বিজ্ঞান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিজ্ঞান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

অঙ্কঃ ২০২৬ ভোটের আগেই তৃনমূল ফিনিশ

 

মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক কেরিয়ার শেষ, ভোটের আগেই তৃণমূলও ফিনিস। অঙ্ক সেটাই বলছে। মিলিয়ে নিন নাহয়-

মুখ্যমন্ত্রী মোটামুটি নিশ্চিত ১কোটি ২০ লাখ নাম কাটা যাচ্ছেই। কিছু ভুলভ্রান্তি বাদে, ধরে নেওয়া যায় ১ কোটি ১০ বা ৫ লাখ অবৈধ ও ভুয়ো ভোটার। নিদেন পক্ষে ১ কোটি নাম বাদ যাওয়া কেউ রুখতে পারবেনা।

রাজ্যে ২০২৪ সালের ভোটার লিষ্টে ৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটার ছিলো। যার মধ্যে পোল হয়েছিলো ৬ কোটি ৫ লাখ মত ভোট। উপরোক্ত ওই সম্ভাব্য বাদ যাওয়া ১ কোটির আশেপাশে ভুতুরে ভোটারের প্রায় সমস্ত ভোটটাই পোল হয়েছিলো, যার ৮০% তৃণমূলের বাক্সেই গিয়েছিলো, এটা বলার জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ হতে হয়না। 

পোলিং ভোটের ৬ কোটির নিরিখে ওই ১ কোটি মানে ১৬.৬৬% ভোট নেই হয়েছে। যার মধ্যে ১৪% এরও বেশী ভোট ভুতুরে ভোট তৃণমূলের ছিলো, যেটা গায়েব হতে, ২০২৪ এর ভোটে প্রাপ্ত তৃণমূলের ৪৩.৬৯% ভোট শেয়ার কমে দাঁড়াবে- ২৯.৬৯% তে। 

২০২৬ এর নিরিখে রাজ্যে মুসলমান ভোট দাঁড়াবে কমবেশী ৩০%, যার মধ্যে বাম+কংগ্রেস ও অন্যান্য ছোট দল মিলে ৫% পায়। বাকি ২৫% এর গোটাটা তৃণমূল পেয়ে এসেছে গত ১৪ বছর ধরে প্রতিটা নির্বাচনে। এখন এই মুসলমান ভোটের মাত্র অর্ধেক, হ্যাঁ- যদি অর্ধেকও যদি তৃণমূলের মুখে ঝাঁটার বারি মারে, তৃণমূলের ২৯.৬৯% ভোট কমে ১৭%তে মুখ থুবড়ে পরবে। ৫০টা আসনে জিতলেই তৃণমূল বর্তে যাবে। এর পর চুরি দুর্নীতির কারনে কিছু বাদ গেলে তো আরো শেষ। 

পিসি ভাইপো গায়ক নায়ক ধমকে চমকে টাকা ছড়িয়ে,  জাপানি তেল রকেট ক্যাপসুল ভায়াগ্রা সর্বিট্রেট RSS কোনো ওষুধই তৃণমূলের শ্মশানযাত্রা আঁটকাতে পারবেনা নিশ্চিত। দুর্নীতিগ্রস্থ BDO/SDO আর থানার অসাধু দলদাস OC/IC এর দলও যদি তৃণমূলের হয়ে প্রকাশ্যে রাস্তায় নেমে পরে উলঙ্গ হয়ে- তারাও জনরোষের শিকার হবে, তাদেরও পরিবার পরিজন আছে। হারামের টাকায় ফুর্তিমারা কোনো চোর বাটপার এবারে পাড় পাবেনা।

সুতরাং, আতঙ্কিত মমতা ও i-Pac সমানে SIR এর মুসলমানকে বাদ দিচ্ছে এমন গল্প ফেঁদে মুসলমান সমাজকে অশান্ত করে রাজ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইছে। মুসলমান সম্প্রদায়কে ভয় দেখিয়ে উস্কিয়ে রাজ্যে দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে। আসল সমস্যার লক্ষ গুন মিথ্যা প্রচার। যেমন SIR এর লাইনে লোকে অসুস্থ হবার গল্প ছড়াচ্ছিলো, অথচ বেকার ভাতার লাইনে সবাই ফুর্তিতে রয়েছে। আতঙ্কিত মুসলমান নয়, আতঙ্কিত তৃণমূল। মুসলমানের নাম বাদ কতটা যাবেনা জানিনা, কিন্তু তৃণমূলের নাম নিশান মুছে যাবে রাজ্যের বুক থেকে- এটার দেওয়াল লিখন পড়া যাচ্ছে।

যতটা আতঙ্কিত হবার কথা, তার লক্ষ গুণ আতঙ্ক তৃণমূল নিজে ছড়াচ্ছে তাদের পোষ্য মিডিয়া আনন্দবাজার, সংবাদ প্রতিদিন, TV9 বাংলা, আজকাল আর বর্তমান মিলে। সাথে ফেসবুক আর ইউটিউবের ভাতাজীবি কিছু স্বঘোষিত মিডিয়া আর বিশ্বমাচাদো সাংবাদিক কুল। তোলামূলের হারামের টাকায় পুষ্ট এরা আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য জান কবুল লড়াই করছে যাতে তাদের রোজগার বেঁচে থাকে।

মমতা ব্যানার্জীও সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টায় আছে, যেন তেন প্রকারে ২০২৪ এর ভুতুরে ভোটারলিস্ট ধরে ভোট করাতে। SIR নিতে তার মূল আপত্তি ভুতুরে ভোটার বাদ দেওয়া যাবেনা। মমতা ব্যানার্জী নিজেও ভোটে না দাঁড়িয়ে পালাতে চাইছে- এতে তাদের ভয় ও আতঙ্ক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগামীতে যা খুশি হোক- মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক কেরিয়ার দৃশ্যত ফিনিস।

সুতরাং, কোমর বেঁধে রাস্তায় নেমে পরুন। আমীতে রাজ্যের ক্ষমতায় কে আসবে তার চিত্র আজও পরিষ্কার নয়, কিন্তু এটা নিশ্চিত যে- ২০২৬শে কোনো অঙ্কে তোলামূল আর ফিরছেনা- এটার চেয়ে সত্যি এই মুহুর্তে আই কিচ্ছু নেই।

CPIM এর জন্যও এ এক চুড়ান্ত সুযোগ, মিডিয়াকে ভৌ ভৌ করতে দিন, কুত্তা ভৌভৌ করবে, কষিয়ে ক্যাৎ করে একটা লাথ মারলে কেঁউকেঁউ করে লেজ গুটিয়ে পালাবে। শুধু মাটিতে দাঁত কামড়ে পড়ে থেকে ভোট গণনা অবধি জান লাগিয়ে দিতে হবে। 


জনগণের বিজয় অদুৱেই। 


বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

ফ্রি অ্যাপসের ফাঁদঃ ঠিক কতটা বিপদের মাঝে রয়েছি আমরা?

 


কাশেম সুলাইমানির কথা স্মরণে আছে?

আমেরিকা ২০২০ এর শুরুটা করেছিল ইরানের এই কমান্ডারকে হত্যা করে। ১৭টি একই রঙের গাড়ির কনভয়ের মাঝে স্পেশ্যাল একটিকেই নিশানা বানিয়ে তাকে ছোট্ট একটা ড্রোন মিসাইল দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল বাকিগুলোকে কোনো ক্ষতি না পৌঁছে, এতই নিখুঁত ছিল এই অপারেশন।

ইরান সেনাবাহিনী মার্কিনিদের গুগল ম্যাপ বা ওই জাতীয় কোনো পরিষেবা পায় না মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের দরুন, তারা নিজেরাও মার্কিনি পণ্য ব্যবহারে উৎসাহী নয় ততটা। তার পরেও কীভাবে এত নিখুঁত ভাবে একজন ব্যক্তিতে নির্দিষ্টভাবে টার্গেট করতে সক্ষম হয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনী! সেদিন উত্তর না মিললেও ২০২০ ই জবাব দিয়ে গেল শেষের বেলায়।

গত ২০১৭ এর ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান দেশ ‘কেনিয়ার’নির্বাচনে এমনই এক চরম নিকৃষ্ট কাজ করেছিল ফ্রান্সের সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান, যেটা ধরা পড়ে এই ২০১৯ এর শেষে। ফ্রান্সের সেই কোম্পানি যারা বিনামূল্যে EVM সরবরাহ করেছিল অবাধ গণতন্ত্রের নামে, ওই EVM এর সুইচে বায়োমেট্রিক সেন্সার লাগিয়ে সকল ভোটদানকারীর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু তারা সফলভাবে সেই ডেটার সবটা নিজেদের দেশে পাচার করার আগেই ধরা পড়ে যায়। এই বিপুল ডেটার সবটা পাচার হয়ে গেলে ৭৭% কেনিয়ান ভোটারের আইডি, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, জন্ম শংসাপত্র, জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কার্ড, জাতীয় হাসপাতাল বীমা তহবিল কার্ড, কেনিয়া রাজস্ব কর্তৃপক্ষের ট্যাক্স পিন সবই হস্তগত করে ফেলত ফ্রান্স সরকার। শোষণের এ এক নতুন প্রক্রিয়া, আসলে আমরা নিজেরাও জানি না এই হাই-টেক দুনিয়াতে কখন কীভাবে কার দ্বারা প্রতারিত হয়ে যাচ্ছি।

ধোঁকাবাজেরা ক্রমাগত প্রযুক্তির সুফলকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে সর্বশ্রান্ত করার ফন্দি এঁটেই যাচ্ছে, তাদের নতুন হাতিয়ার হচ্ছে ফ্রি অ্যাপসের ফাঁদ।

আমরা আমাদের ফোনে অনেকেই হরেক অ্যাপস ডাউনলোড করে ফেলি, যাদের অধিকাংশই ফোটো কেন্দ্রিক, গান ও ভিডিও সম্বন্ধীয়, গেমস এর অ্যাপস ইত্যাদি। মুসলমানেদের মধ্যে অনেকেই হাদিস, কোরান ও নামাজের সময় জানতে বহু অ্যাপস ডাউনলোড করে নির্দ্বিধায়। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের ৯৯.৯৯% মানুষের মোবাইলে ১০০% ফ্রি অ্যাপস বোঝাই রয়েছে, কারণ আমরা ফ্রি কিছু পেলে আর কিচ্ছুটি চাই না।

অ্যাপস মূলত তিন ধরনের হয়,
১) ‘পেইড অ্যাপস’, এইগুলো ডাউনলোড করতে গেলেই নির্দিষ্ট পরিমাণে মূল্য দিতে হয় ও বাৎসরিক ভাবে রিনিউ করতে হয় নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা পেতে।
২) ‘ইন অ্যাপ পার্চেস’, এই অ্যাপগুলো বিনামূল্যে ডাউনলোড করা গেলেও বেশি কিছু পরিষেবা পেতে দাম দিতে হয়।
৩) ‘ফ্রি অ্যাপস’, এগুলোতে সকল ধরনের বা অধিকাংশ পরিষেবাই সম্পূর্ণ ফ্রি।

আচ্ছা কখনও মনে হয়েছে, এরা এত খেটেখুটে অ্যাপস বানিয়ে নিয়মিত পরিষেবা কেন দেয় আপনাকে? কী লাভ সেই সংস্থার! তারা কি জনসেবা করে এগুলো দ্বারা! উত্তর হলো- ‘না’। তারা মোটেও জনসেবা করে না বরং আপনাকে বিনামূল্যে দেওয়ার নামে ডাউনলোড করিয়ে দিতে পারলেই তাদের রোজগার। এবারে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তারা বিজ্ঞাপনদাতাদের থেকে রোজগার করতে শুরু করে। ফ্রি ও সেমি-ফ্রি অ্যাপসগুলোতে মোটামুটি চার প্রকারের বিজ্ঞাপন/অ্যাড দেখতে পাওয়া যায় বর্তমানে। যথাক্রমে, (i) ইন্টারস্টিসিয়াল অ্যাডস, (ii) ব্যানার বা ডিসপ্লে অ্যাড, (iii) ইন-অ্যাপ অ্যাড এবং (iv) ন্যাটিভ অ্যাড। এই সকল অ্যাড নিয়ে পরে কোনো প্রবন্ধে আলাপ করা যাবে। কিন্তু রোজগার এখানেই শেষ হয়ে যায় না, বরং এর পরেই অনৈতিক কাজকর্ম শুরু হয় যা আমাদের সকলের অগোচরে।

আজকের এই বাইনারি মাধ্যম সর্বস্ব 5G গতির দুনিয়াতে সম্পদের মানে বদলে গেছে, যার কাছে যত তথ্য আছে সে বা তারাই সবচেয়ে ক্ষমতাধর, আর ক্ষমতাধরের কাছে অর্থ তো পায়ের ধুলো। তথ্য অর্থাৎ ‘ডেটা’, যাকে বলা হচ্ছে ‘Data is new oil’ অর্থাৎ তথ্যই হচ্ছে বর্তমানে খনিজ তেল। আর এই তেল উত্তোলন যে যত হারে করতে পারছে, সে তত কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। ঘটনা হচ্ছে কী করে বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এই ডেটা ভান্ডার কীভাবে গড়ে তুলেছে, পায় কোথা থেকে? আমরা তো কাউকে কোনোদিন কোনো তথ্য দিইনি। আসলে ‘ফ্রি’ মাধ্যমের মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রতিটি বিনামূল্যে পরিষেবা প্রদান করা কোম্পানিগুলোর মুনাফা। সেই কোম্পানিটি গুগল, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি যে কেউ হোক।

আমরা এই সকল অ্যাপসের থেকে পরিষেবা নিই আমাদের হরেক ব্যক্তিগত তথ্যের বিনিময়ে, আমরা প্রতিটি ব্যক্তিই আসলে ‘পণ্য’ এই অ্যাপস কোম্পানিগুলোর কাছে। আমাদের সেই পছন্দপঞ্জী তথ্য বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে ফ্রি এ্যপস কোম্পানি গুলো। ধরুন আপনি অনলাইনে জামা কেনার জন্য সার্চ দিলেন, দেখবেন সারাদিন আপনি অন্যান্য যেসব ব্রাউজিং করছেন, সেই সকল ক্ষেত্রেই হরেক জামার বিজ্ঞাপন দেখছেন। এখন জামার পরিবর্তে টিভি, ফোন, ট্যুর ডেস্টিনেশন ইত্যাদি যা খুশি পণ্য আপনি একটিবার সার্চ করুন সারাদিন ওটাই দেখবেন সর্বত্র। যদি কৌতূহল মেটাবার জন্য কালাজাদুর বিষয়ে সার্চ করেন, তাতেও দেখবেন সর্বত্র ওই বিষয়েই নানান বিজ্ঞাপন আসছে বিবিধ বিকল্পের সাথে।

এই সকল অ্যাপসগুলোতে এক বিশেষ ধরনের কম্পিউটার প্রযুক্তি নক্সা ব্যবহার করা হয়, যাকে এককথায় ‘অ্যালগরিদম’ বলা হয়। এই অ্যালগরিদমই অ্যাপস বা ওয়েবসাইটটির মূল সার্ভারে তথ্য পাঠিয়ে দেয় যে- আপনি কী খুঁজছেন। ল্যাপটপের কোনো ব্রাউজারে এমন কিছু করতে গেলে সেখানে ‘accept cookies’ বলে একটা অপশন আসে, এই কুকিস মানে বিস্কুট নয়, এই কুকিস হলো টিকটিকি বা গোয়েন্দা। এক বিশেষ ধরনের গোয়েন্দা সফটওয়্যার, যারা আপনার পছন্দ-অপছন্দ ও ব্রাউজিং জগতের যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করে তাদের জন্য, যে ওয়েবসাইট তাকে বসিয়ে রেখেছে আপনার কম্পিউটারে, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে তথ্য পাচার করার জন্য।

সুখের বিষয় হলো ব্রাউজারে আপনি কুকিস ‘কন্ট্রোল’ করতে পারেন, মোবাইল অ্যাপসের ক্ষেত্রে তেমনটার অপশন থাকে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। মোবাইল ব্রাউজারের সেটিংসে গিয়ে আপনি কুকিস ব্লক করে আমাদের আনন্দবাজারের ওয়েবসাইট খুলতে যান, দেখলেই তারা কুকিস অ্যাল্যাও না করলে অ্যাক্সেসই করতে দেবে না, অর্থাৎ সিম্পলি গিভ এন্ড টেক পলিসি।

প্রায় প্রতিটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীই প্রতিটি অ্যাপসকে মোবাইলের লোকেশনের তথ্য থেকে শুরু করে ফোনের কললিস্ট, ফোনের ফোটো গ্যালারি ও ভিডিও ফাইল, ফোনের যেকোনো ধরনের মিডিয়া ফাইল সহ কী কী ধরনের তথ্যের অ্যাকসেস দিয়ে দিই তা আমরা নিজেরাই জানি না। আমরা কেউ কখনও কি পড়ে দেখি, লম্বা ওই ‘টার্মস এন্ড কণ্ডিশন’ লিস্টে কী কী লেখা আছে, আমরা জাস্ট OK বটন ক্লিক করে দিই। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা-ফেসবুকের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর কিছু মানুষ বুঝতে পেরেছে যে, ফ্রি পরিষেবা দেওয়া কোম্পানিগুলো আমাদের তথ্য অবৈধ বিক্রয় করেও অনেক টাকা কামাই করছে। প্রতিটি অ্যাপসে লগ ইন করতে ফোন নম্বর বা ইমেল আইডি দিতে হয়, স্বভাবতই যে কোম্পানি যত বড় তার কাছে তত বড় তথ্য ভান্ডার রয়েছে আমাদের সম্পর্কে। এটি যেমন নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে, সেভাবেই ভয়ঙ্কর ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

প্রায় প্রতিটি দেশেই যেকোনো ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা অবৈধ। কিন্তু এটা নেহাতই কথার কথা, আজকের দিনে অবাধে চুরি হচ্ছে আমাদের অজ্ঞতার সুযোগে। এমন ক্ষেত্রে কিছু দালাল কোম্পানির জন্ম হয়েছে যারা বিভিন্ন অ্যাপস কোম্পানি থেকে মোটা অর্থের বিনিময়ে ডেটাগুলো কিনে নেয় ও বড় বড় বিজ্ঞাপনদাতা বা গবেষণাকারীদের কাছে একাধিকবার বিক্রি করে মোটা টাকা রোজগার করে। একটা তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালে ইউরোপের একটা দেশের নির্বাচনে বিরোধী রাজনৈতিক দল ফেসবুকের থেকে এমনই তথ্য কিনেছিল, ঠিক কী কি বিষয়ে জনগণ সোশ্যাল মিডিয়াতে আলাপ আলোচনা করছে নির্দিষ্ট শহর গ্রাম বা বিধানসভা কেন্দ্রের। সেখানে প্রতিটি ব্যক্তির শেষ ৩ মাসের তথ্যের দাম ছিল ১৭১১টাকা, ভাবুন আমাদের বিপুল জনসংখ্যার দেশে কোনো রাজনৈতিক দল এমনটা করলে, তা থেকে কী বিপুল পরিমাণ টাকা রোজগার করতে পারে বড় বড় সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট গুলো।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত এমনটাই ছিল, যেখানে শুধুমাত্র অ্যাপস কোম্পানিগুলোই ডেটা বেচে আয় করত অনৈতিকভাবে, কিন্তু এখন শুধুমাত্র ডেটা কালেকশন করার জন্য হরেক মনোরঞ্জনকারী অ্যাপস ও সাইটের জন্ম দিয়েছে বহু গোয়েন্দা সংস্থা- তাদের এক ও অদ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে ডেটা মাইনিং করা। ফেসবুক, টুইটারে হরেক মজাদার এমন লিঙ্ক আসে টাইমলাইন সার্ফিং করার সময়, যেখানে আমরা ক্লিক করি কিছু না ভেবেই। মজাদার সব সাইট সেগুলো, পূর্বজন্মে কী ছিলেন, আপনার লাভমেট কী, কবে আপনার বিয়ে হবে, আপনার বর্তমান বয়সের ছবির বিকৃতি ইত্যাদি হরেক মজাদার সাইট, এরা আসলে প্রত্যেকটি ডেটা মাইনিং সংস্থা। সেখানে ঢুকতে গেলে বেশ কতগুলো পার্মিশন চাওয়া হয় তাদের তরফে, সেগুলোকে ok করলে তবে ওই সকল মজাদার পরিষেবা পেতে পারবেন। এমনই একটি ফ্রি এ্যপস হচ্ছে ‘Muslim Pro’।

‘Muslim Pro’ হচ্ছে অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড করা ইসলামিক অ্যাপস, গোটা বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ এটার ব্যবহার করত এই শুরুর নভেম্বরেও। এরাই X-mode নামের এক দালাল ডেটা মাইনিং কোম্পানিকে তাদের যাবতীয় ডেটার অবৈধ বিক্রি করত সেই ২০১৮ সাল থেকে, খবরটি সম্প্রতি ফাঁস হয়ে গেছে হরেক মিডিয়াতে। এই X-Mode কে কাজে লাগিয়েছিল US militery।

মার্কিন মিলিটারি এমন অসংখ্য ছোট ছোট কোম্পানিকে দিয়ে অজস্র ফ্রি অ্যাপস বানিয়ে ছেড়ে দেয় সেই সকল নির্দিষ্ট অঞ্চলে, যেখানে তাদের নজরদারি চালাতে নিখুঁত তথ্য দরকার। সাধে কি আর চীন কোনো ধরনের মার্কিন-ইউরোপীয় ইন্টারনেট মাধ্যমের প্রযুক্তি কোম্পানিকে দেশে ঢোকার পার্মিশন দেয়নি, একই কারণেই শত শত চাইনিজ অ্যাপস ব্যান হয়েছে আমাদের দেশেও।

নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির উপরে, কোনো গোষ্ঠীর উপরে, কোনো বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলে নজরদারি চালাবার জন্য এমন অ্যাপস হাতিয়ার ব্যবহার করছে কিছু দেশ। আমাদের মতো অতি সাধারণ ব্যবহারকারীরাও জানি যে গুগল, ফেসবুক দ্বারা আমাদের সহজে ট্র্যাক করা যেতে পারে, তেমনই মার্কিন সেনাবাহিনী, CIA, মোসাদ, MI-6, ISI এর মতো ধুরন্ধর বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও জানে এ কথা। সুতরাং সেয়ানাদের ধরতে গুগল-ফেসবুকের মতো চিহ্নিত মাধ্যম ব্যবহার করে ট্র্যাক করতে পারবে না। তাই সেয়ানাদের জন্য এমন অসংখ্য মনোরঞ্জন ও প্রয়োজনীয় অ্যাপস বাজারে ছেড়ে রেখে তারা লক্ষ্যে পৌঁছে যাচ্ছে; ব্যাপারটা এমনই ভয়াবহ দিকে চলে যাচ্ছে যে- আমি আপনি যে কেউ তাদের জন্য ঘরের পোষা মুরগির মতো সহজলভ্য নিশানা হয়ে যাচ্ছি।

মার্কিন সেনাবাহিনী ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি এমন হরেক অ্যাপস বাজারে সরাসরি আছে ছদ্মবেশে। এই ২০২০ সালের এপ্রিলে মার্কিন কংগ্রেস ‘বাবেল স্ট্রিট’ নামের একটা প্রযুক্তি সংস্থাকে ৮৯ লক্ষ ডলার পেমেন্ট করেছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ অনুমোদনে। এদের কর্ণধার টিম হকিন্স’ সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিল, “মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ছোট ছোট জনজাতি, মিলিট্যান্ট-মিলিশিয়া গ্রুপদের লোকেশন ট্র্যাক করতে পারা জরুরী জঙ্গীবাদ নিকেশ করতে, সেই প্রযুক্তির উদ্ভাবনের জন্যই এই বিনিয়োগ”। এই ‘বাবেল স্ট্রিট’ কোম্পানির একটি প্রোডাক্ট বা সফটয়্যার আছে ‘LOCATE X’ নামে, এর দ্বারা আপনার ফোনের লোকেশন বন্ধ থাকলেও ‘বাবেল স্ট্রিটের’ সার্ভার নিখুঁত অবস্থান পেয়ে যাবে যে ডিভাইসে এটা ইনস্টল আছে, এমনভাবেই এগুলো তৈরি।

এই ভয়াবহ প্রযুক্তিগত ফাঁদগুলো এই ‘Muslim Pro’ স্ক্যামের উন্মোচনের পরেই ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি মুসলমান দেশগুলোর। আগামীতে এটা খোদ আমেরিকারই উপরেই যে অন্য কেউ প্রয়োগ করবে না তা কে বলতে পারবে! ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্প তো আমরা অনেকেই জানি। তবে তারা ক্ষমতাধর- প্রযুক্তি, অর্থ সকল দিক দিয়ে। ওরা নিজেরা নিজেদের সুরক্ষিত করে নেবে; কিন্তু আমাদের মতো ছাপোষা মানুষের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কী হবে!

উপরে কেনিয়ার ঘটনা সে জন্যই বলেছি শুরুতে। জটিল অ্যালগরিদমের মাধ্যমে আমাদের প্রতিটি গতিবিধি সমন্ধীয় পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য কোন দপ্তরে পৌঁছে যাচ্ছে আমাদের অজান্তে তার খোঁজ কেউ জানি না।

মুসলমানেদের জন্য যেমন ‘Muslim Pro’ সেজে এসেছিল মার্কিন সেনা, তেমনই হিন্দুদের, খ্রিস্টানদের, বৌদ্ধদের জন্য কিছু এমন অ্যাপস আছে কিনা আমরা কেউ জানি কি? এর সাথে যদি সেই অ্যাপস দর্শনধারী হওয়ার সাথে বেশ খানিকটা প্রয়োজনও মিটিয়ে দেয়, সেক্ষেত্রে আমরা নিজেরাই শত শত বন্ধুদের কাছে সংশ্লিষ্ট অ্যাপসের প্রচার করে দিয়ে থাকি, এটাই আমাদের স্বাভাবিক চরিত্র।

অনেকে ভাববেন আরে অমুক অ্যাপস তো আমাদের সাচ্চা ভারতীয়র তৈরি, কিংবা তার মালিক হিন্দু বলে হিন্দুদের ক্ষতি হবে না নিশ্চিত ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের জন্য একটা তথ্য দিই, Muslim Pro অ্যাপসের মালিকও আরবের মুসলমানই ছিল, যদিও তাদের ফান্ডিং করেছিল এক মার্কিন কোম্পানি। আমাদের দেশের দিকেই দেখুন, গরু রাজনীতি এখন ভীষণ জনপ্রিয়। তথাপি গোমাংস রপ্তানি বন্ধ তো হয়নি, উল্টে প্রতি বছর তা বেড়ে চলেছে। প্রথম ১০টি ভারতীয় গোমাংস রপ্তানিকারক কোম্পানির ৭টিই অমুসলিমদের, যদিও প্রতিটি নামই আরবি শব্দ দ্বারা তৈরি। এদের মাঝে কয়েকজন আবার জৈন ধর্মেরও আছে, যারা আজন্ম নিরামিষাশী। আরও বড় তথ্য হচ্ছে ওই ৭টি বড় কোম্পানির মধ্যে অন্তত ১৯ জন এমন পার্টনার আছে যারা বিজেপির বড় বড় নেতা। সঙ্গীত সোম বা অনিল ভিজদের মতো প্রথম সারির গোহত্যা বন্ধ বিষয়ে রাজনীতি করেই তাদের পরিচিতি পাওয়া ব্যক্তিরা ওই ১৯ জনের তালিকাতে রয়েছে। সুতরাং হিন্দু বলেই হিন্দুরা সেফ, বা মুসলমানের কাছে মুসলমানেরা সেফ, বিষয়টা এতটাও অতি সরল নয়। নতুবা প্রতি বছর এদেশে ধরা পড়া ISI এর চরেদের ৯৫% অমুসলিম হতো না।

‘PINGDOM’ নামের ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনি নিজেই দেখে নিতে পারবেন আমাদের বহু চেনা ও অচেনা অ্যাপস বা ওয়েবসাইটগুলো কীভাবে কোন কোন তথ্য চুরি করতে কীভাবে আমাদের ফোনকে ব্যবহার করে। সুতরাং এখন বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কীভাবে কাসেম সুলাইমানিকে এক্কেবারে পিন পয়েন্টে টার্গেট করে খুন করা সম্ভব হয়েছিল।

এমনিতেই আমরা হরেক চাইনিজ কোম্পানিদের ফোন, টিভি, অ্যাপস, ফান্ডিং দ্বারা নাগপাশে বন্দী। আগামীকাল তাদের সাথে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে, তারা আমাদের দেশে ওই কায়দাতেই ক্ষতি করেবে কিনা কে তার গ্যারান্টি দেবে! আমাদের দেশের শিল্পপতিরা, বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও আগামীকাল এমন কিছুর শিকার হতেই পারেন, যদি না আজই এগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বিকল্প সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে রাখে রাষ্ট্র। জনপ্রিয় অ্যাপসগুলোর আদলে সরকারই এমন পরিষেবা দিলে রাষ্ট্রের জনগণের তথ্য বিদেশী শত্রুদের হাতে যাওয়া থেকে অবশ্য রক্ষা পায়, কিন্তু সেটা করবেটা কে! সামান্য আরোগ্যসেতু এ্যপসের বিষয়েই কোনও তথ্য নেই সরকারের কাছে।

বহিঃশত্রু ভুলে যান, তারা আমাদের নাগালের বাইরে। ফেসবুক, গুগলের মতো কোম্পানিগুলোও আমরা ধরাছোঁয়ার বাইরে, তারা অধিকাংশ দেশের সরকারের চেয়েও বেশি ধনী ও ক্ষমতাবান। বিভিন্ন সরকারই এদের সাথে হরেক ডিল করে। যাতে কেউ বিদ্রোহ ঘোষণা করলে সেই বিদ্রোহীদের গতিবিধির সবটাই ট্র্যাক করতে পারে সরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর এই তরজাকে কাজে লাগিয়ে ফ্রি পরিষেবা দিয়ে রাজনৈতিক ডেটা মাইনিং করতেই বা কতক্ষণ এদের!

যেকোনো স্বৈরাচারী শাসক চাইলেই প্রতিটি সরকার বিরোধী বিদ্রোহকে অঙ্কুরেই ‘খতম’ করে দিতে পারে। গণতন্ত্রের সংজ্ঞাই বদলে যেতে পারে এর বিকল্প না এলে। এমন কোনো অ্যাপসের দ্বারা খুব সহজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পথচলতি অবস্থায় ট্র্যাক করে খতম করে দেবে বা পুলিশ দিয়ে তুলে নেবে, অথচ আপনার লোকেশন সার্ভিস বন্ধই ছিল ফোনে। এছাড়া প্রোপাগান্ডা ছড়াবার জন্য ফেসবুক, ওয়াটস অ্যাপ, টুইটার কীভাবে ব্যবহার করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাসীন দল তা আমাদের চেয়ে ভাল কে জানে। তাই গুগল বা ফেসবুককে কোনো সরকারই ঘাঁটায় না, বরং ব্যবহার করে বিপুল অর্থের বিনিময়ে।

আমাদের দেশেরই কোনো ডাকাতগোষ্ঠী, পাচারকারী বা সমাজবিরোধীরা এমন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করলে সাধারণ জনগণের অবস্থা কী হবে বুঝতে পারছেন? আমরা এই ভারত উপমহাদেশের প্রায় প্রতিটি জনগণই ফ্রি পেলে আলকাতরাও খেয়ে নিই পেট ভরে, সেটা কি কারো অজানা রয়েছে! সুতরাং আমাদের এখনই সাবধান হওয়ার সময় চলে এসেছে, নতুবা আগামীতে আপনাকে এক্কেবারে সেখানেই পাকড়াও করবে এরা, যেখানে পেতে চায় তাদের ফাঁদ।

কিন্তু এর মানে কি আমরা ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন ব্যবহার করা ছেড়ে দেব! মোটেই তা নয়, নিশ্চয়ই এ বিষয়ে কোনো সমাধান নেবে সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞেরা ও রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। তবে আমরা নিজেরাও এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি অনেকটাই।

আমাদের প্রত্যেকের ফোনেই কমবেশি ৮০-১০০ বা তারও বেশি নানান অ্যাপস থাকে। যেগুলোর মধ্যে ৫-১০%ই আমরা ব্যবহার করি নিয়মিত। বাকিগুলো দৈনিক ব্যবহার না করলেও সেগুলো ফোনে রয়েই যায়, যেগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে সচল থাকে, ইন্টারনেট কানেকশন পেলেই তারা ডেটা মাইনিং শুরু করে নিজেদের সার্ভারে তথ্য পাচার করতে থাকে।
মোবাইলে নেট চালু করলেও সংশ্লিষ্ট অ্যাপসগুলোতে যদি নেট পরিষেবা বন্ধ করে রাখতে পারেন সেক্ষেত্রে আমার ছোট বুদ্ধিতে মনে হয় অনেকটাই এই অবৈধ ডেটা মাইনিং বন্ধ করে রাখা যাবে। এখানে ইন্টারনেটই এই পাচারের একমাত্র মাধ্যম। কিছু থার্ড পার্টি অ্যাপসের সন্ধান দিলাম নিচে, যেগুলো অ্যান্ড্রয়েড, আইফোন সহ প্রতিটি বড় বড় অপারেটিং সিস্টেমে উপলব্ধ। ‘কোন অ্যাপস নেট কানেকশন পাবে আর কোনটা পাবে না’ এই ধরনের অ্যাপসগুলোর যেকোনো একটি দ্বারা আপনি নিজে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। যখন যে অ্যাপসে নেট প্রয়োজন সেটা অন করে নিলেন, কাজ মিটে গেলেই আবার বন্ধ।

এভাবে আপনি আপনার মোবাইলের অপ্রয়োজনীয় নেট খরচাতেও রাশ টানতে পারবেন। অবশ্যই এই ফায়ারওয়েলের নেটটিও বন্ধ রাখতে ভুলবেন না।

I. NoRoot Firewall
II. NoRoot Data Firewall
III. LostNet NoRoot Firewall
IV. NetGuard
V. DroidWall

সুতরাং আমরা সকলেই পকেটে গোয়েন্দা নিয়ে ঘুরছি অদৃশ্য মাইন বেছানো যুদ্ধক্ষেত্রে। ‘আস্তিনে সাপ পুষে বাঁচা’ প্রবাদের জীবন্ত স্বরূপ প্রজন্মের আমরা। কীভাবে এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবো কেউ জানি না এই মুহুর্তে, তবে শুরুটা করতেই পারি। আমারটা আমি জানালাম, আপনার কাছে কোনো আইডিয়া বা প্রযুক্তি থাকলে কমেন্টে শেয়ার করতেই পারেন।

সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২০

ছেলেবেলা থেকেই মেয়ে প্রোগ্রামার হয় যেন...



ভাবছেন হঠাৎ সুমনের গানের লাইনটা পাল্টে লিখলাম কেন? কারণ, কিছুদিন ধরেই আশেপাশে দেখছি - বাবামায়েদের নতুন অ্যাসপিরেশন - ছেলেমেয়ে যেন অল্পবয়স থেকেই ভালোভাবে কোডিং (বা প্রোগ্রামিং) শিখে নেয়। শুধু বাবামা নয়, আমাদের স্কুলশিক্ষা দপ্তরও মনে করে ভবিষ্যতে প্রতিটা বাচ্চাই প্রোগ্রামার হবে, নইলে জীবন চলবে না, অতএব স্কুলে মানুষ হয়ে ওঠা শেখার চেয়ে সি, পাইথন, জাভা শেখা বেশি দরকারি।

এইটা নিয়েই দুচারটে কথা বলার ছিলো।

একেবারে অনভিজ্ঞ নই। আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে বিশ বছরের বেশি আছি, কোডিং ইত্যাদি ভালোই পারি। বহুদিন নানা টেকনোলজি নিয়ে গবেষণার ফলে খান সত্তর পাব্লিকেশন আর খান কুড়ি গ্রান্টেড পেটেন্টও রয়েছে। একদম ক অক্ষর গোমাংস নই কো বাবুমশাইরা।

মানে বলে রাখলাম আর কী...যদি একটু মন দিয়ে পড়েন আর ভাবেন।

আমার একটা ছোট মেয়ে আছে, ক্লাস এইটে পড়ে। ক্লাস সেভেন অবধি এদের ICT বলে একটা সাবজেক্ট ছিলো - Information and Communication Technology, লক্ষ্য কম্পিউটারের ব্যবহারিক দিকগুলো সম্পর্কে ছেলেমেয়েদের ওয়াকিবহাল করা। আপাতদৃষ্টিতে ঠিকই আছে। হ্যাঁ, ডিজিটাল ডিভাইডের জন্য আমার আপনার ছেলেমেয়েদের স্কুলেই এসব পড়ানো হয়, এরা বাড়িতে ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ পেয়ে হাত মকশো করতেও পারে। নইলে বাদবাকি ক'টা স্কুলের ছেলেমেয়েরা এসব সুযোগ পায় বলুন...

তা সেই প্রিভিলেজের গল্প না হয় আপাতত থাক। যেটা নিয়ে বলছিলাম - এই মেয়ের ক্লাস এইটেও ICT পড়ানো হয়, আর এতদিন যে শুধুমাত্র ব্যবহারিক দিকগুলো ছিলো - মানে ওই বাক্সটার মধ্যে কী থাকে, জিনিসটা চলে কী করে, ডকুমেন্ট বানায় কী করে, স্লাইড বানায় কী করে...ইত্যাদি... - এর বাইরেও জানলাম আরো অনেক কিছু আছে। মেয়ে একদিন বললো - BlueJ ইনস্টল করে দাও। আমি অবাক হওয়াতে জানালো এই ক্লাস এইটে নাকি জাভা প্রোগ্রামিং আর অবজেক্ট ওরিয়েন্টেশন শেখাবে! ক্লাস এইটে অবজেক্ট ওরিয়েন্টেশন? আমার এক বন্ধুর কাছে শুনলাম সিবিএসই বোর্ডে ক্লাস নাইনে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সের কোর্স রয়েছে, তাতে নিউরাল নেটওয়ার্কও রয়েছে। ক্লাস নাইনে নিউরাল নেটওয়ার্ক! যার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে ম্যাট্রিক্স অ্যালজেব্রা আর ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশনের ওপর!

ক্লাস এইট, নাইনে এইসব কীভাবে পড়ানো সম্ভব, যখন এই কনসেপ্টগুলো যে সমস্ত বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে তার কিছুই এই বয়সে পড়ানো হয় না?

এরপর খেয়াল করে দেখতে শুরু করলাম - ফেসবুক বা গুগলের নতুন বিজ্ঞাপণগুলো - যেমন WhiteHat Junior, বা Vedantu - এইসব বেসরকারি অনলাইন টিউশন স্টার্টাপগুলোর। এরা স্কুলের বাচ্চাদের অনলাইনে কোডিং শেখায়। অবশ্যই বিনা পয়সায় নয়। একটা উদাহরণ যেমন ৪৮টা ক্লাসের প্যাকেজের দাম ৩৫,০০০ টাকা। কেন শেখায়? বরং, বলা ভালো কেন এই প্যাকেজগুলো বিক্রি হয়? কারণ, এরা আমার আপনার মধ্যে একটা সংশয় তৈরী করে দিতে পেরেছে - যে ভবিষ্যতে আমার আপনার ছেলেমেয়েগুলো ইন্ডাস্ট্রিতে করে খেতে পারবে তো? তাছাড়া, ভবিষ্যতে সবকিছুই যদি কম্পিইউটারাইজড হয়ে যায়, সফটওয়্যারের ওপরেই চলে, তাহলে নিজের ছেলেমেয়েকে সেসব কীভাবে বানায় সেইটা শেখানোই কি ঠিক রাস্তা নয়?

আর এখনকার সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক অবস্থা এই সংশয়কে আরো বাড়িয়েছে...যেমন জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ এর "স্কিলনির্ভর শিক্ষা" - যেখানে স্পষ্টই ক্লাস সিক্সের পর কোডিং বা প্রোগ্রামিং শেখানোর সুপারিশ করা হয়েছে। আপনাকে বাধ্য করা হচ্ছে ওরা যেভাবে চায় সেইভাবে ভাবতে।

আপনি শুধু একটু চেষ্টা করুন বাস্তবটাকে চিনতে।

(১) কোডিং অবশ্যই বিরাট হাতিঘোড়া কিছু বস্তু নয়। বেসিক লজিক বুঝতে পারলে একটা অ্যালগরিদম বোঝা কঠিন নয়। আর আমাদের শিক্ষার স্ট্যান্ডার্ড কারিকুলাম এই লজিকের ভিত তৈরী করার জন্য যথেষ্ট পোক্ত। ধরুন, আপনি আপনার বাচ্চাকে শেখালেন কীভাবে চা বানাতে হয় - তার পরপর কিছু ধাপ আছে - পাত্রে জল নাও, গ্যাস জ্বালাও, পাত্রটাকে গ্যাসে বসিয়ে জল ফুটতে দাও...ইত্যাদি। সেই ধাপগুলো লিখে ফেলে সে কিন্তু তার বন্ধুদেরও একই কাজ শেখাতে পারবে। সাথে, আপনি তাকে এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে বললেন যে ধাপগুলোকে উল্টোপাল্টা করে দিলে কী হয়...কোডিং বাস্তবে এরকমই অ্যালগরিদমগুলোকে কম্পিউটারের পক্ষে বোঝা সম্ভব এমন ভাষায় - মানে সি, জাভা, পাইথন ইত্যাদিতে লিখে ফেলা। স্কুল লেভেলে আমরা যদি লজিকালি ভাবতে শেখাতে পারি, তাহলেই কিন্তু অনেকটা কাজ এগিয়ে যায়।

(২) কিন্তু ঠিক যেমন বেসিক অঙ্ক না শিখে অ্যালজেব্রার ইকুয়েশন সলভ করা যায় না, বলা ভালো বোঝা যায় না, ঠিক যেমন নিউটোনিয়ান মোশন বা মেকানিক্স না শিখে কোয়ান্টাম মেকানিক্স শেখা যায় না, একইভাবে কিছু গাণিতিক প্রিন্সিপল না শিখে ভালো প্রোগ্রামার হওয়া যায় না। হ্যাঁ, কিছুটা প্যাটার্ন চিনে ফেলে সেইটা দিয়ে গরুর রচনা লেখা যায় অবশ্যই, কিন্তু তাই দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি চলে না। উল্টে যেটা হয় (আর এটা আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলা) সেটা হল এর পরে, কলেজ-ইউনিভার্সিটি বা কর্মক্ষেত্রে, এই শেখাকে ভুলিয়ে নতুন করে আবার সবটা শেখাতে হয়। ভেবে দেখুন - ছয় বছর বা আরো বেশি সময় ধরে আধাখ্যাঁচড়া ব্যাটিং শেখার পর আপনাকে যদি ওয়াসিম আক্রমের সামনে ফেলে দেওয়া হয়...

(৩) খেলাচ্ছলে প্রোগ্রামিং অবশ্যই কিছুটা শেখা যায়। এমআইটি মিডিয়া ল্যাবের তৈরী স্ক্র্যাচ দিয়ে গ্রাফিকালি লেগো ব্লক জোড়ার মত ব্লক জুড়ে জুড়ে ছোটোখাটো গেমও বানিয়ে ফেলা যায়। বা, এমআইটিরই অ্যাপ ইনভেন্টর দিয়ে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপও বানিয়ে ফেলা যায় - আর এগুলো ইস্কুলের বাচ্চাদের জন্যেই তৈরী। কিন্তু এগুলো সবই ওই বেসিক কনসেপ্ট বা খেলাধুলোর জন্য। কেউ আগ্রহ পেলে আরো ভিতরে গিয়ে শিখতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে স্কুলে কোডিং বাধ্যতামূলক করতে হবে। তাছাড়া, প্রোগ্রামিং এর বেসিক কনসেপ্ট, আর অঙ্কের যে নিয়মের কথা আগে বলেছি, সেগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে এখানেও সমস্যা হয়ই।

(৪) প্রত্যেকটা বাচ্চার ভবিষ্যতই কি কোডার হওয়া? পৃথিবীতে আর কোনো কাজ থাকবে না, বা অন্য কোনোকিছু চলবে না? বরং, এত যে অটোমেশনের কথা হচ্ছে চারদিকে, তাতে তো বরং এই প্রোগ্রামারদের ভবিষ্যত বরং বেশি আশঙ্কার। গার্ডিয়ান পত্রিকায় GPT-3 নিয়ে একটা আর্টিকল বেরিয়েছিলো অল্প কয়েকদিন আগে (https://www.theguardian.com/.../robot-wrote-this-article...) - আর্টিকলটা লেখা একটি এআই সফটওয়্যার দিয়ে। তাহলে কোনো গ্যারান্টি আছে যে প্রোগ্রামের কন্ডিশনাল স্টেটমেন্টগুলো - অন্ততঃ খুব রিপিটেটিভ স্টেপ যেসব কোডে আছে সেগুলো আরেকটা এআই সফটওয়্যার লিখতে পারবে না? (এই নিয়ে একটা গাণিতিক তর্ক আছে, সেটা আপাতত থাক)

আর সবচেয়ে রূঢ় বাস্তবটা কী জানেন? খুব কম সংখ্যক ছেলেমেয়ের বাবামায়েরাই বাড়িতে এই প্রোগ্রামিং এর ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন। আমি বা আপনি হয়তো পারবো, বাকি ক'জন পারবে? সেখানেই এই হোয়াইটহ্যাট জুনিয়রদের খেলা। এরা ক্রমাগতঃ আপনার কানের কাছে বলে যাবে - প্রোগ্রামিং প্রোগ্রামিং প্রোগ্রামিং, আপনার বাচ্চার ভবিষ্যত শুধু এর ওপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে - আর আপনিও ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ৪৮টা ক্লাসের জন্যে কড়কড়ে ৩৫,০০০ টাকা দিয়ে ফেলবেন...আফটার অল, যদি আপনার সন্তান কম্পিটিশনে পিছিয়ে পড়ে, যদি হেরে যায়...

মায়ের ভীষণ ইচ্ছে মেয়ে আঁকার স্কুলেও যাক,
বাবার দাবী তারই সঙ্গে কত্থকটাও থাক...

লেখকঃ অরিজিৎ মুখার্জী

রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০

ভূমিকম্প, বজ্রপাতঃ বর্তমান সময় ও সোলার মিনিমাম

 

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রাচীন সভ্যতাই মাটি খুঁড়ে বা ঢিবি সরিয়ে আবিষ্কার করেছে নৃবিজ্ঞানীরা। সুতরাং, বড় বড় সভ্যতার শহরাঞ্চলে ভূমিকম্পের নমুনা ইতিহাসে কিন্তু ভুরিভুরি। আমাদের দেশের হিমালয় থেকে হিন্দুকুশ পর্যন্ত অঞ্চলটি ভূ-কম্প পীড়িত এলাকা হিসাবে প্রসিদ্ধ, ২০১৫ সালের কাঠমান্ডু ভূমিকম্পই সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমাদের দেশের রাজস্থান অঞ্চলে মাসে এক আধবার ভূমিকম্প হওয়াটা স্বাভাবিক জীবনযাত্রারই অংশ হিসাবে মেনে নেওয়া হয়। মাউন্ট আবু থেকে আরাবল্লী পর্বতশ্রেণী পর্যন্ত এই ভূ-প্রাকৃতিক ক্রিয়া চলতেই থাকে।
প্রখ্যাত ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ‘হর্ষ গুপ্ত’র, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া একটা সাক্ষাৎকার মোতাবেক- প্রতিবছরই গোটা পৃথিবীতে হাজার খানেক বড় ভূমিকম্পের ঘটনা রেকর্ড করা হয়, যেগুলো মূলত আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের ফলেই সৃষ্টি হয়। বর্তমানে দিল্লী সংলগ্ন অঞ্চলের এই মুহুর্মুহু ভূমিকম্পের কারণের উৎস সম্বন্ধে তিনি ও তাদের বিজ্ঞানী মহলও ভীষণ রকমের উদ্বিগ্ন, কারণ দিল্লীর সাথে হিমালয় অঞ্চলের টেকটোনিক প্লেটের কোনো সম্পর্ক নেই, যেখানে দুটি টেকটোনিক প্লেট একে অপরের সাথে সংস্পর্শে আসছে এমন কোনো ‘প্লেট বাউন্ডারি’ ওই অঞ্চলে পড়ে না। ভূ-আভ্যন্তরীণ কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতিও ভূমিকম্পের আগে পরিলক্ষিত হচ্ছে না, সুতরাং গোটা বিষয়টি বিজ্ঞানী মহলে বিশ্রী রকমের ধোঁয়াশার জন্ম দিয়েছে।
জানুয়ারি ২০২০ তে ভারতে রেকর্ড করা হয়েছিল ৫টি ৪ মাত্রার উপরের ভূমিকম্পের ঘটনা, ফেব্রুয়ারিতে সেটা দাঁড়ায় ২৩টি তে। মার্চে ২৪টি, এপ্রিলে ২৬টি, মে মাসে ১৭টি, জুন মাসের ২৯ তারিখ পর্যন্ত ৪৩টি ভূমিকম্পের ঘটনা রেকর্ড করেছে ‘National Center for Seismology’. বর্তমান কম্পিউটার সভ্যতার ইতিহাসে শেষ দুই শতকে ৬ মাসে ১৩৮টি ভূমিকম্পের কোনো বিবরণী নেই।
শুধু দিল্লিতেই যে এমন বিষয়টা ঘটছে তেমনটা নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশ বাদ দিন, আমাদের পড়শি দেশগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে, চিনে ৪২৩টা, শুধুমাত্র জুনেই ৫৪টা। আফগানিস্তানে ৩০৮টা, পাকিস্তানে ৫৬টা, বাংলাদেশেও শেষ ২ মাসে ২০টিরও বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে ৪ মাত্রা বা ততোধিক। শুধুমাত্র এশিয়াতেই জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে ২৯ তারিখ পর্যন্ত ১৫২টা ভূমিকম্প রেকর্ড করেছে, যা কয়েক শতাব্দীতে সর্বোচ্চ।
জাপানকে ভূমিকম্পের দেশ বলে অবহিত করা হয়, যেখানে রিখটার স্কেলে ১-৪ মাত্রার মধ্যে দৈনিক কমবেশী ২০-২৫টি ভূ-কম্পণ হয়। তাই জাপানকে বাদ দিয়ে বাকি বিশ্বের পরিসংখ্যানের দিকে তাকিয়ে দেখলে বিষয়টা বোঝা যাবে যে, এটা ঠিক কোন ভয়াবহ পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে।
বিশ্বের নিরিখে ছোট বড় মিলিয়ে (৩ থেকে ৭ মাত্রার), জানুয়ারি ২০২০ সালে ১১১৮৫টি, ফেব্রুয়ারিতে ৯৭৮২টি, মার্চে ১১০৮০টি, এপ্রিলে ১১০৯১টি, মে মাসে ১২৫১৩টি ও জুন মাসে ১২১০৪টে নিয়ে সর্বমোট ৬৭৭৫৫টি ভূমিকম্প রেকর্ড করেছে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো, তাদের বরাতে এই তথ্যগুলো প্রকাশ করেছে ‘ভলকানো ডিসকভারি’ নামের একটি ওয়েবসাইট, যা মার্কিন-ইউরোপীয় ভূ-বিশেষজ্ঞ দল দ্বারা পরিচালিত। ২০২০ পূর্ববর্তী দশ বছরে এই ভূ-বিশেষজ্ঞ দলটির দ্বারা রেকর্ড করা ছোট বড় মিলিয়ে মোট ভূ-কম্পনের পরিমাণ ছিল- ১১৭৬৪৩টি। সেখানে ২০২০ সালের প্রথম ৬ মাসেই ৬৭৭৫৫টি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে।
গতপরশু মানে ৩রা জুলাই তারিখে মিজোরামের চম্ফাই অঞ্চলে এক স্থানেই পর পর ক্রমান্বয়ে তিনবার চার মাত্রার উপরে ভূমিকম্প হয়েছে, এই দিন সন্ধ্যাতেই দিল্লিতে ভূমিকম্প হয়েছে দুবার, হরিয়ানাতেও একই ঘটেছে। ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি সূত্রের বরাতে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে।
মাসখানেক বা তার কিছু আগে একটা বিষয়ে খুব ছোট্ট করে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম, ‘সোলার মিনিমাম’ বিষয়ে। এই ধরণের সময়গুলিতে কী হয়, কী হয় না ইত্যাদি বিষয়ে কিছুটা প্রাথমিক ধারণা দেবার প্রচেষ্টা করেছিলাম। অনেকেই হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, বেশ কিছু গ্রুপে সেই পোস্ট বন্ধুদের কেউ কেউ শেয়ার করলে সেটা নিয়ে বেশ খিল্লিও করেছিলেন, তো সে যাই হোক- সেই প্রবন্ধ কোনো মনগড়া গল্পকথা ছিল না, প্রতিটির তথ্য বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ক ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত, যার লিঙ্ক দেওয়া ছিল।
আজকের দিনে এসে কিন্তু এই মহাজাগতিক ঘটনাবলির প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে ভূ-মন্ডলে। বর্তমান সময়ে যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে শুধু ভারত ভূ-খন্ডেই আমরা অতি অস্বাভাবিক অনেক কিছু বিষয় পরিলক্ষিত করতে পারছি। কোনো বিষয়টাই যে কাকতালীয় হয় না বা হচ্ছে না এ নিয়ে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। কিছু আমুদে পাবলিক সবেতেই মজা খোঁজেন, খুঁজতে দিন তাদের।
একটু শান্তভাবে ভেবে দেখুন তো, এ বছরের গ্রীষ্মে কি সেই রৌদ্র তেজ রয়েছে যেগুলো বিগত বছরগুলোতে ছিল! নাহ কোনো বৈজ্ঞানিক হওয়ার প্রয়োজন নেই, শীত-গ্রীষ্মের স্বাভাবিক প্রাঞ্জল অনুভূতি আপনাকে কী জানান দিচ্ছে? এ বছরে সেই উত্তাপ নেই, কিছুটা হলেও কম, যা আমরা সকলেই অনুভব করতে পারছি, বিগত বছরগুলোর সাথে যার প্রভাব লক্ষ্যনীয় ভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এবারে আসি বজ্রপাতের বিষয়ে।
BBC এর একটা রিপোর্ট অনুযায়ী বজ্রপাতের কারণে, ভারতে গড়ে ২০০০-২৩০০ মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। ‘লাইটনিং রেসিলিয়েন্ট ক্যাম্পেন ইন্ডিয়া’ এর চেয়ারম্যান কর্ণেল সঞ্জয় কুমার শ্রীবাস্তবের একটা সাক্ষাৎকার অনুযায়ী- মোট বজ্রপাতের ৬৪.৫৭% ই IC (In cloud) জাতীয়, বাকি ৩৬.৪৩% হচ্ছে CG (cloud to ground). ভারতের রাজ্যগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় উড়িষ্যাতে, সারা দেশের মোট বজ্রপাতের ১৫%ই এই রাজ্যে হয়। এর পর মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের পর আমাদের পশ্চিমবঙ্গ চতুর্থ স্থানে, সারা দেশের নিরিখে ৮%। উত্তরপ্রদেশ ৮ নম্বরে ও বিহার ১১ নম্বরে এই তালিকাতে; দেখা যাচ্ছে এই দুই রাজ্যতেই বর্তমানে বজ্রপাতের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
ইন্ডিয়ান মেট্রলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টের অধীনে থাকা IAF সেন্সর, পুণের IITM সেন্সর নেটওয়ার্ক ও INSAT-3D উপগ্রহ চিত্র, ইত্যাদি এক বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে পাওয়া সূত্রানুযায়ী কোনো এক অজানা কারণে IC মাত্রার বজ্রপাতগুলো মাটিতে ছুঁয়ে যাচ্ছে বা আছড়ে পড়ছে কয়েকটা। শুধু তাই নয়, ভূমিতে (CG) যে ধরনের বজ্রগুলো আঘাত হাতে সেগুলো মোটের উপরে উলম্ব প্রকৃতির খাঁজকাটা ধরণের হয়ে থাকে, কিন্তু যেগুলো মেঘের মাঝেই সীমাবদ্ধ থেকে যায় (IC), সেগুলো চাদরের মতো আনুভূমিক ভাবে পতিত হয়, বিমানচালকদের কাছে এ অতি পরিচিত একটা দৃশ্য। কিন্তু বর্তমানে কোনো এক অজানা মহাজাগতিক কারণে ভূমিতে যে বজ্রগুলো স্পর্শ করছে তাদের মধ্যে অনেকগুলোই উলম্ব হয়ে না আঘাত হেনে চাদরের মতো আনুভূমিক ভাবে মাটিতে আছড়ে পড়ছে।
উলম্ব হয়ে পড়লে সাধারণত যে বিন্দুতে পড়ল সেই বিন্দুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেমন বিদ্যুতের খুঁটি, তালগাছ, চিমনি ইত্যাদি। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কম হয়, কিন্তু আনুভূমিকভাবে পড়লে তার ব্যাপ্তি বিশালাকার ধারণ করে, আর এই কারণেই বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এত বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে রোজ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, কিছুদিন আগে ব্রাজিলে একটা এমনই আনুভূমিক বজ্রপাত হয়েছিল যার দৈর্ঘ্য ছিল ৭০০ কিলোমিটারেরও বেশি, জাতিসঙ্ঘের পরিবেশ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে গেলেই এই বিষয়ে বিশদে তথ্য পেয়ে যাবেন। শুধু তাই ই নয়, চিলি, ইকুয়েডর, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া জুড়েও এমন আনুভূমিক বজ্রপাত বিস্তর মানুষ ও গবাদি পশুর প্রাণহানি ঘটাচ্ছে, বনাঞ্চলে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চল, ক্যারাবিয়ান সমুদ্রাঞ্চল, পশ্চিম আফ্রিকা, স্ক্যান্ডেনভিয়ান দেশ সকল, ইস্টব্লক, রাশিয়া, অষ্ট্রেলিয়াতেও এই ধরণের বজ্রপাত লক্ষ্য করা গেছে নাসার জলবায়ু সংক্রান্ত উপগ্রহের মহাকাশ চিত্র থেকে। কিছুদিন আগে জুন মাসেই কাশ্মীর ও হিমাচল প্রদেশের বহু পার্বত্য এলাকাতে এমন আনুভূমিক বজ্রপাতের কারণে কয়েক হাজার গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জাতীয় বিপর্যয় সূত্রে খবর বেরিয়েছে।
সুতরাং কোনো কিছুই যে কাকতালীয় হচ্ছে না, এটা কিন্তু পরিষ্কার। এ বছরে বর্ষাও অন্যান্য বছরের তুলনাতে বেশি, জুন মাসেই সারা দেশে গড় বৃষ্টিপাত ১৮% বেশি, রাজস্থানে ৪০ দিন আগে বর্ষা পৌঁছেছে, আসামে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, গোটা উত্তর-পূর্ব ভারত সহ উত্তরবঙ্গ, বিহার, উত্তরপ্রদেশে একাংশ তথা গাঙ্গেয় অববাহিকা অঞ্চলকে বন্যার অরেঞ্জ জোন হিসাবে আগাম ঘোষণা করে সতর্ক করে দিয়েছে কেন্দ্র সরকার।
এ বিষয়ে বিজ্ঞান তার সাধ্যমতো প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আগাম খবর সংগ্রহ করে বা আবহাওয়া বিশ্লেষণ করে মানুষের ক্ষতির পরিমাণ কমাতে। আমরা সাধারণ মানুষ বিজ্ঞান ততটা জানি না, যতটা ধর্ম বিষয়ে জানি। আমি আমার ইসলাম ধর্মের হাদিসে এমন বেশ কিছু টিকা পড়েছিলাম, যেখানে ভবিষ্যৎ বাণী করা আছে এমন বজ্রপাত বিষয়ে, যে- “এমন একটা সময় আসবে যখন মানুষের দৈনন্দিন আলোচনাতে এটাই মুখ্য বিষয় থাকবে, কতজন আজ বজ্রপাতে মারা গেছে”। প্রসঙ্গত ২রা জুলাই ২০২০ তারিখেই বিহারে কমপক্ষে ৩১ জন মারা গেছে বজ্রপাতে, উত্তরপ্রদেশে ২৭ জন, ৩রা ও ৪ঠা জুলাই বিহারে যথাক্রমে মারা গেছে ৩৩ ও ২২ জন। যা এই সময়ের জন্য এই অঞ্চলগুলোতে এক ভয়াবহ রেকর্ড তৈরি করে চলেছে রোজই।

যার যার ধর্ম বিশ্বাস তার কাছে, বিজ্ঞান সর্বজনীন। জীবন বাঁচাতে ‘আল্লা-ভগবান-গড’ সকলের একটাই ওষুধ- প্রাথমিক সতর্কতা অবলম্বন করুন। বৃষ্টির সময় ঘরেই থাকুন, জানি না পরবর্তী মুহূর্ত আমাদের জন্য কী নিয়ে অপেক্ষা করছে। প্রসঙ্গত সোলার মিনিমাম সবে শুরু হয়েছে, ২০২৫ এ এটা সর্বোচ্চ দশায় পৌঁছাবে, যদি এই কারণেই এমন প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তাহলে আগামী যে আরও অনেক বেশি ভয়ংকর তা বলাই বাহুল্য।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

ভুলের নাম যখন মানচিত্র



আকার প্রকারে বৃহৎ মানেই কি- শক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শন করে?
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে মানচিত্র একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম, ছোট বড় যেকোনো ভ্রমণে আমাদের যাত্রাপথ পরিচালিত হয় এই মানচিত্র দ্বারা। বিভিন্ন ভূ-রাজনীতি এবং পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে একটা দ্বিমাত্রিক রূপ প্রদান করে এই মানচিত্র। মানচিত্র দেখা আসলে একটা নেশাও বটে, এটা মাননীয় সুব্রত মণ্ডল দাদার সুত্রে আমার পাওয়া, সেই মত সময় সুযোগ পেলে ম্যাপে ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভালই লাগে। ছোটবেলায় এ্যাটলাসের মানচিত্র বই দেখতাম, পরে বাঁধানো দামি ডায়েরী গুলোর ভিতরে সুদৃশ্য রঙিন মানচিত্র আঁকা থাকত, ‘পলিটিক্যাল ম্যাপ’ ইত্যাদি যেগুলো ভীষণ কৌতূহল সৃষ্টি করত। নতুন শতকে পদার্পন করার কিছুদিনের মধ্যেই মোবাইলে মানচিত্র এসে যাওয়াতে ভীষণ সুবিধা হয়ে গিয়েছিল- পৃথিবীকে বুঝতে।
ঠিকিই চলছিল, কিন্তু গোল বাঁধল অন্যত্র। ভাইরাস ও ‘আর্টিক্টের বরফ’ শীর্ষক একটা প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে গ্রীনল্যান্ডের আয়তন দেখছিলাম, দেখি সাড়ে একুশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার তার আয়তন, ভারতের আয়তন সম্বন্ধে কোথাও একটা পড়েছিলাম বলে সেটাও মগজে ছিল- পৌনে ৩৩ লক্ষ বর্গকিমি। এই গণিতের হিসাবে দেড়খানা গ্রিনল্যান্ড ভারতে অনায়াসে ঢুকে যাবে, কিন্তু মানচিত্রে দেখে থ হয়ে গেলাম- দেখি ৮-১০ খানা ভারত গ্রিনল্যান্ডের মাঝে অনায়াসে ঢুকে যাবে। ঘ্যাঁটে ঘ…
তারমানে আমাদের মানচিত্র ত্রুটিপূর্ণ? আজ্ঞে হ্যাঁ- বিশ্বের সর্বাধিক স্বীকৃত যে মানচিত্র ‘মার্কেটর ম্যাপ’, আমরাও যেটা অনুসরণ করি, তাতে চিত্রিত অধিকাংশ দেশেরই আকার-আয়তণ মোটেই ততটা নয় যতটা আমাদের দেখায়, বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধের উপরের দিকের দেশ সমূহ। এটা নিশ্চিত হাস্যকর রকমের ভুল, কিন্তু আজকেও এটাকেই বয়ে নিয়ে চলেছে সমস্ত ডিজিটাল মানচিত্র কোম্পানিগুলো।
আচ্ছা খুলেই ফেলুন গুগুল মানচিত্র, দেখুনতো গ্রিনল্যান্ডকে কত্তবড় দেখাচ্ছে। এবারে তার পা বরাবর নিচে গিয়ে দেখুন, বেচারা লাতিন আমেরিকা কেমন ছোটখাটো দেহ নিয়ে সেখানে পড়ে রয়েছে। কিন্তু তথ্য কি বলছে? গ্রিনল্যান্ডের আয়তন সাড়ে একুশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার আগেই বলেছি, সেখানে দক্ষিণ আমেরিকা ১ কোটি ৯২ লক্ষ বর্গ কিমি- মানে প্রায় ১০টা গ্রীনল্যান্ডের সমান। শুধু তাই ই নয়, রাশিয়া, ইউরোপ, কানাডা, আমেরিকা সব’ই অনেক ছোট ম্যাপে যেমনটা দেখায় তার চেয়ে। বরং আফ্রিকা বা আমাদের ভারত অনেক বড় মানচিত্রে, তাদের তুলনায়।
কানাডার পূর্ব দিকের আলাস্কা প্রদেশ, যা আমেরিকার অংশ; ম্যাপে তার যা আকার, তাতে করে আমেরিকার নিচের দিকের দেশ মেক্সিকোর মত পাঁচ-ছটা দেশ ঢুকে যাবে। এখানেও গণিত বলছে আলাস্কার আয়তন ১৭ লক্ষ বর্গকিমির সামান্য বেশি, সেখানে মেক্সিকো অন্তত আরো আড়াই লক্ষ বর্গ কিমি বেশি।
ইংল্যান্ডের ম্যাপের দিকে তাকান, দেখে মনে হবে খান চার- পাঁচেক ওই মাপের দেশ হলেই তা ভারতের সমান আয়তন হয়ে যাবে- কিন্তু অঙ্কের হিসাবে ইংল্যান্ডের চেয়ে আমাদের ভারত ২৫ গুনের চেয়েও বেশি বড় আকারে। প্রকৃতপক্ষে, ‘গ্রেট ব্রিটেন’- জাপান, ফিলিপিন্স, মাদাগাস্কার এবং নিউজিল্যান্ড সহ বেশ কয়েকটি দেশের চেয়ে ছোট। কানাডার আকার নিয়ে আর নাইবা বললাম, যাচ্ছেতাই মাত্রার বুজরুকি সেখানে।
বস্তুত এই মানচিত্র অঙ্কনের পদ্ধতি তাকে ‘প্রজেকশন’ বা প্রক্ষেপন বলা হয়, মানে ধরে নেওয়াই হয় যে এতে ত্রুটি থাকলেও থাকতে পারে। এই মানচিত্রাঙ্কন বিদ্যাকে ইংরাজিতে বলা হয় কার্টোগ্রাফি। ‘মানচিত্র সমীক্ষা ও আন্তঃসরকারী কমিটি’ অনুসারে, মানচিত্র পাঁচ প্রকারের হয়। যথাক্রমে- জেনারাল রেফারেন্স, টপোগ্রাফিকাল, থিম্যাটিক, নেভিগেশন চার্ট এবং ‘ক্যাডাস্ট্রাল মানচিত্র ও তার রূপায়ন’।
• যে মানচিত্র গুলো আমরা নিয়মিত দেখি, পথের দুরত্ব নিরুপন করি, সেগুলো এই ‘জেনারাল রেফারেন্স’ মানচিত্র। একমাত্র এই মানচিত্র পর্বেক্ষন করে বোঝার জন্য বিশেষ নির্দিষ্ট শিক্ষার প্রয়োজন নেই, কিন্তু পরবর্তী মানচিত্রগুলো থেকে তথ্য অনুসন্ধান করতে বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন হয়।
• অর্ডিন্যান্স সার্ভের ক্ষেত্রে জমির উচ্চতা গভীরতা ইত্যাদি নিরুপনে টপোগ্রাফিকাল মানচিত্র ব্যবহার করা হয়।
• তথ্যগত বিষয়ভিত্তিক টিকা সম্বলিত, যেমন জনঘনত্ব, ভূতত্ত্ব, আবহওয়া ইত্যাদি বিষয়ক মানচিত্রকে থিম্যাটিক মানচিত্র বলা হয়ে থাকে।
• জলপথে একস্থান থেকে অন্য স্থানের দুরত্ব, পথের দুপাশের ভূপ্রকৃতি, বিশেষ বিশেষ স্থানের পরিচিতি, নিমজ্জিত শিলাখন্ড ইত্যাদি বিষয়গুলোর উপরে ভিত্তি করে যে মানচিত্র, তাকে নেভিগেশন চার্ট বলা হয়। যদিও এর সাথে থিম্যাটিক মানচিত্রও জুড়ে তবেই তা নৌ পথের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠে।
• ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জমির মালিকানা সত্ত্ব সম্বলিত চৌহদ্দির বর্ননা যে মানচিত্রে প্রত্যায়িত থাকে তাকে ক্যাডাস্টাল মানচিত্র বলে। আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির জমির যে নক্সা, তথা আমিনেরা যে মানচিত্রের সহায়তায় জরিপ করে থাকেন সেটাই এই ক্যাডেস্টাল মানচিত্র। সমস্ত ধরনের মানচিত্রের এটাই বিশদ সংস্করণ যেখানে সুক্ষাতিসুক্ষ বিবরণগুলো লিপিবদ্ধ থকে।
এবারে বিভিন্ন মহাদেশ গুলোর আকার গুলোর দিকে আমরা একটু চোখ বোলায়-
• এশিয়া- ৪ কোটি ৪৬ লাখ বর্গ কিমি
• আফ্রিকা- ৩ কোটি বর্গ কিলোমিটারের সামান্য বেশি
• উত্তর আমেরিকা- ২ কোটি ৪৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
• লাতিন আমেরিকা- ১ কোটি ৯২ লাখ বর্গ কিলোমিটার
• ইউরোপ- ১ কোটি বর্গ কিমির সামান্য বেশি
• অস্ট্রেলিয়া- ৭৬ লক্ষ ৯২ হাজার বর্গ কিলোমিটার
এবারে অনান্য কিছু বড় দেশের আকার আয়তন দেখা যায়-
• রাশিয়া- ১ কোটি ৭১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
• কানাডা- প্রায় ১ কোটি বর্গ কিলোমিটার
• চীন- ৯৬ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
• আমেরিকা- ৯৮ লক্ষ ৩৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার
• ব্রাজিল- ৮৫.১১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
তাহলে হিসাব গুলো কেমন দাঁড়াচ্ছে! আলাস্কা ছাড়া বাকি আমেরিকা ব্রাজিলের চেয়ে ছোট, চীনের চেয়েও ছোট। অস্ট্রেলিয়া এদের থেকে সামান্যই ছোট, যদিও মাপে তেমনটা নেই। এশিয়া সবচেয়ে বড় মহাদেশ, আর রাশিয়া সবচেয়ে বড় দেশ। ম্যাপের বিশাল অংশ জুড়ে রাশিয়ার অবস্থান, যদিও সেটাও মস্ত ভুল, মানচিত্র দেখলে মনে হবে চীন বাদে ৮-৯টা ‘অবশিষ্ট এশিয়াকে’ রাশিয়ার মাঝে ভরে দেওয়া যাবে। বরং এশিয়া থেকে রাশিয়া আর চীনের আয়তন বাদ দিলে যেটা অবশিষ্ট থাকে সেটা রাশিয়ার সমতুল্য।
সবচেয়ে দৃষ্টিকটু হচ্ছে ইউরোপের অংশে, মানচিত্র দেখলে মনে হবে ইউরোপ আফ্রিকার অর্ধেক। আসলে ইউরোপ আফ্রিকার একতৃতীয়াংশের চেয়েও ছোট। বহু দেশই ‘ম্যাপের প্রজেকশনে’র তুল্যমুল্য আয়তনের চেয়ে অনেকটা ছোট, যথা- আইসল্যন্ড পাঁচ গুণ, ব্রিটেন ৩ গুণ, নরওয়ে ১০ গুণ, সুইডেন ৩ গুণ, ফিনল্যান্ড ৪ গুণ ছোট। বেলারুশ-পোল্যান্ড-কাজাকিস্থান-জার্মানি-ফ্রান্স দেশ গুলো দ্বিগুণ বড় করে দেখানো আছে। এছাড়া ইউরোপের বাকি প্রত্যেকটি দেশ সহ তুরস্ক ও ইরাণও তাদের আসল আয়তনের তুলনাতে একটু বেশি স্থান দখল করে আছে মানচিত্রে।
শুধু কি তাই? আমরা যেটাকে পৃথিবীর উপরের দিক ভাবি, সেই উত্তর দিক আসলে পায়ের দিক। নাসার মহাকাশান এ্যাপেলো-১৭ এর মহাকাশ অভিযাত্রীরা যে ছবি পাঠিয়েছিল তা আমাদের এই সনাতন মানচিত্রটিকে উল্টো করে ধরলে যেমন দেখায় ঠিক তেমন দেখতে। এছাড়া আন্টাকার্টিকা প্রদেশের ম্যাপে কোনো ভূমিরেখর নির্দেশনা নেই, সবটাই বরফাচ্ছাদিত।
প্রতিটি দেশের মানচিত্র, যেগুলো উত্তরমেরুর দিকে রয়েছে আশ্চর্যজনক ভাবে প্রতিটি দেশের আকার, মিছিমিছিই(!) উত্তরোত্তর বৃদ্ধি প্রাপ্ত আয়তনের দিক থেকে। কারন এই মানচিত্র যবে প্রথম চিত্রিত হয়েছিল, সেই ষোড়শ শতকে এই বিপুলা গোলাকার পৃথিবীর বৃহৎ ক্ষেত্রফলের দ্বিমাত্রিক মানচিত্র অঙ্কন করাটাই ছিল একটা চরমতম সাহসী ও বৈপ্লবিক গবেষনাকৃত সম্পাদনা। এই ভুলটা হয়ত তৎকালীন ততটা ত্রুটিজনক না হলেও আজকের দিনে শুধু দৃষ্টিকটু নয়, বরং এটা অপরাধ; যেখানে দুটো পরমাণুর মাঝের সঠিক দুরত্বর নিখুঁত পরিমাপ করা যায়, সেখানে ওই ত্রুটিযুক্ত মানচিত্র কেন থাকবে!
কেন এমন ত্রুটিযুক্ত মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছিল?
এই ‘কেন’টা জানতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে পাঁচশ বছর অতীতে, ষোড়শ শতকে। খুব একটা বিদেশ ভ্রমণ না করেও, শুধুমাত্র বিভিন্ন পুস্তক, হরেক ভ্রমণকারী, বনিকদল, রাষ্ট্রকর্তা প্রমুখদের সাথে চিঠি চালাচালি করে, সেই সকল টুকরো টুকরো তথ্যগুলিকে নিয়ে দীর্ঘ গবেষণালব্ধ প্রচেষ্টার দরুন ১৫৬৯ খ্রীষ্টাব্দে তিনি আজকের এই মানচিত্রটির রূপদান করেন জেরার্ডাস মার্কেটর। তৎকালীন ইউরোপের নেদারল্যান্ড রাজ্যের অন্তর্গত ফ্ল্যান্ডার্স কাউন্টিতে জন্ম নেন তিনি; একধারে প্রখ্যাত ভুগোলবিদ তথা ভূ-বিবরণবিদ ও মানচিত্র-অঙ্কন বিশারদ ছিলেন; পাশাপাশি মহাকাশ গবেষণা, জামিতিতেও তিনি ভীষণ পারদর্শী ছিলেন। বর্তমান দিনে এই ফ্লান্ডার্স কাউন্টিটি বেলজিয়ামে অবস্থিত। তিনিই প্রথম দেওয়ালে ঝোলানো বিশ্ব মানচিত্র ও গ্লোব ম্যাপের আবিষ্কার করেন।
ভূগোল, দর্শন, কালানুক্রম এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয় নিয়ে মার্কেটর বিস্তর গবেষণা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৫৯৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ১২০ পৃষ্ঠার ‘অ্যাটলাস’ নামের সচিত্র মানচিত্র প্রকাশ করেন; এখানে মহাবিশ্বের সৃষ্টির বিবরণ এবং চিত্রিত সমস্ত দেশের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করেন। খ্রিষ্টীয় ধর্মগ্রন্থ, যথা- গসপেল ও ওল্ড টেস্টামেন্ট আধারে মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ কালিগ্রাফার ও ভাস্কর ছিলেন, তৎকালীন প্রতিটি গ্লোব ম্যাপের সকল কিছুই নিজে হাতে বানাতেন ও অঙ্কন করতে।
পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কিছু সাহসী মানুষ জলপথে যাত্রা শুরু করেছিলেন নিত্যনতুন দেশ আবিষ্কার করে ভাগ্যান্বষনের জন্য, কেউ রাজার ইচ্ছায় কেউবা বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে। মজার বিষয় হল, সে সময় খোদ ইংল্যান্ডের নিজেরই তেমন গ্রহণযোগ্য মানচিত্র ছিলনা। এমতাবস্থায় অস্ট্রিয়ার রোমান শাসক তথা স্পেনের রাজা তথা নেদারল্যান্ডের ডিউক ‘পঞ্চম চার্লসের’ একান্ত ব্যাক্তিগত পরামর্শদাতা জিন কার্ন্দোলেত এর কানে আসে এই ভূগোলবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর এর কথা। সামুদ্রিক নৌচালন বিদ্যায় পথ নিরুপন করা ও দূরত্বের পরিমাপ করার জন্য তখন কোনো একক মানচিত্র ছিলনা ইউরোপীয় শাসকদের কাছে, যা সর্বজনগ্রাহ্য। এরই সমাধানের জন্য জিন কান্দোর্লেত পৃষ্ঠপোষকতা করলেন মার্কেটরকে, কিন্তু তার চাহিদা ছিল অতি সামান্য- দুটো মাত্র গ্লোব। এই আত্মবিশ্বাসই মার্কেটরকে পরবর্তীতে খ্যাতিমান হতে সাহায্য করেছিল।
পরবর্তীতে জার্মানির জালিচ প্রদেশের শাসক, তার পুত্রের রাজ্যাভিষেক এর প্রাক্কাল্লে একসেট নতুন ও নিখুঁত মানচিত্র তৈরির বরাত দেয় মার্কেটরের কাছে। সেই দুর্মুল্য সংগ্রহটি বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা রয়েছে ‘আটলাস’ নামে। এটার নিরিখেই পরবর্তী বিশ্বের মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছিল, যা আজও গোটা পৃথিবীতে ধ্রুবক হিসাবে ববহৃত হয়ে আসছে।
লুথেরিয়ানদের ধর্ম বিশ্বাস মতে উত্তর দিক হল পবিত্র, প্রসঙ্গত মার্কেটর নিজেও একজন লুথেরিয়ান ধর্ম বিশ্বাসী ছিলেন। এজন্যই মানচিত্রে উত্তরদিন উপরের দিকে করেছিলেন তিনি জেনেবুঝেই।
মারকেটরের জীবনীকার, ‘ঘিচ’ এর ভাষ্য অনুসারে, তৎকালীন সকল ইউরোপিয়ান শাসকই চাইত- তাদের দেশগুলো যেন আকৃতিতে বড় করে দেখানো হয়, এতে করে নিজেদের ‘সুপ্রিমেসি’ বা অধিপত্যের দম্ভ দেখানো যেত। সমসাময়িক কালে মারকেটরের কোনো প্রতিদ্বন্দী ছিলনা, স্বভাবতই অধিকাংশ বরাতই তার কাছে আসত; এবং অতিরিক্ত অর্থ সমাগমের অভিপ্রায়ে মারকেটর প্রত্যেকেরটাই এমন করে ‘গোপনে’ বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে অনুমান করেন। এছাড়া এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ছোট করে দেখিয়ে দিলে, ইউরোপিয়ানদের নিজেদের দখলীকৃত অংশগুলো আকারে অনেকটা বড় লাগত পরিমাপের এককে, ৫% অধিগ্রহণ করে- দেশে এসে জানাতো ২৫% দখল করেছি, তাতে গৌরব বাড়ত। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের বাইরে কোন দেশেই যেহেতু মারকেটর নিজে যাননি, তাই আয়তনটা কিছুটা তারই মস্তিষ্কপ্রসুতও ছিল। এছাড়া কাগজকে শঙ্কু আকৃতির বানিয়ে, তা থেকে গোলাকার পৃথিবী বিষয়ে ধারণা করেছিলেন মারকেটর, সেখান থেকেও এমন ভুল হবার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এগুলো সবই সম্ভাবনা মাত্র, আসলে বিষয়টা কী ছিল তা একমাত্র মারকেটরের বাইরে কেউই জানতেননা, বাকিটা পাঠকের ভাবনার উপরে ছাড়া হল।
কিন্তু এই ভুলটা জানা গেল কীভাবে!
১৮৮৫ সালে জেমস গল এবং আরনো পিটার্স নামের দুই ভূগোলবিদ সর্বপ্রথম আয়তাকার মানচিত্র ‘প্রজেকশন’ করেন, যাকে গল-পিটার্স প্রজেকশন বলা হয়ে থাকে। এটা বিষয়ে ১৮৮৬ সালে ফলাও করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রবন্ধাকারে ছাপানোও হয়েছিল, এর পরে গোটা বিশ্বজুড়ে একটা রাজনৈতিক শোরগোল পরে যায়, ফলস্বরূপ বিশ্বমোড়লেরা বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে দেয়। এরপর হঠাৎ করেই ২০১৬ সালের একটা সম্মেলনে পুনরায় এই নিয়ে প্রস্তাব উঠলে, মার্কেটরকে বাতিল করে ‘গল-পিটার’ এর মানচিত্রকেই ইউনেস্কো মান্যতা দেয়; সেই মত আমেরিকা ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশে এই প্রোজেকশনকেই সরকারী ভাবে ব্যবহার শুরু করে এই সেদিন, ২০১৭ সাল থেকে।
তাহলে ১৮৮৫ সালের আগে কি কোনো বিশুদ্ধ ম্যাপ ছিলনা পৃথিবীতে? অবশ্যই ছিল, কিন্তু ইউরোপিয়ানদের কাছে ছিলনা। মার্কেটরেরও প্রায় ৫০ বছর আগে ‘পিরি রেইস’ নামের একজন তুরস্কের অটোমান সাম্রাজের সেনাধ্যক্ষ ছিলেন, হরিণের চামড়ার উপরে তিনিই পৃথিবীর পূর্ণাঙ্গ ম্যাপের চিত্রাঙ্কন করেছিলেন, বর্তমানে যেটা অনেকটা বিনষ্ট হয়ে গেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এখানে আন্টার্ক্টিকারও পূর্ণ ও রেখচিত্র নির্দেশিত রয়েছে যার দ্বারা টপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র চিত্রণ করা সম্ভব।
পিরি রেইসের পুরো নাম ছিল আহমেদ মহিউদ্দিন পিরি। নৌ-যাত্রার উপরে তার লেখা বই ‘কিতাব-ই-বাহারাইয়ি’ গোটা বিশ্বের কাছেই এক অমুল্য নথি। ঝড়ের প্রকারভেদ সম্পর্কে তার গবেষণালব্ধ তথ্য, নৌ-কম্পাস ব্যবহার করার হরেক কৌশল; বিভিন্ন বন্দর এবং উপকূলরেখার বিষয়ে বিশদ তথ্য সহ তার তালিকা, আকাশে নক্ষত্রগুলি ব্যবহার করে দিকনির্দেশের পদ্ধতি, বিভিন্ন সাগর-মহাসাগর এবং তাদের চারপাশের জমিগুলির বৈশিষ্ট্য সমূহ একত্রিত করে সে এক দুর্মুল্য পুস্তক রচনা করেছিলেন। এই বই এর প্রথম সংস্করণ ইস্তানবুলের পাশাপাশি, ব্রিটিশ লাইব্রেরি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, প্যারিস, ভিয়েনা, বাল্টিমোরের মত বড় বড় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।
গ্রেট আলেকজেন্ডার থেকে কলম্বাস হয়ে ভাস্কো-দা-গামা, এমন অনেকের নথি নিয়েই পিরি রেইস কাজ করেছিলেন, যা তার বইতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বানানো ১৫১৩ খ্রীষ্টাব্দের মানচিত্রের প্রথম টুকরো ১৯২৯ ক্রীষ্টাব্দে তুরস্কের ইস্তানমুলের এক গুদাম থেকে উদ্ধার হয়। যে মানচিত্র, আজকের দিনেও প্রায় নিখুঁত। মানচিত্রের দ্বিতীয় অংশটি ১৫২৮ খ্রীষ্টাবে অঙ্কিত, যেটি মিশরের কায়রো থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। প্রসঙ্গত, কর্মে গাফিলতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে এই কায়রো শহরেই পিরি রেইসকে মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। আজকের তুরস্ক নৌবাহিনীতে বহু জাহাজ ও নৌ-বহর পিরি রেইসের নামে রয়েছে।
তবে সভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম চিত্রাঙ্কিত কোনো বৈশ্বিক ম্যাপের উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রীষ্টপূর্ব ১০০ সনের কাছাকাছি সময়ে। প্রখ্যাত গ্রীক গণিতজ্ঞ, জোর্তিবিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ ক্লৌদিয়াস ‘টলেমি’ তাঁর ‘জিওগ্রাফিয়া’ গ্রন্থে বিশ্বের মানচিত্র সম্বন্ধে একটা গ্রহণযোগ্য ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তাহলে, এই হল মানচিত্র, তার ত্রুটি ও তার বিবর্তন সংক্রান্ত একটা ছোট প্রবন্ধ।
আপনারা এই ওয়েবসাইটে গিয়ে দেশগুলির আকার আয়তন নিয়ে একটু মজার খেলা খেলতেই পারেন-
https://thetruesize. com/
প্রাথমিক তথ্যসুত্রঃ The Daily Mail, UK. 17 Aug, 2016

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...