মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২০

জিভে দয়া করে যেই জন


 

হাই-ড-রকসি..... গুলু গুলু কুলু কুলু, ছ্যাঁ ছ্যাঁ এটা আবার কেমনতর নাম যা জিভ উচ্চারণ করতে পারেনা! একটা জীবনদায়ী ওষুধের নাম সহজ হবেনা কেন? সে যুগে ছোটবেলায় জ্বর হলে মায়েরা ডাক্তারের কাছে গিয়ে বড়ি চাইতেন, হাতাওয়াল গেঞ্জি যাকে মেরজাই বা কামা বলে, সেই গায়ে ডাক্তারবাবু হামানদিস্তায় কিছু গুঁড়ো করে পুরিয়া দিতেন, আর সেই খেয়েই আমার দাদু ৭২ তে গিয়ে বোল্ড হয়েছিল by ফুলুরি, বাপটা এই তেষট্টিতেও টগবগে জোয়ান, নটআউট। তাদের এইসব বিটকেলে রোগও যেমন হয়নি, তেমনি এই ওষুধের নামও মনে রাখতে হয়নি।

তারও আগে কোবরেজ মশাই বা হাকিম সায়েব এর পাঁচন খেয়েছিল উর্ধ্বতন পূর্বপুরুষের দল, তারা কি টেঁশে গিয়েছিল অকালে? অথচ আমাদের সর্বাঙ্গ রোগে পটপট করছে, তার উপরে ওষুধের ভিনদেশী শব্দের চোটে লেজে-গোবরে থুক্কুরি জিভে-গয়েরে অবস্থা

পাঠশালাতে এমনিতেই ইতিহাসের সাল মনে থাকতনা, ভুগোলের ম্যাপবই টুকরো করে তাতে আলুকাবলি রেখে খেয়েছি। অঙ্কের ক্লাসে বসে জানলা দিয়ে তালগাছে বাবুই এর বাসা বাঁধা দেখতুম, হাজারহোক শিল্পী মন তো! সাড়ে সাত ঘরের নামতা শিখে ফেলাটা কোনো সাধারণ প্রতিভা ছিলনা। তার উপরে ইঞ্জিরি ক্লাসে নিমুনিয়া, লেফট্যানান্ট, এ্যাসোসিয়েশন ইত্যাদি বানানের চোটে কতজনই যে ক্লাস সিক্স টপকায়নি সে হিসাব সরকারের কাছে আছে? বিজ্ঞানের ক্লাসে গ্যালিলিও বললে গুলি খেলার কথা মনে পরত, কোপার্নিকাশের কথায় মনে পরত- নিচে পাড়ার হারুর সাথে কলআঁটির ঝামেলার হিসাবটা আজও নিকেশ করা বাকি। ভিটামিন মানে ‘গুটা ডিম’ এর বেশি বুঝিনি সেকালে।

ব্যকরণ পড়ে কতজন হাকিম, মোক্তার হয়েছে না জানলেও কত প্রতিভা অকালে ঝরে পড়েছে সে কথার লেখাজোখা কি রয়েছে সরকার বাহাদুরের ঘরে? কোনো মশালচি কী এমন গুরুত্বপুর্ণ বিষয়ের উপরে দস্তাবেজ তৈরি করেছে? নেই! যাদের ছাড়া দেশ চলবেনা, সেই বাসের ড্রাইভার, মুদি দোকানী, ঘুগনি ওয়ালা, জমাদার, গোয়ালা, নরসুন্দর প্রমুখদের ভূগোল-বিজ্ঞান-ব্যাকরণ কোন কাজে লেগেছে? এই ধরুন ঘোষেদের হাবু, আজ লোকের চুল কাটে সে কী এমনি এমনি? রহিম রাজমিস্ত্রির যোগারে হয়েই বুড়ো হয়ে গেল, দীনু লটারির টিকিট বেচে দিন চালায়, সেসব কি স্ব-ইচ্ছায়? আজ্ঞে না মশাই, তিনকড়ি পণ্ডিতের ব্যাকরণের ক্লাস যে কত হাবু, রহিম, মজনু, দীনু, হরিদের ভবিষ্যৎ কেড়েছে, ঘোষের ছেলেকে নাপিত বানিয়েছে, ইতিহাস তা মনে রাখেনি। ওরাও আপিস যেতে পারত যদি উচ্চারণের মহামারীতে ভোগে না যেত। ব্যাকরণের নত্ব-ষত্ব, সন্ধি বিচ্ছেদ, সমাস ছেড়ে দিন- কুজ্ঝটিকা, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, আকাঙ্ক্ষা, দুর্বোধ্য শব্দ গুলোকে কেন মহামারী ঘোষণা করা হয়নি, এতগুলো প্রাণ নেবার পরেও? এক্ষেত্রে সুশীলসমাজ, বুদ্ধিজীবীরাও মুখে তালা লাগিয়ে রেখেছে, কেউ কখনও এমন মারাত্বক ছাত্র বিরোধী বিষয়ের উপরে অনশন, মিছিল, ধর্না কিচ্ছুটি করেনি, আদালতও শুয়োমোটো মামলা করেনি, জনস্বার্থের কথা কে আর ভাবে। এসবের পরেও আজকাল কিছু বিদেশী শব্দ এসেছে এই দুর্দিনের সময়, যখন মানুষ ঘরে শুয়ে শুয়ে ক্লান্ত

অথচ শুরুটা আমাদের কি দিয়ে? অ এ অজগরটি আসছে তেড়ে, আঁটকালো কোথাও! ছোট খোকা বলে অ আ, শেখেনি সে কথা কওয়া, জল পড়ে- পাতা নড়ে, কোথাও আঁটকেছিল? সব জিনিসই কি শিখতে হয়, নিজ প্রতিভাতেও তো কতকিছুই শিখে যায়, বোকা যোগে ওই গালিটা, শুয়োরের বাচ্চা, অমুকের ছেলে, তমুকের ভাই এগুলো কে শিখিয়েছিল! সরল ভাষা, তাই সাবলীল ভাবে প্রায় সকলে শিখে নিয়েছে। উপরোক্ত গালি গুলি পর্যায়ক্রমে- মুর্খরতিকারক, বরাহনন্দন, পতিতাতনয়, উদ্দীপ্ত যৌনবিলাসীর ভ্রাতা ইত্যাদি রূপে যদি শেখাতে যান, কেউ শিখবে? হয় তারা উন্মাদ নতুবা সন্ন্যাসী হয়ে যাবে তবুও শিখবেনা

এই যে ধরুন আমাদের রোগব্যাধি গুলো, কত সরল নাম সব। বুনিয়াদী ইশকুলের সব ছেলেরা জানে ‘পেট-বেতা’ কাকে বলে, ঘরের বৌদের ‘মাতা-বেতা’ রোগ কে শিখিয়েছিল! ধরুন আমাশা, যতটা আয়েসে ওখান দিয়ে বের হয়, ততটাই সহজে জিভ দিয়েও বেড়িয়ে আসে। হাগা, বমি, জ্ব, কাশির মত রোগ, যা জিভকে কষ্ট না দিয়ে ফস করে বেড়িয়ে আসে। তারপর ধরুন ‘বাত’ বললেই সর্বাংগে একটা যন্ত্রনার উপন্যাস পড়ে নেওয়া যায়, আবার বাতের শেষে একটা ‘কম্ম’ জুড়ে দিতেই চোখ বন্ধ করে স্বর্গীয় পরিতৃপ্তিটা উপলব্ধি করার মত। বিদেশী রোগ কিন্তু তা নয়, influenza, Tuberculosis, diabetes, diarrhea , appendix, Osteoarthritis, Schizophrenia, Jaundice আরো কত্তকি, যেগুলো উচ্চারণ করতে গেছো কী হেডফোনের তারের মত জিভ জড়িয়ে গিঁট পেকে যাবে

মহামারীর নাম করোনাই হওয়া উচিৎ, কি সুন্দর মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসে। আগে কি মহামারী ছিলনা! লাউঠো, কুট, মায়ের দয়া, ভেদবমি, ধুমজ্বর- একটাও কী জিভে কষ্ট দিয়ে মেরেছে? চুলকানি রোগ তো আমাদের জাতীয় সম্পদ। এদেশে লোকে পাগল হয়ে যেত ঠিকিই কিন্তু তারাও গান, বাজনা সহ নানান আমোদ হরকত দেখাতো, তাদের কখনও lunatic asylum এ রেখে আসতে হয়নি যার নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে দম আঁটকে যায়। গু, মুত, ঘামও কত ভাল ভাবে বের করা যায়, অথচ সাদা চামড়ার মানুষ গুলো সামান্য হিসি বোঝাতে গিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে কত কসরত করে urine বলে বেচারারা। তারপর ধরুন গু, সেটাও বলতে গিয়ে জিভকে টাঁকরায় ঠেকিয়ে stool বলে, অথচ আমরা school কে সেই কবেই সরল ভাবে ইসকুল করে নিয়েছি

তারা যতই ব্রিটিশ বলুক আমরা ওদের গোরা করে দিয়েছিলাম, মেম-সায়েব, দোলান্দ কত্তো সুন্দর করে আমরা নাম দিয়ে দিয়েছি। Government কেও এই হালেই গরমেনট করে দিয়েছে পিসি। তাদের এলোমেলো ভাষার খপ্পরে আমারা আজও আলমন্ড, ডেঙ্গু, পিজ্জা, সোর, কুপন, লিংগারি, প্লাম্বার, এসথেমা, প্রসিডেন্ট, এগজামিন, এমনকি প্রোনাউনসিয়েসনটাও সঠিক করে আজও উচ্চারণ করতে পারিনা আমরা। কারন আমরা তো শিক্ষার যে ইংরেজি শব্দ সেটাকেই এডুকেশন লিখি অথচ গোরা গুলো এজ্যুকেশন বলে। ওদিকে লালচুলো মারকিন হনুটা আমাদের স্বামীজিকে ‘ভিভেকামুন্নোন’, বানিয়ে ছেড়েছে। ব্যাটা বেল্লিকের জাত, ঠিক করে জিভ ছোলেনা বোধহয়, আমাদের বঙ্কু পণ্ডিতের পাঠশালার ছপটির ঘা সপাৎ করে বার দুয়েক পিঠে পরলে জিভের ভুত রাম নাম জপতে জপতে পালাবার পথ পেতোনা। ভুত হয়েও কি শান্তি আছে, সেখানেও ঘোষ্ট না বলে গৌস্ট বলতে হবে।

সবই সেই জিভের বাঙালিয়ানা। সাবুদানা, কচুর লতি, কলাই ডাল, ভেন্ডি খাওয়া জিভে সড়াৎ করে বেড় হবে এমন শব্দ দিয়ে জিনিসের নাম রাখলে তবে না সেগুলো জনপ্রিয় হবে। আমাদের কবি লেখকদের নাম গুলো দেখুন- রবি, শরৎ, সুকুমার, সুনীল, সিরাজ প্রমুখ, কত্তো সরল। জন দূর্গেশনন্দিনী বা কপালকুণ্ডলা পড়েছেন অথবা একটু শক্ত উচ্চারণের বঙ্কিমকে কতজন জেনেছেন। বরং বিভূতি, মাণিক, শংকর অনেক বেশি জনপ্রিয়। গোরাদের কথা ছেরেই দিন, তাদের মহান লেখকের নাম বাঙালী ভদ্র সমাজে নেওয়া যায়? সেক্স দিয়ে নাম কার শুরু হয় বাপু? চার্লস ডিকেন্স আরেকজন, সেখানেও ডিক, ছিঃ, নির্লজ্জতার চুড়ান্ত। তাদের দেশে যা শোভনীয় আমাদের জিভে যে বড়ই বেমানান সেসব।

আমাদের জনপ্রিয় ওষুধ গুলোর কথাই ভাবুন, যেমন ধরুন ডাইজিন, কাজ হোক বা না হোক নামটাই সুন্দর, বিকোয়ও হুড়মুড়িয়ে। ছোট বেলায় জ্যাক এন্ড জিলের স্বাদ মাখানো পেটব্যাথার মেট্রোজিল। মাথাধরার ক্রোসিন আবার রেশনের কেরোসিনের সাথে নেমসেকের মতই, তাড়াতাড়ি কেরোসিন বললে তেমনই শোনায়। সেলাইন, ওয়ারেশ নামগুলোও কী দারুন নির্বিষ, যেন ফিল্ডিংয়ে থাকা গাঙ্গুলি, দাঁড়িয়ে যেখানেই থাকুক বল ঠিক বেড়িয়ে বাউন্ডারি যাবেই যাবে

আমরা যেসব খাবার খায় সেখানেও কত মসৃণ উচ্চারণ, চাল, আটা, মাছ, ডিম, সিম, আলু ইত্যাদি। উচ্চারনে একটু কষ্ট মানেই তা গরীবের জন্য নয়; পোস্ত, বিরিয়ানি, মাংস এগুলো হত-দরিদ্রের জিভের ভাষাই নয়। অনেকেই আমাদেরকে ছোটলোক বলে এই খটমট শব্দ জিভে খেলেনা বলে। ওরে পাগল ডোলানও তো সুচীন, কুলি আর ভিভেকামুমনোন বলেছিল, তাতে তাদের দেশের লোক হেসেছিল নাকি রে হতভাগা কাঁকড়ার জাত?

আমেরিকানরা আগেই জানত তাদের ওই কি যেন ওষুধ যেটার নাম, যে শুরুতেই উচ্চারণ করতে পারিনি। যাই হোক কাজ চালাতে নেট থেকে কপিপেষ্ট মারলাম- hydroxychloroquine, হ্যাঁ- এটা তাদের লাগবে। তাইতো ২০১৯ এর সেপ্টেম্বরে মোদীজি তাদের দেশে যেতেই- সব গোরার দল হাউডি মোদী করে চেঁচিয়েছিল, আসলে তারা শর্ট ফর্মে বলছিল ওই- হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনিন দে মোদী। বাকিটা অপভ্রংশ দোষ- হাউ দে মোদি, হাউডি মোদি। সবই জিভের করিশ্মা, আর আমরা কি না কি বুঝেছিলাম। উন্নত জাতি কত আগে থেকেই তারা সব জানে- আমরা বাপু আঁটকে যাওয়া জিভের হ্যেবলা হয়েই দারুণ খুশি।

কোয়ারেন্টাইন, প্যান্ডামিক, আইসোলেশন, মিউটেশন, জিনোটাইপ এমন কত কত শব্দ জিভ জড়িয়ে গেলেও আজকাল বলতেই হচ্ছে, যা নিজেই একটা মহামারী। এর বিরুদ্ধে সমগ্র বাঙালি জাতির ‘পোতিবাদ’ কই!

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...