দিল্লির হিন্দি বা ইংরিজি মিডিয়াকে অনুগ্রহ করে 'জাতীয় চ্যানেল' বলবেননা। ওরা নিজেরাই নিজেদের নাম দিয়েছে জাতীয়, কিন্তু আসলে তো হিন্দুস্তানি চ্যানেল। দিল্লির হাওয়া খারাপ হলে ওরা 'জাতীয়' খবর করে দেয়, দিল্লিতে একটা অপরাধ হলে সেটা 'জাতীয়' বিপর্যয়। কিন্তু আপনার ভিটেমাটি উচ্ছেদ হবার উপক্রম হলে, সেটা 'জাতীয়' খবর নয়। আপনার ঝড়-ঝঞ্ঝা-বজ্রপাত-খুন-খারাপি সবই আপনার 'আঞ্চলিক'। জাতীয় ফাতিয় নয়।
এর দোষ ওদের নয়। হিন্দুস্তানি চ্যানেল হিন্দুস্তানি 'জাতীয়' খবর করবে, এতে আশ্চর্য কী। দোষ আপনার আমার। আমরা দিল্লির চ্যানেলকে নিজেরাই 'জাতীয়' আখ্যা দিয়েছি। আমরা বলিউডকে 'সর্বভারতীয়' সিনেমা বলে একবাক্যে মেনে নিয়ে শাহরুক খানের জন্মদিনে পুজো দিয়েছি। আমরা নেটফ্লিক্সে বা অ্যামাজনে হিন্দুস্তানি ওয়েব-সিরিজ দেখে আপন করে নিয়েছি। আমরা টিকিট কেটেছি, টাকা দিয়েছি, টি-আর-পি দিয়েছি, সবকিছুকেই 'জাতীয়' বলে মেনে নিয়েছি, তার জন্যই ওদের এই রমরমা। আমাদের ট্যাঁকের টাকা কেটে এসবের বাজার তৈরি, আমাদের করের টাকা অন্য রাজ্যে, অন্য ভাষায় পাচার করে তৈরি হয় এসবের পিছনের বিপুল বিনিয়োগ, এই প্রাথমিক অর্থনীতিটুকুও আমরা ভুলে মেরে দিয়েছি।
আমাদের কলাকুশলীরা বেশি প্রচার, বেশি সুযোগ, বেশি টাকার জন্য পাচার হয়ে গেছে অন্যত্র, 'জাতীয়' কোনো কিছুতে মুখ দেখানোর জন্য লাইন লাগিয়েছে, কারণ ওখানে বেশি সুযোগ, বেশি প্রচার। আমরা আক্ষেপ করেছি, বাংলায় কেন এরকম হয়না। কিন্তু সোজা বাংলাটা বুঝিনি, যে, সুযোগ, প্রচার, আকাশ থেকে পড়েনা। বিনিয়োগ লাগে। ভারতের ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের টাকা দেয়। ভারত সরকার হিন্দুস্তানের বাজার তৈরি করে দেয়। হিন্দুস্তানি ছাপা ও দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমের বিপুল বিস্তার প্রবল সরকারি উদ্যম এবং বিনিয়োগ ছাড়া হয়নি। এই বিনিয়োগের টাকা আপনার ট্যাঁক থেকে এসেছে।
এও একরকমের চুরি। আপনি সেটা দেখতে পাননি, কারণ, আপনি হিন্দুস্তানি মিডিয়াকে, বলিউডকে 'জাতীয়' মিডিয়া ভেবেছেন। আপনাকে ভাবানো হয়েছে। আদতে যা তৈরি হয়েছে, তা হল হিন্দুস্তানি সাম্রাজ্য এবং আপনি সেখানে টাকা সরবরাহের উপায় মাত্র। বাড়ির চাকর যতই জমিদারের ছেলেকে 'ভাই-ভাই' বলে আদিখ্যেতা করুক, সে জমিদারের কেউ নয়। ফলে আপনার খবর ওরা দেখাবেনা। আপনার সংস্কৃতি ওরা প্রচার তো করবেই না, বরং মুছে দিতে চাইবে। আপনি যতক্ষণ দিল্লির খবর দেখে কলকাতায় মিছিল বার করছেন, যতক্ষণ দিল্লির ভাষায় হল্লাবোল বলে স্লোগান দিচ্ছেন, যতক্ষণ বলিউডের খিচুড়ি সিনেমাকেই একমাত্র বিনোদন বলে মেনে নিচ্ছেন, যতক্ষণ দিল্লিই ভারত এবং ভারতই দিল্লি বলে মেনে নিচ্ছেন, ততক্ষণ কোনো সমস্যা নেই। তবে এর বাইরে আর কিছু আপনি পাবেননা। কারণ আপনি চাকর বাকর শ্রেণীর। আপনার ভাষা ভাষা নয়, আপনার খবর খবর নয়, জমিদারেরটাই খবর। ব্যস।
এই বাস্তবতা চিরকালই ছিল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ছিল, সংস্কৃতিতে ছিল। মহুয়া মৈত্র লোকসভায় এই জন্যই ইংরিজিতে ভাষণ দেন, অধীর চৌধুরি দেন হিন্দিতে। কারণ, হিন্দুস্তানই হল 'জাতীয়'। এই বিপর্যয় এসে সেই ঢপের 'জাতীয়' বাস্তবতার মুখোশ খুলে দিয়েছে। যাঁরা এই ঝড়কে 'জাতীয় বিপর্যয়' বলে ঘোষণা করতে হবে, কেন্দ্রকে পয়সা দিতে হবে বলে দাবী করছেন, তাঁদের সততা এবং আবেগ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁরা এটা ভুলে যাচ্ছেন, যে, বহুকাল ধরেই 'জাতীয়' মানে হিন্দুস্তানি। এবং এই বিপর্যয় 'হিন্দুস্তানি বিপর্যয়' নয়। এটা বাঙালির জাতীয় বিপর্যয়। হিন্দুস্তানিরা সেটা ঘোষণা করার কেউ নয়ও। বাঙালির জাতীয় বিপর্যয় বাঙালি ঘোষণা করুক। এবং কেন্দ্রের থেকে টাকা চাওয়া মানে সাহায্য চাওয়া নয়। ওটা হকের টাকা। বাঙালির নিজের পকেটের টাকা। শুধু আজ নয়, নিয়মিত ভাবে সেটা চাই।
সোজা কথায় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করুন। জাতি এবং রাষ্ট্রকে আলাদা করুন। নইলে এন-আর-সি থেকে শুরু করে আমপান হয়ে আরও বহুকিছু আসতেই থাকবে। এবং আমরা হাত জোড় করে কেঁদে ককিয়েই মরব। আর হ্যাঁ, আমাদের সাংসদরা দিল্লির লোকসভায় গিয়ে দয়া করে বাংলায় ভাষণ দিন, যেমন হিন্দুস্তানিরা দেয় নিজের ভাষায়। আমাদের রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র বাংলায়, দিল্লিতে নয়, সকলেরই এটা বুঝে নেবার সময় হয়েছে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন