না করতে পারলেও আমেরিকা ভাঙবে। দেখা যাক সেটা কত
তাড়াতাড়ি হয় আর কোন পথ ধরে হয়!
#হককথন