কাশেম সুলাইমানির কথা স্মরণে আছে?
আমেরিকা ২০২০ এর শুরুটা করেছিল ইরানের এই কমান্ডারকে হত্যা করে। ১৭টি একই রঙের গাড়ির কনভয়ের মাঝে স্পেশ্যাল একটিকেই নিশানা বানিয়ে তাকে ছোট্ট একটা ড্রোন মিসাইল দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল বাকিগুলোকে কোনো ক্ষতি না পৌঁছে, এতই নিখুঁত ছিল এই অপারেশন।
ইরান সেনাবাহিনী মার্কিনিদের গুগল ম্যাপ বা ওই জাতীয় কোনো পরিষেবা পায় না মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের দরুন, তারা নিজেরাও মার্কিনি পণ্য ব্যবহারে উৎসাহী নয় ততটা। তার পরেও কীভাবে এত নিখুঁত ভাবে একজন ব্যক্তিতে নির্দিষ্টভাবে টার্গেট করতে সক্ষম হয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনী! সেদিন উত্তর না মিললেও ২০২০ ই জবাব দিয়ে গেল শেষের বেলায়।
গত ২০১৭ এর ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান দেশ ‘কেনিয়ার’নির্বাচনে এমনই এক চরম নিকৃষ্ট কাজ করেছিল ফ্রান্সের সরকারি একটি প্রতিষ্ঠান, যেটা ধরা পড়ে এই ২০১৯ এর শেষে। ফ্রান্সের সেই কোম্পানি যারা বিনামূল্যে EVM সরবরাহ করেছিল অবাধ গণতন্ত্রের নামে, ওই EVM এর সুইচে বায়োমেট্রিক সেন্সার লাগিয়ে সকল ভোটদানকারীর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু তারা সফলভাবে সেই ডেটার সবটা নিজেদের দেশে পাচার করার আগেই ধরা পড়ে যায়। এই বিপুল ডেটার সবটা পাচার হয়ে গেলে ৭৭% কেনিয়ান ভোটারের আইডি, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, জন্ম শংসাপত্র, জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কার্ড, জাতীয় হাসপাতাল বীমা তহবিল কার্ড, কেনিয়া রাজস্ব কর্তৃপক্ষের ট্যাক্স পিন সবই হস্তগত করে ফেলত ফ্রান্স সরকার। শোষণের এ এক নতুন প্রক্রিয়া, আসলে আমরা নিজেরাও জানি না এই হাই-টেক দুনিয়াতে কখন কীভাবে কার দ্বারা প্রতারিত হয়ে যাচ্ছি।
ধোঁকাবাজেরা ক্রমাগত প্রযুক্তির সুফলকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে সর্বশ্রান্ত করার ফন্দি এঁটেই যাচ্ছে, তাদের নতুন হাতিয়ার হচ্ছে ফ্রি অ্যাপসের ফাঁদ।
আমরা আমাদের ফোনে অনেকেই হরেক অ্যাপস ডাউনলোড করে ফেলি, যাদের অধিকাংশই ফোটো কেন্দ্রিক, গান ও ভিডিও সম্বন্ধীয়, গেমস এর অ্যাপস ইত্যাদি। মুসলমানেদের মধ্যে অনেকেই হাদিস, কোরান ও নামাজের সময় জানতে বহু অ্যাপস ডাউনলোড করে নির্দ্বিধায়। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের ৯৯.৯৯% মানুষের মোবাইলে ১০০% ফ্রি অ্যাপস বোঝাই রয়েছে, কারণ আমরা ফ্রি কিছু পেলে আর কিচ্ছুটি চাই না।
অ্যাপস মূলত তিন ধরনের হয়,
১) ‘পেইড অ্যাপস’, এইগুলো ডাউনলোড করতে গেলেই নির্দিষ্ট পরিমাণে মূল্য দিতে হয় ও বাৎসরিক ভাবে রিনিউ করতে হয় নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা পেতে।
২) ‘ইন অ্যাপ পার্চেস’, এই অ্যাপগুলো বিনামূল্যে ডাউনলোড করা গেলেও বেশি কিছু পরিষেবা পেতে দাম দিতে হয়।
৩) ‘ফ্রি অ্যাপস’, এগুলোতে সকল ধরনের বা অধিকাংশ পরিষেবাই সম্পূর্ণ ফ্রি।
আচ্ছা কখনও মনে হয়েছে, এরা এত খেটেখুটে অ্যাপস বানিয়ে নিয়মিত পরিষেবা কেন দেয় আপনাকে? কী লাভ সেই সংস্থার! তারা কি জনসেবা করে এগুলো দ্বারা! উত্তর হলো- ‘না’। তারা মোটেও জনসেবা করে না বরং আপনাকে বিনামূল্যে দেওয়ার নামে ডাউনলোড করিয়ে দিতে পারলেই তাদের রোজগার। এবারে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তারা বিজ্ঞাপনদাতাদের থেকে রোজগার করতে শুরু করে। ফ্রি ও সেমি-ফ্রি অ্যাপসগুলোতে মোটামুটি চার প্রকারের বিজ্ঞাপন/অ্যাড দেখতে পাওয়া যায় বর্তমানে। যথাক্রমে, (i) ইন্টারস্টিসিয়াল অ্যাডস, (ii) ব্যানার বা ডিসপ্লে অ্যাড, (iii) ইন-অ্যাপ অ্যাড এবং (iv) ন্যাটিভ অ্যাড। এই সকল অ্যাড নিয়ে পরে কোনো প্রবন্ধে আলাপ করা যাবে। কিন্তু রোজগার এখানেই শেষ হয়ে যায় না, বরং এর পরেই অনৈতিক কাজকর্ম শুরু হয় যা আমাদের সকলের অগোচরে।
আজকের এই বাইনারি মাধ্যম সর্বস্ব 5G গতির দুনিয়াতে সম্পদের মানে বদলে গেছে, যার কাছে যত তথ্য আছে সে বা তারাই সবচেয়ে ক্ষমতাধর, আর ক্ষমতাধরের কাছে অর্থ তো পায়ের ধুলো। তথ্য অর্থাৎ ‘ডেটা’, যাকে বলা হচ্ছে ‘Data is new oil’ অর্থাৎ তথ্যই হচ্ছে বর্তমানে খনিজ তেল। আর এই তেল উত্তোলন যে যত হারে করতে পারছে, সে তত কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। ঘটনা হচ্ছে কী করে বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এই ডেটা ভান্ডার কীভাবে গড়ে তুলেছে, পায় কোথা থেকে? আমরা তো কাউকে কোনোদিন কোনো তথ্য দিইনি। আসলে ‘ফ্রি’ মাধ্যমের মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রতিটি বিনামূল্যে পরিষেবা প্রদান করা কোম্পানিগুলোর মুনাফা। সেই কোম্পানিটি গুগল, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি যে কেউ হোক।
আমরা এই সকল অ্যাপসের থেকে পরিষেবা নিই আমাদের হরেক ব্যক্তিগত তথ্যের বিনিময়ে, আমরা প্রতিটি ব্যক্তিই আসলে ‘পণ্য’ এই অ্যাপস কোম্পানিগুলোর কাছে। আমাদের সেই পছন্দপঞ্জী তথ্য বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে ফ্রি এ্যপস কোম্পানি গুলো। ধরুন আপনি অনলাইনে জামা কেনার জন্য সার্চ দিলেন, দেখবেন সারাদিন আপনি অন্যান্য যেসব ব্রাউজিং করছেন, সেই সকল ক্ষেত্রেই হরেক জামার বিজ্ঞাপন দেখছেন। এখন জামার পরিবর্তে টিভি, ফোন, ট্যুর ডেস্টিনেশন ইত্যাদি যা খুশি পণ্য আপনি একটিবার সার্চ করুন সারাদিন ওটাই দেখবেন সর্বত্র। যদি কৌতূহল মেটাবার জন্য কালাজাদুর বিষয়ে সার্চ করেন, তাতেও দেখবেন সর্বত্র ওই বিষয়েই নানান বিজ্ঞাপন আসছে বিবিধ বিকল্পের সাথে।
এই সকল অ্যাপসগুলোতে এক বিশেষ ধরনের কম্পিউটার প্রযুক্তি নক্সা ব্যবহার করা হয়, যাকে এককথায় ‘অ্যালগরিদম’ বলা হয়। এই অ্যালগরিদমই অ্যাপস বা ওয়েবসাইটটির মূল সার্ভারে তথ্য পাঠিয়ে দেয় যে- আপনি কী খুঁজছেন। ল্যাপটপের কোনো ব্রাউজারে এমন কিছু করতে গেলে সেখানে ‘accept cookies’ বলে একটা অপশন আসে, এই কুকিস মানে বিস্কুট নয়, এই কুকিস হলো টিকটিকি বা গোয়েন্দা। এক বিশেষ ধরনের গোয়েন্দা সফটওয়্যার, যারা আপনার পছন্দ-অপছন্দ ও ব্রাউজিং জগতের যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করে তাদের জন্য, যে ওয়েবসাইট তাকে বসিয়ে রেখেছে আপনার কম্পিউটারে, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে তথ্য পাচার করার জন্য।
সুখের বিষয় হলো ব্রাউজারে আপনি কুকিস ‘কন্ট্রোল’ করতে পারেন, মোবাইল অ্যাপসের ক্ষেত্রে তেমনটার অপশন থাকে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। মোবাইল ব্রাউজারের সেটিংসে গিয়ে আপনি কুকিস ব্লক করে আমাদের আনন্দবাজারের ওয়েবসাইট খুলতে যান, দেখলেই তারা কুকিস অ্যাল্যাও না করলে অ্যাক্সেসই করতে দেবে না, অর্থাৎ সিম্পলি গিভ এন্ড টেক পলিসি।
প্রায় প্রতিটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীই প্রতিটি অ্যাপসকে মোবাইলের লোকেশনের তথ্য থেকে শুরু করে ফোনের কললিস্ট, ফোনের ফোটো গ্যালারি ও ভিডিও ফাইল, ফোনের যেকোনো ধরনের মিডিয়া ফাইল সহ কী কী ধরনের তথ্যের অ্যাকসেস দিয়ে দিই তা আমরা নিজেরাই জানি না। আমরা কেউ কখনও কি পড়ে দেখি, লম্বা ওই ‘টার্মস এন্ড কণ্ডিশন’ লিস্টে কী কী লেখা আছে, আমরা জাস্ট OK বটন ক্লিক করে দিই। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা-ফেসবুকের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর কিছু মানুষ বুঝতে পেরেছে যে, ফ্রি পরিষেবা দেওয়া কোম্পানিগুলো আমাদের তথ্য অবৈধ বিক্রয় করেও অনেক টাকা কামাই করছে। প্রতিটি অ্যাপসে লগ ইন করতে ফোন নম্বর বা ইমেল আইডি দিতে হয়, স্বভাবতই যে কোম্পানি যত বড় তার কাছে তত বড় তথ্য ভান্ডার রয়েছে আমাদের সম্পর্কে। এটি যেমন নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে, সেভাবেই ভয়ঙ্কর ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
প্রায় প্রতিটি দেশেই যেকোনো ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা অবৈধ। কিন্তু এটা নেহাতই কথার কথা, আজকের দিনে অবাধে চুরি হচ্ছে আমাদের অজ্ঞতার সুযোগে। এমন ক্ষেত্রে কিছু দালাল কোম্পানির জন্ম হয়েছে যারা বিভিন্ন অ্যাপস কোম্পানি থেকে মোটা অর্থের বিনিময়ে ডেটাগুলো কিনে নেয় ও বড় বড় বিজ্ঞাপনদাতা বা গবেষণাকারীদের কাছে একাধিকবার বিক্রি করে মোটা টাকা রোজগার করে। একটা তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালে ইউরোপের একটা দেশের নির্বাচনে বিরোধী রাজনৈতিক দল ফেসবুকের থেকে এমনই তথ্য কিনেছিল, ঠিক কী কি বিষয়ে জনগণ সোশ্যাল মিডিয়াতে আলাপ আলোচনা করছে নির্দিষ্ট শহর গ্রাম বা বিধানসভা কেন্দ্রের। সেখানে প্রতিটি ব্যক্তির শেষ ৩ মাসের তথ্যের দাম ছিল ১৭১১টাকা, ভাবুন আমাদের বিপুল জনসংখ্যার দেশে কোনো রাজনৈতিক দল এমনটা করলে, তা থেকে কী বিপুল পরিমাণ টাকা রোজগার করতে পারে বড় বড় সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট গুলো।
কিছুদিন আগে পর্যন্ত এমনটাই ছিল, যেখানে শুধুমাত্র অ্যাপস কোম্পানিগুলোই ডেটা বেচে আয় করত অনৈতিকভাবে, কিন্তু এখন শুধুমাত্র ডেটা কালেকশন করার জন্য হরেক মনোরঞ্জনকারী অ্যাপস ও সাইটের জন্ম দিয়েছে বহু গোয়েন্দা সংস্থা- তাদের এক ও অদ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে ডেটা মাইনিং করা। ফেসবুক, টুইটারে হরেক মজাদার এমন লিঙ্ক আসে টাইমলাইন সার্ফিং করার সময়, যেখানে আমরা ক্লিক করি কিছু না ভেবেই। মজাদার সব সাইট সেগুলো, পূর্বজন্মে কী ছিলেন, আপনার লাভমেট কী, কবে আপনার বিয়ে হবে, আপনার বর্তমান বয়সের ছবির বিকৃতি ইত্যাদি হরেক মজাদার সাইট, এরা আসলে প্রত্যেকটি ডেটা মাইনিং সংস্থা। সেখানে ঢুকতে গেলে বেশ কতগুলো পার্মিশন চাওয়া হয় তাদের তরফে, সেগুলোকে ok করলে তবে ওই সকল মজাদার পরিষেবা পেতে পারবেন। এমনই একটি ফ্রি এ্যপস হচ্ছে ‘Muslim Pro’।
‘Muslim Pro’ হচ্ছে অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড করা ইসলামিক অ্যাপস, গোটা বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ এটার ব্যবহার করত এই শুরুর নভেম্বরেও। এরাই X-mode নামের এক দালাল ডেটা মাইনিং কোম্পানিকে তাদের যাবতীয় ডেটার অবৈধ বিক্রি করত সেই ২০১৮ সাল থেকে, খবরটি সম্প্রতি ফাঁস হয়ে গেছে হরেক মিডিয়াতে। এই X-Mode কে কাজে লাগিয়েছিল US militery।
মার্কিন মিলিটারি এমন অসংখ্য ছোট ছোট কোম্পানিকে দিয়ে অজস্র ফ্রি অ্যাপস বানিয়ে ছেড়ে দেয় সেই সকল নির্দিষ্ট অঞ্চলে, যেখানে তাদের নজরদারি চালাতে নিখুঁত তথ্য দরকার। সাধে কি আর চীন কোনো ধরনের মার্কিন-ইউরোপীয় ইন্টারনেট মাধ্যমের প্রযুক্তি কোম্পানিকে দেশে ঢোকার পার্মিশন দেয়নি, একই কারণেই শত শত চাইনিজ অ্যাপস ব্যান হয়েছে আমাদের দেশেও।
নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির উপরে, কোনো গোষ্ঠীর উপরে, কোনো বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলে নজরদারি চালাবার জন্য এমন অ্যাপস হাতিয়ার ব্যবহার করছে কিছু দেশ। আমাদের মতো অতি সাধারণ ব্যবহারকারীরাও জানি যে গুগল, ফেসবুক দ্বারা আমাদের সহজে ট্র্যাক করা যেতে পারে, তেমনই মার্কিন সেনাবাহিনী, CIA, মোসাদ, MI-6, ISI এর মতো ধুরন্ধর বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও জানে এ কথা। সুতরাং সেয়ানাদের ধরতে গুগল-ফেসবুকের মতো চিহ্নিত মাধ্যম ব্যবহার করে ট্র্যাক করতে পারবে না। তাই সেয়ানাদের জন্য এমন অসংখ্য মনোরঞ্জন ও প্রয়োজনীয় অ্যাপস বাজারে ছেড়ে রেখে তারা লক্ষ্যে পৌঁছে যাচ্ছে; ব্যাপারটা এমনই ভয়াবহ দিকে চলে যাচ্ছে যে- আমি আপনি যে কেউ তাদের জন্য ঘরের পোষা মুরগির মতো সহজলভ্য নিশানা হয়ে যাচ্ছি।
মার্কিন সেনাবাহিনী ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি এমন হরেক অ্যাপস বাজারে সরাসরি আছে ছদ্মবেশে। এই ২০২০ সালের এপ্রিলে মার্কিন কংগ্রেস ‘বাবেল স্ট্রিট’ নামের একটা প্রযুক্তি সংস্থাকে ৮৯ লক্ষ ডলার পেমেন্ট করেছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ অনুমোদনে। এদের কর্ণধার টিম হকিন্স’ সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিল, “মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ছোট ছোট জনজাতি, মিলিট্যান্ট-মিলিশিয়া গ্রুপদের লোকেশন ট্র্যাক করতে পারা জরুরী জঙ্গীবাদ নিকেশ করতে, সেই প্রযুক্তির উদ্ভাবনের জন্যই এই বিনিয়োগ”। এই ‘বাবেল স্ট্রিট’ কোম্পানির একটি প্রোডাক্ট বা সফটয়্যার আছে ‘LOCATE X’ নামে, এর দ্বারা আপনার ফোনের লোকেশন বন্ধ থাকলেও ‘বাবেল স্ট্রিটের’ সার্ভার নিখুঁত অবস্থান পেয়ে যাবে যে ডিভাইসে এটা ইনস্টল আছে, এমনভাবেই এগুলো তৈরি।
এই ভয়াবহ প্রযুক্তিগত ফাঁদগুলো এই ‘Muslim Pro’ স্ক্যামের উন্মোচনের পরেই ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি মুসলমান দেশগুলোর। আগামীতে এটা খোদ আমেরিকারই উপরেই যে অন্য কেউ প্রয়োগ করবে না তা কে বলতে পারবে! ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্প তো আমরা অনেকেই জানি। তবে তারা ক্ষমতাধর- প্রযুক্তি, অর্থ সকল দিক দিয়ে। ওরা নিজেরা নিজেদের সুরক্ষিত করে নেবে; কিন্তু আমাদের মতো ছাপোষা মানুষের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কী হবে!
উপরে কেনিয়ার ঘটনা সে জন্যই বলেছি শুরুতে। জটিল অ্যালগরিদমের মাধ্যমে আমাদের প্রতিটি গতিবিধি সমন্ধীয় পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য কোন দপ্তরে পৌঁছে যাচ্ছে আমাদের অজান্তে তার খোঁজ কেউ জানি না।
মুসলমানেদের জন্য যেমন ‘Muslim Pro’ সেজে এসেছিল মার্কিন সেনা, তেমনই হিন্দুদের, খ্রিস্টানদের, বৌদ্ধদের জন্য কিছু এমন অ্যাপস আছে কিনা আমরা কেউ জানি কি? এর সাথে যদি সেই অ্যাপস দর্শনধারী হওয়ার সাথে বেশ খানিকটা প্রয়োজনও মিটিয়ে দেয়, সেক্ষেত্রে আমরা নিজেরাই শত শত বন্ধুদের কাছে সংশ্লিষ্ট অ্যাপসের প্রচার করে দিয়ে থাকি, এটাই আমাদের স্বাভাবিক চরিত্র।
অনেকে ভাববেন আরে অমুক অ্যাপস তো আমাদের সাচ্চা ভারতীয়র তৈরি, কিংবা তার মালিক হিন্দু বলে হিন্দুদের ক্ষতি হবে না নিশ্চিত ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের জন্য একটা তথ্য দিই, Muslim Pro অ্যাপসের মালিকও আরবের মুসলমানই ছিল, যদিও তাদের ফান্ডিং করেছিল এক মার্কিন কোম্পানি। আমাদের দেশের দিকেই দেখুন, গরু রাজনীতি এখন ভীষণ জনপ্রিয়। তথাপি গোমাংস রপ্তানি বন্ধ তো হয়নি, উল্টে প্রতি বছর তা বেড়ে চলেছে। প্রথম ১০টি ভারতীয় গোমাংস রপ্তানিকারক কোম্পানির ৭টিই অমুসলিমদের, যদিও প্রতিটি নামই আরবি শব্দ দ্বারা তৈরি। এদের মাঝে কয়েকজন আবার জৈন ধর্মেরও আছে, যারা আজন্ম নিরামিষাশী। আরও বড় তথ্য হচ্ছে ওই ৭টি বড় কোম্পানির মধ্যে অন্তত ১৯ জন এমন পার্টনার আছে যারা বিজেপির বড় বড় নেতা। সঙ্গীত সোম বা অনিল ভিজদের মতো প্রথম সারির গোহত্যা বন্ধ বিষয়ে রাজনীতি করেই তাদের পরিচিতি পাওয়া ব্যক্তিরা ওই ১৯ জনের তালিকাতে রয়েছে। সুতরাং হিন্দু বলেই হিন্দুরা সেফ, বা মুসলমানের কাছে মুসলমানেরা সেফ, বিষয়টা এতটাও অতি সরল নয়। নতুবা প্রতি বছর এদেশে ধরা পড়া ISI এর চরেদের ৯৫% অমুসলিম হতো না।
‘PINGDOM’ নামের ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনি নিজেই দেখে নিতে পারবেন আমাদের বহু চেনা ও অচেনা অ্যাপস বা ওয়েবসাইটগুলো কীভাবে কোন কোন তথ্য চুরি করতে কীভাবে আমাদের ফোনকে ব্যবহার করে। সুতরাং এখন বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কীভাবে কাসেম সুলাইমানিকে এক্কেবারে পিন পয়েন্টে টার্গেট করে খুন করা সম্ভব হয়েছিল।
এমনিতেই আমরা হরেক চাইনিজ কোম্পানিদের ফোন, টিভি, অ্যাপস, ফান্ডিং দ্বারা নাগপাশে বন্দী। আগামীকাল তাদের সাথে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে, তারা আমাদের দেশে ওই কায়দাতেই ক্ষতি করেবে কিনা কে তার গ্যারান্টি দেবে! আমাদের দেশের শিল্পপতিরা, বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও আগামীকাল এমন কিছুর শিকার হতেই পারেন, যদি না আজই এগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বিকল্প সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে রাখে রাষ্ট্র। জনপ্রিয় অ্যাপসগুলোর আদলে সরকারই এমন পরিষেবা দিলে রাষ্ট্রের জনগণের তথ্য বিদেশী শত্রুদের হাতে যাওয়া থেকে অবশ্য রক্ষা পায়, কিন্তু সেটা করবেটা কে! সামান্য আরোগ্যসেতু এ্যপসের বিষয়েই কোনও তথ্য নেই সরকারের কাছে।
বহিঃশত্রু ভুলে যান, তারা আমাদের নাগালের বাইরে। ফেসবুক, গুগলের মতো কোম্পানিগুলোও আমরা ধরাছোঁয়ার বাইরে, তারা অধিকাংশ দেশের সরকারের চেয়েও বেশি ধনী ও ক্ষমতাবান। বিভিন্ন সরকারই এদের সাথে হরেক ডিল করে। যাতে কেউ বিদ্রোহ ঘোষণা করলে সেই বিদ্রোহীদের গতিবিধির সবটাই ট্র্যাক করতে পারে সরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর এই তরজাকে কাজে লাগিয়ে ফ্রি পরিষেবা দিয়ে রাজনৈতিক ডেটা মাইনিং করতেই বা কতক্ষণ এদের!
যেকোনো স্বৈরাচারী শাসক চাইলেই প্রতিটি সরকার বিরোধী বিদ্রোহকে অঙ্কুরেই ‘খতম’ করে দিতে পারে। গণতন্ত্রের সংজ্ঞাই বদলে যেতে পারে এর বিকল্প না এলে। এমন কোনো অ্যাপসের দ্বারা খুব সহজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পথচলতি অবস্থায় ট্র্যাক করে খতম করে দেবে বা পুলিশ দিয়ে তুলে নেবে, অথচ আপনার লোকেশন সার্ভিস বন্ধই ছিল ফোনে। এছাড়া প্রোপাগান্ডা ছড়াবার জন্য ফেসবুক, ওয়াটস অ্যাপ, টুইটার কীভাবে ব্যবহার করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাসীন দল তা আমাদের চেয়ে ভাল কে জানে। তাই গুগল বা ফেসবুককে কোনো সরকারই ঘাঁটায় না, বরং ব্যবহার করে বিপুল অর্থের বিনিময়ে।
আমাদের দেশেরই কোনো ডাকাতগোষ্ঠী, পাচারকারী বা সমাজবিরোধীরা এমন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করলে সাধারণ জনগণের অবস্থা কী হবে বুঝতে পারছেন? আমরা এই ভারত উপমহাদেশের প্রায় প্রতিটি জনগণই ফ্রি পেলে আলকাতরাও খেয়ে নিই পেট ভরে, সেটা কি কারো অজানা রয়েছে! সুতরাং আমাদের এখনই সাবধান হওয়ার সময় চলে এসেছে, নতুবা আগামীতে আপনাকে এক্কেবারে সেখানেই পাকড়াও করবে এরা, যেখানে পেতে চায় তাদের ফাঁদ।
কিন্তু এর মানে কি আমরা ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন ব্যবহার করা ছেড়ে দেব! মোটেই তা নয়, নিশ্চয়ই এ বিষয়ে কোনো সমাধান নেবে সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞেরা ও রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। তবে আমরা নিজেরাও এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি অনেকটাই।
আমাদের প্রত্যেকের ফোনেই কমবেশি ৮০-১০০ বা তারও বেশি নানান অ্যাপস থাকে। যেগুলোর মধ্যে ৫-১০%ই আমরা ব্যবহার করি নিয়মিত। বাকিগুলো দৈনিক ব্যবহার না করলেও সেগুলো ফোনে রয়েই যায়, যেগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে সচল থাকে, ইন্টারনেট কানেকশন পেলেই তারা ডেটা মাইনিং শুরু করে নিজেদের সার্ভারে তথ্য পাচার করতে থাকে।
মোবাইলে নেট চালু করলেও সংশ্লিষ্ট অ্যাপসগুলোতে যদি নেট পরিষেবা বন্ধ করে রাখতে পারেন সেক্ষেত্রে আমার ছোট বুদ্ধিতে মনে হয় অনেকটাই এই অবৈধ ডেটা মাইনিং বন্ধ করে রাখা যাবে। এখানে ইন্টারনেটই এই পাচারের একমাত্র মাধ্যম। কিছু থার্ড পার্টি অ্যাপসের সন্ধান দিলাম নিচে, যেগুলো অ্যান্ড্রয়েড, আইফোন সহ প্রতিটি বড় বড় অপারেটিং সিস্টেমে উপলব্ধ। ‘কোন অ্যাপস নেট কানেকশন পাবে আর কোনটা পাবে না’ এই ধরনের অ্যাপসগুলোর যেকোনো একটি দ্বারা আপনি নিজে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। যখন যে অ্যাপসে নেট প্রয়োজন সেটা অন করে নিলেন, কাজ মিটে গেলেই আবার বন্ধ।
এভাবে আপনি আপনার মোবাইলের অপ্রয়োজনীয় নেট খরচাতেও রাশ টানতে পারবেন। অবশ্যই এই ফায়ারওয়েলের নেটটিও বন্ধ রাখতে ভুলবেন না।
I. NoRoot Firewall
II. NoRoot Data Firewall
III. LostNet NoRoot Firewall
IV. NetGuard
V. DroidWall
সুতরাং আমরা সকলেই পকেটে গোয়েন্দা নিয়ে ঘুরছি অদৃশ্য মাইন বেছানো যুদ্ধক্ষেত্রে। ‘আস্তিনে সাপ পুষে বাঁচা’ প্রবাদের জীবন্ত স্বরূপ প্রজন্মের আমরা। কীভাবে এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবো কেউ জানি না এই মুহুর্তে, তবে শুরুটা করতেই পারি। আমারটা আমি জানালাম, আপনার কাছে কোনো আইডিয়া বা প্রযুক্তি থাকলে কমেন্টে শেয়ার করতেই পারেন।