ইতিহাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইতিহাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদঃ সন্ত্রাসী তৈরির আঁতুড়ঘর

 


লেখকঃ রূপ ভট্টাচার্য

ন্যুরেমবার্গ দেখলাম, অবশ্যই সিনেমাটা, জায়গাটা গিয়ে দেখার সৌভাগ্য হয়নি এখনও। ডিসক্লেইমার দিতে হয় কারণ অনেকে এখন এতটাই ছেলেমানুষ যে ভেবে বসবে, আমি সত্যিই সত্যিই গেছি জায়গাটায়, ঠিক যেভাবে ভেবে নেয় তৃণমূল বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ছে।

এই জিনিস আদিকাল থেকে হয়ে আসছে। ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ সহ ইউরোপের তাবৎ বড় শক্তি মনে করেছিল জার্মানিতে নাৎসিদের উত্থান তেমন সমস্যার নয়, মনে করেছিল যে হিটলার, সোভিয়েত দেশ আক্রমণ করলে ওদেরই ভালো, নবজাতক সমাজতন্ত্রের অঙ্কুরেই বিনাশ হবে, শুরু হয়েছিল অ্যাপিসমেন্ট পলিসি বা বাংলা মাধ্যমের ইতিহাস বইতে লেখা “তোষণনীতি”। জার্মানির মধ্যে যেটা হচ্ছিল সেটা আরো ভয়ানক। ইউরোপের অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে যে দম ফেলার সময়টুকু থাকে, দেশের মধ্যে তো সেটা থাকেনা তাও তৎকালীন জার্মানির কমিউনিস্ট, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট, সোস্যালিস্ট সবাই নাৎসিদের এই উত্থানকে তুচ্ছজ্ঞান করেছিল এটা জেনেও যে, এই শক্তি ক্ষমতায় আসলে প্রথম আক্রমন হবে তাদেরই উপর। যে মার্ক্সীয় বিশ্বদর্শন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে, যার মাধ্যমে সমাজ বিশ্লেষণ মোটামুটিভাবে অভ্রান্ত সেই তত্ত্বের দিকপাল তাত্ত্বিকেরা সেই সময়ে জার্মানিতে ছিলেন, তাও তারা ধরতে পারেননি কোন উচ্চকোটির অপশক্তি তার সর্পিল দেহ ঘষে ঘষে, অতি সন্তর্পনে জার্মান রাষ্ট্রযন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে।

মানুষ ভুল করে কিন্তু মানুষই সেই ভুল শুধরে নিয়ে এমন একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয় যে নতুন ইতিহাস রচিত হয়। নাৎসি শাসিত জার্মান রাইখের বিধ্বংসী সেনার নাম ছিল ওয়ারমাখ্ট, যাদের যুদ্ধনীতি ব্লিৎজক্রিগ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে ছিল একটা দুঃস্বপ্নের নাম। জার্মান প্রযুক্তির বলে বলীয়ান প্যানজার (যুদ্ধ ট্যাংক) বাহিনীর প্রবল গোলাবর্ষণ, সাথে লুফ্তওয়াফার (বিমান বাহিনী) আকাশ বাতাস ফালাফালা করে দেওয়া গুলিবর্ষন এবং তার পরে প্রায় সাথে সাথেই ইনফ্যান্ট্রি অ্যাসল্ট, এই হচ্ছে ব্লিৎজক্রিগ যুদ্ধ পদ্ধতি। 

এই অজেয় সেনা নিয়ে, একের পর এক ইউরোপের স্বাধীন দেশ দখল করে, ইংল্যান্ড ফ্রান্সকে পায়ের নিচে চেপে, হিটলার আস্তে আস্তে এগোচ্ছিল তার স্বপ্নের থার্ড রাইখের (জার্মান সাম্রাজ্য) দিকে, স্বপ্নের বেলুন ফাটল পোল্যান্ড ক্রস করার পর। অতি বড় কনজারভেটিভও ঢোক গিলে স্বীকার করবে যে নাৎসি দানবকে কে কবর চেনালো, স্বীকার করবে সে হল সদ্যজাত USSR, সোভিয়েত দেশ, লেনিন স্টালিনের সোভিয়েত। যে কমিউনিস্টদের খুন করে, হিটলার, গেরিং, হিমলার, গোয়েবেলসদের ক্ষমতা দখল, সেই কমিউনিস্টদের সোভিয়েত লাল ফৌজ বার্লিন ধ্বংস করে ভাঙা রাইখস্ট্যাগের চূড়ায় উড়িয়ে দিল লাল ঝান্ডা, ঠুকে দিল শেষ পেরেক নাৎসিদের কফিনে। ইতিহাস তার বদলা নিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে কোনো সিনেমা, বা ডকুমেন্টরি বানানোর সময় পুঁজিবাদী মিডিয়াকে একটু বেশি দক্ষতার সাথে কাজ করতে হয়। তারা ভালোই জানে, হিটলার, মুসোলিনি, তোজো ইত্যাদি সবার জন্ম ওদেরই গর্ভে কারণ সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের শেষ স্তর। নিজের দেশে জিনিস বেচা যাচ্ছেনা, ইকোনমি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে, সেটা কাটানোর জন্য প্রাচ্যের কৃষিপ্রধান জাতিগুলোকে জোর করে নিজের কন্ট্রোলে নিয়ে আসা। কে করেনি এই কাজ? ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন সবাই উপনিবেশ করেছে, লুঠ করেছে অন্য দেশ। এই সব দেশ মিলিত ভাবে বা একা একাই যথেষ্ট স্বেচ্ছাচার করেছে, খুন, ডাকাতি করেছে, যার ফলে ঘুমন্ত দানব জেগে উঠেছে। তাই যুদ্ধে খেলাটা ঘুরেছে যখন সেই দানব এসে দাঁড়িয়েছে স্টালিনগ্রাদে, মুক্ত মানুষের ফৌজের সামনে, যাদের কিছু হারানোর নেই, যারা মানবিকতার সবচেয়ে পবিত্র আবেগে একজোট হয়েছে আর সেটা হল ভালোবাসা। আচার্য ব্রহ্মানন্দ পারেনি বিক্রমের দিকে তাকাতে কারণ সে ছিল নিষ্পাপ, অজাতশত্রু। এই জিনিস খুব ভালো করেই জানে পুঁজিবাদী মিডিয়া, তাই এইসব সিনেমায় যখন নিজেদেরকে হিরো হিসেবে দেখাতে যায়, প্রাণপণ কৌশলে কয়েকটা জিনিস বাদ দেয়।

ন্যুরেমবার্গ দেখে ভালো লাগলো, কারণ গোটা সিনেমাটা যে ন্যারেটিভের উপর দাঁড়িয়ে অর্থাৎ, মানুষের ভুলেই দানব তৈরি হয় আর সেই মানুষই আবার ভীষণ গোলায়েথের সামনে ক্ষুদ্র কিন্তু মূর্তিমান শমনরূপে ডেভিড হয়ে এসে দাঁড়ায়, সেটা তৈরিই হয়েছে এক নবজাতক সমাজতন্ত্রের অনুগ্রহে। ভালো লাগার একটা কারণ হচ্ছে, পরিচালক থেকে প্রযোজক এই বিষয়টা ভালো করেই জানেন যে যখন বিচারক জ্যাকসন জুরি প্যানেলের দিকে ফিরে বলছেন যে সমস্ত দেশকেই আগ্রাসনের রাজনীতি থেকে সরে আসতে হবে, আইনের শাসনের প্রতি দায়বদ্ধ হতে হবে তখন প্যানেলে বসা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিনিধি মনে মনে হয়ত বা মুচকি হাসছেন কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন একমাত্র মিত্র শক্তি যারা নিজেদের সাম্রাজ্য বাঁচানোর দায় নিয়ে যুদ্ধে যুক্ত হয়নি, প্রকৃতপক্ষেই হয়েছিল পিতৃভূমি রক্ষার দায় নিয়ে আর ফ্যাসিবাদের হাত থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করার জন্য। 

ছবির প্রযোজক এটাও জানেন, গত শতাব্দীর শেষ থেকে পুঁজিবাদ, বিশ্বকে একমেরু করার জন্য কি পরিমাণ অর্থ আর শ্রম ব্যয় করেছে। সোভিয়েত সহ প্রায় সব সমাজতান্ত্রিক দেশে ঝামেলা করিয়ে, গোলাপী বিদ্রোহ, গুমখুন, বেআইনি আন্তর্জাতিক ট্রায়াল ইত্যাদি সব রকমের পদ্ধতি ব্যবহার করেছে যাতে সমাজতন্ত্রের বদলে বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে স্থাপন করা যায়। আজকের দিনে এই একমেরু দুনিয়া আরেকটা দানবের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিণত হচ্ছে এবং তাকে ঠেকানোর জন্য আর কোনো সোভিয়েত বেঁচে নেই। জাস্টিস জ্যাকসন সিনেমায় বলছেন, আমরা কোর্ট মার্শালের বদলে ট্রায়াল করছি কারণ আমরা চাইনা আমাদের কোনো ভুলে এই অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি হোক। 

জ্যাকসন উকিল মানুষ, জানতেন না যে আইনি ট্রায়াল এই রোগের একটা তুচ্ছ সাময়িক উপশম মাত্র। যে বিশ্ব অন্যায় অন্যায্যতাকে মান্যতা দেয়, বৈষম্যকে ভবিতব্য হিসেবে প্রতিপন্ন করে, বড়লোকের হয়ে কাজ করে, সেই বিশ্বে বারবার আর্থসামাজিকভাবে বিপর্যস্ত, বিপথুমান, অতি ক্ষুব্ধ যুবক হিটলার হিসেবে তৈরি হবে।


শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

সোনার দাম কেন বাড়ছে?


 সোনার দাম কেন বাড়ছে?


🔰 সোনার দাম কেন বাড়ছে? 🔰


এর কারণ পুরোটাই অর্থনৈতিক এবং আমেরিকান ডলারকেন্দ্রিক। কোনো জিনিসের দাম নির্ভর করে ‘ডিমান্ড আর সাপ্লাই’ এর সামঞ্জস্যতার উপরে। চলুন সংক্ষেপে একটু ব্যাখ্যা করা যাক।


বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে, সমগ্র পৃথিবীর সোনা এক জায়গায় করলে সেটা ২৩ ঘনমিটার জায়গার মধ্যে সবটুকু চলে আসবে। মানে একটা মাঝারি সাইজের আলুর কোল্ডস্টোরের মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত সোনা, হ্যাঁ সমস্ত সোনা ঢুকে যাবে। সোনা যেহেতু গাছে ফলে না বা ফ্যাক্টরিতে প্রোডাকশন করা যায় না, তাই সোনার সাপ্লাই বা পরিমাণ নির্দিষ্ট বা ধ্রুবক। গোল্ডমাইন থেকেও উৎপাদন অতি নগণ্য এবং ভীষণ ব্যয় বহুল; বাকিটা কেবল হাতফেরৎ হয়। সুতরাং, সভ্যতার শুরু থেকে আজ অবধি সোনার পরিমাণ খুব বেশি বাড়েনি, আগামীতেও বাড়বে সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ বা নেই। তাহলে এই মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ- ডিমান্ড বৃদ্ধি।

 

এখানেই প্রশ্ন, রাতারাতি কে এই ডিমান্ড বাড়ালো? আমি আপনি কি বিপুল সোনা কিনেছি? উত্তরটা হলো- না। তাছাড়া আমরা যদি কিনতামও, সেই দু-দশ ভরি কেনাকাটায় দামে অতি সামান্য হেরফের হতো, যেমনটা গত শতাব্দীতে হতো। স্বাভাবিক বাজারে কেউ যেমন কিনছে, তেমন আরেক জন আবার বিক্রিও করছে, এই ভাবেই বাজারের স্থিতাবস্থা বজায় থাকে। কিন্তু বর্তমানে একটা শ্রেণি রয়েছে যারা সোনাটা কিনে মজুদ করে ফেলছে, সেটা পুনরায় আর বাজারে ফেরৎ আসছে না, ফলতো অবশিষ্ট সোনাটুকুর জন্য অন্যজন অনেক বেশি দাম অফার করছে; এভাবেই দাম বাড়ছে।

 

তাহলে কারা সোনাটা কিনে মজুদ করছে? এটা জানতে গেলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘ব্রেটন উডস’ সিস্টেমের নামে শয়তানি করে বিশ্বের প্রায় ৭৩% সোনা আমেরিকা তাদের দেশে নিয়ে চলে যায় নানান ছলচাতুরি করে, পরবর্তীতে যা তারা আত্মসাৎ করে দেয়। কীভাবে নিয়ে গিয়েছিল তা লিখতে বসলে টন টন কাগজ লাগবে, এত বড় সেই শঠতার ইতিহাস। আগামীতে কখনও সে নিয়ে লেখা যেতেই পারে, শুধু এটুকু জেনে রাখুন সেই সোনার পরিমাণ প্রায় সাড়ে আট হাজার টন, কল্পনাতীত। পরবর্তীতে বাকি দেশগুলো যখন তাদের সোনা ফেরৎ চায়, তাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের বন্দুকের ডগায় রেখে, সেই সোনার বিনিময়ে কাগুজে বন্ড ইস্যু করে আমেরিকা- বিনিময়ের ‘ইনস্ট্রুমেন্ট’ হিসাবে’, একেই আমরা ডলার বলে চিনি।


আমাদের দেশের টাকাতেও লেখা থাকে- "চাহিবা মাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে"। অর্থাৎ টাকা একটা সরকারি হাতচিঠি বৈ কিছু নয়। নোটের নিজস্ব কোনো মূল্য নেই, রাষ্ট্র নিজে জামিনদার থেকে ওই ‘টাকা’ নামের কাগজটাকে আসল সম্পদের প্রতিরূপ হিসাবে হিসাবে মূল্যবান করে তোলে। এই হিসাবে দেশে যত টাকা আছে, তত পরিমাণ সম্পদ তথা সোনা/রূপা থাকা উচিৎ। কিন্তু তা নেই, কারণ সোনা আছে আমেরিকার কাছে, তার পরিবর্তে আমেরিকা ডলার দিয়ে রেখেছে, ডলারই আমাদের সহ গোটা বিশ্বের প্রতিটা দেশের সঞ্চিত সম্পদ। কারণ ডলার ছাড়া কোনো দেশ জ্বালানি তেল কিনতে পারবে না কোথাও থেকে, এই জন্যই ডলারের অপর নাম পেট্রোডলার।


পেট্রোডলার কীভাবে শুরু হয়েছিল? ১৯৭৩-১৯৭৪ সৌদির মোল্লাদের সাথে আমেরিকা একটা চুক্তি করে। সৌদি আরব তার দেশের 'পেট্রোল/ডিজেল' শুধুমাত্র আমেরিকান ডলারের মাধ্যমে বিক্রি করবে, অন্য কোন কিছু বিনিময় মূল্য হিসাবে দিলে, সৌদি সরকার তাকে তেল দেবে না। এর বিনিময়ে আমেরিকা সৌদি আরবকে অস্ত্রশস্ত্র, প্রযুক্তি ইত্যাদি দিয়ে সামরিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দেবে। যে কারণে গত ৫০/৬০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র অশান্তির আগুন জ্বললেও সৌদিতে নূন্যতম কোনো অশান্তি হয়নি। কারণ অশান্তি যে পাকায়, সেই আমেরিকাই সৌদির পাহারাদার, অশান্তি করবে টা কে!


অন্যান্য পেট্রোলিয়াম সমৃদ্ধ দেশ যারা এই ডলার ভিন্ন অন্য মুদ্রা কিম্বা সোনার বিনিময়ে তেল বিক্রি করতে গিয়েছিল, তাদের সকলকে আমেরিকা শেষ করে দিয়েছে নানা বাহানাতে। সেটা লিবিয়ার গাদ্দাফি হতে পারে, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন হতে পারে কিংবা বর্তমানে ভেনেজুয়েলার মাদুরো; চোখের সামনে এইসব জ্যান্ত উদাহরণ রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধেও এতো ক্ষোভের মূল কারণ এটাই, তারা ডলার ছাড়া তেল বেচছে ইন্ডিয়ান রুপি, রাশিয়ান র‍ুবেল ও চীনা ইউয়ানে।


আজকের দুনিয়ায় জ্বালানি তেল ছাড়া গোটা সভ্যতা অচল, সুতরাং প্রতিটা দেশকে তেল কেনার জন্য ‘ডলার’ কিনতেই হতো আমেরিকার কাছ থেকে, পাশাপাশি মজুদও রাখতে হতো। যেহেতু বিশ্বের সকলের কোষাগারে ডলার মজুদ আছে ‘তেলের’ ক্রেতা-বিক্রেতা নির্বিশেষে, অচিরেই বিশ্বের যেকোনো দুটো দেশের নিজেদের মাঝের ব্যবসা-বাণিজ্যও ডলারের মাধ্যমেই হতে শুরু করে দিয়েছিল। এভাবেই ডলার বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিল, যুদ্ধ বোমা বন্দুকের ভয় দেখিয়ে পেট্রোডলারের মাধ্যমে। এতে করে বিশ্বের যে কেউ যে কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবসা করুক, আমেরিকা সেখান থেকেই একটা কাটমানি খেতো।


গত পাঁচটা দশক ধরে আপনার কাছে যে ধরনের মুদ্রায় থাক কিংবা সোনাদানা মোহর হিরে জহরত, কোনো কিছু দিয়ে আপনি তেল কিনতে পারেননি কিংবা বিনা ডলারে একটিও বৈদেশিক বাণিজ্য করতে পারেননি। এই সবকিছু সোনাদানা হিরে জহরতের বিনিময়ে আপনাকে আমেরিকার কাছ থেকে ডলার কিনতে হতো। আমাদের সরকার আমেরিকাকে সোনা দিত আর আমেরিকা সেই সোনার বিনিময়ে ডলারের নামে কাগজ ছাপিয়ে দিত। ফলত এতদিন সোনার থেকেও ডলার বেশি মূল্যবান ছিল।


মজার কথা হলো, ২০২৪ জুনের ৯ তারিখ সৌদির সাথে করা সেই পেট্রোডলার চুক্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেটাকে টেনে দেড় বছর আনঅফিসিয়ালি চালাচ্ছিলো। কিন্তু এই জানুয়ারির ৯ তারিখ সৌদি আরব এই চুক্তিকে নবায়ন করতে মানা করে দিয়েছে, সরকারিভাবে। এতেই আমেরিকা পড়েছে তাদের সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর অস্তিত্ব সংকটে, ওয়াশিংটন/নিউইয়র্কে হাহাকার পড়ে গেছে, তারা মরিয়া ক্ষ্যাপা কুকুর হয়ে উঠেছে ইরাণে যুদ্ধ লাগাবার জন্য, ভেনেজুয়েলা বা গ্রীনল্যান্ড দখলের জন্য। কে বলতে পারে, ইরানের নামে বোমাবারুদ জড়ো করে আসলে যুদ্ধটা সৌদিতেই না লাগিয়ে বসে উন্মত্ত আমেরিকা।


ঠিক আজকের দিনে গোটা বিশ্বের অর্ধকের বেশি পেট্রোলিয়াম বাণিজ্য তথা জ্বালানি তেল বিক্রি হচ্ছে স্থানীয় মুদ্রায় বা পণ্য বিনিময় প্রথার মাধ্যমে। ধরা যাক ভারত, আমরা তেলের দাম সৌদি আরবকে রুপিতে পেমেন্ট করছি অথবা চাল, আনাজ, শস্য কিংবা কয়লা দিচ্ছি। পাশাপাশি শ্রীলংকা সিংহলি মুদ্রার বিনিময়ে তেল কিনছে, চীন তাদের মুদ্রা ইউয়ানে কিনছে। কারো কাছে ডলারে কেনাটা আজ আর বাধ্যতামূলক নয়, ফলত ডলার রোজ একটু একটু করে গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে মূল্য হারিয়ে।


যেমন আমাদের দেশে ৫০০/১০০০ টাকার নোট দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বাতিল করে দিতেই সেগুলো বাজে কাগজে পরিণত হয়েছিল, রাশিয়ার ক্ষেত্রেও এমনটা হয়েছে। আমেরিকা রাশিয়া দ্বন্দ্বের কারণে, রাশিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে সঞ্চিত ডলার ছিল, সেগুলোকে আমেরিকা রাতারাতি বাতিল করে দিয়েছে, যেমনটা গত সপ্তাহে ইরানের সাথেও করেছে। আমেরিকার এই গুন্ডামি দেখে বিশ্বের বাকি দেশগুলোর কপালে ভাঁজ পড়েছে। আমাদের যেমন রিজার্ভ ব্যাঙ্কে ডলার মজুদ আছে, প্রতিটা দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্কেও তাই আছে, কিন্তু আমেরিকার এই দাদাগিরির ভয়ে আজকের দিনে প্রতিটা দেশ শঙ্কিত, এমনকি তাদের মিত্র ইউরোপও ব্যতিক্রম নয়।


তাই পেট্রোডলার চুক্তি শেষ হবার কিছু আগে থেকেই ডলার ছেড়ে দেওয়া বা নতুন করে ডলার না কেনার ধুম পরে গিয়েছিল বিশ্বজুড়ে, ২০২৪শে চুক্তি শেষ হতে সেটা মহামারীর আকার ধারণ করেছে। নতুন করে কেউ আর ডলার কিনছে না, বরং যেগুলো আছে সেগুলোও ছেড়ে দিচ্ছে। এদিকে ডলারের বিপরীতে বিকল্প কোনো মুদ্রা বৈশ্বিক ভরষা যোগাড় করে উঠতে পারেনি, ব্রিকসও নতুন মুদ্রা বাজারে আনতে পারেনি। ফলত প্রতিটা দেশ ডলারের বদলে, আসল সম্পদ ‘সোনা’ মজুদ করছে, তাদের দেশজ সঞ্চয় ভান্ডারের জন্য।


সুতরাং, গোটা বিশ্বজুড়ে প্রতিটা দেশ সোনা মজুদের দিকে নজর দিতেই বাজার থেকে সোনা কমতে শুরু করেছে এবং পরিমাণ যত কমতে থাকছে, অবশিষ্ট সোনার দাম তত চড়তে থাকছে। পৃথিবীর প্রতিটা দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, নিজেদের সামর্থ্য মত টন টন সোনা কিনে মজুদ করছে। যেমন আমাদের ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কে ৮৮০ টন সোনা মজুদ রয়েছে, যা দৈনিক আরও বাড়াচ্ছে আমাদের সরকার। ডলারের এই পরিস্থিতিতে শেয়ার মার্কেটও টালমাটাল, আমেরিকা যখন তখন যার তার উপরে স্যাংশন/ট্যারিফ লাগিয়ে দিচ্ছে, সর্বক্ষণ যুদ্ধ পরিস্থিতি। তাই বড় শিল্পপতি, পুঁজিপতিরাও সেফ ইনভেস্ট হিসাবে সোনাতে লগ্নি করছে। কারণ সোনার দামের উপরে আমেরিকা বা অন্য কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণ নেই, সোনা প্রতিটা দেশে প্রতিটা যুগে প্রতিটা সাম্রাজ্যে প্রতিটা ব্যক্তির কাছে সম্পদ হিসাবে মুল্যবান।


পদার্থ বিজ্ঞান বলছে- পতনশীল বস্তুর গতি সময়ের সাথে সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়, মার্কিন ডলারের পতনও রোজ বাড়বে। ডলারের এই পতনের সাথে সোনার মূল্য বৃদ্ধিও সমানুপাতিক; উল্টোটাও সঠিক- সোনার মূল্য বৃদ্ধির সাথেও ডলারের পতন সমানুপাতিক। এই যে ডি-ডলারাইজেশন পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে বিশ্ব ব্যবস্থা যাচ্ছে, এটা আমেরিকাকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে, যে কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প মাতালের মতো আচরণ শুরু করেছে।


সোনার এই মূল্যবৃদ্ধি আসলে পাঁচ লাখে থামবে না দশ বিশ লাখে লাফ দেবে, সেটা আজকের দিনে বলা অত্যন্ত মুশকিল। আমেরিকা তার সঞ্চিত সোনা বাজারে না ছাড়া অবধি সোনার দাম রোজ লাফ দিয়ে বাড়তেই থাকবে। তবে, আমেরিকাও যখন নিজেদের সোনা বিক্রি করতে লাগবে, তখন সে উচ্চ মূল্যেই বিক্রি করবে, আর এটা তাকে করতেই হবে। যে হারে গোটা বিশ্ব ডলারকে পরিত্যাগ করছে, সেই হার চলতে থাকলে দু'এক মাসের মধ্যে আমেরিকাকে তাদের রিজার্ভে থাকা ওই সাড়ে আট হাাজার টন সোনা ধীরে ধীরে বাজারে ছাড়তে হবে। এছাড়া আমেরিকার বিন্দুমাত্র বিশ্বাসযোগ্যতা নেই বাজারে, তাই ডলার নামের অস্ত্র দিয়ে বিশ্বকে লুট করার দিন তার আর ফিরবে না।


আমেরিকা ৫০ টা ভাগে ভাগ হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা, যে কোনোদিন ভোর বেলায় উঠে শুনবেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আর নেই। অস্ত্র ছাড়া আমেরিকার নিজস্ব কোনো উৎপাদন নেই, তারা বিশ্বের নানা দেশ থেকে মালপত্র নিয়ে এসে বড়জোর এ্যাসেম্বল করে কিম্বা অন্যের পণ্য মার্কেটিং করে নিজেদের লোগো লাগিয়ে। আমেরিকার রিজার্ভ সোনা বাজারে আসতে শুরু করলেই তাদের ‘ফোলানো ফাঁপানো’ কোম্পানিগুলো মুখ থুবড়ে পড়বে, শেয়ার বাজার রাতারাতি ক্রাশ করে যাবে।


আমেরিকাতে গৃহযুদ্ধ লেগে যাওয়া সময়ের দাবী। তবে সেটা আটঁকাতে হলে আমেরিকাকে রাতারাতি অন্যত্র যুদ্ধ লাগাতেই হবে, যাতে অস্ত্র বিক্রি করতে পারে। নতুন একাধিক দেশ খুঁজতে হবে যেখান থেকে সম্পদ লুঠ করতে পারে, এবং ডলারকে পুনরায় বিশ্ব বানিজ্যের মুখ্য ও একমাত্র বিনিময় মুদ্রা রেখে দেওয়ার বিনিময়ে কাটমানি খেতে পারে। আর এগুলোর তিনটেই একসাথে করতে হবে, একটাতেও ব্যর্থ হলেই খেল খতম। কিন্তু আজকের বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীন ও রাশিয়া~ আমেরিকার বিরুদ্ধে থাকা সমশক্তির পরাশক্তি, তাই গেলাম আর জয় করলাম- এমন একতরফা হওয়ার নয়। অতি শীঘ্র অতীতের স্প্যানিশ সাম্রাজ্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, উসমানীয় সাম্রাজ্যের মতো ইতিহাসের এক কোণে আস্তাকুঁড়ে ঠাই পাবে ‘প্রতারক ও লুঠেরা’ মার্কিন পশ্চিমা সভ্যতা।


আপনার বাজারে সোনার দাম বাড়ার এর সাথে আমেরিকার পতন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত বা বলা ভালো দুটোই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তবে সোনার দাম আগামী ৫/৭ বছর আর কমছে না, বাড়তেই থাকবে, বাড়তেই থাকবে, যতক্ষণ না সম্পদ জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়।


রবিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২৫

অনুপ্রবেশের নেপথ্যে- ২

 


পর্ব~ ২

চলুন বিস্তারিতভাবে দেখে নিই কেন বাংলাদেশী বা নেপালিরা এদেশে ঢুকে আসে। 

১) ভারতের মতো “SC/OBC রিজার্ভেশন সিস্টেম” বাংলাদেশে/নেপালে কোথাও নেই। এই কোটা সিস্টেমে একবার ঢুকে যাওয়া মানেই দেশের ৬০% জনগণকে টুপি দিয়ে বঞ্চিত করে টপকে, নিজেদের আগামী প্রজন্মকে শিক্ষা, চাকরি সহ প্রায় সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে রেখে দেওয়া গেলো। এই কারনে শেষ ৩০ বছরে এদেশে আসা ৯৯% বাংলাদেশী ও নেপালী হিন্দুরা SC/OBC এই দুটোর একটাতে ঢুকে রয়েছে। শুধু আমাদের দেশের অর্থনীতি, সমাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কাজের গুণগত মান এবং সংখ্যা সুযোগ বেশি বলে লোক আসছে না। ওই সার্টিফিকেটের লোভেও বহু লোক ঢুকেছে। নব্য বাঙাল আর সে জেনারেল কাস্ট- এমন উদাহরণ বিরল। এদেশে বাঙাল কেন আসবেনা?

২) বিনামূল্যে চিকিৎসাঃ নেপালে এমন কিছুই নেই। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারদের জন্য সরকারী ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ফ্রি বা প্রায় ফ্রি চিকিৎসা দেওয়ার আলাদা সরকারি ব্যবস্থা আছে। এর বাইরে নির্দিষ্ট কিছু সরকারী হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে আউটডোর টিকিট ও খুব অল্প ফি এর বিনিময়ে ডাক্তার দেখানোর পরিষেবা আছে, কিন্তু তার মান যে ঠিক কতটা নিকৃষ্ট, সেটা আমাদের কোলকাতার বাইপাসের ধারে বেসরকারী হাসপাতাল গুলোতে গেলেই বুঝে যাবেন বাংলাদেশী রোগীদের ভিড় দেখে। কোনো মৌলিক ওষুধ বা খুব সাধারণ ল্যাব টেস্টও বাংলাদেশে সরকারীভাবে দেওয়া হয়না, কোথাও কখনো শিবির করে পরিষেবা দিলেও তার যা মান, তাতে রোগ সারার বদলে বেড়ে যায়। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সেভাবে কোনো সামগ্রিক টিকাকরণ কর্মসূচী নেই তাদের। এদিকে আমাদের ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, গ্রামীণ, মহকুমা, জেলা সদর হাসপাতাল হয়ে কোলকাতার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সিস্টেমে নানান দুর্নীতির পরেও, বাংলাদেশের তুলনাতে ধ্বন্বন্তরী চিকিৎসা বলাই যায়। এর সাথে ভেলোর, পুত্তাপুত্তির মত দাতব্য হাসপাতাল গুলোতে পৌঁছে যেতে পারলে তো সান্ধ্য টিফিনের খরচাতে মহাব্যাধির চিকিৎসা হয়ে যায়। এদেশে নেপালি-বাঙাল অনুপ্রেবশকারী আসবেনা তো কোথায় যাবে?

৩) ফ্রি শিক্ষাঃ বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা ফ্রি ও বাধ্যতামূলক, কিন্তু বাস্তবে খরচ পুরোপুরি শূন্য থাকে না। সেখানে ভারতে উচ্চমাধ্যমিক অবধি সেই অর্থে কোনো টিউশন ফি’ই নেই সরকারি স্কুলে। সামান্য ভর্তি ফি, পরীক্ষার ফি, ব্যাস। প্রাইমারিতে ইউনিফর্ম অবধি দেওয়া হয়, যাতায়াতের জন্য সাইকেল, বই, খাতা–কলম, সবই ফ্রি। এর পর আছে মিড-ডে মিল। দিনের সবচেয়ে বড় খাবারটা ইস্কুলেই মিটে যায় বাচ্চাদের, বাপমা এটুকু দুশ্চিন্তা মুক্ত যে, তাদের সন্তান ইস্কুলে গেলে অপুষ্টিতে ভুগে না খেতে পেয়ে মরবেনা। এরপর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এ পড়াশোনার খরচা। সরকারি কলেজগুলোতে টিউশন ফি বাৎসরিক মোবাইল রিচার্যের চেয়েও কম, কিছু ক্ষেত্রে টিউশন ফি মকুব হয়ে যায় নানান বৃত্তিতে। ভারতীয় ইঞ্জিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করা ছেলেপুলেদের দাম বিশ্ব IT বাজারে বিপুল, বাংলাদেশী হলেই আর জাতে উঠবেনা। ভারতীয় পাসপোর্টও বাংলাদেশীদের চেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্য। তাই তাদের শিক্ষিত প্রজন্মের ধান্দাই হচ্ছে যেকোনো মূল্যে উচ্চশিক্ষার পড়াশোনাটা ভারতে এসে করা, এবং ভারতীয় পাসপোর্ট হাতানো। SC-OBC হলে তো রীতিমত জামাই আদর, কেন বাংলাদেশীরা এদেশে কাঁটাতার গলে ঢুকবেনা?

৪) ফ্রি রেশনঃ বাংলাদেশে দরিদ্র ও দুর্যোগ কবলিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে খাদ্যশস্য বিতরণের সরকারী প্রকল্প রয়েছে কাগজে কলমে। নতুবা এই খাতে বিদেশী অনুদান কীভাবে আসবে? এই কর্মসূচিগুলো Vulnerable Group Feeding এর আওতাধীন, যেখানে কেবলমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে দরিদ্র পরিবারগুলোকে বিনামূল্যে চাল, গম বিতরণ করা হয়। বাস্তবে, দুটো ঈদের আগে ছাড়া এই সহায়তা কেউ পেয়েছে বলে এমন অভিযোগ নেই কারো। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সকলকে বিনামূল্যে ত্রাণটুকু পৌঁছে দিতে পারেনা বাংলাদেশ সরকার, আজও। সেখানে আমাদের রাজ্যে দুর্যোগের জন্য বরাদ্দ চাল আর ত্রিপল ঝেঁপে অট্টালিকা বানাবার লোভেই একটা গোটা রাজনৈতিক দল রমরমিয়ে চলছে। 

এদিকে ভারত সরকারের খাদ্য ও গণবন্টন বিভাগের প্রকল্পের অভাব নেই দেশের মানুষের মুখে প্রায় বিনামূল্যে, সারা বছর ধরে অন্ন তুলে দেওয়ার বন্দোবস্তে। অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা (Antyodaya Anna Yojana - AAY), অন্নপূর্ণা যোজনা (Annapurna Yojana - APY),  অগ্রাধিকার পরিবার প্রকল্প (Priority Household - PHH), প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা (PMGKAY), সমন্বিত শিশু বিকাশ পরিষেবা (ICDS)-এর মতো অন্যান্য পুষ্টি-সম্পর্কিত প্রকল্পগুলি রমরমিয়ে চলছে। এদেশে ঢঙের কিছু কাজ জুটুক বা না জুটুক, রেশনের চাল খেয়ে পেটের জ্বালাটা অন্তত মিটবেই মিটবে। কেন বাংলাদেশীরা এদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশকারি হবেনা?

৫) বাংলাদেশের আয় মূলত পোশাক শিল্প ও কামলাখাটা শ্রমিকদের পাঠানো প্রবাসী আয়ের (Remittances) উপর নিরর্ভরশীল। এর বাইরে কৃষি খাত, মৎসচাষ ও পশুপালন, এই সবগুলো দিয়ে গ্রামীণ অঞ্চলে দারিদ্র্য হ্রাস করা যেতে পারে, উন্নত বৈচিত্র্যপূর্ণ ও কিছুটা বিলাসী জীবনযাপন করা যায়না। বাংলাদেশ থেকে ভারত আর মিয়ানমার ব্যাতিরেকে যেখানেই যাক, বিমানে যাতায়াত হয়, যা বিপুল খরচা সাপেক্ষ। সেখানে ভারতে আসার জন্য পকেটে ১০০ টাকা থাকলেই যথেষ্ট। আর কোলকাতা থেকে গোটা ভারত জুড়ে কাজ খুঁজে ফিরতে খুব বেশী খরচাকর নয়। বহু বাংলাদেশী রীতিমত শুক্রবার ওদেশে ফিরে ২ রাত কাটিয়ে আবার সোমবার সকালে কোলকাতায় নিজের কাজে ফেরে অফিস টাইমে। এরা অনুপ্রবেশ করবেনা তো কে বা কারা করবে?

৬) ভারতের উন্নত টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র বাংলাদেশের চেয়ে যোজন কিলোমিটার এগিয়ে। সহজলভ্য ইন্টারনেট পরিষেবা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও বিস্তৃত মোবাইল নেটওয়ার্ক ভয়াবহ লোভনীয়। স্পিডটেস্ট গ্লোবাল ইনডেক্সের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের মোবাইল ও ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গড় গতি বাংলাদেশের চেয়ে ঢের বেশি। ২০২৫ সালে সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯০ কোটি বা ৬২%, সেখানে প্রতি তিনমাসে একবার রিচার্যের হিসাবে মাত্র ২৭% মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে বাংলাদেশে। ১ জিবি ডেটার দাম ভারতে গড়ে ৯ টাকা, সেটাই বাংলাদেশে ৩২ টাকা গড়ে। তাই ওই দেশের ওদের শিক্ষিত প্রজন্ম একবার ঢুকলে আর বার হতে চায় না।

৭) পরিকাঠামো ও সুযোগঃ বাংলাদেশের আয়তন ১৪৮০০০ বর্গ কিমি, সেখানে ভারতের আয়তন ৩২ লক্ষ ৮৭ হাজার বর্গ কিমি, মানে ২২ গুনের চেয়েও বেশী বড় দেশ। গোটা ইউরোপের চেয়ে ৩ গুন বড় আয়তনের দেশ আমাদের ভারত। ইউরোপ মানে অনেকগুলো দেশের সমষ্টি, ভারতের প্রত্যেকটা রাজ্যকে একটা দেশ ধরে নিলে- কতগুলো দেশ হয়? আমাদের বিপুল জনসংখ্যা আন্তঃদেশীয় ভাবেই বিপুল বাজার সৃষ্টি করেছে। দেশে বিপুল মাত্রার নানা মাপের শিল্প কলকারখানা রয়েছে। এ প্রান্তে কাজ না জুটলে আরেক প্রান্তে চলে যেতে রেলপথে মাত্র কয়েকশো টাকাতে বিনা ভিসা, বিনা প্রশ্নে চলে যাওয়া যায়, যা গোটা পৃথিবীতে কোথাও সম্ভব নয়। উপরন্তু ভারতের একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর আছে, সেই সুবিধার লোভে এখানে অনুপ্রবেশ ঘটে চলেছে।

অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো পরিবহন ব্যবস্থা, যা পণ্য ও মানুষের চলাচল সহজ করে। মহাসড়ক, সেতু, কালভার্ট বা সেতু, উন্নত গ্রামীণ রাস্তাঘাট। দেশজোড়া বিস্তৃত রেললাইন, আধুনিক রেলস্টেশন, উন্নত ট্রেন পরিষেবা। বন্দর, জেটি, ফেরিঘাট, নৌ-চলাচল উপযোগী নদীপথ। পর্যাপ্ত বিমানবন্দর, নিয়মিত সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ হলো আধুনিক ভারতের প্রাণশক্তি। ভারতীয় রেলকে দেশের ‘লাইফলাইন’ বলা হয়। বার্ষিক যাত্রী ধারন সংখ্যা, গুণগত রেলপথ ও দেশ জুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এর নিরিখে ভারতের স্থান গোটা বিশ্বে দ্বিতীয়, সেখানে বাংলাদেশ তালিকার প্রথম ১০০ এর মধ্যেও আসেনা। বাংলাদেশে সড়ক যোগাযোগ ভালো, কিন্তু সেটা ভারতের তুলনাতে নেহাতই বালখিল্য। আজও নদী পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের বিবিধ স্থানে নদীপথই একমাত্র বিকল্প, কোনো ব্রিজ বা পাকা সড়ক নেই। বাংলাদেশে বেসরকারী পরিবহণনই মূল ভরষা, কারন অনুন্নত সরকারী বাস পরিষেবা, যার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত এবং প্রতিটা ক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সময়ানুবর্তিতা রক্ষিত হয়না, ফলে সাধারণ মানুষ সরকারী পরিষেবা এড়িয়েই চলে। গণ পরিবহণ ব্যবস্থাতে ভারত অবশ্যই ইউরোপের তুলনাতে অনেক পিছিয়ে, কিন্তু বাংলাদেশের তুলনাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে ভারত অন্তত ৫০ বছর এগিয়ে। 

এর সাথে  বিদ্যুৎ ও শক্তি খাত হলো- শিল্পায়ন এবং দৈনন্দিন জীবনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। সেখানে বাংলাদেশের তুলনাতে ভারত স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রায় প্রতিক্ষেত্রেই। বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যেমন কয়লা, গ্যাস, জলবিদ্যুৎ, পারমাণবিক এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে একপ্রকার স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর সাথে সরবরাহ ব্যবস্থাতেও অনেক অনেক এগিয়ে,  ট্রান্সমিশন লাইন এবং ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক স্থাপনে এতো বিশাল বড় দেশে একটা নজির। এরপর রয়েছে পরিশুদ্ধ জল সরবরাহ, স্যানিটেশন, কৃষিতে পর্যাপ্ত সেচ ব্যবস্থা, উন্নত মানের সার ও আধুনিক কৃষিজ যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা। এ সবের লাভ তো কেবল ভারতীয়েরাই পায়। কেন কেউ অবৈধ ভাবে ভারতীয় হতে চাইবেনা?

৮) মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অনুভূতি এবং চুরি বা হামলার ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া জননিরাপত্তা সূচকে ভারত অনেক এগিয়ে। অপরাধ, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাজনিত আইন শৃঙ্খলার নিজস্ব সমস্যা দুই দেশেই রয়েছে। নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, ওয়াশিংটন ভিত্তিক বিশ্লেষণ সংস্থা গ্যালপ (Gallup) দ্বারা প্রকাশিত 'ল অ্যান্ড অর্ডার ইনডেক্স' (Law and Order Index) অনুযায়ী, ভারতীয়েরা ব্যক্তিগতভাবে নিজেদেরকে বাংলাদেশীদের চেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করে।
 
৯) আর্থিক বৈষম্য আরো একটা বড় কারন এই অনুপ্রবেশের। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (SBI)-এর ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে চরম দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশেরও কম। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ সালে ভারতে চরম দারিদ্র্যের হার- প্রতিদিন ২.১৫ মার্কিন ডলারের কম আয় কমে ২.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ গৃহস্থালী আয় ও ব্যয় জরিপ (HIES) ২০২২ অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ১৮.৭ শতাংশ। এর মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার হলো ৫.৬ শতাংশ।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত ২০%, সেখানে ভারতে ৩১% এরও বেশী। ক্রয়ক্ষমতার সমতা (PPP) বিবেচনা করলে, ভারতের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। এর ফলে ভারতীয় মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই বেশি। ভারতের বিশাল শিল্প ও পরিষেবা খাত, বিশেষ করে আইটি সেক্টর শহরাঞ্চলে উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ তৈরি করে, যা মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিলাসবহুল জীবনযাত্রা এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পণ্য ও পরিষেবার প্রতি বেশি আগ্রহী, যা ভারতের বড় অর্থনীতির কারণে সহজলভ্য। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত মূলত মৌলিক চাহিদা পূরণের পর সঞ্চয়ের দিকে নজর দেয়। ফলত, ঢাকা ও মুম্বাইয়ের মধ্যে বাড়ি ভাড়া, মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার খচরে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতে মধ্যবিত্তের সংখ্যা কমার পাশাপাশি গরিবের সংখ্যা বেড়েছে, তবুও ভারতের বহু অংশের গরিব এখনো বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের সঙ্গে তুল্যমূল্য বিচারে লড়াই দিতে পারে।

মালদা মুর্শিদাবাদের নদী ভাঙ্গনের বিপর্যস্ত মানুষের কথা আগে চিন্তা করা হবে, নাকি হিন্দুত্ত্বের দোহায় দিয়ে এসব অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কথা চিন্তা করা হবে- রোহিত শর্মা চুর, আর সূর্যকুমার যাদবের পা বাউন্ডারির বাইরে খুঁজতে প্রানাতিপাত করে দেয়, তাদের? যে দেশে কামলা খাটতে যাওয়াটা সমাজের মূল ধারার সবচেয়ে বড় পেশা, সেখানে এগুলো কী যথেষ্ট কারন নয় এই গণহারে অনুপ্রবেশের? 

সুতরাং, কৃত্রিম ভেকধারী উদবাস্তু মানেই আমার ভাই, বাংলাদেশী হিন্দু মানেই ছিন্নমূল, বাংলাদেশী হিন্দু মানেই সে মোল্লাদের দ্বারা অত্যাচারিত, এই সব গণহারে খেয়ালি পোলাও পাকাবার আগে উপরের তথ্য গুলো মিলিয়ে নেবেন আশাকরি। হয় আমি অনুপ্রবেশকে সমর্থন করব, বা বিপক্ষে থাকব। এখানে আমি যদি তোলামুল হই, আমার ধান্দাবাজ হতে সমস্যা নেই, এটাই আমার রুটিরুজি। আমি বিজেপি হলে মুসলমাদের প্রতি ঘৃনা ও হিন্দুত্বই আমার একমাত্র হাতিয়ার। কিন্তু যখন আমি বাম, আমি কেন জাতের বিচার করব? আমি তো গোটা বিশ্বজুড়ে যেখানে বঞ্চনা হচ্ছে, যাদের উপরে অত্যাচার হচ্ছে, আমি তাদের পক্ষে। মুসলমান বাংলাদেশী হলে সে রোহিঙ্গা, সে অবৈধ, আর হিন্দু বাংলাদেশী হলে এদেশের নাগরিকত্ব নাকি তার প্রাপ্য অধিকার? দেয় কে আপনাদের? আপনার সাথে RSS এর ভাষার ফারাক কোথায়? এমনি এমনি দলটা শূন্যে পৌঁছে যায়নি, আপনি ও আপনার মত ভন্ড মানুষদের মেহেনতে এটা সম্ভব হয়েছে। 


আপনি কী ভাবে দেখেন এই গণহারে অনুপ্রবেশকে?


অনুপ্রবেশের নেপথ্যে- ১


পর্ব~১

ডাঙ্কি সিনেমাটা দেখে ছিলেন?


আপনি যদি অবৈধ পথে পৌঁছে আমেরিকাতে নাগরিকত্ব চান, সেখানকার আইন অনুযায়ী- একজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তি হিসাবেই রাজনৈতিক আশ্রয় দাবি করতে হবে মার্কিন ফেডারাল সরকারের কাছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিকে আদালতে প্রমাণ করতে হয় যে, তার নিজ দেশে বর্ণ, ধর্ম, জাতীয়তা, নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্যপদ বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কিম্বা প্রাণনাশের গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে। 

কীভাবে এসব প্রমাণ যোগার হয়? সব বন্দোবস্ত আছে, শুধু ফেলো কড়ি মাখো তেল সিস্টেম। ২০২৪ সালে ৮৯২,৯০৪টি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জমা পড়েছিলো মার্কিন আদালত গুলিতে, যেখানে ৭০% এর বেশী আবেদনকারী নাগরিকত্ব পেয়েছে নানান শর্তের বিনিময়ে। ওবামা, ট্রাম্পের প্রথম দফা ও বাইডেনের আমল মিলিয়ে শেষ ১২ বছরে ৭৬% আবেদনকারী নাগরিকত্ব পেয়েছে, ট্রাম্পের আমলে এটা কমলেও সেটা ২০২৫ এ ইতিমধ্যেই ৪৭% পাড় করে ফেলেছে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশেও এই একই আইন কিছু রকম ফেরে।

২০২৪ সালে ৪৯,৭০০ জন ভারতীয় মার্কিন নাগরিকত্ব পেয়েছে এই ভাবে, যাদের মধ্যে মাত্র ২৮২ জন অ-হিন্দু। এবারে আপনি বলুন, হিন্দু হৃদয় সম্রাট মোদি শোভিত RSS শাসিত ভারত রাষ্ট্রে এরা কোন ধর্মীয়/রাজনৈতিক অত্যাচারের শিকার হয়েছিলো? এদের জীবন কোথায় কীভাবে গুরুতর ঝুঁকিতে ছিলো? আপনি জানেন সবটা মিথ্যা, আপনি জানেন উন্নত জীবনের খোঁজে তারা জালি কাগজ বানিয়ে সে দেশের আদালতকে বোকা বানিয়েছে। কিন্তু খাতায় কলমে ওরা সকলেই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক হিংসার শিকার, দস্তুর মত ‘খাঁটি’ প্রমাণ পেয়েছে বলেই আদালত তাদেরকে নাগরিকত্ব মঞ্জুর করতে কসুর করেনি। এটা শুধু আমেরিকার তথ্য দিলাম, এমন করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ সর্বত্র দলে দলে ভারতীয় হিন্দুরা পাড়ি জমাচ্ছে একই উদ্দেশ্যে, একই অজুহাত খাঁড়া করে। 

২০১৪ থেকে এদেশে অত্যাচারের শিকার মুসলমান আর দলিতেরা, তাদের কতজন এই অজুহাতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে? ২০২০ এর দিল্লি দাঙ্গায় কতজন মুসলমান দেশ ছেড়ে পালিয়েছে? নব্য আমেরিকান ৪৯৭০০ জন ভারতীয়র মধ্যে সবচেয়ে বেশী মানুষ গুজরাত থেকে গেছে, দ্বিতীয় পাঞ্জাব থেকে, তৃতীয় মহারাষ্ট্র থেকে। গুজরাত মডেল, RSS এর আরেক ছানা APP ও মহারাষ্ট্রের ডবল ইঞ্জিন সরকারের রাজ্য গণতান্ত্রিক কাঠামোটা পরখ করে নিতে পারবেন এখানে। মোল্লা শাসিত গণতন্ত্রহীন মধ্যপ্রাচ্যে ভারতে অসুরক্ষিত ‘অত্যাচারিত’ হিন্দুরা কিসের আশায় আশ্রয় নিতে গেছে? এই ব্যাখ্যাটা যদি নাগপুর করে দেয় তো বড় ভালো হয়।

পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে কোনো হিন্দু চুরির পথে এদেশে এলে, সে সত্যিকারের ‘মোল্লাদের অত্যাচারের’ শিকার হয়ে যায়। তার আর কোনো ধান্দা আছে কল্পনা করাও যেন মহাপাপ। যুধিষ্টিরের পর সত্যবাদীতাতে একমাত্র মানদণ্ড হচ্ছে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী অবৈধ হিন্দুটি। এদের হয়ে রুদালি গাইতে ডান, বাম, রাম সব দলের একই নীতি, বিশেষ করে ব্যাক্তিটি যদি পঞ্চম প্রজন্মেরও বাঙাল হয়, সে ও ফুঁপিয়ে উঠছে রীতিমত। বস্তুত, যে ১৯৪৭ সালে এসেছে এবং যে ২০২৪ সালে এসেছে উভয়ের মধ্যে বক্তব্যের কোন পার্থক্য নেই। ধর্মীয়ভাবে হিন্দুর ক্ষেত্রে- আমি একবার ঢুকে পড়েছি অতএব এই দেশ আমার বাপের দেশ, আমি ফিরে যাব না। বাঙালদের পূর্ববর্তী, বর্তমান বা পরবর্তী প্রজন্মের ৯৯%কে দেখবেননা তারা দেশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত হতে চেয়েছে বা চাইছে। দু একটা ব্যাতিক্রম ছাড়া কেউ ভারতীয় সেনাবাহিনী, বিএসএফ বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হয়ে কাজ করেনা।

কদিন আগেও একটা প্রতিবেদন লিখেছিলাম এই বিষয়ে- কেন বাংলাদেশীরা এদেশে আসে! আচ্ছা, ধর্মীয় অত্যাচারের কারনে পালিয়ে এসেছে বলে যারা দাবী করে, তাদেরই বাবা, মা, বোন, মাসি, পিসি, মামা, কাকা, জ্যাঠা সহ অধিকাংশ আত্মীয়স্বজন গুলোকে কোন মোল্লার ভরষাতে ও দেশে রেখে আসে? কীভাবে তাদের পেট চলে বছরের পর বছর? কোন ইউনিয়নের কোন থানাতে গিয়ে তাদের উপরে হওয়া অত্যাচারের বর্ননা নথিবদ্ধ করে আসে? এদেশে একবার স্থায়ী হয়ে গেলেই, প্রতি বছর যে নিত্য দু-দেশের মাঝে যাতায়াত, সেখানে কেন কোনও সমস্যা হয়না ধর্ম নিয়ে? এত শয়ে শয়ে অবৈধ মুসলমান অনুপ্রবেশকারী দেখা যাচ্ছে উত্তর ২৪ পরগণার হাকিমপুর, নদীয়ার হাঁসখালি, সুন্দরবনের ফ্রেজারগঞ্জ সহ নানান বর্ডারে, এদের উপরে কোন ধর্মীয় অত্যাচার হয়েছিলো? 


আসলে ধর্মীয় মোড়ক হলো বুজরুকি, ভণ্ডামি, এবং ৯৯% মিথ্যাচার। ধর্মকে হাতিয়ার এদেশে ঢুকে পরাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য, যেমন ইউরোপ আমেরিকায় করে। আমেরিকা যেতে গেলে লক্ষ কোটির গল্প, ভাষার সমস্যা, চামড়ার রঙের সমস্যা। ভারতে সে সব বালাই নেই, উপরন্তু ২০০ টাকার খরচাতে ঢুকে পরা যায়। এই কারনে এরা ভারতে এসেছে, এর মধ্যে কোনো হিন্দু প্রেম নেই, কোনো হিন্দুরাষ্ট্রের গল্প নেই। একবার নিজের পা জমে গেলে তখন একে একে আত্মীয় পরিজনকে নিয়ে এসে স্থায়ী হয়। এদিকে ১৯৯৭ সালে কলকাতার পিজি হসপিটালে জন্মেছিল যে বাবুটি, যে জীবনে বাংলাদেশের বর্ডার চোখে দেখেনি, সে অবধি ফেসবুকে আড়াই লাইনের হ্যাজ লিখছে- মোল্লাদের অত্যাচারে ও দেশের লোক ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।

মেদিনীপুর শহরের একটা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একটা প্রান্তে পুরো একটা ছোটখাটো গ্রাম গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের ভোলা জেলার মানুষদের দিয়ে। তাদের দাবী, আমফান ঝড়ে সর্বহারা হয়ে এদেশে চলে এসেছে। আইতে শাল যাইতে শাল, তার নাম বরিশাল; এই দেশে এসে গল্প শোনানো সেই লড়াকু বরিশালীদের ভোলার বুকে শুধু আইলা আমফান ঝড় আছড়ে পড়েনি, আমাদের দেশের অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা, পূর্ব মেদিনীপুর কিম্বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার মানুষেরা দগদগে ঘা নিয়ে নিয়মিত লড়াই করে টিকে আছে। নদী ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারানো মালদা মুর্শিদাবাদের মোল্লারা কেউ আরব দুনিয়ায় ‘ভীর’ সেজে ছুটে পালিয়ে যায়নি। শুধুই মেদিনীপুর শহর নয়, হুগলি জেলার ডানকুনি, গোবরা, রিড়ষা, বাঁশবেড়িয়া, হাওড়া জেলার বাঁকড়া, রামরাজাতলা, বালি, বেলুড়, উত্তর ২৪ পরগনার বিধাননগর, নিউটাউন, গোপালপুর, সেক্টর ফাইভ সমেত বেশিরভাগ অঞ্চলে যা খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে তার সবগুলোই মূলত অবৈধ বাংলাদেশীদের দ্বারা গঠিত হিন্দু বস্তি।

বনগাঁ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা, নদীয়া, পূর্ব বর্ধমানের কথা আলাদা করে বললামনা, এখানে ঠগ বাছতে গাঁ উজার হয়ে যাবে। মেদিনীপুরের এই বাংলাদেশী লোকগুলো অবলীলায় বলছে আমাদের কার্ড থাকুক না থাকুক আমরা এদেশেই থাকবো, অর্থাৎ মধুটা ধর্মে নয়- কাজের সুযোগের গল্পে এমন মরিয়া হয়ে উঠেছে এদেশে থেকে যেতে। সুতরাং, মুখে স্বীকার করুক বা না করুক, তারা মোল্লার অত্যাচারে নয়, পাতি না খেতে পেয়ে চোরের মত রাতের আঁধারে দালাল ধরে সীমান্ত টপকে এসে এখন ‘হিন্দু’ সাজছে। এদেশে একবার পা জমে গেলেই এরা আমাকে আপনাকে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেবে আর আরএসএস শিবিরে নাম লিখিয়ে পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচর বৃত্তির ইতিহাসে নাম লিখে অমর হয়ে যাবে।

২০১৬ পরবর্তী এ রাজ্যের যেকোনো সাল থেকে যেকোনো নির্বাচন মিলিয়ে দেখলে বুঝবেন, উদ্বাস্তু কলোনী গুলিতে সিপিআইএম তথা বামফ্রন্টের ভোট - তৃণমূল বা বিজেপির পেছনে তৃতীয় স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। কোথায় গেল সেইসব বাঁশবেড়িয়া, কাটোয়া, দমদম, টিটাগড়, নোয়াপাড়া, বিজয়গড়, যাদবপুর, বেহালার লেলিন কলোনির আন্দোলনের ইতিহাস? পাথরের মত জমাট বাঁধা ভোট? ইতিহাসের কোন গহ্বরে লুকিয়ে গেল প্রশান্ত শূর জামানার পরবর্তী প্রজন্ম !

সেইকালে এরা সিপিএমকে ব্যবহার করেছিলো, রক্তে বেইমানি, তাই সিপিএমকে ল্যাঙ মেরে এদের উত্তর পুরুষেরাই আজ বলে কমিউনিস্ট মানেই দেশের শত্রু। স্বাভাবিকভাবেই আজকে যারা সদ্য সদ্য ভিখারিপনা করে এখন এদেশের নাগরিকত্ব দাবী নিয়ে হাহাকার করছে, পা জমে গেলেই এরা আমাকে আপনাকে দেশদ্রোহী হিসাবে দাগিয়ে দেবে, এদের জিনে রয়েছে হারামিপনা, বেইমানি, পলায়নপর ধান্দাবাজি।


আপনি এদের জন্য আহা ভেবে আকুল হয়ে যাচ্ছেন, প্রতিটা দলের আঁটি সেলের হ্যাজ আর ফরোয়ার্ডেড হোয়াটস্যাপ মেসেজের ভিড়ে আবেগের সিকনিতে বুক ভিজিয়ে ফেলছেন। কতগুলো ধান্দাবাজ, চিটিংবাজ, মিথ্যেবাদী, পলায়নপর মানসিকতা যুক্ত লোকের জন্য দরদ উথলে পড়লে বুঝে নিতে হবে, আপনার শরীরেও দিনের শেষে সেই একই জিন দৌড়াচ্ছে।। আবেগটা শুধু মাত্র সঠিক ব্যাক্তিদের জন্যই নাহয় সংরক্ষিত থাকুক, যারা সত্যি সত্যি বাধ্য হয়েছেন ছিন্নমূল হয়ে। প্রতিটি অবকাঠামোগত বিষয়ে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, খাদ্য, প্রযুক্তি, রেলপথ, সড়কপথ এবং বিমান পরিবহণে ভারত- বাংলাদেশ বা নেপালের তুলনায় বিপুল বড় এবং উন্নত নেটওয়ার্ক যুক্ত। ভারতের বিশাল অর্থনীতি এবং শিল্পায়নের কারণে এখানে উন্নত জীবনযাত্রা জনিত সুযোগ-সুবিধা ও বিলাসবহুল পণ্যের সহজলভ্যতা বেশি। উচ্চতর মাথাপিছু অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে জীবনযাত্রার উন্নত মান বজায় রাখা ভারতে তুলনামূলক সহজ। আর এটাই এই অনুপ্রবেশের একমাত্র কারন, এখানে ধর্মের ভাঁওতাবাজি স্রেফ মুখোশ।

একটা মিম বাজারে ঘুরছে, ‘বিবাহিত মহিলারা সাবধান হয়ে যাও। বহু পীড়িত স্বামী নাকি ইচ্ছাকৃত ভুলভাল SIR ফর্ম ফিলাপ করে দজ্জাল বৌকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে চাইছে ভায়া ডিটেনশন ক্যাম্প”। সন্দেহ নেই, বিষয়টা নিছক মজার জন্য বানানো, কিন্তু সত্যিই যাদের বাংলাদেশ বা ডিটেনশন ক্যাম্পে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের মাঝে ঠিক কতটা আতঙ্ক কাজ করছে তা আমরা কল্পনা করতে পারবনা কোনোভাবেই। ধান্দাবাজদের অবশ্য ততটা সমস্যা নেই, ওপাড় বাংলাতে তাদের সকলের বাবা, মা, আত্মীয় স্বজনেরা আছে। ছিন্নমূলদের পাশাপাশি সমস্যা হচ্ছে সেয়ানাদের, যারা উত্তরবঙ্গের সিতাই, হেমকুমারী, দক্ষিণবঙ্গের সন্দেশখালি, ধামাখালি, বয়রা, ঘোজাডাঙ্গা ও বনগাঁর আশপাশ দিয়ে দালাল ধরে রাতের আঁধারে এ দেশে ঢুকে ভেবে নিয়েছিলো- এটাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, মোক্ষ লাভ হয়ে গেছে। ওপাড়ের সব ধীরে সুস্থে বেচে দিয়ে এপাড়ে এসে ‘ভিরাট’ হিন্দুবীর হয়ে বসে গেছেন- সমস্যা মূলত এনাদের।

সমস্যা আরেকটা গোষ্ঠীর আছে। গতবছর বাংলাদেশের পালাবদলের পর আওয়ামী লীগের বড় অংশের লোক ভারতে ঢুকে পড়েছিলো। এদেরকে হয়তবা খানিকটা ছাড় দিয়েই বর্ডার পেরোতে সাহায্য করেছিলো ভারত সরকার, সেই ফাঁকে আওয়ামীলীগের ছদ্মবেশে বহু ধান্দাবাজও ঢুকে পরেছিলো। তাই এখন, এমন মুসলমানও ধরা পড়বে, যারা আদব কায়দাতে একটু ভদ্রলোকও বটে, এরা কেউ কিন্তু স্থায়ীভাবে থাকতে আসেনি, প্রাণের ভয়ে পালিয়ে এসেছিলো। এতোদিন উভয়েই বেশ সানন্দ্যে ও সাচ্ছন্দ্যেই ছিলো, এখন মুসলমান গুলো ফিরে যাচ্ছে। ফলত, যাদের বর্ডারে দেখা যাচ্ছে এরা প্রায় সকলেই মুসলমান, কিন্তু যেগুলো হিন্দু আওয়ামিলীগ, তারা কিন্তু কোনোমতেই এ দেশ থেকে আর যেতে চাইছে না। 

সীমান্তের বিভিন্ন ভিডিওতে স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশী মুসলমান মূলত কর্মসূত্রে এদেশে এসেছিল অবৈধ উপায়ে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তারা ওই দেশের কোন জেলা, কোন ইউনিয়নে বাড়ি স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছে। পরিস্থিতি ও গন্ডগোলের কারনে ফিরে যেতে হচ্ছে বলে মনে কোন দ্বিধা দুঃখ নেই। কিন্তু হিন্দুরা কোনো শর্তে যেতে রাজি নয়। দালালের মাধ্যমে ভারতে ঢুকে এসে, তিন দিন পরে এরাই বলবে রক্ত দিয়ে কেনামাটি, ইত্যাদি। সুতরাং, বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী হিন্দু মানেই সে মুসলমানের অত্যাচারের শিকার ব্যাপারটা তেমন নয়। এতদিন এদেশের জলহাওয়া খেয়ে, বিজেপি-RSS এর সাথে থাকতে থাকতে একটা বুলি শিখে গেছে- আমাকে মোল্লারা মেরছে। এটাই তার কাছে এদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার গায়েত্রী মন্ত্র।


এই মুহুর্তে আমাদের সমাজের মূল সমস্যা তিনটে। প্রথম হচ্ছে বেকারত্ব, মানুষের হাতে কাজ নেই। দ্বিতীয়ত, ঘরে একটা গৃহসহায়ক, ড্রাইভার, মালি কিম্বা ভালো একটা কর্মচারীর সন্ধান করুন, দেখবেন লোক খুঁজে পাবেননা। অর্থাৎ কাজের মানুষ নেই। তৃতীয়, আমাদের আশেপাশে যে সকল লোকজন কাজ করছে, তাদের দিকে চেয়ে দেখুন; সেটা আমার আপনার ঘরে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হোক, সর্বত্র একটাই সমস্যা- এরা কোনো কাজের নয়, পুরো বেকার লোকজন। বিশেষ করে সরকারী দপ্তরগুলোতে, দুটো লোকও সঠিক কাজের কাজী এমন পাবেননা খুঁজে। এটাই হচ্ছে দেশের মূল সমস্যা। সুলভ হলো শুধু সময়, সকলের হাতে বিপুল সময়। সুতরাং, জনগণ হুলিয়ে সারা সারা দিনরাত কূটকচালি, কলতলার ঝগড়া, খাপ বসানো, বিশেষজ্ঞ, আঁতেলপনা, ফুট কাটা ফুটো মস্তান, নীরব দর্শক, বিপ্লবী ইত্যাদির সাথে অকারন নিন্দাচর্চার জন্য সময়ই সময়। সোস্যাল মিডিয়াই আজকের মনোরঞ্জনের মূখ্য মাধ্যম, তাই SIR কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ‘টপিক’ এর ঘাটতি নেই দেশে।

এপার ওপার বলে কিছু হয় না, হিন্দু মুসলমান বলেও নেই। দেশ ভাগ বাঙালির বুকে একটা দগদগে ঘা। কিন্তু দেশভাগের ছিন্নমূল হওয়ার ইতিহাস আর ধান্দাবাজির পলায়ন বৃত্তি দুটোকে এক সুতো দিয়ে বাঁধা যাবে না।


...ক্রমশ

বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫

সংখ্যাঘুঘু

 


মাননীয়া বামনেত্রী দীপ্সিতা ধরের গতকালের একটা ফেসবুক পোষ্টের প্রেক্ষিতে এই লেখা


শেষ ২৫ বছরে ওপার বাংলা থেকে যারা এসেছেন- তাদের কতজন রাজনৈতিক অত্যাচারের শিকার আর কতজন ধর্মীয় অত্যাচারের শিকার হয়ে এসেছে? এর কোনো প্রামান্য তথ্য রয়েছে আপনার কাছে? থাকলে সরাসরি লিখুক অমুক 'জামাতি' কিম্বা তমুক 'ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিস্ট' দলের অত্যাচারের কারনে অমুক অমুক ব্যাক্তি বা অমুক অমুক পরিবার বাংলাদেশ থেকে আপনার দাবী মত 'বাধ্য হয়ে' পালিয়ে এসেছে। কোন স্যাম্পেল সার্ভের ভিত্তিতে আপনি ৩৪৭৮৮৬৩৫৮৯৫৩ বার লিখে ফেললেন, তার কোনো তথ্য উপাত্ত রয়েছে আপনার কাছে? এখানেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের তথাকথিত অত্যাচারিত সংখ্যালঘু জনগণের ভিটে ত্যাগের ইতিহাসের পাশাপাশি ধান্দাবাজ সংখ্যাঘুঘুদের ‘বাধ্য হয়ে’ কাঁটা তার টপকাবার গল্প


আমি জানিনা আপনার পরিবার, তথা আপনার পিতৃকুল বা মাতৃকুলের কেউ ‘বাঙাল’ কিনা, তাই হলে তাঁরা কবে এদেশে এসেছিলেন আর ঠিক কার অত্যাচারে কি কি খুইয়ে এসেছিলেন! এদেশে আসার আগে সেখানকার আইন আদালতের কোথায় কোথায় গিয়ে নিজের ভিটেতে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, অবশেষে ‘বাধ্য হয়েছিলেন’- আশা করি ১ বার এই তথ্যগুলোও দেবেন পাবলিক ডোমেইনে। ৩৪৭৮৮৬৩৫৮৯৫৩ বার লাগবেনা, ১ বার দিলেই জাস্টিফাই করে নেওয়া যাবে আপনি সংখ্যালঘু ছিলেন না সংখ্যাঘুঘু


SIR শুরু হয়েছে, কেউ বলছে মুসলমান তাড়াবে, কেউ হিন্দু বিতাড়নের স্বপ্নে বিভোর। আরে বাবা ২০০২ ‘কাটঅফ’ মার্কের পর যারা অন্য দেশ থেকে এসেছে তারা কেউ হিন্দু নয়, বৌদ্ধ নয়, মুসলমান নয়, এদের পরিচয় একমাত্র অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। নিশীথ প্রামাণিক, বিজেপির হয়ে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, তাকে কোন মোল্লা দেশ থেকে তাড়িয়ে ছিল? সে তো পড়তে এসে এদেশে ঘাঁটি গেড়েছিলো, এরপর রাজনীতির কল্যাণে মন্ত্রীও হয়েছে। সে কোন CAA তে অ্যাপ্লিকেশন করে দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছিল?


আমার এলাকাতে, মানে পুর্ব বর্ধমান জেলার, কালনা মহকুমার নবদ্বীপ সংলগ্ন সমুদ্রগড়ে বর্তমান জনসংখ্যার ৯০% এর বেশী ওপার বাংলার মানুষ, যা ৯০ এর দশকের শুরুতে মোট স্থানীয় জনসংখ্যার ৩০% বা তারও কম ছিলো। শেষ পঁচিশ বছরে এরা রাষ্ট্র ভারতের বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ সুবিধা ও সুরক্ষা নিতেই এসেছে মূলত। ফ্রি রেশন, ফ্রি শিক্ষা, ফ্রি স্বাস্থ্য পরিষেবা, সস্তার পরিবহণ, অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মের নানান সুযোগ, এত বড় রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম সুযোগ সুবিধা, তুলনামূলক সস্তা জীবনযাত্রার সাথে একটা OBC বা SC সার্টিফিকেট যোগার করে নিতে পারলেই সংরক্ষিত আসনে চাকরির নিশ্চয়তা- আমার এলাকাতে এমন মানুষের সংখ্যাই বেশী। তথ্য চাইলে অন্তত ১০০টা নাম ও ঠিকানা দিয়ে দেব, যারা ১৯৯৫ সাল থেকে ২০২৪ এর মধ্যে এসেছে।

অর্ধেক বাংলাদেশী মানুষ আদম ব্যাপারিদের মাধ্যমে কামলা খটতে যায় গোটা বিশ্বজুড়ে, এরাই ভারতে এসে ভারতীয় সেজে তারা পার্মানেন্ট হওয়ার সুযোগ পায় নৃতাত্বিক মিলের কারনে, যা অন্য দেশে পায়না। এই ধান্দাবাজি করতে গিয়ে আজ আমাদের এলাকার মত, কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে কেউ মতুয়া, কেউ মায়াপুরী বৈষ্ণব, কেউ হোপবোল, কেউ নমঃশূদ্র, কেউ কামতাপুরি, কেউ জমিয়ত উলামা, কেউ অনুকুলের শিষ্য হয়ে, ধান্দাবাজির প্রয়োজন মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমি আর আমার এক বন্ধু লাদাখ যাওয়ার পথে ১৭০০০ ফুট উচ্চতায় চা বিক্রেতা এক বয়স্ক মহিলাকে দেখেছি, যিনি শেষ ২০ বছরের মধ্যে এদেশে অনুপ্রবেশ করেছে, এবং নকল কাগজ বানিয়ে এই চরম প্রতিকুল অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়েছেন। গোটা দেশ জুড়ে এমন সংখ্যা কোটি কোটি রয়েছে


১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা কত ছিলো? ৪ কোটি ২০ লাখ। ১৯৭১ সালে সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের জনসংখ্যা কত ছিলো? ৭ কোটি। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জনসংখ্যা কত ছিলো, এমন ভাবে কখনও হিসাব করেছেন? ৪৭ সালে ছিলো আড়াই কোটি জনসংখ্যা, ৭১ সালে ৪ কোটি ৪২ লাখ। ২০২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ১০ কোটির সামান্য বেশী, বাংলাদেশে সাড়ে ১৭ কোটি। ৭০ এর দশক অবধি ভারতের জনসংখ্যা গ্রোথ রেট ছিলো ২.৫% এর মত, যা নব্বই এর দশকের পর কমে ১.৯% এসে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই গ্রোথ রেট আরো কম। পুর্ব পাকিস্তানের পপুলেশন গ্রোথ রেট ছিলো ২.৪% মত, বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হওয়া ইস্তক এরা ৩.৫ এর বেশীতে পৌঁছে দিয়েছে গ্রোথ রেট। এই হিসাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হওয়া উচিৎ ছিলো ২৪.৫০ কোটি, তার বদলে ১৭ কোটি হিসাব দেয় তারা। এই সাড়ে সাত কোটি মানুষ গুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে গেছে কামলা শ্রমিক হয়ে, যারা আর স্বদেশে ফেরেনি। এদের সবচেয়ে বড় অংশটা ধর্মের দোহায় দিয়ে ‘শরনার্থী’ সেজে পিলপিল করে শেষ ২৫ বছরে আমাদের দেশে ঢুকে পরেছে, পশ্চিমবাংলা, আসাম, নর্থ ইষ্ট, সিকিম, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা সহ পশ্চিমা রাজ্যের বিভিন্ন অংশে ‘বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক’ পরিচয়ে কাজও করে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর এরাই ভুয়ো পরিচয়পত্র বানিয়ে ‘সেটেল’ হয়ে যাচ্ছে যে যেখানে পারছে।


বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার কোনো লুকানো বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার করছে, এটাই সত্য, জাত পরিচয় যা খুশি হোক। তারপরেও ১ কোটি ৩০ লাখ হিন্দু সেদেশে বসবাস করেন, সে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ গুলোতে হিন্দু শিক্ষকদের আধিক্য রয়েছে আজও। দেশের জনসংখ্যার ৭.৯৫% হিন্দু হলেও সরকারি চাকরিতে তারা প্রায় ১৪% এর আশেপাশে রয়েছে। এটা বাংলাদেশের জামাত বা মৌলবাদী গোষ্ঠীকে গ্লোরিফাই করার জন্যও নয়, না বাংলাদেশে সংখ্যালঘু অত্যাচারকে লঘু করে দেখাবার প্রয়াস। এটা আমাদের দেশের সংখ্যালঘুদের সাথে তুল্যমূল্য ফারাক দেখাবার জন্য, যারা কেবল বাংলাদেশে ‘হিন্দু’ অত্যাচারের মড়াকান্না কেঁদে 'পালিয়ে আসা'কে জাস্টিফাই করে।


বিজেপির ভাষায় ‘মমতাজ বেগমের’ সরকারের রাজ্যে দুধেল গাই ২৭%, সরকারী চাকরিতে এরা মাত্র ৫.৭৩%। গোটা দেশের জনসংখ্যার নিরিখে মুসলমান ১৪%, সরকারি চাকরিতে এখানে ৫% এরও নিচে, এগুলো সবই সরকারি ডেটা। উচ্চশিক্ষিত রাজ্য কেরালা মডেল- ৩০% মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্যে ১৩.৮% মুসলমান রাজ্য সরকারী চাকরিতে। কেন্দ্রীয় সরকারী চাকরিতে মুসলিম মালায়লী মাত্র ১.৮% । গুজরাতে আবার উলটপূরাণ, তাদের জনসংখ্যার মাত্র ৯.৯% মুসলমান, সরকারী চাকরিতে ১৬% এরও বেশী মুসলমান। উত্তরপ্রদেশে ১৯.৩০% মুসলমান, ২০১২ সালে সরকারী চাকরিতে এদের উপস্থিতি ছিলো ১২%, যোগীর কৃপায় সেটা এখন ৫% এরও নিচে। উত্তরপ্রদেশ থেকে কটা সংখ্যালঘু পড়শি দেশে পালিয়ে গেছে ‘বাধ্য হয়ে’।


আসলে পালানটা চয়েস, যেটা রক্তে থাকতে হয়, সকলে পলায়ন মনোবৃত্তি রাতারাতি জন্ম দিতে পারেনা অধিকাংশ ‘বাংলাদেশী হিন্দু’ দের মত। কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক ও আনপপুলার হলেও- গাজায় গণহত্যা হয়েছে লাগাতার আড়াই বছর ধরে, নৃশংস নারকীয় সেই অত্যাচার গোটা বিশ্ব সাক্ষী। কতজন পালিয়েছে দেশ ছেড়ে? ট্রাম্প নিজে তাদের পুনর্বাসনের প্রস্তাব দিয়েছিলো, তারা ভিটে ছাড়তে চায়নি। ভিয়েতনাম? আফগানিস্তান? কিউবা? ইয়েমেন? কারা পালিয়ে গেছে? জঙ্গলমহলের কয়েক হাজার মানুষ মাওবাদী তথা তৃণমূলের হাতে মারা গেছিল। তারা তো পূর্ব বাংলার সংখ্যাঘুঘুদের মতো পালিয়ে যায়নি। পলায়ন একটা চয়েস, একমাত্র অপসন নয়।


দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষেরা পৃথিবীর অত্যাচারিত মানুষদের তালিকায় মোটামুটি সবার উপরে, কিন্তু নিজের দেশ স্বাধীন করে সেই দেশে বসবাস করতে গিয়ে কত মানুষের জীবনহানি হয়েছে তার সংখ্যা পাওয়া মুশকিল কিন্তু কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ানরা হিটলারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছিল কেউ পালিয়ে যায়নি। রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে, আমরা যে পক্ষেরই সমর্থক হই না কেন ইউক্রেনের লোকেরা কিন্তু পালিয়ে যায়নি। ১৯৬৫-৬৬ সালের ইন্দোনেশীয় গণহত্যা হয়, এরা কেউ পালিয়ে আসেনি নিজের ঘর বাড়ি ছেড়ে। তৎকালীন যুগোস্লাভিয়া ভেঙে গিয়ে ৭ টি নূতন রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে এবং দেশ গঠনের সময় প্রত্যেক ক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ করেছে, কিন্তু কোন দেশের নাগরিক পালিয়ে যায়নি। আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে পুরু পালিয়ে যায়নি। পালিয়ে যাওয়াটা চয়েস, একমাত্র বিকল্প নয়


উন্নত জীবনযাত্রার খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় মাইগ্রেশন করাটাই সভ্যতার পরিচয়। একে ঠিক বা ভুল নামের দুটো শব্দ দিয়ে এটি ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু যারা এটাকে গ্লোরিফাই করার জন্য ‘রক্ত দিয়ে কেনা মাটি’ আর কাঁটাতারের গল্প শুনিয়ে রোমান্টিক গল্প ফাঁদে, তারাই আসলে সংখ্যাঘুঘু। রক্ত দিয়ে কেনা মাটির গল্প কোন হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে এসে লাগু হয়? ওপারে যদি রক্ত দিয়ে আপনারা ভিটে মাটি রক্ষা করতে পারতেন, তাহলে সেটা না হয় গণ্য হতো, এপারে শরণার্থী হয়ে এসে কলোনির ভিক্ষার জমিতে আপনাদের বাপ দাদারা জীবন শুরু করেছিল। তারা কোন রক্তটা ঝরিয়ে ছিলো এপারে মাটিটা পাওয়ার জন্য? ১৯৮৯ সালে প্রথম বাংলাদেশ সীমান্তের ২০ শতাংশ অংশে কাঁটাতার লাগানো হয় তৎকালীন ভারত সরকার কর্তৃক, যার অধিকাংশটাই উত্তর-পূর্ব ভারত লাগোয়া। তাহলে কাঁটাতার পেরিয়ে আসার গল্পটাই বা কিভাবে আসে আপনাদের পালিয়ে আসার রোমান্টিক গল্পে? ৯০ এর দশকে উন্নত জীবনযাত্রার খোঁজে আপনাদের পূর্বপুরুষ এদেশে এসেছিলি সংখ্যাঘুঘু হয়ে, শরণার্থীর গল্প ফেঁদে। এটাকে লুকাতে বাকি গল্পগুলো ফাঁদা


সত্যজিৎ রায়, তপন সিনহা, ঋত্বিক ঘটক, রাজেন তরফদারের মত দিকপালের কোনো সিনেমাতেও সেই অর্থে মোল্লাদের অত্যাচার দেখিয়েছে? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসুদের লেখনি সময়ের সাথে একক। এনারা কোথায় লিখেছেন খিয়েছেন যে বাংলাদেশী মোল্লাদের চরম অত্যাচারের শিকার হয়ে তাদের চরিত্রেরা এদেশে এসেছিলেন। অথচ প্রত্যেকের নাড়ি বা শিকরের টান ছিল ওপাড় বাংলার প্রতি। আসামে বাঙালী খেদাও একটা রেজিস্টার্ড আন্দোলন। সেখানে বহু বাঙালী বিতাড়িত হয়েছিলো, এমন কোন আন্দোলন হয়েছিল বাংলাদেশে শেষ ২৫-৩০ বছরে?


সংখ্যাগঘুঘু বাঙালদের সাথে ইজরায়েলী ইহুদিদের হেব্বি মিল, ইহুদীদের সমালোচনা করলেই অ্যান্টি-সেমিটিক বলে দাগিয়ে দেয়। একই ভাবে সংখ্যাঘুঘুদের সমালোচনা করলেই এ্যান্টি উদবাস্তু, এ্যান্টি বাঙাল, এমনকি এ্যান্টি হিন্দু বলেও দাগিয়ে দেয়। সমালোচনা হলেই যে ধুতি খুলে যায়


শেষ ৫ বছরে শুধু গরু সংক্রান্ত বিষয়ে, RSS কতৃক মুসলমান অত্যাচারের ঘটনাতে নানান রাজ্যে FIR ও মামলা রেজিস্টার হয়েছে ৫৩০০ এর বেশী গোটা দেশজুড়ে। বাংলাদেশে এমন কতগুলো হয়েছে শতাংশের বিচারে? ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল অব্দি হাসিনা ওয়াজেদের সরকার ছিল, যারা রীতিমতো হিন্দু সমর্থক এবং হিন্দু রক্ষাকারী হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিত। এদেশের সংখ্যালঘুরা লড়াই করছে আদালতে গিয়ে, কেউ তো দেশ ছেড়ে পালায়নি। ওপাড়ের সংখ্যাঘুঘুরা লড়াই না লড়ে পালিয়ে আসছে কেন! তারা নেপালেও যেতে পারত, কিম্বা শ্রীলঙ্কাতে! যায়নি, কারন ওখানে RSS নেই, ‘বাধ্য হয়েছে’ গল্পে রাজনীতির রুটি সেঁকা যায়না, তাই তাদের সেটেল করে দেওয়ার চক্রও নেই। ১৯৭১ এর পরে বাংলাদেশের সমস্ত খুনি-ধর্ষক-ক্রিমিনাল আর রাজাকারেরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে এই দেশে আসতে শুরু করে। বাংলাদেশের হিন্দু অত্যাচারের কাহিনীর আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে এই দেশে বসবাস করতে শুরু করে। যেকোনো ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটিতে বাংলাদেশী বলতে মুসলিমদের এককভাবে এরাই কাঠগড়াতে তুলতো, যদিও এই সকল ঘটনার পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ‘পালিয়ে আসা’ ক্রিমিনাল হিন্দুটার নিজের অত্যাচারের কু-কর্মও ছিলো, যেটাকে ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে


শেষ ২০-২৫ বছরে যারা এদেশে এসেছে, সেটা তামিল হোক, নেপালি, ভুটিয়া বা বাংলাদেশী, এদের অধিকাংশই রুটিরুজির ধান্দাবাজি আর ভারতীয় রাষ্ট্রীয় নাগরিক সুযোগ সুবিধার লোভে এসেছে। ১৯৯০ সালের পর ঠিক কত শতাংশ ‘বাংলাদেশী হিন্দু’ বাধ্য হয়ে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে? কোনো স্বীকৃত তথ্য নেই, না সরকারী না বেসরকারী, কারো কাছেই নেই। নেই, কারন এই বিষয়ে সার্ভে করলেই উলঙ্গ হয়ে যাবে, প্রতিটা রাজনৈতিক দলের মাথাতেই ওপাড় বাংলার বাঙালদের একটা বড় অংশ বসে আছে, সেটা তোলামুল, কংগ্রেস, রাম, বাম, ঘাম প্রত্যেকটি দলের এক অবস্থা। তাঁরা তথা তাদের পরিবার ঠিক কোন দিন, কোন অত্যাচারের শিকারে এদেশে পালিয়ে এসেছিলো, তাঁরা নিজেরা ছাড়া কেউ জানেনা। তাই এমন কোনো সার্ভে কখনও হয়নি, হবেওনা। শুধু ‘আমাগো একখান দ্যাশ আসিলো’ হ্যাজ নামিয়ে আবেগের বর্জ্য ছড়িয়ে নিজেদের পালিয়ে আসাকে গ্লোরিফাই আর জাস্টফাই করে দেওয়ার মরিয়া প্রয়াস চালায়


বর্তমান SIR অনুযায়ী যারা ২০০২ সাল অবধি এদেশে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ভোটারলিষ্টে নাম তুলিতে পেরেছিলো, তারা তো ভারতীয় নাগরিকই, এটাই তো পরিষ্কার কাট অফ মার্ক। এর পর যারা এসেছে তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। হিসাব সিম্পল, স্বভাবতই এ রাজ্যের ৯৯% মুসলমান দুশ্চিন্তামুক্ত। কিন্তু এটাকেই গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে যেকোনো মূল্যে অবৈধভাবে আসা সংখ্যাঘুঘু গুলোকে বৈধতার মান্যতা দেওয়া যায়। এখানেই শরনার্থী আর অনুপ্রবেশকারীর গনিত গুলিয়ে দিচ্ছে ধর্মের পাঁক দিয়ে। কেন তারা শরণার্থী- এর কোনো সন্তোষজনক জবাব নেই অধিকাংশ সংখ্যাঘুঘুর কাছে- ‘হিন্দু’ জাত পরিচয় বাদে কোনো যুক্তি নেই।


বামদলগুলো বা এরাজ্যের সিপিএম যত বেশি SIR/NRC বলেছে, শঙ্কিত হিন্দু জনসংখ্যা তত বেশি পরিত্রতা হিসেবে বিজেপিকে আঁকড়ে ধরেছে, উল্টোদিকে অশিক্ষিত মুসলমান তত বেশি তৃণমূলকে জড়িয়ে ধরেছে। SIR নিয়ে বাহ্যিকভাবে সবচেয়ে শঙ্কিত বিজেপি কারণ ভোটার তালিকা পরিচ্ছন্ন করতে গিয়ে সবচেয়ে সমস্যার মধ্যে যে অংশটি পড়তে চলেছে সেটি মতুয়া ও নমঃশূদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের একটি বড় অংশের লোক আপাতত বিজেপি ভোটার এবং বাকিরা তৃণমূল ভোটার। নিজেদের শঙ্কা ভয়ঙ্কর ভাবে লুকিয়ে রেখেছে দল তৃণমূল, কারণ কোথায় তারা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নিজেরা ক্যালকুলেশন করতে পারছে না। চুরির ভোট শুকিয়ে গেলে কোথায় কোন ঘটি উল্টে যাবে তার হিসেব আইপ্যাক পর্যন্ত দিতে পারছে না। ফলশ্রুতিতে আগামী দিনে কাকে গাছে বাঁধা হবে আর কাকে লাইট পোষ্টে- তৃণমূল কোনো কিছুর হিসাব করতে পারছে না


SIR জুজুতে বিজেপি কোনভাবেই মুসলমানকে ভয় দেখাতে পারেনি উল্টে তাদের মতুয়া ভোট ভেঙে চুরমার। নমঃশূদ্র ভোটের অধিকাংশই তৃণমূলের দখলে ছিলো কিন্তু পশ্চিম বর্ধমান, দুই চব্বিশ পরগণা, নদীয়ার যা চালচিত্র উঠে এসেছে তাতে তৃণমূলের নমঃশূদ্র ভোট, মতুয়াদের থেকেও বেশি বিপদে পড়ে গেছে, কারণ মতুয়াদের নিয়ে তবুও তো চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছে; নমঃশুদ্র দের জন্য আলাদাভাবে বলার মত কেউ নেই। তৃণমূল চারপাশে শুধুমাত্র লাশ খুঁজে বেড়াচ্ছে, মুসলমানের বিজেপি ভয় কেটে গেলে আর নিজেদের নমঃশূদ্র ভোট হাতছাড়া হয়ে গেলে- ভাইপো সমেত গোটা দলের অধিকাংশ নেতা যে জেলে বসে চাক্কি পিসিং পিসিং, সেটা না বোঝার মত বোকা ওরা নয়। কিন্তু উভয় দলের ভয় স্পঞ্জের মতো শুষে নেওয়ার জন্য মাঠে নেমে পড়েছে একা কুম্ভ সিপিআইএম। গতকাল আনন্দ টিভিতে সুজন বাবুও, প্রদীপ করের মৃত্যুকে NRC এর সাথে জুড়ে দিয়েছেন। বাকীটা নিজেরা চেয়ে দেখুন, জবাব পেয়ে যাবেন। এর বেশী বললে ভক্ত বাম্বাচ্চার দল কামড়ে দিতে আসবে। এমন ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ টাইপের NGO ভলেন্টিয়ার সার্ভিস মার্কা বিরোধী সিপিএম থাকলে, চোর তৃনমূল আগামী ১০০ বছর ক্ষমতায় থাকবে, এটা আপনি পাথরের দেওয়ালে খোদাই করে নিন


যাই হোক, মাননীয় নেত্রী সমীপেষু, আপনিই পেহেলগাম জঙ্গি হামলার সময় 'ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ' শব্দ লিখেছিলেন, যেটা RSS থেকে অমিত শাহ, মোদী এমনকি আপনার দল অবধিও বলেনি, আপনি বলেছিলেন। আজও আপনি 'বাধ্য হয়েছে' নামে একটা তত্ত্ব এনেছেন, কটা স্থানে রিসার্চ করে এনেছেন এই তথ্য? বাংলাদেশী অধুষ্যিত কটা স্যাম্পেল গ্রামে গঞ্জে কতগুলো দিন/রাত কাটিয়েছেন সত্য উদঘাটনে? কতজন স্যাম্পেল ব্যাক্তি ও পরিবারের তথ্য রয়েছে এমন 'বাধ্য হয়েছে' দের? নাকি একটু ধর্মগন্ধী ফ্লেভার ছড়িয়ে দিয়ে বঙ্গ রাজনীতিতে 'বুদ্ধিজীবি বাম' কোটাতে নিয়মিত ভেসে থাকতে চাইছেন? পাশাপাশি ‘গুড বামপন্থী’ হিসাবে গোয়ালঘরের অভিষ্ট স্থানে বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। আপনার এই প্রবনতা নতুন কিছু নয়, ধর্ম আর জিরাফে থাকার এটা চমৎকার ‘ধান্দাবাজি’ অনেক পুরাতন খেলা, অতীতে অনেকেই খেলে সফল হয়েছেন। আপনাদের মূল সমস্যা হলো, নিজেদের বিশাল শিক্ষিত আর জ্ঞানী ভাবেন। আপনার ভাষাতে 'এর সাথে সিপিএমের শূন্য হওয়ার সম্পর্ক নেই' নয়, এটাই শূন্য হওয়ার মূল কারন


SIR কে সামনে রেখে যে বা যারা ‘পালিয়ে যাওয়া’ কে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে, তারা আসলে সুপ্ত RSS
লিবোরাল, ধর্মনিরেপেক্ষ এবং মুসলমান বিদ্বেষ RSS এর জিনে আছে; এই সুপ্ত বিদ্বেষ এতদিন যারা মনেপ্রাণে লালিত পালিত করছিল, আজকে SIR কে সামনে রেখে বমি করে ফেলেছে। এদের মনের বড় বড় পদ্ম দ্রুত বিকশিত হোক। যাদের সাদাকালো চেনার ক্ষমতা নেই, যাদের দিন রাতের পার্থক্য করার ক্ষমতা নেই যাদের ভালো-মন্দ বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা নেই, তারা পৃথিবীর যে দেশেই যে শিবিরেই থাকুক না কেন আদপে তারা সবাই ভক্ত


পৃথিবীতে কোথাও বামপন্থীদের পালিয়ে আসার ইতিহাস নেই। পালিয়ে আসার ইতিহাস একমাত্র RSS এর আছে। মুচলেকা দেওয়ার ইতিহাস একমাত্র RSS এর আছে। এই কারনেই সংখ্যাঘুঘু গুলো সব বিজেপির ভোটার। পাশের রাজ্য বিহারে ভোট চলছে। যেখানে ভূমি আন্দোলন এর বিরোধিতা এবং উচ্চবর্ণের লোকেদের দ্বারা গণহত্যা সমার্থক শব্দ। রণবীর সেনা এবং অন্যান্য মৌলবাদী মিলিশিয়া গোষ্ঠী গুলি নিম্নবর্গীয়দের উপর অসংখ্য গণহত্যা চালিয়েছে। যেমন, বেনিগ্রাম গণহত্যা, লক্ষ্মীপুর গণহত্যা, এবং রাউলি গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। এই ঘটনাগুলোতে শত শত নিরপরাধ দলিতকে হত্যা করা হয়েছিল। বিহারে মাটি কামড়ে আজকেও বামপন্থীরা একজোট হয়ে এ নির্বাচনে লড়াই করছে। তাই পালিয়ে আসতে ‘বাধ্য হয়েছে’ বলে পালিয়ে আসাকে জাষ্টিফাই করাটা আপনারা- পলায়নকারী হিসেবে কার উত্তরসূরী?


চালাক বা বুদ্ধিমান হওয়া খুব ভালো, কিন্তু সেয়ানা সাজা আসলে একধরণের ভন্ডামি ও মূর্খতার পরিচয়। কাদের উদ্দেশ্য সাধন করতে আপনি এমন উদ্দেশ্যমূলক পোষ্ট করেন তা আজকে সবটা পরিষ্কার না হলেও, বালিশকুমারের মত অবশ্যই ধরা খেয়ে যাবেন। এই মুহুর্তে আপনাকে জবাব দিতে হবেনা, জনগণ আপনাদের গুন্তিতে ধরেনা, আলিমুদ্দিনে আপনি প্রিভিলেজড- জবাবদিহির বালাই সেখানেও নেই। এছাড়া বামেদের যে ‘অন্ধভক্ত শ্রেনী’ আকাট মূর্খর দল রয়েছে, তারাই আপনাকে ডিফেন্ড করবে জান লড়িয়ে দিয়ে, আপনার এই মুহুর্তে ভয়ের কিছু নেই। সেই দিনটার প্রতীক্ষাই রইলাম, যেদিন আপনিও ‘বাধ্য হবেন’ রাজনৈতিক মাইগ্রেশন করতে। ফেসবুকের পোষ্টে গল্পটা আমিই শেয়ার করব বেঁচে থাকলে।


আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, কেন আমি টার্গেট হলাম! আপনি নিজেকে 'বাম' নেত্রী বলেই তাই এই হ্যাজ নামানো, নতুবা শুভেন্দু অধিকারী বা দিলীপ ঘোষেরা নিয়মিত তাদের ভাষণে বলে- বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। সুযোগ বুঝে তাদের ভাষা গুলো নিয়মিত আপনার মুখেও উঠে আসে, তাই আজকের পোষ্টটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এতদিন মনের মধ্যে যেটা গজ গজ করছিল, অনুকুল পরিস্থিতি পেতেই উগড়ে দিয়েছেন। পাঁহেলগাঁও ঘটনায় আপনার ‘ভাবনার’ ঝলক ইতিমধ্যেই দেশবাসি দেখে ফেলেছে। আপনারা আগামীর বাম রাজনীতিতে টিকে থাকলে, RSS এর তৃণমূল বা বিজেপিকে আলাদা করে আর দরকার লাগবে কেন! আপনার ৩৪৭৮৮৬৩৫৮৯৫৩ বার লিখে ফেলা কারনের সাথে আরো ৬০ গুন যোগ হয়ে যাবে আগামীতে, সাভারকর ওটাই পেনশন পেতেন যে। ঠিকাচে!

মনের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট জাতের প্রতি বিতৃষ্ণা রেখে রঞ্জন গগৈ হওয়া যায়, চন্দ্রচূড় হওয়া যায, তসলিমা নাসরিন হওয়া যায, সুব্রামনিয়াম স্বামী বা প্রবীণ তোবাড়িয়া অথবা তথাগত রায় হওয়া যায়। জয় গোস্বামী, শুভাপ্রসন্ন, কবীর সুমন বা অপর্ণা সেনও হওয়া যায়, এমনকি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা তিলোত্তমা মজুমদার, এমনকি গৌতম গম্ভীর পর্যন্ত হওয়া যায়; কিন্তু বামপন্থী হওয়া যায় কি? যদি না একটা মুখোশ পরে থাকে!


আপনার মনের পদ্মফুল বিকশিত হোক


বৃহস্পতিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৫

১৯৪৭ঃ দেশভাগ নাকি দেশ জুড়ে ছিলো?

 


কারা নাগরিক আর কারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, আজকের দিনে এটাই দেশজুড়ে মুখ্য আলোচনার বিষয়। চলুন একটু অন্যভাবে ভাবি আজকে এই স্বাধীনতার দিনে, একটু অন্য আঙ্গিকে।

গতকাল ছিল ১৪ আগস্ট, ৭৯ তম দেশভাগের দিন।

আমাদেরকে এটাই শেখানো হয়েছিল। হয়েছিল, কারন এতে একটা কায়েমী শ্রেনীর লাভ ছিল, আর অবশ্যই সেটা জাতীয় কংগ্রেসের। আজকের বিজেপির বাবা ঠাকুরদারা যেহেতু ইংরেজদের দালালি করত, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়াটা তৎকালীন ভক্তদের রুজি রোজগার ছিল- তাই তারা কংগ্রেসের বিরোধিতা করার পর্যায়েই ছিলোনা। স্বভাবতই নেহেরু-প্যাটেলের প্রোপ্যাগান্ডা মেশিনারি সমস্ত ক্রেডিট নিয়েছিল স্বাধীনতার।

‘সেকুলার এবং মুসলিম দুটো আলাদা আলাদা রাষ্ট্রে ‘দেশভাগের’ প্রায় সমস্ত দায় তুলে দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশদের ঘাড়ে; সামান্য কিছুটা দায় জিন্নার ফেজ টুপিতে আর কিছুটা মুচলেকা বীর- সাভারকরের চাড্ডিতে ভরে দিয়েছিল তৎকালীন কংগ্রেসের প্রোপাগান্ডা মেশিনারি।

আসলেও এই ধারণা কি সঠিক? আজকে প্রায় ৮০ বছর পর কী আমরা একটু অন্য ভাবে ভাবতে পারিনা! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইংরেজ যদি আর ৫টা বছর টেনে নিয়ে যেত পারত তাদের শাসনকাল, ইতিহাস অনুযায়ী হয়ত গান্ধী, প্যাটেল বা জিন্না- কেউই আর বেঁচে থাকতনা। ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। হতেই পারে আমার ভাবনা ভুল, তবুও একটু ব্যতিক্রমী ভাবলে ক্ষতিটা কী!

আমাদেরকে শেখানো ইতিহাস- স্বাধীনতার মত এতো বিশাল মাপের একটা ঘটনাকে অতি সরলীকরণ করে একটি সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণে বেঁধে দেয় না কি? কংগ্রেস স্বাধীনতার ক্রেডিট দাবী করে, RSS-BJP মুসলমান বিতারণ ও দেশে হিন্দুত্ব শাসন প্রতিষ্ঠার কৃতিত্বের দাবী করে। পাশাপাশি নেহেরু ও জিন্নাকে এই অতিভক্তির কারবারি নাগপুরীরা দেশভাগের জন্য দায়ি করে। কিন্তু মগজের দৃষ্টি দিয়ে যদি দেখা যায়, প্রশ্ন উঠবেই- সত্যিই কি দেশ ভাগ হয়েছিল?

নিচের ছবিতে দেওয়া মানচিত্রের প্রতি এবার লক্ষ্য করুন, স্বাধীনতা পুর্ব ১৯৪৭ সালের ভারত উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র এটা। ছোট বড় মিলিয়ে ৫৭০ টিরও বেশি রাজনৈতিক অস্তিত্ব ছিলো তৎকালীন সময়ে। আপনি এককথায় দের দেশীয় রাজ্য বলতে পারেন, তবে এরা আসলে ছিল বংশানুক্রমিক নেটিভ নবাব, রাজা, জমিদার, জায়গীরদার, মনসবদার, চৌধুরি, তালুকদার এমন নানান ব্যাক্তিবর্গের নিজশ্ব ক্ষমতার সমষ্টি, যাদের পরিষ্কার নিজশ্ব সীমানা ছিল। যেখানে নিজ কর ব্যবস্থা ছিল এই নেটিভ ক্ষমতাবানদের হাতে।

দিল্লির সুলতান হোক বা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হয়ে রানীর শাসন- সরকারকে সামান্য খাজনা তুলে দেওয়ায় পরিবর্তে তারা যথেচ্চাচারের ক্ষমতা পেতো মোটামুটিভাবে বাত্সরিক আয়ের এক দশমাংশ তৎকালীন ‘সেন্ট্রাল GST’ তথা খালিসাতে পাঠাতে হতো। নিজামত, দেওয়ান, কানুনগো, এই পদবীধারি অধিকারীরা সেন্ট্রালের সাথে নেটিভদের মাঝে যোগাযোগকারী ‘সেন্ট্রালের বেতনভুক’ কর্মচারী ছিল। এরা বিভিন্ন এলাকায় বদলিও হতেন নেটিভ জমিদারেরা কর ফাঁকি দেবার জন্য ধর্মের নামে নিষ্কর জমি’ নামের এক ধরনের জমির চরিত্র তৈরি করেছিল- মদদইমাশ, লাখেরাজ, খয়রাত, আয়মা, পীরোত্তর, দেবোত্তর, মহাত্রাণ, চাকরান, পাইকান ইত্যাদি হিসেবেআলাদা আলাদা স্টেটে আলাদা আলাদা নাম থাকলেও, সুলতানি আমল থেকে ব্রিটিশ শাসন অবধি কমবেশী একই ব্যবস্থা ছিল। মোদ্দাকথা ছোট ছোট রাজ্য গুলো বহাল তবিয়তেই ছিল নিজশ্ব পরিচয়ে।   

১৯৪৭ সালে ৫৬২টি দেশীয় রাজ্য ভারতীয় কনফেডারেশনে যোগদানের জন্য সম্মতি জানিয়েছিল; হায়দ্রাবাদ, জুনাগড়, ভোপাল ও কাশ্মীর- এরা ১৫ই আগষ্ট কিন্তু ভারতে যোগ দেয়নিকারন একে অপরের থেকে স্বাধীন শক্তি ছিল। নিজশ্ব স্বাধীন আইন-কানুন ও নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ছিল। শুদধুমাত্র বৃহত্তর প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র এবং সন্ধি জাতীয় আলাপ আলোচনার ক্ষেত্রে তারা ব্রিটিশদের উপরে নির্ভরশীল ছিলো। ব্রিটিশরাও লেলিয়ে দিতো একে অন্যের বিরুদ্ধে।

 

তাহলে কী দাঁড়ালো! ১৪ আগস্ট দেশ ভাগ হয়েছিলো নাকি এতগুলি বিভাজিত রাজ্যের একত্রীকর হয়েছিল।

মিউনিটিনির পর থেকে পরবরর্তী ৯০ বছর ধরে ব্রিটিশদের দ্বারা সরাসরি শাসিত অঞ্চলগুলি, সকলে ১৯৪৭ এর নতুন একত্রীকরণের অংশীদার হয়নিদুটো আলাদা সংস্কৃতি এক শাসনের অধীনে বসবাস করতে অস্বীকার করেছিল। ভারত উপমহাদেশের একটা শ্রেনী ব্রিটিশদের পুর্বে ভারতে আসা মুঘলদের বা এককথায় ‘মুসলমানদের’ অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দিয়ে, তাদের বংশধরদের সাথে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা বন্টন করে ‘এক দেশ’ পরিচয়ের অধীনে থাকতে অস্বীকার করেছিল।

তৎকালীন কিছু মুসলমান এমন ছিল যারা নবাবী যুগের আধিপত্যতায় আচ্ছন্ন ছিল। এই ‘অভিজাত’ বিভোরতা তাদের উন্নাসিক ও ঔদ্ধত্ব বানাবার পাশাপাশি ও হিন্দুদের অযোগ্য, তুচ্ছ বা নিচু জাত মনে করত। তারা জানত ভারত উপমহাদেশে ‘মুসলমানেরা’ সংখ্যালঘু, তাই একটা মাত্র ঐক্যবদ্ধ দেশ গঠিত হলে ‘তাদের’ রাজনৈতিক ক্ষমতা সীমিত হয়ে হ্রাস পাবে। স্বভাবতই এই ‘অভিজাত’ নবাবী মেজাজের মুসলমান ক্ষমতাবান শ্রেনী- হিন্দুদের সাথে থাকতে অস্বীকার করল। উভয় জাতের অভিজাতদের অহং- ‘গরীবদের’ ঠেলে দিলো স্থায়ী রক্তক্ষয়ী ধর্মীয় জাতি দাঙ্গার যুদ্ধে।

তারা এটা ভুলে গেল- আসল ভারতের অধিবাসী সাঁওতাল, গন্ড, দ্রাবিড়, ভীল, কোল, মুন্ডা, ভূমিজ প্রমুখেরা। মুসলমানদের আগে তারাও ভারতের মূলনিবাসীদের আক্রমণ করেছিল, তারাও আসলে অনুপ্রবেশকারীই। তারা সকলেই হিট্টি, সিথিয়ান, তুর্কি শক, হুন, পারস্য ও গ্রীকদের বংশজ। যেহেতু যুদ্ধে মুঘলদের সাথে পেরে উঠেনি পরবর্তী ১০০০ বছর ধরে, তাই ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার গন্ধ পেতেই– বিন কাশিম (৭১২ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দ) থেকে শেষ মুঘলের বংশধর ও তাদের অনুগামীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করতে উঠে পরে লাগল; ১০০০ বছরের ব্যর্থতার প্রতিশোধ নিতে।

২০২৫ সালে এসে যে সব জাতীয়তাবাদী স্লোগান শুনতে পায় আমরা, ফেসবুক, টুইটার বা হোয়াটসঅ্যাপে যে বিদ্বেষ গুলোড়ি, তার সূচনা ১২০০ বছর আগে কোনো এক অতীতকালের গর্ভে হয়েছিল, যা আজও বহমান। সত্যটা হল মুসলমান হোক বা হিট্টি, সিথিয়ান, তুর্কি শক, হুন, পারস্য ও গ্রীকদের বংশজ- যারা ‘পিওর ব্লাড’ ছিলো, আজকের ১৪৪ কোটি সংখ্যার নিরিখে তারা গননাতেও আসেনা। এদের বীর্যজাত সন্তানই হোক বা ধর্মান্তরিত হওয়া কোনও উত্তরপুরুষ- সবাইকে নিয়েই তো ‘আমরা’। ‘তাদের’ পৌরুষে জন্মানো আমরা, আমাদের পূর্বপুরুষরা, আমাদের রক্ত, আমাদের জিন- সব এই দেশের, এই মাটিরই বাসিন্দা ছিলেন। সুতরাং, ভাগ যদি হয়ে থাকে সেটা বিশ্বাসের ভাগ হয়েছে, মাটির নয়।

১৯৪৭ সালে বহু ভাষাভাষী, বহু জাতীয় কণ্ঠস্বর, ভিন্ন ভিন্ন অভ্যাসের জাতির অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশ একত্রীত হয়েছিল। বিপুল সামাজিক-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ ভূ-রাজনৈতিক ভাবে, তার স্বাধীন ‘নেটিভ স্টেট’ গুলোকে সম্মিলিত করে দুটো আলাদা আলদা মেরুতে, আলাদা শিবিরে যোগ করেছিল, ভাগ করেনি। সুতরাং বিভাজন শব্দটি আমার মতে স্বাধীনতা দিবসের সাথে যায়না, এটা একটা দূরদর্শী প্রোপাগ্যান্ডার অংশ মাত্র।

যদি প্রশ্ন করেন এর জন্য দায়ী কে! এটা কোনো এক বাক্যের জবাব হতে পারেনা, সেই দাবি করাও অন্যায়। কেউ কেউ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল, আবার কেউ দ্বিজাতি তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়েছিল। আসলে সকলেই নিজের তরফ থেকে সঠিক ছিল, প্রত্যেকের কাছে নিজশ্ব ক্ষুরধার যুক্তিও ছিলো। কিন্তু সবচেয়ে বড় ছিল, আবার ক্ষমতা হারাবার ভয়। এটা কোনো ধর্ম বা জাতিকে সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে ছিলোনা।

একদল নেহেরুকে দোষ দেয় তো অন্য দল জিন্নাহকে কেউ সাভারকরের দলকে। সত্যতা বিচার করলে, তৎকালীন ভারতের এই রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের- দেশভাগের মত এতবড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল? যেকোনো সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়, একসময় এর গতি চুড়াতে পৌঁছায়, ক্রমশ বৃদ্ধি হ্রাস পায়, অবশেষে ক্লান্ত হয়ে শেষ হয়। আন্দোলন সিদ্ধান্ত নেয়না, বড়জোর প্রভাবিত করে মাত্র, গতিপথ নির্ধারণ করেনা পাকিস্তানকে দুই টুকরো তাদের নেতারা করেনি, মুজিব আন্দোলন করেছিল মাত্র। আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানের ইচ্ছায়, ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে - ইন্দিরা গান্ধী তা করিয়েছিলেন।

স্বাধীন ভারতের তেলেঙ্গানা, ঝাড়খণ্ড গঠিত হয়েছিল। ক্ষমতাসীন সরকার যখন চেয়েছিল তখনই এগুলি গঠিত হয়েছিল। নতুবা ছত্তিশগড়ের জন্য কে আন্দোলন করেছিল? কাশ্মীরকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করার জন্য কে আন্দোলন করেছিল? খালিস্তান বা গোর্খাল্যান্ডের আন্দোলন আজ অবধি কোনো ফলাফল পেয়েছে? আন্দোলনের ফলাফলের চেয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত সবসময় বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। সেদিনও ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আমাদের লোভ লালসা, অহং, অভিজাত আর প্রতিশোধ মানসিকতা, অন্য পক্ষকে দ্বিতীয় শ্রেনির নাগরিক বানিয়ে রাখার পাশবিক তৃপ্তিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। পুর্বপুরুষের সেই ত্রুটি-বিচ্যুতির সুযোগ নিয়ে দুটি দেশ তৈরি হয়েছিল, যার কোনো দায় আমাদের আজকের প্রজন্মের নয়। আমরা শুধু ঘৃনা আর ক্ষোভ বয়ে বয়ে যাচ্ছি রক্তের নদী পথে, কেন- তার কারন কেউ জানিনা, খুঁজিনা

একটা রাষ্ট্রের সংজ্ঞা কি? জয় শ্রী রাম ধ্বনি, বন্দেমাতরম, সোনার বাংলা বা পাক সরজমিন বললেই কী রাষ্ট্রের পরিচয় দেওয়া হয়ে যায়? সংজ্ঞা নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রের ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্য, ধর্মাচারন ও কৃষ্টি দিয়ে। একটা স্লোগান কখনও একটা জাতিকে সংজ্ঞায়িত করেনা। স্বাধীনতা কোনো শারীরিক বস্তু নয়, এটা একটা দর্শন, মানসিক চিন্তাভাবনা।

স্বাধীনতা আমাদের বৈচিত্রে, এই মাটিতে বসবাসকারী প্রতিটি ব্যক্তির মর্যাদা, একে অন্যের খুশিতে অংশগ্রহণে, দুঃখে কাঁধ দেওয়াতে, সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এবং প্রতিটা ভাষাকে সমানভাবে মূল্য দেওয়াতে, তবে ঐক্যের অনুভূতি জাগবে। ক্ষমাসুলভ ভালোবাসা দিয়ে ছোট ছোট ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণ করতে না পারলে, ক্ষমতালোভী স্বার্থান্বেষীদের আবার সুযোগ দেওয়া হবে- ১৯৪৭ সালে যে সংযুক্তি হয়েছিল, তার বিভাজনে

উপমহাদেশে ‘দেশ-যোগ’ ভারতের জন্য যন্ত্রণার কারন হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, ‘দেশভাগ যন্ত্রণার কারণ হয়েছিল ১৯৭১ সালেযোগ বা ভাগ, কোনটাই মানুষের জন্য সুখ বয়ে আনেনি। আজকের দিনেও আমরা রুটিরুজির চিন্তার চেয়ে বড় আতঙ্কে থাকি- আমাদের রাষ্ট্রগত পরিচয় কি? সংখ্যাগুরু সবসময় অন্যপক্ষকে দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক বানাবার সামান্য সুযোগ ছাড়েনা। ফলে মানুষ ছিন্নমূল হয়ে যায়, অবৈধ হয়ে যায় নিজের অজান্তে, নিজভূমে, নিজের রক্তের কাছে।

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...