সোমবার, ১১ আগস্ট, ২০২৫

ভারতের পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারন কে করে?

 


কেন পাকিস্তানের সাথে ক্রিকেট ম্যাচ খেলবে

এর উত্তর খুব সোজা কিন্তু রচনাত্বক।

প্রত্যেকে চায় তার প্রতিষ্ঠিত হোক, অমিত শাহ তার ছেলেকে এই মুহুর্তে ভারতের সবচেয়ে ধনী যে বেসরকারী সংস্থা (বোর্ড) রয়েছে সেই BCCI এর উচ্চপদে আসীন করিয়ে রেখেছে। বর্তমানে সে ICC এর পদে থাক বা যেখানেই থাক, ছেলের নামে অমিত শাহ পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করছে সেটা সকলে জানি। এখানে এতো বেশি টাকা রয়েছে যে টানা দুটো টার্ম স্বপদে রয়ে যেতে পারলে বাকি জীবন রোজগার না করলেও চলে।

এশিয়া কাপের মূল স্পনসর আরব আমিরাতের সরকারী কোম্পানি DP World, যারা ভাইব্রেন্ট গুজরাতের টাইটেল স্পনসর ছিলো। গান্ধীনগরের দীনদয়াল পোর্টের মালিকানার পাশাপাশি মুম্বই এর JNPT বন্দরের ৩টে ডকের মালিকানাও রয়েছে। ‘ভীমাসার-কলকাতা’ পণ্য রেল পরিসেবা চালাবার দায়িত্ব পেয়েছে। এছাড়া ভারত সরকার ও আফ্রিকার মাঝে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাঝেও এই DP World জাঁকিয়ে রয়েছে ‘Bharat Africa Setu’ নাম নিয়ে। দুবাই এ জনগনের করের টাকায় ভারত সরকারের তৈরি করা ‘ভারত মার্ট’ শপিং কমপ্লেক্স তৈরির বরাত পেয়েছে।

আদানির যাবতীয় সমুদ্রবন্দর গুলোতে এই DP ওয়ার্ল্ড পণ্য হ্যান্ডেলিং এর কাজ করে। Container Corporation of India (Concor), যা ভারতীয় রেলের প্রাণ- সেই সরকারী পন্য পরিবাহী রেলওয়ে কোম্পানিটিকে বেসরকারীকরন করে ‘ADANI–DP World’ জয়েন্ট ভেঞ্চারের কাছে বেচে দেওয়ার প্ল্যান পাকা করেছে মোদী সরকার।

➤ https://www.pib.gov.in/PressReleasePage.aspx?PRID=2062903

➤ https://www.dpworld.com/en/news/gujarat-and-dp-world-sign-agreements-to-strengthen-logistics-in-the-indian-state

➤ https://www.cnbctv18.com/infrastructure/concor-privatisation-draws-interest-from-dp-world-adani-and-vedanta-8640071.htm

এর পরের পার্টনার ‘ওয়ান্ডার সিমেন্ট’। যাদের মূল ব্যবসা মার্বেলের, কোম্পানির নাম RK Marble. এর মালিকের নাম ‘বিবেক পাটনি’। এই বিবেক পাটনি অমিত শাহ এর অতি ঘনিষ্টের অন্যতম। গুজরাতে সোহরাবুদ্দিন ও তার স্ত্রী এনকাউন্টার মামলাতে মূল অভিযুক্ত ছিল CBI এর চার্যশিটে, বিচারপতি লোয়া খুন সন্দেহ তালিকাতেও এই ব্যাক্তিই অমিত শাহ এর হয়ে সুপারি দিয়েছিল বলেই অভিজ্ঞ মহলের বিশ্বাস।

২০০১ সাল থেকে মার্বেলের বাইরে অন্যান্য ব্যবসাতে এদের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে গুজরাতে মোদী সরকারের সৌজন্যে, ২০১৪ সালের পর আক্ষরিক অর্থে এদের অমৃত কাল আসে এবং পরবর্তী ৫ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক, একাধিক সিমেন্ট ফ্যাক্টারির মালিক ও দেশ জুড়ে জমির মালিক হয়ে উঠে।

✅ DP World ও Wonder Cement এর মত সংস্থা যখন এশিয়া কাপের মুখ্য স্পনসর, সেখানে অমিত শাহ এর ক্ষমতা কী ‘মানা করবে”! জয় শাহ, নেহাতই নাবালক ও নির্বোধ পাপ্পু।

কিন্তু প্রশ্ন তো দেশের বিদেশনীতি ও অর্থনীতির, প্রতিরক্ষার, এগুলো তাহলে কে ঠিক করে? অর্থনীতির দিশা কে বা কারা দেয়? ❓

বাকি সকল দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অধীনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক থাকে, ২০১৪ পূর্ববর্তী আমাদের দেশেও তেমনই ছিল। সেই দপ্তরের মন্ত্রী, আমলা, দেশের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা সেনা শাসন থাকলে সেনা কর্তা প্রমুখ, নানান অঞ্চলের সিলেক্টিভ জনপ্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, বিদেশ ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ পন্ডিতের দল ও উচ্চপদস্থ সরকারী আমলারাই সিদ্ধান্ত নেয়।
২০১৪ পরবর্তী RSS শাসিত মোদীর ভারতে এই নিয়মটার পরিবর্তন হয়ে গেছে। মোদী মূলত শো-ম্যান, টেলিপ্রম্পটার সামনে নিয়ে ক্যামেরার দিকে তাক করে আত্মবিশ্বাসের সাথে মিথ্যা বলে, আর শারিরীক অঙ্গভঙ্গী সহ মোটাদাগের অভিনয় করে টেনে টেনে সাম্প্রদায়িক কথা বলে ভক্তদের উদ্দেশ্যে।

আপনি ভাবছেন বিদেশমন্ত্রী লেজার জয়শঙ্কর বা গরীবের জেমস বন্ড- অজিত ডোভাল, বৈদেশিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়! অরুন জেটলি বা নির্মলা সীতারামন অর্থনীতির সিদ্ধান্ত নিয়েছে!

মোদী জামানায় ৯ জন অর্থমন্ত্রকের সেক্রেটারি হয়েছে, বর্তমান জনের নাম অজয় শেঠ। বিতাড়িত অশোক লাভাসা থেকে “কবিশ্রী” রাজীব কুমার- সকলেই এই পদ কলঙ্কিত সরি অলঙ্কৃত করেছে। এদের কাজ কী ধরণের, আজ ভারতেই সকলেই জানে, সৌজন্যে ভোট চুরির ম্যানিপুলেশন ফর্মুলা। এরা IAS ডিগ্রীধারি হলেও, মূলত দিল্লির কেশবকুঞ্জের নেড়ি। কে জানে সুপ্রিম কোর্ট এই ঘেঁয়ো গুলোকেই খাঁচায় বন্দি করার অর্ডার দিয়েছে কিনা!

মোদী জামানার বিদেশ সচিব পদে ২০১৫ সালে প্রথম এ্যাপোয়েন্টমেন্ট ‘লেজার’ জয়শঙ্কর, এরপর যারা এসেছেন- কাগজে লেখা বিবৃতির বাইরে তেমন কোনো কাজ এনাদের করতে হয়নি বা করতে দেয়নি। যিনি কিছু করেছেন এবং তা কার্টেলের পক্ষে, শ্রীংলার মত রাজ্যসভায় যাবার হাতেগরম পুরষ্কারও পেয়েছেন। যিনি বিরুদ্ধে গেছিলেন সেই অশোক লাভাসার ছেলে মেয়েকে জেলে পাঠিয়ে, স্ত্রী ও আত্মীয় স্বজনের নামে মামলা করে, ED এর রেড করিয়ে যাবতীয় হয়রানি করিয়ে, আপাতত এশিয়ান ডেভলপমেন্ট এর একটা পদে পাঠিয়ে তড়িপাড় করে দিয়েছে।

তাহলে অর্থমন্ত্রক আর বিদেশ মন্ত্রকের মত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর চালায় কে?


💥 ১ কথায় উত্তর- “আদানি ও আম্বানি”।


কীভাবে? চলুন, সেটাই দেখুন।

১) আম্বানির একটা সংস্থা রয়েছে https://www.orfonline.org/, এই সংস্থার ৯৭% ফান্ডিং করে রিলায়েন্স ইন্ড্রাস্ট্রিজ। আমেরিকার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য এই সংস্থার সর্বোচ্চ কর্তার নাম ‘ধ্রুব জয়শঙ্কর’। হুম, ঠিকিই ধরেছেন, লেজার বাবুরই ছেলে। ইনি ভারত সরকার অনুমোদিত অফিসিয়াল ব্যক্তি। ফলত ট্রাম্পের শপথ গ্রহনে মোদী ডাক না পেলেও মুকেশ আম্বানি ডাক পায়, সৌদিতে ট্রাম্প এলে আম্বানি ঠিক পৌছে যায়। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে ভারত রাষ্ট্রের হয়ে এই সংস্থা বিদেশনীতি তৈরি করে, বিশেষ করে আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য অংশে।


২) এর পর রয়েছে India Foundation, যার মাথায় রয়েছে RSS এর কার্যকর্তা প্রচারক রাম মাধব, আর মূল সংগঠন চালায় শৌর্য্য ডোভাল, হুম- ভক্তদের জেমস বন্ডের ছেলে। বাকি আরো কিছু কেষ্টবিষ্টু রয়েছে, তারাও ওই গোয়ালঘরের প্রোডাক্ট, বকনা বাছুর ও বৃদ্ধ ষাঁড়ের দল। এরাও ‘গর্ভমেন্ট অফ ইন্ডিয়ার’ অফিসিয়াল থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিদেশ নীতি ও কূটনীতি তৈরি করে।

➤ https://indiafoundation.in/

৩) এদের সাথে রয়েছে আদানি ফাউন্ডেশনের অধীনস্থ CRF (Chintan Research Foundation), এরা আবার ভারতের অর্থনীতি, বিদেশনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতিও তৈরি করে, Govt of India এর হয়ে অফিসিয়ালি। ভোট চুরির ডেটা ম্যানেজমেন্ট নাকি এরাই করতো, তাই ৯ই আগষ্ট থেকে এদের মূল ওয়েবসাইট বন্ধ করে রেখেছে। পাশাপাশি আর একটা সংস্থা আছে আদানির- APSE, এদের কাজ বৈদেশিক বানিজ্য বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া।

গত ১০ বছরে ভারতে যত বিদেশী রাষ্ট্রদুত ও বানিজ্যিক প্রতিনিধি দল এদেছে, প্রতেককে ‘হোস্টিং’ করার বরাত পেয়েছিল আদানির এই সংস্থাই। মোদী যখনই বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণে গেছে – উপরোক্ত ৩ ধরণের সংস্থার লোকজনই তার সাথে গেছে। বুঝে গেলেন, কারা মূলত ভারতের অর্থনীতি, বিদেশনীতি আর প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ন্ত্রন, তৈরি করে চলেছে মোদীর জামানাতে!
➤ https://www.crfindia.org/

বিজেপি ও তাদের ঘনিষ্ট আমলাদের প্রত্যেকের ছেলে-মেয়ে ‘দেশ বিক্রিতে’ নিয়োজিত প্রতিটি ‘দেশাত্ববোধক’ ও ‘হিন্দুত্বে’ ভরপুর সংস্থার মাথায় বসে রয়েছে। আপনার ছেলে জয় শ্রী রাম নাদে মদজিদের চূড়ায় উঠে গেরুয়া উড়াচ্ছে, তরোয়াল হাতে রামনবমীর মিছিল করছে মুসলমান পাড়ার মুখে, স্বাধীনতা দিবসে মাংস কিনতে বাঁধা দিচ্ছে। দলিত আর মুসলমান মেরে নিজেকে হিন্দুত্বের রক্ষাকর্তা ভাবছে। এটাই RSS এর জাতীয়তাবাদ, আপনার ছেলেকে ধর্ম দিয়ে মাতিয়ে রাখবে, ওদের ছেলেরা দেশ বিক্রি করে বিদেশে সেটেল হয়ে যাবে।

দেশের ৭৩% মেইনস্ট্রিম মিডিয়া রিলায়েন্স-জিওর দখলে। হ্যাঁ, হোয়াটস্যাপও, ওখান থেকেই ভক্তদের ইউনিভার্সিটি চলে। বাকি ১৯% মেইনস্ট্রিম মিডিয়া আদানি গোষ্ঠীর। বাকি যে ৮%, সেগুলো বিজেপির সাংসদ সুভাষচন্দ্রের জি-নিউজ, বা অর্ণবদের মত নাগপুরের হাফপ্যান্টওয়ালাদের। আনন্দবাজারের মত আঞ্চলিক ভাষার মিডিয়া গুলোও RSS এর মতাদর্শেই চলে, নাহলে কেন্দ্রের বিজ্ঞাপন পাবেনা, আর সংশ্লিষ্ট রাজ্যের শাসককে খুশি করে চলে এরা।

সংবাদ প্রতিদিন, খবর ৩৬৫, যুগশঙ্খ বা কলম- এই জাতীয় কাগজ গুলো একমাত্র বাচ্চাকে হাগাবার জন্য মায়েরা কেনে। কেরল আর তামিলনাড়ু ব্যতিরেকে অবশিষ্ট ৭% মিডিয়াই নাগপুরের গোয়ালঘর থেকে সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হয়। ৯২% মিডিয়া ইতিমধ্যেই গুজ্জু কার্টেলের হাতে। তাই এরা কখনই আপনাকে শুনতেও দেবেনা যে কারা আসলে সরকার চালাচ্ছে। এর বাইরে ২ টাকা পোষ্টের সোস্যাল মিডিয়া ব্রিগেড মহান আঁটসেল তো আছেই মিথ্যা প্রচারের জন্য।

মোদী এই গুজ্জু কার্টেলের বিজ্ঞাপনী ও রাজনৈতিক মুখ মাত্র, দেশের আসল নিয়ন্ত্রক ওই দুই গুজরাতি মাফিয়া, যারা দেশের বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনী সিস্টেম, CAG, FCI, UPSC, GST, AGI, ASG সহ প্রায় প্রতিটি ফেডারাল স্ট্রাকচারকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিয়েছে, উগ্র দেশপ্রেম আর হিন্দুত্বের রঙে সাজিয়ে। তলে তলে নিজেরা দেশ লুঠের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আপনার আমার শ্রমের অর্থ এরা চুরি করছে রোজ, আমাদের পূর্বপুরুষের মেহনতও লুঠ করছে নির্বিচারে- ধর্মের গাজর ঝুলিয়ে।

তাই আপনি আমি যতই দেশ নিয়ে আবেগান্বীত হই না কেন, ভারত পাকিস্তান ম্যাচ হবে, কারন দেশ যারা চালায়- সেই কার্টেল সরাসরি ভাবে এই ব্যবসার মুনাফাখোর। যেদিন কেন্দ্রের সরকার বদলাবে, এদের অধিকাংশই জেলের ভিতরে থাকবে আজীবন, যেকনো মূল্যে ‘সরকার’ নামের সার্কাসটার তাবু বাঁচাতে মরিয়া এরা।

আবার ‘হিন্দু খতরেমে হ্যাঁয়’ মন্ত্র নিয়ে আপনার দ্বারে ছুটে আসবে এরা। আজ হিন্দু নয়, এই চোর গুলো নিজেরা বিপদে পরেছে, তারা ‘খতরেমে’। তাই হিন্দুত্বর আবেগকে বেচতে আসবে মেজো খোকার রূপ নিয়ে, যার পালে হাওয়া দেবে মুসলমানের মসিহা সাজা ‘কয়লা ভাইপোর পিসি’। মিডিয়াতে ন্যারেটিভ সেট হবে বিজেপি-তৃনমূল, আরেকটা দল সেটিং সেটিং করে চেঁচিয়েই মল খসিয়ে ফেলবে। সবাই নিজের নিজের আখের গুছাবে। আর সেই প্রোপাগান্ডার জলোচ্ছাসে আবার যদি ভেসে যান, আপনার আগামী প্রজন্মের পরনের ত্যানা টুকু বাঁচবে কী?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ঘৃণার যাত্রাপথঃ স্টেট স্পনসর্ড টেরোরিজম ও RSS

  ধর্মীয় শোভাযাত্রা এখন দাঙ্গা বাঁধানোর মূল অস্ত্র, নাগপুরের হিন্দুত্ব আধিপত্যবাদীরা ভারতের আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করছে দিয়েছে; যার মেরামতিতে কয়...