প্রকৃতির আপন নিয়মে বৈশাখ শেষে জ্যৈষ্ঠ এসে গেছে, এই নিয়মে বর্ষা’ও আসবে অচিরেই। আষাঢ়ের কালো মেঘ বয়ে আনে
ফসলের ঠিকানা লেখা চিঠি, শ্রাবনে
অবিরামধারা মাটির রন্ধ্রে প্রেথিত করে দেয় আগামীর রসদ, যে রসদে বলীয়ান হয়ে ফুলে ফলে শস্য শ্যমলা হয়ে উঠে
সভ্যতা। চাষীর ঘরে খুশির বান ডাকে, কচি ধানের সুগন্ধমাখা ঘ্রাণে
আগামীর নবান্নের প্রতীক্ষায় আঙিনাতে সান্ধ্য আলপনার সাথে মঙ্গলশঙ্খের সুরে মেশে আজানের ধ্বনি, ডুরেকাটা শাড়িতে চাষীর বৌ’এর হেঁশেল থেকে আসে পায়েসের সুঘ্রাণ- উৎসবের
দিনের প্রতীক্ষাতে দিন গোনা শুরু হয়।
কিন্তু হায়, গোটা সভ্যতাই আজ
এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবানুর আক্রমণে অবরুদ্ধ বা গৃহবন্দী। কর্ম নেই, তাই রোজগারও নেই, দিনে দিনে কমেই চলছে ক্রয়ক্ষমতা। গোটা বিশ্বের পাশাপাশি আমাদের দেশও
লকডাউনের ফাঁসে দমবন্ধ প্রায়, রাস্তার ধারের
লাইন হোটেল বন্ধ, ট্রাকচালকেরা
খাবার পাচ্ছেনা- স্বভাবতই পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্বক রকমের ক্ষতিগ্রস্থ। চাষীর ফসল
হয় মাঠেই শুকাচ্ছে বা পচছে, কিম্বা জলের দরে
বেচে দিতে বাধ্য হচ্ছে ‘যা পাওয়া যায়’ তার আশায়। সরকারের তরফে কোনো বিকল্প পরিকল্পনা নেই কীভাবে চাষি ও তার ফসলকে
বাঁচানো যায়।
হাজার আলাপ-আলোচনার মাঝে যাদের বিষয়টা এখনও সেভাবে উঠে আসেনি- তারা হল
কৃষক। বৃহৎ পুঁজির সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রপিতারা রয়েছে, ক্ষুদ্র পুঁজির সংগঠন রয়েছে, সরকারী চাকুরীজীবীর বেতনের সুরক্ষা রয়েছে, শ্রমিকেরা ভোটব্যাঙ্ক- তাদের কষ্ট দৃশ্যত অবর্ননীয় তবুও
তাদের শ্রমের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রয়েছে। এনাদের কথা সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু যাদের ছাড়া সভ্যতার রথের চাকা ‘খিদের মহা
সমুদ্রে’ ডুবে মরবে- তারাই আজ চরম উপেক্ষিত। ক্রমাগত অন্তর্মূখী রক্তক্ষরণে গোটা
কৃষি সিস্টেমটা ক্রমশ অতলে তলিয়ে যাবার প্রতীক্ষাতে।
অর্থশাস্ত্র বলে- দ্রব্যমুল্য ‘বাড়লে চাহিদা কমে, আর কমলে চাহিদা বাড়ে’। কিন্তু শহরে আর গ্রামে ফসল-আনাজের
উৎপাদন আর চাহিদার সাথে অসামঞ্জস্য দ্রব্যমূল্যের অসাম্যটা বর্তমানে গর্হিত
অপরাধের পর্যায়ে নিয়ে চলে গেছে অদক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা। একটা লকডাউন মুর্খদের
দ্বারা পরিচালিত স্থানীয় রাজনীতির কুম্ভিপাকে জর্জরিত কঙ্কালসার আমলাতন্ত্রটাকে
ন্যাংটা করে দিয়েছে। একদিকে মুল্যবৃদ্ধির চোটে শহুরে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস, অন্যদিকে ফসলের জলের দড়ের জন্য নতুন করে চাষে অনিহা- এক
অদ্ভুত চরমাবস্থার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এই হারে উৎপাদন কমলে, অচিরেই
খাদ্যপণ্যের দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে দেশের অধিকাংশ মানুষের। এমনিতেই গাঁয়ে
গাঁয়ে শ্রমিকেরা ফিরে এসেছে, তাদের পাঠানো
অর্থের যোগান বন্ধ, বন্ধ্যা গেয়ে
গেছে গ্রামীণ অর্থনীতি। চাষীর রোজগারে ভাটা পরা মানে দেশে বেকারত্বের হার যে
চূড়ান্ত আকার ধারন করবে তা বলাই বাহুল্য। দ্রুত পরিস্থিতির সংশোধন না হলে, এক ভয়ঙ্কর অরাজক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা, যেখানে একটা রুটির জন্য খুন জখম অতি সাধারণ ঘটনা হয়ে
যাবে,
বিংশ শতকের শুরুর দিকের মত আবার না ভাতের
ফ্যান চেয়ে একদল ‘মানুষ’কে পাড়ায় পাড়ায় বের হতে দেখি!
আজকের দিনে প্রতিটি ছোটবড় শহরে, মফঃস্বলে সব্জির দাম আকাশছোঁয়া, যারা আমরা শহরের বাসিন্দা তারা সকলেই ভুক্তভোগী। ঠাকুর্দার অন্ত্যেষ্টিতে
গ্রামে গিয়ে চোখে দেখে ও চাষীর নিজ মুখে তাদের দুরবস্থার কথা শোনার পর থেকে আমি
আতঙ্কের মাঝে রয়েছি। অধিকাংশ গ্রামেই সব্জির কোনও দাম নেই, ৫-১০ টাকা কেজি বিকোচ্ছে অধিকাংশ আনাজ। গায়ে-গতরে শ্রমের
মূল্য তো অনেক দূর, চাষের
সার-নাঙলের খরচা টুকুও উঠছেনা, ঋণের বোঝা বেড়ে
চলেছে। চাহিদা ও যোগানের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।
অর্থনৈতিক অবরোধের কারনে এমনিতেই মানুষ নুন্যতম কেনাকাটা করছে, তার উপরে পরিবহণ সমস্যা- ফসলের দামটা পাবে কোত্থেকে? অথচ সরকার চাইলেই ফসলের পরিবহণে একটা এ্যাকশন প্ল্যান
নিতে পারত, তাতে কৃষকের পাশাপাশি মধ্যবিত্তও
অর্থনৈতিক লাভ পেত। এখনই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথোচিত পরিকল্পনা মাফিক
পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ধনীকেও একবেলা খেয়ে বাঁচতে হবে, কারন কয়েন বা কাগজের নোট চিবিয়ে খেলে পেট ভরেনা।
আসলে কৃষিতে কোন সরাসরি কর ব্যবস্থা নেই মদের মত, তাই মদ নিয়ে সরকার যতটা আগ্রহী, কৃষি নিয়ে তার ছিটেফোঁটাও নেই। কয়েকটি হাতে গোনা শস্যে
সরকারী নুন্যতম সহায়ক মূল্যের সুবিধা থাকলেও সেখানেও ক্ষমতার পোষা দালালদের, অসীম লোভমাখা সর্বগ্রাসী হিংস্র লোলুপতার কাছে
আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হচ্ছে দুর্বল কৃষক। তাই এবারের আসন্ন আষাঢ় চাষীর জন্য কোনো
সুখের বার্তা নিয়ে আসছেনা, নিয়ে আসছে এক
আকাশ স্যাঁতস্যাঁতে গাঢ় অন্ধকার।
পর্যাপ্ত উৎপাদন নিশ্চিত করতেই হবে রাষ্ট্রকে, কেননা বাজার অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিটা জীবন।
বিশ্বায়নের ফলে আজ ৭০০ কোটি জনসংখ্যাই আমরা পড়শী, একজনের ঘরে আগুন জ্বললে সে আগুন রাষ্ট্র হতে সময় লাগবেনা। প্রতিটা নিত্য
প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য জরুরি, তাই শিল্পে জোর
থাকুক,
কিন্তু আমাদের শিকড় সেই মাটিতে- যেখানে চাষীর
বাস। মাটি না পেলে শিকড় শুকাতে সময় লাগবেনা; গ্রাম, গ্রাম্য সভ্যতা, কৃষিপ্রধান জীবিকা না বাঁচলে শহরের অট্টালিকায় শ্মশানের
নীরবতা বিরাজ করতে সময় লাগবেনা। “কৃষি আমাদের ভিত্তি” এটা কোনো রাজনৈতিক শ্লোগান
নয়,
এটা আমাদের অস্তিত্ব- এই বুঝটা আসা জরুরী
প্রশাসনের শীর্ষমহলে।
ধান কাটা হয়ে খামারে গুটিয়েছে, এবারে বর্ষার চাষ শুরু হবে। মুসুরি, ছোলা বা মুগডাল চাষ, সূর্যমুখী, সরষে, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, টম্যাটো, শশা সব চাষই শুয়ে পরেছে। পাটের কি
হবে কেউ জানেনা, তিল ও ভুষিমালের অবস্থাও তথৈবচ।
মাচার সব্জি অর্থাৎ ঝিঙে, চিচিঙ্গে, বরবটি, করলা, লাউ, কুমড়ো, মাচাতেই ঝুলছে। এই রোহিণী জাতীয় উদ্ভিদ গুলোই মুলত
আমাদের দৈনন্দিন সব্জির চাহিদা মেটায়। বীজ তো নিচের মাটিতেই রোপিত হয়, বড় হতে শুরু করলে- লাঠি বা বাঁশের টুকরোর অবলম্বনে
কচি-নরম শাখা প্রশাখা গুলোকে মাচায় উঠিয়ে দেয় চাষী; পরম মমত্ব আর অসীম ধৈর্য দিয়ে আগলিয়ে লালন করার জন্য দেওয়া হয় রৌদ্রের
খোরাক,
ওষুধের পরিচর্যা, আর তৃণভোজী প্রাণীদের বিনষ্ট থেকে সুরক্ষা। এর পরে তবে
না ফুলে ফলে ভরে উঠে মাঠকে মাঠ। অবলম্বন বিনা দুর্বল কেউ কীভাবে দাঁড়াতে পারে!
চাষী নামের দুর্বল প্রাণীগুলোকে ফুলে ফলে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার নামের
পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা মোটেই একজন দায়িত্বশীল চাষীর মত নয়, বরং তা ন্যাক্করজনক ও ক্রোধের উন্মেষ ঘটায়।
প্রানিসম্পদ ও মৎস চাষীদেরও অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। দারিদ্রতার গাঢ় কুয়াশার
মাঝে স্বর্বস্বহারা হওয়া এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা, কারনে তাদের সঞ্চয় বলে কিছু হয়না- দিনআনি দিনখাই পরিস্থিতিতে শরীরটা ছাড়া
বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষাটাই তাদের একমাত্র সম্বল। আসলে তৃতীয় বিশ্বের
রাষ্ট্রব্যবস্থা কখনই চায়নি দেশের কৃষক শিক্ষিত হোক; তাই প্রথাগত শিক্ষার অভাবে, মাঝখান থেকে মুনাফার সবটাই লোপাট করে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী মহাজনেরা।
আমাদের দেশে চাষী শুধুই ভোট ব্যাঙ্ক, তাই তারা হিন্দু-মুসলমানের বেশি কিছু হতে পারেনা। চাষী কখনও আইন সভায় যায়না
তাই তারা যে তিমিরে সেই তিমিরেই পরে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম, ব্যাতিক্রম বাদে। এদেশে কৃষক দুর্বল নয়, দুর্বল আমাদের সংবিধান ব্যবস্থার প্রয়োগে- যা সেই
উপনিবেশিক ধারাকে বয়ে নিয়ে চলেছে আজও।
বর্ষা সম্মুখে, চাষী
কদর্পশূন্য। শাসকে দলের নেতারা রেশনের চাল চুরি করছে, এমনটাই অভিযোগ বিরোধীদের; আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই এই পালা গানে মত্ত, কেউ ভাবছেনা- যদি পরের মরশুমে চাষই না হয়, চালটা আসবে কোত্থেকে, চুরিটাই বা কি
করবে,
আর এই অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের রাজনীতিই বা
আসবে কোত্থেকে? রাজ্য হোক বা কেন্দ্র, কঠিন নীরবতা পালন করছে সকলে; বুদ্ধিজীবীরাও মৌনব্রত পালনে ব্যস্ত। শিল্পপতিরা ব্যাস্ত
নিজেদের আখের গোছাতে, মধ্যবিত্ত
ব্যাস্ত সোশ্যাল মিডিয়াতে, টেলিভিশনের
দৈনন্দিন তরজাতে, শ্রমিকেরা
রাস্তায় হাঁটতে ব্যাস্ত।
শাসকের দল রোজই ঘটা করে প্রেস কনফারেন্স এর নামে বিশাল বিশাল প্রতিশ্রুতি
আর ‘দেখ আমি কত মহান’ সাজার প্রচেষ্টা করতে ব্যাস্ত, মূল সমস্যা যে তিমিরে সেই তিমিরেই। এদের চাষ কেবল বেঁচে আছে মিথ্যায়-ঘৃণাতে, তথ্য গোপনের নির্লজ্জতায়। আমলাদের হাতের পুতুল বানিয়ে
তাদের দিয়ে মিথ্যের বীজ বপন করছে রোজ, সমাজের জমিতে; আর এই মিথ্যাই
দাঙ্গা নামের ফল দিচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ের অন্তর।
ত্রাণ নয়, ভিক্ষা বা
অনুদানও নয়- তাদেরকে সুবিধা পৌঁছে দিন; যা তাদের ন্যায্য অধিকার। তাদের স্বার্থে না হোক, দেশের স্বার্থে, নিজের স্বার্থে। যে অবলম্বন ধরে জীবন বাঁচে, তেমন একটা লাঠি চাই, যাকে আঁকড়ে ধরে
চললে মাথা তুলতে পারে কৃষকেরা।
বিনামুল্যে উন্নত মিনিকিট বীজের যোগান, করমুক্ত রাসায়নিক-জৈব সারের সরবরাহ করন, বিনা সুদে অগ্রিম ঋণ প্রদান, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, উৎপাদিত পণ্যের সুলভে বাজারজাত করার সুবিধা, সহায়ক মুল্য পাইয়ে দেবার নামে চাষীর থেকে ফসলের তোলা আদায় বন্ধ করা, রাষ্ট্রীয় জুলুম অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি সহ-
মধ্যসত্ত্বভোগী লুঠেরা মহাজনেদের দমন করে চাষীর ঘরে যদি না সুফল পৌঁছে দেওয়া যায়-
আগামীতে সবচেয়ে বিপদে পড়বে মধ্যবিত্ত।
ধনী কিনে খাবে, চাষী নিজেরটা
উৎপাদন করে নেবে যেভাবে হোক। যাদের না আছে বেশি দামে কিনে খাবার পয়সা না আছে ঘাম ঝড়ানোর দম- সেই মধ্যবিত্তের পেটে লাথি পরবেই। ভাবনাটা বর্তমানের নয়, বরং ভবিষ্যতের। অতীত সাক্ষী, যারা শিক্ষা নেয়না তাদের ধ্বংস অনিবার্য।