ভূগোল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভূগোল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৫

সংখ্যাঘুঘু

 


মাননীয়া বামনেত্রী দীপ্সিতা ধরের গতকালের একটা ফেসবুক পোষ্টের প্রেক্ষিতে এই লেখা


শেষ ২৫ বছরে ওপার বাংলা থেকে যারা এসেছেন- তাদের কতজন রাজনৈতিক অত্যাচারের শিকার আর কতজন ধর্মীয় অত্যাচারের শিকার হয়ে এসেছে? এর কোনো প্রামান্য তথ্য রয়েছে আপনার কাছে? থাকলে সরাসরি লিখুক অমুক 'জামাতি' কিম্বা তমুক 'ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিস্ট' দলের অত্যাচারের কারনে অমুক অমুক ব্যাক্তি বা অমুক অমুক পরিবার বাংলাদেশ থেকে আপনার দাবী মত 'বাধ্য হয়ে' পালিয়ে এসেছে। কোন স্যাম্পেল সার্ভের ভিত্তিতে আপনি ৩৪৭৮৮৬৩৫৮৯৫৩ বার লিখে ফেললেন, তার কোনো তথ্য উপাত্ত রয়েছে আপনার কাছে? এখানেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের তথাকথিত অত্যাচারিত সংখ্যালঘু জনগণের ভিটে ত্যাগের ইতিহাসের পাশাপাশি ধান্দাবাজ সংখ্যাঘুঘুদের ‘বাধ্য হয়ে’ কাঁটা তার টপকাবার গল্প


আমি জানিনা আপনার পরিবার, তথা আপনার পিতৃকুল বা মাতৃকুলের কেউ ‘বাঙাল’ কিনা, তাই হলে তাঁরা কবে এদেশে এসেছিলেন আর ঠিক কার অত্যাচারে কি কি খুইয়ে এসেছিলেন! এদেশে আসার আগে সেখানকার আইন আদালতের কোথায় কোথায় গিয়ে নিজের ভিটেতে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, অবশেষে ‘বাধ্য হয়েছিলেন’- আশা করি ১ বার এই তথ্যগুলোও দেবেন পাবলিক ডোমেইনে। ৩৪৭৮৮৬৩৫৮৯৫৩ বার লাগবেনা, ১ বার দিলেই জাস্টিফাই করে নেওয়া যাবে আপনি সংখ্যালঘু ছিলেন না সংখ্যাঘুঘু


SIR শুরু হয়েছে, কেউ বলছে মুসলমান তাড়াবে, কেউ হিন্দু বিতাড়নের স্বপ্নে বিভোর। আরে বাবা ২০০২ ‘কাটঅফ’ মার্কের পর যারা অন্য দেশ থেকে এসেছে তারা কেউ হিন্দু নয়, বৌদ্ধ নয়, মুসলমান নয়, এদের পরিচয় একমাত্র অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। নিশীথ প্রামাণিক, বিজেপির হয়ে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, তাকে কোন মোল্লা দেশ থেকে তাড়িয়ে ছিল? সে তো পড়তে এসে এদেশে ঘাঁটি গেড়েছিলো, এরপর রাজনীতির কল্যাণে মন্ত্রীও হয়েছে। সে কোন CAA তে অ্যাপ্লিকেশন করে দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছিল?


আমার এলাকাতে, মানে পুর্ব বর্ধমান জেলার, কালনা মহকুমার নবদ্বীপ সংলগ্ন সমুদ্রগড়ে বর্তমান জনসংখ্যার ৯০% এর বেশী ওপার বাংলার মানুষ, যা ৯০ এর দশকের শুরুতে মোট স্থানীয় জনসংখ্যার ৩০% বা তারও কম ছিলো। শেষ পঁচিশ বছরে এরা রাষ্ট্র ভারতের বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ সুবিধা ও সুরক্ষা নিতেই এসেছে মূলত। ফ্রি রেশন, ফ্রি শিক্ষা, ফ্রি স্বাস্থ্য পরিষেবা, সস্তার পরিবহণ, অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মের নানান সুযোগ, এত বড় রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম সুযোগ সুবিধা, তুলনামূলক সস্তা জীবনযাত্রার সাথে একটা OBC বা SC সার্টিফিকেট যোগার করে নিতে পারলেই সংরক্ষিত আসনে চাকরির নিশ্চয়তা- আমার এলাকাতে এমন মানুষের সংখ্যাই বেশী। তথ্য চাইলে অন্তত ১০০টা নাম ও ঠিকানা দিয়ে দেব, যারা ১৯৯৫ সাল থেকে ২০২৪ এর মধ্যে এসেছে।

অর্ধেক বাংলাদেশী মানুষ আদম ব্যাপারিদের মাধ্যমে কামলা খটতে যায় গোটা বিশ্বজুড়ে, এরাই ভারতে এসে ভারতীয় সেজে তারা পার্মানেন্ট হওয়ার সুযোগ পায় নৃতাত্বিক মিলের কারনে, যা অন্য দেশে পায়না। এই ধান্দাবাজি করতে গিয়ে আজ আমাদের এলাকার মত, কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে কেউ মতুয়া, কেউ মায়াপুরী বৈষ্ণব, কেউ হোপবোল, কেউ নমঃশূদ্র, কেউ কামতাপুরি, কেউ জমিয়ত উলামা, কেউ অনুকুলের শিষ্য হয়ে, ধান্দাবাজির প্রয়োজন মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমি আর আমার এক বন্ধু লাদাখ যাওয়ার পথে ১৭০০০ ফুট উচ্চতায় চা বিক্রেতা এক বয়স্ক মহিলাকে দেখেছি, যিনি শেষ ২০ বছরের মধ্যে এদেশে অনুপ্রবেশ করেছে, এবং নকল কাগজ বানিয়ে এই চরম প্রতিকুল অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়েছেন। গোটা দেশ জুড়ে এমন সংখ্যা কোটি কোটি রয়েছে


১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা কত ছিলো? ৪ কোটি ২০ লাখ। ১৯৭১ সালে সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের জনসংখ্যা কত ছিলো? ৭ কোটি। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জনসংখ্যা কত ছিলো, এমন ভাবে কখনও হিসাব করেছেন? ৪৭ সালে ছিলো আড়াই কোটি জনসংখ্যা, ৭১ সালে ৪ কোটি ৪২ লাখ। ২০২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ১০ কোটির সামান্য বেশী, বাংলাদেশে সাড়ে ১৭ কোটি। ৭০ এর দশক অবধি ভারতের জনসংখ্যা গ্রোথ রেট ছিলো ২.৫% এর মত, যা নব্বই এর দশকের পর কমে ১.৯% এসে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই গ্রোথ রেট আরো কম। পুর্ব পাকিস্তানের পপুলেশন গ্রোথ রেট ছিলো ২.৪% মত, বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হওয়া ইস্তক এরা ৩.৫ এর বেশীতে পৌঁছে দিয়েছে গ্রোথ রেট। এই হিসাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হওয়া উচিৎ ছিলো ২৪.৫০ কোটি, তার বদলে ১৭ কোটি হিসাব দেয় তারা। এই সাড়ে সাত কোটি মানুষ গুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে গেছে কামলা শ্রমিক হয়ে, যারা আর স্বদেশে ফেরেনি। এদের সবচেয়ে বড় অংশটা ধর্মের দোহায় দিয়ে ‘শরনার্থী’ সেজে পিলপিল করে শেষ ২৫ বছরে আমাদের দেশে ঢুকে পরেছে, পশ্চিমবাংলা, আসাম, নর্থ ইষ্ট, সিকিম, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা সহ পশ্চিমা রাজ্যের বিভিন্ন অংশে ‘বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক’ পরিচয়ে কাজও করে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর এরাই ভুয়ো পরিচয়পত্র বানিয়ে ‘সেটেল’ হয়ে যাচ্ছে যে যেখানে পারছে।


বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার কোনো লুকানো বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার করছে, এটাই সত্য, জাত পরিচয় যা খুশি হোক। তারপরেও ১ কোটি ৩০ লাখ হিন্দু সেদেশে বসবাস করেন, সে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ গুলোতে হিন্দু শিক্ষকদের আধিক্য রয়েছে আজও। দেশের জনসংখ্যার ৭.৯৫% হিন্দু হলেও সরকারি চাকরিতে তারা প্রায় ১৪% এর আশেপাশে রয়েছে। এটা বাংলাদেশের জামাত বা মৌলবাদী গোষ্ঠীকে গ্লোরিফাই করার জন্যও নয়, না বাংলাদেশে সংখ্যালঘু অত্যাচারকে লঘু করে দেখাবার প্রয়াস। এটা আমাদের দেশের সংখ্যালঘুদের সাথে তুল্যমূল্য ফারাক দেখাবার জন্য, যারা কেবল বাংলাদেশে ‘হিন্দু’ অত্যাচারের মড়াকান্না কেঁদে 'পালিয়ে আসা'কে জাস্টিফাই করে।


বিজেপির ভাষায় ‘মমতাজ বেগমের’ সরকারের রাজ্যে দুধেল গাই ২৭%, সরকারী চাকরিতে এরা মাত্র ৫.৭৩%। গোটা দেশের জনসংখ্যার নিরিখে মুসলমান ১৪%, সরকারি চাকরিতে এখানে ৫% এরও নিচে, এগুলো সবই সরকারি ডেটা। উচ্চশিক্ষিত রাজ্য কেরালা মডেল- ৩০% মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্যে ১৩.৮% মুসলমান রাজ্য সরকারী চাকরিতে। কেন্দ্রীয় সরকারী চাকরিতে মুসলিম মালায়লী মাত্র ১.৮% । গুজরাতে আবার উলটপূরাণ, তাদের জনসংখ্যার মাত্র ৯.৯% মুসলমান, সরকারী চাকরিতে ১৬% এরও বেশী মুসলমান। উত্তরপ্রদেশে ১৯.৩০% মুসলমান, ২০১২ সালে সরকারী চাকরিতে এদের উপস্থিতি ছিলো ১২%, যোগীর কৃপায় সেটা এখন ৫% এরও নিচে। উত্তরপ্রদেশ থেকে কটা সংখ্যালঘু পড়শি দেশে পালিয়ে গেছে ‘বাধ্য হয়ে’।


আসলে পালানটা চয়েস, যেটা রক্তে থাকতে হয়, সকলে পলায়ন মনোবৃত্তি রাতারাতি জন্ম দিতে পারেনা অধিকাংশ ‘বাংলাদেশী হিন্দু’ দের মত। কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক ও আনপপুলার হলেও- গাজায় গণহত্যা হয়েছে লাগাতার আড়াই বছর ধরে, নৃশংস নারকীয় সেই অত্যাচার গোটা বিশ্ব সাক্ষী। কতজন পালিয়েছে দেশ ছেড়ে? ট্রাম্প নিজে তাদের পুনর্বাসনের প্রস্তাব দিয়েছিলো, তারা ভিটে ছাড়তে চায়নি। ভিয়েতনাম? আফগানিস্তান? কিউবা? ইয়েমেন? কারা পালিয়ে গেছে? জঙ্গলমহলের কয়েক হাজার মানুষ মাওবাদী তথা তৃণমূলের হাতে মারা গেছিল। তারা তো পূর্ব বাংলার সংখ্যাঘুঘুদের মতো পালিয়ে যায়নি। পলায়ন একটা চয়েস, একমাত্র অপসন নয়।


দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষেরা পৃথিবীর অত্যাচারিত মানুষদের তালিকায় মোটামুটি সবার উপরে, কিন্তু নিজের দেশ স্বাধীন করে সেই দেশে বসবাস করতে গিয়ে কত মানুষের জীবনহানি হয়েছে তার সংখ্যা পাওয়া মুশকিল কিন্তু কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ানরা হিটলারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছিল কেউ পালিয়ে যায়নি। রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে, আমরা যে পক্ষেরই সমর্থক হই না কেন ইউক্রেনের লোকেরা কিন্তু পালিয়ে যায়নি। ১৯৬৫-৬৬ সালের ইন্দোনেশীয় গণহত্যা হয়, এরা কেউ পালিয়ে আসেনি নিজের ঘর বাড়ি ছেড়ে। তৎকালীন যুগোস্লাভিয়া ভেঙে গিয়ে ৭ টি নূতন রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে এবং দেশ গঠনের সময় প্রত্যেক ক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ করেছে, কিন্তু কোন দেশের নাগরিক পালিয়ে যায়নি। আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে পুরু পালিয়ে যায়নি। পালিয়ে যাওয়াটা চয়েস, একমাত্র বিকল্প নয়


উন্নত জীবনযাত্রার খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় মাইগ্রেশন করাটাই সভ্যতার পরিচয়। একে ঠিক বা ভুল নামের দুটো শব্দ দিয়ে এটি ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু যারা এটাকে গ্লোরিফাই করার জন্য ‘রক্ত দিয়ে কেনা মাটি’ আর কাঁটাতারের গল্প শুনিয়ে রোমান্টিক গল্প ফাঁদে, তারাই আসলে সংখ্যাঘুঘু। রক্ত দিয়ে কেনা মাটির গল্প কোন হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে এসে লাগু হয়? ওপারে যদি রক্ত দিয়ে আপনারা ভিটে মাটি রক্ষা করতে পারতেন, তাহলে সেটা না হয় গণ্য হতো, এপারে শরণার্থী হয়ে এসে কলোনির ভিক্ষার জমিতে আপনাদের বাপ দাদারা জীবন শুরু করেছিল। তারা কোন রক্তটা ঝরিয়ে ছিলো এপারে মাটিটা পাওয়ার জন্য? ১৯৮৯ সালে প্রথম বাংলাদেশ সীমান্তের ২০ শতাংশ অংশে কাঁটাতার লাগানো হয় তৎকালীন ভারত সরকার কর্তৃক, যার অধিকাংশটাই উত্তর-পূর্ব ভারত লাগোয়া। তাহলে কাঁটাতার পেরিয়ে আসার গল্পটাই বা কিভাবে আসে আপনাদের পালিয়ে আসার রোমান্টিক গল্পে? ৯০ এর দশকে উন্নত জীবনযাত্রার খোঁজে আপনাদের পূর্বপুরুষ এদেশে এসেছিলি সংখ্যাঘুঘু হয়ে, শরণার্থীর গল্প ফেঁদে। এটাকে লুকাতে বাকি গল্পগুলো ফাঁদা


সত্যজিৎ রায়, তপন সিনহা, ঋত্বিক ঘটক, রাজেন তরফদারের মত দিকপালের কোনো সিনেমাতেও সেই অর্থে মোল্লাদের অত্যাচার দেখিয়েছে? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসুদের লেখনি সময়ের সাথে একক। এনারা কোথায় লিখেছেন খিয়েছেন যে বাংলাদেশী মোল্লাদের চরম অত্যাচারের শিকার হয়ে তাদের চরিত্রেরা এদেশে এসেছিলেন। অথচ প্রত্যেকের নাড়ি বা শিকরের টান ছিল ওপাড় বাংলার প্রতি। আসামে বাঙালী খেদাও একটা রেজিস্টার্ড আন্দোলন। সেখানে বহু বাঙালী বিতাড়িত হয়েছিলো, এমন কোন আন্দোলন হয়েছিল বাংলাদেশে শেষ ২৫-৩০ বছরে?


সংখ্যাগঘুঘু বাঙালদের সাথে ইজরায়েলী ইহুদিদের হেব্বি মিল, ইহুদীদের সমালোচনা করলেই অ্যান্টি-সেমিটিক বলে দাগিয়ে দেয়। একই ভাবে সংখ্যাঘুঘুদের সমালোচনা করলেই এ্যান্টি উদবাস্তু, এ্যান্টি বাঙাল, এমনকি এ্যান্টি হিন্দু বলেও দাগিয়ে দেয়। সমালোচনা হলেই যে ধুতি খুলে যায়


শেষ ৫ বছরে শুধু গরু সংক্রান্ত বিষয়ে, RSS কতৃক মুসলমান অত্যাচারের ঘটনাতে নানান রাজ্যে FIR ও মামলা রেজিস্টার হয়েছে ৫৩০০ এর বেশী গোটা দেশজুড়ে। বাংলাদেশে এমন কতগুলো হয়েছে শতাংশের বিচারে? ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল অব্দি হাসিনা ওয়াজেদের সরকার ছিল, যারা রীতিমতো হিন্দু সমর্থক এবং হিন্দু রক্ষাকারী হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিত। এদেশের সংখ্যালঘুরা লড়াই করছে আদালতে গিয়ে, কেউ তো দেশ ছেড়ে পালায়নি। ওপাড়ের সংখ্যাঘুঘুরা লড়াই না লড়ে পালিয়ে আসছে কেন! তারা নেপালেও যেতে পারত, কিম্বা শ্রীলঙ্কাতে! যায়নি, কারন ওখানে RSS নেই, ‘বাধ্য হয়েছে’ গল্পে রাজনীতির রুটি সেঁকা যায়না, তাই তাদের সেটেল করে দেওয়ার চক্রও নেই। ১৯৭১ এর পরে বাংলাদেশের সমস্ত খুনি-ধর্ষক-ক্রিমিনাল আর রাজাকারেরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে এই দেশে আসতে শুরু করে। বাংলাদেশের হিন্দু অত্যাচারের কাহিনীর আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে এই দেশে বসবাস করতে শুরু করে। যেকোনো ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটিতে বাংলাদেশী বলতে মুসলিমদের এককভাবে এরাই কাঠগড়াতে তুলতো, যদিও এই সকল ঘটনার পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ‘পালিয়ে আসা’ ক্রিমিনাল হিন্দুটার নিজের অত্যাচারের কু-কর্মও ছিলো, যেটাকে ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে


শেষ ২০-২৫ বছরে যারা এদেশে এসেছে, সেটা তামিল হোক, নেপালি, ভুটিয়া বা বাংলাদেশী, এদের অধিকাংশই রুটিরুজির ধান্দাবাজি আর ভারতীয় রাষ্ট্রীয় নাগরিক সুযোগ সুবিধার লোভে এসেছে। ১৯৯০ সালের পর ঠিক কত শতাংশ ‘বাংলাদেশী হিন্দু’ বাধ্য হয়ে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে? কোনো স্বীকৃত তথ্য নেই, না সরকারী না বেসরকারী, কারো কাছেই নেই। নেই, কারন এই বিষয়ে সার্ভে করলেই উলঙ্গ হয়ে যাবে, প্রতিটা রাজনৈতিক দলের মাথাতেই ওপাড় বাংলার বাঙালদের একটা বড় অংশ বসে আছে, সেটা তোলামুল, কংগ্রেস, রাম, বাম, ঘাম প্রত্যেকটি দলের এক অবস্থা। তাঁরা তথা তাদের পরিবার ঠিক কোন দিন, কোন অত্যাচারের শিকারে এদেশে পালিয়ে এসেছিলো, তাঁরা নিজেরা ছাড়া কেউ জানেনা। তাই এমন কোনো সার্ভে কখনও হয়নি, হবেওনা। শুধু ‘আমাগো একখান দ্যাশ আসিলো’ হ্যাজ নামিয়ে আবেগের বর্জ্য ছড়িয়ে নিজেদের পালিয়ে আসাকে গ্লোরিফাই আর জাস্টফাই করে দেওয়ার মরিয়া প্রয়াস চালায়


বর্তমান SIR অনুযায়ী যারা ২০০২ সাল অবধি এদেশে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ভোটারলিষ্টে নাম তুলিতে পেরেছিলো, তারা তো ভারতীয় নাগরিকই, এটাই তো পরিষ্কার কাট অফ মার্ক। এর পর যারা এসেছে তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। হিসাব সিম্পল, স্বভাবতই এ রাজ্যের ৯৯% মুসলমান দুশ্চিন্তামুক্ত। কিন্তু এটাকেই গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে যেকোনো মূল্যে অবৈধভাবে আসা সংখ্যাঘুঘু গুলোকে বৈধতার মান্যতা দেওয়া যায়। এখানেই শরনার্থী আর অনুপ্রবেশকারীর গনিত গুলিয়ে দিচ্ছে ধর্মের পাঁক দিয়ে। কেন তারা শরণার্থী- এর কোনো সন্তোষজনক জবাব নেই অধিকাংশ সংখ্যাঘুঘুর কাছে- ‘হিন্দু’ জাত পরিচয় বাদে কোনো যুক্তি নেই।


বামদলগুলো বা এরাজ্যের সিপিএম যত বেশি SIR/NRC বলেছে, শঙ্কিত হিন্দু জনসংখ্যা তত বেশি পরিত্রতা হিসেবে বিজেপিকে আঁকড়ে ধরেছে, উল্টোদিকে অশিক্ষিত মুসলমান তত বেশি তৃণমূলকে জড়িয়ে ধরেছে। SIR নিয়ে বাহ্যিকভাবে সবচেয়ে শঙ্কিত বিজেপি কারণ ভোটার তালিকা পরিচ্ছন্ন করতে গিয়ে সবচেয়ে সমস্যার মধ্যে যে অংশটি পড়তে চলেছে সেটি মতুয়া ও নমঃশূদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের একটি বড় অংশের লোক আপাতত বিজেপি ভোটার এবং বাকিরা তৃণমূল ভোটার। নিজেদের শঙ্কা ভয়ঙ্কর ভাবে লুকিয়ে রেখেছে দল তৃণমূল, কারণ কোথায় তারা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নিজেরা ক্যালকুলেশন করতে পারছে না। চুরির ভোট শুকিয়ে গেলে কোথায় কোন ঘটি উল্টে যাবে তার হিসেব আইপ্যাক পর্যন্ত দিতে পারছে না। ফলশ্রুতিতে আগামী দিনে কাকে গাছে বাঁধা হবে আর কাকে লাইট পোষ্টে- তৃণমূল কোনো কিছুর হিসাব করতে পারছে না


SIR জুজুতে বিজেপি কোনভাবেই মুসলমানকে ভয় দেখাতে পারেনি উল্টে তাদের মতুয়া ভোট ভেঙে চুরমার। নমঃশূদ্র ভোটের অধিকাংশই তৃণমূলের দখলে ছিলো কিন্তু পশ্চিম বর্ধমান, দুই চব্বিশ পরগণা, নদীয়ার যা চালচিত্র উঠে এসেছে তাতে তৃণমূলের নমঃশূদ্র ভোট, মতুয়াদের থেকেও বেশি বিপদে পড়ে গেছে, কারণ মতুয়াদের নিয়ে তবুও তো চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছে; নমঃশুদ্র দের জন্য আলাদাভাবে বলার মত কেউ নেই। তৃণমূল চারপাশে শুধুমাত্র লাশ খুঁজে বেড়াচ্ছে, মুসলমানের বিজেপি ভয় কেটে গেলে আর নিজেদের নমঃশূদ্র ভোট হাতছাড়া হয়ে গেলে- ভাইপো সমেত গোটা দলের অধিকাংশ নেতা যে জেলে বসে চাক্কি পিসিং পিসিং, সেটা না বোঝার মত বোকা ওরা নয়। কিন্তু উভয় দলের ভয় স্পঞ্জের মতো শুষে নেওয়ার জন্য মাঠে নেমে পড়েছে একা কুম্ভ সিপিআইএম। গতকাল আনন্দ টিভিতে সুজন বাবুও, প্রদীপ করের মৃত্যুকে NRC এর সাথে জুড়ে দিয়েছেন। বাকীটা নিজেরা চেয়ে দেখুন, জবাব পেয়ে যাবেন। এর বেশী বললে ভক্ত বাম্বাচ্চার দল কামড়ে দিতে আসবে। এমন ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ টাইপের NGO ভলেন্টিয়ার সার্ভিস মার্কা বিরোধী সিপিএম থাকলে, চোর তৃনমূল আগামী ১০০ বছর ক্ষমতায় থাকবে, এটা আপনি পাথরের দেওয়ালে খোদাই করে নিন


যাই হোক, মাননীয় নেত্রী সমীপেষু, আপনিই পেহেলগাম জঙ্গি হামলার সময় 'ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ' শব্দ লিখেছিলেন, যেটা RSS থেকে অমিত শাহ, মোদী এমনকি আপনার দল অবধিও বলেনি, আপনি বলেছিলেন। আজও আপনি 'বাধ্য হয়েছে' নামে একটা তত্ত্ব এনেছেন, কটা স্থানে রিসার্চ করে এনেছেন এই তথ্য? বাংলাদেশী অধুষ্যিত কটা স্যাম্পেল গ্রামে গঞ্জে কতগুলো দিন/রাত কাটিয়েছেন সত্য উদঘাটনে? কতজন স্যাম্পেল ব্যাক্তি ও পরিবারের তথ্য রয়েছে এমন 'বাধ্য হয়েছে' দের? নাকি একটু ধর্মগন্ধী ফ্লেভার ছড়িয়ে দিয়ে বঙ্গ রাজনীতিতে 'বুদ্ধিজীবি বাম' কোটাতে নিয়মিত ভেসে থাকতে চাইছেন? পাশাপাশি ‘গুড বামপন্থী’ হিসাবে গোয়ালঘরের অভিষ্ট স্থানে বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। আপনার এই প্রবনতা নতুন কিছু নয়, ধর্ম আর জিরাফে থাকার এটা চমৎকার ‘ধান্দাবাজি’ অনেক পুরাতন খেলা, অতীতে অনেকেই খেলে সফল হয়েছেন। আপনাদের মূল সমস্যা হলো, নিজেদের বিশাল শিক্ষিত আর জ্ঞানী ভাবেন। আপনার ভাষাতে 'এর সাথে সিপিএমের শূন্য হওয়ার সম্পর্ক নেই' নয়, এটাই শূন্য হওয়ার মূল কারন


SIR কে সামনে রেখে যে বা যারা ‘পালিয়ে যাওয়া’ কে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে, তারা আসলে সুপ্ত RSS
লিবোরাল, ধর্মনিরেপেক্ষ এবং মুসলমান বিদ্বেষ RSS এর জিনে আছে; এই সুপ্ত বিদ্বেষ এতদিন যারা মনেপ্রাণে লালিত পালিত করছিল, আজকে SIR কে সামনে রেখে বমি করে ফেলেছে। এদের মনের বড় বড় পদ্ম দ্রুত বিকশিত হোক। যাদের সাদাকালো চেনার ক্ষমতা নেই, যাদের দিন রাতের পার্থক্য করার ক্ষমতা নেই যাদের ভালো-মন্দ বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা নেই, তারা পৃথিবীর যে দেশেই যে শিবিরেই থাকুক না কেন আদপে তারা সবাই ভক্ত


পৃথিবীতে কোথাও বামপন্থীদের পালিয়ে আসার ইতিহাস নেই। পালিয়ে আসার ইতিহাস একমাত্র RSS এর আছে। মুচলেকা দেওয়ার ইতিহাস একমাত্র RSS এর আছে। এই কারনেই সংখ্যাঘুঘু গুলো সব বিজেপির ভোটার। পাশের রাজ্য বিহারে ভোট চলছে। যেখানে ভূমি আন্দোলন এর বিরোধিতা এবং উচ্চবর্ণের লোকেদের দ্বারা গণহত্যা সমার্থক শব্দ। রণবীর সেনা এবং অন্যান্য মৌলবাদী মিলিশিয়া গোষ্ঠী গুলি নিম্নবর্গীয়দের উপর অসংখ্য গণহত্যা চালিয়েছে। যেমন, বেনিগ্রাম গণহত্যা, লক্ষ্মীপুর গণহত্যা, এবং রাউলি গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। এই ঘটনাগুলোতে শত শত নিরপরাধ দলিতকে হত্যা করা হয়েছিল। বিহারে মাটি কামড়ে আজকেও বামপন্থীরা একজোট হয়ে এ নির্বাচনে লড়াই করছে। তাই পালিয়ে আসতে ‘বাধ্য হয়েছে’ বলে পালিয়ে আসাকে জাষ্টিফাই করাটা আপনারা- পলায়নকারী হিসেবে কার উত্তরসূরী?


চালাক বা বুদ্ধিমান হওয়া খুব ভালো, কিন্তু সেয়ানা সাজা আসলে একধরণের ভন্ডামি ও মূর্খতার পরিচয়। কাদের উদ্দেশ্য সাধন করতে আপনি এমন উদ্দেশ্যমূলক পোষ্ট করেন তা আজকে সবটা পরিষ্কার না হলেও, বালিশকুমারের মত অবশ্যই ধরা খেয়ে যাবেন। এই মুহুর্তে আপনাকে জবাব দিতে হবেনা, জনগণ আপনাদের গুন্তিতে ধরেনা, আলিমুদ্দিনে আপনি প্রিভিলেজড- জবাবদিহির বালাই সেখানেও নেই। এছাড়া বামেদের যে ‘অন্ধভক্ত শ্রেনী’ আকাট মূর্খর দল রয়েছে, তারাই আপনাকে ডিফেন্ড করবে জান লড়িয়ে দিয়ে, আপনার এই মুহুর্তে ভয়ের কিছু নেই। সেই দিনটার প্রতীক্ষাই রইলাম, যেদিন আপনিও ‘বাধ্য হবেন’ রাজনৈতিক মাইগ্রেশন করতে। ফেসবুকের পোষ্টে গল্পটা আমিই শেয়ার করব বেঁচে থাকলে।


আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, কেন আমি টার্গেট হলাম! আপনি নিজেকে 'বাম' নেত্রী বলেই তাই এই হ্যাজ নামানো, নতুবা শুভেন্দু অধিকারী বা দিলীপ ঘোষেরা নিয়মিত তাদের ভাষণে বলে- বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। সুযোগ বুঝে তাদের ভাষা গুলো নিয়মিত আপনার মুখেও উঠে আসে, তাই আজকের পোষ্টটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এতদিন মনের মধ্যে যেটা গজ গজ করছিল, অনুকুল পরিস্থিতি পেতেই উগড়ে দিয়েছেন। পাঁহেলগাঁও ঘটনায় আপনার ‘ভাবনার’ ঝলক ইতিমধ্যেই দেশবাসি দেখে ফেলেছে। আপনারা আগামীর বাম রাজনীতিতে টিকে থাকলে, RSS এর তৃণমূল বা বিজেপিকে আলাদা করে আর দরকার লাগবে কেন! আপনার ৩৪৭৮৮৬৩৫৮৯৫৩ বার লিখে ফেলা কারনের সাথে আরো ৬০ গুন যোগ হয়ে যাবে আগামীতে, সাভারকর ওটাই পেনশন পেতেন যে। ঠিকাচে!

মনের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট জাতের প্রতি বিতৃষ্ণা রেখে রঞ্জন গগৈ হওয়া যায়, চন্দ্রচূড় হওয়া যায, তসলিমা নাসরিন হওয়া যায, সুব্রামনিয়াম স্বামী বা প্রবীণ তোবাড়িয়া অথবা তথাগত রায় হওয়া যায়। জয় গোস্বামী, শুভাপ্রসন্ন, কবীর সুমন বা অপর্ণা সেনও হওয়া যায়, এমনকি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা তিলোত্তমা মজুমদার, এমনকি গৌতম গম্ভীর পর্যন্ত হওয়া যায়; কিন্তু বামপন্থী হওয়া যায় কি? যদি না একটা মুখোশ পরে থাকে!


আপনার মনের পদ্মফুল বিকশিত হোক


রবিবার, ২১ জুন, ২০২০

গালওয়াল কি ও কেন?



লাদাখের যে অঞ্চলে বর্তমানে ভারত চীন দ্বন্দ্ব চলছে সেই অঞ্চলটির নাম আমরা সকলেই জেনে গেছি, ‘গালওয়ান উপত্যকা’; কিন্তু এটা কি জানি- কেন এই অঞ্চলের নাম গালওয়ান?
এটি বিরল উদাহরণগুলির মধ্যে একটি, যেখানে একটি বিশিষ্ট ভৌগলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পন্ন অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছিল তথাকথিত ‘নেটিভ’ এক্সপ্লোরারের নামে।
সমুদ্র পৃষ্ঠের ৫০০০ থেকে ৭০০০ মিটার উচ্চতার হিমালয়ে, যেখানে স্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ৩০ ডিগ্রী, এমন সব অগম্য দুর্গম স্থানে, পাহাড়ি চিতার মতো অনায়াস পথ খুঁজে সভ্যতার সামনে নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করে গেছেন সারাজীবন ধরে যে মানুষটি, তার নাম- গোলাম রসূল গালওয়ান।
‘লেহ’ থেকে লাদাখের পথ অন্বেষণকারী প্রথম ব্যক্তির নাম ‘গোলাম রসূল গালওয়ান’। আয়ারল্যাণ্ডের অভিজাত কাউন্টি ডানমোরের সপ্তম আর্ল ‘ডুনমোর মুর’ সাহেব এলেন হিমালয় অভিযানে, সেটা তখন ১৮৯২ সাল; এই আইরিস-ব্রিটিশ অভিযাত্রী দলটি ‘চ্যাং চেনমো’ উপত্যকার উত্তর দিকের অঞ্চল অন্বেষণ করছিল। একদিকে রাশিয়ান অভিযাত্রীদের সাথে তিব্বত দখলের লড়াই- অন্যদিকে ব্রিটিশদের আগের প্রতিবারের ব্যর্থ অভিযানের ইতিহাস বেয়ে, একসময়ে মুর সাহেবরাও ভ্রমবশত পূর্ব দিকে এক অজানা নদী উপত্যকায় এসে পড়েছিল, যেখান থেকে সামনে দুর্ভেদ্য খাড়াই হিমালয়ের প্রাচীর ছাড়া আর কিছুই ছিলনা।
দুর্গম অঞ্চলে পথ হারিয়ে যখন প্রায় মৃত্যুমুখে অবতীর্ণ হতে বসেছে অভিযাত্রী দলটি, ঠিক তখনই একটি ১৪ বছরের বালক কুলি, গোটা দলটাকে একটা এমন পথে দিয়ে বের করে নিয়ে আসে, যা ওই অভিযানের সবচেয়ে সহজলভ্য পথ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করে দেয়।
কোনও ধরনের পুর্ব অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া, আশ্চর্য অনুমান ক্ষমতা, সাহস, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা, আর কঠিন পরিস্থিতিতে স্নায়ুর উপরে পূর্ন নিয়ন্ত্রণ রেখে, সাথে হিমালয়কে অনুসন্ধানের এক অবিশ্বাস্য নেশার দৌলতে সে যাত্রায় গোটা অভিযাত্রি দলটা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়। আজও ওই অঞ্চলে যাতায়াতের জন্য এই পথের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সহজ কোনো উত্তরণের পথ পাওয়া যায়নি।
জীবন বাঁচানোর কৃতিত্বে মুগ্ধ হয়ে যান আর্ল ‘ডুনমোর মারে’, কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সেই বালকের কাছে জানতে চান- ‘তোমার কী পুরস্কার চাই বলো’! তখন বালক গোলাম রসূল বলেন- ‘যে পাহাড়ী নদীটি আছে এটি আমার উপজাতির নামে রাখা হোক ‘গালওয়ান নাল্লা’। নূন্যতম কালক্ষেপ না করে অভিযাত্রী দলটি তৎকালীন ব্রিটিশ বাহাদুরকে যে নথি পাঠায় সেখানে প্রায়োরিটি হিসাবে নদীর নাম ‘গোলাম রসূল গালওয়ান’ এই পুরো নামটাই উল্লেখ করে পাঠান।
সেইমতো পরবর্তী ব্রিটিশ মানচিত্র প্রকাশিত হলে দেখা যায়, ওই অঞ্চলের ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ যে নদী, সরকারি ভাবে তার নাম রাখা হয়েছে ‘গালওয়ান নদী’; যা লাদাখের পূর্ব অংশে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পাড় বরাবর যে পথ, সেই নতুন পথেরও নাম রাখা হয়েছিল গালওয়ান পাস। শুধু তাইই নয়, অঞ্চলটির নামও গালওয়ান উপত্যকা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল মানচিত্রে। গালওয়ান নদীটি বর্তমান ‘আকসাই চিন’ অঞ্চলের একটি ছোট অনাম্নী হ্রদ থেকে উদ্ভূত হয়ে চীনের সীমান্ত বরাবর পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ভারতের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে ‘শায়ক’ নদীর সাথে মিলিত হয়েছে, এই শায়ক নদী সিন্ধু নদীর একটি গুরুত্বপুর্ণ শাখা।
‘ফোরসাকিং প্যারাডাইজঃ স্টোরিস অফ লাদাখ, বই অনুসারে যে তথ্য পাওয়া যায়-
বইতির লেখক, ব্রিটিশ ‘রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির’ ১৯১৯ সালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ‘লেফটেন্যান্ট কর্ণেল স্যার ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’; যিনি তার সেনা কর্মজীবনে তিব্বত অঞ্চলের কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৮৯০ সালের শীতে তিনি কাশগরে শীত কাল কাটিয়ে সেখান থেকে হিমালয়ের পাদদেশ বরাবর অভিযান শুরু করেন, সহজে ‘চাইনিস তুর্কিস্তানে’ যাবার রাস্তা খোঁজার মিশনে পাঠানো হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার বাহাদুরের তরফে। বলাই বাহুল্য সেই মিশন সাফল্যের মুখ দেখেনি। এই একই রাস্তা খুঁজছিল বেশ কয়েকটি রাশিয়ান, ফরাসি, মার্কিন ও অস্ট্রেলীয় অভিযাত্রী দল; প্রসঙ্গত কেউই সফলতার মুখ দেখেনি চূড়ান্ত পর্যায়ের দুর্গম আবহাওয়ার জন্য।
ডুনমোর আর্লের পাঠানো নথিতে বিস্ময় বালকের সন্ধান পেতেই ব্রিটিশ বাহাদুর পুনরায় ‘ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’কে তিব্বত অভিযানে পাঠায় পথের সন্ধান করতে; তবে এবারে অর্ডার ছিল ‘গোলাম রসূল গালওয়ান’ কে গাইড হিসাবে নেওয়ার। ব্যাস, ১৮৯৯ সালে শুরু হওয়া অভিযান অচিরেই সফলতা অর্জন করে ও পরবর্তীতে ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’ তিব্বতের কমিশনার পদে নিযুক্ত হন।
আরও পরবর্তীতে ‘ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’ মাউন্ট এভারেস্ট কমিটির চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন, যার দরুন ১৯২১ সালের ‘ব্রিটিশ রিকনোসায়েন্স এক্সপিডিশন টু মাউন্টে এভারেস্ট’ মিশনে মুখ্য কোঅর্ডিনেটর নিযুক্ত হন; আবার সেই গোলাম রসূল গালোয়ানের দ্বারস্থ হয় গোটা অভিযাত্রি দলটি। এমন হরেক বীরত্বে ঠাসা তথ্য সযত্নে লিখিত রয়েছে রয়েছে ‘ফ্রান্সিস ইয়ংহসব্যান্ড’ রচিত ২৬টি পুস্তকে, যা ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত রাখা আছে। তাছাড়া আরো অন্তত ৫০ জন আলাদা আলাদা অভিযাত্রীর লেখা বইতে ‘গোলাম রসূল গালওয়ানের’ গৌরবান্বিত উপস্থিতি রয়েছে।
গোলাম রসূল গালওয়ান সারা জীবন ধরেই বহু দুর্গম অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্থানীয় গাইড হিসাবে। তিনি ব্রিটিশ, ইতালিয়ান এবং আমেরিকান এক্সপ্লোরারদের নেতৃত্বে হরেক অভিযানগুলিতে শুধুই গাইড হিসাবে সহায়তা করেননি, বরং একজন নিখুঁত পরিকল্পনাকারী ও তার সফল রূপায়নকার হিসাবে নির্দিষ্ট করে নিজের কর্মের ছাপ রাখতেন। তিব্বত, জিনজিয়াংয়ের ইয়ারকান্দ যা বর্তমানে চীনের উইঘুর প্রদেশের কাছে অবস্থিত, কারাকোরাম শৈলসীমা, পামির মালভূমি অঞ্চল সহ অন্যান্য মধ্য এশিয়ার দুর্গম থেকে দুর্গমতম অঞ্চল গুলোতে কেউ অভিযানের কথা ভাবলে সকলের আগে তারা গালওয়ানকে ভাবতেন।
১৮৭৮ সালে লেহ’তে জন্মগ্রহন করা গোলাম রসূল গালওয়ান মাত্র ১২ বছর বয়সের আর্থিক দুরবস্থার কারণে, ঝুঁকিপূর্ণ, পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘ-দূরত্বে অভিযান চালানো বিভিন্ন দলের সাথে গাইডের কাজে নিযুক্ত হয়ে যান। কাজের সন্ধানে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাড়ি ত্যাগ করেন, নতুন জায়গা সন্ধানের প্রতি তাঁর অসীম আগ্রহ ও আবেগ তাকে ব্রিটিশদের প্রিয় গাইড হিসাবে গড়ে তুলেছিল।
গোলাম রসূল গালওয়ান প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু ভীষণ পণ্ডিত মানুষ ছিলেন। একজন আগ্রহী শিক্ষানবিশ কিশোরের সামান্য মুটে থেকে অপ্রতিরোধ্য গাইড হিসাবে বেড়ে উঠার কথা, ফ্রান্সিস ইয়াংহাজবেন্ডের প্রতিটি লেখায় ফুটে উঠেছে। চোস্ত ইংরাজির সাথে সাথে, চীনা, রাশিয়ান, তুর্কি, তিব্বতি, ইতালীয় ও স্প্যানিশ ভাষায় তার দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। এর সাথে সাথে নেটিভ ভারতীয়দের ভাষা, যেমন লাদাখি, উর্দু, হিন্দি, কাশ্মীরি, পুস্তু, আফগানী, গাড়োয়ালী, কিন্নরী ইত্যাদি সহ প্রায় ১৮টি ভারতীয় ভাষায় অনর্গন কথা বলতে পারতেন। একজন সামান্য কুলি এবং টাট্টু ঘোড়ার সহিস হিসাবে জীবন শুরু করে, ১৯১৭ সালে লেহ’এর ব্রিটিশ যুগ্ম কমিশনারের প্রধান সহকারী পদে উত্তীর্ন হয়েছিলেন।
গোলাম রসূল গালওয়ানেরা কাশ্মীরি ‘গালওয়ান’ উপজাতির অন্তর্ভুক্ত, যার অর্থ কাশ্মীরি ভাষায় ‘ঘোড়ার রক্ষক’; আমরা বাংলায় যাকে উচ্চারণ করি ‘গাড়োয়ান’। কথিত আছে যে, গোলাম রসূল গালওয়ানের মাতামহ ‘কারা গালওয়ান’ নামের কুখ্যাত ছিল, কাশ্মীরি ভাষায় যার অর্থ ‘কালো দস্যু’। ‘কারা’ সে সময় তার উপজাতির গোষ্ঠী প্রধান ছিল, এবং তারা শুধুমাত্র ধনী জমিদারদের সম্পদ লুঠ করত, যা তার জ্ঞাতিভাইদের মাঝে বিতরণ করত। এক সময় কাশ্মীরের ডোগরা রাজার ঘরে দস্যু বৃত্তি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় ‘কারা’, ফলস্বরূপ গোটা উপজাতি দলটির উপরে নেমে আসে সাহার খাঁড়া। গালওয়ান উপজাতিকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে দিয়ে একটাকে লেহ আর অন্যটিকে বালোচিস্তানের ঊষর অঞ্চলে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। লেহ এর দুর্গম আবহাওয়া সহ্য না করতে পেরে বহু ‘গালওয়ানিস’ মারা যাওয়া শুরু হলে, তখন তারা হিমালয় টপকে উইঘুর প্রদেশের ইয়ারকান্দে বসতি স্থাপন করেছিল, যদিও গোলাম রসুলের পরিবার লেহ তেই রয়ে যায় কয়েকঘর স্বজাতির সাথে। তার পারিবারিক জীবনের ইতিহাস তিনি নিজেই তার লিখিত বইতে উল্লেখ করে যান, যা তিনি তার মা ও স্বজাতিদের কাছে শুনেছিলেন।
১৯৪৫ সালে এক দুর্গম অভিযানে গিয়ে আর ফেরা হয়নি গালওয়ানের, হিমালয়ের কোনো এক দুর্গম অঞ্চলে বরফের মাঝেই তার নশ্বর দেহ চিরতরে হারিয়ে যায় মাত্র ৪৭ বছর বয়সে। এভাবেই একটা বর্ণময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। বর্তমান দিনে, ওল্ড লেহ’এর চামসপা ইয়ার্টং সার্কুলার রোডে গোলাম রসূলের চতুর্থ প্রজন্মের সদস্য বসবাস করেন। সেখানের সরকারি গেস্টহাউজ ‘গালওয়ান গেস্ট হাউস’টি ওনারই সম্মানার্থে নামকরণ করা হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার দ্বারা, যা আজও রয়েছে।
কিন্তু এত সবের পর আর গালওয়ানের নাম থাকবেনা কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। ইতিমধ্যেই এলাকাটিকে চীন তাদের দেশের অংশ বলে অন্যায় দাবী করে নতুন নাম দিয়েছে; আর চীনকে সমুচিত জবাব দিয়ে যদি আমাদের সেনা ওই এলাকা পুনরুদ্ধার করে আনে, যোগী আদিত্যনাথ কি আর হাত গুটিয়ে বসে থাকবে! হাজার হোক নামটা গোলাম রসূল, গৌড় বা রাসেল নয়, তাই অতি শীঘ্রই এমন একটা ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে তা বলাই বাহুল্য।
তথ্য সুত্রঃ
indian defence research wing এর ওয়েবসাইট

মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০

নেপাল সীমান্ত সমস্যা


পাক অধিকৃত কাশ্মীর নিয়ে মিডিয়ার যতটা আগ্রহ, চীন অধিকৃত কাশ্মীর তথা ‘আকসাই চীন’ নিয়ে এরা ততটাই নীরব। জানিনা কোন কারনে কোন মন্ত্রবলে। তবুও এটা আশ্চর্য করেনা, কারন বিগত ছ’বছরে ভারতীয় মিডিয়া নির্লজ্জতার সর্বোচ্চ সীমা পার করে গেছে; কিন্তু যেটা আশ্চর্য করছে সেটা হচ্ছে নেপালের বর্তমান রূপ, রীতিমত আগবাড়িয়ে তারা ভারতের মত দেশকে হুমকি দিচ্ছে। যারা আমাদের ভারতের চেয়ে আকারে আয়তনে ২১৩৩ গুণ ছোট, অর্থনীতি বা সেনাবাহিনী শক্তি তুলনাতেও আসেনা- তা সে তথ্য দেওয়া বৃথা।

সঙ্ঘ পরিবার, মোদী সরকারের ব্যার্থতা ঢাকতে লাল চীনের সাথে বর্তমান নেপালের বাম সরকারকে এক করে ফেলে, অতি সরলীকরণ এর মাধ্যমে নিজেদের লুকাতে চাইছে। সমস্যার যে বিষয়, তার সময়রেখা আজকে নয়; বরং আজ থেকে ২০০ বছর পিছনে। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাদের সাথে তৎকালীন ‘কিংডম অফ গোর্খা’র সেনাদের লড়াই হয়, যাকে ‘এংলো-নেপালী যুদ্ধ ১৮১৪’ বলা হয় এবং এই যুদ্ধের শেষে ১৮১৫ সালে শেষ নাগাদ ‘সুগৌলির চুক্তি’ সম্পাদিত হয়, যার দ্বারা আজকের নেপাল রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারিত হয়েছে, যা পশ্চিমে ‘মহাকালী নদী’ বরাবর ও পূর্বে ‘মেচি নদী’ বরাবর। প্রসঙ্গত এই চুক্তি অনুযায়ী নেপালিরা দার্জিলিং ও সিকিম ব্রিটিশদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
সমস্যার সুত্রপাত হয়, পশ্চিম সীমার নির্নায়ক মহাকালী নদী বর্তমান উত্তরাখন্ডের একটা স্থানে এসে দুটো শাখানদীতে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে, যে অঞ্চলটার নাম লিপুলেখ ও কালাপানি। এই মহাকালী নদীর উৎপত্তি লিম্পিয়াধুরা নামে একটা স্থানে। ব্রিটিশ সার্ভেয়ারেরা ১৮২৭ সালে যে ম্যাপ প্রকাশিত করেছিল নেপালের সীমানার, সেখানে দেখা যাচ্ছে নদীর মোটা যে অংশ সেটাকে তারা ‘অফিশিয়ালি’ মান্যতা দিয়েছিল সীমানা হিসাবে। কিন্তু পরবর্তীতে এই অঞ্চলটি চীনের সাথে ব্যবসার জন্য একটা গুরুত্বপুর্ন অঞ্চল হিসাবে দেখা দেয়, ফলস্বরূপ ব্রিটিশরা নেপালিদের সাথে আলোচনা না করেই তাদের ম্যাপে সরু নদী ‘পানিখাদ’কে সীমানা করে নতুন ম্যাপ প্রকাশিত করে দেয় ১৮৬০ সালে প্রকাশিত একটা সার্ভে অনুযায়ী।
তৎকালীন দিনে এই অঞ্চলে কেউ বসবাস করতনা, তাই এই অঞ্চলটার কোনো গুরুত্বই ছিলনা নেপালের রাজার কাছে। একে তো দুর্গম এলাকা, দ্বিতীয়ত কেবল ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের- কৈলাসের মানস সরবোরে যাওয়ার এটা একটা সহজ রাস্তা ছিল, নতুবা সিকিম ঘুরে তাদের মানস সরবোরে যেতে হত, তাই ১৮৬০ এর সমসাময়িকালে নেপালি রাজা বিষয়টিকে একপ্রকার উপেক্ষাই করেছিল বলা যেতে পারে, কারন ১৮৫৭ সালের একটি আভ্যন্তরীণ ঘরোয়া বিদ্রোহে তৎকালীন নেপালি রাজা জঙ্গ-বাহাদুর রানা- ব্রিটিশদের সেনা সাহায্যে বিদ্রোহীদের দমন করেছিল, এর পর থেকেই নেপাল কখনও এই অংশকে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক ম্যাপে নেপালের অংশ বলে উল্লেখ করেনি। কিন্তু চীনের কুং রাজবংশের প্রকাশিত তৎকালীন ম্যাপে অংশটিকে নেপালের বলেই উল্লেখিত রয়েছে, যেমনটা ১৮২৭ সালে ব্রিটিশদের ম্যাপে ছিল।
এই ধারাবাহিকতা সেই থেকে চলে আসছে, ব্রিটিশরা এর পর প্রায় ১০০ বছর রাজ ক্ষমতায় ছিল, কোন সমস্যা হয়নি; স্বাধীন ভারতেও ১৯৯০ সালে একবারই সামান্য উচ্চবাচ্য শোনা গিয়েছিল, যখন নেপালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছিল। এছাড়া দীর্ঘ কংগ্রেসি শাসনে নেপাল একপ্রকার ভারতের স্বাধীন করদ রাজ্য হিসাবেই ছিল বলা যেতে পারে। স্বাধীন ভারতে উক্ত ‘লিপুলেখ-কালাপানি-লিম্পিয়াধুরা’ অঞ্চলটি উত্তরাখণ্ডের পিথরগড় জেলার অধীনে রয়েছে, বর্তমানে অঞ্চলটি ভারতের দিক থেকে অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।
এদিকে নেপালিরা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যেমন চাকরি করে রোজগার করে তেমনই লক্ষ লক্ষ নেপালি ভারতে এসে বিনা পাসপোর্ট বিনা ভিসাতে ব্যবসা, বাণিজ্য, চাকরি সবই করছে একজন আম ভারতীয়ের মতই। তারা আমাদেরই খেয়ে আমাদেরই লাল চোখ দেখাচ্ছে।
বর্তমান ভারতের অকর্মন্য ও চূড়ান্ত ব্যার্থ রাষ্ট্রনেতাদের কল্যাণে নেপালের মত দেশও ভারতের সাথে সংঘাতের যেতে রাজি হয়ে যাচ্ছে, যা এক চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা। ভুটান ছাড়া এই মুহুর্তে প্রায় প্রতিটি প্রতিবেশী দেশের সাথেই ভারতের সম্পর্ক তলানিতে।
মোদী সরকার এক্ষেত্রেও স্বভাবগত ভাবেই নেহেরুর উপরে দোষ চাপিয়ে পালাবার বাঙ্কার খুঁড়তে ব্যস্ত হয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

ভুলের নাম যখন মানচিত্র



আকার প্রকারে বৃহৎ মানেই কি- শক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শন করে?
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে মানচিত্র একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম, ছোট বড় যেকোনো ভ্রমণে আমাদের যাত্রাপথ পরিচালিত হয় এই মানচিত্র দ্বারা। বিভিন্ন ভূ-রাজনীতি এবং পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে একটা দ্বিমাত্রিক রূপ প্রদান করে এই মানচিত্র। মানচিত্র দেখা আসলে একটা নেশাও বটে, এটা মাননীয় সুব্রত মণ্ডল দাদার সুত্রে আমার পাওয়া, সেই মত সময় সুযোগ পেলে ম্যাপে ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভালই লাগে। ছোটবেলায় এ্যাটলাসের মানচিত্র বই দেখতাম, পরে বাঁধানো দামি ডায়েরী গুলোর ভিতরে সুদৃশ্য রঙিন মানচিত্র আঁকা থাকত, ‘পলিটিক্যাল ম্যাপ’ ইত্যাদি যেগুলো ভীষণ কৌতূহল সৃষ্টি করত। নতুন শতকে পদার্পন করার কিছুদিনের মধ্যেই মোবাইলে মানচিত্র এসে যাওয়াতে ভীষণ সুবিধা হয়ে গিয়েছিল- পৃথিবীকে বুঝতে।
ঠিকিই চলছিল, কিন্তু গোল বাঁধল অন্যত্র। ভাইরাস ও ‘আর্টিক্টের বরফ’ শীর্ষক একটা প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে গ্রীনল্যান্ডের আয়তন দেখছিলাম, দেখি সাড়ে একুশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার তার আয়তন, ভারতের আয়তন সম্বন্ধে কোথাও একটা পড়েছিলাম বলে সেটাও মগজে ছিল- পৌনে ৩৩ লক্ষ বর্গকিমি। এই গণিতের হিসাবে দেড়খানা গ্রিনল্যান্ড ভারতে অনায়াসে ঢুকে যাবে, কিন্তু মানচিত্রে দেখে থ হয়ে গেলাম- দেখি ৮-১০ খানা ভারত গ্রিনল্যান্ডের মাঝে অনায়াসে ঢুকে যাবে। ঘ্যাঁটে ঘ…
তারমানে আমাদের মানচিত্র ত্রুটিপূর্ণ? আজ্ঞে হ্যাঁ- বিশ্বের সর্বাধিক স্বীকৃত যে মানচিত্র ‘মার্কেটর ম্যাপ’, আমরাও যেটা অনুসরণ করি, তাতে চিত্রিত অধিকাংশ দেশেরই আকার-আয়তণ মোটেই ততটা নয় যতটা আমাদের দেখায়, বিশেষ করে উত্তর গোলার্ধের উপরের দিকের দেশ সমূহ। এটা নিশ্চিত হাস্যকর রকমের ভুল, কিন্তু আজকেও এটাকেই বয়ে নিয়ে চলেছে সমস্ত ডিজিটাল মানচিত্র কোম্পানিগুলো।
আচ্ছা খুলেই ফেলুন গুগুল মানচিত্র, দেখুনতো গ্রিনল্যান্ডকে কত্তবড় দেখাচ্ছে। এবারে তার পা বরাবর নিচে গিয়ে দেখুন, বেচারা লাতিন আমেরিকা কেমন ছোটখাটো দেহ নিয়ে সেখানে পড়ে রয়েছে। কিন্তু তথ্য কি বলছে? গ্রিনল্যান্ডের আয়তন সাড়ে একুশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার আগেই বলেছি, সেখানে দক্ষিণ আমেরিকা ১ কোটি ৯২ লক্ষ বর্গ কিমি- মানে প্রায় ১০টা গ্রীনল্যান্ডের সমান। শুধু তাই ই নয়, রাশিয়া, ইউরোপ, কানাডা, আমেরিকা সব’ই অনেক ছোট ম্যাপে যেমনটা দেখায় তার চেয়ে। বরং আফ্রিকা বা আমাদের ভারত অনেক বড় মানচিত্রে, তাদের তুলনায়।
কানাডার পূর্ব দিকের আলাস্কা প্রদেশ, যা আমেরিকার অংশ; ম্যাপে তার যা আকার, তাতে করে আমেরিকার নিচের দিকের দেশ মেক্সিকোর মত পাঁচ-ছটা দেশ ঢুকে যাবে। এখানেও গণিত বলছে আলাস্কার আয়তন ১৭ লক্ষ বর্গকিমির সামান্য বেশি, সেখানে মেক্সিকো অন্তত আরো আড়াই লক্ষ বর্গ কিমি বেশি।
ইংল্যান্ডের ম্যাপের দিকে তাকান, দেখে মনে হবে খান চার- পাঁচেক ওই মাপের দেশ হলেই তা ভারতের সমান আয়তন হয়ে যাবে- কিন্তু অঙ্কের হিসাবে ইংল্যান্ডের চেয়ে আমাদের ভারত ২৫ গুনের চেয়েও বেশি বড় আকারে। প্রকৃতপক্ষে, ‘গ্রেট ব্রিটেন’- জাপান, ফিলিপিন্স, মাদাগাস্কার এবং নিউজিল্যান্ড সহ বেশ কয়েকটি দেশের চেয়ে ছোট। কানাডার আকার নিয়ে আর নাইবা বললাম, যাচ্ছেতাই মাত্রার বুজরুকি সেখানে।
বস্তুত এই মানচিত্র অঙ্কনের পদ্ধতি তাকে ‘প্রজেকশন’ বা প্রক্ষেপন বলা হয়, মানে ধরে নেওয়াই হয় যে এতে ত্রুটি থাকলেও থাকতে পারে। এই মানচিত্রাঙ্কন বিদ্যাকে ইংরাজিতে বলা হয় কার্টোগ্রাফি। ‘মানচিত্র সমীক্ষা ও আন্তঃসরকারী কমিটি’ অনুসারে, মানচিত্র পাঁচ প্রকারের হয়। যথাক্রমে- জেনারাল রেফারেন্স, টপোগ্রাফিকাল, থিম্যাটিক, নেভিগেশন চার্ট এবং ‘ক্যাডাস্ট্রাল মানচিত্র ও তার রূপায়ন’।
• যে মানচিত্র গুলো আমরা নিয়মিত দেখি, পথের দুরত্ব নিরুপন করি, সেগুলো এই ‘জেনারাল রেফারেন্স’ মানচিত্র। একমাত্র এই মানচিত্র পর্বেক্ষন করে বোঝার জন্য বিশেষ নির্দিষ্ট শিক্ষার প্রয়োজন নেই, কিন্তু পরবর্তী মানচিত্রগুলো থেকে তথ্য অনুসন্ধান করতে বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন হয়।
• অর্ডিন্যান্স সার্ভের ক্ষেত্রে জমির উচ্চতা গভীরতা ইত্যাদি নিরুপনে টপোগ্রাফিকাল মানচিত্র ব্যবহার করা হয়।
• তথ্যগত বিষয়ভিত্তিক টিকা সম্বলিত, যেমন জনঘনত্ব, ভূতত্ত্ব, আবহওয়া ইত্যাদি বিষয়ক মানচিত্রকে থিম্যাটিক মানচিত্র বলা হয়ে থাকে।
• জলপথে একস্থান থেকে অন্য স্থানের দুরত্ব, পথের দুপাশের ভূপ্রকৃতি, বিশেষ বিশেষ স্থানের পরিচিতি, নিমজ্জিত শিলাখন্ড ইত্যাদি বিষয়গুলোর উপরে ভিত্তি করে যে মানচিত্র, তাকে নেভিগেশন চার্ট বলা হয়। যদিও এর সাথে থিম্যাটিক মানচিত্রও জুড়ে তবেই তা নৌ পথের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠে।
• ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জমির মালিকানা সত্ত্ব সম্বলিত চৌহদ্দির বর্ননা যে মানচিত্রে প্রত্যায়িত থাকে তাকে ক্যাডাস্টাল মানচিত্র বলে। আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির জমির যে নক্সা, তথা আমিনেরা যে মানচিত্রের সহায়তায় জরিপ করে থাকেন সেটাই এই ক্যাডেস্টাল মানচিত্র। সমস্ত ধরনের মানচিত্রের এটাই বিশদ সংস্করণ যেখানে সুক্ষাতিসুক্ষ বিবরণগুলো লিপিবদ্ধ থকে।
এবারে বিভিন্ন মহাদেশ গুলোর আকার গুলোর দিকে আমরা একটু চোখ বোলায়-
• এশিয়া- ৪ কোটি ৪৬ লাখ বর্গ কিমি
• আফ্রিকা- ৩ কোটি বর্গ কিলোমিটারের সামান্য বেশি
• উত্তর আমেরিকা- ২ কোটি ৪৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
• লাতিন আমেরিকা- ১ কোটি ৯২ লাখ বর্গ কিলোমিটার
• ইউরোপ- ১ কোটি বর্গ কিমির সামান্য বেশি
• অস্ট্রেলিয়া- ৭৬ লক্ষ ৯২ হাজার বর্গ কিলোমিটার
এবারে অনান্য কিছু বড় দেশের আকার আয়তন দেখা যায়-
• রাশিয়া- ১ কোটি ৭১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
• কানাডা- প্রায় ১ কোটি বর্গ কিলোমিটার
• চীন- ৯৬ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
• আমেরিকা- ৯৮ লক্ষ ৩৪ হাজার বর্গ কিলোমিটার
• ব্রাজিল- ৮৫.১১ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার
তাহলে হিসাব গুলো কেমন দাঁড়াচ্ছে! আলাস্কা ছাড়া বাকি আমেরিকা ব্রাজিলের চেয়ে ছোট, চীনের চেয়েও ছোট। অস্ট্রেলিয়া এদের থেকে সামান্যই ছোট, যদিও মাপে তেমনটা নেই। এশিয়া সবচেয়ে বড় মহাদেশ, আর রাশিয়া সবচেয়ে বড় দেশ। ম্যাপের বিশাল অংশ জুড়ে রাশিয়ার অবস্থান, যদিও সেটাও মস্ত ভুল, মানচিত্র দেখলে মনে হবে চীন বাদে ৮-৯টা ‘অবশিষ্ট এশিয়াকে’ রাশিয়ার মাঝে ভরে দেওয়া যাবে। বরং এশিয়া থেকে রাশিয়া আর চীনের আয়তন বাদ দিলে যেটা অবশিষ্ট থাকে সেটা রাশিয়ার সমতুল্য।
সবচেয়ে দৃষ্টিকটু হচ্ছে ইউরোপের অংশে, মানচিত্র দেখলে মনে হবে ইউরোপ আফ্রিকার অর্ধেক। আসলে ইউরোপ আফ্রিকার একতৃতীয়াংশের চেয়েও ছোট। বহু দেশই ‘ম্যাপের প্রজেকশনে’র তুল্যমুল্য আয়তনের চেয়ে অনেকটা ছোট, যথা- আইসল্যন্ড পাঁচ গুণ, ব্রিটেন ৩ গুণ, নরওয়ে ১০ গুণ, সুইডেন ৩ গুণ, ফিনল্যান্ড ৪ গুণ ছোট। বেলারুশ-পোল্যান্ড-কাজাকিস্থান-জার্মানি-ফ্রান্স দেশ গুলো দ্বিগুণ বড় করে দেখানো আছে। এছাড়া ইউরোপের বাকি প্রত্যেকটি দেশ সহ তুরস্ক ও ইরাণও তাদের আসল আয়তনের তুলনাতে একটু বেশি স্থান দখল করে আছে মানচিত্রে।
শুধু কি তাই? আমরা যেটাকে পৃথিবীর উপরের দিক ভাবি, সেই উত্তর দিক আসলে পায়ের দিক। নাসার মহাকাশান এ্যাপেলো-১৭ এর মহাকাশ অভিযাত্রীরা যে ছবি পাঠিয়েছিল তা আমাদের এই সনাতন মানচিত্রটিকে উল্টো করে ধরলে যেমন দেখায় ঠিক তেমন দেখতে। এছাড়া আন্টাকার্টিকা প্রদেশের ম্যাপে কোনো ভূমিরেখর নির্দেশনা নেই, সবটাই বরফাচ্ছাদিত।
প্রতিটি দেশের মানচিত্র, যেগুলো উত্তরমেরুর দিকে রয়েছে আশ্চর্যজনক ভাবে প্রতিটি দেশের আকার, মিছিমিছিই(!) উত্তরোত্তর বৃদ্ধি প্রাপ্ত আয়তনের দিক থেকে। কারন এই মানচিত্র যবে প্রথম চিত্রিত হয়েছিল, সেই ষোড়শ শতকে এই বিপুলা গোলাকার পৃথিবীর বৃহৎ ক্ষেত্রফলের দ্বিমাত্রিক মানচিত্র অঙ্কন করাটাই ছিল একটা চরমতম সাহসী ও বৈপ্লবিক গবেষনাকৃত সম্পাদনা। এই ভুলটা হয়ত তৎকালীন ততটা ত্রুটিজনক না হলেও আজকের দিনে শুধু দৃষ্টিকটু নয়, বরং এটা অপরাধ; যেখানে দুটো পরমাণুর মাঝের সঠিক দুরত্বর নিখুঁত পরিমাপ করা যায়, সেখানে ওই ত্রুটিযুক্ত মানচিত্র কেন থাকবে!
কেন এমন ত্রুটিযুক্ত মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছিল?
এই ‘কেন’টা জানতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে পাঁচশ বছর অতীতে, ষোড়শ শতকে। খুব একটা বিদেশ ভ্রমণ না করেও, শুধুমাত্র বিভিন্ন পুস্তক, হরেক ভ্রমণকারী, বনিকদল, রাষ্ট্রকর্তা প্রমুখদের সাথে চিঠি চালাচালি করে, সেই সকল টুকরো টুকরো তথ্যগুলিকে নিয়ে দীর্ঘ গবেষণালব্ধ প্রচেষ্টার দরুন ১৫৬৯ খ্রীষ্টাব্দে তিনি আজকের এই মানচিত্রটির রূপদান করেন জেরার্ডাস মার্কেটর। তৎকালীন ইউরোপের নেদারল্যান্ড রাজ্যের অন্তর্গত ফ্ল্যান্ডার্স কাউন্টিতে জন্ম নেন তিনি; একধারে প্রখ্যাত ভুগোলবিদ তথা ভূ-বিবরণবিদ ও মানচিত্র-অঙ্কন বিশারদ ছিলেন; পাশাপাশি মহাকাশ গবেষণা, জামিতিতেও তিনি ভীষণ পারদর্শী ছিলেন। বর্তমান দিনে এই ফ্লান্ডার্স কাউন্টিটি বেলজিয়ামে অবস্থিত। তিনিই প্রথম দেওয়ালে ঝোলানো বিশ্ব মানচিত্র ও গ্লোব ম্যাপের আবিষ্কার করেন।
ভূগোল, দর্শন, কালানুক্রম এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয় নিয়ে মার্কেটর বিস্তর গবেষণা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৫৯৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ১২০ পৃষ্ঠার ‘অ্যাটলাস’ নামের সচিত্র মানচিত্র প্রকাশ করেন; এখানে মহাবিশ্বের সৃষ্টির বিবরণ এবং চিত্রিত সমস্ত দেশের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করেন। খ্রিষ্টীয় ধর্মগ্রন্থ, যথা- গসপেল ও ওল্ড টেস্টামেন্ট আধারে মানচিত্র অঙ্কন করেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ কালিগ্রাফার ও ভাস্কর ছিলেন, তৎকালীন প্রতিটি গ্লোব ম্যাপের সকল কিছুই নিজে হাতে বানাতেন ও অঙ্কন করতে।
পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কিছু সাহসী মানুষ জলপথে যাত্রা শুরু করেছিলেন নিত্যনতুন দেশ আবিষ্কার করে ভাগ্যান্বষনের জন্য, কেউ রাজার ইচ্ছায় কেউবা বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে। মজার বিষয় হল, সে সময় খোদ ইংল্যান্ডের নিজেরই তেমন গ্রহণযোগ্য মানচিত্র ছিলনা। এমতাবস্থায় অস্ট্রিয়ার রোমান শাসক তথা স্পেনের রাজা তথা নেদারল্যান্ডের ডিউক ‘পঞ্চম চার্লসের’ একান্ত ব্যাক্তিগত পরামর্শদাতা জিন কার্ন্দোলেত এর কানে আসে এই ভূগোলবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর এর কথা। সামুদ্রিক নৌচালন বিদ্যায় পথ নিরুপন করা ও দূরত্বের পরিমাপ করার জন্য তখন কোনো একক মানচিত্র ছিলনা ইউরোপীয় শাসকদের কাছে, যা সর্বজনগ্রাহ্য। এরই সমাধানের জন্য জিন কান্দোর্লেত পৃষ্ঠপোষকতা করলেন মার্কেটরকে, কিন্তু তার চাহিদা ছিল অতি সামান্য- দুটো মাত্র গ্লোব। এই আত্মবিশ্বাসই মার্কেটরকে পরবর্তীতে খ্যাতিমান হতে সাহায্য করেছিল।
পরবর্তীতে জার্মানির জালিচ প্রদেশের শাসক, তার পুত্রের রাজ্যাভিষেক এর প্রাক্কাল্লে একসেট নতুন ও নিখুঁত মানচিত্র তৈরির বরাত দেয় মার্কেটরের কাছে। সেই দুর্মুল্য সংগ্রহটি বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা রয়েছে ‘আটলাস’ নামে। এটার নিরিখেই পরবর্তী বিশ্বের মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছিল, যা আজও গোটা পৃথিবীতে ধ্রুবক হিসাবে ববহৃত হয়ে আসছে।
লুথেরিয়ানদের ধর্ম বিশ্বাস মতে উত্তর দিক হল পবিত্র, প্রসঙ্গত মার্কেটর নিজেও একজন লুথেরিয়ান ধর্ম বিশ্বাসী ছিলেন। এজন্যই মানচিত্রে উত্তরদিন উপরের দিকে করেছিলেন তিনি জেনেবুঝেই।
মারকেটরের জীবনীকার, ‘ঘিচ’ এর ভাষ্য অনুসারে, তৎকালীন সকল ইউরোপিয়ান শাসকই চাইত- তাদের দেশগুলো যেন আকৃতিতে বড় করে দেখানো হয়, এতে করে নিজেদের ‘সুপ্রিমেসি’ বা অধিপত্যের দম্ভ দেখানো যেত। সমসাময়িক কালে মারকেটরের কোনো প্রতিদ্বন্দী ছিলনা, স্বভাবতই অধিকাংশ বরাতই তার কাছে আসত; এবং অতিরিক্ত অর্থ সমাগমের অভিপ্রায়ে মারকেটর প্রত্যেকেরটাই এমন করে ‘গোপনে’ বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে অনুমান করেন। এছাড়া এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ছোট করে দেখিয়ে দিলে, ইউরোপিয়ানদের নিজেদের দখলীকৃত অংশগুলো আকারে অনেকটা বড় লাগত পরিমাপের এককে, ৫% অধিগ্রহণ করে- দেশে এসে জানাতো ২৫% দখল করেছি, তাতে গৌরব বাড়ত। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের বাইরে কোন দেশেই যেহেতু মারকেটর নিজে যাননি, তাই আয়তনটা কিছুটা তারই মস্তিষ্কপ্রসুতও ছিল। এছাড়া কাগজকে শঙ্কু আকৃতির বানিয়ে, তা থেকে গোলাকার পৃথিবী বিষয়ে ধারণা করেছিলেন মারকেটর, সেখান থেকেও এমন ভুল হবার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এগুলো সবই সম্ভাবনা মাত্র, আসলে বিষয়টা কী ছিল তা একমাত্র মারকেটরের বাইরে কেউই জানতেননা, বাকিটা পাঠকের ভাবনার উপরে ছাড়া হল।
কিন্তু এই ভুলটা জানা গেল কীভাবে!
১৮৮৫ সালে জেমস গল এবং আরনো পিটার্স নামের দুই ভূগোলবিদ সর্বপ্রথম আয়তাকার মানচিত্র ‘প্রজেকশন’ করেন, যাকে গল-পিটার্স প্রজেকশন বলা হয়ে থাকে। এটা বিষয়ে ১৮৮৬ সালে ফলাও করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রবন্ধাকারে ছাপানোও হয়েছিল, এর পরে গোটা বিশ্বজুড়ে একটা রাজনৈতিক শোরগোল পরে যায়, ফলস্বরূপ বিশ্বমোড়লেরা বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে দেয়। এরপর হঠাৎ করেই ২০১৬ সালের একটা সম্মেলনে পুনরায় এই নিয়ে প্রস্তাব উঠলে, মার্কেটরকে বাতিল করে ‘গল-পিটার’ এর মানচিত্রকেই ইউনেস্কো মান্যতা দেয়; সেই মত আমেরিকা ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশে এই প্রোজেকশনকেই সরকারী ভাবে ব্যবহার শুরু করে এই সেদিন, ২০১৭ সাল থেকে।
তাহলে ১৮৮৫ সালের আগে কি কোনো বিশুদ্ধ ম্যাপ ছিলনা পৃথিবীতে? অবশ্যই ছিল, কিন্তু ইউরোপিয়ানদের কাছে ছিলনা। মার্কেটরেরও প্রায় ৫০ বছর আগে ‘পিরি রেইস’ নামের একজন তুরস্কের অটোমান সাম্রাজের সেনাধ্যক্ষ ছিলেন, হরিণের চামড়ার উপরে তিনিই পৃথিবীর পূর্ণাঙ্গ ম্যাপের চিত্রাঙ্কন করেছিলেন, বর্তমানে যেটা অনেকটা বিনষ্ট হয়ে গেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এখানে আন্টার্ক্টিকারও পূর্ণ ও রেখচিত্র নির্দেশিত রয়েছে যার দ্বারা টপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র চিত্রণ করা সম্ভব।
পিরি রেইসের পুরো নাম ছিল আহমেদ মহিউদ্দিন পিরি। নৌ-যাত্রার উপরে তার লেখা বই ‘কিতাব-ই-বাহারাইয়ি’ গোটা বিশ্বের কাছেই এক অমুল্য নথি। ঝড়ের প্রকারভেদ সম্পর্কে তার গবেষণালব্ধ তথ্য, নৌ-কম্পাস ব্যবহার করার হরেক কৌশল; বিভিন্ন বন্দর এবং উপকূলরেখার বিষয়ে বিশদ তথ্য সহ তার তালিকা, আকাশে নক্ষত্রগুলি ব্যবহার করে দিকনির্দেশের পদ্ধতি, বিভিন্ন সাগর-মহাসাগর এবং তাদের চারপাশের জমিগুলির বৈশিষ্ট্য সমূহ একত্রিত করে সে এক দুর্মুল্য পুস্তক রচনা করেছিলেন। এই বই এর প্রথম সংস্করণ ইস্তানবুলের পাশাপাশি, ব্রিটিশ লাইব্রেরি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, প্যারিস, ভিয়েনা, বাল্টিমোরের মত বড় বড় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।
গ্রেট আলেকজেন্ডার থেকে কলম্বাস হয়ে ভাস্কো-দা-গামা, এমন অনেকের নথি নিয়েই পিরি রেইস কাজ করেছিলেন, যা তার বইতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বানানো ১৫১৩ খ্রীষ্টাব্দের মানচিত্রের প্রথম টুকরো ১৯২৯ ক্রীষ্টাব্দে তুরস্কের ইস্তানমুলের এক গুদাম থেকে উদ্ধার হয়। যে মানচিত্র, আজকের দিনেও প্রায় নিখুঁত। মানচিত্রের দ্বিতীয় অংশটি ১৫২৮ খ্রীষ্টাবে অঙ্কিত, যেটি মিশরের কায়রো থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। প্রসঙ্গত, কর্মে গাফিলতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে এই কায়রো শহরেই পিরি রেইসকে মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত করা হয়েছিল। আজকের তুরস্ক নৌবাহিনীতে বহু জাহাজ ও নৌ-বহর পিরি রেইসের নামে রয়েছে।
তবে সভ্যতার ইতিহাসে সর্বপ্রথম চিত্রাঙ্কিত কোনো বৈশ্বিক ম্যাপের উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রীষ্টপূর্ব ১০০ সনের কাছাকাছি সময়ে। প্রখ্যাত গ্রীক গণিতজ্ঞ, জোর্তিবিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ ক্লৌদিয়াস ‘টলেমি’ তাঁর ‘জিওগ্রাফিয়া’ গ্রন্থে বিশ্বের মানচিত্র সম্বন্ধে একটা গ্রহণযোগ্য ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তাহলে, এই হল মানচিত্র, তার ত্রুটি ও তার বিবর্তন সংক্রান্ত একটা ছোট প্রবন্ধ।
আপনারা এই ওয়েবসাইটে গিয়ে দেশগুলির আকার আয়তন নিয়ে একটু মজার খেলা খেলতেই পারেন-
https://thetruesize. com/
প্রাথমিক তথ্যসুত্রঃ The Daily Mail, UK. 17 Aug, 2016

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...