তখনও আমাদের এলাকাতে বিদ্যুৎ আসেনি, ওই নব্বই এর দশকের গোঁড়ার দিককার কথা। সন্ধ্যায় হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোতে খানিক ঢুলুনির পড়া- দুলে দুলে পড়ে ছাদে চলে যাওয়া, ওখানেই দাদু ক্যাম্পখাট বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে আকাশের তারা দেখতো। বাসু, পঞ্চানন, আল্লারাখা, নেপাল, মজনুর কেউ কেউ বা সব কজন মিলেই কেউ হাতপাখার বাতাস করত, কেউ বা হাতপা টিপে দিতে দিতে দাদুকে কোম্পানি দিতো। কখনও কালী নগরের চাষা বিষ্টু পাল, কখনও হাটের কেষ্ট ময়রা, কখনও ইস্কুল পাড়ার দুর্গা মাস্টার সঙ্গ দিতো, কিছু রেশনের মাল ফ্রিতে পাবার আশাতে। বুশ কোম্পানির একটা খাঁটি বিলাতী রেডিওতে সর্বক্ষণ বাজত, ঠুংরি, গজল, আধুনিক, লোকগীতি থেকে গজল, কীর্তন, কাওয়ালি সবই। মাঝেমাঝে সংবাদের সময় ভলিউমটা বেড়ে যেতো, তারপর আবার সেই একটানা শান্ত লয়ে ফিরে যাওয়া। বৃষ্টির দিন বাদে, মোটামুটিও সারাবছরই এই আসর জমত এক অদ্ভুত মৌতাতের সাথে।
ব্যবসায়িক মানুষের সারাদিনের উদয়াস্ত নানান কাজের শেষে এটাই ছিলো নিখাদ অবসরের সময়। যারা এই আসরে থাকত তারা অধিকাংশই ভৃত্য শ্রেনীর আর উমেদার গোছের মানুষ, তবে রোজই এক বা একাধিক সাহায্যপ্রার্থী ভদ্রজন পরিস্থিতির দায়ে কাঁচুমাচু মুখে ক্যাম্প খাটের পাশে রাখা হাতল ওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসত, বাকিরা ফরাশ ঢালা খেজুর পাতার মাদুরে। ভৃত্যদের দল অবশ্যই ছাদের মেঝেতে বসত। পাশেই দেবনাথ স্টোভে আগ্নেয়গিরির মত সর্বদা ফুটত চায়ের দুধ, জনতা স্টোভের নবদ্বীপীয় সংস্করণ ছিলো এই দেবনাথ স্টোভ। নিজেদের রেশন দোকান হেতু কেরোসিনের কোনো অভাব ছিলোনা, না চিনির ঘাটতি ছিলো, গোয়ালে খান বিশেক দুধেল গাই- শুধু চা টা বাইরে থেকে কিনতে হতো। এর মধ্যে ‘ডাকু সমর সেন’ এর টোঙ থেকে চপের বিবিধ পসরা আসত, সাধুচরণের ঘুগনি, আর কালুর দোকান থেকে গরম গরম রসগোল্লার সাপ্লাই আসতেই থাকত। ডায়াবিটিস বা কোলেস্টেরল মত বিদেশী রোগের নাম এ অঞ্চলে তখনও আবিষ্কারই হয়নি।
ও হ্যাঁ, সমর সেন কেন ডাকু তার আলাদা গল্প আছে, রাত ১০টার মধ্যে তেলেভাজার দোকান বন্ধ করে নিয়মিত শুঁড়িখানায় গিয়ে চোলাই পান করত। সাথী ছিলো কাঞ্চনতলার বিষে মাতাল, মোল্লারবিলের অতুল, বারোয়ারীতলার কানা পটল, চাষাপাড়ার পরেশ পালের মত অনেকে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে সকলেই মিছিল করে ভোর রাত অবধি পাকা রাস্তা জুড়ে তাদের মাতলামির পালাগান চালাতো। আমার দেখা মতে এরা কারোর কখনও ক্ষতি করেনি, রাত্রের ওই শব্দ উপদ্রব টুকু ছাড়া। প্রতিটা মাতালের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট ছিলো, ছিলো আলাদা আলাদা কাণ্ডকারখানা, সে গল্প আরেকদিন বলা যাবে। সমর সেন ছিলো দিনের বেলায় পেশাদার রাঁধুনি ঠাকুর, বিয়ে, শ্রাদ্ধ এমন অনুষ্ঠান বাড়িতে তাকে পাওয়ার জন্য রীতিমত ৩ মাস আগে বায়না করতে হতো, আর সন্ধ্যায় কালীতলা প্রাইমারি স্কুলের সামনে চপের দোকান দিতো। কিন্তু মদ পেটে গেলেই ইনি মনেপ্রাণে ডাকাত সর্দার হয়ে যেতো, বনবন করে একটা কঞ্চি বা ঢোলকলমির লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে ভোররাত অবধি এলাকার অলিগলি দিয়ে নেশার খেয়ালে ছোটাছুটি করতে করতে হাঁক পারত- হুঁশিয়ার, ডাকু সমর সিং, হুঁশিয়ার। এই এক লাইনের ডাইলোগ হাজার বার আউড়াতো, সেন বদলে যেতো সিং এ। রোজ সকালে তাকে কোনও না কোনো খাল বা নয়ানজুলিতে আবিষ্কার করত ভোরের বেলা মাছ ধরতে যাওয়া বাগদিদের দল। এই ছিলো সমর সেনের কাহিনী।
আমার দাদু, তার পাঁচ ছেলের একটাকেও তিনি মানুষ হওয়ার যোগ্য মনে করেননি আমৃত্যু, ফলত কাউকেই তিনি নাম ধরে ডাকতেননা, অমুকের বাচ্চা তমুখের ছেলে যোগে প্রত্যেকেরই একটা নাম খাস্ত করা ছিলো। জ্যেঠুর নাম বড় পাঁঠা, বাবার নাম তোতলা, সেজো কাকার নাম কানপচা, ন কাকার নাম ডোম, ছোট কাকার নাম ফেউ। পিসিদেরও এমন নাম ছিলো, এমনকি প্রতিটা জামাই এরও। জ্যেঠু প্রফেসর হয়েছিল শুনে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল বেচারা। সেজদাদু উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা চছিলেন বলে তিনি একপ্রকার অচ্ছুৎ নিম্নবর্গীয় ম্লেচ্ছ জাতের ছিলেন বাড়িতে। দাদুর প্রতাপের সামনে দাড়াবে সে মুরোদ কারো ছিলোনা। বাবাকেও চাকরি করতে দেননি, ছোটকাকা রীতিমত পালিয়ে গিয়ে আর্মিতে যোগ দেন। দাদুর একটাই সরল দর্শন ছিল, ব্যবসা কর, টাকা কামাও- লোকের চাকর হবি ক্যেনে হে…, ইত্যাদি।
স্বভাবতই বাবা-কাকাদের সাথে দাদুর সম্পর্ক ছিলো অহি-নকুলের, কখনও কাউকে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে দাদুর সাথে কথোপকথন করতে দেখিনি। একবার হিন্দুও হতে চেয়েছিলেন যাতে ছেলেদের ত্যাজ্য করা যায়, কারন ইসলামে সেই সুযোগ নেই। হাল জোতার কাজ করা করিমের বামন আধপাগলা ছেলে- কইসারকে প্রায় দত্তক নিয়েই ফেলেছিলেন আরকি! শেষে বটুকেশর মোক্তার বুঝিয়ে শুনিয়ে ক্ষান্ত করেন কর্তাকে। আরেকবার রেগে গিয়ে ঝাড়খণ্ডের কোনো এক এলাকা থেকে হতদরিদ্র কুর্মি ও চৌধুরীদের আন্ডাবাচ্চা সহ প্রায় দেড় ডজন পরিবারকে হাজির করলেন, এবং তাদের থাকার জন্য জমি ও রোজগারের কাজ দিলেন ক্ষেতে আপিসে। শর্ত একটাই, ওনাকে রাজা সাহেব বলে ডাকতে হবে। কয়েক বছর মিছিল করে সকালে তারা রাজা সাহেবকে প্রদক্ষিণ করত, শুরুতে বিষয়টা হাস্যকর লাগলেও ক্রমশ সয়ে গিয়েছিলো। আজও আমাদের গুল ফ্যাক্টারির গায়ে এই প্রজাদের দল বাস করে। এই প্রজারা ওনাকে নিয়মিত নজরানা দিতো, পুঁইশাক, কলাই এর ডাল, কাঁচা ভুট্টা, লাউ, ওল, শীতের সময় নানান পিঠে, খেজুর গুড় ইত্যাদি। সন্ধ্যার আসরে তারা মাঝেমাঝেই গাঢ় ঘণ দুধ দিয়ে যেত, সাথে গুড় আর ছাতুর নাড়ু, ঘরে বানানো বোঁদে জাতীয় মিষ্টান্ন, চিনেবাদাম ভাজা- হরেক রকমের আইটেম দিয়ে তাদের ‘রাজাসাহেব’কে খুশ করে দিতো।
সান্ধ্যকালীন ওই ছাদ আসরটা ছিলো জ্ঞানের খনি, এক তো সকলে সারাদিনের কাজের বর্ননা দিতো। মুন্সী, খাজাঞ্চির, দস্তিদারের দল ওখানে এসেই তাদের সারাদিনের হিসাবের ফিরিস্তি শোনাতো অনেকদিন। আমাদের মসজিদের ছোট মৌলানা মনসুর সাহেব আসতেন ‘বড় কর্তাকে’ নসিয়ত করতে। কখনও কখনও মুসাফিরের দলের কাউকে ছাদে ডেকে নিয়ে তাদের থেকে নানান গল্প শুনতেন দেশ বিদেশের। তেমনই একজন আসতেন দস্তগীর সাহেব নামে, ইয়া লম্বা দশাসই ফর্সা চেহারা, মাথায় সবুজ সিল্কের কাপরের ফেট্টি, লম্বা কালো দাঁড়ি, গোঁফ হীন মুখেমন্ডলে দু’চোখে মোটা সুর্মার রেখা। হাতে গোনা যে দু একজনকে দাদু সামান্য শ্রদ্ধা ভক্তি করতেন তার মধ্যে ইনি ছিলেন। কেউ বলত তার বাড়ি নাকি সেই ইরাণ দেশ, কেউ বলতো আরব মুলুক, কেউ নাকি তাকে আজমীঢ়ে এমনকি পাথরচাপড়িতেও দেখেছে- জ্বীন পোষা আছে। যারা ওনাকে সহ্য করতে পারতনা, তারা বলত ব্যাটা নাকি মুর্শিদাবাদের খুনে আসামি, পুলিশের ভয়ে ভেক ধরেছে।
এই প্রসঙ্গে যে কথাটা না বললেই নয়, তা হলো দাদুর উপাস্য। আমাদের মাদ্রসার হেড মৌলানা নঈম সাহেব কবে নাকি দাদুকে একবার সাহস করে বলেছিলেন- চাচাজী, আপনার তো সব ফরজ হয়ে গেছে, তা নামাজ রোজাটা…, দাদু বাকীটা আর শোনেননি। এবং ফরজ শব্দের মানে তার নিজের অভিধান মাফিক করে নিয়েছিলো, এর পর থেকে ঈদ বকরিদের নামাজ টুকু ছাড়া আর কিছুই করতেননা ধম্মকম্মের কাজ। শুধু বলতেন, তার তো সব ফরজ হয়ে গেছে, নঈম বলেছে। দাদুর ঘরে পূবের দেওয়াল জুড়ে ইয়াব্বড় একটা মোটা কাপরের উপরে আঁকা রঙচটা ডমরুধর নটরাজের ছবি টাঙানো ছিলো। ওনার আইডল ছিলো হিটলার, তার মত মাছি গোঁফ লালন করে গেছেন সারাজীবন।
আমরা সকল ভাইবোন ও আমাদের সমবয়সী বাবার তুতো ভাইবোনেরা মিলে সর্বক্ষণ ওই ছাদের আসরে যাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকত, যেন তেন ভাবে পড়া শেষ করেই দে ছুট। যেতে দেরি হলে দাদুই কাউকে না কাউকে দিয়ে সমানে তাগাদা দিতেন হাজির হওয়ার জন্য। মা কাকিমারা দালান বাড়িতে চলে যেতেন হেঁসেল সামলাতে, ব্যাস আমাদের আর বাঁধে কে! আসরের প্রধান আকর্ষণ হিসাবে তেলেভাজা, ঘুগনি, গরম রসগোল্লার নৈবিদ্যি তো ছিলোই, তার সাথে ছিলো বিড়ি খাবার বিষয়টা। ওটাই ছিলো শো স্টপার। ওই আসরেই নানান ধরণের জীবনশিক্ষার ক্লাস হত, বিড়ি টানাটাও তার মধ্যেই ছিলো। স্বভাবতই প্রত্যেক বোনেরাও সে বয়সে বিড়ি টানাতে উস্তাদ হয়ে গিয়েছিলো। বাবা কাকারা এসব তুচ্ছ বিষয়ে কখনই গুরুত্ব দিতেননা, মা কাকিমারা দাদির কাছে গজগজ করে তাদের রাগের বহিঃপ্রকাশ করত আর ওছিলা পেলেই আমাদের ধরে পেটাতো। দাদুর সামনে সে কথা বলার সাহস কারোরই ছিলনা।
বেলতলার পালবাড়ির শীলা পিসি আমার কাজরী পিসির ক্লাসমেট ছিলো, সান্ধ্য আসরে আমাদের উচ্ছুন্নে যাওয়া দেখে মা কাকিমা দাদি পিসিরা মিলে শলা করে শীলা পিসিকে আমাদের টিউশনি দিদিমনি নিযুক্ত করলেন। রাত হয়ে যাওয়ার দরুন পিসিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য দাদুর চৌধুরী প্রজাদের মধ্যে থেকে রামখিলোয়ান আর পাষাণ সিং কে পাহাড়াদার নিযুক্ত করেছিল দাদি। সেই টিউশনিও ৩ মাসের বেশী টেকেনি, দাদু জানতে পারার একমাসের মধ্যেই টিউশনি গোল্লায় গিয়েছিলো। একদিন দাদু শুধালেন, হ্যাঁরে হাফ পচা, এটাই আমার দাদুর দেওয়া নাম ছিলো। যাই হোক, দাদুর প্রশ্ন ছিলো- অধরের বেটির কাছে আমরা কী ধরণের পড়াশোনা করতাম! বললাম, গণিত, বিজ্ঞান আর সাধারণ জ্ঞান। একদিন সান্ধ্য আলাপ শেষ হওয়ার আগে মেয়েদের সকলকে নিচে পাঠিয়ে দিয়ে দাদু বললেন- বিয়ে কর, গণিত শিখে যাবি।
শুরুতেই বলেছি, বিভিন্ন বয়সি, ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক তবকার মানুষের সে এক আজব আড্ডাখানা ছিলো, রীতিমতো জ্ঞানের বিরিকণ হতো নানান অলঙ্কারের সহিত। কারো একটা এজাহারকে কেন্দ্র করে আসর শুরু হতো, এবারে চক্রাকারে আলাপ পাক খেতে খেতে জমে উঠত, উমেদার মোসায়েবের দল হৈ মেরে উঠত। দাদু বললেন, কিহে পশুপতি- এ বিষয়ে তোমার কী রায়! পশুপতির থালাবাসনের দোকান বর্ধমান শহরের কোথাও একটা, কর্তার তেজারতির ব্যবসার তামাদি হয়ে যাওয়া কাঁসা, পিতলের থালা বাটি গ্লাস কিনতে আসত মাসে এক দুই বার। তিনি বললেন, আজ্ঞে গণিতের বিষয়ে কর্তার চেয়ে আর পারদর্শী কেউ বা আছে! পরশুরাম দেবনাথ নিম্ন বুনিয়াদী পাঠশালার শিক্ষক, কন্যাদায়ের সাহায্যপ্রার্থী হেতু সদ্য মোসায়েবের দলে নাম লিখিয়েছে। কালনা কোর্টের পেসকার মনোতোষ ঘরামী, জমি মাপা আমিন সইফুল্লা উকিল, পাটের আড়ৎদার রাসু ভাদুড়ি, জমির দালাল মিহিজাম মুৎসুদ্দি, ইমারতি দ্রব্যের দোকানি পরিমল ঘটক, হোমিওপ্যাথি ডাক্তার তারাচরণ ভচ্চাজ্জ্যি সহ এমন অনেকেই নিজ নিজ উদ্দেশ্যে মণ্ডলীতে উপস্থিত হতো। সকলেই কিছু কিছু চটুল রসিকতা করলেও তার স্বর বেঁধে দিতো কর্তার সেই দিনের মেজাজ। তাই আড্ডা অবিচল থাকলেও মোসায়েব গুলো ঋতুর মতই বদলাতে থাকত।
বিপদতারণ সামন্ত ছিলো স্যাকরা, তিনিও কোনো উদ্দেশ্যে সেদিন হাজির ছিলো। সে নিক্তি মেপে ভরিতে সোনা কেনাবেচা করে অভ্যস্ত, সূক্ষ্মতা তার স্বভাব গুণ, তিনিই বিষয়টা আরো গভীরে নিয়ে গিয়ে ব্যাখ্যা করলেন। বিবাহিত পুরুষ যতই বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ, করণের ‘পঞ্চাঙ্গ’ মিলিয়ে পঞ্জিকা দেখে গননা করুক, ২৩ দিনের বেশী কিছুতেই হাতে পাবেনা মাসে। বাদ যাওয়া ৭ দিন কালহরণ দশা, রক্তারক্তি বিষয় আরকি। দাদুর দুটো গুণ ছিলো অনন্য, যেমন সিমাহীন খিস্তিখেউর করতেন কারনে অকারনে, পাত্রমিত্রের ফারাক না করে; তেমনই অকারতে দান করতেন জাত ধর্ম বর্ণ বাছবিচার না করে। রেগে গেলে গালিগালাজ করতেন, আনন্দে ফুর্তিতে গালিগালাজ করতেন, টেনশনে গালিগালাজ করতেন, অসুস্থতাতে গালিগালাজ করতেন, শোকেও গালিগালাজই ছিলো তার যাবতীয় আবেগ প্রকাশের ভাষা।
কর্তা তোফা বলে কয়েকটা বাছা খিস্তি মেরে উঠতেই মোসাহেবের দল চাটুকারিতার জন্য তৃপ্তির সাথে পুণ্যবান হৈ মেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো। এক্ষেত্রেও বিপদতারণ অমুখের ভাই শব্দে ভূষিত হলে সম্মানের সহিত। মধুকর হালদার কিছুটা ঠোঁটকাটা ছিলো, যেন দুধের মাছি। তার পেশা ছিলো অভাবি লোককে খুঁজে খুঁজে তাকে চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়া, অনাদায় হলেই লেঠেল দিয়ে ভিটেমাটি দখল করাই ছিলো তার মূল কাজ। এর জন্য বড়কর্তার আশির্বাদ অত্যন্ত জরুরি, দারোগা সামাল দেওয়া থেকে শুরু করে মামলা হলে মুন্সেফ এজলাস বা মোক্তার সামল দেওয়া লাগতো। এ ছারা সারাবছর ভুষি মাল আর দাদনের অর্থের যোগানের জন্য এলাকাতে কর্তার দ্বিতীয় বিকল্প ছিলোনা।
হালদার মশাই বললেন- ওই ২৩ দিনেও কী রক্ষে আছে বিপদ ভায়া, মাগীদের নানান ছুতো আর নক্সা। কবে কবে মাথার ব্যামো, কবে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাওয়া, কবে তার তিরিক্ষি মেজাজ, কবে আবার মন খারাপ, কবে গরম লাগা, আবার কবে শীতের কাঁপুনি, বাপের বাড়ি যাওয়া, সই আসা, ছেলে কেঁদে মায়ের পাশে শুয়ে পরা, বাড়িতে অতিথি আসার দরুন পেরেসানি, মড়া বাপ মায়ের কথা মনে পরার বেদনা, তার উপরে শুয়োছো কি শোওনি হরদম পোয়াতি হয়ে যাবার ঝক্কি- এ সব বিবিধ ধরণের জটিল গণনা যুক্ত হিসাবনিকেশ হলো এই বিয়ে। পাঁজি জ্যোতিষ মিলিয়ে মাসে সাকুল্যে ৪-৫ দিন পাওয়া যায় খুব বেশি হলে। এটাও সম্ভাব্যতা মাত্র, এবারে নিজেকে সেই সম্ভাব্যতা সাথে জরিপ করে কার্যসিদ্ধি করতে হয়। এর পর যদি সামান্য অশান্তি টুকুও হয়েছে কী হয়নি, অমনি মাগীরা গোসাঘরে খিল আঁটে। লগ্ন বয়ে গেলেও, হপ্তাগুলো ঝিলিক মেরে কোথাদিয়ে যে নিকেশ হয়ে যায়, টেরই পায়না। মাগী মটকা মেরে এক কাতে সারারাত পাশে শুয়ে থেকে হাড় মটমটে রোগ বাঁধালেও, মুখ ফুটবেনা গয়না বা শাড়ির উৎকোচ বিনা। এটা আমার তৃতীয় পক্ষ, সব এক জাত, এক রোগ। অতএব উপবাসি জীবন রে ভায়া, পুরুষের জীবনটাই এমন কঠিন আঁক কষতে কষতে ফুরিয়ে যায়। আর এভাবেই প্রত্যেকটা মরদ মানুষ অশিক্ষিত হলেও গণিত ঠিকিই শিখে যায়।
আজকে আমি নিজেই চল্লিশের গন্ডি ছুঁয়েছি,
বেঁচে থাকলে আগামী এক দশকে আমিও দাদু হয়ে যাব। পেশাদার জীবনের
বাধ্যবাধকতায় বছরের অর্ধেক দিন বাইরে বাইরেই কাটে, এর মাঝে যে কটা দিন ঘরে ফিরি- ন্যাতানো জীবনে কখনই স্ত্রীর গণিতের
সাথে আমার গণিত মেলাতে পারিনি। সে আপনি যতই বীজগনিত, জ্যামিতি, পরিমিতি, ক্যালকুলাস বা
লগারিদম ব্যবহার
করুননা কেন, কোনো রসায়ন কাজ করেনা। পুরুষ মানুষের জীবনে এসব শিক্ষা নুন্যতম কাজে লাগেনা- স্ত্রীচরিত্র গণনায়।
আমাদের শিক্ষা জীবনে ইস্কুলে যা কিছু শিখেছিলাম তার প্রায় কোনো কিছুই কাজে লাগেনি দৈনন্দিন
জীবনের আবর্তে। তারচেয়ে বরং দাদুর সাথে সান্ধ্য মন্ডলীর ওই খেউর আড্ডায় শেখা
গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, নীতিকথা গুলোই
অনেক কার্যকরী এই পোড়ার জীবনে।