(১)
কথা ছিল অকপট নিয়ে লেখার, কারণ অকপটের জন্মতিথি উদযাপনী পক্ষ চলছে। কিন্তু অকপট একটা অন্তর্জালীয় ভার্চুয়াল জগত, আমরা জোর করে গুটিকয়েক মানুষ একে ‘একচুয়াল’ রূপ দিয়েছি বটে, তবে তাতে ভার্চুয়াল এসেন্সটা হারিয়ে যায়নি মোটেও। মোদ্দা কথা হোয়াটস অ্যাপ, টেলিগ্রাম হয়ে টুইটার, তারই মাঝে নানান মাধ্যমের পত্রিকা সাজলেও- আদতে আসল গ্রুপ বললে কিন্তু এই ফেসবুকীয় গ্রুপটিকেই বুঝি। তাই এই পর্যায়ে ফেসবুকে থাকা আপনি আর বাকিদের নিয়ে একটা অ-দরকারী আলাপচারিতা ভাঁজব, যার মাঝখানে রয়েছে ফেসবুক। আরও খান দুয়েক প্রবন্ধ লেখার ইচ্ছা আছে এই জন্মতিথিতে- একটা খাদ্য বিষয়ক, অন্যটা করোনা উত্তর পৃথিবী। যাই হোক বাজে না বকে, চলুন শুরু করা যায়-
আপনি চোর বা ডাকাত! নির্জীব না সিপিএম! কেপমারি করেন কিম্বা তোলামূল! হাতেনাতে ধরা পড়েছেন? জেল জরিমানা খেটে সমাজের পরিচিত বা বিখ্যাত তথা কুখ্যাত মুখ! তাহলে চিন্তা নেই, নিশ্চিন্তে ফেসবুক করুন। ধর্ষণ করেছেন? রাজনীতিও করেন! আরিব্বাস, তাহলে সোনায় সোহাগা। ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, পিছনে হাঁড়িচাঁচার দল ভিড় জমাবে শিগগিরই, নিশ্চিন্তে ফেসবুক করুন। আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক, ডেজিগনেশন নিয়ে। আপনি কোনো উগ্রবাদী দলের সমর্থক? বজরং দল কিম্বা বাংলাপক্ষ! গরম গরম বিস্ফোরক লাইন ঝাড়ছেন নিজ সংগঠনের সমর্থনে? তাহলে তো কথাই নেই বস, আপনাকে যমেও ছোঁবে না। বরং যমের সহোদরা তাঁর অনুপ্রেরণা, ইয়ে জেন্ডারে গন্ডগোল হয়ে যাচ্ছে- মানে শনি মহারাজ স্বয়ং আপনার উপরে তুষ্ট হবেন নীলা রত্ন ধারণ না করেও, ফলত কিছু গু’য়ে মাছি ভনভনিয়ে ভিড় জমাবে আপনাকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু, যদি আপনি দু’কলম লিখে ফেলেন এই সকলের বাইরে- তাহলে আর রক্ষে নেই! কী লিখেছেন সেটা বড় কথা নয়, কেন লিখেছেন সেটাই বড় কথা। অতএব আপনিই হলেন সেই ‘বিষয়’। অবশ্য আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে প্রায় সকলেই লেখক, কমেন্টও তো লেখে রে বাবা। সুতরাং লেখকময় দুনিয়াতে আপনি যদিও একটা সংখ্যা, তবুও অনু বাবুদের ভিড়ে, ঐ যেমন- অনু সাংবাদিক, অনু ঔপন্যাসিক, অনু প্রতিবেদক, অনু কাব্যের জন্মদাতা প্রমুখরা, যারা লেখক নন- তারা পাঠক, কিন্তু ওই- অনু পাঠক। এনারা প্রথম দু'লাইনের বেশি পড়বেনই না বা পড়েন না। যা বোঝার ওতেই তারা বুঝে যান।
যদিও অনু কবিদের আজকাল দেখা যায় না করোনার পরে, শুনেছি তারা নাকি আজকাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হয়েছে। অনু কবিতা প্রসবের চেয়ে ক্যামেরার সামনে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে নাচা, বা কাপল ব্লগের নামে ন্যাকামি ও ভন্ডামি করা কতটা বৈপ্লবিক না জানলেও, যুগের নিরিখে নিঃসন্দেহে কাব্যিক একটা শিল্প বটে। ইয়ে, এই ক্রিয়েটর গিরিতে অবশ্য কুণাল ঘোষ নেই; থাকলে শুধু খিস্তি খেয়ে একটা লোককে মাসে কোটি টাকা কামাতে দেখতাম। সুতরাং, এমন একটা সামাজিক অবস্থায় একটু বড় যেই না লিখবেন, ওমনি আপনি নিজেই একটা ‘সাবজেক্ট’ হয়ে যাবেন। আগেই বলেছি জেন-জি ও নেটিজেন পাঠকেরা বড় লেখা পড়েনা-
আসলে আমরা সেই অন্তিম প্রজন্ম যারা জন্মের সময় ডুলি, পালকি, ছই-গাড়ি দেখিছি, মধ্য বয়সে পৌঁছাবার পূর্বেই শব্দভেদী বিমান দেখছি। আমরাই শেষ প্রজন্ম যারা কমপক্ষে ৫টা উপন্যাসের গোটাটা পড়েছি। ১০ জন বাঙালী কবি সাহিত্যিকের নাম বলতে পারি একটানে। পোস্টবক্সকে চ্যাটবক্সে বদলিয়ে যেতে দেখলাম এই আমরাই। অসম্ভবকে সম্ভব হতে দেখেছি একটা জিনিসেরই কল্যাণে- সেটার নাম বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের চেয়ে বড় আবিষ্কার আর নেই এই ধরাধামে। বিদ্যুৎ না এলে কিছুই আসত না, না ইন্টারনেট না শব্দভেদী কোনোকিছু। দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণশক্তিই এই বিদ্যুৎ।
এবার আসি একটু অ-প্রয়োজনীয় ইতিহাসচর্চাতে।
সদ্য ব্যবসাতে ঢুকেছি তখন, গোঁফের রেখা সবে স্পষ্ট হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া বলতে অর্কুটকেই বুঝি। তখনও ‘ওয়াল’ বিষয়টা বাজারে আসেনি, ছিল স্ক্র্যাপবুক। কলেজের বন্ধু অয়ন তখনও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, গবেষণারত। কোলকাতাতে কোনো কাজে গিয়ে মেসের কথা মাথায় আসতেই পাড়ি লাগিয়েছিলাম যাদবপুরের ঝিল রোডের সেই মেসের উদ্দেশ্যে, যেখানে জীবনের ৩টি সুবর্ণ বছর কেটেছিল।
ইন্টারনেট তখনও চাঁদমারি, সন্ধ্যাতে এক রেস্টুরেন্টে টিফিন খেয়ে ঢুকতাম কোনো ইন্টারনেট কাফেতে। সেদিন আমি অর্কুট খুলছি, অয়ন বলল নতুন একটা কিছু অর্কুটের মতো এসেছে, নাম ফেসবুক; সেই শুরু আজও চলছে। নাহ, আজ আর চলেনি- বাবুল সুপ্রিয়র রাজনীতি ত্যাগের মতোই ফেসবুক ত্যাগ করেছিলাম। ইয়ে, ‘এখন নিজেকে অস্বাভাবিক রকম একা লাগছে’ না- এটাই পার্থক্য। তবে গিয়ে এসেছি, না ‘এসে গিয়েছি’ এই নিয়ে ধন্দ রয়ে গেছে।
আসলে কি জানেন, প্রিয় লেখকের সেই বইটাও একদিন পুরনো হয়ে বইয়ের তাকে ধুলো ধারণের মাধ্যম হিসাবে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বছরের পর বছর, সবচেয়ে পছন্দের সেই লাল কাপড়টাও একদিন অলক্ষ্যে ন্যাপথালিনের সাথে সোহাগে মেতে উঠে একাকিত্বের জ্বালায়। প্রথম পাওয়া লুকানো চিঠিটা কবেই হলুদ হয়ে আধখানা হয়ে পাঁপড়ের মতো টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেছে। পুরাতন হয় সকল কিছুই, বদলে যায় সময়, বদলায় মানুষ, সেই সাথে বদলে যায় উপলব্ধি তাই বদলায় আবেগ ও অনুভূতি- শুধু বদলায় না প্রেম।
কাঁচ কাটা পোকার মতোই একটা অলীক কিছু এই প্রেম, নিজে অবিকৃত থেকে বাকি সকলকে বদলে দেয়। কারণ পুরাতন হয়ে যায়, ক্ষণ বদলে যায়- বদলায় না অক্ষরেরা। মাঝরাত্রে যখন ভাঙা ঘুমে জেগে উঠি, সর্বাঙ্গে বিন্দু বিন্দু ঘামের সাথে খুঁজে পায় শব্দগুলোকে, প্রতিটা অক্ষর খুঁজে পাওয়া যায়, হাত বুলোতে বুলোতে মনে হয় শব্দগুলো আজও জীবন্ত। কিম্বা ওরা জীবন্ত বলেই আমিও সজীব আছি, বাক্যের অলিতেগলিতে তখন গুপ্তজালের বিমোহ গভীরভাবে লেপ্টে রয়। নিজেকে মনে হয় ফ্রান্ৎস কাফকার ‘মেটামর্ফসিসের’ এর- গ্রেগর। জীবনের ক্যানভাসে প্রেম হারায় না, একটা প্রেমের রঙ ধীরে ধীরে ফিকে হতে হতে মুছে যায়। ঘটনাচক্রে সেই ফিকে রঙে যদি ভুল করে আবারও তুলির আঁচড় পরে, সে প্রেম অক্ষয় হয়ে যায়। ও প্রেমের চিত্র আরও গভীর হয়, ছড়িয়ে সংক্রামক হয়ে বাঁচে বহু প্রেমিকের মনে।
আমরা এই প্রজন্মের অর্ধশিক্ষিত উন্মাদ, না মানুষ হয়েছি না মুনিষ। তেতো বাস্তবের অঙ্গারে পা ফেলতে ভয় লাগে বলে আমরা কল্পনা বিলাসী হয়েই বেঁচে থাকি। রোজ জীবনের বেঁচে থাকার লড়াই লড়তে লড়তে, যারা জীবনের দুই তৃতীয়াংশ সময় ফুরিয়ে ফেলে ক্রমশ বুড়িয়ে যাওয়ার দিকে হাঁটা দেয়, এই চল্লিশের ঘন্টা পার করা জীবনে সুররিয়ালিজমই বেঁচে থাকার রসদ। যে বয়সে চিবুকে চর্বি জমে, জুলফির চুলে শুভ্রতার ছোঁয়া লাগে, সেই বয়সে এসে সালভাদর ডালি, ফ্রিদা, রেনে, হুগো, কাম্যু, ডিকেন্স বা চসারকে আর জানা হয়ে উঠেনা। বণলতা সেনকে প্রেমিকা নয়, বেশ্যাই মনে হয়।
শিল্প, সাংস্কৃতি, অবচেতন মন, স্বপ্ন, লুকানো চিন্তাভাবনা,
সবই অনুপ্রাণিত হয় অন্তর্জাল থেকে। আমাদের
যুক্তিবুদ্ধি, সচেতন চিন্তার দ্বারা
নিয়ন্ত্রিত এই মাধ্যম থেকেই- বহমান সমাজকে আমরা সংজ্ঞায়িত
করি, সোস্যালমিডিয়ার আয়নাতেই। ২ দশক আগে যা কিছু উদ্ভট ও আশ্চর্যকর রূপকল্প মনে হতো, আজ সেগুলোই বাস্তব। আমাদের সুররিয়ালিজম
বাস্তব অবাস্তব বাছবিচার না করে তাদের একত্রিত করে,
শিল্প, সাহিত্য সহ সমস্ত
শিল্পকলা এক অভিনব মাধ্যমের দ্বারা মুঠোযন্ত্রে উদ্ভাসিত হয়।
হয়ত এই বর্ণনাটা বেশিই কাব্যিক হয়ে গেল, কিন্তু ফেসবুকের প্রতি এই নেশাটাকে যদি প্রেম না বলি কাকে প্রেম বলব? প্রতিটি অক্ষরকে বড় আদরে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে হয় যে, এভাবে আর কাকেই বা ছোঁয়া যায়?
(২)
ফেসবুক...
দিনের অনেকটা অংশই আমাদের এই ‘মুহূর্তের’ হাত ধরে কেটে যায়। সেই ২০০৮ এর প্রায় শুরুর দিন থেকে থাকার সুবাদে গত দেড় দশকের অধিক কাল ধরে জমা অভিজ্ঞতাটা নিতান্ত কমও নয়। মাঝখানে চিংড়ির খোলস ত্যাগের মত বেশ কিছু প্রোফাইলের মায়া ত্যাগ করতে হয়েছে। কত নতুন বন্ধু, পুরাতন ইয়ার-দোস্ত, আত্মীয় পরিজন, ভাই-বন্ধু-বান্ধবী নিয়ে গোটা একটা পরিপূর্ণ সংসার, তবে ভার্চুয়াল। ভার্চুয়ালেরই আবার নানা বিভাগ- কিছু পাংচুয়াল, কিছু মিউচুয়াল, কিছু কনসেপচুয়াল, কিছু কনটেক্সচুয়াল, পারসেপচুয়াল, কনসেনসুয়াল, নন-ফাংচুয়াল, সাবটেক্সচুয়াল, কনভেঞ্চুয়াল ইত্যাদি কত দ্যোতনা। এনারা ফলত, তথাপি বস্তুত নয়।
অবশিষ্ট কিছু জনই একচুয়াল, বন্ধুত্বেও- উপস্থিতিতেও, জীবনেও। আমার মতো অনেকেই শুরুর দিকে ভীষণ ন্যালা-খ্যাপা গোছের ছিল ও থাকে। উপক্রমণিকাপাতে টানা ৩ বছর প্রায় তেমন কিছুই জানতাম না বা বুঝতাম না; বলা ভাল চেষ্টাও করিনি জানার। সেকালের অধিকাংশই অবশ্য আমারই মতন, ব্যতিক্রম বাদে। পুরাতন বহু সদস্যদেরই আমি চিনি তারা আমাকে না চিনলেও, তেমনিই আমাকেও অনেকেই স্বনামে বেনামে-চেনেন বা জানেন আমি তাদের না চিনলেও। বয়সটাও বাড়ছে, তাই কালের নিয়মেই হয়ত এখন সামান্য অল্প অল্প কিছু বুঝতে শিখেছি এই ইথারীয় জগতের অধিবিদ্যা সম্বন্ধে। তাহলে কী সেই অভিজ্ঞতা তথা উপলব্ধি!
বছর পনেরো আগেও ফেসবুক ধারণাটা
তেমন জেঁকে বসেনি সমাজে, আজকের মতো।
অনেকে অনেক কিছুই করত, তার সাথে
ফেসবুকও। মানুষের চরিত্রই হলো পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে বাকিটা নিজের আয়ত্তে নিয়ে
চলে আসা,
ফেসবুককেও তেমনই করে নিয়েছে। বাংলাতে লিখছে, বাংলাতে পড়ছে আর কী চাই! রাজনীতি,
লেঙ্গি, খেলা, সংবাদ, আবহাওয়া, জ্ঞান, ধর্মচর্চা, গান-নাচ-সিনেমা, সহ সম্পূর্ণ বিনোদন, পরনিন্দা- মনোরঞ্জনের উপাদানে আর বাকি কী রইল! টিকটক পরবর্তী নতুন যুক্ত হয়েছে রিলস। একটা টিপিক্যাল
বাঙালিয়ানা সংস্কৃতির ঘরানা ফেসবুকে আনতে সক্ষম হয়েছে- বাঙালী নেটিজেনরা। মূলত তিন
ধরনের চরিত্রের খোঁজ মেলে এই ফেসবুকে; এক ধরনের মানুষ যারা বিনোদন জগতের সাথে যুক্ত, ছোট হোক বা বড়, নামি হোক বা অনামী- তারা সাহিত্য বা শিল্পকর্মের সাথে যুক্ত, নিত্যাবসরে বিনোদনের পসরা সাজিয়ে বসেন।
দ্বিতীয় দলটি উপরোক্ত ও তৃতীয় দল থেকে নিজ নিজ পছন্দের বিনোদন সামগ্রী চয়ন করে নিজেকে বিনোদিত করে থাকেন। এদের কারোর সাথে কোনো বিরোধ ঘটেনা সাধারণত, ঘটলে তা সংবাদ শিরোনামে যাওয়ার মতই গুরুত্বপুর্ণ কিছু ঘটে, খাপও বসে। মুশকিলটা তৃতীয় লিঙ্গদের নিয়ে থুড়ি তৃতীয় পন্থা অবলম্বনকারীদের নিয়ে।
এনারা খান কম ছড়ান বেশি, শোনেন কম বকেন বেশি, এনারা পরামর্শ দানের নিমিত্তেই মূলত জন্মগ্রহণ করেছেন। সব কিছুতেই ফোঁপরদালালি মাস্ট, জীবনের সব কিছুতেই অধিকিন্তু। সর্বত্র গূঢ় জুগুপ্সা, কী বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন, সেটা বড় কথা নয়, কাকে দিচ্ছেন সেটাও নয়; কীভাবে দিচ্ছেন সেটাও বিচার্য নয়- সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে তিনি বিষয়টিতে ঢুকে পরেছেন, এটিই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ। তার যা খুশি করার অধিকারটা স্বলব্ধ। অনু থেকে অনুব্রত হয়ে জ্যোর্তিবিদ্যা থেকে জ্যোতিষচর্চা সকল বিষয়েই এনাদের অবাধ যাতায়াত, গতিবেগ আলোর চেয়েও সময়ে সময়ে বেশি, তাই আমরা এদের উল্টো দিকেও হাঁটতে দেখি কখনও কখনও। খাটের তলা থেকে ঝাঁপানতলা সর্বত্র মাসরুমের মত জ্ঞানের চাষ করে চলেন।
এনাদের পোষাকি নাম সমালোচক।
সনাতন ধর্ম মতে বিদেহী আত্মারা পুণরায় ধরাধামে জীবদেহে জন্মগ্রহণ করেন। পাপী আত্মারা কাক, শৃগাল বা সারমেয় রূপে এলেও অতৃপ্ত আত্মারা মনুষ্যরূপেই ধরাধামে অবতীর্ন হন। এনাদের থেকেই যোগ্যতমের উদবর্তনের নিয়ম মেনে ‘সমালোচক’ নামক প্রাণীটি বিকাশ লাভ করেছে বলেই বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস। এমনিতে এদের বিশেষ কোনো বিশেষত্ব নেই চরিত্রে বা রূপে। এনারা দুইটি অবস্থার সামান্যতম তারতম্যকে খুব দ্রুত অনুধাবন করতে পারে, তাই দ্রুত পাল্টি খেতে এনারা ওস্তাদ। একটি নাসিকা, যেটা মিষ্টতার আস্বাদ পেলেই সেই পানে দ্রুত ধাবিত হয়ে পরেন।
একটি জিভ, চাঁটার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত। দুইটি কান থাকলেও সেগুলো অ্যাপেনডিক্সের ন্যায় নিষ্কর্মা, কারণ সমালোচকরা কারও কোনো কথা শুনেছেন বলে কেউ বদনাম দিতে পারবে না। দুটো প্রসারিত হাত রয়েছে এই প্রজাতির, একই সাথে একটি গলাতে ও অন্যটি পদযুগল স্পর্শ করার মতো বিলুপ্তপ্রায় ক্ষমতা যুক্ত। প্রয়োজন অনুসারে এনারা যে হাতটা দরকার সেটাই ব্যবহার করে থাকেন। এদের দুইটি রিকেটগ্রস্ত কিন্তু সবল পা বর্তমান, যা পলায়নে উপযুক্ত। ঝামেলা লাগিয়ে দিয়ে ভদ্রতার দোহাই দিয়ে এনাদের পালানোর কৌশল বিশ্ববন্দিত। বাকি জননাঙ্গ সম্ভবত ক্লীব শ্রেণীর, হয়তবা ক্লাউন ফিসের মতো বদলিযোগ্য। সম্ভবত বললাম এইজন্য, কারণ ব্যক্তিগতভাবে কখনও এদের সাথে মৈথুনের সুযোগ পাইনি, পেলে সেই বিষয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ চটি লেখার অগ্রিম প্রতিশ্রুতি দিলাম।
রিস্তে মে তো হাম সবকে বাপ লাগতে হ্যাঁয়, নাম হ্যাঁয় সমালোচক। এই প্রজাতিটির এমনই গুণ যে কঠিনপণ তপস্যাকারীকেও এনারা নির্বীজ করে দিতে সক্ষম, এনাদের জিহ্বা নামক অস্ত্র প্রয়োগে। অন্তর্জালীয় এই ভূমে থকথকে পিঁচুটির এঁটুলি ঝোলা কুতকুতে চোখের কোন থেকে লালসা ঝরে পরে যাদের, তারাই আমার এই পর্যায়ের আলোচ্য- ফেসবুকীয় সমালোচক, অতএব তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক।
ধরা যাক একজন বিজ্ঞানী যিনি ইসরো মঙ্গলযান প্রজেক্টের সাথে যুক্ত, কিন্তু মনের দিক থেকে ইনি কবিও বটে, ফেসবুকে কবিতা লিখতে শুরু করেছেন হালফিল। তার গুণমুগ্ধ পাঠকের সংখ্যাও নেহাত কম নেই, অতএব সমালোচকের নজর গেল, ব্যাস। বিজ্ঞান চর্চা বিষয়ে জ্ঞান থাকতেই হবে এমন মাথার দিব্যি যেহেতু কেউ দিইনি অতএব সমালোচক ‘তাঁর’ সমালোচনা শুরু করে দিলেন।
তার ‘বিশ্বস্ত সূত্রে’ পাওয়া ঘটনা দিয়ে রটনা স্টার্ট, বিজ্ঞানী জ্ঞানী হলেও প্যান্টের ভিতরে জাঙিয়া পরেন না, এবং বাসর রাতে ইনি নাক খুঁটে হাত ধোয়নি, সাথে বুড়ো আঙুলও। সমস্বরে বলুন- ম্যা গো… আর কী চাই, লাইক- কমেন্ট- শেয়ারের বন্যা। ফেসবুকে অধিকাংশ সময়ই সত্যতা প্রমাণের দায় থাকে না, তাই স্বঘোষিত অভিভাবক হতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। ‘সমালোচনা ব্যবসা’ পচা ছানার মতো ফুলে ফেঁপে উঠতে দেরি হয় না।
মন্টু মাতব্বর আমাদের চেনাজানা এরকমই একজন বিশিষ্ট বিদ্বজ্জন তথা ফেসবুক সমালোচক। ইনি সম্ভবত সেই হিমু ট্রমার শিকার, যিনি বিশ্বাস করেন তালিম দিলেই মহাপুরুষ হওয়া সম্ভব।
কিন্তু তেমন ইস্কুল কী আর এই পোড়া ভূ-ভারতে আছে! অগত্যা নিজে থেকেই শুরু করে দিলেন পাঠশালা, অর্থাৎ শালা শব্দ পাঠের জন্য প্রস্তুতি, যেখানে তিনিই অধ্যাপক আবার তিনিই ছাত্র। যথারীতি শোরগোলের সাথে ফেসবুকের পাড়াতে নিজের অস্তিত্ব জাহির করলেন। ইনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, গান লেখেন, গান গান, বাজনা বাজান, নিজেই নাচেন, ছবি আঁকেন, পুতুল গড়েন, কবিতা লেখেন, গদ্য বমিও করেন- আর কবিতাটা তো এনার বাই নেচার প্রতিভা, কাব্যেই কথা বলেন। তবে এনার পছন্দের বিষয়টা হলো জীবনশৈলী। ধর্মে নাস্তিক, নাম দেখে বোঝার উপায় নেই ইনি কোন জাতের। রামের আদর্শে জীবন গড়ে তোলা এমন গোঁড়া তথা পাঁড় কমিউনিস্ট, যিনি মমতার মাঝে লেনিনের ছায়া দেখতে পান। তাই সর্ব ধর্মকে নিয়ে খিল্লি করার লাইফটাইম লাইসেন্স এনার কোঁচড়ে বাঁধা আছে। আর সেটাই করেন, ফেসবুকের দেওয়াল জুড়ে নিজস্বতার ‘বিজ্ঞাপন’এর রেতঃপাতে চুনকাম করে চলেন মুহুর্মুহ।
মন্টুদা তথা ফেলেব সমালোচকদের অন্যতম বড় গুণ হচ্ছে প্রায় সর্বত্র এনাদের নীরব উপস্থিতি। অকুস্থলে এনারা কেউই কিছু বলেন না বা করেন না। এনারা সর্বঘট থেকে কাঁড়া আকাঁড়া খুদ কুঁড়ো নিয়ে বেশ গুছিয়ে নিজের পাড়ায় এসে গোছা করে কালিপটকার পেটো ফাটান। পুরাণে নানা ধরনের অস্ত্রশস্ত্রের উল্লেখ থাকলেও বর্তমান ফেসবুক সমালোচকদের অস্ত্র হচ্ছে ‘SS’ নামক মারণাস্ত্র। কপি-পেস্টে এনাদের দর মেলা ভার। তাবলে এনারা সর্বত্র মন্তব্য করেন না, তাতে নাকি ইজ্জতের হানি হয়! মেকুরের মতো মাটি যদি নরম বোঝেন তবেই সেখানে বাহ্য করেন রীতিমতো আঁচড় কেটে- নচেৎ নয়। হ্যাঁ, জ্ঞানত এনারা পাণ্ডিত্য আর রেচন পদার্থ ছাড়া কিছুই ত্যাগ করেন না।
মন্টুবাবুদের মতো নমুনাগুলো নিজেকে নিম্নমেধার বলেই পরিচয় দেন স্বগর্বে।
ধরুন আপনি ভবঘুরে ফেসবুকার, মেধার গভীরতা
খুঁজতে গিয়ে গুগুলে মেধা পাটেকরের জীবনীতে পি.এইচ.ডি করে ফেলেছেন প্রায়, তবুও মেধার পরিভাষা রপ্ত করতে পারেননি। অগত্যা মন্টুদার
দেওয়াল টপকে গ্রুপে ঢুঁ মারলেন। হ্যাঁ, গ্রুপ। কদিন আগেও সমালোচক বাবুদের একটা প্রসিদ্ধ খিল্লি করার বিষয় ছিল
গ্রুপবাজি। আশ্চর্যজনক ভাবে এনারা প্রত্যেকেই নিজেরা একাধিক গ্রুপ খুলে বসেছিলেন
কিম্বা পেজের এডমিন। অধিকাংশ জন হালে সেভাবে পানি না পেয়ে গণেশ উল্টিয়ে আবার
পুনঃর্মূষিক ভব, পেশাদার সমালোচনা ব্যবসাতে মন
দিয়েছেন। স্বাদ বদলাতে
বাংলাদেশী ফেসবুকারদের ‘সেমি পানু’ ব্লগ পড়ে, মোহনার প্রমাণ সাইজের স্তনের সামান্য
খাঁজের তীরে ‘আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো…’ ভেবে বিশ্রাম করেন।
(৩)
ফেসবুকের সংসারে মুখ্য যে কয় ধরনের পাবলিক দেখা যায় তাদের দিকে একটু দৃষ্টিপাত করা যাক। রিলস দেখে ক্লান্ত হয়ে একদল টাইমলাইনের অন্যদিক গুলোতে দৃষ্টি দেন ‘সপ্তম ভাব’ থেকে। কিছু লোক শুধুই জোকসের ভক্ত, কেউ প্রিয়জনের মৃত্যু সংবাদ দিলেও এনারা একটা অট্টহাস্যের ইমোজি নেদে দেবেন। একদল সারাদিনই কমেন্ট করেন, এনারা মূলত কমেন্টার। জেনিভা চুক্তি থেকে হরপ্পা সভ্যতা হয়ে আমস্টারডামের ব্রথেল হোক বা তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্রতা সকল বিষয়েই এনারা চটপট কমেন্ট করে দেন, তীব্র জ্বালাময়ী সব ভাষণ দিয়েই এনারা বিখ্যাত। অন্যান্য সমমতাদর্শীরা তর্কস্থলে এদের নাম উল্লেখ করে ডেকে এনে রীতিমতো স্টারের মর্যাদাও প্রদান করে থাকেন।
সারা বছরে কালেভদ্রে এনারা মৌলিক পোস্ট বা শেয়ার করেন। কুণাল বনাম শতরূপের খেউর, ‘তমাল কেন তালিবানদের’ বিরুদ্ধে বললেন না, সৌরভের শালবনীর কারখানা বা পোশাক ব্রান্ডের কী হবে, কিম্বা দরে উঠা ‘সুপ্রিম কোর্ট ও একটি কুকুর’ শীর্ষক আলাপ, অথবা রোজকার হটকেক- শোভন বৈশাখী কিম্বা মহুয়াতে পিনাকীর বাণ, মুগরি রেসকিউ করা হাতি আম্বানির ‘বনতারা’ যা খুশি আসুক, কমেন্টারদের মত ঘেঁটে দেবার শক্তি অমিত মালব্যেরও এরও নেই। সিলেবাসের বাইরের যেকোনো কঠিন প্রশ্নের চটজলদি কমেন্টের জন্যই ইনারা বিখ্যাত, যাই হোক ট্র্যাকে ফিরি।
একদল বোদ্ধা শুধুই কবিতা, গল্প, উপন্যাস আমাশার মতন করে ডেলিভারি করেন, নির্দিষ্ট অবকাশে। তবে ঐ, টুক করে পোস্ট করে দিয়ে ফেরারি আসামির মতো গায়েব হয়ে যান পরবর্তী পোস্টের আগে পর্যন্ত। একদল ফেসবুকার পেজ বা গ্রুপের এডমিন, এনারা সারাদিন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর ব্রতে দীক্ষিত। এনারাই আসলে মিনি সেলিব্রিটির মর্যাদা ভোগ করে নিজ নিজ এলাকাতে। এদের আচরণ অনেকটা আমলা বা মন্ত্রীসুলভ, যাবতীয় নিত্যনতুন আইডিয়াগুলো এদেরই মস্তিষ্কপ্রসূত।
একদল আছেন, যারা সারাদিন শেয়ার করেন। সেটা ধর্ষণের খবর হোক বা বর্ষণের, ডোন্ট কেয়ার। একদলের আবার গ্যালপিং চিন্তাভাবনা, তাও আবার হাই লেভেলের, এদের ছোটখাটো স্টেশন ধরে না। এদের বিষয় কূটনীতিক না হয়েও সোর্জিও গোরকে কেন ট্রাম্প ইন্ডিয়াতে রাষ্ট্রদূত করে পাঠালো, নতুবা ৫ বছর আগে রাফালের বরাত ছোট আম্বানিকে যে মোদীজি দিয়েছিলেন, তারই ঘরে CBI-ED পাঠানো কি চাট্টিখানি কথা, কিন্তু তিনি করেছেন- কারণ ঝোলা উঠিয়ে চলে যাবার সময় দ্বারপ্রান্তে। তাঁর শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডলই তো অনুপ্রেরণা (কালীঘাট নয়, কারণ সেখানে খেলা হচ্ছে আজকাল)। চীন নিয়ে জয়শঙ্করের কূটনীতি কী হওয়া উচিত! মার্কিন শুল্ক বিশ্ব বাণিজ্য মানচিত্রে কতটা এফেক্ট ফেলল ইত্যাদি। ইরাণ কী পরমানু বোবা বানিয়েই ফেলেছে, কিম্বা গাজায় আসলে কে জিতল তা নিয়ে এদের ভাবনার শেষ নেই। এর মাঝে সময় পেলে একটু ক্রিকেট, একটু মোহন ইষ্ট হয়ে রোলান্ডো-মেসী সাবড়ে নেটিজেনদের মনোরঞ্জনে ত্রুটি রাখেননা।
কিছুজন সজ্জনব্যাক্তি- মুসলমানেরা কত খারাপ আর কেন তাদের তাড়ানো হবে না, এই নিয়েই দ্বিতীয় ভাবনার ফুরসতই পায় না, তাদের যোগ্য সঙ্গত দেয় কিছু আরবি নামধারী- পক্ষে হোক বা বিপক্ষে। কেউ মোদীর ভক্ত তো কেউ লেলিনীয় বীর্যে জারিত হয়ে চীনাবাজারের সস্তা রেস্তঁরাতে ফিদেল খোঁজে, বর্ষার সন্ধ্যায় জার্মান শেফার্ড বাগিয়ে- আর সেটার হ্যাংওভারই হাগে ফেসবুকের ওয়ালে। কিছু জন অতীব ইন্টালেকচুয়াল, এরা যে কার পক্ষে কেউ জানেনা, কিন্তু লম্বা লম্বা হ্যাজ নামায়। কিছু আছে নেপোকিড, ১০টা ৫টার বেসরকারি চাকরির ফাঁকে, বাপের অতীত কর্মকান্ডের দয়ায় কোনো একটা রাজনৈতিক দলের লেজুড় বৃত্তি এমন ভাবে করে, যেন দলের উত্তরাধিকার একা কুম্ভ হয়ে ওকেই বইতে হচ্ছে। এদের ভিড় ঠেলে বাকি অবশিষ্টরা হয় ‘চ্যাঁচ্যাঁই মাতা’, ‘লাল সেলাম’ কিম্বা ‘খেলা হবে’র বৈধ গর্ভপাত।
আজকাল ক্রিয়েটরদের যুগ চলছে। মোদ্দাকথা পোঁদ নাচাবার যুগ, একসময় ধনীরা লুচ্চা পুরুষের দল বাইজি বাড়ি যেতো গরীবের মেয়ের শরীর নাচানো দেখতে, তাকিয়াতে আধাশোয়া হয়ে টাকা ছুঁড়ে মারত। একখন বড় লোকের মেয়েরা ক্যামেরার সামনে এসে ‘ভিউ’ বাড়াবার জন্য প্রায় খোলা বুক দুলিয়ে আধা ন্যাংটা হয়ে পোঁদ নাচাচ্ছে, আর দুনিয়ার বুভুক্ষু শ্রমিক কৃষক বেকার ভবঘুরের দল চোখ দিয়ে সেগুলো গিলছে। গোটা সোস্যাল মিডিয়াই এখন বাইজিবাড়ি। এর পরের দল ফুড ব্লগার, ফ্রি খাবারের ধান্দায় রাজুদা থেকে ঝরে ঝরে পরছে- এক অদ্ভুদ মন্তাজ সৃষ্টি করেছে। একদল সারাদিন ট্যুরের উইন্ডো শপিং করেন, অন্যদল বিজ্ঞাপন দেয়। কেউ শাড়ি বিক্রি করে, কেউ কুকুরের জন্মদিন পালনের ৭ দিন ব্যাপী সঙ্গীত অনুষ্ঠানের লাইভ দেখায়। সবচেয়ে সেরা হচ্ছে ব্যারাকপুরে AC লোকাল ট্রেনের ব্লগার হওয়া। মাইরি বলছি, কুনাল ঘোষ বা শতরূপ হওয়ার চেয়েও সোজা। এগুলোই বর্তমান ফেসবুকের ‘হট ট্রেন্ডিং’।
একদল নিজের ও নিজের পরিবারের বস্তা বস্তা ছবি শেয়ার করেই সেলিব্রিটি, কেউ কেউ ঘন্টায় ২৮টা করে নিজের ছবি দিচ্ছে নানান এ্যাঙ্গেলে। কেউ কেউ আবার ওই করেই এক আধটা পেজও খুলেছেন বলে খবর আছে। কেউ বিরহ গায়, তার সবেতেই বিরহ- পরিস্থিতি যা খুশি হোক। আরেকটা দল, যারা গ্রুপ গ্রুপে পুরস্কার বিতরণ করে রোজ, নিত্য, নিয়মিত। ফলত আপনি যদি তেমন গোটা সাতেক গ্রুপের মেম্বার থাকেন, রোজই কিছু না কিছু একটা শিরোপা জুটবেই, ধ্বজভঙ্গ বঙ্গ সিপিএমের বৃদ্ধতন্ত্রের মতই সত্য ঘটনা এটাও। ট্রাম্প যদি ‘নোবেলের’ লোভে যুদ্ধের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে, একজন সত্যকারের ফেস-‘বুকার’ কেন রোজ পুরষ্কার দাবী করতে পারবে না! যদিও প্রেরকদের কে ওই বিচারকের আসনে বসিয়েছে এ সত্য জানার কোনও উপায় নেই। শেষের দলটি ‘আমি আর ফেসবুক করব না’, ‘বিদায় বন্ধু’, ‘ফ্রেন্ডলিষ্টের আগাছা পরিষ্কার করব’, ‘ফেসবুক রিচ কমিয়ে দিয়েছে, প্লিজ স্টিকার কমেন্ট করো’, ‘আগামীকাল একটা বড় দিন…’, 'সুপ্রভাত', 'শুভরাত্রি', ‘এতো কষ্ট কেন”, এই ধরনের আঁতলামো পোস্ট করেই মানসিক তৃপ্তি লাভ করেন।
বাপে বলেছে সুধীরভাই, আনন্দের আর সীমা নাই, এই একটা প্রজাতীর প্রাণী ফেসবুকের সমাজে সবর্ত্র বিরাজমান, এবং এরাই সংখ্যাধিক্য। এরা সকল কিছুতেই ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর জটিল, বাছা বাছা কঠিন অব্যয় আর বিশেষণ ব্যবহার করেন। এরাই সমালোচকদের মূল খদ্দের। কারণ বাকি সকলেই নিজ নিজ কর্মে ব্যস্ত, সুতরাং মধু আর মালতির এ এক বিচিত্র গন্ধ শোঁকাশুঁকি।
বাকিরা? নাহ এখানেই শেষ নয়, শেষেরও একটা শেষ থাকে, বাকি হলে তারা...
আরে বাওয়া, এরাই তো হলেন ওই মন্টু বাবুর বাপ, বিদগ্ধ সমালোচকদেরও সমালোচক। নাম না দিয়ে কেউ যদি একটা রবি ঠাকুরের কবিতা বা সেক্সো কবির ড্রামা পোস্ট করে ফেলেছেন, এনারা নির্দ্বিধায় তার মা-মাসি উদ্ধার করে দেবেন অবলীলাক্রমে।
কবি ঠাকুরের কথায় মনে এল, ইনি অনেক বই ছাপিয়েছিলেন বা প্রকাশকও এনার বই ছাপে। আজকের এই ট্যাকস্যাভি যুগে আড্ডার পরিসরটা বা চেনা পরিচিতের গণ্ডিটা ফেসবুক ভায়া হয়েই বস্তু দুনিয়ার প্রান্তে উন্মুক্ত হচ্ছে। অনামি তথা শখের লেখকেরাও একটা চটজলদি পাঠক প্রতিক্রিয়াও পাচ্ছেন, হ্যাঁ-না করতে করতে কিছু জন বইও ছাপিয়েই ফেলছেন। মুশকিল হচ্ছে, ফেসবুকে ৩ লাইনের ‘স্ট্যাটাস’ দেওয়া লোকটাও নিজেকে লেখক ভাবছে, না তার ব্যকরণ জ্ঞান রয়েছে, না আছে বাক্য গঠনের আসত্তি জ্ঞান, না রয়েছে বাংলা বিশেষণের মজুদ, না আছে অর্থপূর্ণ ভাব প্রকাশের জন্য শব্দভান্ডার, না রয়েছে বাক্যাংশ পরিস্ফুটনের অলঙ্কার, তার সাথে পদে পদে বানান ভুলে ভরা মানুষটাও নিজেকে লেখক ভেবে বই ছাপিয়ে ফেলছে, সমস্যা এটা। তার পরেও ঘটনা হচ্ছে ছাপাছাপির বিষয়টা আগের চেয়ে অনেক অনেক কমে গেছে, যেটা বই পাড়াতে যাতায়াত করলেই মালুম হয়। কিন্তু ছাপার অক্ষরে নিজেকে দেখার বাসনা কার না হয়- একটা আম জীবনে অন্নপ্রাশন, বিয়ে আর শ্রাদ্ধ ছাড়া কার নামই বা আর ছাপার কালিতে ছাপে! সুতরাং, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবাদেই ফেসবুকের মঞ্চ থেকে আরও অনেক সংগঠিত কর্মের মতো বই ছাপানোও হচ্ছে।
তাহলে আর কী! হাত গুটিয়ে বসে থাকার প্রশ্নই নেই? কিছু লেখিকা (WBCS অফিসারও বটে) লেখেন- “সম্পূর্ণ কাল্পনিক কিন্তু গবেষণাধর্মী ইতিহাসশ্রয়ী উপন্যাস, যা আমাদের গৌরবময় অতীতকে মনে করাবে”। পুরো পুদিচ্চেরি কেস, লেখেন বললাম, আসলে এনারা ছাগলের চেয়েও উন্নত প্রসবশীল প্রাণী, বছরে ৫-৭টা উপন্যাস স্বয়ং কবি ঠাকুরও লেখেননি, ইনারা ছাপাচ্ছেন- স্বগর্ভে থুক্কুরি স্বগর্বে। বাঁশবনে শেয়াল রাজা, নব্বই এর দশকের বাংলা সিনেমা আর আজকের বাংলা ভাষায় আধুনিক লেখকদের বেশিরভাগ অংশটা- হোল…বোল…, এরা রোজগার করে খায় এটাই সত্য। বাংলায় শিল্প যেখানে চপ, সেখানে মুদ্রাক্ষরিক পেশাতে মুনিশেরা জুটবে এটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু ইজ্জতেরও প্রশ্ন আছে বস! সমালোচনা মাংতা হ্যাঁয়, অতএব লাগাও কাঠি।
ফিরে যাই শুরুর লাইনে, আপনি যদি রাজনৈতিক নেতা হন, চোর, ডাকাত, খুনী, ধর্ষক হন আপনি অনেকটা সেফ- সমালোচকদের থেকে। কারণ কোষ বলতে এদের শুধুই অণ্ড, বাকিটা চর্বি আর জ্ঞান। সুতরাং পাল্টা আসতে পারে এমন বাক্সের ধারেকাছে এনারা যান না। আসলে ময়ূখ ঘোষ লেলিয়ে দেয়- কুসম কুসুম করে মাথার চুল ছিঁড়ে নেবে। কিন্তু যদি আপনি নিরীহ নির্বিরোধী লেখক হন! তাহলে আর আপনার রক্ষে নেই। আপনার যাবতীয় সকল কিছু ভালমন্দ বিচারের ঠিকেদারি এনারা নিজ দায়িত্বে কাঁধে তুলে নেবেন। শুরু হয়ে যাবে নিরন্তর কাঠিবাজী, কাঠির টান পড়লে হাতে পায়ে কুড়িটা আঙুল হ্যায় না...
কেউ মদের নেশা করেন, কেউ মেয়েছেলের, কেউ রেসের মাঠে যান। গাঁজা, চরস, হেরোইন তো আছেই। একটাকেও সমাজ ভাল চোখে নেয় না। কিন্তু আপনি যদি বই লেখা বা ছাপানোর মতো নিরীহ নেশা করেছেন!! অমনি সমালোচকের দল এমন ফেনাতে শুরু করে দেবে, যে আপনার খাটের তলা অবধি পৌঁছে যাবে। আপনি হয়ত বিনিদ্র রজনীতে পেটে অম্বলের দোষ করে বসে আছেন। আনন্দের বিষয় হলো আপনার পায়ুরন্ধ্রে সমালোচকের দল হয় কাঠি বা আঙুল কিছু একটা গুঁজে রেখেই দিয়েছেন। সমালোচোকরা সেটা টেনে মাঝে মাঝে বের করে শুঁকবেন, দেখবেন গন্ধটা ঠিকঠাক মনমতো ঝাঁঝালো হলো কিনা।
সমালোচক সকল কিছুই করেন শুধু এটুকু বোঝেন না, আঙুল বা কাঠি করতে করতে আঙুলের ডগাতে যে হলুদ বর্ণটা শোভা বর্ধন করে ওটা তরল কাঞ্চণ নয়, পাতি নরগোবর। কিন্তু বিজ্ঞ সমালোচককে কে বোঝাবে! তিনি ওতেই মোক্ষ লভেছেন।
ফেসবুক পূর্ব জীবনের এক পর্যায়ে সময় সময় মনে হতো, ছোট বেলায় কত কষ্ট করে নামতা, ব্যাকরণ ও মাস্টার টেন্সের গজগজে ভিড় ঠেলে মাতৃভাষায় নানা ধরনের গালি শিক্ষা অর্জন করে নিজেকে ঋদ্ধ করেছিলাম। কিন্তু কলেজ শেষে পেশা জগতে ঢুকে চর্চার অভাবে অধিকাংশ গালিই ভুলে যেতে বসেছিলাম। তবে, বিগত প্রায় দেড়দশক ধরে আবাল সমালোচকদের দেখলেই মনের মাঝে চু-কিত-কিত খেলে যায় সেই কৈশোরে শেখা গালিগুলো, সঠিক পরিবেশে পুনরায় চর্চিত হয় স্বস্নেহে। এই সমালোচকদের কল্যাণেই ঐতিহ্যবাহী বাংলা খিস্তিখেউর গুলো আজ বিলুপ্তির পথ থেকে ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে স্বমহিমায় নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়ে যায়। এভাবেই ইতিহাস সচল থাকার পথ খুঁজে নেয়। রয়ে যায় সেই ভাষা, অক্ষরের প্রেম, হারিয়ে যায় মানুষ, হারায় সময়, রয়ে যায় প্রেম।
বর্তমান সমাজ- ফেসবুকীয় পরাকাষ্ঠা, স্ট্যাটাসের ভিড়ে অক্ষম রমনের প্রয়াসে নিত্যনতুন খুঁত খুঁজে ফেরা অতৃপ্ত
আত্মার সাথে প্রতিষিদ্ধ স্বমৈথুন।
