ছোট গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোট গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৫

গণিতশিক্ষা

 

তখনও আমাদের এলাকাতে বিদ্যুৎ আসেনি, ওই নব্বই এর দশকের গোঁড়ার দিককার কথা। সন্ধ্যায় হ্যারিকেনের টিমটিমে আলোতে খানিক ঢুলুনির পড়া- দুলে দুলে পড়ে ছাদে চলে যাওয়া, ওখানেই দাদু ক্যাম্পখাট বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে আকাশের তারা দেখতো। বাসু, পঞ্চানন, আল্লারাখা, নেপাল, মজনুর কেউ কেউ বা সব কজন মিলেই কেউ হাতপাখার বাতাস করত, কেউ বা হাতপা টিপে দিতে দিতে দাদুকে কোম্পানি দিতো। কখনও কালী নগরের চাষা বিষ্টু পাল, কখনও হাটের কেষ্ট ময়রা, কখনও ইস্কুল পাড়ার দুর্গা মাস্টার সঙ্গ দিতো, কিছু রেশনের মাল ফ্রিতে পাবার আশাতে। বুশ কোম্পানির একটা খাঁটি বিলাতী রেডিওতে সর্বক্ষণ বাজত, ঠুংরি, গজল, আধুনিক, লোকগীতি থেকে গজল, কীর্তন, কাওয়ালি সবই। মাঝেমাঝে সংবাদের সময় ভলিউমটা বেড়ে যেতো, তারপর আবার সেই একটানা শান্ত লয়ে ফিরে যাওয়া। বৃষ্টির দিন বাদে, মোটামুটিও সারাবছরই এই আসর জমত এক অদ্ভুত মৌতাতের সাথে।

ব্যবসায়িক মানুষের সারাদিনের উদয়াস্ত নানান কাজের শেষে এটাই ছিলো নিখাদ অবসরের সময়। যারা এই আসরে থাকত তারা অধিকাংশই ভৃত্য শ্রেনীর আর উমেদার গোছের মানুষ, তবে রোজই এক বা একাধিক সাহায্যপ্রার্থী ভদ্রজন পরিস্থিতির দায়ে কাঁচুমাচু মুখে ক্যাম্প খাটের পাশে রাখা হাতল ওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসত, বাকিরা ফরাশ ঢালা খেজুর পাতার মাদুরে। ভৃত্যদের দল অবশ্যই ছাদের মেঝেতে বসত। পাশেই দেবনাথ স্টোভে আগ্নেয়গিরির মত সর্বদা ফুটত চায়ের দুধ, জনতা স্টোভের নবদ্বীপীয় সংস্করণ ছিলো এই দেবনাথ স্টোভ। নিজেদের রেশন দোকান হেতু কেরোসিনের কোনো অভাব ছিলোনা, না চিনির ঘাটতি ছিলো, গোয়ালে খান বিশেক দুধেল গাই- শুধু চা টা বাইরে থেকে কিনতে হতো। এর মধ্যে ‘ডাকু সমর সেন’ এর টোঙ থেকে চপের বিবিধ পসরা আসত, সাধুচরণের ঘুগনি, আর কালুর দোকান থেকে গরম গরম রসগোল্লার সাপ্লাই আসতেই থাকত। ডায়াবিটিস বা কোলেস্টেরল মত বিদেশী রোগের নাম এ অঞ্চলে তখনও আবিষ্কারই হয়নি।

ও হ্যাঁ, সমর সেন কেন ডাকু তার আলাদা গল্প আছে, রাত ১০টার মধ্যে তেলেভাজার দোকান বন্ধ করে নিয়মিত শুঁড়িখানায় গিয়ে চোলাই পান করত। সাথী ছিলো কাঞ্চনতলার বিষে মাতাল, মোল্লারবিলের অতুল, বারোয়ারীতলার কানা পটল, চাষাপাড়ার পরেশ পালের মত অনেকে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে সকলেই মিছিল করে ভোর রাত অবধি পাকা রাস্তা জুড়ে তাদের মাতলামির পালাগান চালাতো। আমার দেখা মতে এরা কারোর কখনও ক্ষতি করেনি, রাত্রের ওই শব্দ উপদ্রব টুকু ছাড়া। প্রতিটা মাতালের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট ছিলো, ছিলো আলাদা আলাদা কাণ্ডকারখানা, সে গল্প আরেকদিন বলা যাবে। সমর সেন ছিলো দিনের বেলায় পেশাদার রাঁধুনি ঠাকুর, বিয়ে, শ্রাদ্ধ এমন অনুষ্ঠান বাড়িতে তাকে পাওয়ার জন্য রীতিমত ৩ মাস আগে বায়না করতে হতো, আর সন্ধ্যায় কালীতলা প্রাইমারি স্কুলের সামনে চপের দোকান দিতো। কিন্তু মদ পেটে গেলেই ইনি মনেপ্রাণে ডাকাত সর্দার হয়ে যেতো, বনবন করে একটা কঞ্চি বা ঢোলকলমির লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে ভোররাত অবধি এলাকার অলিগলি দিয়ে নেশার খেয়ালে ছোটাছুটি করতে করতে হাঁক পারত- হুঁশিয়ার, ডাকু সমর সিং, হুঁশিয়ার। এই এক লাইনের ডাইলোগ হাজার বার আউড়াতো, সেন বদলে যেতো সিং এ। রোজ সকালে তাকে কোনও না কোনো খাল বা নয়ানজুলিতে আবিষ্কার করত ভোরের বেলা মাছ ধরতে যাওয়া বাগদিদের দল। এই ছিলো সমর সেনের কাহিনী।

আমার দাদু, তার পাঁচ ছেলের একটাকেও তিনি মানুষ হওয়ার যোগ্য মনে করেননি আমৃত্যু, ফলত কাউকেই তিনি নাম ধরে ডাকতেননা, অমুকের বাচ্চা তমুখের ছেলে যোগে প্রত্যেকেরই একটা নাম খাস্ত করা ছিলো। জ্যেঠুর নাম বড় পাঁঠা, বাবার নাম তোতলা, সেজো কাকার নাম কানপচা, ন কাকার নাম ডোম, ছোট কাকার নাম ফেউ। পিসিদেরও এমন নাম ছিলো, এমনকি প্রতিটা জামাই এরও। জ্যেঠু প্রফেসর হয়েছিল শুনে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল বেচারা। সেজদাদু উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা চছিলেন বলে তিনি একপ্রকার অচ্ছুৎ নিম্নবর্গীয় ম্লেচ্ছ জাতের ছিলেন বাড়িতে। দাদুর প্রতাপের সামনে দাড়াবে সে মুরোদ কারো ছিলোনা। বাবাকেও চাকরি করতে দেননি, ছোটকাকা রীতিমত পালিয়ে গিয়ে আর্মিতে যোগ দেন। দাদুর একটাই সরল দর্শন ছিল, ব্যবসা কর, টাকা কামাও- লোকের চাকর হবি ক্যেনে হে…, ইত্যাদি।

স্বভাবতই বাবা-কাকাদের সাথে দাদুর সম্পর্ক ছিলো অহি-নকুলের, কখনও কাউকে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে দাদুর সাথে কথোপকথন করতে দেখিনি। একবার হিন্দুও হতে চেয়েছিলেন যাতে ছেলেদের ত্যাজ্য করা যায়, কারন ইসলামে সেই সুযোগ নেই। হাল জোতার কাজ করা করিমের বামন আধপাগলা ছেলে- কইসারকে প্রায় দত্তক নিয়েই ফেলেছিলেন আরকি! শেষে বটুকেশর মোক্তার বুঝিয়ে শুনিয়ে ক্ষান্ত করেন কর্তাকে। আরেকবার রেগে গিয়ে ঝাড়খণ্ডের কোনো এক এলাকা থেকে হতদরিদ্র কুর্মি ও চৌধুরীদের আন্ডাবাচ্চা সহ প্রায় দেড় ডজন পরিবারকে হাজির করলেন, এবং তাদের থাকার জন্য জমি ও রোজগারের কাজ দিলেন ক্ষেতে আপিসে। শর্ত একটাই, ওনাকে রাজা সাহেব বলে ডাকতে হবে। কয়েক বছর মিছিল করে সকালে তারা রাজা সাহেবকে প্রদক্ষিণ করত, শুরুতে বিষয়টা হাস্যকর লাগলেও ক্রমশ সয়ে গিয়েছিলো। আজও আমাদের গুল ফ্যাক্টারির গায়ে এই প্রজাদের দল বাস করে। এই প্রজারা ওনাকে নিয়মিত নজরানা দিতো, পুঁইশাক, কলাই এর ডাল, কাঁচা ভুট্টা, লাউ, ওল, শীতের সময় নানান পিঠে, খেজুর গুড় ইত্যাদি। সন্ধ্যার আসরে তারা মাঝেমাঝেই গাঢ় ঘণ দুধ দিয়ে যেত, সাথে গুড় আর ছাতুর নাড়ু, ঘরে বানানো বোঁদে জাতীয় মিষ্টান্ন, চিনেবাদাম ভাজা- হরেক রকমের আইটেম দিয়ে তাদের ‘রাজাসাহেব’কে খুশ করে দিতো।

সান্ধ্যকালীন ওই ছাদ আসরটা ছিলো জ্ঞানের খনি, এক তো সকলে সারাদিনের কাজের বর্ননা দিতো। মুন্সী, খাজাঞ্চির, দস্তিদারের দল ওখানে এসেই তাদের সারাদিনের হিসাবের ফিরিস্তি শোনাতো অনেকদিন। আমাদের মসজিদের ছোট মৌলানা মনসুর সাহেব আসতেন ‘বড় কর্তাকে’ নসিয়ত করতে। কখনও কখনও মুসাফিরের দলের কাউকে ছাদে ডেকে নিয়ে তাদের থেকে নানান গল্প শুনতেন দেশ বিদেশের। তেমনই একজন আসতেন দস্তগীর সাহেব নামে, ইয়া লম্বা দশাসই ফর্সা চেহারা, মাথায় সবুজ সিল্কের কাপরের ফেট্টি, লম্বা কালো দাঁড়ি, গোঁফ হীন মুখেমন্ডলে দু’চোখে মোটা সুর্মার রেখা। হাতে গোনা যে দু একজনকে দাদু সামান্য শ্রদ্ধা ভক্তি করতেন তার মধ্যে ইনি ছিলেন। কেউ বলত তার বাড়ি নাকি সেই ইরাণ দেশ, কেউ বলতো আরব মুলুক, কেউ নাকি তাকে আজমীঢ়ে এমনকি পাথরচাপড়িতেও দেখেছে- জ্বীন পোষা আছে। যারা ওনাকে সহ্য করতে পারতনা, তারা বলত ব্যাটা নাকি মুর্শিদাবাদের খুনে আসামি, পুলিশের ভয়ে ভেক ধরেছে।

এই প্রসঙ্গে যে কথাটা না বললেই নয়, তা হলো দাদুর উপাস্য। আমাদের মাদ্রসার হেড মৌলানা নঈম সাহেব কবে নাকি দাদুকে একবার সাহস করে বলেছিলেন- চাচাজী, আপনার তো সব ফরজ হয়ে গেছে, তা নামাজ রোজাটা…, দাদু বাকীটা আর শোনেননি। এবং ফরজ শব্দের মানে তার নিজের অভিধান মাফিক করে নিয়েছিলো, এর পর থেকে ঈদ বকরিদের নামাজ টুকু ছাড়া আর কিছুই করতেননা ধম্মকম্মের কাজ। শুধু বলতেন, তার তো সব ফরজ হয়ে গেছে, নঈম বলেছে। দাদুর ঘরে পূবের দেওয়াল জুড়ে ইয়াব্বড় একটা মোটা কাপরের উপরে আঁকা রঙচটা ডমরুধর নটরাজের ছবি টাঙানো ছিলো। ওনার আইডল ছিলো হিটলার, তার মত মাছি গোঁফ লালন করে গেছেন সারাজীবন।

আমরা সকল ভাইবোন ও আমাদের সমবয়সী বাবার তুতো ভাইবোনেরা মিলে সর্বক্ষণ ওই ছাদের আসরে যাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকত, যেন তেন ভাবে পড়া শেষ করেই দে ছুট। যেতে দেরি হলে দাদুই কাউকে না কাউকে দিয়ে সমানে তাগাদা দিতেন হাজির হওয়ার জন্য। মা কাকিমারা দালান বাড়িতে চলে যেতেন হেঁসেল সামলাতে, ব্যাস আমাদের আর বাঁধে কে! আসরের প্রধান আকর্ষণ হিসাবে তেলেভাজা, ঘুগনি, গরম রসগোল্লার নৈবিদ্যি তো ছিলোই, তার সাথে ছিলো বিড়ি খাবার বিষয়টা। ওটাই ছিলো শো স্টপার। ওই আসরেই নানান ধরণের জীবনশিক্ষার ক্লাস হত, বিড়ি টানাটাও তার মধ্যেই ছিলো। স্বভাবতই প্রত্যেক বোনেরাও সে বয়সে বিড়ি টানাতে উস্তাদ হয়ে গিয়েছিলো। বাবা কাকারা এসব তুচ্ছ বিষয়ে কখনই গুরুত্ব দিতেননা, মা কাকিমারা দাদির কাছে গজগজ করে তাদের রাগের বহিঃপ্রকাশ করত আর ওছিলা পেলেই আমাদের ধরে পেটাতো। দাদুর সামনে সে কথা বলার সাহস কারোরই ছিলনা।

বেলতলার পালবাড়ির শীলা পিসি আমার কাজরী পিসির ক্লাসমেট ছিলো, সান্ধ্য আসরে আমাদের উচ্ছুন্নে যাওয়া দেখে মা কাকিমা দাদি পিসিরা মিলে শলা করে শীলা পিসিকে আমাদের টিউশনি দিদিমনি নিযুক্ত করলেন। রাত হয়ে যাওয়ার দরুন পিসিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য দাদুর চৌধুরী প্রজাদের মধ্যে থেকে রামখিলোয়ান আর পাষাণ সিং কে পাহাড়াদার নিযুক্ত করেছিল দাদি। সেই টিউশনিও ৩ মাসের বেশী টেকেনি, দাদু জানতে পারার একমাসের মধ্যেই টিউশনি গোল্লায় গিয়েছিলো। একদিন দাদু শুধালেন, হ্যাঁরে হাফ পচা, এটাই আমার দাদুর দেওয়া নাম ছিলো। যাই হোক, দাদুর প্রশ্ন ছিলো- অধরের বেটির কাছে আমরা কী ধরণের পড়াশোনা করতাম! বললাম, গণিত, বিজ্ঞান আর সাধারণ জ্ঞান। একদিন সান্ধ্য আলাপ শেষ হওয়ার আগে মেয়েদের সকলকে নিচে পাঠিয়ে দিয়ে দাদু বললেন- বিয়ে কর, গণিত শিখে যাবি।

শুরুতেই বলেছি, বিভিন্ন বয়সি, ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক তবকার মানুষের সে এক আজব আড্ডাখানা ছিলো, রীতিমতো জ্ঞানের বিরিকণ হতো নানান অলঙ্কারের সহিত। কারো একটা এজাহারকে কেন্দ্র করে আসর শুরু হতো, এবারে চক্রাকারে আলাপ পাক খেতে খেতে জমে উঠত, উমেদার মোসায়েবের দল হৈ মেরে উঠত। দাদু বললেন, কিহে পশুপতি- এ বিষয়ে তোমার কী রায়! পশুপতির থালাবাসনের দোকান বর্ধমান শহরের কোথাও একটা, কর্তার তেজারতির ব্যবসার তামাদি হয়ে যাওয়া কাঁসা, পিতলের থালা বাটি গ্লাস কিনতে আসত মাসে এক দুই বার। তিনি বললেন, আজ্ঞে গণিতের বিষয়ে কর্তার চেয়ে আর পারদর্শী কেউ বা আছে! পরশুরাম দেবনাথ নিম্ন বুনিয়াদী পাঠশালার শিক্ষক, কন্যাদায়ের সাহায্যপ্রার্থী হেতু সদ্য মোসায়েবের দলে নাম লিখিয়েছে। কালনা কোর্টের পেসকার মনোতোষ ঘরামী, জমি মাপা আমিন সইফুল্লা উকিল, পাটের আড়ৎদার রাসু ভাদুড়ি, জমির দালাল মিহিজাম মুৎসুদ্দি, ইমারতি দ্রব্যের দোকানি পরিমল ঘটক, হোমিওপ্যাথি ডাক্তার তারাচরণ ভচ্চাজ্জ্যি সহ এমন অনেকেই নিজ নিজ উদ্দেশ্যে মণ্ডলীতে উপস্থিত হতো। সকলেই কিছু কিছু চটুল রসিকতা করলেও তার স্বর বেঁধে দিতো কর্তার সেই দিনের মেজাজ। তাই আড্ডা অবিচল থাকলেও মোসায়েব গুলো ঋতুর মতই বদলাতে থাকত।

বিপদতারণ সামন্ত ছিলো স্যাকরা, তিনিও কোনো উদ্দেশ্যে সেদিন হাজির ছিলো। সে নিক্তি মেপে ভরিতে সোনা কেনাবেচা করে অভ্যস্ত, সূক্ষ্মতা তার স্বভাব গুণ, তিনিই বিষয়টা আরো গভীরে নিয়ে গিয়ে ব্যাখ্যা করলেন। বিবাহিত পুরুষ যতই বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ, করণের ‘পঞ্চাঙ্গ’ মিলিয়ে পঞ্জিকা দেখে গননা করুক, ২৩ দিনের বেশী কিছুতেই হাতে পাবেনা মাসে। বাদ যাওয়া ৭ দি কালহরণ দশা, রক্তারক্তি বিষয় আরকি। দাদুর দুটো গুণ ছিলো অনন্য, যেমন সিমাহীন খিস্তিখেউর করতেন কারনে অকারনে, পাত্রমিত্রের ফারাক না করে; তেমনই অকারতে দান করতেন জাত ধর্ম বর্ণ বাছবিচার না করে। রেগে গেলে গালিগালাজ করতেন, আনন্দে ফুর্তিতে গালিগালাজ করতেন, টেনশনে গালিগালাজ করতেন, অসুস্থতাতে গালিগালাজ করতেন, শোকেও গালিগালাজই ছিলো তার যাবতীয় আবেগ প্রকাশের ভাষা।

কর্তা তোফা বলে কয়েকটা বাছা খিস্তি মেরে উঠতেই মোসাহেবের দল চাটুকারিতার জন্য তৃপ্তির সাথে পুণ্যবান হৈ মেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো। এক্ষেত্রেও বিপদতারণ অমুখের ভাই শব্দে ভূষিত হলে সম্মানের সহিত। মধুকর হালদার কিছুটা ঠোঁটকাটা ছিলো, যেন দুধের মাছি। তার পেশা ছিলো অভাবি লোককে খুঁজে খুঁজে তাকে চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়া, অনাদায় হলেই লেঠেল দিয়ে ভিটেমাটি দখল করাই ছিলো তার মূল কাজ। এর জন্য বড়কর্তার আশির্বাদ অত্যন্ত জরুরি, দারোগা সামাল দেওয়া থেকে শুরু করে মামলা হলে মুন্সেফ এজলাস বা মোক্তার সামল দেওয়া লাগতো। এ ছারা সারাবছর ভুষি মাল আর দাদনের অর্থের যোগানের জন্য এলাকাতে কর্তার দ্বিতীয় বিকল্প ছিলোনা।

হালদার মশাই বললেন- ওই ২৩ দিনেও কী রক্ষে আছে বিপদ ভায়া, মাগীদের নানান ছুতো আর নক্সা। কবে কবে মাথার ব্যামো, কবে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাওয়া, কবে তার তিরিক্ষি মেজাজ, কবে আবার মন খারাপ, কবে গরম লাগা, আবার কবে শীতের কাঁপুনি, বাপের বাড়ি যাওয়া, সই আসা, ছেলে কেঁদে মায়ের পাশে শুয়ে পরা, বাড়িতে অতিথি আসার দরুন পেরেসানি, মড়া বাপ মায়ের কথা মনে পরার বেদনা, তার উপরে শুয়োছো কি শোওনি হরদম পোয়াতি হয়ে যাবার ঝক্কি- এ সব বিবিধ ধরণের জটিল গণনা যুক্ত হিসাবনিকেশ হলো এই বিয়ে। পাঁজি জ্যোতিষ মিলিয়ে মাসে সাকুল্যে ৪-৫ দিন পাওয়া যায় খুব বেশি হলে। এটা সম্ভাব্যতা মাত্র, এবারে নিজেকে সেই সম্ভাব্যতা সাথে জরিপ করে কার্যসিদ্ধি করতে হয়। এর পর যদি সামান্য অশান্তি টুকুও হয়েছে কী হয়নি, অমনি মাগীরা গোসাঘরে খিল আঁটে। লগ্ন বয়ে গেলেও, হপ্তাগুলো ঝিলিক মেরে কোথাদিয়ে যে নিকেশ হয়ে যায়, টেরই পায়নামাগী মটকা মেরে এক কাতে সারারাত পাশে শুয়ে থেকে হাড় মটমটে রোগ বাঁধালেও, মুখ ফুটবেনা গয়না বা শাড়ির উৎকোচ বিনা। এটা আমার তৃতীয় পক্ষ, সব এক জাত, এক রোগ। অতএব উপবাসি জীবন রে ভায়া, পুরুষের জীবনটাই এমন কঠিন আঁক কষতে কষতে ফুরিয়ে যায়। আর এভাবেই প্রত্যেকটা মরদ মানুষ অশিক্ষিত হলেও গণিত ঠিকিই শিখে যায়।

আজকে আমি নিজেই চল্লিশের গন্ডি ছুঁয়েছি, বেঁচে থাকলে আগামী এক দশকে আমিও দাদু হয়ে যাব। পেশাদার জীবনের বাধ্যবাধকতায় বছরের অর্ধেক দিন বাইরে বাইরেই কাটে, এর মাঝে যে কটা দিন ঘরে ফিরি- ন্যাতানো জীবনে কখনই স্ত্রীর গণিতের সাথে আমার গণিত মেলাতে পারিনি। সে আপনি যতই বীজগনিত, জ্যামিতি, পরিমিতি, ক্যালকুলাস বা লগারিদম ব্যবহার করুননা কেন, কোনো রসায়ন কাজ করেনা। পুরুষ মানুষের জীবনে এসব শিক্ষা নুন্যতম কাজে লাগেনা- স্ত্রীচরিত্র গণনায়

আমাদের শিক্ষা জীবনে ইস্কুলে যা কিছু শিখেছিলাম তার প্রায় কোনো কিছুই কাজে লাগেনি দৈনন্দিন জীবনের আবর্তে। তারচেয়ে বরং দাদুর সাথে সান্ধ্য মন্ডলীর ওই খেউর আড্ডায় শেখা গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, নীতিকথা গুলোই অনেক কার্যকরী এই পোড়ার জীবনে।

 

মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫

বিল্বমঙ্গল

 


(১)

সেটা ২০০৮ এর শেষ নভেম্বর কী ডিসেম্বরের শুরু নাগাদ হবে। তখন রমরমিয়ে চলা রাইসমিলের সাথে চাল এক্সপোর্টের জাঁকানো ব্যবসা। আমরা মূলত দুবাই এর এজেন্ট দের LC মারফৎ CIF পশ্চিম আফ্রিকার কোনো বন্দরে মোটা চাল পাঠাতাম। কখনও কখনও আতপ চালের অর্ডারও আসত, সেই সুত্রে আমাদের হয় ছত্রিশগড় কিম্বা অন্ধ্রপ্রদেশ দৌড়াতে হতো, কোন বন্দর দিয়ে এক্সপোর্ট হবে তার উপরে নির্ভর করে। সেবারে আতপের অর্ডারটা বেশ মোটা ছিলো, তাছাড়া ভাইজাক পোর্টে নতুন এক ক্লিয়ারিং এজেন্ট নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে নিজেকে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলো।

দাক্ষিণাত্যের এই দিকটাতে এলে সর্বক্ষণ যেন ইতিহাসের পথ বেয়ে হেঁটে চলি অবচেতনে। অন্ধ্রের এই অঞ্চলগুলো কতই না সাম্রাজ্যের সাক্ষী, কখনও নন্দ ও মৌর্যদের অধীনে ছিল। কখনও সাতবাহনদের, মাথার রাজবংশ, ইক্ষ্বাকু, কাকতীয়, বিষ্ণুকুণ্ডিনদের শাসনে সেজে উঠেছিলো। চালুক্যদের পুলকেশী, বিষ্ণু বর্ধন, চোলা সাম্রাজ্য, নাম গুলো শুনলেই গায়ে কাঁটা দেয়। কত শত শাসক কত শত বার এই অঞ্চলের উপর আধিপত্য পেতে যুগে যুগে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে রাজত্ব বিস্তার করেছিলেন, সকল প্রতাপকে মিথ্যা প্রমাণ করে আবার তারা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এলাকার প্রতিটি নদী, প্রতিটা পাহাড়, প্রতিটি ধূলিকণা সেই ইতিহাসের সাক্ষী। অতীতের উত্তরাধিকার নিয়ে আজও জনপদ গুলো সেই দিনের মতই সজীব আর প্রাণবন্ত।

অন্ধ্রের পূর্ব গোদাবরী জেলাকে চালের বাটি নামে ডাকা হয়, স্বভাবতই রাজামুন্দ্রি শহরে সেখানকার মূল চালের গদি গুলো অবস্থিত। আমাদের গন্তব্যও সেখানে, সঙ্গী আমার এক একাউন্টেন্ট কাম এ্যাটেন্ডেড জনা। জনা জাতে উড়িয়া, মিশমিসে কালো, গাঁট্টাগোট্টা ও প্রচণ্ড ধর্মভীরু। পুরো নামটা বড় বিচিত্র ‘জনাঞ্জলী ভয়’, এর কান্ড কারখানা নিয়েই একটা গোটা উপন্যাস লেখা যায় ‘ভয়’ নামে। আমাদের মিলের বিনোদ সর্দারের মজুরদের খাতা লেখার কাজে এসেছিলো। অত্যন্ত গরীবের ছেলে, বাপ মরে যাওয়াতে একাউন্টেন্সী নিয়ে আর বি-কম পাশ করা হয়ে উঠেনি। খাওয়া থাকা মাসিক ৩৫০০ টাকায় খাজাঞ্চীর চাকুরি। মিলে আসার বছর দেড়েক পর আমি তাকে কিছুটা শিখিয়ে পড়িয়ে একপ্রকার পার্সোনাল এ্যাসিস্টেন্ট বানিয়ে নিই। অনেক কাজের সাথে রান্নাটা বড় ভালো করত সে, এটা ছিলো তাকে নিয়ে সফর করার মস্ত কারন।

হাওড়া চেন্নাই মেইন লাইনের সব ট্রেনই রাজামুন্দ্রি ছুঁয়ে যায়। শেষ নভেম্বরের ঠান্ডা- অন্ধ্রকে ততটা শীতল করেনা মধ্য বাংলার মত। রাজামুন্দ্রির বিকিকিনির কাজ ২ দিনেই মিটে গেলো, যেসব মিল থেকে শিপমেন্ট যাবে তাদের কয়েকটাতে ভিজিট করে আমরা চলে গেলাম বিশাখাপত্তনম। সেখানে আমাদের কোম্পানির এক মারাঠা ফাইনান্সারও আসবে নতুন ক্লিয়ারিং এজেন্টের সাথে মিটিং এ যোগ দিতে। ব্যবসায়ী ছাড়াও তার অন্যতম পরিচয় হচ্ছে তিনি শিবসেনা দলের ক্ষমতাবান বিধায়ক ও সঙ্ঘ ঘনিষ্ট। যথারীতি তিনি পরপর ২ বার মিটিং পোস্টপোন্ড করাতে বহুবার ঘোরা ভাইজাককে আবার একবার চষে ফেললাম। অবশেষে তৃতীয় দিনে এসে তিনি পৌঁছালেএবং স্বস্ত্রীক। মহিলাটি সত্যিকারের ‘আলফা ফিমেল’, কুতকুতে চোখ বিশিষ্ট খর্বাকৃতির মানুষটি আক্ষরিক অর্থেই জীবন্ত ফুটবল, পুরো গোল। 

আমাদের ফাইনান্সার ভদ্রলোকটির নাম ধরে নিন- গাইকোয়াড় সাহেব। সৌম্যকান্তি মারাঠা সুপুরুষ সাথে রাশভারি ব্যাক্তিত্বের। স্ত্রী সাথে আসার কারনে হোক বা ব্যবসায়িক লেনদেনের গোপনীয়তা রক্ষাত্রে; সাথে তৃতীয় কোনো ব্যাক্তি ছিলোনা, দুই মানুষে মুম্বই থেকে সোজা ভাইজ্যাক এয়ারপোর্ট। কিছু মহিলাকে দেখলেই মনে হয় ভয়ানক ঝগরুটে ও সন্দেহবাতিক, মিসেস গাইকোয়াড় সেই প্রজাতির, এবং আসলেও তাই। গাইকোয়াড় সাহেব যেভাবে মেনি বিড়ালের মত মুখ করে কুঁচকে গিয়ে বউ এর সামনে খাড়া রয়েছেন, দেখলে মায়াই হয়। এয়ারপোর্টেই আমার একদফা জিজ্ঞাসাবাদ চলল, বুঝলাম আবার আমাকে ওনার ময়না তদন্তের সামনা হতে হবে। আমি নিশ্চিত, মহিলা নিজে কোনো বড় সরকারি পদ অধিকার করে আছেন, কিম্বা এনার পিতৃকুল অমিত সম্পদশালী ও তার দৌলতেই গাইকোয়াড়- আজকের গাইকোয়াড় সাহেব হয়েছেন, সবটাই অনুমান মাত্র। নতুবা যত জাঁদরেল মহিলাই হোক, এভাবে স্বামীকে কেঁচো করে রাখতে আমি অন্তত কাউকে দেখিনি, কিছু তো স্পেশাল রয়েছেই যা গাইকোয়াড় সাহেবের নেই।

ঔরাঙ্গাবাদ আম্বেদকর মারাঠওয়াড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে M.Phil করা এই মানুষটি সত্যিই বিস্ময়। ওনার আসল ব্যাবসাই নাকি এই লগ্নি করা, কিন্তু এতো টাকার উৎস কি সেটা ঠারেঠোরে বোঝার চেষ্টা করেও কোনো তল পাইনি। বললেন, ২ দিন দেরি হওয়ার কারন নাকি লঙ্কা। CIF ইন্দোনেশিয়া না থাইল্যান্ডের কোথাও একটা বন্দরে যাবে এই শুকনো লঙ্কা, দুবাই এর এক ইজিপ্সীয় শেঠ তাকে এই ট্রান্সসিপমেন্ট অর্ডারটা দিয়েছেন। আমি যেন মাত্র ১০ কন্টেনারের এই ‘ছোট্ট’ শিপমেন্টটা উৎরে দিই। ওনার ভাষায়- জানোই তো আমার হাতে সময় কত কম। নতুন সুযোগ হাতছাড়া করার দলে আমি কখনই ছিলামনা, আর উদ্যমেও সদাই ফুর্তি। ঠিক হলো গুন্টুর যাব।

পরের দিন ভোরের ট্রেনে রওনা দিলাম, আমার ও গাইকোয়াড় সাহেব দুজনেরই কন্টাক্ট কাজে লাগিয়ে পরবর্তী দেড় দিনে গুন্টুরের লঙ্কা-কান্ড শেষ করলাম, বাকীটা ফোনে ফোনেই হয়ে যাবে। অর্ডারের ২৫ দিন পর লোডিং, তখন QC সার্টিফিকেটিং এর সময় আবার আসতে হবে। স্বভাবতই রাত্রের ট্রেনে হাওড়া ফেরার টিকিট কেটে নিলাম। সন্ধ্যায় গাইকোয়াড় সাহেব হোটেলের লবিতে চা খেতে ডাকলেন। বললেন ম্যাডাম পুজো দিতে যেতে চাইছেন, এতো কাছে এসে জ্যোতির্লিঙ্গটা মিস করতে চাইছে না। তাছাড়া গুরু প্রদোষ ব্রত পালনটাও করে নেবেন, মানত রয়েছে। আমিও ওনাকে দারুন উৎসাহ দিলাম, ততক্ষণে ম্যাডামও এসে গেছেন। হঠাৎ গাইকোয়াড় সাহেব প্রশ্ন করলেন, তন্ময় তুমি কী এ দিকটা ঘুরেছো! আমি ক্যাজুয়ালি মাথা নেড়ে না বললাম, কে জানত এটাই ছিলো ফাঁদ! ম্যাডাম সমানে তার কুতকুতে চোখে আমাকে জরিপ করে চলেছেন, এমন সময় গাইকোয়াড় সাহেব বলে উঠলেন- তুমিও কাল চলো না আমাদের সাথে। এটা অনুরোধ না আদেশ বুঝলামনা। শ্রীমতী গাইকোয়াড় সাহেবা নির্বিকার, ওনাকে মিছিমিছি বোঝার চেষ্টা করে আর অসুস্থ হতে চাইলামনা ।

আমি খেই হারিয়ে কিছু বলতে গিয়ে দেখলাম সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। আমার ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা দেখে গাইকোয়াড় সাহেব বললেন- আমরা একটা প্যাকেজ বুক করেছি দর্শনের, অনেকের সাথে একটা ট্রাভেলারে করে যাব গুন্টুর থেকে। তোমারা একটা গাড়ি করে নাও বরং, রিসেপসন থেকে, ওতে সুবিধা হবে। বুঝলাম আমার ইচ্ছা অনিচ্ছা সম্পূর্ণ মূল্যহীন, পরে বুঝেছিলাম গাইকোয়াড় সাহেব আমাকে কোম্পানি হিসাবে নিয়ে গিয়েছিলেন। ডিনারের টেবিলে বুকে সাহস সঞ্চয় করে, ম্যাডামের দিকে চেয়ে বললাম- গুন্টুর প্রাচীন শহর, অগস্ত্যেশ্বরি শিবালয়ম্‌ নামে অতি প্রাচীন একটি শিবমন্দির রয়েছে এখানেরিসেপশনের মেয়েটির থেকে তথ্যটা যোগার করেছিলাম, আবার ভয়ে ভয়েই বললাম, ম্যাডাম এখানে সারা যায়না পুজোটা! তাতে তিনি যে দৃষ্টি হানলেন- সত্য যুগ হলে নির্ঘাত ভষ্ম হয়ে যেতাম।

যেতে যখন হবেই, রাত্রেই রেল স্টেশন থেকে একটা ভ্রমণ গাইড বই কিনে নিলাম। তখন কী আর ইন্টারনেট এমন সহজলভ্য ছিলো! পড়লাম কৃষ্ণা নদীর উপর নির্মিত শ্রীশৈলম বাঁধ দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তম বাঁধগুলির মধ্যে একটি, এটা দর্শনীয় স্থান সন্দেহ নেই। এছাড়া ভারতের বৃহত্তম বাঘ সংরক্ষণাগার ‘নাগার্জুনসাগর-শ্রীশৈলম টাইগার রিজার্ভ’টি ৩৫০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। স্থানীয় নাল্লামালা জঙ্গলও দেখার জাইগা বটে। পাহাড়, জঙ্গল নদী আমার চিরকালের প্রিয়, তাই মন থেকে হতাশার ভাবটা ঝেড়ে ফেললাম

রাত্রের দিকে গাইকোয়াড় সাহেব ফোন করে আবার একবার মনে করিয়ে দিতে ভুললেন না- তন্ময় মিস কোরোনা, এখানে মন্দির ছাড়াও বেড়াতে মন্দ লাগবেনা। পুঁজি লগ্নিকারক ব্যক্তিকে না বলা যায়না, অগত্যা নিমরাজি হয়েই গেলাম। হোটেলের রিসেপশনে শ্রীশৈলম যাতাযাতের জন্য একটা ছোট গাড়ির কথা বলে দিলাম পরদিন ভোরের জন্য। রাত সাড়ে তিনটের সময় দেখি এক ব্যাটা ফোন করে হাঁকডাক করছে, বুঝলাম গাড়ির ড্রাইভার। স্যান্ট্রো নিয়ে একটা ১৭-১৮ বছরের ছেলে হাাজির। ঘুম চোখে লটবহর গুছিয়ে ‘ভয়’কে সাথে নিয়ে রওনা দিলাম।

ড্রাইভারটা তিলে খচ্চর টাইপের সবজান্তা, শুরুতে সারাক্ষণ উচ্চস্বরে তেলেগু গান চালিয়ে মাথা ধরিয়ে রেখেছিলো, সেটা বন্ধ করতেই- জনার সাথে তার ১০% হিন্দি পুঁজি করে সে কী গভীর আলোচনা, যা আরো ভয়াবহ মাথাব্যাথার কারন হয়ে দাঁড়ালো। এর মাঝে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম জানিনা, জনার ডাকে ঘুম ভাঙলো। অকারন বকবক করতে করতে কখন যে ব্যাটা রাস্তা ভুলে যে অন্য পথ ধরেছে তা জনার জ্ঞানের বাইরে। যতদূর চোখ যায় ধু ধু জনহীন অরণ্য, জনার দিকে চাইতে সে বলল- শেষ ২ ঘন্টা ধরে এমন জঙ্গল পেরিয়েই এসেছি। অগত্যা সামনে এগোনই স্থির করলাম। গুন্টুর থেকে শ্রীশৈলম মেরেকেটে ২২০ কিলোমিটারের মত রাস্তা, চার ঘন্টায় স্বচ্ছন্দ্যে পৌঁছে যাওয়া উচিৎ, সেখানে ইতিমধ্যেই ৬ ঘন্টা পার হয়ে গেছে, ঘড়িতে বেলা ১১টা।

আত্মাকুর থেকে শ্রীশৈলম অবধি পায়ে হেঁটে অনেক ভক্ত আসে, যারা মানত করে। ঘণ জঙ্গলের মাঝে কোনো দোকানপাট নেই, না বসতি রয়েছে। পথটি সম্পূর্ণরূপে নল্লামালা পাহাড়ের ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যায়। তেমনই একটা ভক্তের দল রাস্তার ধারে বসে আহারাদি করছিলো। তাদের সামনে গিয়ে গাড়িটা দাঁড় করাল ড্রাইভার। আমাদের ওই দিশেহারা দশা দেখে তাদের একজন এগিয়ে আসতে, ড্রাইভার স্থানীয় ভাষায় বিষয়টা বলে বোঝালো যে আমরা রাস্তা ভুল করেছি। ভয়ের চোটে এতক্ষণ খিদে না পেলেও, এবারে সেটা যেন চিৎকার করে হাঁক ছাড়লো পেট থেকে। ভক্তেরা সাথে করে নিজস্ব খাবার এবং পানীয় সামগ্রী নিয়ে এসেছে, তাদের দয়ায় সে যাত্রায় খিদের হাত থেকে রেহাই পেলাম। ওদের বাতলে দেওয়া পথ ধরে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই শ্রীশৈলম পৌঁছে গেলাম।

 

(২)

শিবা রেসিডেন্সী নামের একটা মধ্যম মানের হোটেলে ঢোকার পর ফ্রেস হয়ে আমি গাইকোয়াড় সাহেবকে ধরার জন্য রওনা দিতে, জনা আমার দিকে জুলুজুলু চোখে চেয়ে রইতে শুধালাম- কিছু বলবি! সে অস্ফুট উড়িয়াতে বলল- ‘মু সে সক্কালেরু জগ্রত রহিছি, এবে কি সইবারি পারিবু!’, বুঝলাম ঘুমাতে চাইছে। আমি আর কথা না বাড়িয়ে একাই বেড়িয়ে গেলাম। ফোনে জানলাম ম্যাডামের সাথে সাহেব আপাতত হটকেশ্বরমের পথে।

মল্লিকার্জুন অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলম শহরে কৃষ্ণা নদীর তীরে একটি টিলা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। জ্যোতির্লিঙ্গটি একটি অতি প্রাচীন মন্দির যা দ্রাবিড় শৈলীতে নির্মিত, এখানে বিজয়নগর স্থাপত্যের নমুনা দেখা যায়ম্যাডাম গাইকোয়াড়ের তালিকা অনেক লম্বা, সাক্ষী গণপতি, হটকেশ্বরম, শিখরেশ্বরম, ফলধারা পঞ্চধারা এমন অনেক কিছুকে দেখে তারপর নাকি মল্লিকার্জুন দর্শন করতে হয়। এসব একদিনে শেষ হলে হয়।

হটকেশ্বরম পৌঁছাতেই দেখলাম পাঞ্জাবি পায়জামা শোভিত গাইকোয়াড় সাহেব একটা গুমটির আড়ালে ধুম্র সহযোগে চা-পান করছেন। আমার জন্যই প্রতীক্ষা করছিলেন, দেরির কারন জানতে পেরে তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন। তবে এটাও বুঝলাম, স্ত্রীর সামনে ধূমপানের অনুমতি নেই। আমাদের বয়সের ফারাক দেড় গুণ, উনি ৫৩- তাই আমি শুধু চায়ে যোগ দিলাম। কথায় কথায় শুধালাম এতোগুলো মন্দির ঘুরলেন, আপনার মাথায় চন্দন বা তিলক কই! তিনি যা বললেন তাতে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, ধর্মে নাকি তার তেমন ভক্তিই নেই, কখনই ছিলোনা- তিনি নাকি ঘোরতর নাস্তিক। রাজনীতির দায় ও সামাজিক স্বার্থে যেটুকুতে না গেলেই নয়, ব্যাস অতটুকুই। অথচ মিডিয়াতে উনি চরম হিন্দুত্ববাদী, বক্তব্য শুনলে মনে হবে ক্ষতস্থানে কেউ বাঁটা লঙ্কা ডলে দিয়েছে। একটা মানুষের মধ্যে এমন পরস্পর বিরোধী দ্বৈত্ব স্বত্বা কীভাবে থাকতে পারে! এই কারনেই কী স্ত্রী অমন চড়ে থাকে!

আমার ভ্যাবাচ্যাকা ভাব দেখে গাইকোয়াড় সাহেব হেসে বললেন, বড় হও তন্ময়- সব বুঝবে। এর পর তিনি মল্লিকার্জুন এর লোককথা শোনাতে লাগলেন। কথিত আছে প্রতি অমাবস্যায় স্বয়ং মহাদেব, পুত্র কার্তিককে এখানে খুঁজতে আসেন। আবার পূর্নিমাতে নাকি দেবী মহামায়াও মর্ত্যের এই এলাকাতেই বিরাজ করেন। পুরাণমতে দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের সময় ‘উপরোষ্ঠ’ এই মল্লিকার্জুনে পড়েছিল, তাই এটা ১৮টি মহাশক্তিপীঠের একটি- অগত্যা। বুঝলাম লোকটি পণ্ডিত মানুষ বটে, তারপরে নাস্তিক, আর সবার উপরে উগ্র হিন্দুত্ববাদ রাজনীতিতে সফল ব্যাক্তি- আজব সঙ্গম।

দিনটা সোমবার, রীতিমত গলদঘর্ম হয়ে আজই বেলা থাকতে থাকতে মল্লিকার্জুন পৌঁছাতেই হবে যেভাবেই হোক, সুতরাং শ্রীমতী গাইকোয়াড়ের তাড়ার শেষ নেই। দুপুরে লাঞ্চ করলাম ভাকরি-পিঠলা সাথে ভাজি নামক পদ দিয়ে, মোটা মোটা জোয়ার বা বাজরার রুটি আর পেঁয়াজ রসুনে ঠাসা এক জাতীয় তীব্র মসলাদার সব্জির ঘন্ট। খিদের পেটে ওই খেলাম সাঁটিয়ে। দুচোখ মেলে প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে যখন মল্লিকার্জুন এসে পৌঁছালাম, তখন সূর্য ঢলে গেছে।

গাড়ি থেকে নেমেই ম্যাডাম সটান মন্দিরে ঢোকার লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন, প্রথম দফায় কবার নাকি প্রদক্ষিণ করে আবার ঢুকবেন পুজো দিতে, সাহেবকে নির্দেশ দিলেন ততক্ষণে পুজোর উপাচার যোগার করে আনতে। গোল বাঁধল ফুলের দোকানে গিয়ে, ঘ্যেটুর মত বিজাতীয় ফুল সহ আকন্দের ফুল পাতাও পাওয়া গেলো। স্থানীয় নানা জাতের অচেনা ফুলের মালার সাথে বেলফুলের মালাটিকেও চিনতে পারলাম। জবা, রজনীগন্ধারও অভাব ছিলোনা, নেই শুধু বেলপাতা এই বস্তুটি অবশ্য এতো গুলো মন্দিরের কোথাও সেভাবে দেখিনি, হয়ত সেভাবে চল নেই কিম্বা আমিই ভাল করে নজর করিনি। তবে সজনে পাতার মত এক ধরণের পাতা এরা ঘট সাজিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

লাইনে দাঁড়ানো ম্যাডামের কানে সে কথা তুলতেই তার মুখ রক্তবর্ণ ধারন করল, গাইকোয়াড় সাহেব প্রমাদ গুণলেন। আমার দিকে জুলজুল করে তাকাতে আমি প্রায় স্প্রিন্টারের মত দৌড় লাগালাম ওই এলাকার সকল ফুলমালার দোকান গুলোতে ঢুঁ মেরে বিল্বপত্রের অন্বেষণে। প্রায় সবটা চষে যখন ব্যর্থ মনোরথে ফিরছি, একটা গলির শেষের গুমটিতে বিশাল রেশন দোকানের মত লাইন দেখে সামনেটাতে গিয়ে উঁকি মেরে দেখি- রয়েছে। আর কী, আমিও ওই লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। করোনাকালে যদি এমন জমাটি লাইন কোনো বিজ্ঞানী বা ডাক্তার দেখতেন, নিশ্চিত তারা নিজেরাই আতঙ্কে অক্কা পেতেন। মিনিট দশেক পর যতক্ষণে গুমটির সামনে সৌভাগ্যক্রমে পৌঁছালাম, ততক্ষনে আমার মাথার ঘাম মেরুদণ্ড বেয়ে অকুস্থলের উপত্যকা, খাঁজ সর্বত্র লোনা জলময় করে তুলেছে। পাতা তখন অতি সামান্যি অবশিষ্ট রয়েছে, শেষ অবধি আমার ভাগ্যে জুটবে তো! উত্তেজনা আর আশঙ্কাতে এমন দোদুল্যমান অবস্থা যে শরীরের সমস্ত রক্ত মাথায় এসে ফেটে পরতে চাইছে, শেষে চ্যাংদোলা করে হাসপাতালে না নিয়ে যেতে হয়।

সমানে জপে যাচ্ছি- মেরা নাম্বার কব আয়েগা। ওমা, দোকানি অবধি পৌঁছাবার ২ জন আগেই খেল খতম। বিনা নোটিসে ঝাঁপ বন্ধ। বেলপাতা ছাড়া স্বয়ং মহাদেব সন্তুষ্ট হলেও হতে পারেন, কিন্তু ম্যাডাম গাইকোয়াড়কে কীভাবে সন্তুষ্ট করব! পিছন থেকে তেলেগুতে অনেকেই নানা পরামর্শ দিলো, সে সব শুনে আমার পিছনে থাকা জনা পঞ্চাশেক ভক্ত উলটো পথ ধরেলো। সে ভাষা বোঝা কী আর আমার কম্ম, আমার পা যেন ২০০ মন ভারি হয়ে গেলো, উঠাতেই পারিনা এমন দশা। সামনে রণচণ্ডী রূপে ম্যাডামের মুখ ভেসে উঠতেই, ধড়ফড় করে আমিও স্ববেগে সেই পথে পা বাড়ালাম, দেরি করে পৌঁছালেও কি আর কম বিপদ!

ফিরে গিয়ে গাইকোয়াড় সাহেবকে জানাতে তিনি আরো কাকুতিমিনতি করে বললেন, ড্রাইভারকে নিয়ে আশেপাশের মন্দিরগুলোতে গিয়ে দেখোনা ভাইটি। অগত্যা দৌড়ালাম গাড়ির দিকে। ড্রাইভার ঘুমাচ্ছিলো, তেতো মুখে ব্যাজার ভাবে চেয়ে দেখে গাড়িতে স্টার্ট লাগালো। ওদিকে দিনের আলো ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে, সন্ধ্যার পর সাধারানত ছোট মন্দিরের এলাকা গুলোতে আর কেউ থাকেনা, টিমটিমে আলো আর ভুতুরে পরিবেশ। আশেপাশের ৩-৪ কিমির মধ্যে অধিকাংশ দোকানই বন্ধ, এক আধটা যেগুলো খোলা তার কোনোটাতেই বেলপাতা খুঁজে পেলামনা। হতাশ হয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেটে মন দিয়েছি, পশ্চিমাকাশে তখনও রক্তাভ একটা নিশান ঝুলে আছে লেজ কাটা ঘুরির মত।

হঠাৎ, সেই আলো আঁধারিতে মনে হলো, ওই দূরে একটা ঝুঁকে পরা বেল গাছ না? ইউরেকা বলে দৌড় লাগালাম, নির্ঘাত বেলই বটে, ডাবল শিওর হওয়ার জন্য ড্রারভারকেও ডাকলাম, সে যেন অনিচ্ছুক ঘোড়া, বিকারহীন মুখে বলল- এটা বেলগাছই বটে। ‘দুটো পাতা পেরে দে না ভাই’- অনুরোধ করতে সটান মুখের উপরে না বলে হাঁটা দিলো। যেতে যেতে তার তেলেগু সর্বস্ব হিন্দিতে যেটা বললো, তার বাংলা মানে দাঁড়ায়- মন্দিরের ড্রেনে প্রচুর বেল পাতা পরে রয়েছে, সেখান থেকে কুড়িয়ে দিলে অসুবিধা কোথায়, কে দেখতে পাবে! কথাটা আমারও মনে ধরলো, পরক্ষনেই মনুষ্যত্ব বিবেক জেগে উঠলো। বেলপাতাতে আমার ধর্ম বিশ্বাস জুড়ে না থাকলেও, যিনি আমাকে বিশ্বাস করে বেলপাতা আনতে পাঠিয়েছেন, তার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখাটা আমার কর্তব্য, ওটাই তো ধর্ম। তৎক্ষণাৎ ড্রেনের প্ল্যান ক্যান্সিল করে দিলাম।

একটা ছোট মত নালা কিম্বা খাল, রাস্তা থেকে ৩০-৪০ ফুট দূরে। তারই পাড়ে গাছটা প্রায় ৫০ ডিগ্রি কোনে হেলে রয়েছে। গুঁড়িটা বেশ মোটাসোটা শক্তপোক্ত হলেও সেখানটা বেশ অন্ধকার ও উঁচু ঘাসের ঝোপ জঙ্গল রয়েছে, সমস্যা হলো হাতের নাগালে কোনো পাতা নেই। গাইকোয়াড় সাহেবকে বিষয়টা জানাতে ফোনেই শুনলাম ম্যাডামের তীক্ষ্ণ বাক্যবাণের সামনে তিনি ঢালহীন জবুথবু অবস্থায় সহ্য করছেন। শুধু বললেন- প্লিজ তন্ময়, বুঝে গেলাম বেগতিক। এ দিকে দিনের অবশিষ্ট আলো উড়ন্ত ফড়িং এর ডানার উপরে মুছে যাওয়ার শোকে কিম্বা পরের দিনের প্রতীক্ষাতে তিরতির করে কাপঁছে। আরেকবার সাহায্যের জন্য ড্রাইভারের সামনে গেলাম, আমাকে আসতে দেখেই বোধহয় মুখে রুমাল দিয়ে শুয়ে পড়ল, ওদিকে মিউজিক সিস্টেমে তারস্বরে তেলেগু গান চলছে।

সদ্য কেনা মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে একটু দেখে নিলাম, পাথুরে নালাটা ঘাস লতাপাতায় ঢাকা। পায়ে উডল্যান্ডস এর জব্বর বুট রয়েছে সমস্যা নেই, সাপখোপের ভয় থেকে অন্তত মুক্ত। গাছের উপরের দিকটা ঝাঁকড়া গোছের হলেও, নিচের দিকে শুধুই ডালপালার কঙ্কাল, অথচ সব ডালেই এক হওয়া উচিৎ ছিলো। এটা বেলের মরসুম নয়, হয়ত বেলের পাতা ঝরে যায় এই সময়ে। তার উপরে রোজ রোজ পাতা পেড়ে নিয়ে যাওয়ার কারনে যতদূর হাত যায় সবটাই ন্যাড়া, বেশ খানিকটা উপরে চড়ে তবে অবশিষ্ট পাতার নাগাল পেতে হবে। একটা লগা বানাবো তেমন জুতসই একটা লাঠিও পেলামনা, এদিকে দ্রুত সময় পেড়িয়ে যাচ্ছে। দোনামনা করতে করতে ছেলেবেলার পুরাতন অভ্যাস স্মরণ করে গাছে চড়ে যাওয়াটাই ধার্য্য করলাম। তাতে কী আর সমস্যা মেটে, কিশোর বেলায় ছিলাম রোগা প্যাঁকাটি মার্কা, আর এখন প্রায় সাত মাসের গাভিনের মত থলথলে চর্বির একটা আড়াই মণের নধর লাশ। এদিকে যতবার মনে পড়ছিলো এনারা ফাইনান্সার, উদ্দীপনা সপ্তমে চড়ে যাচ্ছিলো। অগত্যা, সুভানাল্লা বলে গাছে চড়ে বসলাম।

গুঁড়িটা যেখানে দুটো ভাগ হয়ে গেছে সেই অবধি পৌঁছাতে কোনো সমস্যা হলোনা, মাটি থেকে ফুট চারেক মাত্র, খাল থেকে ফুট ছয়েক বটে। এর পর হলো আসল সমস্যা, শুধু জুতো পিছলে যায়। অথচ বেল গাছে কাঁটা থাকা উচিৎ ছিলো, বছরের পর বছর ধরে ‘পত্রশিকারীদের’ দৌড়াত্বে সে সব মসৃণ ‘কান্ড’ হয়ে গেছে। বুকে পেটে হিঁচড়ে আরো ২-৩ ফুট উঁচুতে অপেক্ষাকৃত সরু ডালে উঠলাম, তাতেও পাতার নাগাল নেই। ওদিকে জিন্সের পকেটে তখন সমানে বেজে চলেছেন গাইকোয়াড় সাহেব, ফোন ধরব সে উপায় নেই। শুঁয়োপোকার মত আবার খানিক বুকে হেঁটে চলার চেষ্টা করতে গিয়ে, একটা ভাঙা বেল কাঁটার উদ্ধত অংশে লেগে জামাটা আর্তনাদ করে ছিঁড়ে গেলো। ক্ষণিকের জন্য বোধহয় মাথাটাও সামান্য টলে গেলো। খানিক ধাতস্ত হতে এবারে শরীরে যেন অদ্ভুত বল পেলাম।

পৃথিবীর বুকে তখন আলো আঁধারের দড়ি টানাটানি চলছে, আমিও বেলপাতার ঝাড়ের অন্ধকারে পাতা ধরে টান পাড়াপাড়ি করছি, তবুও পাতা আর হাতে আসেনা। এবারে বাইকে বসার মত করে ডালের আসনে বসে যতটা সম্ভব জোড়ে টান দিতেই একটা ময়লা মত কাপড় এসে হাতে ঠেকলো। যাব্বাবা, এ আবার কি কেলো! আচমকা দেখি আমারই মত আরেকটা ভুঁড়িওয়ালা টাকমাথা লোক পাতা পাড়তে উঠেছে, ওরই ধুতি আমার হাতে। হতচ্ছাড়া আমি শেষ ১০ মিনিট ধরে কী লঙ্কাকান্ডটাই না করছি, আর ব্যাটাচ্ছেলে বেল্লিক গাছে চড়ে উপর থেকে আমার অসহায়তার মজা নিচ্ছিলো! ইচ্ছে হলো দিই খানকতক বাছাবাছা খিস্তি, কিন্তু দ্বিগুণ মন খারাপ করে থেমে গেলাম। তেলেগুভাষী মানুষ, সুললিত বাংলা গালির মর্ম এ ব্যাটা বুঝবে কীভাবে! মিছে পন্ডশ্রম।

আশ্চর্য হওয়ার আরো বাকি ছিলো, লোকটা পরিষ্কার বাংলাতে বলে উঠলো- কটা পাতা চাই খোকা। মানে কী, আমি কোন এ্যাঙ্গেল থেকে খোকা! কিন্তু আচমকা ওই বাংলা উচ্চারন খোকা ডাকের অপমান ভুলিয়ে দিলো। মুখ থেকে আপনা হতেই বেড়িয়ে এলো- আপনি বাংলা জানেন! জবাব এলো- জানি বৈকি, এবারে হাতে কটা পাতা নিয়ে তিনিও কাঠবেড়ালির মত সরু ডাল বেয়ে নেমে আমার প্রায় মুখোমুখি চলে এলো। বয়স্ক লোক, খোঁচা খোঁচা দাড়ি আর ইয়া মোটা ঝাঁটার মত অপরিচ্চছন্ন গোঁফ। আমাদের কালীনগরের ষষ্টি গোয়ালার এমন বিচ্ছিরি গোঁফ আছে।

বললাম- চটপট পাতা গুলো দিন, তাড়াতাড়ি যেতে হবে, গাইকোয়াড় ম্যাডাম অপেক্ষা করছে। বৃদ্ধ খানিক হাই তোলার মত ভঙ্গি করে পিঠ চুলকে বললো- পারিশ্রমিক দাও। মনে মনে খুব রাগ হলো, নিশ্চিত এই বুড়ো ব্যাটাই নিচের সব ডাল ফাঁকা করে রেখেছে, আবার গালি দেওয়ার বাসনাটা জাগার আগেই সংবরণ করে নিলাম। শুধালাম, এ কী তোমার গাছ! বুড়ো বললো- কাগজে কলমে আমার নয় বটে, তবে দখল স্বত্বের দিক দিয়ে যদি হিসাব করা হয় তাহলে আমিই এর মালিক। আমি আর কথা না বাড়িয়ে পকেটে হাতটা চালান করলাম, একটা ৫ টাকার কয়েন খুঁজে আনার লক্ষ্যে। ওমা কোথায় কি, পকেট তো গড়ের মাঠ; অথচ আমি মানি ব্যাগ কোনোকালেই ব্যবহার করিনা, ডান পকেটেই আমার যাবতীয় টাকাপয়সা থাকে। পড়ে গেলো নাকি নিচে! বৃদ্ধ একটা অশ্লীল হাসি হেসে বললো- নেই বুঝি! আমি কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে খেই হারিয়ে জবাব দিলাম- নেই মানে, থাকতেই হবে, যাবে কোথায়!

পরিষ্কার মনে আছে আমি জিন্স পরে এসেছিলাম, অন্ধকারে কেন যে ঠিক ঠাউর করতে পারছিনা- মাথায় ঢুকলনা। আমার রীতিমতো কাঁচুমাচু অবস্থা, হা হতোস্মি করতে করতে দ্রুত বিষয়টা ধামাচাপা দিতে চাইলাম। ওদিকে ফোন আসা আচমকাই থেমে গেছে, আঁধারটাও বেশ গাঢ় হতে বুড়োকে আরো ভালভাবে যেন দেখতে পেলাম। বুড়ো শুধালো- বেল খাবে! বললাম- ইয়ে, কাঁচা বেলে আঠা থাকে, জিভ ঠোঁট কয়েসে জ্বালা করে বড়। একটু শরবৎ করার ব্যবস্থা হলে ভালো হতো। বুড়ো বলল, এ আর এমন বড় কথা কি, তুমি আব্দার করেছো যখন আলবাৎ হবে, হতেই হবে।

আমি শুধালাম- তা কর্তা, আপনার ঘর কোথায়! বুড়ো খানিকটা উদাস গলায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, এই দশাতে এসে পড়লে বাবা কার ঘর, আর কিসের ঘর! বুঝলাম, ছেলেপুলে নেই বা তারা খেতে পরতে দেয়না হয়ত। আহা রে, এই বুড়ো বয়সে বেলপাতা বেচে পেট চালায়, একটু মায়াই হলো। কিছুটা আর্থিক সাহায্য করতে মন চেয়ে শূন্য পকেটের দিকে হাতটা যেতেই আবার বুকটা হু হু করে উঠলো- অনেকগুলো টাকাই খোয়া গেছে। মাঝখান থেকে অন্ধকারে হাতড়ানোর দরুন হাতের কব্জিতে একটা কাঁটা ফুটে সেই জ্বালা করতে লাগল।

তা বাপু তুমি এ লাইনে কদ্দিন? আমি হো হো করে হেসে বললাম- আরে কাকা, আমার এক বন্ধুর স্ত্রী পুজো দেবেন, বেলপাতা নেই তাই তার জন্য বেলপাতা আনতে এসেছিলাম। বুড়ো যারপর নাই আশ্চর্য হয়ে আমাকে বলল- পুজো আর তুমি! বলো কী খোকা! এবারে আমি বেশ চটেই গেলাম, হতেই পারি আমি মুসলমান, তা বলে কোনো হিন্দু বন্ধু থাকতে নেই, নাকি সেই বন্ধুর যদি কিছু দরকার হয় সেটা আমি করবনা, হলোই বা সেটা বেলপাতার মত তুচ্ছ কিছু। বলতে গিয়েও চেপে গেলাম। বললাম, কাকা পাতা কটা দাও, আমাকে এগোতে হবে, গাইকোয়াড় সাহেব অপেক্ষা করছে। বুড়ো খেঁকিয়ে উঠে বলল- মস্করা হচ্ছেটেনে এক থাপ্পড় মারব যে হাড়েহাড়ে গিঁট পেকে যাবে। তবে রে হারামজাদা বুড়ো, দরকার নেই তোর বেলপাতার, আমিও দাঁত খিঁচিয়ে বললাম- সাইড দাও দেখি, আমার তাড়া আছে, যত্তসব জোটেও মাইরি।

বুড়ো সরে যাবার কোনও উদ্যোগই নিলোনা, উলটে বললো- চটছো কেন ভায়া, একটু পরে চাঁদ উটবে, চাঁদ দেখতে আমার বড় ভালো লাগে। আমি বললাম- তুমি একা একা এই নিশুতি রাত্রে চাঁদ দেখ আর বেলের আচার, মোরব্বা, শরবৎ খাও, পারলে কিছুটা শুঁট বানিয়েও খেয়ো, সকালে হাগা ভালো হবে। বুড়ো আমার কথা অগ্রাহ্য করে এবারে শুধালো, তা বাপু তোমার প্রকার কী, কুল কী? আমি বললাম, এই তো খানিক আগেই জাত তুলে খোঁটা দিলে, আবার শুধানো কেন! এবারে কেমন যেন সন্দেহ হলো, ব্যাটা চোর নয়ত! পকেটে টাকা না থাকলেও, সদ্য কেনা আইফোন রয়েছে। হাতে খান দুই আঙটি আছে, একটাতে হিরে বসানো। বুড়ো কথা না বাড়িয়ে আমার দিকে একটা শরবতের গ্লাস বাড়িয়ে দিতে, সন্দেহ আমার তিনগুণ হয়ে গেলো। নিশ্চই এতে অজ্ঞান করার ট্যাবলেট বা বিষ মেসানো আছে, নতুবা শরবৎ এর বোতল নিয়ে গাছে কে উঠে! আমি অচৈতন্য হলেই ব্যাটা সব লুঠ করবে।

তবে রে ঠ্যাঁটা বুড়ো, আমি খানিকটা তেড়ে যেতেই, আমার চোখের সামনে গিরগিটির মতো সরসর করে মগ ডালের দিকে গিয়ে কন্টকাকীর্ণ সরু ডালে চড়ে বসল। আমি তখন এক হাতে তার ধুতির খুঁট ধরে টানছি, আর সেই বুড়ো আমার দিকে বেলের শরবৎ ছেটাচ্ছে। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ঘেমে উঠলাম, শরীর দিয়ে আগুন আর ঘাম পাল্লা দিয়ে বের হচ্ছে। এবারে আবার একটা হ্যাঁচকা টান দিতে ধুতিটা খুলে হাতে এলো ঠিকিই, তার সাথে দেখলাম বুড়ো একটা সাদা বক হয়ে মিলিয়ে যেতে যেতে কেমন করে যেন গাইকোয়াড় সাহেব হয়ে গেলেন, আমার হাতে ওনার পাঞ্জাবির একটা ছেঁড়া অংশ। দূর আকাশের গোল থালার মত চাঁদটা ক্রমশ একটা নার্স এর মুখ হয়ে গেলো, যিনি আমার মুখে জলের ছিটে দিচ্ছিলেন। যাব্বাবা, কেমন যেন সব গুলিয়ে গুবলেট গেলো আবার।

আমার চোখ মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেলো, চারপাশে চেয়ে দেখলাম- একটা হাসপাতালের বেডে আমি শুয়ে। হাতের কব্জিতে বেল কাঁটার বদলে স্যালাইনের সিরিঞ্জ গাঁথা রয়েছে। জনা দেখলাম খুশি চেপে রাখতে না পেরে- ‘চেতনা অসি যাইছি’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো উল্লাসে। এতক্ষণে গাইকোয়াড় ম্যাডামের মমতাময়ী আওয়াজ পেলাম, কী দরকার ছিলো বাবা ওই সন্ধ্যাবেলায় বেলগাছে চড়ার! গাইকোয়াড় সাহেব বললেন, চোট তেমন মারাত্বক নয়, ভাগ্যিস ঘাসের গাদার উপরে পরেছিলে। পাথরে পড়োনি বলে রক্ষে, তবে হাড় ভাঙেনি এটাও তোমার তোমার গুরুজনের আশির্বাদ, ইত্যাদি। তা বাবা, ওই ভাবে পাঞ্জাবি ধরে টানাটানি করছিলে কেন! তোমার ভুল বকা দেখে আমার খানিক ভয় ভয়ই লাগছিলো।

সকলে নানা কথাবার্তা বলা কওয়া করতে লাগল, গায়ে ধুম জ্বর ঘাম দিয়ে ছাড়ছে বলে মাথা শরীর ভিজে গেছে। এর মাঝে যে কথা কটা কাউকে বলতে পারলামনা- সেই বুড়োর কাহিনীটা। ওটা স্বপ্ন ছিলো নাকি সত্যিকারের ভুত দর্শন করেছিলাম তাও মনে পরছেনা! কে জানে কখন পা ফসকে নালায় পড়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম, ওই কাঁটায় বিঁধে যখন জামাটা ছিঁড়েছিল তখনই বোধহয়। যাই হোক, ২ দিন পর ছাড়া পেয়েছিলাম হাসপাতাল থেকে, গাইকোয়াড় সাহেব ব্যস্ত মানুষ, প্রায় জোর করেই ওনাদের ফেরত পাঠিয়ে দিলাম। জনা থাকলে আমার কোনো অসুবিধা নেই, সে হোটেলে থাকাতেই তো আমার এই বিপত্তি।

এর পর থেকে আজও, যখনই বেল গাছ দেখি, সেই বৃদ্ধ বক ভুতকে দেখার বা খোঁজার চেষ্টা করি, কে জানে কোন অন্ধকারে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে কার মুখে শরবৎ ছেটাচ্ছে!

 

শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৫

নাস্তিক পণ্ডিতের ভ্রমণ

(১)

ভ্রমণের নেশা সর্বনাশা, আর সেই সুত্রেই দেশে বিদেশের নানান ধর্মস্থানে যাবার সৌভাগ্য হয়েছে, সেটা মসজিদ, মাজার, গুরদুয়ারা, বৌদ্ধ স্তুপা ও মনেষ্ট্রি, দেরাসর বা বসডি, চার্চ, সিনাগগ, এমনকি শাক্ত, পার্শি, আদিবাসী, বাহাই, বৈষ্ণব মঠ, টাও, কনফুসিয়ানিজম, শিন্তো, রাস্টাফি, জেন, হোয়া, কাও এর মত ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় উপাসনালয় সহ আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক ছোট ছোট স্বতন্ত্র নৃ-গোষ্ঠীর থান তথা উপাসনালয়েও যাবার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশী গেছি হিন্দু মন্দিরে।

আজকের গল্পটা ধর্মস্থান গননার নয়, না কোনো ভক্তি বা আস্থার। এটা পাতি জীবনের রোজনামচা আর ভ্রমণের গল্প।

বহু হিন্দু পূন্যার্থীর স্বপ্ন থাকে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের সবকটা স্থান দর্শনের। আমি তথাকথিত ম্লেচ্ছ হয়েও ১০টা জ্যোতির্লিঙ্গ ঘুরে দেখেছি। কেদারনাথ, বৈদ্যনাথ, বিশ্বনাথ মন্দিরে তো বেশ কয়েকবার যাওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলমে মল্লিকার্জুন, মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে মহাকালেশ্বর, মধ্যপ্রদেশের নর্মদা নদীর তীরে ওমকারেশ্বর, তামিলনাড়ুরামেশ্বরম, গুজরাটের সোমনাথে ১ বার করে গিয়েছিলাম। নাসিকের ত্রিম্বকেশ্বর আর ঔরঙ্গাবাদে গ্রীষ্ণেশ্বরে এই তো গত বছর ২০২৪ এর জুলাই মাসে- আমি আর সুব্রতদা মহারাষ্ট্র সফরে ঢুঁ মেরে এসেছি। বাকি রয়েছে কেবল পুণের ভীমাশঙ্কর, গুজরাটের দ্বারকানাগেশ্বর মন্দির। সেগুলোও কোনো দিন ঠিক পৌঁছে যাব ঘুড়তে ঘুড়তে।

আমি এমনিতেই নবদ্বীপের মানুষ, মঠ মন্দির আর কীর্তনের আবহাওয়াতেই বড় হয়ে উঠা। তার পরও গোটা ভারতজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকশো মন্দির সহ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ গুলোর অধিকাংশেই উপস্থিত হয়েছিলাম নানান উদ্ভুত পরিস্থিতিতে। একবার লৌক্ষৌ ভ্রমণ করছিলাম ২০১৮ সালে আমি ও সুব্রত মন্ডল দাদা, উভয়েই স্বপরিবারে। লৌক্ষৌ জুড়ে বিরিয়ানি, তন্দুরি, ফিরনি আর গালৌটি কাবাব ধ্বংসের সাথে সাথে, গোটা বেনারস জুড়ে ২টো দিন পেঁড়া, কচুরি, লাড্ডু আর স্বাত্তিক আহারের ফাঁকে বৌদির কল্যাণে এলাকার বহু ঘাট ও মন্দিরের দর্শন আমার হয়ে গিয়েছিলো।

এদিকে সুব্রতদা কঠোর নাস্তিক ও পন্ডিত মানুষ, শুধু ভাবনাতে নয়- ব্যাক্তিজীবনের আচার বিচারেও তাই। তবে ধর্মবিশ্বাসীদের সাথে তার কোনো বিরোধ নেই, কাউকে মানাও করেননা। সুতরাং, তিনি কোনোভাবেই ভক্তির কারনে মন্দির মসজিদ চার্চে ঢুকতে নারাজ, বাইচান্স ঢুকলেও স্থাপত্য দেখতে বা তার সাথে জুড়ে থাকা ইতিহাসকে ছুঁতে, প্রণাম বা নমস্কারের ধার ধারেন না। ওদিকে বৌদিকে একা ছাড়াও যায়না ওই ভিড়ে, অগত্যা আমিই দোসর। আমি আস্তিক মানুষ, মুর্তি পুজাতে বিশ্বাস না থাকলেও ভুত-ভগবান- দৈববাণীতে আস্থার ঘাটতি নেই, তাই বিসমিল্লাহ্‌ বলে সর্বত্র ঢুকে যেতে পারি সহজে। বড়জোর মালাউন মুনাফেক ডাকে খিস্তি খাবো, তাও ফেসবুকে, ব্যাস। তাতে কী আর আমার ভিতরের ইসলাম বিশ্বাস বদলে যাবে! যাই হোক-

একটা মজার ঘটনা ঘটে লৌক্ষৌ থেকে বেনারস ফেরার পথে। কোলকাতা থেকে নিজেরা SUV গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম, যাতে যেখানে খুশি দাঁড়াতে পারি, আর সময়ের যেন কোনো বাঁধন না থাকে। সুব্রতদা মির্জাপুর যাবে বলে শুরু থেকেই পণ করে বসে ছিলেন। এই মির্জাপুর শুধু ‘কাট্টা’ বন্দুক আর ওয়েব সিরিজের জন্য বিখ্যাত নয়, আমাদের সমগ্র দেশের যে ধ্রুবক সময় +5.30 GMT, সেটাও এই মির্জাপুরেরই। আদত ৮২°৩০' পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এই মির্জাপুরের উপর দিয়েই গেছে। আমাদের মির্জাপুর যাত্রায় খুব স্বাভাবিকভাবেই মেয়েদের কোনো আগ্রহ ছিলোনা, সুতরাং সেই সুযোগে রত্না বৌদির ভক্তি জেগে উঠল প্রয়াগের ত্রিবেণী সঙ্গমে পুজো দেওয়ার।

যাবার সময় আমরা বিহারের সাসারামে শেরশাহ সুরির সমাধি দেখার প্ল্যান করেছিলাম। দিনের বেলায় যাবার সময় এই অঞ্চলে দেখেছিলাম বিপুল সংখ্যায় রাইস মিল তৈরি হচ্ছিলো প্রায় সার বেঁধে, পশ্চিমবাংলার চাল শিল্পের অস্তাচলে যাওয়ার উপন্যাস সেই আমলেই লেখা হয়েছিলো। সেদিন বিজয়া দশমী, মোড়ে মোড়ে রামলীলার মেলা চলছে, সর্বত্র জনস্রোত। তাছাড়া রাস্তা জুড়ে বিশাল বিশাল শোভাযাত্রা চলছে প্রতিমা নিয়ে, তাসা ঢাক ঢোল কাঁসি সহযোগে ডিজে বক্সে উৎকট ভোজপুরী গান আর গেরুয়া আবীরের ভিড়ে গাড়ি এগোনোই দায়। স্থানীয় মানুষের দশেরা পালনের রীতিনীতি দেখতে দেখতে, তাদের আলুর বোন্দা, চাটনি, আচার আর গজা জাতীয় মিষ্টি খেতে খেতে- দীর্ঘ সময় রাস্তার যানজটে আঁটকে তখন মাঝরাত ছুইঁছুঁই।

রাস্তার ধারে কোনো দিক নির্দেশনার বোর্ড নেই, গুগুল ম্যাপে নির্দেশিত রাস্তায় সারারাত শোভাযাত্রার মিছিল চলবে। সেই বিচিত্র পরিস্থিতিতে এক পুলিশ গাড়ি দেখতে পেয়ে তাদেরকে রাস্তা শুধাতে, অদ্ভুতভাবে তারা উৎসবের আনন্দ নিতে বললো। বারকয়েক শুধাতে তারা রাস্তার বাতলানোর বদলে যথারীতি দশেরার বখশিস চেয়ে বসলো। সুব্রতদা ট্যাঁরে গিয়ে সেটাকে পাত্তা না দেওয়াতে এক কনস্টেবল তাচ্ছিল্যের একটা রাস্তা দেখিয়ে দেওয়াতে বিপদের মূল সূত্রপাত। ভোরবেলা যখন ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরে একটা হোটেলে গিয়ে পৌঁছালাম, তারা সব দেখে ও শুনে একই সাথে আতঙ্কিত ও হতবাক হয়ে গেলো।

আমরা যে অঞ্চলটাতে আঁটকা পড়ে সারারাত গোলগোল ঘুরে মরেছি, সেটা নাকি স্থানীয় বাহুবলী কুখ্যাত রাজা ভাইয়ার অঞ্চল। বিপদের গভীরতা অনুমান না করতে পারার দরুন আমরা ততটা ভয় না পেলেও, রিসেপশনের মেয়েটির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। চেক-ইন ফর্মালিটি পূরণ করতে করতে বললো- বাল বাল বাঁচ গ্যায়া আপলোগ। গাড়িতে ৩টে বাচ্চা, ৩ জন মহিলা, দুজন আনফিট ‘হাই ট্রাইগ্লিসারাইড’ পুরুষ- পুলিশের ভুলের মাশুল শুধুমাত্র সারারাত গোলকধাঁধার উপর দিয়েই সে যাত্রায় ফাঁড়া কেটেছিলো বরাতজোরে।

অজানা রাস্তা দিয়ে আনাড়ির মত গাড়ি চালিয়ে গাজিপুর, আজমগড়, সুলতানপুর রুটে লৌক্ষৌ পৌঁছেছিলাম, তাই ফেরার পথে বৌদির প্রয়াগ দর্শন পূর্ণ করতে এলাহাবাদ না যাওয়ার কোনো কারন ছিলনা। আমরা মুঘলসরাইতেও গিয়েছিলাম ‘দীনদয়াল পরোটা’ পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে, সেই দিনই স্টেশনের বাইরের বোর্ডে ‘দীনদয়াল’ নাম লেখা হচ্ছিলো, কাকতালীয় ভাবে সেই কুৎসিত ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম। শেষ অবধি শেরশাহ সুরির সমাধি দর্শনও আর সে যাত্রায় হয়ে উঠেনি।


(২)

যাই হোক, লৌক্ষৌ থেকে ফেরার পথে শেষ বিকালের দিকে আমরা এলাহাবাদে গঙ্গা যমুনার সঙ্গমে গিয়ে পৌঁছালাম, সুব্রতদা যথারীতি গাড়িতেই বসে ঘুমাবার তাল ফেঁদে রেখেছে। ওদিকে এ যাত্রায় বৌদিরও এক গোঁ, দাদাকে যেতেই হবে নতুবা বেণীদান সম্পাদন করা যাবেনা। ওনাদের এই ক্যাঁচালের ফাঁকে আমি ঘাটে গিয়ে একটা নৌকার সাথে দড়দাম করে প্রাথমিকভাবে বিষয়টা কিছুটা এগিয়ে রাখলাম। এখানে নৌকার মাঝি ও পুরুত ঠাকুরের কম্বো প্যাকেজ, সাথে যাবতীয় পুজো ও তর্পনের রেডিমেড আয়োজনের কোনো ত্রুটি নেই নৌকাতে। অবশেষে সুব্রতদাকে আসতে দেখলাম, গাই দোয়ানোর সময় এঁড়ে বাছুর গুলোকে যেমন টেনে হিঁচড়ে দূরের খুঁটিতে নিয়ে বাঁধা হয়, ওনাকে তেমনই জবরদস্তি করে পাড়ে এনে হাজির করানো হলো।

এসে আরেক ক্যাঁচাল, মাঝিকে সটান তার বলা রেটের অর্ধেক বলে মাঝির সাথে জানপ্রাণ লাগিয়ে দর কষাকষি করতে লেগে গেলো। বিষয়টা বৌদি তৎক্ষণাৎ ধরতে না পারলেও, আমি প্রমাদ গুনলাম- নির্ঘাৎ এটা সময় নষ্টের ফন্দি, কোনো মতে সন্ধ্যা হয়ে গেলেই কেল্লাফতে, আর যেতে হবেনা। কিন্তু উনি শেয়ানা হলেও ছোকরা পুরুত ঠাকুরটি সেয়ানার বাপ, তারা রোজ এমন ভক্তের দল দেখছে, সে বেশী কথা না বাড়িয়ে দুপক্ষের মাঝে মধ্যস্থতা করিয়ে প্রায় দাদার রেটেই রাজি হয়ে গেলো। নৌকায় চড়া ইস্তক সুব্রতদা পুরুত ঠাকুরের দিকে না তাকিয়ে মাঝির দিকে ফিরে বসে দূরে আলোআঁধারির বালুচর দেখছিলো, গোল বাঁধল সঙ্গমে পৌঁছে।

পুরুত ঠাকুরের নিদান, আচারের সাথে মন্ত্রোচ্চারণও করতে হবে, সুব্রতদার মেদিনীপুরিয়ান গোঁ- তিনি কিছুই করবেনা। অনেক বোঝালাম, মহামতি মার্ক্স বা কমরেড লেনিনের আত্মার জন্য অন্তত তর্পন করুন। ভারতে এসে কী এতো দিনে ওনাদের আত্মাও কী সনাতনী হয়ে যাননি! ওনাদেরকে আপনার পিতৃপুরুষ ভেবে নিয়েই নাহয় তাঁদের আত্মার উদ্দেশ্যে পিন্ডদান করুন। শুধু মন্ত্রের শুরুতে কমরেড আর শেষে ইনকিলাব জিন্দাবাদ জুড়ে নিলেই বিষয়টা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ দোষ মুক্ত হয়ে যাবে। নাহ, সমস্ত জোরাজুরি ভেস্তে যাওয়ার সাথে সাথে দিনের আলোও ক্রমশ ফুরিয়ে যাবার পথে, অগত্যা আমিই বৌদি সাথে সাথে মন্ত্রোচ্চারণের ভার কাঁধে তুলে নিলাম। নবদ্বীপের মাটির সন্তান আমি, ক্লাস সিক্স থেকে মাধ্যমিক অবধি সংস্কৃত পড়েছি ইস্কুলে, ও ভাষা জিভে আঁটকায়না, তাই মনে মনে সুভানাল্লা বলে শুরু করে দিলাম- যা আছে কপালে।

কালো তিল, যব, কুশ ঘাস, গঙ্গা জল এবং সাদা ফুল সহ তর্পণ মন্ত্র উচ্চারণ করে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি ও তৃপ্তি কামনা করে সেই জলই নদীতে অর্পণ- এই ছিলো মূল বিষয়টা। পূর্বপুরুষদের আত্মার উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান, পিতৃদোষ মুক্তি আশীর্বাদ চাওয়া, ও শুদ্ধাচারে আত্মাকে পবিত্র করে নিজের আধ্যাত্মিক উন্নতি করা। এই প্রক্রিয়া গুলো আমি এই দফায় শিখেছিলাম। পুরুত বেটা শুরুতে কম টাকায় রাজি হয়ে গেলেও, প্রতিবার নতুন আচারের মন্ত্র পড়ার সময় ফুল, বেলপাতা, নারকেল সব আলাদা আলাদা করে ১০ গুণ দামে বিক্রি করছিলো, বৌদি তখন ভক্তিতে চূড়, তিনি বিনা বাক্যব্যায়ে হ্যাঁ এ হ্যাঁ মিলিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি এই সব তর্পনের সিস্টেম জানিনা, তাই এ যাত্রায় চুপ চেয়ে থাকা ছাড়া বিশেষ কিছু করার ছিলোনা। এর পর ব্রাহ্মণ ভোজন করানোর জন্য- ‘আপকো যো আচ্ছা লাগতা হ্যায় দিজিয়ে’ বলে যতক্ষণে তর্পনের অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করলেন, ততক্ষণে নৌকাতে একটা ব্যাটারির LED বাল্ব টিমটিম করে জ্বলে উঠেছে।  

এবারে শুরু হলো মূল খেলা। পুরুত ঠাকুর যত বলে এটাই তিনটে নদীর সঙ্গম স্থান, সুব্রতদার সেই গোঁ- খাঁটি বাংলাচ্চোরণের কিম্ভূত হিন্দিতে বলতে শুরু করলেন- গঙ্গা যমুনা তো দেখতা পায়া, সরস্বতী কিধোর গয়া? তুম ছাগল বলির মন্ত্র পড়া হ্যায়, সব জিনিসে বেশী বেশী দাম ধরা হ্যাঁয়, তুমারা নারকেল অনেক পুরানো, ঝুনো হ্যায়। ফুল বেলপাতা সব বাসি হ্যায়, সব নদী থেকে তুলে ডাবল ট্রিপিল বার ব্যবহার করতা হ্যায়- ইত্যাদি, লেগে সেই তর্ক। এরপর পুরুত ঠাকুরের এক্সট্রা যোগ করা অতিরিক্ত বাজেটের প্রায় ৮০% কেটে পেমেন্ট করে যতক্ষণে নৌকা থেকে নামলাম তৎক্ষণে রাত্রি নেমে গেছে প্রয়াগের তীরে।

ব্রাহ্মণ ভোজনের দরুণ- আপকা মর্জি সেগমেন্টে, সুব্রতদা ৫১ টাকা দিয়ে পুরুত ঠাকুরকেই অনেক আশির্বাদ দান করলেন- চলো আশির্বাদ কর দিয়া, ও ভি বিনা পয়সা মে। ফেরার পথে আধাঁরে চেয়ে দেখলাম, বেচারা পুরুত বিহ্বল হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে রয়েছে, জীবনে প্রথমবার হয়ত নিজেকে এমন মুরগি হতে দেখেলো।

 

সোমবার, ২ আগস্ট, ২০২১

পোর্শিয়া



“গঙ্গাগর্ভোস্থিত দ্বীপ দ্বীপপূঞ্জৈবর্হিধৃত। প্রতিচ্যাং যস্য দেশস্য গঙ্গাভাতি নিরন্তরম”।

আমাদের এই সুপ্রাচীন অঞ্চল নিজগুণেই প্রসিদ্ধ। মধ্যযুগের হেন কোনো কবি নেই যিনি সেন রাজাদের রাজধানী- গাঙ্গেয় এই ছোট্ট শহর নবদ্বীপকে নিয়ে সূক্ত বা পদাবলী বাঁধেননি। কবি কর্ণপুর, নুলো পঞ্চানন কিম্বা এডু মিশ্রের বর্ণনায় নদীয়া ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে তার সমৃদ্ধির নিশান রেখে দিয়েছে। কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকে নরহরি চক্রবর্তীর বৈষ্ণব সাহিত্য, সর্বত্র নবদ্বীপের উল্লেখ রয়েছে। গোটা মধ্যযুগে বিদ্যালাভ ও সংস্কৃতিচর্চার পীঠস্থান ছিল আমাদের এই অঞ্চল; এখান থেকেই স্মার্ত রঘুনন্দন, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, বুনো রামনাথের মতো মণীষীরা সমাজকে দিশা দেখিয়েছেন। এই সব কিছুর উপরে প্রেমসাগর মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের জন্ম ও লীলাভূমি হওয়ার দরুন এতদ অঞ্চলে কখনও সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ছিল না, বরং এক আশ্চর্য মিথোজীবীয় সৌভাতৃত্বময় সহাবস্থান দেখা যেত আদিবাসী, দেশীয় হিন্দু ও মুসলমানেদের মাঝে। নতুন শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে এই অঞ্চলে পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তুর ভিড় বাড়তে বাড়তে দেশীয় হিন্দু, আদিবাসী ও মুসলমানেরা জনসংখ্যার ২০ শতাংশে এসে দাঁড়াবার দরুন অঞ্চলের চরিত্র বদলে গেল, পুরাতন ঐতিহ্য আজ তলিয়ে গেছে বর্ণময় অতীতের গর্ভে। এই স্বীকারোক্তির গল্পটা খুবই ছোট্ট, তাই একটা ভণিতা দিয়ে শুরু করি- এটা সেই আশির দশকের গ্রামবাংলার সমাজব্যবস্থার একটা ক্ষুদ্র চিত্রকল্পও বটে।
আমার তখন বছর আষ্টেক বয়স, সারাদিন দম ফেলার ফুরসত থাকে না, এত খেলার ব্যস্ততা। এক সংসারের বিশাল হেঁসেলের জোয়াল বইতে বইতে মায়ের সুযোগই ছিল না দস্যি ছেলেকে দু’দণ্ড নজরে রাখে। জমিদারী প্রথা বহু আগেই গত হয়েছিল, অপারেশন বর্গার পর জমির পরিমাণও কমে গিয়েছিল, কিন্তু জমিদারী মেজাজের ঘাটতি ছিল না। দাদুদের চার ভাইয়ের মধ্যে একজন শহরে চাকরি করলেও তিনজন এখানেই থাকতেন এক পেল্লাই ইমারতের মাঝে যৌথ সংসারে। আমরা ভাইবোনেরা অবশ্য সেই বাড়িতে আংশিক বড় হয়েছি, বাবা-কাকার বিয়ের পরেই পুরাতন বালাখানার পশ্চিমে পিচরাস্তার ধারে নতুন বাড়িতে উঠে আসে, মা সেখানেই নতুন বউ হয়ে এসেছিলেন। তবে নতুন বাড়িতে কেবলমাত্র রাত্রিবাস, খাওয়া-দাওয়া সহ বাকি সকল কিছু পুরানো বাড়ির খানকাতেই হতো, দুপুরের বিশ্রাম বলতে খানিক খানকার রোয়াকের সামনে পুকুর ও বাড়ির উত্তর দেহলির মাঝখানে কয়েক একরের বাচরা মতো স্থানটিতে বসে গল্পগাছা। বড়ি দেওয়া, আচার শুকানো, পিঠেপুলির জন্য প্রাকপ্রস্তুতি, চুলে চিরুনি দেওয়া, কাঁথায় ফুলেল নক্সা আঁকা কিম্বা সোয়েটার বোনা- সবই দ্বিপ্রাহরিক বাচরাতেই অনুষ্ঠিত হতো।
গোটা বাড়িটার চর্তুবেড়ে বাঁশবাগান, তারই মাঝে মাঝে ধানের মড়াই, ভূষিমালের গোলা। বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিমে বাঁশ ঝাড়ের নিচেই হাঁস-মুরগির খুলডো, গরুর গোয়াল, সারগর্ত আর ছাগলের মাচা। বাড়ির রান্নাঘরও ওই বাঁশবাগানের মধ্যে, তার চালে লাউ, কুমড়ো, শশার লতা। বাচরার শেষে প্রশস্ত হামাম মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ঘাট, চারকোণা পুকুরের উত্তরপাড়ে পারিবারিক গোরস্থান। পূর্বপাড়ে বিস্তীর্ণ খেলার মাঠের শুরুতেই বেশ কয়েক কুঠুরি দালান বাড়ি ছিল, তার মধ্যে একটা বৈঠকখানা, হাকিমের দাওয়াখানা, একটা নহবতখানা, একসার টানা মুসাফিরখানা। এর ঠিক পিছনে একটা ক্যাম্পবাড়ি। ক্যাম্পবাড়িতে দেশ স্বাধীনের পূর্বে নাকি পুলিসের ফাঁড়ি ছিল, নব্বই এর দশকের মাঝামাঝি সময় অবধি ২-৩ জন কনস্টেবল থাকতেন। বাড়ির দক্ষিণে কয়েকশো মিটার দূরে ছিল অভিলাষের বাগান, বড় বড় ফল গাছের পারিবারিক বাগান। এই বাগানের শুরুতে দরগাতলা, তারপর একটা সাহেবকুঠি, এরপর পাঁচিলে ঘেরা বিস্তীর্ণ নীলকুঠির মাঠ ও তার দরদালান। ইস্কুলবাড়ির মতো এই সাহেবকুঠির নির্মাণ ব্রিটিশেরাই করেছিল, রেললাইন পাতার সময়। একপাশে তাদের ইঞ্জিনিয়ারেরা থাকত, অন্যদিকে কুলিবস্তি। তারা চলে গেলে দাদুর বাবা সেগুলো সস্তায় কিনে নেয়। এই বাড়িটাই কালক্রমে হয়ে উঠে মিস্ত্রীবাড়ির জাইরামঞ্জিল। এই ছিল তৎকালীন সময়ের আমাদের বাড়ির সুদীর্ঘ ভিটের বর্ণনা।
এই সমস্ত বাড়ি তৈরি ছিল ইয়া মোটা মোটা দেওয়ালের, পাটকেল রঙের বেলে পাথরের সাথে চুনসুরকির পেটাই করা মেঝে, লম্বা থাম, ছোট ক্যাসেজ, কড়িবরগা, জাফরি আর খিলানের মাথায় অর্ধবৃত্তাকার জানালা দরজা দিয়ে ইরানি-ফরাসি স্থাপত্যের এক মিশ্র নক্সার স্থাপত্য। কিছু কিছু ইমারতে ফিনিয়াল আর গম্বুজও ছিল। আমাদের পরিবারের ঊর্ধ্বতন কোনো পুরুষ পামির অঞ্চলের কোনো এক স্থান দেশ থেকে বাংলার ভূমে এসেছিল ‘মিস্ত্রী’ হয়ে, আমার ঊর্ধ্বতন তৃতীয় পুরুষ পর্যন্ত সেই পদবীই ছিল- যদিও মূল পদবী ছিল সেখ। আগেই বলেছি এটা নবদ্বীপ অঞ্চল, তবে ঠিক নবদ্বীপ নয় যা আজকের পুরসভা শহর।
“দ্বীপ নাম শ্রাবণে সকল দুঃখ ক্ষয়। গঙ্গা পূর্ব-পশ্চিম তিরেতে দ্বীপ নয়।
পুরবে অন্তদ্বীপ, শ্রীসীমন্তদ্বীপ হয়। গোদ্রুমদ্বীপ, শ্রীমধ্যদ্বীপ চতুষ্টয়।
কোলদ্বীপ, ঋতু, জহ্নু, মোদদ্রুম আর।
রুদ্রদ্বীপ এই পঞ্চ পশ্চিমে প্রচার”।
এই ন’টা দ্বীপের মধ্যে আমাদের বসবাস মোদদ্রুম দ্বীপে, যা কালক্রমে গড়ে পরিণত হয়েছিল শ্রীচৈতন্য দেবের কল্যাণে। নবদ্বীপের এই মিশ্র সংস্কৃতির কল্যাণে বাড়িতে সেই অর্থে কোনো হার্ডকোর ইসলামিক নিয়মের বন্ধন ছিল না, তবে বাড়ির বৌ-শ্রেণীর মহিলারা সাধারণত সেভাবে বাইরে পরপুরুষের সামনে যেত না। বোরখার চল না থাকলেও সাত হাত ঘোমটা টানাটা বাধ্যতামূলক ছিল। পুরুষেরা জুম্মার নামাজে অধিকাংশই হাজিরা দিত, ব্যাস; এখানেই নামাজ পালনের ইতি। রমজান মাসে মহিলারা হায়েজের দিনগুলো বাদে সব রোজা রাখলেও, শেষ সাতদিন তথা শেষ তিনদিনে হৈহৈ রৈরৈ ব্যাপার হতো, কারণ বাড়ির অভিভাবক স্থানীয় পুরুষেরা এই কটাদিনই রোজা রাখত। বাড়ির বাচ্চারাও উৎসাহে জোহর পর্যন্ত রোজা রাখত। স্বাভাবিক ভাবেই ইফতারির দস্তরখানে খানাপিনার জুলুশ বসাতে খানদানি বাবুর্চিরা আসতেন। পঞ্চাশের দশকের আগে নাকি লক্ষ্ণৌ থেকে বাবুর্চিরা আসতেন, এখন মুর্শিদাবাদের লালবাগ কিম্বা কোলকাতার মেটিয়াবুরুজ থেকে আসে। অগুন্তি মেহমান, দরবেশ, পীর, ফকির, মাওলানা, মুয়াজ্জিন কতই না মুরুব্বিরা দরগাতলায় মেহফিলের রুহানিতে দোয়া, দরুদ পাঠ করতেন, সালাম-আসগর দিতেন- যাতে আল্লাহর রহমত নাজিল হয়।
ঈদ, মহরম, ঊরুষ, মিলাদের জশনের পাশাপাশি রথযাত্রা, দোলযাত্রা, রাসযাত্রা, অম্বুবাচীর হরেক আচার পালন হতো সমোৎসাহে। তবে মহাশিবরাত্রি পালনে হতো সবচেয়ে বেশি ধুমধামের সাথে। বিশ-পঁচিশ ক্রোশ দূরের গাঁ শান্তিপুর, ধুবুলিয়া, কাটোয়া থেকে, এদিকে রাঢ় ও দখিনা ভেল অঞ্চল থেকে লোক আসত উৎসব পালন করতে, বাড়তি হিসাবে পাওনা ছিল নবদ্বীপে গঙ্গাস্নান, এই সময় দরগাতলায় ম্যারাপ বেঁধে অন্নকূট উৎসব পালিত হতো। যদিও শ্রীকৃষ্ণের অন্নকূট উৎসবের সাথে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না, আগত পুণ্যার্থীদের খাওয়া-দাওয়া করানোর নামটাই ছিল অন্নকূট। এনাদের মহিলারা অধিকাংশেই গাদাগাদি করে উপরোক্ত জাইরামঞ্জিল, বৈঠকখানা, ক্যাম্পঘর, হামাম, নহবত, মুসাফিরখানা, নতুনবাড়ির বারান্দাতে থাকতেন। পুরুষেরা খানকা ও বাচরাতে মাথায় শামিয়ানা টাঙিয়ে, চটের পাতলা শতরঞ্জির নিচে খড় বিছিয়ে শুতেন।
মোট কথা উৎসব ছাড়াও সারা বছর বাড়িতে মেলা বসে থাকত আত্মীয় কুটুম্বে- কারণ মেহমানখানা ও জাইরামঞ্জিল নামের দুই সরাইখানার নিঃশুল্ক অন্ন ব্যঞ্জন; শুধু একটু কসরত করে বিপুল সাইজের এই ভিটের কোনো একটা ইমারতের কোনো একটা কোণে মাথা গোঁজার স্থানটা করে নিতে পারলেই নিশ্চিন্তি। মুসাফিরখানা একটু উচ্চাঙ্গের খাবার-দাবার থাকত, মানে রোজ দুপুরে মাছের পদ আর একটা অম্বল। কুলকুচি ও হাত ধোয়ার জন্য থাকত চিলিঞ্চি। জাইরামঞ্জিলের খাতকদের জন্য সপ্তাহে একদিন মাছ, নিজে যোগাড় করতে পারলে ডিম, বাকি ডাল সব্জি আর ভাজা- এই ছিল বারমাস্যা বরাদ্দ। রাত্রে এই দুই স্থানের জন্যই আটার রুটি আর কিছু একটা ভাজি বা ডাল, কোনোদিন একটু গুড় দেওয়া জাউ এর পায়েস- ব্যাস। পালে-পরবে মাংস হতো।
    ঠাকুমাদের ভাইয়ের শালা থেকে দাদুর বোনপোদের ফুফুশাশুড়ির ননদাই এর মতো নিকটাত্মীদের ভিড়ের সাথে বাবা-কাকাদের বন্ধুর বন্ধু, তস্য বন্ধুতে গোটা অঞ্চল গমগম করত। দাদুদের মূল ব্যবসা ছিল ফসল মজুদ করে বজরায় করে কোলকাতায় চালান দেওয়া, তাই পাইকের, মহাজন, ফড়েদের সাথে মুন্সী, খাজাঞ্চি, সরকার, চৌধুরী, ধোপা, নাপিত, জেলে, রোজমুনিষ, রাখালবাখাল, চাকরবাকর মিলিয়ে দৈনন্দিন ভিড় মেলার চেয়ে নেহাত কম ছিল না। অনেকেই বছরের পর বছর এখানেই থাকত, তাদের মেয়েরা হেঁসেলে আর খামারে স্বেচ্ছাকর্মী হিসাবে কাজ করতেন, পুরুষেরা ব্যবসায়িক ও চাষাবাদী দেখভাল করত ফাইফরমাইসে। এই ভাবেই মাসের পর মাস দিব্ব্যি গড়িয়ে যেত, কেউ কাউকে মানা করত না। কেউ কাউকে সেভাবে নিমন্ত্রণও করত না, কেউ চলে যেতেও বলত না। প্রথমত জমিদারী মেজাজ বজায় রাখা, চাকরবাকর ছাড়াও কয়েকশো লোক কত্তাবাবু বলে কারণে-অকারণে মাথা ঝুঁকিয়ে থাকাটা বেশ উপভোগ করতেন দাদু ও তদুর্ধ্ব ঊর্ধ্বতন পুরুষেরা। দ্বিতীয়ত, লেঠেল না পুষেও এক হাঁকে একশত লাঠি সড়কি বেরিয়ে আসার জোরের জন্য এই বিপুল আয়োজন চালিয়ে যেত ধুরন্ধর পূর্বপুরুষেরা- বিনা বেতনে, শুধুমাত্র পেটেভাতের বিনিময়ে। সুতরাং, এই বাড়ির বড় বৌমা হিসাবে মায়ের শ্বশুরবাড়ির শুরুর দিনগুলোর অবস্থা কল্পনা করতে খুব একটা কষ্ট হয় না।
    আমি তখন আইডিয়াল ইস্কুলে স্ট্যান্ডার্ড টু’তে পড়ি, এক শীতকালে কোনো এক আত্মীয়ের কিছু একটা লতাপাতা সূত্রে খান দুয়েক পরিবার এসে মিস্ত্রীবাড়ির আশ্রিত হলেন। এনাদের সূত্রেই কিছুদিন পর নিগারও এলো। নিগার মাসোনি আর তার ছোট বোন মেহের গুল তাদের বাবাব সাথে দাদুর কিসমাতে এসে আতুরাশ্রম প্রার্থনা করলেন। কোনো একটা স্থানে দাঙ্গাতে নাকি তাদের মা ও ভাই মারা গেছে, সহায়সম্বলহীন হয়ে চেনা এক বাঙালি পড়শি ব্রজ মোদকের সাথে এখানে এসে জুটেছেন। এখন বুঝি সেটা ছিল ৯২ এর বোম্বে দাঙ্গা। সময়ের পলি তাদের ভুলিয়েই দিয়েছিল প্রায়, স্বীকারোক্তি লিখতে বসে আবার স্মৃতির সাগরে ডুবুরি নামাতে ভেসে উঠল নিগার, নিগার মাসোনি।
    নিগারকে কখনও বুবু-আপা-দিদি বা ফুফু-খালা কোনো নামে সম্বোধন করিনি, কেন করিনি তা অজানা। আমি যখন আট, তখন সে ষোল। বাবা কয়লা আমদানি ও পাটের চালানের দায়িত্বে ছিলেন, স্বভাবতই মাসের অধিকাংশ দিন তিনি বিদেশ বিভূঁইতে রাত কাটাতেন। আমি আর আমার ছোট বোন মায়ের সাথে নতুন বাড়িতে থাকতাম। নিগার মায়ের সাথে সেই রাত্রিগুলোতে আমাদের ঘরে থাকত মাকে সঙ্গ দিতে, তার ভাই মায়ের জন্য বিলাপ করত। আমার দুই খুড়তুতো বোন আছে, আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট, তারা দেখতে পুরো পুতুলের মতো ছিল।
    এদের সাথে আমার বোন- সারাদিন বিদঘুটে কাজকর্ম করে বেড়ানো বেয়াড়া বাচ্চা- স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির দুজন ঝি এই কন্যা সন্তানদেরই আগলাত, আর আমি একটু বড় হয়ে যাওয়াতে সেভাবে আমার কেউ খোঁজ রাখত না, আগানে-বাগানে ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম স্কুল থেকে এসে। মাস খানেকের মধ্যেই নিগার মায়ের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল, কারণ এনাদের দুজনের মাঝে একটা কমন মিল ছিল, কেউ কারও ভাষা বুঝত না। মা আদ্যোপান্ত শহুরে মেয়ে, গ্রাম্য বিদ্যুৎহীন পরিবেশে শুরুতে কষ্ট হতো। সে সম্বন্ধে কিছু বললেই আমার ফুফু-দাদিরা মাকে উন্নাসিক বলত, এ নিয়ে একটা আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও ছিল তাদের মাঝে- খুব সম্ভবত এই কারণেই মা ও নিগার একটা শহুরে আত্মীয়তার বন্ধনে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য নিগারের ভাষা এ বাড়ির হাতে গোনা এক আধাজন সদস্যের বাইরে কেউই বুঝত না।
    নিগারের আব্বার নাম ডোংরিওয়ালা, অবশ্য পুরো নাম তৌফিক আগা, বোম্বে শহরের অদূরে ডোংরি নামে একটা স্থানে থাকত বলে নামের শেষে ডোংরিওয়ালা জুড়ে গিয়েছিল। দাদু রেগে গেলে বরাবর হিন্দি বলতেন, আগাসাহেবকে পেতেই উর্দু শিক্ষার ক্লাসও শুরু করে দিলেন সন্ধ্যার দিকে, সে এক কমিক অধ্যায় ছিল- কারণ এরপর হরকথায় দাদুর ভুলভাল উর্দু লফজ-লতিফার চোটে সকলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। অল্প দিনেই দাদুর ভীষণ আস্থাভাজন হয়ে উঠলেন আগা সাহেব। বোম্বের কোনো একস্থানে বা একাধিক স্থানে তাদের গালিচা, মখমল, মলমল পর্দা, বিছানার চাদরের ব্যবসা ছিল, এনার অন্য এক ভাইয়ের কাঁচের থালাবাসনের ব্যবসা ছিল। দাঙ্গার সময় সব কিছুতে লুঠপাঠ ভাঙচুর চলে, বহু আত্মীয়স্বজন খুন হয়ে যায়। এনাদের কথ্য ভাষা ফার্সি, প্রত্যেকেই উর্দু জানতেন অল্পবিস্তর। সময়ের তাড়নাতে হোক বা বিশেষ কোনো এলেম, নিগার অতিদ্রুত বাংলা ভাষা করায়ত্ত করে নিল, বছর দেড়েকের মধ্যে সে কলেজেও ভর্তি হয়েছিল ক্লাস ইলেভেনে, অনর্গল বাংলা বলতে শিখে গিয়েছিল। নিগারের বাবাও দাদুর দেওয়া পুঁজিতে মেটিয়াবুরুজ থেকে কাপড় এনে হাটে-ঘাটে বিক্রি করে সম্মানের রুজি রোজগার করতেন, যদিও থাকা-খাওয়া করতেন জাইরামঞ্জিলে।
    মা বড় বাড়ির হেঁসেলে সাংসারিক কাজের তদারকি করতেন। নিগার তার ভাবির ছেলে অর্থাৎ আমাকে নিয়েই সারাদিন খেলা করত, মা নিজেও নিগারের কাছে আমাকে ছেড়ে বড় নিশ্চিন্তে থাকত। সোনালি কোঁকড়ানো চুল, কটা সাদা চামড়া, ছিপছিপে দীর্ঘাঙ্গী, টিকালো নাক, প্রশস্ত কপাল আর নীল চোখের এই পার্সিয়ান জিনের মেয়েটির মুখশ্রী মারাকাটারি সুন্দরী না হলেও উপরোক্ত বৈশিষ্টের কারণে আমাদের দক্ষিণ গাঙ্গেয় অঞ্চলের শ্যামবর্ণ তামাটে মানুষের ভিড়ে আলাদা করে চেনা যেত। এদের সম্ভাষণ রীতিতে হাত ও কপাল চুম্বনের প্রথা ছিল, যেটাকে আমাদের সমাজে সবাই শুরুতে খুব হাসাহাসি করত। নিগারের কাছে আমরা ভাইবোনেরা কতশত ইরানি গল্প শুনতাম, ডাকাতের গল্প, বোম্বে শহরের গল্প, আরব সাগরের গল্প। আরব্য রজনীর গল্প, বাগদাদ, তেহরান, জ্বিন, পরী, শাহেনশা, বাদশাদের দেশের ওস্তান, মার্কাজ, বাখ্‌শে পাড়ি জমাতাম নিগারের গল্পের উড়ন্ত গালিচাতে চড়ে। প্রথমদিকে নিগার জাইরামঞ্জিলের একটা ঘরে আরো অনেক মহিলাদের সাথে ঠাসাঠাসি করে থাকলেও পরবর্তীতে মায়ের উদ্যোগে গুমঘরের এককোণে পাটকাঠির বেড়া দিয়ে একটা স্থান নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল বাড়ির অন্দরে। প্রথমদিকে ফুফুদের পুরাতন সালোয়ারগুলো পরলেও পরের দিকে তাদের দেশীয় স্টাইলের খাটো কুর্তি, আজারি চুড়িদার আর জরিদার কুর্দি ওড়নায় বড় মোহময়ী লাগত তাকে। আমাকেও কয়েক পিস গিলান জোব্বা ও পিরান গড়িয়ে দিয়েছিল আগা সাগেব।
    সমস্যাটা শুরু হলো কিছুদিন পর থেকে, ফুফুদের বিয়ে-শাদির জন্য ঘটকে যখন ভাল ভাল সম্বন্ধ আনে, সকলেই নিগারকে পছন্দ করে। কারণ, বাঁধা বাঁদির মতো নিগারই শরবত, বরফি, মিষ্টি, শোনপাপড়ি সাজিয়ে যেত বারকোশে সাজিয়ে। সিউড়ির বড় খানেদের বাড়ি থেকে ন’ফুফুর জন্য একটা সম্বন্ধ এলে তারা নিগারের বোন মেহের গুলকে নিকাহ পড়িয়ে নিয়ে চলে যেতে তখন বিষয়টা অসহ্যের পর্যায়ে পৌঁছাল। সেই থেকেই দাদির চোখের বালি হয়ে গেল নিগার, যথারীতি তার ঠাঁই হলো জাইরামঞ্জিলের গাদাগাদিতে। কয়েকদিন পর মা- দাদির বিরোধিতা করে আমাদের নতুন বাড়ির সিঁড়ির নিচেটা খানিকটা মেরামত করে সেখানেই নিগারের পাকা আস্তানা করে দিলেন। সেই থেকে নিগার আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে উঠল। আব্বা শুরুতে কিছুটা আপত্তি করলেও নতুন বাড়িতে দুটো বাচ্চা নিয়ে মায়ের অসুবিধার কথা ভেবে রাজি হয়ে গেলেন। ফলত দাদির সাথে মায়ের বিরোধ তুঙ্গে উঠল ছুতোনাতাতে, এই সময়েই গত কয়েক শতাব্দীর যৌথ সংসার থেকে হাঁড়ি আলাদার বীজ বপন হয়ে গেল। দাদি-পিসিরা শলা করে নিগারের নামে হরেক রকমের চারিত্রিক অপবাদ কুৎসা দিতে শুরু করল।

    আমাদের ঘরে থাকার জন্য নিগারের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলাম, ক্রমশ সে যেন মিস্ত্রী বাড়িরই মেয়ে হয়ে গেল। একটা কেমন যেন অযাচারী অধিকারবোধ জন্মে গিয়েছিল ওর প্রতি। সে নিয়মিত তাদের দেশে বা অন্য কোথাও কাউকে চিঠি লিখত, পাল্টা চিঠি আসতও। হয়ত কোনো প্রেমিক বা পত্রমিতালী- ভাষা ফার্সি হওয়ার দরুন তা আমার অবোধ্য ছিল। নিগার আমাকে আদর করে বুল্লা নামে ডাকত, কারণে-অকারণে আল্লাকে শুকরানা দিয়ে আমাকে স্নেহ, আদর, চুমুতে ভরিয়ে তুলত সর্বক্ষণ। একা একাই বলত, হসলা জিততা হ্যাঁয়, হাতিয়ার নেহি। আমার হসলা আছে, আমরা আবার ডোংরি ফিরে যাব। বুঝতাম তার রুহতে শুকুন নেই স্বদেশ ছেড়ে এসে, শরীরটা এখানে থাকলেও আত্মা সেই ডোংরিতেই পড়ে থাকে।
    নিগার দারুণ দারুণ সব রান্না করত, আমার নানি, মামারা এলে মাকে সাহায্য করত। ডালিমের রস দিয়ে মাংসের এক চমৎকার সুরুয়া বানাত- ফেসেঞ্জান বা ঐ ধরনের কিছু একটা নাম ছিল। মাংসের কিমা দিয়ে নানা ধরনের সবজি সিদ্ধ বানাত- এর নাম ছিল বাদেমজান। এছাড়া কাসেমি পুলাও, খাসবু মাহি, কোরমাহ, খোশ কারাফ এমন নানা ধরনের খাবারে খুশবুতে বাড়ি ম ম করত যখন সানকি বা খঞ্চাতে করে দস্তরখান সাজত। জন্মদিনে আমাকে একটা অনুবাদিত বাংলা বই দিয়েছিল নিগার- ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’। পাওলো কয়েলহো নামের এক লাতিন লেখকের রাখাল নায়কের গুপ্তধন প্রাপ্তির কাহিনী, নায়িকার নাম ফাতিমা। আমি নিজেকে সান্তিয়াগো মনে করতাম, আর নিগারকে ফাতিমা। সর্বক্ষণ বলত, মাওলাকে বলেছি- তুই আমার মুরসিদ, আমি তোর মুরিদ হবো- ভাল করে লেখাপড়া কর বুল্লা। তুই বড় হলে আমি তো তোকেই শাদি করতাম, তুই আমার মির্জা আর আমি তোর বেগম; আ মেরে আউলিয়া। বলেও নিপুণভাবে গালে, কপালে, ঠোঁটে চুমু এঁকে দিত। সুন্দর সুন্দর ফার্সি গজল, আলাপ, কাওল, রুবাইয়াৎ ভীষণভাবে মন ছুঁয়ে যেত। বোল না বুঝলেও সুফি ঘরানার সুরগুলো কিশোর মনে পুলক জাগাতো, খিলখিলিয়ে বিষয়গুলো উপভোগ করতাম।
    আমাদের ঘরে থাকাকালীন তার ইবাদতে পাবন্দেগী এল, চেহেরাতেও নূর এল- কিন্তু বিরহাপনা বেড়ে যেতে লাগল, কারণ ফুফুরা তার সাথে কেউ কথা বলত না- মাতৃ ও ভাতৃ বিয়োগের যন্ত্রণা তো ছিলোই, বোনটাও চলে গিয়েছিল শ্বশুরবাড়ি । একদিন মা সত্যিই আর সকালে ও’বাড়ি গেল না, ভেঙে গেল সংসার। মালার একটা পুঁতি খুলে গেলে বাকিগুলো চোখের পলকে ঝরে যায়, এক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হলো না। চার দাদু সহ তাদের অধিকাংশ বিবাহিত ছেলেপুলেরাই আলাদা হয়ে গেল বছর ঘুরতেই। এর ফলে যারা লাভবান হয়েছিল তারা নিজেদের ক্রেডিট দিল, আর যাদের লোকসান হলো তারা গালিগালাজের জন্য নিগারকে বেছে নিল। ভূসম্পত্তি বা ব্যবসা ভাগ না হলেও হাঁড়ি আলাদা হয়ে যেতেই বারোয়ারি খানার চাষ উঠে গেল, কারণ তখন সকলের জন্য নির্দিষ্ট মাসিক মাসোহারার বন্দোবস্ত হলো, কে আর নিজের পকেটের টাকা দিয়ে ভূতভোজন করাবে! ভেলকিবাজির মতো লতায় পাতায় জড়িয়ে থাকা আত্মীয়েরা পাততাড়ি গুটাল মিস্ত্রীবাড়ি থেকে।
    কিন্তু যাদের হাতে কাজ ছিল না, এ বাড়িতে খেয়েদেয়ে ব্যোম ব্যোম করে ঘুরে বেড়াত তেমন কিছু আত্মীয়ের মাথায় বাজ পড়ল, খুব মনে আছে ক্লাস সিক্সের হাফইয়ার্লির রেজাল্ট এনে নাচতে নাচতে বাড়িতে ঢুকে দেখি লোকজন গিজগিজ করছে। সবটা না বুঝলেও যেটা বুঝলাম, সেটা হলো- নিগার নাকি পতিতাবৃত্তি করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে। ফজল নামের একজনের সাথে ভরদুপুরে ছাদের চিলেকোঠায় নাকি মন্দ কাজ করেছে, আর সেটা দেখেছে বাড়ির এক ঝি আশিরন আর দাদির ভাইপো নাতি শাবাব। বিচার হলো, যেহেতু হাতেনাতে ধরা পরেছে তাই পঞ্চাশ ঘা কাড়ার হুকুম দিলো দাদু, নিগার কিছুই বলার সুযোগ পেল না আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য। সেদিন সারারাতই প্রায় কাঁদল সে, মায়ের কাছে কোরান পাক হাতে নিয়ে বারে বলতে থাকল- এই কালামে পাকের কসম ভাবি, আমি মন্দ কিছু করিনি। আগা খান তখন কোলকাতায়, তিনি ফিরে এসে কান্নাকাটি করে মেয়ের হয়ে মাফ চেয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার আর্জি করলেন।
    নারী-পুরুষের সম্পর্ক, যৌনতার বিষয়ে সবটা না বুঝলেও ভাসা ভাসা একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল সেই সময়, কেমন যেন ঘৃণা তৈরি হয়ে গেল নিগারের উপরে। যদিও মা বিশ্বাস করল না নিগার অন্যায় কিছু করেছে বলে, কিন্তু চারিপাশের সকলের মুখের কথা শুনে আমার কেমন একটা হতে লাগল। যদিও অনেক পরে দাদি বিলাপ করে সত্য উগরেছিল, স্বীকার করেছিল যে নিগারের সাথে অন্যায় করা হয়েছিল- যখন আমার ছোট ফুফা ২৩ বছরের ফুফুকে বিধবা করে জান্নাতে চলে যান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। যাইহোক, ক্রমশই আমি কেমন যেন হিংস্র হয়ে উঠতে লাগলাম নিগারের উপরে। সারাক্ষণ তাকে তাড়াবার চেষ্টায় মত্ত হয়ে উঠলাম, সে শুধু বলত- এখানে আমার কেউ নেই বুল্লা, বাপটাও দেশে চলে গেল। এমনই একদিন কাছে ডেকে হাসতে হাসতেই বলল- শর কলম কিয়া যায়ে, হুজুর! উর্দু আমিও কিছুটা বুঝি, বিরক্তির সাথে উপেক্ষা করে টিভি খুলে বসে গেলাম। সেদিনের কথাগুলো আজও কানে বাজে- “এটা জাজমেন্টাল সোসাইটি বুল্লা, তুইও ভুল বুঝলি! শোন আমার কথা- যে শোনে, সেই কেবল বুঝতে পারে, যে বুঝতে পারে তার পক্ষেই ভাল কিছু করা সম্ভব”। আমার এই আচরণ তাকে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা দিয়েছিল, যা সে মেনে নিতে পারেনি। হয়ত, আমার প্রতি তার ছিল এক অকৃত্রিম সন্তান বাৎসল্য- কিম্বা, কে জানে কী ছিল!
    এরপর একদিন সকালে উঠে দেখি নিগার নেই, বিকাল পর্যন্তও ফিরে এল না, মা খোঁজ শুরু করল, আমাকে শুধাল। আমি মিথ্যা বললাম, বিল পাড়ার পরীক্ষিতের সাথে তাকে যেতে দেখেছি বলে মাকে মিথ্যা বললাম। সন্ধ্যার পর কাকিমার সাথে সে বাড়ি ফিরতে কিছু না শুনেই মা ভীষণভাবে তাকে অপমান করল, তারপর সে নিজেও কিছু তর্কে জড়িয়ে যায়- আমি সেসব আর খেয়াল করিনি। পরদিন ভোরে আর কেউ তাকে দেখেনি এ তল্লাটে। সেদিন গেল, আজও গেল। ২০১৫ সালে মুম্বই গিয়েছিলাম, ডোংরিতে গিয়ে দেখি তৌফিক আগা সাহেবের ধান্দা আবার জমে উঠেছে, খাতিরের কোনো ত্রুটি হলো না। নিগারের কথা শুধাতে তিনি মৌন হয়ে গেলেন, চোখ মুছে বললেন- ইতনা বড়া দেশমে শোয়া’শ কড়োর লোগ- উসে কাহা ঢুঁন্ডু বেটা।
    একটা জলজ্যান্ত অনূঢ়া মেয়ে জাস্ট হারিয়ে গেল আমাদের পরিচিত সমাজ থেকে, শুধুমাত্র অবহেলা আর কুৎসার কারণে। হারিয়ে গেল নিগার মাসোনি।
“ভালবাসা হলো এমন একটি পর্যায়, যা দুঃখের মধ্যেও মানুষকে সুখী রেখে দেয়”
    পাওলো কোয়েলহোর অমর উক্তির মাঝে আজও নিগারকে খুঁজে পাই, আমার ছেলেবেলার ক্রাশ ছিল হয়ত বা- যার জন্য আজও নিগার নামটা শুনলে সবার আগে একটা অনাবিল খুশির উদ্রেগ হয়, তারপরেই একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা ঘিরে ধরে- ভরসার মর্যাদা রাখতে না পারার যন্ত্রণা। সে যেখানে আছে নিশ্চিত সুখেই আছে।
সেকেন্দ্রাবাদী শায়র সন্তোষ আনন্দের একটা শায়েরী দিয়ে তাকে অক্ষম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ছাড়া আজ কিছুই করার নেই-
“কুছ পা কর খোনা হ্যাঁয়
কুছ খো কর পানা হ্যাঁ
জীবন কা মতলব তো
আনা অউর জানা হ্যাঁয়
জিন্দেগী অউর, কুছ ভি নেহি
তেরি মেরি কাহানি হ্যাঁয়”।

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...