আজ আমি অনেকক্ষণ ধরে ভাবলাম, যা বুঝলাম- আমি সত্যিকারের একজন মমতাপ্রেমী মানুষ, আপনার সবচেয়ে জাবড়া ফ্যানদের মধ্যের শীর্ষস্থানীয়। আমি চটি চাঁটা নই, কারণ ক্ষমতায় থাকাকালীন আপনি সর্বনাশ ছাড়া আমাকে কিছু উপহার দেননি; সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক ভাবে আমাকে রিক্ত, নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত করে ছেড়ে দিয়ে ছিলেন। ঘরদোর ছেড়ে আজ বিদেশ বিভূঁইতে আদাড়ে পাঁদাড়ে খুঁটে খাচ্ছি পেটের দায়ে। সবই তো আপনার প্রত্যক্ষ দয়াতে, ফলত আমি প্রকাশ্যে আপনাকে শালীনতার মধ্যে রোজ গালিগালাজ করেছি, যতটা আজকের ২০৭ জন বিজেপির বিধায়কেরাও করেনি।
আপনার প্রতি ভালোবাসা কতটা থাকলে, আজকে যখন আপনি কিছুই নন - তখনও আপনাকে নিয়ে লিখছি। এখানে বাজারে বিকাশ-কান্ড আছে, লাখে লাখে আপনার চোর ভাইদের কেলানি খাওয়ার বিচিত্র মডেল ঘুরে বেড়াচ্ছে, গরু কোরবানি, রাস্তায় নামাজ, ডায়মন্ড মডেল, মেলোডি হানিমুন, এই সমস্ত ইস্যু রয়েছে- সব ছেড়ে আজও আপনাকে নিয়েই লিখছি। দিস ইজ কলড ট্রু লাভ।
সত্য বলতে, স্টকহোম সিনড্রোমের মতোই আমি আপনার মোহে আকৃষ্ট হয়ে গেছি। বিগত ১৫ বছর ধরে আমাদের অস্তিত্বের মাঝে আপনি বিলীন হয়ে গিয়েছেন, রন্ধ্রে রন্ধ্রে আপনি ছিলেন রক্তের অক্সিজেনের মতোই। অধিক উচ্চতায় গেলে যেমন শ্বাসকষ্ট হয়, মেজো খোকার ‘সেমি’ হিন্দুত্বের রাজত্বে আপনার অভাবে আমারও কেমন হেপো রোগীর দশা হয়ে গেছে। মাইরি বলছি, আপনার পোঁয়াপাকা ভাইপোর দিব্যি। ভাষণের নামে ধমকানো চমকানো, আমলাদের কুত্তা বানিয়ে রাখা, মঞ্চ জুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো, পিছনে এক মঞ্চ সুশীল ভাতাজীবী ধান্দাবাজদের জুলুজুলু চোখে তাকিয়ে থাকা, আমরা এটাতেই তো অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। মেজোখোকার কোনো কিছুতেই কোনো এন্টারটেইনমেন্ট নেই, সব যেমন কেমন কাটখোট্টা, জোলো স্বাদের।
গাইয়ে নাচিয়ে আর এক্টো করনেওয়ালা/ওয়ালিদের ভিড় আর তাদের সমঝদারবাবুদের দিয়ে, সংসদ ভবন থেকে রাজ্য বিধানসভা, গোটা সংসদীয় সিস্টেমকে যেভাবে বাইজিবাড়ি বানিয়ে রেখেছিলেন, সেই অভ্যাসে এভাবে ছেদ পড়তে- ভীষণ হতাশাতে ডুবে গেছি। যেখানেই বাইজি বাড়ি সেখানেই মাতাল, লম্পট, দুশ্চরিত্র, ধর্ষক, খুনি, চোর ডাকাতদের ভিড় থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আপনি তাদেরকেও নিরাশ করেননি, কিছু উচ্চস্তরীয় ওই জাতের দুষ্কৃতীকে সাংসদ বিধায়ক বানালেও- বাকি প্রায় সকলকে পঞ্চায়েত স্তরের প্রতিটা রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক পদে বসিয়ে, একটা নিবিড় কর্মসংস্থান গড়ে দিয়েছিলেন। রাজ্যের ৮৮ হাজার বুথে অন্তত ৪ লক্ষ নানান মাপের শিল্পী ‘চোর ডাকাত'দের সম্মানের সাথে চৌর্যবৃত্তির দোকান খুলে দিয়েছিলেন, আজ এরা প্রত্যেকে মাতৃহীনা হয়েছে আপনার চেয়ার গেছে বলে। যদিও চেয়ার আপনি ছাড়েননি, ‘ওরা’ আপনাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
দুনিয়ার সমস্ত ওঁচা মালগুলোকে এভাবে সংগঠিত কেউ করতে পেরেছিল আপনার আগে? আজ শুধুমাত্র আপনার অভাবে এই তাজা কর্মঠ অপকর্মাগুলো ঘরছাড়া, উন্নয়নের জোয়ারে এদেরকে আপনি ভাসিয়ে এনেছিলেন, গেরুয়া গ্রহণ লেগে ভাটির টান আসতেই স্রোতের ‘গু’ এর মতো এরা সকলে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। আপনার শাসনামলে পকেটমারি, কেপমারি, ছিঁচকে চুরি, বাস ডাকাতি, ওয়াগন ব্রেকিং, ব্যাঙ্ক লুঠ, ছিনতাই জাতীয় সমস্ত কুটির শিল্পগুলো লুপ্তপ্রায় করে দিয়েছিলেন। এই শিল্পীদের প্রত্যেককে ভবনে বসিয়ে মা-মাটি-মানুষ এর সরকার বানিয়ে ছিলেন। আজ কীভাবে আমরা চোর নয় (আপাত) কাউকে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে সহ্য করতে পারব! সিভিক পুলিশের কথা সকলে জানে, কিন্তু সিভিক শিক্ষক, সিভিক প্রশাসক, সিভিক মন্ত্রী- আজ সকলেই জারজ সন্তানের মতো বেদনা বিধুর। অথচ, আপনি যদি আইন করে সিভিক মুখ্যমন্ত্রীর পদ বানিয়ে রাখতেন, সেই আইনের বলেই আপনি আজ অল্প হলেও তো ক্ষমতাধর থাকতেন, আজ আমাদের এভাবে কষ্ট পেতে হতো না।
আপনি শুধু শিল্পের সংজ্ঞাই বদলে দেননি, আপনি শিক্ষা স্বাস্থ্য সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি সমস্ত কিছুর পরিভাষা বদলে দিয়েছিলেন। সন্তানকে ভাইপো হিসাবে প্রতিষ্ঠা কতজন করতে পেরেছে সভ্যতার ইতিহাসে? কাশের বালিশে শুইয়ে, সিঙ্গুরের সরষের তেল দিয়ে- নান্দনিক শিল্পের পায়ুমর্দনও যে নান্দনিক ভাবেই করা যায়, সেটাও তো আপনারই অতুল্য কীর্তি। বাঙালির দেশে বিহারি মেড়োদের প্রতিষ্ঠা করেছেন, অশিক্ষিত নেড়ে মোল্লাদের ভিক্ষা দিয়ে দুধেল গাই বানিয়ে ফেলা যায়, তা তো আপনার উদ্ভাবনী। ধর্ষিতা, মৃত লাশ হয়ে ইমাম মুয়াজ্জিন আলেম কিম্বা পুরোহিত, প্রত্যেকের যে রেট হয়- সেটাও তো আপনার দুরদর্শী আবিষ্কার। রাজ্য সরকারি কর্মীদের যে ঘেউ এর পর্যায়ে নামানো যায়, শিক্ষিত আঁতেল বুদ্ধিজীবী সমাজকে ভাতাজীবী বানিয়ে তাদের চাকরবাকরের পর্যায়ে এনে, উলঙ্গ করে ওদেরকে সমাজের সামনে ন্যাংটা করে তুলে ধরা- আপনি ছাড়া আর কেউ কি করেছে! আজ আপনাকে আমি মিস করব না? সংখ্যালঘু তোষণের প্রচারের আড়ালে RSS এর এমন বিস্তার স্বাধীনতার পর কেউ করতে পেরেছিল বাংলার জমিনে? অথচ আপনি যে চরম সাম্প্রদায়িক একজন নিকৃষ্ট ব্রাহ্মণ্যবাদী মহিলা, যার ক্ষমতার মানচিত্র কেবল দক্ষিণ কোলকাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ- সেটা নিয়ে কাউকে প্রতিবাদ করতে দিয়েছিলেন!
আজ প্রায় কুড়ি দিন হতে চলল, আপনার ওই শ্বাপদের মতো পদচারনা করে বক্তব্য মঞ্চায়ন হতে না দেখে- জীবনটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। কী যেন নেই, কী যেন নেই সারাক্ষণ এক অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করছিল, আজ আবার বক্তব্যের নামে মুখ দিয়ে অশ্রাব্য নরগোবর গ্যাসের নিঃসরণ শুনে- আত্মায় একটা পাশবিক তৃপ্তি পেলাম। বড্ড মিস করছিলাম আপনাকে। আপনার দলের ব্লক প্রেসিডেন্ট এর দল, যারা আবার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে BDO পদও সামলাতো, আপনার দলের সেক্রেটারিরাও আজ পাল্টি মেরে দিয়েছে- যারা প্রতিটা থানার বড়বাবু সেজে বসে ছিলেন। সবাই ভাবছে আপনি কেন রাস্তায় নেই, আরে গর্ধব মাথামোটার দল- তোরা তো তবুও কাঁদছিস; ভেবে দেখেছিস কখনও- যার অনুপ্রেরণাতে তোরা এতদিন করে কম্মে খেয়েছিস, তিনি মানে আপনি তো পাথর হয়ে গেছেন। তোরা অল্প শোকে কাতর, আপনি অধিক শোকে পাথর। পাথর কখনও কাঁদে? পাথরের মূর্তি বানিয়ে তার পূজা করতে হয়। আসলে আপনি দেহত্যাগ করছেন না বলে পুজোটা শুরু হচ্ছে না, কবীর সুমোন্দা প্রস্তাবিত মন্দিরটাও তৈরি হচ্ছে না।
সত্যি বলতে আপনি তো ৪ তারিখে রাজনৈতিকভাবে মারা গেছেন, বিষাক্ত সাপের খোলস দেখে যেমন পক্ষীকূল ভয় পায়, তেমনই কেউ কেউ ভয় পাচ্ছে হয়ত আজও আপনাকে দেখে। অনেকেই মিথ্যা ভ্রমে রয়েছে, আপনি আবার জ্বলে উঠবেন। নষ্টপল্লীর মহিলারা যৌবন হারালে প্রথমে সেই পাড়ারই মাসী হয়, এর পর কোনো বাবুর বাড়ির কাজের লোক, তারপর কোনো মন্দির চত্বরের ভিকিরি। আপনি রাজনৈতিক পতিতাপল্লীর মাসী থেকে আজ ভিকিরি, বাকি জীবনটা দয়া আর সহানুভূতি ভিক্ষা করেই কাটবে। যত দিন যাবে তত আপনি ফেকলু হয়ে যাবেন। সবাই অত্যন্ত তৃপ্তির সাথে আপনার ঔদ্ধত্বের পতন দেখতে আগ্রহী। একটা করে দিন যাবে, আপনাকে শেয়াল কুকুরে লাথি ঝাঁটা মারবে।
আপনি নোটার সাথে লড়তে লড়তে হাঁফিয়ে গিয়ে ফেসবুক লাইভে এসে মড়াকান্না কাঁদবেন, দেওয়ালকে কবিতা শোনাবেন, শূন্যের ক্যানভাসে কোটি টাকার ছবি আঁকবেন, গলির নেড়িটার সাথে রেশ দিয়ে গান গাইবেন, কবিতার নামে শব্দ হাগবেন। ১৫ বছর ধরে উত্যক্ত করে, আমার মতো কত লাখ মানুষকে সর্বস্বান্ত করে, দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটা মুহূর্তকে নাকালে জেরবার করা একজন অসভ্য, ইতর, চোর, মিথ্যাবাদী, নির্লজ্জ, বেহায়াকে এমন অসহায় দেখতে পাওয়ার চেয়ে সুখ- আর কিচ্ছুতে নেই, কিচ্ছুতে নেই। আপনি কাঁদতে থাকুন, প্রতিটা ফেসবুক লাইভ আমি দেখবোই দেখব, কথা দিলাম। আর প্রার্থনা করব, আমার মেয়ের নাতি যেন আপনাকে জীবিত দেখে যায়, যখন আপনি অন্ধ হয়ে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুকে কামনা করে তাকে খুঁজে ফিরবেন। এটুকু শুভনন্দন তো করতেই পারি, কী বলেন!
জয় বাংলা
জয় তোলাবাজি
জয় কাটমানি
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন