সমকাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমকাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঘৃণার যাত্রাপথঃ স্টেট স্পনসর্ড টেরোরিজম ও RSS

 


ধর্মীয় শোভাযাত্রা এখন দাঙ্গা বাঁধানোর মূল অস্ত্র, নাগপুরের হিন্দুত্ব আধিপত্যবাদীরা ভারতের আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করছে দিয়েছে; যার মেরামতিতে কয়েকটা দশক লাগবে এদের সম্পূর্ণ নির্মূলকরনের পরেও। 

RSS এর কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোকে- নূন্যতম ১০ মিনিট হলেও স্থানীয় কোনো মসজিদের সামনে এসে ডিজে বাজিয়ে উদ্দাম নাচনকোঁদন, বাজি ফাটানো, তীব্র ঘৃণাসূচক স্লোগান দিতেই হবে। এর উপরেই তাদের অস্তিত্ব টিকে আছে; যেখানে মুসলমান আর মসজিদ অপসন নেই, সেখানে এদেরকে আদিবাদী ও ব্রাহ্মণ ব্যতিত অন্যান্য ‘ছোট জাতের’ হিন্দুদের উপরে আক্রমণ করতে হবে। এসবের পেছনে রাজনৈতিক সিদ্ধি লাভের অঙ্ক ছাড়া কিচ্ছুটি নেই, নুন্যতম সামাজিক কিম্বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য খোঁজা অর্থহীন সময় নষ্ট। একটা সময় অবধি এই ধরনের ঘটনাগুলো মূলত রাম নবমী, হনুমান জয়ন্তী জাতীয় হাতেগোনা অনুষ্ঠানের দিনেই সীমাবদ্ধ ছিলো, আজ ১২ বছর ধরে মহাদানবের শাসনের পর- যে কোনো উঠতি হিন্দুত্ববাদী নেতা, যার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রবল, কিম্বা যে নেতার সদ্য ডিমোশন হয়েছে, তাদেরকে লাইমলাইটে আসতে গেলে একটাই সহজ পথ; মসজিদের সামনে গিয়ে তান্ডব করো কিম্বা কোনো গরীব মুসলমানকে প্রকাশ্যে হেনস্থা করো। এই পদ্ধতিতে, বিজেপির আদর্শগত অভিভাবক ‘সঙ্ঘ পরিবারের’ নেক নজরে এলেই, তাকে সরাসরি সরকার ও প্রশাসনের উচ্চপদে নিয়োগ দিয়ে পুরষ্কিত করা হচ্ছে প্রতিটা ক্ষেত্রে।

মুসোলিনির ফ্যাসিস্টদের প্রতি মোহগ্রস্ত কিছু গোঁড়া ও সুবিধাবাদী বেইমানদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত RSS হলো হিন্দু আধিপত্যবাদের মোড়কে নিকৃষ্ট উগ্র জাতীয়তাবাদীর জনক, যারা রাজনীতি করে ধর্মের বর্ম বানিয়ে। ইহুদী জায়োনিজম ছাড়া আজকের পৃথিবীতে RSS-এর মতো এমন ইতর প্রতিরূপ খুঁজে পাওয়া কঠিন। ভারতীয় হিন্দু ধর্মতত্ত্বের উৎসের দিকে তাকালে দেখবেন- এটা সেই অর্থে শ্রেণিবদ্ধ ও কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত কোনো ধর্ম ব্যবস্থা নয়, বিবিধতাই এর মূল পরিচয়বাহক। কিন্তু ব্রাহ্মন্যবাদী যাজক সম্প্রদায় RSS এর রূপে এসে; এই বহুত্ববাদী ধর্মতত্ত্বকেই রাষ্ট্রপরিচালনার একটি প্রকল্পে রূপান্তরিত করেছে। হিন্দুধর্মের কোনো প্রধান মন্দির নেই, যেমন ক্যাথলিকদের ভ্যাটিকান বা মুসলমানদের মক্কা-মদিনা আছে। হিন্দুধর্মে পোপের মত কোনো একক ধর্মগুরু নেই যার একক বাণীই ধর্মের শেষ কথা। RSS ঠিক এই সুযোগোটাকেই লুফে নিয়েছে, নিজেদেরকে হিন্দু ধর্মতাত্ত্বিক নিয়ামক বানানোর প্রচেষ্টাতে লেগে রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের জন্য ‘হিন্দু-রাষ্ট্র’ স্থাপনের মাধ্যমে ধর্মীয় সুড়সুড়ি তাদের প্রধান অস্ত্র। এখন হিন্দুরাষ্ট্র বানাবার প্রথম ধাপ কি? মুসলমান ও তাদের ধর্মীয় উপাসনাস্থল মসজিদে আক্রমণ। এখান থেকে অশান্তির মূল শুরু।

মসজিদের সামনে নেচে জাতিগতভাবে হিন্দু ধর্মের কোন উন্নতি আজ অবধি হয়েছে? মানে বিজেপির নেতাদের ছাড়া আম হিন্দুর কোনো লাভ হয়েছে? উস্কানিমূলক আচরণের মাধ্যমেই ‘সঙ্ঘ সংশ্লিষ্ট’ গোষ্ঠীগুলো ঘৃণার বারুদ ভরা শব্দে শাওয়ার হয়ে গোটা দেশজুড়ে তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য বা ক্ষমতা প্রদর্শন করে চলেছে। মূলত কোনো বড় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক মেরুকরনের জন্য ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরি করে এরা, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট হয়। যারা মনের মাঝে ইসলামোফোবিয়া পালন করে, সেই ভোটব্যাংক শক্তিশালী হয় এই বিভিষীকা দেখে। উস্কানি ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি এদের অন্যতম উদ্দেশ্য, যাতে অপর পক্ষকে উত্তেজিত করে কোনো হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়ায় জড়িয়ে যায়। তখন সেটাকেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেওয়া সহজ হয়। এর মাধ্যমে মুসলমান সম্প্রদায়ের মনে ভয় বা নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করা যায় সহজে, যাতে তারা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তৃতীয় শ্রেনীর নাগরিক হয়ে যায়।

আর এই সবকিছুকে নির্মান করা হয় জাতীয়তাবাদের গাঁজা খাইয়ে। ‘জয় শ্রীরাম’ যেমন বিজেপির রাজনৈতিক স্লোগান, ‘ভারত মাতা কি জয়’ও তাদের রাজনৈতিক স্লোগানের অংশ বর্তমানে। কট্টরপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাবধারা থেকে সর্বসমক্ষে অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের সামনে নিজেদের ধর্মীয় শক্তির প্রকাশ ঘটানো এখন প্রতিটা বিজেপি সরকারের বীরত্বের প্রতীক। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার যে কাঠামো ছিলো, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সম্প্রীতি ছিলো, তা এই বারো বছরে শুধু ক্ষতিগ্রস্তই হয়নি, অনেকটা তলিয়ে গেছে। ঘৃণার বিষ সমাজের কয়েকটা প্রজন্মের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে- চাইলেই যা রাতারাতি উদ্ধার করা যাবেনা। 

কয়েকটা উদাহরণ দেখুন, এই সেপ্টেম্বর ২০২৬ এর; উত্তর প্রদেশর মিরাট শহরের ঐতিহাসিক শাহী জামা মসজিদ নাকি সম্রাট অশোকের আমলের একটি মঠ ধ্বংস করে নির্মাণ করা হয়েছিল। একজন নাগপুরী জঙ্গি রামকুমার শর্মার অভিযোগের ভিত্তিতে মসজিদটিতে তালা লাগিয়ে দিতে বলেছিলো নিম্ন আদালত, স্থানীয় প্রশাসন যথারীতি বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যের শতবর্ষ প্রাচীন ব্রিটিশ আমলের শাহারানপুর মসজিদে বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছে, একই জমিতে একই সময়ে নির্মিত মন্দিরটি অক্ষত রয়েছে। ওদিকে মোরাদাবাদ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ স্থানীয় মুস্তাফা মসজিদের তত্ত্বাবধায়কে ভবনের নকশা চেয়ে একটি নোটিশ জারি করেছে। এটাকেও যেকোনো দিন ভেঙে দেবে, তার আগে একটু আইনি আইনি খেলার নকশা না করলে কেমন যেন মজা আসেনা। অথচ একই মালিকের দান করা জমিতে এই মোরাদাবাদ জামা মসজিদের ঠিক পাশেই থাকা জৈন মন্দির নিয়ে না হিন্দুত্বের রক্ষাকর্তা না প্রশাসন- কারো কোনো সমস্যা নেই।

মহারাষ্ট্রের অচলপুরে কানওয়ার যাত্রার সময় স্থানীয় একটি মসজিদের সামনে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান সম্বলিত যাত্রাপালাটি প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ নভনীত রানা এবং বিজেপি বিধায়ক প্রবীণ তায়েদের উপস্থিতিতে চলেছে। বেশ কয়েকঘন্টা ধরে মসজিদ অবরুদ্ধ রেখে, সেখানে হনুমান চালিসা পাঠ করা হয়। সবচেয়ে মজা হলো পুলিশ ও প্রশাসন এই নির্দিষ্ট গেরুয়া জঙ্গিদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়, যাতে তারা সুশৃঙ্খল ভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। আগামীতে যখন ইতিহাস লেখা হবে, স্টেট স্পনসর্ড টেরোরিজম কাকে বলে, এই গুলো প্রতিটার উল্লেখ থাকবে আগামীর গবেষকদের জন্য।

গবেষনা প্রসঙ্গে বলি, Routes of Wrath: Weaponizing Religious Processions নামের একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিলো- ‘সিটিজেন অ্যান্ড লইয়ার্স ইনিশিয়েটিভ’ দের দ্বারা। Weaponizing Religious Processions: Communal Violence During Ram Navami and Hanuman Jayanti (April 2022) শীর্ষক এই রিপোর্টে বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে RSS ও নানান শাখাগুলো পরিকল্পিত দাঙ্গা বাঁধায়, দাঙ্গার নেপথ্যভূমি কী থাকে, পুলিশ-প্রশাসনই-বা কী ভূমিকা নেয়, কারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি আর মিডিয়াই-বা কী ভূমিকা পালন করে। পারলে রিপোর্টটি অবশ্যই পড়ে দেখবেন। 

মন্দির নয়, মসজিদই হচ্ছে RSS এবং তার হিন্দুত্ববাদী শাখা সংগঠনগুলির মূল উপাসনালয়, মুসলমান বিরোধিতার এক ভয়ঙ্কর শাণিত অস্ত্র। এরা মন্দিরে সাধন ভজন করুক বা না করুক, মসজিদের সামনে এসে নাচতেই হবে, নাহলেই ‘হিন্দু খতরেমে হ্যাঁয়’। হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ফায়দার লক্ষ্যে মুসলমানদের আক্রমণ আর থকথকে ঘৃণা মেশানো বিষাক্ত স্লোগান একে অপরের পরিপূরক, যে শোভাযাত্রার রঙ গেরুয়া। যে রং আবহমানকাল ধরে ভারতীয় সন্ন্যাসীদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার প্রতীক, যে রং ভারতের জাতীয় পতাকার অঙ্গ- সেই গেরুয়া আজ ঘৃণা, বিদ্বেষ, ভয়, ধ্বংস, দাঙ্গা, হত্যা, বুলডোজারের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। চেতনাহীন উন্মত্ত কিছু যুবক-যুবতী, তাদের উন্মাদ-তাণ্ডব নাচ, হাতে হাতে নাচে যুগপৎ ধারালো অস্ত্রশস্ত্র, লাঠিসোটা, আগ্নেয়াস্ত্র- আর জারিকেন ভরা সহজদাহ্য জ্বালানি। 

RSS স্বীকৃত একদল জঙ্গি গেরুয়া রংটাকে অবলম্বন করে সমস্ত তাণ্ডব গুলো চালাচ্ছে। গৌতম বুদ্ধের চীবর, শংকরাচার্য, স্বামী বিবেকানন্দ সহ রামকৃষ্ণ মিশন বা ভারত সেবাশ্রম- সকলে গেরুয়া রং ব্যবহার করে এই রংকে শান্তির প্রতীক হিসাবে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছেন। ব্যক্তিগত সংসার, সম্পদ, ভোগ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের জীবন ত্যাগ করে তবে নিজেকে প্রকৃত গেরুয়া রঙে রাঙানো যায়। RSS এর দূর্বৃত্তের দল নিজেদের নিকৃষ্ট উদ্দেশ্য ও ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে- হিন্দুত্বের অস্তিত্ব ও চলমান আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে পড়ে গিরগিটির মতো গেরুয়া রঙে নিজেদের ছাপিয়ে নিজেদের বাঁচিয়ে রেখেছে।

রং বিভাজনের যে নিকৃষ্ট খেলা, যেটার সফল পরীক্ষা তৃণমূল কংগ্রেসের মাধ্যমে বাঙলাতে করিয়েছিল RSS, সেটা আজ বাঙালির মননে ঢুকে গেছে। একটা রাজনৈতিক দলের পতাকা তৈরি হয়েছে কংগ্রেসের পতাকাকে চুরি করে, যেখানে নীল সাদা রঙের কোন অস্তিত্বই নেই, অথচ তৃণমূল নামক দলটির অস্তিত্ব টিকে আছে নীল সাদা রঙের মধ্যে। এই নিকৃষ্ট সাম্প্রদায়িক মানসিকতা সমাজের নিচের দিকে একশ্রেনীর লুম্পেন তৈরি করেছে বলে ভুল হবে, বাঙালি সমাজের মাথা থেকে পা অবধি বায়োলজিক্যাল ফর্মটা চেঞ্জ হয়ে গেছে। পৃথিবীর যে কোন দেশে রেড কার্পেট বিছানোর মাধ্যমে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়। এটাই সভ্যতার গতিপথের অভিমুখ, মানুষ যেমন উল্টোদিকে হাঁটতে পারে না, সিগন্যালের আলো লাল, হলুদ আর সবুজের বাইরে অন্য কিছু ব্যবহার করতে পারেনা- তেমনই রেড কার্পেটও একটা একক। অথচ একদল অজ গেরুয়া রঙের কার্পেট বিছিয়ে পুরনো নীল সাদা মূর্খ ঐতিহ্যের উত্তরসূরী হতে চাইছে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা সুপরিকল্পিত।
রামনবমী তো রামের জন্মোৎসব পালন, কোথায় সেই ধার্মিক আদি দেবতা সূর্যকে জলদান? কোথায় অধর্মের বিনাশ আর শুভশক্তির জয় আকাঙ্ক্ষায় উপবাস, বৈদিক মন্ত্র, রাম কাহিনি পাঠ! কোথায় রামভজন! নাগপুরের হিন্দুত্বে পরিভাষায় তা এখন শুধুই মসজিদ কেন্দ্রিক, যার মূল মন্ত্র হচ্ছে মুসলমান বিদ্বেষ ও তীব্র ঘৃণাসূচক গালিগালাজ। এই ধর্মোন্মাদদের চরম অধর্ম আর অশুভ পরধর্ম বিদ্বেষ দেখে, জানিনা কতজন প্রকৃত ধর্মপ্রাণ হিন্দু শিউরে উঠছেন, কিন্তু এটাই আজকের ভারতীয় মুসলমানদের রোজনামচা। 

অথচ, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উচিৎ ছিল সংবিধান মানা। সংবিধানের মৌলিক অধিকার রক্ষা, নাগরিকের কর্তব্য পালন, আইনসভার সদর্থক প্রতিক্রিয়া, সমঅধিকারে সংখ্যালঘুর বাঁচার শর্ত, নিজ ধর্ম পালনের অধিকার- এগুলোই তো সংবিধান। কিন্তু রাষ্ট্র নিজেই যখন ধর্মীয় সন্ত্রাসকে হাতিয়ার বানায়- তার বর্তমান রাষ্ট্রচালককে ক্ষমতায় চির অমর করে রাখতে, তখন আইন অন্ধ হয়ে যায়, প্রশাসন সন্ত্রাসীদের সুরক্ষা দেয়। তবে না দেশ জুড়ে এই ঘৃণার শোভাযাত্রার অনুমতি পায়, এবং আইন ধৃতরাষ্ট্র সেজে থাকে। দেশের আলপথ থেকে রাজপথ, ঝুপড়ি-বস্তি, মহল্লার পর মহল্লা সর্বত্র এই ঘৃণার ছত্রাক পৌঁছে দিয়েছে RSS, তার বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরঙ দল, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ এমন হরেক কিসিমের হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি শাখা সংগঠনগুলোর মাধ্যমে। এ যদি রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ না হয়, তবে সন্ত্রাসবাদ সংজ্ঞা কী কেউ বোঝাবেন?

প্রতিটা দাঙ্গার নিখুঁত তথ্য উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরন গচ্ছিত রয়েছে প্রশাসন ও আদালতের কাছে। তার পরেও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি পুলিশ-প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দল বা সরকারের মদতে একের পর এক সংখ্যালঘুর উপরে অত্যাচার ও দাঙ্গা সংঘটিত করে চলেছে- দেশের সর্বোচ্চ আদালত অবধি নিশ্চুপ, এর চেয়ে বড় তামাশা আর কি হতে পারে! বিগত ১৫ বছরে উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, দিল্লি ও উত্তরাখণ্ডে, এই নাগপুরী আদর্শের গুন্ডাদের হাতে আক্রান্তদের শেষ সম্বলটুকুও ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসন-পুলিশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বুলডোজার নামিয়ে প্রমাণ লোপাট করে দিয়েছে। উপরে উল্লেখিত রিপোর্টটির সম্পাদক, সিনিয়র অ্যাডভোকেট চন্দর উদয় সিং প্রমাণ সহ দেখিয়েছেন- কীভাবে বিগত ৭৮ বছরে স্বাধীন ভারতে ধর্মীয় শোভাযাত্রাকে দাঙ্গা বাঁধানোর অস্ত্র হিসাবে বারবার ব্যবহার করেছে RSS এর হিন্দুত্ববাদী জঙ্গীরা। 

ঔপনিবেশিক সময়ে ১৮৬০ সালে প্রথম ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধি চালু হয়। তার ১৮৮ ধারায় বলা হয়েছে, প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট রাস্তা ছাড়া ধর্মীয় শোভাযাত্রা, মিছিল করলে, এবং তার জন্য যদি দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হয় তবে, যারা জেনেবুঝে ওই রাস্তায় মিছিল  করেছে তা্রা ঐ ধারা মোতাবেক অপরাধী। ১৫৩ ধারায় বলা হয়েছে, দাঙ্গা ঘটানোর জন্য  প্ররোচনা দেওয়া হলে ৬ মাস জেল এবং সেই প্ররোচনার ফলে দাঙ্গা ঘটলে এক বছরের কারাদণ্ড হবে। প্রতিটা দাঙ্গার ক্ষেত্রেই সংবেদনশীল অঞ্চল দিয়ে মিছিল নিয়ে যাওয়া এবং প্ররোচনা বা উস্কানি দেওয়ার ব্যাপারটা মুখ্য ছিল। পুলিশ-প্রশাসনের দুর্বলচিত্ততা, হিন্দুত্ববাদীদের প্রতি প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ও গোপন বোঝাপড়াই মূলত এই হানাহানির পিছনে কাজ করে। আইন-আদালত উপেক্ষা করে দাঙ্গাহাঙ্গামার প্রত্যুত্তরে পুলিশ-প্রশাসনের শিখণ্ডীর ভূমিকাই সবচেয়ে বেশী দোষী।

একটা সময় সরকার ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা দাঙ্গা ঘটলে তীব্র দুঃখ ব্যক্ত করতেন, দাঙ্গার কারণ নির্ধারণ করতে তদন্ত কমিশন বসানো হত এবং দাঙ্গার শিকার ব্যক্তিদের জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হত। বিজেপির আমলে সরকার অস্বীকার করার সহজ পন্থা নিয়েছে, এবং নানান হাস্যকর ‘আপাত অজুহাতের’ দায় দেখিয়ে লজ্জার আবরনটুকুও ঝেড়ে ফেলেছে। এখানেই থেমে না থেকে, অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে দাঙ্গাকারীদের রাজনৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে MLA/MP বা মন্ত্রী বানিয়ে। তদন্ত কমিশনের বদলে বুলডোজার পাঠিয়েছে সংশ্লিষ্ট মুসলমান মহল্লার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, জীবন-জীবিকা, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য। এক্ষেত্রে আদালত অব্ধি বিচার যাওয়ার আগেই, স্থানীয় প্রশাসন ও বিজেপির নেতৃত্বই- বিচারক ও জুরির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে যায়, পুলিশ এখানে বুলডোজার বাহিনীর সর্দার হয়ে ফাঁসুড়ের ভূমিকা পালন করে দক্ষতার সাথে। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উচ্ছেদ, ধ্বংসাত্মক কাজকে ধামাচাপা দেওয়া, লন্ডভন্ড অবস্থা সাফসুতরো করার জন্য- স্থানীয় পঞ্চায়েত বা পুর কর্তৃপক্ষকে দিয়ে, নিজেরা দাঁড়িয়ে থেকে পুলিশ এগুলোকে সুচারুভাবে সম্পন্ন করায়।
আদালত ও পুলিশ প্রশাসনের বাইরে আর যার অবদান সবচেয়ে বেশী এই মসজিদ সংস্কৃতিতে, তা হলো Archaeological Survey of India নামক সংস্থার। বিজ্ঞান ও পুরাতাত্ত্বিক প্রমানের চেয়ে, Religious outcomes আর public sentiment বেশি গুরুত্বপূর্ণ এদের কাছে; কারন এগুলোই রাষ্ট্রীয়ভাবে হিন্দুত্বের মিথ মেকিং টুল হিসাবে কাজ করে। ASI অফিসিয়ালি লিখিত বিবৃতি দেয়না শুরুতে, স্ট্রাটেজিক লিক, সিলেক্টিভ ডিসক্লোজার দিয়েই ব্রেকিং নিউজ চালিয়ে জনমত বানিয়ে টিভি মিডিয়া বিশেষজ্ঞর দল সমাজে ছড়িয়ে দেয়। এটাই হিন্দুত্ব আর্কিওলজি, যারা অতীতকে আবিষ্কার করেনা, অতীতকে প্রোডিউস করে। ফলত, ASI বর্তমানে আর্কিওলজিকাল সংস্থা থেকে আইডিওলজিক্যাল সংস্থায় রুপান্তরিত হয়ে গেছে, যার মূল কাজ মসজিদের নিচে দেবদেবীর মূর্তি খোঁজা; অথচ ভারত একসময় সামগ্রিকভাবে বৌদ্ধদের দেশ ছিল, তাদের মনাস্ট্রি আর মঠ গুলোকে কারা ভেঙেছে বা দখল করেছে? মিডিয়ার তৈরি এই হিন্দুত্বের হাওয়া বেলুনের গ্যাস ততক্ষণ, যতক্ষন বর্তমান ফর্মে মিডিয়া এগজিস্ট করবে, মিডিয়ার ঘটি উল্টালেই এই নাগপুরী হিন্দুত্বের বেলুন ফেঁসে যাবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এই উগ্রবাদীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি, সেখানেও রোজ চরম সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে হয়েছে মুসলমান ও দলিতেরা। কখনও কখনও লোহার রড, ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে। এরা প্রশিক্ষিত দুষ্কৃতির মত মুখোশে ঢেকে আসে, যারা প্রত্যেকে অখিল ভারতীয় বিদ্যা পরিষদ (এবিভিপি) এর সদস্য; যারা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) যুব শাখা। বিজেপির নয় কিন্তু, সরাসরি RSS এর যুবশাখা। বাংলার বামেরা আজও এই তফাৎ টিকে আত্মস্থ করতে পারেনি। বাংলার কথা উঠাতে বলি, খোদ কোলকাতার বুকে কাশিপুরের জ্যোতিনগরের একটি মুসলিম-প্রধান কলোনি, যেখানে সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষের বাস, সেখানে গত ২৯শে জুলাই থেকে বিজেপি সরকার পানীয় জল বন্ধ করে রেখেছে। এদের অনুশোচনা, লজ্জা, সহানুভূতি কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই, সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে।

সন্ত্রাসীদের মুখ আর মুখোশ সবসময়েই আলাদা হয়, তাই RSS নিজে কোনো নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ না নিয়ে, বিজেপির মুখোশে এই কাজটা করে। গত এক শতাব্দী ধরে গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্র (প্রয়োজন ফুরানো বা বেঁকে বসা নিজেদের নেতাকেও), সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে দাঙ্গায় উস্কানি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপেরর মাধ্যমেই এরা আজ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন। কিন্তু চুরি, দুর্নীতি, হিংসা, সাম্প্রদায়িক হানাহানির সাথে তীব্র মূল্যবৃদ্ধি, বেকরত্বের জ্বালা ধর্মের নেশা কাটিয়ে দিয়েছে অনেকটাই- যারা কয়েক বছর আগেও RSS এরই সমর্থক ছিল। গরু শুয়োর, মন্দির মসজিদ আর পাকিস্তানের বাইরে তারা তিনটে লাইন বলতে পারবেনা, বড় অংশের জনগন বুঝেছে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির বাইরে এই অশিক্ষিত জীবাণুগুলোর আর দেওয়ার কিছুই নেই। সামনেই, উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে বিজেপি শোচনীয় পরাজয়ের মুখে, ফলত নতুন করে মসজিদের সামনে এই নাচ, গান, উস্কানি দিয়ে- দাঙ্গা লাগাবার ষড়যন্ত্র করছে।

এদের তৈরি জম্বিরা আজকে মনিপুরীকে শিক্ষককেও ছাড়ছেনা। ২ দিন আগে রাস্তায় বাড়ির সামনের শব্দদূষনের প্রতিবাদ করায় একজন ঐ মনিপুরী সঙ্গীত শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করে দিয়েছে। আইনের শাসন উবে গিয়ে এই সন্ত্রাসই এখন সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অত্যাচার সংস্কৃতির কথা আসলে, পশ্চিমবাংলায় গত বিধানসভা ভোটের সময় বাঙালী নিগ্রহ একটা পপুলার কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। লেখক ললিত ভাচানির ‘দ্য মেন ইন দ্য ট্রি’ (২০০২) বইতে উনি বিপুল তথ্য সহ লিখেছেন, কীভাবে RSS- আম হিন্দুদের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভ সৃষ্টির লক্ষ্যে মুসলিমদের ছদ্মবেশ ধারণ করে হিন্দুদের উপরে আক্রমণ অত্যাচার করেছে। বিগত ১০০ বছর ধরে RSS এর এটাই চরিত্র, আগে এটি করা হতো সংবাদপত্র, পোস্টার ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে, এখন হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটি।

১৪৭ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশে, শুধু মসজিদই কি অবৈধ? মন্দির বা গির্জা নয়? প্রতিটা রাস্তার মোড়ে মোড়ে অবৈধ মন্দির রয়েছে, যেমন অবৈধ মাজারও রয়েছে। আইন কি শুধু মসজিদ আর মাজারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? নিম্ন আদালত গুলোও আজকাল ভারতীয় সংবিধানের চেয়ে নাগপুরী আদর্শের ভিত্তিতেই অধিকাংশ রায়দান করছে। যেখানে চার্চও রক্ষা পাচ্ছেনা, সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের পিমপ্রি-চিঞ্চওয়াড় এর ‘জিসাস ইজ লর্ড’ নামের চার্চকে দুপুরে বেআইনি আখ্যা দিয়ে মধ্যরাতেই ভেঙে ফেলা হয়, অথচ পরদিন যতক্ষণে আদালতের স্থগিতাদেশ নোটিশ আসে, ততক্ষণে ভবনটি ময়দান হয়ে গেছে। উড়িষ্যা, ছত্রিশগড়, মহারাষ্ট্র কোথায় খ্রীষ্টানদের উপরে হামলা হচ্ছেনা? RSS কে অনুকরন করতে গিয়ে, RSS এর ঘৃণার আদর্শে দীক্ষিত কোনো এক নিকৃষ্ট মোল্লা ভিড় রাস্তাতে নামাজ শুরু করে দিচ্ছে। 

আইন সবার জন্য এক হোক, রাস্তায় নামাজ পরা মুসলমানটিকে যেমন আইনের আওতাতে নিয়ে সাজা দেওয়া হোক, মসজিদের সামনে উন্মাদ নাচ করা জঙ্গীগুলোকেও আইনের আওতাতে নিয়ে আসা হোক। সময় কিন্তু সর্বদা নিজের অনুকুলে থাকেনা, নদীর এক পাড় ভাঙে, অন্য পাড় গড়ে। আজ RSS শক্তিশালী, অত্যাচার করে নিচ্ছে- কাল যখন সুখের দিন ফুরাবে সময়ের পরিক্রমায়, সংগঠনটা অদৌ টিকবে তো? এতোদিন নানান ছদ্মবেশ ধরে এর তার আঁচলে লুকিয়ে টিকে ছিল, ১২ বছরের শাসনামলে সব পর্দা ছিঁড়ে গেছে কিন্তু। আপনাদের তৈরি করা ইয়েস ম্যানগুলোই কিন্তু আইন আদালত প্রশাসনের শীর্ষে আছে, কাল নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে- এরা তাদেরকেও খুশি করতে আপনাদের উপরে বুলডোজার আর মিথ্যা মামলার খড়্গ চাপিয়ে দেবে। কতটা দেওয়াল লিখন পড়োতে পারছেন জানিনা, কিন্তু সেই দিন খুব দূরে নেই এটুকু বলতে পারি। 

আপনারা আর কতটুকু ক্ষমতাবান হয়েছেন! মধ্যযুগে ইউরোপের চার্চ আর তাদের ইনকুইজিশন আপনাদের এই ধর্মের ভেক আর জাতীয়তাবাদী তামাশার চেয়ে কয়েক লক্ষ গুণ বেশী শক্তিশালী ছিলো, আজ তারা কোথায়? আপনাদের কাপুরুষ বজরং দলের চেয়ে নাইট টেম্পলারেরা আলোকবর্ষ এগিয়ে ছিলো ধর্মের রক্ষার্ত্রে আর বীরত্বে; সেই তাদের আজ কোনো অস্তিত্ব আছে ইউরোপের জনজীবনে? খ্রীষ্টান ধর্ম টিকে আছে, চার্চের শাসন কালের গর্ভে তলিয়ে গেছে; হিন্দুত্ব বেঁচে থাকবে আপনারা তলিয়ে যাবেন ইতিহাসের আস্তাকূড়ে। আর সে দিন অতি সন্নিকটে।

শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আচ্ছে দিন বলবেন নাকি অমৃতকাল?

 



উত্তরপ্রদেশে যোগীর পুলিশ সাংবাদিক অভিষেক উপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) ও তথ্য প্রযুক্তি আইনের (IT Act) বেশ কয়েকটি ধারায় FIR করেছে।

কে এই সাংবাদিক অভিষেক? ইনিই প্রথম রাম মন্দিরের চাঁদা চুরির বিষয়টা জনগনণের সামনে আনেন।

উত্তরপ্রদেশের রাজ্য প্রশাসনের জাতপাতভিত্তিক সমীকরণ নিয়ে ‘X’ (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে "যাদব রাজ বনাম ঠাকুর রাজ (অথবা সিং রাজ)" শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের বিরুদ্ধে প্রতথম মামলা দায়ের করা হয়েছে।  BNS ধারা ৩৫৩(২) অনুযায়ী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা বা বিদ্বেষ ছড়ানো বা ঘৃণা উস্কে দেওয়ার চেষ্টা। BNS ধারা ১৯৭(১)(C) অনুযায়ী জাতীয় সংহতি বা অখণ্ডতার ক্ষতিসাধন করতে পারে এমন বক্তব্য দেওয়া বা প্রচার করা।BNS ধারা ৩০২ অনুযায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে শব্দ উচ্চারণ বা মন্তব্য করা। BNS ধারা ৩৫৬(২) অনুযায়ী মানহানি বা মানহানিকর বক্তব্য প্রচারের শাস্তি। তথ্য প্রযুক্তি আইন (IT Act)-এর ধারা ৬৬ ধারা অনুযায়ী কম্পিউটার বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আপত্তিকর বার্তা বা তথ্য ছড়ানো।

এতেও যখন প্রাণে তৃপ্তি আসেনি, তখন একটা রোড-রেজ বা পথ-বিবাদ সংক্রান্ত মামলা করা হয়,  এফআইআর নম্বর -৬৭৮/২০২৬) । মজা হলো, তাকে কাস্টাডিতে নিয়ে পুলিশ ব্যাপক মারধোর করে একটাই তথ্য জানতে চায়- কেন সে চাঁদা চুরির ভিডিও বাজারে ছেড়েছে আর কে তাকে এই গোপন তথ্য সরবরাহ করেছিলো। রামমন্দিরের চাঁদা চুরির তদন্তের সূত্র এবং তার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট (Digital Footprint) ঘেঁটে তার গোপন তথ্য ও সোর্সদের চেনার উদ্দেশ্যেই পুলিশ সর্বস্ব লাগিয়ে দিয়েছিল।

পুনের সন্তোষ পণ্ডিতের ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটে। সন্তোষ পণ্ডিত তার ইউটিউব চ্যানেলে পুনের কোথরুড এলাকার নাগরিক সমস্যা ও উন্নয়নমূলক কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় মহারাষ্ট্রের উচ্চ ও প্রযুক্তি শিক্ষামন্ত্রী চন্দ্রকান্ত পাতিল এবং পুনে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের (PMC) কাউন্সিলর মিতালি সালভেকারের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেছিলো।
আক্ষরিক অর্থেই আজ হিন্দু খতরেমে হ্যাঁয়।


মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

নাগপুর ও শিক্ষা দূুর্নীতি


পেপার লিক বা প্রশ্নপত্র ফাঁস কোন বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়।  এটা একটা পরিকল্পিত অর্থনৈতিক মডেল যেটা সরাসরি নাগপুর থেকে পরিচালিত হয়। এটার পেছনে একটা পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক কাঠামো কাজ করে, যা কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলাফল নয়।

পেপার লিক দুর্নীতির ক্ষেত্রে একটা বড় অংশ ইচ্ছাকৃত আঁধারে রেখে দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো, যে বিষয়ে আলোকপাত হওয়া অত্যন্ত জরুরী। গদি মিডিয়া এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করবে না এটা স্বাভাবিক কিন্তু তথাকথিত নিরপেক্ষ youtube সাংবাদিক কুলও নিম্নলিখিত বিষয়ের উপর কোনো ধরনের আলোকপাত করতে সক্ষম হয়নি। স্বভাবতই রাহুল গান্ধী থেকে দীপকে অব্দি কারও মুখে কোনো রা নেই।

বর্তমানে যে পেপার লিক বিষয়টা নিয়ে এত আন্দোলন, সেটার হুইসেল ব্লোয়ার হিসাবে রাজস্থানের সিকর জেলার রসায়নের শিক্ষক শশীকান্ত সুতার প্রথম বিষয়টি সামনে আনেন। সেখানেই প্রথম FIR হয়। তদন্তে দেখা যায় কয়েকজন বিহারের বাসিন্দা যারা দিল্লি লাগোয়া হরিয়ানার গুরগাঁও থেকে গোটা বিষয়টা অপারেট করত। প্রশ্নপত্র ছাপা হতো রাজস্থানের প্রেসে, সেখান থেকে দিল্লির বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে অবিশ্বাস্য মোটা দামে বিক্রি করা হতো। এই অব্দি দেখে মনে হবে- মোটামুটি সবকিছুই একটা দুষ্ট দুর্নীতি চক্র জড়িত - যেমনটা প্রতিটি দুর্নীতিতে হয়ে থাকে। 

কিন্তু এই প্রশ্ন ফাঁস করেছিল কারা? যারা করেছিল তারা প্রত্যেকে মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা, পেশায় অধ্যাপক। লাতুরের অধ্যাপক পি. ভি. কুলকার্নি ও প্রফেসর শিবরাজ রঘুনাথ মোটেগাঁওকর, পুনের মনীষা গুরুনাথ মান্ধারে এবং মনীষা হাভালদার, মনীষা বাঘমারে, নাসিকের শুভম খায়রনার ও ধনঞ্জয় লোখান্ডে। এরা প্রত্যেকে মহারাষ্ট্রের। এদের আরো বড় পরিচয় হচ্ছে এরা প্রত্যেকে হয়- অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘ (ABRSM), কিম্বা ভারতীয় শিক্ষণ মণ্ডল (BSM) অথবা    বিদ্যা ভারতী (Vidya Bharati) সংগঠনের সাথে যুক্ত। এই তিনটে সংগঠনই নাগপুরের গোয়াল ঘরের নিজস্ব সংস্থা।

অর্থাৎ প্রশ্নপত্র ফাঁস দুর্নীতিতে যুক্ত প্রত্যেকে আরএসএস এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।  এমনকি রাজস্থানের ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কে যেসব ছাত্র এবং কাউন্সিলর নামের দালালেরা এই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তারাও অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP) এর সাথে সম্পৃক্ত। 

প্রতিটা সাংবিধানিক পদ সেটা বিচারব্যবস্থা হোক কিংবা নির্বাচন কমিশন, প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য পদে সরাসরি RSS এর প্রচারকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।  সুতরাং যারা প্রশ্নপত্র তৈরি দায়িত্বে ছিল, তারা সেই দায়িত্ব পেতই না- যদি না তারা সরাসরি নাগপুরের আস্থাভাজন হতো। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বলি দেওয়ার আড়ালে মহারাষ্ট্র সরকার আর আরএসএস নিজেদের লুকিয়ে ফেলতে চাইছে।

এই পেপার লিক থেকে প্রাপ্ত দুর্নীতির আর্থিক লাভের একটা বড় অংশ সরাসরি আরএসএস এর হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে যেত বা যায়। বরং বলা ভালো নাগপুর থেকে সরাসরি এই দুর্নীতিটাকে সঞ্চালন করা হতো। যে কারণে এই কেলেঙ্কারিতে ধরা খাওয়া প্রতিটা 'কিংপিন' মহারাষ্ট্রের। অথচ মহারাষ্ট্রের শিক্ষামন্ত্রী, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাড়নবীসের নাম একবারও শুনেছেন এ বিষয়ে? শোনেননি,  কারণ ব্যথা জায়গায় হাত পড়লেই সেই হাত সরাসরি নাগপুরের গোয়াল ঘরে পৌঁছে যাবে। এই কারণেই পেপার লিক হওয়ার পর দেবেন্দ্র ফড়নবীসকে রাজস্থানে ডেকে পাঠিয়েছিল। তাকে ধমকাতে কিংবা তদন্তে সহযোগিতা করতে নয়, কেন ফাঁস হলো সম্ভবত এই বিষয়ে জানার জন্য। 

ধর্মেন্দ্র প্রধান বলি গেছে, সেটা যাওয়ারই ছিল অপদার্থ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে। কিন্তু মূল মাস্টারমাইন্ড মহারাষ্ট্র সরকার এবং আরএসএস সরাসরি এই দুর্নীতিতে জড়িত। নতুবা এটা কখনও সম্ভব হতো না। একটা ধর্মেন্দ্র গিয়ে আরেকটা নতুন চোর চলে আসবে,  কিন্তু নাগপুরের গোয়াল ঘরের যারা মাস্টারমাইন্ড তারা বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যতক্ষণ না এদের কান ধরে আইনের সামনে দাঁড় করানো হবে ততদিন এরকম প্রশ্নপত্র ফাঁস চলতেই থাকবে। 

২০১৫ সালের 'ব্যাপম' কেলেঙ্কারিতে ৪০ জনের রহস্য মৃত্যু আমরা কেউ ভুলিনি, কে জানে এবারে কতজন সাক্ষী এবং অপরাধী রহস্য মৃত্যুর শিকার হয়। ব্যাপম কেলেঙ্কারির নায়ক  শিবরাজ সিং চৌহানের সাজা হওয়া তো দূরস্থান, ন্যূনতম তদন্ত টুকু হয়নি। মহারাষ্ট্র সরকার এবং সেই সরকারের মাথা এবং দেবেন্দ্র ফড়নবীশকেও তদন্তের আওতায় আনা হবে বলে মনে হয় না। যে সমস্ত কিংপিন ধরা পড়েছে, সেই অপরাধীরা যে সংগঠনের সঙ্গে জড়িত, সেই RSS এর শিক্ষক সংগঠনগুলোকে কেন তদন্তের আওতায় আনা হবে না? 

মোহন ভাগবত এমনি এমনি জেন-জি কে সার্টিফিকেট বিলি করতে বসে যায়নি কিংবা মাঝরাতে হ্যালো ফ্রেন্ডস বলে বিশ্বভাঁড় মিছিমিছি ভাঁড়ামি করতে আসেনি instagram এ, RSS কে আড়াল করতে যাবতীয় এইসব ফন্দিফিকির।

সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

তোলামূলের রক্ষিতা



কুত্তাদের সামনে ভিক্ষার বাটি দিয়ে একশ্রেণির ধর্ম পেশাজীবিদের বাঁধা রক্ষিতা বানিয়ে রেখেছিল মান্নীয়া, ক্রমশ 'উম্মতে চটি' হয়ে ওঠা মুনাফেকদের আবার একবার উম্মতে মুহাম্মদী(সাঃ) হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে আজকের ঘোষণা। 

যারা মাত্র হাজার-দু'হাজারে বিকিয়ে গিয়েছিল গত ১৫ বছরে, তোলামুলের হয়ে 'দুধেল গাই' সেজে ভোটের রাজনীতিতে ন্যাংটা 'জিহাদ' করেছিল, আপাতত অতীতের সেই নির্লজ্জতা থেকে এই হারামখোর ইমান-মুয়াজ্জিন প্রজন্ম কি মানুষ হতে পারবে? লিবরেন্ডূ ঝান্ডুর দল যারা চোখে তোলামুলী সুরমা লাগিয়ে জ্ঞানের রজঃস্রাব ছেটাতে আসবেন- জানবেন, আপনার ভ্যাসেকটমি করিয়ে দিয়েছে মান্নীয়ার ভায়ের দল। চেঁটে খাওয়ার স্বভাব বড় বদঅভ্যাস, খেটে খাওয়ার ইচ্ছা নষ্ট করে দেয়।

আগে এনারা মানুষ হোক, তারপর না হয় মুসলমান হবে। গরিলা, শিম্পাঞ্জি,  ওরাংওটাং কিম্বা কুত্তা শ্রেণির মনুষ্যেতরদের জন্য কোনো লোকাচার ধর্মের বিধান নেই কোনো সমাজে। ইসলামি শরিয়তে পাগল উন্মাদের জন্যও কোনো ধর্মীয় বিধান নেই।

সরকার বদলাতে শুধু যে তোলামুলী চোর-ডাকাতগুলো যে অনাথ হয়েছে তা তো নয়, ভাতাজীবি ভাতারির দল সমেত সমস্ত এঁটোকাঁটা কমিটি, প্রতিটি বুদ্ধিবীচির গায়ে ঘাম দিচ্ছে আবার খেটে খেতে হবে ভেবেই। সিপিএম কে খানিক গালি দিয়ে তাল বুঝে নিতে চাইছে। আবার কোন ইজের ধরে ঝুলে পড়া যায়! এরা কেউ বিজেপি কে কিছু বলছে না। কে জানে কাল আবার ওদের হয়ে গোবর খেয়ে জয়শ্রীরাম বলতে হবে কিনা!

২০১৮ তে ক্ষমতা দখলের আগে ত্রিপুরায় মোদীজি সপ্তম বেতন কমিশনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ক্ষমতায় এসে বিজেপি ঢাকঢোল পিটিয়ে তা ঘোষণাও করে। কিন্তু আট বছর পেরিয়ে গেছে- পূর্ণাঙ্গ বেতন আজও কমিশন গঠিত হয়নি। 

তৎকালীন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব বলেছিলেন, রাজ্যের আর্থিক হাল ভালো নয়, তাই কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ্যভাতা দেওয়া সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গে ত্রিপুরার পুনরাবৃত্তি হওয়াটাই নিয়তি সম্ভবত। আশঙ্কা বাড়িয়ে, মন্ত্রীসভার বৈঠকের পর আজও কিছু ঘোষনা হয়নি, ফক্কা।

স্বীকৃত গরু-বাঁদরের দল সরকার এসেছে, তারা মানুষ নিয়ে খুব বেশি কথা বলবে সে আশা করি না, বললেই লোকে অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের কথা তুলবে। তাই এরা রাস্তায় নামাজ, কোরবানির গরু এসব নিয়েই থাকবে। আমাদের যারা খেটে খেতে হয়, তাদের কোনো ধরনের আশা না রাখাই ভালো।

সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

বাংলার লজ্জা বাঙালীর লজ্জা


বাংলার লজ্জা, বাঙালির লজ্জা

আজকে বাংলাতে একটা শার্প শ্যুটার অব্দি নেই, যাকে সুপারি দিয়ে বাঙালি একটা রবীন্দ্র/নজরুলের ঘরানায় কাব্যিক মার্ডার অবধি করতে পারে। এ লজ্জা বামেদের, ৩৪ বছরের চূড়ান্ত ব্যর্থতা। আজকের আলিমুদ্দিনের দায় নেওয়া উচিত। মমতা ব্যানার্জীর অতিবড় দোষ থাকলেও তাকে কেউ খুনী মমতা বলে না, সে চোর মমতা, মিথ্যুক মমতা, সে বামেদের অনুসরণ করে গেছে মাত্র। পাড়ায় পাড়ায় তোলাবাজি করালেও, একটা শ্যুটার বানাতে ব্যর্থ হয়েছে। কত বড় কলঙ্ক আজ আন্তর্জাতিক মহলে, ছিঃ ছিঃ রব পড়ে গেছে। শান্তিনিকেতন থেকে শান্তিকুঞ্জ হয়ে রিঙ্কু বৌদির প্রাতঃভ্রমণ- সর্বত্র শিল্পীদের হাহাকার। 

এই লজ্জা বাঙালি রাখবে কোথায় ঘরে আজকাল না ট্যাঙ্ক রয়েছে, না সিন্দুক রয়েছে, না উঠোনে গোলা রয়েছে। থাকার মধ্যে গেরুয়া ধুতি, যাতে পকেটটুকু নেই। অবিলম্বে দেউচা পাঁচামিতে গভীর খুনি খনন করা হোক,  সেখানকার কয়লা দ্রুত উত্তোলন করে গর্ত করা হোক,  যে গর্তে বাঙালি তার ৩৪ বছর প্লাস ১৫ বছর মোট ৪৯ বছরের লজ্জা গচ্ছিত রাখতে পারে। কিংবা তাজপুরে গভীর সমুদ্র বন্দর আপনা করে,  কিংবা কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ বন্দর থেকে বিশেষ ফ্রেড় করিডর এর মাধ্যমে দেশের গুজরাট উপকূলের সমুদ্রে গিয়ে বাঙালির লজ্জা কে বিসর্জন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।  অবশ্যই সেটা মহান দেশপ্রেমিক আদানী শেঠকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হোক, প্রয়োজনে কলকাতা বিমানবন্দর তার হাতে অর্পণ করা হোক। নতুরা এই পাপ স্খলনের কোনো শর্টকাট নেই।

মমতা ব্যানার্জী সার বেঁধে টালিগঞ্জের শিল্পীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে মঞ্চ জুড়ে দাপিয়ে গান গেয়েছে, ধমেকেছে, চমকেছে, ছবি এঁকেছে, কাব্য করেছে- কিন্তু শ্যুটার? না না না- ব্যর্থ। বামেরা? তারাও ভাত খাওয়ার কথা বলে, গুলি খাওয়াটাকে তারা গণনাতেই আনেনি, ধিক্কার রইল তাদের যুব নেতৃত্বের প্রতি।

দেখুন আজ উত্তর প্রদেশকে, হিংসায় জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে না লেনিনের বাচ্চাদের? এই হচ্ছে ডবল ইঞ্জিন সরকার, যোগী মডেল। সবাই শুধু বুলডোজার মডেলটাকে সামনে রাখাতে শৈল্পিক বিষয়গুলোকে আজ ইচ্ছাকৃতভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে, এটা সনাতনী স্বার্থের উপর সরাসরি আঘাত। এর জবাব বাংলার মানুষ একদিন দেবে। আজ সারা দেশে শার্প শ্যুটার সাপ্লাই দিচ্ছে উত্তরপ্রদেশ, সেটা সরকারিভাবে 'সিংহম' এর মাধ্যমে হোক বা চন্দ্রনাথের খুনী হিসাবে - মোদ্দা কথা এই যে শ্যুটিং শিল্পের উন্নতি, তা তো করে দেখিয়েছে যোগীজী। গতকাল তীরন্দাজিতে সোনা না কি একটা জিতেছে দেশের মেয়েরা, আগামীতে শার্প শুটিং এ প্লাটিনাম, হিলিয়াম, বোরিয়াম জিতবে। হিরেন পান্ডিয়া, মনোহর পারিক্কর, গোপীনাথ মুন্ডের দিব্যি রইল- বাঙালিকে প্রমাণ করতে হবে, তারা পিছিয়ে নেই।

আশা করব, বাংলাও দ্রুত এই শার্প শিল্প শিখে নেবে 'স্বাধীন' পশ্চিমবঙ্গের প্রথম রাষ্ট্রবাদী মুখ্যমন্ত্রীর শাসনে। ব্রিটিশ আমল থেকে বাঙালি বোমা শিল্পে উন্নত, সেটা সন্দেশখালি থেকে গরুকেষ্টর নাড়ু- কিন্তু আজ সময় বদলেছে। দীলুদার নেতৃত্বে আগামীতে শুটিং শিল্পে বাংলাকে স্বাবলম্বী করতে তুলতে হবে, এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

জয় সেমাপোসাদ
জয় সিরি জোগিজি
জয় সারপেনটার বাবা

রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

মমতা ব্যানার্জি একটা অপ্রাসঙ্গিক অবাঞ্ছিত নাম আজকের তারিখে

 

মুষলপর্ব- ১

 

মমতা ব্যানার্জী খেজুরিতে যেতে পারবে না। যাওয়া উচিত ছিল নিশ্চিতভাবে, কিন্তু যেতে পারবে না, সাহস নেই। ভাইপো এখন দিল্লি পালিয়ে গেছে, সেখান সেফ হাউজে থেকে জনগণকে একত্রিত হওয়ার উপদেশ দিচ্ছে। কল্যাণ ব্যানার্জীও সেফ হাউজে, বাকি সমস্ত তোলামুলী লোকজন অজ্ঞাতবাসে লুকিয়ে কুলোর বাতাস দিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছে।

ভাইপো ঠান্ডা ঘরের নেতা, লড়াই আন্দোলনে জন্মানো ঘাম রক্তের নেতা নয়, সারোগেসি বা টেস্টটিউব বেবী। বাইরে বের হলেই আক্ষরিক অর্থে সে বলাৎকারের শিকার হবে। আগে তাকে তৃণমূলের একটা বড় অংশ ক্যালাবে, তাদের হাত থেকে যদি কিছুটা বেঁচে ফেরে প্রাক্তন তৃণমূলীরা মারবেই মারবে, এরপর শাসক দল বিজেপি ক্যালাবে এবং বামেদের একটা অংশ আদা ছ্যাঁচা করবে, আর আমার মতো যারা মনে মনে অন্তত ভাইপোর গায়ে থুতু দিতে চায়- তারাও তো লাইনে আছি। মমতার যে কেরিয়ার শেষ, ২০২৩ থেকে প্রতি মাসে একবার করে লিখেছি, তাই ওটা নিয়ে আজ নতুন করে লেখার কিচ্ছু নেই, বর্তমান রাজনীতির মঞ্চে মমতা ব্যানার্জী একটা অপ্রাসঙ্গিক অবাঞ্ছিত নাম।

২০১১ তে সুর্যকান্ত মিশ্র, নিরূপম সেন, বিমান বসু, মহঃ সেলিম, বুদ্ধদেব বাবু কেউ যেতে পারেনি অধিকাংশ আক্রান্তদের পাশে, দলটা উঠে গিয়েছিল। বৃদ্ধ কিছু নেতার দল, তাদের পার্টি অফিস, তাদের ফাঁপা শৃঙ্খলা, অতীতের পাহাড় প্রমাণ বনেদিয়ানা জমিদারির ইতিহাস, আর শূন্যগর্ভ বক্তৃতা- ২০২০ অবধি সিপিএম এই ফাঁদে আঁটকে গিয়েছিল। তোলামুলের ক্ষেত্রেও এর কোনো আলাদা কিছু হবে না। আগামী ৩ মাস মাস পর প্রতিটা তোলামুল নেতার স্নায়ুরোগ হবে। কলিং বেল বাজলে প্যান্টে মুতে ফেলবে।

আজ তৃণমূল মার খেলেই সে মুসলমান হয়ে যাচ্ছে, এটা কি অস্বীকার করা যাবে রাজ্যের ৯০% মুসলমান ভোট তৃণমূলের ঝুলিতে গেছে। প্রতিটা গ্রামের প্রায় প্রতিটা ইমামকে দিয়ে মসজিদে মাদ্রাসাতে ভোট প্রচার করিয়েছিল মমতা ব্যানার্জী, জমিয়ত উলামা প্রকাশ্যে তৃণমূলের হয়ে ভোট প্রচার করেছে, তাদের অফিসগুলো তৃণমূলের পার্টি অফিসে পরিণত হয়েছিল। প্রতিটা মুসলিম সংগঠন উলঙ্গ হয়ে ‘বিজেপিকে রুখতে’ তৃণমূলকে ভোট দিন বলে তান্ডব নৃত্য করেছিল। ভোটের সময় সময় তুমি তৃণমূল ছিলে, নির্দিষ্ট করে তোমাদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, তুমি চুরি তোলাবাজি কাটমানির ভাগা নিয়েছ; আজ মার খাওয়ার সময় ধার্মিক হয়ে ধর্ম এগিয়ে আসছে কেন; কেন বলতে পারছ না যে আমরা তৃণমূলকে ভোট দিয়েছি, আমরা ওই দলেরই কর্মী সমর্থক, ওদের হয়ে সমস্ত পাপ করেছি বা করাকে সমর্থন করেছি বলে, আজ আমাদের উপরে অত্যাচার হচ্ছে! আসলে তৃণমূলও চাইছে এই ক্যালানির ঘটনাতে সাম্প্রদায়িক রঙ লাগুক। 

মমতা ব্যানার্জী সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী ছিল। আপনাদের পাড়া এবং চেনা জানা সমস্ত মুসলমান পাড়ায় কোন উন্নতিটা করেছে? সংখ্যালঘু মানে শুধু মুসলমান? বৌদ্ধ, জৈন, খ্রীষ্টান এরা সংখ্যালঘু নয়? এদের পিছিয়ে পড়া সমাজ থেকে কতজনকে গত ১৫ বছরে চাকরি দিয়েছে?

☞ কতজন গরিব মুসলমানের চিকিৎসার দায় নিয়েছে?

☞ কতজন জেলে থাকা মুসলমানকে আইনি সাহায্য দিয়েছে?

☞ মুসসলমান সমাজের পিছিয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীর কতজনকে স্কলারশিপ দিয়েছে? 

☞ কতজন মুসলমান ব্যবসায়ীকে বিনা সুদে লোন দিয়েছে? 

☞ কতজন গরিব মুসলমানকে বাড়ি করে দিয়েছে? 

☞ কটা আধুনিক মাদ্রাসা তৈরি করেছে বা মাদ্রাসার আধুনিকীকরণ করেছে? 


আসলে কয়েকটা লোক যারা এই দপ্তরের নামে মন্ত্রিত্ব পায়, তারা নিজেরা আপন আখের গুছিয়েছে, তার বাইরে এই দপ্তর থেকে আমাদের চেনা জানা একটিও মানুষ উপকৃত হয়নি। 

এর মানে কি হিন্দুত্ববাদী RSS এর দুষ্কৃতিরা হামলা করছে না মুসলমান ও তাদের সম্পত্তির উপরে? অবশ্যই করছে; কিন্তু তেমনটা ১টা হলে, ৯টা তোলামুলের উপরে আক্রমণ হচ্ছে, যেটাকে মুসলমানের উপরে অত্যাচারের মোড়ক লাগিয়ে পরিবেশনা করা হচ্ছে, কারণ বিজেপি মানেই সাম্প্রদায়িক, ফলত তাদের ওই খাতে মিটার উঠে যাচ্ছে।

আগামীতে ৩ দফায় আসল মার শুরু হবে তোলামুলের। আজ কাল যেগুলো হচ্ছে সেগুলো সেই- হ্যালো হ্যালো মাইক টেস্টিং ১ ২ ৩ ৪... এই হচ্ছে। তোলামুল নামের দানবের বিসর্জন হয়েছে বলে আমাদের মতো অনেকেই খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছি, তার মানে এই নয় যে বিজেপি সভ্য মানুষের দল হয়ে গেছে। তারা যে পর্যায়ের নিকৃষ্ট বেহায়া নির্লজ্জ পুঁজিপতিদের দাস ছিল সেটাই থাকবে, তারা সাম্প্রদায়িক ছিল, তারা সংখ্যালঘু অত্যাচারী ছিল, মনুবাদী ব্রাহ্মন্যবাদী ছিল, সেটাই থাকবে। এবারে লড়াইটা আর ঘোমটার আড়ালে নয়, সরাসরি হবে।

তোলামুলের হিন্দু অংশের অধিকাংশই বিজেপিতে চলে যাবে, যাদের হাতে হারামের টাকা আছে, তারা অনেকে টাকা জরিমানা দিয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেও- প্রত্যেকে আগামী ৬ মাসে বুঝবে আতঙ্ক কাকে বলে। মুসলমান অঞ্চলের মালগুলো মূল ক্যালানিটা খাবে। আর এদের হাল দেখার পর- তোলামুলের ডিমে তা দিয়ে কোনো বাচ্চা ফু্টবে না। বরং আগামীতে তোলামুল নেতানেত্রীদের যৌন প্রোটেকশন দরকার হবে না- ক্ষমতায় থাকাকালীন তৃণমূলের যেকোনো স্লোগান বললেই বীর্যের শুক্রাণুগুলো নিজেই আত্মহত্যা করে মরে যাবে। না কন্ডোম, না কন্ট্রাসেপটিভ পিল- নির্বীজকরণের এটা এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। আজ বুঝবে না সকলে, যত সময় যাবে, আমার কথাগুলোর বাস্তবতা বুঝতে পারবে।

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা পদে বসছেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। ডেপুটি বিরোধী দলনেতা হচ্ছেন তৃণমূলের দুই মহিলা মুখ, অসীমা পাত্র এবং নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরোধী দল তৃণমূলের চিফ হুইপ পদে বসছেন ফিরহাদ হাকিম। মমতা শোভনদেবকে বিরোধী দলনেতা করেছে এক নম্বর কারণ নিজের কন্ট্রোলে থাকবে, শোভনদেবের বয়স ৮৩ উল্টোদিকে ববি ৭০। দুই নম্বর কারণ- দক্ষিণ কলকাতা। তিন নম্বর কারণ মমতা ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক, ব্রাহ্মণ বলে একমাত্র নির্বাচিত করেছে। নয়না সুদীপের বউ এবং ব্রাহ্মণ দুই ক্যাটাগরিতে ঢুকেছে। অসীমা পাত্র ওর বাড়ির কাজের লোক। তালিকা সমাপ্ত।

দেবী ঘৃণাতে সাওয়ার হয়ে এসেছিলেন, ঘৃণাতেই বিসর্জন হয়েছে। বিজেপি RSS উভয়েই জানে, তারা মমতার প্রতি ঘৃণার স্রোতে ক্ষমতায় এসেছে, যেমন বামেদের প্রতি তীব্র রাগের নৌকায় চড়ে মমতা ক্ষমতায় এসেছিল। শুভেন্দু যদি যোগীর মতো আচরণ না করে তাহলে বাংলার লোকজন খানিকটা জায়গা দেবে। বিজেপির শুভেন্দুর সবচেয়ে বড় সমস্যা তৃণমূলের শুভেন্দুর বলা সংলাপগুলো। পরবর্তী সমস্ত জীবন তাকে নিজের সাথে লড়াই করতে হবে। বাঙালি হিন্দুদের ৬০% এর বেশি ভোট বিজেপির ঝুলিতে গেছে বিজেপির হিন্দুত্বকে সাপোর্ট করে নয়, মমতাকে উৎখাত করতে, বহু মুসলমান বুথেও বিজেপির প্রার্থীরা না হলে ভোট পেতো না।

খুব সত্য ঘটনা হচ্ছে, বহু স্থানে বিজেপি কর্মীরা আফসোস করছে, তাদের হাত নিসপিস করলেও ,সাম্পদায়িক রং লাগার ভয়ে তারা তোলামুলকে চেয়েও ক্যালাতে পারছে না। অনেক স্থানে অশান্তি করতে চেয়েও পারছে না, যা সময়ের দাবী; উলটে ব্রেক মারতে হচ্ছে, পাছে তোলামুল ক্যালাতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলে চিহ্নিত হয়ে যায়। সদ্য এরা সরকার এসেছে, এই লাইনে অনেক চোর তোলাবাজ বেঁচে যাচ্ছে এই মুহূর্তে। এর পরের মারগুলো গতরে হওয়ার চেয়েও পুলিশি আর অর্থনৈতিক মার বেশি হবে। তাই যারা ভাবছে বেঁচে যাচ্ছি, তারা কেউ বাঁচবে না, কাকে কতটা ক্যালানি দেওয়া হবে এবং কোন লেভেলের হবে- সেইটার তালিকা তৈরি হচ্ছে।

চোরগুলো কেউ ১০০ কোটির মালিক, কেউ ৫০ কোটি তো কেউ ৫ কোটির। সামান্য পঞ্চায়েতের সদস্যও ৫০ লাখ বাগিয়ে বসে আছে। কাকে জরিমানা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হবে, কাকে অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে বলবে, প্রতিটা প্রেসক্রিপসন আলাদা আলাদা হবে। মেদিনীপুরিয়ান কি জিনিস, বিশ্ব সংসারে এদের নিয়ে যে বা যারা ঘর করেছে একমাত্র তারাই জানে। এদের মত জেদী, গোঁয়ার, ছেঁড়া ন্যাকড়ার আগুনের মতো লেগে থাকার মানসিকতা যুক্ত প্রতিহিংসা পরায়ণ জাতি বিশ্ব সংসারে দ্বিতীয়টি নেই, আসল তো বটেই- এরা সুদেরও সুদ আদায় করা লোকজন। সুতরাং, ছাড় দিলেও ছেড়ে দেবে না। 

এতো কিছু বলার উদ্দেশ্য একটাই, পূর্ব বর্ধমানে কমল গায়েন, প্রদীপ তা খুন হয়েছিলেন মমতার প্রত্যক্ষ মদতে, তিন মেদিনীপুর, বাঁকুড়া পুরুলিয়া - সিপিএম সবচেয়ে বেশি মার খেয়েছিল এই জেলাগুলোতে। আজও সিপিএম সেই আতঙ্ক কাটিয়ে উঠে একটা কচি নেতাও জন্ম দিতে পারেনি। সরি, জন্ম দেওয়া দূর অস্ত, গর্ভধারণ অবধি করতে পারেনি। আরো ৫-৭ বছর লাগবে ২০১১ সালের আতঙ্ক দূর করে, সেই ট্রমা কাটিয়ে সুস্থ স্বাভাবিক হতে। 

বামেদের নিজশ্ব ইউনিক সাপ্লাই লাইন থাকা সত্বেও তারা আজ অবধি মানসিক ভীতি কাটিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি, রাজ্য জুড়ে অন্তত ১৬টা জেলাতে তারা হামাগুড়ি দিচ্ছে। শরিকগুলোর তো ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গেছে। ২০১১ এর সময়কার কোনো বড় বাম নেতার যা খুশি রোগ থাক, কোষ্ঠকাঠিন্য নেই। মমতার নাম দু'বার করলে পোঁদ দিয়ে জিভ বেরিয়ে আসে, সেখানে রেক্টামে গু আঁটকে থাকার প্রশ্নই নেই। আজ তোলামুল নামের সাপটা মারা গেছে, খোলস পরে আছে। সেটাকে দেখেই পাখি আর বাঁদরের দল কিচিরমিচির করছে। ভুলে যেও না SUCI এরও পলিটব্যুরো আছে। ২০ বছর পরেও অফিসিয়ালি তৃণমূল কংগ্রেস দলটার অফিস থাকবে কোলকাতার কোথাও না কোথাও। কিন্তু এরা ৫% ভোটও পাবে না ঠিক আগামীকাল নির্বাচন হলেও। যেসব ঘাটের মরাদের যাবার জাইগা নেই, তারা কালীঘাটের ভিকিরি আর ঘেও কুত্তা হয়ে পরে থাকবে।

পরবর্তী ৬ মাসে যে হারে এরা শারীরিক, মানসিক এবং অর্থনৈতিক যে মার খাবে, সেই আতঙ্ক কাটানো তো দুরস্থান- এদের শুক্রাণুর কেউ রাজনীতির নামটুকু মুখে আনবে না। নির্দিষ্ট আদর্শ থাকা সিপিএমের ধ্বজভঙ্গ আজও দশা কাটেনি, কারণ সিপিএম যখন মার খেয়েছিল সাধারণ মানুষ সেটাকে উদযাপন করেছিল। কোনো ধরনের আদর্শহীন তোলামুলকেও যখন মার খেতে দেখবে, একটা পাশবিক জিঘাংসা বৃত্তি কাজ করবে জনগণের মনে। ১৫ বছর ধরে করা প্রতিটা পাপের সাথে আজকের অত্যাচারকে জাস্টিফাই করে- হিসাব মিলিয়ে দেবে। এরপর এরা এতোটাই দুর্বল হয়ে যাবে যে, ওই গোটা বাংলা জুড়ে সাকুল্যে ২-৪টে পার্টি অফিস বাঁচবে, SUCI এর সাথে জোটে করে, কংগ্রেসের রক্ষীতা হয়ে তাদের দয়া দাক্ষিণ্যের উপরে বেঁচে থাকবে। ঘাটের মরা মালগুলো, যেগুলোকে আস্তাকুঁড়ের ডাব্বাও নেবে না- সেগুলোই জলসাঘরের ছবি বিশ্বাসের মতো বসে থাকবে।

এরপর সিভিক পুলিশ ধরবে, এদের উপরেই ফার্স্ট ফ্লাসের ক্যালানি শুরু হবে। সিভিকের পরেই পঞ্চায়েত, মিউনিসিপ্যালিটির ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের শরীরে হাত বোলালেই জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের মতো প্যান্টে হেগে মুতে দেবে, তাদের থেকে পাওয়া তথ্যতেই তো মূল প্রাণভোমরা রয়েছে সরকারি চুরিচামারির। এরপর আইপ্যাকের মেজো ও উঁচু পদের পেদোর দল, ডেটা তাদের কাছেও কম কিছু নেই। দুর্নীতির হাতে-কলমে প্রয়োগ যদি সিভিক পুলিশগুলো করে থাকে, তাহলে এসি ঘরে বসে তার রূপায়ণ করেছে এইসব ডেটা এন্ট্রি অপারেটরগুলো- আইপ্যাকের তত্ত্বাবধানে। পঞ্চায়েতে পঞ্চায়েতে লক্ষ কোটির ঋণ আছে নানান কন্ট্রাকটারের। তারা টাকা পাবে না, তোলামুলের নেতাদের সম্পত্তি বেচে টাকা আদায়ের আগে দ্বিতীয় দফার ক্যালানি ও খুনোখুনি শুরু হবে এদের মাধ্যমে। এর পর তো পঞ্চায়েত ভোটের আগে আসল সাম্প্রদায়িক খেলা শুরু হবে।

তাই যারা ভাবছে খেলা শেষ, তাদের বলি- খেলা শুরুই হয়নি এখনও।



বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সাসপেন্ডেড AERO এর উপরে, মমতার এঁটো দরদ কিসের ইঙ্গিত?

 


মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেস ভুতুড়ে ভোটারওয়ালা ২০২৪ এর ভোটারলিস্ট দিয়ে ২০২৬ এর নির্বাচন করতে মরিয়া ছিল, তাই গোটা SIR প্রক্রিয়াটাকে গুলিয়ে দিতে অধিকাংশ জালিয়াতি অপকর্ম করেছে। তারা জানে আসন্ন নির্বাচনে জালিয়াতি না করলে সরকার টিকিয়ে রাখতে পারবে না।

SIR হেয়ারিং এর শুরু থেকেই এই কথাগুলো রোজ রোজ চেঁচিয়ে বলেছি- ইচ্ছাকৃত নামের ভুলগুলো মুরুলীধর স্ট্রিটের কেশব ভবন বা দিল্লির অশোক রোডে নির্যাতন কমিশনের সদর দপ্তর থেকে কেউ করেনি। বিজেপি ও নির্যাতন কমিশন উভয়েই শঠ, দুবৃত্ত, প্রবঞ্চক, মিথ্যুক, কিন্তু বাংলাতে এদেরকে ছাড়িয়ে গেছে শাসক তৃণমূল। সাদা খাতা জমা দেওয়া 'শিক্ষক' বাহিনী, বাহুবলী BDO দের দল ও তোলামূলের পে-রোলে থাকা ডেটা এন্ট্রি অপারেটর এর ত্রিবেণী সঙ্গমের গর্ভে, i-Pac এর ঔরসে গোটা SIR ম্যাসাকারটা সংগঠিত হয়েছে। যাবতীয় হয়রানির মাস্টারমাইন্ড তৃণমূল কংগ্রেস, সাপ হয়ে কেটে ওঝা হয়ে ঝাড়তে এসেছে। না হলে কমিশন যদি দুর্নীতির দায়ে কাউকে সাসপেন্ড করে, মমতা ব্যানার্জীর এঁটো দরদ কেন উথলে পড়ছে? কারণ পরিষ্কার, তারা মমতা ব্যানার্জীর নির্দেশেই ইচ্ছাকৃত এই ভুলগুলো করেছিল।

এ বিষয়ে না আলিমুদ্দিন স্পষ্ট করে সাংবাদিক সম্মেলন করেছে আজ অবধি, না তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার সর্বজ্ঞ 'আদর্শবাদী' বাম্বাচ্চাগুলো এ নিয়ে হল্লাচিল্লা করেছে, যতটা তারা দীপ্সিতার জামাত বধে উল্লসিত ছিলো। জেনেরিক উদগান্ডু হলে তাদের ভাবনাও আঁটকে যায় ভক্তির পর্দার মাঝে। যেহেতু শুরু থেকে সাদাকে কালো আর কালোকে সাদা শেখানো হয়েছে, তাই যতই আসল 'সাদা-কালো'র প্রভেদটা কেউ চোখে আঙুল দিয়ে দেখাক, এরা গান্ধারির মতো স্বেচ্ছা অন্ধ সেজেই থাকবে।

চুরি দুর্নীতির পাঁকে ডুবে রয়েছেন মমতা ব্যানার্জী। ফলত তার রাজনৈতিক চরিত্রের image cleansing এর জন্য এখন রোজ ‘প্যাথলজিক্যাল মিথ্যা’ সম্বলিত আলফাল বকবেন, মৃত মানুষদের নিয়ে মিথ্যাচার করবেন, নতুন ভড়ং ধরবেন, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করবেন, ইনশাল্লাহ মাসাল্লাহ বিষ্ণুমাতা জয় জহর ইত্যাদি বকবেন, ছোটখাটো দাঙ্গা লাগাবেন ধর্মীয় মেরুকরণের জন্য, বিরোধী দল ভাঙানোর চেষ্টা করবেন, মিথ্যা মামলাতে ফাঁসিয়ে বিরোধী স্বরকে জেলহাজতে পাঠাবেন- ওনার গোটা রাজনৈতিক জীবনটাই এই কটা স্তম্ভের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। পাশাপাশি RSS ও চাইবে না তাদের তাদের ‘দেবী’র গদি টলে যাক। মুসলমানকে SIR এ ভয় দেখানো যায়নি, তাই আতঙ্কিত গোটা তৃণমূল নেতৃত্ব অলআউট আক্রমণে গিয়ে দাঁতনখ দিয়ে ছিঁড়ে খাবার সব ধরণের অগণতান্ত্রিক অসংবিধানিক অপচেষ্টা চালাবে।

এখনও সময় আছে, SIR এ হেয়ারিং এর নামে এই হয়রানি ও তাতে নাম বাদ যাওয়ার মাস্টারমাইন্ড যে তোলামুল, সেটাকে অষ্টপ্রহর সঙ্কীর্তন এর মতো রোজ জনগণের সামনে বাজানো। এসবের বদলে মমতা ব্যানার্জী সাংবাদিকদের কী বলেছেন, সেই নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বস্তুত ওনারই প্রচার করে যাচ্ছে সমস্ত বিরোধী শিবির। এখনও বামাতি লালবাবুদের দল ‘সেটিং’ তত্ত্বের বাইরে বের হয়ে বলতে পারছে না- কোথাও কোনো সেটিং নেই, কেউ বিজেমূল নয়। 

বামেদের গোটা ন্যারেটিভ ‘সেটিং আর বিজেমূল’ তত্ত্বে আঁটকে রয়েছে, যা গত ১০ বছর ধরে লাগাতার ফেল মেরেছে, জনগণ এটা খায়নি প্রত্যাখ্যান করেছে। আসলে TMC ও BJP এরা এক মায়ের পেটের দুই ভাইবোন, এদের একটাই বাপ- RSS, ভাই ভাই-এ বা ভাইবোনে সেটিং হয় না, ওটা ওদের নাড়ির টান। বাকি সবটাই তাদের ঘরোয়া খুনসুটি কিম্বা পারিবারিক কলহ। ওরা কোনো ভিন্ন সত্ত্বা নয়। সেটিং শব্দে আসলে ওদের আলাদা করে দেওয়াই হয়, বিজেমূল নামের হাঁসজারু সন্ধি ওদের অভিন্ন সত্ত্বাকে অস্বীকার করে। গোটা ন্যারেটিভটাই ভুল ‘লাইন’।

ক্রিকেটে আপনি যদি ‘লাইন’ মিস করেন, লোপ্পা ছয় মারার বলেও খোঁচা লাগিয়ে ক্যাচ তুলে দিতে পারেন কিম্বা তিনকাঠি উড়ে যেতে পারে। কানায় কানায় পরিপূর্ণ স্টেডিয়াম আপনার সমর্থকে ভর্তি, টিভির ওপারে আরও কয়েক কোটি আপনার জয়ের প্রতাশ্যাতে ক্ষণ গুনছে। রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশ, প্রতিপক্ষ চোটগ্রস্থ, আপনি ধড়াচুড়ো পরে রয়েছেন, প্যাড গ্লাভস হেলমেড এ্যাবডোমেন গার্ড সব রয়েছে। বাউন্ডারির বাইরে সাজঘরে দেওয়ালে আপনার সোনালী অতীতের দেওয়ালচিত্রের নিচে বসে থাকা বাঘা বাঘা এ্যানালিস্ট, কোচ, ট্রেনার, ব্রডকাস্টার সবাই প্রস্তুত। কিন্তু ‘লাইন’ মিস করে আপনি আত্মাহুতি দিলে, এই ম্যাচে আপনার কোনো সুযোগ নেই, এই যাত্রাতেও আপনার নামের পাশে ‘আর্যভট্ট’ই লেখা থাকবে। 

আমাদের নীতি, আমাদের প্রয়োজনে সেটার মাপকাঠি আমরা ঠিক করব প্রতিবার, বারংবার। এটা জোর দিয়ে বলতে কুন্ঠা কীসের?

কে গেল কিম্বা আর কে কে যাবে, ও সব ভবিতব্যের উপরে ছেড়ে দিন। যারা যাবার তারা ইতিমধ্যেই মানসিকভাবে চলে গেছে, ধরে বেঁধে রাখলে সেটাতে বড়জোর কিছুদিন লাশটা থাকবে, উল্টে আরও বেশী অন্তর্ঘাতের সুযোগ পেয়ে যাবে তাদের শয়তানি মস্তিষ্ক। গু খাওয়া গরুকে আপনি বেশিদিন ঘাস বিচালি খাওয়াতে পারবেন না, সে দড়ি ছিঁড়ে হলেও গু খেতে পালাবে। তৃণমূল চাইছে অপ্রয়োজনীয় ইস্যুতে বামেদের ফোকাস টলে যাক, তাই চুরির দায়ে জেলখাটা তাদের মূর্খপাত্র নীতি নৈতিকতার জ্ঞান দিচ্ছে, তাবড় মিডিয়াকুলও ঠেকা নিয়ে রেখেছে- কতটা হেলে গেলে বামেদের ‘নৈতিকতা’ কতটা টোল খাবে ইত্যাদি, যেন তাদেরকে নৈতিকতার চ্যুতির ঠিকেদারি দেওয়া আছে। সতীদাহ প্রথায় যেমন মৃতের স্ত্রীদের জ্যান্ত চিতায় জ্বালিয়ে দেওয়া হতো ধর্মীয় আদর্শের কথা বলে, একই ভাবে নীতি আদর্শের নামে বামকে শূন্যতেই রেখে দেওয়ার পবিত্র কর্তব্যে নিয়োজিত  এই দালাল মিডিয়া ও বিশ্বমাচাদো বুদ্ধিজীবিরা।  

আপনারা দ্রুত স্থির করুন করুন- আপনাদের ফোকাস ঠিক কীসে থাকবে আর কোন ‘লাইন’, কোন ন্যারেটিভ আপনাদের প্রচারে গুরুত্ব পাবে। আপনারা ঠিক করুন কোনটা আপনাদের নীতি আর কোনটা আপনাদের আদর্শ। আপনারা যেটাতে সীলমোহর দেবেন, সেটাই সঠিক- মিডিয়ার ঠিক করে দেওয়া পথে হেঁটে সম্ভাবনাকে ভুঁইয়ে মুড়িয়ে রাখার মাঝে আদর্শ নীতি নৈতিকতা বেঁচে থাকবে না। আদর্শ আর নীতি কপচিয়ে সতী হয়ে চিতায় উঠলে, বিপুল কর্মী সমর্থকেরা আপনাদের সাথে সহমরণে যাবে, অনাথ হবে শ্রেণি গরিবগুর্বের দল। মিডিয়া আবার তার রমনের সাথী খুঁজে নেবে আপনাকে চিতায় পাঠিয়ে। 

দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই মতো প্রচার শুরু করে দিন, হাতে সময় নেই আর।





সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

২০২৬ প্রাক বিধানসভা নির্বাচনী প্রেক্ষাপটঃ সিদ্ধান্ত নেওয়া সময়

 

শত্রু কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করে না, তারা মন দিয়ে শত্রুতা করে; বিশ্বাসঘাতকতা ঘরের লোকে করে।

(৪)

বাংলা এখন ট্রাঞ্জিশন ফেজে রয়েছে, যা CPIM সহ বিরোধীদের জন্য ঘুড়ে দাঁড়াবার সুবর্ণ সুযোগ। সেখানে কবর খুঁড়ে সত্য-অসত্য- অর্ধসত্য মেসানো ইতিহাস হাাজির করছে তৃণমূল, দীপ্সিতার এই ফোঁপরদালালির সৌজন্যে। ১৯৬৪ থেকে ২০০৫, এই দীর্ঘ সময়ে পলিটব্যুরো সম্পূর্ণ মহিলা বর্জিত ছিল। পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা এবং ত্রিপুরা এই তিন রাজ্যে কয়েক দশক ধরে শাসন করলেও আশ্চর্যজনকভাবে গত ৬০ বছরে তারা এক জন নারী মুখ্যমন্ত্রীও তৈরি করতে পারেনি, ইত্যাদি ইত্যাদি। পদ্মনিধি ধরকেও টেনে এনেছে ওরা, আপনার চোখে পড়ছে না বলে এগুলো ঘটছে না তা নয়, চোখ বন্ধ করে থাকলে প্রলয়  থেমে থাকে না। বিপুল সম্ভাবনা অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে।   

অনেকেই আবার নওশাদকে নিয়ে খিল্লি করছে তীব্র ভাষায়, এটাও একপ্রকার চরম উন্নাসিক ঔদ্ধত্বের প্রকাশ। টুপি মাথার মুসলমান দেখলেই একশ্রেণির সেকুলারের মুখোশ খুলে যায়, দাঁত নখ বেরিয়ে আসে। এই নওশাদ গত ৫-৬ বছরে বাংলার বুকে ততটুকু গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে তারা বামফ্রন্টের কাছে ৪২ টা আসনের দাবি করছে। আজ ১৬/০২/২৬ বিকালে পার্টি সেক্রেটারি নিজে জানিয়েছেন ৫-৬টা আসন নিয়ে ISF এর সাথে মতানৈক্য ব্যাতিরেকে একটা সহমতে চলে এসেছে। ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা একটা দলকে যখন, নওশাদের মতো ৩ দিনের যোগীর সাথে আসন রফা করতে হয়, সেখানে আপনার মতো ফেসবুকীয় বিশ্বমাচাদোর কোনো অউকাত জন্মায়না ওকে রাজনীতির পাঠ পড়ানোর। দীপ্সিতারা যতদিন এমন লাগামহীন ভাবে বাম দলের নেত্রী থাকবে বা এদের লালন করবে আলিমুদ্দিন, আপনি লিখে নিন- আগামীতে দীপ্সিতা দেবীর দল কটা আসনে লড়াই করবে- সেটা এই সব ৩ দিনের আল-বাল-ছাল যোগীরা ঠিক করে দেবে। উদাহরণ চান? ইতিহাসে ফিরে গিয়ে দেখে আসুন, People's United Left Front (PULF), United Left Front (ULF), United Left Election Committee, Communist Revolutionary League of India (CRLI), West Bengal Socialist Party (WBSP), Nirjatita Samaj Biplabi Party, Right Party of India, The Religion of Man Revolving Political Party of India- এদের সমর্থকেরাও কম বোদ্ধা ছিলেন না নিজের সময়ে, আজ তাদের অস্তিত্ব আছে?

আমার পেশাগত কারণে রোজ কমপক্ষে ৮০-১০০ জন নতুন নতুন মানুষের সাথে আলাপের সুযোগ ঘটে। সকলের সাথে না হলেও অধিকাংশের সাথেই রাজনীতির প্রসঙ্গ চলে আসেই, দরদামের প্রাক্কালে হোক বা রাত্রে সমবেত ডিনারের টেবিলের খেজুরে আলাপে। আমার হোটেল ব্যবসা কোনো এলিট বা ধনীদের নিয়ে নয়, এনারা গোটা পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটা পকেট থেকে আসা নেহাতই গরিব, কেউ মধ্যবিত্ত, বড়জোর উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজের, যাদের ৯৫% বাঙালি। ফলত চেয়ারে বসেই নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও এদের আশেপাশের সমাজটাকে জানা যায়, তাদের ভাবনাতে নিজের জ্ঞানকে পুষ্ট করা যায় অনেকটাই। তাই আমাকে প্রতিক্রিয়াশীল উন্মাদ বলে মিডিয়াতে না হয় দীপ্সিতাকে বাঁচিয়ে দিলেন, তাতে আপনাদের ভোটবাক্সে কোনো লাভের প্রতিফলন হবে না।

সোশ্যাল মিডিয়ার তথাকথিত ‘সেকুলার’ অমুসলিম সমাজ ঠিক করে দিচ্ছে মুসলমানদের কোন শব্দে কতটা প্রতিক্রিয়া দিতে হবে কিম্বা হবে না। এদের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে কিছু আরবী নামধারী যারা দীপ্সিতার হয়ে গলা চড়াচ্ছেন, তারা কি নিজেরা মসজিদে যান? এতক্ষণে তৃণমূল তো সেখানে সিপিএমের নামে বিষ ঢেলে এসেছে। এখন সেখানে একটা ভ্যানওয়ালা আপনাকে এ বিষয়ে শুধালে জবাব দিতে পারবেন তো? আজ অবধি ইমাম ভাতার টাকা সরকার না ওয়াকফ বোর্ড দেয়- সেটা বোঝাতে পারেননি। লক্ষ্মীর ভান্ডার সহ প্রতিটা সরকারি ভাতার টাকা যে আমার আপনার করের টাকা থেকে আসে, ওটা তৃণমূল বা মমতা ব্যানার্জীর পৈতৃক সম্পত্তি থেকে দেয় না- সেটা বোঝাতে পারেননি, আর দীপ্সিতার ‘উপহাস’ বুঝিয়ে দেবেন, তাও প্রতিকুর বিপর্যয়ের পড়েও! ঘোড়ায় হাসবে কাকা।

যারা হা রে রে করে দীপ্সিতার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছেন বিরাট সেকুলার হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, তারা কি নিজেরা জানেন ইনশাল্লাহ সুবহানাল্লাহ আলহামদুল্লিল্লাহ শব্দের মানে? এটা কী অমুসলিম সমাজের কথ্য শব্দমালা, যেমন বাবাগো, মাগো, Oh my God বা সমজাতীয় শব্দের মতো? আপনারা নিজেরা কখনও এই শব্দ দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করেন? এগুলো নির্দিষ্ট করে মুসলমানদের দৈনন্দিন মুখের ভাষা। যুক্তি হিসাবে- মমতা ব্যানার্জীকে ব্যঙ্গ করে নাকি এটা বলেছে। ভালো কথা, মমতা তো RSS এর নেত্রী, প্যাথোলজিকাল লায়ার ও ভড়ং ধরতে উস্তাদ, RSS এর এ্যাজেন্ডা লাগু করতে তার মুখে এই কথাই তো মানায়। 

আপনারাই মূলত ফেসবুক শাসন করেন, বছরে একবার ব্রিগেড যান, বড় নেতার সাথে ছবি তোলেন, নিজেদের মধ্যে গেট-টু করে আর সারাদিন খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে হোয়াটস অ্যাপে স্ক্রিনশট চালাচালি করেন। কিন্তু যখন রাস্তার মিছিলে হাঁটার ব্যাপারটা আসে, অমনি আপনাদের ৫০% গায়েব। এরপর নিজের পাড়ার জনসংযোগের সময় আরও ২০% হাওয়া হয়ে যান, আর লড়াই প্রতিরোধের পরিস্থিতে বাকি ২৮% হাওয়া। যতক্ষণে বুথে দাঁড়িয়ে থেকে ভোটটা করাবার দিন আসে- ২% পার্টিজান বাদে, আপনারা বাকি সমস্ত ফেসবুকীয় লালমুখো বাঁদরের দল গায়েব হয়ে যান। তাই, যারা ভাবে আপনারা পার্টির সম্পদ, আজ্ঞে না- আপনারা আপদ, মূর্তিমান অভিশাপ। আপনারা মেরুদন্ডহীন, আদর্শের ফাঁপা বুলি কপচানো কিছু কাপুরুষ, যারা টাইমপাসের জন্য বামবৃত্তের উপস্থিত হন মূলত মনোরঞ্জন খোঁজে। আপনারাই দলবেঁধে সর্বক্ষণ মমতাকে খিল্লির বাহানাতে, বস্তুত তৃণমূলের হয়েই নেগেটিভ প্রচারটা করে দেন দায়িত্ব নিয়ে।

ব্যক্তি দীপ্সিতাকে আমি চিনিনা, আগ্রহও নেই। তবে মিডিয়াতে দেখে যেটুকু অনুমান করেছি- তার গাত্রবর্ণ আমার মতোই কালো, এ নিয়ে তার ভিতরে চরম হীনমন্যতা কাজ করে। পাশাপাশি আবার বিদেশ ভ্রমণ, JNU ও PhD নিয়ে একটা সুপিরিয়র কমপ্লেক্সে ভোগে। যার দরুন একটা দ্বিমুখী বৈপরিত্য কাজ করে এর চরিত্রে। নিজেকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর মিডিয়াতে ভাসিয়ে রাখতে এ্যারোগেন্সি মাখা অসভ্যতামিটা চরিত্রে প্রকট করে তুলেছে। এর চেয়েও ভয়াবহ হলো- এটাকেই জনসংযোগের মাধ্যম বানিয়েছে। আছে বামদলে, কথা বলে মমতার ভাষায়, বার্তা দেয় RSS কে। সদ্য অতীতের আগুনখেকো বাম নেতৃত্বের ঋতব্রত, কানাইয়া কুমার কিম্বা প্রসেনজিত বসু- দীপ্সিতার চেয়ে কম ফুটেজ খাননি, এনারাও উস্তাদই ছিলেন। এদের হয়েও সে সময় ভক্ত লালবাবুর দল ঢাল হয়ে সে কী লড়াইটাই না দিতেন। 

এই আপাত উদগান্ডু কথাবার্তায় সূক্ষ্মভাবে একটা ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতা কাজ করে দীপ্সিতা ধরের মাঝে, যা জামাতিদের মূল চরিত্র। অমিত শাহ, মোহন ভাগবত আজও পহেলগাঁও হামলাতে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ শব্দ বলেনি, দীপ্সিতা আগ বাড়িয়ে সেটা বলে খুব হাততালি কুড়িয়ে নিয়েছিল। অতীতে কত রথী মহারথী তলিয়ে গেছে ভোগের লালসার হাতছানির কুম্ভীপাকে, যাদের চরিত্র দীপ্সিতার সাথে হুববু মিলে যায়, তাহলে দীপ্সিতা কেন সন্দেহের গণ্ডিতে আসবে না?

যে এবিপি বামেদের কোনো কর্মসূচি নুন্যতম দেখায় না– সেই এবিপির TRP বাড়াতে ইনি অষ্টমীর সন্ধ্যায় দেবাংশুর সাথে খুনশুটি আড্ডায় হাজির হয়ে যান। তৃণমূলের কেউ নাকি বিপুল দামী ব্যাগ উপহার দেয় ওনাকে, কখনও নাচছে, কখনও ওয়েব সিরিজে অভিনয় করছে, না এগুলো দোষের কিছু নয়; কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে যখন এগুলোই তার জনসংযোগের এর মুখ্য হাতিয়ার যায়, তখন উঠতি মুলো ঋতব্রততে চেনা যায়। এই কারণেই এই নেত্রীকে নিয়ে আমি ব্যক্তিগভাবে ভীষণ সন্দিহান। আমি বেঁচে থাকব কিনা জানি না, এই মহিলা আগামীতে ডানপন্থী পুঁজিবাদী কোনো দলে গিয়ে আলহামদুলিল্লাহ সুবহানাল্লাহ বলে আজকের বাম সমর্থকদের উপহাস করবে- বাকিটা জবাবটা ‘চে’ এর ট্যাটু ওয়ালা শঙ্কর ঘোষ, বঙ্কিম ঘোষ বা তাপসী মন্ডলদের কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন।

শেষ ৩টে নির্বাচনে হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলে ভোটে দাঁড়িয়েও আপনি দীপ্সিতা ধর তিন নাম্বার ছাগলছানা হয়েছেন, শুধুমাত্র ফেসবুকের ভক্তকুলের আদর্শবান ‘সেকুলার’ ভোট আপনাকে দু নাম্বারে তুলতে পারেনি। ইনশাল্লাহ সুবহানাল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ বলে যে সম্প্রদায়কে হ্যাটা করলেন ‘মমতা ব্যানার্জী’ নামের ঢালের আড়ালে, তাদের ভোটটা পেলে হয়তো জিতে যেতেন। আগামীতেও এদের ভোট না পেলে আপনি অন্য দলে পালিয়ে যাবেন মধু খেতে, আপনার দল SUCI এর সাথে মহাশূন্যে বসে 'গড পমিস' লিখে- আসমানি দেওয়ালে ধুসর আঁকিবুঁকি করবে। বামপন্থা আপনার পৈতৃক সম্পত্তি নয়। ফেসবুকের লাইক বিপ্লব, এ্যাকাডেমিক ডিগ্রী আর বিদেশে থাকার ছবি দিয়ে যে ভোটের রাজনীতিতে যে ঠনঠনে গোপাল হতে হয়- যেটা বাংলাদেশী জামাতের ফরাসি আমির পিনাকী ভট্টাচার্যকে দেখে কিছুটা শিক্ষা নিতে পারেন। 

হুমায়ুনের (আপনার আঙ্কল) সাথে আলাপের জন্য সেলিমকে সতর্ক করেছে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী, আর দীপ্সিতার মতো ফুটেজ সর্বস্ব ভোগবাদী মানসিকতার মহিলা- প্রকাশ্যে বারংবার সমগ্র মুসলমান কমিউনিটিকে কখনও জঙ্গী, কখনও উপহাস করেও, কোন যাদুমন্ত্রে ছাড় পেয়ে যায়, এটা কিন্তু আম মুসলমানকে ভাবাবে। প্রান্তিক মুসলমানকে বাদ দিয়ে কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ- CPIM কি খাতা খুলতে পারবে? আপনি ভাবছেন এটা আরও হাজারটা ইস্যুর মতো থিতিয়ে যাবে চতুর্থ দিনে, বিশ্বাস করুন তা হবে না। তৃণমূল ও RSS সেটা হতে দেবে না, এটা পাড়ায় পাড়ায় CPIM দলের মনোভাব বলেই প্রচার করবে। তাই, ইম্মিডিয়েট দলের তরফে সতর্ক না করলে এটা ক্যান্সার হয়ে যাবে, আর তা হলে মুসলমান ভোটব্যাংক ফিরবে না কাস্তেতে, হাতে রইবে পেনসিল। 

দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে SIR এর গুঁতোতে তৃণমুল ব্যাকফুটে, বিজেপি রিং এর বাইরে। RSS এর ফাটল এখন স্পষ্ট, কোনো মলমে কাজ কাজ হচ্ছে না মেরামতিতে। আগামীতে বামেদের বিপুল আসন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলত মুসলমান যাতে সিপিএমের থেকে দূরে সরে যায়, তারই হয়তো খেলাটা দীপ্সিতাকে দিয়ে খেলিয়ে দিয়েছে। একে তাকে দিয়ে নানাভাবে গুলিয়ে দেবেই RSS, তারাই এই ফুটেজখোর দীপ্সিতাকে ট্রোজেন হর্স বানায়নি কে গ্যারান্টি নেবেন ঋতব্রতের কসম খেয়ে? ফুটেজ খেতে গিয়ে, RSS এর হাতে লুকিয়ে তামাক খাওয়াটা ধরা পড়ে গেল কিনা- এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে কি? 

আগের পর্বেই লিখেছি এ রাজ্যে বিজেপির প্রতিটা মহিলা লগ্নি সব ফেল মেরেছে, নাম ধরে ধরে লেখা আছে। সেই রকম একটা পরিস্থিতিতে দীপ্সিতাই কেন বারংবার এমনটা করছে! ৯০ দশকের মমতা ইচ্ছাকৃত অশান্তি সৃষ্টির জন্য তৎকালীন কংগ্রেসের তাবড় বাঘা নেতাদের টপকে প্রদেশের সর্বোচ্চ নেত্রী হতে চেয়েছিলো। ঋতব্রতর প্রকাশ্য অসভ্যতামি গুলো ভুলে গেছেন? এগুলোই তো লক্ষণ। উনি যে পথে সংসদীয় রাজনীতিতে এসেছেন, সেই JNU এর ছাত্রনেতা উমর খালিদ জেলে, ঐশি ঘোষের মাথা ফাটিয়েছিল, প্রাক্তন বাম ছাত্রনেতা কানাইয়াও কম মারধোর খায়নি, সেই তুলনাতে এই নেত্রীর বলার মতো কোনো সাফল্যটা আছে? মহিলা চাইছে দল তাকে তাড়াক, নতুবা পশ্চিমবঙ্গের নোংরা দিক নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছে কেন? মহিলার ‘পপুলার’ TRP জোন হচ্ছে মুসলমান আর বাঙাল পরিচয়। মূর্খ একটা চাষীও জানে ধান বীজতলায় বাড়ে না, তাকে অন্য স্থান থেকে তুলে জো ধরা জমিতে পুঁততে হয়। রাজন্যার মতো ‘পাতি’ প্রেসিডেন্সিতে যখন RSS বড়শি দেয়, তারা NJU কে টার্গেট করবে না?

বামপন্থা একটা জীবনশৈলীর নাম, সারাজীবন ধরে একে লালন ও যাপন করতে হয়। যে কারণে আমি বা আমার মতো কোটি মানুষ কখনও বামপন্থী হতে পারব না, কারণ আমাদের মাঝে ভোগের লালসা রয়েছে। আপনি বিমান বসুর ত্যাগের বিজ্ঞাপন করবেন, আর দীপ্সিতার মতো নমুনাকে বাজারে প্রকাশ্যে ছেড়ে রাখবেন- দুটো একসাথে হতে পারে না। ব্রতীন সেনগুপ্ত, ৩ বারের রাজ্যসভার মেম্বারকে সদ্য গোঁফ গজানো বামাতিদের মনে থাকার কথা নয়। মজিদ মাস্টার, রেজ্জাক মোল্লা, শওকত মোল্লা, তাপস চ্যাটার্জি, সুজিত বোস, আবু আয়েস মন্ডল, আব্দুল সাত্তার, মৈনুল হাসান- এনাদের অতীত পরিচয় কর্মী সমর্থকেদের কাছে বিস্মৃত হয়ে গেলেও, ঘর পোড়া শীর্ষ আলিমুদ্দিন আজও কীভাবে সিঁদুরে মেঘ চিনতে ভুল করেন! 

রাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তা হাতের কাছে পেলে প্রত্যেকে নেবে, মুসলমানও নিয়েছে। কিন্তু সেই সহায়তা না পেলে মুসলমান মরে যাবে ব্যাপারটা এমন সরল নয়, তাই তাকে নিয়ন্ত্রণের দুটো জায়গা ধর্ম এবং ভয়। ভয়ের জায়গাটা যখন সে কাটিয়ে উঠে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে পা বাড়িয়েছে, তখনই শেষ চেষ্টা হিসেবে ধর্মের দিক থেকে ‘অকারণ’ কিছু একটা টেনে RSS অন্তিম চালটা দীপ্সিতার মাধ্যমে দেয়নি কে বলবে! 

কথিত আছে, ‘বিড়াল কালো না সাদা, তাতে কিছু যায় আসে না, যতক্ষণ না সে ইঁদুর ধরে’। নেকুপুষু দীপ্সিতাদের লালন করতে গিয়ে প্রতিকুরেরা যে ব্রাত্য হচ্ছে না, দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারবেন? এমতাবস্থায়, জনগণ যদি সর্বহারা এই উদ্ধত নেত্রীকে সেন্সার করার সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওজন দল CPIM বইতে পারবে তো?
 

২০২৬ প্রাক বিধানসভা নির্বাচনী প্রেক্ষাপটঃ অন্তর্ঘাত পর্ব

 


ভীষণ আনপপুলার অপিনিয়ন


(৩)


দীপ্সিতা ধরকে CPIM সেন্সর করবে নাকি জনগণই তাকে সেন্সর করবে? 


ডিসক্লেইমারঃ ও পাড়ের জামাত আর এ পাড়ের RSS, এদেরকে যদি আপনি অন্তর থেকে ঘেন্না না করতে পারেন, তাহলে নিজের মনুষ্যত্ব নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত। তাই জামাত ও তাদের বিষাক্ত আমিরকে নিয়ে ব্যঙ্গোক্তি বিষয়ে- কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের। জামাত কোনো নির্দিষ্ট দেশের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নয়, একটা একটা কুৎসিত কনসেপ্ট তথা আদর্শের নাম। নাইজেরিয়াতে বোকো হারাম, আফগানিস্তানের তালিবান, শ্রীলঙ্কার LTTE, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী (তাতমাদো), গোটা পাকিস্তান রাষ্ট্র কিম্বা ভারতের RSS, এরা সকলেই জামাত। এদের এক ভাবাদর্শ, একই চিন্তাধারা, শুধু দেশ ভেদে নাম গুলো আলাদা।

বিজেপির জামানাতে তীব্র ইসলামোফোবিয়া আক্রান্ত টক্সিক রাজনীতির অভিঘাতে এদেশের মুসলমানরা প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কিত হয়ে রয়েছে। আপনি অমুসলিম হলে সেই আতঙ্কের ধাক্কার ১% অনুভব করতে পারবেন না। এই আতঙ্কই মমতার মূল হাতিয়ার ছিল- তৃণমূলকে ভোট না দিলেই বিজেপি চলে আসবে। আমরা শুরু থেকে বলে আসছি, মমতা ব্যানার্জি প্রান্তিক মুসলমানকে ভয় দেখাতে পারেনি, যে মুসলমানের ভোট পেয়ে উনি ক্ষমতার মসনদে। ২০২১ সালে NRC জুজুতে মুসলমান ভোট পোলারাইজেশন হয়েছিল, SIR ইস্যুতে তৃণমূলের ভয় দেখাবার প্রতিটা চাল বিফলে গেছে। চুরি দুর্নীতি বাদেও OBC ও ওয়াকফ ইস্যুতে গোটা সম্প্রদায় ফুসঁছে। ভোট দিতে পারলে তারা তৃণমূলের বিকল্পেই ভোট দেবে, আর সেটাই CPIM এর সামনে সুবর্ণ সুযোগ। লড়াইটা তো অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের, লড়াইটা খেটে খাওয়া মানুষের রুটিরুজির। গত ১২ তারিখ অবধিও তো সেটাই ছিল। শেষ ৩ দিন ফেসবুক ইউটিউব খুললেই দীপ্সিতা, কেউ পক্ষে তো কেউ বিপক্ষে। গোটাটাই অনর্থক বিষয়ে, এমনকি আমার এই পর্বটাও। 

বামেদের এই সমূহ সম্ভাবনাময় পরিস্থিতে একমাত্র নিজেদের ঘর থেকে সাবোটেজ না হলে আশাতীত ফলাফল অপেক্ষা করছে CPIM ও তার শরিকদের জন্য। যেকোনো ধরনের ধর্ম নিয়ে এমন উপহাস বিদ্রুপাত্মক লাগাতার নিকৃষ্ট মন্তব্যের উদাহরণ, অতীতে কোনো বাম নেতার নেই, এটা বামেদের ঘরানাই নয় গোটা বিশ্বজুড়ে। 

প্রতিকুর কেন ইস্তফা দিয়েছে জানি না, কিছু আগামীর সম্ভাবনা বীজ পুঁতেই সে যে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটার জন্য গনৎকার হতে হবে না। কেউ যখন আজকে পালাচ্ছে, এটা শুধু ঘোষনার দিন মাত্র; মানসিকভাবে সে ছ’মাস এক বছর আগেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শাসকের মার খাওয়াটা কারো একমাত্র যোগ্যোতা হতে পারে না, রাজ্য জুড়ে প্রতিটা বুথে এমন অসংখ্য বামকর্মী সমর্থক আছে, যারা শাাসকের অত্যাচারে ঘটি বাটি পরিবার সব খুইয়েছে। ফুটেজখোর হয়ে যাওয়াটা ভয়াবহভাবে মানসিক সমস্যা তৈরি করে। সৃজন-প্রতিকুর জুটির আমলে SFI এর সংগঠনের অন্তর্জলী যাত্রা সবচেয়ে দ্রুত হয়েছে, নতুন ইউনিট খোলা তো দূরস্থান বরং একের পর এক কলেজে ঝাঁপ বন্ধ হয়েছে, নির্বাচন হয়নি, তার জন্য আন্দোলনটুকুও করেনি এরা। সৃজন গিটারবাদক হয়ে এবিপিতে গান গেয়েছে, প্রতিকুর হাত্তালি দিয়ে দন্ত বিকশিত করে ওই পথ বেয়ে রাজ্য নেতৃত্বে উত্তীর্ণ হয়েছে। 

SFI এর পদ সরে যেতেই প্রচারের লাইমলাইট হাওয়া হয়ে গেছে, এবারে ফুটেজ পেতে গেলে ময়দানে দৌড়ে কাজ করতে হবে কিম্বা সাম্প্রদায়িক এ্যাঙ্গেলে ফেসবুকে খেলতে হবে, দুটোতেই ফেল মেরেছে। এদিকে ISF, INC, JUP এর নিষিদ্ধ হাতছানি তো আছেই, বাকিটা সময় উত্তর দেবে। সৃজন, প্রতিকুর, দীপ্সিতা এদের রোগই হচ্ছে ভোটে দাঁড়ানো, বিধানসভা হোক বা লোকসভা- অমনি দাঁড়িয়ে যাওয়া, ফুটেজের পরাকাষ্ঠা। একই রোগে আক্রান্ত সুজন চক্রবর্তী এবং পার্টি সম্পাদক নিজেও। ভবিষ্যতে যদি দলের হাল আরও খারাপ হয় কখনও, এনারা কোমর বেঁধে পঞ্চায়েত বা মিউনিসিপ্যাল ইলেকশনেও দাঁড়িয়ে পড়বেন অতীতের ট্রেন্ড অনুযায়ী। সকলকে MLA/MP ই হতে হবে কেন? বাম রাজনীতিতে ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা’ নিজেকেই কেন পেতে হবে!

একে তো হিন্দু ভোটের একটা বড় অংশ RSS এর ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক উন্মাদনার কারণে বিভ্রান্তির শিকার। ফলত এনাদের ভোটটা BJP পায়, যেটা প্রায় ১০%। বিজেপির কোর ভোটার ৫-৬%। বাকি প্রায় ২৩% হিন্দু ভোটার CPIMকে শাসক হিসাবে বিশ্বাস করা তো দুরস্থান, সামান্য বিরোধী হিসাবেও ভরষা না করার কারণে, তারা তৃণমূলকে ঠেকাতে বিজেপিকে ভোট দেয়। উত্তরবঙ্গে ৭টা জেলার দিকে তাকালেই তো উদাহরণ পায়ে হেঁটে এসে চোখে ঢুকে যায়। ২৩+১০, এই ৩৩% ভোটকে রাতারাতি সিপিএমের বাক্সে আনা যাবে না যতদিন RSS এর সরকার থাকবে রাজ্যে। 

ইনশাল্লাহ সুবাহানাল্লাহ আলহামদুল্লিলাহ বলা জনগোষ্ঠীর পুরো ভোটটা CPIM এর ঘরে ফেরা সম্ভব তৃণমূলের ঘর থেকে। এই সম্প্রদায়ের ০.১% জনগণও বিজেপিকে ভোট দেবে না মরে গেলেও। এদের ভোটার সংখ্যা তালিকাতে ৩০% ছুঁইছুঁই হলেও, পোলিং ভোটের ৪৩%। এই ভোটটা পুঁজি করেই তৃণমূল ক্ষমতায়, যারা নানা ভাবে তৃণমূলের উপরে অতিষ্ট ও মুক্তির পথ খুজঁছে। সেই সময় তাদের পাশে মরমী হয়ে দাঁড়াতে হবে, তাদের আপনজন হতে হবে, দেখনদারিতেও কার্যক্ষেত্রেও। মার্ক্স মাও লেনিন কপচিয়ে, উপহাস, ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ করে প্রান্তিক মুসলমানকে ভরষা দিতে পারবেন না। 

RSS এর বিরোধিতা করতে গিয়ে কেউ বেদের বিরুদ্ধে, রামায়ণ মহাভারতের বিরুদ্ধে বা হিন্দু ধর্মের আরাধ্য দেবদেবী বা পূজার মন্ত্র নিয়ে উপহাস তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে পারি না। আমাকে কেউ সেই অধিকার দেয়নি। তাই জামাত বা RSS এর নামের আড়ালে এগুলো যে করে, তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এতে ধর্মীয় ভাবাবেগ আহত না হলেও সামনের ব্যক্তিটির মনোভাব পরিষ্কার হয়ে যায়।

আসল সমস্যাটা গোড়ায়। আমাদের সমাজের সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায়ের ৯৭% মানুষ, মুসলমান সমাজের পরিকাঠামো সম্বন্ধে নূন্যতম ধারণা রাখেন না, প্রয়োজনও বোধ করেননি কখনও। যা আছে তা ওই ভাষা ভাষা, ওরা গরু খায়, কাকাতো মাসতুতো ভাই বোনে বিয়ে করে, এক একজন একগাদা বিয়ে করে, ওরা সিমুই লাচ্ছা খেয়ে গাদা গাদা বাচ্চা পয়দা করে, আর ক্রিকেট ম্যাচে পাকিস্তানকে সাপোর্ট করে। ফুলস্টপ। এর বেশি কিচ্ছু জানে না। কিছু নাস্তিক, শহুরে আঁতেল ও সোস্যাল মিডিয়ার মুসলমানকে দেখেই গোটা সম্প্রদায়কে জেনারালাইজড করে ফেলে, যেখানে মুসলমান সমাজে নাস্তিকের সংখ্যা ১% বা তারও কম। গোটা সম্প্রদায়ের ৮৩% মানুষই কৃষক বা শ্রমিক- আমার জ্ঞান মতে এরাই তো শ্রেণি। এরা তত্ত্ব বোঝে না, ইনশাল্লাহ সুবহানাল্লাহ-টা এদের মুখের আম ভাষা, ধর্মের পাশাপাশি তাদের সংস্কৃতি এটা। মমতা ব্যানার্জীর স্টাইলের ভাষা ওগুলো নয়, যেটা উপহাসের সাবজেক্ট। 

মুসলমান চাষী, মুসলমান মুনিষ, মুসলমান রাজমিস্ত্রী, সোনার কাজ করে, তাঁতি, দর্জি, জরির কাজ, এমব্রডয়ারি, চামড়ার কাজ, পিতলের কাজ, পালিশের কাজ, বিড়ি বাঁধা, ধুপ তৈরি, পশু পালন, মাছ চাষ, ইত্যাদি জাতীয় পেশাগুলো মোটামুটিভাবে মুসলমান দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। রাজ্য অর্থনীতিতে মুসলমান নারী সম্পূর্ণভাবে রাজ্যের লক্ষীর ভান্ডারের উপরে নির্ভরশীল নয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে মুসলমানকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, এটা বুঝতে পেরেই একমাত্র বিজেপি জুজুর রাজনীতি আর নাগরিকত্বের প্রশ্নে টালমাটাল করে দেওয়ার মতো আবহ তৈরি করে, মুসলমান ভোটকে এতদিন নিয়ন্ত্রণ করেছে শাসক তৃণমূল। 

যারা গাঁ, গঞ্জ, বস্তির প্রান্তিক গরিব মুসলমান, বিশ্বাস করুন তারা সিংহভাগ ওই তিনটে শব্দের বাইরে আল্লাহ আর নবীটুকুই জানে, আর তেমন কিছুই জানে না। কেউ কেউ বড় জোর নামাজের কয়েকটা সূরা, তাই আবার ১ লাইন আরবি শব্দের মানে জানে না অধিকাংশ। তাদের আস্তিক ধর্মাচারণের নিত্যদিনের জ্ঞাপনের ভাষা ওই ইনশাল্লাহ, মাশাল্লাহ। ‘ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত’ এমন ভারি শব্দের মানেও এদের কাছে অচেনা, কিন্তু ওরা এটা বোঝে- কে আপন আর কে নয়। এই ফুটেজখোর উদ্ধত মহিলাটি ‘আমাদেরকে’ উপহাস করছে, ব্যঙ্গ করছে, বারংবার করেছে- এটা না বোঝার মতো নির্বোধ তারা নয়। 

আপনি বা আমি লেখার ভাষায় যত খুশি তত্ত্বের কচকচি করি না কেন, আম পাবলিক ততটুকুই নেয়, যতটুকু তার দরকার। সাধারন গরিব মুসলমান তারা ডান বা বামপন্থা বোঝে না, তারা অত্যাচার বোঝে, তারা পরিত্রাণ খোঁজে। আর বোঝে- কে তাদেরকে বোঝে। দীপ্সিতার এই ভাষা, সাধারণ মুসলমানকে CPIM থেকে দূরে সরিয়ে দেবেই। এটা না রাজনৈতিক প্রাজ্ঞতার পরিচয় না বুদ্ধিদীপ্ত সারকাজম। স্যাটায়ার ব্যাকফায়ার করে গোটা বিষয়টাকে ছড়িয়ে লাট করে দিয়েছে। লড়াই এর ময়দানে কোনো স্নো পাউডার, রিটেক, পিছনে ফেরা, কোনো কিচ্ছু নেই। প্রান্তিক মুসলমান সমাজের কাছে বার্তা যাচ্ছে- এদের দলই হয়তো একে খোলা ছেড়ে রেখেছে, কারণ ইনি দলের অন্যতম মহিলা মুখ। এটাই তৃণমূল বোঝাচ্ছে, কারণ তাদের ভোটে জিততে হবে। মুসলমান ভোটেই তাদের প্রাণভোমরা টিকে আছে। সিপিএমের সংগঠন এমন অবস্থাতেও নেই যে তারা তৃণমূলের পাল্টা হিসাবে মাঠে ময়দানে মুসলমান মহল্লাতে ‘পাল্টা’ ন্যারেটিভ পৌঁছে দিতে পারবে। এই নেত্রী ও তার ভক্তকুলের মতো ফেসবুকের ফুটেজ বিপ্লবের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্গাজম দিয়ে শূন্য কাটবে না। 

অথচ, বিষয়টা তেমন গুরুত্বপূর্ণই ছিল না। সামান্য তিল, যাকে তাল পাকিয়ে দিয়েছে এ পাড়ের জামাত মনোভাবাপন্নেরা, যারা চায় CPIM শূন্যই থাকুক। এই মহিলা, বারংবার ফাঁপা স্টান্টবাজি করতে গিয়ে এমন কথা প্রতিবার লেখে, যেটা শুধু অশোভনই নয়, নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। এই ফাঁকে জিম নাওয়াজের মতো বিষাক্ত সাপগুলো, ছুপা জামাতেরা দাঁত নখ বের করে আক্রমণের সুযোগ পেয়ে গেছে। ব্যক্তি দীস্পিতা উহ্য হয়ে গিয়ে গাঁ গঞ্জের প্রান্তিক মুসলমানের কাছে CPIM কে মুসলমান বিদ্বেষী হিসাবে প্রতিকৃত করার অপচেষ্টায় লেগে পড়েছে। 

তৃণমূল রাজনীতি করতে এসেছে, এমন বহু phd ধারীকে ওরা চাকরবাকর বানিয়ে রেখেছে। ভায়া আইপ্যাক, তারা সোশ্যাল ইঞ্জিয়ারিংটা বোঝে, তাই তারা ইউসুফ পাঠান, জুন মালিয়া বা সায়ন্তিকার মতো অপগন্ডদের জিতিয়ে আনতে পারে। মমতা ব্যানার্জী RSS এর সহযোগিতাতে ইনশাল্লাহ সুবহানাল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ করতে করতেই গোটা সম্প্রদায়কে দুধেল গাই বানিয়ে দিয়েছে, আর সেটা থেকেই এই সমাজটা মুক্তি চাইছে। মমতা তার বুলি দিয়েই বামফ্রন্টকে শূন্য করে দিয়েছে। যারা দীপ্সিতার সমর্থনে শেষ ৩ দিন ধরে 'ভুলটা কী বলেছে' জপে গেল- তাদের সেই বোধটা থাকলে আর্যভট্টের আবিষ্কারের সাথে একাত্বীভূত হতে হতো না আপনাদের। জামাত শব্দের ঝুলফাঁদে আপনারা গুলিয়ে দিতে পারবেন না। না জানাটা অপরাধ নয়, কিন্তু সেই নির্বুদ্ধিতাকে প্রমাণ করার তাগিদে গলা ফাটালে সেটা যে শুধু হাস্যকরই হয় তা নয়, ভিতরের অন্তঃসার শূন্যতাটাও প্রকাশ পেয়ে যায়।

আমার বেশকিছু বামমনস্ক বন্ধুকে দেখলাম দীপ্সিতার হয়ে অভিষেক শর্মা স্টাইলে চালিয়ে খেলছেন। 'ম্যান টু ম্যান' বিতর্কে যাব না আমি, প্রত্যেকের নিজস্ব মতামত আছে। আমার ভাবনা যেমন আমি চাপিয়ে দিই না, তেমন আমাকেও তেমন আপনার সাথে প্রতিটা বিষয়ে লাইন বাই লাইন ঐক্যমত হতে হবে না। ভক্ত তাদেরই বলে যারা অন্ধ সমর্থক, এক্ষেত্রেও লাইন দিয়ে যারা অন্ধ সমর্থন করছেন আপনারা লালচাড্ডি বা লালবাবু। এই আপনারাই তো বামেদের পক্ষে জান কবুল করে দায়িত্ব নিয়ে দলকে শুধু শূন্যতেই পৌঁছে দেননি, ভোট শতাংশকেও ৫%এ টেনে নামিয়েছেন শেষ এক দশকে। ফেসবুকে আপনাদের ৫০০০ জন সর্বজ্ঞ আদর্শবান কমিউনিস্ট ও সেকুলারের ভোটে ২০২১ এর নির্বাচনে ১৫৮টা কেন্দ্রে জামানতটুকুও বাঁচাতে পারেননি নিজেদের দলের। চাইলেই একটু শিক্ষিত হওয়া যায় বৈকি, তবে মূর্খ ও উদগান্ডু হওয়ার অধিকার সকলেরই আছে।

…ক্রমশ


রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

২০২৬ প্রাক বিধানসভা নির্বাচনী প্রেক্ষাপটঃ ভয় পর্ব

 


(২)

সোভিয়েত পতনের সাথে সাথে সাথেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছোট বড় প্রত্যেকটি পকেটে বামপন্থী কর্মী সমর্থক এবং শাসকের উপরে বিভিন্ন পদ্ধতিতে হামলা শুরু হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গ তার ব্যতিক্রম ছিল না। ১৯৯৩ এ উগ্র বিধ্বংসী আন্দোলনের নামে মমতা ব্যানার্জীর উন্মত্ততা তারই প্রকাশ বলা যেতেই পারে। তাই ৯০ দশকের গোড়াতেই RSS এর ঔরসে কংগ্রেস গর্ভে তৃণমূলের জন্ম নেওয়া যে একটি সুদূর প্রসারী লগ্নি ছিল, তা মেনে নিতে আজ অন্তত দ্বিধা থাকার কথা নয়, যা আজকের তৃণমূলের রাজত্বে প্রমানিত। 

১৯৯৮ সালে জন্ম নিয়েই মমতা ব্যানার্জীর তৃনমূল ২৮টা লোকসাভা আসনে লড়াই করার মতো রসদ যোগাড় করেছিল RSS এর মাধ্যমেই, সেটা প্রামান্য নথিতেই রয়েছে। বিজেপির সাথে ২:১ আসন ভাগে লড়ার সিদ্ধান্ত তো RSS ছাড়া হয়নি, ২৮টা লোকসভা আসন মানে ১৯৬টা বিধানসভা আসনে লড়াই করা কী ছেলেখেলা? কে দিয়েছিল সেই বিপুল অর্থ? পাশাপাশি বিজেপিকেও ৯৮টা আসনে শক্তি দিয়েছিল। সেদিন কি বিজেপি সাম্প্রদায়িক ছিল না? বাবরির ঘা তো তখনও শুকায়নি! এই তৃণমূলই আজকে বিজেপিকে রোখার রঙিন গল্প বলে, মুসলমানকে ভয় দেখায়। আশ্চর্যভাবে দুধেলগাইগুলো বিশ্বাসও করেছিল ও করে। কটা দিন যেতে দিন, মমতার চোর ইমেজের ভাবমুর্তি মুছে দিতে তার নানান পডকাস্ট সাক্ষাৎকার বাজারে আসবে, নানান চ্যানেলে; যেন তিনি ‘দেবী’ এমন ভাবে পোট্রেট করা হবে।

৩৪ বছরের বাম শাসনামলে কংগ্রেস, তৃণমূল বা উভয় জোটের ভোটের শতাংশ কখনই ৩৫ শতাংশের নিচে নামেনি। তাই ২০০৯ বা তার পরবর্তী ২০১১ এর রণনীতি সাজাতে তথা কংগ্রেসের গুরুত্ব অনুধাবন করতে- তৃণমূল নেতৃত্বের খুব একটা ভুল হয়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২০১১ এর পরিবর্তন- কংগ্রেসের সাহায্য ছাড়া কোনোমতেই সম্ভব ছিল না। শুধুমাত্র বাম বিরোধিতাকে ভিত্তি করে জন্মানো তৃণমূল- তার জন্মদাত্রী জাতীয় কংগ্রেসের সংগঠন ও ভোটাদের ধীরে ধীরে খেয়ে এমন ছিবড়ে করে ফেলেছে যে, আজকের তারিখে গনি খানের গড়ে তাদের পরিবার কিম্বা অধীর চৌধুরী পর্যন্ত নিজেদের আসন হারিয়ে ফেলেছে। সোমেন মিত্র থেকে মানস ভুঞ্যাঁ, এমন সকলকে চটির নিচে এক লজ্জাজনক আত্মসমর্পন করতে বাধ্য করেছে।

অপারেশন বর্গা ও দীর্ঘ বাম শাসনে রাজ্যের বিরোধী হিসাবে অধিকাংশ সময়কালটাই জাতীয় কংগ্রেসই ছিল। স্বভাবতই তাদের ভোটারের মধ্যে একটা স্থায়ী বাম বিরোধ, বিবাদ বা দ্বন্দ্ব যা খুশি বলুন- এগুলো স্থায়ী হিসাবে চরিত্রে গেঁথে গিয়েছিল। উল্টোদিকে কংগ্রেসের প্রতিও একই অসূয়া বামেদের মধ্যেও তীব্রভাবে ছিল, ফলে উপরতলার জোট তথা সমঝোতা কখনই নিচুতলায় স্বতঃস্ফূর্ততা আনেনি, উল্টে অভিযোগের অন্ত ছিল না। স্বভাবতই কংগ্রেসী ভোটারদের মধ্যে পারিবারিকভাবে একটা স্থায়ী বাম বিরোধীতা অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। তবুও একটা জিনিস বলা যেতে পারে, যেহেতু নির্বাচনে জিতলে শাসন ক্ষমতা মূল চাবিকাঠি বামেদের হাতে থাকতো, তাই জোটের ব্যাপারে বামেরা যতটা আন্তরিক এবং সক্রিয় ছিল; মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কংগ্রেস সমর্থকদের পক্ষে বামেদের জন্য ততটা আন্তরিক হওয়া সম্ভব ছিল না এবং বাস্তবে তারা হয়ওনি। 'কংগ্রেস আমাকে ভোট দেয় না' বলে কান্নাকাটি করা ফেসবুকের বাম সমর্থকদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে এই কারণেই বারবার প্রশ্নচিহ্ন ওঠে।

১০ বছরের সম্পর্কে পারস্পারিক অভিযোগগুলো মোটামুটি একই থাকলেও, বামকর্মী সমর্থদের তরফে দাবীগুলোর বাস্তব সারবত্তা ছিল। যেমন, বুথে ঝান্ডা টাঙ্গানোর লোক নেই কংগ্রেসের, পোস্টার ব্যানার ছাপাবার টাকা দেয় না, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার মঞ্চ থেকে মাইক সব নিজেদের খরচা করতে হয়। যেহেতু সবকিছুই চাঁদা দিয়ে করতে হয় তাই কংগ্রেসের প্রার্থীর নামে কেউ চাঁদা দিতে চায় না। কংগ্রেসী সমর্থকরা বাম নেতৃত্বের মিটিং মিছিলে মাঠে আসে না। বক্তা তালিকা কংগ্রেস নিজেদের মতো ঠিক করে, মঞ্চের টাইমে বামেদের বলার সুযোগ দেয় না বা কম দেয়। চাহিদা মতো কংগ্রেসী কোনো বিশিষ্ট বক্তাকে চাইলে তাদের উপেক্ষা করা। যেকোনো গন্ডগোল হলেই পলায়ন করে, পরবর্তী মামলা মোকদ্দমাতে সাথ দেয়না, ইত্যাদি। 

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল- হাতে গোনা দু-চারটে আসনের বাইরে ৯৯% বুথে কংগ্রেসীদের এজেন্ট না দিতে পারার অক্ষমতা, উলটে বামেদের তরফে এজেন্ট বসাতে হয়েছে। এত কিছু করে ক্যান্ডিডেটকে জেতালে, সে বিক্রি হয়ে তৃণমূলে চলে যাবে না- এই আতঙ্ক সারাক্ষণ তাড়া করে ফিরেছে বামেদের। 

২০১৬ পরবর্তী বাম-কংগ্রেস জোটের পরীক্ষা যে একপ্রকার ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৬ এর নির্বাচনের আগে কংগ্রেস নেতৃত্ব তথা রাহুল গান্ধী বিষয়টা বুঝে, একটা স্থির সিদ্ধান্তে আসতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাহুল গান্ধীর কেরলের ওয়েনাড আসনে দাঁড়ানোটাই জোট ভাঙ্গার ইঙ্গিত ছিল, ২০২৪ এ প্রিয়াঙ্কাকে পুনরায় ওখান থেকে প্রার্থী করে সেটাতে সীলমোহর দিয়েছিল। ইয়েচুরি পরবর্তী বাম নেতৃত্বের তরফে দেওয়াল লিখন পড়তে না পারার দায় তাদের নিজস্ব এ্যাচিভমেন্ট, বিশেষ করে বঙ্গ সিপিএম এর। বঙ্গ CPIM কাটা হাতকে সামনে ঝুলিয়ে রেখে, দুটো চারটে আসনে বৈতরিনী পার হওয়ার ঘিনঘিনে প্রচেষ্টা করলেও, মাটিতে টিকে থাকা বামকর্মী সমর্থকরা যে খুব ভালোভাবে নেয়নি, সেটা শুরুর দিন থেকেই পরিষ্কার ছিল। তাই ভোট পরবর্তী নির্বাচনী ফলাফল ব্যাখ্যার নামে বিরাট একটা বিবৃতি প্রকাশের দ্বারা- দায়িত্ব অস্বীকারের যে প্রবণতা নেতৃত্বের মধ্যে দেখা দিয়েছিল, সেখান থেকে বিভিন্ন রকম অজুহাতের মধ্যে ‘আমরা ভোট দিলেও কংগ্রেস আমাদের ভোট দেয় না’ জাতীয় একটি অক্ষম অজুহাত শুরুতেই বাদ পড়ে গেছে। 

সবচেয়ে বড় সমস্যার মুখোমুখি হতে চলেছে বামফ্রন্টের তথাকথিত শরিক দলগুলি। RSP ইতিমধ্যেই রাজ্যে তাদের সিম্বল হারিয়েছে, এই শতকের শুরুর মুর্শিদাবাদের মাটিতে তাদের শক্তিশালী অংশগুলিতেই আজ হুমায়ূন এর পার্টির উদ্ভব হয়েছে, তবে হুমায়ূন সম্পর্কে মন্তব্য করার মতো সময় এখনো আসেনি। এদিকে CPI আর SUCI এখন এক সারিতে দাঁড়িয়ে, সেই অর্থে এরা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কোনো শক্তিই নয়। রাজ্যে CPI এর সিম্বলটুকু টিকে আছে শুধুমাত্র পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কল্যাণে। বামফ্রন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শরিক ফরওয়ার্ড ব্লক- কোচবিহার আর পুরুলিয়াতে পঞ্চায়েত স্তরে সামান্য অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারলেও, উত্তর দিনাজপুর, হুগলি ও উত্তর ২৪ পরগনা, এমনকি মূল শহর কলকাতার সংগঠন শক্তি ও ভোটার সবকিছুই হারিয়েছে। উত্তরবঙ্গে বিজেপির উত্থান ও দক্ষিণবঙ্গে ISF দলের উত্থানের অন্যতম কারণ ফরওয়ার্ড ব্লকের ব্যর্থতা। 

জোটের দায়বদ্ধতার দরুন সিপিএম নেতৃত্ব নিজের ভাগের আসন ছেড়ে জোট সঙ্গীদের দিলে কোন সমস্যা ছিল না, কিন্তু নিধিরাম সর্দার অন্যান্য বাম শরিক, যাদের দলের ৯৫% চটির নিচে সেঁধিয়ে গেছে, তাদেরকে আসন বিষয়ে ছাড় দিতে বললেই তারা বেড়ালের মতো ফ্যাচ ফ্যাচ করে দাঁত নখ বের করে বাম ঐক্যের বিষয়ে গল্পমালা ফাঁদাটা অভ্যাসে পরিনত করেছে। আশ্চর্যজনকভাবে কেরলের UDF ফ্রন্টে RSP-ফরওয়ার্ড ব্লক কংগ্রেসের সাথেই আছে, সেটা পুরোটাই ভাবের ঘরে চুরি বা ধ্যাষ্টামো।

গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীরা রাজ্যের যে যেখানেই নির্বাচিত হয়েছে, তারা তৃণমূলের লুঠেরা বাহিনীকে প্রতিহত করে তথা পাল্টা ঠেঙিয়েই জিতেছে। আজ দীর্ঘদিন বাদে এমন ব্যাতিক্রমী পরিস্থিতে মহঃ সেলিম যেভাবে মিডিয়ার বাইনারিকে ভেঙে সিপিএমকে প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা করছেন, সেটার জন্য কোনো সাধুবাদই যথেষ্ট নয়। তাই তৃণমূলীয় লেঠেল বাহিনীর বিরুদ্ধে জিততে গেলে, পাল্টা মার দিতে হবে। নিজেরা না পারলে, যে পারবে তাকে সাথে নিতে হবে। এটাই সমসাময়িক আদর্শ। নতুবা বাংলা কংগ্রেস, স্বরাজ পার্টি, রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস, প্রগতিশীল ইন্দিরা কংগ্রেস, বাংলা বাঁচাও ফ্রন্ট ইত্যাদির ভিড়ে নিজের দলকে দেখার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিন। CPI, RSP ও ফরোয়ার্ড ব্লক ওই অন্তর্জলী যাত্রার পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। বামপন্থা তার বৈপ্লবিক আদর্শে নতুন অবতারে নতুন নামে আবার হাজির হবেই, কিন্তু আপনার পছন্দের দলটা এই ফর্মে থাকবে না, এটার গ্যারান্টি দিলাম।

RSS তাই পার্টি সেক্রেটারিকে মুসলমান হিসাবে দাগিয়ে দেবেই, কারণ ওরা মরিয়া। এই কারণেই যেকোনো মূল্যে ISF এর সাথে আসন সমঝোতাটাকে গুলিয়ে দিতে চাইছে RSS, বিজেপি যেহেতু ২০২৬ এর নির্বাচনে বাংলার ক্ষমতা দখলের লড়াই থেকে দৃশ্যত ছিটকে গেছে, তাই তাদের খোঁচর তৃণমূল যেন টিকে থাকে, এই চেষ্টাতে তারা জান লড়িয়ে দেবে, তবেই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি জীবিত থাকবে এই বাংলার মাটিতে, তবেই RSS এর এ্যাজেন্ডার বাস্তবায়ন ঘটবে বিনা বাধায়। এই কারণেই হুমায়ূনের সাথে সামান্য মিটিং করলেই গোটা মিডিয়া ও স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবীরা অদ্ভুত জান্তব ব্যথায় ককিয়ে উঠে চেঁচিয়ে গাঁ মাথায় করছে। যেচে সিপিএমকে নীতি নৈতিকতার পাঠ পড়াচ্ছে, যাদের নিজেদের ও জিনিস কখনই ছিল না। 

সুতরাং, বাম-কংগ্রেস জোট না হয়ে বিরোধী ভোটের বিভক্তিতে যেখানে শাসক তৃণমূল শিবিরের উল্লসিত হওয়ার কথা ছিল, তার বদলে আইপ্যাক, তৃণমূল নেতৃবৃন্দ, তাদের কর্মীদল, তৃণমূল পোষিত বুদ্ধিজীবী, বিশ্বমাচাদো বিশ্লেষকের দল ও দালাল মিডিয়ার মধ্যে হাহাকার রব উঠে গেছে বহুমুখী ভোটের অজানা শঙ্কায়। এর পরেও এই পুঁজিবাদী ধর্মান্ধ RSS শেষ মুহুর্ত অবধি বামেদের ভিলেন বানাবার চেষ্টা করবেই। এর জন্য যেকোনো অসাধু উপায় তারা অবলম্বন করতেই পারে।

এখানেই আরো একটা ভয়াবহ বিষয় উঠে আসে, যা বামেদের গোটা সম্ভাবনাকে ভুঁয়ে মুড়িয়ে দিতে পারে। RSS এর ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, প্রথমত তারা ডাবল এজেন্ট নিয়োগ করে। সবসময় অনেক দূরের লক্ষ্যে চারা রোপন করে, যেমন মমতা ব্যানার্জীর পিছনে তারা লগ্নি করেছিল, আজ পবন কল্যাণের পিছনে লগ্নি করছে। দ্বিতীয়ত, অন্যের খামারে বেড়ে উঠা তাজা প্রতিশ্রুতিমান লোভী নেতা-নেত্রীদের টার্গেট করে দলে ভিড়িয়ে, নিজেদের পার্পাস সার্ভ করে। ঠিক আজকের দিনে বাংলার শুভেন্দু, মহারাষ্ট্রে শিন্ডে, আসামে হেমন্ত বিশ্বশর্মা, মধ্যপ্রদেশে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। আসামে অগপ থেকে বিজয়া চক্রবর্তীকে নিয়ে এসেছিলো RSS, আজকের আসাম সহ গোটা উত্তরপূর্ব ভারতে যে সাম্প্রদায়িক অশান্তি- তার মূল বীজ বপন করেছিলো এই নৃশংস মহিলা। অতীত ঘাটলেও কংগ্রেস, সমাজবাদী দলগুলো এমনকি বামেদের ঘর থেকে গিয়েও অনেকে RSS এর প্রধান রাজনৈতিক শাখা BJP এর মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারায়ন রাণে, রীতা বহুগুণা যোশী, রভনীত বিট্টু, মুকুল রায়, গৌরব ভাটিয়া, নীরজ শেখর- অগুন্তি। 

মমতাকে কাউন্টার করার জন্য বিজেপির প্রতিটা মহিলা প্রোজেক্ট ফেল করেছে। রূপা গাঙ্গুলী ফেল, লকেট চ্যাটার্জী ফেল, দেবশ্রী চৌধুরী ফেল, অগ্নিমিত্রাও আঁটকে গিয়ে- মুসলমানকে ক্রিমিনাল দাগিয়ে মিডিয়াতে ভেসে থাকার চেষ্টাতে মত্ত। এদিকে বিজেপির একটা আগামীর মুখ ভীষণ দরকার, ইতিমধ্যেই বামেদের মহিলা ব্রিগেড যথেষ্ট শক্তিশালী। ABVP এর পাইপলাইনে এমন একটাও মুখ নেই যাকে নিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী RSS আশাবাদী হতে পারে। ফাল্গুনি পাত্র, পামেলা গোস্বামী, শ্রীরূপা মিত্র, মৌসুমী বিশ্বাস, চন্দনা বারুই দের নামই শোনেনি বাংলার মানুষ। তাহলে?

এখানেই রাজন্যা হালদারের এ্যান্ট্রি হচ্ছে। না তাকে দলে নিয়েছে বিজেপি, না সে তৃণমূলে রয়েছে। রাজন্যার ডেবিউ হয়েছে স্বপ্নের মত, মমতার উপস্থিতিতে ২১শে জুলাই এর মঞ্চে । রাজন্যা কখনও ভোটেও লড়েনি, অথচ সে যেকোনো বিজেপি নেত্রীর চেয়ে বেশী পরিচিত ও জনপ্রিয়। সে সুন্দরী, প্রেসিডেন্সীর ট্যাগ রয়েছে, ভালো কথা বলে, বাকীটা ঘষামাজা করে নিলেই আগামী এক দেড় দশকে রেডি হয়ে যেতে পারে। দৃশ্যত আজকের জটাধারী রাজন্য হ্যাক হয়ে গেছে RSS এর ফাঁদে। যেমন ৯০ এর দশকের শেষ লগ্নে মমতা ব্যানার্জীতে RSS লগ্নি করেছিলো। তবে রেডি করা আর রেডি হয়ে যাওয়া দুটো এক নয়, রাজন্য একটা বাজি, সে বাজি সফল হবার চান্স যতটুকু, ফেল করার চান্সও ততটুকুই। RSS কী আর কারো দিকে গোপনে ললিপপ ছুঁড়ে দেয়নি হলপ করে বলতে পারবেন? তারা কী অন্য দলের উঠতি নেত্রীদের দিকে টোপ ফেলেনি?

তাই আগামীতেও আমাদের রাজ্যে যে এমন পুনরাবৃত্তি ঘটবে না বা ইতিমধ্যেই কাউকে গোকুলে গোপনে বাড়াচ্ছে না তারা, সে বিষয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সাথে সিপিএম নেতৃর্ত্বও কি সতর্কতা অবলম্বন করেছে?

এ বিষয়ে এই সিরিজের পরবর্তী কিস্তিতে লিখব, সম্ভাবনা ও সেই সংক্রান্ত ভয়।

…ক্রমশ


শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

২০২৬ প্রাক বিধানসভা নির্বাচনী প্রেক্ষাপটঃ কংগ্রেস পর্ব


 পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের ৩৬০ ডিগ্রি এ্যাঙ্গেল খুলে গেছে


(১)

শিয়রে এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। যেখানে কমপক্ষে ৬টা আলাদা আলাদা ফ্রন্টে লড়াই হতে চলেছে সম্মুখ সমরে- যারা যেকোনো মুহূর্তে হিসাবনিকেশ ফলাফল উলটে দিতে পারে। ফলত, CPIM তথা বা বাম জোটের কাছে একটা সুবর্ণ সুযোগ এসেছে নিজেদেরকে বেশ কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে, সংসদীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তুলতে, যাতে আগামী দিনে কমিউনিস্ট রাজনীতির আদর্শে আবার জনগণকে একটা উন্নত সরকার উপহার দিতে পারে। 

তৃণমূল, বিজেপি, বামফ্রন্ট, কংগ্রেস, হুমায়ূন ও সমগোত্রীয় এবং SIR; নূন্যতম এই ছ'টা আলাদা আলাদা ফ্রন্টে লড়াই হতে চলেছে। প্রথমেই প্রশ্ন জাগবে SIR কেন ষষ্ঠ সত্ত্বা বা entity? আসলে SIR হলো সেই মিস্ট্রি স্পিনার, যার স্পেলে বাদ যাওয়া ভোটারেরা কার ঘর কতটা ভেঙেছে সেটাই সবচেয়ে বড় রহস্য, যা নির্বাচনের অভিমুখ ও বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে। আজকের দিনে কটা আসন যে মার্জিনাল, তা অতি বড় ভোট বিশেষজ্ঞও বলতে পারেনি। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী খসড়াতে মোট বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯। মানে প্রতিটা বিধানসভায় গড়ে ২০ হাজার ভোটার নেই হয়ে গেছে। মিথ্যা নথি জমা দিলেই জেল- এই তথ্য জানতে পারার পর, বাগদা বিধানসভায় শুনানিতে ডাক পাওয়া ৬০,৯২৮ জনের মধ্যে মাত্র ২১,৬২৮ জন হাজিরা দিয়েছে। বনগাঁ উত্তরে ৫৪,৪৯৩ জনের মধ্যে ১০,০৬৩ জন হাাজির হয়েছে। বনগাঁ দক্ষিণে ৪৭,৮৮৯ ডাক পাওয়ার মধ্যে ১২,১০৩ জন এসেছিল, গাইঘাটায় ৫৪,৪০৪ জনের মধ্যে ১৬,০৮১ জন হাজির হয়েছে। সুতরাং বিজেপির বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এই পরিসংখ্যান কি যথেষ্ট নয়! ফাইনাল লিস্ট প্রকাশিত হলে প্রতিটা বিজেপি তৃণমূলের নেতামন্ত্রীদের ঘর থেকে মরাকান্নার গোঙানি ওঠা সময়ের অপেক্ষা।

তৃণমূলের হালের দিকে চেয়ে দেখুন, যেমন কোলকাতা পোর্ট কেন্দ্রে তৃণমূলের ফিরহাদ হাকিম ৬৮০০০ ভোটে জিতেছিল ২০২১ সালে, ওই কেন্দ্রে SIR এ বাদ গেছে ৭৪ হাজার নাম। অনুরূপ, বালিগঞ্জ কেন্দ্রে বাদ গেছে ৬৪ হাজার নাম, সেখানে বাবুল সুপ্রিয় ২০ ভোটে জিতেছিল। নন্দীগ্রামে হেরে এসে বাই ইলেকশনে ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জী জিতেছিলেন প্রায় ৫৯ হাজার ভোটে, সেই কেন্দ্রে SIR এ বাদ গেছে ৪৪ হাজার নাম। আর এ সবই প্রাথমিক খসড়া তালিকা অনুসারে, ফাইনাল তালিকাতে আরো কতটা কী বাদ যাবে কেউ জানে না। এই তিনটে তো স্যাম্পেল হিসাবে দিলাম, সবচেয়ে বেশী ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার নিরিখে প্রথম ১০টি বিধানসভা কেন্দ্র জোড়াসাঁকো, চৌরঙ্গী, হাওড়া উত্তর, কলকাতা পোর্ট, শ্যামপুকুর, কাশীপুর-বেলগাছিয়া, বেলেঘাটা ইত্যাদির মতো সবকটা তৃণমূলের জেতা আসন। গোটা পশ্চিমবাংলা জুড়েই এই এক চিত্র, ২৯৪ টা আসনের কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না যে এটা আমাদের কনফার্ম আসন। এই কারণেই আইপ্যাক শহর কলকাতা সহ কোথাও এখনো প্রার্থী ঠিক করেই উঠতে পারেনি, ঘোড়ার মুখের খবর ববি হাকিমের রাজ্যসভায় পালিয়ে যেতে চাওয়ার কারণও নাকি এই ঘোলাটে পরিস্থিতি।

এদিকে বামকর্মী সমর্থকদের প্রবল অনিচ্ছা জ্ঞাপনের দরুনই হোক বা শুভঙ্কর সরকারের নেতৃত্বাধীন জাতীয় কংগ্রেসের একলা চলো নীতি- বাম কংগ্রেস বিচ্ছেদ ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের মাঠটাকেই শুধু বড় করে দেয়নি, বাম ও কংগ্রেস উভয়কেই বিবিধ এক সম্ভাবনাময় পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করে দিয়েছে; যেখানে RSS তাদের পোষ্য মিডিয়া সৃষ্ট ‘তৃণমূল-বিজেপি’ বাইনারির হেজিমনি হাজারো চেষ্টাতেও দাঁড় করিয়ে রাখতে পারছে না ‘জাপানি তেল’ দিয়েও। 

SIR এ একমাত্র নিশ্চিন্ত কংগ্রেস এবং বামেরা, এদের হারাবার কিছু নেই। কিন্তু তৃণমূল ও বিজেপির নাভিশ্বাস উঠে গেছে, আগেও লিখেছি ৯৩ টা এমন আসন রয়েছে যেখানে তৃণমূলের জয়ের মার্জিনের চেয়ে, খসড়া তালিকাতেই বাদ যাওয়া ভুতুড়ে ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি। পাশাপাশি SIR প্রক্রিয়ার দরুন বিজেপি তার কোর ভোটারদের কাছেই অবিশ্বাসের পাত্র হয়ে উঠেছে।

দেশজ রাজনীতিতে জাতীয় কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে কখনও মুলায়ম, কখনও লালুপ্রসাদ, কখনও শিবু সোরেন, শরদ পাওয়ার, দেবগৌড়া, কিম্বা পশ্চিমবঙ্গে কখনও মমতা কখনও সিপিএম জাতীয় অসম জোটের মধ্যে থেকে- কংগ্রেস কোথাও শক্তি খুইয়েছে আবার পশ্চিমবঙ্গের মতো কোথাও একেবারে সাইনবোর্ডে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন পরে রাহুল গান্ধীর ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’র দরুন বাংলার প্রতিটা প্রান্তের কংগ্রেসি ভোটারেরা অন্তত ২০ বছর পরে নিজের বুথে হাত চিহ্ন দেখতে পাবেন। 

কিন্তু কংগ্রেসের সাথে বামেদের জোট হচ্ছে না, তার জন্য সোশ্যালমিডিয়া জুড়ে তৃণমূল পোষিত বিশ্বমাচাদো বুদ্ধিজীবী, আইপ্যাক, মিডিয়া হাউস, এমনকি বিজেপি অবধি মরাকান্না জুড়েছে, কেন? 

শুরুতে কংগ্রেসী ভোটাররাই মূলত তৃণমূলে কনভার্ট হয়ে গিয়েছিলো বাম বিরোধীতার নামে। পরবর্তীতে তৃণমূল যখন জাতীয় কংগ্রেসকে গ্রাস করে নিঃস্ব করে দিল, তখন পিছন ফিরে আদি কংগ্রেসী ভোটারেরা দেখেছে- আমরা প্রতারিত হয়ে ফেঁসে গেছি, ফেরার পথ নেই। শুরুতেই বলেছি এরা বামেদের ভোট দেবে না কোনও ভাবেই, বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে এনারা ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে ঘেন্না করেন, পড়ে রইল তৃণমূল। গত ১০ বছরে কংগ্রেসের নিজস্ব সিম্বল না পেয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে, যা এবারে হবে না। এটা তৃণমূলকে একপ্রকার উন্মাদ করে দিয়েছে। ১০ বছর আগের অগ্নিকন্যা দুর্নীতির আগুনে পুড়ে, আপাদমস্তক চোরের দলের মাথা হিসাবে ঘুগনি কন্যায় রুপান্তরিত হয়েছেন; তাই ‘হাত সিম্বল’ পেলে' এই তৃণমূল আর নয়” জপতে জপতে আদি কংগ্রেসী ভোটার ঘরে ফিরে যাবেই যাবে।

কংগ্রেসের ভোট কীভাবে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, সেটার দিকে তাকানো যাক। উপরেই বলেছি, নিজের দলকে ভোট দেওয়ার সুযোগ। তৃণমূল ও বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভোট, যারা তৃণমূলের নিপাত চায়, মুক্তি চায়। যারা বিজেপিকে কখনই গ্রহণযোগ্য মনে করে না এবং সাইলেন্ট কংগ্রেস ভোটার। গ্রামগঞ্জে এখনো অনেক বয়স্ক মানুষ আছে, যিনি নিজে ও তার পরিবার আদপেই কন-ম্যান, শাসক বিরোধী কোনো দলের সভায় যায় না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে চরম কংগ্রেসপন্থী- এরা হাত চিহ্ন পেলে, ভোটটা তাতেই দেবে। দেশে বহু মানুষ এমন আছেন যারা ঐতিহ্যগত ভাবে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ ও সংবিধানভিত্তিক শাসন চান, তারা কংগ্রেসে ছাপ মারবে। আরেকটা জটিল মনস্তত্ত্বও রয়েছে, বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি অংশ যারা কেন্দ্রে বিজেপির পতন চায়, তারা কংগ্রেসকে শক্তিশালী করতে হাতে ছাপ দেবে, যাতে ভবিষ্যতের জন্য দলকে শক্ত করা যায়। অনেকের ভাবনা, তৃণমূলের পতন হলেই রাজ্যে ডানপন্থী বিজেপি বিরোধী শক্তি হিসাবে কংগ্রেসই আবার উঠে আসবে, যে ট্রেন্ড অন্য অনেক রাজ্যেই হয়েছে, সেটার নান্দীমুখ হিসাবেও অনেকে কংগ্রেসে ভোট দেবে। 

এই বহুমুখী লড়াই এর ময়দানে কংগ্রেস কালো ঘোড়া, তারা কটা আসন জিতবে সেটার চেয়ে বড় হচ্ছে তারা কত শতাংশ ভোট পাবে যদি অবাধ ও লুঠ মুক্ত নির্বাচন হয়। SIR পরবর্তী বাংলাতে অন্তত ১০০ টির বেশি বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেসের ভোট আশ্চর্যজনক ভাবে বাড়বে, আর এই ভোটের প্রতিটাই যে তৃণমূল ও বিজেপির ঘর কেটে বেরিয়ে আসবে সেটা বলাই বাহুল্য। আর কিছুদিন গেলেই মিডিয়া জুড়ে ‘বিজেপি আসতে চলেছে’ এই প্রচারে ঢেকে যাবে। প্রতিটা মৌলবাদী শক্তি এভাবেই বাইনারি তৈরি করে, সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশী নির্বাচনে জামাতের ফেসবুকীয় আমির- পিনাকী ভট্টাচার্য মন্ত্রীসভা অবধি গঠন করে দিয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়াতে। বাস্তবের ফলাফল চোখের সামনে, সোশ্যাল মিডিয়া ন্যারেটিভ তৈরি করে, ভোটটা মাটিতে হয়- যেটা করাতে হয় ময়দানে উপস্থিত থেকে। মিডিয়ার বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকাটাও এবারে জনগণের বড় পরীক্ষা।

ঘৃণার যাত্রাপথঃ স্টেট স্পনসর্ড টেরোরিজম ও RSS

  ধর্মীয় শোভাযাত্রা এখন দাঙ্গা বাঁধানোর মূল অস্ত্র, নাগপুরের হিন্দুত্ব আধিপত্যবাদীরা ভারতের আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করছে দিয়েছে; যার মেরামতিতে কয়...