সংস্কৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সংস্কৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬

বামপন্থা কি!

 

বিচিতে লাথি পরলে কেউ বউকে স্মরণ করেনা। নাঙ, ব্যাং, নেতা, দিদি, পিসি, দাদা, জ্যেঠু, মেসো, গার্লফ্রেন্ড , শ্বশুর, শালী, বৌদি, ভগবান প্রমুখ কাউকে ডাকেনা।

বাবাগো/মা'গো, গেলাম গেলাম- এটা বলেই চেল্লায়। এটাই শাশ্বত।

কৃষক শ্রমিকের পেটে লাথি পরলে যে কথা গুলো বের হয়, মার্ক্স সেই কথা গুলোই সংকলন করে লিখে গেছেন, তার বাইরে আজও নতুন কিচ্ছু বলার নেই, আগামীতেও থাকবেনা। কারন এগুলোও শাশ্বত। এই কারনেই যুগ যুগান্তরে দেশ কালের গন্ডী পেরিয়ে প্রতিটা রক্তচোষাদের স্থায়ী শত্রুর নাম মহামতি মার্ক্স ও তাঁর দর্শন।

স্বভাবতই, তোলামুল বা চাড্ডিরাও যখন শ্রমিক কৃষকের হয়ে কথা বলে সেটা বামেদের মতই শোনায়। মার্ক্সের অনুগামী মনে হয়।

সুতরাং, এলিতেলি যাকে তাকে বাম ভাবার ভুলটা বড্ড করে ফেলি আমরা। বামপন্থা কোনো কবিতা বা কয়েকটা ইষ্টমন্ত্র জপার নাম নয়। এটা একটা জীবনধারা, যেটা সারাজীবন ধরে অনুশীলন করে যেতে হয়। তাই ধান্দাবাজ, সেয়ানা, চালচোর, ধর্মীয় উন্মাদ, ভাতাজীবি কিম্বা নেকু সুশীল যে কেউ যখন অন্ন বস্ত্র বাসস্থান ও মৌলিক অধিকারের দাবীতে কথা বলে আমরা তাৎক্ষণিক ভাবে ধোঁকা খেয়ে যায়।

আমাদের আরো বেশী সতর্ক হতে হবে এই ক্রান্তিকালে।

সোমবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৫

হ্যাজের দুনিয়া

 

এই বাঁধভাঙা উচ্ছাস, আবেগের মেয়াদ সর্বোচ্চ আজ সন্ধ্যা বা রাত অবধি। তার চেয়েও বড় হচ্ছে ১১ জন মেয়ের মধ্যে ৭/৮ জনেরই নাম না জানা, ফেকুটিও স্বগর্বে বলছে- আজ স্বপ্ন সত্যির রাত! ভাই কভার আর এক্সট্রা কভারের ফারাক টুকুও বুঝিসনা, কখন কটা ফিল্ডার ৩০ গজ বৃত্তের ভিতরে আর বাইরে থাকবে তা জানিসনা, ফাইন লেগ মানে ওটা ক্রিকেট মাঠের একটা অংশের নাম, দীপিকা পাড়ুকোনের পা নয়- এটা যাদের বুঝিয়ে দিতে হয়, তাদেরও আজ 'নারীশক্তির' জয়ে আপ্লুত হওয়ার দিন বৈকি।

ওরে বঞ্চিতের দল, তোদের রাত মানে স্বপ্নদোষের, স্বপ্ন পূরণের নয়। আসলে সকলেই একটা ইভেন্ট চায়, সেটা যা খুশি হোক, যেমন এখন SIR এর মরসুম, তার মাঝে মহিলা বিশ্বকাপ জয় ১ দিনের ফুরফুরে অন্যস্বাদের পদ, আজ রাত থেকে না হলেও আগামীকাল সকালে আবার সেই মতুয়া, বিজেপি আর প্রদীপ করের আঙুলহীন বিদেহী আত্মার গল্প। কার্বলিক এ্যাসিড ঢালা বঙ্গ রাজনীতিতে সেই আদি অকৃত্রিম হেলে আর কেউটের পালাগান তরজা।

অমল মজুমদার না ওমোল মুজুমদার এ নিয়ে রীতিমতো সে কী তর্কাতর্কি আর খাপ পঞ্চায়েত, বাপ্রে। এর ফায়সালা না হলে বাবা ভাঙ্গার অভিশাপে দুনিয়া রসাতলে যাবে। অর্শের নাড়ি যেন পুনরায় পায়ুপথে রিটার্ণ করবেইনা না, মিতালি রাজ কে ট্রফি তুলতে না দেখলে। কে মিতালি রাজ? আরে  করোনার পর 'ট্যাপসি' পান্নু একটা সিনেমা এনেছিলোনা, সেটার আসল নায়িকাটা। তাও ভালো, কাউয়া বিরিয়ানির বিজয় রাজের বোনের মেয়ে বলেনি এই ভাগ্য। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি- হারলিন, সানি দেওয়লের কেউ হয়না, শার্দুল ঠাকুরের পরিবারের কোনো মহিলা ক্রিকেট খেলেনা। ঘোষ পদবী মানেই রঞ্জিত ঘোষের কেউ হতে হবে কেন? স্মৃতি মান্দানা রশ্মিকার "খালাতো বোইন" নয়। রাধা যাদব RJD কোটার খেলোয়ার নয়। এই রেনুকা সিং ছত্রিশ গড়ের বিজেপির MLA নয়। সাই কিশোর আর শ্রী চড়নী আত্মীয় নয়, যতই মাথার চুলে আঁটা ব্যান্ড একই রকম দেখতে লাগুক। আপনি বরং সৌরভ গাঙ্গুলির কবেকার করা কটাক্ষ নিয়ে সারগর্তের বুদ্বুদের মত উপরে চড়ে বসুন, ওটাতে মিষ্টতা পাবেন।

একজন দার্শনিকের প্রশ্ন- মাঠে আজ ৩০ টা মেয়ে খেলছে দু'দল মিলিয়ে, ৩ জন অনফিল্ড আম্পায়ার। এদের কী কারো পিরিয়ড হয়নি? কত কষ্ট নিয়ে দৌড়ায়। কমেন্ট একজন পুরুষ দরদী লিখেছে- ছেলেদের ঝুলন্ত বিচি সহ এ্যাবডোমেইন গার্ড নিয়ে দৌড়াবার যন্ত্রণা মেয়েরা বোঝে? আরেকজনের প্রশ্ন- আচ্ছা, বোলারের পিরিডয় হলে বল বেশী সুইং করে না মুড? আরো কিছু প্রশ্নমালা- আচ্ছা হরমনপ্রীত,স্মৃতি মান্ধানা, জেমিমা রদ্রিগেজ এনারা কী অপারেশন করে বুকের চর্বি বাদ দিয়েছে? কিম্বা হট প্রেসিং ট্রিটমেন্ট নিয়েছে? আচ্ছা এই মেয়ে গুলো স্বামীকে মানবে বিয়ের পর? কিরকম সব ব্যাটাছেলে মার্কা হাড়কাঠ বেড় করা দেখতে। দু একটা বাদে সবকটা কাজের মাসি মার্কা খেঁদি পেঁচি, কোনো লাবণ্য নেই। বাপ্রে বাপ, ওই থাই পাছা নিয়ে দৌড়ুচ্ছে দেখো!!  এই অবধি পড়া শোনার পর আর দেখার সাহস হয়নি দার্শনিকদের ওয়াল গুলো।

এরপর আছে কবির দল। ওষ্ঠো, অধর, স্তন, নিতম্ব, নাভী, যোনী, জরায়ু, চোখ, কাজল এর সাথে কয়েকটা ক্রিকেটীয় শব্দ, আর শ্রী চড়ণী, স্মৃতি, শেফালি এমন কিছু শব্দ জুড়ে সে কী সব কবিতার রক্ত আমাসা, টাইমলাইনে ঢুকলেই পিছলে যাচ্ছি সেই থকথকে স্রোতে। 

এর পর হ্যাজারের দল। রিচা ঘোষের মেসোমশাই এর ছোট শালার কাকাতো ভাই এর প্রমিকা লিখছে- রিচা দই খেতে ভালোবাসে। ব্যাস আরেক শিলিগুড়িয়ান চে এর ট্যাটু করা টঙ্কার ঘোষ বলছে, আমরা ২৬শে ক্ষমতায় এলে CAB এর নাম GAB করে দেব। কে জানে G ফর ঘোষ ভেবে দিলুদা মুকচি হাসলেও কুণাল শতরূপ হালকা কাশি সহযোগে সম্মতি দিয়েছে বলে 'ঘন্টাখানেক' ব্রেকিং নিউজ। এর পর স্মৃতি মান্ধানার চিকনা বয়ফ্রেন্ড, ক্রান্তি গৌড় এর পুলিশ পিতার চাকরি চলে যাওয়া, জেমাইমকে হিন্দুত্ববাদীদের ট্রোল, শেফালির উপরে ১ সপ্তাহ জুড়ে হনুমানের গদা ট্যাটুর কৃপায় ম্যাজিক পার্ফর্মেন্স ঢুকে যাওয়া। হর্ষিতের রানা পদবীর দায়ে স্নেহ রানার বাদ পরা, উমা ও শাশা দুই ছেত্রীর মধ্যে কে বেশী প্রতিভাবান! ঝুলনের কীসের এতো তাড়া ছিলো অবসর নেওয়ার! যা, বুঝলাম- দেশে হ্যাজ এর সাবজেক্টের অভাব পরেনি। এমনকি বাংলাদেশ থেকেও নাস্তিক নারীবাদীর হাহাকার ঝরে পরছে- কেন আমি ভারতীয় নই! এতো দুক্ষু রাখি কোথায়!

এর পর আসল খেলা, মোদী ম্যাজিক। দেশের তাবড় জনসংখ্যা জেনে গেছে- এই জয়ে সবচেয়ে বড় অবদান মোদীজির। তিনি এমনই অনামুখো যে, অতীতে যেখানে যেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন- সেটা চন্দ্রযান হোক বা পুরুষ ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপ, নিশ্চিত ভরাডুবি করিয়ে এলাকা ছেড়েছেন। গতকাল DY Patil স্টেডিয়ামে এ উপস্থিত না থেকে যে এভাবে জেতানো যায়, সেটা বিরল প্রতিভা। মোদি হ্যায়, তো মুমকিন হ্যায়। 

যাবার বেলায়, ট্রল বাহিনী মমতাকে ট্রল করে সে কী অর্গাজম। দেখো তারা রাত ১২টার পর জিতেছে- বলে সে কী উল্লাস। তাদের বলি, ২০০০ পুলিশ, প্রায় ৫০ হাজার ছুঁইছুঁই জনগন আর লক্ষ ওয়াটের আলো সরিয়ে নিলে, ঝুলন্ত বিচিওয়ালা ৫৫ ইঞ্চি ছাতিওয়ালা পুরুষ পুঙ্গবটি রাত্রের আঁধারে নিজে সেফ তো? সেখানে রাত বারোটার সময় হাতে দুটো ব্যাট, ৬টা উইকেট আর ১টা বল ধরিয়ে এই ২২টি মেয়েকে রাস্তায় ছেড়ে দিলে আমাদের দেশের কোন শহর বা গ্রাম সেফ? আপনি দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত? কোনো ঋজুদার দরকার নেই- you are looking good in Sharee বলার জন্য, সামান্য সুযোগ পেলে আপনিই হয়তবা - চলতি ক্যায়া বলে, রেট শুধাবেন।

তবে ছেলেদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেটের জয় অপারেশন সিঁদুরের অংশ হলেও হলে মেয়েদের জয় শুধুই জয়। এখানে না হ্যান্ডসেক তরজা না তৃতীয় কোনো ভ্যেনুতে খেলার জন্য কোঁদল। তবে কাপটা জিতে গিয়ে জয়টা ক্রীড়ার জয় নয়, নারীবাদীদের হয়। মা দুর্গার জয়। ভারত মাতার জয়। মেয়েদের জয়টা নিয়ে দেশপ্রেমের আবেগ লক্ষ্যনীয় ভাবে অনুপস্থিত। আর দীপ্তি শর্মার টিপ নিয়ে কোনো হ্যাজ এই অবধি নামেনি। আমাদের ভারতীয় পুরুষতান্ত্রিক আধা রক্ষণশীল মাইন্ডসেটে এর চেয়ে বেশী ভালো হওয়া সম্ভব নয়, সে আপনি আমি নিজেকে যতই উদার আধুনিক মক্তমনা বলে দাবী করিনা কেন! তবে আশা করতেই পারি, গতকালের এই জয় আগামীতে অনেক কিছুই বদলে দেবে। অনেকে আকৃষ্ট হবে। আশা টুকুই সম্বল।

ক্যাপিটার মার্কেট মুনাফা বোঝে, তাই পুরুষের অন্তর্বাসের বিজ্ঞাপনেও নারী মুখ ছাড়া চলেনা। খেলাতে দর্শন টানতে গেলে যে পারফর্মেন্স দরকার, পুরুষ ক্রিকেটের নিরিখে। সেটা নেই মহিলা ক্রিকেটে, তাই অর্থ নেই- এটা যুক্তি হতে পারে। কিন্তু পারফরম্যান্স দেখাতে গেলে যে পরিমাণ পরিবেশ দরকার, প্রস্তুতি দরকার এবং পরিকাঠামো দরকার সেগুলো কী করে উঠতে পেরেছে ক্রিকেট বোর্ড বা সরকারের ক্রীড়া দপ্তর করতে পেরেছে যারা সবেতে কর বসিয়ে রোজগার করে? মহিলা ক্রিকেট ছেড়েই দিন, পুরুষ ক্রিকেট ছাড়া দেশের বাকি কোনো স্পোর্টসে সেই অর্থ আধুনিক পরিকাঠামো রয়েছে যাকে বিপননের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনদাতারা আয় করতে পারে? সবটাই দিনের শেষে বিজ্ঞাপনী চমক। বাজারই তৈরি করে দেয় কে থাকবে আর কে থাকবেনা। বাজার বিরাট কোহলি যেতে না যেতেই শুভমন গিলের উপরে লগ্নি করে বসে আছে, তাই যতই যে শেষ ১৫টা ODI/T20 তে ১৩ গড়ে রান করুন, তাকে সহজে বাদ দেওয়া যাবেনা। এই কারনেই বুড়ো ধোনী আজও IPL খেলে, কারন স্পনসরদের লগ্নি রয়েছে তাদের উপরে। 

এবারে মহিলা ক্রিকেটে প্রচুর টাকা আসবে, সফল ও সুন্দরী মহিলা ক্রিকেটারদের প্রচুর ভাবে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হবে। তারা কোটিতে রোজগার করবে, মধ্যবিত্ত অসংখ্য বাবা মা তাদের বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে ক্রিকেট একাডেমিতে দৌড়াবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের ফিল্ডিং অনেক উঁচু জায়গায় চলে যাবে। ক্রিকেটীয় বিচারে, সেই লেগে টেনে টেনে মারে রাণ করছে অধিকাংস দল, দক্ষিণ আফ্রিকার মেয়েরাও তাই। সে তুলনাতে আমাদের দেশের ব্যাটারটা অনেক বেশী উন্নত। তবে মেয়েদের বোলিং এর হাল অতি বাজে।  এদের ইয়র্কর হয়না সেভাবে, তার জন্য যে গতি লাগে সেটা এরা এ্যাচিভ করতে পারেনা। লেগস্পিনার একটাও নেই, বাকিদের বলও স্পিন হচ্ছে কই! সব ওই স্লো মিডিয়াম, ফ্লাইটেড ডেলিভারি। বোলিং এ বৈচিত্র্য খুবই কম মেয়েদের ক্রিকেটে। আগামীতে বেশ কয়েকটা পেস বোলিং অলরাউন্ডার খুঁজে পাওয়া যাবে। অন্তত ৫ ফুট ১০/১১ ইঞ্চি বোলারদের বলের গতি ১৩০ এর বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে। অনেক প্রাক্তন মহিলা খেলোয়াড় আম্পায়ার হবার জন্য হাজির হয়ে যাবে। 


ইয়ে, আমারটা এইটাও হ্যাজ, আগামীকাল আর এটার তেমন মার্কেট ভ্যালু রইবেনা, বাসি হয়ে যাবে। তাই টাটকা হ্যাজ নামিয়ে নিলাম আরকি। আপনি এমন কোন হ্যাজ দেখে হেজিয়ে গেলেন, করবেন নাকি আপনার অভিজ্ঞতার শেয়ার!!


#হককথন

রবিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৫

বাঙালির ভূত

 

ভুতকে সেই অর্থে বাঙালী কোনো কালেই জাতে তুলতে পারেনি। 

সাহিত্যের ভুত কখনই সেভাবে একটা জলজ্যান্ত চরিত্র হতে পারেনি, হাস্য কৌতুক বা গা ছমছমে পিশাচ রূপী পার্শ্ব চরিত্র হয়েই রয়ে গেছে। বাস্তব জীবনে ভুতের ভয়ে বুক ধুকপুক করলেও গবেষণায় দেখা গেছে ৯০% ভীতুর ডিম প্রকাশ্যে ভুতের ভয় স্বীকার করেনা লোকলজ্জায়। আবার অদ্ভুত বাঙালি নাস্তিক সমাজ আছে, যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস না করলেও ভূতে ভয় রয়েছে, সে ভূত অতীতকাল নয়- পাতি বিদেহি আত্মা, তাদের যুক্তিও আছে অতিপ্রাকৃত শক্তির উপরে।

ওদিকে ব্যাঙ্কোর স্কন্দকাটা ভূত, আর ডাইনি নিয়ে নটসম্রাট শেক্সপিয়ার যে কালজয়ী ম্যাকবেথ লিখে গেলেন, তাকে কেউ ভৌতিক উপন্যাস বা নাটক বলেনা, শুধু কাল্ট বা অমর ট্রাজেডি হিসাবে মহা মহা মহা সমাদৃত। ড্রাকুলা কিম্বা মেরি শেলীর ফ্রানকেনস্টাইনও আদতে আধাভৌতিক। এর বাইরে জম্বি, ভ্যাম্পায়ার, গবলিন কিম্বা হালের হ্যারি পটারেও ভূতকে কী দারুন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। আরব্য রজনী বা ওই যুগের মধ্যপ্রাচ্যের সাহিত্যের  জ্বীন গুলোকে দেখুন, কী সব একেকটা চরিত্র, তাদেরকে কেন্দ্র করে গল্প, তারাই মূল চরিত্র।

পাশাপাশি আমাদের শীর্ষেন্দুর ভুত গোবেচারা বোকার হদ্দ, লীলা মজুমদার হয়ে সত্যজিতের ভুতও জাতে উঠতে পারেনি। বিভূতি বাবুর তারানাথের ভুতও মূল চরিত্র হয়ে উঠতে পারেনি। এমন বহু বাঙালী বা ভারতীয় লেখকের লেখনিতে ভুতের নানান উপদ্রব থাকলেও, সেগুলো শেষমেষ সাইড নায়ক হয়েই রয়ে গেছে। হরিনারায়ন চট্টোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা সিরাজ, অদ্রীশ বর্ধণ, হিমানীশ গোস্বামী, প্রমুখেরা ভূতকে এনেছেন সাসপেন্স তৈরির চরিত্র হিসাবে, ভুত কোথাও মুখ্য চরিত্র নয়। যেমন আমাদের ভাতের সাথে নানান পদ খায়, এখানে ভাত নায়ক, তরকারিরা রোজ বদলায়, আমাদের ভূতেরা তেমন মুখোরোচক তরকারি।

আমাদের অধিকাংশ সাহিত্যিক লেখকেরা বিদেশী সাহিত্যিকদের নিরিখে ভূতেদের প্রেস্টিজ পাংচার করে দিয়েছেন। সামান্য কিছু হানাবাড়ি, শ্মশান বা গোরস্থানের কিছুটা গায়ে কাঁটা দেওয়া ছমছমানি থাকলেও, বাকীরা প্রায় সবাই নির্বিষ কোমল হাস্যরস। আমাদের সাহিত্যে ভুতেরাও আত্মহত্যা করতে চায়, ভাবুন অবস্থা। 

সাহিত্যে ভূতের আলাপ হবে আর দাড়িবুড়ো বাদ যাবে সেই ধৃষ্টতা কার রয়েছে। বাংলা সাহিতে তিনিই প্রণম্য, ভূতকে চরিত্র বানাতেও। তিনি সিম্পলি বাকিদের বলতেই পারেন 'তফাৎ যাও তফাৎ যাও, সব ঝুট হ্যায়'। সেই কবিঠাকুরের ক্ষুধিত পাষাণ বাদে, মণিহারা,  কঙ্কাল কিম্বা মাস্টারমশাই, কোথাও ভুত সেভাবে মুখ্য চরিত্র হয়ে উঠেনি যারা রক্ত মাংসের মানুষের সাথে প্রভেদ ঘুচিয়ে দিয়েছে। 

আমাদের বাঙালী শিশুর জন্মই হয় জুজু নামের ভুতের সাথে, এর সাথে রাক্ষস খোক্কসের গল্প দিয়ে শৈশবের যাত্রা শেষ হতে না হতে, কৈশোরে ব্রহ্মদৈত্তি আর মামদোর পাল্লায় পড়ি। প্রথম যৌবনের প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে সবাই শাঁকচুন্নি দর্শন করি। আমাদের বাঙালী জীবনটাই ভুতময়, কিন্তু বড্ড রুগ্ন আর অধিকাংশই আদর্শবান সব ভুত, সবাই পার্শ্বচরিত্র। 

সে যাই হোক, কোন সাহিত্য বড় সেটা আলাপের বিষয় নয়, সকলে তার স্থানে সুমহান। বিষয় হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি কোমলমতি ভুতেদের নিয়ে, আদুরে পোষ্যের মত কিছুটা, যেখানে শিরশিরানি ভয়ও আছে আবার এ্যাডভেঞ্চারও আছে। এটাই 'আমাদের' নিজস্বতা।

তাই আজকের এই ভূত চতুর্দশীর সাঁঝবেলাতে এটাই নাহয় থাকুক। এটা যাদের ধর্মীয় উৎসব, তাঁরা ধর্ম হিসাবে পালন করুক, আমরা নাহয় এটা আমাদের ছেলেবেলার ভয়কাতুরে সন্ধ্যা গুলোকে উদযাপন করি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে।

বুধবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৪

মব-জাস্টিস ও মব-জাজমেন্ট


 

“মব-জাস্টিস ও মব-জাজমেন্ট— দুটিকেই আমি প্রচণ্ড ভয় পাই। 


মবের হাতে, অর্থাৎ গণমানুষের হাতে সবকিছু বিচারের ভার তুলে দেয়াটা বিপজ্জনক। কারণ গণমানুষের হার্ড-ইনস্টিঙ্কট রয়েছে। ঝোঁকের বশে পাল বেঁধে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা তাদের আছে। যারা বিহ্যাভিয়োরাল ইকোনোমিক্স বা মব-সাইকোলোজি পড়েছেন, তারা ‘ইনফরমেশন ক্যাসকেড’ নামে একটি বিষয়ের সাথে পরিচিত থাকবেন। ইনফরমেশন ক্যাসকেডে কী ঘটে? ধরা যাক কোনো এলাকায় আপনি বেড়াতে গিয়েছেন। সেখানে আপনার ক্ষুধা পেয়েছে, এবং খাবার খাওয়ার জন্য রেস্তোরাঁর সন্ধান করছেন। হঠাৎ দুটি রেস্তোরাঁর দেখা পেলেন। একটির নাম ‘A’, আরেকটির নাম ‘B’। দুটি রেস্তোরাঁই খালি। সেগুলোতে কোনো কাস্টমার নেই। আপনি বুঝতে পারছেন না কোন রেস্তোরাঁটির খাবারের মান ভালো। 


এ অবস্থায় র্যান্ডোমলি, অর্থাৎ দৈব চৈয়নের ভিত্তিতে রেস্তোরাঁ ‘A’-তে ঢুকে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর আরও একটি লোক সেখানে খাবারের সন্ধানে এলো। সে দেখলো যে— রেস্তোরাঁ ‘B’ খালি পড়ে আছে, কিন্তু রেস্তোরাঁ ‘A’-তে একজন লোক বসে খাবার খাচ্ছে। সে ভাববে, রেস্তোরাঁ ‘B’-এর চেয়ে ‘A’-এর খাবারের মান নিশ্চয়ই ভালো। এ জন্য ‘A’-তে কাস্টমার আছে, ‘B’-তে নেই। লোকটি করবে কী, আপনার দেখাদেখি ‘A’-তে ঢুকে পড়বে। এভাবে আরও যারা আসবে, তাদেরও একটি বড় অংশ ‘A’-কে বেছে নেবে। এই যে একজনের দেখাদেখি আরেকজনের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা, এটি গণমানুষের মধ্যে খুব দেখা যায়। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অন্যের সিদ্ধান্তকে অনুকরণ করে থাকে। নিজের বুদ্ধি-বিবেককে তারা সহজে খাটাতে চায় না। আগামীকাল যদি টেলিভিশনে কোনো জনপ্রিয় ব্যক্তি বলে ফেলেন— অমুক লেখক চোর, তার সব লেখা নকল, তাহলে গণমানুষদের একটি অংশ চোখ বুজে এ মিছিলে যোগ দিয়ে দেবে। তারা জানতে চাইবে না— ‘জনপ্রিয় স্যার, অমুক লেখকের কোন কোন লেখার কোন কোন বাক্য নকল? তিনি কোন মনীষীর কোন বইয়ের কোন পৃষ্ঠা থেকে নকল করেছেন? নকল কাকে বলে? আমাদেরকে দেখান, আমরা নিজে পড়ে, নিজে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চাই।’ ফেসবুকে আমরা যে-ভাইরাল কন্টেন্টগুলো দেখি, সেগুলোও ইনফরমেশন ক্যাসকেডের ফসল। কেউ একজন কোনো জিনিস নিয়ে মাতামাতি করলো, আর অমনি তার অনুসরণকারীরাও এটি নিয়ে তুলকালাম শুরু করে দিলো। সবাই দলবেঁধে প্রথম জনের মতামতের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে।


সেলেব্রিটি মন্টু যদি বলে— রবীন্দ্রনাথ ইসলাম-বিদ্বেষী লেখক, তাহলে তার বুদ্ধিবিমুখ অনুসারী পালও বলতে শুরু করবে— ‘রবীন্দ্রনাথ ইসলাম-বিদ্বেষী লেখক; তাঁকে জুতো মারতে হবে।’ কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কোন কোন লেখার কোন কোন বাক্য ইসলাম-বিদ্বেষী, ইসলাম বিদ্বেষ কাকে বলে, কোনো লেখা ইসলাম-বিদ্বেষী কি না এটি কীভাবে নির্ধারিত হয়, একজন লেখকের ইসলাম-বিদ্বেষী বা ইসলাম-বিরোধী হওয়ার অধিকার আছে কি না, নাস্তিক-বিদ্বেষ জায়েজ হলে ইসলাম-বিদ্বেষ কেন জায়েজ নয়, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন গণমানুষ করবে না। তারা চাইবে কেবল অন্যের টানা উপসংহার নকল করতে। কোনো বিষয়ে অন্যের দেখাদেখি সিদ্ধান্ত নেয়ার এই যে সংস্কৃতি, এটিকে গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করি। অমুকে অমুককে ভোট দিচ্ছে, তাই আমিও অমুককে ভোট দেবো, অমুকে অমুককে ঘৃণা করছে, তাই আমিও অমুককে ঘৃণা করবো, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যে-জাতি নিমজ্জিত থাকে, গণতন্ত্র তাদের জন্য উপযুক্ত নয়। রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক কাঠামো সৃষ্টির জন্য তাদের কোনো বুদ্ধনির্ভর প্রস্তুতি নেই।

হ্যাঁ, মানুষ যখন জঙ্গলে ছিলো, তখন হার্ড-ইনস্টিঙ্কট বেশ উপকারী ছিলো। এটি আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে অনেক বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করতো। সমাজে সবার পক্ষে সব বিষয়ে ইনফর্মড ডিসিশন নেওয়া সম্ভব নয়। কোনো ফল বিষাক্ত কি না, কোনো প্রাণী বিপজ্জনক কি না, এ বিষয়গুলো একজন অনভিজ্ঞ শিশুর পক্ষে জানা কঠিন। বাবা-মা’র দেখাদেখিই তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একজন বয়স্ক মানুষ বাঘ দেখে দৌড় দিলে, একজন শিশুরও উচিত বাঘ দেখে দৌড় দেয়া। হার্ড-ইনস্টিঙ্কটের এটি একটি বড় ইভোলিউশোনারি কারণ। আমাদের মন বা বুদ্ধি এভাবেই বিবর্তিত হয়েছে। যে-মানুষ বাঘ দেখে পালিয়ে যায় না, তার পক্ষে প্রকৃতিতে টিকে থাকা কঠিন। তবে আদিম মানুষদের হার্ড-ইনস্টিঙ্কট আধুনিক মানুষদের মতো হুজুগে ও ভিত্তিহীন ছিলো না। বাই ইনডাকশন, অর্থাৎ পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তারা বুঝতে পারতো, কোন কোন বিষয়ে অন্যের সিদ্ধান্ত নকল করতে হবে। বিপদের সাথে লড়াই করে করে তারা বুঝতো, এই এই ব্যাপারে বিজ্ঞজনের মতামত অগ্রাহ্য করা বিপজ্জনক। আধুনিক সমাজে এমনটি ঘটছে না, কারণ এ সমাজ জঙ্গলের সমাজ থেকে একেবারেই আলাদা। মানুষের হার্ড-ইনস্টিঙ্কট এখন বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, ও সোশ্যাল মিডিয়াতে।

প্রতিবাদীদের দিকে তাকান। সেখানে কী হচ্ছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ পালবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করছে। অন্ধ ভাল্লুকের মতো আচরণ করছে। প্রতিবাদী মানুষদের আমি সম্মান করি। তাদের কাছে সভ্যতার ঋণ রয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদকে পেশা হিশেবে নিলে বিপদ। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে পেশাদার প্রতিবাদজীবী রয়েছেন। নানা বিষয়ে বুঝে না বুঝে তারা প্রতিবাদ করেন। যেন প্রতিবাদ করার জন্যই জন্মেছেন। প্রতিবাদের বিষয় নির্বাচনেও তারা অসৎ। কর্মের চেয়ে কর্তা তাদের কাছে অধিক মুখ্য। সবাই প্রতিবাদ করছে, তাই আমাকেও করতে হবে— এমন প্রবণতা সমাজের জন্য আত্মঘাতী। আমি চাই মানুষ নিজ বুদ্ধি খাটিয়ে প্রতিবাদ করুক। অন্যের দেখাদেখি বা অন্যকে অনুসরণ করে যে-প্রতিবাদ হয়, তা সবসময় ভালো ফল বয়ে আনে না। বোধ-বিবেচনা হারিয়ে সারাক্ষণ অন্যের কণ্ঠের চিৎকার নকল করাকে প্রতিবাদ বলে না। বরং এটি ‘হার্ড বিহ্যাভিয়ার’ বা ‘পাল বেঁধে চলার সংস্কৃতি’-কে উৎসাহিত করে। ফ্যাসিবাদের মূল কারণ কিন্তু মানুষের এই ‘হার্ড বিহ্যাভিয়ার’। ভুলে গেলে চলবে না, ফ্যাসিজম ধারণাটির উদ্ভব ঘটেছিলো ‘লাঠির বান্ডিল’ থেকে। অনেকগুলো লাঠি মিলে একটি মুগুর তৈরি হয়। এ মুগুর যখন ভিন্নমতের মানুষদের মাথায় বাড়ি মারতে থাকে, তখন এটিকে ফ্যাসিবাদ বলে। শব্দটি এসেছিলো ইতালীয় ভাষার 'Fascio' থেকে, যার অর্থ বান্ডিল। সমাজে বাস করা প্রতিটি মানুষই লাঠি। এরা যদি কোনো রাজনীতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের পক্ষে একত্রিত হয়, এবং ভিন্নমতের মানুষদের উপর চড়াও হয়, তখন বুঝতে হবে সমাজে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে। পশুরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এ জন্য কোনো কাজ করার আগে ভেবে দেখা উচিত— আপনি ফ্যাসিবাদের লাঠি রূপে ব্যবহৃত হচ্ছেন কি না।

ফ্যাসিবাদবিরোধী মানুষও ফ্যাসিবাদী হতে পারেন। ফেসবুকে আমাকে প্রায়ই নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হয়। এসব পরীক্ষায় দেখেছি, এ দেশে যারা ফ্যাসিবাদ শব্দটি বেশি উচ্চারণ করেন, বা এর বিরুদ্ধে নিয়মিত শ্লোগান দেন, তারা নিজেরাও ফ্যাসিবাদী। এমন অনেককেই পেয়েছি, যারা ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করছেন— কিন্তু নিজেরা ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলন নন। অপছন্দের লেখা লেখেন, এমন লেখকদের শত্রু জ্ঞান করেন। প্রতিপক্ষের প্রতি মনে তীব্র বিদ্বেষ লালন করেন। পছন্দের বিশ্বাস, প্রতিষ্ঠান, হুজুর, নেতা, ও সেলেব্রিটির পক্ষে তারা যে-ভঙ্গিতে পাল বেঁধে কথা বলেন, এবং অপছন্দের লোকজনের বিরুদ্ধে যেভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে কুৎসা রটান, তাতে তারা মানুষ নাকি ভেড়া— এটি বোঝা কঠিন। ইংরেজিতে ‘Sheeple’ নামে একটি শব্দ আছে, যেটি তৈরি হয়েছে ‘Sheep’ ও ‘People’—কে একত্রিত করে। পিপল বা জনগণ তখনই শিপল হয়ে ওঠে, যখন তার ভেতর শিপ বা ভেড়ার গুণাবলী সংক্রমিত হয়। ভেড়া পাল বেঁধে চলতে পছন্দ করে। কারণ তার বুদ্ধি কম। গায়ের জোরও বেশি নয়। একা থাকলে সে নিরাপদ বোধ করে না। কিন্তু মানুষ বুদ্ধিমান। তার গায়ে জোর আছে, ব্যাংকে টাকা আছে। ফলে মানুষ যদি ভেড়ার মতো ইনস্টিংকটিভ আচরণ করে, তাহলে সমাজে রাজনীতিক ও অর্থনীতিক ঝুঁকি তৈরি হয়। দেখা যাবে, নেকড়েরাই ভেড়া সেজে শিকার নিয়ে ঢুকে পড়েছে অরণ্যে।”


—মহিউদ্দিন মোহাম্মদ

বুধবার, ৩ মার্চ, ২০২১

বিরিয়ানি ও বাঙালির খাদ্য বিবর্তন

 

 

(১)

অকপট নিয়ে যখনই কেউ কিছু বলে তার সাথে বিবিধ বিষয় জড়িয়ে থাকে। ব্যক্তি আমরা, সাহিত্য পত্রিকা, ভ্রমণ, নিজেদের মাঝের বন্ধুত্ব, আড্ডা, রাজনৈতিক খেউর ইত্যাদি; কিন্তু সব কিছুকে ছাড়িয়ে গিয়ে যেটা একান্ত পরিচয়বাহক হয়ে উঠেছে সেটার নাম রকমারি বাহারি খাদ্যসম্ভার। নির্দিষ্ট করে বললে, তা হলো বিরিয়ানি। বিরিয়ানি আর অকপট কোথাও যেন একটা সমার্থক হয়ে উঠেছে, অথচ গ্রুপের সদস্যসংখ্যার বিচারে খাদ্য গ্রুপগুলোতে, সাহিত্য গ্রুপ কিম্বা ভ্রমণ গ্রুপে বিরিয়ানি নিয়ে অনেক বেশি পোস্ট হয় অকপটের তুলনাতে, মনোজ্ঞ লেখাও আসে সেসব গ্রুপে- কিন্তু গ্রুপের সাথে বিরিয়ানির এতটা আত্মীকরণ, অকপট ছাড়া কারও সাথে এতটা ঘটেছে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে

বিরিয়ানি আমাদের জীবনের সাথে এমন ভাবে মিশে গেছে যে, কোনো কিছু বিশেষ দিন হোক বা না হোক বিরিয়ানির আগমনই যেন সেই দিনটিকে বিশেষ করে তোলে। প্রথমে ছিল শুধুই বিরিয়ানি, এখন তার কতইনা ঘরানা। কোলকাতা, দিল্লী, হায়দ্রাবাদি, লক্ষ্ণৌ, কাশ্মীরি, অওয়ধি, লাহোরি, বোম্বাই কত্তো কি। আবার আলু থাকা না থাকা, ডিম থাকা না থাকা, মাংসের সাইজ, চালের সুগন্ধ ও টেক্সচার, মশলার ভিন্নতা ইত্যাদি ভেদে বিরিয়ানি নানা গোত্রের হয়ে থাকে, এদের কৌলিন্য নির্ভর করে স্থানীয় ঐতিহ্যের উপরে। বিরিয়ানির হাঁড়ি আসলে স্বাদের আস্ত উৎকৃষ্ট রাসায়নিক ফলিত প্রয়োগশালা। এতে শিল্প আছে, সাহিত্য আছে, অঙ্ক আছে, বিজ্ঞান আছে, ভূগোল, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি- সব সব সব আছে। বিরিয়ানি নবীন প্রেমিকার মতো মাতাল করা উচ্ছল আস্বাদের, তবে যখন ওটা পুরাতন গৃহিণীর মতোই উষ্ণ থাকে তখন। বিরিয়ানির আঘ্রাণেই মুখে এত পরিমাণ লালার উদ্রেগ হয় তাতে অনায়াসে ডিঙি ভাসিয়ে দেওয়া যায়। মিঠা আতরের সুবাসে ফুসফুসের আয়ুবৃদ্ধি ঘটে। একদৃষ্টে বিরিয়ানির দিকে চেয়ে থাকলে প্রবৃত্তির নিবৃত্তি ঘটে। একপ্লেট বিরিয়ানি শুধুই খাদ্যবস্তু নয়, একটা তীর্থস্থল- যাকে চুম্বনের দ্বারা ছুঁলে পূণ্যার্জন হয়। এগুলো সবই আমার দর্শন।

বন্ধুবর ইন্দ্রর এক অমোঘ উক্তি আছে এই বিষয়ে, “বিরিয়ানি মানেই একটা অনিশ্চয়তার দোলাচল। অতি বড় বাবুর্চিও জানে না দম থেকে নামাবার পর শুকিয়ে যাওয়া আটার চাঙড় খুঁটে ভিতর থেকে কী বের হবে। প্রতিবার একই উপকরণ, একই মশলা, একই স্থান, একই পাতিল, একই ব্যক্তির রন্ধনশৈলী- তবুও প্রতিদিনের স্বাদ পৃথক হয়ে যায়, দুটো হাঁড়ির স্বাদেও ফারাক এসে যায়। এই কারণেই বিরিয়ানি এত সুস্বাদু”। বিরিয়ানি মানে অদ্ভুত সুগন্ধের মাঝে গোটা গোটা মশলায় সেজে ওঠা, সরু লম্বা শুভ্র সুগন্ধি মেদহীন ঘি মাখা ভাতে- জাফরানের সোহাগ মাখা হলুদ রঙের উপরে তুলতুলে মাংসের কুটুম্বিতাই শুধু নয়; বিরিয়ানির অর্থই হলো ধৈর্য, অধ্যাবসায়, মনোঃসংযোগ আর একরাশ অনিশ্চয়তা- এটাই বিরিয়ানির আসল স্বাদের রহস্য

জনসংখ্যাতাত্ত্বিক অঞ্চল ভেদের বাইরেও বিরিয়ানির একাধিক উপবিভাগ রয়েছে। যেমন কোলকাতার রয়্যালের স্বাদের সাথে আমিনিয়া বা আরসালানের স্বাদের অনেক ফারাক। তবে কোলকাতা বিরিয়ানি মানে শুধুই উপরের তিনটে নয়, কলেজ স্ট্রিটের সুফী, দমদম-নাগের বাজার ও বেহালার হাজী, নিউ মার্কেটের মস্তান, সল্টলেকের চাচাজান আর গলৌট, সেলিমপুরের তন্দুর, রিপন স্ট্রিটের হাণ্ডি, রাজাবাজারের তাজ, রুবির মনজিলাত কিম্বা বেনেপুকুরের জমজম- প্রতিটির স্বাদ ইউনিক। এর বাইরেও স্বাদের এমন জীবন্ত প্রতিষ্ঠান কম কিছু নেই, সে সবের তালিকা দিলে একটা গোটা উপন্যাস হয়ে যাবে

রাজ্যের বাইরে বলতে গেলে দিল্লীর করিমসের বিরিয়ানির স্বাদ ৫ বছর পরেও জিভে লেগে থাকে। হায়দ্রাবাদ গেলে সকলেই প্যারাডাইস খোঁজে, কিন্তু চারমিনারের কাছে সাদাবের বিরিয়ানির স্বাদ যে অমৃত কুম্ভের সন্ধান। বোম্বের লোখান্ডওয়ালার চাচার বিরিয়ানি হাসতে হাসতে দু'প্লেট শেষ করে দেওয়াই যায়, এতটাই সুস্বাদু। মহীশূরের আন্ধা ঘরানার নবাবি বিরিয়ানিতে পুদিনা পাতার ব্যবহার যেন জীবন্ত এক শিল্পকলা। সেবার সুব্রতদার সাথে লক্ষ্ণৌ গিয়ে আমরা সারা শহর জুড়ে তারিয়ে তারিয়ে হরেক ধরনের বিরিয়ানির স্বাদ নিয়েছিলাম সপরিবারে। প্রতিটাই অনবদ্য, স্বাদে-গন্ধে-বর্ণে।

জীবনের একটা অধ্যায়ে রপ্তানি বাণিজ্যের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে বিদেশ গমনের সুযোগ ঘটেছিল। বর্তমানে পর্যটন ও হোটেল ব্যবসার সাথে যুক্ত, আমাদের রেস্টুরেন্টেও বিরিয়ানি বানানো হয়। সেই সুবাদে ইরানি বিরিয়ানি, কাবুলি বিরিয়ানি, মদিনা বিরিয়ানি, বাগদাদি বিরিয়ানি, পাখতুনি বিরিয়ানি, তুর্কি বিরিয়ানি, মিশরি বিরিয়ানি, লেবাননি বিরিয়ানি, ইয়েমেনি বিরিয়ানি, নেপালি বিরিয়ানি সহ নানা স্বাদের পরখ করার সুযোগ পেয়েছি জীবনে। এগুলোতে ভাল বা মন্দের বিচার করা যায় না, কারণ প্রত্যেক দেশের নিজস্ব রন্ধনশৈলীতে নিজস্ব মশলা ও পাকপ্রণালীর বিশেষত্ব থাকে, সেটা বিদেশী জিভে ভাল না লাগতেও পারে। পশ্চিম ইরাক, কুর্দ, জর্ডন ও জেরুজালেম শহরের বিরিয়ানিতে কচি বেগুন দেয়, যেমন আমরা আলু দিই। খেতে বেশ লাগে। তবে বিদেশী বিরিয়ানির স্বাদের বিচারে ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানির তুলনা নেই

একগ্লাস বাদাম শরবতের স্টার্টার দিয়ে শুরু করে, কম তৈলাক্ত চিনিগুঁড়া চালের সাথে ছোট্ট ছোট্ট নরম ঢোলা মাংস, যা মুখে দিলেই হাড় থেকে খুলে আসে, সাথে বুরহানি আর ফিরনি- শুধু এই পদটা খেতেই বারেবারে ঢাকা যাতায়াত করা যায়। তবে সব ভালর চেয়েও ভাল আমার ঘরণী রুমির হাতের নিজস্ব ঘরানার বিরিয়ানি, সাথে পাতলা কাচুম্বর বা ঘন রায়তা। কিছুটা কোলকাত্তাইয়া, কিছুটা কাশ্মীরি, কিছুটা হায়দ্রাবাদি- বাকিটা রান্নার প্রতি অসীম প্রেম, যার দরুন যেকোনো ছুতোনাতায় “আজ না হয় বিরিয়ানিই হয়ে যাক” হরদম লেগেই আছে আমাদের সংসারে। এই জন্যই বলে, উপরওয়ালা জুড়ি মিলিয়েই পাঠায়

উইকিপিডিয়াতে পড়েছিলাম, দ্বাদশ শতকের ‘নৈষধ চরিত’, চতুর্দশ শতকের ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ এবং বৌদ্ধ সহজিয়া গান ‘চর্যাপদ’, মধ্যযুগীয় মনসামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত হয়ে খনার বচন- সর্বত্রই বাঙালির রন্ধনশৈলীর কিছু কিছু বিবরণ রয়েছে। অর্থাৎ খাদ্য নিয়ে আজকের প্রজন্মই যে লিখছে তা নয়, সেকেলের একচুয়াল লেখনীচর্চা গ্রুপগুলোতেও খাদ্যচর্চা জমিয়েই হতো, নতুবা তা কখনও লেখনী শিল্পে আসত না। ধরে নেওয়া যেতেই পারে, সেযুগেও যদি বিরিয়ানি থাকত- নিশ্চিত চর্যাপদে এমন কিছু লাইন থাকতই-

রান্ধি বিরিয়ানি ব্যঞ্জন পরাণ হরষিত,

ছাগমৃগ মাংসে কাবাব অকপট সচকিত”

আধুনিক যুগে ব্যাঞ্জনসাহিত্যের ইতিহাস মাত্র দুশো বছরের কুলীন। খাদ্যপ্রনালী ও রন্ধনচর্চার উপরে আধুনিক বাঙালি সেভাবে কিন্তু লেখেনি। ‘ইতিহাস’ নামের একটা অনলাইন ব্লগ থেকে যেটা পেলাম, হুবহু তুলে দিলাম- ‘১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কার ভট্টাচার্যের ‘পাক্‌ রাজেশ্বর’, ১৮৫৮ সালে গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশের ‘ব্যঞ্জন রত্নাকর’। তবে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করছিল বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের ‘পাক-প্রণালী’। পুরুষদের পাশাপাশি বাঙালি ‘ভদ্রমহিলা’রাও রান্নার বই লিখতে শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী তথা ‘পুণ্য’ পত্রিকার সম্পাদিকা লেখেন ‘আমিষ ও নিরামিষ’ নামে একটি বই। কিরণরেখা রায় লেখেন ‘বরেন্দ্র রন্ধন’। রেনুকাদেবী চৌধুরানী লিখেছিলেন ‘রকমারি নিরামিষ রান্না’ আর ‘আমিষ খণ্ড’

 (২)

আমাদের ছোটবেলা মানে নব্বই এর দশক বা এই নতুন শতকের প্রথম দশকটাতেও বিরিয়ানির এমন একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল না বঙ্গজীবনে। বিরিয়ানি যে আগে ছিল না তা নয়, চিৎপুরের রয়্যাল কিম্বা কোলকাতা পুরসভার কাছে আমিনিয়া তো তীর্থস্থানে মতো ছিল- বছরে এক-দুবার যেতে পারলেই নিশ্চিত মোক্ষলাভ। এখন হলে-মলে তো ছাড়, যে কোনো বাহানাতেই বিরিয়ানি ঢাকে কাঠি পাহাড় থেকে সাগর। পাড়ায় মোড়েতে লাল সালুতে ঢাকা পেতলা বা ডেকচি, এলাকা ভুরভুর করে মিঠা আতরের গন্ধে। মূলত বিরিয়ানির হাত ধরেই তুর্কি, ফার্সি তথা মধ্য এশিয়ার খাদ্যশৈলীতে ছেয়ে গেছে মাছে ভাতে বাঙালির খাদ্যতালিকা। বিরিয়ানির সাথে সাথেই হেঁসেলে ঢুকেছে কিমা, কাবাব, চাপ, রেজালা, ভুনা, হালিম, ভর্তা, কোর্মা, কালিয়া, নিহারি, পায়া, পসিন্দা, রোগান জোশ, রেশমি বোটি, কোফতা, টিকিয়া, মুসল্লম, ফালুদা, বরফি, ফিরনি, শিরখুর্মা, আরও কত কী! সনাতনী বাঙালিয়ানার বাইরে- থুড়ি, এখানেই প্রশ্ন উঠবে সনাতনী বাঙালিয়ানা কী!

আমরা অনেকেই বলব, ডাল, আলুপোস্ত আর চারটি গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, এই তো আমাদের বাঙালি ঐতিহ্য। কিন্তু পঞ্চদশ শতকের আগে পোস্তর নামটারই অস্তিত্ব ছিল না বঙ্গজীবনে, মুঘলরা মশলা হিসাবে পোস্ত এনেছিল এদেশে। আলু এসেছিল পর্তুগীজদের সাথে আর ডাল এসেছে মধ্য ভারত থেকে মূলত বর্গিদের হাত ধরে। তাহলে হাতে রইল পেনসিল। মাছ-ভাত, বলতে গেলে এই দুটোই আদি তথা অকৃত্রিম বাঙালি খাদ্য, বাকি সবই বদলেছে সময়ের সাথে। মাছের রন্ধনশৈলীও বদলে ৩৬০ ডিগ্রী কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করেছে সময়সারণি জুড়ে। বর্ণপ্রথায় জর্জরিত সংখ্যাগরিষ্ঠ বঙ্গ হিন্দুসমাজে প্রাক মধ্যযুগীয় বঙ্গনারীর হেঁসেলে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। আইনের সবকিছুই উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়দের জন্য সীমাবদ্ধ ছিলতারাই মূলত অর্থবান হতো, তাই ধর্মীয় অনুশাসন তাদের সাজত। এক পেট খিদে নিয়ে ধর্মের গানে ঘুম আসে না, তাই নিম্নবর্গীয় কায়স্ত হোক বা শূদ্র তথা দরিদ্র নিম্নবিত্ত কৌম সমাজে ধর্মীয় বেড়াজালের বাইরে একাধিক খাদ্যের বিকল্প ছিল। সমস্যা ছিল আর্ত আর বিধবাদের, যা আজও কিছুটা আছে বৈকি গ্রাম্য হিন্দুসমাজে

খ্রীস্টপূর্ব ময়ূর সাম্রাজ্য থেকে, শক, হুন, কুষাণ হয়ে গুপ্তযুগ পর্যন্ত বাঙালির কী যে খাদ্যাভ্যাস ছিল সেটা বড় গোলেমেলে একটা বিষয়, গোলেমেলে এই জন্য- কারণ তখন আজকের ফর্মের এই বাঙালি জাতিটারই অস্তিত্ব ছিল কিনা কে জানে! বারেবারে হানাদারেদের আক্রমণ ঘটেছে সিন্ধু-গাঙ্গেয় অঞ্চলে, নিশ্চয় সেই সময়েও খাদ্যের পরিবর্তনও এসেছিল প্রতিবার। কিন্তু তা লিপিবদ্ধ নেই, তাই জানার সুযোগ নেই। এক্কেবারে শুরুর যুগে যা ছিল তা মূলত আর্য-অনার্যের দ্বন্দ্ব- সেই দ্বন্দ্ব যে খাদ্যাভাসেও থাকবে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। প্রথমে মুসলমান ও পরে ইউরোপীয় নানা হানাদার জাতির প্রাদুর্ভাবে বাঙালির রান্নাঘর ক্রমশ সম্পৃক্ত হয়েছে, বিকল্পের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে- লিখিত ইতিহাসের দরুন এটা জানা যায়।

এই খাদ্য সম্প্রীতিকে আপন করতে অবশ্য দণ্ড কিছু কম দিতে হয়নি ইতিহাসের এই দীর্ঘপথকে, আজও গোমাংস ভক্ষণের শাস্তি গণপিটুনিতে মৃত্যু, কিম্বা হালাল মাংস বিনা একটা বড় জনগোষ্ঠী- মাংস ছোঁয় না অবধি। প্রাচীন বঙ্গীয় সমাজে সকালে হবিষ্যান্ন সেবন করে গঙ্গাজল দিয়ে আচমন করে তিনবার ‘তৈলাধার পাত্র কিম্বা পাত্রাধার তৈল' মন্ত্র উচ্চারণ করা সমাজপতিরা মহা অধ্যাত্মতেজে মুনি ঋষিদের মতো টেলিস্কোপিক নজর দিয়ে গোটা সমাজের খাদ্যাভ্যাসের প্রতি কড়া নজর রাখত, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের উপরে। স্মার্তরা কখনই অন্ত্যজ শ্রেণীর রোজনামচার উপরে দৃষ্টিক্ষেপ করতে ততটা উৎসাহী ছিলেন না। আজ এই অনুপরিবার কাঠামোতে অন্তর্জালময় ইথারীয় জীবনে কে যে কী খাচ্ছে তা পাশের মানুষটি অবধি জানতে পারে না- সোস্যালমিডিয়াতে ছবি পোষ্ট করে নিজে জানান না দিলে

অনার্য তথা শুদ্ধ ভারতীয় আদিবাসী খাদ্যশৈলীতে ভাতের গুরুত্ব ছিল সর্বাধিক, তা গরম হোক বা গেঁজানো। এর বাইরে নানান ফলমূল, কন্দ, বাঁশ, শাকপাতা, বুনো মাশরুম, দুগ্ধজাত সামগ্রীর সাথে সাথে শিকারকৃত মাছ ও প্রাণীজ মাংসের একটা বিস্তৃত বিকল্প ছিল। গেঁড়ি, গুগলি, সাপখোপ, পাখি, বাদুড় কিছুই বাদ দিত না সস্তার আমিষে নিজেকে পুষ্টি দান করতে। স্বভাবতই নিজেদের উচ্চ জাতি ভাবা আর্যরা- অনার্যদের প্রতিটি খাবারকে বর্জন করেছিল স্মৃতিশাস্ত্রে, যা আজও বহমান। এদের চিকিৎসা ব্যবস্থাটার গোটাটাই দাঁড়িয়েছিল বা আছে ভেষজ খাদ্যাভ্যাসের উপরে। খুব ভুল না হলে যাযাবর আর্যদের আয়ুর্বেদের হাতেখড়ি অনার্যদের ভেষজ খাদ্যচর্চা থেকেই। আজও আদিবাসী সংস্কৃতিতে খাদ্যাভ্যাসের তেমন কিছুই পরিবর্তন সংগঠিত হয়নি, প্রায় আদি অকৃত্রিম রয়েছে। আমাদের ভারতীয় বাঙালি সমাজ আদিবাসীদের অবশ্য বাঙালি বলে স্বীকৃতিই দেয় না। সেই অর্থে বলতে গেলে আদিবাসীরা সংখ্যাতে সত্যিই অনেক কম, দুই পার মিলিয়ে বাঙালিদের মধ্যে মুসলমানেদের সংখ্যাই ৭০% এর বেশি- অথচ পশ্চিমবঙ্গীয় হিন্দুসমাজে কমিউনিস্ট বাদে প্রায় সকলেই ‘বাঙালি মানে’ শুধুই হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায়কেই বোঝে- নতুবা শুনতে হতো না “ওহ, আপনি মুসলমান, আমি ভেবেছিলাম বাঙালি”।

 ()

আহার কয় প্রকার, এটা জানতে হবে। কারন আমরা খাদ্য গ্রহনই করি আহার তথা জঠরাগ্নি নিবৃত্তির জন্য। শাস্ত্র বলছে- গঠনগতভাবে আহার দুই প্রকারের- স্থুল আহার ও সূক্ষ্ম আহার। স্থুল আহার ক্ষুন্নিবৃত্তি করে, এ থেকে মলমুত্র সহ ৩২ প্রকারের অশুচি উৎপাদিত হয়। আর সূক্ষ্ম আহার জঠরাগ্নিকে প্রজ্বলিত রাখে ও দেহ গঠিত করতে সাহায্য করে, এ থেকে তেজ বা শক্তি উৎপন্ন হয়। আহারে যে নিবৃত্তি লাভ হয় তা মূলত চার প্রকারের- প্রথম- ইন্দ্রিয় দ্বারা ভক্ষণ, যা অন্তরে সুখবেদনার সঞ্চার ঘটিয়ে মনকে উজ্জীবিত করে তোলে, চিত্ত বিশুদ্ধ হয়। দ্বিতীয়টি স্পর্শভক্ষণ, এতে হাতে করে খাদ্যদ্রব্য ছোঁয়া থেকে শুরু করে দাঁত দিয়ে চূর্ণ করে মলাশয় অবধি পৌঁছানো অবধি এই প্রক্রিয়া চলে। তৃতীয়ত- কবলীকার ভক্ষণ, তুমুল ক্ষুধাতৃষ্ণাক্রান্ত ব্যাক্তি হিতাহিত শূন্য হয়ে যখন গোগ্রাসে খাদ্য গ্রহণ করে তখন তার বৌদ্ধিক জ্ঞান লুপ্ত হয়, একেই কবলীকার আহার প্রণালী বলে। চতুর্থত হচ্ছে সুষম বা বিজ্ঞান আহার, যার মাঝে উপরোক্ত তিন ধরনের আহারের সুষম বন্টন থাকে।

যদি বলে খাদ্যের মূল বিভাগ কি! উত্তরে একটাই শব্দ আসবে- রুচি। যার যেমন রুচি সে তেমন খায়, আর এই রুচি তৈরিতে অনেকটা ভূমিকা থাকে পারিপার্শ্বিক সমাজ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের। বাঙালির মাঝে ইসলামায়নের পূর্বে ধরে নেওয়া যায় তারা সকলেই হিন্দু ছিল, সুতরাং সেই সমাজ আজ হিন্দু-মুসলমানে আড়াআড়ি ভাগ হলেও জিনগত রুচির বিলোপ ঘটেনি। শুধুমাত্র মুসলমান বলেই কেউ খুব বেশিদিন উত্তরপ্রদেশের আলিগড় কিম্বা আরবের মক্কার কোনো ঘরে দুদিনের বেশি তাদের স্থানীয় খাবার নিতে পারবেনা। সমস্ত স্বত্বা তখন ভাত ভাত করে আকুল হয়ে যাবে। বসিরহাটের হিন্দু ভাইটি ওপাড় বাংলার হানিফ শেখের বাড়িতে চাট্টি ভাত খেয়ে যতটা শান্তি পাবে, রাজস্থানের স্বজাতীয় কোনো হিন্দু বাড়িতে মোটেই সেই তৃপ্তি আসবেনা। তবে ধর্মীয় কারনে কারো রুচিতে গোমাংস পাপ, তো কারো রুচিতে গেঁড়ি গুগুলি সাপ- এভাবেই ধর্ম রুচিকে নিয়ন্ত্রণ করে সংক্ষিপ্ত করে দেয়।

আজকের ট্যেকস্যাভি প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরা যাদের জন্ম নতুন শতকে, ইন্টারনেটের কল্যাণে তারা বিশ্বনাগরিক। জনপ্রিয় কার্টুন আর বিজ্ঞাপনের দৌলতে তাদের নিজস্ব কোনো খাদ্যরূচিই নেই। তারা সপ্তাহে একবেলা ‘রাইস’ খায়, সকাল ১০টায় ব্রেকফার্ষ্টে কর্নফ্লেক্স কিম্বা মুসলি, দুপুরে নুডলস। বিকালের নাস্তায় পিৎজা পাস্তা, রাত্রে সুসি, ফো, হুমুস, বার্গার কিম্বা বাস্যান্ডুইচ। আউটিং বা গেটটুগেদারে ফ্রায়েড রাইস বা বিরিয়ানি- তাও সস দিয়ে। এরা কেউই ‘ফিস’ ছোঁয়না, বিষয়টাই নাকি ভীষণ ফিসি। মাংস বললে কেবল পোল্ট্রি মুরগিই বোঝে। এরা না বাঙালী না ভারতীয় না বিদেশী, এক আজব জগাখিচুড়ি। অথচ ইংরেজরা আসার আগে ভারতীয় সমাজে ছিল তিনবেলা খাবার অভ্যাস, কিন্তু তার কোনো নাম ছিলনা, না ছিল ধরাবাঁধা কোনো সময়জ্ঞান। ইংরেজ চলে গেছে, রেখে গেছে তাদের খাদ্যাভাসের বিভক্তির লেগাসি, এক্সট্রা লেজের মত। তারপরেও US টাইমধরে চলা বঙ্গপুঙ্গবেরা দুপুরে ব্রেকফার্ষ্ট করে আর ভোরে ডিনার। এখন তো আবার ‘ব্রাঞ্চ’ চলে এসেছে, উঁহু শাখাপ্রশাখা ওয়ালা ব্রাঞ্চ নয়- ব্রেকফার্ষ্ট ও লাঞ্চের ধরেমুড়ো সন্ধি- যা লাঞ্চও আবার ব্রেকফার্স্টও বটে। হয়ত এটা কোনো একটা যুগসন্ধিক্ষণ, ভেঙে গড়ে নতুন একটা রুচিধারার জন্ম হবে, তাই আমরা যারা সাবেক প্রজন্মের শেষ সলতে তাদের এগুলোতে মেনে নিতে এতোটা অসুবিধা হয়।

সনাতন বাঙালি খাবারে দুটো মুখ্য বিভাগ ছিল, যথা তামসিক ও রাজসিক। রাজসিক অবশ্যই রাজা ও তৎবর্গীয়দের জন্য, তামসিক ছিল সন্ন্যাসী ও অসহায় গরিবদের জন্য। এদেশে খ্রিস্টীয় খাবারের তেমন প্রচলন ঘটেনি যেমনটা লাতিনভূমে ঘটেছিল স্পেনীয়-পর্তুগীজ নামে। তবে ইসলাম পূর্ব যূগে ভারতভূমে হিন্দু ধর্মের চেয়েও বৌদ্ধ ধর্ম বেশি প্রচলিত ছিল, সেই বৌদ্ধ সমাজে দেব স্থানীয়দের জন্য যে খাদ্য প্রস্তুত হতো তার নাম ‘ওজ’। এই ওজ হচ্ছে অত্যন্ত পুষ্টিকর ভিটামিনযুক্ত খাবার যা সাধারণ মানুষের হজমের অনুপযুক্ত বলে প্রচারিত ছিল- বলাই বাহুল্য এই অতিরিক্ত পুষ্টি প্রাণীজ মাংস ও চর্বি থেকেই আসত। এখানে দেবতা মানে ঈশ্বর নয়, দেবতা কোনো সিদ্ধপুরুষ- যিনি নির্বাণ লাভ করেছেন। বৌদ্ধ বিশ্বাসে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই

প্রভু বুদ্ধের অন্তিম ভোজে ‘শূকরমাদ্ধব’ নামের একটি শুঁটকি মাংসের পদ ছিল, যা নাকি পচা ছিল। সেই খেয়ে বুদ্ধের আমাশয় রোগ হয় ও তাঁর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে। কেউ কেউ সেটাকে শূকরের মাংস না মানলেও অধিকাংশ বৌদ্ধ পণ্ডিত শূকরমাদ্ধবকে- শূকরের মাংসের শুঁটকি বলেই মত দিয়েছেন, কেউ কেউ মাশরুম বলে অবিহিত করেছেন। স্রোতাপন্ন আর্যশ্রাবকরা ভীষণ চালাক ছিলেন, তারা নিজেরা প্রাণীহত্যা করতেন না। কিন্তু সাধারণ লোকে প্রাণী হত্যা করে ভিক্ষুসংঘের জন্য খাদ্য তৈরি করে স্রোতাপন্ন আর্যশ্রাবকে পরিবেশন করলে তিনি চোব্য-চোষ্য-লেহ্য করে উদরস্থ করে নিতেন। আমার বলার উদ্দেশ্য, ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ বলা স্বয়ং বুদ্ধদেব নিজেই মাংস খেতেন ও আজকের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা অধিকাংশই মাছ-মাংস তথা প্রাণীজ প্রোটিন খান। মাংস খাওয়ার চল থাকলে বিবিধ প্রকারের রন্ধনশৈলীও ছিল নিশ্চিত। প্রামাণ্য দলিল না থাকার কারণে সে বিষয়ে বিশদে জানার উপায় নেই

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে ইসলামের প্রবর্তকেরা তথা আব্রাহামীয় ধর্মের সকল শাখাগুলিই মধ্যপ্রাচ্যের বেদুঈন-যাযাবরদের দ্বারা তৈরি ধর্মবিশ্বাস। যাদের বসবাস শুষ্ক মরু অঞ্চলে, মাংস আর দুধ ছাড়া খাদ্যের তেমন বিকল্প নেই। মশলার ভিন্নতা ও পরিমাণের তারতম্য হলেও সেখানেও মাংসের রন্ধনশৈলীর অভাব ছিল না। আজও আমাদের অধিকাংশ মাংস রন্ধনশৈলী সেই মধ্যপ্রাচ্যেরই, তবে তাতে ভারতীয় মশলা ও শিল্পী বাবুর্চিদের উদ্ভাবনী শিল্প মিশে আছে

বেদ-পুরাণে সাধারণ মানুষদের জন্য যব, তণ্ডুল ইত্যাদি শস্যের উল্লেখ রয়েছে। আর্যদের প্রধান খাদ্যই ছিল মাংস, বনজ ফলমূল, তিল, সুটিডাল আর দুধ, কারণ তারাও পশুপালক যাযাবর জাতিই ছিল। অথর্ববেদের ৪/১৪০/২ সূক্তে এটারই উল্লেখ রয়েছে।

ব্রীহী মত্তং যবমত্তোমথ তিলং

এষ বাং ভাগো নিহিতো রত্নম ধেয়ায় দন্তৌ মা হিংসিষ্টং পিতরং মাতরং চ”।

পরবর্তীতে আর্যরা বর্ষাকালে অস্থায়ী চাষাবাদ শিখলে যব ও গমজাতীয় দানা শস্য উৎপাদন করতে শিখলেও সবজি উৎপাদন শেখে অনেক পরে। ধান যেহেতু আদিবাসীদের শস্য ছিল তাই আর্যরা বহুদিন সেটা ছুঁয়েই দেখেনি। তাই বেদের এক্কেবারে শেষের দিকে ধানের কথা এসেছে। চাল সেই অর্থে বঙ্গ সমাজে আজও দেবতাদের ভোগে ভাত হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি, তাকে প্রসাদ নামে ডাকা হয়, আজও ভোজসভার আয়োজন করা হলে সেখানে লুচি খাওয়ানোটাই সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত কাজ, ভাত আসে শেষে কারণ তা নিকৃষ্ট। বৈদিক সমাজে মাংসের ব্যবহার যথেচ্ছভাবে ছিল, কিন্তু তা ব্রাহ্মণদের জন্য উপলব্ধ ছিল না প্রকাশ্যে।

ব্রাহ্মণেরা সারা বছর ফলমূল, দুধ, ঘি খেতেন, প্রাণীজ আমিষ ভক্ষণের জন্য যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করতেন বা বলা ভাল রাজাদের দ্বারা আয়োজন করাতেন ধর্মের নামে। সেই যজ্ঞের আগুনে ষাঁড়, বন্ধ্যা গাভী, মহিষ, পুরুষ ছাগল বা অজ মাংস ও বৃদ্ধ অশ্বের মাংসের রোস্ট তথা কাবাব বানান হতো বিশুদ্ধ ঘি সহযোগে। শাস্ত্রে একে ‘বলি প্রথা’ বলা হয়েছে। কোরবানি হোক বা বলি, খায় তো সেই মানুষই- সবই আসলে ধর্ম বাঁচিয়ে সস্তায় প্রাণীজ প্রোটিনের যোগাড় দেওয়ার ফিকির। তাছাড়া ঋষি-মুনি ও দেবতাদের দৈনন্দিন সান্ধ্য আসরে যে সোমলতার রস পান করা হতো- তার চাট বা চাখনা হিসাবে মাংসই থাকত। নতুবা ঋষি যাজ্ঞবাল্ক্য বলতেন না,অশ্নামি প্রবামহমংসলং চেৎভবতি”, অর্থাৎ গোমাংস যদি কোমল হয়; তবে এনে ভোজন করব। ঋগ্বেদ- ৩/২/২১

আমরা বাংলা দেশের লোক, যতই আজ দেশ ভাগ হয়ে যাক- দীর্ঘ বর্ষাকাল যুক্ত আবহাওয়ার গাঙ্গেয় অববাহিকার শতশত নদনদী, তাদের শাখানদী, উপনদীতে পুষ্ট। এই পলিপুষ্ট অঞ্চলে উর্বর জমির চেয়ে চাষের উপযুক্ত আর কিছু হয় না, স্বভাবতই এখানে বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় যে চাষযোগ্য নিরামিষ সবজি-ফসল খাওয়ার বিস্তার ঘটবে তাতে আর আশ্চর্য কী! তাছাড়া আমাদের এই স্যাঁতস্যাঁতে ঘর্মাক্ত আবহাওয়াতে পরপর দু'দিন পশুর মাংস খেলে তৃতীয় দিন আর কাজেকর্মে যেতে হবে না, টয়লেট এক প্রেম কথার নতুন পর্ব রচিত হবে। বঙ্গভূমের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নদনদী, খাল, বিল, বাঁওর, হাঁওরের মাছ আজও সহজলভ্য সাধারণ গরিব মানুষের কাছে, আর তার সাথে সমতল জমিতে সুলভে চাষের ধান- সুতরাং মাছে-ভাতে বাঙালি শব্দটাই একমাত্র যথাযথ বাঙালির জন্য। তবে সে মাছ রান্নাতে অবশ্যই পেঁয়াজ-রসুন ব্রাত্য ছিল

তা সত্ত্বেও আজকের বাঙালি হেঁসেলের জনপ্রিয় সবজি বেগুন, ঢেঁড়স, টম্যাটো, লঙ্কা, পেঁপে, আনারস, পেয়ারা, ভুট্টা, চিনেবাদাম কোনো কিছুই ছিল না অষ্টাদশ শতক অবধি, যেমন ছিল না আলু। ইউরোপীয় সাহেবরা এদেশের লাউ, ওল, কচু, মুলোর একঘেয়েমি থেকে নিস্তার পেতে ওই সবজিগুলোর আমদানি করে। এই ভাবেই মটরশুঁটি, গাজর, কুল জাতীয় ফলগুলো খাঁটি বাঙালির নিজস্ব খাবারে পরিণত হয়ে গেছে। এমনকি ছানা ও দই তৈরির কৌশলটিও বাঙালি শিখেছিল ফরাসডাঙার পর্তুগীজ সাহেবদের থেকে। সুতরাং, নিরামিষ রান্নাতে ছানা বা পনিরের ব্যবহারও কয়েকশো বছরের বেশি পুরাতন নয়। তবে হ্যাঁ, বাঙালির ইতিহাসের শুরু থেকেই তেঁতুল কিন্তু খাস বাঙালি খাবার, তাতে সে যতই এখন দক্ষিণ ভারতের খাবারের প্লেটের কোহিনুর হোক না কেন

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের আকালের সময় গম ছড়িয়ে পরে দেশব্যাপি, তার আগে অপ্রতুলতার কারনে বাঙালির কাছে গম মানে ছিলো ‘বড়লোকি’ ব্যাপার স্যাপার। বিয়ে, শ্রাদ্ধ বা যেকোনো অনুষ্ঠানে লুচি খাওয়াটাকে ঐতিহ্য ও আভিজাত্যর প্রতীক হিসাবে দেখা হতো। তাই খুব সম্পন্ন পরিবার ছাড়া বাঙালি কখনই রুটিতে অভ্যস্ত ছিল না, কারণ আমাদের যে প্রাচীন সাহিত্য সেখানে তাওয়ার উল্লেখ প্রায় নেই বললেই চলে। সর্বত্রই হাঁড়ির উপস্থিতি, বাসনকোসনের শুরুতেই হাঁড়িকুঁড়ি অর্থাৎ হাঁড়ি ও কড়াই আসবে, তারপর থালা, বাসন, বাটি, হাতা, খুন্তি ইত্যাদি। যেখানে ভাত খাওয়া হয় সেই সমাজেই একমাত্র হাঁড়ির দেখা মেলে, যেখানে ভাত নেই সেখানে আর যা কিছু থাকুক, হাঁড়ি পাওয়া যাবে না।

বেদে মাসকলাই ডালের উল্লেখ থাকলেও মধ্যযুগীয় সাহিত্য বা প্রাথমিক পর্যায়ের ইংরেজ আমলের লেখালেখিতে ডালের উল্লেখ পাওয়া যায় না। বস্তুত ইংরেজদের হাত ধরেই ‘লেন্টিলস ও বিনস’ এর বিস্তারে ডাল এসে ঢোকে বাঙালির হেঁসেলে, পরে বর্গিদের আক্রমণ নিত্য ঘটনা হয়ে গেলে তাদের শক্তির উৎস ‘ডাল’কে আপন করে নেয় বাঙালি, তাদেরই প্রতিরোধ করার জন্য। মধ্যযুগে বাংলার চিরাচরিত খাদ্যাভাসে যখন ঠিক বদলের রঙ ধরতে শুরু করেছে, ওদিকে ঢাকাকে কেন্দ্র করে মুসলমান সুলতান-নবাবেরা ক্ষমতার কেন্দ্র পত্তন করেছেন, এদিকে সেই তালে রয়েছে গৌড়- ঠিক সেই সময় শ্রী চৈতন্যের নেতৃত্বে বৈষ্ণব জীবনধারার প্রবর্তন ঘটে। এই বৈষ্ণবদের ধারাটা গোটাটাই কঠিন নিরামিষাশী হয়ে যায়।

প্রাণীজ আমিষের ঘাটতি ও একঘেঁয়ে নিরামিষ রান্নার মাঝে বৈচিত্র্যৈ আনতে বৈষ্ণব হিন্দু সমাজে এক বিপ্লব সংগঠিত হয়। ফল ও সবজির খোসা থেকে গাছ-লতা-গুল্মের ডগা, কাণ্ড, শিকড়, ফুল, পাতা সব কিছু দিয়ে বিবিধ ব্যঞ্জন বানানো শুরু করে। রন্ধনশৈলীতেও আসে আমুল পরিবর্তন। নিজেদের সনাতন পদ্ধতির সাথে বিজাতীয় যবনধারার মিশ্রণ ঘটায় প্রণালীতে। রাঁধতে শেখে- ভাজা, সিদ্ধ, পোড়া, শুক্তো, ঘণ্ট, ছ্যাঁচড়া, ছেঁচকি, চচ্চড়ি, ছক্কা, ছোকা, ঘ্যাঁট, লাবড়া, ঝাল, ঝোল, ভাপা, ডালনা, দোলমা, অম্বল, টক... এ দীর্ঘ অভিধান। খাদ্য সংস্কৃতি হলো জাতির আত্মপরিচিতি, আজ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে জাতিতে খণ্ডিত করে দেওয়া হলেও স্বাদে আজও দুই বাংলা এক পাতেই রয়ে গেছে। ইলিশের মুড়ো দিয়ে কচুর শাক হোক বা ডুমোডুমো লাউ দিয়ে জিড়ের ফোঁড়নের সোনা মুগের ডাল- হাপুস হুপুস শব্দে দুই পাড়ের মানুষেরই তৃপ্তির ভাত পেটে ঢুকে যায়

শাসক যেহেতু মুসলমান, তাই সাধারণ অবৈষ্ণব ও অব্রাহ্মণ হিন্দুদের খাদ্যচর্চাতে মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনের প্রচলন ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। হিং ও আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, কিন্তু বৈষ্ণবরা সেটাকে গ্রহণ করে নিরামিষ হিসাবে। স্মৃতিশাস্ত্রকে উপেক্ষা করে আজও দুর্গা পুজোয় মাংস রান্না হয়, তবে পেঁয়াজ-রসুন না দিয়ে। শাস্ত্রের মান রক্ষা করা হয়। জাত একবারই যায়, দ্বিতীয়বার নয়। সেই সূত্র মেনেই বাঙালি বাবু তথা মধ্যবিত্ত সমাজ অতি সহজেই বিদেশী চপ, কাটলেট, ফ্রাই, স্টু এর সংস্কৃতিতে নিজেকে জারিত করে নেয় যখন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসকের দলেরা এদেশে আসে।

বলা যেতে পারে, মুসলমানেরা বঙ্গদেশে এসেই মাছ খাওয়া শিখেছিল বাঙালির কাছে। ব্রিটিশদেরও মাছ-মাংস রান্নাতে তেমন বেশি পদের বিকল্প ছিল না। মাছ মানেই ফ্রাই তথা ভেজে খাওয়া, আর মাংস হয় শুঁটকি করে খাওয়া বা সেঁকে কাবাব বানিয়ে খেতো। ভারতীয় মশলার কল্যাণেই তাদের কারি অতটা সুস্বাদু হয়, সাধে কি আর ভাস্ক-দ্য-গামা মশলার জন্য অজানা সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিল অচেনা ভারতের সন্ধানে। রসনা তৃপ্তির চেয়ে তৃপ্তি জীবনে আর কীসেই বা আসে। কবিকঙ্কন বড় দর্শনতত্ত্ব দিয়ে লিখে গেছেন- যে মহিলা তৃপ্তিদায়ী ব্যঞ্জন রাঁধতে জানল না, সে সংসারের কিছুই জানল না

তেতো, নোনতা, ঝাল, টক, ও মিষ্টি- এই পঞ্চ স্বাদের খাদ্য সামগ্রী আমাদের বাঙালি খাবারের মূল বৈশিষ্ট্য। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে একটা আম বাঙালি পরিবারে সবজি ও মাছ রান্না প্রায় সমগোত্রীয়, কেবল হিন্দুদের রান্নার ফোঁড়ন বৈচিত্র্য বেশি। সেই তুলনাতে মাংস রান্নাতে মুসলমান পরিবারগুলো বেশ কয়েক যোজন এগিয়ে থাকে মশলার ব্যবহার কৌশল ও বিবিধ বিকল্প প্রণালীর দৌলতে। আজকাল মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের ঘরে দক্ষিণ ভারতীয় পোহা, উপমা, ইডলি, ধোসা সহ চাইনিস নুডলস, ইতালিয়ান পাস্তা সহ কত রকমারি খাবারেরই না সমাবেশ ঘটেছে। আসলে খাদ্যাভ্যাস একটা প্রবাহিত নদীর মতো, যত বেশি পথ চলবে তত শাখা-প্রশাখারা এসে মিলিত হবে ও মিলেমিশে নিজস্ব ধারা তৈরি হবে। যেমন ধরুন- কোলকাতার ফুটপাতের ওই অপুর্ব স্বাদওয়ালা চাউমিন- দুনিয়ার কোথাও পাবেন না। খোদ চিনা-জাপানিরাও এভাবে ভেজে ডিম-মাংস-ফুলকপি-গাজর দিয়ে নুডুলস খায় নাকোলকাতায় চাইনিস স্ট্রিট ফুডের নামে যে পদ গুলো বিক্রি হয়, আসল চিনারা জানতে পারলে নিশ্চিত মানহানির মামলা করতো।

সভ্যতার শুরুতে যখন দেশ ছিল না তখন মানুষ কাঁচা খেতো। তারপর আগুনে ব্যবহার শিখলে পুড়িয়ে খেতে শিখল, ক্রমান্বয়ে শিখল সিদ্ধ করে খেতে। সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে ভেজে খাওয়া। লিখিত সভ্যতার ১০ হাজার বছরের বিবর্তনে মূলত এই চারটেই মূল খাদ্যধারা। বাঙালি এই চারটেতেই রয়েছে। এক খঞ্চা আদর্শ বিরিয়ানিতেও এই চারটিই রয়েছে। সিদ্ধ চালের উপরে ভাজা পেঁয়াজ বেরেস্তা তার উপরে কাঁচা স্যালাড- আর একপ্লেট পোড়া মাংস অর্থাৎ কাবাব। ব্যাস আর কী চাই! এই কারণেই ইতিহাস, ভূগোল, বাঙালি সবকিছু মিশে গেছে বিরিয়ানিতে

বিরিয়ানি জন্দাবাদ

অকপট জিন্দাবাদ

 

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...