প্রলাপ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রলাপ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মিথ্যা মামলাঃ ফ্যাসিস্ট শাসকের অস্ত্র

 


‘বাটন’ নামের ভিডিওটি যে বানিয়েছে সেই ছেলেটিকে চিনতামনা, না আগে তার রিল/ভিডিও দেখেছি। তাই এর চরিত্র ভাল মন্দের বিষয়েও কিছুই জানিনা। স্বভাবতই সে নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য থাকতে পারেনা, নেই ও। দেশে আইন আদালত রয়েছে, বিচার করাটা তাদের কাজ। তাই প্রাইমাফেসি দেখে, আমি যেমন ছেলেটিকে নির্দোষ বলতে পারিনা, দোষীও বলতে পারি কী? কোন এভিডেন্সের এগনেস্টে বলবো? অভিযোগকারিনী মেয়েটির মিডিয়া জবানবন্দির প্রমানে?

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB)-এর ডেটা অনুযায়ী, সমস্ত IPC/BNS মামলার প্রায় ২৩%ই মিথ্যা fabricated মামলা। এগুলো হয়রানির উদ্দেশ্যে বিদ্বেষপূর্ণভাবে দায়ের করা হয় পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে। প্রমানিত হওয়ার আগেই লকাপ বা জেলের ভিতরে ঢুকিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর মধ্যে ব্যাক্তিকে অত্যাচার করা হয়। ২০২০ সালের ডেটা অনুযায়ী, ৪৯৮এ পণপ্রথা সংক্রান্ত ১৪.৪% মামলা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, কারণ সেগুলো মিথ্যা হিসাবে প্রমানিত হয়েছিলো। ধর্ষণ, মানে ৩৭৬ ধারার ১৭%ই মামলাই পুলিশের সাজানো মিথ্যা তথ্যের জুয়াচোরি

উদাহরণ হিসাবে, রাজস্থানের ৪১%-৪৫% পর্যন্ত মামলাই ভুয়ো হিসাবে প্রমাণ হয়েছে আদালতে। ২০২৩ সালের NCRB প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেষ ১৫ বছরে মিথ্যা অভিযোগের অনুসারে পুলিশের দাখিল করা মিথ্যা ও সাজানো ভুয়ো fabricated মামলা ২৬.৭% বৃদ্ধি পেয়েছে গোটা দেশেএই হচ্ছে সমাজের আয়না, শাসক তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে নিজের নাগরিককেই মামলার ফাঁদে ফেলে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করছে। ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যে রচিত সাংবিধানিক আইনের ধারা, অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত করছে শাসক।


অভিযোগকারীনি মেয়েটির মেডিকেল টেস্টের রিপোর্ট কি আজ অবধি আদালত দেখেছে? মেয়েটি ক্যামেরার সামনে সেই রিপোর্ট দেখিয়েছে? না, দেখায়নি। মেয়েটিকে সারারাত বেঁধে রেখেছিলো, তার নাকি ফোন কেড়ে নিয়েছিলো, ইত্যাদি। স্বভাবতই তার বাড়ির লোকজন মেয়েটির সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি, তারা কি সেই রাত্রে নিকটবর্তী থানায় নুন্যতম একটা ‘GD’ করেছে? দীর্ঘদিন কোর্টে যাতায়াত ও আইনজীবি বন্ধুদের থেকে জানার সুবাদে যেটুকু বুঝলাম, মেয়েটি তো ফার্স্টক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটকে গোপন জবানবন্দি দেবে, বিচার পাওয়ার জন্য এটাই নিয়ম। তা না করে শুরুতেই মিডিয়া ট্রায়ালের জন্য একটা জনমত তৈরির চেষ্টা শুরু করেছে, যেটাকে ভিক্টিম কার্ড বলে। রেপ হয়ে থাকলে ভ্যাজাইনাল টেস্ট করতে হয় ৭২ ঘন্টার মধ্যে, যেটাকে ফরেনসিক পরীক্ষার ভাষাতে SATU বলা হয়। সেটা করা হয়েছে? যেহেতু মেয়েটি ও ছেলেটি উভয়েই পরিচিত, তাই TI প্যারেড বিষয়টাকে নাহয় বাদ দিলাম। আমার এতো কিছু গল্প করার উদ্দেশ্য- ছেলেটি দোষী হতেই পারে, কিন্তু মেয়েটি যে অসাধু উদ্দেশ্যে এই মিডিয়া ট্রায়াল করাচ্ছে, সেটাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

তবে হ্যাঁ, ছেলেটিকে এ্যারেস্ট না করলেই আশ্চর্য হতাম। মলেস্টের বিষয়টা যদিবা নাও আসতো, অন্য কিছুনা কিছু একটা আসতই, কারন শাসকের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, একে নমুনা হিসাবে শাস্তি না দিলে, কাল অন্য আরেকজন বলবে, পরশু আরেকজন। ক্ষমতা কখনও বিরোধীতা পছন্দ করেনা। স্বভাবতই, ওই মলেস্ট ইত্যাদির গল্প গাধার ওখানে না পাঠাতে পারলে, নিজেরটাতেও ভরে নিতে পারেন। হাগেন তো মুখ দিয়ে, আপনার ওটা কোন কাজেই বা লাগে!

কাল হয়ত আমি, পরশু আপনি, এভাবেই কাউকে গাঁজা কেসে, কাউকে মলেস্ট কেসে- ভরে দেবে। ওদিকে এই নপুংসক পুলিশের ক্ষমতা নেই ১৩ পাওয়া BDO, প্রশান্ত বর্মনের নাগাল পায়। ৫০ জন মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও এদের ক্ষমতা হয়না সেই WOW মালিকদের লোমের ডগা ছুঁতে। এটাই আজকের পুলিশ প্রশাসনের স্ট্যান্ডার্ড।

কটা দিন প্রতীক্ষা করুন, তোলামুলের প্রার্থী তালিকা ঘোষনা করলেই, কমপক্ষে ৮০ জন সিটিং বিধায়ক টিকিট পাবেনা আগামী নির্বাচনে, তার বাইরেও তোলাবাজদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কম কিছু নেই। পরিস্থিতি কী হবে সেটা জানে i-Pac, প্রতিটা পঞ্চায়েতে কুকুর কেত্তন শুরু হওয়া সময়ের অপেক্ষা, হ্যাঁ ভোটের আগেই। তখন দেখবেন এই পুলিশকেই কেমন ফেলে ক্যালান দিচ্ছে তোলাবাজদের নানান গোষ্ঠী।

তোলামুল ভয় পেয়েছে, চরম ভয় পেয়েছে, ক্ষমতা চলে যাওয়ার ভয়, হারামের সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়, জনগণের ক্যালানি খাওয়ার ভয়, পালিয়ে বেড়াবার ভয়, জনরোষের ভয়, তোলা সিন্ডিকেট ভেঙে পরার ভয়। আর তার জন্য এই পঞ্চায়েতে পঞ্চায়েতে সম্ভাব্য অশান্তি রুখতে রুখতে আইন প্রণয়ন করলো রাজ্যসরকার। ২০২৬ জুলাইয়ের আগে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতের কোথাও অনাস্থা আনা যাবে না।

প্রসঙ্গত, জেলা পরিষদের ১০০%, পঞ্চায়েত সমিতির ৯২% ও গ্রাম পঞ্চায়েতের ৮০% তোলামূলের চোর বাহিনীর দখলে আছে।

তোলামুল ভয় পাচ্ছে, আরো ভয় পাবে, রোজ এই ভয় বাড়বে। সাহস করে শুধু বলতে হবে, মেরুদন্ডটা আরেকটু শক্ত করতে হবে, বিশ্বাস করুন এরা নুনের মত গলে যাবে, কারন এরা কাপুরুষের দল, দুর্নীতিগ্রস্থ পুলিশ আর প্রশাসন দিয়ে জঙ্গলের শাসন চলছে। চোরেদের বিরুদ্ধে আমার আপনার গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ভাষা যদি বিজেপি বা অন্য কারো সাথে মিলে যায়, মিলতে দিন। বিজেপি বিরোধিতা করতে গিয়ে কি আমি শ্বাসবায়ু হিসাবে ওজোন বা সালফাইড গ্যাস নেব, অক্সিজেনের বদলে? যুক্তির হিসাবে বিজেপিও অক্সিজেন নেয়, তাই আমি অক্সিজেনে যাবনা! এই প্রশ্নগুলোও শাসকের নানান ভাতাজীবী গোষ্ঠী, মিডিয়ার দালালেরা তুলবে, যাতে আমি আপনি আওয়াজ না তুলি।


আওয়াজ তুলুন, কতজনকে জেলে ভরবে?

 

 


রবিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৫

বাঙালির ভূত

 

ভুতকে সেই অর্থে বাঙালী কোনো কালেই জাতে তুলতে পারেনি। 

সাহিত্যের ভুত কখনই সেভাবে একটা জলজ্যান্ত চরিত্র হতে পারেনি, হাস্য কৌতুক বা গা ছমছমে পিশাচ রূপী পার্শ্ব চরিত্র হয়েই রয়ে গেছে। বাস্তব জীবনে ভুতের ভয়ে বুক ধুকপুক করলেও গবেষণায় দেখা গেছে ৯০% ভীতুর ডিম প্রকাশ্যে ভুতের ভয় স্বীকার করেনা লোকলজ্জায়। আবার অদ্ভুত বাঙালি নাস্তিক সমাজ আছে, যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস না করলেও ভূতে ভয় রয়েছে, সে ভূত অতীতকাল নয়- পাতি বিদেহি আত্মা, তাদের যুক্তিও আছে অতিপ্রাকৃত শক্তির উপরে।

ওদিকে ব্যাঙ্কোর স্কন্দকাটা ভূত, আর ডাইনি নিয়ে নটসম্রাট শেক্সপিয়ার যে কালজয়ী ম্যাকবেথ লিখে গেলেন, তাকে কেউ ভৌতিক উপন্যাস বা নাটক বলেনা, শুধু কাল্ট বা অমর ট্রাজেডি হিসাবে মহা মহা মহা সমাদৃত। ড্রাকুলা কিম্বা মেরি শেলীর ফ্রানকেনস্টাইনও আদতে আধাভৌতিক। এর বাইরে জম্বি, ভ্যাম্পায়ার, গবলিন কিম্বা হালের হ্যারি পটারেও ভূতকে কী দারুন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। আরব্য রজনী বা ওই যুগের মধ্যপ্রাচ্যের সাহিত্যের  জ্বীন গুলোকে দেখুন, কী সব একেকটা চরিত্র, তাদেরকে কেন্দ্র করে গল্প, তারাই মূল চরিত্র।

পাশাপাশি আমাদের শীর্ষেন্দুর ভুত গোবেচারা বোকার হদ্দ, লীলা মজুমদার হয়ে সত্যজিতের ভুতও জাতে উঠতে পারেনি। বিভূতি বাবুর তারানাথের ভুতও মূল চরিত্র হয়ে উঠতে পারেনি। এমন বহু বাঙালী বা ভারতীয় লেখকের লেখনিতে ভুতের নানান উপদ্রব থাকলেও, সেগুলো শেষমেষ সাইড নায়ক হয়েই রয়ে গেছে। হরিনারায়ন চট্টোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা সিরাজ, অদ্রীশ বর্ধণ, হিমানীশ গোস্বামী, প্রমুখেরা ভূতকে এনেছেন সাসপেন্স তৈরির চরিত্র হিসাবে, ভুত কোথাও মুখ্য চরিত্র নয়। যেমন আমাদের ভাতের সাথে নানান পদ খায়, এখানে ভাত নায়ক, তরকারিরা রোজ বদলায়, আমাদের ভূতেরা তেমন মুখোরোচক তরকারি।

আমাদের অধিকাংশ সাহিত্যিক লেখকেরা বিদেশী সাহিত্যিকদের নিরিখে ভূতেদের প্রেস্টিজ পাংচার করে দিয়েছেন। সামান্য কিছু হানাবাড়ি, শ্মশান বা গোরস্থানের কিছুটা গায়ে কাঁটা দেওয়া ছমছমানি থাকলেও, বাকীরা প্রায় সবাই নির্বিষ কোমল হাস্যরস। আমাদের সাহিত্যে ভুতেরাও আত্মহত্যা করতে চায়, ভাবুন অবস্থা। 

সাহিত্যে ভূতের আলাপ হবে আর দাড়িবুড়ো বাদ যাবে সেই ধৃষ্টতা কার রয়েছে। বাংলা সাহিতে তিনিই প্রণম্য, ভূতকে চরিত্র বানাতেও। তিনি সিম্পলি বাকিদের বলতেই পারেন 'তফাৎ যাও তফাৎ যাও, সব ঝুট হ্যায়'। সেই কবিঠাকুরের ক্ষুধিত পাষাণ বাদে, মণিহারা,  কঙ্কাল কিম্বা মাস্টারমশাই, কোথাও ভুত সেভাবে মুখ্য চরিত্র হয়ে উঠেনি যারা রক্ত মাংসের মানুষের সাথে প্রভেদ ঘুচিয়ে দিয়েছে। 

আমাদের বাঙালী শিশুর জন্মই হয় জুজু নামের ভুতের সাথে, এর সাথে রাক্ষস খোক্কসের গল্প দিয়ে শৈশবের যাত্রা শেষ হতে না হতে, কৈশোরে ব্রহ্মদৈত্তি আর মামদোর পাল্লায় পড়ি। প্রথম যৌবনের প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে সবাই শাঁকচুন্নি দর্শন করি। আমাদের বাঙালী জীবনটাই ভুতময়, কিন্তু বড্ড রুগ্ন আর অধিকাংশই আদর্শবান সব ভুত, সবাই পার্শ্বচরিত্র। 

সে যাই হোক, কোন সাহিত্য বড় সেটা আলাপের বিষয় নয়, সকলে তার স্থানে সুমহান। বিষয় হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি কোমলমতি ভুতেদের নিয়ে, আদুরে পোষ্যের মত কিছুটা, যেখানে শিরশিরানি ভয়ও আছে আবার এ্যাডভেঞ্চারও আছে। এটাই 'আমাদের' নিজস্বতা।

তাই আজকের এই ভূত চতুর্দশীর সাঁঝবেলাতে এটাই নাহয় থাকুক। এটা যাদের ধর্মীয় উৎসব, তাঁরা ধর্ম হিসাবে পালন করুক, আমরা নাহয় এটা আমাদের ছেলেবেলার ভয়কাতুরে সন্ধ্যা গুলোকে উদযাপন করি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে।

বুধবার, ১ অক্টোবর, ২০২৫

খুঁজে চলেছি একটা ভাঙ্গা হৃদয়


আমি প্রতিবার ভেঙ্গে যাওয়া একটা হৃদয় খুঁজেছি। যতবার পেয়েছি ততবার নুঁড়ি পাথরের মতো বহু যত্নে আদরে ভালোবাসায় ধূলি মাখা ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়টাকে কুড়িয়ে এনে আমার হৃদয়ের ঝুড়িতে জায়গা দিয়েছি। আমি জানি ভেঙ্গে যাওয়া একটা হৃদয়ের বিধ্বস্ততা কতটুকু, কতটুকু অপূর্ণতায় ঘিরে থাকে সকল কিছু। কিভাবে নিঃশব্দে বুকের পাজরগুলো ভেঙ্গে পড়ে অদৃশ্য মায়া জালে আটকে থেকে কিভাবে রাতের আঁধারে চোখের অশ্রু ঝরায়। কিভাবে সমস্ত বিষক্রিয়া হৃদয়ে ধারণ করে হাসি মুখে নিজের অভিনয়টা চালিয়ে যায় প্রতিনিয়ত

প্রতিদিনের ভিজে থাকা কান্না মাখা জীবন পাতার ডায়েরিটা স্নেহ মমতা ভালোবাসা দিয়ে একটু একটু করে জুড়েছি রোজ। ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়টা প্রতিনিয়ত শুকিয়ে দিয়েছি পরম ঘেন্নায় কিন্ত যত্নের সাথে। ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে থাকা জীবন আরশির গল্পটা নিয়ে কখনো কবিতা কখনো গান অথবা আস্ত একটি উপন্যাস রচনা করেছি। পরিপূর্ণ ভাবে একটা জীবন্ত জীবন সাজিয়ে দেব তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি নিজেকে। সম্পূর্ণ একটি গল্প রচনা হবার পর একে একে সবাই আমাকে ছেড়ে গিয়েছিল, তাই আজও সম্পর্কের হিসেব মিলাতে গিয়ে যগে ভুল করি প্রতি লাইনে।

জীবনের প্রতি একটা অলস নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে বন্ধুর মতো পাশে থাকার অঙ্গীকার অনেকেই করেছে, বিনিময়ে কেউ কথা রাখতে পারেনি। আমার নমনীয়তায় এতোটাই মুগ্ধ হয়েছে যে বন্ধুত্বের পোশাকে থেকে ভালোবাসার নতুন রূপে আঁকড়ে থাকতে চেয়েছে। কিন্তু সময়ের স্রোতের বাঁকে সম্মান আর বিশ্বাস ধরে রাখতে যতটুকু ত্যাগ প্রয়োজন তা না করে নীরবে হারিয়ে গেছে তারা

আমরা সবাই সফররত অবস্থায় রয়েছি, প্রত্যেকের গন্তব্য আলাদা কিন্তু জীবনের চলচিত্রে কার কারো উপস্থিতি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, নিজের অস্তিত্বের মতই সমান্তরালেএটাই আসল জীবন যাত্রা শৈশব থেকে শুরু করে বয়স্ক লজ্জ্বরে বৃদ্ধদশা অবধি ক্রমাগত বিচ্ছেদকে গুণে যাওয়া ও তাদেরকে ভুলে যাওয়া সহ্য করাই এই যাত্রার মূল প্রতিপাদ্য, যাকে কোনোভাবে উপেক্ষা করার উপায় নেই।

আমি দেখেছি মুখে মিথ্যে হাসি নিয়ে ভালো থাকার অভিনয় করা মানুষের মিছিল, অজস্র সহস্র মানুষ এই শহরে মুখোশের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে। মুখোশ খুলে গেলে এক নিমিষেই হারিয়ে যেতে পারে, হারিয়ে যাবে তাকে ঘিরে গড়ে উঠা শত সহস্র স্বপ্ন, মিথ্যে আশার বহর। নিরাশার বালিচরে অযত্নে গড়াগড়ি খাওয়া কত মৃত স্বপ্নেরা স্থির চোখে ঝিকমিক করা তারার আলোর দিকে চেয়ে থাকে, যে তারাটা কত শত আলোকবর্ষ দূরে মৃত হয়ে হারিয়ে গেছে কোনো কৃষ্ণগহ্বরে। বিশ্রী অন্ধকার কুপে মিথ্যাই কেবল শান্তি, একটু বেঁচে থাকার সুখ পেতে। চলমান নাটকের ভিড়ে হারিয়ে লুকাবো নাকি লুকিয়ে হারাবো– সারাক্ষণ এরই দ্বন্দ্ব।

অতীত নিয়ে গর্ব নেই, অনুশোচনা আছে, প্রগাঢ় রয়েছে। তারপরেও আমি নিজেকে দেখি, আমি কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছি কঠোর পরিশ্রমে কাকে পেতে কে জানে! কোনও যাত্রাই দর্পহীন হয়না, প্রতিটিথেই স্পর্ধার বাঁধা অতিক্রম করতে হয় কখনও বুঝে করি, অধিকাংশ সময় করে বুঝি। হাল ছেড়ে দেওয়ার প্রাক মুহুর্তে আবার অভ্যাসে ফিরে আসি অধ্যবসায়ের গুণে।

কেউ বা দুটো হাত এক করে সারজীবন পাশাপাশি থেকে আগামীর পথ চলার অঙ্গীকার করতে চেয়েছে। আবার কেউ নষ্টামি করতে না পারায়- মিথ্যে অপবাদ দিয়ে দূরে সরে গিয়েছেঅথচ আমি ভালোবাসাময় একটা পরিপূর্ণ পৃথিবী সাজাতে চেয়েছিলাম। যেখানে হৃদয় ভাঙ্গার আর্ত চিৎকার থাকবেনা, থাকবেনা আকাশে বাতাসে অভিশাপের দীর্ঘশ্বাস। থাকবে না কোন একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা, শুধুই পূর্ণতায় ঘিরে হৃদয়ের মেলা বসবে

কিন্তু তা হয়নি, সবাই শুধু স্বার্থের টানে ভালোবেসে কাছে পেতে চেয়েছে নিজেদের মতো করেআসলে কারো হৃদয়ের টান ছিলো না, তারা শুধু অভিনয় করে গেছে ভাঙ্গা-গড়ার মিথ্যা খেলায়কেউ কখনো জানতে চায়নি- আমি কেমন আছি! আমি কী চায়! আমার হৃদয়ের কোনো পাড় ভেঙ্গে পরেছে, কোন পাড় কষ্টের আঘাতে জীর্ণ? কেউ জানতে চাইনি আমি কখনো রাতের আঁধারে হারিয়ে যায় কিনা একাকিত্বের নীরব কোনো অভিশাপে! কেউ আমার প্রাণের, আমার শ্বাসের খোঁজ রাখেনি যা নিঃশব্দে ধুঁকে চলেছে

এটা অনিবার্য সত্য আমি সারাজীবন ধরে কেবল খারাপ সিদ্ধান্ত নিয়েছিনিশ্চিত তাতে অনেকের ক্ষতিও করে থাকতে পারি, প্রতিটি সিদ্ধান্তই এমন একটি বোবা প্রান্তে গিয়ে শেষ হয়েছিল, যেখান থেকে আর ফেরা যায়না, শুধু আমরা শিখতে পারি। প্রতিটি সিদ্ধান্তই অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আপেক্ষিক, যদি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতাম- আমি কী ভিন্ন ব্যক্তি হয়ে যেতাম? আজ আমি যা কিছু সমস্তটাই সেই অতীতের সিদ্ধান্তের জন্য, এর জন্য গর্বিত হতে বাঁধা থাকলেও লজ্জিত হবার উপায় নেই। ওগুলোই মাকে আজকের ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।

তবুও আমি সর্বময় খুঁজেছি একটা ভাঙ্গা হৃদয়, যে আমারি মতো করে আমাকে নিজে বাঁচবে শুধু আমাকে একটু একটু করে আবিষ্কারর করবে আমার চোখের ভাষায়,  আমার ভালবাসা মেপে নেবে রাগের উষ্ণতাতে, নিজেকে বেঁধে নেবে আমার শাসনের ব্যাঞ্জনায়। না পাওয়ার অতৃপ্তি গুলোকে ঢেকে দেবে সোহাগে আবদারে, হাসি মুখে মিটিয়ে দিবে আমার সকল অপূর্তাগুলো। দুটো প্রাণের একটা সংসার হবে, নিভৃতে- শত কোলাহল, শত অভিযোগ, শত দূরত্বের ব্যবধানে থেকেও জুড়ে থাকবে সর্বক্ষণ আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে সপ্রতিভ ভাবে।

নিশ্চিত প্রতিটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, প্রতিবার নিজেকে উন্নত করেছি। চুপচাপ বসে অঙ্ক মেলাতে থাকি, দূরে মানুষগুলো আমাকে ঠকায়নি, বাইরের কেউ প্রতারিত করেনি। তারপরেও আমি আপন খুঁজে ফিরছি ইতিবাচক গর্বের সাথে। কারো চোখে এটা আবার ভুল, কারো ভাবনাতে বিতর্কিত- কিন্তু কোটোটাই কী যুক্তিসঙ্গত? আমার যে যাত্রা, সেখানে নানা জনের নানান ভূমিকা, কিন্তু আমার ডুবে ডুবে ভেসে চলা নোৌকার হাল কী ধরবে সেই সমালোচকেরা, সকলের ভূমিকাই যে নির্দিষ্ট।

আজকাল কষ্টের পরিভাষা বদলে গেছে, দৈন্য দুর্দশা কিম্বা অসচ্ছলতা মুখোমুখি হলে গর্বিত হই- এগুলো ততটাও সংগ্রামময় নয় যতটা বিচ্ছেদের পাঁজর ভাঙা যন্ত্রণা। জীবনের কঠিন সময়গুলোর সীমারেখাও ক্রমশ সীমানা বদলে ফেলেছে, আজকাল আর পরাজিত হতে ভয় পায়না, না মরে আজ বেঁচে থাকাটাই আসল চ্যালেঞ্জ

 

তাই আমি-

প্রতিনিয়ত খুঁজে চলেছি একটা ভাঙ্গা হৃদয়।

যে শুধু আমার হবে আমার মতো করে ।

মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

এলোমেলো ঘুড়ি


সুতো ছিঁড়ে যাবার পর ঘুড়িটা ভাবলো সে স্বাধীন, আজ নিজের খুশিতে উড়ছে। যতক্ষণ উড়লো, আনন্দের আতিসায্যে যে সে ভুলে গেল- এটা ছিল বহমান বাতাসের দয়া। 

দয়া খুবই সাময়িক, সামনের জনের উপরে নির্ভরশীল। ফলত ঘুড়িটা আর কোনোদিন আকাশ দেখলো না। গোঁত্তা খেয়ে মুখের বলে মাটিয়ে পরে ছিন্নভিন্ন হয়ে পরে রয়েছে কোথাও। অথচ সুতো ছিঁড়ে না গেলে বা দিলে সে  আবার পরদিন আকাশে পৌঁছে যেতো। আসলে লাটাই, যে সুরক্ষা দিতো- তাকেই বন্ধন বা শৃঙ্খলা মনে হয়েছিলো ঘুড়ির। পরিমিত ও বন্ধনের বাঁধনে থাকাটাকে পরাধীনতা মনে হয়েছিলো ঘুড়ির। সুতো কেটে দেবার মাঝে জীবনের স্বার্থকতা মনে করেছিলো।

আসলে দিনের শেষে সকলেই একটা সুতোর বাঁধন দিয়ে লাটাই নামের সংসারে বেঁধে থাকতে চায়। যেখানে শাসন থাকবে, মানা থাকবে, আদেশ, নিষেধ থাকবে। তবে সেখানে ভালবাসা শব্দটা মর্যাদা পাবে। সুতো কেটে গেলে কেউ কারো খোঁজ নেবেনা আর- কখনও। 

আমরা আকাশে উঠলে আগে লাটাইকে ভুলে যায়, আর সুতো কেটে স্বাধীন হতে গিয়ে- অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলি। ন্যংটা লোভ একাকিত্ব আর সামাজিক পঙ্গুত্ব দেয়। জুড়ে থাকার মাঝে যে আসল সুখ- তা আমরা হারিয়ে বুঝি।

সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২০

রাত জাগানিয়াঃ একটি সুখের ডাকনাম

 


বন্ধু শুভঙ্করদা সেদিন আমাদের আড্ডায় শুধিয়েছিল যে- কেন তুমি রাত্রে জেগে থাক, কীভাবে?
আসলে আমরা অনেকেই সারারাত বা প্রায় সারারাত জেগে থাকি, প্রত্যেকের নানান আলাদা আলাদা কারন৷ আমার কিন্তু জেগে থাকা সম্পুর্ণ অকারণে, যার বস্তুগত কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই, সেই অসামাজিকতার কথাই আজ কিছুটা শোনাবো যদি ধৈর্য থাকে।
অনেকে বলে শিল্প কেউবা বলে প্রতিভা, কিন্তু ভীষণ ঘুম ধরা চোখ নিয়েও মোবাইলের কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় আলো জ্বালিয়ে রাখটা কোনো স্বাভাবিক ব্যাপার নয় মোটেও। কি মনে হয়, রাত জেগে কারো সাথে কথা বলি কিম্বা প্রেমালাপ? ম্যাসেজের টুংটাং কিম্বা ভাইব্রেটারের গোঙানি শব্দে ফোনের কম্পন… নাহ এসবের প্রতীক্ষা করিনা, পরোয়াও করিনা। তবুও জেগে থাকি, শুধুই জেগে থাকি রাতভর- জেগে থাকার আতিসায্যে। রাতের একাকিত্ব যখন অন্তরের সবচেয়ে আপন হয়ে যায় তখন সেই চরম সুখের মূহুর্তগুলোকে উপভোগ করার জন্য নিজেকে জাড়িত করে তার শেষ রস বিন্দু টুকু আস্বাদন করার জন্যই তো এই জাগরণ।
সমগ্র চরাচর যখন নিস্তব্ধ, নিশ্চিন্ত ঘুমের পরিরম্ভে মত্ত, দিকচক্রবালে গ্রহ নক্ষত্রেরা নিজেদের ক্লান্ত একঘেয়ে পরিক্রমায় ব্যাস্ত, শ্বাপদেরা অরণ্যে শিকারের জন্য বেরিয়ে পরেছে- তখনই জাগা শুরু হয়। পূর্নিমা রাত্রিতে আকাশের দিকে চেয়ে থাকার যে অপার্থিব সুখ তা ঘুমের মাঝে কোথায়? অমাবস্যার সীমাহীন অন্ধকারের মাঝে দিকচক্রবাল জুড়ে কালো কালো প্রেতসম ছায়া, এক আকাশ তারাদের মাঝে নিজেকে ওই তাদেরই একজন হিসাবে কখনও কি ভাবতে পারতাম যদিনা রাত্রিতে জেগে থাকতাম?
এই জেগে থাকতে থাকতেই তো নিজেকে চিনেছি, কখনও রবি ঠাকুরের লেখায় ডুবে গেছি তো কখনও বঙ্কিমের সাথে বাংলা ভাষা শিখেছি। শরৎচন্দ্রের ইন্দ্রের সাথে তো আমার রাত্রেই পরিচয়, কিছুক্ষণ সেক্সপিয়ার হাতড়ে আবার পরক্ষণেই জীবনানন্দের শঙ্খ চিল হয়ে নবান্নের স্বাদ চেখেছি। অপুর পাঁচালী হোক বা ফেলুদার সাথে মগজাস্ত্রে শান সবই এই রাত্রির আঁধারেই ঘটা। কখনও বিভূতিভূষণের ইছামতিতে ভেসে চলা তো কখনও আবার বিমল মিত্রের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েনের চড়াই উৎরাই পেরানো- জেগে থাকার জন্য আর কোন বাহানা প্রয়োজন!
এই রাত্রিতেই কী অনায়াসে আতালান্তিক পেরিয়ে হাজির হয়ে যায় লাতিন আমেরিকার মানুষখেকোদের ডেরায়, আফ্রিকার উপজাতিদের মাঝে কিম্বা আরবের রঙিন রজনীগুলোতে। কখনও ব্রোঞ্চ যুগে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে ছুটে বেড়ায় ভূমধ্যসাগরের তীর ঘেঁষে, দেখি ইউরোপের আধুনিকতা, ক্লান্ত হয়ে সাঁতার কাটি কৃষ্ণ সাগরের বন্দি জলে। কখনো হেঁটে চলি ইবনে বতুতার সাথে, চলে যায় স্ক্যান্ডেনেভিয়ানদের ভাইকিং রাজ্যে, গোবি মরুভূমির গিরগিটিদের সাথে কিছুক্ষণ সময় লুকোচুরি করে ফিরে আসি গঙ্গার উৎসমুখে, হিমালয়ের কোলে।
ভূগোলের ম্যাপে থাকা সরু সরু শিরা উপশিরা বেয়ে চলতে থাকি জ্ঞানের অন্বেষণে, যত জানি ততই স্তব্ধ হয়ে যায় নিজের অজ্ঞানতা দেখে, পাছে লোকে জেনে যায় এই মূর্খতার কথা, তাই তো রাত্রের আঁধার বেয়ে পাড়ি দিই শান্ত নদী বেয়ে কখনও চীনে, কখনও মিশরে কখনও বা মস্কোর অলিতে গলিতে। বিপুলা এই ভারতের কত সভ্যতা, কত সংস্কৃতি কত ভাষা- লতার মতো চেপে ধরে রাত্রিকে অবলম্বন করে। বিস্মৃতির চোরাবালির আড়ালে একান্ত গোপনে তারা নিজের মধ্যে আপাদমস্তক টেনে নেয় আমাকে রাত্রির আঁধারে।
ভাবনার মাঝে কতশত দ্বন্দ্বেরা যখন নিজেদের মাঝে হুলুস্থুল বাঁধিয়ে রাখে, তখন তাকে কাছ থেকে পরখ করা জন্য রাত্রির নির্জনতা ভিন্ন আর সময় আছে? বাষ্পীয় আত্মার পরিভ্রমণের পথে মুক্ত প্রাণের স্লোগান লেখা চিঠি গুলো তো এই রাত্রের ডাকেই এসে পৌঁছায় হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে। ব্যাঙাচির জীবনচক্রে নীতি গ্রন্থের অসহায় আত্মসমর্পন ঘটলে লেজ খসে পরে, মৃত্যুর দূতেরা বার্তা দিয়ে যায় তির্যক দীর্ঘশ্বাসে, পরিচিত গন্ধেরা কুড়ে খায় মগজের ধন- এসব কি জানতে পারতাম রাত্রি না জাগলে?
অপ্রাপ্তিকে হাতড়িয়ে হা হুতাশ না করে নৈঃশব্দকে যারা আপন করতে পারে তাদের কাছে অবসাদই প্রিয়ার বেশে ধরা দেয় আলুথালু বেশে, কালের খাতায় লিপিবদ্ধ হয় ঘড়ির নির্বাক পরিযায়, অভিমানের সীলমোহরে থাকা কলঙ্কেরা ধরা দেয় রঙিন স্বপ্নের বসনে। রাত্রি জেগে থাকার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ লাগেনা, দুঃখ সুখ হাসি কান্না ব্যথা আনন্দ বেদনা- এসব কিছুকে বস্তুগত ভাবে স্পর্শ করে তাদের সাথে কিছুটা সময় একান্তে কাটানো যায়না দিনের কোলাহলে।
ব্যার্থ প্রেম, প্রিয় মানুষের ছেড়ে চলে যাওয়াতে যারা কাঁদতে পারেনা, রাত্রির আঁধারই তো তাদের শুশ্রূষা করে পরম মমত্বে, সমৃদ্ধ হয় উপলব্ধির ঝুলি। পুরোনো স্মৃতির সরণীতে পিছলিয়ে না চলে, মাকড়সার ঝুল সরিয়ে সিঁড়ি পথে স্যাঁতস্যাঁতে জমিতে নামার জন্য রাত্রির গভীরতাই যে আদর্শ, আঁধারের আঁধার চোখকে সইয়ে দেয়। তাইতো জেগে থাকি রাতের নিস্তব্ধতার মোড়কে থাকা যত্নেকে অনুভব করতে৷
মুখোশের আড়ালে থাকা বিরহের আগুনকে দীর্ঘদিন ধরে লালনের রমণ আসলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেশা, কবিরা কাব্যে তার বিষ্ফোরন ঘটাতে পারেন, কিন্তু আমাদের মতো যারা অকবি তারা রাতের পাহারাদার হয়ে বিরহের সূচ দিয়ে জীবনের কাঁথা সেলাই করে ফুলকারি নক্সা আঁকে। শরতের আকাশে ভেসে যাওয়া সাদা মেঘের মতো অনিশ্চিত এই জীবনে কখন যে কে কোথায় টুক করে ঝরে পড়বে তার ঠিকানা কে রাখে, ব্যর্থতার কালো মেঘ হয়ে জমে থাকা অপ্রিয় স্মরণিকাদের সাথে একান্তে কিছুটা সঙ্গম সুখ নিশীথের একাকিত্বে যার শীৎকারে রোমকূপে শিহরণ জাগে, ঝরে পড়ার ঠিক আগে।
বিরাট এই বিশ্বের মাঝে নিজে যে কি সামান্য ক্ষুদ্র অস্তিত্ব তা রাত্রির আরসির মুখোমুখি হলে তবেই উপলব্ধি করা সম্ভব। আলোকের আনন্দে উল্লসিত প্রাণ, তুচ্ছ আমিত্বকে উপেক্ষা করে শোকসর্বস্ব পৃথিবীর জন্মজন্মান্তরের যে নিগুঢ় রহস্য- তার স্বাদ আস্বাদন করতে পারেনা। জীবনের পথে চড়াই কম উৎরাই বেশি, বিপদেরা ঝাঁক বেঁধে ওৎ পেতে বসে থাকে জোনাকির মতো, যা অমাবস্যার রাত্রিতে আবিষ্কার করা যায়। ভীরুতা, শঠতা, কাপুরুষতাকে অন্ধকার কখনও দৃশ্যমান করেনা লোকসমাজে, দেখনদারির ঝুলন উৎসবে সামাজিক বর্ম পরিহিত ‘আমি’ কে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য আঁধারের চেয়ে বড় বন্ধু আর কেউ নেই।
নিজের মাঝে ইশ্বরের খোঁজ পেতে হলে, ভেঙে যাওয়া মুহুর্ত গুলোর প্রতিটি টুকরো খুঁজে আবার নতুন করে বানিয়ে, অলীকের সাথে আবার নতুন করে শুরু করে সেই ভুল শুধরে নেওয়ার মাঝেই তো ঈশ্বরের বাস। দিনের আলো জীবনকে শুষে নিয়েই তো সে উজ্জ্বল হয়, রাত্রি আবার সেই পরমায়ু ফিরিয়ে দেয়।
সকলের মাঝে থেকে সম্পূর্ন একটা নিঃসঙ্গ জীবন যাপন আসলেই একটা কলা, জেদ না থাকলে শিল্পী হওয়া যায়না, প্রয়োজন অধ্যাবসায়। মানবীয় সম্পর্কের বন্ধনে জড়িয়ে থাকা সাংসারিক সদস্য- মা, ভাই, বোন, স্ত্রী, সন্তান, বন্ধু, আত্মীয় স্বজনেরা জীবনের অবিচ্ছেদ্য, কিন্তু তার জন্য নিজেকেও প্রয়োজন, আর নিজেকে জানতে কিছুটা অধিকার নিজের জন্যও সংরক্ষণ করতেই হয়, আর তার জন্যই রাত্রির প্রহর গুলোকে কারোর সাথে ভাগ করতে মন সায় দেয়না।
মাঝরাতে খুব প্রিয় মানুষ ছাড়া বাকি সকল কিছুকেই যেন অনাহূত মনে হয়, কেউ যদি নতুন করে জীবনে আসতে চায়- বস্তু হোক বা জীবন; মনটা শিউরে উঠে, ভয়ে পেয়ে চমকে যায়- যদি সেই সম্পর্ক সেই ভালোবাসা নিজেকে ভালবাসার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে যায়, তখন আমি তো আর আমার সাথে বাঁচতে পারবনা। তাই ভয় পায়, সম্পর্কেরা হারিয়ে যায় সীমান্তে বিলীন হয়ে নিজ কক্ষপথে...
হারিয়ে যাওয়া সকল কিছুই আর কখনও ফিরে আসেনা, এটাকে নগ্ন ভাবে আঁকার জন্য একটা বিস্তৃত ক্যানভাস দরকার হয়, রাত্রের গাঢ় অন্ধকারের চেয়ে মসৃণ ক্যানভাসের বিকল্প আর কিছু আছে কি অদৌ? পোড়া বুকের মাঝে তাজা ফুসফুস বড় বেমানান জুটি, এদের মাঝে সন্ধির জন্য প্রয়োজন সীমাহীন কল্পনার প্রলেপ, যে কল্পনা জন্ম দেয় দুর ভবিষ্যতের, জন্ম দেয় নব নব সৌন্দর্যের- যাকে পুঁজি করে আগামীর সকল রাত্রে জেগে থাকার জন্য রসদ সংগ্রহ হয়।
একা থাকাটা আসলেই ভালোবাসা, নিঃস্বার্থ ভালবাসার জন্য অখন্ড অবকাশ প্রয়োজন যেখানে কেউ শান্তিভঙ্গ করবেনা৷ সারারাত জেগে রাতের নির্জনতাকে উপভোগ করতে শিখে গেলে অবশিষ্ট প্রার্থিব সকল কিছুকেই অত্যন্ত সস্তা বলে মনে হয়। রাতজাগা অস্বস্তির নয়, বরং সুখের- অনন্ত সুখের পরশ; তাই তো বছরের পর বছর ধরে রাত্রিগুলো সুখের ওমেই কাটিয়ে দেওয়া যায় জেগে জেগে।

প্রতিদিন একটা নতুন ভোরের জন্ম দেবার সুখ কেবলমাত্র সে ই জানে যে রাত্রি জেগেছে শখ করে।

সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৯

।। ভোটের ডিউটি ।।



ভোটের ডিউটিতে যাবার আগে এটা করে যান, নতুবা হারিয়ে গেলে তার জন্য আপনিই দায়ী থাকবেন।

To whom it may concern

বিধিঃ পচাশৎ অর্থমূল্যমানের একটি রাষ্ট্রীয় মোহর মুদ্রাক্ষিত বিশিষ্ট পত্রে লিপিবদ্ধ করিতে হইবে, অতঃপর দলিলপত্র হিসাবে সম্পাদনের কল্পে কারণিক হাকিমের দস্তখৎ আবশ্যক।   

উপক্রমণিকাঃ
কস্য সাধারণ আম-হলফনামা মিদং কার্যাঞ্জে, পরম করুণাময় (নিজ নিজ ঈশ্বরের নাম লিখিবেন, নাস্তিকেরা এড়াইয়া যান, শষ্প বংশীয়েরা লিখিবেন ‘তাঁহার অনুপ্রেরণায়’) নামে শপথ করিয়া ঘোষণা করিতেছি যে-

রাষ্ট্রীয় পরোয়ানা হেতু, রাষ্ট্রীয় অভিভাবক নির্বাচনের নিমিত্ত, আমি রাষ্ট্রীয় অঙ্গরাজ্যের সোপর্দ কতৃক কর্মবিশেষ দায়িত্ব সনদপত্র প্রাপ্ত করিয়াছি। তৎসুত্রীয় এই নিষ্কণ্টক কার্মিকেয়র অবতারণা।

অঙ্গীকারনামাঃ

১) আমি শ্রীযুক্ত ‘অমুক’, শ্রীযুক্ত ‘অমুকের’ ঔরসজাত সন্তান, সাকিন ‘তমুক’। চুরান্ত অনিহা স্বত্বেও, রাষ্ট্রীয় বলপূর্বক স্নায়ুচাপজনিত নানাবিধ আতঙ্ক, ত্রাস, ভীতি, আশঙ্কার অভ্যন্তরে, সর্বপরি সরকারী চাকুরীটি বাঁচাইবার লক্ষ্যে, আমি এই কার্যে আসিবার জন্য সম্মত হইয়াছি। অন্যথায় রাষ্ট্ররোষে কুপিত হইতে পারি।

২) আমার কোনো প্রকারের মানসিক দুর্বলতা ও অবসাদ নাই।

৩) আমার পারিবারিক অশান্তি নাই, থাকিলেও উহাকে প্রলম্বিত রাখিবার দায়ে আমার গৃহে প্রত্যাবর্তন জরুরী

৪) আমার উত্তমর্ণ দ্বারা বিপদগ্রস্থ নই, ভ্রান্তিবসত থাকিলেও উত্তমর্ণগণ আমার অবর্তমানে আমার অপত্য ও আস্থাস্থাপকের উপরে অধমর্ণহেতু গঞ্জনা বর্ষন করিলে উহা আমার নিকট মোটেই সুখকর বিষয় হইবেনা, সেইহেতু রাষ্ট্রীয় কর্ম সমাপ্তিতে আমার গৃহে প্রত্যাবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৫) বিশ্বসমাজের সৃষ্টিকর্তা, পুরুষ জাতিকে সৃষ্টিই করিয়াছেন বহুগামিতার সর্বপ্রকারের গুণ দিয়া। ইহার পরেও আমার, কহিবার মত সুস্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ অন্তরটান বিশিষ্ট পরকিয়া না, অতএব গৃহত্যাগী হইতে আমি অক্ষম। পড়শিতুতো সম্পর্কজালের দ্বারা সৃষ্ট অগ্রজজায়ার প্রতি কিঞ্চিৎ আকর্ষণ থাকিলেও সেক্ষেত্রে গৃহে পুনরাগমন আবশ্যিক।

৬) ই মধ্যবয়সে আসিয়া, দুর্মূল্যের দুর্বিপাকে কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানাত্ত্বে বিশ্বাসী নই, উহা মনে মনেআমার জন্য সঠিক, গুরুদেবের লেখনি সার্থকতাতে আমরা দায়বদ্ধ। নিরুদ্দেশ যাত্রা এমনিতেই জাতি বাঙালির গঠনতন্ত্রে অনুপস্থিত।

৭)  “কর্ণকুহরে সঞ্চালিত একাকী সঙ্গীত বাসর যন্ত্রে” উন্মত্তের মত গীতসুধা শুনিতে শুনিতে রেলপথ বা সড়কে পারাপার করিতে কোনোকালেই স্বচ্ছন্দ্য ছিলামনা বর্তমানেও নেই।

৮) আমি কোনো প্রকারের গুপ্ত ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত নই যে সামান্য পলায়নের সুযোগ আসিবা মাত্রই আমি উন্মত্তের মত সেই পথে ধাবিত হইব, সভ্য সমাজ ত্যাজিয়া।

৯) হিন্দিভাষ্যে নির্মিত চলচ্চিত্র মিস্টার ইন্ডিয়ার মত নীলিন হইবার মত ক্ষমতা করায়ত্ত করিতে পারিনাই।

১০) স্বল্পাহারী আমার এমন কোনো প্রকারের ক্ষুধা ব্যারাম না, যেখানে গোটা 'আমি' টাকেই উদরস্থ করিয়া সম্পূর্ণ পরিপাক করিয়া ফেলিব, সামান্যতম উচ্ছিট্ট ব্যাতিরেকে।

১১) এই সরকারী চাকুরিটির হেতু বড় কায়ক্লেশে করিয়া অমন একপিস নধর, তত্বাবধায়ক, নীতিশিক্ষক, বাক্যবাগীশ জীবনসঙ্গিনী, বিশ্বনিষ্কাষণ করিয়া অর্জন করিয়াছি। সেইহেতু, দ্বিতীয় কোনো প্রকারের  প্রেমজনিত কার্যকলাপের প্রতিশ্রুতি দিতে অক্ষম, যাহাতে চাঁদে চলিয়া যা বা কোনো নির্জন দ্বীপে যাইবার বাসনা জাগ্রত হইবে

১২) ইন্ট্রিগেশন ক্যালুলাস অনুশীলনের অভ্যাস নাই, কিন্ত ১৭ ঘরের নামতা যোগ করিয়া করিয়া মুখস্ত বলিতে পারি। আমি সুস্থ ও স্বাভাবিক তাহার একটি নমুনা ইহা।

১৩) সনাতন ধর্মের পূর্নজন্মের লোভ বা ইসলামে উল্লেখিত মৃত্যুর পর প্রাপ্ত ৭২ হুরের লোভে আমি লোভাতুর মোটেই নই, শাস্ত্রে আছে তাই পাঠ করি মাত্র। আমি বাঙালী পুরুষ, ঘরের দেবী ছিন্নমস্তা/রণচন্ডী স্ত্রীরূপী অভিভাবকই আমার উপরে সৌন্দর্য আরোপিত করিয়া থাকেন তাঁহার সুমিষ্ট আঁচলের তলেই আমার যাবতীয় সুখানুভূতি ও বিশ্ব ক্রীড়াক্ষেত্র।

১৪) মহার্ঘভাতার বৃদ্ধি সেই তিমিরে, পরিভৃতি অন্যন্য অঙ্গরাজ্য কিম্বা কেন্দ্রের তুলনাতে বিপুল বৈষম্যান্বিত। তাই ইলিশ মৎস, নপুংসক পুরুষ ছাগ মাংস, বিরিয়ানি, অসময়ে পক্ক অমৃতফল, সরভাজা, গলদা চিঙিড়ি খাবার মত সামর্থ্য নেই- যাহার দরুন অম্লশূল, ভেদবমি, শিথিলান্ত্র, আন্ত্রিক ইত্যাদির মত বিত্তশালী পীড়াহত হইয়া বনেবাদারে মরিবার মত সঙ্কুলান নাই, তথাপি আমি আমৃত্যু পরিবারের সহচর্যেই থাকিতে চাই।

১৫) জঙ্গি নাম শুনিবামাত্রই আমার পক্ষি সদৃশ্য স্বেতবর্ণের মলত্যাগ করি, অতএব জঙ্গিদলে নাম লেখাইবা হেতু আমি গৃহত্যাগে অক্ষম।

১৬) শত্রু প্রতিপালনের মত পরাক্রমতা আমার রক্তে কোনো কালেই ছিলনা। অবশিষ্ট যাহা কিছু তাহার নির্বীজকরন করিয়াই আমি আজ এই স্থানে পৌছাইয়াছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রদর্শিত বীরত্ব অনুসারে আমাকে বিবেচনা করা অহেতুক, ওই পরিসরের শত্রুরাও বাগ্মী জগন্নাথ। বাস্তবে ওই পরিমন্ডলের আমরা নিতান্তই ছাপোষা। অতএব আমি অজাতশত্রু।

এদত মর্মে পুনরায় অঙ্গীকার পূর্বক স্বজ্ঞানে, সুস্থ মস্তিষ্কে, পত্নী ও শ্বশ্রূমাতা প্ররোচনা ব্যাতিতই ঘোষণা করিতেছি; আমি একজন ভারত রাষ্ট্রের বিশ্ববাংলা অঙ্গরাজ্যে তাঁহার অনুপ্রেরণায় একজন আম নাগরিক।

ঘোষণাকারীর সাক্ষরঃ
তারিখঃ

মুসাবিদা কারকের নামঃ
সাক্ষরঃ

সনাক্ত কারকের নামঃ
সাক্ষরঃ


প্রামাণিক ইশাদীর নামঃ
সাক্ষরঃ
_______________________
রাষ্ট্রীয় আইনব্যবস্থায় স্বীকৃত হাকিম কতৃক নিশ্চয় রূপে জ্ঞাত করণের উদ্দেশ্যে প্রত্যায়িত করা হইল।




তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...