শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

সেলিম হুমায়ূন বৈঠকঃ অপারেশন কাটমানি

 


অপারেশন কাটমানি।

 

অপারেশন বর্গা যেমন হয়েছিল, তেমনই ‘অপারেশন কাটমানি’ করতে হবে সেলিম সাহেব। “লুঠের টাকা কেড়ে নিয়ে এসে, বিলিয়ে দেওয়া হবে মুটে মজদুর চাষীদের মাঝে”- এটা স্পষ্ট করে বলুন, রোজ বলুন, বারেবারে বলুন, দলের সবাইকে দিয়ে বলান। আর এগুলো করতে গেলে ঝান্ডা ধরার ডান্ডা দিয়ে তোলামুলের লুঠেরা বাহিনীকে পালটা ক্যালানি দিতে হবে, নতুবা লুঠের মাল উদ্ধার হবে না। এই ক্যালান দিতে গিয়ে যার সাহায্য লাগবে, অর্থাৎ যারা তোলামুলকে কেলিয়ে লাট বানিয়ে দেবে তাদের সাথে যদি কিছু রফা করতে হয়, ১০০ বার করুন, হাজার বার করুন। রাজনীতি যুদ্ধের ময়দান, বাবু বিবিদের পোঁদ নাচিয়ে রিল বানানো নয়।

হুমায়ূন পচা সন্দেহ নেই। পাশাপাশি একটা এমন ভোটার দেখান যে গত ৩টে নির্বাচনে হুমায়ুনের ‘আদর্শে দীক্ষিত হয়ে’ ভোট দিয়েছিল। হুমায়ুনের সাপোর্ট করার প্রশ্নই নেই, কিন্তু তীব্র সাম্প্রদায়িক যে খুনে বক্তৃতা হুমায়ূন দিয়েছিল, সেটা সালারের যোগীর ভাষণের একটা পালটা এফেক্ট ছিল। আজ যারা হুমায়ুনের বিরুদ্ধে লিখছে, সেই চটিচাঁটা মিডিয়া ও ভাতাজীবী সারমেয়কুল এর আগে হুমায়ুনের জাত নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, যখন সে তোলামুল আর বিজেপিতে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করছিল।

হুমায়ূন বা নৌশাদের সাথে রয়েছে তারা, তারা কারা? এরাই তো ২০০৬ সালে সিপিএমের ভোটার ছিল, ২০১৬ সালে তোলামুলের ভোটার, ২০২৬ শে হুমায়ূন বা নৌসাদের কুলে ভিড়েছে। ফেসবুকের সোফা বিপ্লবীরা জোরে পাদতে গেলে হেগে ফেলে, তারা সামান্য বুথ এজেন্ট হবার নাম শুনলে মুতে ফেলে, এরা পাল্টা ক্যালানি দিতে পারবে তোলামুলের লুটেরা বাহিনীকে? দল সিপিএম সেই ক্যালানি দেওয়ার লোকটা কোথা থেকে পাবে রাতারাতি? আর ক্যালানি না দিতে পারলে ব্যান্ডেজ বাঁধা কালসিটের ছবি দিয়ে সহানুভূতি ভিক্ষা করা আর শূন্যের মহিমা কীর্তনই করতে হবে আগামী ১ দশক।

বিজেপি যাদের প্রার্থী করেছে, তৃণমূল তাদের মন্ত্রী করেছে- এমন ডজন খানেক উদাহরণ রয়েছে। অথচ, সিপিএম শুধু একটু কথা বলেছে মাত্র, তাতেই সিপিএমের সতীত্ব রক্ষার্থে তৃণমূল, বিজেপি বুদ্ধিজীবী সমালোচক, তাবড় মিডিয়া, সব একাকার হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি হাহাকার একশ্রেনীর বাম্বাচ্চাদের, এরা চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় তুলছে। উদগান্ডুরা বোঝেই না- রণনীতিতে সংগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ, সতীত্ব নয়; দিনের শেষে টিকে থাকতে হবে তো

সেলিম সাহেব ধন্যবাদ, আপনি একটা পরিণত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যার দরুন অন্তত ৩ দিন প্রচারের আলোর সবটা আপনার দিকে ছিল। হুমায়ুনের সাথে আলাপ করতে যাওয়াটা কোন গভীর অন্তরালের বিষয় ছিল না, রীতিমতো ফাঁদ পেতে স্বীকৃত মিডিয়া হাউসগুলোকে বাধ্য করেছেন- তুমি আমার কাছে এসো, আমার বক্তব্য শোনো, আর এইগুলোর মাধ্যমে পার্টিকে প্রাসঙ্গিক করে তোলো। নতুবা এই মিডিয়াই ইনসাফ যাত্রা, বাংলা বাঁচাও যাত্রা সহ এমন শয়ে শয়ে সিপিএমের কর্মসূচীকে ১ পয়সার গুরুত্ব দেয়নি; অথচ হুমায়ূন হিট। মিডিয়ার তৈরি তৃনমূল-বিজেপি এই বাইনারিকে কাটানো, বিষয়টা মোটেই সহজ ছিল না।

কোলকাতার কোনো অন্ধ গলিতে মাঝরাত্রে কিংবা মুর্শিদাবাদের যেকোনো বাড়িতে, কালো কাঁচে ঢাকা গাড়িতে নিজেদের লুকিয়ে দিব্যি কথা বলা যেত হুমায়ুনের সাথে। যেহেতু আসল উদ্দেশ্যটা হুমায়ুন নয়, আসল উদ্দেশ্য নিজেদের পালে প্রচারের আলো কেড়ে নেওয়া, আসল উদ্দেশ্য দশ দিক খুলে বার্তা দেওয়া। রাজ্যের মানুষ কী বলতে চাইছে, কী তাদের চাহিদা, সেইটা খানিকটা পরখ করার তাগিদে- তাদের বক্তব্য রাখার রাজনীতির ময়দানকে আরেকটু বড় করে দেওয়া। দেখুন কী কী আউট হয়েছে- মমতার সিঙ্গুর ফ্লপ ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে, সিদ্দিকুল্লার রাজভবন অভিযান অন্ধকারে তলিয়ে গেছে, নিতীন নবীন মহাশয়- রবীন্দ্রনাথকে শান্তিতে নোবেল পাইয়ে না দিলে বাংলাতে তার উপস্থিতির কথাও মানুষ জানতে পারত না। কারণ  মিডিয়ার সমস্ত আলোর কেন্দ্রে একটাই মানুষ – মহঃ সেলিম।

সংসারটা যাকে চালাতে হয়, সে বোঝে ঝক্কি কাকে বলে। যে রান্না করে সে জানে কখন কতটা নুন দিতে হবে, কোথায় চিনি দিতে হবে, কোথায় তেল লাগাতে হবে। বড় বাবুর্চিরও ভুল হয় বৈকি। টানাটানির সংসারে অল্প অল্প করে কিছুটা টাকা বাঁচিয়ে দুর্গাপুজো/ঈদে যিনি সকলকে কাপড় কিনে দেন, নুন আনতে পান্তা ফুরায় যে হেঁশেলে সেখানে রোববার অন্তত একপিস চিকেন আর অনেকটা ঝোল যিনি জোটাবার বন্দোবস্ত করেন, ভুল হলে গালিগালাজ তিনিই খান। দিনের শেষে সংসার চালাবার দায় ও গালি খাবার দায় যখন কারো একার ঘাড়ে- সুতরাং সিদ্ধান্তের বড় অংশটা যে তিনিই নেবেন, স্ট্যান্ড তিনিই নেবেন এটাই কি স্বাভাবিক নয়?

সিঙ্গুরের বুকে মমতা ব্যানার্জী, নির্বাচন কমিশনকে শিখন্ডী বানিয়ে SIR কে আক্রমণ করে মুসলমান প্রীতি দেখানোর মিথ্যা প্রয়াস বাস্তবে মাঠে মারা গেছে। RSS থেকে পরিষ্কার করে বার্তা গেছে কমিশনে, মুসলমানকে ডিফিউজ করার মতো সব রকম প্রচেষ্টা চালু হয়েছে কমিশন ও RSS এর দুই রাজনৈতিক শাখা তৃণমূল ও বিজেপি উভয়ের তরফেই।

একটু পিছনে ফিরুন, ২০২৪ লোকসভা। একটা বিজেপি জোট আরেকটা কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইন্ডি জোট। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার পরিষ্কারভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল, বিজেপিকে ১৮ থেকে ১২ তে নামিয়ে এনেছিল। অধীর ও সেলিম দুজনেই হেরেছিলেন, এটা কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না, এটা ইন্ডি জোটের কংগ্রেস ও তোলামুলের মাঝে বোঝাপড়ার ফল ছিল- মমতা ও রাহুল গান্ধীর মাঝের আঁতাত। ২০২৪ সাল থেকে কংগ্রেস ও তোলামুলের অফিসিয়াল অলিখিত জোট চলছে, শুভঙ্কর তো একটা পাতি বোড়ে মাত্র।

খুব খেয়াল করে দেখুন, ২০২৪ নির্বাচনী প্রচারে রাহুল গান্ধী বা তার মা সহ, কংগ্রেসের কোনো শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব কিন্তু বাংলাতে প্রচারে আসেনি। ইন্ডি জোটে সিপিএম যেমন রয়েছে, তোলামুলও রয়েছে। রাহুল গান্ধীর বার্তা স্পষ্ট ছিল ও আজও সেটাই আছে- বাংলাতে ইন্ডি জোটের প্রধান শরিক তোলামুল। পাশাপাশি অধীর চৌধুরী ছিল লোকসভার বিরোধী দলনেতা, সে জিতে গেলে তাকে রাতারাতি সরিয়ে দেওয়াটাও দৃষ্টিকটূ ছিল, সুতরাং রাহুল গান্ধী বাংলাতে না এসে শুধু তোলামুলকে সাপোর্ট করেছে এমনটা নয়, অধীরকে হারিয়ে দিয়ে লোকসভার বিরোধী দলনেতার পদটাকেও কুক্ষিগত করতে পেরেছে প্রশ্নাতীত ভাবে। কংগ্রেসের চেয়ে হারামি আর কেউ নেই, না তাদের নীতি আছে, না তাদের ভোট। এদের সাথে জোট মানে গাধার পিঠে চড়ার বদলে গাধাকেই কাঁধে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া।

রাজ্যজুড়ে ৮৮ হাজার বুথে ২জন করে কমপক্ষে দেড় লাখ চোর রয়েচছে। এচছাড়া MAL, MP, তাদের স্যাঙাৎ, চাঁটাপার্টি সব মিলিয়ে কমবেশী ৩ লক্ষ স্বীকৃত চোর রয়েছে এই মুহুর্তে। হারাম খেয়ে খেয়ে চর্বি জমে গেছে এদের, মানসিকভাবে কুঁড়ে হয়ে গেছে। ভোট চুরির জন্য তো দৌড়ঝাঁপ করতে হয়, নিজেরা সেসব ভুলে গেছে, ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে আর কতটা কী করা সম্ভব! পাশাপাশি সম্পদ মানুষকে ভীত করে তোলে, হারাবার ভীতি এসে যায়। এদের ছেলেপুলেরা বড় ব্যবসা ফেঁদে বসেছে রাজ্যের সর্বত্র। ফলে, তোলামুলের প্রতিটা চোর এখন ভীত, এরা এবারে আপসে আসতে রাজি হবে। এদের ক্যালাতে হলে ফেসবুকের বিপ্লবীরা কি যাবে দ্বান্দিক তত্ত্ব আবৃত্তি করতে করতে? নাকি বাঁশ নিয়ে যারা ক্যালাতে পারে তারা যাবে? আর বাঁশ নিয়ে ক্যালাবার লোক বামেদের দলে মাঠে ময়দানে ঠিক কতজন আছে আজকের দিনে এই মুহূর্তে?

যারা হুমায়ূন বা সিদ্দিকির দলে রয়েছে, তাদের অধিকাংশই তো সর্বহারাদের প্রতিনিধি। শ্রমিক, কৃষক, প্রান্তিক শ্রমজীবী। এটা ঠিক, ১০১% ক্ষেত্রে এদের সাথে বামেদের আদর্শ খাপ খায় না, তাই জোট করার প্রশ্নই ওঠে না, কিন্তু গণতন্ত্রে যখন সংখ্যা কথা বলে, সেখানে পরিস্থিতির সাপেক্ষে রফা হলে সমস্যাটা কোথায়! বেগ এলে নাকে রুমাল চাপা দিয়েও তো আমরা হাইজিন ভুলে বাসস্ট্যান্ডের পাবলিক টয়লেটে ঢুকে পড়ি। শৌচের জন্য রোজ বাঁ হাতে করে হলেও গু ঘাঁটি তো আমরা প্রত্যেকে, তাহলে তোলামুল নামের রাজনৈতিক গু সাফাই করতে হলে হুমায়ূন নামের গু ঘাঁটলে অমনি অপবিত্র অশুচি হয়ে যাবো?

টাকা কারো বাপের নয়, আমার ট্যাক্সের টাকা চুরি হয়েছে, অথবা রাষ্ট্রীয় জনগণের সম্পদ চুরি হয়েছে। চোর তোলামুল এই চুরি করেছে। তাই যেকোনো মুল্যে এদের বিসর্জন দিতে হবে ভোটের মাধ্যমেই। দুর্নীতির পাহাড় ভাঙতে গেলে কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি বা ন্যাকড়া জড়ানো দাস ক্যাপিটেলের সামনে হাত জড়ো করে পূজারী শ্রেণির তাত্ত্বিক কমিউনিস্ট দিয়ে হবে না, ওই জাতেরই গাঁইতি কুড়ুল নেওয়া লোক দরকার, জেসিবি দরকার। যারা তোলামুলকে ক্যালাবে। সর্বহারা শ্রমজীবী ‘শ্রেনি’ ডাইলেক্ট এর কচকচি বোঝে?

দিনের শেষে সংসারটা যাদের চালাতে হয়, দল ক্ষমতায় এলে নেতা মন্ত্রী হলে যেমন তারা হবেন, খারাপ হলে মা মাসি তুলে গণ খিস্তিখেউরটাও তারাই শোনে। তাই, বাকি সেটাই হোক যেমনটা পার্টি শীর্ষ নেতারা পরিস্থিতিকে বুঝবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে। আমি বুঝি, যে উদমা ক্যালান দিতে পারবে, তার সাথে ভোটের বাজারে সমঝোতা বা রফা করো; ব্যাস এটুকুই, যাতে অপারেশন কাটমানি প্রোজেক্ট সফল হয়।

শ্রমিকের যেমন শৃঙ্খলা ছাড়া হারাবার কিছু নেই, বামেদেরও তেমন শূন্য ছাড়া হারাবার কিছু নেই, পাওয়ার জন্য গোটা বাংলা রয়েছে প্রতীক্ষাতে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...