আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে মানচিত্র একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম, ছোট বড় যেকোনো ভ্রমণে আমাদের যাত্রাপথ পরিচালিত হয় এই মানচিত্র দ্বারা। বিভিন্ন ভূ-রাজনীতি এবং পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে একটা দ্বিমাত্রিক রূপ প্রদান করে এই মানচিত্র। মানচিত্র দেখা আসলে একটা নেশাও বটে, এটা মাননীয় সুব্রত মণ্ডল দাদার সুত্রে আমার পাওয়া, সেই মত সময় সুযোগ পেলে ম্যাপে ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভালই লাগে। ছোটবেলায় এ্যাটলাসের মানচিত্র বই দেখতাম, পরে বাঁধানো দামি ডায়েরী গুলোর ভিতরে সুদৃশ্য রঙিন মানচিত্র আঁকা থাকত, ‘পলিটিক্যাল ম্যাপ’ ইত্যাদি যেগুলো ভীষণ কৌতূহল সৃষ্টি করত। নতুন শতকে পদার্পন করার কিছুদিনের মধ্যেই মোবাইলে মানচিত্র এসে যাওয়াতে ভীষণ সুবিধা হয়ে গিয়েছিল- পৃথিবীকে বুঝতে।
ঠিকিই চলছিল, কিন্তু গোল বাঁধল অন্যত্র। ভাইরাস ও ‘আর্টিক্টের বরফ’ শীর্ষক একটা প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে গ্রীনল্যান্ডের আয়তন দেখছিলাম, দেখি সাড়ে একুশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার তার আয়তন, ভারতের আয়তন সম্বন্ধে কোথাও একটা পড়েছিলাম বলে সেটাও মগজে ছিল- পৌনে ৩৩ লক্ষ বর্গকিমি। এই গণিতের হিসাবে দেড়খানা গ্রিনল্যান্ড ভারতে অনায়াসে ঢুকে যাবে, কিন্তু মানচিত্রে দেখে থ হয়ে গেলাম- দেখি ৮-১০ খানা ভারত গ্রিনল্যান্ডের মাঝে অনায়াসে ঢুকে যাবে। ঘ্যাঁটে ঘ…
তারমানে আমাদের মানচিত্র ত্রুটিপূর্ণ? আজ্ঞে হ্যাঁ- বিশ্বের সর্বাধিক স্বীকৃত যে মানচিত্র ‘মার্কেটর ম্যাপ’, আমরাও যেটা অনুসরণ করি, তাতে চিত্রিত অধিকাংশ দেশেরই আকার-আয়তণ মোটেই ততটা নয় যতটা আমাদের দেখায়, বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধের উপরের দিকের দেশ সমূহ। এটা নিশ্চিত হাস্যকর রকমের ভুল, কিন্তু আজকেও এটাকেই বয়ে নিয়ে চলেছে সমস্ত ডিজিটাল মানচিত্র কোম্পানিগুলো।
আচ্ছা খুলেই ফেলুন গুগুল মানচিত্র, দেখুনতো গ্রিনল্যান্ডকে কত্তবড় দেখাচ্ছে। এবারে তার পা বরাবর নিচে গিয়ে দেখুন, বেচারা লাতিন আমেরিকা কেমন ছোটখাটো দেহ নিয়ে সেখানে পড়ে রয়েছে। কিন্তু তথ্য কি বলছে? গ্রিনল্যান্ডের আয়তন সাড়ে একুশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার আগেই বলেছি, সেখানে দক্ষিণ আমেরিকা ১ কোটি ৯২ লক্ষ বর্গ কিমি- মানে প্রায় ১০টা গ্রীনল্যান্ডের সমান। শুধু তাই ই নয়, রাশিয়া, ইউরোপ, কানাডা, আমেরিকা সব’ই অনেক ছোট ম্যাপে যেমনটা দেখায় তার চেয়ে। বরং আফ্রিকা বা আমাদের ভারত অনেক বড় মানচিত্রে, তাদের তুলনায়।
কানাডার পূর্ব দিকের আলাস্কা প্রদেশ, যা আমেরিকার অংশ; ম্যাপে তার যা আকার, তাতে করে আমেরিকার নিচের দিকের দেশ মেক্সিকোর মত পাঁচ-ছটা দেশ ঢুকে যাবে। এখানেও গণিত বলছে আলাস্কার আয়তন ১৭ লক্ষ বর্গকিমির সামান্য বেশি, সেখানে মেক্সিকো অন্তত আরো আড়াই লক্ষ বর্গ কিমি বেশি।
ইংল্যান্ডের ম্যাপের দিকে তাকান, দেখে মনে হবে খান চার- পাঁচেক ওই মাপের দেশ হলেই তা ভারতের সমান আয়তন হয়ে যাবে- কিন্তু অঙ্কের হিসাবে ইংল্যান্ডের চেয়ে আমাদের ভারত ২৫ গুনের চেয়েও বেশি বড় আকারে। প্রকৃতপক্ষে, ‘গ্রেট ব্রিটেন’- জাপান, ফিলিপিন্স, মাদাগাস্কার এবং নিউজিল্যান্ড সহ বেশ কয়েকটি দেশের চেয়ে ছোট। কানাডার আকার নিয়ে আর নাইবা বললাম, যাচ্ছেতাই মাত্রার বুজরুকি সেখানে।
বস্তুত এই মানচিত্র অঙ্কনের পদ্ধতি তাকে ‘প্রজেকশন’ বা প্রক্ষেপন বলা হয়, মানে ধরে নেওয়াই হয় যে এতে ত্রুটি থাকলেও থাকতে পারে। এই মানচিত্রাঙ্কন বিদ্যাকে ইংরাজিতে বলা হয় কার্টোগ্রাফি। ‘মানচিত্র সমীক্ষা ও আন্তঃসরকারী কমিটি’ অনুসারে, মানচিত্র পাঁচ প্রকারের হয়। যথাক্রমে- জেনারাল রেফারেন্স, টপোগ্রাফিকাল, থিম্যাটিক, নেভিগেশন চার্ট এবং ‘ক্যাডাস্ট্রাল মানচিত্র ও তার রূপায়ন’।
• যে মানচিত্র গুলো আমরা নিয়মিত দেখি, পথের দুরত্ব নিরুপন করি, সেগুলো এই ‘জেনারাল রেফারেন্স’ মানচিত্র। একমাত্র এই মানচিত্র পর্বেক্ষন করে বোঝার জন্য বিশেষ নির্দিষ্ট শিক্ষার প্রয়োজন নেই, কিন্তু পরবর্তী মানচিত্রগুলো থেকে তথ্য অনুসন্ধান করতে বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন হয়।• অর্ডিন্যান্স সার্ভের ক্ষেত্রে জমির উচ্চতা গভীরতা ইত্যাদি নিরুপনে টপোগ্রাফিকাল মানচিত্র ব্যবহার করা হয়।• তথ্যগত বিষয়ভিত্তিক টিকা সম্বলিত, যেমন জনঘনত্ব, ভূতত্ত্ব, আবহওয়া ইত্যাদি বিষয়ক মানচিত্রকে থিম্যাটিক মানচিত্র বলা হয়ে থাকে।• জলপথে একস্থান থেকে অন্য স্থানের দুরত্ব, পথের দুপাশের ভূপ্রকৃতি, বিশেষ বিশেষ স্থানের পরিচিতি, নিমজ্জিত শিলাখন্ড ইত্যাদি বিষয়গুলোর উপরে ভিত্তি করে যে মানচিত্র, তাকে নেভিগেশন চার্ট বলা হয়। যদিও এর সাথে থিম্যাটিক মানচিত্রও জুড়ে তবেই তা নৌ পথের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠে।• ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জমির মালিকানা সত্ত্ব সম্বলিত চৌহদ্দির বর্ননা যে মানচিত্রে প্রত্যায়িত থাকে তাকে ক্যাডাস্টাল মানচিত্র বলে। আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির জমির যে নক্সা, তথা আমিনেরা যে মানচিত্রের সহায়তায় জরিপ করে থাকেন সেটাই এই ক্যাডেস্টাল মানচিত্র। সমস্ত ধরনের মানচিত্রের এটাই বিশদ সংস্করণ যেখানে সুক্ষাতিসুক্ষ বিবরণগুলো লিপিবদ্ধ থকে।
এবারে বিভিন্ন মহাদেশ গুলোর আকার গুলোর দিকে আমরা একটু চোখ বোলায়-
• এশিয়া- ৪ কোটি ৪৬ লাখ বর্গ কিমি• আফ্রিকা- ৩ কোটি বর্গ কিলোমিটারের সামান্য বেশি• উত্তর আমেরিকা- ২ কোটি ৪৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার• লাতিন আমেরিকা- ১ কোটি ৯২ লাখ বর্গ কিলোমিটার• ইউরোপ- ১ কোটি বর্গ কিমির সামান্য বেশি• অস্ট্রেলিয়া- ৭৬ লক্ষ ৯২ হাজার বর্গ কিলোমিটার
এবারে অনান্য কিছু বড় দেশের আকার আয়তন দেখা যায়-
• রাশিয়া- ১ কোটি ৭১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার• কানাডা- প্রায় ১ কোটি বর্গ কিলোমিটার• চীন- ৯৬ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার• আমেরিকা- ৯৮ লক্ষ ৩৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার• ব্রাজিল- ৮৫.১১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
তাহলে হিসাব গুলো কেমন দাঁড়াচ্ছে! আলাস্কা ছাড়া বাকি আমেরিকা ব্রাজিলের চেয়ে ছোট, চীনের চেয়েও ছোট। অস্ট্রেলিয়া এদের থেকে সামান্যই ছোট, যদিও মাপে তেমনটা নেই। এশিয়া সবচেয়ে বড় মহাদেশ, আর রাশিয়া সবচেয়ে বড় দেশ। ম্যাপের বিশাল অংশ জুড়ে রাশিয়ার অবস্থান, যদিও সেটাও মস্ত ভুল, মানচিত্র দেখলে মনে হবে চীন বাদে ৮-৯টা ‘অবশিষ্ট এশিয়াকে’ রাশিয়ার মাঝে ভরে দেওয়া যাবে। বরং এশিয়া থেকে রাশিয়া আর চীনের আয়তন বাদ দিলে যেটা অবশিষ্ট থাকে সেটা রাশিয়ার সমতুল্য।
সবচেয়ে দৃষ্টিকটু হচ্ছে ইউরোপের অংশে, মানচিত্র দেখলে মনে হবে ইউরোপ আফ্রিকার অর্ধেক। আসলে ইউরোপ আফ্রিকার একতৃতীয়াংশের চেয়েও ছোট। বহু দেশই ‘ম্যাপের প্রজেকশনে’র তুল্যমুল্য আয়তনের চেয়ে অনেকটা ছোট, যথা- আইসল্যন্ড পাঁচ গুণ, ব্রিটেন ৩ গুণ, নরওয়ে ১০ গুণ, সুইডেন ৩ গুণ, ফিনল্যান্ড ৪ গুণ ছোট। বেলারুশ-পোল্যান্ড-কাজাকিস্থান-জার্মানি-ফ্রান্স দেশ গুলো দ্বিগুণ বড় করে দেখানো আছে। এছাড়া ইউরোপের বাকি প্রত্যেকটি দেশ সহ তুরস্ক ও ইরাণও তাদের আসল আয়তনের তুলনাতে একটু বেশি স্থান দখল করে আছে মানচিত্রে।
শুধু কি তাই? আমরা যেটাকে পৃথিবীর উপরের দিক ভাবি, সেই উত্তর দিক আসলে পায়ের দিক। নাসার মহাকাশান এ্যাপেলো-১৭ এর মহাকাশ অভিযাত্রীরা যে ছবি পাঠিয়েছিল তা আমাদের এই সনাতন মানচিত্রটিকে উল্টো করে ধরলে যেমন দেখায় ঠিক তেমন দেখতে। এছাড়া আন্টাকার্টিকা প্রদেশের ম্যাপে কোনো ভূমিরেখর নির্দেশনা নেই, সবটাই বরফাচ্ছাদিত।
প্রতিটি দেশের মানচিত্র, যেগুলো উত্তরমেরুর দিকে রয়েছে আশ্চর্যজনক ভাবে প্রতিটি দেশের আকার, মিছিমিছিই(!) উত্তরোত্তর বৃদ্ধি প্রাপ্ত আয়তনের দিক থেকে। কারন এই মানচিত্র যবে প্রথম চিত্রিত হয়েছিল, সেই ষোড়শ শতকে এই বিপুলা গোলাকার পৃথিবীর বৃহৎ ক্ষেত্রফলের দ্বিমাত্রিক মানচিত্র অঙ্কন করাটাই ছিল একটা চরমতম সাহসী ও বৈপ্লবিক গবেষনাকৃত সম্পাদনা। এই ভুলটা হয়ত তৎকালীন ততটা ত্রুটিজনক না হলেও আজকের দিনে শুধু দৃষ্টিকটু নয়, বরং এটা অপরাধ; যেখানে দুটো পরমাণুর মাঝের সঠিক দুরত্বর নিখুঁত পরিমাপ করা যায়, সেখানে ওই ত্রুটিযুক্ত মানচিত্র কেন থাকবে!
কেন এমন ত্রুটিযুক্ত মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছিল?
এই ‘কেন’টা জানতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে পাঁচশ বছর অতীতে, ষোড়শ শতকে। খুব একটা বিদেশ ভ্রমণ না করেও, শুধুমাত্র বিভিন্ন পুস্তক, হরেক ভ্রমণকারী, বনিকদল, রাষ্ট্রকর্তা প্রমুখদের সাথে চিঠি চালাচালি করে, সেই সকল টুকরো টুকরো তথ্যগুলিকে নিয়ে দীর্ঘ গবেষণালব্ধ প্রচেষ্টার দরুন ১৫৬৯ খ্রীষ্টাব্দে তিনি আজকের এই মানচিত্রটির রূপদান করেন জেরার্ডাস মার্কেটর। তৎকালীন ইউরোপের নেদারল্যান্ড রাজ্যের অন্তর্গত ফ্ল্যান্ডার্স কাউন্টিতে জন্ম নেন তিনি; একধারে প্রখ্যাত ভুগোলবিদ তথা ভূ-বিবরণবিদ ও মানচিত্র-অঙ্কন বিশারদ ছিলেন; পাশাপাশি মহাকাশ গবেষণা, জামিতিতেও তিনি ভীষণ পারদর্শী ছিলেন। বর্তমান দিনে এই ফ্লান্ডার্স কাউন্টিটি বেলজিয়ামে অবস্থিত। তিনিই প্রথম দেওয়ালে ঝোলানো বিশ্ব মানচিত্র ও গ্লোব ম্যাপের আবিষ্কার করেন।
ভূগোল, দর্শন, কালানুক্রম এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয় নিয়ে মার্কেটর বিস্তর গবেষণা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৫৯৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ১২০ পৃষ্ঠার ‘অ্যাটলাস’ নামের সচিত্র মানচিত্র প্রকাশ করেন; এখানে মহাবিশ্বের সৃষ্টির বিবরণ এবং চিত্রিত সমস্ত দেশের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করেন। খ্রিষ্টীয় ধর্মগ্রন্থ, যথা- গসপেল ও ওল্ড টেস্টামেন্ট আধারে মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ কালিগ্রাফার ও ভাস্কর ছিলেন, তৎকালীন প্রতিটি গ্লোব ম্যাপের সকল কিছুই নিজে হাতে বানাতেন ও অঙ্কন করতে।
পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কিছু সাহসী মানুষ জলপথে যাত্রা শুরু করেছিলেন নিত্যনতুন দেশ আবিষ্কার করে ভাগ্যান্বষনের জন্য, কেউ রাজার ইচ্ছায় কেউবা বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে। মজার বিষয় হল, সে সময় খোদ ইংল্যান্ডের নিজেরই তেমন গ্রহণযোগ্য মানচিত্র ছিলনা। এমতাবস্থায় অস্ট্রিয়ার রোমান শাসক তথা স্পেনের রাজা তথা নেদারল্যান্ডের ডিউক ‘পঞ্চম চার্লসের’ একান্ত ব্যাক্তিগত পরামর্শদাতা জিন কার্ন্দোলেত এর কানে আসে এই ভূগোলবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর এর কথা। সামুদ্রিক নৌচালন বিদ্যায় পথ নিরুপন করা ও দূরত্বের পরিমাপ করার জন্য তখন কোনো একক মানচিত্র ছিলনা ইউরোপীয় শাসকদের কাছে, যা সর্বজনগ্রাহ্য। এরই সমাধানের জন্য জিন কান্দোর্লেত পৃষ্ঠপোষকতা করলেন মার্কেটরকে, কিন্তু তার চাহিদা ছিল অতি সামান্য- দুটো মাত্র গ্লোব। এই আত্মবিশ্বাসই মার্কেটরকে পরবর্তীতে খ্যাতিমান হতে সাহায্য করেছিল।
পরবর্তীতে জার্মানির জালিচ প্রদেশের শাসক, তার পুত্রের রাজ্যাভিষেক এর প্রাক্কাল্লে একসেট নতুন ও নিখুঁত মানচিত্র তৈরির বরাত দেয় মার্কেটরের কাছে। সেই দুর্মুল্য সংগ্রহটি বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা রয়েছে ‘আটলাস’ নামে। এটার নিরিখেই পরবর্তী বিশ্বের মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছিল, যা আজও গোটা পৃথিবীতে ধ্রুবক হিসাবে ববহৃত হয়ে আসছে।
লুথেরিয়ানদের ধর্ম বিশ্বাস মতে উত্তর দিক হল পবিত্র, প্রসঙ্গত মার্কেটর নিজেও একজন লুথেরিয়ান ধর্ম বিশ্বাসী ছিলেন। এজন্যই মানচিত্রে উত্তরদিন উপরের দিকে করেছিলেন তিনি জেনেবুঝেই।
মারকেটরের জীবনীকার, ‘ঘিচ’ এর ভাষ্য অনুসারে, তৎকালীন সকল ইউরোপিয়ান শাসকই চাইত- তাদের দেশগুলো যেন আকৃতিতে বড় করে দেখানো হয়, এতে করে নিজেদের ‘সুপ্রিমেসি’ বা অধিপত্যের দম্ভ দেখানো যেত। সমসাময়িক কালে মারকেটরের কোনো প্রতিদ্বন্দী ছিলনা, স্বভাবতই অধিকাংশ বরাতই তার কাছে আসত; এবং অতিরিক্ত অর্থ সমাগমের অভিপ্রায়ে মারকেটর প্রত্যেকেরটাই এমন করে ‘গোপনে’ বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে অনুমান করেন। এছাড়া এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ছোট করে দেখিয়ে দিলে, ইউরোপিয়ানদের নিজেদের দখলীকৃত অংশগুলো আকারে অনেকটা বড় লাগত পরিমাপের এককে, ৫% অধিগ্রহণ করে- দেশে এসে জানাতো ২৫% দখল করেছি, তাতে গৌরব বাড়ত। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের বাইরে কোন দেশেই যেহেতু মারকেটর নিজে যাননি, তাই আয়তনটা কিছুটা তারই মস্তিষ্কপ্রসুতও ছিল। এছাড়া কাগজকে শঙ্কু আকৃতির বানিয়ে, তা থেকে গোলাকার পৃথিবী বিষয়ে ধারণা করেছিলেন মারকেটর, সেখান থেকেও এমন ভুল হবার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এগুলো সবই সম্ভাবনা মাত্র, আসলে বিষয়টা কী ছিল তা একমাত্র মারকেটরের বাইরে কেউই জানতেননা, বাকিটা পাঠকের ভাবনার উপরে ছাড়া হল।
কিন্তু এই ভুলটা জানা গেল কীভাবে!
১৮৮৫ সালে জেমস গল এবং আরনো পিটার্স নামের দুই ভূগোলবিদ সর্বপ্রথম আয়তাকার মানচিত্র ‘প্রজেকশন’ করেন, যাকে গল-পিটার্স প্রজেকশন বলা হয়ে থাকে। এটা বিষয়ে ১৮৮৬ সালে ফলাও করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রবন্ধাকারে ছাপানোও হয়েছিল, এর পরে গোটা বিশ্বজুড়ে একটা রাজনৈতিক শোরগোল পরে যায়, ফলস্বরূপ বিশ্বমোড়লেরা বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে দেয়। এরপর হঠাৎ করেই ২০১৬ সালের একটা সম্মেলনে পুনরায় এই নিয়ে প্রস্তাব উঠলে, মার্কেটরকে বাতিল করে ‘গল-পিটার’ এর মানচিত্রকেই ইউনেস্কো মান্যতা দেয়; সেই মত আমেরিকা ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশে এই প্রোজেকশনকেই সরকারী ভাবে ব্যবহার শুরু করে এই সেদিন, ২০১৭ সাল থেকে।
তাহলে ১৮৮৫ সালের আগে কি কোনো বিশুদ্ধ ম্যাপ ছিলনা পৃথিবীতে? অবশ্যই ছিল, কিন্তু ইউরোপিয়ানদের কাছে ছিলনা। মার্কেটরেরও প্রায় ৫০ বছর আগে ‘পিরি রেইস’ নামের একজন তুরস্কের অটোমান সাম্রাজের সেনাধ্যক্ষ ছিলেন, হরিণের চামড়ার উপরে তিনিই পৃথিবীর পূর্ণাঙ্গ ম্যাপের চিত্রাঙ্কন করেছিলেন, বর্তমানে যেটা অনেকটা বিনষ্ট হয়ে গেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এখানে আন্টার্ক্টিকারও পূর্ণ ও রেখচিত্র নির্দেশিত রয়েছে যার দ্বারা টপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র চিত্রণ করা সম্ভব।
পিরি রেইসের পুরো নাম ছিল আহমেদ মহিউদ্দিন পিরি। নৌ-যাত্রার উপরে তার লেখা বই ‘কিতাব-ই-বাহারাইয়ি’ গোটা বিশ্বের কাছেই এক অমুল্য নথি। ঝড়ের প্রকারভেদ সম্পর্কে তার গবেষণালব্ধ তথ্য, নৌ-কম্পাস ব্যবহার করার হরেক কৌশল; বিভিন্ন বন্দর এবং উপকূলরেখার বিষয়ে বিশদ তথ্য সহ তার তালিকা, আকাশে নক্ষত্রগুলি ব্যবহার করে দিকনির্দেশের পদ্ধতি, বিভিন্ন সাগর-মহাসাগর এবং তাদের চারপাশের জমিগুলির বৈশিষ্ট্য সমূহ একত্রিত করে সে এক দুর্মুল্য পুস্তক রচনা করেছিলেন। এই বই এর প্রথম সংস্করণ ইস্তানবুলের পাশাপাশি, ব্রিটিশ লাইব্রেরি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, প্যারিস, ভিয়েনা, বাল্টিমোরের মত বড় বড় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।
গ্রেট আলেকজেন্ডার থেকে কলম্বাস হয়ে ভাস্কো-দা-গামা, এমন অনেকের নথি নিয়েই পিরি রেইস কাজ করেছিলেন, যা তার বইতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বানানো ১৫১৩ খ্রীষ্টাব্দের মানচিত্রের প্রথম টুকরো ১৯২৯ ক্রীষ্টাব্দে তুরস্কের ইস্তানমুলের এক গুদাম থেকে উদ্ধার হয়। যে মানচিত্র, আজকের দিনেও প্রায় নিখুঁত। মানচিত্রের দ্বিতীয় অংশটি ১৫২৮ খ্রীষ্টাবে অঙ্কিত, যেটি মিশরের কায়রো থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। প্রসঙ্গত, কর্মে গাফিলতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে এই কায়রো শহরেই পিরি রেইসকে মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। আজকের তুরস্ক নৌবাহিনীতে বহু জাহাজ ও নৌ-বহর পিরি রেইসের নামে রয়েছে।
তবে সভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম চিত্রাঙ্কিত কোনো বৈশ্বিক ম্যাপের উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রীষ্টপূর্ব ১০০ সনের কাছাকাছি সময়ে। প্রখ্যাত গ্রীক গণিতজ্ঞ, জোর্তিবিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ ক্লৌদিয়াস ‘টলেমি’ তাঁর ‘জিওগ্রাফিয়া’ গ্রন্থে বিশ্বের মানচিত্র সম্বন্ধে একটা গ্রহণযোগ্য ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তাহলে, এই হল মানচিত্র, তার ত্রুটি ও তার বিবর্তন সংক্রান্ত একটা ছোট প্রবন্ধ।
আপনারা এই ওয়েবসাইটে গিয়ে দেশগুলির আকার আয়তন নিয়ে একটু মজার খেলা খেলতেই পারেন-
https://thetruesize. com/প্রাথমিক তথ্যসুত্রঃ The Daily Mail, UK. 17 Aug, 2016
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন