গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৫ অক্টোবর, ২০১৭

চুলকানি

 


১)

রাত তখন দুটো। চুলটা শাঁকচুন্নিদের মতো এলোমেলো করে বেডরুম থেকে বেরিয়ে এলো তৃষা। কি কারনে! কারন কি আর একটা যে সেটাকে রসিয়ে রসিয়ে বলা যায়! তবে  টেনসন হলে চুল সে এলোমেলো করবেই। এ এক ধরনের প্রতিভা, যেমন কবি কলম ধরে কবিতা লেখেন, ভাস্কর মুর্তি গড়েন ছেনি-হাতুরি দিয়ে, তুলি দিয়ে চিত্রকর ছবি আঁকেন; তৃষাও তেমনই ওর ওই সুন্দর কোঁচকানো একরাশ খোলা চুল দিয়ে নিজকে শাঁকচুন্নি বানায়।

"কেউ আমাকে ভালোবাসে না.... আমার কথা কেউ ভাবে না.."

হ্যাঁ এই প্লটের উপরেই ভাবনাটা চাগার দিয়ে উঠল, মাঝরাত্রের ঘুমটা ভেঙে। স্বগোতোক্তির ঢঙে বেশ কয়েকবার কথা কটা গজগজ করতে করতে ডাইনিং এর শোকেশের ড্রয়ারটা খুলে ওষুধের বক্সটা বের করলো। কপাল থেকে চুলের গোছাটা সরিয়ে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস নিল। চারপাশে একবার শতর্ক চোখ বুলিয়ে নিল। নাহ কেউ কোথাও আড়চোখে দেখছেনা। এমনকি ‘ধুম তা না না না’ ‘ধুম তা না না না’ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও বাজছেনা, যেমনটা টিভি সিরিয়ালে বাজে আরকি।

এতে তার মনটা আরো খাপ্পা হয়ে গেল, গলায় পাকিয়ে আসা চরম কষ্টকে সে আর সহ্য করতে পারলো না। ঘরে নাইটবাল্বের নীল আলোতে একবার নিজেকে আয়নাতে দেখে নিল, এবং তাতে বেশ একটা ড্রামিক ফিল হতেই; বক্সটা খুলে সব ওষুধের পাতা থেকে ওষুধ খুলে নিয়ে বোতলের জল দিয়ে গিলতে লাগলো একের পর এক। নরফ্লক্স, প্যারাসিটামল, লেমোনেট, স্যারিডন, অ্যাসিলক, সিট্রিজিন, নানান ধরনের ওষুধ ভর্তি থাকে এই বক্সে। সম্ভবত কিছুই বাদ গেল না।

২)

তৃণা উপাধ্যায়, সিংভুম জেলার বনেদী বাড়ির আদুরে কন্যা। পিতা ব্যাঙ্কের অফিসার, ভাই বোন ছোট। মাস্টার্স করতে করতেই ব্যাঙ্কে চাকরির পরীক্ষাতে সফলতা আসতে , পড়াশোনাতে ছেদ ঘটিয়ে চাকুরীতেই মনোনিবেশ করেছিল আনন্দের সাথে। কিন্তু উপরওয়ালা সবকিছু তো আর একসাথে দেননা। চাকরি এলো, পরিবারের রোজকার সাথের বিনিময়ে। সুদূর জামসেদপুর থেকে বারুইপুরের কুলপি রোডের উপরে একটা রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কে রোজ কুলপি খাচ্ছে। উকুলপাড়া রোডে একটা বাড়ির দ্বিতলে একাই থাকে সে। নিচেতলাতেও তিনটে রুম, একটাতে দুটো কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী থেকে। একটাতে একটি স্কুলের শিক্ষিকা, অন্যটাতে এক শিক্ষিকা প্রায় সারাদিন কোচিং ক্লাস চালান।  

ঘরে থাকতে হলেই তৃণার ক্লান্তি, সে একা একাই ক্লান্ত হয়ে যায়। স্কুল পড়ুয়া মেয়ে দুটো সারাদিন হাহা হিহি করে প্রজাপতির মত উড়ে বেড়ায়, অসহ্য লাগে তৃণার। স্কুল দিদিমণি সারাদিন স্বামী বিরহেই কাতর প্রায়, তার অষ্টমবর্ষীয় কন্যা সহ। কোচিং দিদিমনির কাছে বসলে শুধুই জীবনযন্ত্রনার কথা। একটাও কেউ এমন নেই যার সাথে দু-দন্ড একটু মনখুলে কথাবার্তা বলা যায়। যেটুকু সময় ব্যাঙ্কে থাকে সেই সময়টুকুই শান্তি, কখন যে দশটা থেকে বিকাল পাঁচটা কেটে যায় বোঝাই যায়না। সকালে আটটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে, স্নান খাওয়া বাজার করে কাজের মাসির কাছে বিবিধ ভারতী সমাচার শুনতে শুনতে সকালটা বেশ বিন্দাস কাটে। সমস্যা হয় সন্ধ্যার পর থেকে। দেওয়ালে লটকানো টিভিটা উদ্দেশ্যহীন ভাবে চলতে থাকে। ঠুংরি, গজল, খবর, খেলা, সিরিয়াল, পর্ণ, যা চলে সবই ও শুনে যায়। নজর থাকে হাতের মোবাইলে, আর সেখানে ওই ফেসবুক হয়াটস এপ।

অনেকের অনেক সমস্যা, তৃণার সমস্যা অন্য। বারুইপুরের চেনাজানা লোকের সাথে ফেসবুকে বন্ধুত্ব করলে কখন কোথায় কে আলফাল প্রস্তাব দেয়, তাই সে প্রথম প্রথম ডিপিতে নিজের ছবি দেয়নি। মাসখানেক আগে যখন সে ছবি দিল, ৯৯% বন্ধু ফেক প্রোফাইল বলে দেগে দিল। কোনো মানে হয়! কলেজের ছুড়ি, তাঁরাও ৩-৪ করে প্রেমিক নাচাচ্ছে। আর সে! নাহ, তাঁর কাওকে নাচাবার দরকার নেই, তাবলে একটা মনের মানুষ থাকবেনা? সবাই ভাবে এমন সুন্দরী চাকুরিওয়ালা মেয়ে , এ কি আর ফাঁকা আছে! কাছেই ঘেষেনা কেউ, আর যারা ঘেঁষে তাদের ছুলে চান করতে হয় এমন গা ঘিনিঘিনে। সকলে কেমন সুখের কথা বলে , সুখের কথাও; তৃণার সুখই নেই তো দুঃখ আসবে কোত্থেকে। সে ও প্রেমে পড়তে চায়। ফেসবুকে যে কটা ছেলেকে মনে ধরে তারাও কি আর ফাঁকা আছে! অথচ এ মেয়ে যেচে বলার বান্দা এই, তাই একা একাই ক্লান্ত হয় ভেবে ভেবে।

৩)

সেই উচ্চমাধ্যমিকের সময় একটা ছেলের প্রতি কেমন যেন টান অনুভব করত। বাড়িতে সকলেই জানত শৈবালের কথা। কিন্তু সেটা আর এগোয়নি, অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয় প্রেমাভাব। এর পর স্নেহাও প্রেমে পরল, আবিরের সাথে। তৃণা সব জানল, ছোট বোন চুটিয়ে প্রেম করছে। লেজকাটা শেয়ালেরা সকলকেই লেজ কেটে ফেলতে পরামর্শ দেয়, সেই নিয়ম মত স্নেহা দিদিকে প্রেমের পরামর্শ দিতে লাগল; যাতে নিজের পথে দিদি যেন অন্তরায় না হয়। কিন্তু তৃণা বইয়ের সাথেই ডেটিং করতে লাগল, বলল ওই সব ন্যাকামু পেরেম পিরিতি নাকি ওর জন্য নয়। ফলাফল ঈর্ষনীয় রেজাল্ট ও আজকের এই চাকুরী।

দিন কয়েক আগে এক সন্ধ্যাতে, ‘People you may know’ তে সেই শৈবাল রায়চৌধুরীর মুখটা দেখেই বুকে কেমন ছ্যাঁত করে উঠল। আঙুলটা যেন নিজে হতেই বন্ধু রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে তৃণাকে দায়মুক্ত করল। এরপর একটা অদ্ভুত প্রশান্তির সাথে একটা আশঙ্কার দ্বন্দ্ব নিয়ে সে ঘুমিয়ে গেল। ঘড়িতে প্রায় পৌনে দশটা, মানে টানা দিনঘন্টা অঘোরে ঘুমিয়েছে। ফ্যান এসি একই সাথে চলছিল, রাত্রে শীত না লাগলে হয়ত ঘুমটা ভাঙত না। অভ্যাস বসত ফোনটা হাতে নিতেই নোটিফিকেশনে দেখল শৈবাল তার রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করেছে। অমনি হামলে পড়ে শৈবালের রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দেখে আনমনেই হেসে উঠল। প্রোফাইলে তেমন কিছু নেই যদিও, কিন্তু পুরাতন ছবির কোলাজ সাথে বর্তমান ব্যাবসার কিছু চালচিত্রের ছবি।

দু তিনদিন তেমন কিছু হলনা, রোজ সন্ধ্যায় মায়ের সাথের ম্যান্ডেটারি রোজনামচার পর আজ একটু টিভিটা খুলে বসতেই কেমন যেন স্টার জলসা পেয়ে বসল। একটা চ্যানেলে সির্ফতুম হচ্ছে, মনদিয়ে দেখতে দেখতে তৃণা ভাবল নায়িকা যদি ওই সোয়েটার না দিত; তাহলে গোটা প্রেমটাই আধুরা থেকে যেত। মোদ্দা কথা হল, মনের কথাটা বলতেই হবে। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ, তবে যতটা ডিটারমিনেসন নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছিল ততটা মোটেই বর্ষালো না। ইনবক্সে গিয়ে শৈবালের উদ্দেশ্যে একটাই কথা লিখল

-      চিনতে পারছেন?

উফ, সময় যেন আর কাটেনা। বারবার মেসেঞ্জার খুলে রিফ্রেশ করে করে দেখা। আসলে তৃণার হেব্বি প্রেম পেয়ে গেছে। অবশেষে রাত দশটার পর প্রত্তুত্তর এলো।

-      তোর মত এন্টিসোস্যাল বইপোকাকে কে ভুলতে পারে!

-      ভালো আছিস?

-      এই চলছে, তোর খবর কি?

-      কাটছে আর কি।

-      বিয়ে থা কোথায় হল? বর কি করে!

-      ধুর ধুর, কোথায় বিয়ে! তোর খবর কি! কটা ছাপ রাখলি!

-      আরে নাহ, এই তো সবে ইলেকট্রনিক্সের শোরুম দিলাম। একটু সেটেল হয়ে নিই। তার পর ভাবা যাবে। তুই?

-      আমি আর কি! বেঙ্গলে আছি, বারুইপুরের একটা ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার বৃত্তি করে সার্ভাইভ করছি।

-      আরেহ বাহ, লোনটোন লাগলে ম্যাডামের স্মরণাপন্ন হওয়া যাবে আর কি...

-      আয় চলে আয়, এপ্লাই কর

এভাবেই শুরুই হওয়া বন্ধুত্বটা মাস তিনেকের মধ্যেই তৃণার তরফে গভীর প্রেমে পরিণত হয়ে গেল। শৈবালের তরফ থেকে ততটা পজিটিভ না থাকলেও প্রচ্ছন্ন অনুমতি ছিল স্পষ্ট।

৪)

দুর্গাপুজোর ছুটিতে জামসেদপুর ফিরেই শৈবালকে দেখার জন্য মনটা হুহু করে উঠল তৃণার। কিন্তু শৈবাল এতোই ভদ্র ছেলে যে আজ পর্যন্ত ইনবক্সে একটা ছবিও চায়নি, সেখানে তৃণা কেমন করে সরাসরি ডেটিং এর প্রস্তাব দেয়! অষ্টমীর দিন সন্ধ্যায় দুই বোন মিলে ফাটাফাটি সাজ দিয়ে প্যান্ডল হফিং করে বেড়ালো। স্নেহা বুঝতে পারছিল যে দিদির মধ্যে একটা চেঞ্জ এসেছিল, কিন্তু সে চেপে গেল। কিন্তু আশ্চর্যভাবে যার প্রতীক্ষা করছিল সেই শৈবালের মেসেজ এলোনা, অথচ দেখা হবার বাহানা এর থেকে আর ভাল কিছু ছিলনা। রাত্রে ঘরে ফিরে কোনো রকমে ড্রেসটা চেঞ্জ করেই বিছানাতে শুয়ে পরল দুজনেই। স্নেহা টুক করে ঘুমিয়ে গেলেও, তৃণা তখনও নির্ঘুম, অভিমানের চোটে সেই রাত্রে আর অনলাইন আসবেনা বলেই সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু মন কি মানে, উৎসাহের বশে সোজা ভিডিও কল করে বসল। ফোন বেজে যাচ্ছে কিন্তু তুলছেনা, দ্বিতীয়বার ট্রাই করতেই মাথায় আকাশ ভেঙে পরল তৃণার। বুঝতে বাকি রইলনা, শৈবালের রিসেন্ট কয়েকটা ছবি যোগার করে স্নেহাই তাঁর সাথে এই মস্করাটা করে গেছে। আবিরের পক্ষে শৈবালের ছবি যোগার করা মোটেই কঠিন কিছুনা।

রাগে দুঃখে কাওকে কিছু না বলেই নবমীর সকালে, বাক্স প্যাটরা গুছিয়ে কোলকাতার উদ্দেশ্যে বাসেই রওনা দিল। সে যে কি তীব্র মানসিক যন্ত্রণা সে শুধু তৃণাই জানে। বারুইপুরের রুমে এসে শেষের তিনমাসকে চরমভাবে ভুলে যাবার চেষ্টা করতে চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই কিছু নয়, শেষে মাঝ রাত্রে এই ঔষুধ খাওয়া নির্বিচারে।

এতক্ষণে সে নিজে উপলব্ধি করতে পারল, যে স্নেহা তার সাথে এই চালাকিটা করেছে। এটা তো তেমন অন্যায় কিছু সে করেনি, প্রেম নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে চেয়েই হয়ত স্নেহার এই প্রচেষ্টা। ওর আর বিশদে বোঝার প্রয়োজন ছিল। অভিমানিনী তৃষার চোখ লেগে আসে গভীরভাবে। ঘুমের মধ্যেও বিড়বিড় করতে থাকে সে। হঠাৎ তার কানে ফিসফিসিয়ে ওঠে, "কেন আমরা যে এতো ভালোবাসি..!! দেখো কত সোহাগ করেছি তার প্রমাণ তোমার অঙ্গে অঙ্গে।" এ কথাটা শুনেই ধড়মড়িয়ে উঠলো তৃষা। আবছা চোখে সব ধোঁয়া ধোঁয়া চারিদিক। কাউকে দেখতে পেল না। বেড থেকে নামতেই পা কেঁপে উঠলো আর সাথে সাথে এক বিছুটি পাতা যেন সারা গায়ে কেউ বুলিয়ে দিও গেল তৃষার। আবার কানে ফিসফিস, "দেখো কত ভালোবেসেছি। দেখো সারা গায়ে... "." কে কে করে" চমকে উঠে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে সারাগায়ে লম্বা লম্বা ভাবে ফুলে গেছে। কোথাও কোথাও আবার সদ্য গঠিত টিলা বা মালভূমি। যেন চোদ্দ বছর জেল খাটার পর মুক্তিপ্রাপ্ত চুলকানিরা সারা শরীরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আবার কানের কাছে ফিসফিস, "কবে থেকে বাক্সবন্দি হয়ে পড়েছিলাম। কাল অতো যতন করে আমাদের মুক্তি দিলে। তার বদলে এটুকু সোহাগ তো তোমাকে দিতেই পারি সোনা। না গজরেকি ধার না কোয়ি পিয়া সিঙ্গার ... ফিরবি কিতনি সুন্দর হো... তুম কিতনি সুন্দর হো ।" এসব শুনে তৃষার বিপি ফল করলো । যাই হোক আপাতত মৃত্যুর আতঙ্কে নিচেরতলার সেই দিদিমণি ও কলেজ পড়ুয়াদের নামে একটা তীব্র আর্তনাদ দিয়েই অচেতন হয়ে গেল।

বাড়িওয়ালাকে ডেকে নিয়ে নিচেরতলার ওই ভাড়াটেরা মিলে তৃণাকে প্রথমে স্থানীয় ইনফর্মাল মার্কেট বারুইপুর হাসপাতালে নিয়ে গেল। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে তাঁরা কোলকাতা মেডিকেল কলেজে রেফার করল। সকালে জ্ঞান ফিরলে তৃণা নিজের তার জামসেদপুরের বাড়িতে বলতে মানা করল। কারন প্রেমঘটিত বিষয় ও আত্মহত্যা এটেম্পের খবরে অসুস্থ বাবার না আবার এটাক হয়ে যায়। তবে বাড়ি ওয়ালা কাকিমা থেকে শীক্ষিকা দিদিমণি ও পড়ুয়া মেয়েদুটি নিজের নিজের মত করে খুব করে বকে দিল। আর বলল তাঁরা রোজ তৃনার ঘরে আসবে গল্প করতে।

৬)

তৃণা তার পুরাতন ফেসবুক একাউন্ট ডিলিট করে দিয়েছে নতুন একাউন্ট খুলেছে। স্নেহার ওই চরম মস্করা সত্বেও তাকে কিচ্ছুটি বললনা তৃণা।

বড় দিনের ছুটিতে বাড়িতে ফিরে এমন ভাব রাখল যেন কিচ্ছুটি হয়নি, এদিকে স্নেহা যত অপরাধীর মত করে ঘোরে; তৃণা তত সেটা তারিয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে। অবশেষে রাত্রে যখন দুই বোন শুতে এলো, স্নেহা কেঁদেকেটে ক্ষমা চাইতে উদ্যত হলে তৃণা দুম করে ওর দুটো হাত ধরে থ্যাঙ্কস বলতে স্নেহা কেমন যেন ভেবলি হয়ে গেল। সেই রাত্রে তৃণা নাক ডেকে ঘুমালেও স্নেহার চোখের দুপাতা এক হলনা। দোষ সে করল অথচ দিদি রেগে যাবার বদলে কিনা ধন্যবাদ দিল!

সকালএ উঠেও তৃণা ভীষণ ফুরফুরে। চুপিচুপি মাকে বলে দিল যে ও প্রেমে পরেছে। সন্ধায় সেই তাকে বাড়িতে নয়ে আসবে, এবং স্নেহাকে না জানাতে বলে রাখল।

যথারীতি সন্ধ্যায় এসে তৃণার সেই প্রেমিক প্রবর হাজির হতেই সকলে খুশির আনন্দে ভেসে গেলেও স্নেহা সংজ্ঞাহীন হয়ে পরল। সাথে সাথে সকলে ব্যাস্তহয়ে পরলেও ডাঃ শৈবাল রায়চৌধুরী নাড়ি টিপে জানালেন ভয়ের কিছু নেই, হঠাত করে শক খেলে মানুষ এমন অচৈতন্য হয়ে যায়।

পড়ে জ্ঞান ফিরলে বাকিটা শৈবাল নিজেই বলল-

“দশমীর দিন ভোরে হঠাত করে এক বিষখাওয়া রোগী জেলা থেকে রেফারে এসেছে, সারাগায়ে এলার্জীর ফোলা সহ। শৈবাল কোলকাতা মেডিক্যালে ইন্টার্ণসিপ করছে, ভোরের দিকে ডিউটি ডাক্তারের সাথে জুনিয়র হিসাবে ও ই ছিল। মুখটা দেখেই চিনে যায়, যে এ মেয়ে স্কুলের সহপাঠী তৃণা। তারপর চিকিৎসা, প্রেম ও বিবাহের প্রস্তাব। থ্যাঙ্কস স্নেহা। তবে চুলকানিই কিন্তু আমাদের মিলিয়ে দিল। প্রথমে স্নেহার ইয়ার্কির মিথ্যা চুলকানি, পড়ে ওষুধের সাইড এফেক্টের চুলকানি”।

আবার একবার ভীষনভাবে অজ্ঞান হবার চেষ্টা করল স্নেহা কিন্তু এবারে সে শুধুই লজ্জাতে লাল হয়ে গেল, সেই সিরিয়ালের মত করে।

সামনের ফাগুনে তৃণার রিসেপসন বারুইপুরে, নিমন্ত্রন না পেলেও আসতে ভুলবেননা যেন। কি করে জানবেন? কেন ফেসবুক হ্যায় না।

~ সমাপ্ত~

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল, ২০১১

একটা প্রেমের জন্ম


লুঙির নীচ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে আন্ডারপ্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করল লোকটা, পুলিশকে ফোন করছে।

আমি ক্লরোমিন্ট চিবোচ্ছি। এখানে একটা সত্যি কথা বলা প্রয়োজন; আমার মুখ দিয়ে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বেরোয়, বিশেষত যেদিন আমি আলুভাজা দিয়ে ডালভাত খাই। আমার এই বুড়ো বয়সেও ব্যাচেলর অবস্থার জন্য কিছুটা মুখের দুর্গন্ধ অবশ্যই দায়ী। নামীদামী কোম্পানির মাউথওয়াশ থেকে শুরু করে মুখে দারুচিনি রাখা, দিনে পাঁচবার দাঁত ব্রাশ করা, অতিমাত্রায় তেলেভাজা না খাওয়া, গরম দুধ আর ঠান্ডা জল পান থেকে নিজেকে বিরত রাখা..... প্রায় সমস্ত প্রচেষ্টা যখন বিফলে, আমি পাড়ার পীর বাবার কাছে গেলাম, একটা ঘোড়া দিয়ে মানত করলাম আল্লাহ্‌ বা ভগবান, তুমি যাই হও, পরের জন্মে এই মুখে দুর্গন্ধ থেকে আমায় নিস্তার দিও।
লোকটার আন্ডারপ্যান্ট নীল রঙের। নীল রঙের আন্ডারপ্যান্ট সচরাচর চোখে পড়েনা। এখনকার মডার্ন যুগে এক বুড়ো দাদু ছাড়া সবাই জাঙ্গিয়া পরে। যা দু-একটা আন্ডারপ্যান্ট চোখে পড়ে তা সাদা রঙের।

জগৎসংসারে কিছুকিছু লোকজন আছে যাদের চোখমুখ মায়াভরা, মারাত্মক অপরাধ করলেও চোখমুখ দেখে বিশ্বাস করা যায়না এই প্রকৃত দোষী, এক লোকটা তাদের মধ্যে একজন। আমি নিজেও আয়নার সামনে কয়েকবার দাঁড়িয়ে নিজেকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি, চোর ছ্যাঁচড় ছাড়া কিছুই মনে হয়নি কোনওদিন। নিজেকে দেখে একেক সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত মনে হয়, কিংবা পূর্বজন্মে পোলিও রোগাক্রান্ত ছিলাম, ইহজন্মেও তা পূর্ণরূপে আরোগ্যলাভ করতে পারেনি। বারকয়েক এরকমও ভেবেছি নিজেই একজন নারী হলে আমার পুরুষ সত্তার সঙ্গে প্রেম করার ইচ্ছে প্রকাশ করতাম না কখনও। নিজেকে কেমন মুড়ি-চানাচুর খাওয়া উচ্চিংড়ে মনে হয়, অথচ অনেকবার চেয়েছি সন্দেশ খাওয়া বীর পুরুষ হতে।
লোকটি ফোন করল...
- হ্যালো পুলিশ! শীঘ্রই স্টেশনে আসুন, শম্ভু মাতাল জব্বর এক কেস ঘটিয়েছে, মেয়েছেলে ঘটিত কেস।
প্রত্যেকজন মানুষ জীবনে কিছু মহান স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়। একেক সময় স্বপ্নগুলো হারিয়ে যায়, অথবা রাত পেড়িয়ে ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভেঙে যায়। এরকম ঘুমের ঘোরে আমিও দীর্ঘদিন কাটিয়েছি। ছোটবেলাতে যখন বাড়ির সামনের হাসপাতালে ভিন গাঁয়ের লোক এসে লাইন দিত, দাক্তার বাবু টেথিস্কোপের একপ্রান্ত কানে লাগিয়ে হৃতস্পন্দন পরিমাপ করত, আমার দাক্তার হতে ইচ্ছে করত। দাক্তার হয়েছিও বার কয়েক। শরীরের কোনও রোগ দেখা দিলেই ওষুধের ঘর থেকে অ্যান্টি চারটে, প্যারা চারটে নিয়ে খেয়ে নিয়েছি। রোগও সেরে গিয়েছে।

মাথায় হলুদ রঙের হেলমেট দেখে ইঞ্জিনিয়ারও হয়েছি, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। কালবৈশাখীর ঝড়ে যখন লোকজনের রান্নার চালা উড়ে যেত, আমি বাঁশ কেটে নতুন চালা বানিয়ে দিয়েছি, দর্মার বেড়া বানিয়েছি। সেই অর্থে লোকজন এখনও আমায় ইঞ্জিনিয়ার বলেই ডাকে।
একটা সময় ভাবলাম দাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সব হওয়া কমপ্লিট, এবার জীবনমুখী কোনও কোর্স করার প্রয়োজন। তার পর থেকেই আমার ট্রেনে ট্রেনে যাতায়াত। অবনী ঘোষের ডবল অ্যাক্সন বিদ্যুৎ বাম।

আমার হাতে একটা স্ক্রিপ্ট আছে। পড়ে শোনায়.....
মাথার যন্ত্রণা, দীর্ঘদিনের চোট লাগা ব্যথা, মচকা লাগা ব্যথা, বাতের ব্যথা, গিটেগিটে ব্যথা, জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথা মালিশ করবেন, অবনী ঘোষের ডবল অ্যাক্সন বিদ্যুত্ বাম।

আমার জীবনের বিখ্যাত স্বরচিত রচনার মধ্যে এটি শ্রেষ্ঠ। সম্পূর্ণ স্ক্রিপ্ট লিখতে আমার সপ্তাধীক সময় লেগেছে।

শম্ভু মাতালের চারিদিকে লোকজন জড়ো হয়েছে। আমার পাড়াতেই বাড়ি শম্ভুর। সারাদিন বৌয়ের সঙ্গে ঝগড়া লেগেই আছে। আজ বাড়ি থেকে আসবার সময় দেখলাম শম্ভু চিনি দিয়ে মুড়ি ভিজিয়ে খাচ্ছে। এই দরিদ্র সংসারে এমন শান্তি দেখলে মাঝেমধ্যে আমার চোখে জল আসে। শম্ভুর দুঃখের কথাও শুনেছি বারকয়েক, বৌ শিক্ষিত, আশাকর্মী। নিরক্ষর স্বামীর শিক্ষিত বৌ হলে স্বামীর স্বায়ত্তশাসন থাকেনা। শ্বশাসনের অজুহাতে রাজ্যগ্রাসের একতরফা অধীকার থাকে স্ত্রীর হাতে। তেমনই অধীকারে শম্ভুর পারিবারের পারিবারিক প্রধান ওর স্ত্রী। শম্ভু কাঁদছিল। হয়তো নেশার ঘোড়ে। বৌ চায় হিসেব করে চলতে, দুধের হিসেব, গ্যাসের খরচ, বিদ্যুতের বিল, মাসে ক'কেজি চাল লাগছে, সপ্তাহে দুদিন আমিষ, তিনদিন নিরামিষ। সবই ভাল লাগে শম্ভুর, শুধু রাতবিরেত বৌ আর তার জামাইবাবুর নিষিদ্ধ ফোনালাপ কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারেনা। ছেলেটাও বড় হচ্ছে, সেও তো মায়ের সঙ্গে পরপুরুষের সম্পর্কের কথা টের পাবে একদিন। শম্ভুর ভাবতে ভাল লাগেনা এসব। মানুষের যখন কোনও কিছু ভাল লাগেনা, সে মুক্তি চায়, নিস্তার চায়। শম্ভুর বিশ্বাস ওর মুক্তি দেশী মদ এ।

পুলিশ এসেছে, মেলা লোক জড়ো হয়েছে।
বিদ্যুত্ বাম বিক্রি করে রোজকার রুটিরুজি হয়ে যায়। সমস্যা হয় হঠাৎ কোনওদিন শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিলে। একটু জ্বর এলে গা ম্যাজম্যাজ করে, উঠতে ইচ্ছে করেনা। অথচ একদিন কাজে না গেলে চুলোয় হাঁড়ি চাপেনা। আর তাছাড়াও কাজে যাওয়াতেই আমার আগ্রহ বেশি, রোজ আট' টা পঞ্চাশ এর ব্যান্ডেল লোকালের লেডিস কামরার তিন নম্বর সিট। মাঝেমধ্যে মনে হয় আমার বেঁচে থাকার উৎস ওই তিন নম্বরি সিট টা। হলুদ চুড়িদার, কানে দুটো গোলাকার দুল, কুচফলের পাতার মত ছোট্ট নাকের নথ,
আর ভ্রুবিভঙ্গের মাঝখানের ছোট্ট সাদা টিপ, এই টিপের নামে আমি লিখেছি আমার জীবনের দস্তাবেজ।

শম্ভুর আসল বাড়ি কোথায় আমার জানা নেই, তবে বিয়ের পরপরেই আমাদের পাড়াতে চলে আসে। তখন সংসারের চাহিদা কম ছিল, শান্তি ছিল। বিয়ের প্রথম প্রথম সব স্বামী স্ত্রী একে অপরকে পেয়ে পূর্ণপরিতৃপ্ত হয়, তারপর ধীরে ধীরে শারীরিক, মানসিক আকর্ষণ কমতে থাকে। এক সময় মনে হয় সংসারে অশান্তি ছাড়া আর কোনও কিছু অবশিষ্ট নেই। শম্ভুর এখন সেই অবস্থা।
আজ বাজার খারাপ, ভাল বিক্রি হয়নি। কিছুটা মন মরা হয়ে বসে আছি। কাল চাল কিনতে হবে, মুসুরির ডাল, হলুদ, সর্ষের তেল, চা, চিনি সবই ফুরানোর মুখে। মুখের ক্লরমিন্ট সাদা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে, ফেলার জন্য এগিয়ে গেলাম।
ওভারব্রিজে হইচই শুরু হয়েছে। কেউকেউ বলছে ব্রিজ থেকে ছুড়ে ফেলে দাও মাল টাকে, শালা মাতাল কোথাকার!

না! ব্যাপারটা আসলে কী জানা দরকার। বিদ্যুত্ বামের ব্যাগটা হাতে নিয়ে আমি ওভারব্রিজের দিকে এগিয়ে গেলাম।

শম্ভুকে সবাই মিলে ধরে 'যেমন খুশি মারো' খেলছে। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে একজন কম বয়সী যুবা শম্ভুর নাকে ঘুষি চালালো, হয়তো কোনও পুরনো শত্রুতার প্রতিশোধ অথবা কাউকে মেরে হাতের সুখ পাওয়া যায় তাই মারা। নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে টুপটাপ করে মাটিতে পড়ছে। আমি বাঁচানোর চেষ্টা করতে গেলে দু-এক ঘা আমার পিঠেও পড়লো। শম্ভু সত্যিই মহাপাপী, সে মহা অপরাধ করেছে। দুর্গার ভিক্ষার থালা থেকে পয়সা চুরি করেছে। দুর্গা দীর্ঘদিন ভিক্ষা করছে এই স্টেশনের ওভারব্রিজে, শেষমেশ ওর বাটি থেকে পয়সা চুরি করল শম্ভু মদ খাওয়ার জন্য!

মারতে মারতে একসময় মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায়। শম্ভু স্টেশনে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, চোখ মুখ দিয়ে গড়গড় করে রক্ত বেরোচ্ছে। একটা কুকুর এল, শম্ভুর নাকমুখ শুঁকে চলে গেল। কুকুরও জানে শম্ভু ঘৃণার কাজ করেছে, ওর প্রতি সমবেদনা জানানোর কোনও মানে হয়না। একমাত্র দুর্গা কষ্টে থাকতে পারলো না বোধহয়। মেয়েদের মনে মা বাস করে।
- দাদাবাবু! শম্ভুকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
মানুষ তখনই বেশি আদরযত্ন পায়, যখন সে অসুস্থ অথবা মৃতপ্রায়। আমি নিজের কথা ভুলে শম্ভুর জন্য এক গ্লাস দুধ, দুটো পাউরুটি আর একটা ডিম কিনে নিয়ে গেলাম। ওর বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে।
রাত তখন আট টা, আমি হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে একটা মেজদার বিড়ি ধরিয়েছি, শম্ভুর বৌ এসে হাউমাউ করে কান্না করছে, মা কাঁদছে দেখে ওর ছেলেও সুর মিলাচ্ছে।
- দাদাকে বাঁচানোর জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
হাসপাতালের আলো হলুদ রঙের চুড়িদারের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে। সাদা টিপটা চকচক করছে, কখনও মনে হচ্ছে তারাখশা। এই মুহূর্তে একটাই প্রার্থনা করতে ইচ্ছে করছে......
"চির সখা হে, ছেড়োনা মোরে ছেড়োনা।"

হাসপাতালে অনেক শিশুর জন্ম হয়, অথচ একটা প্রেম কিভাবে জন্মাতে পারে? নিজের চোখকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা। তবে কী স্বপ্ন দেখছি। নিজের গালে ঠাটিয়ে এক থাপ্পড় মারলাম, প্রচণ্ড লাগল সাথেসাথে হলুদ চুড়িদার - সাদা টিপ খিলখিল করে হেসে উঠল। মেজদার বিড়ি সচরাচর খাইনা আমি, মেজদার বিড়ি বড্ড কড়া, আজ নেশা হয়ে গিয়েছে বোধহয়।

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...