কারা নাগরিক আর কারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, আজকের দিনে এটাই দেশজুড়ে মুখ্য আলোচনার বিষয়। চলুন একটু অন্যভাবে ভাবি আজকে এই স্বাধীনতার দিনে, একটু অন্য আঙ্গিকে।
গতকাল ছিল ১৪ আগস্ট, ৭৯ তম দেশভাগের দিন।
আমাদেরকে এটাই শেখানো হয়েছিল। হয়েছিল, কারন এতে একটা কায়েমী শ্রেনীর লাভ ছিল, আর অবশ্যই সেটা জাতীয় কংগ্রেসের। আজকের বিজেপির বাবা ঠাকুরদারা যেহেতু ইংরেজদের দালালি করত, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়াটা তৎকালীন ভক্তদের রুজি রোজগার ছিল- তাই তারা কংগ্রেসের বিরোধিতা করার পর্যায়েই ছিলোনা। স্বভাবতই নেহেরু-প্যাটেলের প্রোপ্যাগান্ডা মেশিনারি সমস্ত ক্রেডিট নিয়েছিল স্বাধীনতার।
‘সেকুলার এবং মুসলিম’ দুটো আলাদা আলাদা রাষ্ট্রে ‘দেশভাগের’ প্রায় সমস্ত দায় তুলে দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশদের ঘাড়ে; সামান্য কিছুটা দায় জিন্নার ফেজ টুপিতে আর কিছুটা মুচলেকা বীর- সাভারকরের চাড্ডিতে ভরে দিয়েছিল তৎকালীন কংগ্রেসের প্রোপাগান্ডা মেশিনারি।
আসলেও এই ধারণা কি সঠিক? আজকে প্রায় ৮০ বছর পর কী আমরা একটু অন্য ভাবে ভাবতে পারিনা! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইংরেজ যদি আর ৫টা বছর টেনে নিয়ে যেত পারত তাদের শাসনকাল, ইতিহাস অনুযায়ী হয়ত গান্ধী, প্যাটেল বা জিন্না- কেউই আর বেঁচে থাকতনা। ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। হতেই পারে আমার ভাবনা ভুল, তবুও একটু ব্যতিক্রমী ভাবলে ক্ষতিটা কী!
আমাদেরকে শেখানো ইতিহাস- স্বাধীনতার মত এতো বিশাল মাপের একটা ঘটনাকে অতি সরলীকরণ করে একটি সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণে বেঁধে দেয় না কি? কংগ্রেস স্বাধীনতার ক্রেডিট দাবী করে, RSS-BJP মুসলমান বিতারণ ও দেশে হিন্দুত্ব শাসন প্রতিষ্ঠার কৃতিত্বের দাবী করে। পাশাপাশি নেহেরু ও জিন্নাকে এই অতিভক্তির কারবারি নাগপুরীরা দেশভাগের জন্য দায়ি করে। কিন্তু মগজের দৃষ্টি দিয়ে যদি দেখা যায়, প্রশ্ন উঠবেই- সত্যিই কি দেশ ভাগ হয়েছিল?
নিচের ছবিতে দেওয়া মানচিত্রের প্রতি এবার লক্ষ্য করুন, স্বাধীনতা পুর্ব ১৯৪৭ সালের ভারত উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র এটা। ছোট বড় মিলিয়ে ৫৭০ টিরও বেশি রাজনৈতিক অস্তিত্ব ছিলো তৎকালীন সময়ে। আপনি এককথায় এদের ‘দেশীয় রাজ্য’ বলতে পারেন, তবে এরা আসলে ছিল বংশানুক্রমিক নেটিভ নবাব, রাজা, জমিদার, জায়গীরদার, মনসবদার, চৌধুরি, তালুকদার এমন নানান ব্যাক্তিবর্গের নিজশ্ব ক্ষমতার সমষ্টি, যাদের পরিষ্কার নিজশ্ব সীমানা ছিল। যেখানে নিজ কর ব্যবস্থা ছিল এই নেটিভ ক্ষমতাবানদের হাতে।
দিল্লির সুলতান হোক বা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হয়ে রানীর শাসন- সরকারকে সামান্য খাজনা তুলে দেওয়ায় পরিবর্তে তারা যথেচ্চাচারের ক্ষমতা পেতো। মোটামুটিভাবে বাত্সরিক আয়ের এক দশমাংশ তৎকালীন ‘সেন্ট্রাল GST’ তথা খালিসাতে পাঠাতে হতো। নিজামত, দেওয়ান, কানুনগো, এই পদবীধারি অধিকারীরা সেন্ট্রালের সাথে নেটিভদের মাঝে যোগাযোগকারী ‘সেন্ট্রালের বেতনভুক’ কর্মচারী ছিল। এরা বিভিন্ন এলাকায় বদলিও হতেন। নেটিভ জমিদারেরা কর ফাঁকি দেবার জন্য ধর্মের নামে ‘নিষ্কর জমি’ নামের এক ধরনের জমির চরিত্র তৈরি করেছিল- মদদইমাশ, লাখেরাজ, খয়রাত, আয়মা, পীরোত্তর, দেবোত্তর, মহাত্রাণ, চাকরান, পাইকান ইত্যাদি হিসেবে। আলাদা আলাদা স্টেটে আলাদা আলাদা নাম থাকলেও, সুলতানি আমল থেকে ব্রিটিশ শাসন অবধি কমবেশী একই ব্যবস্থা ছিল। মোদ্দাকথা ছোট ছোট রাজ্য গুলো বহাল তবিয়তেই ছিল নিজশ্ব পরিচয়ে।
১৯৪৭ সালে ৫৬২টি দেশীয় রাজ্য ভারতীয় কনফেডারেশনে যোগদানের জন্য সম্মতি জানিয়েছিল;
হায়দ্রাবাদ, জুনাগড়, ভোপাল ও কাশ্মীর- এরা ১৫ই আগষ্ট কিন্তু ভারতে যোগ দেয়নি। কারন একে অপরের থেকে স্বাধীন শক্তি ছিল। নিজশ্ব স্বাধীন আইন-কানুন ও নিজেদের
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ছিল। শুদধুমাত্র বৃহত্তর প্রতিরক্ষা,
পররাষ্ট্র এবং সন্ধি জাতীয় আলাপ আলোচনার ক্ষেত্রে তারা
ব্রিটিশদের উপরে নির্ভরশীল ছিলো। ব্রিটিশরাও লেলিয়ে দিতো একে
অন্যের বিরুদ্ধে।
তাহলে কী দাঁড়ালো! ১৪ আগস্ট দেশ ভাগ হয়েছিলো নাকি এতগুলি বিভাজিত রাজ্যের একত্রীকরণ হয়েছিল।
মিউনিটিনির পর থেকে পরবরর্তী ৯০ বছর ধরে ব্রিটিশদের দ্বারা সরাসরি শাসিত অঞ্চলগুলি, সকলে ১৯৪৭ এর নতুন একত্রীকরণের অংশীদার হয়নি। দুটো আলাদা সংস্কৃতি এক শাসনের অধীনে বসবাস করতে অস্বীকার করেছিল। ভারত উপমহাদেশের একটা শ্রেনী ব্রিটিশদের পুর্বে ভারতে আসা মুঘলদের বা এককথায় ‘মুসলমানদের’ অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দিয়ে, তাদের বংশধরদের সাথে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা বন্টন করে ‘এক দেশ’ পরিচয়ের অধীনে থাকতে অস্বীকার করেছিল।
তৎকালীন কিছু মুসলমান এমন ছিল যারা নবাবী যুগের আধিপত্যতায় আচ্ছন্ন ছিল। এই ‘অভিজাত’ বিভোরতা তাদের উন্নাসিক ও ঔদ্ধত্ব বানাবার পাশাপাশি ও হিন্দুদের অযোগ্য, তুচ্ছ বা নিচু জাত মনে করত। তারা জানত ভারত উপমহাদেশে ‘মুসলমানেরা’ সংখ্যালঘু, তাই একটা মাত্র ঐক্যবদ্ধ দেশ গঠিত হলে ‘তাদের’ রাজনৈতিক ক্ষমতা সীমিত হয়ে হ্রাস পাবে। স্বভাবতই এই ‘অভিজাত’ নবাবী মেজাজের মুসলমান ক্ষমতাবান শ্রেনী- হিন্দুদের সাথে থাকতে অস্বীকার করল। উভয় জাতের অভিজাতদের অহং- ‘গরীবদের’ ঠেলে দিলো স্থায়ী রক্তক্ষয়ী ধর্মীয় জাতি দাঙ্গার যুদ্ধে।
তারা এটা ভুলে গেল- আসল ভারতের অধিবাসী সাঁওতাল, গন্ড, দ্রাবিড়, ভীল, কোল, মুন্ডা, ভূমিজ প্রমুখেরা। মুসলমানদের আগে তারাও ভারতের মূলনিবাসীদের আক্রমণ করেছিল, তারাও আসলে অনুপ্রবেশকারীই। তারা সকলেই হিট্টি, সিথিয়ান, তুর্কি শক, হুন, পারস্য ও গ্রীকদের বংশজ। যেহেতু যুদ্ধে মুঘলদের সাথে পেরে উঠেনি পরবর্তী ১০০০ বছর ধরে, তাই ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার গন্ধ পেতেই– বিন কাশিম (৭১২ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দ) থেকে শেষ মুঘলের বংশধর ও তাদের অনুগামীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করতে উঠে পরে লাগল; ১০০০ বছরের ব্যর্থতার প্রতিশোধ নিতে।
২০২৫ সালে এসে যে সব জাতীয়তাবাদী স্লোগান শুনতে পায় আমরা, ফেসবুক, টুইটার বা হোয়াটসঅ্যাপে যে বিদ্বেষ গুলো পড়ি, তার সূচনা ১২০০ বছর আগে কোনো এক অতীতকালের গর্ভে হয়েছিল, যা আজও বহমান। সত্যটা হল মুসলমান হোক বা হিট্টি, সিথিয়ান, তুর্কি শক, হুন, পারস্য ও গ্রীকদের বংশজ- যারা ‘পিওর ব্লাড’ ছিলো, আজকের ১৪৪ কোটি সংখ্যার নিরিখে তারা গননাতেও আসেনা। এদের বীর্যজাত সন্তানই হোক বা ধর্মান্তরিত হওয়া কোনও উত্তরপুরুষ- সবাইকে নিয়েই তো ‘আমরা’। ‘তাদের’ পৌরুষে জন্মানো আমরা, আমাদের পূর্বপুরুষরা, আমাদের রক্ত, আমাদের জিন- সব এই দেশের, এই মাটিরই বাসিন্দা ছিলেন। সুতরাং, ভাগ যদি হয়ে থাকে সেটা বিশ্বাসের ভাগ হয়েছে, মাটির নয়।
১৯৪৭ সালে বহু ভাষাভাষী, বহু জাতীয় কণ্ঠস্বর, ভিন্ন ভিন্ন অভ্যাসের জাতির অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশ একত্রীত হয়েছিল। বিপুল সামাজিক-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ ভূ-রাজনৈতিক ভাবে, তার স্বাধীন ‘নেটিভ স্টেট’ গুলোকে সম্মিলিত করে দুটো আলাদা আলদা মেরুতে, আলাদা শিবিরে যোগ করেছিল, ভাগ করেনি। সুতরাং বিভাজন শব্দটি আমার মতে স্বাধীনতা দিবসের সাথে যায়না, এটা একটা দূরদর্শী প্রোপাগ্যান্ডার অংশ মাত্র।
যদি প্রশ্ন করেন এর জন্য দায়ী কে! এটা কোনো এক বাক্যের জবাব হতে পারেনা, সেই দাবি করাও অন্যায়। কেউ কেউ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল, আবার কেউ দ্বিজাতি তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়েছিল। আসলে সকলেই নিজের তরফ থেকে সঠিক ছিল, প্রত্যেকের কাছে নিজশ্ব ক্ষুরধার যুক্তিও ছিলো। কিন্তু সবচেয়ে বড় ছিল, আবার ক্ষমতা হারাবার ভয়। এটা কোনো ধর্ম বা জাতিকে সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে ছিলোনা।
একদল নেহেরুকে দোষ দেয় তো অন্য দল জিন্নাহকে কেউ সাভারকরের দলকে। সত্যতা বিচার করলে, তৎকালীন ভারতের এই রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের- দেশভাগের মত এতবড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল? যেকোনো সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়, একসময় এর গতি চুড়াতে পৌঁছায়, ক্রমশ বৃদ্ধি হ্রাস পায়, অবশেষে ক্লান্ত হয়ে শেষ হয়। আন্দোলন সিদ্ধান্ত নেয়না, বড়জোর প্রভাবিত করে মাত্র, গতিপথ নির্ধারণ করেনা। পাকিস্তানকে দুই টুকরো তাদের নেতারা করেনি, মুজিব আন্দোলন করেছিল মাত্র। আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানের ইচ্ছায়, ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে - ইন্দিরা গান্ধী তা করিয়েছিলেন।
স্বাধীন ভারতের তেলেঙ্গানা, ঝাড়খণ্ড গঠিত হয়েছিল। ক্ষমতাসীন সরকার যখন চেয়েছিল তখনই এগুলি গঠিত হয়েছিল। নতুবা ছত্তিশগড়ের জন্য কে আন্দোলন করেছিল? কাশ্মীরকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করার জন্য কে আন্দোলন করেছিল? খালিস্তান বা গোর্খাল্যান্ডের আন্দোলন আজ অবধি কোনো ফলাফল পেয়েছে? আন্দোলনের ফলাফলের চেয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত সবসময় বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। সেদিনও ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আমাদের লোভ লালসা, অহং, অভিজাত আর প্রতিশোধ মানসিকতা, অন্য পক্ষকে দ্বিতীয় শ্রেনির নাগরিক বানিয়ে রাখার পাশবিক তৃপ্তিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। পুর্বপুরুষের সেই ত্রুটি-বিচ্যুতির সুযোগ নিয়ে দুটি দেশ তৈরি হয়েছিল, যার কোনো দায় আমাদের আজকের প্রজন্মের নয়। আমরা শুধু ঘৃনা আর ক্ষোভ বয়ে বয়ে যাচ্ছি রক্তের নদী পথে, কেন- তার কারন কেউ জানিনা, খুঁজিওনা।
একটা রাষ্ট্রের সংজ্ঞা কি? জয় শ্রী রাম ধ্বনি, বন্দেমাতরম, সোনার বাংলা বা পাক সরজমিন বললেই কী রাষ্ট্রের পরিচয় দেওয়া হয়ে যায়? সংজ্ঞা নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রের ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্য, ধর্মাচারন ও কৃষ্টি দিয়ে। একটা স্লোগান কখনও একটা জাতিকে সংজ্ঞায়িত করেনা। স্বাধীনতা কোনো শারীরিক বস্তু নয়, এটা একটা দর্শন, মানসিক চিন্তাভাবনা।
স্বাধীনতা আমাদের বৈচিত্রে, এই মাটিতে বসবাসকারী প্রতিটি ব্যক্তির মর্যাদায়, একে অন্যের খুশিতে অংশগ্রহণে, দুঃখে কাঁধ দেওয়াতে, সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এবং প্রতিটা ভাষাকে সমানভাবে মূল্য দেওয়াতে, তবে ঐক্যের অনুভূতি জাগবে। ক্ষমাসুলভ ভালোবাসা দিয়ে ছোট ছোট ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণ করতে না পারলে, ক্ষমতালোভী স্বার্থান্বেষীদের আবার সুযোগ দেওয়া হবে- ১৯৪৭ সালে যে সংযুক্তি হয়েছিল, তার বিভাজনে।
উপমহাদেশে ‘দেশ-যোগ’ ভারতের জন্য যন্ত্রণার কারন হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, ‘দেশভাগ’ যন্ত্রণার কারণ হয়েছিল ১৯৭১ সালে। যোগ বা ভাগ, কোনটাই মানুষের জন্য সুখ বয়ে আনেনি। আজকের দিনেও আমরা রুটিরুজির চিন্তার চেয়ে বড় আতঙ্কে থাকি- আমাদের রাষ্ট্রগত পরিচয় কি? সংখ্যাগুরু সবসময় অন্যপক্ষকে দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক বানাবার সামান্য সুযোগ ছাড়েনা। ফলে মানুষ ছিন্নমূল হয়ে যায়, অবৈধ হয়ে যায় নিজের অজান্তে, নিজভূমে, নিজের রক্তের কাছে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন