হককথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
হককথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মুকুল রায়


বাংলায় সন্তজলীয় রাজনীতির অনুপেক্ষনীয় জনক


মুকুল রায়, যিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন, শুধু এমনটা নয়; তিনি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতেন ছলে বলে কৌশলে। কেউ তাকে চাণক্য বলেন কেউ বলে চোর, যে যা খুশি বলুক তার নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে, আমি তাকে ‘মুকুল রায়’ই বলব। বাংলার বুকে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক পান্ডিত্যের উর্ধ্বে প্রণব মুখার্জির সমমানের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক যদি কারো হয়ে থাকে, সেটা মুকুল রায়। চাণক্য তোপ বা পরমাণু বোমা ছিলেন হয়তবা, সেখানে মুকুল রায় সামান্য সূচ; কিন্তু সেই প্রায় অক্ষম সূচই এতটা বিষাক্ত হয়ে তার বিরোধী রাজনীতির শরীরে মনে গেঁথে গিয়েছিল, যেখান থেকে আজও কংগ্রেস ও বামেরা বের হতে পারেনি। 

মমতা ব্যানার্জী তৃণমূল দল তৈরি করেননি, দল অজিত পাঁজা বানিয়েছিলেন। মুকুল রায় সেই সদ্য ভূমিষ্ঠ তৃণমূলেরর সমস্ত ব্যাক অফিস পিঠে করে বয়ে নিয়ে একটা দল বানিয়ে তুলেছিলেন নেপথ্যে থেকে। মুকুল রায়ের ৩০% রাজনৈতিক প্রাজ্ঞতা, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, রিস্ক নেওয়ার সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যদি আজকের বামেদের সবকটা নেতা মিলিয়েও থাকতো, দলটা কবে দাঁড়িয়ে যেতো। লোকে এটা ভুলে গেছে, মুকুল রায় ২০১৬ সালে তৃণমূল থেকে চলে যেতে আইপ্যাককে আসতে হয়েছিল মমতার পরামর্শদাতা হিসাবে। 

অত্যন্ত লো-প্রোফাইল, ভীষণ ডিসিপ্লিন, সাথে আন্তরিকতা- এটাই তাকে দক্ষ সংগঠক করে তুলেছিলো। যে মানুষ রাগে না, তার চেয়ে ডেডিকেডেট ত্রাস কম জনই হতে পারে, মুকুল রায় ছিল সেই ব্যতিক্রমী চরিত্র, যাকে রাগানো একপ্রকার অসম্ভব ছিল। একটা মানুষ কখন এগিয়ে যায় জানেন? না, প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী কাউকে ধড়াচূড়া শিক্ষিত বানালেও জ্ঞানী বানাবে তার নিশ্চয়তা নেই। জ্ঞানী সেই লোক যিনি শুধু নিখুঁত পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত বিশ্লেষণ করে ফেলতে পারেন পরিস্থিতি বা ঘটনাকে। জ্ঞানী সেই লোক, যে বলে কম, শোনে বেশি- মুকুল রায় দ্বিতীয় ক্যাটেগরির লোক ছিলেন, যিনি নিজে হামবড়া না সেজে, রাজ্যের প্রায় প্রতিটা হামবড়াদের পথে বসিয়ে দিয়েছিল। এমনকি শেষ কালেও বিজেপি আর তৃণমূলে যে কোনো প্রভেদ নেই, এটাও তিনিই প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন অফিসিয়ালি, এটাই মুকুল রায়। সৌজন্যবোধ আর শালীনতা তাকে অহংকারী আর অতিচালাকি করে তোলেনি, তাই তিনি তার রাজনৈতিক লক্ষ্যে অবিচল ও সফল ছিলেন।

তিনি শৈল্পিক ঘরানায় এসরাজ বেহালা তবলা বাজাতেননা, এক উদাসীন ভঙ্গিমায় প্রিলিউড ইন্টারলিউড গাইতেন কথ্য ভাষায়, তাতেই তার বিরোধী রাজনৈতিক মহলে হাহাকার পরে যেত। এটাই শিল্পী মুকুল রায় স্টাইল। মুকুল রায়ের মতন প্রোফাইল প্রতিটা রাজনৈতিক দলে হাজারে হাজারে আছে তারপরেও লোকটা 'স্বতন্ত্র' মুকুল রায় হয়ে বঙ্গীয় রাজনীতিতে অনন্য নিজস্ব ধারা সেট করে যেতে সক্ষম হয়েছে। আপনি ডানধারায় থাকুন কিংবা বামধারায়, মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতিকে উপেক্ষা করার উপায় নেই আপনার। আজকের পশ্চিমবঙ্গে যে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ফর্মটাকে আমরা দেখছি, তার ইঞ্জিনিয়ারিং মুকুল রায়ের হাতে তৈরি করা। বঙ্গীয় রাজনীতিতে ঘোড়া কেনাবেচা মুকুল রায়ের তৈরি। চিটফান্ডকে সরাসরি দলীয় ফান্ড হিসেবে ব্যবহার করা, প্রশাসন আর দলকে গুলিয়ে দেওয়া- অত্যন্ত দক্ষতা ও কনফিডেন্টের সাথে প্রতিটা দুষ্কর্ম করেছেন।

এথিক্সহীন নোংরা রাজনৈতিক জামানার জননী মমতা ব্যানার্জী হলে, মুকুল রায় তার সুযোগ্য পালকপিতা। এটার সুচারু শুরু বা এটার গুরুও এই মুকুল রায়ই। তারপরেও একটা সুক্ষ পার্থক্য রয়ে গেছে উভয়ের মাঝে, প্রায় একই নামগোত্রহীন সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে উঠে আসা মুকুল রায়ের তথাকথিত শিক্ষাগত যোগ্যতার অস্তিত্বকে জাহির করতে কোন অসততা তঞ্চকতার পথ নিতে হয়নি। কথায় কথায় মিথ্যাচার করতে হয়নি, নিজেকে শিল্পী কবি সাহিত্যিক বানাবার চেষ্টা করতে হয়নি, তার এক ও অকৃত্রিম পরিচয় ছিলো- রাজনীতিবিদ। সেই অর্থে মিডিয়ার ব্লু-আইড বয় ইমেজও কখনও ছিল না। মুকুল রায়ের মূল কৃতিত্ব তার ভাবলেশহীন মুখের অসাধারণ ফ্লেক্সিবিলিটি এবং গোপনীয়তা রক্ষা করার এক অনন্য সাধারণ দক্ষতা। এক‌ই পার্টির দুই লবি বা গোষ্ঠী বানানো এবং সেখান থেকে জন্মানো দ্বন্দ কীভাবে মেটাতে হয়, এটার উপরে তার মাস্টার্স করা ছিল। 

পশ্চিমবঙ্গের এত বছরে বাম লেগাসিকে কেলিয়ে লাট করে, নৈতিকতার মুখোশ খুলিয়ে আর্থিক লোভের ফাঁদে ফেলে, যাকে যেভাবে পেরেছে ন্যাংটা করে হাতে বাটি ধরিয়ে, তাদের তীব্র অহং আর ঔদ্ধত্যকে দেওয়াল ধরিয়ে, পিঠের চামড়া গুটিয়ে পোঁদে নামিয়ে দিয়েছিল যে লোকটা- তার নাম মুকুল রায়। শুধু তাই নয়, গোটা বাম সমাজ আজ বাম রাজনীতির নামে যে ‘পার্লামেন্টারি আর জুডিশিয়ারি প্র‍্যাক্টিসের’ নাগপাশে বন্দি, সেই বৃত্তে তাদের গোলগোল ঘুরিয়ে বেরাবার যে ব্লুপ্রিন্ট তা মুকুল রায়ের তৈরি, মমতার নয়। নকশাল, কংগ্রেস, অতিবাম, এসোসুই, NGO, সিদ্দিকুল্লাহ, রাজবংশী, গোর্খা বিচ্ছিন্নতাবাদী, সিমি, জামাত, বিজেপি থেকে মাওবাদী- সমস্ত আলবালছাল এই সকলকে এক ছাতার তলায় আনার ক্রেডিট মুকুল রায়ের, সূচ হয়ে এদের সকলকে এক চাদরের নিচে সেলাই করেছিলেন তিনি। মমতার অগ্নিকন্যা আর সততার প্রতীক ইমেজ ছিল, সেই ইমেজের পারফেক্ট ব্যবহার মুকুল রায় করেছিল। 

ওই যে তাৎক্ষণিক মারপ্যাঁচ ও সেই মতো দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সকলকে যোগাড় করে এনে একটা চাদর বোনা- এটা বিরল কৃতিত্ব ছিল বাম বিরোধী রাজনীতিতে। না তিনি ভাল মঞ্চের বক্তা ছিলেন, না ক্যারিশ্ম্যাটিক উপস্থিতি, না ব্লু-ভেইন বংশমর্যাদা, না হাইফাই শিক্ষাগত যোগ্যোতা, তার পরেও একটা ৩৪ বছরের ক্যাডারভিত্তিক ক্ষমতাসীন আদর্শবাদী পার্টিকে সরাতে এই লোকটা কৃষ্ণের মতো যোগ্য সারথির মতো কাজ করে গেছেন। যিনি জানতেন তার সেই উজ্জ্বল ক্যারিশ্মা নেই, না তার পিছনে জেভিয়ার্স, যাদবপুর বা JNU ট্যাগ রয়েছে, না তিনি আইনজীবি বা অর্থনীতিবিদ, গায়ক, নায়ক ছিলেন। অনেকে বলেন তিনি নাকি ওয়াগান ব্রোকার বা সাট্টা দলের চাঁই ছিলেন- সত্যিও হতে পারে মিথ্যা হতে পারে। ধরে নিলাম এটাই সত্যি, তাহলে সেই নর্দমা থেকে উঠে এসে, কোলকাত্তাইয়া রাজনীতির বৃত্তে ঢুকে পড়ে, একটা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের দলকে পথে বসিয়ে দিয়েছিল, CPIM বাদে বাকি দলগুলোকে সাইনবোর্ড বানিয়ে দিয়েছিল তার কুৎসিত দুর্বুদ্ধি দিয়ে। তিনি তার সমস্ত লিমিটেশন ঢেকে দিয়েছিলেন ক্ষুরধার শয়তানি বুদ্ধি দিয়ে। মমতার ইমেজকে ব্লেডের মতো ব্যবহার করে সর্বত্র ফালাফালা তিনি করেছিলেন।

শত্রুকে ঘৃণা করতেই হবে, কিন্তু রাজনীতি করতে এসে রাজনৈতিক ব্যক্তিকে যে শুধু ঘৃণার বসে যারা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য উপহাস করে, তার মতো হতচ্ছাড়া মূর্খ গাম্বাট আর কেউ হয় না। সমালোচনা হতে পারে তীব্র ভাবে কিংবা প্রশংসা করতে পারেন, উপেক্ষা করতে পারেন না। তার সময়ে তাকে নিয়ে কেউ কেউ আশায় থাকত, কেউ আবার আশঙ্কায়। কিন্তু, এটা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই, যে তিনি যদ্দিন প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে সুস্থ শরীরে ছিলেন- তাঁর নিজের মতো করেই ছিলেন।

এটা হচ্ছে মুকুল রায়ের সম্বন্ধে আমার মূল্যয়ন। আমি তার রাজনৈতিক আদর্শকে ঘেন্না করি, কিন্তু উপহাস করতে পারি না, কারণ সে চোখে আঙুল দিয়ে তার বিরোধী প্রতিটা রাজনৈতিক দলের ফাঁকফোঁকর দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। দম্ভ অহমিকার হাড়ে মজ্জায় জন্মানো ক্যান্সার খুঁচিয়ে দিয়ে তাসের ঘরের মতো একটা নীতি আদর্শবাদী দলকে প্রায় ডোডো পাখি করে দিয়ে গেছেন তার সময়ে। মরে যাওয়ার পর তাকে গালিগালাজ দিয়ে নিজের অপরাগতার ঘায়ে উপশম দেওয়ার ছলনা করা যায়, নিজেদের ব্যর্থতাকে জাস্টফাই করা যায় না। আগামীকাল আপনি সফল হবেন তখনই, যখন মুকুল রায়কে পর্যালোচনা করে দেখবেন যে, সে কোন পথে বাম সাম্রাজ্যকে ধ্বসিয়ে দিয়েছিল। যারা অতীতকে অন্তঃসারশূন্য হয়ে উন্মত্ত ভাবে কেবল ঘৃণা করতে শেখে, সেখান থেকে শিক্ষা নেয় না, তারা কখনও সোজা মানুষ হতে পারে না।


নদী যদি তার স্রোত হারায় তাকেও নর্দমায় পরিণত হতে হয়, শেষ জীবনে মুকুল রায়েরও সেটাই হয়েছিলেন। মৃত্যুর পর একটা মানুষকে সবাই মিলে শ্রদ্ধা দেখাতে হবেই বা কেন? কেনই বা তাকে সবাই মিলে মূল্যায়ন করতে হবে, প্রয়োজন নেই তো, যোগ্যতাই বা কজনের আছে? যারা রাজনীতির ছাত্র, তারা তথ্যগতভাবে ও সময়ের নিরিখে সুক্ষ বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার মন্দ রাজনৈতিক দিকগুলো নিয়ে মূল্যায়ন করবে, প্রয়োজনে তীব্র আক্রমনাত্বক হলেও তাতে দোষ নেই। কিন্তু ২ পয়সার জ্ঞান নিয়ে আপনি তাকে উপহাস তাচ্ছিল্য করতে পারেন না, কারণ এই ব্যাক্তিই আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শকে তার ক্ষমতা দিয়ে দুর্বল করার সাথেসাথে, আপনাকেও তুচ্ছ হাসির পাত্র বানিয়ে যাবার কারিগর। আজ সোস্যাল মিডিয়ার সর্বত্র যে সব নপুংসক, ঘরে বসে জাতীয় কংগ্রেস বা কমিউনিস্ট রাজনীতির নামে বিশ্বজয় করে ফেরে, সেই সব কঙ্গু বা বাম্বাচ্চা যাদের প্যাকাটির মতো মেরুদন্ড, এদের প্রত্যেকের জন্ম মুকুল রায়ের বীর্যে। কারণ এদের বাপেদের ধরে ধরে মুকুল রায় খোজা করে দিয়েছিল তার সময়ে।

বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সাসপেন্ডেড AERO এর উপরে, মমতার এঁটো দরদ কিসের ইঙ্গিত?

 


মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেস ভুতুড়ে ভোটারওয়ালা ২০২৪ এর ভোটারলিস্ট দিয়ে ২০২৬ এর নির্বাচন করতে মরিয়া ছিল, তাই গোটা SIR প্রক্রিয়াটাকে গুলিয়ে দিতে অধিকাংশ জালিয়াতি অপকর্ম করেছে। তারা জানে আসন্ন নির্বাচনে জালিয়াতি না করলে সরকার টিকিয়ে রাখতে পারবে না।

SIR হেয়ারিং এর শুরু থেকেই এই কথাগুলো রোজ রোজ চেঁচিয়ে বলেছি- ইচ্ছাকৃত নামের ভুলগুলো মুরুলীধর স্ট্রিটের কেশব ভবন বা দিল্লির অশোক রোডে নির্যাতন কমিশনের সদর দপ্তর থেকে কেউ করেনি। বিজেপি ও নির্যাতন কমিশন উভয়েই শঠ, দুবৃত্ত, প্রবঞ্চক, মিথ্যুক, কিন্তু বাংলাতে এদেরকে ছাড়িয়ে গেছে শাসক তৃণমূল। সাদা খাতা জমা দেওয়া 'শিক্ষক' বাহিনী, বাহুবলী BDO দের দল ও তোলামূলের পে-রোলে থাকা ডেটা এন্ট্রি অপারেটর এর ত্রিবেণী সঙ্গমের গর্ভে, i-Pac এর ঔরসে গোটা SIR ম্যাসাকারটা সংগঠিত হয়েছে। যাবতীয় হয়রানির মাস্টারমাইন্ড তৃণমূল কংগ্রেস, সাপ হয়ে কেটে ওঝা হয়ে ঝাড়তে এসেছে। না হলে কমিশন যদি দুর্নীতির দায়ে কাউকে সাসপেন্ড করে, মমতা ব্যানার্জীর এঁটো দরদ কেন উথলে পড়ছে? কারণ পরিষ্কার, তারা মমতা ব্যানার্জীর নির্দেশেই ইচ্ছাকৃত এই ভুলগুলো করেছিল।

এ বিষয়ে না আলিমুদ্দিন স্পষ্ট করে সাংবাদিক সম্মেলন করেছে আজ অবধি, না তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার সর্বজ্ঞ 'আদর্শবাদী' বাম্বাচ্চাগুলো এ নিয়ে হল্লাচিল্লা করেছে, যতটা তারা দীপ্সিতার জামাত বধে উল্লসিত ছিলো। জেনেরিক উদগান্ডু হলে তাদের ভাবনাও আঁটকে যায় ভক্তির পর্দার মাঝে। যেহেতু শুরু থেকে সাদাকে কালো আর কালোকে সাদা শেখানো হয়েছে, তাই যতই আসল 'সাদা-কালো'র প্রভেদটা কেউ চোখে আঙুল দিয়ে দেখাক, এরা গান্ধারির মতো স্বেচ্ছা অন্ধ সেজেই থাকবে।

চুরি দুর্নীতির পাঁকে ডুবে রয়েছেন মমতা ব্যানার্জী। ফলত তার রাজনৈতিক চরিত্রের image cleansing এর জন্য এখন রোজ ‘প্যাথলজিক্যাল মিথ্যা’ সম্বলিত আলফাল বকবেন, মৃত মানুষদের নিয়ে মিথ্যাচার করবেন, নতুন ভড়ং ধরবেন, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করবেন, ইনশাল্লাহ মাসাল্লাহ বিষ্ণুমাতা জয় জহর ইত্যাদি বকবেন, ছোটখাটো দাঙ্গা লাগাবেন ধর্মীয় মেরুকরণের জন্য, বিরোধী দল ভাঙানোর চেষ্টা করবেন, মিথ্যা মামলাতে ফাঁসিয়ে বিরোধী স্বরকে জেলহাজতে পাঠাবেন- ওনার গোটা রাজনৈতিক জীবনটাই এই কটা স্তম্ভের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। পাশাপাশি RSS ও চাইবে না তাদের তাদের ‘দেবী’র গদি টলে যাক। মুসলমানকে SIR এ ভয় দেখানো যায়নি, তাই আতঙ্কিত গোটা তৃণমূল নেতৃত্ব অলআউট আক্রমণে গিয়ে দাঁতনখ দিয়ে ছিঁড়ে খাবার সব ধরণের অগণতান্ত্রিক অসংবিধানিক অপচেষ্টা চালাবে।

এখনও সময় আছে, SIR এ হেয়ারিং এর নামে এই হয়রানি ও তাতে নাম বাদ যাওয়ার মাস্টারমাইন্ড যে তোলামুল, সেটাকে অষ্টপ্রহর সঙ্কীর্তন এর মতো রোজ জনগণের সামনে বাজানো। এসবের বদলে মমতা ব্যানার্জী সাংবাদিকদের কী বলেছেন, সেই নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বস্তুত ওনারই প্রচার করে যাচ্ছে সমস্ত বিরোধী শিবির। এখনও বামাতি লালবাবুদের দল ‘সেটিং’ তত্ত্বের বাইরে বের হয়ে বলতে পারছে না- কোথাও কোনো সেটিং নেই, কেউ বিজেমূল নয়। 

বামেদের গোটা ন্যারেটিভ ‘সেটিং আর বিজেমূল’ তত্ত্বে আঁটকে রয়েছে, যা গত ১০ বছর ধরে লাগাতার ফেল মেরেছে, জনগণ এটা খায়নি প্রত্যাখ্যান করেছে। আসলে TMC ও BJP এরা এক মায়ের পেটের দুই ভাইবোন, এদের একটাই বাপ- RSS, ভাই ভাই-এ বা ভাইবোনে সেটিং হয় না, ওটা ওদের নাড়ির টান। বাকি সবটাই তাদের ঘরোয়া খুনসুটি কিম্বা পারিবারিক কলহ। ওরা কোনো ভিন্ন সত্ত্বা নয়। সেটিং শব্দে আসলে ওদের আলাদা করে দেওয়াই হয়, বিজেমূল নামের হাঁসজারু সন্ধি ওদের অভিন্ন সত্ত্বাকে অস্বীকার করে। গোটা ন্যারেটিভটাই ভুল ‘লাইন’।

ক্রিকেটে আপনি যদি ‘লাইন’ মিস করেন, লোপ্পা ছয় মারার বলেও খোঁচা লাগিয়ে ক্যাচ তুলে দিতে পারেন কিম্বা তিনকাঠি উড়ে যেতে পারে। কানায় কানায় পরিপূর্ণ স্টেডিয়াম আপনার সমর্থকে ভর্তি, টিভির ওপারে আরও কয়েক কোটি আপনার জয়ের প্রতাশ্যাতে ক্ষণ গুনছে। রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশ, প্রতিপক্ষ চোটগ্রস্থ, আপনি ধড়াচুড়ো পরে রয়েছেন, প্যাড গ্লাভস হেলমেড এ্যাবডোমেন গার্ড সব রয়েছে। বাউন্ডারির বাইরে সাজঘরে দেওয়ালে আপনার সোনালী অতীতের দেওয়ালচিত্রের নিচে বসে থাকা বাঘা বাঘা এ্যানালিস্ট, কোচ, ট্রেনার, ব্রডকাস্টার সবাই প্রস্তুত। কিন্তু ‘লাইন’ মিস করে আপনি আত্মাহুতি দিলে, এই ম্যাচে আপনার কোনো সুযোগ নেই, এই যাত্রাতেও আপনার নামের পাশে ‘আর্যভট্ট’ই লেখা থাকবে। 

আমাদের নীতি, আমাদের প্রয়োজনে সেটার মাপকাঠি আমরা ঠিক করব প্রতিবার, বারংবার। এটা জোর দিয়ে বলতে কুন্ঠা কীসের?

কে গেল কিম্বা আর কে কে যাবে, ও সব ভবিতব্যের উপরে ছেড়ে দিন। যারা যাবার তারা ইতিমধ্যেই মানসিকভাবে চলে গেছে, ধরে বেঁধে রাখলে সেটাতে বড়জোর কিছুদিন লাশটা থাকবে, উল্টে আরও বেশী অন্তর্ঘাতের সুযোগ পেয়ে যাবে তাদের শয়তানি মস্তিষ্ক। গু খাওয়া গরুকে আপনি বেশিদিন ঘাস বিচালি খাওয়াতে পারবেন না, সে দড়ি ছিঁড়ে হলেও গু খেতে পালাবে। তৃণমূল চাইছে অপ্রয়োজনীয় ইস্যুতে বামেদের ফোকাস টলে যাক, তাই চুরির দায়ে জেলখাটা তাদের মূর্খপাত্র নীতি নৈতিকতার জ্ঞান দিচ্ছে, তাবড় মিডিয়াকুলও ঠেকা নিয়ে রেখেছে- কতটা হেলে গেলে বামেদের ‘নৈতিকতা’ কতটা টোল খাবে ইত্যাদি, যেন তাদেরকে নৈতিকতার চ্যুতির ঠিকেদারি দেওয়া আছে। সতীদাহ প্রথায় যেমন মৃতের স্ত্রীদের জ্যান্ত চিতায় জ্বালিয়ে দেওয়া হতো ধর্মীয় আদর্শের কথা বলে, একই ভাবে নীতি আদর্শের নামে বামকে শূন্যতেই রেখে দেওয়ার পবিত্র কর্তব্যে নিয়োজিত  এই দালাল মিডিয়া ও বিশ্বমাচাদো বুদ্ধিজীবিরা।  

আপনারা দ্রুত স্থির করুন করুন- আপনাদের ফোকাস ঠিক কীসে থাকবে আর কোন ‘লাইন’, কোন ন্যারেটিভ আপনাদের প্রচারে গুরুত্ব পাবে। আপনারা ঠিক করুন কোনটা আপনাদের নীতি আর কোনটা আপনাদের আদর্শ। আপনারা যেটাতে সীলমোহর দেবেন, সেটাই সঠিক- মিডিয়ার ঠিক করে দেওয়া পথে হেঁটে সম্ভাবনাকে ভুঁইয়ে মুড়িয়ে রাখার মাঝে আদর্শ নীতি নৈতিকতা বেঁচে থাকবে না। আদর্শ আর নীতি কপচিয়ে সতী হয়ে চিতায় উঠলে, বিপুল কর্মী সমর্থকেরা আপনাদের সাথে সহমরণে যাবে, অনাথ হবে শ্রেণি গরিবগুর্বের দল। মিডিয়া আবার তার রমনের সাথী খুঁজে নেবে আপনাকে চিতায় পাঠিয়ে। 

দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই মতো প্রচার শুরু করে দিন, হাতে সময় নেই আর।





শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বাংলাদেশের বিশ্বমাচাদো মেধাবীকুল ও নির্বাচনী ফলাফল


 অথঃ মেধাবী কাহন


জামাতের মেধাবী বিশ্বমাচাদো আমির পিনাকী ভট্টাচার্য ওরফে ফজা মিঞা- ইন্ডিয়া বিরোধী জিকির করতে করতে আক্ষরিক অর্থেই মন্ত্রীসভাই গঠন করে দিয়েছিলো। যার ওষুধের কারবারি তথা শিশু হত্যাকারী এই ক্রিমিনালটা পালটি খেতে উস্তাদ, শীঘ্রই প্যারিস থেকে 'ইন্ডিয়া আমার আব্বা' জিকির শুরু করবে। তার ভিউ ব্যাবসার গনেশ উল্টিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের জনগণ।

ভোটটা হয়েছে এ্যান্টি ইন্ডিয়া প্রোপাগাণ্ডার বিরুদ্ধে। যারা এসেছে তারাই উত্তম সেটা বলার সময় আসেনি, কিন্তু ঘোষিত উন্মাদগুলোর গালে সপাটে থাপ্পড় এই রায়। গাঁজা খোর গেঞ্জিদের বাপ, ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে পাবলিক ক্ষেপানোর মাস্টারমাইন্ড এই পিনাকী, ইলিয়াস, কণকেরা। সাথে তাদের মহান ষাঁড় উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। সস্তার ভারতীয় পন্য, সস্তার সু চিকিৎসা, রপ্তানি মালের ট্রাঞ্জিট আর সস্তার ভ্রমণ- ইন্ডিয়া না আসতে পারার দরুন যারা এগুলো থেকে বঞ্চিত, তারা জবাব দিয়েছে ভোটে। 

যারা জানেনা জামাত কারা, তাদের জন্য- আমাদের RSS নামক নিকৃষ্ট হায়নার বাংলাদেশী ভার্সন হলো জামাত, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এদের অবদান জিরো। বরং এরা বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ধরিয়ে দিতো।

এই ভোটে বিশ্বাসঘাতক রাজাকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। তাদের ভন্ডামি, ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে প্রোপাগাণ্ডার ফলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত- তারা জামাতকে আর তাদের নাবালক উপদেষ্টা সমন্বায়কদের পিছনে লাথ মেরেছে। হাসিনার প্রভাব বর্তমানে জিরো, তাকে অধিকাংশই ঘেন্না করে তার মাৎসন্যায় শাসনকালের জন্য। কিন্তু আওয়ামীলীগের প্রভাব আছে ভীষণ ভাবে। মুজিবের প্রভাব আছে মারাত্মক, মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব আছে।

হিরোসিমার পরমাণু বোমা হামলার ক্ষয়ক্ষতির রেশ পরবর্তী  দুই দশকেই অনেকটা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছিলো জাপান। কিন্তু পাকিস্তানি সেনার বীর্য হামলা,পরমাণু বোমার চেয়েও ধ্বংসাত্মক। পাঁচ দশক পরেও লাহোরের ঔরসজাত বাপের সন্তানদের পিতৃতর্পনে সে কী আকুলতা। পাকিস্তানের এই নাপাক জারজদের থেকে আশু মুক্তি নেই বাংলাদেশের। 

বাংলাদেশে গত ১৭ মাসের নাবালকেরা এখনও নির্বাচনে জয় পরাজয় নিয়ে মেতে রয়েছে। তারা বুঝছে না যে দ্রুতই সব বদলে যাবে। নতুন সরকার গঠিত হলেই এদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। কাটা ছাগলের মত লটকে দিয়ে এদের ছাল ছাড়াবে নতুন সরকার। আত্মসমালোচনা করার সুযোগ পায়নি এরা, করতেও চায়নি। বরং তাদের ঘোর কাটেনি আজ পর্যন্ত, ফলে আদিখ্যেতা কমেনি। ভুল বা ঠিকের জাইগা কোথায়, কোন কোন জায়গায় সংস্কার করতে হয়, কতটা করা যেতো- আর কী পারলোনা, এসবের দিক থেকে এরা প্রথম ৩ মাসের সরে এসে, পরবর্তী ১৪ মাস গুছিয়ে চুরি চামারি করেছে। ইউনুস ও তার বিদেশী নাগরিক রাঘব বোয়াল সাঙ্গোপাঙ্গরা পালাবে, তাদের ধরতেই পারবেনা, ধরলেও বিদেশী নাগরিক বিধায় ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে নতুন সরকার। 

জেলেহাজতে থাকা অনেক আওয়ামী নেতা যেমন মুক্তি পাবে নিঃশব্দে, তেননই গৃহহীন হয়ে বেদুইনদের মত দেশের বিভিন্নপ্রান্তে, মিয়ানমার, নেপাল বা ভারতে গা ঢাকা দিয়ে আছে যারা, তারাও দেশে ফিরবে। সমন্বায়ক ও তাদের চামচাদের একটা বড় অংশ আগামী ৫/৭ বছরের জন্য জেলে ঢুকে যাবে। কেউ কেউ পালিয়ে বিদেশ চলে যাবে, যে  পালিয়ে বা জেলে যাবে - সে বেঁচে থাকবে, যারা এ দুটোর কোনটাই পারবেনা - তারা গুম খুন হয়ে যেতে পারে। বলির পাঁঠা যেমন কাঁঠাল পাতা চেবায় নিশ্চিন্তে, এরাও এদের বিপদ টেরই পাচ্ছেনা। বাংলাদেশী সাধারণ মানুষ তার নিজের সমস্যা তো বুঝতে পারছে, ফেসবুকে ইন্ডিয়াকে রেন্ডিয়া বললে আত্মসুখ পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু ৩০০ টাকা কেজি পেঁয়াজ খেতে পেছন ফেটে যাচ্ছে। বিনা চিকিৎসায় কষ্ট পেয়ে মৃত্যু শয্যায় রেনডিয়া বললে উপসম মিলিছেনা। 

আমাদের RSS এর কোনো হিরো নেই, আছে মুচলেকা সাভারকর, তাই তারা কখনও নেতাজি কখনও বল্লভভাই প্যাটেলকে নিজেদের বলে প্রচার করে জবরদস্তি। জামাত বা গেঞ্জিদেরও তেমন কোনো নেতা ছিলোনা। তাই তারা ভোটের আগে একটা 'শহীদ' নেতা খুঁজছিলো। উসমান হাদি তেমনই এক হতভাগ্য মানুষ। হাদি রাষ্ট্র নির্মিত জবরদস্তি চরিত্র, সে তার জীবন বা দর্শনের কারনে মহাপুরুষ হয়নি। তাকে বানানো হয়েছে নির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী কায়েমি গোষ্ঠীর কর্ম সম্পাদনের জন্য- পরিকল্পনা মাফিক খুন করা হয়েছিল তাকে। সেই নিয়ে গেঞ্জিদের সে কী আবেগের বিস্ফোরণ। 

পিনাকীকে জামাতের আমির বানিয়ে দেওয়া হোক, এটা সময়ের দাবী। একজন ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ ইসলামি জামাতের আমির, এর চেয়ে সেকুলার আর কিছু হতে পারে কি? তবে জামাতের ভোটের পার্সেন্টেজ কিন্তু ভয় ধরানো, খুব বেশী মার্জিনে তারা হারেনি অধিকাংশ কেন্দ্রে। ভোট পরবর্তী হিংসায় তারা সোৎসাহে উস্কানি দিয়েই যাবে। কেউ ডাক্তার হতে যায়, কেউ উকিল, কেউ শিক্ষক তো কেউ শুধুই সুস্থ মানুষ হতে চায়। তেমনই কেউ মহামুর্খ গান্ডু হতে চাইলে তাতেও দোষ নেই। বাংলাদেশের অশিক্ষিত অন্ধ ছাত্র যুব- 'দিল্লি না ঢাকা' এই অলীক স্লোগানে, অসম মিথ্যা ছায়াযুদ্ধে নিজেদের নিরেট দিশাহীন আকাট মুর্খ হিসাবে প্রমান করেছে বা প্রতিষ্ঠা করেছে।

শহর হোক বা গ্রামাঞ্চল, যেখানে তথাকথিত অশিক্ষিত ও ধর্মীয় মুসলমানের বাস, যারা আসলেই নামাজ রোজাটা পালন করে নিয়ম করে, তারাই জামাতকে ছুঁড়ে ফেলেছে। উল্টে সিংহভাগ হিন্দু জনগণ জামাতকে ভোট দিয়েছে কারণ ২০২৪ এর জুলাই মাসে মেধাবীদের উন্মত্ত সময়ে হাসিনা পালিয়ে গেলে, পুলিশ এবং প্রশাসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলো। সে সময় জামাত এদের নিরাপত্তা দিয়েছিল, হিন্দু জনগণ সেটার প্রতিদান দিয়েছে। তবে আগামীতে এই হিন্দু ভোট জামাতের থেকে কেটে যাবে। 

গেঞ্জি, মানে এনসিপি নেতারা হলো কু'ত্তার বাচ্চার মতো। হওয়ার সময় ছিলো অনেক গুলো, সবাই ফুটফুটে কিউট। ভোটের পর কয়েকটা ঘেঁয়ো লাথখোরই বেঁচে আছে। নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী নামের একটা ভাঁড়, রীতিমতো সার্কাসের বাঁদরের মত মনোরঞ্জন জোগাচ্ছিল সোশাল মিডিয়া নেটিজেনদের। এগুলো প্রত্যেকটা ইঞ্জেকশন ছাড়া র‍্যাবিস ভাইরাস যুক্ত ঘেউ, কামড়ালেই জলাতঙ্ক থুরি ইন্ডিয়াতঙ্ক গ্যারান্টি

ধর্মীয় মেরুকরনের মুখে প্রস্রাব করে দিয়েছে এই ভোট। আমরা ভারতীয় হিসাবে সুস্থ প্রতিবেশীর সুষ্ঠু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আশা করব নতুন বাংলাদেশী সরকারের কাছে। গত ২ বছরের ভারত বিরোধী সার্কাসের পুণঃমঞ্চায়ন হলে- এই সরকারকেও পথে বসতে হবে নাবালক গেঞ্জি গুলোর মতই। ইতিহাস ছাড় দেয় কিন্তু ছেড়ে দেয় না। 

শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

সেলিম হুমায়ূন বৈঠকঃ অপারেশন কাটমানি

 


অপারেশন কাটমানি।

 

অপারেশন বর্গা যেমন হয়েছিল, তেমনই ‘অপারেশন কাটমানি’ করতে হবে সেলিম সাহেব। “লুঠের টাকা কেড়ে নিয়ে এসে, বিলিয়ে দেওয়া হবে মুটে মজদুর চাষীদের মাঝে”- এটা স্পষ্ট করে বলুন, রোজ বলুন, বারেবারে বলুন, দলের সবাইকে দিয়ে বলান। আর এগুলো করতে গেলে ঝান্ডা ধরার ডান্ডা দিয়ে তোলামুলের লুঠেরা বাহিনীকে পালটা ক্যালানি দিতে হবে, নতুবা লুঠের মাল উদ্ধার হবে না। এই ক্যালান দিতে গিয়ে যার সাহায্য লাগবে, অর্থাৎ যারা তোলামুলকে কেলিয়ে লাট বানিয়ে দেবে তাদের সাথে যদি কিছু রফা করতে হয়, ১০০ বার করুন, হাজার বার করুন। রাজনীতি যুদ্ধের ময়দান, বাবু বিবিদের পোঁদ নাচিয়ে রিল বানানো নয়।

হুমায়ূন পচা সন্দেহ নেই। পাশাপাশি একটা এমন ভোটার দেখান যে গত ৩টে নির্বাচনে হুমায়ুনের ‘আদর্শে দীক্ষিত হয়ে’ ভোট দিয়েছিল। হুমায়ুনের সাপোর্ট করার প্রশ্নই নেই, কিন্তু তীব্র সাম্প্রদায়িক যে খুনে বক্তৃতা হুমায়ূন দিয়েছিল, সেটা সালারের যোগীর ভাষণের একটা পালটা এফেক্ট ছিল। আজ যারা হুমায়ুনের বিরুদ্ধে লিখছে, সেই চটিচাঁটা মিডিয়া ও ভাতাজীবী সারমেয়কুল এর আগে হুমায়ুনের জাত নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, যখন সে তোলামুল আর বিজেপিতে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করছিল।

হুমায়ূন বা নৌশাদের সাথে রয়েছে তারা, তারা কারা? এরাই তো ২০০৬ সালে সিপিএমের ভোটার ছিল, ২০১৬ সালে তোলামুলের ভোটার, ২০২৬ শে হুমায়ূন বা নৌসাদের কুলে ভিড়েছে। ফেসবুকের সোফা বিপ্লবীরা জোরে পাদতে গেলে হেগে ফেলে, তারা সামান্য বুথ এজেন্ট হবার নাম শুনলে মুতে ফেলে, এরা পাল্টা ক্যালানি দিতে পারবে তোলামুলের লুটেরা বাহিনীকে? দল সিপিএম সেই ক্যালানি দেওয়ার লোকটা কোথা থেকে পাবে রাতারাতি? আর ক্যালানি না দিতে পারলে ব্যান্ডেজ বাঁধা কালসিটের ছবি দিয়ে সহানুভূতি ভিক্ষা করা আর শূন্যের মহিমা কীর্তনই করতে হবে আগামী ১ দশক।

বিজেপি যাদের প্রার্থী করেছে, তৃণমূল তাদের মন্ত্রী করেছে- এমন ডজন খানেক উদাহরণ রয়েছে। অথচ, সিপিএম শুধু একটু কথা বলেছে মাত্র, তাতেই সিপিএমের সতীত্ব রক্ষার্থে তৃণমূল, বিজেপি বুদ্ধিজীবী সমালোচক, তাবড় মিডিয়া, সব একাকার হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি হাহাকার একশ্রেনীর বাম্বাচ্চাদের, এরা চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় তুলছে। উদগান্ডুরা বোঝেই না- রণনীতিতে সংগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ, সতীত্ব নয়; দিনের শেষে টিকে থাকতে হবে তো

সেলিম সাহেব ধন্যবাদ, আপনি একটা পরিণত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যার দরুন অন্তত ৩ দিন প্রচারের আলোর সবটা আপনার দিকে ছিল। হুমায়ুনের সাথে আলাপ করতে যাওয়াটা কোন গভীর অন্তরালের বিষয় ছিল না, রীতিমতো ফাঁদ পেতে স্বীকৃত মিডিয়া হাউসগুলোকে বাধ্য করেছেন- তুমি আমার কাছে এসো, আমার বক্তব্য শোনো, আর এইগুলোর মাধ্যমে পার্টিকে প্রাসঙ্গিক করে তোলো। নতুবা এই মিডিয়াই ইনসাফ যাত্রা, বাংলা বাঁচাও যাত্রা সহ এমন শয়ে শয়ে সিপিএমের কর্মসূচীকে ১ পয়সার গুরুত্ব দেয়নি; অথচ হুমায়ূন হিট। মিডিয়ার তৈরি তৃনমূল-বিজেপি এই বাইনারিকে কাটানো, বিষয়টা মোটেই সহজ ছিল না।

কোলকাতার কোনো অন্ধ গলিতে মাঝরাত্রে কিংবা মুর্শিদাবাদের যেকোনো বাড়িতে, কালো কাঁচে ঢাকা গাড়িতে নিজেদের লুকিয়ে দিব্যি কথা বলা যেত হুমায়ুনের সাথে। যেহেতু আসল উদ্দেশ্যটা হুমায়ুন নয়, আসল উদ্দেশ্য নিজেদের পালে প্রচারের আলো কেড়ে নেওয়া, আসল উদ্দেশ্য দশ দিক খুলে বার্তা দেওয়া। রাজ্যের মানুষ কী বলতে চাইছে, কী তাদের চাহিদা, সেইটা খানিকটা পরখ করার তাগিদে- তাদের বক্তব্য রাখার রাজনীতির ময়দানকে আরেকটু বড় করে দেওয়া। দেখুন কী কী আউট হয়েছে- মমতার সিঙ্গুর ফ্লপ ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে, সিদ্দিকুল্লার রাজভবন অভিযান অন্ধকারে তলিয়ে গেছে, নিতীন নবীন মহাশয়- রবীন্দ্রনাথকে শান্তিতে নোবেল পাইয়ে না দিলে বাংলাতে তার উপস্থিতির কথাও মানুষ জানতে পারত না। কারণ  মিডিয়ার সমস্ত আলোর কেন্দ্রে একটাই মানুষ – মহঃ সেলিম।

সংসারটা যাকে চালাতে হয়, সে বোঝে ঝক্কি কাকে বলে। যে রান্না করে সে জানে কখন কতটা নুন দিতে হবে, কোথায় চিনি দিতে হবে, কোথায় তেল লাগাতে হবে। বড় বাবুর্চিরও ভুল হয় বৈকি। টানাটানির সংসারে অল্প অল্প করে কিছুটা টাকা বাঁচিয়ে দুর্গাপুজো/ঈদে যিনি সকলকে কাপড় কিনে দেন, নুন আনতে পান্তা ফুরায় যে হেঁশেলে সেখানে রোববার অন্তত একপিস চিকেন আর অনেকটা ঝোল যিনি জোটাবার বন্দোবস্ত করেন, ভুল হলে গালিগালাজ তিনিই খান। দিনের শেষে সংসার চালাবার দায় ও গালি খাবার দায় যখন কারো একার ঘাড়ে- সুতরাং সিদ্ধান্তের বড় অংশটা যে তিনিই নেবেন, স্ট্যান্ড তিনিই নেবেন এটাই কি স্বাভাবিক নয়?

সিঙ্গুরের বুকে মমতা ব্যানার্জী, নির্বাচন কমিশনকে শিখন্ডী বানিয়ে SIR কে আক্রমণ করে মুসলমান প্রীতি দেখানোর মিথ্যা প্রয়াস বাস্তবে মাঠে মারা গেছে। RSS থেকে পরিষ্কার করে বার্তা গেছে কমিশনে, মুসলমানকে ডিফিউজ করার মতো সব রকম প্রচেষ্টা চালু হয়েছে কমিশন ও RSS এর দুই রাজনৈতিক শাখা তৃণমূল ও বিজেপি উভয়ের তরফেই।

একটু পিছনে ফিরুন, ২০২৪ লোকসভা। একটা বিজেপি জোট আরেকটা কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইন্ডি জোট। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার পরিষ্কারভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল, বিজেপিকে ১৮ থেকে ১২ তে নামিয়ে এনেছিল। অধীর ও সেলিম দুজনেই হেরেছিলেন, এটা কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না, এটা ইন্ডি জোটের কংগ্রেস ও তোলামুলের মাঝে বোঝাপড়ার ফল ছিল- মমতা ও রাহুল গান্ধীর মাঝের আঁতাত। ২০২৪ সাল থেকে কংগ্রেস ও তোলামুলের অফিসিয়াল অলিখিত জোট চলছে, শুভঙ্কর তো একটা পাতি বোড়ে মাত্র।

খুব খেয়াল করে দেখুন, ২০২৪ নির্বাচনী প্রচারে রাহুল গান্ধী বা তার মা সহ, কংগ্রেসের কোনো শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব কিন্তু বাংলাতে প্রচারে আসেনি। ইন্ডি জোটে সিপিএম যেমন রয়েছে, তোলামুলও রয়েছে। রাহুল গান্ধীর বার্তা স্পষ্ট ছিল ও আজও সেটাই আছে- বাংলাতে ইন্ডি জোটের প্রধান শরিক তোলামুল। পাশাপাশি অধীর চৌধুরী ছিল লোকসভার বিরোধী দলনেতা, সে জিতে গেলে তাকে রাতারাতি সরিয়ে দেওয়াটাও দৃষ্টিকটূ ছিল, সুতরাং রাহুল গান্ধী বাংলাতে না এসে শুধু তোলামুলকে সাপোর্ট করেছে এমনটা নয়, অধীরকে হারিয়ে দিয়ে লোকসভার বিরোধী দলনেতার পদটাকেও কুক্ষিগত করতে পেরেছে প্রশ্নাতীত ভাবে। কংগ্রেসের চেয়ে হারামি আর কেউ নেই, না তাদের নীতি আছে, না তাদের ভোট। এদের সাথে জোট মানে গাধার পিঠে চড়ার বদলে গাধাকেই কাঁধে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া।

রাজ্যজুড়ে ৮৮ হাজার বুথে ২জন করে কমপক্ষে দেড় লাখ চোর রয়েচছে। এচছাড়া MAL, MP, তাদের স্যাঙাৎ, চাঁটাপার্টি সব মিলিয়ে কমবেশী ৩ লক্ষ স্বীকৃত চোর রয়েছে এই মুহুর্তে। হারাম খেয়ে খেয়ে চর্বি জমে গেছে এদের, মানসিকভাবে কুঁড়ে হয়ে গেছে। ভোট চুরির জন্য তো দৌড়ঝাঁপ করতে হয়, নিজেরা সেসব ভুলে গেছে, ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে আর কতটা কী করা সম্ভব! পাশাপাশি সম্পদ মানুষকে ভীত করে তোলে, হারাবার ভীতি এসে যায়। এদের ছেলেপুলেরা বড় ব্যবসা ফেঁদে বসেছে রাজ্যের সর্বত্র। ফলে, তোলামুলের প্রতিটা চোর এখন ভীত, এরা এবারে আপসে আসতে রাজি হবে। এদের ক্যালাতে হলে ফেসবুকের বিপ্লবীরা কি যাবে দ্বান্দিক তত্ত্ব আবৃত্তি করতে করতে? নাকি বাঁশ নিয়ে যারা ক্যালাতে পারে তারা যাবে? আর বাঁশ নিয়ে ক্যালাবার লোক বামেদের দলে মাঠে ময়দানে ঠিক কতজন আছে আজকের দিনে এই মুহূর্তে?

যারা হুমায়ূন বা সিদ্দিকির দলে রয়েছে, তাদের অধিকাংশই তো সর্বহারাদের প্রতিনিধি। শ্রমিক, কৃষক, প্রান্তিক শ্রমজীবী। এটা ঠিক, ১০১% ক্ষেত্রে এদের সাথে বামেদের আদর্শ খাপ খায় না, তাই জোট করার প্রশ্নই ওঠে না, কিন্তু গণতন্ত্রে যখন সংখ্যা কথা বলে, সেখানে পরিস্থিতির সাপেক্ষে রফা হলে সমস্যাটা কোথায়! বেগ এলে নাকে রুমাল চাপা দিয়েও তো আমরা হাইজিন ভুলে বাসস্ট্যান্ডের পাবলিক টয়লেটে ঢুকে পড়ি। শৌচের জন্য রোজ বাঁ হাতে করে হলেও গু ঘাঁটি তো আমরা প্রত্যেকে, তাহলে তোলামুল নামের রাজনৈতিক গু সাফাই করতে হলে হুমায়ূন নামের গু ঘাঁটলে অমনি অপবিত্র অশুচি হয়ে যাবো?

টাকা কারো বাপের নয়, আমার ট্যাক্সের টাকা চুরি হয়েছে, অথবা রাষ্ট্রীয় জনগণের সম্পদ চুরি হয়েছে। চোর তোলামুল এই চুরি করেছে। তাই যেকোনো মুল্যে এদের বিসর্জন দিতে হবে ভোটের মাধ্যমেই। দুর্নীতির পাহাড় ভাঙতে গেলে কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি বা ন্যাকড়া জড়ানো দাস ক্যাপিটেলের সামনে হাত জড়ো করে পূজারী শ্রেণির তাত্ত্বিক কমিউনিস্ট দিয়ে হবে না, ওই জাতেরই গাঁইতি কুড়ুল নেওয়া লোক দরকার, জেসিবি দরকার। যারা তোলামুলকে ক্যালাবে। সর্বহারা শ্রমজীবী ‘শ্রেনি’ ডাইলেক্ট এর কচকচি বোঝে?

দিনের শেষে সংসারটা যাদের চালাতে হয়, দল ক্ষমতায় এলে নেতা মন্ত্রী হলে যেমন তারা হবেন, খারাপ হলে মা মাসি তুলে গণ খিস্তিখেউরটাও তারাই শোনে। তাই, বাকি সেটাই হোক যেমনটা পার্টি শীর্ষ নেতারা পরিস্থিতিকে বুঝবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে। আমি বুঝি, যে উদমা ক্যালান দিতে পারবে, তার সাথে ভোটের বাজারে সমঝোতা বা রফা করো; ব্যাস এটুকুই, যাতে অপারেশন কাটমানি প্রোজেক্ট সফল হয়।

শ্রমিকের যেমন শৃঙ্খলা ছাড়া হারাবার কিছু নেই, বামেদেরও তেমন শূন্য ছাড়া হারাবার কিছু নেই, পাওয়ার জন্য গোটা বাংলা রয়েছে প্রতীক্ষাতে।

রবিবার, ২ নভেম্বর, ২০২৫

শিন্ডলার এফেক্ট ও মার্ক্স


অস্কার শিন্ডলারকে চেনেন?

না চেনাই স্বাভাবিক, ইনি একজন জার্মান শিল্পপতি ও ফিকশনাল চরিত্র। বিশ্বখ্যাত সিনেমা পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ এর বানানো ১৯৯৩ সালের একটি সিনেমা শিন্ডলার্স লিস্ট Schindler's List- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকাতে নাৎসিদের হাত থেকে এক হাজারেরও বেশি ইহুদিকে ‘রক্ষা করা’ জার্মান শিল্পপতি অস্কার শিন্ডলারের গল্প নিয়ে তৈরি। সময় সুযোগ হলে একবার সিনেমাটা দেখে নেবেন, আমাজন প্রাইমে পেয়ে যাবেন।

বন্ধু কিংশুক তা আমাদের একটা ক্লোজ গ্রুপে প্রশ্ন করেছিলো, সত্যিই যদি কয়েক কোটি মানুষ বাদ পরে যায় SIR এ, তারা যাবে কোথায়! ওকে বলেছিলাম, আসামে D-Voter হওয়া ১৯ লক্ষ ভোটার কোথায় গেছে? সে উত্তর দিতে পারেনি। আপনার আমার কাছেও বিশদে এর জবাব নেই। যারা NRC করেছে, তাদের কাছেও জবাব নেই।

আচ্ছা রাষ্ট্র কি? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব মতে, গুগুল জবাব দিলো- রাষ্ট্র হলো একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের জনগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত একটি রাজনৈতিক সংগঠন, যার একটি সরকার আছে এবং এটি নিজস্ব আইন ও সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে। রাষ্ট্রের চারটি মূল উপাদান হলো—জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার এবং সার্বভৌম ক্ষমতা। অনেকে জাতির সাথে রাষ্ট্রকে গুলিয়ে ফেলে। জাতি তৈরি হয় একটা সার্বজনীন ভাষা, যৌথ ইতিহাস, যৌথ সংস্কৃতি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্নিহিত ভৌগলিক অঞ্চলের জনগণ দ্বারা তৈরি একটি গোষ্ঠী দ্বারা। এক জাতি হওয়ার জন্য সীমানা লাগেনা, সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা থাকেনা, স্বভাবতই সার্বভৌমতার কোনো বিষয় থাকেনা সমজাতি হওয়ার জন্য। 

অর্থাৎ, নির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকার নির্দিষ্ট মানুষ তথা জনগণ তাদের সরকার চয়ন করবে, যারা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সার্বভৌম ক্ষমতা পাবে রাষ্ট্র পরিচালনার। সুতরাং, বিদেশী কোনো অনুপ্রবেশকারী, আমাদের গণতান্ত্রিক সরকার চয়নের প্রক্রিয়াতে অংশগ্রহন করতে পারেনা, করলে সেটা অবৈধ ও বাতিল হিসাবের গন্য হবে। বাঙালি হিসাবে বাংলাদেশীদের প্রতি, তামিল হিসাবে শ্রীলঙ্কানদের প্রতি, বৌদ্ধ হিসাবে নেপালীদের প্রতি কিম্বা সিন্ধি বা পাঞ্জাবি হিসাবে পাকিস্তানীদের প্রতি আপনার দুর্বলতা তথা সহমর্মিতা থাকতেই পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা আমাদের দেশের সরকার গঠনের প্রক্রিয়াতে অংশ নেবে অবৈধ ভাবে- আর আপনি বা আমি আমাদের রাজনৈতিক দলের স্বার্থে সেই অবৈধতাকে সাপোর্ট করব, এটাও অপরাধ। এই পয়েন্টে এসে SIR মান্যতা পেয়ে যায় যে, ভারত রাষ্ট্রের ভোটাধিকার প্রক্রিয়াতে শুধু মাত্র ভারতীয়েরাই অংশগ্রহন করবে, বিদেশী কোনো অনুপ্রেবেশকারী নয়। রাষ্ট্রের সংজ্ঞাতে ভৌগলিক সীমানা যেমন গুরুত্বপূর্ন, তেমনই সীমানার গণ্ডিতে থাকা মানুষের পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্দিষ্ট। যে কেউ যখন খুশি তার ইচ্ছামত, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমি অমুক দেশের ‘নাগরিক’ দাবী করতে পারেনা।

সমস্যাটা কোথায়! সমস্যা প্রক্রিয়াতে নয়, প্রক্রিয়া সাধনের গূঢ় উদ্দেশ্য ও পদ্ধতিতে। সমস্যা প্রপাগান্ডায়। কারন কেন্দ্রে RSS পরিচালিত যে বিজেপি সরকার রয়েছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ই হলো- মুসলমান, দলিতকে অত্যাচার করার মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণ করে সেখান থেকে রাজনৈতিক লাভ নেওয়া। মনুবাদকে সংবিধান মেনে মানুষের খাওয়া, পরার মত মৌলিক বিষয়গুলোকে অনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। সর্বক্ষণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হিন্দু মুসলমান অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব, মসজিদ মন্দির, গরু শুয়োরের বৃত্তে সাধারণ মানুষকে আঁটকে রেখে দেওয়া, যাতে পুঁজিবাদী শোষক গোষ্ঠী সেই অকারন অশান্তির আড়ালে ফাঁকতালে রাষ্ট্রের সম্পত্তি বেহিসাবি লুঠ করতে পারে। 

২০১৫ সালে এই বিজেপি NRC করার নামে দেশের জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলো। ১৪% মুসলমানের জন্য নাকি দেশের ৮০% হিন্দু ‘খতরেমে’। ভোটের হিসাবে অন্তত ৩৭% মানুষ এটাকে বিশ্বাসও করেছে বলে আরো দুটো টার্মে মোদী সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছে, ভোট চুরিকে আমি উহ্যই রাখলাম। দেশের ৪৬% হিন্দু RSS এর বিপক্ষে, এনাদের চাপ সহ মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বামপন্থীদের লাগাতার আন্দোলনে সেই যাত্রাই NRC/CAA থেকে পিছু হাঁটলেও, ওরা ভুলে যায়নি। দৃশ্যত এদের উদ্দেশ্য, দেশ থেকে কিছু মুসলমানকে তড়ানো, আর বাকিদের উপরে হেনস্থা আর অত্যাচার করা- যাতে মৌলবাদী হিন্দু গোষ্ঠীটার কাছে একটা অর্গাজমের বার্তা পৌঁছায়, ঘৃণার আবহে ভোট কুক্ষিগত করা যায়। 


আসামের NRC এর রেজাল্ট ২০২৫ এর শেষে এসে কোন স্থানে দাঁড়িয়ে? ১৯ লক্ষের বেশী মানুষ অবৈধ ঘোষিত হয়েছিলো, যাদের মধ্যে সাড়ে ৯ লক্ষ হিন্দু রয়েছে, এবং বাকিরা মুসলমান বলে শুরুতে ঘোষণা করেছিলো আসাম সরকার। পরে দেখা যায় তার মধ্যে এক লক্ষ নেপালী গোর্খা, সাড়ে পাঁচ লক্ষ বাঙালী হিন্দু- যাদের মধ্যে কোচ, রাজবংশীই বেশী। ১৯ লাখের বাকি থাকে সাড়ে তিন লাখ, এদের মধ্যে বড়জোর দেড় লাখ মুসলমান। যাদের অধিকাংশকে জবরদস্তি ডিটেনশনে রেখে এসেছিলো বিজেপি সরকার, মামলা লড়ে বহু মুসলমান নাগরিক তার নাগরিকত্ব ফিরে পেয়েছে। অতএব বাকিরাও হিন্দু বা অন্যান্য উপজাতী সম্প্রদায়ের, যাদের পরিচয়পত্র নেই। CAA এর মাধ্যমে যারা নাগরিকত্ব ফিরে পায়নি। অর্থাৎ, হিন্দু খতরেমে। বিহারে রোহিঙ্গা তাড়াবার নামে SIR হলো হৈ হৈ রবে, সেখানে বাদ যাওয়া ৬৫ লাখ ভোটারের মধ্যে ২১ লাখ মৃত ও স্থায়ী পরিযায়ী। অবশিষ্ট ৪৪ লক্ষ মানুষের মধ্যে প্রায় সকলেই হিন্দু। অর্থাৎ, হিন্দু খতরেমে। পশ্চিমবঙ্গে SIR নিয়ে গরীব মানুষ কিছুটা বিভ্রান্তিতে থাকলেও, যে মুসলমানকে লক্ষ্য করে এত আয়োজন, তারাই একমাত্র নিশ্চিন্ত, প্রায় সকলেই কাগজ রেডি করে রেখেছে। কিন্ত অর্ধেকের বেশী হিন্দু সমাজ আতঙ্কিত, সেটা মতুয়া হোক বা নমঃশূদ্র। অর্থাৎ, হিন্দু খতরেমে। 

মুহাম্মদ বিন কাশিম থেকে শেষ মুঘল বাহাদুর শাহ জাফর অবধি দীর্ঘ ১০০০ বছরের মুসলমান শাসনে হিন্দুরা ‘খতরেমে’ ছিলনা, ২০০ বছরের ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনামলেও হিন্দুরা বহাল তবিয়তে ছিলো। কংগ্রেস ও অন্যান্য জোট সরকার পরিচালিত স্বাধীন গণতান্ত্রিক ভারতের প্রথম ৬৭ বছরের ইতিহাসে হিন্দুরা অসুরক্ষিত ছিলোনা, কিন্তু ২০১৪ পরবর্তী RSS এর রাজত্বে সত্যিই হিন্দু খতরেমে। মোদীর প্রধানমন্ত্রীত্বে কোটি কোটি হিন্দু ভিটেমাটি হারিয়ে পথের ভিখারি হয়ে যাবার পথে। মোদী শুরু থেকেই জানত তাদের এ্যাজেন্ডা, তাই কোনো ভনিতা না করে ‘হিন্দু খতরেমে হ্যায়’ মন্ত্রে হিন্দুকে অভ্যস্ত করে দিয়েছিলো। কিন্তু এটা বলেনি- এই খতরাটা RSS এর নির্দেশে ‘বিকাশ পুরুষই’ লাগু করবে। মুসলমানকে জব্দ করা যাবে এই আনন্দে বিভোর হয়ে হিন্দুত্ববাদী ভক্ত পাবলিক তুড়ীয় মেজাজে সপ্তমে চড়ে ছিলো, আজ দেখছে মগডালে তুলে দিয়ে হিন্দু হৃদয় সম্রাট নিজেই মই কেড়ে নিয়েছে। তাই জগন্নাথকে ‘বর্ডার তুলে দেব’র মত আজগুবি গল্প বলতে হচ্ছে, মমতাবালাকে অনশনের নাটক করতে হচ্ছে।

শুধু মুসলমানকে তাড়াবার উদ্দেশ্য হলে, বেছে বেছে মুসলমানদের SIR/NRC করলেই ল্যাঠা চুকে যেতো। সমস্ত মতুয়া, নমঃশূদ্র হিন্দুদের যদি CAA তে এ্যাপ্লিকেশন করলেই নাগরিকত্ব দিয়ে দেবে, সেক্ষেত্রে সরাসরি দিলেই তো হয়ে যেতো, তাদের SIR প্রক্রিয়াতে আনার প্রয়োজনীয়তাই ছিলোনা। এই খানেই ধাপ্পাবাজিটা লুকিয়ে। আসামে আজ ৮ বছরের কতজন হিন্দুকে CAA এর মাধ্যমে ইন্ডিয়ান নাগরিকত্ব দিয়েছে বিজেপির ডাবল ইঞ্জিন সরকার? তারা নাকি বাংলাতে SIR এর মাধ্যমে D-Voter হয়ে যাওয়া পাব্লিককে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেবে, এটা আপনি বিশ্বাস করলে আপনি একজন ফুটফুটে চুতিয়া, আপনি নিজেই ‘আত্মলিণঙ্গম পশ্চাদপূরম’ করে বসে আছে, আপনার পায়ুমর্দন অন্য কেউ করবে সেই সুযোগ কোথায়! 

আপনি ছোট জাতের হিন্দু, তাই আপনার ক্ষয়ক্ষতিতে ব্রাহ্মণ্যবাদী মনুবাদীদের কিচ্ছু যায় আসেনা। RSS ব্রাহ্মণ্যবাদী দল, একটা মুসলমানের সাথে একটা দলিত, একটা মতুয়া বা একটা নমঃশূদ্রের কোনোর পার্থক্য নেই। সবকটাই তাদের কাছে অস্পৃশ্য, অশুচি, ম্লেচ্ছ মনুষ্যেতর ইতর জীব, যাদের জন্মের একমাত্র উদ্দেশ্য ব্রাহ্মণদের সেবা করা। কিন্তু মেকি হিন্দুপ্রেমী সেজে মধু ঝরায় আপনার ভোটটা নেওয়ার জন্য। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমানাধিকারের ধারাতে এই কারনে RSS এর এতো গাত্রদাহ। এই কারনেই সংবিধান সংশোধন করতে চায়, যাতে মনুবাদকে লাগু করতে পারে।

কিংশুকের প্রশ্নে ফিরে আসি, কেন RSS এই SIR করাচ্ছে? কোথায় যাবে এত বিপুল সংখ্যার মানুষ? কী হবে এদের ভবিষ্যৎ? খুব সহজ, কোনো এক মহান অস্কার শিন্ডলার এসে এদের কর্মসংস্থান দিয়ে ঈশ্বর হয়ে যাবে। এই শিন্ডলারের এর ভারতীয় পদবী আম্বানি হতে পারে, আদানি, টাটা, বিড়লা, নারায়নমূর্তি, হক, খান, মন্ডল, ব্যানার্জি, প্যাটেল, শর্মা যা খুশি হতে পারে। শিন্ডলারেরা অতি সস্তার লেবার খুঁজে নেওয়ার মাধ্যমে অবৈধ দের পুনর্বাসন দেবে। এতদিন ভারত থেকে চাল, পাথর পেঁয়াজ, গোমাংস রপ্তানি হয়েছে অফিসিয়ালি, এরপর জ্যান্ত মানুষ রপ্তানি হবে। D-Voter মানুষ, যার দেশ নেই, যার পরিচয় নেই, যার রাষ্ট্র নেই। কিন্তু পেট আছে, বেঁচে থাকার আকাঙ্খা আছে, তাই সে যা খুশি কাজ করতে রাজি হয়ে যাবে- যে কোনো মূল্যে। দাসপ্রথা নতুন পোশাকে এসে হাাজির হবে সামনের দশকে।

কি হয় যখন কেউ D-Voter হয়ে যায়?

প্রথমত তার পরিচয় পত্র কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর সে একটা ফোনের সিম অবধি কিনতে পারবেনা। ট্রেনে ও বিমানে যাতায়াত করতে পারবেনা যেখানে পরিচয়পত্র দেখাতে হয়। যতই অত্যাচারিত হোক, আইন আদালতে যেতে পারবেনা, কারন সেখানেও পরিচয়পত্র লাগে। বাচ্চাদের ইস্কুলে ভর্তি করতে পারবেনা, বীমা পাবেনা, রেশন পাবেনা, সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা পাবেনা, কোনো কাজে গিয়ে হোটেলে থাকার ঘর পাবেনা। সরকারী বা বেসরকারি কোনো ক্ষেত্রেই চাকরি করতে পারবেনা। একমাত্র কাজ, যে এলাকাতে থাকবে সেই অতি সংক্ষিপ্ত এলাকাতে দম বন্ধ পরিস্থিতিতে গতরে খাটা কাজ, যারা নগদে মজুরী পেমেন্ট করে, সেই কাজ করতে বাধ্য হওয়া। এখানেই পুঁজিবাদ সস্তার শ্রমকে গ্রাস করতে আস্কার শিন্ডলার সেজে, ত্রাতা হয়ে দাঁড়াবে বুভুক্ষু আতঙ্কিত মানুষগুলোর সামনে। 

"Capital is dead labour, which, vampire-like, lives only by sucking living labour, and lives the more, the more labour it sucks."

এখানেই মহামতী মার্ক্স অমর হয়ে রয়ে গেছেন। আপনারা পালাবার পথ নেই। হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ কিম্বা ফয়ারবাখের বস্তুবাদী দর্শনের সমন্বয় জটিল তাত্বিক বিষয়, যা সকলের বোঝার বিষয় নয়। মার্ক্স ঈশ্বর নন, না প্রফেট না কোনো স্বঘোষিত গুরু কিম্বা পাদ্রী, উনি চিরন্তন হয়ে রয়েছেন “শ্রমশক্তি, মূল্যের শ্রম তত্ত্ব এবং শ্রমের বিভাজন” এই শ্রমের মন্ত্রের উপরে। SIR ও তার ফলাফল আবার চোখে আঙুল দিয়ে মানুষকে বাধ্য করছে মার্ক্সের প্রাথমিক পাঠে ফিরে যেতে। পুঁজিবাদী সমাজে- শ্রমের বিভাজন শ্রমিককে তার শ্রমের পণ্য এবং নিজের কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, যা শ্রমিককে শোষিত করে এবং এতে মুনাফা বৃদ্ধি পায়। SIR দ্বারা সৃষ্ট অদক্ষ ও অসংগঠিত শ্রমিকের শ্রমকে বিনামূল্যে, পেটেভাতে কিম্বা অতি স্বল্পমূল্যে কিনে নেবার জন্য এই বৃহত্তর আয়োজন। যে কোনো মূল্যে সস্তার লেবার ‘শ্রেনী’ তৈরি করা যাতে মুনাফা কামানো যায়। মার্ক্সের ‘সারপ্লাস ভ্যালু থিওরি’ অনুসারে শ্রমিকের শ্রমের একটি অংশ বিনা পারিশ্রমিকে দখল করা হয় এটাই শ্রমের 'মূল্য চুরি'। NRC-SIR এর গোপন ও মূল উদ্দেশ্য এটাই।

"The worker becomes an even poorer commodity the more wealth he produces; the more that his production increases in power and amount, the more orphaned he becomes of his own product and the more he is determined by the capitalist."

পশ্চিমা দেশগুলোতে সাধারণ মধ্যবিত্তরাও আমাদের টাকার নিরিখে মাসে ১০-২০ লাখ টাকা রোজগার করে, কিন্তু সে দেশের আইনের গেরোতে একটা গৃহ সহায়িকা, পরিচারিকা, ড্রাইভার বা মালি রাখার অউকাত থাকেনা। কারন একজনের সভ্যভদ্র ভাবে থাকা খাওয়া, বেতন ও অন্যান্য জরুরী নুন্যতম সুযোগ সুবিধা দিতে গেলে, ওই মাসিক ১০-২০ লাখও কম পরবে, অগত্যা জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবটাই নিজেকে করতে হয়। আগামীতে এই D-Voter ও তাদের সন্তানাদির দল, দলে দলে পশ্চিমা বিশ্বে শুধু পেটে খেতে পাবে এই শর্তেই যেতে রাজি হয়ে যাবে। মা ও মেয়ে একই সাথে মালিকের যৌন লালসা তৃপ্ত করবে। মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় আছে কী? 

তাদের তথাকথিত উন্নত বিশ্বের আইন? আইন তো মানুষের জন্য, দেশের নাগরিকদের জন্য, সেটা যে দেশেরই হোকনা কেন! D-Voter দের দেশ কোথায় যে তাদের উপরে শ্রম আইন লাগু হবে? বিনা মুল্যে শ্রমের অফুরান উৎস, মার্ক্স এই কারনেই পুঁজিবাদকে ঘেন্না করার সাথে সাথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নিদান দিয়ে গেছেন। 

"The philosophers have only interpreted the world, in various ways. The point, however, is to change it."

সুতরাং, এখানে কেউ ততটা হিন্দুপ্রেমী নেই, কেউ ততটা মুসলমান বিদ্বেষীও নেই, যতটা তারা পুঁজি বাদীদের দাস। RSS জন্মলগ্ন থেকে উপনিবেশিক শোষক ইংরেজ প্রভুদের হয়ে গোলামি করে এসেছে, তাদের লুন্ঠন, অত্যাচার ও বঞ্চিতদের উপরে শোষনকে সমর্থন করে এসেছে। তাদের রক্তে, তাদের জিনে রয়েছে শ্রেনীকে শোষণ করা। ২০১৪ এর পর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেতেই RSS পুঁজিবাদীদের এ্যাজেন্ডাকে বাস্তবায়িত করছে মাত্র, ধর্মের মোড়কে। আজ আদানি, আম্বানিকে দেশ বেচছে, কাল ভালো দাম পেলে পশ্চিমা হোক, চীন কিম্বা রাশিয়া, অথবা আরবী শেখ- যাকে খুশি বেচে দেবে যে বেশী দাম দেবে।

অস্কার শিন্ডলার এর গল্পে, নাৎসি বাহিনীর সমর্থক হিসেবে শিন্ডলার মেটাল, গ্লাস, সেরামিকের ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে ওঠেন। যুদ্ধের কালোবাজারি মরশুমে লাভের অঙ্ক আরও স্ফীত করবার জন্য ইহুদী ব্যবসায়ী, নাৎসি বাহিনীর উঁচু পদে থাকা অফিসারদের সাথে সম্পর্ক ভাল করে, এর ফলে ব্যবসা আরও বড় হয়ে যায়। এই ব্যবসার জন্য প্রচুর কর্মীর দরকার হয়। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ইহুদী বন্দীদের কাজে লাগানোর জন্য নাৎসি অফিসারদের সাথে আর্থিক লেনদেনের কথা শুরু হয়। এই যুদ্ধবন্দীরা জানত মৃত্যুই ছিল ভবিতব্য, তবুও নিয়তির মুচকি হাসি বেঁচে থাকবার আশা জিইয়ে রেখেছিলো। সামান্য অঙ্কের বিনিময়ে একেকজন বন্দীর জীবন রক্ষা করার নামে তালিকাভুক্ত বন্দিদের ওনার ফ্যাক্টরিতে পেটেভাতের শ্রমিক বানিয়ে দিয়েছিলো।

RSS এভাবেই ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট অধ্যয়গুলোকে জীবন্ত করছে, ভারতীয় সংস্কৃতির ধাঁচে ফেলে অনুশীলন করছে, এবং সুক্ষ প্রয়োগ করছে হিন্দুত্বের মোড়ক লাগিয়ে।

মধ্যযুগে বর্বর ইউরোপীয়েরা দেশ আবিষ্কার আর বানিজ্যের নামে এশিয়া আফ্রিকা আর লাতিন দেশ থেকে অবাধে লুন্ঠনের সাথে ‘মানুষ’ বেঁধে আনত খাঁচায় করে। সেই হতভাগাদের ইউরোপীয় শ্রমের বাজারে উচ্চমুল্যে বিক্রি করত- অতি সামান্য দৈনিক খাদ্য আর অকথ্য শারীরিক অত্যাচারের বিনিময়ে। সামান্য ২০০-৫০০ জন ইউরোপিয়ান কি আর নিজেদের শক্তি বলে সেই সব ভিনদেশি মানুষদের বন্দি বানাত? স্থানীয় অধিবাসীদের একটা অংশ, সাদা চামড়ার ইউরোপিয়ানদের দালাল হয়ে কাউকে লোভে ফেলে, কাউকে ফাঁদে ফেলে, কাউকে জবরদস্তি বন্দি বানিয়ে ইউরোপ গামী জাহাজে তুলে দিতো। SIR/NRC এর মাধ্যমে দালাল বিজেপি RSS এটাই করছে আদানি, আম্বানির হয়ে। 

তৃণমূল এই পুঁজিবাদেরই অংশ, RSS এর নানান ব্রান্ডের মধ্যে একটা মেকী গান্ধিবাদী দোকান। তারা কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে মানুষকে মূল সমস্যা থেকে বিমুখ করে দিচ্ছে। নন ইস্যুকে ইস্যু বানিয়ে আপনার যন্ত্রণার আওয়াজকে ঢেকে দিচ্ছে, কারন তাকেও দিনের শেষে পুঁজিকেই তুষ্ট করতে হবে। কোনো গান্ধীবাদ, কোনো মনুবাদ, কোনো মোদী ম্যাজিক, কোনো বড়মার ঠাকুরবাড়ি আপনাকে রক্ষা করবেনা। বুঝে হোক বা না বুঝে, মার্ক্সের স্মরণে আসা ছাড়া আপনার মুক্তি নেই। স্পিলবার্গের অস্কার শিন্ডলার কোনো ইশ্বর ছিলোনা, সে ছিলো শ্রমিকের রক্ত চুষে খাওয়া মুনাফাখোর পুঁজিবাদী শয়তান। RSS ও তাই, হিন্দুত্বের ত্রাতা মুখোশ পরে রক্তচোষা মুর্তিমান শয়তান।

সামনে ছয় মাসের মধ্যে বিধানসভা ভোট, সিদ্ধান্ত নিন- পুঁজিবাদীদের দালাল RSS এর দুই ফুলের ‘ধর্মের নামে’ মেকি লড়ায়ের মাঝে আতঙ্কে বাঁচবেন, নাকি পুরাতন পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে, মার্ক্সবাদীদের হাত শক্ত করবেন, নিজের বেঁচে থাকার স্বার্থে। অপসন একটাই, সিদ্ধান্ত আপনার। 


#হককথন

#BanRSS

বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫

সংখ্যাঘুঘু

 


মাননীয়া বামনেত্রী দীপ্সিতা ধরের গতকালের একটা ফেসবুক পোষ্টের প্রেক্ষিতে এই লেখা


শেষ ২৫ বছরে ওপার বাংলা থেকে যারা এসেছেন- তাদের কতজন রাজনৈতিক অত্যাচারের শিকার আর কতজন ধর্মীয় অত্যাচারের শিকার হয়ে এসেছে? এর কোনো প্রামান্য তথ্য রয়েছে আপনার কাছে? থাকলে সরাসরি লিখুক অমুক 'জামাতি' কিম্বা তমুক 'ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিস্ট' দলের অত্যাচারের কারনে অমুক অমুক ব্যাক্তি বা অমুক অমুক পরিবার বাংলাদেশ থেকে আপনার দাবী মত 'বাধ্য হয়ে' পালিয়ে এসেছে। কোন স্যাম্পেল সার্ভের ভিত্তিতে আপনি ৩৪৭৮৮৬৩৫৮৯৫৩ বার লিখে ফেললেন, তার কোনো তথ্য উপাত্ত রয়েছে আপনার কাছে? এখানেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের তথাকথিত অত্যাচারিত সংখ্যালঘু জনগণের ভিটে ত্যাগের ইতিহাসের পাশাপাশি ধান্দাবাজ সংখ্যাঘুঘুদের ‘বাধ্য হয়ে’ কাঁটা তার টপকাবার গল্প


আমি জানিনা আপনার পরিবার, তথা আপনার পিতৃকুল বা মাতৃকুলের কেউ ‘বাঙাল’ কিনা, তাই হলে তাঁরা কবে এদেশে এসেছিলেন আর ঠিক কার অত্যাচারে কি কি খুইয়ে এসেছিলেন! এদেশে আসার আগে সেখানকার আইন আদালতের কোথায় কোথায় গিয়ে নিজের ভিটেতে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, অবশেষে ‘বাধ্য হয়েছিলেন’- আশা করি ১ বার এই তথ্যগুলোও দেবেন পাবলিক ডোমেইনে। ৩৪৭৮৮৬৩৫৮৯৫৩ বার লাগবেনা, ১ বার দিলেই জাস্টিফাই করে নেওয়া যাবে আপনি সংখ্যালঘু ছিলেন না সংখ্যাঘুঘু


SIR শুরু হয়েছে, কেউ বলছে মুসলমান তাড়াবে, কেউ হিন্দু বিতাড়নের স্বপ্নে বিভোর। আরে বাবা ২০০২ ‘কাটঅফ’ মার্কের পর যারা অন্য দেশ থেকে এসেছে তারা কেউ হিন্দু নয়, বৌদ্ধ নয়, মুসলমান নয়, এদের পরিচয় একমাত্র অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। নিশীথ প্রামাণিক, বিজেপির হয়ে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, তাকে কোন মোল্লা দেশ থেকে তাড়িয়ে ছিল? সে তো পড়তে এসে এদেশে ঘাঁটি গেড়েছিলো, এরপর রাজনীতির কল্যাণে মন্ত্রীও হয়েছে। সে কোন CAA তে অ্যাপ্লিকেশন করে দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছিল?


আমার এলাকাতে, মানে পুর্ব বর্ধমান জেলার, কালনা মহকুমার নবদ্বীপ সংলগ্ন সমুদ্রগড়ে বর্তমান জনসংখ্যার ৯০% এর বেশী ওপার বাংলার মানুষ, যা ৯০ এর দশকের শুরুতে মোট স্থানীয় জনসংখ্যার ৩০% বা তারও কম ছিলো। শেষ পঁচিশ বছরে এরা রাষ্ট্র ভারতের বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ সুবিধা ও সুরক্ষা নিতেই এসেছে মূলত। ফ্রি রেশন, ফ্রি শিক্ষা, ফ্রি স্বাস্থ্য পরিষেবা, সস্তার পরিবহণ, অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মের নানান সুযোগ, এত বড় রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম সুযোগ সুবিধা, তুলনামূলক সস্তা জীবনযাত্রার সাথে একটা OBC বা SC সার্টিফিকেট যোগার করে নিতে পারলেই সংরক্ষিত আসনে চাকরির নিশ্চয়তা- আমার এলাকাতে এমন মানুষের সংখ্যাই বেশী। তথ্য চাইলে অন্তত ১০০টা নাম ও ঠিকানা দিয়ে দেব, যারা ১৯৯৫ সাল থেকে ২০২৪ এর মধ্যে এসেছে।

অর্ধেক বাংলাদেশী মানুষ আদম ব্যাপারিদের মাধ্যমে কামলা খটতে যায় গোটা বিশ্বজুড়ে, এরাই ভারতে এসে ভারতীয় সেজে তারা পার্মানেন্ট হওয়ার সুযোগ পায় নৃতাত্বিক মিলের কারনে, যা অন্য দেশে পায়না। এই ধান্দাবাজি করতে গিয়ে আজ আমাদের এলাকার মত, কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে কেউ মতুয়া, কেউ মায়াপুরী বৈষ্ণব, কেউ হোপবোল, কেউ নমঃশূদ্র, কেউ কামতাপুরি, কেউ জমিয়ত উলামা, কেউ অনুকুলের শিষ্য হয়ে, ধান্দাবাজির প্রয়োজন মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমি আর আমার এক বন্ধু লাদাখ যাওয়ার পথে ১৭০০০ ফুট উচ্চতায় চা বিক্রেতা এক বয়স্ক মহিলাকে দেখেছি, যিনি শেষ ২০ বছরের মধ্যে এদেশে অনুপ্রবেশ করেছে, এবং নকল কাগজ বানিয়ে এই চরম প্রতিকুল অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়েছেন। গোটা দেশ জুড়ে এমন সংখ্যা কোটি কোটি রয়েছে


১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা কত ছিলো? ৪ কোটি ২০ লাখ। ১৯৭১ সালে সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের জনসংখ্যা কত ছিলো? ৭ কোটি। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জনসংখ্যা কত ছিলো, এমন ভাবে কখনও হিসাব করেছেন? ৪৭ সালে ছিলো আড়াই কোটি জনসংখ্যা, ৭১ সালে ৪ কোটি ৪২ লাখ। ২০২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ১০ কোটির সামান্য বেশী, বাংলাদেশে সাড়ে ১৭ কোটি। ৭০ এর দশক অবধি ভারতের জনসংখ্যা গ্রোথ রেট ছিলো ২.৫% এর মত, যা নব্বই এর দশকের পর কমে ১.৯% এসে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই গ্রোথ রেট আরো কম। পুর্ব পাকিস্তানের পপুলেশন গ্রোথ রেট ছিলো ২.৪% মত, বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হওয়া ইস্তক এরা ৩.৫ এর বেশীতে পৌঁছে দিয়েছে গ্রোথ রেট। এই হিসাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হওয়া উচিৎ ছিলো ২৪.৫০ কোটি, তার বদলে ১৭ কোটি হিসাব দেয় তারা। এই সাড়ে সাত কোটি মানুষ গুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে গেছে কামলা শ্রমিক হয়ে, যারা আর স্বদেশে ফেরেনি। এদের সবচেয়ে বড় অংশটা ধর্মের দোহায় দিয়ে ‘শরনার্থী’ সেজে পিলপিল করে শেষ ২৫ বছরে আমাদের দেশে ঢুকে পরেছে, পশ্চিমবাংলা, আসাম, নর্থ ইষ্ট, সিকিম, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা সহ পশ্চিমা রাজ্যের বিভিন্ন অংশে ‘বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক’ পরিচয়ে কাজও করে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর এরাই ভুয়ো পরিচয়পত্র বানিয়ে ‘সেটেল’ হয়ে যাচ্ছে যে যেখানে পারছে।


বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার কোনো লুকানো বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার করছে, এটাই সত্য, জাত পরিচয় যা খুশি হোক। তারপরেও ১ কোটি ৩০ লাখ হিন্দু সেদেশে বসবাস করেন, সে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ গুলোতে হিন্দু শিক্ষকদের আধিক্য রয়েছে আজও। দেশের জনসংখ্যার ৭.৯৫% হিন্দু হলেও সরকারি চাকরিতে তারা প্রায় ১৪% এর আশেপাশে রয়েছে। এটা বাংলাদেশের জামাত বা মৌলবাদী গোষ্ঠীকে গ্লোরিফাই করার জন্যও নয়, না বাংলাদেশে সংখ্যালঘু অত্যাচারকে লঘু করে দেখাবার প্রয়াস। এটা আমাদের দেশের সংখ্যালঘুদের সাথে তুল্যমূল্য ফারাক দেখাবার জন্য, যারা কেবল বাংলাদেশে ‘হিন্দু’ অত্যাচারের মড়াকান্না কেঁদে 'পালিয়ে আসা'কে জাস্টিফাই করে।


বিজেপির ভাষায় ‘মমতাজ বেগমের’ সরকারের রাজ্যে দুধেল গাই ২৭%, সরকারী চাকরিতে এরা মাত্র ৫.৭৩%। গোটা দেশের জনসংখ্যার নিরিখে মুসলমান ১৪%, সরকারি চাকরিতে এখানে ৫% এরও নিচে, এগুলো সবই সরকারি ডেটা। উচ্চশিক্ষিত রাজ্য কেরালা মডেল- ৩০% মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্যে ১৩.৮% মুসলমান রাজ্য সরকারী চাকরিতে। কেন্দ্রীয় সরকারী চাকরিতে মুসলিম মালায়লী মাত্র ১.৮% । গুজরাতে আবার উলটপূরাণ, তাদের জনসংখ্যার মাত্র ৯.৯% মুসলমান, সরকারী চাকরিতে ১৬% এরও বেশী মুসলমান। উত্তরপ্রদেশে ১৯.৩০% মুসলমান, ২০১২ সালে সরকারী চাকরিতে এদের উপস্থিতি ছিলো ১২%, যোগীর কৃপায় সেটা এখন ৫% এরও নিচে। উত্তরপ্রদেশ থেকে কটা সংখ্যালঘু পড়শি দেশে পালিয়ে গেছে ‘বাধ্য হয়ে’।


আসলে পালানটা চয়েস, যেটা রক্তে থাকতে হয়, সকলে পলায়ন মনোবৃত্তি রাতারাতি জন্ম দিতে পারেনা অধিকাংশ ‘বাংলাদেশী হিন্দু’ দের মত। কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক ও আনপপুলার হলেও- গাজায় গণহত্যা হয়েছে লাগাতার আড়াই বছর ধরে, নৃশংস নারকীয় সেই অত্যাচার গোটা বিশ্ব সাক্ষী। কতজন পালিয়েছে দেশ ছেড়ে? ট্রাম্প নিজে তাদের পুনর্বাসনের প্রস্তাব দিয়েছিলো, তারা ভিটে ছাড়তে চায়নি। ভিয়েতনাম? আফগানিস্তান? কিউবা? ইয়েমেন? কারা পালিয়ে গেছে? জঙ্গলমহলের কয়েক হাজার মানুষ মাওবাদী তথা তৃণমূলের হাতে মারা গেছিল। তারা তো পূর্ব বাংলার সংখ্যাঘুঘুদের মতো পালিয়ে যায়নি। পলায়ন একটা চয়েস, একমাত্র অপসন নয়।


দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষেরা পৃথিবীর অত্যাচারিত মানুষদের তালিকায় মোটামুটি সবার উপরে, কিন্তু নিজের দেশ স্বাধীন করে সেই দেশে বসবাস করতে গিয়ে কত মানুষের জীবনহানি হয়েছে তার সংখ্যা পাওয়া মুশকিল কিন্তু কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ানরা হিটলারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছিল কেউ পালিয়ে যায়নি। রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে, আমরা যে পক্ষেরই সমর্থক হই না কেন ইউক্রেনের লোকেরা কিন্তু পালিয়ে যায়নি। ১৯৬৫-৬৬ সালের ইন্দোনেশীয় গণহত্যা হয়, এরা কেউ পালিয়ে আসেনি নিজের ঘর বাড়ি ছেড়ে। তৎকালীন যুগোস্লাভিয়া ভেঙে গিয়ে ৭ টি নূতন রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে এবং দেশ গঠনের সময় প্রত্যেক ক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ করেছে, কিন্তু কোন দেশের নাগরিক পালিয়ে যায়নি। আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে পুরু পালিয়ে যায়নি। পালিয়ে যাওয়াটা চয়েস, একমাত্র বিকল্প নয়


উন্নত জীবনযাত্রার খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় মাইগ্রেশন করাটাই সভ্যতার পরিচয়। একে ঠিক বা ভুল নামের দুটো শব্দ দিয়ে এটি ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু যারা এটাকে গ্লোরিফাই করার জন্য ‘রক্ত দিয়ে কেনা মাটি’ আর কাঁটাতারের গল্প শুনিয়ে রোমান্টিক গল্প ফাঁদে, তারাই আসলে সংখ্যাঘুঘু। রক্ত দিয়ে কেনা মাটির গল্প কোন হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে এসে লাগু হয়? ওপারে যদি রক্ত দিয়ে আপনারা ভিটে মাটি রক্ষা করতে পারতেন, তাহলে সেটা না হয় গণ্য হতো, এপারে শরণার্থী হয়ে এসে কলোনির ভিক্ষার জমিতে আপনাদের বাপ দাদারা জীবন শুরু করেছিল। তারা কোন রক্তটা ঝরিয়ে ছিলো এপারে মাটিটা পাওয়ার জন্য? ১৯৮৯ সালে প্রথম বাংলাদেশ সীমান্তের ২০ শতাংশ অংশে কাঁটাতার লাগানো হয় তৎকালীন ভারত সরকার কর্তৃক, যার অধিকাংশটাই উত্তর-পূর্ব ভারত লাগোয়া। তাহলে কাঁটাতার পেরিয়ে আসার গল্পটাই বা কিভাবে আসে আপনাদের পালিয়ে আসার রোমান্টিক গল্পে? ৯০ এর দশকে উন্নত জীবনযাত্রার খোঁজে আপনাদের পূর্বপুরুষ এদেশে এসেছিলি সংখ্যাঘুঘু হয়ে, শরণার্থীর গল্প ফেঁদে। এটাকে লুকাতে বাকি গল্পগুলো ফাঁদা


সত্যজিৎ রায়, তপন সিনহা, ঋত্বিক ঘটক, রাজেন তরফদারের মত দিকপালের কোনো সিনেমাতেও সেই অর্থে মোল্লাদের অত্যাচার দেখিয়েছে? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসুদের লেখনি সময়ের সাথে একক। এনারা কোথায় লিখেছেন খিয়েছেন যে বাংলাদেশী মোল্লাদের চরম অত্যাচারের শিকার হয়ে তাদের চরিত্রেরা এদেশে এসেছিলেন। অথচ প্রত্যেকের নাড়ি বা শিকরের টান ছিল ওপাড় বাংলার প্রতি। আসামে বাঙালী খেদাও একটা রেজিস্টার্ড আন্দোলন। সেখানে বহু বাঙালী বিতাড়িত হয়েছিলো, এমন কোন আন্দোলন হয়েছিল বাংলাদেশে শেষ ২৫-৩০ বছরে?


সংখ্যাগঘুঘু বাঙালদের সাথে ইজরায়েলী ইহুদিদের হেব্বি মিল, ইহুদীদের সমালোচনা করলেই অ্যান্টি-সেমিটিক বলে দাগিয়ে দেয়। একই ভাবে সংখ্যাঘুঘুদের সমালোচনা করলেই এ্যান্টি উদবাস্তু, এ্যান্টি বাঙাল, এমনকি এ্যান্টি হিন্দু বলেও দাগিয়ে দেয়। সমালোচনা হলেই যে ধুতি খুলে যায়


শেষ ৫ বছরে শুধু গরু সংক্রান্ত বিষয়ে, RSS কতৃক মুসলমান অত্যাচারের ঘটনাতে নানান রাজ্যে FIR ও মামলা রেজিস্টার হয়েছে ৫৩০০ এর বেশী গোটা দেশজুড়ে। বাংলাদেশে এমন কতগুলো হয়েছে শতাংশের বিচারে? ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল অব্দি হাসিনা ওয়াজেদের সরকার ছিল, যারা রীতিমতো হিন্দু সমর্থক এবং হিন্দু রক্ষাকারী হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিত। এদেশের সংখ্যালঘুরা লড়াই করছে আদালতে গিয়ে, কেউ তো দেশ ছেড়ে পালায়নি। ওপাড়ের সংখ্যাঘুঘুরা লড়াই না লড়ে পালিয়ে আসছে কেন! তারা নেপালেও যেতে পারত, কিম্বা শ্রীলঙ্কাতে! যায়নি, কারন ওখানে RSS নেই, ‘বাধ্য হয়েছে’ গল্পে রাজনীতির রুটি সেঁকা যায়না, তাই তাদের সেটেল করে দেওয়ার চক্রও নেই। ১৯৭১ এর পরে বাংলাদেশের সমস্ত খুনি-ধর্ষক-ক্রিমিনাল আর রাজাকারেরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে এই দেশে আসতে শুরু করে। বাংলাদেশের হিন্দু অত্যাচারের কাহিনীর আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে এই দেশে বসবাস করতে শুরু করে। যেকোনো ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটিতে বাংলাদেশী বলতে মুসলিমদের এককভাবে এরাই কাঠগড়াতে তুলতো, যদিও এই সকল ঘটনার পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ‘পালিয়ে আসা’ ক্রিমিনাল হিন্দুটার নিজের অত্যাচারের কু-কর্মও ছিলো, যেটাকে ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে


শেষ ২০-২৫ বছরে যারা এদেশে এসেছে, সেটা তামিল হোক, নেপালি, ভুটিয়া বা বাংলাদেশী, এদের অধিকাংশই রুটিরুজির ধান্দাবাজি আর ভারতীয় রাষ্ট্রীয় নাগরিক সুযোগ সুবিধার লোভে এসেছে। ১৯৯০ সালের পর ঠিক কত শতাংশ ‘বাংলাদেশী হিন্দু’ বাধ্য হয়ে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে? কোনো স্বীকৃত তথ্য নেই, না সরকারী না বেসরকারী, কারো কাছেই নেই। নেই, কারন এই বিষয়ে সার্ভে করলেই উলঙ্গ হয়ে যাবে, প্রতিটা রাজনৈতিক দলের মাথাতেই ওপাড় বাংলার বাঙালদের একটা বড় অংশ বসে আছে, সেটা তোলামুল, কংগ্রেস, রাম, বাম, ঘাম প্রত্যেকটি দলের এক অবস্থা। তাঁরা তথা তাদের পরিবার ঠিক কোন দিন, কোন অত্যাচারের শিকারে এদেশে পালিয়ে এসেছিলো, তাঁরা নিজেরা ছাড়া কেউ জানেনা। তাই এমন কোনো সার্ভে কখনও হয়নি, হবেওনা। শুধু ‘আমাগো একখান দ্যাশ আসিলো’ হ্যাজ নামিয়ে আবেগের বর্জ্য ছড়িয়ে নিজেদের পালিয়ে আসাকে গ্লোরিফাই আর জাস্টফাই করে দেওয়ার মরিয়া প্রয়াস চালায়


বর্তমান SIR অনুযায়ী যারা ২০০২ সাল অবধি এদেশে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ভোটারলিষ্টে নাম তুলিতে পেরেছিলো, তারা তো ভারতীয় নাগরিকই, এটাই তো পরিষ্কার কাট অফ মার্ক। এর পর যারা এসেছে তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। হিসাব সিম্পল, স্বভাবতই এ রাজ্যের ৯৯% মুসলমান দুশ্চিন্তামুক্ত। কিন্তু এটাকেই গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে যেকোনো মূল্যে অবৈধভাবে আসা সংখ্যাঘুঘু গুলোকে বৈধতার মান্যতা দেওয়া যায়। এখানেই শরনার্থী আর অনুপ্রবেশকারীর গনিত গুলিয়ে দিচ্ছে ধর্মের পাঁক দিয়ে। কেন তারা শরণার্থী- এর কোনো সন্তোষজনক জবাব নেই অধিকাংশ সংখ্যাঘুঘুর কাছে- ‘হিন্দু’ জাত পরিচয় বাদে কোনো যুক্তি নেই।


বামদলগুলো বা এরাজ্যের সিপিএম যত বেশি SIR/NRC বলেছে, শঙ্কিত হিন্দু জনসংখ্যা তত বেশি পরিত্রতা হিসেবে বিজেপিকে আঁকড়ে ধরেছে, উল্টোদিকে অশিক্ষিত মুসলমান তত বেশি তৃণমূলকে জড়িয়ে ধরেছে। SIR নিয়ে বাহ্যিকভাবে সবচেয়ে শঙ্কিত বিজেপি কারণ ভোটার তালিকা পরিচ্ছন্ন করতে গিয়ে সবচেয়ে সমস্যার মধ্যে যে অংশটি পড়তে চলেছে সেটি মতুয়া ও নমঃশূদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের একটি বড় অংশের লোক আপাতত বিজেপি ভোটার এবং বাকিরা তৃণমূল ভোটার। নিজেদের শঙ্কা ভয়ঙ্কর ভাবে লুকিয়ে রেখেছে দল তৃণমূল, কারণ কোথায় তারা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নিজেরা ক্যালকুলেশন করতে পারছে না। চুরির ভোট শুকিয়ে গেলে কোথায় কোন ঘটি উল্টে যাবে তার হিসেব আইপ্যাক পর্যন্ত দিতে পারছে না। ফলশ্রুতিতে আগামী দিনে কাকে গাছে বাঁধা হবে আর কাকে লাইট পোষ্টে- তৃণমূল কোনো কিছুর হিসাব করতে পারছে না


SIR জুজুতে বিজেপি কোনভাবেই মুসলমানকে ভয় দেখাতে পারেনি উল্টে তাদের মতুয়া ভোট ভেঙে চুরমার। নমঃশূদ্র ভোটের অধিকাংশই তৃণমূলের দখলে ছিলো কিন্তু পশ্চিম বর্ধমান, দুই চব্বিশ পরগণা, নদীয়ার যা চালচিত্র উঠে এসেছে তাতে তৃণমূলের নমঃশূদ্র ভোট, মতুয়াদের থেকেও বেশি বিপদে পড়ে গেছে, কারণ মতুয়াদের নিয়ে তবুও তো চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছে; নমঃশুদ্র দের জন্য আলাদাভাবে বলার মত কেউ নেই। তৃণমূল চারপাশে শুধুমাত্র লাশ খুঁজে বেড়াচ্ছে, মুসলমানের বিজেপি ভয় কেটে গেলে আর নিজেদের নমঃশূদ্র ভোট হাতছাড়া হয়ে গেলে- ভাইপো সমেত গোটা দলের অধিকাংশ নেতা যে জেলে বসে চাক্কি পিসিং পিসিং, সেটা না বোঝার মত বোকা ওরা নয়। কিন্তু উভয় দলের ভয় স্পঞ্জের মতো শুষে নেওয়ার জন্য মাঠে নেমে পড়েছে একা কুম্ভ সিপিআইএম। গতকাল আনন্দ টিভিতে সুজন বাবুও, প্রদীপ করের মৃত্যুকে NRC এর সাথে জুড়ে দিয়েছেন। বাকীটা নিজেরা চেয়ে দেখুন, জবাব পেয়ে যাবেন। এর বেশী বললে ভক্ত বাম্বাচ্চার দল কামড়ে দিতে আসবে। এমন ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ টাইপের NGO ভলেন্টিয়ার সার্ভিস মার্কা বিরোধী সিপিএম থাকলে, চোর তৃনমূল আগামী ১০০ বছর ক্ষমতায় থাকবে, এটা আপনি পাথরের দেওয়ালে খোদাই করে নিন


যাই হোক, মাননীয় নেত্রী সমীপেষু, আপনিই পেহেলগাম জঙ্গি হামলার সময় 'ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ' শব্দ লিখেছিলেন, যেটা RSS থেকে অমিত শাহ, মোদী এমনকি আপনার দল অবধিও বলেনি, আপনি বলেছিলেন। আজও আপনি 'বাধ্য হয়েছে' নামে একটা তত্ত্ব এনেছেন, কটা স্থানে রিসার্চ করে এনেছেন এই তথ্য? বাংলাদেশী অধুষ্যিত কটা স্যাম্পেল গ্রামে গঞ্জে কতগুলো দিন/রাত কাটিয়েছেন সত্য উদঘাটনে? কতজন স্যাম্পেল ব্যাক্তি ও পরিবারের তথ্য রয়েছে এমন 'বাধ্য হয়েছে' দের? নাকি একটু ধর্মগন্ধী ফ্লেভার ছড়িয়ে দিয়ে বঙ্গ রাজনীতিতে 'বুদ্ধিজীবি বাম' কোটাতে নিয়মিত ভেসে থাকতে চাইছেন? পাশাপাশি ‘গুড বামপন্থী’ হিসাবে গোয়ালঘরের অভিষ্ট স্থানে বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। আপনার এই প্রবনতা নতুন কিছু নয়, ধর্ম আর জিরাফে থাকার এটা চমৎকার ‘ধান্দাবাজি’ অনেক পুরাতন খেলা, অতীতে অনেকেই খেলে সফল হয়েছেন। আপনাদের মূল সমস্যা হলো, নিজেদের বিশাল শিক্ষিত আর জ্ঞানী ভাবেন। আপনার ভাষাতে 'এর সাথে সিপিএমের শূন্য হওয়ার সম্পর্ক নেই' নয়, এটাই শূন্য হওয়ার মূল কারন


SIR কে সামনে রেখে যে বা যারা ‘পালিয়ে যাওয়া’ কে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে, তারা আসলে সুপ্ত RSS
লিবোরাল, ধর্মনিরেপেক্ষ এবং মুসলমান বিদ্বেষ RSS এর জিনে আছে; এই সুপ্ত বিদ্বেষ এতদিন যারা মনেপ্রাণে লালিত পালিত করছিল, আজকে SIR কে সামনে রেখে বমি করে ফেলেছে। এদের মনের বড় বড় পদ্ম দ্রুত বিকশিত হোক। যাদের সাদাকালো চেনার ক্ষমতা নেই, যাদের দিন রাতের পার্থক্য করার ক্ষমতা নেই যাদের ভালো-মন্দ বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা নেই, তারা পৃথিবীর যে দেশেই যে শিবিরেই থাকুক না কেন আদপে তারা সবাই ভক্ত


পৃথিবীতে কোথাও বামপন্থীদের পালিয়ে আসার ইতিহাস নেই। পালিয়ে আসার ইতিহাস একমাত্র RSS এর আছে। মুচলেকা দেওয়ার ইতিহাস একমাত্র RSS এর আছে। এই কারনেই সংখ্যাঘুঘু গুলো সব বিজেপির ভোটার। পাশের রাজ্য বিহারে ভোট চলছে। যেখানে ভূমি আন্দোলন এর বিরোধিতা এবং উচ্চবর্ণের লোকেদের দ্বারা গণহত্যা সমার্থক শব্দ। রণবীর সেনা এবং অন্যান্য মৌলবাদী মিলিশিয়া গোষ্ঠী গুলি নিম্নবর্গীয়দের উপর অসংখ্য গণহত্যা চালিয়েছে। যেমন, বেনিগ্রাম গণহত্যা, লক্ষ্মীপুর গণহত্যা, এবং রাউলি গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। এই ঘটনাগুলোতে শত শত নিরপরাধ দলিতকে হত্যা করা হয়েছিল। বিহারে মাটি কামড়ে আজকেও বামপন্থীরা একজোট হয়ে এ নির্বাচনে লড়াই করছে। তাই পালিয়ে আসতে ‘বাধ্য হয়েছে’ বলে পালিয়ে আসাকে জাষ্টিফাই করাটা আপনারা- পলায়নকারী হিসেবে কার উত্তরসূরী?


চালাক বা বুদ্ধিমান হওয়া খুব ভালো, কিন্তু সেয়ানা সাজা আসলে একধরণের ভন্ডামি ও মূর্খতার পরিচয়। কাদের উদ্দেশ্য সাধন করতে আপনি এমন উদ্দেশ্যমূলক পোষ্ট করেন তা আজকে সবটা পরিষ্কার না হলেও, বালিশকুমারের মত অবশ্যই ধরা খেয়ে যাবেন। এই মুহুর্তে আপনাকে জবাব দিতে হবেনা, জনগণ আপনাদের গুন্তিতে ধরেনা, আলিমুদ্দিনে আপনি প্রিভিলেজড- জবাবদিহির বালাই সেখানেও নেই। এছাড়া বামেদের যে ‘অন্ধভক্ত শ্রেনী’ আকাট মূর্খর দল রয়েছে, তারাই আপনাকে ডিফেন্ড করবে জান লড়িয়ে দিয়ে, আপনার এই মুহুর্তে ভয়ের কিছু নেই। সেই দিনটার প্রতীক্ষাই রইলাম, যেদিন আপনিও ‘বাধ্য হবেন’ রাজনৈতিক মাইগ্রেশন করতে। ফেসবুকের পোষ্টে গল্পটা আমিই শেয়ার করব বেঁচে থাকলে।


আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, কেন আমি টার্গেট হলাম! আপনি নিজেকে 'বাম' নেত্রী বলেই তাই এই হ্যাজ নামানো, নতুবা শুভেন্দু অধিকারী বা দিলীপ ঘোষেরা নিয়মিত তাদের ভাষণে বলে- বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। সুযোগ বুঝে তাদের ভাষা গুলো নিয়মিত আপনার মুখেও উঠে আসে, তাই আজকের পোষ্টটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এতদিন মনের মধ্যে যেটা গজ গজ করছিল, অনুকুল পরিস্থিতি পেতেই উগড়ে দিয়েছেন। পাঁহেলগাঁও ঘটনায় আপনার ‘ভাবনার’ ঝলক ইতিমধ্যেই দেশবাসি দেখে ফেলেছে। আপনারা আগামীর বাম রাজনীতিতে টিকে থাকলে, RSS এর তৃণমূল বা বিজেপিকে আলাদা করে আর দরকার লাগবে কেন! আপনার ৩৪৭৮৮৬৩৫৮৯৫৩ বার লিখে ফেলা কারনের সাথে আরো ৬০ গুন যোগ হয়ে যাবে আগামীতে, সাভারকর ওটাই পেনশন পেতেন যে। ঠিকাচে!

মনের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট জাতের প্রতি বিতৃষ্ণা রেখে রঞ্জন গগৈ হওয়া যায়, চন্দ্রচূড় হওয়া যায, তসলিমা নাসরিন হওয়া যায, সুব্রামনিয়াম স্বামী বা প্রবীণ তোবাড়িয়া অথবা তথাগত রায় হওয়া যায়। জয় গোস্বামী, শুভাপ্রসন্ন, কবীর সুমন বা অপর্ণা সেনও হওয়া যায়, এমনকি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা তিলোত্তমা মজুমদার, এমনকি গৌতম গম্ভীর পর্যন্ত হওয়া যায়; কিন্তু বামপন্থী হওয়া যায় কি? যদি না একটা মুখোশ পরে থাকে!


আপনার মনের পদ্মফুল বিকশিত হোক


বুধবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৫

দেশবন্ধু

দেশবন্ধু 

সকালের বদলে আজ বাজারে বের হতে বেলা ৯টা বেজে গিয়েছিলো। আমাদের এলাকাতে শীত না পরলেও, AC আপাতত লম্বা ছুটিতে গেছে, আজই ভোরে ফ্যানও বন্ধ করে দিয়ে হয়েছিল উত্তুরে হাওয়ার শিরশিরানির দাপটে। বাজারে নতুন মরসুমি সব্জির সাথে কাঁচা তেঁতুল, চালতা এমনকি কাঁচা আমও রয়েছে। সাথে আমলকি, জলপাই, পেঁয়াজকলি, সার হীন দিশি মুলো, দিশি পালং ও শিমের ভালো আমদানি রয়েছে। দীঘার ইলিশ ১৪০০, গঙ্গার তাজা চিংড়ি- সেও ৭০০ টাকা কেজি। পাবদা, ভোলা, ভেটকি, পার্শে, দিশি পোনা, পাঙাস, রূপচাঁদা, লোটে, সিলভারকার্প, পমফ্রেট সহ চালানি ও সামুদ্রিক মাছের বহরে সারা বাজার থইথই কছে।

কিছু বারোভেজালি ছোট মাছ নিতেই হয় মায়ের বাটি চচ্চরি জন্য, বাবার জন্য বরাদ্দ তাজা দিশি পোনা, ওনার আবার না ভেজে কাঁচা মাছের ঝোল প্রিয়। আমার জন্য বাটা, রিটা, আর পাবদা মাস্ট। শশা, কাঁকুড়, কাঁঠালি কলা, ডাঁসা পেয়ারা সহ প্যাকেটের দুধ, দই, লেড়ো বিস্কুট ইত্যাদি নিয়ে, হাড়কাটা গলির সামনে ওই ভিড়ে টোটোর জন্য প্রতীক্ষা করছি। ভারি ৩টে ব্যাগ নিয়ে রাস্তা পার হওয়াই মুশকিল, জ্যোতি আর চন্দ্রমূখী মিলিয়ে আলুই ৭ কেজি। একটা টোটো এসে দাঁড়ালো, বিবিরহাট বলাতে সে সটান না বলে, সামনে ২০ মিটার মত এগিয়ে গিয়েও আমাকে নাম ধরে ও হাতের ইশারাতে ডাকতে লাগল।

আসলে আমি যেদিকে যাব, সেই রাস্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, চলতি টোটোকে ইউটার্ণ নিয়ে ঘুরে যেতে হবে। বাইক নিয়ে আসিনা, ভিড়ে পার্কিং করা মহাঝক্কি। ৭-৮ দিনের সব্জি আর আনাজপাতির ব্যাগ লটবহর আড়েবহরে কম হয়না মোটেও, সাধারণনত টোটোতে ২টো সিটের ভাড়াই আমি গুনি। সেই টোটোওয়ালা নিজেই এসে দু’হাতে দুটো ব্যাগ তুলে নিলো, আমি একটা ব্যাগ নিয়ে তার পিছুপিছু গিয়ে গাড়িতে চড়ে বললাম, একজন প্যেসেঞ্জার ইতিমধ্যেই রয়েছে। বললাম, চলো আরো ১০টাকা বেশী নিও না’হয়। টোটো চালক অদ্ভুত হাসি হাসি মুখ করে বললো- তুমি তন্ময়ই তো, আমাকে চিনতে পারোনি! আমি সেই দেশবন্ধু।

এমনিতেই মাথায় হাাজার ফিৎনা, এই মাসেই ৩টে মামলার ডেট আছে, যে কারনে পাহাড়ে উঠতে পারিনি। ফেসবুক ইউটিউবে এ্যাড ক্যাম্পেইন চলছে ট্রাভেল এজেন্সির, ফোনগুলো ভয়েস কল আর মেসেজে গিজগিজ করছে। বাবা তার মেয়ের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ২ দিন হাবজিগুবজি গিলে সমানে হেগে যাচ্ছে, উনাকে আনতে মা বোনের বাড়ি যাবে আমার জন্য রান্না করে দিয়ে, তাই বাজার সহ ঘরে ফেরার তাড়া রয়েছে। সেই সব কিছুর বর্মকে ভেদ করেও দেশবন্ধু নামটা যেন বুলেটের মত সজোরে ব্রহ্মতালুতে গিয়ে আঘাত করল। এক লহমাতে এই দু’কুড়ির জীবনের সেই সুদূর বিদিশা কালের অতীতের ধুলোয় ঢাকা স্মৃতির পাতায় কেউ যেন সজোরে ধাক্কা মারলো।

মুহুর্তে ধুলোর আস্তরণ সরে যেতে দেখলাম, স্মৃতির দলেরা নিবিষ্ট বুদ্ধের মত মহানির্বানের পথে পাড়ি দেওয়ার জন্য যেখানে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদনে নাম লিখিয়ে অনন্ত প্রতীক্ষারত। হঠাৎ একটা শব্দের আঘাত, ধুসর কোষেদের দুনিয়াতে সে এক লণ্ডভণ্ড কান্ড বাঁধিয়ে হুলুস্থুল বসিয়েছে। সেই বিশৃঙ্খলার ফাঁকে, কোনো এক ‘টিপলার সিলিন্ডার’ বা ‘ওয়ার্মহোলের’ পথ বেয়ে এক লহমাতে ১৯৯১ সালে, ক্লাস ফাইভের প্রথম দিনে পৌঁছে গেলাম।  

গত সাড়ে ৩ দশক সময়ে আমাদের সমুদ্রগড়ের প্রায় সবকিছুই বদলে গেছে, বসাকদের কাপড়ের ব্যবসার উত্থানে স্থানীয় অর্থনীতির জোয়ারের সাক্ষী হওয়া থেকে, আজকে সেই বসাক পরিবারের পুরুষদের পরিযায়ী হতে দেখছি, এর মাঝে গোটা এলাকার ভূগোল ও রসায়ন বদলে গেছে। বদলায়নি শুধু ইতিহাস, তাই আজকেও প্রায় ৩৪ বছর পর, এক মাথা টাকওয়ালা, জালার মত ভুঁড়ি সহ, একমুখ দাড়িগোঁফের জঙ্গল থাকা সত্বেও কেউ, সেই প্রস্তর যুগের ছবির সাথে মিলিয়ে আজকের আমাকে চিনতে পারে। বলল, সে নাকি আমার হাসিমুখ দেখে চিনেছে, কে জানে হাসির মানচিত্র হয়ত বদলায়না। আমি অবশ্য তাকে চিনিনি, শুধু দেশবন্ধু শব্দটা আমাকে ঝাঁকিয়ে দিয়েছে।

দ্রুত গাড়িতে বসতেই সে আমাকে একটা বিড়ি অফার করল, আমি চেইন স্মোকার হলেও বিড়ি খাইনা, তাও ভদ্রতার খাতিরে নিলাম। খেয়াল করলাম সে আমাকে বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার বদলে উল্টোদিকে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষটা মিশকালো রঙের, তারও একমুখ দাড়ি, স্বাস্থ্য বেশ ভালো, কিন্তু খুব সাধারণ চেহারা, যেখানে আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই হাজার মানুষের ভিড়ে স্বতন্ত্র হওয়ার জন্য। নিজেই বললো- আমাকে চিনতে পারোনি তো! কী করেই বা চিনবে বলো, কম দিন কী হলো! আমি দাস, সেই হাই ইস্কুলে তোমার দেশবন্ধু। সব কেমন যেন দ্রুত মনে পড়ে যেতে লাগলো। এটুকু মনে আছে হাই ইস্কুলে আমার প্রথম ও ঘনিষ্ট বন্ধুটির পদবী ছিলো দাস, কিন্তু তার সাথে বন্ধু যোগ করাতে- দাস থেকে কীভাবে যেন দেশবন্ধু হয়ে গিয়েছিলো।

একদম ছোট বেলাকার বন্ধুগুলোর প্রতি আমাদের বাপ মায়েদেরও বিশেষ লক্ষ্য থাকে, সন্তান কার সাথে মিশছে এ বিষয়ে কড়া নজর থাকে। মন্বন্তরের অপুষ্টিতে ভোরা রিকেটগ্রস্থদের মত সে কালে আমার গড়ন ছিলো। একমাথা শজারুর কাঁটার মত ঝুপসি চুলের নিচে, একটা লিকলিকে হাত’পা ওয়ালা মিশকালো কঙ্কালসার শরীর, সাথে হাড় জ্বালানো তিলে খচ্চর একটা জীব। তারপরেও যেদিন প্রথম হাই ইস্কুলে গিয়েছিলাম মায়ের হাত ধরে, অত বড় ইস্কুলে শত শত ছেলেপিলের ভিড়ে নিজেকে ভয়ানক একা লেগেছিলো। ইয়া বড় দালান বাড়ির ঘরটিতে চুপচাপ এককোনের একটা কাঠের বেঞ্চিতে গিয়ে জবুথবু হয়ে বসেছিলাম, একটা এ্যালুমিনিয়ামের ‘নাম খোদাই’ করা বাক্স নিয়ে। আমারই পাশে আমার থেকেও জবুথবু আরেকজন বসেছিলো হাবাগোবা মুখশ্রী করে। আমার হাই ইস্কুল বেলার প্রথম সাথী, সেই দেশবন্ধু। এর সাথে মেশার জন্য মায়ের তরফে ‘ছাড়পত্র’ ছিলো।

আমরা একসাথেই বাড়ি ফিরতাম, আমাদের বাড়ি টপকে ওদের বাড়ি যেতে হতো, গৌরাঙ্গ পাড়ার ভিতরের দিকে কোথাও একটা ছিলো। আমার নিজের টিফিন নিয়ে যাওয়ার বালাই কোনোকালেই ছিলনা, কিন্তু দেশবন্ধু রোজই কিছু না কিছু আনত ঘর থেকে। মার্বেলের সাইজের তিলের নাড়ু, চালভাজা আর চিনি, ঘরের ঘি মাখানো চিঁড়ে ভাজা, গোলগোল বাদাম চাপ, মুড়কির মোয়া, চালের আটা গুড় আর পাকা কলা দিয়ে মাখা একধরণের দধিকর্মা জাতীয় খাবার, ইত্যাদি গুলোর কথা স্পষ্ট মনে রয়েছে আজও। আমাদের মুসলিম বাড়িতে এই ধরণের অনেক খাদ্যসম্ভার থাকেনা সাধারনত। ফেরার পথে একসাথে গাছে চড়ে কামরাঙ্গা, আঁশফল, কুল আর কদবেল পাড়া, বর্ষার দিনে ঢাউস কচুপাতার নিচে বাক্স বাঁচিয়ে, ভেজা কাক হয়ে কাদা রাস্তায় খেলতে খেলতে ফেরা- স্মৃতিতে আজও অমলিন, শুধু সাথীটার নাম হারিয়ে ফেলেছিলাম।

ইস্কুল বেলার কতশত গল্প দেখলাম তার স্মৃতিতে অবিকল রয়েছে, যার প্রতিটা আমারও জীবনের ঘটনা। ততক্ষণে তুমি বলার সামাজিক দায় ঝেড়ে ফেলে আরো আপন করে তুই সম্বোধনে নেমে এসেছে। বই দেখে পড়ার মত মুখস্ত বলে যেতে লাগল, পাশের জনও দেখলাম সমান সঙ্গত দিচ্ছিলো। উল্টোদিকে চলছি, কিন্তু সে বিষয়ে যেন আমার হুঁশই নেই। পারুলডাঙ্গা ইস্কুলটা পার করে একটা মিষ্টির দোকানে দাঁড়িয়ে পেটাই পরোটা আর দই খাওয়ালো, আমি পয়সা দিতে যাওয়াতে বিচ্ছিরি ধরণের রাগও দেখালো। আবার সামনের দিকে এগোতে থাকল নানান গল্প করতে করতে। গোয়ালপাড়ার আখের পাইকারি বাজারটাকে পাশে রেখে, ঢালাই রাস্তা ধরে ভিতর পানে এগোতে এগোতে শুধালাম- এখানে কোনও প্যাসেঞ্জার আছে নাকি রে! সে জবাব দিলোনা।

জানলাম তার তিনটে মেয়ে, তারপর ১টা ছেলে। খুব ভোরে উঠে একদফা কাপড়ের ডেলিভারি দিয়ে আসে নবদ্বীপে, তারপর ঘরে ফিরে মেয়েদের সাথে হাতেহাতে একটু রান্নাবান্না করে আবার টোটো নিয়ে বেরিয়ে পরে। ছেলেমেয়েরা নিজেরাই খেয়েদেয়ে ইস্কুলে, কলেজে চলে যায়। শুধালাম, বউ কী চাকরি করে! কেমন একটা বেদনা মাখা মুখে একটা কাঁচা খিস্তি সহযোগে বললো- আরে ফোন, ওই ফোনে একজনার পিরিতে মজে সে শালী পালিয়েছে, সুরাত না বোম্বতে থাকে এখন। তার মুখের সেই বেদনামাখা অভিব্যাক্তিতে স্ত্রী হারানোর যন্ত্রণা নাকি সিঙ্গেল ফাদারের জীবন সংগ্রাম ফুটে উঠেছে- ঠাহর করতে পারলামনা। সে বলে চললো- বড় মেয়েটা ১৯শে পরেছে, কলেজ যায়, বড় লক্ষী মেয়ে আমার। কিন্তু কপালটা দেখ, মা অন্য মানুষের সাথে পালিয়েছে, কোন ভালো ঘরের ছেলে ওদের বিয়ে করবে বলল তো ভাই!

তার আক্ষেপ ঝরতেই লাগল- প্রেম করেই বিয়ে করেছিলাম খুব ছোট বয়েসে। ইস্কুল ছাড়ার পর তাঁতের কাজে লেগে যাই, একটু বড় হতে বাইরে বাইরে কাপড় বেচতে যেতাম, বেশ দু’পয়সা কামিয়ে ছিলাম। যে দোকানটাতে টিফিন করলি, সেটাও কিনেছিলাম, করোনার পর বেচে দিয়েছি। শালীটাও ওই সময় ভেগে গেলো, সে সময় নেশা করতাম ভাই সর্বক্ষণ, তাই ধারদেনায় ডুবে গিয়েছিলাম। মেয়েগুলো বড় হচ্ছে, বে’থা দিতে হবে- আবার ভালো হয়ে গেছি। তুই কী করছিস ভাই! কোথায় থাকিস! আমি আমতা আমতা করে জবাব দিলাম। টোটোটা গোয়ালপাড়া গ্রামের অনতি ভিতরে একটা টিনের বাড়ি দেখিয়ে বলল, সেটাই তার মেয়েদের মামার ঘর। আমার গলায় যেন একটা অব্যক্ত আবেগ দলা পাকিয়ে কণ্ঠরোধ করে ধরলো, আওয়াজ বের হচ্ছিলো না। 

আমার সুবিধা হলো আমি দিনের বেলায় রাস্তায় বের হলে সানগ্লাস পরি, কিন্ত সে দামী ফ্রেমের রে-ব্যান চোখ ঢেকে রাখলেও আবেগকে কীভাবে ধামাচাপা দেবে!  আজ ৫ বছর হলো, বিবাহিত স্ত্রী মানুষ একটা পরপুরুষের সাথে পালিয়েছে, তাও কতটা ভালবাসা বেঁচে থাকলে সেই কবে কার বাল্যকালের বন্ধুকে গল্পের ছলে এককালের প্রেমিকার বাড়ি দেখাতে নিয়ে আসে! তার বলার ধরনে মনে হলো সবটা যেন আমার সাথেই ঘটেছে। ক্লাস সেভেনের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার পর দেশবন্ধু আর স্কুলে আসেনি, শুনেছিলাম তার মা কিম্বা বাবা গত হয়েছিলো, তাই ইস্কুলে আসার বিলাসিতা ফুরিয়ে ছিলো। অথচ আমার শৈশব কৈশোর সবই ‘পিকচার পারফেক্ট’ ভাবে কেটেছিলো, যেমনটা গ্রামীণ মধ্যবিত্তের ছেলেপুলের কাটে। আনন্দে না হলেও, কষ্টের জাইগাতে আমরা সবাই কী সহজে মিশে যেতে পারি।

আসলেই এটা একটা শ্রমজীবী আম মানুষের জীবনের উপন্যাস, যার উপসংহার টানা হয়নি। কিসের বিজেপি, কিসের তৃনমূল আর কিসের সিপিএম, কে হিন্দু, কেই বা মুসলমান। কিসের হানাহানি, কিসের পরকীয়া, রোজ লড়াই এর ময়দানে প্রতিটা মুহুর্তে সময় বদলে যাচ্ছে, বহু কিছুই আমাদের ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা ভুঁই-এ লুটিয়ে থাকছি। কিসের লোভ, কিসের মোহ মায়া, কার পিছনেই বা ছোটা, ৩৫টা বছর পাড় হয়ে গেছে, অথচ মনে হচ্ছে এই তো সেদিন। এভাবেই একদিন সত্তরে পৌঁছে যাব বেঁচে থাকলে। সেদিনও পিছন ফিরে তাকালে অর্থ সম্পদ কিছুই নজরে আসবেনা, শুধু রোজগার করা সম্পর্ক গুলোকে মনে থাকবে। যাদের কেউ রয়ে গেছে, কেউ ছেড়ে গেছে, কেউ হারিয়ে গেছে।

ফেরার পথে ইচ্ছা গেলো ওর মেয়ে গুলোকে দেখে আসি, ওদিকে ফোনে মায়ের সমানে তাড়া, ঘড়িতে বেলা ১১টা ছুইঁছুঁই। এ যাত্রায় আর দেশবন্ধুর ঘরে যাওয়া হলোনা, সে আমাদের গাড়ি বারান্দা অবধি ব্যাগ গুলো পৌঁছে দিয়ে বললো- যাস ভাই আমাদের বাড়ি। আমিও তাকে স্বপরিবারে পাহাড়ে ঘুরতে যাবার নিমন্ত্রণ জানালাম। যেতে যেতে একসাথে আরো একটা বিড়ি টানতে টানতে বললাম, আরেকটা বিয়েই না হয় কর, তোকে দেখবে কে বুড়ো বয়সে! খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থেকে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন ভরা চোখে চেয়ে বলল, আমি ওকে তাড়িয়েছি নাকি! আমি ডিভোর্সও দিইনি। সে নেশায় গেছে, নেশা কেটে গেলে ঠিক ফিরবে রে ভাই।

কী সাবলীল ভাবে কথাগুলো বলে দিলো। ভালবাসা প্রকাশের জন্য লক্ষ টাকার হিরের আঙটি লাগে! নাকি বুকে আই লাভ ইউ এর উল্কি আঁকতে হয়! আমরা কত সহজে একটা সম্পর্ককে ঠুনকো তুচ্ছ বিষয়ে ভেঙে দিই, সামান্য রিপালসান টুকুও হয়না পরবর্তীতে। হতেই পারে দেশবন্ধু মাতাল ছিলো, চন্ডাল রাগী ছিলো, কোনো অবৈধ পরকিয়ায় জড়িয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু সংসার ছেড়ে পালায়নি, দায়িত্ব এড়ায়নি। তার স্ত্রী’টি সবকিছুই দেখেছিলো, শুধু এই আদিম নাছোড় ভালবাসাটা খুঁজে পায়নি, যেটা আগলে কতশত দেশবন্ধুরা বেঁচে আছে প্রতীক্ষাতে। হ্যান্ডসেক করি না কোলাকুলি, বুঝে উঠতে না পেরে শেষেরটাই করলাম, সে এটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলোনা, তাই গদগদ হয়ে গেলো।

বড় আশ্চর্য এই মানবজীবন। একজন সংসারের সব কিছুকে মিথ্যা করে স্বামী সংসার সব কিছু ত্যাগ করে নিজের ‘ভালবাসার’ টানে দেশান্তরী হয়েছে। অন্যজন সেই তারই প্রতীক্ষাতে সংসার সাজিয়ে বসে আছে, স্মৃতি আঁকড়ে। তার জীবন সেই বিয়ের দিন, সন্তানের জন্ম, তাদের বেড়ে ওঠার দিনের ‘স্বামী-স্ত্রী’র মিষ্টি খুনসুটির ঘোরেই আচ্ছন্ন। আমাদের ছেলেবেলা, আমাদের সম্পর্ক গুলো এভাবেই এলাকার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে, একটু খুঁজলেই তাদের দেখা মেলে। চারিদিকে এতো সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক পারিবারিক হানাহানি, এর মাঝে এমন মিথ্যা প্রেমের গল্প, ফাঁপা হয়ে যাওয়া সংসারের স্বপ্ন, এমন শৈশবের গল্প গুলো বড় দুর্লভ।

লজ্জার কথা হলো, আমি দেশবন্ধুর নামটা ভুলে গেছি, সাথে থাকা ছেলেটিও আমাদেরই সহপাঠী ছিলো, তার যাত্রা ১ বছরই ছিলো, তারপর তাকেও কর্মক্ষেত্রে ঢুকে যেতে হয়েছিলো পেটের দায়ে, সত্যি বলতে তাকে আমি এই লেখা অবধিও মনে করতে পারিনি। শরমের মাথা খেয়ে নাম জিজ্ঞাসা করার সাহসও জোটাতে পারিনি, কী দরকার এমন একটা সুন্দর সম্মীলনীর তাল কেটে দেওয়ার! দেশবন্ধু, ওই নামেই থেকে যাক বাকি জীবনটা। সেক্সপিয়ার তো বলেই গেছেন, "What's in a name?   

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...